Saturday, November 29, 2014

এক পশলা আড্ডাস্মৃতি

সিজিএস কলোনীর সাথে আমার রক্তের, স্নায়ুর, মগজের এমন কোন যোগসুত্র আছে যে এই বিষয়ক কিছু লিখতে গেলে আমার সমস্ত শরীরে স্নায়বিক আনন্দকোষগুলো তোলপাড় শুরু করে। লেখার মধ্যে তাই লাগামছাড়া কোন আবেগ এসে পড়লে তাকে কখনো কখনো বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে।

সিজিএস কলোনী আমার কাছে প্রিয় একটি গ্রামের নাম। যদিও আমি এই গ্রামের লাইসেন্সপ্রাপ্ত নাগরিক ছিলাম না। বেসরকারী চাকুরে বাবা এই কলোনীতে ভাড়া থাকতেন পাকিস্তান আমল থেকেই। সেই সুত্রে আমরাও বাবার সাথে যুক্ত হই দেশ স্বাধীন হবার পর। যদিও ভাড়াটে ছিলাম কিন্তু নিজেদের কখনোই বহিরাগত মনে হয়নি। আমার স্কুল ও কলেজ জীবনের সম্পূর্ণটাই কলোনীর নিরিবিলি গণ্ডীতের ভেতরে কেটে গেছে।

যে বয়সের স্মৃতি মানুষের সবচেয়ে প্রিয়, যে শৈশব কৈশোরের আনন্দ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জীবনের সেই অংশটুকু আমি কলোনীতে কাটিয়েছি বলে নিজের গ্রামের বাড়ির চেয়ে আগ্রাবাদকে অনেক বেশী চিনি, বেশী জানি। নিজের গ্রামের চেয়েও কলোনীতে অনেক বেশী সহজ, স্বচ্ছন্দ, পরিচিত। কলোনী ছাড়ার প্রায় তিন দশক পার হয়ে গেলেও এখনো বছরে দুয়েকবার কলোনীতে যাই পুরোনো ঘ্রাণ শুঁকতে। চোখ বুজে কল্পনা করার চেষ্টা করি সত্তর আর আশির দশকের সেই নয় নম্বর মাঠ, হাসপাতাল মাঠ, মসজিদ মার্কেট, পাওয়ার হাউস, আগ্রাবাদ স্কুল এমনকি স্কুলের সামনে দাড়ানো কুলফি মালাই বিক্রেতার মুখ।

অনেক কিছু বদলে গেছে সময়ে। কিন্তু সেই রাস্তাগুলো, তিন চারতলা পুরোনো দালানগুলো এখনো টিকে আছে। এখনো তাই পুরোনো দিনের কিছু গন্ধ  রয়ে গেছে কলোনীর ইঠ সিমেন্ট সুরকির দেয়ালে। নিঃশ্বাস ভরে নেয়া ওই গন্ধটা আমার ভীষণ আপন।


কলোনীর মাঠ
মাঠের কথা বলি সবার আগে। সিজিএস কলোনীর মতো এত বেশী মাঠসমৃদ্ধ কলোনী বাংলাদেশে আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই। আজকাল বাচ্চাদের খেলার জন্য মাঠ দূরে থাক, খালি পায়ে হাঁটার কোন উঠোনও পাই না দমবন্ধ ফ্ল্যাটবাড়িতে। অথচ আমাদের সময়ে আমরা কয়েকজন মিলে একেকটা মাঠের দখল নিয়ে ফুটবল ক্রিকেট ব্যাডমিন্টন, দাড়িয়াবান্ধা ডাংগুলি যা খুশী তা খেলতাম। মাঠে মাঠে ছিল আমাদের অবারিত রাজত্ব। মাঠের জগতে আমরা যেন ধনীশ্রেষ্ঠ। সকল মাঠের রাজধানী ছিল সেই বিখ্যাত ৯ নম্বর মাঠ। এই মাঠে অনেক বিখ্যাত খেলোয়াড় ক্রিকেটে ব্যাট-বল লাগিয়েছেন, ফুটবলে লাথি মেরে গোল হেঁকেছেন। প্রধান এই মাঠ ছাড়াও ছিল মসজিদের মাঠ, স্কুলের মাঠ, হাসপাতাল মাঠ। ছিল সামনের মাঠ, পেছনের মাঠ, এমনকি প্রতিটা বিল্ডিং এর পেছনেই একেকটি সবুজ মাঠ। ওইসব মাঠের এত কাহিনী, এত ঘটনা যে, শুধু কলোনীর মাঠের কাহিনী নিয়েই আস্ত একটা বই লিখে ফেলা যাবে। তবে মাঠের ইতিহাস লেখার জন্য সেই সব বড় ভাইদের উপর নির্ভর করবো যারা ওই মাঠগুলোতে ইতিহাস গড়েছিলেন একদিন।


মসজিদ মার্কেটের সিঙ্গাড়া
এটা কি একটা লেখার বিষয়? তবু লিখছি। মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়ে মসজিদ মার্কেটে আড্ডার সংখ্যা অন্তত কয়েকশোগুন বেশী হবে। কি ছিল মসজিদ মার্কেটে? কয়েকটা মুদি দোকান একটা টেইলার্স, দুটো সেলুন, একটা ফার্মেসি, দুটো চায়ের দোকান, দুটো পানসিগারেট কলামুলার দোকান, ছোট্ট একটা তরকারী কর্নার, এই তো। কিন্তু এই কখানা দোকানের মধ্যেই আমরা কি বিপুল আনন্দ পেতাম। কলোনীর চা দোকানে বানানো সেই নরোম ডালপুরি আর সিঙ্গাড়া এখনো তুলনাবিহীন। ওরকম সিঙ্গাড়া আমি আর কোথাও খাইনি। মাঠে ময়দানে দৌড়ঝাপ করে যখন ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়তাম তখন টিফিনের পয়সা বাঁচানো চারআনা-আটআনা দিয়ে মসজিদ মার্কেটের ডালপুরি সিঙ্গাড়া। সেই সিঙাড়া কারিগরকে খুঁজে পেলে আমি তার সুদক্ষ হাত দুটোকে বিশেষ কোন পুরস্কার দিতাম। সিঙ্গাড়ার মধ্যে মাত্রা ও স্বাদ অক্ষুন্ন রেখে আলু আর মটর ডালের এত সুন্দর কম্বিনেশান আর কেউ পারতো না।

সিঙাড়া স্মৃতিতে জিবে জল চলে এসেছে রীতিমত। অন্যদিকে যাওয়া যাক এবার।

আমার কলোনী স্মৃতির অন্যতম প্রিয় বিষয় হলো আড্ডা। অতীত জীবনের প্রথম তিনটা প্রিয় বিষয় বলতে বলা হলে আমি বলবো আড্ডা, আড্ডা এবং আড্ডা।  আমাদের ব্যাচটা বোধহয় সবচেয়ে বেশী আড্ডা দিয়েছে কলোনীতে। স্কুল থেকে চাকরীতে ঢোকার আগ পর্যন্ত, এমনকি এখন পঞ্চাশের দিকে রওনা দেবার পরও সেই আড্ডার অভ্যেস ত্যাগ করতে পারিনি। সেই আড্ডা কাহিনী নিয়ে কয়েক ছত্র।

হাসপাতালের সিঁড়ির সান্ধ্য আড্ডা
কলোনীতে একটা সরকারী ক্লিনিক ছিল। এখনো আছে হয়তো। তখন দিবাভাগেই চিকিৎসা দিত সেটি। রাতে বন্ধ থাকতো যদি কোন রোগী ভর্তি না থাকতো। লোকে হাসপাতালে যায় চিকিৎসা নিতে। আমরা হাসপাতালে যেতাম আড্ডা দিতে। বিকেলের দিকে যখন হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যেতো তখন হাসপাতালের প্রবেশমুখের সিড়ি আর লাগোয়া চাতাল হয়ে উঠতো আমাদের আড্ডাখানা। এই আড্ডাখানা এত নিয়মিত ছিল যে দুপাশের সিড়িতে কোন গ্রুপ কখন বসবে তা প্রায় স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল। এটা নিয়ে কোন দ্বন্দ্বও ছিল না। এখানে আড্ডা বসতো সূর্যাস্তের পর।

পাওয়ার হাউসের দিনভর আড্ডা
কলোনীর দক্ষিণ সীমানা দেয়ালের পাশে একতলা দালানটি ছিল পাওয়ার হাউস। ওটার সামনে টানা বারান্দা। সিমেন্টের চকচকে মেঝে। জাম্বুরী মাঠ থেকে উড়ে আসা বাতাসের কারণে ওই বারান্দাটি সবসময় ধুলোবালি মুক্ত থাকতো। ওই বারান্দাটি ছিল সারাদিনের আড্ডাবাজির প্রিয় জায়গা। হাসপাতালের সিড়িতে সন্ধ্যের আগে বসতে না পারলেও, এই চত্বরটি ছিল সারা দিন রাতের জন্য উন্মুক্ত। এখানে দিনরাতের যে কোন সময় আসলে কাউকে না কাউকে পাওয়া যেত। গভীর রাতে কেউ থাকার কথা না, কিন্তু কখনো কখনো এমনও হয়েছে বাসায় ঝগড়াঝাটি করে কেউ বেরিয়ে এসে এখানে বসে বিড়ি ফুঁকছে একলা বসে।

নয় নম্বর মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব কোনার আছর
এই জায়গাটা আমরা কবে লীজ নিয়েছিলাম জানি না। কিন্তু বহুবছর এই জায়গাটা দখলে রাখাতে মনে হতো সরকার আমাদেরকে জায়গাটা দিয়ে দিয়েছে। আমরা যতগুলো জায়গায় আড্ডা দিয়েছি তার সবগুলো সময়ের সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল নানান প্রতিবন্ধকতায়। কিন্তু এই কোনাটা দীর্ঘকাল আমাদের হয়ে ছিল। এমনকি আমি কলোনী ছাড়ার পরে আরো দশ বছর এই কোনাটায় আড্ডা দিতে চলে আসতাম দূর থেকে। এমনকি কলোনী ছাড়ার ৩ দশক পরে এখনো যদি কলোনীতে ঢুকি ওই জায়গাটা ছুঁয়ে আসি।

কী ছিল ওখানে? তেমন কিছু না। কিছু দুর্বাঘাসের সবুজ চাঙর, ডজনখানেক সান্ধ্যকালীন মশা, কিছু লোডশেডিংএর অন্ধকার, কয়েকটি প্রজ্জ্বলিত জোনাকী, এই তো। আমাদের আড্ডাবাজির কারণে ওখানে ঘাসও বেশী বড় হতে পারতাম না। সেই ঘাসগুলোর উপর আমরা হাত পা ছড়িয়ে বসতাম। কখনো কখনো শুয়ে পড়তাম। মাথার উপরে নক্ষত্র মাখানো আকাশ দেখতাম। রাজা উজির মারতাম, হেড়ে গলায় গান গাইতাম দল বেধে, তর্ক ঝগড়া খুনসুটি, আরো কত কি পাগলামো হতো। এখানে হাজির হবার সময় ছিল সূর্যাস্তের পর। এখান থেকে হাসপাতাল মাঠ এবং পাওয়ার হাউস দুটোর দূরত্ব একই। আমরা ঘুরে ফিরে এই তিনজায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতাম।  আড্ডাড়ুদের কোন সংখ্যার সীমা ছিল না। কখনো পাঁচসাতজন, কখনো দশ বিশজন, যখন যে কাজ শেষ করতো চলে আসতো। হ্যাঁ চাকরী জীবনেও এখানে আড্ডা দিয়েছি কিছুকাল।

এই আড্ডার সুত্রে মনে পড়লো কয়েক বছর রনশিঙ্গায় নাট্য আড্ডা দিয়েছিলাম। রিহার্সালের উসিলায় সেও আরেক রকমের আড্ডা। নাটকের চেয়ে আড্ডাবাজি কোন অংশে কম সরস ছিল না। ওই বিষয় নিয়ে আরেকদিন লেখা যাবে।

এখন আমার খুব খারাপ লাগে যখন ভাবি আমাদের আড্ডার এক মধ্যমণি এখন খ্যাতির মধ্যগগন থেকে ছিটকে কোথায় হারিয়ে গেছে। আড্ডাটা হারিয়ে গেছে, আড্ডার মানুষগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের আবর্তে। কিন্তু বেঁচে থাকার শেষদিন পর্যন্ত সেই আড্ডাস্মৃতি তাজা ফুলের সুবাস ছড়াবে বুকের ভেতর।

Sunday, October 26, 2014

অর্থপূর্ণ কিংবা অর্থহীন কিছু দুঃস্বপ্ন

চেনা রাস্তায় কোন এক অচেনা কবরখানা। আমি একটি কবরের সামনে দাঁড়িয়ে। কবরটি কয়েকটি ইস্পাতের ঢাকনা দিয়ে ঢাকা দেয়া। আমি স্টীল পাইপের ফ্রেমগুলো তুলে ঢাকনা খুলে কবরটা উন্মুক্ত করলাম। কবরে সাদা কাফন পরে শুয়ে আছে যে লাশটা সে আমার খুব প্রিয়জন, তার চলে যাওয়া অনিবার্য হয়েছিল বলে সে চলে গিয়েছে, আমার কোন ভয় শোক তাপ কিছুই লাগছিল না। যেন খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা। আমি লাশটির মাথার পাশে রাখা একটা পুটুলি দেখলাম। সে পুটুলিতে কি আছে মনে নেই। কিন্তু আমি দেখছিলাম পুটুলিটি ঠিকঠাক আছে কিনা। সদ্য কবর দিয়ে সবাই চলে যাবার পর আমি নিশ্চিত হতে এসেছিলাম জিনিসটা ওখানে দেয়া হয়েছিল কিনা। দেখে নিশ্চিন্ত হলাম। এরপর লাশের শরীর স্পর্শ করে দেখলাম, তখনো শক্ত হয়ে যায়নি। আমি কবরের ঢাকনাগুলো আবার জায়গামতো বসিয়ে দিয়ে উঠে পড়লাম।

কিছুদুর হেঁটে গিয়ে আবারো কবরের পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় হঠাৎ চমকে দেখি লাশটা কবর থেকে উঠে কবরের পাশে একটা স্টিলের খাটিয়ায় শুয়ে আছে। মাথাটা একটু উঁচু করা। কাফনে ঢাকা শরীরের মাথার অংশটা খোলা। সেই খোলা অংশে দেখা যাচ্ছে ওর অনিন্দ্যসুন্দর মুখটি। আমি স্পষ্ট দেখলাম সে হাসছে আমার দিকে চেয়ে, সেই চিরপরিচিত হাসি। অশ্রু সরিয়েও যে মুখে হাসি ফোটে সেই ম্লানসুন্দর হাসি। সেই হাসির কোন অর্থ আমি বুঝতে পারলাম না। বুকের ভেতর কেমন করে উঠলো। না কষ্ট না ভয় একটা অনুভুতি। আমার কিছু করার নেই। কিছু জানার উপায় নেই।

আমি ফিরে চলে আসলাম। কিছুদূর গিয়ে
বাদামতলী মোড়ে পৌঁছে আবার ফিরতে চাইলাম। কোথায় ফিরছি জানি না। আমি তখন আখতারুজ্জামান সেন্টারের উল্টোদিকে। আমি রাস্তা পেরিয়ে কেন যেন দক্ষিণ দিকে যাচ্ছিলাম। যে রাস্তায় লাশটা দেখে এসেছি সেই দিকেই কী?

রাস্তা পেরোতে গিয়ে দেখলাম পূর্বদিকে আগ্রাবাদ হোটেলের দিক থেকে গোঁ গোঁ শব্দে একটা হেডলাইটবিহীন অন্ধ ট্রাক ছুটে আসছে, চারপাশ অন্ধকার, সড়কবাতি জ্বলছে না, আশপাশের কোন দালানেও নেই বাতির আভাস, যেন এক অন্তহীন ব্ল্যাকআউট, সেই ব্ল্যাকআউটের মধ্যে পূর্বদিক থেকে ছুটে আসা ট্রাকটা দেখে আমি রাস্তাটা দ্রুত পেরিয়ে যেতে চাইলাম, কিন্তু হঠাৎ আমার চোখের উপর একটা অন্ধকার পট্টি পড়ে চারপাশ নিকষ কালিতে ঢেকে দিল, তখন আমি আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না, চোখ থেকে পট্টিটা নামানোর প্রানান্তকর চেষ্টা করে যখন ব্যর্থ হলাম তখন দিগ্বিবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অন্ধের মতো ছুট লাগালাম মাথাটা নীচু করে, কিন্তু ছুটতে গিয়ে টের পেলাম আমি দিক হারিয়ে ফেলেছি, আমি চরকির মতো ঘুরতে শুরু করেছি, উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম সবকিছু আমার কাছে অর্থহীন হয়ে গেল, আমি যে কোন একটা দিকে ছুটে হেডলাইটবিহীন অন্ধ ট্রাকের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করলাম, যদিও জানি ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে আমাকে পিষে দিয়ে ট্রাকটি শরীরের উপর দিয়ে পেরিয়ে যাবে যে কোন সময়।

ঠিক তখন গোঁ গোঁ শব্দ নিয়ে পার্শ্ববর্তিনীর ধাক্কায় ঘুম ভেঙ্গে গেল আমার। 
আমি বেঁচে আছি! ওটা নিতান্তই এক দুঃস্বপ্ন ছিল। স্বপ্নগুলোর হয়তো কোন মানে নেই, হয়তো আছে। সময়ের কাছে এর কোন ব্যাখ্যা থাকলে থাকতে পারে কিন্তু আমার নিজের কোন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে ইচ্ছে করছে না। আয়ুষ্কাল সমাপ্ত হবার পর কেউ হয়তো স্বপ্নগুলোর অর্থ খুঁজে পাবে। কে জানে? এক রাতে আধডজন স্বপ্ন হানা দিয়েছে যার প্রায় প্রতিটিই ভয়ংকর। কিন্তু বাকী স্বপ্নগুলো ভোর হবার আগেই মুছে গেছে স্মৃতি থেকে।

Monday, October 20, 2014

সময় অসময়ের কথকতা

এক. হেমন্ত হিম

অনেকদিন পর হেমন্তের ঘ্রাণ পেলাম। গতকাল সন্ধ্যায় রিকশা নিয়ে যখন বাড়ি ফিরছিলাম তখন লালখান বাজার থেকে চিটাগং ক্লাবের দিকে যাবার পথে হঠাৎ বাতাসে একটা হিমেল স্পর্শ। অক্টোবর মাসে এই আবেশ বহুবছর নির্বাসিত ছিল। এই আবহাওয়া বসন্তের চেয়েও আদৃত। বাংলা কত তারিখ আজ? পত্রিকা দেখে জানলাম কার্তিকের ৫। হ্যাঁ কার্তিকেই তো একটু হিমহাওয়া বইবার কথা, সাথে হালকা কুয়াশা।

এমন আবহাওয়ায় কোথাও বেড়াতে ইচ্ছে করে। না শীত না গরম। আজকাল বসন্তে সেই সুখ নেই। ফেব্রুয়ারী থেকেই কেমন তেতে ওঠে আবহাওয়া। সকালটা সহনীয় হলেও দুপুরটা অসহ্য। বছরে একবার কক্সবাজারে ছোটে বাঙালী। আমিও। যেতে না চাইলেও যেতে হয়। বাকীরা যাচ্ছে, আমরা একঘরে হয়ে থাকি কি করে? প্রতিবার যাই, একরাশ বিরক্তি নিয়ে ফিরে আসি। অবশ্য বিরক্তি আমার একারই। বাকীদের আনন্দ। ওদের আনন্দের জন্যই আমার যেতে হয় বিরক্তি সহ্য করে।

কিন্তু একটা সময় ছিল আমি কক্সবাজার গিয়ে এরকম বিরক্ত হতাম না। তখন আমি অনেক বেশী স্বাধীন ছিলাম বলেই? মনে হয় না। তখন কক্সবাজারে এত ভিড় হতো না, হাজার হাজার মানুষ আর দালানকোঠার ভিড়ে সমুদ্রের নির্জনতা হারিয়ে যেতো না। এখন একা হবার জো নেই। থাকার হোটেল, খাবার হোটেল সবকিছুর শান শওকত বেড়েছে, কিন্তু সেবা ও আন্তরিকতার মানে চরম অধোগতি। প্রতিটা হোটেলে একই খাবার, কোন বৈচিত্র নেই। তবু মানুষ হৈ হৈ করে যায়, হৈ হৈ করে খায়, হৈ রৈ ফুর্তিতে কলাতলীর রাস্তা মাতিয়ে রাখে। কেন জানি কক্সবাজার গেলে আমার খুব ক্লান্তি লাগে, সামান্য হেঁটেও কাতর হয়ে পড়ি। আর কেবলই ঘুম পায়। আমি গতবার দুদিন ছিলাম। অধিকাংশ সময় আমার ঘুমে কেটেছে হোটেলে।



দুই. স্মার্টফোন কীর্তি:

১. মানুষ এখন দুই প্রকার। 'নেট মানুষ' এবং, 'বাস্তব মানুষ'। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবজাতিকে এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছে স্মার্টফোন।

২. আগের মানুষ বিবেক দ্বারা চালিত হতো, এখন চালিত হয় ফেসবুকের লাইক দিয়ে। স্মার্টফোনের দামে বিবেক কিনে নিয়েছে জুকারবার্গের ফেসবুক।

৩. অচেনা 'নেট মানুষ'কে যেমন আপন করে দিয়েছে স্মার্টফোন, তেমনি অতিচেনা বাস্তব মানুষকে ভুলে যেতে শিখিয়েছেও সেই স্মার্টফোন।

৪. পাশের বিছানায় তিনদিনের জ্বরে যে ভাই/বোন/বাবা/মা পুড়ে তামা হয়ে যাচ্ছে তার কপালে কখনো হাত ছোঁয়ায়নি। কিন্তু অতিদূর সমুদ্রের পাড়ে অদেখা আপন কেউ হাঁচি দিলেও আঁতকে উঠে বলছে, 'ম্যান তুমি তো ভীষণ সিক, যাও ডাক্তার দেখাও এখুনি। পাশে থাকলে আমি জলপট্টি দিতাম কপালে।' এও সেই স্মার্টফোন কীর্তি।

৫. একাকীত্ব ঘোচাতে আগের যুগে আত্মীয় বন্ধুর বাড়ি গিয়ে কড়া নেড়ে বলতো, অবনী বাড়ি আছো? এখন আত্মীয় বন্ধুর বাড়ি যাবার বদলে ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে খোঁজে 'হু ইজ অনলাইন নাউ'!

৬. পথে যেতে শোনা একটি সংলাপ- 'ফেসবুক, স্কাইপে, ভাইবার, হোয়াটসআপ, ট্যাঙ্গো কিছুই নাই? তাহলে আমাকে খুঁজে পাবে কি করে?'

.....................মাত্র এই ৬টি নয়, আরো অগুণতি আছে!

স্মার্টফোন আমাদের অনেক উপকার করেও যে যান্ত্রিক মানবতা শিখিয়েছে, ভার্চুয়াল বাস্তবতার রাস্তা খুলে দিয়েছে, সেই রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা মনুষ্যত্ব হারিয়ে বরণ করছি টেকনোলজির দাসত্ব!! আমি নিজেও এই দাসত্বের অনিবার্য শেকলে বন্দী হয়ে যাই মাঝে মাঝে।



৩. আত্মঘাতী বাঙালী

নীরদ চৌধুরীকে খুব অপছন্দ করতাম একসময়। বাঙাল বিদ্বেষী লোক বলে খ্যাত। কিন্তু তার আত্মঘাতী বাঙালীতে কিছু অজনপ্রিয় সত্যি কথা পড়ে ভিন্নভাবে ভাবতে হচ্ছে এখন। বাংলাদেশ এবং বাঙালী জাতি আসলেই একটা সংকটপ্রিয় মানবের একটা অংশ। বাঙালী হুমায়ূন আজাদের তিতা কথাগুলোতেও চরম সত্য কথার নজির ছিল। আমার কি দেশপ্রেম কমে যাচ্ছে?


Saturday, October 11, 2014

নাগরিক সন্ধ্যার অঙ্গনে

অপরূপা এক সন্ধ্যে নেমেছে নদীতীরে। শহরজুড়ে সড়কবাতির উৎসবেও কাটে না সম্পূর্ণ আঁধার।

ভাবতে চাই না, এই সন্ধ্যে আসন্ন মধ্য চল্লিশ পেরুনো অথর্ব জীবনের অনিবার্য অংশ। ভাবতে চাই না ফুরিয়ে গেছে কল কোলাহলের সকল বিকেল।

নদীর ঘাটে রাতের আকাশ, আলোড়িত জলে গোধূলির প্রতিবিম্ব এবং আধখাওয়া কৃষ্ণপক্ষ চাঁদের বিলম্বিত আবির্ভাব। তবু কী বিপুল আনন্দ এখনো অবশিষ্ট।

এক কাপ চায়ের সাথে দুটো ধূম্রশলা, হয়ে যাওয়া বৃষ্টির পরিচিত ঘ্রাণ নদীর বাতাসে, প্রলম্বিত আড্ডার একটু প্রহর। যেখানে শুধু আমরা দুজন।

[স্থান: অভয়মিত্র ঘাট]

শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০১৪​

Thursday, October 9, 2014

ফেলে আসা সময়ের ছায়া সবুজ বাড়িটা

প্রিয় অতীত,
তুমি জানো বাড়িটার কোন বিশেষ সৌন্দর্য ছিল না। না ছিল বিশেষ মুগ্ধ হবার মতো কোন বৈশিষ্ট। শুধু একটা ব্যাপার। কোলাহলময় শহরে ওই বাড়িটা ছিল ছোট্ট নিস্তব্ধ একটা গ্রাম। রাস্তা থেকে গেট পেরিয়ে সীমানা দেয়ালের মধ্যে প্রবেশ করলে আমাদের নিজস্ব জগত। আমাদের আনন্দ বাড়ি। তুমি জানো ওখানে একটা বাগানও ছিল। সেই বাড়িটার সামনে অগোছালো একটা বাগান বা উঠোন। বাগানে কিছু বিক্ষিপ্ত গাছপালা। মোট কটা গাছ ছিল বাগানে? কখনো গুনিনি। দাঁড়াও স্মৃতিতে গুনতে চেষ্টা করি। নারকেল গাছ ছিল দুটো। সুপুরি তিনটা। পেয়ারা গাছ পাঁচটা, সেই পাঁচটা গাছের পাঁচ রকমের পেয়ারা, আম গাছ চারটা প্রতিটা গাছের স্বাদ  আলাদা, দেশি আমের মতো পোকা নেই, টকও না। বরই গাছ ছিল দুটো, দেশি বরই, একটু কষা, আরেকটা টকমিষ্ট রসালো। কামরাঙ্গা একটামাত্র কিন্তু ধরেছিল অজস্র ফল। কাঠাল গাছ দুটো, একটা গাছ হাজারি কাঠাল। আগা থেকে গোড়া কাঠালে ভর্তি থাকতো। আরেকটি লেবু গাছ লাগিয়েছিলাম, অনেকদিন লেবু ধরবে ধরবে করে গাছটা বড় হয়ে একদিন যা ধরলো সেটা একটা জাম্বুরা।
সে কথা রাখেনি, তবু আমরা তাতেই কী আনন্দ করেছিলাম। আরো আছে, কলাগাছের কথা তো বলাই হয়নি। অনেকগুলো গাছ ছিল। কিন্তু কলাগাছগুলো ফলের চেয়ে পাতা বেশী উপহার দিয়েছে, কোরবানীর মাংস রাখার কাজে কাজে লাগতো, আর লাগতো পিঠা বানাতে। তবু বছর কয়েক ধরে নিয়মিত কাঁচকলা উপহার দিয়েছিল দুটো গাছ। আর দিয়েছিল কলার থোড়। কলা গাছ কেটে ফেললে সেটার কাণ্ডের মধ্যখানে যে সাদা শাস থাকে সেটা এক মজার তরকারী হতো। চাটগাইয়া ভাষায় তাকে বলা হয় বহলী। সবজি হিসেবে অতুলনীয়। 

বাগানে আরো কটা ফলের গাছ ছিল আতা, জলপাই, আমলকি হাবিজাবি। কিন্তু ওরা কেউ কথা রাখেনি। অথবা আমরা ওদের ঠিকমতো যত্ন নিতে পারিনি। ফুলের গাছের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ছিল মাধবীলতা, সবচেয়ে সুগন্ধী ছিল শিউলি আর হাসনাহেনা। ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাইরে পা রাখলে শিউলিতে সাদা হয়ে থাকতো পথের অনেকটা।  হাসনাহেনার গন্ধে নাকি সাপ আসে, আমার জানালার পাশেই ছিল হাসনাহেনার ঝাড়, কিন্তু আমি কখনো সাপ দেখিনি।  গোলাপ ছিল, কথা রাখেনি গোলাপও। যে রঙের ফুল দেবার কথা তা না দিয়ে অন্য রঙ দিয়েছিল। জবাগুলো অসাধারণ ছিল, সাদা, লাল, গোলাপী। গাঁদা, কসমস, জিনিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, এমনকি সূর্যমুখীও ফুটেছে একসময়। 

নিয়মিত ফুলফলের পাশাপাশি ছিল অসংখ্য অজানা অচেনা ঘাসলতাপাতার জঙ্গল। এই যে যাকে বাগান বলছি, তাকে সত্যি সত্যি বাগান বলা যায় কিনা সন্দেহ আছে। এখানে সবকিছু ছিল একদম অগোছালো। কিছু গাছ নিয়ম মেনে লাগানো হলেও অধিকাংশ উঠেছিল স্বেচ্ছাচারীর মতো। পাতাবাহারের ঝোপগুলো বেড়ে উঠতো ইচ্ছেমতো। আমাদের বাড়ির চেয়ে তিনগুন বড় ছিল বাগান, তাই বৃক্ষদের স্বাধীনতা ছিল অবারিত। ওরা ওদের মতো এখানে সেখানে বেড়ে উঠেছিল। একসময় বাগানের আড়ালে হারিয়ে গেল আমাদের আস্ত বাড়িটাই। 

পাশের রাস্তা দিয়ে যাবার সময় কেউ বাড়ি খুঁজে পেতো না, দেয়ালের দক্ষিণ পাশে যে রাস্তা সোজাসুজি চলে গেছে সেখানে দাড়ালে দেখা যাবে শুধুই সবুজ, শুধুই ছায়া। কোলাহলময় ব্যস্ত সড়ক থেকে আকাশী রঙের গেটটা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই সুনসান এক সবুজ শান্তির জগত। সেই সবুজের ছায়ার আশ্রয়ে ছিল আমাদের বাড়িটা। আমরা দীর্ঘ ২২ বছর কাটিয়েছে সেই অখ্যাত স্মৃতিময় বাড়িটাতে।

এত বছর পর হঠাৎ খুঁজতে গিয়ে দেখি ওই বাড়িতে তোলা অধিকাংশ ছবি হারিয়ে গেছে। সেই সৌন্দর্যের একাংশও নেই বিদ্যমান ছবিগুলোতে। তবু কয়েকটি ছবি স্মৃতির অংশ হিসেবে যুক্ত করা হলো।


১. মহাসড়কের পাশে বাড়ির প্রবেশ পথে গেটের দুই পিলারের সাথে লাগানো কিছু গাছ ছিল। হাতের বায়ে শিউলি আর কামিনী। হাতের ডানে মাধবী লতার ঝোঁপ। মাধবী লতার ফুলগুলো বেলা বাড়ার সাথে সাথে নিজেদের রূপ বদলাতো। সকালে সাদা, দুপুরে লাল হয়ে যেতো। শিউলি তলাটা সাদা হয়ে যেতো সারারাতের ঝরে পড়া শিউলিতে। শিউলি গাছের পাশেই ছিল আমগাছ, কাঁঠাল গাছ, তার গা ঘেষেই আমাদের বসার ঘরের দক্ষিণের জানালাটা।

বাড়ির উঠোনে মা খালা ভগিনীত্রয়ীর অবসর বিকেল

গাছের কাণ্ড ধরে ঝাকুনি নিলে বরই ঝরে পড়তো
থালা ভর্তি কুড়িয়ে নেয়া বরই


গাছ থেকে সদ্য পাড়া ডাব

সকালের রোদ মেখে দ্বিতীয় প্রজন্মের দুইজন
ঘুম ভাঙা শীতের সকালে বাগানে চেয়ার পেতে রোদ পোহানো


দ্বিতীয় প্রজন্মের হাত ধরে চতুর্থ প্রজন্ম
রাজকীয় জবা বাড়ির ছাদ ছুঁয়ে আম গাছের মগডালে পৌঁছেছে


নিবাসী কাকের ধারণা, এই বাড়ি তার, আমরা নেহাত ভাড়াটে


থোকা থোকা কামরাঙা

জানালার পাশে ঝুলছে কাঠাল, হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়
সবুজের ছায়ায় নিঃসঙ্গ কাক

যে ফুলে সুগন্ধ নেই

সমস্ত বাগানে বিস্তৃত সবুজের ছাদ

অবসর বিশ্রামে মা

ঘরের দেয়াল ঘেঁষে বাহারী পাতার মিছিল

মানিপ্ল্যান্টের দেয়াল ভ্রমণ

রাত জাগা ফুল ফোটাবার প্রস্তুতি

দেয়াল বাইছেন ইনিও

ওখানে কে রে?

তৃতীয় প্রজন্মের উর্ধমূখী কৌতুহল

গাছ থেকে পড়ে থাকা পাকা আম


সাদা জবা

অতিথি শালিক

বাগানে দ্বিতীয় প্রজন্মের একজন



দীর্ঘ বিশ বছরের ইতিহাস থেকে খুঁজে পাওয়া কয়েকখানা মাত্র ছবি দিয়ে এই বাড়ি নিয়ে কিছুই বোঝানো যাবে না। যতটা লেখার সাধ, ক্ষমতা তার চেয়ে অনেক কম।

ফেলে আসা বাড়িটা এখন কেবলই স্মৃতি। খুব প্রিয় একটা স্মৃতিময় অংশ। অথচ, অথচ এতসব স্মৃতির বোঝা ফেলে একদিন চলে যেতে হয়। তারপর.......

সেই সেদিন, অফিস থেকে ফেরার পথে আমাদের সাবেক সেই বাড়িটার পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখি আস্ত বাড়িটা মাটির সাথে মিশে গেছে উন্নয়ন শাবলের আঘাতে, সেই সাথে মিশে গেছে ছায়া সবুজের সকল আশ্রয়। আর কদিন পরেই আকাশচুম্বি দালান খাড়া হয়ে যাবে সেখানে। তখন কেউ ভাবতেই পারবে না, এই জায়গার মাটি দীর্ঘ বিশ বছর সবুজ ছায়ায় নিমজ্জিত ছিল।

একদিন আমিও হয়তো বিস্মরণের পথে হাঁটতে শুরু করবো। তবু তার আগ পর্যন্ত আমাদের ছায়াবাড়িটা নিয়ে স্মৃতির বিলাস চালিয়ে যাবো। মানুষের জীবনটা খুবই ছোট্ট, অনিশ্চিত। অনেক প্রতিশ্রুতি সময়ের স্রোতে হাস্যকর হয়ে যায়। তাই 'আমি আরো লিখবো' এটা কোন প্রতিশ্রুতির দায় বহন করে না। এটা খুব সামান্য একটা ইচ্ছামাত্র।




[অসমাপ্ত]







Wednesday, October 8, 2014

ছুটিময় শহরে বিষাদময় অবসর অতঃপর খানিক আনন্দ ছোঁয়া মুহুর্ত

১.

ঈদের ছুটি শুরু হবার দিন ফেসবুকে লিখেছিলাম-

কিভাবে ছুটি কাটাতে চাই?

"সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে শুয়ে শুয়ে একটু বিশ্রাম করি। তারপর হাতমুখ ধুয়ে চা-জলখাবার খেয়ে আবার শুয়ে পড়ি। দুপুরবেলা কষ্টেসৃষ্টে উঠে টানটান করে খাওয়া সারি। দ্বিপ্রাহরিক আহারের পর ভাতঘুম তো বাঙালীর ন্যায্য পাওনা, দুপুরের পর তাই ভাতঘুমে থাকি। বিকেলে চা জলখাবার খাবার পর ভাবি কোথায়ই-বা যাবো, বরং শুয়েই থাকি। রাতের বেলা খাওয়া সেরে আবার ঘুমিয়ে পড়ি।"

সৌজন্যে: বিশ্রামগুরু শিবরাম চক্রবর্তী

দেখা গেল আক্ষরিক অর্থে ছুটিটা চুড়ান্ত অলসতায় গেল, যেটাকে খানিক অসুস্থতা বলেও চালানো গিয়েছে। এই অবসাদ, এই ক্লান্তি, কোথাও যেতে ইচ্ছে না করা, কিছু লিখতে না পারা, অথচ নির্ঘুম রাত এইসব কি অসুস্থতার লক্ষণ? আমি ঠিক জানি না, কিন্তু ভেতরের কলকব্জাগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে না এটা নিশ্চিত। ৪৫ পার হওয়া মানে ৫০ এর পথে রওনা দেয়া। পঞ্চাশের দিকে সুস্থতার সম্ভাবনা কমে আসতে থাকে ক্রমেই। অগ্রজেরা যে পথে গেছে আমি সেই পথ থেকে ব্যতিক্রম হবো কি করে।

জুবায়ের ভাইয়ের 'সিকি আধুলি গদ্যগুলি' পড়ছিলাম। আগেও পড়েছি, কিছু লেখা বাকী ছিল সেগুলো পড়লাম রাত জেগে। একটা লেখা আরেকটা লেখাকে ডেকে আনে। বইটা আমাকে আরো তিনটা বই পড়তে বাধ্য করলো। আরো কয়েকটা জীবনকে আমার কাছে উন্মুক্ত করলো। চেনা মানুষের অজানা জীবন। আমি দুদিন বুঁদ হয়ে থাকলাম। এমন ঘোর অনেকদিন আসেনি আমার। আমি যখন ব্লগ জীবন শুরু করি, জুবায়ের ভাই তখন জীবনের মায়া ছেড়ে অন্য পৃথিবীর পথে রওনা দিয়েছে। মূলতঃ জুবায়ের ভাইয়ের সবগুলো লেখাই পড়েছি তাঁর অন্তর্ধানের পর। এই বইটা যতবার হাতে নেই, কেমন একটা চাপা কষ্টবোধ পেয়ে বসে। বর্তমান আনন্দময় দিনগুলো থেকে আমি ভাসতে ভাসতে ভবিষ্যতের না হওয়া কোন এক বিষন্ন দিনে ঘুরতে থাকি। তবু এই ছোট্ট বইটার ছোট ছোট বিষন্ন শব্দগাঁথা আমার পড়তে ইচ্ছে করে। অনেক লেখার বিষয়বস্তু চলে যাওয়া। অনেক মানুষের চলে যাওয়া নিয়ে লিখতে লিখতেই তিনি নিজেও একদিন চলে গেলেন। আমি জুবায়ের ভাইয়ের ব্লগস্পটে ঢুকে পুরোনো লেখাগুলো খুঁজে পড়তে থাকি। আমি কি কোথাও নিজেকে খুঁজে পাই ওখানে?

সিকি আধুলি গদ্যগুলির নতুন একটা লেখা পড়লাম পরশু রাতে। ২০০৬ সালে প্রয়াত কবি সুরাইয়া খানমের স্মরণে। একালের খুব বেশী মানুষ তাঁকে চেনে না। সত্তর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়েছেন শিক্ষকতা করেছেন, ছিলেন তাদের কাছে ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপক সুরাইয়া খানম এক আলোচিত কিংবদন্তী। যত না তাঁর প্রতিভা ও মেধার জন্য, তার চেয়ে অনেক বেশী রূপের জন্য, সম্পর্কের জন্য। সবচেয়ে বেশী আলোচিত কবি আবুল হাসান এবং লেখক আহমদ ছফার সাথে বিশেষ সম্পর্কের জন্য। লেখাটি পড়ার পর আমাকে পড়তে হলো আহমদ ছফার আত্মজৈবনিক উপন্যাস- 'অর্ধেক নারী, অর্ধেক ঈশ্বরী'। বইটিতে চরিত্রের নামগুলো বদলে দেয়া হলেও অধিকাংশ চরিত্রই আমাদের চেনা। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক থেকে শামীম শিকদার, আহমদ ছফা থেকে আবুল হাসান সবাইকে খুঁজে পাই। ছফার জীবনীকার নুরুল আনোয়ারের মতে উপন্যাসে বর্ণিত প্রতিটি ঘটনা সত্য। এখানেই কিছু গোলমাল লাগে। কারণ ছফার দৃষ্টি দিয়ে বিচার করলে সবার প্রতি ঠিক সুবিচার করা হয় না। আবার তৃতীয় পক্ষের সাক্ষ্য পাওয়াও মুশকিল। আবুল হাসানের কোন সম্পূর্ন জীবনী পাইনি। সুরাইয়া খানমের জীবনির খোঁজও জানা নেই। তবে সুরাইয়া খানমের পরিচয় খুঁজে গিয়ে পেলাম তিনি ভোয়ার দিলারা হাশেমের ছোটবোন। তাঁর আরেক বোন দিলশাদ খানম সত্তর দশকে বিটিভিতে রক্ত করবী  নাটকের নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, সেই নন্দিনী যাকে আমি কৈশোরে দেখে এত বছরেও ভুলিনি। জুবায়ের ভাইয়ের লেখাটা আমাকে আবুল হাসান, সুরাইয়া খানম আর আহমদ ছফা ত্রয়ীর সম্পর্কের আরো ইতিবৃত্ত জানার আগ্রহী করায় আমি 'ছফামৃত' পড়ে ফেললাম আরো একবার।

জুবায়ের ভাইয়ের শেষ লেখা ছিল - দুই মাস যখন দুইদিনে নেমে আসে। চলে যাবার এক মাস আগের লেখা অথবা প্রকাশ। লেখাটি অসম্ভব বিষন্ন করে দেয় মন। এই বিষন্নতা কাটাতে নতুন কিছু পড়া দরকার। এই অন্তহীন মন খারাপিয়া চক্র থেকে বের করার জন্য অন্য কোন বই পড়তে হবে। ছফা নয়, আবুল হাসান নয়, অন্য অন্য কোন বই।

২.

ঈদে কোথাও বেড়াতে না গেলেও বাচ্চাদের নিয়ে রাতের বেলা রিকশায় করে পূর্ণিমা দেখতে বেরোলাম গত রাতে। পাশাপাশি প্রবারণা পূর্ণিমার ফানুস উড়ানোর অপরূপ দৃশ্যও দেখা হলো। শত শত ফানুস  আকাশ ছেয়ে ফেলেছে, চাঁদের চারপাশে লালচে তারার মেলা। বাতাসে শীতলতা। অপূর্ব সুন্দর কিছু সময় কাটলো বাইরে। নিস্তব্ধ ছুটির শহরে এ এক পরম প্রাপ্তি।



Tuesday, September 30, 2014

ছুটির গন্ধে ঘুম আসে না

এই সময়গুলো তবু ভালো। একটা দিন ভালো গেলে, একটা সপ্তাহ ভালো গেলে সাফল্যজনক এক আনন্দ ভর করে। মাঝে মাঝে সেই সাফল্যের উপর চুনকালি দেয়া দিনও এসে হাজির হয়। তখন সময় কঠিন। বলতে না পারা কষ্ট, বোঝানো যায় না তেমন বেদনা, অসহায়ত্ব সবকিছু একসাথে ঘিরে ধরে। যে ভিত্তির উপর দাড়িয়ে আমাদের এই সমস্ত সুখ, সেই ভিত্তি কোথাও কেঁপে গেলে সবকিছু অর্থহীন মনে হয়। যেখানে আমার শান্তির আশ্রয় সেটাকেও নিতান্ত অকার্যকর মনে হয় তখন। প্রিয় সময়গুলোও অবান্তর হয়ে যায়।

এখন সময় ভালো, তবু সেই কঠিনকে ভুলতে পারি না। মাঝে মাঝেই কঠিন দিনগুলো আসে। আবারো আসবে। সবকিছু ছেড়ে তখন পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। আসলে পালানো হয় না। পিছুটান থাকলে ফিরে আসতে হয়। সবগুলো ভুল, পাপ, গ্লানি পুরোনো রুমালে মুছে ফিরে আসতে হয়। যদি ভূমিকম্প না থামে, তাহলে কি ফেরার পথ থাকে? কোন কোন ভূমিকম্প অগ্ন্যুৎপাতের সূচনা করে, তখন তো সকল ভিত্তি ভারসাম্যহীন। আমি দাঁড়াবো কোথায়?

এই সময়গুলো তবু ভালো, আজকের দিনটা ভালো, গতকালের দিনটাও ভালো, তার আগের দিনও। আমি স্বাধীনতা উদযাপন করেছি। মানুষ মাত্রেই স্বাধীন হতে পছন্দ করে। কিন্তু কোথাও কোথাও পরাধীনতা চায় কেন সেই একই মানুষ? এ এক অবোধ্য স্ববিরোধীতা।

প্রেরণার শক্তি অনেক। প্রেরণার অন্য নাম হতে পারে জ্বালানী। প্রেরণা থেকে অসম্ভব শক্তি নির্গত হতে পারে। সেই শক্তি সৃষ্টি করতে পারে, ধ্বংস করতে পারে, জন্ম দিতে পারে শিল্পের শ্রেষ্ঠতম সজ্জা। কিন্তু সব প্রেরণায় ধারাবাহিকতা থাকে না। প্রেরণা নিজেই হারিয়ে যায় মাঝে মাঝে। তখন শিল্প পড়ে বিপদে আর জ্বালানীর অভাবে শিল্পকর্তা ধ্বংস করতে পারে নিজের শিল্পকর্মও। এটা একটা ট্র্যাজেডি এবং এই ট্র্যাজেডির কোন প্রতিকার নেই।

একটা সম্ভাব্য কাজে সময়, অর্থ এবং শক্তি বিনিয়োগ করতে শুরু করেছি। কাজটার সাফল্য আমি দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি। আমি পরিপূর্ণভাবে আত্মবিশ্বাসী। কাজটা হবে, কতটা সুন্দর হবে তা নিশ্চিত নই। কিন্তু আর সব কাজের মতো এই কাজের শুরুতেও আমি বিপরীত প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ে ভাবছি। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে আমি অহেতুক ঋণাত্মক বিষয় নিয়ে চিন্তাগ্রস্থ হই। অভিযোগের সত্যতা মেনেও আমি আমার ভাবনা অব্যাহত রাখি। এটা আমার ধাক্কা সামলানোর মানসিক প্রস্তুতি। আমি খুব বড় কোন ধাক্কা খাইনি মানুষের কাছে, কিন্তু ছোট ছোট প্রচুর ধাক্কা খেয়েছি। যেখানে খাবার ছিল না সেখানেও। সেই ধাক্কাগুলো সামলেছি শুরুতেই একটা সংশয় রেখেছিলাম বলে। পুরোনো অভ্যেস, ছাড়ানো কঠিন।

দুদিন বাদেই দীর্ঘ ছুটি। পুজা আর ঈদ মিলে ৮ দিনের ছুটি। আমার জন্য অকাজের ছুটি। এবার ছুটিতে কোথাও যাবো না। যথারীতি সামাজিক কর্মে ব্যস্ত। পড়াশোনার কাজ, লেখালেখির অনেক কাজ পড়ে আছে, প্রতিবার ছুটিতে এগিয়ে নিতে চেষ্টা করি। কিন্তু কিছুই হয় না। আমি বরং কর্মস্থলে অনেক বেশী কাজ করতে পারি। গত বছরের সাথে এবছরের একটা পার্থক্য আছে। আকাশে, বাতাসে, অনুভবে। অনেক কিছু যেন বদলে গেছে। বদলানো উচিত হয়েছি কিংবা হয়নি সেই বিচারে আমি অক্ষম। তবু সময় নিজস্ব গতিতে চলে, নিজস্ব পরিকল্পনায়। আমরা সময়ের অনিবার্য দাসত্ব মেনে বেঁচে থাকি।

আমাকে তুমি ছুটি দিয়েছো, অথচ আমি সেই ছুটি অনুভব করতে পারি না। ছুটির কী নিদারুণ অপচয়।

বৃষ্টির দিন শেষ, আশ্বিনের কুয়াশায় ভোর হয়, তিন শালিকের ঝগড়ায় ঘুম ভাঙ্গে। একলা রাত জাগার কথা তখন আর মনে থাকে না। কেন জাগি, জিজ্ঞেস কোরো না।




Thursday, September 11, 2014

আলো ছায়ার গদ্য

১.
এক সময় রুটিন বদলে যাবে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। একসময় পৃথিবী বদলে যাবে স্বেচ্ছায়। খোদ সময় বলে সে চলে না কারো ইচ্ছায়। একসময় একা থাকলেও খারাপ লাগবে না। সবকিছু থেকেও তো মাঝে মাঝে খারাপ লাগে। সবকিছু পেয়েও শূন্যতা বুকে বাজে। নির্ভরশীলতার দায় নেই। তবু স্বেচ্ছা নির্ভরশীলতার দায় চাপিয়ে দেই ফাঁকা জানালায়। যে জানালা আকাশ মেঘ বৃষ্টি আর ঝোপ জঙ্গলের আদিম সুঘ্রাণ বয়ে আনে, সেই জানালা কখনো কখনো দুঃস্বপ্নের অনাদরও বয়ে আনে। আমি কি সব জানি, আমি কি সব জানি? আমাদের যতটা জানানো হয় ততটা জানি। সংবাদে প্রকাশিত অংশটুকুই। না জানা অংশটা চমকে যাবার মতো। কখনো না জানাই ভালো। সবটুকু বলা হয় না, শোনার সময় থাকে না, কিংবা ধৈর্য। একসময় রুটিন বদলে যাবে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। স্মৃতি তখন পুরাকীর্তি। সময় হয়তো কীর্তিনাশা। নাটকের একাংশে সাজানো স্ক্রিপ্ট, অসমাপ্ত বই, ভুল গানের অনাচার, দীর্ঘশ্রুত মিথ্যা, অসময়ের ছেদবিন্দু, প্রতিটি সম্পর্কহীন দৃশ্য, অপাত্রের ফুটো দিয়ে গড়িয়ে হারিয়ে যায়। বিস্মরণ যখন অনন্ত আশ্রয়,তখন তোমার বিলম্বিত উপস্থিতি। শেষ কথাটি বকেয়া থেকেই যাবে।

২.
একটা সত্যি প্লেনের বায়না ধরেছো। আগের প্লেনটি বাতাস ভর্তি শুধু। ভেতরে কিছু নেই, মাকাল ফলটি। দেখতে বড়ো, উড়তে অক্ষম। এখন একটি সত্যি প্লেন আসছে। সত্যি সত্যি, তিন সত্যি। দেখতে ছোট, উড়তে পারে। অনেক দূরে নেবে তোমায়। শুধু রিমোট সামলে রেখো। যাবার আগে আগের প্লেনের বাতাস ছেড়ে ভাঁজটি করে দেরাজে ঢুকিয়ে রেখো। কখনো যদি বিনা বাধায় স্বাধীন কোথাও উড়তে ইচ্ছে করে, ভাজটি খুলে গ্যাস বেলুনের বাতাস ভরে আকাশ জুড়ে পাখা মেলো।

৩.
ওটা এক চিরচেনা ঠাঁই। এই কিছুকাল আগেও। ওখানে শুধুই সবুজ। ভেতরে বাইরে সবখানে। ছিল ছায়া, এলোমেলো ডালপালা জঙ্গল, তরতাজা ভোরের শিউলি, মাধবী লতায় রোদের ঝিলিক। পথিকের মেঠোপথ। মহাসড়ক সুদূর স্বপ্ন। ঘাসের গালিচায় আলোর বিকেল। রাত্রিসজ্জায় জ্যোৎস্নার নকশা। ছায়াপথের আলোয় ঘুমের আয়োজন। এক বাড়ি নিঝুম। ওই ঠাঁই, এই নির্জনতা আমার খুব চেনা। আমি তাদের কখনোই ভুলি না। আমি রাখলেও মহাকাল এসব কিছুই মনে রাখবে না।

৪.
বইটা যথেষ্ট ভালো, কিন্তু মলাট ভালো না। শুধু মন্দ মলাটের জন্য একটা ভালো বই নষ্ট হয়ে যাবে।


Wednesday, September 10, 2014

হাসির কথা না

১.
আমার এক স্প্যানিশ বন্ধু ছিল পেরুতে। মাঝে মাঝে এমএসএন চ্যাটে কথা হতো তার সাথে। কোন কোন আড্ডায় মজার কথা শুনে সে "যা যা যা যা... করতো"। আমি প্রথমে ভাবতাম সে আদর করে যাহ দুষ্টু টাইপ কিছু বলছে। পরে মনে হলো সে তো বাংলা জানে না, তাহলে? ইংরেজিতে 'যা যা...' করার মানে কি?

আরো অনেক পর স্প্যানিশ শিখতে গিয়ে বুঝলাম আসলে ওটা ছিল হাহাহাহাহা। ইংরেজিতে আমরা লিখি hahahaha, ওরা লেখে jajajajaja স্প্যানিশে h উচ্চারণ হয় j দিয়ে। ভাগ্যিস এই গাধামিত্ব কেবল নিজের ভেতরেই ছিল।

২.
নানান কাজে দীর্ঘদিন ধরে শহরের একটা নামকরা অফিসে যেতাম মাঝে মাঝে। কয়েকবার টয়লেট ব্যবহারও করেছি সেই অফিসের। অফিস বড়, তাই তাদের টয়লেট কমপ্লেক্সও বড়সড়। মজার ব্যাপার ছিল টয়লেটে লাগানো স্টিকারগুলো। এগুলো  মাঝে মাঝেই বিবর্তিত হয় বছরখানেক পরপর। প্রতিটা পরিবর্তনের পর আমি বুঝতে পারি ওই অফিসের লোকেরা কি চরিত্রের।  যতটা মনে আছে শুরু থেকে স্টিকারগুলো  সময়ক্রম অনুসারে সাজিয়ে লিখেছি এবং ব্র্যাকেটে আমার তাৎক্ষণিক ভাবনাগুলো লিখেছি।

- কমোডে পা রাখিবেন না (তার মানে তখন কিছু লোক হাই কমোডে পা রেখে বাথরুম সারতো)
- দাঁড়িয়ে প্রশ্রাব করিবেন না (তার মানে এখানে কিছু লোক দাঁড়িয়ে প্রশ্রাব করে)
- ব্যবহারের পর কল বন্ধ করুন (তার মানে এখানে কিছু লোক বাথরুমের কল বন্ধ না করে চলে আসে)
- ইউরিন প্যানে টিস্যু ফেলিবেন না। (তার মানে এখানে কিছু লোক ইউরিন প্যানে টিস্যু ফেলে)
- দেয়ালে প্রশ্রাব করিবেন না (তার মানে এখানে কিছু লোক দেয়ালে প্রশ্রাব করে!!!)
- বাথরুম ব্যবহারের পর ফ্ল্যাশ করুন (তার মানে এখানে কিছু লোক ফ্ল্যাশ করে না)
- প্রশ্রাব করলে বদনার পানি ব্যবহার করুন। পায়খানা করলে ফ্লাশ ব্যবহার করুন (এবার সাফ ফেল্টু খেলাম। আমার কোন ভাবনাই তল পেলো না)

আমি কৌতুহল চাপতে না পেরে ওই অফিসের একজনকে জিজ্ঞেস করে বসলাম, ঘটনা কি ভায়া?
সে বললো, হঠাৎ করে কোম্পানীর পানি সংকট দেখা দিয়েছে। ফ্ল্যাশ আইন হবার পর থেকে সবাই কথায় কথায় ফ্ল্যাশ করে পানি শেষ করে ফেলতো। এক ছটাক পেশাব করেও বিশ লিটার পানি ঢেলে দিত ফ্ল্যাশ করে। পানি সংকট নিরসনে বাধ্য হয়ে কতৃপক্ষ  বদনা আইন জারি করেছে এবং ফ্ল্যাশ ব্যবহার সীমিত করেছে।

ফেরার পথে ভাবতে লাগলাম, এরপর কি ওই কোম্পানী সিসিটিভি লাগাবে বাথরুম কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে?


Monday, September 8, 2014

অসম্পূর্ণ গল্পের ভূমিকা

১.
তোমার অনিন্দ্য সুন্দর চোখ দুটি মেলো।
এদিকে চোখ তোলো।
এই দেখো-
তাকিয়ে দেখো খুব ভালো করে
তোমার পাশে একজোড়া নতুন হাত।
তোমার বাঁধানো সুখের শস্যখেত থেকে
কষ্টের আগাছাদের উপড়ে ফেলতে প্রস্তুত সেই দুটি হাত।
তোমার মাথার চুলে বিলি কাটছে যে দুটো হাত।
তার সেই বেদনার্ত বুক ক্ষতি ভুলে আগলে রাখছে তোমার যত কষ্ট।
লুকিয়ে ফেলো তোমার অঝোর কান্না সেই আড়ালে।
আর কোন কষ্ট তোমাকে কুঁকড়ে খাবে না।
যতদিন সে জীবিত আছে
এই সময়, সেই সময়,
সে আছে তোমার পাশেই!
দেখো, তোমার অনিন্দ্য সুন্দর চোখ মেলে দেখো, আমি আছি!


তারিখটা বোধহয় ১৭ জুলাই ২০১০। এটিকে পদ্য মনে হলেও এটি আসলে সংলাপ সিঁড়ি। যার জন্য লেখা সে যোজন যোজন দূরে। তার সাথে কখন দেখা হবে সে জানে না। আদৌ হবে কিনা। প্রতিদিন তবু অনুভুতির প্রজাপতিরা বাগানে উড়ে উড়ে নিঃশব্দে স্মৃতি এঁকে যায়।

২.
তবু কোথাও থেকে এক অচেনা ভাবনা এসে জুড়ে বসে। 

"শুরুই তো নেই, শেষ কি করে হবে। আসলেই কী তাই? আমি এভাবে ভাবি না। শুরুর তারিখটা আমার জানা নেই তবে শেষ যে হয়নি সে আমি জানি। আমার কাছে তাই ব্যর্থতার কোন হাহাকার নেই। বরং আছে সফলতার আনন্দ। দুজন মানুষ যুগ যুগ ধরে সফলভাবে একটা পবিত্র সুন্দর অনুভুতিকে লালন করেছে পৃথিবীর কোন অনিষ্ট না করে। এই সাফল্যের কথা আমি অস্বীকার করি কি করে? পাওয়া কি সবসময় শুধু দৈহিক পাওয়াই হয়? আমার কাছে তার চেয়ে আত্মিক পাওয়া যে অনেক বড়। আমি যে আত্মিক সফলতা অর্জন করেছি এটা তো আমার পৃথিবীর অন্যতম সুখের বিষয়। আমার বুকে তাই হারিয়ে ফেলার হাহাকার বাজে না। আমি যখন পথ হাঁটি তখন মাথার অনেক উপরে ভেসে থাকা মেঘের মধ্যে আমি দেখতে পাই সেও আমার সাথে সাথে উড়ে যাচ্ছে। আমি একটা নক্ষত্রগামী ফড়িং এর মতো ওর পাশে পাশে উড়তে থাকি হাওয়ায় হাওয়ায়। মেঘেরা আমাদের ছায়া দিয়ে পথ দেখায়। ওই আকাশের বিশালতায় ছড়ানো আছে আমাদের প্রাপ্তি। যে পথে সে একদিন হেঁটেছিল আমি এখনো সেই পথে হেঁটে যাই। তার পদস্পর্শ পৃথিবীর যতগুলো ধুলো ছুয়েছে তার সবকিছুই আমি যেন ছুঁতে পাই। আর সেই সাথে পেয়ে যাই তাকেও। তুমি কখনো হারাবে না আমার কাছ থেকে। সেই রূপে আমাদের কখনো দেখা হবে না হয়তো আর, কিন্তু তোমার স্মৃতির ছায়াগুলো আমার সঙ্গী হয়ে থাকবে সারাজীবন। এ আমার অনুপম আনন্দ। কাছে থাকা মানে পাশে বসে থাকা না। অনেক দূর থেকেও পাশে থাকা যায়। আমি জানি আমি জানি। আমি তো অনুক্ষণ পাশে থাকি অদৃশ্য মায়ায়।"

৩.
পাল্টে যাওয়া সময়ে এসে সেই গানটা আবারো হাজির হয়।

"অমরত্বের প্রত্যাশা নেই নেই কোন দাবী দাওয়া
এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকে চাওয়া
মুহূর্ত যায় জন্মের মতো অন্ধ জাতিস্মর
গত জন্মের ভুলে যাওয়া স্মৃতি বিস্মৃত অক্ষর
ছেঁড়া তাল পাতা পুঁথির পাতায় নিঃশ্বাস ফেলে হাওয়া
এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া

কাল-কেউটের ফনায় নাচছে লখিন্দরের স্মৃতি
বেহুলা কখনো বিধবা হয় না এটা বাংলার রীতি
ভেসে যায় ভেলা এবেলা ওবেলা একই শবদেহ নিয়ে
আগেও মরেছি আবার মরবো প্রেমের দিব্যি দিয়ে

জন্মেছি আমি আগেও অনেক মরেছি তোমারই কোলে
মুক্তি পাইনি শুধু তোমাকে আবার দেখবো বলে
বার বার ফিরে এসেছি আমরা এই পৃথিবীর টানে
কখনো গাঙর কখনো কোপাই কপোতাক্ষর গানে
গাঙর হয়েছে কখনো কাবেরী কখনো বা মিসিসিপি
কখনো রাইন কখনো কঙ্গো নদীদের স্বরলিপি
স্বরলিপি আমি আগেও লিখিনি এখনও লিখিনা তাই
মুখে মুখে ফেরা মানুষের গানে শুধু তোমাকেই চাই

তোমাকে চেয়েছি ছিলাম যখন অনেক জন্ম আগে
তথাগত তার নিঃসঙ্গতা দিলেন অস্তরাগে
তারই করুনায় ভিখারিনী তুমি হয়েছিলে একা একা
আমিও কাঙাল হলাম আরেক কাঙালের পেতে দেখা
নতজানু হয়ে ছিলাম তখন এখনো যেমন আছি
মাধুকরী হও নয়নমোহিনী স্বপ্নের কাছাকাছি

ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ব্যারিকেড কর প্রেমের পদ্যটাই
বিদ্রোহ আর চুমুর দিব্যি শুধু তোমাকেই চাই

আমার স্বপ্নে বিভোর হয়েই জন্মেছ বহুবার
আমি ছিলাম তোমার কামনা বিদ্রোহ চিৎকার
দুঃখ পেয়েছ যতবার জেনো আমায় দিয়েছো তুমি
আমি তোমার পুরুষ আমি তোমার জন্মভূমি
যতবার তুমি জননী হয়েছ ততবার আমি পিতা
কতো সন্তান জ্বালালো প্রেয়সী তোমার আমার চিতা

বার বার আসি আমরা দুজন বার বার ফিরে যাই
আবার আসবো আবার বলবো শুধু তোমাকেই চাই"


আমার প্রিয় বেশ কিছু গানের মধ্যে কোন না কোন সময়ের স্মৃতি জড়িত। এই গানটা যখন প্রথম শুনি তখন খুব মন দিয়ে মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা করিনি। গানের সুর এবং গায়কীর দিকেই মনোযোগ ছিল বেশী। কিন্তু আরো বিশ বছর পর যখন গানটা শুনলাম, তখন ভিন্ন একটা সময়। পৃথিবীর অনেক কিছু বদলে গেছে। বদলে গেছে আমার নিজের জীবনটাও। ঠিক তখন এই গানটা সিনেমার মধ্যে শুনলাম আবার এবং আবিষ্কার করলাম এই গানটা কার জন্য লেখা। এত বছর পর গানের সমস্ত কলি লাইন লাইন ধরে শুনে বুঝলাম এটা কেবলই তোমার জন্য। জাতিস্মর সিনেমায় দেখার পর প্রিয় গানের মধ্যে এই গানটা নতুন মাত্রা নিয়ে আরো প্রিয় হয়ে গেল। শুনে খুব ছেলেমি হয়ে যাচ্ছে বলবে তাই না? আমি জানি। তবু এই গানে আমি তোমাকে খুঁজবো। আমার না পাওয়া সুখ, না হওয়া প্রেম সবকিছুর অস্তিত্ব এই গানের প্রতিটা ছত্রে লুকিয়ে আছে। তোমাকে পাওয়া হবে না বলে যে আক্ষেপ ছিল সেই আক্ষেপের ক্ষতের উপর মলম হয়ে গানের কলিগুলো আমাকে শান্ত্বনা যোগাবে।

আমি আসলে একটি চিঠি লিখতে চেয়েছিলাম কোন অনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে। চিঠিটা লেখা হলো না। কেননা-
Time passes slowly up here in the mountains
We sit beside bridges and walk beside fountains
Catch the wild fishes that float through the stream
Time passes slowly when you're lost in a dream

Thursday, September 4, 2014

এনায়েত মওলার 'কাকলী' এবং একাত্তরে চট্টগ্রামের অবস্থা নিয়ে ইতিহাসপাঠ

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মিথ্যাচার নতুন কিছু না। এতে ইতিহাস লেখক, গবেষক, রাজনীতিবিদ, সবারই কিছু না কিছু দায় আছে। সরল মনে পড়লে যখন যার বই পড়ি তার তথ্যই সঠিক বলে ভাবতে ইচ্ছে করে, আবার ক্রিটিকাল মুডে পড়তে বসলে কাউকেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। এটা একটা সমস্যা। তাছাড়া কোনটা ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার কোনটা অনিচ্ছাকৃত মিথ্যাচার সময়ের সাথে তা ঝাপসা হয়ে আসছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের অনেক লেখক জীবিত নেই। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যাও কমে আসছে। আগামী বিশ বছর পর হয়তো একদম শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। তখন মিথ্যার বেসাতি খুলে বসতে সুবিধা হবে মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসায়ীদের। বলতে খারাপই লাগে এদেশে ধর্মব্যবসায়ী যেমন আছে তেমনি মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসায়ীও আছে। এরা প্রত্যেকে নিজ নিজ পছন্দের ব্যাপারে খুব স্বার্থপর। লিখিত বইপত্রে যার প্রতিফলন ঘটে কৃতিত্ব ছিনতাইয়ের মাধ্যমে।

এই বেসাতি বন্ধের জন্য বর্তমান প্রজন্মকে সতর্কতার সাথে ইতিহাস পড়তে হবে। গল্প আর ঘটনার মধ্যে ফারাক করার ক্ষমতা থাকতে হবে। সেই ক্ষমতা অর্জনের জন্য অল্পবিস্তর পড়াশোনা করা দরকার। ইতিহাস নিয়ে মিথ্যাচার বন্ধ করা অসম্ভব জেনেও আমি চেষ্টা করছি অন্ততঃ চট্টগ্রাম অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনাগুলোর একটা সমন্বয় ঘটাতে। একই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন লেখক তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে লিখেছেন, সেই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সঠিক তথ্য বের করাই এই সমন্বয় প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য।

সেই লক্ষ্যে চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইপত্র সংগ্রহ করার আরেকটি চেষ্টা করছি। আমার সংগ্রহে যা আছে তা যথেষ্ট নয় বলে মনে হচ্ছে। যত বেশী প্রত্যক্ষদর্শীর বই পাওয়া যাবে তত বেশী তথ্যসুত্র মিলবে। লেখক জীবিত থাকলে সরাসরি কথা বলতেও আগ্রহী। ক্রস চেকিং এর মাধ্যমে অনেক ঘটনার সত্যমিথ্যা যাচাই করা যাবে। এসব বই থেকে ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে, তৎকালীন অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে।

বুঝতেই পারছেন চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইয়ের তালিকা করার ব্যাপারে সাহায্য চাইছি। বইয়ের নাম, এমনকি কেউ স্ক্যান বা পিডিএফ ডকুমেন্ট/বই দিলেও বাধিত থাকবো।


========================

উপরের লেখাটা স্ট্যাটাস আকারে ফেসবুকে বইপড়ুয়াতে দিলাম। কিছু বইয়ের খোঁজ দরকার জরুরী ভিত্তিতে।

ঘটনা হলো, গতকাল এনায়েত মওলা নামে এক অচেনা ভদ্রলোকের লেখা বই "মুক্তিযুদ্ধের ভিন্নছবি- চট্টগ্রামের কাকলী" পড়ে গতরাতে আমি ছটফট করেছি। বইটাকে বিশ্বাস করলে অনেক কিছুর উপর অবিশ্বাস আসে, আবার বইটা নিয়ে বিভিন্ন রেফারেন্স পড়ে অবিশ্বাসও করতে পারছি না। কে কতটা সত্যি বলছে সেটা নির্ভর করে ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থানের উপর। যদিও ভদ্রলোক বলেছেন তিনি রাজনৈতিক নিরপেক্ষ লোক, কিন্তু আসলে সেটা কি সম্ভব? বইটার মধ্যে মাথাব্যথা হবার মতো বেশ কিছু উপাদান আছে যার সত্যতা যাচাই করার জন্য আমার অনেক বই পড়া দরকার। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চট্টগ্রামের এত বই পড়েও এনায়েত মওলার কোন হদিস পাইনি, ঘটনা বুঝলাম না। কিন্তু কাকলী যে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ছিল সেটাও সত্যি। অপারেশান জ্যাকপটে নৌকমাণ্ডোরা ওই বাড়িতে উঠেছিল। ওই বাড়ির মালিক এনায়েত মওলা। ভদ্রলোক পাকিস্তানীদের ফাঁকি দিয়ে পুরো সময়টা কিভাবে কাটিয়ে দিলেন সে এক রহস্য। বইতে যদিও লিখেছেন কিভাবে কি করেছেন, তবু প্রশ্ন থেকে যায়। একাত্তরে এরকম অলস অবসরে কাটিয়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করে গেছেন, ব্যাপারটা প্রায় অবিশ্বাস্য।

যদি তাঁর দাবী মতে একাত্তরের ওই ভূমিকা সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে তাকে অরাজনৈতিক মহত্বে ভূষিত করতে হয় একাত্তরের অবদানের জন্য। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তখন দুটো দল। ফ্রিডম ফাইটার বা এফ এফ, বাংলাদেশ লিবারেশান ফোর্স বা বিএলফ। শেষোক্তটি চার খলিফার তত্ত্বাবধানে চলতো, আর প্রথমোক্ত চলতো সেক্টর কমাণ্ডারদের নির্দেশনা অনুযায়ী। এই দুই দলে আবার বিবাদও ছিল, পরস্পর খুনোখুনির ঘটনাও ঘটেছে। এনায়েত মওলা সেই বিভেদগুলোর কথা বলেছেন স্পষ্টভাবে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা যেসব বই লিখেছেন তাতে এই দ্বন্দ্বের উল্লেখ থাকতে দেখি না। এসব ব্যাপার পড়ে এনায়েত মওলার রাজনৈতিক অবস্থান জানার জন্য কৌতুহলী হয়ে উঠেছি। কিন্তু ভদ্রলোক এখন বেঁচে আছেন কিনা জানি না। কোথায় থাকতেন তাও জানি না। তাঁর বইটা প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে আজ থেকে ২১ বছর আগে। আমি অন্ততঃ চাই তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চেনে তেমন কারো সাথে কথা বলতে। রেডিওর একজন নাজমুল আলমের কথা উল্লেখ করেছেন, তিনিও বেঁচে আছেন কিনা জানি না। আমাকে তথ্য যাচাইয়ে পথে নামতে হবে মনে হচ্ছে।

Wednesday, September 3, 2014

আই লাভ মাই chum

আমি নিশ্চিত কমপক্ষে ৯৫% পাঠক শিরোনামের ইংরেজী শব্দটার সাথে পরিচিত নন। ডিকশেনারী না খুলে শব্দটার অর্থ বলতে পারবেন খুব কম মানুষ। যারা পারবেন আমি প্রায় নিশ্চিত তাদের ঘরে নার্সারি কেজি পড়ুয়া বাচ্চা আছে।

শব্দটির সাথে আমিও পরিচিত ছিলাম না দুদিন আগেও। এই শব্দটা না জানার কারণে সারাজীবন আমার কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। আমার ধারণা এই chum শব্দটার অর্থ একজন মানুষ সারাজীবন না শিখলেও কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু ক্লাস টুতে পড়ুয়া বাচ্চাটি এই শব্দ না জানার কারণে স্কুলে বকুনি খাবে হয়তো নাম্বারও পাবে না। আমার কন্যা একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ছে। আমাকে তাই শব্দটা ডিকশেনারী খুঁড়ে বের করতে হয়েছে। 

এটি একটা মাত্র তুচ্ছ উদাহরণ। এরকম আরো ডজনে  ডজনে অপ্রয়োজনীয় শব্দ স্কুলের ইংরেজী বইগুলোতে গিজগিজ করে। সবাই জানি আমরা, তবু কেউ প্রশ্ন করছি না, কেন এই অপ্রয়োজনীয় ইংরেজী শব্দ আমাদের শিখতে হবে? কেন ওসব বই আমাদের সন্তানদের পড়াতে হবে। বাচ্চা লেভেলের ইংরেজী শেখার জন্য একটা বই লিখতে পারে না সেদেশে এত ইংরেজী স্কুল অনুমতি পায় কি করে?

এই chum শব্দের মানে দোস্ত বা বন্ধু। Radiant Reader বইতে শব্দটা পেয়েছি। আরো অনেক ইংরেজী বইয়ের মতো Radiant Reader নামের বইটার আদি প্রকাশও ইংল্যাণ্ডের কোন প্রকাশনী থেকে, সেটি এখন ভারত ঘুরে বাংলাদেশের স্কুলে বাচ্চাদের পড়ার টেবিলে ঠাঁই নিয়েছে। এসব বইতে অদ্ভুতুড়ে সব শব্দ আছে। যেসব শব্দ সতেরো শতকে ইংল্যাণ্ডের কৃষকেরা ব্যবহার করতো সেসব শব্দ আজো কেন বাংলাদেশের ছাত্রদের পড়তে হবে, আমার মাথায় আসে না।

স্কুলগুলোকে বলছি, আমাদের দেশে শিক্ষিত লোকের এত অভাব যে বাচ্চাদের ইংরেজী শেখার বইও আমদানী করে পড়াতে হবে? যে ইংরেজী বই আপনারা লেখার ক্ষমতা রাখেন না, সেটা বাচ্চাদের পড়াতে দেন কোন মুখে?

সরকারকে বলছি, আপনারা দেশে যেখানেই গণতন্ত্রের চাষবাস করুন না কেন অন্ততঃ শিক্ষা ক্ষেত্রে এসব গণতান্ত্রিক চর্চা বন্ধ করার ব্যবস্থা করুন। পড়াশোনা ভালো জিনিস হলেও অপ্রয়োজনীয় বইপত্র মেধা, অর্থ সময়ের প্রচুর অপচয় করে।

Sunday, August 31, 2014

গিরিগিটি জীবন

এক.
প্রথম জীবনটা দারিদ্রক্লিষ্ট ছিল। খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করছে সে। টিউশানী করে পড়ার খরচ যোগাড় করে তার একাংশ সংসারেও ব্যয় করে। আবার চোখে তার সমাজ ভাঙার স্বপ্নও খেলা করতো। পড়াশোনার পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্নেও বিভোর তরুণ। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার ছেয়ে যায় স্বপ্ন শ্লোগানে। রাত জেগে চিকা মেরে ভোরবেলা ঘুম। উই শ্যাল ওভার কাম, উই শ্যাল ওভার কাম সাম ডে....। নতুন দিন একদিন আসবেই। পূর্ব দিগন্তে নতুন সূর্য।

দুই.
পড়াশোনা শেষ হলো চার বছরের সেশান জটের লেজে। চাকরীর সন্ধানে পথে। ছাত্র ভালো, সরকারী চাকরীর ইন্টারভিউ বোর্ডে উৎরে যায় অবশেষে। দুঃস্বপ্নের রাত কেটে যায় নতুন চাকরীর সুরভিতে। আপাততঃ টিকে থাকার চেষ্টা। বেতনের টাকার পরিমান টিউশানীর চেয়ে খুব বেশী না হলেও নতুন স্বপ্নে বিভোর হয় তরুন। বিয়ে করে সংসার সাজাতে শুরু করে একদিন। উন্নত জীবনের স্পর্শে আস্তে আস্তে ফিকে হতে থাকে সমাজবদলবিষয়ক বিপ্লবের স্বপ্ন, স্মৃতি।

তিন.
আরো এক দশক পর তরুণ সরকারী চাকরীতে পোক্ত। সমাজে নাম ডাকের পাশাপাশি ব্যাংক ব্যালেন্সও উপচে পড়ছে। বছর বছর বদলানো লেটেষ্ট মডেলের গাড়িগুলো সিনেমার রাজপুত্রদের কথা মনে করিয়ে দেয়। তরুণের দারিদ্র যাদুঘরে, সমাজতন্ত্র আস্তাকুড়ে, মগজ মার্কিন ডলারের ঘুর্নিপাকে। সেই নোংরা অতীত, সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন, শোষণমুক্ত সমাজের অস্তিত্ব সবই ভুল প্রমানিত হতে থাকে। জীবনের প্রথম পর্বটা তামাশা হয়ে যায় এখানে এসে।

মানুষের জীবন এরকমই। গিরিগিটির মতো কেবল রঙ বদলাতে থাকে। যখন যে বর্ণ ধারণ করে তখন সেই বর্ণের প্রতি যুক্তি ধরতে থাকে।

দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং অন্যন্য

দ্বারকানাথ ঠাকুর মনে হয় সমগ্র ঠাকুর বংশের মধ্যে সবচেয়ে স্মার্ট লোক। লোকটা বিলাতের খুব ভক্ত ছিলেন, দেশকে খুব একটা পছন্দ করতেন না মনে হলো। বিশেষ করে দেশের আবহাওয়া নিয়ে ত্যক্ত ছিলেন। তিনি যখন প্রথম বিলাতে যান তখন খুব বেশী লোক বিলাত দেখেনি। তার আগে রামমোহন রায় গিয়েছিলেন। রাজা রামমোহন রায় এবং দ্বারকানাথ ঠাকুর এই দুজন সাদা চামড়ার দেশে যথেষ্ট সমাদর পেয়েছিলেন। দ্বারকানাথ ঠাকুরের জমিদারী আয় খুব বেশী না থাকলেও বিলাতী বাণিজ্যে বেশ টাকাকড়ি কামিয়েছিলেন। যেগুলো তিনি দেদারসে উড়িয়েছেন ইউরোপে।

তিনি যখন প্রথম লণ্ডন যান তখন ইংল্যাণ্ডের প্রধানমন্ত্রী তাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। আবার যখন প্যারিস যান তখন ফ্রান্সের ফিলিপ লুইও তাঁকে যথেষ্ট খাতির করেছিলেন। প্যারিসে তিনি বিলাসবহুল একটা ঘরে বসবাস করতেন। একদিন সান্ধ্য আসরে গণ্যমান্য লোকদের নিমন্ত্রণ করেন সেখানে রাজা লুই ফিলিপও আসেন। তিনি সমস্ত ঘর কাশ্মীরী শাল দিয়ে সাজিয়ে রাখেন, কাশ্মীরী শাল তখন পৃথিবীর অভিজাত রমনীদের সবচেয়ে কাংখিত বস্তু। নিমন্ত্রন শেষে ফিরে যাবার সময় যখন প্রত্যেক অভিজাত নারীদের গায়ে একটা করে কাশ্মিরী শাল জড়িয়ে দেন তখন তাদের কি আনন্দ হয়েছিল সেটা বলাই বাহুল্য। এভাবেই প্রিন্স দ্বারকানাথ তাঁর ঠাট বজায় রাখতেন। সম্ভবত তিনিই প্রথম ভারতীয় যাঁকে বৃটিশরা তাদের সমকক্ষ মনে করতো। তার বাণিজ্যবুদ্ধিও বেশ প্রখর ছিল। লণ্ডনের ইউনিয়ন ব্যাংকের তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও।

বিলাতে অবস্থান কালে রাজা রামমোহন রায় মারা গেলে তার সমাধির উপর তিনি একটি মন্দির গড়িয়ে দেন। কিন্তু তার কিছুদিন বাদে তিনি নিজেই যে ওই দেশে দেহত্যাগ করবেন, তাকেও বিদেশে সমাধিস্থ করতে হবে, কে ভেবেছিল। তিনি ভারতবর্ষের আবহাওয়ায় স্বস্তিবোধ করতেন না। তাই দেহত্যাগও হলো ইউরোপের শীতল মাটিতে। শোনা যায়, তাঁর হৃৎপিণ্ডটি আলাদা করে ভারতবর্ষে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এই বিষয়ে অবশ্য সত্যেন্দ্রনাথের বইতে কিছু পাইনি।

দ্বারকানাথের বাবা ছিলেন রামলোচন। আসলে রামলোচন তার আসল বাবা নন। রামলোচন নিঃসন্তান ছিলেন বলে তার ভাই রামমনির সন্তান দ্বারকানাথকে নিজের পুত্র হিসেবে গ্রহন করেন। রামলোচনের পিতা নীলমনি চট্টগ্রামে সেরেস্তাদার ছিলেন। নীলমনি কিছুকাল চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন৷ চট্টগ্রাম আদালতে সেরেস্তাগিরি করে তিনি অগাধ বিষয় সম্পদের মালিক হন। পরবর্তীকালে পাথুরিয়াঘাটার পৈত্রিক বাড়ি ছেড়ে জোঁড়াসাকোয় নতুন বাড়ি তৈরী করে বসবাস করতে শুরু করেন। সেই থেকে ঠাকুরবাড়ি জোঁড়াসাকোয় স্থানান্তরিত হলো।

দ্বারকানাথের ভাগ্যের দ্বার খুলে দিয়েছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। তারপর ধাপে ধাপে উপরে উঠে যান তিনি। মৃত্যুর আগে অবশ্য দেনার দায়ে জর্জরিত হন যখন তুলা ব্যবসায় বিশ্বমন্দা দেখা দেয়।

দ্বারকানাথের কথা থাক। দেবেন্দ্র পরবর্তী অংশে যাই। রবীন্দ্রনাথের বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর সুরসিক ব্যক্তি ছিলেন। তার লেখা ছড়া কবিতা শ্লোক আছে অসংখ্য। মজাদার একটা শ্লোক পেলাম পড়তে গিয়ে। লেখালেখিতে সিদ্ধলাভের উপায় সম্পর্কে লিখেছেন-

প্রথমে প্রথম খণ্ডে পাকাইবে হাত
দ্বিতীয় খন্ডের তবে  উলটিবে পাত।।
মস্তকে মথিয়া লয়ে পুস্তকের সার
হস্তকে করিবে তার তুরুক সোয়ার।।
হইবে লেখনী ঘোড় দৌড়ের ঘোড়া
আগে কিন্তু পাকা করি বাঁধা চাই গোড়া।।

ভবিষ্যত লেখিয়েদের জন্য একটা উত্তম দিক নির্দেশনা হতে পারে এটি।


তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথের একজন সভাসদ নবীনচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, তিনিও খুব মজার কথা বলতেন। ভুলে যাওয়া আর মনে রাখা লোকদের চার ভাগে ভাগ করতেন। সেই ভাগগুলো নিন্মরূপ-

বেগাবেগা- যে শীঘ্র শেখে শীঘ্র ভুলে যায়
বেগচেরা- যে শীঘ্র শেখে চিরদিন মনে রাখে
চেরবেগা-যে দেরীতে শেখে শীঘ্র ভুলে যায়
চেরচেরা- যে দেরীতে শেখে দেরীতে ভোলে।

সবচেয়ে উন্নত প্রজাতির মানুষ হলো বেগচেরা। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্মৃতিশক্তি হলো চেরবেগা। আমি মনে হয় চেরবেগা আমি কেবলই ভুলে যাই। প্রতিদিন ভুলি। গতকাল যা সঠিক জেনেছি আজ তা ভুল জানি। চেরবেগা জীবন লইয়া আমি বিব্রত আছি।

[সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমার বাল্যকথা পড়ার সময় যে কথাগুলো ঘুরছিল মাথায়]


অনিশ্চয়তার অন্ধকার বনাম আশাবাদের আলো

বিদ্যমান সকল অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও আমাদের আয়ুষ্কাল কাটিয়ে যেতে হয় পৃথিবীতে। তেমন অনিশ্চয়তার আশংকায় আমার উপর নির্ভরশীল পরিবার প্রিয়জনদের ক্রমাগত স্মরণ করাতে হয় আমার অনুপস্থিতিতে সমুদয় অসুবিধাগুলো কিভাবে মোকাবেলা করবে। কোন শূন্যতাই চিরন্তন নয় জানি। আমি না থাকলেও পৃথিবীর সবকিছু ঠিকঠাক চলবে। তবু গুটিকয়েক মানুষ এবং আমার সন্তানেরা দীর্ঘসময় আমাকে ভুলতে পারবে না। শিশুদের আগলে রাখার মতো আশ্রয় খুব বেশী নেই।

এখনো তেমন কোন বিপর্যয় ঘটেনি আমাদের। কিন্তু চারপাশ থেকে যে দুঃসংবাদের হাতছানি প্রতিদিন এসে দাঁড়ায়, তাতে এসব আশংকা দানা বাঁধে। গত বছর আমার এক প্রিয় স্বজন চলে গেল সবকিছুর মায়া ত্যাগ করে। সেই একই রোগে আক্রান্ত আরো একজনের চিঠি পেলাম আজ। কাছের কেউ না, অফিশিয়ালী পরিচিতদের একজন। কদিন আগেও তাকে সুস্থ, যোগ্য, সফল মানুষ জানতাম। হঠাৎ বিপর্যয়ে তার জীবন বিপন্নতার মুখোমুখি। মেজর অপরাশেন শেষে বিদেশ থেকে ফিরেছে কদিন আগে। এখন সে রাইসটিউব দিয়ে খাবার খেয়ে বেঁচে আছে, ডানপাশ অকেজো হয়ে আছে প্রায়, চারটা নার্ভ এখনো কাজ করছে না, আরো কয়েক মাস লাগবে একটু স্বাভাবিক হতে, কতটা স্বাভাবিক হবে তা জানা নেই, কিন্তু আবারো দেশের বাইরে যেতে হবে রেডিওথেরাপী দিতে। বিপদের ঘড়ি চালু হয়ে গেছে। থামবে কবে জানা নেই। আমরা সবাই কোন না কোন সময় এই সব বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারি। অর্থ সম্পদ এসব বিপদ ঠেকাতে পারে না।

এই সবই স্বার্থপর চিন্তা ভাবনা। একটা বয়স এলে মানুষ কেবল স্বার্থপর চিন্তা ভাবনা করে। কিছু মানুষ তার চেয়ে ব্যতিক্রম। তাদের মতো হতে পারি না কেন? আগুনের মধ্যে বসেও যারা হাসে পুষ্পের হাসি। কিছু মানুষ জীবন খুড়ে খুড়ে যারা নতুন নতুন চারাগাছ বুনেন, আনন্দ খুঁজে নেন তুচ্ছাতিতুচ্ছের মধ্যেই। আমি সেইসব আনন্দদায়ক মানুষদের সন্ধান করি। লেখকদের মধ্যেই খুঁজি। শিবরাম চক্রবর্তী সেরকম একজন প্রিয় লেখক। খুব অন্ধকারেও যার লেখার রস দিনযাপনকে আনন্দে ভরিয়ে রাখে। আজ শিবরাম পড়তে ইচ্ছে করছে কষ্ট ভুলে থাকার জন্য। কিন্তু গতকাল থেকে পড়তে শুরু করেছি সত্যেন্দ্রনাথের 'আমার বাল্যকথা'। উনিশ শতকের বইটার শুরু থেকে প্রথমার্ধই বেশী আকর্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষের কীর্তিকাহিনী নিয়ে প্রথম অংশটা। আপাততঃ তাই পড়ি।



Thursday, August 28, 2014

কোন একদিন বাড়ি ফিরবো না

মাঝে মাঝে ভাবি বাড়ি ফিরবো না।

বাসা থেকে কর্মক্ষেত্রের দূরত্ব মাত্র ৭ কিলোমটার। ১৫ মিনিটে পৌঁছে যাবার কথা। কিন্তু শেষ কবে ১৫ মিনিটে পৌঁছেছি মনে নেই। গতকাল পৌঁছালাম সোয়া দুই ঘন্টায়। সারাদিন অফিস করে যত না পরিশ্রম, যাত্রাপথে তার দশগুন অথবা বেশী। একটা মানুষকে পায়ের গোছায় দড়ি দিয়ে বেঁধে গাছে ঝুলিয়ে নীচে একটা গরম চুলা জ্বালিয়ে রাখলে যে কষ্ট হয়, আমরা প্রতিদিন বিনাকারণে প্রায় সেরকম শাস্তি পাচ্ছি।

ট্র্যাফিক জ্যামের মধ্যেও সুন্দর অসুন্দর আছে। ইপিজেড থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত জ্যামটা সম্ভবতঃ পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত জ্যাম। এই রাস্তা দিয়ে ভিইআইপিরা চুপচাপ কিভাবে প্রতিদিন এয়ারপোর্ট যাতায়াত করে সে এক বিস্ময়। এই রাস্তার পুরোটা জুড়েই বিশাল সব গর্ত। স্থানে স্থানে আবর্জনার ভাগাড়, দানবীয় ট্রেলার ট্রাক কাভার্ডভ্যানের সড়ক বেদখল তো আছেই, তার উপর এই সড়কে চলাচলকারী ১০০ বছরের পুরোনো, অসংখ্য জোড়াতালির বাস ট্রাক যারা শুধু ট্রাফিকের পকেটে পয়সা দিয়েই চলে। এই গাড়িগুলো থেকে যে কর্দমাক্ত ধোঁয়া বের হয় সেগুলো জামাকাপড়ের চেহারা যেভাবে বদলে দেয়, ফুসফুসের চেহারাও সেভাবে বদলে দিচ্ছে তা বলাই বাহুল্য।

এই রাস্তায় যেমন ক্ষুদে রিকশা টেম্পু টেক্সি চলে, তেমনি চলে ৪০ ফুট লম্বা কন্টেইনার,ভগ্নপ্রায় ট্রাক বাস কাভার্ডভ্যান। এই বড় বড় দানবগুলো যে কি বিশ্রীরকম ধাক্কাধাক্কি করে চলে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। এর মাঝে আবার মানুষ মারার ওভারটেকিং প্রতিযোগীতাও চলে যদি ২০ ত্রিশ ফুট খালি রাস্তা মেলে। এসব নানান বিদঘুটে সাইজের যানবাহন থেকে নির্গত গরম ধুলো ধোয়া দুর্গন্ধে কেউ শ্বাসকষ্টে মারা গেলে তার লাশও সময়মত হাসপাতালে পৌঁছাতে পারবে না ভয়ংকর জ্যামের কারণে।

আমি তাই মাঝে মাঝে ভাবি, আজ বাড়ি ফিরবো না। কর্মক্ষেত্রের এক কোনে শুয়ে কাটিয়ে দেবো। ৭ কিমি পাড়ি দিতে প্রতিদিন রাস্তার এই ভয়ংকর দুই ঘন্টা আমার আয়ু থেকে কতটা সময় কেড়ে নিচ্ছে সেটা কেউ জানে না। কিন্তু আমাদের সবার সম্মিলিত অঙ্গপ্রত্যক্ষের যে ক্ষতি সাধিত হচ্ছে তা সমগ্র চট্টগ্রাম শহর বিক্রি করেও পূরণ করা যাবে না।

[মাননীয় মেয়র, নগর প্রশাসক, সরকার.... আপনারা কেউ এদেশে বাস করেন কিনা জানি না, আপনাদের কোন অস্তিত্ব আমি বহুকাল টের পাই না। তবু আরেকটি অরণ্যে রোদন পেশ করলাম]

Wednesday, August 27, 2014

ভুল বেভুল শৈশব (১৯৭৭-১৯৭৯)

আমি ক্লাস ওয়ানে পড়ি নাই বললেই চলে। বার্ষিক পরীক্ষার মাত্র ছদিন আগে ভর্তি হয়েছিলাম স্কুলে। স্কুলে যেতে চরম অনিচ্ছুক (তার চেয়ে বড় সমস্যা ক্লাসে বসতে অনিচ্ছুক)। তাই ক্লাস টুতে উঠেও কোন ক্লাস করিনি। পড়াশোনা যা হয়েছে বাসাতেই। টুতে যে কদিন স্কুলে গিয়েছি পাশের ক্লাসে কাজিনের সাথে ক্লাস থ্রীর বেঞ্চে বসে থাকতাম। ও ছিল আমার শহুরে গুরু। ওয়ান টু এভাবে ফাঁকিবাজিতে পার যাবার পর থ্রিতে উঠে গেলাম একসময়। দুয়েকজন বন্ধু হয়ে গেছে ততদিনে। ফাঁকিজুকি শিখতে শুরু করেছি। 

থ্রী থেকে ফোরে উঠার পর মোটামুটি জবরদস্ত কজন বন্ধু হয়ে গেল। ওই পাড়াটায় যে ধরণের বন্ধু সহজলভ্য ছিল সেই ধরনের বন্ধুর সাথেই মার্বেল, লাঠিম, ডাংগুলি, গোল্লাছুট, হাডুডু, দাড়িয়াবান্ধা, কড়ি খেলা, ডাগ্গি খেলা, সিগারেটের প্যাকেট ছিড়ে তাস খেলা থেকে হেন খেলা নেই আমাদের খেলা হয়নি। ওই বন্ধুগুলার সবাই স্কুলে পড়তো না। কেউ হয়তো দোকানে কাজ করতো, কেউ অন্য স্কুলে দুয়েক ক্লাস পড়েছে, কেউ টোকাই, নানান কিসিমের ছেলেপেলে। তবে সেই দলের মধ্যেও দুয়েকজন অন্যরকম ছেলে ছিল। মারুফ তাদের একজন। মার্বেল ডাংগুলির চেয়েও মারুফের আগ্রহ বিজ্ঞানের দিকে।

আমরা দুজন আলাদা বসে প্ল্যান করতাম কি কি আবিষ্কার করা যায়। মারুফের স্বপ্ন ছিল একটা সিনেমা মেশিন বানাবে। যেটার ভেতর রিল ঢুকালে দেয়ালে চলন্ত ছবি নাচবে গাইবে। আমার পছন্দ হলো আইডিয়াটা। আমরা খুঁজতে শুরু করলাম। রাস্তায়, মাঠে, কলোনীর গেটের কাছে ডাম্পিং গ্রাউণ্ডে কোথায় কি পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতি মেলে সব যোগাড় করি। প্রথমে যোগাড় হলো পাইপ। মোটা কাগজের পাইপ। ওটা হলো প্রজেক্টরের প্রধান অঙ্গ। এক ইঞ্চি ব্যাসের সেই পাইপের দুই পাশে দুটো আতসী কাঁচ লাগবে। তার পর লাগবে ছোট্ট একটা টর্চের বালব। দুটো পেন্সিল ব্যাটারি। চিকন তার। ইত্যাদি যোগাড় হয়ে যাবার পর আমাদের জিনিসটা একটা পর্যায়ে দাড় করানো গেল। এবার পরীক্ষার পালা। অন্য বন্ধুরা মারুফের এসব পাগলামিকে ব্যাঙ্গ করতো।

কিন্তু আমরা জিনিসটা তৈরী করার পর একটু সমীহ যেন। আমরা রিল খুজতে লাগলাম। কে যেন একটা রিলের টুকরো খুজে পেল কাছের কোন সিনেমা হলের কাছ থেকে। সেটা যন্ত্রের সামনে ধরে অন্ধকার ঘরে ওই প্রজেক্টর চালু করলে দেয়ালজুড়ে কিসব ঝাপসা ঝিলিমিলি। ঐ তো সিনেমা চলছে, হ্যাঁ আরেকটু উপরনীচ করলেই তো চলবে। রীল ঘুরায় কেমনে? একেকজন একেক উপদেশ দিতে লাগলো। কিন্তু সব উপদেশ বিফলে গেল যখন নাড়াচাড়া করেও ছবিগুলোকে চলন্ত ফর্মে আনা গেল না। বেজার হয়ে গেল মারুফ। আমিও হতাশ। জীবনের প্রথম প্রজেক্টটা ফেল করলো। কিন্তু একটা ভক্তি অর্জন করে ফেললাম দুজনেই।

ক্লাস ফাইভে উঠে একদিন সিদ্ধান্ত হলো আমরা একটা ক্লাব করবো। কলোনীতে বড়দের তখন বেশ কটা ক্লাব। সোনালী সংঘ, রূপালী সংঘ, প্রভাতী সংঘ ইত্যাদি। আমাদের ক্লাবের কী নাম দেয়া যায়? আমরা তো ওদের তুলনায় অনেক পুচকা। আমি আন্দাজে বলে উঠলাম, কচি সংঘ! হ্যাঁ সবাই রাজী। হয়ে গেল ক্লাব। এরপর নির্বাচন। কে হবে ক্যাপটেন। গোপন ব্যালটে ভোট হলো ছোট ছোট চিরকুটে। অবাক হয়ে দেখলাম আমি ক্যাপটেন হয়ে গেছি। কিন্তু ক্যাপটেনের কাজ কি তাই তো জানি না।

একটা ফুটবল টুর্নামেন্টে যোগ দিলাম। গোহারা হারলাম। ক্যাপটেনের মাথা নীচু। তবু হাল ছাড়ি না। এবার ক্রিকেট খেলবো। তখন বাঁশের কঞ্চি অথবা থান ইট ছিল আমাদের উইকেট। আর তক্তা কেটে বানানো হতো ব্যাট। তাই নিয়ে খেলতে শুরু করলাম টেনিস বল দিয়ে। হারলাম জিতলাম এভাবে চললো।  পরের বছর চাঁদা তুলে মিস্ত্রী লাগিয়ে বড়দের মতো উইকেট আর ব্যাট তৈরি করে আনলো রজব আলী। সাইজে আমাদের মধ্যে সে সবার বড়। তার পড়াশোনা মনে হয় শেষ, ফাইভ থেকে আর সিক্সে পড়া হয়নি। তাদের মুদী দোকানের ব্যবসা ছিল।

কিন্তু সিক্সে এসেই আমার বন্ধু সার্কেল বদলাতে থাকলো। নতুন বন্ধুরা কেউ ডাংগুলি মার্বেল ইত্যাদি খেলে না। তারা ব্যাডমিন্টন খেলে, তীর ধনুক ইত্যাদি নিয়ে এডভেঞ্চার করে। টারজান রবিনহুড হাতছানি দিতে থাকে আমাকে। বাসাও বদলে গেলে আগের বন্ধুগুলোর সাথে বিচ্ছিন্ন হতে থাকি। তখনই মারুফের সাথে আমার আবিষ্কার ইত্যাদির স্বপ্নেরও ছেদ ঘটে গেল। ওই ডানপিঠে শৈশবের ডাংগুলি বন্ধুগুলোর সাথে আর কখনো দেখা হয়নি। বখে যাওয়া বন্ধুগুলোর পরিণতির খবর জানলেও মারুফ বড় হয়ে কি হয়েছে জানতে পারিনি। কেউ কি একবার বলেছিল কোন সরকারী অফিসের কেরানী হয়েছে? মনে নেই। এতদিনে নিশ্চয়ই বুড়ো হয়ে গেছে, দেখলেও চিনবো না।

আমি শৈশবের সব খেলা ভুলে গেছি। মার্বেল কেমনে খেলতাম, লাটিম কি কায়দায় ঘুরাতাম, ডাংগুলি কিভাবে ওড়াতাম সব ভুলে গেছি। কিন্তু একটা জিনিস ভুলি নাই- "এরি দুরি তেরি চুরি জিবুক চম্পা......." ডাংগুলি বচন। এটা দিয়ে ডাংগুলি কত দূরে ছুড়লাম তার মাপ দেয়া হতো। এটার মানে কি? কোন দেশী ভাষা ছিল এটা? এখন খুঁজতে যাওয়া বৃথা।


[অসমাপ্ত]



Tuesday, August 26, 2014

বৈদ্যুতিক পত্রসাহিত্য

চিঠিসাহিত্য বিষয়টা উঠেই গেছে আজকাল। গত শতকে আমরা যেমন চিঠিসাহিত্য নিয়ে বেশ কয়টা বই পেয়েছি এই শতকে তেমন আর হবে না। এখন আর কেউ কাউকে চিঠি লেখে না। বড়জোর ইমেইল করে। শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ নাকি সবচেয়ে বেশী অবদান রেখেছেন চিঠিসাহিত্যে। তিনি সারাজীবন সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি প্রচুর চিঠি লিখেছেন বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে। সেই চিঠিগুলো আজ বাংলা সাহিত্যে অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে। ফরাসীদের মধ্যে সর্বোচ্চ চিঠি লেখা রেকর্ড নাকি শার্ল বোদলেয়ারের। তিনি প্রতি ঘন্টায় একখানা চিঠি লিখেছেন তেমন নজীরও আছে। এই যুগে কেউ চাইলে অবশ্য প্রতি মিনিটে একটা চিঠি লেখা সম্ভব। হতে পারে সেটা চিরকুট। কেউ দুপাশের কম্পিউটারে অনলাইনে বসে চিরকুট বিনিময় করলে ঘন্টায় ৬০টি চিরকুট লেখা সম্ভব। তার মানে এক ঘন্টায় ৬০ খানা চিঠি!! আবার চ্যাটের হিসেব করলে মিনিট ভেঙ্গে সেকেণ্ডও চলে আসে। গড়ে ১০ সেকেণ্ডে একটা বাক্য বিনিময় করলে মিনিটে ১০টি বার্তা বিনিময় করা যায়। এক ঘন্টায় হবে ৬০০ বার্তা। ভাবা যায়? কিন্তু দুঃখের বিষয় যে আজকাল প্রযুক্তি অনেক উন্নতি লাভ করলেও সেই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহনকারী কবিসাহিত্যিকের সংখ্যা খুব নগণ্য। নইলে এই বঙ্গদেশে যে পরিমান আবেগ শিল্প সৃষ্টি হয় তাতে প্রযুক্তি নির্ভর চিঠি সাহিত্যের বিরাট সম্ভাবনা ছিল।

কম্পিউটারে চিঠি লিখতেও আলসেমী অনেকের। ল্যাপি খোলো, ইন্টারনেটে ঢোকো, মেইলে লগ ইন করো, তারপর চিঠি লিখতে শুরু করো। কিন্তু এই প্রক্রিয়াগুলো করতে করতে চিঠি লেখার মুডই হারিয়ে যায়। পাতা খুলে বসে থাকে, কি লিখি? তারচেয়ে মোবাইলে টিপ দিয়ে দুই শব্দ এসএমএস পাঠিয়ে দাও, ব্যস ওই হয়ে গেল বার্তা বিনিময়। এসএমএস যুগে এসে ইমেইলও মার খেয়ে গেছে। এখন বিশেষ দিবসে লোকজন শুভেচ্ছা পাঠায় এসএমএসে। ঈদ পরব নববর্ষ সবকিছুতেই কপিপেষ্ট শুভেচ্ছা শুভেচ্ছা শুভেচ্ছা। আমি নিশ্চিত ৯৯% মেসেজ কপিপেষ্ট। নিজ থেকে কষ্ট করে দুটো লাইন কেউ লেখে না। আমি খুব বেশী মোবাইলবান্ধব মানুষ নই। তাই এসএমএস বান্ধবও হতে পারিনি। আমি কখনো বিশেষ দিবসে শুভেচ্ছা বিনিময় করি না এসএমএস দিয়ে। আমার কাছে যেসব এসএমএস আসে, তাও পড়ি না। যে কোন বিশেষ দিবসের পরদিন আমাকে মেসেজবক্স ঝাড়ু দিতে হয় মুছে মুছে। অবশ্য তরুণদের ক্ষেত্রে এরকম নাও হতে পারে। তাদের কাছে হয়তো সত্যিকারের আন্তরিক এসএমএস আসে। কিন্তু সেটা কি চিঠির সমতূল্য হতে পারে? অথবা ইমেইল? কে জানে কিছুদিন পর হয়তো এসএমএস সাহিত্য বলে কিছু একটার জন্ম হলেও হতে পারে।

আমি এক তরুণ গবেষককে চিনি যিনি ইলেকট্রনিক মাধ্যমে 'বাংলা ভাষায় ভাব ও বার্তা বিনিময় প্রবণতা' বিষয়ে গবেষণা করছেন। তার গবেষণার কিছু অংশ দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। আমি বিস্মিত হয়ে দেখেছি এই যুগেও কী অসাধারণ চিঠি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে এই ইলেকট্রনিক মাধ্যমে। গবেষণায় অংশগ্রহন কারী ৩৫ জনের মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করেছে ভিন্ন দেশে বসবাসকারী দুই ঘনিষ্ট বন্ধু যারা ৯০ দিনে প্রায় দশ হাজার চিঠি বিনিময় করেছিল। যদিও কোন কোন চিঠি মাত্র দুয়েক লাইনের। তবু আমার জানামতে কোন বাংলাদেশীর মধ্যে এত দ্রুত গতির চিঠিপত্র বিনিময় আর কখনো হয়নি। তাদের গিনেস বুকে নাম তোলার সুযোগ ছিল। কিন্তু গবেষককে বিনীতভাবে প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে তারা কোন রেকর্ডের লোভে চিঠি লেখেননি। এত বেশী চিঠি লেখার প্রেরণা সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তরুণ গবেষক বলেন, মানুষ মাত্রই নৈকট্য সন্ধানী। বন্ধুর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগে থাকার জন্যই এত বেশী পরিমান চিঠি লিখেছে ওরা। চিঠি একটি মানবিক আবেগের বিষয়। দুই বন্ধু সেই আবেগকে ছুঁয়ে থাকতে চায়। আজ অনেক বছর পরও ওরা সেই আবেগ ধরে রেখেছে।

অজ্ঞাতনামা ওই দুজনের চিঠি আমাকে কৌতুহলী করে তুললেও আর বিশেষ কিছু জানতে পারিনি। এটা ঠিক যে এক্ষেত্রে চিঠিগুলো যদি কোন দুই বিখ্যাত ব্যাক্তির মধ্যে চালাচালি হতো, তাহলে নিশ্চিত তা বিশ্বাসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত হতো। এখন তো তা হবার নয়।

আজকাল বহির্বিশ্বে অবশ্য এসএমএস, ইমেইল এসবের চেয়েও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে আরো অনেকগুলো সফটওয়ার নির্ভর বার্তাবিনিময় পদ্ধতি। ভাইবার, হোয়াটসআপ,ট্যাঙ্গো ইত্যাদি মাধ্যমে পৃথিবীর যে কোন স্থান থেকে বিনে পয়সায় কথা বলা যায়। কথা ছাড়াও আছে টেক্সট, চ্যাট, ইনস্ট্যান্ট ছবি ভিডিও বিনিময়, এমনকি নিজের হাতে আঁকা যে কোন ছবি বা ডিজাইন সাথে সাথে অন্যপক্ষকে পাঠিয়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশে এখনো এসবের ব্যবহার সীমিত। অনেকেরই এণ্ডরয়েড বা স্মার্টফোন নেই। ওয়াইফাই নেই। এসবের জন্য স্মার্টফোন লাগবেই। এ হলো আমাদের জানা জগতের কথা। আমাদের অজানা প্রযুক্তির তালিকা হয়তো এখনো নাগালে আসেনি। সেখানে থাকতে পারে আরো বিস্ময়কর কিছু। প্রথমবার ভাইবার ব্যবহার করে যে পরিমান বিস্ময় লাভ করেছিলাম, সেটা এখনো অক্ষুন্ন। অবস্থা এমন দাড়িয়েছে আমি নিজে আনস্মার্ট মানুষ হলেও ভাইবারের জন্যই স্মার্টফোন ব্যবহার করি। ভাইবারের আইকনটা আমাকে যেন নিঃশব্দে জানান দেয়, ইউ আর নট এলোন এনিটাইম। কে জানে ভবিষ্যতে ভাইবার সাহিত্য নিয়েও গবেষণা হতে পারে।

কিন্তু সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য এক। যোগাযোগ। পত্র বিনিময়ের আদিম সূচনা থেকে এই প্রযুক্তিভরপুর দিন পর্যন্ত সব চিঠিপত্র যোগাযোগের উদ্দেশ্যেই লিখিত। ফরমেট বদলালেও ভাব বিনিময় কিন্তু সেই একই উৎস থেকেই বয়ে আসছে।

চোখ বন্ধ, বেছে নাও.....

মানুষের আয়ু যতটা সীমিত ততটা অনিশ্চিত। সীমাটা জানা নেই বলে অনিশ্চয়তার উপর চাপটা আরো বেশী। এই সীমিত সময়েই যা কিছু করে ফেলা দরকার। এই ক্ষণে এসে টাইমলাইন হিসেব করে বিস্মিত হই, আমি কেন যথা সময়ে 'কিছু করে ফেলার' এই পরিকল্পনায় অংশ নিলাম না। শিক্ষাজীবনে যেমন একাডেমিস্ট ছিলাম না, পেশাগত ক্ষেত্রেও ক্যারিয়ারিস্ট হতে ইচ্ছে করেনি। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও চাকরী বদল করিনি। মাত্র কয়েকশো মাইল দূরের রাজধানীর চাকরীতেও বিমুখ আমি। বর্তমান কোম্পানীতেও যা যা করলে পকেট ভারী হতো তার কিছুই করিনি। কেন? মিলিয়ন থেকে শুরু করে বিলিয়ন ডলারের পরিবর্তিত হওয়া কোম্পানীর ঠুঁটো জগন্নাথের একজন তো হয়েছি।(শান্ত্বনা!) আরো উন্নতির, আরো টাকা পয়সার কী দরকার? চলছে তো, চলছে না? আসলে এই সবই খোঁড়া যুক্তি। পৈত্রিক ব্যাকাপটা না থাকলে আমি নিজের জন্য প্যাকাপ করতে মাঠে নেমে যেতাম হয়তো। মানুষ বড় বিচিত্র উপায়ে নিজেকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করে।

তবু এর মধ্যেই মাঝে মাঝে নতুন একটা খেয়াল চাপে। নিজেকে বোঝাই, এখন বরং অবসর নিয়ে ফেলা দরকার। আটটা পাচটা চাকরী করে সময় নষ্ট না করি আর। সময় চলে যাচ্ছে অথচ কত পড়াশোনা বাকী, কত কি জানার বাকী, কত লেখালেখি, শেখাশেখি। গুডরিডসে ঢুকলে তরুণ সহব্লগার বন্ধুদের পড়াশোনা দেখে লজ্জিত হই। ওরা যেসব বই পড়তে দেয় সেগুলো পড়া দূরে থাক আমার নিজের কেনা আধপড়া/আনপড়া বইয়ের সংখ্যাই এখন শতেক ছাড়িয়ে গেছে। টাকার পেছনে ছুটতে গিয়ে আধমূর্খ অতৃপ্ত হয়ে মরবো?

এই বয়সে এসে মুখোমুখি সাংঘর্ষিক অবস্থায় পাই পড়াশোনা আর ক্যারিয়ারকে। সময় নিয়ে কাড়াকাড়ি। ৪৫ বছর পার হবার পর এই দ্বন্দ্বটা অনেক বেশী প্রকট। যেটুকু আয়ু অবশিষ্ট আছে তাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি করবে এই দুটো প্রয়োজন। সংসার চাইবে ক্যারিয়ারকে প্রাধান্য দিতে, আমি চাইব পড়াশোনাকে দিতে। কে জিতবে? যেই জিতুক আমি নিশ্চিত জানি আমার চেয়ে সংসারের হাত অনেক বেশী শক্তিশালী। কিন্তু আমার প্রয়োজনের গুরুত্ব বুঝবে কে? মহাকাল?

নাকি বলবো, চোখ বন্ধ, বেছে নাও..........?

Wednesday, August 13, 2014

মাঝে মাঝে অন্ধতা

You should close your eyes sometimes.

মাঝে মাঝে তোমার চোখটা বন্ধ রেখো। মাঝে মাঝে অন্ধ থেকো। মাঝে মাঝে বধির। যা তোমার দেখার নয়, যা তোমার শোনার নয়, যা তোমার বোঝার নয়, তার কাছ থেকে দূরে সরে থেকো। মাঝে মাঝে অন্ধ থাকা ভালো।

যেখানে তোমার যাবার নয়, সেখানে যেও না। যে পথে তোমার হাঁটার নয়, সে পথে হেঁটো না। সব পথ সব মত মসৃন হয় না। অসমতল পথে হাঁটতে গেলেই তো হোঁচট খাবে। বেশী পথ হেঁটো না। সমতলেই থেকো। পর্বত আরোহন তোমার নয়।

মাঝে মাঝে সয়ে যেও। মাঝে মাঝে সহনশীলতা ভালো। মাঝে মাঝে অসহ্যকেও সহ্য করে নিতে হয়। মাঝে মাঝে বিবেকের পথ রুদ্ধ করে দিতে হয়।

মাঝে মাঝে সত্যভাষণ ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে উপদেশ বদহজম হয়। মাঝে মাঝে নিজেকেও চেনা যায় না। মাঝে মাঝে পাথেয় এসে পথের ধারে পড়ে থাকে তুমি ফিরে তাকাও না। মাঝে মাঝে অবহেলা এত ভীষণ ভালো জানো। অবহেলে তিনদিন ওষুধ খাও না।

তোমার জন্য ঘুম ভালো, ঘুম ভালো, ঘুম ভালো। তুমি নিদ্রাহীন বহুকাল। তুমি অনিদ্রাশংকিত প্রতিরাত। এবার তুমি ঘুমিয়ে পড়ো, এবার তোমার ঘুমের সময়। তোমার চোখের পাতা বন্ধ করো।

পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্টের সত্যগোপন অথবা মিথ্যাভাষণ

================
এক: মর্মান্তিক এক ফিকশন
================

১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ : রাত ২.৪৫মিনিট - ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট
---------------------------------------------------------------
ডিজিএফআই(প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা) প্রধান ব্রিগেডিয়ার রউফের কাছে একটা বিশেষ খবর নিয়ে এলেন ডিএমআই(সেনা গোয়েন্দা) প্রধান কর্নেল সালাহউদ্দিন।

খবরটা খুব খারাপ। আজ ভোরে মারাত্মক কিছু একটা হতে যাচ্ছে দেশে। ক্যান্টনমেন্ট থেকে ট্রাকে ট্রাকে সৈন্য আর আর্টিলারী ট্যাংক বহর বেরিয়ে গেছে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর প্রেসিডেন্টের বাড়ির দিকে। ভয়ংকর ব্যাপার। খবরটা সেনাপ্রধানকে জানানো উচিত।

খবরটা শুনে ব্রিগেডিয়ার রউফ ভয়ে কাঁপতে শুরু করলেন। তারপর একটু ভাবলেন কি করা যায়। প্রেসিডেন্টকে ঘুম ভাঙিয়ে ব্যাপারটা জানাবেন? কিন্তু তিনি তার সাম্প্রতিক বদলির সিদ্ধান্তে প্রেসিডেন্টের উপর অসন্তুষ্ট। তাকে অন্যত্র বদলি করে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কর্নেল জামিলকে। এসব ফ্যাকড়া সেই সামলাক এখন। ১৫ আগষ্ট থেকে তো তারই দায়িত্ব নেবার কথা। রাত বারোটার পর তারিখটা ১৫ হয়ে গেছে। সে যাই হোক, প্রেসিডেন্টের আগে নিজের জান বাঁচানোই দরকার। এদিকেও আক্রমন হতে পারে, বলা যায় না। তিনি পরে দেখা যাবে বলে বিদায় করে দিলেন কর্নেল সালাহউদ্দিনকে। এরকম একটা ভয়ংকর খবরে ডিজিএফআই প্রধানের নিরাসক্ত ভাব দেখে কর্নেল সালাহউদ্দিন কেমন একটু বিভ্রান্ত, হতাশ। অতঃপর তিনিও আর কাউকে কিছু না বলে বাসায় চলে গেলেন।
কর্নেল সালাহউদ্দিন যাবার পর আর কাউকে কিছু না জানিয়ে চুপি চুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরিবার নিয়ে পেছন দিকের মাঠ পেরিয়ে দূরের একটা গাছতলায় গিয়ে আশ্রয় নিলেন তিনি।

১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ : ভোর ৪.৩০- ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট
---------------------------------------------------------------

বাসায় ফিরেও ঘুম আসছে না কর্নেল সালাহউদ্দিনের। কি ঘটতে যাচ্ছে আজ। এই ঘটনায় প্রেসিডেন্ট মারা গেলে কে হবে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। যারা ঘটাচ্ছে তাদের সবাই জুনিয়র। কেন কি ঘটছে কিছু বুঝতে পারছেন না তিনি। সিনিয়রদের কেউ কি আছে পরিকল্পনায়? জানেন না তিনি।

নিজেকে কেমন অপরাধী লাগছে। উঠে পড়লেন। এবার রওনা দিলেন চীফের বাসায়। চীফকে জাগিয়ে খবরটা দিতেই চীফ বললেন কর্নেল শাফায়াতকে জানাতে সে যেন তিনটা ব্যাটেলিয়ন নিয়ে পাল্টা অ্যাকশানে যায়। কিন্তু দূরে গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। এখন শাফায়াতকে অ্যাকশানে যাবার খবর দিলে আবার কী গোলাগুলি লাগে। তার চেয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে থাকি। দৃশ্যপট থেকে সরে গেলেন কর্নেল সালাহউদ্দিন।

১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ : ভোর ৪.৩০ - ধানমণ্ডি সেরনিয়াবতের বাড়ি
-------------------------------------------------------------------------
সেরনিয়াবতের বাড়ি আক্রমন শুরু করেছে মেজর ডালিমের দল। বাড়ি থেকে ফোন করে আক্রমনের খবর জানানো হলো প্রেসিডেন্টের কাছে। সাহায্য চলে আসবে শীঘ্রি। কিন্তু না। কোন সাহায্য আসার সুযোগ নেই। সৈন্যরা তার আগেই নারীপুরুষ শিশু নির্বিশেষে বাড়ির সকল বাসিন্দাকে নির্বিচারে নিষ্ঠুরতার সাথে হত্যা করলো।

১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ : ভোর ৪.৪৫ - ধানমণ্ডি শেখ মনির বাড়ি
---------------------------------------------------------------
রিসালদার মোসলেমের নেতৃত্বে আরেকটা দল তখন শেখ মনির বাড়ির বাসিন্দাদেরও নির্বিচারে চরম নির্দয়ভাবে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। দুদিকে দুই দলের রক্তাক্ত অপারেশান সাকসেসফুল। একটাকেও বাঁচতে দেবে না বলেই কালো পোষাকের সৈন্যদের নিয়ে বেরিয়েছিল হায়েনা অফিসার। ১০০ভাগ সফল।


১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ : ভোর ৫.০০- ধানমণ্ডি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি
---------------------------------------------------------------
মেজর হুদা এবং মেজর মহিউদ্দিন এই বাড়ির হত্যাকাণ্ডের দায়িত্বে। বাড়ি ঘেরাও করার সাথে সাথে গোলাগুলি শুরু করে দিয়েছে সৈন্যরা। বিনা প্রতিরোধে বাড়ির সব গার্ড আত্মসমর্পন করলো। কর্নেল জামিল খবর পেয়ে ছুটে আসছিল, কিন্তু কর্নেল জামিলকে রাস্তায়ই গুলি করে মেরে ফেলা হয়। বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছে সৈন্যরা। মেজর হুদা আর মেজর মহিউদ্দিনের সাথে বঙ্গবন্ধুর উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলছিল ভেতরে। বাড়িতে ঢোকার পনের বিশ মিনিট কেটে গেছে। শেখ কামাল সহ কয়েকজনকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে ইতিমধ্যে। প্রেসিডেন্ট কয়েক জায়গায় ফোনও করেছেন সাহায্যের জন্য। দেরী হলে ঝামেলা লেগে যেতে পারে। রক্ষীবাহিনী চলে আসতে পারে।

মেজর হুদা ও মহিউদ্দিনের সাথে বাকবিতণ্ডা চলার মাঝখানে মেজর নূরও চলে আসলো কোথাও থেকে। এই বাড়ির উপর বিশেষভাবে ক্ষিপ্ত সে। সিড়িতে দাড়ানো পাঞ্জাবী পড়া লোকটা তার চাকরী খেয়েছে। তাকে আর সময় দেয়া যাবে না। হুদা মহিউদ্দিন ভুদাই পাবলিক, খামাকা টাইম পাস করছে। মেজর নূর দেরী না করে "দিস বাসটার্ড হ্যাভ নো রাইট টু লিভ.....গেট এসাইড" বলে বিকট চিৎকার করে সামনে এগিয়ে ব্রাশ ফায়ার করতে শুরু করলো। ১৮টা বুলেটের সরাসরি ধাক্কায় বঙ্গবন্ধু সিড়িতে পড়ে গেলেন। চশমা পাইপ গড়িয়ে পড়লো পাশেই। বাংলাদেশের ঘড়িতে সময় তখন ৫.৫০মিনিট(আনুমানিক)।

মাত্র দেড় ঘন্টা সময়ে বাংলাদেশের আকাশ থেকে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটাকে ভূমিতে নামিয়ে আনা হলো। স্বাধীনতার নায়ক বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করার কোন বাহিনী সক্রিয় ছিল না এই স্বাধীন দেশে। কিন্তু সেই দুঃসময়ে এমন কেউ ছিল যে একটু সচেষ্ট হলেই কি পারতো ঘটনাটা অন্যরকম করে দিতে?
===========
দুই: সন্দেহের সুত্রপাত
============

সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহকে দিয়ে শুরু করি। জেনারেল শফিউল্লাহ সবার আগে খবর পান পরিচালক সামরিক গোয়েন্দা লেফটেন্যান্ট কর্ণেল সালাউদ্দিনের কাছ থেকে। সময়টা সাড়ে চারটা থেকে পাঁচটা। কর্নেল সালাহউদ্দিন তাঁর কাছে এসে বলেন "স্যার আপনি কি আরমার আর আর্টিলারি ব্যাটেলিয়নকে শহরের দিকে যেতে বলেছেন? তারা তো রেডিও স্টেশান, গণভবন আর ৩২ নম্বরের দিকে যাচ্ছে।"

শফিউল্লাহ আঁতকে উঠে সাথে সাথে কর্নেল সালাহউদ্দিনকে বলেন, "না আমি কাউকে সেরকম কিছু বলিনি। তুমি শীঘ্রই শাফায়াতের কাছে যাও এবং তিনটা পদাতিক বাহিনী দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বলো। আমি ফোনে নির্দেশ দিয়ে দিচ্ছি"(ধরা যাক সময় তখন ভোর ৫.০০টা)

তারপর শফিউল্লাহ বঙ্গবন্ধুকে ফোন করতে শুরু করেন কিন্তু লাইন পাচ্ছিলেন না। তাঁকে ফোনে না পেয়ে তিনি শাফায়েত, জিয়া, খালেদ এবং তিনবাহিনী প্রধানের সাথে কথা বলে ঘটনা জানান। সাফায়েতকে তিনটা পদাতিক বাহিনী দিয়ে প্রতিরোধ করার নির্দেশ দেন। ধরা যাক তখন ভোর ৫.১৫মিনিট)

তার কিছু পরেই আবার বঙ্গবন্ধুকে ফোনে পেয়ে যান তিনি। তখনি বঙ্গবন্ধু জানান তার বাড়ি আক্রান্ত। জলদি ফোর্স পাঠাতে। শফিউল্লাহ বলেছিলেন, I am doing something sir, can you get out of the house?(ধরা যাক তখন ভোর ৫.৪৫মিনিট)

তখন আবারো শাফায়েতকে ফোন করেন তিনি। কিন্তু ফোনের রিসিভার নাকি তুলে রাখা হয়েছিল। এটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। এখানে কিছু একটা গণ্ডগোল আছে। এবার শাফায়াত জামিলের বক্তব্য শুনি।

কর্নেল শাফায়েত জামিল বলছেন তিনি সেনাপ্রধান শফিউল্লাহর কোন ফোন পাননি। এই খবরটা প্রথম শুনেন মেজর রশিদের কাছ থেকে। সোয়া ছটার দিকে স্টেনগান হাতে মেজর রশীদ তাকে ঘুম ভাঙ্গিয়ে যা জানায় তার সারমর্ম এরকম - আমরা শেখ মুজিবকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেছি, আমাদের বিরুদ্ধে কোন অ্যাকশানে গেলে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা আছে।

মেজর রশীদের উপস্থিতিতেই শাফায়াতের ফোনটা বেজে ওঠে ঘরের ভেতর। ওটা ছিল সেনাপ্রধান শফিউল্লার ফোন। "শাফায়েত তুমি কি জানো কারা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ফায়ার করেছে? তিনি তো আমার কথা বিশ্বাস করলেন না"। শফিউল্লার সাথে কথা চলার সময় রশীদ চলে যায়। সময়টা তখন ভোর ৬টা পার হবারই কথা। কেননা বঙ্গবন্ধুকে ততক্ষণে সপরিবারে শেষ করে ফেলা হয়েছে। তার পরেই রশীদ কর্নেল শাফায়াতের কাছে আসে।

জেনারেল শফিউল্লাহর কথা সঠিক ধরলে ফোনটা এসেছিল ৫-১৫মিনিটে। কর্নেল শাফায়াতের কথা সঠিক ধরলে ফোনটা এসেছিল ৬.০০টার পর। দুজনের মধ্যে কার কথা সঠিক? কে মিথ্যা বলছে?

পরবর্তীকালে অনেক সাক্ষাতকারে শফিউল্লাহ বলেছে শাফায়াত চাইলে ঠেকাতে পারতো।
আবার শাফায়েত বলেছেন, জেনারেল শফিউল্লাহ চাইলে ঠেকাতে পারতো ওই হত্যাকাণ্ড।

শেখ মুজিব গুলিবিদ্ধ হন আনুমানিক ভোর পৌনে ছটায়। শফিউল্লাহ আর শাফায়াতের সময়ের তথ্যে প্রচুর গড়মিল। সময়ে গড়মিল ৪৫মিনিট প্রায়। ফোনের কথায় গড়মিল। শফিউল্লাহ বলছেন তিনি দুবার ফোন করেছেন শাফায়েতকে। প্রথমবার সোয়া পাঁচটায় পরেরবার পৌনে ছটায়। ওই সময়ে ফোর্স মুভ করালে বঙ্গবন্ধু বেঁচে যেতো হয়তো। শাফায়েত বলেছেন শফিউল্লাহ ফোন করেছেন ছটার পরে। হত্যাকাণ্ডের প্রথম খবর পান রশীদের কাছ থেকে ছটার পরপর। তারপরেই শফিউল্লাহর কাছ থেকে খবর পান। এসব গোলমেলে তথ্যে একটা জিনিস নিশ্চিত হয় দুজনের যে কোন একজন মিথ্যা বলছেন।


=================================================
তিন :কর্নেল হামিদের "তিনটি সেনা অভ্যূত্থান ও কিছু না বলা কথা"র প্রশ্নবিদ্ধ অংশ 
==================================================


অসঙ্গতি-১
৬২ পৃষ্ঠার ১ নং পয়েন্টে কর্নেল হামিদ লিখেছেন জনৈক গোয়েন্দা ডিরেক্টর রাত আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে ঘটনা সম্পর্কে ডিজিএফআই প্রধান ব্রিগেডিয়ার রউফকে জানান। ব্রিগেডিয়ার রউফ খবরটি রাষ্ট্রপতি বা সেনাপ্রধান কাউকে জানাননি।

কে সেই গোয়েন্দা ডিরেক্টর? কর্নেল সালাহউদ্দিন? তখন ডিএমআই প্রধান ছিলেন কর্নেল সালাহউদ্দিন। 

আবার ৬২ পৃষ্ঠার ৩ নং পয়েন্টে কর্নেল হামিদ বলেন সাড়ে চারটা থেকে পাচটার মধ্যে কর্নেল সালাহউদ্দিন সৈন্য ও ট্যাংক চলাচলের খবর পান এবং সোয়া পাঁচটার দিকে জেনারেল শফিউল্লাহকে গিয়ে খবরটা জানান।

কোনটা সত্যি?

এবার একটু দেখি কে কাকে দায়ী করেছে-

১) কর্নেল হামিদের মতে সিনিয়র অফিসারদের মধ্যে জিয়া, শাফায়েত জামিল ও খালেদ মোশাররফ এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে আগ থেকে কিছুটা অবহিত ছিল।
২) কর্নেল শাফায়েত জামিল আবার জেনারেল জিয়াকে জড়িত না করে শফিউল্লাহর দিকে আঙুল তুলেছেন। পাশাপাশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলেছেন কর্নেল হামিদের বিরুদ্ধেও। কেননা তিনি তখন ঢাকার স্টেশান কমাণ্ডার। বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দলটির নিয়ন্ত্রণ হামিদের উপর বর্তায় তেমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।
৩) ওদিকে জেনারেল শফিউল্লাহ কিন্তু প্রায় সরাসরি সাফায়াতের দিকেই তুলেছেন অভিযোগের আঙুল। শাফায়েত কেন ফোর্স মুভ করাননি সময়মতো। তাকে তো সময়মতো খবর দেয়া হয়েছিল।
এখানে এসে আমি কর্নেল সালাউদ্দিনকে মিস করি। একমাত্র তিনিই বলতে পারতেন কে মিথ্যা বলছেন। কিন্তু কর্নেল সালাহউদ্দিনের কোন বইপুস্তক পাইনি। পরবর্তীকালে তিনি কোন পথে গেলেন তার কোন খোঁজ পাই না। এই কর্নেল সালাউদ্দিন কি কি কোন বইপত্র লিখেছেন অথবা সাক্ষ্য দিয়েছেন কোথাও? যদি সেরকম কিছু থাকে তাহলে ১৫ আগষ্টের প্রধান মিথ্যাবাদীকে সনাক্ত করার ব্যাপারে আরেকটু স্পষ্ট সুত্র পাওয়া যেতো।

অসঙ্গতি-২বঙ্গবন্ধুর পাশের বাড়ির ডাঃ ফয়সাল নামে শেখ জামালের এক বন্ধু কর্নেল হামিদকে বলেছে সে রাতে শেখ জামাল তার সাথে ছিল সারারাত আড্ডাবাজি করেছে তার সাথে। ওরা চাঁদা তুলে মুরগী কিনেছে এবং প্ল্যান করেছিল বন্ধুরা মিলে মুরগীর রোস্ট খাবে। কিন্তু ভোর ৪টার দিকে বাড়িতে গোলাগুলির শব্দ শুনে জামাল দেয়াল টপকে নিজ বাড়িতে চলে যায়। ফয়সাল আরো বলেন যে বাড়ির জানালায় দাড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির হত্যাকাণ্ডের কিছু অংশ তিনি দেখেন। এমনকি মেজর নূরের চিৎকারটিও শোনেন।


কিন্তু ডাঃ ফয়সাল সত্য কথা বলছেন মনে হচ্ছে না। প্রথমতঃ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আক্রমন শুরু হয়েছে ৫টার পরে। ৪টায় কি করে গোলাগুলি শুনে জামাল বেরিয়ে গেল। তাছাড়া একটা প্রেসিডেন্টের ছেলে চাঁদা তুলে মুরগী খাবার প্ল্যান করে বন্ধুদের সাথে এটাও কেমন লাগে শুনতে। তাও পূর্নবয়স্ক এক তরুণ। যে নতুন বিয়ে করেছে। নতুন বউ ফেলে পাশের বাড়িতে সারারাত আড্ডা দেয় এবং গোলাগুলি শুরু হলে পেছনের দরোজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকে। কেমন গোলমেলে লাগে।
এবার অন্য পাশের বাড়ির আরেকজনের কথা শুনি। তাঁর নাম নেওয়াজ আহমেদ গর্জন। একটা বাড়ির দুটো পাশই থাকতে পারে। ইনি কোন পাশের না জানলেও এনার বাড়ির নাম্বার ৬৭৮ এবং বঙ্গবন্ধুর বাড়ির নম্বর ৬৭৭ এটা জানা গেছে। ইনি আদলতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন ১৫ আগষ্ট খুব ভোরবেলা তার ঘুম ভাঙ্গে বিউগলের শব্দে। জানালার পাশে দাড়িয়ে তিনি দেখতে পান বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। এর অল্পক্ষণ পরেই কিছু কালো পোশাকধারী কিছু সৈন্য বঙ্গবন্ধুর বাড়ি লক্ষ্য করে গোলাগুলি শুরু করে। তারপরের ঘটনা তো সবার জানা।
এবার বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ভেতরে অবস্থান করা একজনকে নিয়ে আসি। রমাকে চেনেন? বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাজের লোক। রমা তার সাক্ষ্যে বলেছে ওইদিন শেখ জামাল ও রোজী দোতালায় তাদের ঘরে ঘুমিয়েছিল। কামাল ওর সুলতানা তিনতলায়। জামাল রোজী দোতলায়। গোলাগুলি শুরু হলে প্রথমে বেগম মুজিব তাকে জাগায়। সে কামালকে জাগায়। কামাল শার্টপ্যান্ট পরে নীচতলায় নেমে যায়। তারপর রমা শেখ জামালকেও দোতালায় গিয়ে জাগায়। সে শার্টপ্যান্ট পরে বউকে নিয়ে মায়ের ঘরে যায়। তারপর তো যা ঘটার ঘটলো। আধঘন্টার মধ্যে সব শেষ।
রমা ও নেওয়াজ সাহেবের বর্ননা পড়ে ডাঃ ফয়সাল সাহেবকে মিথ্যেবাদী মনে হচ্ছে না? কিন্তু কর্ণেল হামিদ কি সেটা জানেন না? তাহলে এই রেফারেন্সটা কেন দিলেন তাঁর বইতে?


===========
চার : ব্যর্থ উপসংহার
============

আবার ফিরি কর্নেল শাফায়েত জামিল ও মেজর জেনারেল শফিউল্লাহর কাছে। আমি বিশ্বাস করি এই দুজনের একজনও হত্যায় জড়িত ছিল না। কিন্তু তাঁরা পরস্পর পরস্পরের ঘাড়ে কিছুটা হলেও হত্যার দায় চাপাতে চেয়েছেন অবহেলা করেছেন বলে। এক্ষেত্রে কর্নেল শাফায়েত জামিলের একটা ঘটনার কথা বলি।

হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন পর ১৯শে আগষ্ট  আর্মি হেডকোয়াটারে সিনিয়র অফিসারদের একটা শৃংখলা সভায় শাফায়েত জামিল হঠাৎ করে গর্জে উঠেছিলেন। ফারুক রশীদের উদ্দেশ্যে দাত খিঁচিয়েছিলেন এবং এই হত্যাকারীদের বিচার করার হুমকি দিয়েছিলেন প্রকাশ্যেই। এই সাহস আর কেউ দেখাতে পারেনি। এত সাহস দেখাবার পেছনে কোন শক্তি কাজ করেছে? তবে এটা জেনে ভরসা জাগতে পারে শাফায়েত হয়তো এই ঘটনায় জড়িত ছিল না। কিন্তু জিয়ার সাথে তার খাতির বা জিয়ার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব আমাদেরকে দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়।

আবার মাত্র ৯ দিনের মাথায় ২৪ আগষ্ট জেনারেল শফিউল্লাহকে যখন জোর করে সেনাপ্রধান থেকে সরিয়ে দিয়ে জেনারেল জিয়াকে প্রধান বানানো হয় তখন শফিউল্লাহকেও সন্দেহমুক্ত তালিকায় নিয়ে আসা যায়। হত্যায় জড়িত থাকলে তাঁকে সেনাপ্রধানের পদ ছাড়তে হতো না।

অতএব এই দুজনই আপাততঃ সন্দেহমুক্ত। কিন্তু হত্যার দায় থেকে সন্দেহমুক্ত করেও মিথ্যাবাদীর দায় থেকে মুক্তি দিতে পারছি না শাফায়াত বা শফিউল্লাহকে।। দুজনের মধ্যে অবশ্যই কেউ একজন মিথ্যে বলছেন। কেন বলেছেন সেটা তারাই বলতে পারবেন। এতসব মিথ্যার কারণে আমি কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হই, আসলে কে মিথ্যে বলেছেন। কিন্তু মিথ্যেটা এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মাঝখানে একটা কাঁটা হয়ে বিদ্ধ করতে থাকে।

সুত্র:
১. একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য আগষ্ট, ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর, কর্নেল(অব) শাফায়াত জামিল
২. Additional Paper Books of Death Reference no.30 of 1998, The Supreme Court of Bangladesh
৩. তিনটি অভ্যূত্থান ও কিছু না বলা কথা, কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ, পিএসসি
৪. সমকাল, প্রথম আলো ১৫ আগষ্ট সংখ্যা

 

[কৈফিয়তঃ আমাদের জীবদ্দশায় একাত্তরের পর পঁচাত্তর একটি মর্মান্তিক অধ্যায়। পঁচাত্তরকে নিয়ে যারা উল্লসিত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তাদের আমি জানোয়ার বলতেও দ্বিধা করি। কেননা এই ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলংকিত ঘটনা। শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের শাসনামলকে দুঃশাসন আখ্যায়িত করে যারা এই হত্যাকাণ্ডকে যৌক্তিক আখ্যা দেন তাদের সাথে কোনরকম তর্কে যাওয়াও মানুষ হিসেবে অপমানজনক। বাংলাদেশের ৪৩ বছরের ইতিহাসে ওই সাড়ে তিন বছর সময়টা কত ক্ষুদ্র এখন আমরা সবাই জানি। আমরা চল্লিশ বছরেও যা অর্জন করতে পারিনি অনেকে সাড়ে তিন বছরেই তা আশা করে বসেছিল। আমরা জানি অনেক ভুল হয়েছে সেই সময়কালে। কিন্তু সেই ভুলের পরিণতি ওই হত্যাকাণ্ড, এটা মেনে নেয়া যায় না। বাস্তবতা হলো, অপরাজনীতির কিছু উপাদান শেখ মুজিবের সেই ভুলগুলোকে সম্প্রসারিত করেছে এবং বাংলাদেশ বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাতকে শক্তিশালী করেছে। আমার এই লেখাটা তাদের উদ্দেশ্যে লেখা যাদের কাছে পঁচাত্তরের ওই তিন মাস এখনো একটা ধোঁয়াশা। এই লেখাটা আমার নিজের ধোঁয়াশা দূর করার জন্য লেখা। যদি আর কারো ধোঁয়াশাও দূর হয় তাতে, সেটা বাড়তি পাওনা হয়েই থাকবে।]