Monday, April 30, 2012

তিনটি অবুঝ প্রশ্ন এবং একটি জ্ঞানী উপলব্ধি

১) জগতে এত ঘুরন্তিস কেন?
কৈশোর থেকে প্রশ্নগুলো ঘুরছে। পড়াশোনায় মন ছিল না বলে টই টই করে ঘুরে বেড়াতাম। তাবৎ মুরব্বীর একই ঝাড়ি- 'এত ঘুরাঘুরি কিসের? লেখাপড়ার কাম নাই?' আরে আজব আমি একা ঘুরি নাকি? সারা দুনিয়াটা ঘোরে। কেবল পার্থক্য হলো ওরা ঘুরে নির্দিষ্ট বৃত্তাকারে, আমি ঘুরি লাইন ছাড়া। তবে এইসব ঘুরাঘুরি নিয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনা বিকাশ লাভের আগেই মারা গেছে। যেটুকু মনে আছে তা বলছি-

পৃথিবীটা গোল। চাঁদটাও। এমনকি সূর্যটাও। তাবৎ সৌরজগতের, এ পর্যন্ত জানা মহাকাশের সবগুলো গ্রহ নক্ষত্র গোলাকার। ব্যতিক্রম আছে কিছু গ্রহাণু, ধূমকেতু আর উল্কা, সেটাকে হিসেবে আনছি না। প্রত্যেকটা গ্রহ উপগ্রহ নক্ষত্রের একটা অক্ষরেখা আছে, সেই অক্ষরেখায় বৃত্তাকার বা উপবৃত্তাকার রেখায় ঘুরছে সবাই। আবার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনুপরমাণু ভেঙ্গেও একই কারবার। ছোট বড় সবাই ঘুরছে তো ঘুরছেই। হাতের নখের মধ্যে আটকানো একবিন্দু বালি, তার ভেতরেও চলছে অবিরাম ঘূর্ণি। এত ঘুরন্তিস কেন? কি উদ্দেশ্য তাহার? উদ্দেশ্যহীন ঘুরন্তিস প্রকৃতির সাথে যায় না। প্রত্যেকটা কাজেরই একটা ইনপুট আর একটা আউটপুট আছে। দুটো মিলেই জগতের সকল কর্মযজ্ঞ। নিশ্চয়ই এই ঘুরন্তিস এর কোন উদ্দেশ্য আছে যা আমাদের অজানা। ঘুরন্তিস এর উদ্দেশ্য বের করা সহজ না হলেও, এখান থেকে একটা সাধারণ জ্ঞান শিক্ষা নিলে ক্ষতি নেই। যেহেতু দুনিয়ার সবকিছুর আকৃতির মধ্যে ঘুরন্তিসের নেশা মানে বৃত্তের প্রভাব, তাহলে ধরে নেয়া যায় বৃত্ত একটি মৌলিক আকৃতি যার জন্ম আদিতে। বৃত্ত ছাড়া আর যত আকৃতি সব মানবসৃষ্ট। মানে দুনিয়াটা আসলে গোল।

২) একই আকাশে চাঁদ সূর্যের আকার পরিবর্তন হয় কেন?
সূর্য যখন দিগন্ত রেখার কাছাকাছি থাকে তখন তার সাইজ দেখছেন? কিংবা পূর্ণিমার সন্ধ্যার পূর্বদিগন্তের চাঁদটা? ইয়া ঢাউস সোনালী/কমলা থালা যেন। কিন্তু একই জিনিস যখন মাথার উপরে থাকে, তখন আবার সেই স্ট্যান্ডার্ড সাইজে ফিরে যায়। এই তেলেসমাতির রহস্য কি? এটা তো আর ভাত চালের ব্যাপার না যে রান্না করার আগে এক সাইজ, রান্না করার পরে অন্য সাইজ হয়ে যাবে। তাহলে রহস্যটা কি? টলেমি আংকেল বলছিলেন যে পৃথিবীর অভিকর্ষ বা বায়ুমণ্ডলের কোন একটা প্রভাব আছে এতে যার ফলে সাইজ এরকম হেরফের দেখায়। দুই হাজার বছর এতে কোন দ্বিমত দেখা না গেলেও আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞানীরা তার দাবীটা খারিজ করে দিয়ে বলেছে, বুড়া কিছুই জানতো না। এখানে কোন ব্যাপারই নাই। আগাগোড়া নাকি একই সাইজ দেখা যায়। যেটা আমরা বড় ছোট দেখি বলে মনে হয় সেটা আমাদের দেখার ভুল, মগজের এরর মেসেজ। যার নাম অপটিক্যাল ইল্যুশন।

আমি আধুনিক বিজ্ঞানীদের গুল্লি মারি। আমার বিশ্বাস টলেমি আংকেলের সাথে যায়। এখানে অভিকর্ষ কিংবা বায়ুমণ্ডলের কোন ফাঁপর না থাকলে এত বড় জালিয়াতি কারবার লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলতে পারতো না।

৩) পা দিয়ে হাঁটেন নাকি চোখ দিয়ে?
ঘুরাঘুরি কেবল আমিই করি না। আপনিও করেন। কথা সেটা নয়। এই যে এত হাঁটাহাঁটি করেন কখনো ভেবে দেখেছেন কিভাবে হাঁটেন? হ্যাঁ, পা দিয়ে হাঁটেন জানা কথা। কিন্তু অজানা কথা হলো পা হলো একটা ভর দেবার অঙ্গ মাত্র আপনি আসলে হাঁটেন চোখে ভর দিয়ে। কিভাবে? আপনার আশেপাশে টাইলসের ফ্লোর আছে? একফুট বাই একফুট টাইলস? যদি থাকে তবে একফুট টাইলসের উপর দিয়ে সোজা সামনে একশো ফুট হেঁটে যান তো! সাবধান, একফুট টাইলসের বাইরে যেন কোনমতেই পা না পড়ে। সীমা এই একফুট প্রস্থ টাইলস। এর ডাইনে বামে যে টাইলস আছে তাতে যেন পা না পড়ে। .......... কী, পারা গেছে? পারার কথাই। সোজা একটা কাজ।

কিন্তু ধরুন এই একফুট প্রস্থ একটা সাঁকো স্রোতস্বিনী নদীর পঞ্চাশ ফুট উপরে বসিয়ে দেয়া হলো। এটার উপর দিয়েই আপনাকে নদীটা পার হতে হবে। পারবেন? এবার চিন্তায় পড়ে গেছেন তাই না? হুঁ সেজন্যই বলেছিলাম, আপনি আসলে হাঁটেন চোখের মাথায় ভর দিয়ে। ফ্লোরে হাঁটার সময় আপনার দৃষ্টি আশেপাশের টাইলসে ভর করে আপনাকে সোজা পথে হাঁটিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু নদীর উপর দিয়ে যাবার সময় আপনার চোখকে ভর দিতে হয় জলের স্রোতে। ফলে আপনি ভারসাম্য হারাবেন বারবার, হয়তো দশ পা গিয়েই নদীতে ঝপাৎ করে পড়ে যাবেন । (তবে হ্যাঁ কেউ যদি শারীরিক কসরতের কারিগর হয়, তাহলে এটা তার জন্য প্রযোজ্য নয়।) এখন বলুন, আপনি কী দিয়ে হাঁটেন, চোখ দিয়ে নাকি পা দিয়ে?

৪) এবং কলম বিষয়ে একটি সাম্প্রতিক উপলব্ধি
আমার ধারণা কলম দিয়ে লেখালেখি করতে হলে ৯৯% লোকের ব্লগিং নেশা ছুটে যেতো এবং নিশ্চিতভাবে আমি তাদের প্রথম সারিতে থাকতাম। সেদিন এক জায়গায় কলম দিয়ে দুই পাতা বাংলা লিখতে গিয়ে হাতের আঙুলগুলো এমন কিমা কিমা হলো যেন স্কুলের তিন ঘণ্টার বার্ষিক পরীক্ষার খাতা জমা দিয়ে বেরুলাম।

কম্পিউটারের কাছে কৃতজ্ঞতা। বিশ শতকে আবিষ্কৃত হবার জন্য এবং উনিশ শতকে আবিষ্কৃত না হবার জন্য। কম্পিউটার, ইন্টারনেট, অভ্র এই তিনটা বস্তু না থাকলে এতগুলো বই একুশে মেলায় প্রকাশ পেতনা, বাঙালী এতখানি লেখালেখি করতো না, এতগুলো বাংলা ব্লগেরও জন্ম হতো না- এটা যেমন সত্য, এই আবিষ্কার ১০০ বছর আগে হলে রবি বুড়ো একা যা লিখতো তা পড়ে শেষ করার জন্য একেকটা মানুষের সত্তরবার জন্ম নিতে হতো সেটাও সত্য। বেঁচে গেছি!

আমার ঘরটি

আমার ঘরটিকে আমি স্বার্থপরের মতো ভালোবাসতাম।

আমাদের ছোট্ট বাড়িটায় আরো চারটা কামরা ছিল। তবু আমার ঘরটিকেই আমি বিশেষভাবে ভালোবাসতাম। পূর্ব দক্ষিণ ঘরটা ছিল সর্বকাজের। সেখানে বসা, খাওয়া, বই-পত্রিকা পড়া, আড্ডা দেয়া, টিভি দেখা, হেন কাজ নেই হতো না। এই ঘরটির দুটো জানালা, একটা দক্ষিণে আরেকটা পূর্বদিকে। এই ঘরকে আমরা ডাকতাম 'ড্রইংরুম' বলে। আসবাবের মধ্যে ছিল একসেট কাঠের, আরেক সেট বেতের সোফা, অন্যপাশে বুকশেল্ফ, শোকেস, টিভি ইত্যাদি। এই দুয়ের মাঝে ছজন বসার মতো একটা ডাইনিং টেবিল ছিল যেটায় খাওয়া পড়া লেখা সবই চলতো। দক্ষিণের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে দুটো পেয়ারা গাছ, একটা আমগাছ দেখা যেত। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কামিনী আর শিউলীর ঝোপটাও আংশিক দেখা যেত। এইসব গাছপালা পেরিয়ে সীমানা দেয়াল। দেয়ালের ওপাশে রাস্তা। রাস্তা থেকে এই ঘরটা দেখাই যেত না গাছপালার আড়ালে। আমাদের বাড়িটা ছিল প্রায় একটা জঙ্গলবাড়ি। ড্রইংরুমের পশ্চিমে যে ঘর, সেটায়ও দুটো জানালা, একটা দক্ষিনমুখী, আরেকটা পশ্চিমমুখী। এই ঘরটায় প্রকৃতির শীততাপ নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা ছিল। গরমকালে গরম কম, শীতকালে শীত কম। এটা বাবা-মার ঘর। এই ঘরের উত্তরদিকে করিডোর বেয়ে গেলে, বায়ে একটা ঘর, ডানে আরেকটা। বায়ে মানে পশ্চিমেরটায় বোনেরা থাকতো, ডানদিকের মানে পূবদিকের ঘরটা খালি থাকতো। খালি ঘরটায় একটা বিছানা পাতা থাকতো, আরেকটা আলনা, আর কিছু টুকিটাকি মালপত্র। এই ঘরকে আমরা বলতাম গেষ্টরুম। এটা পার হয়ে উত্তরে রান্নাঘর, রান্নাঘর পেরিয়ে দুকদম গেলে সর্ব উত্তরের বিচ্ছিন্নপ্রায় একটা ঘর এবং সেই ঘরটায় ছিল আমার বসতি।

১০ ফুট বাই ১৪ ফুট ঘরটিতে একটা সেমি ডাবল খাট, একসেট সোফা, একটা বুকশেলফ, একটা পড়ার টেবিল, একটা চেয়ার। ব্যস এটুকুই আসবাব। সিমেন্টের মেঝেটা নির্মানকালেই খাদা না খাদা হয়ে গিয়েছিল নির্মানকর্মীদের অবহেলায়। তাই ছোট্ট একটা কার্পেটে ঢেকে দেয়া হয়েছিল। এই ঘরটি বাইরে থেকে ঢোকার একটা দরোজা, ভেতরে অন্য ঘরে যাবার একটা দরোজা ছিল। যখন বন্ধুরা আসতো তখন ভেতরের দরোজাটা বন্ধ করে দিয়ে জমিয়ে আড্ডা চলতো। এই ঘরে উত্তরে একটা, পু্র্বদিকে আরেকটা জানালা ছিল। উত্তরের জানালা দিয়ে সীমানা দেয়াল পার হলেই দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত দেখা যেত। ধানক্ষেত পেরিয়ে অনেক দূরে একটা লোকালয় যেখানে আকাশটা মিশেছে দিগন্তে। আশেপাশের দালানগুলি বেড়ে ওঠার আগ পর্যন্ত ওই সবুজ ল্যান্ডস্কেপ দেখে বছরের পর বছর কাটিয়েছি। পুবদিকের জানালা দিয়ে দুটো বেড়ে ওঠা নারিকেল গাছ, একটা আম গাছ, একটা কাঠালগাছ আর বাগানের সব ঝোপঝাড়ের সবুজ থেকে আলো ঠিকরে আসতো। এই ঘরটায় আমি একা থাকতাম। এই ঘরের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল চেয়ার টেবিলের অংশটা। টেবিলটা একটা পুরু সুতী কাপড়ে ঢাকা ছিল। টেবিলের ওপাশে একটা যুদ্ধবিরোধী পোষ্টার দাড় করানো থাকতো। তারপাশে একটা ক্যাসেট প্লেয়ার, তার পাশে বইপত্রপত্রিকা ইত্যাদি ছড়ানো। আমার কনুই দুটো রাখার জন্য যেটুকু খালি জায়গা দরকার সেটুকু বাদে বাকীটা কাগজপত্রের দখলে। টেবিলের পাশেই ছিল জানালাটা। যেটা দিয়ে বাগানের সম্পূর্ন দৃশ্যটা দেখা যেতো। আমি টেবিলে দুই কনুই রেখে, গালে হাত দিয়ে চুপ করে বসে বসে গান শুনতাম। যখন গান শুনতাম তখন কিছু পড়তাম না। গানের মধ্যেই ডুবে থাকতাম। শোনা আর পড়া দুটো আমার এক সাথে হয় না। এই ঘরে তেমন কেউ আসতো না। নিরিবিলি পড়াশোনা করার জন্য এর চেয়ে আদর্শ ঘর হতেই পারে না। আমার জীবনে যতটুকু পড়াশোনা তার বেশীরভাগই হয়েছে এই টেবিলে বসে। আর ছিল ডায়েরী লেখা।  জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালে সবুজের ছায়া, সবুজ থেকে সবুজাভ আলো আসতো। সেই আলো ছায়াগুলো এত সুন্দর ছিল, ওদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে লিখতে ইচ্ছে করতো না। কখনো দেখা যেত এক ঘন্টা বসে থেকেও এক লাইনও লিখিনি।

তবে ভার্সিটি খোলা থাকলে রুটিনে একটু পরিবর্তন আসতো। দুপুরের ট্রেনে ভার্সিটি থেকে ফিরতে ফিরতে আড়াইটা বাজতো। গোসল খাওয়া সেরে রুমে আসতে আসতে তিনটা সাড়ে তিনটা। এই সময়টা হলো স্বর্গ সুখের সময়। এর চেয়ে আরামের সময় পৃথিবীতে আর কি থাকতে পারে আমার জানা নেই। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই সমস্ত শরীর জুড়ে ক্লান্তির কনাগুলো সুখ সুখ হয়ে ফিসফিস করতে থাকে। চোখের পাতাটা ভারী হয়ে আসবে অজান্তেই। তারপরের দেড় দুঘন্টা নিশ্ছিদ্র ঘুম।

ঘুম থেকে উঠে বিকেলের চা খেয়ে পায়ে হেঁটে সিজিএস কলোনী। কলোনীর স্কুলঘরে গ্রুপ থিয়েটারের নাটকের রিহার্সালে সাংস্কৃতিক আড্ডা। তবে সেই আড্ডায়ও পেট ভরতো না। রাত আটটার দিকে রিহার্সাল শেষ হবার পর আরো ঘন্টা দুই কলোনীর মাঠে বন্ধুদের সাথে দ্বিতীয় দফা আড্ডা।প্রথম আড্ডা কখনো মিস হলেও দ্বিতীয় আড্ডাটা কোনদিন মিস হতো না। ঘড়ি যখন দশটার দিকে, বাড়ি ফেরার সময় হয়। হ্যাঁ প্রায় প্রতিদিন বাড়ি ফিরতাম রাত দশটার পর। তখন বুঝতাম না, ভালো ছেলেরা এত রাতে বাড়ি ফেরে না। আমি যে ভালো ছিলাম না সেটা বুঝতে অনেক বছর সময় লেগেছে। দশটায় ফিরে খেয়ে দেয়ে এগারোটায় রুমে আসতাম। দরোজা বন্ধ করে প্লেয়ারে গান ছেড়ে দিতাম। রাত বারোটা পর্যন্ত গান শুনে তারপর পড়াশোনার সময় হতো। সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই আমার একাডেমিক পড়াশোনাগুলো সব রাত বারোটার পরে হয়েছে। আসলে সেই সময়ে রাত বারোটা থেকেই যেন আমার সন্ধ্যা শুরু। রাত দুটো তিনটার দিকে ঘুমোতে যেতাম প্রায়ই। পরদিন সকাল দশটা পর্যন্ত ঘুম। তারপর আরেকটি নতুন দিন........।

আমার সেই ঘরটি এখন স্মৃতি, সেই আড্ডাগুলোও.....সবকিছু একসময় গল্প হয়ে যায়। একসময় কিছুই আর আগের মতো থাকে না।


============================

আলো অন্ধকার

১.
তুমি যতটা অন্ধকারে ছিলে, আমি ততটা আলোতে। তোমাকে অন্ধকার ছেড়ে বের করে আনার জন্য হাত ধরেছিলাম বলে তুমি কৃতজ্ঞতায় নত হয়েছিলে। কিন্তু যেই তুমি আমাতে লোড শেডিং দেখলে অমনি তিরষ্কারে জর্জরিত করে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললে, আমার আঁধারই ভালো।

২.

অদ্ভুত আঁধার এক ভর করেছে এই মাঝদুপুরের মেঘের পাখায়। দূর দিগন্ত বিস্তৃত সেই মেঘের ছাতায় নগরী অন্ধকার। ক্ষয়িষ্ণু অন্ধকার তোমার কান্নার রং হয়ে আমার শহরে নেমেছে অঝোর ধারায়। তোমার জমানো ঘেন্নাগুলো বজ্রপাতের মতো প্রবল গর্জনে কামান দাগছে ক্ষণে ক্ষণে। হে অসময়ের বর্ষা, তোমার ঘেন্নার সমাপনীতে উপহার দিও একটুখানি রোদেলা হাসি।




ক্যাকটাস


এ যেন নিঝুত বছর আগের কথা। আমার দুজন বন্ধু ছিল। তার একজন মানুষ, আরেকটা বৃক্ষ। ক্যাকটাসের গাছকে বৃক্ষ বললে কি বৃক্ষসমাজকে অপমান করা হয়?

ক্যাকটাসের ছোট্ট টবটা কিনে সাজিয়ে রেখেছিলাম বিছানার পাশের টেবিলে। টবটায় প্রতিদিন একটু করে পানি স্প্রে করতে হতো। ওটাই তার একমাত্র দৈনিক পাওনা আমার কাছ থেকে। এর চেয়ে বাড়তি ছিল সপ্তাহে একবার খানিকটা রোদ।

নিয়ম মেনে সব দিয়ে যাচ্ছিলাম। রোদ পানির রুটিন ঠিক ঠাক থাকলে একদিন ছোট্ট একটা ফুল উপহার দিল আমাকে। আমি তার ছবি তুলে আমার মানুষ বন্ধুটাকে উপহার দিলাম। বন্ধুটা আমার কাছ থেকে বহুদূরের এক দেশে থাকে। আমি একা হয়ে যাবার পর সেই আমার একমাত্র সঙ্গী। তারপর যুক্ত হয় এই ক্যাকটাস। দুজনের সাথে আমি প্রচুর বকবক করি। যখন মানুষ বন্ধুটা থাকে তখন ক্যাকটাসের সাথে কথা বন্ধ থাকে। ক্যাকটাসের তাতে মন খারাপ হতো? অভিমানে ঠোট ফুলাতো? কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি।

আমি এই দুজনের মধ্যে কখনো তুলনা করতাম না। দুজনই আলাদা সত্ত্বায় তৈরী। মাঝে মাঝে মনে হতো আমি বুঝি ক্যাকটাস বন্ধুকে বেশী পছন্দ করি। ওর কাছেই নিরাপদ থাকি। মানুষ বন্ধু বড় ফ্যাসাদের জিনিস। কথায় কথায় রাগ করে অভিমান করে চলে যেতে পারে সাত দিনের জন্য। তখন আমি ওই ক্যাকটাসের সঙ্গ নিয়ে তাকে ভুলে থাকি। তবে মানুষটা আবার ফিরে আসলে আমি দুহাতে জড়িয়ে ধরি। যেদিন ফিরে আসে সেদিন আমি ওর সাথে একটু বেশী সময়ই থাকি। সেই সময়টাতে আমি ক্যাকটাসকে একরকম ভুলে থাকি। অনুভুতির অনুরণনে সারাদিন কেটে যায় আমার। এভাবেই চলছিল দিন।

একদিন কি যেন হয়ে গেল। মানুষ বন্ধুটার সাথে তুচ্ছ কারণে নেট ঝগড়া হয়ে গেল। মানুষ বন্ধু আমাকে ছেড়ে চলে যাবার ঘোষণা দিল। আমি সেদিন ভেবেছি সত্যি সত্যি যাচ্ছে না। মিছে ভয় দেখাচ্ছে। বরাবরই এমন করে। কিন্তু সেবার সত্যি চলে গেল সে। একদিন দুদিন তিনদিন......... আমি বিছানায় উপুড় হয়ে সাতদিন কাঁদলাম, চোখের জল শুকিয়ে কালি হয়ে গেল। তারপর মাস চলে গেলেও বন্ধু ফেরেনি।

না ফিরলেও আমার বিশ্বাস ছিল তার জন্য আমি অনন্তকাল অপেক্ষা করতে পারবো। অপেক্ষার দিন মাস বছরগুলোতে আমি একের পর এক ক্যাকটাসে ফুল ফুটিয়ে যাবো। আমার প্রতিজ্ঞা নিয়ে বিছানা থেকে মাথা তুললাম ক্যাকটাসের খোঁজে। কিন্তু সাইড টেবিলে তাকিয়ে দেখি, ক্যাকটাসটা কখন মরে শুকিয়ে রয়েছে ছোট্ট মলিন টবের মাঝে। আমার এক মাসের চরম অমনোযোগ আর অবহেলায় আমি ক্যাকটাস বন্ধুকেও হারালাম চিরতরে।

অচেনা ষ্টেশানে

কোথাও না কোথাও আমাদের থামতে হবে। জীবনের গতির ধর্মই তেমন। থামার সময়টা কতখানি দীর্ঘ তার উপর নির্ভর করে জীবন মৃত্যু। যদি অনন্তকাল থেমে থাকে কোন স্টেশানে মনে করতে হবে ওটাই ছিল তার গন্তব্য। একেকটি স্টেশান একেকটি ক্ষণ, হতে পারে কোন একটি বছর কিংবা মাস অথবা দিবস রজনী। জীবনের যাত্রাপথে শত শত হাজার হাজার স্টেশান পেরিয়ে আমরা অনির্ধারিত কোন স্টেশনে গিয়ে চিরতরে থেমে যাবো। প্রত্যেকটা জীবিত প্রাণীই তাই। সেই শেষ ষ্টেশনটি আসার আগে আমরা যে স্টেশনগুলো ফেলে এসেছি তার মধ্যে কোন কোনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ন স্টেশন, যেখানে আমরা অধিকসময় পার করেছি অনেক আনন্দ নিয়ে, আবার কোন কোন স্টেশান ছিল যন্ত্রনাদায়ক। সে কথা আমরা ভাবতে চাই না। কোন কোন ষ্টেশানে আমাদের যাত্রাবিরতি ছিল একেবারেই অনির্ধারিত অনাকাংখিত।

তোমার সাথে আমার যে স্টেশনে দেখা সেটা আমার জন্য নির্ধারিত স্টেশন ছিল না। তবু আমি তোমাকে দেখে থমকে গিয়েছিলাম এবং নেমে পড়েছিলাম। যে দরোজায় কোন গার্ড ছিল না সেই দরোজা দিয়েই নেমেছিলাম। তুমি তোমার ট্রেন মিস করে অনির্ধারিত কোন গন্তব্যের আশায় বসে ছিলে। যেই আমি স্টেশানে নামলাম তুমি হাত বাড়িয়ে দিলে। আমরা দুজন অনির্ধারিত এক সম্মেলনে মিলিত হলাম। তুমি বললে অপ্রত্যাশিত কিন্তু বহুল কাংখিত। আমি বললাম, অপ্রত্যাশিত কিন্তু অনাহুত নয়। আমাদের ইচ্ছে করছিলনা আর কোন ট্রেনে চড়ে আর কোন গন্তব্যে পৌঁছাতে। কিন্তু আমার টিকেট রয়ে গেছে পকেটে, যে টিকেটে আমি এই ষ্টেশানে অবৈধ। আমাকে দ্রুত ফিরতে হবে। কিন্তু তোমাকে একা ফেলে আমি ফিরতে পারছিলাম না। আমার এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব তোমাকে আহত করেছে হয়তো। তুমি নীরবে আমার হাত ছেড়ে দিলে। বেদনা লুকিয়ে বললে আমাকে চলে যেতে। আমি তোমার আবেদনে ব্যাথাতুর হলাম। উঠে পড়লাম ট্রেনে আবার। তোমাকে বিদায় জানাতে জানালা দিয়ে তাকালাম। দেখলাম তুমি মুখ ফিরিয়ে বসে আছো যেন আমি কোনকালেই এই ষ্টেশানে নামিনি।

চাবির রিং

রাক্ষুসে অন্ধকার হা করে গিলে ফেললো টর্চলাইটের একরত্তি আলোকে। দুটো পেন্সিল ব্যাটারীর শক্তিতে নির্গত আলোর পরিধি দুচোখের গন্ডীর চেয়েও কম। গহীন এই অন্ধকারের কাছে আলো এক পরাজিত শক্তি। যা খোঁজা হচ্ছে তা দামী কিছুই না, সাধারণ ধাতব গোলাকার একটি চাবির রিং। চাবিটা হারাবার আগে মূল্য হারিয়েছিল। অকেজো চাবিটাকে গলায় ঝুলিয়ে বহুদিন বেঁচে ছিল রিংটা। চাবিটা হারাবার পর থেকে নিঃসঙ্গ রিংটা আংটির মতো আঙ্গুলে গলিয়ে হারানো চাবির অস্তিত্ব অনুভব করে বেড়াতো সে। চকচকে গোলাকার রিংটা সময়ের তামাটে স্পর্শে রূপোলী বর্ন হারিয়ে ফেলেছিল।

চাবি হারাবার আগে নষ্ট হয়েছিল ড্রয়ারের তালাটা। তালাচাবিওয়ালা এসে রায় দিল এই তালা ঠিক হবার নয়। তালাটা ভেঙ্গে ড্রয়ারটা উন্মুক্ত করে দিয়ে গেল সে। জং ধরা প্রাচীন তালা আশ্রয় পেল ডাস্টবিনের ধারে ছড়ানো আবর্জনার আড়ালে।

তারও আগে হারিয়েছিল ড্রয়ারে শুয়ে থাকা ডায়েরীটার কয়েকটি পাতা। সেই পাতাগুলোয় একটি অদ্ভুত চিঠি লেখা ছিল। পাঠাবার আগেই চিঠির প্রাপক হারিয়ে গিয়েছিল বলে চিঠিটাও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। অদ্ভুত নীল অক্ষরে সাজানো পাতাগুলো তাই ছিঁড়ে ফেলে দিতে হয়েছিল।

সবকিছু হারিয়ে গেলেও হারায়নি কথাগুলো। ভুলতে চাওয়া সেই কথাগুলো স্মৃতি প্রকোষ্ঠে স্থায়ী বাসস্থান গড়ে রাতের পর রাত ঘুনপোকার মতো খেয়ে যাচ্ছিল মগজের শিরা উপশিরা। তার সময়ে এক বিরল মুহুর্তের অধিকারবোধের উপহার এই চাবির রিং।

প্রতিকূল সময়ে টিকতে না পেরে সে হারিয়ে গেছে এটা যেমন সত্য, আবার একদিন সে ছিল বুকের খুব গভীরে এটাও ভীষণ সত্য। এই দুই সত্যের সেতুবন্ধন চাবির রিংটা। আমি তাই এই রাক্ষুসে অন্ধকার ভেদ করে সেই চাবির রিংটাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। যা ভোলা দরকার তা ভুলতে পারি না, যা হারাবার নয় তা হারিয়ে যায়।

Sunday, April 22, 2012

যখন আর কিছুই আগের মতো থাকে না



গল্পগুলো খুব চেনা আর সাধারণ। ওরা প্রত্যেকে কাছাকাছি সময়ে আলাদা পরিবারে মানুষ হচ্ছিল। বয়েস ৪-৬ বছর। ২০১১ সালে যে গল্পগুলো ছিল এরকম-

১. অমি প্রতি শুক্রবারের অপেক্ষায় থাকে। বাবা বাসায় থাকে সারাদিন। বিকেলে ওকে নিয়ে বের হয়। হয় শিশুপার্ক, নয়তো চন্দ্রিমা, নয়তো চায়নীজ। ফিরে আসার সময় মুঠোভর্তি চকোলেট আর বেলুন। প্রতি শুক্রবার ওর জন্মদিনের আনন্দ।

২. নীহা প্রতি রাতে ঘুমোবার আগে এক ঘন্টা বাবার গলা জড়িয়ে গল্প শুনে। সেই তিন বছর বয়স থেকে গল্প শুনতে শুনতে মুখস্ত হয়ে গেছে বাবার প্রতিটা গল্প, তবু বাবার মুখ থেকে শুনতে ইচ্ছে করে ওর। প্রতিবার শুনলে মনে হয় এই প্রথম শুনছি, বাবা এমন মজা করে গল্প করে।

৩. শায়ানের খুব শখ ঘোড়ায় চড়া। বাবাকে কতো করে বলেছে একটা ঘোড়া কিনে দাও। বাবাটা কথা শোনে না। তাই শাস্তিস্বরূপ প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাবাকে ঘোড়া বানিয়ে বিছানাময় ঘুরে বেড়ায়। বাবা অফিস থেকে ফিরে চা খেয়ে এসে সানন্দে ওকে পিঠে নিয়ে পংখীরাজ হয়ে যায়।

২০১২ সালে এসে গল্পগুলো হয়ে যায় এরকম-

১. অমি এখন শুক্রবারের প্রতীক্ষা করে না।

২. নীহা আর প্রতি রাতে গল্প শোনার বায়না করে না।

৩. শায়ান আর প্রতি সন্ধ্যায় পংখীরাজের পিঠে চড়ে না।

স্থান ভিন্ন। কাল ভিন্ন। পাত্র ভিন্ন। তবু একটা জায়গায় মিলে যায় তিনজনের সমীকরণ।
সাদা কাপড়ে ঢাকা চারপায়ের একটা বিছানায় করে বাবাকে ওরা নিয়ে যাবার পর থেকে আর কিছুই আগের মতো হচ্ছে না।

===========================================================

যে ঘটনা উপরের গল্পগুলোর কথা মনে করিয়ে দিল-


ভদ্রলোকের নামও জানতাম না। আমি থাকি ৭ তলায়, উনি ১০ তলায়। দেখা হতো লিফটে, আসা যাওয়ার পথে। কেমন আছেন, এটুকুই যোগাযোগ। সিগারেট হাতে থাকতো প্রায়ই। ওনার সিগারেট খাবার দৃশ্যটা দেখতে কেন জানি ভালো লাগতো। কিছু একটা ছিল। রাতে ফেরার সময় হাতের মুঠোভর্তি থাকতো বিস্কুট চিপস জুস কিংবা বাজার। এই ফ্ল্যাট বসতির ৬০ টি পরিবারের মধ্যে ওনাকেই আমার সবচেয়ে সপ্রতিভ মনে হতো। মনে মনে পছন্দ করতাম খুব, ভাবতাম একদিন বসে চা সিগ্রেট খাবো। কিন্তু কখনো বসা হয়নি।

ফ্ল্যাটবাড়িগুলিতে প্রত্যেকটা পরিবার আলাদা দ্বীপের বাসিন্দা যেন। সে কারণেই হয়নি। গত শুক্রবার নামাজের জন্য বেরুচ্ছি এমন সময় সাইরেন বাজিয়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স ঢুকছে গেট দিয়ে। ভাবলাম কেউ অসুস্থ হয়তো, হাসপাতালে নেবে। বেরুবার সময় সিকিউরিটিকে জিজ্ঞেস করতেই বললো, হক স্যারকে আনছে। মারা গেছেন। মনটা একটু খারাপ হলো, হক সাহেব মানে উপর তলার চশমা পড়া মাঝবয়েসী স্মার্ট ভদ্রলোক, নাকি প্যারালাইসড বুড়ো ভদ্রলোক যিনি ড্রাইভারের কাঁধে ভর দিয়ে প্রায়ই বিকেলে বেরোতেন। যেই হোক, দুঃখজনক ব্যাপারটা। মসজিদে চলে গেলাম আমি।

ফিরে আসার পর দেখি অ্যাম্বুলেন্সটা তখনো দাড়ানো। অনেক লোকজন আসছে। সবার চেহারা শোকার্ত। আমি লিফটে না গিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের দিকে গেলাম। ভাবলাম হক সাহেবকে দেখে যাই। কে তিনি চিনে যাই। অ্যাম্বুলেন্সের ছোট্ট খুপরি আয়না দিয়ে তাকাতেই বুকের ভেতর ছ্যাঁত করে উঠলো। এ তো সেই ভদ্রলোক, যাকে চেহারায় এত চিনি, কখনো নাম জানা হয়নি, সেই দিব্যি তরুণ, আমাদের বয়সী, এভাবে চলে গেলেন?? সকালে কাজের উদ্দেশে বেরিয়েছেন সুস্থ মানুষ। দুঘন্টা পরেই ফিরে এলেন লাশ হয়ে। কী নিদারুণ অনিশ্চিত মানুষের জীবন।

ভদ্রলোকের নাম মাহমুদুল হক। চিটাগাং গ্রামার স্কুলের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিক্ষক। দুটো ছোট ছোট বাচ্চা তাদের বাবাকে হারালো। কখনো দেখেছি বাচ্চাদুটোকে? হয়তো দেখেছি। কিছুক্ষণ পর ওনার স্ত্রীকে লাশের মুখটা দেখাতে নিয়ে এলো কয়েকজন ধরাধরি করে। সেই দৃশ্যটা বর্ননা করার ভাষা নেই আমার। কেবল বলতে পারি উপস্থিত সবাই সম্মিলিতভাবে চোখের জল ফেলছে। গতকাল আর আজকের মধ্যে কত যোজন যোজন পার্থক্য করে দিয়ে যায় একেকটি মৃত্যু। কতোগুলো স্বপ্নের কবর রচনা করে দিয়ে গেল এই মৃত্যুটা। মৃত্যু অনিবার্য একটা ঘটনা, তবু এরকম মৃত্যুগুলো কিছুতেই মানতে পারি না। অচেনা মানুষের জন্যও শোকে ভেসে যাই। মাহমুদুল হকের চেহারাটা আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না। যেন আজকেও বাড়ি ফেরার পথে লিফটে দেখা হবে, হাসিমুখে জিজ্ঞেস করবেন -কেমন আছেন?


Thursday, April 19, 2012

কি যেন নেই -১২

কি যেন নেই
কি যেন নেই

কি যেন নেই-১১

কি যেন নেই এই ছবিতে

কি যেন নেই-১০

কি নেই এই ছবিতে?

কি যেন নেই-৯

কি নেই?

কি যেন নেই-৮

কী নেই এখানে?

Tuesday, April 17, 2012

কি যেন নেই-৭


কি নেই এই ছবিতে?

কি যেন নেই-৬


কী যেন নেই, কী যেন নেই,
চককচে ওই জলের রূপোয়

কি যেন নেই-৫


হঠাৎ একটি গ্রামের বিকেল, কী যেন নেই এই বিকেলে।

Thursday, April 12, 2012

কি যেন নেই-৪


কি নেই এই ছবিতে?

কি যেন নেই-৩


এখানে দিনের বেলায়ও অন্ধকার ঘুটঘুট করে।
এখানে আলোতেও অন্ধকার ভর করে।
এখানে কেবলই শূন্যতা।
এখানে কি যেন নেই নেই নেই।

কি যেন নেই-২


কোন কারণ নেই।
তবু কি যেন নেই।
এই নিঃসঙ্গ চাঁদের সাথে
আর কি থাকার ছিল?
কি যেন নেই নেই নেই।

কি যেন নেই-১


কি নেই জানি না।
কিছু একটা নেই।
একসময় ছিল।
আমি কিছু খুঁজতে যাইনি
তবু গিয়ে দেখি
কখানা পায়া ভাঙ্গা বেঞ্চিতে
নিথর শূন্যতা।
কি যেন নেই
নেই নেই নেই।

Monday, April 9, 2012

মেঘ বৃষ্টি ঝালমুড়ি এবং.......

এক দুপুরের হঠাৎ মেঘ-
দুপুর হতে হতেই মেঘের বান ডাকলো আকাশে। নিঃশব্দে সমস্ত চরাচর ডুবে গেল বিবশ এক অন্ধকারে। টেবিলের উপর রাখা বই খাতা কলম সবই ঠিক আছে, কিন্তু কলম নিয়ে লিখতে গিয়ে টের পেলাম খাতাজুড়ে সেই মেঘের অন্ধকার কালি ছড়িয়ে গেছে, লিখতে পারছি না। বন্ধ জানালা দিয়ে দূরে তাকালাম। ধুসর অন্ধকার চারদিকে। মাথার উপর জ্বলতে থাকা দুটো টিউবলাইটও সেই অন্ধকার ছাড়াতে পারছে না। বই খুলে বসলাম, সেই বইয়ের অক্ষরগুলো লেপ্টে গেছে অন্ধকারে। পড়তে পারছি না। তারপরই নামলো ঝুম বৃষ্টি। আবার বাইরে তাকাই। দিগন্ত অদৃশ্য হয়ে গেছে, চারদিকে কেবলই ধোঁয়াশা। আমার দুচোখের সমস্ত আলো অর্থহীন হয়ে গেল।

এবং সন্ধ্যেবেলার ঝালমুড়ি-
সন্ধ্যার আগে বাসায় ফিরে ঝালমুড়ির আয়োজন হলো পেঁয়াজ কাচামরিচ সরিষার তেল দিয়ে। ওশিন তীব্র অভিযোগ করলো ঝালমুড়িতে চানাচুর কেন নেই। বৃষ্টিতে দোকানে যাওয়া যাবে না বলে অভিযোগ খারিজ করতে না করতেই শিহান এসে বললো ঝাল মানে ঝালমুড়ি খাবে। ওশিন আঙুলে কাঁচামরিচ ছুঁয়ে ওর জিবে ঠেকিয়ে দিতেই নি নি নি.....করে চেঁচিয়ে উঠলো শিহান। পানির সংক্ষিপ্ত প্রকাশ ছেলেটা এক অক্ষরে ভাব প্রকাশে বিশ্বাসী। ঝালমুড়ি শেষে একদফা কড়া চা। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় বসার শখটা পুরণ হলো না দেখি বৃষ্টির ছাঁটে বারান্দা জল থৈ থৈ। চা খেয়ে পত্রিকা খুলে বসেছি, অমনি শিহান কোত্থেকে বাদামের টিনটা তুলে এনে পত্রিকার উপর বসিয়ে দিল। ইশারায় বললো বাদাম ভেঙ্গে দিতে। শুরু হলো বাদামপর্ব। বাপ-বেটা বাদাম ভেঙ্গে ভেঙ্গে খেতে শুরু করলাম। দুটো বাদাম ভাঙলে একদানা ওকে দেই তিন দানা আমি খাই। বানরের পিঠাভাগ দেখে সে বুঝে ফেললো দুনিয়াতে বিচার নাই। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে সেও প্রতিযোগিতায় নেমে যায়। কিন্তু তার আঠারোটা দাঁত দিয়ে আমার বত্রিশ দাঁতের সাথে পাল্লা দিতে না পেরে আধভাঙ্গা বাদামই গিলে ফেলতে থাকে। চোখ পাকিয়ে বললাম, পাজিটা তুমি না চিবিয়ে গিলছো কেন? কিন্তু সে নির্বিকার ভঙ্গিতে পরবর্তী বাদামের জন্য হাত পাতলো। কায়দা তো ভালোই শিখেছে পৌনে তিন বছরের পোলা! আবার বাদাম ভাঙতে একটু দেরী করলেই ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেয়ে চিৎকার দেয়, 'দাদাম'!!!

অতঃপর মধ্যরাতের বৃষ্টির আদর
রাত এগারোটার দিকে রেলষ্টেশানে যেতে হবে। সুবর্ন এক্সপ্রেসে বোন ভাগ্নীরা আসছে ঢাকা থেকে। ঘর থেকে বেরিয়ে বৃষ্টির মুখোমুখি। ষ্টেশানে পৌঁছে জানলাম ট্রেন তখনো মীরেরসরাই পার হয়নি। আরো এক ঘন্টা লাগবে। লম্বা প্ল্যাটফর্মের দুই পাশে খোলা। তুমুল বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে নগর। স্টেশান রোডের হোটেলগুলোর নিয়নবাতি ঝাপসা দেখাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মে লোকজন তেমন নেই। শীত শীত আমেজ। ফুলহাতাও মানছে না ঝাপটা শীতল বাতাসে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ট্রেনের ইঞ্জিন চাপা গর্জন করছে। তার ছাদের উপর একটা সার্চলাইট জ্বলছে। সার্চলাইটের আলোয় বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা স্পষ্ট। লক্ষ লক্ষ বৃষ্টির ফোঁটা ট্রেনের ছাদের উপর ছিটকে পড়ে হাজার কোটি বিন্দুতে লাফিয়ে উঠে সার্চ লাইটের আলোয় সোনালী ঘাসের বর্ন ধারণ করেছে। যেন ট্রেনের ছাদের উপর কেউ সোনালী দুর্বাঘাসের কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছে। তখন বুকের ভেতর বেজে ওঠে, 'আমি নই আমার ভেতর অন্য কে এক কথা কয়'। এরকম সময়ে সিগারেটের তৃষ্ণা হয়। এদিক ওদিক তাকিয়েও কিছু পেলাম না। রাত সাড়ে বারোটা। তখনো ট্রেন আসেনি। পথে কোথাও আটকে আছে বৃষ্টিতে। পকেট হাতড়ে মোবাইল নিলাম। কাউকে ফোন করে ঘুম ভাঙাবো? নাম্বারগুলো একবার স্ক্রল করে ইচ্ছেটা চাপা দিলাম। যারা ঘুমোচ্ছে তারা ঘুমোক, মাঝরাতে শাপশাপান্ত শোনার মানে নেই। আরো দীর্ঘসময় পরে যখন ট্রেনের বাঁশী শোনা গেল তখন যেন গডোর প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো। আর আমি ততক্ষনে সিক্ত বৃষ্টির আদরে। ফেরার পথে গুনগুন করি-
বৃষ্টি হচ্ছে আমার শহরে।
বৃষ্টি হচ্ছে তোমার নগরে।
বৃষ্টি হচ্ছে বুকের ভেতরে,
অঝোরে অঝোরে।

Saturday, April 7, 2012

এই চৈত্রে

অনেকদিন পর একটা নিটোল ছুটির দিন। নটায় ঘুম থেকে জেগে দেখি আকাশের মুখ ভার। সূর্য ওঠেনি আজ। এটা আমার জন্য সুখবর। দেরীতে ঘুম ভাঙ্গলে যদি দেখি সূর্য অনেক বেলা হয়ে যাবার ঘোষণা দিচ্ছে, মেজাজ অযৌক্তিকভাবেই খারাপ হয়ে যায়। কখন কি কারণে মেজাজ খারাপ হবে আজকাল তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। বুড়ো হয়ে যাবার লক্ষণ কিনা। এর জন্য খেসারতও কম দিতে হয় না। দিনযাপনের জন্য আরো অনেক বেশী স্থৈর্য ধৈর্য দরকার। আমার কোনটাই নেই। সূর্যের চেহারা দেখা না যাওয়া তাই আমার মেজাজের অনুকুল খবর। আমি চাই প্রতিদিন আমি এরকম ভোর দেখি। আমি উঠে গেছি কিন্তু সূর্য ওঠেনি। সূর্য আমার কাছে হেরে গেছে ভাবতে ভালো লাগে। তা বলে এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে আমি জীবনের সবখানে জিততে চাই। যা জেতার আমি এমনিতেই জিতি, না চাইতে পেয়ে যাওয়ার নজীর অনেক আমার। চেয়ে না পাওয়ার নজীর যে নেই তা বলবো না। কিন্তু সত্যি বলতে কি আমি বুঝ হবার পর থেকে কারো কাছ থেকে কিছুই চাইনি। শুধু একবার গোলাপের জন্য পাগলামি করেছিলাম। কিছুতেই গোলাপ ফোটাতে পারছিলাম না বাগানে। এক বন্ধুর বাগানে চমৎকার সব বহুবর্নের গোলাপের সমাহার দেখে এতটা মুগ্ধতা ভর করেছিল যে ইচ্ছে করছিল নিজেও একটা গোলাপ গাছে ফুল ফোটাই। কিন্তু একের পর এক গোলাপ চারা কিনেই গিয়েছি ফুল তাতে ফোটেনা। গোলাপ কাঁটায় ছেয়ে যায় বাগান। বুঝে যাই গোলাপ ফোটানো আমার কর্ম নয়। জেদ করে কখনো ফুল ফোটানো যায় না। হাল ছেড়ে দিলাম। কিন্তু কি হয়, হাল ছেড়ে দিলাম বলার এক সপ্তাহের মধ্যে সেই কাটাঝোপে নতুন জাতের গোলাপ ফুটতে শুরু করে। একেকটা তোড়ায় দশ পনেরোটা করে ছোট ছোট গোলাপ। এই গোলাপ আমি জন্মেও দেখিনি। কেউ কেউ বললো এটা আগাছা গোলাপ, কেউ বললো লতা গোলাপ। আমি বুঝলাম ফুল না আগাছাই আমার উপহার। সেই আমার গোলাপের স্বপ্নের ইতি ঘটালো। এরপর তো বাগানের স্বপ্নই মরে গেল। আমার এরকম হয়। কখনো কখনো কোন স্বপ্নকে আমি পাগলের মতো তাড়া করি। সেটা গান হোক, মুভি হোক, বই হোক, যেটার পেছনে লাগি সেটার সাথেই সেঁটে থাকি। বাকী সবকিছু ভুলে যাই। এটাকে নেশা বা আসক্তি বলে। আসলেই কি আসক্তি? আসক্তি তো কয়েকদিনের ব্যাপার। বছরের পর বছর কোন আসক্তি টিকে থাকে? গোলাপের জন্য আমার প্রেম মরে গেছে, কিন্তু হিমালয় দেখার জন্য স্বপ্নটা মরেনি। বহুবছর ধরে ওটা জেগে ছিল। আমার পরের গাড়ির যাত্রীরাও যখন হিমালয় থেকে ঘুরে আসছিল তখন আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি বেরুতে পারছিলাম না। পারছিলাম না শৃংখল মুক্ত হতে। একদিন বিদ্রোহী হয়ে চড়ে বসলাম হাওয়াই জাহাজে। প্রিয় স্বপ্নের নদীকে বুকে নিয়ে উড়াল দিলাম ভূটান। দেখা হলো হিমালয়। অপূর্ব সেই অনুভুতি। এই প্রথম একটা স্বপ্নকে প্রায় গায়ের জোরে সফল করেছি। ভুল করেছিলাম কি খুব?

একটা সময় চলে এসেছিল আমি হারতে ভুলে গেছিলাম। আমি শুধু জিতেই চলেছি। জিততে জিততে কোন অহংকার কি ভর করেছিল? না। অহংকার হয়নি, তবে আত্মবিশ্বাসের পালে জোর হাওয়া ছিল। আমি চাইলে বহুদূর যেতে পারি। তবু থেমে গেলাম একটা জায়গায়। থামলাম এবং বিজয় রথকেও থামালাম। একদিন হারলাম। মাঝে মাঝে হারতে হয়, হারাতে হয়। তবেই না জেতার সুখ। আমি হারলে যদি আর কেউ জেতে তবে ক্ষতি কি, জিতুক। মাঝে মাঝে তাই ঠকাও ভালো। আমি ঠকলে যদি কেউ আনন্দ পায় পাক। জগতে আনন্দের কতো সংকট। আমাকে ঠকতে দেখে যদি কেউ আনন্দে কিছু সময় পার করে আমার তেমন ক্ষতি কি। আমি সেদিন হারতে ভালোবাসলাম। হারাতেও।

ছুটির দিনটা অপূর্ব ছিল। বৃষ্টির ঘ্রান নিয়ে কেটেছে সারাবেলা। কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে, কোথাও ঝরছে জল অবিরল, চোখ বন্ধ করে দেখতে পেলাম সেই দৃশ্য। ছুটির দিনের সেই শীতলতার রেশ আজ সকালেও। সকাল থেকে মেঘ জমতে জমতে দুপুর অবধি কালো আকাশ অন্ধকার ছুড়ে দিয়েছে পৃথিবীতে। সেই অন্ধকার মাথায় নিয়ে খেতে বসলাম। খাওয়া অর্ধেক যেতেই আকাশ কাপিয়ে নামলো বৃষ্টি ধারা। অঝোর ধারায় বৃষ্টি আর বাতাস। এসো হে বৈশাখ এসো এসো.........ধেয়ে এলো কালবৈশাখী। এই বৈশাখেই হয়েছিল আমার সর্বনাশ। সেই থেকে বৈশাখ আর আমার প্রিয় নয়। তবু আজকের অন্ধকার, বৃষ্টিময় দুপুর আমার ভীষণ ভালো লাগলো। এরকম দুপুরগুলোয় একাকীত্বের রোমান্টিকতায় হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। যদিও আমি একা নই, যদিও আমার না বলা কোন কথা নেই আর, তবু পেছনের দিনগুলোতে ফিরে গিয়ে গাইতে ইচ্ছে করে, "এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়............" । তারে সব কথা বলা হয়ে গেছে, তারে সব ভালোবাসা দেয়া হয়ে গেছে। তার সাথে সমস্ত লেনদেনের হয়েছে অবসান। তবু কেবলি পেছনে ফিরে যায় মন। যদি আগের দিনগুলো আবারো ফিরে পেয়ে ঘুরে আসা যেতো। কি হতো? কিছু মানুষ কেবলই অতীতমুখী হয় বোধহয়। অতীতেই যেন সব সৌন্দর্য রোমান্টিকতা নস্টালজিকতার আসর। এই শতকের চেয়ে গত শতক আরো, তার আগের উনিশ শতক আরো রোমান্টিক। এরকম বিচিত্র ধারার মানুষ আমি নিজেও। গাল গল্পের মাধ্যমেও উনিশ শতকে ঢুকে বসে থাকতে পছন্দ করি। বর্তমান থেকে পালিয়ে থাকার জন্য একসময় অতীতে ডুবে থাকতাম। এখন বর্তমানকে ভালোবেসেও অতীতের প্রতি মোহ একবিন্দুও কমেনি। অতীতে অনেক হেরে যাবার গল্প থাকা সত্ত্বেও। অনেকদিন পর সেদিন হারলাম আবারো। তবে জীবনে এই প্রথমবার হেরে গিয়েও চরম আনন্দ পেয়েছি। আমার এই হার কাউকে খুব আনন্দিত করেছে। আমি তাই চেয়েছিলাম।

কালবোশেখির ঝড় আর বৃষ্টি থেমেছে অনেক্ষণ। এখনো বাতাসে ছড়ানো বর্ষার আমেজ।
এই বরষাদিনে কাউকে বলার কিছু নেই। কোন কথা নেই। কোথাও কেউ নেই।

Wednesday, April 4, 2012

অবিশ্বাস

বাড়িটা ওদের হলেও বারান্দাটা ছিল আমাদের। আমাদের হলেও এটা প্রায় সরকারী বারান্দা। বারান্দার একপাশ দিয়ে ছাদে যাতায়াত, ওদের আমাদের সবার। ছাদে যাবার কালে এখানে যে কেউ তিষ্টোতে পারে ক্ষণকাল।
বাড়িটা দোতলা, ওরা নীচতলায়, আমরা দোতলায়।  এ বাসায় এসেছি মাত্র দুমাস।
 
নতুন বাসায় ওঠার পরদিন ভুল দড়িতে কাপড় শুকোনোর অপরাধে আমার শার্টটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল যে বালিকাটি, তার নাম মিলা। ওরা বাড়ি ভাড়া দিয়েছে দড়ি নয়। আমি তখন ইন্টারে, মিলা ক্লাস টেনে।
বাড়িঅলাদুহিতার এহেন আপ্যায়নে মুগ্ধ হতে পারিনি বলে ওদের ছাদে রাখা একটা গাঁদা ফুলের টব লবন পানির আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয় সেই রাতে। আর কোন অগ্রগতি হয় নি তারপর।

কিছুদিন পর থেকে মেঘ চেহারায় মিলি এসে দাঁড়িয়ে থাকে সামনের বারান্দায়। ওর দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা স্পষ্টতই অপেক্ষার হলেও মেঘটা বৈশাখী না আষাঢ়ী সাহসের অভাবে খেয়াল করা হয় না। মনে মনে ভাবি সেদিনের সে ঘটনায় মেয়েটা অনুতপ্ত বুঝি। তবু ভয়ে সংকোচে কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে বাইরে চলে যাই। কিছুপর সেও নেমে যায়। নিয়মিত এই দৃশ্যে আকর্ষিত হয় কিছু পাড়া প্রতিবেশী বন্ধুর দৃষ্টি। সন্দেহের দৃষ্টি আমার দিকে। যে যাই বলুক আমি কিন্তু রোমাঞ্চিতই। রাগের পরই আসে অনুরাগ।

আমার ঘরটা বারান্দার লাগোয়া। একদিন কলেজে যাইনি। ঘরে বসে পড়ছি। দুপুরে বারান্দায় কয়েকটা খিলখিল হাসির সাথে মিলার কন্ঠ -

-কেউ দেখবে না তো?
-দেখবে না
-তুই চারপাশে খেয়াল রাখ, আমি গাছে উঠি
-ঠিকাছে
-এ...মা, এগুলো তো শক্ত কাঁচা রে, পুরা কষ কষ
-হোক কষ, তবু ছিড়ে নে
-আরে খাওয়া যাচ্ছে না তো, থু
-থু থু করিস না, তাড়াতাড়ি ছিড়ে নে, হাতের নাগালে সবগুলো....
-এতগুলো কাঁচা পেয়ারা নিয়ে কি করবি
-নালায় ফেলবো
-নালায় ফেলবি কেন?
-তো কি করবো, এখানে সাজিয়ে রেখে দেবো?
-রেখে না দিলে পাকবে কি করে?
-পাকার দরকার নাই
-কেন?
-পাকতে দিলে হারামীটার দাঁতের নীচে পড়ে যাবে সবগুলো
-কোন হারামী?
-আবার কার, এ বাসার বাঁদরমুখোটার?
-তোদের ভাড়াটে ছেলেটা?
-আবার কে? ব্যাটা তক্কে তক্কে থাকে কখন পেড়ে নেবে সবগুলো পেয়ারা। আমিও কম যাই না। প্রতিদিন এসে পাহারা বসাই বারান্দায়।
-বলিস কি, তুই এই বারান্দায় এসে দাড়িয়ে থাকিস প্রতিদিন??
-তাতে কি? বাড়ি তো আমাদেরই, বারান্দাও। পাহারা না দিলে পাতাসহ খেয়ে ফেলবে হারামীটা।
 
জমে যায় আমার বুক হাত পা মগজ। বিষম খাওয়ার সংজ্ঞাটা মর্মে মর্মে জানা হয়ে যায় সেদিন।