Wednesday, October 26, 2011

হিমালয় দর্শন - ৩য় দিন

উগেন আমাদের নামিয়ে দিয়ে গেল ক্লক টাওয়ারের সামনে। হোটেলে ঢুকতে ইচ্ছে হলো না এত তাড়তাড়ি। শেষ বিকেলের থিম্ফু। ফুটপাত ব্যস্ত। মানুষ দেখতে লাগলাম হাঁটতে হাঁটতে। এই সময়ে ফুটপাতটা দিনের সবচেয়ে ব্যস্ত। তবু ঢাকার যে কোন ফুটপাতের চেয়ে কম ভীড়। বাড়ি ফিরছে লোকজন কাজ সেরে। বাচ্চারা স্কুল থেকে ফিরছে। আধুনিক আর ট্রাডিশানল দুরকম পোষাকের ছড়াছড়ি রাস্তায়। মানুষ, দোকান, রাস্তা ইত্যাদি দেখতে দেখতে ভুটানী মানস আবিষ্কারের চেষ্টায় থাকি। ভুটানের আসল সংস্কৃতি কি? সরকার চায় মানুষ ঐতিহ্যকে ধরে রাখুক। মানুষ চায় আধুনিক ফ্যাশান। দোকানপাট দেখে তাই মনে হলো। এখানে কোথাও কি একটা সুক্ষ্ণ দ্বন্দ্ব আছে? সত্যি কি ভুটানীরা সব সুখী মানুষ? আমি পরিসংখ্যানের মিথ্যা দেখে অভ্যস্ত। তাই মানুষের সাথে কথা বলে, চেহারা দেখে আবিষ্কার করার চেষ্টা করি লুকোনো কোন দুঃখ বঞ্চনা। কিন্তু সহজ সরল হলেও খুব চাপা ওরা। বোঝা গেল না।



হাঁটাহাটিতে হাটু ব্যাথা করা শুরু করতে হোটেলে ফিরলাম। রুমে গিয়ে পোষাকআশাক বদলে, শাওয়ার নিয়ে কিছুক্ষণ পর তেতলার রেষ্টুরেন্টে নেমে এলাম। হালকা পানীয়ের তেষ্টা পেল আমার সঙ্গীর। একটা টেবিল দখল দিয়ে বসে অর্ডার দিলাম। হঠাৎ রেষ্টুরেন্টের ওই পাশ থেকে একটা বাংলা কন্ঠ বলে উঠলো 'দাদারা বাঙ্গালী মনে হচ্ছে!' তাকিয়ে দেখলাম কন্ঠের মালিক আমাদের লক্ষ্য করেই বাক্যটা নিক্ষেপ করেছেন। আমার সঙ্গী রিজওয়ান ভাই পাল্টা বাক্য ছুড়লেন, 'বাঙালী আর থাকতে পারলাম কই, কাঁটাতার দিয়ে আমাদের তো বাংলাদেশী বানিয়ে দিলেন।' সেই শুরু। খোঁচাখুচি বাক্য বিতন্ডার পাঁচ মিনিটের মাথায় কৃষানু ব্যানার্জি আর অনিন্দ্য চ্যাটার্জী আমাদের টেবিলে এসে যোগ দিলেন। শুরু হলো জমাট আড্ডার এক আসর। রাজনীতি, অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, মাছের বাজার, জীবনযাত্রা সকল বিষয় নিয়ে প্রায় তিনঘন্টা ব্যাপী আড্ডা। রাত এগারোটায় নেহাত বাধ্য হয়ে ইস্তফা দিলাম আমরা। পরদিন আমাদের পারো ফিরে যাবার কথা। পারোতে হোটেল বুকিং দেয়ার জন্য ট্যুর অপারেটরকে খুব পীড়াপিড়ি করছিলাম সন্ধ্যার সময়ও। কিন্তু এই আড্ডার শেষে রিজওয়ান ভাই কাউন্টারে গিয়ে বললেন, কালকে পারো যাচ্ছি না আমরা। এখানেই থাকছি আরো একদিন।

পরদিন সাড়ে সাতটায় ডাইনিং এ হাজিরা দিলাম। দোচুলা যাবো আজকে। ড্রাইভার বলে রেখেছে সাড়ে সাতটায় তৈরী হয়ে থাকতে। দেরী হলে হিমালয় দেখা যাবে না। বেলা বাড়তে বাড়তে মেঘ এসে ঢেকে দেবে। আমরা জানি রোদ উঠলে কুয়াশা মেঘ সরে দিন আরো স্পষ্ট হয়, কিন্তু এই লোক বলে উল্টা। ব্যাপার কি। তবু তার কথামতো সাড়ে সাতটায় ডাইনিং রুমে গিয়ে দেখি এখনো কেউ জাগেনি। ওদের রেস্তোঁরা কিচেন খোলে আটটার পর। আমরা আগের রাতে বলে রাখাতে হোটেল মালিক মালিক দীপক গুরুং নিজে এসে আমাদের জন্য টোস্ট জেলী অমলেট কফি ইত্যাদি বানিয়ে দিলো। আমাদের দেশে এরকম সার্ভিস কষ্ট কল্পনা। খেতে খেতে দেখি উগেন এসে গেছে। মুখে সারল্যমাখানো হাসি। এত নিরীহ গোবেচারা লোকের বন্ধু হতে পারে কোন ইমিগ্রেশান অফিসার ভাবতেও কেমন লাগে।

নীচে নেমে দেখি গাড়ীর সামনের সীটে ভুটানী পোষাক পরা একজন বসা। উগেন জানালো এই সেই বন্ধু, সেও আমাদের সাথে দোচুলা চেকপোষ্ট পর্যন্ত যাবে, ওখানেই তার ডিউটি। আমাদের গেট পার করে দেবে নিজ দায়িত্বে। চমৎকার একটা ভ্রমন। রাস্তা শহর ছেড়ে অরণ্যের দিকে চললো। যেদিকে তাকাই সবুজে সবুজ পাইনের অরণ্য। কিছু পর পর আপেল বাগান। আপেলের সিজন শেষ। কেবল গাছগুলো ঝাকড়া পাতা মাথায় নিয়ে দাড়িয়ে। পথে যেতে ইমিগ্রেশান অফিসার কেমবোর সাথে আলাপ জমে গেল। ভালো ইংরেজী পারে কেমবো। ভুটানের সংস্কৃতি, রাজনীতি, জীবনযাত্রা, ভারত নেপালের সাথে সম্পর্ক, বাংলাদেশের সাথে ভুটানের বন্ধুতা, ইত্যাদি নিয়ে নানান আলাপ। নেপালী শরনার্থী সমস্যা কিভাবে সৃষ্টি হলো, এটা নিয়ে কৌতুহল ছিল আমার, পঠিত জ্ঞানের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ জ্ঞানও লাভ হলো।

বেশ কিছুদুর যাবার পর যেখানে লোকালয়ের কোন চিহ্ন নেই, কিছু জায়গা দেখে মনে হচ্ছিল কাপ্তাইয়ের মতো। কাপ্তাই শিলছড়ি বাজার ফেলে সামনের দিকে গেলে পাহাড়ের রং কেমন নীলাভ হয়ে যায়। সকালের দৃশ্যটার সাথে খুব মিল। তবে এখানকার পাহাড়গুলো অনেক বেশী উঁচু। আমাদের কর্নফুলী অনেক বেশী গভীর পাশের নদীটা থেকে। চেকপোষ্টে আমাদের পাসপোর্ট জমা নিয়ে ছেড়ে দিল কেমবো। বললো, যাবার পথে পাসপোর্ট ফেরত নিয়ে যেতে।

গাড়ি চলছে মসৃন গতিতে। উগেনের দক্ষতার প্রতি বিশ্বাস রেখে কখন যে ঘুম চলে এসেছে। জেগে দেখি গাড়িটা একটা সমতল চাতালের মতো জায়গায় এসে দাড়িয়েছে। সামনে আরো কটা গাড়ি দাড়ানো। উগেনকে বললাম, ব্যাপার কি, সমতলে নেমে আসছো নাকি। উগেন ইশারা দিয়ে সামনের দিকে তাকাতে বললো। আরে? ওদিকে তো আর কিছু নাই। ধূধূ শূণ্যতা শেষে দিগন্ত দেখা যাচ্ছে মেঘের আভাস। সেই মেঘের উপর দিয়ে তিনকোন একটা বরফের টুকরো উঁকি দিয়ে আছে। গাড়ি থেকে নেমে ক্যামেরার গুল্লি চালানো শুরু করলাম। সুপার ডুপার জুম দিয়ে যতদুর কাছে আনা যায় ওই তিনকোনাকে। অদ্ভুত সুন্দর প্রকৃতি এখানে। গত দুদিনের দেখা ভুটানের চেয়ে এই দৃশ্যটার পার্থক্য অনেক। যেখানে দাড়িয়ে আছি ওটা দশহাজার ফুট উচু। সামনের পাহাড়গুলোকে অনেক নীচু মনে হচ্ছে। মেঘ জমে আছে পাহাড়গুলোর উপর। আমরা সেই মেঘেরও উপরে এখন। আর আমাদের অনেক উঁচুতে ওই হিমালয়ের চুড়া।

...............আর এইখানে আসিয়া আমি বাক হারাইলাম।



..................
..................

..................
..................



..................
..................



..................
..................

Saturday, October 22, 2011

হিমালয় দর্শন- দ্বিতীয় দিন

শেষরাতের দিকে ঘুম ভেঙ্গে গেল। বাইরে কোথাও একদল কুকুর বিকট গলায় ঝগড়া করছে। এই শহরে এত কুকুর কোত্থেকে এলো। রাতে যখন বেরিয়েছিলাম তখন নেকড়ে চেহারার কুকুর দেখেছিলাম। এদেশের কুকুর মানুষের চেয়েও স্বাস্থ্যবান। অ্যালসেশিয়ানের মতো লেজটা মোটা। দেখে বলছিলাম মনে হয় চেঙ্গিজ খানের কুত্তা।

গলা শুকিয়ে কাঠ। বেডসাইড টেবিলে পানির বোতল আছে। ঢকঢক করে খেলাম বরফ গলা জল। এখনাকার পানি মাত্রেই বরফ গলা বোধহয়। বুক থেকে তলপেট পর্যন্ত আগুন জ্বলছে। রাতের ঝাল খাওয়ার পরিণতি। ঘড়ি দেখলাম সাড়ে তিনটা। রাত এত দীর্ঘ কেন এখানে। লেপ কম্বল চাদর এই তিনস্তরের নীচের উষ্ণতায় ঘুমোচ্ছিলাম, পায়ের দিকে হিটারও জ্বলছে। তবু রুমে শীতল আবহাওয়া। রাতের থিম্ফু অতীব শীতল। পেটের জ্বলুনিতে ঘুম আসছিল না। রিমোট নিয়ে টিভিটা ছাড়লাম। শুয়ে শুয়ে একের পর এক চ্যানেল ঘোরাচ্ছি। কোন চ্যানেলই পছন্দ হচ্ছে না। প্রায় সবগুলো চ্যানেল ভারতীয়। ভুটানী চ্যানেল দুতিনটা আছে, সব ঘুমাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে টিভি বন্ধ করলাম। মটকা মেরে শুয়ে থাকলাম। এলোমেলো ভাবনায় মাথার ভেতর জিলিপির প্যাচ লেগে গেলো।

ঘুম আসে আসে না করতে করতে ঘন্টা দুই তিন কেটে গেল। তারপর জানালা দিয়ে সরু আলোর রেখা দেখা যেতে শুরু করলে বিছানায় উঠে বসলাম। আরেক দফা পানি খেলাম। জানালার পাশে গিয়ে পর্দা সরিয়ে বাইরে উঁকি দিলাম। রাস্তার ওপাশে আরেকটা হোটেল, তার পেছনে দেখা যাচ্ছে গতরাতের রহস্যময় আলো আধারী পর্বতটা এখন সবুজ পাইনে ছাওয়া। কিন্তু ওকি? পাহাড়ের মাথাটা মেঘের আড়ালে কেন? এত নীচে মেঘ নেমে আসে শহরে? তখন মনে পড়লো থিম্ফু শহরটিই তো সাত হাজার ফুট উপরে। আর সামনের ওই পর্বতের উচ্চতা হাজার পাঁচেকের কম হবে না। সুতরাং মেঘেরা এখানে এসে ঠায় দাড়িয়ে থাকবে তাতে অবাক হবার কি।

দেরী না করে জ্যাকেট প্যান্ট পরে, কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম হোটেল থেকে। তখনো থিম্ফু শহরের অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে। কেবল রাস্তার ঝাড়ুদার, কয়েকটা কুকুর আর দুয়েকজন পথচারীকে এদিক যেদিক যেতে দেখা যাচ্ছে। হাটতে হাটতে ক্লকটাওয়ারের সামনে আসলাম। দারুন আরেকটা দৃশ্য এত ভোরে শত শত কবুতর কি করছে এখানে? আমাদের শহরে কাক বাদে কিছু দেখার কথা ভাবা যায় না এই সময়ে। ক্যামেরায় ক্লিক করতে করতে হাটছি। সামনের পাহাড়ে মেঘগুলো এখনো অন্ধকার করে রেখেছে।

কিন্তু ক্লক টাওয়ারের দিক থেকে বায়ে ঘুরতেই ভিন্ন একটা দৃশ্য। ওদিকে যে রাস্তাটা দিগন্তে মিলিয়ে গেছে সেদিকে আরেকটা পর্বত আছে। ওই পর্বতের চেহারা আর সামনের পর্বতের চেহারায় কোন মিল নেই। ওদিকে পরিষ্কার ঝলমলে রোদ হাসছে। পেছনে ফিরলাম, ওদিকের পর্বতেও কুয়াশা, ঝাপসা দেখাচ্ছে। আমাদের হোটেলের পেছন দিকে যে পাহাড়, ওদিকেও দেখি রোদের হাসি। খুব মজা লাগলো। থিম্ফু উপত্যকার একটা পয়েন্ট থেকেই চার রকমের দৃশ্য। এটাই এখানকার স্বাভাবিক দৃশ্য। বারো চোদ্দ হাজার ফুট উচু পর্বত বেয়ে সূর্যকে দেখা দিতে বেশ সময় লাগে, তাই এরকম ভিন্ন ভিন্ন চেহারা একেক পর্বতের।

ঘন্টা খানেক ঘুরে ফিরে হোটেলে ফিরলাম। তারপর গোসল নাস্তা ইত্যাদি সারতে সারতে উগেন এসে হাজির। বললো আজকে থিম্ফুর আশপাশ চষা হবে, তারপর কালকে দোচুলা পুনাখা ওয়াংডি। তবে এখন ইমিগ্রেশান অফিসে যেতে হবে পারমিশানের জন্য। ভুটানে কিছু জায়গায় যেতে সরকারের অনুমতি লাগে। ট্যুর অপারেটর সেই অনুমতিগুলো নিয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের গাইড ভেতর থেকে ঘুরে এসে দুঃসংবাদ দিল। দোচুলা পুনাখা যাবার অনুমতি দিচ্ছে না সরকার। কারণ আগামী পরশু রাজার বিয়ে পুনাখায়। হ্যাঁ ভুটানের নতুন রাজা ৩১ বছর বয়সী জিগমে নামগিল বিয়ে করছে। সারা শহরে রাজা রানীর ছবিতে ছেয়ে আছে। সেই বিয়ে উপলক্ষে ট্যুরিষ্ট মুভমেন্ট সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত।

আমি হতাশায় মুষড়ে পড়লাম। আসার আগে সবাইকে বলে এসেছিলাম রাজার বিয়ে খেতে যাচ্ছি। ভেবেছিলাম অন্তত বিয়ের ঐতিহাসিক জায়গাটা ঘুরে আসবো। হলো না। পুনাখা যাবার রাস্তায়ই পড়ে দোচুলা পাস। যেখান থেকে পূর্ব হিমালয় রেঞ্জের বিরাট একটা অংশ দেখা যায় খালি চোখেই। সব ভেস্তে গেল। উগেনের চেহারাও বিমর্ষ। সে কাকে যেন ফোন করলো। খানিক পর এসে বললো, পুনাখা তো যেতে পারবা না, কিন্তু দোচুলা যাবার একটা ব্যবস্থা হয়েছে। অনুমতি ছাড়াই যাওয়া যাবে। উগেনের এক দোস্ত আছে ইমিগ্রেশানে যার ডিউটি দোচুলা যাবার চেকপোষ্টে। তার সেই বন্ধুটা আমাদেরকে দোচুলার চেকপোষ্ট পার করে দেবে। আপাতত সেই ব্যবস্থাতেই আমরা খুশী।

এখন শহর দেখার পালা। প্রথমে গেলাম একটা প্রাচীন মনেস্টারিতে। সিড়ি বেয়ে উঠতে হয় মন্দিরে। উঠে দেখি জরাজীর্ন প্রাচীন এক দালান। তার ভেতরে অনেকগুলো প্রেয়ারহুইল। নানান বয়সী মানুষেরা প্রেয়ারহুইল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এগোচ্ছে। ভেতরের একাংশে মাজারের মতো লাগলো। ওখানে জুতো খুলে ঢুকতে হয়। শতবর্ষী ভুটানী কয়েকজন নারীকে দেখলাম জপমালা হাতে বিড়বিড় করছে। আমি কিছু ছবি তুলে নেমে এলাম।

এরপর চললাম বিবিএস টাওয়ারের দিকে। ভুটানের টিভি টাওয়ার। এখানে সবগুলো রাস্তাই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বানানো। অতীব সুন্দর। খুব বেশী খাড়াই না। ৮০০ সিসির গাড়িও স্বচ্ছন্দে উঠে যায়। এখান থেকে থিম্ফু উপত্যকা আর শহরের সমস্তটা চমৎকার দেখা যায়। এখানে উঠার সময় শরীর থেকে গরম পোষাক খুলে ফেলতে হলো। রোদটা তেতে উঠছিল ক্রমশঃ। টাওয়ারের কাছাকাছি গিয়ে থেমে যেতে হলো। নেমে গেলাম গাড়ি থেকে। বাহ অপূর্ব এক দৃশ্য। যেদিকে তাকাই সবুজ আর নীলচে সবুজ পর্বতমালা। তার মধ্যখানে ছিমছাম গোছানো একটা শহর। যে শহরে কোন সমতল জায়গা নেই। তবু উপর থেকে দেখে মনে হচ্ছে সবগুলো বাড়ি একই সমতলে। আরো দূরে নদী। এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে উচ্ছল ঝরনার গতিতে বয়ে যাচ্ছে থিম্ফু উপত্যকার মাঝ দিয়ে। যেদিকে তাকাই অপরূপ রূপের পসরা।

হালকা কুয়াশার কারণে শহরের ছবিগুলো তেমন ভালো আসলো না। এরপর উগেন আমাদের নিয়ে গেল, পেইন্টিং স্কুলে। ভুটানের ঐতিহ্যবাহী চিত্রকর্মের শিক্ষা দেয়া হয় এখানে। পেইন্টিং কিনতে গিয়ে দাম শুনে ভিরমি খেলাম। আমেরিকা অস্ট্রেলীয় ট্যুরিষ্টরা কিনছে দেদারসে। আমি ক্যামেরায় তুলে নিলাম কয়েকটা চিত্রকর্ম। তারপর গেলাম ন্যাশনাল লাইব্রেরী। বহুপুরোনো বইপত্রের মিউজিয়াম বলা যায়। কিন্তু বইপত্রের প্রতি আগ্রহ কমে গেছে বলে ওখানে বেশীক্ষণ কাটালাম না। উগেন অবাক হলো, শিক্ষিত মানুষেরা তো এই জায়গায় সময় কাটাতে পছন্দ করে। ওকে নিরাশ করে বললাম, আমাদের শিক্ষাদীক্ষা নিতান্তই কম, আগ্রহও নেই বেশী কিছু শেখার। শেখার চেয়ে পাহাড় নদী ঘুরতেই পছন্দ বেশী আমাদের।

তারপর আমাদের নিয়ে গেল হেরিটেজ মিউজিয়াম বলে একটা জায়গায়। যেখানে ভুটানের আদিম জনপদের ব্যবহার্য সকল বস্তু রাখা আছে। কৃষি, শিকার, রান্না, শৈত্য দূরীকরণ, মদ্য সংরক্ষণ, ইত্যকার সকল প্রকার সরঞ্জাম আদিম অবস্থায় রেখে দেয়া হয়েছে একটা মাটির প্রাচীন ঘরে। সেই ঘরটিতে প্রবেশের আগে ক্যামেরা অফ করতে হলো। ছবি তোলা নিষেধ। মাটির তৈরী একটা ঘরে ঢুকলাম, পাশে মিউজিয়ামের পেশাদার গাইড বিড়বিড় করে মুখস্ত বলে যাচ্ছে একেকটি জিনিসের ব্যবহার ইত্যাদি। তার মুখ নড়া দেখে বুঝতে পারছি বেচারা সকাল থেকে এই মুখস্ত বিদ্যা ঝাড়তে ঝাড়তে ক্লান্ত। আমরা তাড়াতাড়ি দেখে বিদেয় হলেই বাঁচে। তাকে মুক্তি দেবার জন্য আমরা ঐতিহাসিক বস্তুসমূহের দিকে হালকা দৃষ্টি নিয়েই এঘর থেকে ওঘরে চলে যাচ্ছি। এই ঘরে ঢুকে প্রথমেই মনে হতে পারে এটি একটা গরুর ঘর। অন্ধকার করে রাখা হয়েছে ইচ্ছে করেই। গা ছম ছম নীরবতা। আসলেই ভেতরের একটা ঘরে গরুদের জন্য জায়গা আছে। যেখানে শীতকালে গরুদের জন্য উষ্ণতার ব্যবস্থা করা আছে। আমরা হেরিটেজ মিউজিয়াম দেখে কিছুটা ক্লান্ত। খিদে পেয়ে গেছে। ড্রাইভারকে বললাম, আর না, হোটেলে চল। খেয়ে আবার বেরুবো।

হোটেলে একটার সময়ই লাঞ্চ তৈরী করে বসে আছে। আমরা খেয়ে উঠে ভাবলাম একটু গড়িয়ে নেই। তারপর বেরুবো। দুপুরের পর প্রোগ্রাম হলো থিম্ফুর একটা পাহাড়ে নির্মানাধীন বুদ্ধমুর্তি পরিদর্শন। কিন্তু গড়িয়ে নিতে গিয়ে আমার ঘুম পেয়ে গেল। জেগে দেখি প্রায় তিনটা বাজে। তাড়াতাড়ি রেডী হয়ে নীচে নামলাম। উগেন গাড়ি নিয়ে দাড়িয়ে আছে, মৃদু হাসি মুখে। ভুটানীদের কখনো গোমড়ামুখো দেখিনি। রাস্তাঘাটে সব সুখী মানুষের চেহারা যেন। পেটের মধ্যে দুঃখ লুকোনো থাকলে অবশ্য আমার জানার কথা না। কিন্তু বাইরের খোলসটা হাসিখুশী। এই যে উগেন, আমাদের ড্রাইভার। ওকে প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল ভুটানী চাষা। কিন্তু সুখী চেহারা। কিছুতে না করে না। যখন যাই বলি, বলে হ্যাঁ। যদি বলি, উগেন পাহাড় খুব সুন্দর, তাই না? সে বলবে, হ্যাঁ। যদি বলি, নদী খুব সুন্দর। সে বলবে হ্যাঁ। যদি বলি পূবে যাওয়া ভালো হবে না, সে বলবে, ভালো হবে না। যদি বলি উত্তরে যাওয়াও ঠিক হবে না। সে বলবে, ঠিক হবে না। মানে তার সব কিছুতেই সায় আছে।

সে আমাদের আগেই বলেছিল থিম্ফুর গর্ব বুদ্ধমুর্তি দেখাতে নিয়ে যাবে। আমি গাড়িতে উঠে বললাম, উগেন, আজকে বুদ্ধমুর্তি দেখতে যাওয়া ঠিক হবে না। দেরী হয়ে গেছে। সে সায় দিয়ে বললো, জী হ্যাঁ দের হো গেয়ি। আমাদের বরং নদীর কাছে গিয়ে হাওয়া খেয়ে বিকেলটা পার করা উচিত। সে বললো, ঠিক হ্যায়।

আমি হিন্দি পারি না। আমার সঙ্গী পারে। আমি বাংলায় বলি আমার সঙ্গী হিন্দিতে বুঝিয়ে দেয় উগেনকে। ভুটানীরা হিন্দি ভালো বোঝে।

উগেনকে বললাম, চলো রাজার বাড়ি যাবো।

উগেন এই প্রথম বললো, নেহি।

ভুটানীরা রাজার বাড়ির দিকে তাকানোও বেয়াদবী মনে করে। এত ভক্তি শ্রদ্ধা রাজপরিবারের প্রতি।

আমি তারপর বললাম, বাড়ি না যাই, বাড়ির গেট থেকে ছবি তুলবো, তুমি কেবল গাড়িটা এক মিনিটের জন্য দাড় করাবা।

উগেন দ্বিতীয় বারের মতো বললো, নেহি।

আমি বুঝলাম কাজ হবে না। রাজার বিয়ে অথচ রাজবাড়ির ছবি তুলবো না, কেমনে হয়। তারপর বললাম, ঠিক আছে তোমার কিছু করতে হবে না, তুমি কেবল রাজবাড়ির সামনে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাবে। এবার রাজী হলো সে। রাজার বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে রয়েল তোরন দেখলাম। বিয়ের মাত্র একদিন বাকী। রাস্তায় কঠিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ট্রাকে ট্রাকে জলপাই বাহিনী ঘোরাঘুরি করছে রাজপ্রসাদের রাস্তা দিয়ে। রাজবাড়ি আসার আগে আমি ক্যামেরার ভিডিও অন করলাম। ছবি তোলার চেয়ে ভিডিও ঢের ভালো ব্যবস্থা। গাড়ির চলন্ত অবস্থাতেই ধারণ করলাম কয়েক মিনিটের চলন্ত ভিডিও। বলাই বাহুল্য সেই ভিডিওতে ছোকরা পুলিশ আর রাজতোরনের ছবি আসলেও রাজপ্রাসাদকে ধরা যায়নি।

যাইহোক তারপর উগেন আমাদের নিয়ে চললো নদীর তীর ধরে। ডানে স্বচ্ছ নীলাভ জলের নদী, বায়ে সবুজ পাহাড়। হাতের ডান দিকে থিম্ফুর বাকী শহর। অদূরে স্টেডিয়াম দেখা যাচ্ছে। তার পাশে ভেজিটেবল মার্কেট, তারও বহুদূরে পাহাড়ের মাথায় জেগে আছে একটা মুর্তি। ওটাই বুদ্ধমুর্তি। ক্যামেরার জুম দিয়ে বুদ্ধমুর্তিকে ধরলাম।

উগেন আমাদের নিয়ে গেল সবজী বাজারে। এই বাজারটা সপ্তাহে তিনদিন বসে। গতকাল ছিল শেষদিন। আজকে সব সুনসান।

শাকসবজির বাজার বলতে আমরা বুঝি জঞ্জালময় বিশৃংখল একটা জায়গা। যেখানে ময়লা আবর্জনা স্তুপ হয়ে থাকে মাসের পর মাস। পুঁতিগন্ধময় একটা জায়গা। কাক আর কুকুরের গনতান্ত্রিক সহাবস্থান চরমভাবে বিরাজমান। কিন্তু থিম্ফুর এই বাজার আমাদের ভিন্ন জিনিস শেখালো। একটা বাজারও সুপারমার্কেটের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে বছরের পর বছর অক্ষত থাকতে পারে। বাজারের সামনে সাজিয়ে রাখা ডাস্টবিনের চেহারা দেখলেই বোঝা যায় পরিচ্ছন্নতা ভুটানীদের ঈমানের অঙ্গ, বাঙালীদের নয়।

বাজারের উল্টোদিকেই থিম্ফুর প্রধান নদীটা বয়ে যাচ্ছে। তার উপর চমৎকার একটা সেতু। পঞ্চাশ ফুটের বেশী হবে না ঝুলন্ত সেতুটা। একটা লম্বা টানা বারান্দার মতো সেতু। মাথার উপর কাঠের ছাদ দেয়া। সেতুর দুপাশে দুটি ঘর। ওই পাড়েও একটা বাজার। এই বাজারটিও শূণ্য। কেবল দোকানের বাঁশের তৈরী মাচানগুলো আছে। সেতুর উপর উঠে নদীর অসাধারণ রূপটা দেখা গেল। এখান থেকে নদীটা অনেক বেশী নীল, অনেক বেশী স্বচ্ছ। বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটা নদী এত পরিষ্কার হতে পারে তার কৃতিত্ব কি ভুটানী জনগনের, নাকি রাজার তা বুঝতে পারলাম না। আমাদের দেশে বাজার জাতীয় এলাকার আশপাশের কথা চিন্তা করলে শিউরে উঠতে হয়। অতি অবশ্যই্ একটা বিশাল দুর্গন্ধস্তুপ থাকবেই বাজারে প্রান্তে।

কিভাবে এত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখে ওরা? বাজারের উল্টোদিকে দেখলাম বেশ কটি ডাস্টবিন সারিবদ্ধভাবে রাখা আছে। কোন ময়লা বাইরে পড়ে নেই। বোঝা যায় ময়লার বাক্সকেও পরিষ্কার রাখার কায়দা জানে ভুটানীরা। এরপর এক পাহাড়ের উপর বেড়াতে গিয়েও দেখলাম ডাস্টবিন বসানো আছে, চেহারা অতিশয় ভদ্র। এই কায়দাগুলো কি খুব ব্যয়বহুল নাকি কষ্টসাধ্য? আমরা কেন পারিনা এই মনোকষ্ট চেপে দুটো ছবি তুলে নিলাম ডাস্টবিনের।

সন্ধ্যের আগে আগে ফিরলাম ওই ব্রিজের কাছ থেকে। ইচ্ছে করছিল রাতে একবার এসে ঘুরে যাই। কিন্তু হোটেলে ফিরে কফি খেতে খেতে দেখা হয়ে গেল কোলকাতা থেকে আসা অনিন্দ্য চক্রবর্তী আর কৃষানু ব্যানার্জীর সাথে। যে দুজন আমাদের এই অনাত্মীয় প্রবাসে দারুণ আত্মীয় হয়ে আবির্ভূত হয়ে গিয়েছিল পরবর্তী দুদিন। সেই মজার আড্ডা ছেড়ে রাতে আর বেরুতে ইচ্ছে করেনি।




















Wednesday, October 19, 2011

হিমালয় দর্শন-প্রথমদিন

১.
আকাশভ্রমণ আমার খুব নাপছন্দ। প্রতিটি আকাশভ্রমণে আমি ধরে নেই যে এইটা আমার অগস্ত্য যাত্রা। মাঝপথেই ধরণীর পরে মাথা ঠেকাবে বায়ুশকট। কিন্তু শেষমেষ সশরীরেই মাটিতে নামা হয়। এবারো ভুটানী এয়ারের ছোটখাট প্লেনটা দেখে ভয় হলো এই শকটে করে কি করে দুর্গম গিরি পাড়ি দেবো। মাত্র ৪৮ সীটের ছোট্ট বাহন। সেই ৪৮ জনের মধ্যে ১৮ জনের মতো যাত্রী উঠেছে। বাকী আসনগুলো শূণ্য। অথচ টিকেট যোগাড় করতে কেয়ামত হয়ে গেছে আমার।

প্লেনে ওঠার পর হালকা গর্জন করে রানওয়ে দিয়ে চলতে শুরু করে ভুটানী বিমান। পাইলট যথারীতি শক্ত করে বেল্ট পরে বসে থাকতে উপদেশ দিল। রানওয়ের ছোট গলিপথ ছেড়ে প্রধান সড়কে উঠে এল প্লেনটা। কিন্তু হঠাৎ করে ব্রেক কষে থমকে দাড়ালো। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। ঢাকার উষ্ণ আবহাওয়ায় খাঁ খাঁ করছে বিশাল ঘেসো প্রান্তর। প্লেনটা গোঁ গোঁ করছে দাড়িয়ে। ঈষৎ বিরক্ত সে। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল থেকে গ্রীন সিগন্যাল পাচ্ছে না বোধহয়। বেশ অনেকক্ষণ কেটে গেল। কোন নড়নচড়ন নেই। ব্যাপার কি, ইঞ্জিনে সমস্যা নাকি? পাইলট কিছু বলছে না কেন। সন্দেহ লাগলে আমাদের নামিয়ে চেক করে নিক। তবু যাত্রা নিরাপদ হোক। দুপুর একটা বিশ মিনিট। ছাড়ার কথা বরাবর একটায়।

একটু পরেই নড়তে শুরু করলো। বেশ জোরালো গর্জন দিল। মোটর সাইকেলের মতো একটা টান দিয়ে হুশ করে বেরিয়ে গেল ছোট লেন থেকে প্রধান রানওয়েতে। তারপর দিল এক চিতাবাঘের লাফ। বাপ্রে। আমি জীবনে এতবার বিমান চড়েও এই রকম আকাশ লম্ফ দেখিনি। ভয়ে অন্তরাত্মা বুকের খাঁচা ছেড়ে উড়াল দিতে চাইল। এই ব্যাটা পাইলট ক্ষেপে গেছে নিশ্চয়ই এতক্ষণ দেরী হওয়াতে। সে দিগ্বিদিগ জ্ঞান হারিয়ে দশ দিগন্ত ছাড়িয়ে মেঘের রাজ্য পেরিয়ে খাড়া চাঁদের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করলো আমাদের। উঠছে তো উঠছেই, ছোট প্লেন এত উপরে উঠতে দেখিনি আগে। মেঘের সাথে ধাক্কাধাক্কি লেগে ডানা ঝাপটাতে শুরু করলো প্লেনটা। আমার সহযাত্রী চোখ বন্ধ করে দোয়া দরুদ পড়ছে। এয়ারহোস্টেস কোথাও লুকিয়ে পড়েছে। ভুটানী ভাষায় পাইলট কিছু একটা বলছিল এয়ার হোস্টেসের উদ্দেশ্যে একটু আগে। মনে হলো বলছে, তোরা লুকায়া পর, আমি কিন্তু হেঁচকা টান মারতেছি। সাবধান!!!

ডিং করে ঘন্টা বাজলো একটা। প্লেনটা কাত হতে হতে সোজাতে আসলো। এবার পতন শুরু। সাঁ করে নামছে এবার। পাইলট প্লেনটাকে মধ্যাকর্ষনের কাছে সমর্পন করেছে মনে হলো। ব্যাটার মাথায় কি মতলব কে জানে। মনে মনে বললাম, মরলে তুইও মরবি ব্যাটা। সামলে চালা।

আমার কথা টেলিপ্যাথিতে তার কানে গেল মনে হয়। আবারো ডিং করে শব্দ হলো। কি একটা বললো এয়ারহোস্টেসের উদ্দেশ্যে। মনে হলো বলছে, এবার জলদি খানা লাগা পাবলিকের ভাত হজম হয়ে গেছে একটানে।

এয়ারহোস্টেস এসে বললো, জুস খাবা? আপেল না অরেঞ্জ। আমি কই আপেল দাও, গলা শুকায় গেছে। জুশ দেবার পর স্যান্ডউইচ আনলো। ওটা ভয়ে রেখে দিলাম। আগে কে জানি বলছিল ভুটানী স্যান্ডউইচ ভয়ংকর হতে পারে। পেটের বিমারের ভয়ে ওটা ধরলাম না। তবে সাথে দুপ্যাকেট বাদাম ভাজা দেখা যাচ্ছে। ওগুলো নিয়ে কুড়মুড় করে খাওয়া শুরু করলাম। নীচের দিকে তাকালাম। মেঘের ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশের জলাভূমি দেখা যাচ্ছে।

খানিক পর বিমানটা আবার মোচড়ামুচড়ি শুরু করলো। একটু চিত্তচাঞ্চল্য দেখা গেল যাত্রীদের মধ্যে। খবর খারাপ নাকি? জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি সামনে বামদিকে মেঘের রাজ্য ছাড়িয়ে একটা সাদা তেকোনা বরফের মাথা। বুঝলাম চাঞ্চল্যের রহস্য। ব্যাগ খুলে তাড়াতাড়ি ক্যামেরা বের করলাম। ওইটা হিমালয় পর্বত। জীবনে এই সুযোগ খুব বেশী আসে না। এই ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য হলো খালি চোখে হিমালয় দর্শন। ক্যামেরা ক্লিক করা শুরু করলাম। ক্লিক করতে করতেই পাইলট তার সমস্ত ক্যারিশমা দেখিয়ে মেঘের রাজ্য ছেদ করে প্রবল ঝাকুনি কাপুনির মাধ্যমে প্লেনটাকে ভুটানের জটিল ও বন্ধুর পর্বতমালার উপর নিয়ে এসেছে। এবার একবার ডানদিকে কাত হয়, আবার বামদিকে। অপূর্ব এক দৃশ্য। দুই পাশে দুই পর্বত রেখে মাঝখান দিয়ে ছুটে যাচ্ছে ছোট্ট প্লেনটা। সেই বাড়াবাড়ি পার্বত্য সৌন্দর্যের প্রভাবে সকল ঝাঁকুনি কাঁপুনির ভয় উবে গেল। কেবল ক্যামেরায়ই ক্লিক চলতে থাকে নামার আগ পর্যন্ত। একসময় চাকাগুলো ভুটান রানওয়ে স্পর্শ করে এক ছুটে গিয়ে থেমে গেল টার্মিনালের সামনে।

দরোজায় লাগানো সিড়ি দিয়ে নীচে পা দেয়া মাত্র অদ্ভুত সুন্দর এক নিস্তব্ধতার সঙ্গীত বেজে উঠলো চারপাশের পাহাড়ে। লক্ষ কোটি ঝিঁঝি পোকা ভর দুপুরে বাজিয়ে যাচ্ছে মধ্যরাতের সঙ্গীত। চারদিকে সবুজ পাহাড়ঘেরা ছোট্ট এই বিমানবন্দরকে প্রথম দেখায়ই ভালো লেগে গেল। এত সুন্দর যে আমি ক্যামেরায় হাত দিতেই ভুলে গেলাম। এয়ারপোর্ট থেকে গাড়িটা বেরিয়ে যখন পাহাড়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, আমি তখন ক্যামেরায় হাত দিতে বাধ্য হলাম।



পারো থেকে থিম্ফু যাবার পথে

২.
পারো এয়ারপোর্ট টার্মিনাল ভবনে ঢুকলাম। হাতের ব্যাগটা একটা ডেস্কে রেখে এরাইভাল ফর্ম পুরন করতে শুরু করলাম। দেখি হাসি হাসি মুখ করে এক বালিকা এগিয়ে এসে আমার উল্টেদিকে দাড়ালো। ভাবলাম মিষ্টি হেসে জেরা করবে, কোন দেশ থেকে আসছো, কি কাজে আসছো ইত্যাদি। কিন্তু সে চুপ করে দাড়িয়ে। আমার সন্দেহ হলো নিশ্চয়ই গোয়েন্দা হবে। আমাকে আপাদমস্তক দেখে আন্দাজ করার চেষ্টা করছে হয়তো আমার ব্যাগে কি কি অবৈধ জিনিস লুকোনো আছে। বিশেষ করে সিগারেটের একটা প্যাকেট ভেতরে আছে সেটা আমার চেহারা দেখেই বুঝে ফেলেছে বোধহয়। ব্যাগটা বেশ ফোলা এমনিতেই, ওজনও কম হবে না। ক্যামেরা ডায়েরী পাসপোর্ট সব ওই হাত ব্যাগেই। মনে মনে বলি, লাভ নেই বালিকা। আমি কোন অবৈধ জিনিস আনিনি, এক প্যাকেট সিগারেট আছে, ওটা তুমি ধরার আগেই আমি খুলে দেখিয়ে দেবো। ফর্ম পুরন করতে করতে মনে মনে বালিকার সাথে ইন্টারোগেশান জাতীয় সংলাপ চালিয়ে গেলাম। ফর্ম পুরন শেষ। তারপর আমি মুখ তুলে তাকালাম বালিকার দিকে।

বললাম, এই যে আমার কাছে কিন্তু এক প্যাকেট সিগারেট আছে। বের করবো?
বালিকা হেসে বলে, আমাকে এসব বলার মানে কি? আমি কাস্টমস না। তুমি ওই খানে ওসব দেখাবে। আমি এয়ারপোর্ট স্টাফ।
আমি কথা শুনে বুঝলাম ভুল জায়গায় সিগারেটের কথা বলে ফেলছি। মনে মনে নিজেকে শাসন করে এগিয়ে গেলাম ইমিগ্রেশান কাউন্টারে। ইমিগ্রেশানের লোকটা পাসপোর্ট ইত্যাদি দেখে সীল মেরে ফেরত দিল। আমি বললাম, ভাইরে আমার কাছে একটা প্যাকেট সিগারেট আছে, দেখবা না?
লোকটা বললো, ওটা আমার কাজ না, ওইদিকে কাস্টম আছে ওদের বলোগে।

আমি এবার কাস্টম চেকপোষ্টে গেলাম। ওরা পাসপোর্ট ইত্যাদি দেখে আমাকে বললো, যাও ওদিক দিয়ে বেরিয়ে যাও।
আমি তখন প্রায় মরিয়া হয়ে বললাম এবার, কিন্তু আমার ব্যাগে যে আস্ত এক প্যাকেট সিগারেট রয়ে যাচ্ছে তার কি হবে???
লোকটা অবাক হলো আমার কথা শুনে। বলে, ওটা আমার কাজ না, ওদিকে ওই ঘরে ডিউটি নেয়, কিছু থাকলে ওখানে ঘোষনা দিয়ে ডিউটি ট্যাক্স দিয়ে আসো।

আমি তখন অদূরের সেই ঘরে গিয়ে দেখি এক বালিকা ডেস্কের কম্পিউটার নিয়ে বসে আছে। আমি গিয়ে ব্যাগ থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে বললাম, আমার কাছে এই এক প্যাকেট সিগারেট আছে। কি করতে হবে বলো?

ওখানে আর কোন যাত্রী যায়নি। কারো কাছে ট্যাক্সেবল কিছু নেই বোধহয়। আমিই একমাত্র বেকুব। বালিকা আমাকে দেখে হেসে বললো, তুমি বসো আমি দেখছি।
তারপর কিছু ফর্ম, রেজিস্টার ইত্যাদি বের করে খচখচ করে লিখলো। তারপর বললো আশি নুলট্রাম। আমি বললাম আমার তো ডলার আছে, নুলট্রাম কই পাবো?
সে তখন বললো, ওদিকে ব্যাংক আছে, ওখানে ভাঙাও। আমি ব্যাংকের কাউন্টার গিয়ে ১০ ডলার ভাঙিয়ে ৪৬০ নুলট্রাম নিয়ে আসলাম। তারপর ডিউটি মিটিয়ে কাস্টম পেরিয়ে লবিতে চলে এলাম। আমার সহযাত্রী রিজওয়ান ভাই ওখানে বসে মিটিমিটি হাসছে। বললো, এক প্যাকেট সিগারেটের জন্য এত কিছু করলেন? না বললেও তো কিছু হতো না। আমি বললাম, ধরা পড়লে, তিন বছর জেল। আশি টাকা বাঁচাবার জন্য তিন বছর জেল বেশী হয়ে যায়।

এখন গাইডের খোজ নেবার পালা। আমাদের নিতে আসবে একজন গাইড। যার নাম উগেন। চেহারা চিনি না। আমাদের চেহারাও চিনে না সে। এরমধ্যে গেটে দাড়ানো বেশ কয়েকজন লোকাল ড্রাইভার বেশ বন্ধুসুলভ স্বরে বলছে ওদের গাড়িতে যেতে। কিন্তু আমি তো আগেই বুক করে এসেছি হোটেল গাইড সব। খানিক পর নিরীহ চেহারার একজন কাছে এসে হাতের একটা কাগজ দেখালো, দেখি আমার নাম লেখা। বললাম, উগেন? বললো জী হা।

আমরা তার গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। গাড়ি ছুটে চললো শহরের দিকে। গাড়িতে উঠেই বললাম, উগেন আমার প্রথম কাজ হলো একটা সীম যোগাড় করা। তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে?

উগেন আমাকে সীম কিনে দিল পথের একটা দোকান থেকে। আমার ছবি পাসপোর্টের কপি ইত্যাদি দিয়ে সিম লাগালাম মোবাইলে। এবার শান্তি। পথের দৃশ্য উপভোগ করতে কোন অসুবিধা হলো না এরপর থেকে। রাস্তার পাশে পাহাড়ি ঝরনাময় নদী, নদীর ওপারে পর্বত, পর্বতের গায়ে ছোট ছোট সব বাড়ি। অপূর্ব সুন্দর একটা দৃশ্য। গাড়ি এগিয়ে চললো থিম্ফুর দিকে।

থিম্ফুর কেন্দ্রস্থলে আমাদের হোটেল। সন্ধ্যে হয়ে এসেছিল তখন। গাড়ি থেকে নেমে অবাক সৌন্দর্যে আমি বাক হারা। রাস্তার উল্টোদিকে একটা বিশাল পাহাড় আকাশের দিকে উঠে গেছে। ঝাপসা অন্ধকার পাহাড়ের মাথায় ঝুলে আছে একটা অপার্থিব চাঁদ। এত সুন্দর চাঁদ আর কোথাও দেখিনি যেন। এত শান্ত নিরিবিলি একটা শহর। কোথাও কোন কোলাহল নেই। প্রায় নিঃশব্দে জেগে আছে একটা শহর।

হোটেল রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে কফি খেতে আসলাম নীচের রেস্তোঁরায়। খোঁজ করলাম হোটেলের মালিক দীপক গুরুংকে। কিন্তু সে নেই। গ্রামের বাড়িতে গেছে এখান থেকে বহুদূরে। তবে সমস্যা নেই তার কিশোরী কন্যা জাহানা আর আইটি বিশেষজ্ঞ শ্যালক উগেশ আমাদের সার্ভিস দিতে এগিয়ে এল। এটা পুরোপুরি পারিবারিক একটা হোটেল। দীপক তার স্ত্রী কন্যা মিলে চালায়। হোটেল লবিটা চমৎকার। বারান্দার মতো একটা জায়গা আছে অর্ধবৃত্তাকার, ওখানে বসে শহর দেখা যায়, সামনের পাহাড়ের উপর ঝুলে থাকা চাঁদটাও একদম স্পষ্ট। বলাই বাহুল্য চমৎকার একটা সূচনা হলো থিম্ফু শহরে।

কফি খেয়ে নীচে নামলাম। ছোট্ট একটা শহর। আমাদের হোটেলের সামনের রাস্তটাই প্রধান সড়ক। তার ওপাশে মাইকে ভুটানী গান চলছে। একটা কি উৎসব চলছিল। আমরা হেঁটে হেঁটে বেড়ালাম ঘন্টা খানেক এদিক সেদিক। দোকানপাটগুলো ছিমছাম। ট্যুরিষ্টদের জন্যই সাজানো। দাম আকাশছোয়া। রাতে খাওয়ার আগে ফিরে এলাম। রিজওয়ান ভাই বললো এই ঠান্ডায় দুটো বিয়ারের বোতল নিলে মন্দ হয় না। আমি বললাম, অনেকদিন খাইনা। তবু আজকে খাওয়া যায়। ভ্রমণে এলে একটু বিয়ারটিয়ার দিয়ে সন্ধ্যেটা শুরু করা যায়। বিয়ার এলো, সাথে বাদাম ভাজা, চমৎকার করে পিয়াজ কাচামরিচ লেবু টমেটোর মিশ্রনে। নটার পর ডিনার আসলো। খেয়েদেয়ে রাত দশটায় যার যার রুমে পৌঁছে গেলাম।




রাতের থিম্ফু

Wednesday, October 5, 2011

পাহাড় ডাকছে

পাহাড় ডাকছে।
হিমালয় ডাকছে হাতছানি দিয়ে।
অনেকদিন অনেক মাস বছর ডাকছিল কাংখিত সেই পর্বতমালা।
অবশেষে সেই ডাকে সাড়া দিতে যাচ্ছি।

গন্তব্য ভূটান। পারো, থিম্ফু, দোচুলা, পুনাখা, ওয়াংডির পথে শীঘ্রই যাত্রা শুরু হচ্ছে।

আসো পাহাড় ছুঁয়ে আসি। পাহাড় থেকে শীত কিনে আনতে যাচ্ছি। তুষার ধবল শীত।