Tuesday, April 18, 2017

সিপাহী বিদ্রোহ : চট্টগ্রামের ইংরেজ ক্যাপ্টেনের বিদ্রোহ বিবরনী ২৪ নভেম্বর ১৮৫৮

একজন মঙ্গলপাণ্ডে যখন ২৯শে মার্চ ১৮৫৭ তারিখে বিদ্রোহ করেছিলেন ইংরেজের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন একা। ছোট্ট একটি ঘটনায় তিনি প্রতিবাদী হয়ে প্রমান করেছিলেন হাজার মাইলের দাবানল ছোট্ট একটি আগুনের ফুলকি থেকেই শুরু হয়। তাঁকে প্রাণ দিতে হয় এক সপ্তাহের মধ্যেই। কিন্তু সেই ফুলকি কোলকাতা ছাড়িয়ে সমগ্র ভারতবর্ষে সিপাহী বিদ্রোহ হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছিল কয়েক মাসের মধ্যেই। সেই বিদ্রোহ ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতে পারেনি ঠিক, কিন্তু একশো বছরের ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর শাসন থেকে ভারতকে সরাসরি ইংরেজ সরকারের শাসনে রূপান্তরিত করেছিল। এটাও একটা অর্জন। কোম্পানী শাসন ছিল বস্তুতপক্ষে দুবৃত্ত শাসন। ভারতবর্ষের মতো বিশাল একটি অঞ্চলের জন্য চরম অপমান। ভাড়াটে গুণ্ডাপাণ্ডা সৈন্য দিয়ে এত বিশাল একটা দেশকে দখল করে শাসন করায় ঔপনিবেশিক শক্তির চেয়েও বেশী কারণ ছিল আমাদের নিজস্ব বিভেদ এবং দুর্বলতা। অনেক রাজা মহারাজা যুদ্ধ বিগ্রহ করে যা পারেনি, এক মঙ্গল পাণ্ডে তা করতে পেরেছিল। তাই সিপাহী বিদ্রোহকে প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধও বলা হয়।

মঙ্গলপাণ্ডের সেই বিদ্রোহ এ আত্মদানের প্রভাব প্রায় আট মাস পরে পূর্ববঙ্গের বন্দর শহর চট্টগ্রামেও এক ঝলক দেখা গিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে পূর্ববাংলা সিপাহী বিদ্রোহের প্রভাব থেকে মুক্তই ছিল। চট্টগ্রামের ওই্ একটি ঘটনা ছাড়া আর কোথাও কিছু ঘটেনি। ঢাকার লালবাগে একটু বিদ্রোহপ্রচেষ্টা গোড়াতেই থামিয়ে দেয়া হয়েছিল।

চট্টগ্রামের ঘটনার নায়ক ছিলেন হাবিলদার রজব আলী খান। নাম ছাড়া তাঁর আর কোন পরিচয় পাওয়া যায় না।

তিনি ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর বৃটিশের বিরুদ্ধে তার অন্যান্য সহযোদ্ধাসহ বিদ্রোহ করেন। তিনি বৃটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরিরত ছিলেন। তার পোস্টিং ছিল চট্টগ্রামে। ৩৪নং রেজিমেন্ট। কর্মস্থল ছিল প্যারেডগ্রাউন্ড। যা বর্তমানে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের খেলার মাঠ। ৩৪নং রেজিমেন্ট ছিল বাঙালি সৈনিকদের সমন্বয়ে সৃষ্ট রেজিমেন্ট। উক্ত রেজিমেন্ট ইংরেজের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিল।

জেলগেটের সশস্ত্র পাহারাদারদের পরাজিত করে হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম জেলে আটক সকল বন্দীদের মুক্তি দিয়ে ছুটলেন চট্টগ্রাম ট্রেজারির দিকে। ট্রেজারিতে কর্তব্যরত বৃটিশ অফিসারকে হত্যা করে বিদ্রোহীরা ট্রেজারি দখল করে প্রচুর টাকাকড়ি লুট করে নেয়। তারপর রজব আলীর নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ইংরেজদের চট্টগ্রামস্থ অস্ত্রাগার লুট করলেন। তিনটি হাতী ও অন্যন্য অস্ত্র সহকারে হাবিলদার রজব আলীর বিদ্রোহী সিপাহীরা ত্রিপুরা রাজার সাহায্য পাবার আশায় তার রাজ্য সীমানায় পৌঁছে গেলেন। এই ঘটনাগুলো দ্রুত গতিতে ঘটেছিল এবং হতাহতের সংখ্যা ইংরেজদের পক্ষে মাত্র একজন। বিদ্রোহীদের কেউ হতাহত হয়নি।

ত্রিপুরার দিকে এগিয়ে গেলেও রাজার সহায়তা না পেয়ে  হাবিলদার রজব আলীরা আর ত্রিপুরা না গিয়ে মনিপুর যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মনিপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে অাঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ বেয়ে অবশেষে সিপাহীরা সিলেট এসে পৌঁছলেন। তারা তখন ক্লান্ত। অনেক দুর্গম পথ হেঁটে তারা সিলেটে পৌঁছেন।

ইংরেজরা খবর পেয়ে সেখানে আক্রমণ করতে আসে। খবর পেয়ে হাবিলদার রজব আলী এক পরিকল্পনা করলেন। সৈনিকরা তৈরি করলেন অনেকগুলো খড়ের মূর্তি। পাহাড়ের ঢালুতে তাঁবু গাড়লেন রজব আলী। সন্ধ্যার সাথে সাথে সেই মূর্তিগুলোকে সিপাহীদের পোশাক পরিয়ে তাঁবুর চারপাশে সুন্দরভাবে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো। রজব আলী সিপাহীদের নিয়ে পাহাড়ের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে রইলেন। এদিকে মেজর বাইঙ-এর নেতৃত্বে বৃটিশ সৈন্যরা রাতের অন্ধকারে মুর্তিগুলোর উপর আক্রমণ করে বসল। এ সুযোগে হাবিলদার রজব আলী মেজর বাইঙকে হত্যা করেন। উক্ত যুদ্ধে অনেক বৃটিশ সৈন্য নিহত হয়। এরপর হাবিলদার রজব আলী মনিপুরের দিকে রওয়ানা হন।

সিপাহীরা মনিপুর প্রবেশ করলে সেখানেও আক্রান্ত হয়। এই পর্যায়ে এসে সিপাহীদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং তারা চারদিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম ত্যাগ করার পর সিপাহীদের রসদের অভাব দেখা দেয়। স্বাভাবিক কারণে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন সংঘর্ষে ২০৬ জন সিপাহী মারা যায়। অবশেষে রজব আলীর দল রেঙ্গুনের পার্বত্যাঞ্চলে চলে যায় এবং ধারণা করা হয় রেঙ্গুনের পার্বত্য জঙ্গলে খাদ্যাভাবে তাদের মৃত্যু হয়।

ঘটনার এইটুকু আগেই জানা ছিল।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের ইতিহাস বিষয়ক পড়াশোনা করতে গিয়ে সিপাহী বিদ্রোহের প্রত্যক্ষদর্শী একটি বিবরণের সন্ধান পাওয়া গেল বৃটিশ সরকারের একটি তথ্যভাণ্ডার থেকে। চট্টগ্রাম শহরে সেই সময় Captain P.H.K. Dewool ছিলেন ৩৪ রেজিমেন্টের প্রধান। তিনি বিদ্রোহের ঘটনাটির বিবরণ দিয়ে একটি পত্র লিখেছিলেন মেজর জেনারেল Sir J. Hearsey, K.C.B. এর কাছে যিনি প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের প্রধান ছিলেন।

১৮ নভেম্বর বিদ্রোহের এক সপ্তাহ পর ২৪শে নভেম্বর লিখিত সেই দুর্লভ চিঠির সম্পূর্ণ বিবরণী-

"Chittagong, November 24th, 1857.

 

" I have the honour to report, for the information of Major-general Sir J. Hearsey, K.C.B., commanding the presidency division, that, on the evening of Wednesday, the 18th instant, about nine o'clock, the detachment of the 34th regiment of native infantry mutinied, and instantly occupied the magazine with a strong body of men. Immediately upon hearing the noise from my house, which is quite close to the lines, I went to the parade in company with Lieutenant Hunter; but upon approaching the scene of disturbance, hearing the men very violent and loading their muskets, I directed that officer to retire, and went forward to the mutineers alone. I found a very strong guard in front of the magazine, who challenged me, and shouted out in a most violent tone, ' Don't care for him ! Go away ! you have no business here !'


I advanced up to it, and did my best, with every argument I could use, to persuade the men to their duty; but a Mohammedan, who was in a native dress, and not in uniform like the rest, standing out in front, called out in a loud voice, ' The whole detachment is in a state of mutiny, and we have all determined to die if it is necessary. Go away !' This he said shaking his hand in my face, and using the most violent gestures. A shout was then raised, ' Shoot him ! shoot him !' but a number of voices replied, 'No! no! don't hurt the captain.' Taking encouragement from this, and thinking I might have some men who would stand by me, I again endeavoured, by every persuasion, to bring the men to a sense of their duty, and appealed to several sepoys by name, who had previously borne a good character, to think what they were about, and to remain faithful to their salt; but they all replied that they had joined the mutineers, and that it was not their intention to withdraw. 


A shout was again raised, ' Shoot him ! shoot him !' which was again negatived ;and at the same moment two or three sepoys, with their muskets at the charge, came at me. Not liking this demonstration, I stepped back a few paces, and got out of the crowd, which was gradually getting round me; a Sikh of No. 4 company then came up, and giving me a rough push, said, ' Go away from this [Hum suh log bigger gya).'


Not a single native commissioned or non-commissioned officer, or Sikh, remained by me; and seeing nothing could be done, I went to the quarters of Lieutenant Hunter, close by, and found that officer with Lieutenant Thomson, walking in the verandah ;  I told them hastily what had occurred, upon which they armed themselves and immediately went away. I then went to every house in the cantonment, to give warning to the residents, but most of them had already taken alarm and fled. Ultimately joining the civil surgeon's family, who live at the extreme end of the cantonment, in their company I sought to make my own escape; but by this time the parade and all the road around were covered with mutineers, so that we were only able to reach the next house, where we were detained for about two hours ; we afterwards disguised ourselves as natives, and, under the guidance of the collector's bearers, proceeded by a jungle path to the banks of the river, when with difficulty we got a boat, and dropped  down to the Kortabeea lighthouse, from whence we returned yesterday.

 

"I have to state that the mutineers plundered the treasury most completely, and in doing so killed a burkandaze. They also broke open the gaol, and forced the prisoners to go with them to carry the treasure ; and afterwards returned to the cantonments, and blew up the magazine and burned down the lines. I am happy to say that none of the European residents have been personally injured, and that, with the exception of a horse or two which were taken away to carry their baggage, the mutineers have left all private property untouched. 


" I have been informed by a native named Thakoor Bux, formerly a jemadar of the Chittagong provincial battalion, whom the mutineers forced to go some distance with them, that the pay-havildar of No, 4 company, named Rujub Ali Khan, has assumed command of the detachment, which, we hear, has crossed the Fenny river, and entered the territories of the rajah of Tipperah.

 

" I took the opportunity while at Kootuhdeen, to write to the commissioner of Arracan, reporting the mutiny, and requesting him to send a copy of my letter for the information of the general commanding, which I hope has been done.


— I have

 

P.H.K. Dewool,

Captain,

Commanding 34th Regiment Native Infantry.

 

" P.S. — Lieutenants Hunter and Thomsonare in safety."




১৮৫৮ সালে প্রকাশিত The Mutiny of Indian Army থেকে সংকলিত।



Monday, April 17, 2017

তোর জন্য

আজকাল প্রায় প্রতিদিন একটা করে দুঃসংবাদের টেলিফোন পাই। কখনো একাধিক। পৃথিবীর দুঃসংবাদের ভয়ে টিভি দেখা, খবরের কাগজের পাঠ ছেড়ে দিয়েছি। নিজের কাজ, পড়াশোনার বাইরে আমার যোগাযোগ পৃথিবী খুব সীমিত করে রেখেছি। কোন কোন দুঃসংবাদ এমন হয় বুক ভরে শ্বাস নেয়া যায় না। ভার হয়ে থাকা বুকটা হালকা করার পথ যেখানে খুঁজি, সেখানেও এলোমেলো হাওয়া। তোর টেলিফোন পেয়ে আমি আবারো ভারাক্রান্ত হলাম। আমি যখন পথ খুঁজে পেতাম না, তোর কাছে গিয়ে হালকা হতাম। তুই যখন দিশেহারা তখন আমার কাছে ছুটে আসতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষাটা দিয়ে আমি তোর কাছে গিয়ে থেকেছিলাম কয়েকদিন। তখন আমার অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যত। কিন্তু তোর কাছে গিয়ে আমি আলো খুঁজে পেতাম। আমার সব দুশ্চিন্তা উধাও হয়ে যেতো তোর কাছে গেলে। তুই অভয় দিয়ে বলতি যতদিন তুই দুপায়ে দাঁড়িয়ে আছিস, আমি চিন্তামুক্ত। আমি জানতাম ভালো করেই। তাই আমার কখনো দ্বিধা ভর করতো না তোর কাছে আমার সব জানালা খুলে দিতে। আমার বন্ধুর সংখ্যা নেহাত কম ছিল না, তবু তুই সবার চেয়ে আলাদা। তোর চায়ের কাপের আধখানা আমার থাকবে আমি জানতাম। মানুষে মানুষে সম্পর্কে কত জটিলতা, কত অবিশ্বাস, কত রকমের রাসায়নিক পরিবর্তন আসে, কিন্তু তিন দশকের বেশী সময়েও আমাদের কখনো ভুল বোঝাবুঝি হয়নি। আমাদের সব লেনদেন একপাক্ষিক বলেই হয়তো। আমরা দুজন দুজনকে যা দেই সেটা চুড়ান্ত। কখনো কিছু ফেরত চাই না। ফিরতি প্রত্যাশা থাকলেই যত সমস্যা। তুই ছাড়া আমার তেমন বন্ধু সারাজীবনে মাত্র আর একজনই হয়েছে। এখানে আমি চিরঋনী থেকে সুখী। যেখানে আমি নিজের জীবনটা হাতে তুলে দিতে পারি নিশ্চিন্তে। এই বিশ্বাস কিভাবে তৈরী হয় কেউ জানে না। আমি খুব বেশী মানুষের সাথে মিশি না, খুব বেশী মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখি না কষ্ট পাবার ভয়ে। কিন্তু আমি যাকে বিশ্বাস করেছি সেটা নিজের প্রাণের সাথে বাজী রেখে করেছি। সে আমাকে কখনো ঠকাবে না জানি। এই যে বিশ্বাস, এটা কোন লেনদেনের ব্যাপার না। প্রাণের সাথে প্রাণের যোগাযোগ। এটা একটা স্বস্তি। একটা আশ্রয়। তুই আমার সেই আশ্রয়।

সেই তুই যখন 'ভালো নেই' বলিস,তখন আমি আশ্রয়হীন হয়ে পড়ার অস্থিরতায় ভুগি। পঞ্চাশের কাছাকাছি পৌঁছে জীবনের অনেক পতনশীল সুত্র এসে আমাদের আহত করবে এটা স্বাভাবিক জেনেও মেনে নিতে পারি না।

এসব কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমি বলতে পারি না। এসব শুধু নিজেকেই সাময়িক ভোলানোর চেষ্টা।


Sunday, April 16, 2017

বিজয়ের আগমুহূর্তে যেসব পাকিস্তানী পালিয়েছিল

একজন পাকিস্তানী সামরিক অফিসার ব্রিগেডিয়ার (অব.) শের খান  ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে একদল পাকিস্তানী কিভাবে আত্মসমর্পনের আগেই বার্মার পথে পালিয়ে গিয়েছিল তার বিবরণ লিখেছেন নিজের জবানীতেই।

সেই লেখাটি দৈনিক বণিকবার্তায় অনুবাদ করেছেন 'ইবনে মোতালেব'।


------------------------------------------------------------

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১

পূর্ব পাকিস্তান থেকে শেষ ফ্লাইট

ব্রিগেডিয়ার শের খান (অব.) | ১৯:১৯:০০ মিনিট, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৬

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বেলা ১টা ৫ মিনিটে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এলুয়েট-৩ হেলিকপ্টার ঢাকা এয়ারপোর্টের কাছ থেকে উড়ে এয়ারফিল্ড অতিক্রম করে চলে গেল। সেখানে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের নিচ দিকটাতে ভিআইপি হেলিপ্যাড প্রস্তুত রাখার কাজ এগিয়ে চলছে। ভারতীয় বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল অরোরা এখানে অবতরণ করবেন। এ মাসের প্রথম দিকে তার বাহিনী পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করেছে।

মেজর মোহাম্মদ জারিফ বাঙ্গাশ হেলিকপ্টারটি স্বাভাবিক উচ্চতার নিচ দিয়ে উড়িয়ে পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণে এবং বার্মার উত্তর প্রান্তে আকিয়াব শহরের দিকে এগোচ্ছে। আমাদের সঙ্গে আছেন আরো একজন এলুয়েট পাইলট মেজর তোহিদ উল হক, এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ার মেজর ইজাজ মিনহাজ ও পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের একজন স্কোয়াড্রন লিডার আর পথে রিফুয়েলিংয়ের জন্য ১০ জেরিক্যান অতিরিক্ত জেট ফুয়েল। এ ধরনের হেলিকপ্টারে ট্যাংকে যে পরিমাণ জ্বালানি ধরে, তাতে এত দূর গন্তব্যে পৌঁছা সম্ভব নয়। বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে এবং বঙ্গোপসাগরে শক্তিশালী অবস্থান নেয়া ভারতীয় নৌ-বাহিনীর শনাক্তকরণ আওতা এড়িয়ে চট্টগ্রামের দক্ষিণে আরাকানের জঙ্গলে প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে রিফুয়েলিং করে এবং সাড়ে ৪ ঘণ্টা আকাশপথে উড়ে হেলিকপ্টারটি সন্ধ্যার দিকে আকিয়াব অবতরণ করল। পাকিস্তানের ইতিহাসে সেই বেদনাদায়ক দিনে, পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে সেই কলঙ্ক দিনে, ১৯৭১-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ নিয়ে লেখা লে. জেনারেল কামাল মতিনউদ্দিনের গ্রন্থের ভাষায়, 'লে. জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করলেন এবং পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানের তিক্ততম শত্রুর হাতে অর্পণ করলেন।

কিছুদিন আগে আমি জরিফকে পেয়ে গেলাম, তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল। প্রায়ই আমাদের সেই স্মরণীয় ফ্লাইটটি নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতাম। আলাপের বিষয় যথেষ্ট আগ্রহসঞ্চারক এবং তা পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করা যায়। হামুদুর রহমান কমিশনের আংশিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর যেসব বিতর্ক উঠেছে, এ লেখা তার ওপর কিছু আলো ফেলবে, আশা করা যায় এটি নতুন কোনো বিতর্কের জন্ম দেবে না। আমাদের দীর্ঘ আলাপচারিতার সারাংশ:

'১৯৭১-এর ২৫ মার্চের সামরিক অভিযানের পর পরই এপ্রিলের প্রথম দিকে আমাকে করাচি যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হলো, সেখান থেকে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হবে পূর্ব পাকিস্তানে ইস্টার্ন কমান্ডের সঙ্গে সংযুক্ত এভিয়েশনে লজিস্টিক ফ্লাইটে। আমার সঙ্গে তিনজন ফিক্সড-উইং-পাইলটও রয়েছেন। আমরা করাচি এয়ারপোর্টের হজ টার্মিনাল থেকে পিআইএর বোয়িং ৭০৭-এ আরোহণ করলাম। আমাদের সঙ্গে সাইবার রাইফেলসের এক কোম্পানি বা কাছাকাছি সংখ্যক সদস্য। সাইবার রাইফেলসকে শক্তি জোগাতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে তারাও চলেছে। আমাদের উড়োজাহাজ টেকঅফ করার পর পরই পাইলট আমাকে ককপিটে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, উড়োজাহাজে আমরা কী মাল নিয়েছি? এত ভারী হয়ে গেছে যে, রানওয়ের শেষ প্রান্তে পৌঁছে কোনো রকমে জাহাজটিকে উড়াতে পেরেছেন। জাহাজ অতিরিক্ত ভারী হয়েছে; ভবিষ্যতে ওজনের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক হতে বললেন। যা-ই হোক, কোনো রকম ঘটনা-দুর্ঘটনা ছাড়া আমরা কলম্ব পৌঁছলাম (ভারতের উপর দিয়ে ঢাকায় সরাসরি ফ্লাইট কথিত হাইজ্যাকের ঘটনায় নিষিদ্ধ ছিল)। পাইলট আমাকে আবার ককপিটে ডাকলেন। এবার জানালেন, দুটি ভারতীয় ফাইটার আমাদের বোয়িংয়ের পিছু নিয়েছিল। পাইলটটা তাই তাড়াতাড়ি আরো উপরে উঠে যান এবং গতি বাড়িয়ে দেন। ফাইটার দুটি পেছনে পড়ে যায়। ভারতের পূর্ব উপকূলের পাশ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের দিকে আসার সময় ভারতীয় ফাইটার বারবার বিরক্ত করতে থাকে। তার পরও আমরা নিরাপদে ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম এবং আমাদের দায়িত্ব গ্রহণ করলাম।

'পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর কোনো উড়োজাহাজ না থাকায় আমরা ফ্লাইং ক্লাবের সেসনা এবং কৃষির প্লান্ট প্রটেকশন বিভাগের বিভার উড়োজাহাজকে আমাদের মতো করে রূপান্তরিত করে নিলাম। তার পর বলতে গেলে আমাদের প্রায় সব ধরনের কাজই দেয়া হলো— যেমন কমান্ড ও সংযোগের দায়িত্ব, পর্যবেক্ষণ, শত্রুপক্ষের অবস্থান জরিপ, সীমান্তসংলগ্ন ভারতীয় ঘনবসতিতে গোলন্দাজ আক্রমণে সহায়তা দেয়া তো রয়েছেই। একটি স্মরণীয় গোলন্দাজ আক্রমণের ঘটনা ঘটে ফেনীতে। যদি ঠিকভাবে স্মরণ রাখতে পারি, ৩৩ ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল কাজী নিজেই তার একটি ইউনিটের কমান্ডারকে নিয়ে আমাদের উড়োজাহাজে বসা। বিভারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন প্লান্ট প্রটেকশন বিভাগের পাইলট, আমি সেখানে কো-পাইলট এবং পর্যবেক্ষক। আমরা সেদিন প্রায় ৫ ঘণ্টা আকাশে ছিলাম। সীমান্তের ওপারে লক্ষ্যবস্তুতে গোলাগুলিও করেছি। পর্যবেক্ষণের জন্য আমরা ভূমি থেকে ৫ হাজার ফুট উঁচু দিয়ে উড়ছিলাম। ফ্লাইটের একপর্যায়ে মনে হলো, নিচ থেকে ছুড়ে দেয়া আগুনের হলকা উড়োজাহাজে লাগছে। কিন্তু এর কোনো বাস্তবিক প্রমাণ উড়োজাহাজে দেখা গেল না। পরে আমরা জানতে পারি, ভারতীয় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা কামান থেকে গোলা ছোড়া হয়েছে। কিন্তু এগুলোর ফিউজ এমনভাবে নির্মিত যে, সাড়ে চার হাজার ফুট দূরত্বে গিয়ে আগুন লাগিয়ে বিস্ফোরিত হবে। ফলে তা আমাদের জাহাজের নিচে বিস্ফোরিত হয়েছে। কপাল ভালো সেদিন ভারতীয়রা আমাদের শিক্ষা দেয়ার জন্য তাদের ফাইটার নিয়োজিত করেনি।

'মে মাসের প্রথম দিকে এলুয়েট-৩ হেলিকপ্টার চালনার কনভার্শন প্রশিক্ষণের জন্য রাওয়ালপিন্ডির কাছে ধামাইল ক্যাম্পে রিপোর্ট করি। অক্টোবরের ১ তারিখে আমাকে আবার পূর্ব পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তত দিনে পূর্ণশক্তি নিয়ে আর্মি এভিয়েশন স্কোয়াড এসে যোগ দিয়েছে। তখন ইস্টার্ন কমান্ডের অধীন ছয়টি এমআই৮ হেলিকপ্টার এবং তিনটি এলুয়েট হেলিকপ্টার সক্রিয় রয়েছে। প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার ক'মাস আগে থেকেই ভারতীয় সেনাবাহিনী যখন আন্তর্জাতিক সীমান্ত লঙ্ঘন করছিল,            তখন এভিয়েশন স্কোয়াডকে বিভিন্ন মিশনে ব্যস্ত থাকতে হয়— মুক্তিবাহিনীর দখল করা জায়গা পুনরুদ্ধার করার জন্য নিয়মিত বাহিনী ও কমান্ডোদের পৌঁছানো ছাড়াও অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে— অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ, জেনারেল নিয়াজি ও তার স্টাফদের বিভিন্ন কমান্ড এলাকা ও সদর দপ্তরে আনা-নেয়া করা।

'নিয়মিত কাজের একটি ছিল আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক গণমাধ্যমের কর্মীদের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় এজেন্টদের তত্পরতা ও সহিংসতার জায়গাগুলোয় নিয়ে যাওয়া। নোমান মাহমুদ সাগিরের মতো সিনিয়র ক্যাপ্টেনদের সঙ্গে এলুয়েট চালনা ছাড়াও আমি মাঝে মধ্যে এমআই৮-এর কো-পাইলট হিসেবে বসতাম। তাছাড়া যখন ককপিট ক্রুর সংকট দেখা দিত, তখন তো বসতেই হতো। নভেম্বরে ঈদের দিন জেনারেল নিয়াজি হেলিকপ্টারে বিভিন্ন হেডকোয়ার্টার্সে গেলেন এবং সৈন্যদের সঙ্গে সাক্ষাত্ ও শুভেচ্ছা  বিনিময় করলেন।

সেদিন আমরা জানতে পারি, পাকিস্তান এয়ারফোর্সের একটি জাহাজ ভারতীয় সীমানায় ঢুকে পড়লে তা গুলিবিদ্ধ হয়ে ভূপাতিত হয়। তারা পাইলটকে ছেড়ে দিয়েছে আর অন্য একটি ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ। যদি ঠিকভাবে স্মরণ করতে পারি, পিকিউ মেহেদি চালিয়ে ঢাকায় ফিরে আসতে সক্ষম হন। মেহেদি ক'দিন আগে পাকিস্তান বিমান বাহিনীপ্রধানের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। তত দিনে বৈরিতা অনেক দূর গড়িয়েছে, মুক্তিবাহিনী অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সেক্টরে মোতায়েন আমাদের বাহিনী আসন্ন ভারতীয় আক্রমণের মুখোমুখি হয়ে আছে, তা সত্যিই অতি আসন্ন। মুক্তিদের তত্পরতার কারণে সড়ক ও নদীপথের যানবাহনে চলাচল ঝুঁকিবহুল এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সে কারণে হেলিকপ্টার এবং ক্রুদের ওপর সার্বক্ষণিক চাপ পড়ছে।

'আমাদের একটি অন্যতম মিশন আহত ও নিহতদের সরিয়ে নিয়ে আসা— প্রায়ই তা করতে হয়েছে সীমান্তের ওপার থেকে আমাদের সৈন্যবেষ্টিত লক্ষ্যগুলোয় গোলন্দাজ আক্রমণের বিপরীতে। আমার জন্য সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক মিশনটি ছিল আমার নিজের ব্যাটালিয়নের বিরুদ্ধে লড়াই করা; আমি ৪ বেঙ্গল রেজিমেন্টে আমার চাকরি জীবনের প্রথম চার বছর কাটিয়েছি। এখান থেকেই কমিশন লাভ করেছি কিন্তু ভৈরব মুক্তিবাহিনীর হাত থেকে উদ্ধার করতে আমাদের এ লড়াই করতে হয়েছে। আমাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, আমাদের ইএমই রক্ষণাবেক্ষণ ক্রুরা তাদের সার্বক্ষণিক ব্যস্ততার মধ্যেও স্মরণ রাখার মতো সেবা দিয়ে হেলিকপ্টারগুলোকে চালু রেখেছেন। এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের সরঞ্জাম ও রক্ষণাবেক্ষণ ঘাঁটি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পরও তারা এ কাজটি করেছেন। ব্যাপারটি একটু লঘু হাস্যকর মনে হতে পারে। আমাদের আরেকটি মিশন— লুট হয়ে যাওয়া সরকারি তোষাখানা অর্থ পুনরায় সরবরাহ করা। মাসে যাদের বেতন সামান্য কয়েকশ টাকা, তাদের হাত দিয়ে হেলিকপ্টারে কোটি টাকা পাঠানো জিহ্বায় পানি আসার অভিজ্ঞতা হয়ে যায়।

'ডিসেম্বরে যুদ্ধ বাধতেই হেলিকপ্টারগুলো ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বিভিন্ন জায়গায় রাখা হলো। ভারতীয়রা একেবারে শুরুতেই ঢাকা এয়ারফিল্ডে বোমাবর্ষণ করে এটিকে অকেজো করেছিল। পাকিস্তান এয়ারফোর্সের কোনো জাহাজ আর উড়তে পারল না। তার পরই পূর্ব পাকিস্তানের আকাশ ভারতীয়দের দখলে চলে গেল। আমাদের আকাশপথে অধিকাংশ চলাচল কেবল রাতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল। ওড়াউড়ির যত কাজ, আমাদের স্কোয়াড্রন তা রাতেই প্রায় অন্ধের মতো চালিয়ে যেতে লাগল। কারণ উড়োজাহাজের আলো দেখা গেলে ভূমি থেকে অবিরাম গুলিবর্ষণ শুরু হয়ে যাবে। সৌভাগ্যবশত পূর্ব পাকিস্তানে আমার চার বছরের চাকরি খুব কাজে লেগেছে। এখানকার ভূপ্রকৃতি আমার ভালো চেনা ছিল। আত্মসমর্পণের কয়েক দিন আগে ইস্টার্ন কমান্ডের এক কর্মকর্তাকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অধঃস্তন হেডকোয়ার্টার্সে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হই। আমরা যেখানেই অবতরণ করছি, তিনি স্থানীয় কমান্ডারের কাছে একটি খাম হস্তান্তর করছেন— খাম খুলে পত্রগ্রাহকের যে অভিব্যক্তি, তা ক্রোধের। খামের ভেতর আসন্ন আত্মসমর্পণের কথা লেখা আছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন চট্টগ্রাম গ্যারিসনের কমান্ডিং অফিসার। ভারতীয় নৌ-বাহিনী অবরোধ সৃষ্টি করে গোড়াতেই চট্টগ্রামকে দেশের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। তিনি আমাদের মুখের ওপর আদেশটি ছুড়ে মারলেন। বললেন, এ ধরনের অপমানজনক আত্মসমর্পণের আদেশ তিনি মানতে রাজি নন— এমন পরিস্থিতিতে যেখানে তার ট্রুপসের আদৌ কোনো রক্তপাতও ঘটেনি। যাক, তার পরও তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি কমিশনার ও পুলিশের ডিআইজিকে আমার হেলিকপ্টারে চট্টগ্রাম ত্যাগ করতে দিলেন।

১৫ ডিসেম্বর স্কোয়াড কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার লিয়াকত আসরার বুখারি অফিসারদের নিয়ে একটি সম্মেলন করলেন এবং বললেন, ইস্টার্ন কমান্ড তাকে নির্দেশ দিয়েছে, উড্ডয়ন উপযোগী সব উড়োজাহাজ সে রাতেই বার্মার আকিয়াব নিয়ে যেতে হবে, সঙ্গে যত বেশি সংখ্যক নারী ও শিশু। একটি এলুয়েট এবং এর ক্রুদের যদি জেনারেল নিয়াজির প্রয়োজন হয়, সেজন্য রয়ে যেতে হলো। যেহেতু আমি ও তৌহিদুল হক ব্যাচেলর, ক্রু হিসেবে আমাদেরই নির্বাচন করা হলো।

(জেনারেল মতিনউদ্দিনের কথায়) '১৫ ডিসেম্বর (১৯৭১) জেনারেল নিয়াজি (ফিল্ড মার্শাল) মানেকশর কাছে সিগনাল পাঠিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে শর্তযুক্ত অস্ত্রবিরতি প্রস্তাব মেনে নিলেন। জেনারেলের চার আর্মি এভিয়েশন স্কোয়াডের কমান্ডিং অফিসার লিয়াকত আসরার বুখারি প্রস্তুত, অনুমতি পেলেই রাতের অন্ধকারে তার দলবল ও হেলিকপ্টার নিয়ে বার্মা চলে যাবেন। ভারতীয় বিমান বাহিনী তুলনামূলক অধিক শক্তি ও আকার বিবেচনা করে রিয়ার অ্যাডমিরাল শরিফ মত দিলেন, লিয়াকতকে একটা সুযোগ দেয়া যায়। উড়োজাহাজ যেন শত্রুর হাতে গিয়ে না পড়ে, সেজন্য লিয়াকতকে বাধা দেয়া ঠিক হবে না। জেনারেল নিয়াজি রাজি হলেন এবং লিয়াকতকে আদেশ দিলেন, আহত মেজর জেনারেল রহিমকে সঙ্গে নিয়ে যাক, মেজর জেনারেল রহিমের সঙ্গে ইসলামাবাদ নিয়ে যাওয়ার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও থাকবে। তিনি আরো বললেন, আহত জেনারেলের সঙ্গে নার্সও নিতে হবে। সে রাতে সবাই চাইছেন সপরিবারে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে চলে যাবেন, তাতে সম্পূর্ণ অরাজকতার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি পাইলটদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, ঠেলাঠেলি চলতে থাকে। হেলিকপ্টারের ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ ওজনের মানুষের ঠাসাঠাসি চলতে থাকে। জেনারেল মতিন বললেন, সে রাতে ১৩৯ জন নারী ও শিশুকে উঠিয়ে দেয়া হয়েছে হেলিকপ্টারে অনুমোদিত সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। হেলিকপ্টারের টেক অফ পয়েন্টে কোনো নার্সের দেখা মিলল না। ভোরের আগে পূর্ব পাকিস্তানের আকাশসীমা পেরোতে হলে ঢাকা ছেড়ে যেতে আর নষ্ট করার মতো সময় নেই। ১৬ ডিসেম্বর ভোর ৩টার দিকে চারটি এমআই৮ এবং দুটি এলুয়েট দক্ষিণমুখী হয়ে উড়ে গেল। আমাকে জানানো হলো, চট্টগ্রামে 'কিন্ডার' রাডার এখনো ঢাকায় কাজ করছে। পাকিস্তান এয়ারফোর্সের লোকজন তা কিছু সময় সচল রাখার পর ধ্বংস করে দেয়। এয়ারফিল্ডে অবস্থানরত এফ-৮৬ জেট শত্রুর হাতে পড়া এড়াতে তারা এক কাজটি করে। পরদিন সকালে আমাকে বিস্মিত করে মেজর সগির ও মাহমুদ আনোয়ার স্কোয়াড্রন কমান্ড পোস্টে এসে হাজির, এটা আমি চালাচ্ছি। তাদের তো অন্যান্য উড়োজাহাজের সঙ্গে আগেই আকিয়াব চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু তাদের এলুয়েট স্টার্ট না নেয়ায় তারা যেতে সক্ষম হয়নি। তারা আমাকে অনেক তোষামোদ করে বোঝাতে চেষ্টা করল, আমি যেন ইস্টার্ন কমান্ডকে রাজি করিয়ে দিনের আলোতেই তাদের নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করি। 'হেড কোয়ার্টার্সের অবস্থা খুবই গোলমেলে, আত্মসমর্পণের সময় ঘনিয়ে আসছে। আমার মনে হয়, তিনি এয়ার কমডোর ইমাম আমরা কেন যাইনি সেজন্য বকাঝকা করলেন এবং হেলিকপ্টার দ্রুত স্থান ত্যাগ করার পরামর্শ দিলেন। পাকিস্তান এয়ারফোর্সের একজন অফিসারকে আমাদের সঙ্গে নিতে বললেন। কারণ এখানে তার আর কোনো কাজ নেই।

হেলিকপ্টারগুলো যেখান পার্ক করা, আমরা গাড়ি চালিয়ে সেখানে এলাম। মেজর সগির আমার চেয়ে খানিকটা দূরে ছিলেন। পরে তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে আমাদের আকিয়াবে দেখা হয়। আমরা যার যার মতো কারে বোঝা নিয়েছি। সঙ্গে বাড়তি জ্বালানি। কারণ এলুয়েটের উড্ডয়নক্ষমতা অনেক কম। আকিয়াবে পৌঁছতে আরো বেশি সময় আকাশে থাকতে হবে (এমআই৮ বহু দূরবর্তী সফরের জন্য বাড়তি ট্যাংক সংযোজন করা আছে), আমাদের জাহাজ চালু হলো, টেকঅফ করল, এয়ারপোর্টে যেখানে জেনারেল অরোরাকে অভ্যর্থনা জানানো হবে, সেই রিসেপশন লাইনের উপর দিয়ে আমরা উড়ে গেলাম। গাছগাছালি পাশ কাটিয়ে আমরা দক্ষিণে চলেছি। চট্টগ্রাম থেকে খানিকটা দূরে থাকতেই ফুয়েল ফিল্টারের সতর্কতা বাতি জ্বলে উঠল। মানে পাইপে জ্বালানি আটকে গেছে। এটা পরিষ্কার করতে হবে অথবা পাল্টাতে হবে নতুনবা কয়েক মিনিটের মধ্যে ইঞ্জিন তেলশূন্য হয়ে পড়বে। আমরা তখনো শত্রুর সীমানার ভেতর, কাজেই বেপরোয়া হয়ে আমরা পূর্ব পাকিস্তান সীমান্ত পেরিয়ে আরাকান অরণ্যে খানিকটা খালি জায়গা পেয়ে সেখানে ল্যান্ড করি।

মেজর ইজাজ মিনহাস ফুয়েল ফিল্টার বদলানোর আয়োজন করলেন। ফিল্টার না করেই আমরা জেরিক্যান থেকে জ্বালানি সরাসরি ট্যাংকে ঢাললাম। স্বাভাবিক অবস্থায় এমনটি কখনো করা হয় না। আদিবাসী উপজাতীয়দের কেউ কেউ কী হচ্ছে, দেখার জন্য উঁকিঝুঁকি দিলে আমরা তাদের দিকে সাব-মেশিনগান তাক করে রইলাম। আমরা যখন যাওয়ার জন্য প্রস্তুত, ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়ার চেষ্টা করার পরও ইঞ্জিনের আলো জ্বলল না। আরো কয়েকটি প্রচেষ্টা একইভাবে ব্যর্থ হলো। ইঞ্জিনে জ্বালানি প্রবেশ করছে না। ততক্ষণে ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে এসেছে। ঢাকা থেকে পালিয়ে আসার পর বার্মার অরণ্যে এ এক অদ্ভুত অনুভূতি— গন্তব্য থেকে শতমাইল দূরে। ব্যাটারিকে স্বয়ংক্রিয় শক্তি অর্জনের জন্য কিছুটা সময় দেয়া হলো। আমাদের ঠোঁটে প্রার্থনা, হূদয় চলে এসেছে মুখে। শেষে চেষ্টা হিসেবে আমি আরেকবার ইঞ্জিন ক্র্যাংক করলাম। ধীরে, অলসভাবে, মনে হলো অনন্তকাল পর শেষ পর্যন্ত ইঞ্জিনে আলো জ্বলল, গতিসঞ্চার হলো, আমরা উড়তে সক্ষম হলাম। যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, আমরা আকিয়াব অবতরণ করতে সমর্থ হলাম।.

'বার্মার কর্তৃপক্ষ আমাদের অন্তরীণ করল, আগে যারা পৌঁছেছে সে ক্রু ও যাত্রীদেরও— তারা জানতে চাইছে বিনা অনুমতিতে আমরা কেন বার্মার আকাশপথে প্রবেশ করলাম। সব ক্রু ও হেলিকপ্টার বেসামরিক— আমাদের এ কথা তারা গ্রহণ করল না। অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের সত্যিকার পরিচয় বেরিয়ে এল— যদিও আমরা বেসামরিক পোশাকে ছিলাম এবং উড়োজাহাজের সামরিক চিহ্নও মুছে ফেলেছিলাম। কয়েক দিনের মধ্যেই আমাদের আগে যারা এসেছেন, তাদের সঙ্গে আমাদের রেঙ্গুন পাঠিয়ে দেয়া হলো, কাউকে উড়োজাহাজে, কাউকে সড়কপথে। তার পর পুনর্বাসনের জন্য পাকিস্তান দূতাবাসের কাছে হস্তান্তর করা হলো। কয়েক সপ্তাহ পর আমরা সবাই কলম্বো হয়ে করাচি পৌঁছলাম। সেখানে আর্মি এভিয়েশন ঘাঁটি ধামাইলের (পরে কাসিম ঘাঁটি) কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জব্বার আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন।

কয়েক সপ্তাহ পর হেলিকপ্টারগুলো ব্যাংকক নিয়ে যাওয়ার জন্য পাকিস্তানি ক্রুদের অনুমতি দেয়া হয়, ব্যাংকক থেকে জাহাজে এগুলো করাচি আনা হলো।

 

টীকা

১.         এয়ার কমডোর (পরে এয়ার মার্শাল) ইনাম উল হক পূর্ব পাকিস্তানে দায়িত্ব পালনকারী সিনিয়র এয়ারফোর্স অফিসার। ঢাকা এয়ারফিল্ড স্থায়ীভাবে অকেজো করে দেয়ার পর তিনিই হেলিকপ্টার ও প্লান্ট প্রটেকশন ডিপার্টমেন্টের এয়ার ক্রাফট দিয়ে পাইলটদের আকিয়াব পাঠানোর বন্দোবস্ত করেন। তিনিও সবার সঙ্গে পালাতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি যুদ্ধবন্দি হওয়ারই সিদ্ধান্ত নেন।

২.        ভারত ও বাংলাদেশের জোর দাবি সত্ত্বেও বার্মা যে পাইলটদের তাদের কাছে না দিয়ে পাকিস্তানে ফিরিয়ে দিয়েছে, এজন্য পাকিস্তান কখনো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে কিনা আমার জানা নেই।

অনুবাদ: ইবনে মোতালেব

http://bonikbarta.net/bangla/magazine-post/412/%E0%A6%AA%E0%A7%82%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%A5%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B7-%E0%A6%AB%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F--/


ভালো থাকা, ভালো নেই

আজকের সকালটা বৈশাখের খরতাপ জর্জরিত নয়। কুয়াশা ভেজা ফুরফুরে হাওয়া। রিকশা নিয়ে নিয়ে রেলস্টেশন থেকে ফিরে আসার পথে ভ্যানগাড়ি থেকে তাজা সবুজ সবজি হাতে বাড়ি ফিরলাম। নাস্তা সেরে ল্যাপটপ খুলে বসেছি। হাতের কাজ ধরার আগে ফেসবুকে ক্লিক করে এলাম কয়েক মিনিটে। সে ভালো আছে, আমি ভালো আছি, আজ খুব ভালো আছি।

এমন আনন্দমুহূর্তে আচমকা একটা টেলিফোন এসে সবকিছু থমকে দিল। অসহায় করে দেয় তেমন একটা সংবাদ। তবু কি দিন থেমে থাকে? গরম চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দিতে দিতে নিজেকে বোঝালাম, শক্ত হও, শক্ত হও। তুমি তো স্বার্থপর মানুষ, আরো স্বার্থপর হও। আত্মরক্ষার জন্য স্বার্থপরতার বিকল্প নেই। যেখানে তুমি হাত বাড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করোনি, সেটা নিয়ে আক্ষেপ কোরো না।

আমার প্রতিদিনের স্বস্তিদেবী আমাকে বহুদিন ধরে সব অযাচিত দুঃখবেদনাবোধ থেকে রক্ষা করে আসছে। এখন তার কাছেও বিব্রত হই সবটুকু সত্য বলতে। আলোটুকু দেখিয়ে অন্ধকার নিজের কাছে লুকিয়ে রাখি। সে নিজেই ভারাক্রান্ত, তাকে নতুন করে ভারাক্রান্ত করার মানে হয় না। আমরা সবাই তো একেকটা চক্রে বন্দী হয়ে আছি।

অসংখ্য মানুষ ভালো নেই। অসংখ্য মানুষের ইস্ত্রি করা শার্টের নীচে ছেঁড়া গেঞ্জি। অনেক মানুষ অদৃশ্য ক্ষরণ নিয়ে আয়ুক্ষয় করে বেঁচে থাকে প্রতিদিন। মুখোশের পেছনে মুখোশ, আড়ালের আড়ালে আড়াল বাড়তে বাড়তে একদিন নিজেরাই ভুলে যায় কোনটা সত্যি ছিল কোনটা মুখোশ।

অক্ষমতাও একটা গ্লানি। সেই গ্লানির আগুনে পুড়ছে কতো মানুষ।

আমি ভালো আছি, ভাবতে একটা অপরাধবোধ জাগে। সবাইকে নিয়ে ভাবতে গেলে আমি ভালো থাকি কী করে? কাউকে কাউকে বাদ দিয়েই আমরা ভালো থাকি।


 

Thursday, April 13, 2017

সিদ্দিক ভাই

সিদ্দিক ভাই চলে গেলেন অবশেষে!

চলে যাবেন জানতাম ৷ চলে গিয়ে বেঁচে গেলেন ৷ তাঁকে নিয়ে কেউ আর বেসাতি করতে পারবে না ৷

যাবার আগে তাঁর সাথে একবার বসে গল্প করা হলো না আমার ৷ বলা হলো না তাঁর একটি আদর্শকে আমি লালন করে চলেছি দীর্ঘকাল ধরে ৷ তিনি জানতেন না আমি কতদিন থেকে মনে মনে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম ৷ তাঁকে মনে করে আমি বঞ্চিত কত সময়ে ভারসাম্য রেখেছি ৷ তিনি দেখিয়েছেন সাদামাটা ঠকে যাওয়া জীবন কাটিয়েও কত আনন্দ আছে ৷

পড়াশোনা বাদে আর কোন উচ্চাকাংখা আপনার ছিল না ৷ আপনি কখনো জানবেন না আপনাকে আমি কত গভীরভাবে বুঝতে চেয়েছি .......  কেবল নিজেকে বোঝার জন্য!

বয়সে আপনি বাবার মতো তবু চিরকাল আপনি ভাই নামে পরিচিত থাকবেন সবার কাছে ৷

যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন অজস্র মানুষের ভালোবাসা নিয়ে ৷

Sunday, April 9, 2017

অতিথি কাকস্য পরিবার

বিবাহ আয়োজন প্রাঙ্গনে জানালার গরাদে অপেক্ষমান অতিথি কাকের অদৃষ্টে একখানা পরিত্যক্ত হাড়ের প্রতীক্ষা


আহার্য প্রস্তুতি

নেমন্তন্ন ডাকিয়া আহার্যে সবিশেষ সবজি রাঁধিয়া বিপন্ন প্রাণীকূলের বিলুপ্তি বিমোচন মানবাত্মার মহত্ব পরিচয় প্রদান প্রকরণ৷

চট্টগ্রাম ইতিহাস অনুসন্ধান

মধ্য চট্টগ্রামের হরিকেল রাজ্য

অবিভক্ত চট্টগ্রাম প্রায় ১৬৬ মাইল দীর্ঘ। ফেনী নদী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত এই জেলাটিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। উত্তরভাগ মীরেরসরাই থেকে কর্নফূলী নদী পর্যন্ত। মধ্যভাগ কর্নফুলীর দক্ষিণ তীর থেকে শংখনদী পর্যন্ত। দক্ষিণ ভাগ শংখ নদী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত। মধ্য ভাগের যে ভূখণ্ড সেখানে একটি প্রাচীন রাজ্যের অবস্থান পাওয়া যায় ইতিহাস খুঁড়ে। বহুদিন পর্যন্ত এই রাজ্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান খুব ক্ষীণ ছিল। বিশ শতকের শেষভাগে এসে বেশ কিছু তথ্য উপাত্ত আর ঐতিহাসিক নজির গবেষণা করে জানা গেছে সেই রাজ্যটি হরিকেল  নামে পরিচিত ছিল।

প্রাচীন সমৃদ্ধ রাজ্য গুলোর মধ্যে হরিকেল অন্যতম। হরিকেল রাজ্যের সাথে আরাকান রাজ্যের একটা সম্পর্কের বিষয় জানা যায় মুদ্রা বিনিময়ের সুত্রে। মধ্যযুগে সেই রাজ্যটি প্রায় পাঁচশত বছর টিকেছিল। হরিকেল রাজ কান্তিদেবের নামে একটি তাম্রশাসনের সন্ধান পাওয়া গেছে যেটি ৮৫০ থেকে ৯৫০ খ্রীষ্টাব্দে উৎকীর্ণ হয়েছিল। এ ছাড়াও আরো দুটি পাত্র লিপির সন্ধান পাওয়া গেছে যাতে হরিকেল রাজ্য সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্যের সন্ধান মেলে। তাছাড়া সন্ধান পাওয়া গেছে বেশ কিছু ধাতব মুদ্রারও। মুদ্রাগুলো তিন রকমের। পূর্ণমুদ্রা, অর্ধমূদ্রা এবং এক চতুর্থাংশ মুদ্রা। খাঁটি রূপার তৈরী মুদ্রাগুলো সপ্তম শতকের।

হরিকেল রাজত্বের সময় চট্টগ্রামের বন্দর ছিল কর্নফুলীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত দেবগ্রামে যা বর্তমানে দেয়াং নামে পরিচিত। ওই বন্দরটি চট্টগ্রামের আদি বন্দর ছিল যেখান দিয়ে চীনা পর্যটক তেন কাওং হরিকেল রাজ্যে এসেছিলেন। তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে হরিকেল রাজ্যের কিছু বিবরণ খুঁজে পাওয়া যায়।

চট্টগ্রামকে প্রাচীন বন্দর বলে যে কারণে অভিহিত করা হয় তার প্রমাণ হরিকেল রাজ্যে বিদ্যমান। হরিকেল রাজ্য সম্ভবত সপ্তম শতক কিংবা তারো আগ থেকে বিদ্যমান ছিল। সেই রাজ্যের বন্দর ছিল দেবগ্রাম। কর্ণফুলী নদীর বাম দিকের মোহনায় অবস্থিত এই বন্দরের প্রাচীন অবস্থান এবং বর্তমান অবস্থানের মধ্যে বিস্তর ভৌগলিক ব্যবধান আছে। কর্ণফুলী নদীর মোহনা বর্তমানের আকার আকৃতির চেয়ে একদম ভিন্ন ছিল। মাত্র পাঁচশো বছর আগেও কর্নফূলী নদী দুটি মোহনায় বিভক্ত ছিল। নদীর গতিপথ বদল হয়েছে বহুবার। এখন যেখানে শহর সেই চট্টগ্রাম সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রের অধিকারেই ছিল। সেই হিসেবে দেড় হাজার বছরের প্রাচীন বন্দরটির আদি অবস্থান সমুদ্র গর্ভে থাকলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

আবার বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড.সুনীতি ভূষণ কানুনগো বলেছেন বন্দরটির অবস্থান সমুদ্র তীরবর্তী স্থানে ছিল না, কর্নফুলীর মোহনা থেকে আট দশমাইল ভেতরে ছিল। এই অনুমান বর্তমান ভৌগলিক বাস্তবতায় সঠিক মনে হলেও আদি অবস্থান হিসেবে তা সঠিক না। ষোড়শ শতকের পর ইউরোপীয়ানদের তৈরী করা মানচিত্রগুলো বিশ্লেষন করে দেখা গেছে গত তিনশো বছরে কর্ণফুলী নদীর মোহনা বিপুল আকারে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এমনকি কর্ণফুলীর মোহনায় চর জেগে তা শহরের একাংশ হয়েছে আরো এক অংশ দক্ষিণ তীরে মিশেছে। ভৌগলিক অবস্থান বিচারে মোহনার কাছেই বন্দরের অবস্থান ছিল তা মানচিত্রে নির্দেশিত আছে। একাধিক ইউরোপীয়ান মানচিত্রে সেই বন্দরকে Bangala নামে হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

[চলবে....]

Saturday, April 8, 2017

এপ্রিল ধূলো

সামান্য ঘটনার জটিল প্রতিক্রিয়ায় পৃথিবী দুলে উঠে দিন যখন রাত হয়ে যায় তখন রক্তচাপের উর্ধ্বগতির প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করি। প্রতিবছর এপ্রিল মাসে একটা অনিবার্য জটিলতা গ্রহের ফেরে এসে হাজির হয়ে স্নায়ুজগতে তোলপাড় করে। আমি কিছুতেই পারি না সেই রাশিচক্র এড়াতে। ১৯৯৭ সাল থেকে এপ্রিলকে আমি ঘেন্না করতে শুরু করেছিলাম। এখন এপ্রিলের সাথে নিজেকেও করি। চুড়ান্ত পতনেও নিজেকেই দায়ী করবো। চৈত্রের ধূলো উড়লেই আমি সেই বিশ্বকাপ বিকেলে শেখ মুজিব সড়ক দিয়ে হাঁটতে শুরু করি চোখ বন্ধ রেখে। অনেক ধূলো ওড়ে........বাদামী ধূলোয় ধূসর হয়ে যায় শহরের আকাশ। এপ্রিল এলেই মনে পড়ে তাঁহারে।

বাংলাদেশ : অপুষ্ট শিশুর জন্মবঞ্চণা

বাংলাদেশ একটি আজন্ম ভুক্তভোগী রাষ্ট্র। একজন দরিদ্র মানুষের সংসারে যেমন অর্থকষ্টের পাশপাশি নানান রোগব্যধির মোকাবেলা করতে হয়, পেটের ভাত যোগাতে হিমশিম খাওয়া মানুষ ডাক্তার আর ওষুধের পেছনে সকল অর্থ ব্যয় করে অপুষ্টি আর অনাহারে মরতে হয়, বাংলাদেশ নাম স্বাধীন রাষ্ট্রটিও জন্ম থেকে সেরকম নানাবিধ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বারবার হোঁচট খেয়ে পড়ছে।

১৯৭১-১৯৭৫ পর্যন্ত বাংলাদেশ সৃষ্টিযন্ত্রণা পেরিয়ে চরম অভুক্ত এবং অপুষ্টিতে ভুগছিল। এমন ভয়াবহ যুদ্ধবিধ্বস্ত, রক্তস্নাত একটি দেশ স্বাধীন হবার পর জীবিত মানুষেরা শোক কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় নেয়। স্বজনহারা, সর্বহারা দেশটির মানুষের বুকে লেপ্টে থাকে দুঃসহ স্মৃতি। তারা হয়ে ওঠে অনেক বেশী মানবিক, অনেক বেশী দেশপ্রেমিক। বিশ্বাস করা যায় অন্ততঃ প্রথম পাঁচ বছর শোকে বিহ্বল থেকে প্রতিটি নাগরিক চেষ্টা করবে দেশ থেকে বেশী কিছু আশা না করে কোন মতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে।

কিন্তু সেই অপুষ্ট শৈশবের শুরুতেই বাংলাদেশ কী দেখেছে?

লোভ, ষড়যন্ত্র, দুর্নীতি আর ক্ষমতা নিয়ে কামড়াকামড়ি। একটি অপুষ্ট শিশুকে জন্ম থেকেই পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল তার জের এখনো চলছে।


ভয়াক্রান্ত পৃথিবীর বাইরে.......

চোখের সামনে পড়ে থাকা আসল সমস্যাগুলোর সমাধানে অক্ষম হয়ে নকল সমস্যায় বুঁদ হয়ে থাকাটা জীবন থেকে পালিয়ে থাকারই নামান্তর। সেই পলাতক জীবনকে মানসিক আশ্রয় বলি সুবিধাভোগীতা যার আসল চরিত্র। খুব ভালো করে জানি প্রতিনিয়ত যেসব বিপন্ন বন্ধু কিংবা ঘনিষ্ট স্বজনের দুঃসময়ের গল্প শুনি সেইসব দুঃসময় একদিন আমাকেও ঘিরে ধরতে পারে। তাই আসল সমস্যায় আক্রান্ত মানুষ দেখলেই আজকাল ভয় পাই, বুকের ভেতর অস্বস্তি কাঁপতে থাকে।

ভয়ানক সমস্যায় আক্রান্ত কোন মানুষ যখন আমার উপর ভরসা করে কোন একটি আশ্বাসের স্বস্তি চায় তখন তাঁকে মিথ্যে অভয় দিতে গেলে হৃদপিণ্ডে যে শক্তি দরকার তা আমার নেই বলে পালিয়ে থাকাই শ্রেয় বলে মেনে নেই। এই শাঁখের করাতে দুটোই শঠতার অপরাধ।

আর্থিক সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা না থাকলে হয়তো এতটা অসহায়বোধ করতাম না। যতটা আয় ততটাই ব্যয় যাদের, তাদের হাতে আর্তমানবতার সুযোগ খুব বেশী থাকে না। নিজে অর্ধভুক্ত থেকে অন্য কারো ভোজনের ব্যবস্থা করার যে মহত্ব সেটা এখন আমার জন্য দূরতিক্রম্য। সীমিত যেটুকু করি সেটা নিজে পরিপূর্ণ ভোজনের পর বাড়তি অংশ মাত্র। তাই এটাতে কেউ যখন মহত্বের প্রশংসা করে তখন বিব্রত হতে হয়। কেবল ইচ্ছেটুকু সম্বল করে কেউ মহৎ হতে পারে না। অসাধুতার নজির যেখানে চামড়ার নীচে পরতে পরতে লুকোনো।

এইসব পলাতক ভাবনার আড়ালে আমার একটি প্রাচীন পৃথিবী আছে, কিছু নীহারিকার নক্ষত্র আছে, আর আছে আমার সেই আশ্রয়। প্রতিদিন যেখানে আমি ডুব দিয়ে নিরাপদ থাকি। পালিয়ে থাকার অপরাধ ভুলে যাবার মতো আর কোন জায়গা আমার এত প্রিয় নয়।

কলম্বাস, ভাস্কো দা গামা, ম্যাগেলান এবং Treaty of Tordesillas

পৃথিবীটা কতোটা বড় কিংবা কতোখানি গোল তা জানার আগেই সেটাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে মালিকানা চুক্তি করে ফেলেছিল স্পেন আর পর্তুগাল। চুক্তিটার নাম Treaty of Tordesillas স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৪৯৪ সালে। তখনো সবগুলো মহাদেশ আবিষ্কৃত হয়নি, সবগুলো দেশে প্রতিষ্ঠিত শাসক ক্ষমতায় বসেনি।

ওই চুক্তি অনুযায়ী আটলান্টিকের পূর্বদিকের সকল আবিষ্কৃত ভূমির মালিকানা পর্তুগালের আর আটলান্টিকের পশ্চিমের সকল আবিষ্কৃত ভূমির মালিকানা স্পেনের। ১৪৯২ সালে কলম্বাস আমেরিকার নতুন ভূমি আবিষ্কার করেছিল ভারত মনে করে, আর ১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামা আফ্রিকার দক্ষিণপ্রান্ত  দিয়ে ভারতে যাবার জলপথ খুঁজে পেয়েছিল। মাঝখানের সময়ে ১৪৯৪ সালে সমুদ্রে নতুন কোন অভিযান চালাবার অধিকার এভাবেই ভাগ হয়ে যায় দুই দেশের মধ্যে।

Tordesillas চুক্তির বিভক্ত পৃথিবী



ইতিমধ্যে ভাস্কো দা মার পথ বেয়ে পর্তুগাল ভারতে নিজেদের উপনিবেশ স্থাপনের পথে এগিয়ে গেলে স্পেনের জন্য মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়ায় বিকল্প একটি পথের সন্ধান করা। সবকিছুর মূল ছিল এশিয়ার মশলা বাণিজ্য হস্তগত করা। ভারত মশলা বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। ইউরোপে মশলা বাণিজ্যের একচেটিয়া কারবার করছিল ভেনিসের এক বণিক। অটোমান সাম্রাজ্যের উপর দিয়ে ইউরোপের বাণিজ্য করার উপর নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে বিকল্প একটা পথের সন্ধানে পর্তুগীজ ও স্পেনিশ শক্তি মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তার ফলশ্রুতি এই রকম সব চুক্তি ও নতুন পথের সমুদ্র অভিযান।

কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর Treaty of Tordesillas স্পেনের জন্য যতখানি সৌভাগ্য মনে হয়েছিল ভাস্কো দা গামা ভারতের জলপথ আবিষ্কার করার পর তা স্পেনের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। ওই পথে স্পেনিশদের কোন অভিযান চালানো সম্ভব ছিল না।

ইতিমধ্যে বালবোয়া নামে এক স্পেনিশ ১৫১৩ সালে পানামার পশ্চিম প্রান্তে গিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের সন্ধান পেলেও ধারণা করা যায়নি তার বিশাল বিপুল আয়তন সম্পর্কে। ওই প্রান্তে কোন  নৌযান ছিল না যাতে দূরবর্তী অনুসন্ধান সম্ভবপর হয়। তবু সেই স্বল্প ধারণার ভিত্তিতে স্পেনের রাজা আটলান্টিকের পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে নতুন পথ আবিষ্কারে ফার্ডিন্যাণ্ড ম্যাগেলানের মতো এক পর্তূগীজ নাবিকের উপর দায়িত্ব অর্পন করে।

স্পেনের রাজার পর্তুগীজ নাবিকের উপর নির্ভরতার ব্যাপারটা একটু অস্বাভাবিক লাগলেও ঘটনা হলো ম্যাগেলানের তখন খারাপ সম্পর্ক যাচ্ছিল পর্তুগীজ রাজার সাথে। ম্যাগেলান প্রস্তাবিত একটি নতুন অভিযানের জন্য পর্তুগীজ রাজা সাহায্য করতে রাজী ছিল না বলে স্পেনের রাজার দিকে ঝুঁকেছিলেন তিনি।

স্পেনিশ রাজার পক্ষে  ম্যাগেলানকে পছন্দ করার আরেকটি কারণ ছিল ম্যাগেলান ১৫০৫ সাল থেকেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ছিলেন। এমনকি ইন্দোনেশিয়ার একটি মশলাসমৃদ্ধ দ্বীপরাজ্যে রাজার উপদেষ্টা ছিলেন। ১৫১৭ সালে ম্যাগেলানের অভিযানের পরিকল্পনা শুরু হলেও যাত্রা শুরু হয় ১৫২০ সালের সেপ্টেম্বরে ৫টি জাহাজ এবং ২৭০জন নাবিককে দিয়ে।

১৫২১ সালে ম্যাগেলান দক্ষিণ আমেরিকার শেষ প্রান্ত দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে যাবার পথ আবিষ্কার করেন। যা এখন ম্যাগেলান প্রণালী বলে পরিচিত। প্রশান্ত মহাসাগরের শান্ত চেহারা দেখে তিনিই নামকরণ করেছিলেন তার। ফার্ডিন্যাণ্ড ম্যাগেলান প্রথম বিশ্বপরিভ্রমণকারী হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ভ্রমণ সম্পন্ন করার শেষার্ধে ফিলিপাইনের কাছে আদিবাসীদের সাথে সংঘর্ষে নিহত হয়েছিলেন। তবু তাঁকে এই কৃতিত্ব দেবার কারণ হলো তাঁর অধীনস্থ বহরের একাংশ এই অভিযান সমাপ্ত করতে পেরেছিলেন।

ম্যাগেলানের যাত্রাপথ



আজকের সমৃদ্ধ পৃথিবীটা সর্বোতভাবে ইউরোপ কিংবা ইউরোপীয়ান বংশোদ্ভুত জাতিদের করায়ত্ত হবার মূল সুত্রপাত ছিল এই তিনজনের হাতে। কলম্বাস, ভাস্কো দা গামা এবং ফার্ডিন্যাণ্ড ম্যাগেলান।

আজকের সমৃদ্ধ পৃথিবীটা ইউরোপের হলেও প্রাচীন সভ্যতাগুলোর একাংশ ধ্বংসের সবচেয়ে বড় দায়ভার তাদের হাতেই।

Battle of Chile : আলেন্দে হত্যাকাণ্ডের জীবন্ত দলিল

এমন ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি ঘটেনি। যে মানুষকে হত্যার জন্য জলে-স্থলে-আকাশে কয়েক হাজার সুসজ্জিত বাহিনী ট্যাংক-কামান- যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ ঘিরে রেখেছে সে মানুষ মৃত্যু নিশ্চিত জানা সত্ত্বেও পালিয়ে না গিয়ে হাতে তুলে নিলেন রেডিও স্টেশনের মাইক্রোফোন। জাতির উদ্দেশ্যে জীবনের শেষ বার্তাটি দিতে শুরু করেন-

......Workers of my country, I have faith in Chile and its destiny. Other men will overcome this dark and bitter moment when treason seeks to prevail. Keep in mind that, much sooner than later, the great avenues will again be opened through which will pass free men to construct a better society. Long live Chile! Long live the people! Long live the workers!

তাঁর নাম সালভাদর আলেন্দে। তিনি ১৯৭০ সালের ৩ নভেম্বর থেকে ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চিলির প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

চিলির সান্টিয়াগো শহরের ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ সালের সকালবেলা। La Moneda নামের প্রাসাদের চারপাশ ঘিরে ফেলেছে ট্যাংক আর কামানে সুসজ্জিত এক সেনাবাহিনী। অবিরাম গোলাগুলি ছুড়তে ছুড়তে বাড়িটার ভেতরে অবস্থানরত প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করার আহবান করছিল তাঁর নিজের দেশের সেনাবাহিনী। তাদের কাছে আত্মসমর্পন করলে পালিয়ে যাবার পথ করে দেয়া হবে বলা হচ্ছিল, বলা হচ্ছিল তাঁর জন্য তৈরী আছে একটি বিমান। আত্মসমর্পন  না করলে বোমা মেরে উড়িয়ে দেবার হুমকি। কিন্তু নিজের নীতিতে অটল অসীম আত্মবিশ্বাসী মানুষটি পালিয়ে যাওয়া কিংবা অবৈধ আহবানে সাড়া দেবার চেয়ে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করাকে বেছে নিলেন। ভবনের ভেতরে তাঁকে রক্ষার জন্য অবস্থানকারী সৈন্যদের বললেন নিরাপদ স্থানে সরে যেতে। তাঁর পরিবারের নারী ও শিশুদের সরিয়ে দিলেন। ইতিমধ্যে আকাশ পথে উড়ে এলো সশস্ত্র জঙ্গী বিমান। একের পর এক বোমাবর্ষণে লা মোনেদা প্রাসাদের ছাদ ধ্বসে পড়ছিল।

দেশবাসীর প্রতি দেয়া বক্তব্য শেষ হবার পর তিনি হাতের AK-47 রাইফেলটি হাতে নিয়ে চিবুকে ঠেকিয়ে ট্রিগার চেপে ধরলেন। সেই অসম্ভব দৃঢ়চেতা মানুষটি দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রপ্রধান। চিলির জন্য নতুন যুগের হাওয়া বয়ে আনা একজন স্বপ্নবাজ মানুষ। যিনি মাত্র ৩৪ মাস বৈরী শক্তির মোকাবেলা করে ক্ষমতায় টিকতে পেরেছিলেন। দেশে তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক মোড়ল আমেরিকার চক্রান্তে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে রক্তাক্ত অভ্যূত্থানে সরিয়ে দেয়া হয়।

রাইফেলটি তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় বন্ধু ফিদেল ক্যাস্ত্রো। যিনি কল্পনাও করেননি প্রিয় কমরেড এই অস্ত্র দিয়েই পৃথিবীকে বিদায় জানাতে বাধ্য হবেন একদিন।

চিলির সেই ভয়াবহ সময়টাকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত করেছিলেন চিলির খ্যাতনামা তথ্যচিত্র নির্মাতা Patricio Guzman. ১৯৭৩ সালে আলেন্দে হত্যার আরো আগ থেকে তিনি আর তাঁর পাঁচ সহযোগী চিলির রাজনৈতিক অস্থিরতার চিত্র  ক্যামেরায় ধারণ করে যাচ্ছিলেন। তখনো তাঁরা জানতেন না সেই চিত্রায়নগুলো কখনো কাজে আসবে কিনা। সময়কে ধরে রাখা সেই চিত্রগুলো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থেকে গেছে। আলেন্দে সরকারের পতনের পর গুজম্যান ও তাঁর দলের সবাই পালিয়ে আত্মগোপনে কিংবা নির্বাসনে চলে যান। কিন্তু একজন ধরা পড়ে গেলেন। তিনি Jorge Müller Silva, যিনি গত এক বছরের সব চিত্র  ক্রমাগত ক্যামেরায় ধারণ করে ইতিহাসের জ্বলন্ত প্রমাণ রেখে গেছেন, তাঁকে ১৯৭৪ সালে গ্রেফতার করার পর গুম করে ফেলা হয়, তাঁর লাশও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই চলচ্চিত্রটি তাঁকে উৎসর্গ করেছিলেন পরিচালক প্যাট্রিসিও গুজম্যান যিনি নিজেও ২৩ বছর নির্বাসিত জীবনযাপন করেছিলেন। নির্বাসিত অবস্থাতেই নির্মান করেন সারা বিশ্বে সাড়া জাগানো Battle of Chile।

'ব্যাটল অব চিলি' তিন ভাগে বানানো হয়েছে আলাদা তথ্যচিত্র হিসেবে-
The Insurrection of the Bourgeoisie (1975),
The Coup d'état (1976),
Popular Power (1979)

এর মধ্যে দ্বিতীয় পর্ব The Coup d'état (1976) হত্যাকাণ্ডের মূল চিত্রটি তুলে ধরেছে, বাকী দুটি অভ্যূত্থানের পটভূমি এবং সামগ্রিক পরিস্থিতির চিত্রায়ন।

এই ছবিতে আলেন্দে হত্যার দৃশ্য নেই। কিন্তু ওই প্রাসাদে বোমাবর্ষণের সরাসরি চিত্রায়ন আছে। সম্ভবত নিকটস্থ কোন দালানের ছাদ বা জানালা থেকে চিত্রায়িত হয়েছিল দৃশ্যটা। আলেন্দে আত্মহত্যা করেছিলেন কিনা সেটা নিয়ে অনেক বছর বিতর্ক ছিল ধোঁয়াশা ছিল। আরো অনেক বছর পর ২০১১ সালে তাঁর কন্যা ইসাবেল আলেন্দের অনুরোধে আবারো লাশের ময়না তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়া গেছে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। তাছাড়া তাঁর দেহরক্ষীদের সাক্ষাতকারেও একই বিবরণ মেলে।

পুরো চলচ্চিত্রে ক্যামেরার কাজ Jorge Müller Silva-র করা হলেও এখানে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও চিত্র যুক্ত করা হয়েছে।

সেই চিত্রটি ধারণ করেছিলেন Leonardo Henrichsen নামে আর্জেন্টিনার টিভি চ্যানেল-১৩ এর একজন রিপোর্টার। তিনি চিলির ঘটনাবলী কাভার করার জন্য সান্টিয়াগো অবস্থান করছিলেন। ২৯শে জুন ১৯৭৩ তারিখ সকাল নটায় সেনাবাহিনীর ছোট একটা দল একজন লে.কর্নেলের নেতৃত্বে ৬টি ট্যাংক নিয়ে আলেন্দের প্রাসাদে আক্রমন চালিয়ে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু তখন সম্পূর্ণ সেনাবাহিনী যুক্ত হয়নি বলে ব্যর্থ হয়েছিল সেই অভ্যূত্থান। আলেন্দের পক্ষের সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু অভ্যূত্থান প্রচেষ্টার সময় ২২ জনকে হত্যা করে সেই বাহিনী, যার মধ্যে ছিল Leonardo Henrichsen। তিনি সেদিন প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছাকাছি একটা হোটেলে ব্রেকফাস্ট করতে বসেছিলেন সকাল নটার সময়। হঠাৎ হৈচৈ ছোটাছুটি গোলাগুলির শব্দ পেয়ে তিনি নীচে নেমে এসে দেখেন অদূরে সেনাবাহিনীর কিছু সৈন্য প্রাসাদের সামনে গোলাগুলি শুরু করেছে।

সবাই যখন উর্ধ্বশ্বাসে পালাচ্ছিল, তিনি তখন ক্যামেরা নিয়ে ঘটনার চিত্রায়ন শুরু করে দিলেন। সৈন্যরা তাঁকে দেখে ফেলে এবং এক অফিসার তাঁকে লক্ষ্য করে হুংকার দেয় রিভলবার তাক করে। সেই হুংকার এবং তাক করা বন্দুক ক্যামেরার লেন্সে দেখতে পাওয়া যায় এবং ক্যামেরা তাক করা অবস্থাতেই গুলি লাগে। তবু ক্যামেরা থামেনা রেকর্ড চলা অবস্থাতেই তিনি ক্যামেরা হাতে পড়ে যান এবং মৃত্যুবরণ করেন। হত্যাকারী সেই অফিসার ক্যামেরা থেকি ফিল্ম খুলে ছুড়ে ফেলে, কিন্তু সৌভাগ্যবশত ক্যামেরায় আরেকটি ব্যাকাপ ফিল্ম ছিল এবং সেখানে এই চিত্রটি ধারণ করা ছিল। তাঁর এক সহকর্মী আর্জেন্টিনা ফিরে গিয়ে সেই চিত্রটি প্রচার করে টেলিভিশনে। সেই ঐতিহাসিক দুর্লভ চিত্রটি এই সিনেমায় যুক্ত করেছেন গুজম্যান। Leonardo Henrichsen এর স্মরণে ১৯৮৯ সালে আর্জেন্টিনার কংগ্রেস ২৯শে জুনকে National day of the cameraman হিসেবে পালন করার আইন করেছিল।

এই সিনেমা সম্পর্কে টিম অ্যালেন 'ভিলেজ ভয়েস' পত্রিকায় বলেছিলেন- "The major political film of our times - a magnificent achievement."

পলিন কায়েল 'দ্য নিউ ইয়র্কার' পত্রিকায় লিখেছিলেন - " How could a team of five - some with no previous film experience - working with ... one Éclair camera, one Nagra sound recorder, two vehicles..and a package of black-and-white film stock sent to them by the French documentarian Chris Marker produce a work of this magnitude? The answer has to be partly, at least; through Marxist discipline ... The young Chilean director and his associates had a sense of purpose. The twenty hours of footage they shot had to be smuggled out of the country..the cameraman, Jorge Müller Silva, hasn't been heard of since his imprisonment. The others fled separately, assembled in Cuba, and together with a well known Chilean film editor Pedro Chaskel, ... worked on the movie ... Aesthetically, this is a major film, and that gives force even to the patterning of its charges ... It needs to be seen on public television, with those [U.S.] government officials who formed policy toward Allende explaining what interests they believed they were furthering."

সালভাদর আলেন্দে হত্যাকাণ্ডে আমেরিকান সরকার জড়িত ছিল এটা এখন আমেরিকাও স্বীকার করে খোলাখুলিভাবে। কিন্তু কিভাবে সেই অভ্যূত্থানের পরিবেশ তৈরী করা হয়েছিল এবং পরিকল্পনা এগিয়েছে সেটা এক ঝলকে বোঝার জন্য গুজম্যানের এই সিনেমাটা খুব কাজের। যে সরকারকে পছন্দ হয় না তাকে উচ্ছেদের জন্য আমেরিকান পদ্ধতি হলো সরকার বিরোধী একটি আবহাওয়া তৈরী করা, সরকারকে অজনপ্রিয় করার জন্য অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরী করা। পত্রিকার মাধ্যমে প্রপাগাণ্ডা চালানো। সেই সাথে মদদ দিতে হবে সেনাবাহিনীকে। চিলির ক্ষেত্রে জনগণ বাদে সমগ্র দেশের আর সবকিছুকে আলেন্দের বিপরীত মেরুতে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এর পেছনে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ঢেলেছে আমেরিকা। শুধু একটি উদাহরণ দেয়া যায়। সমগ্র চিলির ট্রাক কোম্পানীগুলো সব আমেরিকার। সমগ্র চিলিকে পন্য পরিবহনে ওই ট্রাকের কোন বিকল্প নেই। চিলিকে অচল করার জন্য ট্রাক ট্রলি ধর্মঘটের মত অস্ত্র নেই আর। সেই অস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়েছিল দেশকে অস্থিতিশীল করার সূচনাতেই। সারা চিলিতে খাদ্য সংকট দেখা দেয়, কলকারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ হাহাকার করতে থাকে। মজার ব্যাপার হলো সারা দুনিয়াতে শ্রমিকেরা ধর্মঘট ডাকলেও চিলির ওই ধর্মঘট ডেকেছিল মালিকপক্ষ। এবং শ্রমিকদেরকে ঠাণ্ডা রাখার জন্য নিয়মিত বেতন পরিশোধ করা হতো আমেরিকার দেয়া টাকা দিয়ে।

চিলির প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি তার খনিজ সম্পদ। সেই সম্পদই আলেন্দের জন্য কাল হয়েছিল। সেখানে মার্কিন পুঁজির মূল বিনিয়োগ ছিল সর্বোচ্চ। আলেন্দে ক্ষমতায় আসার পর খনিগুলো জাতীয়করণের ঘোষণা করা হয় শ্রমিকদের স্বার্থে। তাদের মজুরি বৃদ্ধি করা হয় ২৫% হারে। শ্রমিকরা খুশী হলেও মালিকরা চরম অসন্তুষ্ট। সেই মালিক পক্ষ আমেরিকা দাঁড়াবে সেটাই স্বাভাবিক।

চিলিতে আলেন্দের সরাসরি শত্রু সিনেট, আদালত এবং সেনাবাহিনীর একাংশ। চিলির সিনেটে বিরোধী পক্ষের আসন বেশী হলেও একক দল হিসেবে আলেন্দে সংখ্যাগরিষ্ট।  বিরোধী দলের দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ট ছিল না বলে প্রেসিডেন্টকে আইনগতভাবে অপসারণে ব্যর্থ হয়ে অবৈধ পন্থা বেছে নয়।

বলা বাহুল্য প্রতিটি তৃতীয় বিশ্বের অপছন্দের সরকারকে উৎখাত করার এই মার্কিন ষড়যন্ত্র এখনো বহাল আছে সারা বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশে সেই উদাহরণ আমরা খুব নগ্নভাবে দেখেছি ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সময়কালে।

Thursday, April 6, 2017

Machuca : মানবিকতা ও বৈষম্যের সার্বজনীন গল্প

অপ্রচারিত কিছু সিনেমা আছে যা হঠাৎ দেখে ধাক্কা লাগে, মুগ্ধতা জাগে, আনন্দ-বেদনার অনুভূতি ঘুরপাক খায় দীর্ঘক্ষণ। বেশ কদিন ধরে তেমন অপরিচিত কিছু সিনেমা দেখা হয়েছে, আরো কিছু বাকী আছে। আজকে যেটা দেখা হলো তার কথা বলি।

এটি চিলির সিনেমা। ঘটনার সময়কাল ১৯৭৩। সালভাদর আলেন্দে হত্যাকাণ্ডের সময়কালে। তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে  অসাধারণ কিছু ভালো সিনেমা/ ডকুমেন্টারি দেখেছি Patricio Guzmán কিংবা Costa-Gavras এর তৈরী। কিন্তু একদম সামাজিক পারিবারিক উপাদান নিয়ে তৈরী কিছু দেখা হয়নি। সালভাদর আলেন্দের উপর তৈরী সিনেমাগুলোর উপর পড়াশোনা করতে গিয়ে প্রায় অনালোচিত এই ছবিটার সন্ধান পেয়ে যাই।

চিলির Andres Wood এর অন্যতম সেরা কাজ Machuca এর গল্পটি ছিল চিলির একটি স্কুলের দুই বালকের বন্ধুতা ও সামাজিক দূরত্বের উদাহরণ নিয়ে। গল্পটি একই দেশে দুটি বৈষম্যমূলক সমাজ কিভাবে স্কুল বা পরিবারকে বিভাজিত করে তার প্রকট উদাহরণ। একটি নতুন বৈষম্যমূলক সমাজ যখন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল তাকে যখন গলা টিপে হত্যা করা হয় তার শিশু মানসের প্রতিক্রিয়া নিয়ে এই সিনেমাটি তৈরী। এই সিনেমার বার্তাটি তৃতীয় বিশ্বের খুব চেনা। ওই মানবিকতা এবং বৈষম্য সার্বজনীন।

মাচুকা ও কয়েকটি বস্তির ছেলেকে শহরের একটি নামকরা স্কুল বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ দিয়েছিল স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল। স্কুলের স্বচ্ছল পরিবারের ছাত্র এবং অভিভাবক সেটা মেনে নিতে না পারলেও মুখ বুজে সহ্য করে থাকে। তারপর নানান ঘটনার পর যখন হঠাৎ আলেন্দে সরকারের পরিবর্তন হয় তখন স্বপ্নগুলো ভেসে যায়, বন্ধুতা হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় আরো কতকিছু।

ট্রেলার দেখতে চাইলে-
https://www.youtube.com/watch?v=5N_XKFA1RLg

Tuesday, April 4, 2017

The Trial, কাফকা এবং আমাদের বাস্তবতা

কাফকার চোখে আধুনিক মানুষ যেভাবে সভ্যতার কাঠগড়ায় শারিরীক ও মনস্তাত্বিকভাবে নির্যাতিত হবার চিত্র দেখা গেছে, তা শতবর্ষ পরেও প্রাসঙ্গিক তো বটেই, তা বৃদ্ধি পেয়েছে নানান আঙ্গিকের আরো জটিলতর অবস্থান নিয়ে। সভ্যতার আলোর পাশাপাশি সভ্যতার একটি কুৎসিত অন্ধকারও বয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিটি আধুনিক মানুষ। কাফকার উপন্যাস অবলম্বনে Orson Welles নির্মিত ১৯৬২ সালের The Trial সিনেমায় সেই অন্ধকারকে চিত্রায়িত করা হয়েছিল ইউরোপীয়ান বাস্তবতার আলোয়।

বাংলাদেশের আলোতে দ্যা ট্রায়ালকে যদি আরো একটু বিস্তৃত করে দেখার চেষ্টা করা হয় তখন আরো প্রকট বীভৎস রূপ ধরা পড়ে।

আইনকে মানুষ ভয় পায়, সেটা আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আইন সাধারণ মানুষকে অভয় দেয় না, ভয় দেখায়। আইনের সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি শাখা মানুষের জন্য উৎপাত ছড়িয়ে রেখেছে। বর্তমান ইউরোপ জানি না, কিন্তু কাফকার আমলের ইউরোপের আইন আদালতের চিত্রটি এখন এই উপমহাদেশের বাস্তবতা। আদালত, উকিল, পুলিশ, মোক্তার, দালাল, সর্বশ্রেণীর হাতে মানুষের অধিকার বিপন্ন, কখনো কখনো জীবনটাই।

শুধু আইন আদালত পুলিশী হয়রানী নয়, প্রতিটি সরকারী দফতরেই খাবি খাওয়া মানুষগুলো বৃহত্তর জিম্মি জনগোষ্ঠির অংশ। যেখানে কেউ দেয় প্রাণ, কেউ দেয় মান। অর্থের কথা বলাই বাহুল্য।

সরকারী দফতর বা আইন আদালতের বাইরেও কী নিরাপদ মানুষ? যেখানে মানুষ শান্তি সেবা ও সুস্থতার সন্ধান করে সেখানেও যে বিপুল বিশাল অন্ধকার লুকিয়ে। ভাবতে খারাপ লাগে অসুস্থ হওয়াও একটা অপরাধ এই দেশে। সাধারণ কিংবা দুরারোগ্য যে ব্যধিতেই আক্রান্ত হোক, যদি কেউ ডাক্তার হাসপাতালের ফাঁদে পা দিতে বাধ্য হয় তখন অর্থ, স্বাস্থ্য, এমনকি জীবনও বিপন্ন হয়। চিকিৎসা ব্যবস্থাও আইন আদালতের মতো একটি ত্রিচক্র ফাঁদ।

আইনের আশ্রয় নেয়া মানুষ যেমন পুলিশ, উকিল, আদালত এই তিনটি চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকে, অসুস্থ হবার পর সেই মানুষ ডাক্তার, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চক্রে ঘুরতে ঘুরতে নিঃশেষে প্রাণ দিতে পারে। একটা সময় ছিল ডাক্তার, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার তিনটি আলাদা ইউনিট হিসেবে কাজ করতো। সময়ের বিবর্তনে তিনটি ইউনিটকে একটি গ্রন্থিতে আবদ্ধ করেছে।

আপনাকে বেশীদূর যেতে হবে না সেবা পেতে। একই দালানেই সব পাবেন। ঝকঝকে রিসেপশনে প্রবেশ করে প্রথম পর্বে আপনি ডাক্তারের চেম্বারে যাবেন। ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লিখে পাঠাবে উপরতলায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেখান থেকে রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারকে দেখানোর পর ডাক্তার বলবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন। হাসপাতালে ভর্তি হবেন আপনি। তারপর চিকিৎসা চলাকালীন এই ত্রিচক্রযান অব্যাহতভাবে চলতে থাকবে যতদিন একটা চক্র সম্পন্ন না হচ্ছে। একেকটি সম্পূর্ণ চক্র হলো সুস্থ অথবা মৃত অবস্থায় বাড়ি ফেরা। সেখানেও তিনটি সম্ভাবনা আছে।
১. খুব সৌভাগ্যবান হলে অর্থ ব্যয় শেষে বাড়ি সুস্থ হয়ে ফিরতে পারে রোগী।
২. ভাগ্যবান না হলে সুস্থ না হয়ে আরো জটিল অবস্থায় পড়ে যেতে পারে।
৩. আর খুব দুর্ভাগা হলে সকল সম্পদ ব্যয় করে পরিবারকে পথে বসিয়ে পরপারে চলে যেতে পারে।

এর বাইরে আরো একটি সম্ভাবনা আছে। ধরে নিলাম হাসপাতাল, ডাক্তার, ডায়াগনস্টিক সেন্টার সবকিছু ঠিক আছে। তার পরেও ওষুধের ভেজালে মারা পড়তে পারেন আপনি কিংবা অঙ্গ হারাতে পারেন। আসলে সস্তায় মৃত্যুবরণ করাও একটা সৌভাগ্য হিসেবে ধরা হয় অনেক ক্ষেত্রে।

চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে কাফকা কিছু লিখেছেন কিনা জানি না। যদি কাফকা এই মুহুর্তে বাংলাদেশে জন্মাতেন তাহলে হয়তো আরেকটি মহাকাব্যিক অমানবিক আখ্যান পড়ার সৌভাগ্য হতো বিশ্ববাসীর।


Sunday, April 2, 2017

মহাকালের খাতায় মানব সভ্যতা

অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী। তবু মাঝে মাঝে সেই ভয়ংকরের চর্চা করতে হয় নতুন জ্ঞান উন্মোচনের স্বার্থে।
টুকরো টুকরো পাঠাভ্যাসের পাশাপাশি যেসব চিন্তা তাৎক্ষণিকভাবে ঘুরপাক খায় তা পরবর্তী অধ্যায়ে গিয়ে হারিয়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই হারিয়ে যাওয়া ভাবনাগুলো ফিরে আসে না। টুকরো টুকরো চিন্তাগুলোকে লন্ড্রির স্লিপের মতো গেঁথে রাখার জন্য মাঝে মাঝে হাতের কাছে কাগজ কলম নিয়ে পড়তে বসা হয়। মানবজাতির উপকারে আসবে না এসব তুচ্ছজ্ঞান। শুধু নিজেকে শোনাবার জন্য এই অল্পবিদ্যাগুলো সুতোয় গেঁথে রাখা।


জাতীয়তাবাদী দানব
মানুষের জাতীয়তাবাদের ধারণাটা আপেক্ষিক। জাতীয়তাবাদী ঐক্যের মূল উৎস হলো নিজ গোত্রের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বন্ধন। এই ঐক্যের পরিধিও নিজ নিজ স্বার্থের উপর নির্ভরশীল। গ্রামপ্রীতি, জেলাপ্রীতি, দেশপ্রীতি, ভাষাপ্রীতি, ধর্মপ্রীতি, গোত্রপ্রীতি সব একই সামাজিক সুত্রে গ্রোথিত। আরো বৃহত্তর অর্থে মহাদেশপ্রীতি কিংবা সমস্ত পৃথিবীকে একটি ইউনিট ধরে গ্রহপ্রীতিও হতে পারে। যদি সূর্যকে কেন্দ্রবিন্দু ধরি তাহলে সৌরজগত প্রীতি, ছায়াপথকে আমাদের অংশ ধরে গ্যালাক্সিপ্রীতিও একই অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে।

আমরা জানি না মহাবিশ্বে আরো কতগুলো সভ্যতা আছে, সমাজ আছে। যদি জানা যেতো তাহলে এই বৃহত্তর জাতীয়তাবোধ নিয়ে আরো বিশদ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা যেতো। আবার জাতীয়তাবোধকে কোন কোন ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা বলা যায়। যখন সে জাতীয়তা অপরাপর জাতি বা গোত্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। জার্মানীতে নাৎসী জাতীয়তাবোধ একটি উদাহরণ হতে পারে। সেরকম মতবাদ ভিত্তিক জাতীয়তাবোধ পৃথিবীর জন্য অনেক ক্ষেত্রেই ধ্বংস ডেকে এনেছে। অতীতের ধর্মযুদ্ধগুলো এবং বর্তমানে জঙ্গীবাদী সন্ত্রাসবাদ সেই একই সুত্রে গাঁথা। এই ধরনের ভাবনাগুলোর জন্য বিশেষ কোন গ্রন্থের প্রয়োজন হয় না, একটি সুস্থ চিন্তার ক্ষমতা সম্পন্ন যৌক্তিক মস্তিষ্ক হলেই চলে।


ছিল অধিবাসী, হয়ে গেল আদিবাসী
মাত্র কয়েকশো বছর আগে কেমন ছিল মানব জাতি? ইউরোপ তখন মাত্র অন্ধকার কাটিয়ে আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে। নৌ প্রযুক্তির সহায়তায় মহাসাগর পাড়ি দেবার সাহস অর্জন করে প্রথমবারের মতো। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে পাল তোলে দূর দেশে। সারা পৃথিবী আবিষ্কারের জন্য বের হয়নি ওরা। বের হয়েছিল ভারতে যাবার বাণিজ্য পথ আবিষ্কার করতে। সেই চেষ্টার প্রথম ফল কলম্বাসের হাতে আমেরিকা 'আবিষ্কার'। তারপর ভাস্কো দা গামার হাতে ভারতে পৌঁছানোর জলপথ আবিষ্কার। মূলতঃ এই দুজনের হাত ধরে সমস্ত ইউরোপের বৃহৎ শক্তিগুলো আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে একের পর এক উপনিবেশ গড়ে তুলেছে বিশ্বজুড়ে।  দখল করেছে একেকটি মহাদেশ। এশিয়া দখল করতে না পারলেও কলোনী নামের দাসত্ব শৃংখল পরিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু আটলান্টিক মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তের দুটো মহাদেশ থেকে বিদ্যমান সকল সভ্য রাজ্যকে শক্তি বলে উচ্ছেদ করে একেবারে নিজেদের দেশ বলে দখল করে নিয়েছে। কয়েক কোটি মানুষকে হত্যা করেছে যার ওই দেশগুলোর আদি অধিবাসী ছিল। যদিও তাদের তথাকথিত আবিষ্কারের আগেই ওখানে সভ্যতা হাজার বছর ধরে বিরাজ করছিল, তবু শত শত বছর ধরে নির্লজ্জের মতো প্রচার করে গেছে ইউরোপীয়ান আবিষ্কারের বীরত্বগাঁথা যেটা ছিল মূলতঃ আগ্রাসন এবং দস্যুতা। সভ্যতার দাবীদার ইউরোপীয়ান শক্তিগুলো একবারও দুঃখপ্রকাশ করেনি এই আগ্রাসনের জন্য। স্বীকার করেনি কতগুলো প্রাচীন সভ্যতা ধ্বংস করে দিয়েছে সেই তথাকথিত আবিষ্কারের মাধ্যমে।

ভারত মহাসাগর পেরিয়ে এশিয়াতে পৌঁছেও তাই করতো যদি ভারতে প্রতিষ্ঠিত কোন সাম্রাজ্য না থাকতো। তবু কী কামড় দেয়নি? দিয়েছে, অন্যভাবে। এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোতে প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য থাকা সত্ত্বেও ভারতবর্ষের ক্ষমতাসীন রাজা বাদশাদের দ্বিধাবিভক্তি আর অন্তর্কোন্দলের সুযোগ নিয়ে ইউরোপীয়ানরা তাদের সাম্রাজ্যবাদী হাত বিস্তার করার প্রতিযোগীতা করে গেছে।

সারাবিশ্ব জুড়ে ইউরোপীয় সাম্রাজ্য বিস্তারের জয়জয়কারের যুগে উত্তর আর দক্ষিণ আমেরিকায় বিজয়ী হয়েছিল পর্তুগীজ স্পেনিশরা এবং উত্তর আমেরিকায় বিজয়ী হয়েছিল ইংরেজ। এশিয়ায় অপরাপর ইউরোপীয় শক্তি পরিপূর্ণ সফলতা অর্জন না করলেও ইংরেজ ব্যর্থ হয়নি। সফলতা অর্জন করেছিল সুক্ষ্ণ রাজনৈতিক বুদ্ধি প্রয়োগ করে। এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে তৈরী হয়েছিল দীর্ঘমেয়াদী বৃটিশ উপনিবেশ।

এই গ্রহটিকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভোগ দখল করে গেছে ইউরোপ। এশিয়া, আমেরিকা(উত্তর-দক্ষিণ) এবং আফ্রিকা। ওরা এশিয়াকে বানিয়েছিল বাণিজ্য শোষণ কেন্দ্র, আফ্রিকা ছিল খনিজ সম্পদ আর দাস সরবরাহ কেন্দ্র, আর আমেরিকার দুটি মহাদেশেই কোটি কোটি জনগোষ্ঠিকে মেরে কেটে নিঃশেষ করে নিজেদের নামে লিখে নিয়েছিল। বাড়িওয়ালাদের ভাড়াটে বানিয়ে রাখাও এর চেয়ে অনেক কম নিষ্ঠুরতা হতো। বেঁচে থাকতেই দেয়নি কাউকে।

আলাস্কা থেকে টেরা-ডেল ফুয়েগো পর্যন্ত দুই মহাদেশজুড়ে যারা ছিল জাতি, তারা হয়ে গেল উপজাতি। যারা ছিল ভূখণ্ডের অধিবাসী, তারা হয়ে গেল আদিবাসী। আজটেক থেকে ইনকা সবখানে একই পদ্ধতিতে একেকটি প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা বিনাশ করে আবিষ্কারের ইতিহাস লেখা হয়েছে পাঁচশো বছর ধরে। অথচ ইউরোপের চেয়ে অনেক প্রাচীন সভ্যতার অধিকারী আমেরিকার আদিবাসিন্দারা।


Norte Chico: একটি অচেনা প্রাচীন সভ্যতা

দক্ষিণ আমেরিকার নর্তে চিকো(Norte Chico) নামে লুপ্ত হয়ে যাওয়া একটি সভ্যতার আবিষ্কার হয়েছে বেশ কিছু কাল আগে।  এই সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলোর একটি। এটি প্রায় ৯০০০ বছর পুরোনো। এখানে যে পিরামিড আবিষ্কৃত হয়েছে তার বয়স ৫০০০ বছরের কম নয়। মিশরের পিরামিড আর এই পিরামিডের সময়কাল কাছাকাছি। পেরুর কারাল নগরীতে এই সভ্যতার সন্ধান পাওয়া গেছে।  এটি অতি শুষ্ক একটি মরু অঞ্চল। যেখানে জীবনধারণ করার মতো যথেষ্ট উপকরণ বিদ্যমান নেই সেখানে এমন একটি সভ্যতা গড়ে ওঠা আ্শ্চর্যজনক। হয়তো সবসময় এরকম ছিল না পরিবেশ, পৃথিবী অনেক বদলে গেছে কয়েক হাজার বছরে। কারাল-সুপে অঞ্চলে গড়ে ওঠা এই সভ্যতাও ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু কেন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল এখনো জানা যায়নি। এই সভ্যতার সাথে ইনকা সভ্যতার কোন যোগ সুত্র ছিল কিনা তাও জানে না কেউ।

একেকটা সভ্যতা কেন ধ্বংস হয়ে যায় তার সব সুত্র কী ইতিহাসে রেখে যায়? একটা সভ্যতা থেকে আরেকটা সভ্যতার দূরত্ব কয়েক হাজার বছর হয়ে যায়। ফলে মাঝখানে অনেক সুত্র হারিয়ে যায়। আমরা এখন যে সভ্যতা যাপন করছি তার আয়ু আর কতো বছর আমরা কেউ জানি? কোন সভ্যতা যত শক্তিশালীই হোক না কেন তা অবিনশ্বর থেকে যাবে চিরকাল, এটা কেউ বলতে পারবে না। মহাজাগতিক বিবর্তনে তো বটেই, এমনকি এই গ্রহের ভৌগলিক বিবর্তনের পারিপার্শ্বিক বিচারেও আমাদের সভ্যতা অনেকটা নাজুক। মাত্র ৫০ মিটার জলোচ্ছ্বাস কিংবা ১০ মাত্রার ভূমিকম্পেও পৃথিবীর অধিকাংশ জনগোষ্ঠি নাই হয়ে যেতে পারে। এই সভ্যতা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না অর্ধশতক আগেও। ইউরোপীয়ানদের লেশমাত্র ধারণা ছিল না তাদের মহাদেশ আবিষ্কারের আরো কয়েক হাজার বছর আগে সেখানে বিদ্যমান ছিল আধুনিক একটি সভ্যতা।


মাপুচে: এখনো নিঃশেষিত হয়নি যে আদিবাসী জাতি

দক্ষিণ আমেরিকায় ইউরোপীয়ান আগ্রাসনের পরেও সর্বশেষ টিকে থাকা আদিবাসী জাতি মাপুচে(Mapuche)। মাপুচে এমন এক দুর্দমনীয় জাতি, যাদেরকে ইনকা থেকে স্পেনিয়ার্ড শক্তি কেউ পুরোপুরি করায়ত্ত করতে পারেনি। ধ্বংস হতে হতেও এরা বারবার উঠে দাড়িয়েছে। সর্বশেষ হিসেবে মাপুচে জনগোষ্ঠী চিলির মোট জনসংখ্যার প্রায় দশ ভাগ। তাদের নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি ইত্যাদি টিকিয়ে রাখার জন্য এখনো অবিরাম আন্দোলন করে যাচ্ছে। সমগ্র আমেরিন্দিয়ান জাতিগোষ্ঠির মধ্যে মাপুচে একমাত্র জাতি যারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে প্রবল প্রতিকূল আগ্রাসন সত্ত্বেও। স্পেনিশরা চিলি দখল করার পরও মাপুচেদের পরাস্ত করতে পারেনি। সান্টিয়াগোর দক্ষিণে চিলির যে আংশটা মাপুচেদের দখলে ছিল সেটা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ  চলেছে মাপুচেদের সাথে। ষোড়শ শতক থেকে উনিশ শতকব্যাপী সাড়ে তিনশো বছরের যুদ্ধ। পৃথিবীর ইতিহাসে এত দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের নজির আর একটিও নেই। সর্বশক্তি হারিয়ে শেষমেষ পরাজয় মেনে নেয় উনিশ শতকে এসে। পরাজয় মেনে নিলেও এখনো ভাষার অধিকারের জন্য সংগ্রাম করছে চিলি সরকারের সাথে। ভাষার অধিকারের পাশাপাশি স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের স্বপ্নও মাথাচাড়া দিয়েছে দুই মিলিয়ন জনগোষ্ঠির এই জাতির মধ্যে। একদিন এই দেশটি ওদেরই ছিল। মাপুচে স্বপ্ন এখনো পাহাড়ে পাহাড়ে খুঁজে বেড়ায় লোটারো (Lautaro) নামের প্রাচীন বীর যোদ্ধাকে। যে তার জীবন দিয়ে স্পেনিশদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে গেছে কয়েকশো বছর আগে।


তবুও সভ্যতা যেখানে আংশিক সভ্য হয়েছে
সভ্যতার বিবর্তনের সাথে মানুষের অন্ততঃ একটা উন্নতি হয়েছে। পাঁচশো বছর আগে একটা জাহাজে করে নতুন কোন ভূখণ্ডে নেমে প্রথম চিন্তাটি ছিল কিভাবে ভূখণ্ডটি কব্জা করা যায়। ওখানে যারা বাস করে তাদের কিভাবে উৎখাত করা যায়। কিন্তু এই মানসিকতা সার্বজনীন ছিল না। অল্প কিছু জাতিগোষ্ঠী যাদের বাহুবলের সাথে প্রযুক্তিবল যুক্ত হতে শুরু করেছিল সেই ইউরোপের কয়েকটি দেশ সারা পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তারের যে হাত ছড়িয়ে দিয়েছিল। তাদের হাতে প্রায় সমস্ত পৃথিবী পদানত হয়েছিল। পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলে পদার্পন করে একই বর্বর মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে। সে জনগোষ্ঠী যত উন্নত যত সভ্যই হোক না কেন, গায়ের জোরে পরাজিত করতে পারলেই সেই ভূখণ্ডের উপর অধিকার জন্মে যেতো তাদের। বিশ শতকে এসে ওই জাতিগুলো অন্তত এতটুকু সভ্য হয়েছে যে তারা কোন দেশে প্রবেশ করার সময় পাসপোর্ট ভিসা নিয়ে প্রবেশ করে। বিশ্বজুড়ে শক্তিমানদের সামরিক বা অর্থনৈতিক যেসব আগ্রাসন এখনো বিদ্যমান তাতে অন্ততঃ কিছু খোঁড়া অজুহাত যুক্ত থাকে। সেই খোঁড়া অজুহাতগুলোকে বৈধতা দেবার জন্য জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠান কার্যকরী হাতুড়ি নিয়ে সদাপ্রস্তুত।


মহাকালের শ্যাওলা যখন গর্বিত মানব সভ্যতা

এই গ্রহের মধ্যে মানুষ নামের প্রাণীটার সভ্যতার বয়স এক লাখ বছরও গড়ায়নি। এক কোটি বছরের মধ্যে কয়েকটি প্রাণী সভ্যতার সৃষ্টি ও বিনাশ খুব সম্ভব। কিন্তু ডায়নোসরদের হিসেবটা আমলে আনলে কোটি বছরও খুব বেশী না। তারা প্রায় বিশ কোটি বছর আগে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়িয়েছে এবং ধ্বংস হয়েছে সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে। মাত্র দশ কিলোমিটার প্রস্থের অখ্যাত একটা উল্কার আঘাতে। সে আঘাতের পর তাবৎপ্রাণীকূলের ৭৫ ভাগ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ডায়নোসরকূল ধ্বংস হবার পর পৃথিবীটা কতো শতবার রূপ আর প্রকৃতি বদল দেখেছে সেটা মহাকাল বাদে কেউ জানে না। সুতরাং মাত্র কয়েকশো বছর বয়সী এইসব আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে কেউ যদি মানবজাতির আস্ফালন দেখে হেসে ফেলে তাকে দোষ দেয়া যায় না। টিকে থাকার গর্ব যদি কেউ করতে পারে সেটা ডায়নোসর সমাজ। সমগ্র মানবজাতির ইতিহাসের যোগফল এক কোটি বছর দূরে থাক, এক লাখ বছরও দীর্ঘায়িত করতে পারবে না কেউ। যেটুকু সময়কে আমরা মানব সভ্যতার বয়স বলে থাকি, সেই সময়টা মহাকালের এক টুকরো নগন্য শ্যাওলা মাত্র। সারা জনম ধরে মতলব আর মতবাদের দাঙ্গাবাজি না করে মানুষের সাড়ে সত্তুর বছরের আয়ুটা একটু শান্তিতে কাটাতে দিলে হয় না?


অনিবার্য পাদটীকা:
মানুষের অর্জিত জ্ঞানের পরিধি এখনো খুব সীমিত। সময়ের সাথে ক্রমাগত উন্মোচিত হচ্ছে নতুন নতুন সত্য। একশো বছর আগের জ্ঞানের সাথে একশো বছর পরের জ্ঞানের পার্থক্য যোজন যোজন। চুড়ান্ত উপসংহারে পৌঁছে যাবার মতো পরিপূর্ণ তথ্য এখনো করায়ত্ত হয়নি মানুষের। প্রতিষ্ঠিত লব্ধ বিশ্বাস হুমড়ি খেয়ে পড়ার মতো সত্যের মুখোমুখি হবার অনেক সম্ভাবনা অনাগত ভবিষ্যতে অপেক্ষমান।