Wednesday, August 29, 2012

পনেরো আনা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবিঠাকুর আসলেই গুরু মানুষ। নইলে এরকম একটা লেখা তার কলম দিয়ে বেরুতো না। এই লেখা তাঁকে চেনার জন্য, জানার জন্য। পারলে এই লেখাটা আমি বাংলাদেশের কোন পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতাম।


------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

পনেরো আনা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


   যে লোক ধনী, ঘরের চেয়ে তাহার বাগান বড়ো হইয়া থাকে। ঘর অত্যাবশ্যক; বাগান অতিরিক্ত, না হইলেও চলে। সম্পদের উদারতা অনাবশ্যকেই আপনাকে সপ্রমাণ করে। ছাগলের যতটুকু শিং আছে তাহাতে তাহার কাজ চলিয়া যায়, কিন্তু হরিণের শিঙর পনেরো-আনা অনাবশ্যকতা দেখিয়া আমরা মুগ্ধ হইয়া থাকি। ময়ুরের লেজ যে কেবল রঙচঙে জিতিয়াছে তাহা নহে, তাহার বাহুল্যগৌরবে শালিক-খঞ্জন-ফিঙার পুচ্ছ লজ্জায় অহরহ অস্থির।

   যে মানুষ আপনার জীবনকে নিঃশেষে অত্যাবশ্যক করিয়া তুলিয়াছে সে ব্যক্তি আদর্শপুরুষ সন্দেহ নাই, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তাহার আদর্শ অধিক লোকে অনুসরণ করে না; যদি করিত তবে মনুষ্যসমাজ এমন একটি ফলের মতো হইয়া উঠিত যাহার বিচিই সমস্তটা, শাঁস একেবারেই নাই। কেবলই যে লোক উপকার করে তাহাকে ভালো না বলিয়া থাকিবার জো নাই; কিন্তু যে লোকটা বাহুল্য, মানুষ তাহাকে ভালোবাসে।

   কারণ, বাহুল্যমানুষটি সর্বতোভাবেই আপনাকে দিতে পারে। পৃথিবীর উপকারী মানুষ কেবল উপকারের সংকীর্ণ দিক দিয়াই আমাদের একটা অংশকে স্পর্শ করে। সে আপনার উপকারিতার মহৎ প্রাচীরের দ্বারা আর-সকল দিকেই ঘেরা; কেবল একটি দরজা খোলা--সেখানে আমরা হাত পাতি, সে দান করে। আর, আমাদের বাহুল্যলোকটি কোনো কাজের নহে, তাই তাহার কোনো প্রাচীর নাই। সে আমাদের সহায় নহে, সে আমাদের সঙ্গীমাত্র। উপকারী লোকটির কাছ হইতে আমরা অর্জন করিয়া আনি এবং বাহুল্যলোকটির সঙ্গ মিলিয়া আমরা খরচ করিয়া থাকি। যে আমাদের খরচ করিবার সঙ্গী সে-ই আমাদের বন্ধু।

   বিধাতার প্রসাদে হরিণের শিং ও ময়ূরের পুচ্ছের মতো সংসারে আমরা অধিকাংশ লোকই বাহুল্য, আমাদের অধিকাংশেরই জীবন জীবনচরিত লিখিবার যোগ্য নহে, এবং সৌভাগ্যক্রমে আমাদের অধিকাংশেরই মৃত্যুর পরে পাথরের মূর্তি গড়িবার নিষ্ফল চেষ্টায় চাঁদার খাতা দ্বারে দ্বারে কাঁদিয়া ফিরিবে না।    

   মরার পরে অল্প লোকই অমর হইয়া থাকেন, সেইজন্যই পৃথিবীটা বাসযোগ্য হইয়াছে। ট্রেনের সব গাড়িই যদি রিজার্ভ গাড়ি হইত তাহা হইলে সাধারণ প্যাসেঞ্জারদের গতি কি হইত? একে তো বড়োলোকেরা একাই একশো--অর্থাৎ, যতদিন বাঁচিয়া থাকেন ততদিন অন্তত তাহাদের ভক্ত ও নিন্দুকের হৃদয়ক্ষেত্রে শতাধিক লোকের জায়গা জুড়িয়া থাকেন--তাহার পরে আবার মরিয়াও তাঁহারা স্থান ছাড়েন না। ছাড়া দূরে থাক, অনেকে মরার সুযোগ লইয়া অধিকার বিস্তার করিয়াই থাকেন। আমাদের একমাত্র  রক্ষা এই যে, ইহাদের সংখ্যা অল্প। নহিলে কেবল সমাধিস্তম্ভে সামান্য ব্যক্তিদের কুটিরের স্থান থাকিত না। পৃথিবী এত সংকীর্ণ যে জীবিতের সঙ্গ জীবিতকে জায়গার জন্য লড়িতে হয়। জমির মধ্যেই হউক বা হৃদয়ের মধ্যই হউক, অন্য পাঁচজনের চেয়ে একটুখানি ফলাও অধিকার পাইবার জন্য কত লোকে জাল-জালিয়াতি করিয়া ইহকাল পরকাল খোয়াইতে উদ্যত। এই যে জীবিতে জীবিতে লড়াই ইহা সমকক্ষের লড়াই, কিন্তু মৃতের সঙ্গ জীবিতের লড়াই বড়ো কঠিন। তাহারা এখন সমস্ত দুর্বলতা, সমস্ত খন্ডতার অতীত; তাহারা কল্পলোকবিহারী--আমরা মাধ্যাকর্ষণ কৈশিকাকর্ষণ এবং বহুবিধ আকর্ষণ-বিকর্ষণের দ্বারা পীড়িত মর্তমানুষ, আমরা পারিয়া উঠিব কেন? এইজন্যই বিধাতা অধিকাংশ মৃতকেই বিস্মৃতলোকে নির্বাসন দিয়া থাকেন, সেখানে কাহারো স্থানাভাব নাই। বিধাতা যদি বড়ো বড়ো মৃতের আওতায় আমাদের মতো ছোটো ছোটো জীবিতকে নিতান্তই বিমর্ষ-মলিন, নিতান্তই কোণঘেঁষা করিয়া রাখিবেন, তবে পৃথিবীতে এমন  উজ্জ্বল সুন্দর করিলেন কেন--মানুষের হৃদয়টুকু মানুষের কাছে এমন একান্তলোভনীয় হইল কী কারণে?

   নীতিজ্ঞেরা আমাদিগকে নিন্দা করেন। বলেন, আমাদের জীবন বৃথা গেল। তাঁহারা আমাদিগকে তাড়না করিয়া বলিতেছেন--উঠ, জাগো, কাজ করো, সময় নষ্ট করিয়ো না।

   কাজ না করিয়া অনেকে সময় নষ্ট করে সন্দেহ নাই; কিন্তু কাজ করিয়া যাহারা সময় নষ্ট করে তাহারা কাজও নষ্ট করে, সময়ও নষ্ট করে। তাহাদের পদভারে পৃথিবী কম্পান্বিত এবং তাহাদেরই সচষ্টতার হাত হইতে অসহায় সংসারকে রক্ষা করিবার জন্য ভগবান বলিয়াছেন, "সম্ভবামি যুগে যুগে।'

   জীবন বৃথা গেল। বৃথা যাইতে দাও। অধিকাংশ জীবনই বৃথা যাইবার জন্য হইয়াছে। এই পনেরো-আনা অনাবশ্যক জীবনই বিধাতার ঐশ্বর্য সপ্রমাণ করিতেছে। তাঁহার জীবনভাণ্ডারে যে দৈন্য নাই, ব্যর্থপ্রাণ আমরাই তাহার অগণ্য সাক্ষী। আমাদের অফুরান অজস্রতা, আমাদের অহেতুক বাহুল্য দেখিয়া বিধাতার মহিমা স্মরণ করো। বাঁশি যেমন আপন শূন্যতার ভিতর দিয়া সংগীত প্রচার করে, আমরা সংসারের পনেরো-আনা আমাদের ব্যর্থতার দ্বারা বিধাতার গৌরব ঘোষণা করিতেছি। বুদ্ধ আমাদের জন্যই সংসার ত্যাগ করিয়াছেন, খৃস্ট আমাদের জন্য প্রাণ দিয়াছেন, ঋষিরা আমাদের জন্য তপস্যা করিয়াছেন, এবং সাধুরা আমাদের জন্য জাগ্রত রহিয়াছেন।

   জীবন বৃথা গেল। যাইতে দাও। কারণ, যাওয়া চাই। যাওয়াটাই একটা সার্থকতা। নদী চলিতেছে--তাহার সকল জলই আমাদের স্নানে এবং পানে এবং আমন-ধানের ক্ষেতে ব্যবহার হইয়া যায় না। তাহার অধিকাংশ জলই কেবল প্রবাহ রাখিতেছে। আর-কোনো কাজ না করিয়া কেবল প্রবাহরক্ষা করিবার একটা বৃহৎ সার্থকতা আছে। তাহার যে জল আমরা খাল কাটিয়া পুকুরে আনি তাহাতে স্নান করা চলে, কিন্তু তাহা পান করি না; তাহার যে জল ঘটে করিয়া আনিয়া আমরা জালায় ভরিয়া রাখি তাহা পান করা চলে, কিন্তু তাহার উপরে আলোছায়ার উৎসব হয় না। উপকারকেই একমাত্র সাফল্য বলিয়া জ্ঞান করা কৃপণতার কথা, উদ্দেশ্যকেই একমাত্র পরিণাম বলিয়া গণ্য করা দীনতার পরিচয়।

   আমরা সাধারণ পনেরো-আনা, আমরা নিজেদের যেন হেয় বলিয়া না জ্ঞান করি। আমরাই সংসারের গতি। পৃথিবীতে, মানুষের হৃদয়ে আমাদের জীবনস্বত্ব। আমরা কিছুতেই দখল রাখি না, আঁকড়িয়া থাকি না, আমরা চলিয়া যাই। সংসারের সমস্ত কলগান আমাদের দ্বারা ধ্বনিত, সমস্ত ছায়ালোক আমাদের উপরেই স্পন্দমান। আমরা যে হাসি, কাঁদি, ভালোবাসি--বন্ধুর সঙ্গ অকারণ খেলা করি--স্বজনের সঙ্গ অনাবশ্যক আলাপ করি--দিনের অধিকাংশ সময়ই চারি পাশের লোকের সহিত  উদ্দেশ্যহীনভাবে যাপন করি, তার পরে ধুম করিয়া ছেলের বিবাহ দিয়া তাহাকে আপিসে প্রবেশ করাইয়া পৃথিবীতে কোনো খ্যাতি না রাখিয়া মরিয়া পুড়িয়া ছাই হইয়া যাই--আমরা বিপুল সংসারের বিচিত্র তরঙ্গলীলার অঙ্গ; আমাদের ছোটোখাটো হাসিকৌতুকেই সমস্ত জনপ্রবাহ ঝল্‌মল্‌ করিতেছে; আমাদের ছোটোখাটো আলাপে বিলাপে সমস্ত সমাজ মুখরিত হইয়া আছে।

   আমরা যাহাকে ব্যর্থ বলি প্রকৃতির অধিকাংশই তাই। সূর্যকিরণের বেশির ভাগ শূন্যে বিকীর্ণ হয়, গাছের মুকুল অতি অল্পই ফল পর্যন্ত টিঁকে। কিন্তু সে যাঁহার ধন তিনিই বুঝিবেন। সে ব্যয় অপব্যয় কি না বিশ্বকর্মার খাতা না দেখিলে তাহার বিচার করিতে পারি না। আমরাও তেমনি অধিকাংশই পরস্পরকে সঙ্গদান ও গতিদান ছাড়া আর-কোনো কাজে লাগি না; সেজন্য নিজেকে ও অন্যকে কোনো দোষ না দিয়া ছট্‌ফট্‌ না করিয়া, প্রফুল্ল হাস্যে ও প্রসন্ন গানে সহজেই অখ্যাত অবসানের মধ্যে যদি শান্তিলাভ করি তাহা হইলেই সেই উদ্দেশ্যহীনতার মধ্যেই যথার্থভাবে জীবনের উদ্দেশ্যসাধন করিতে পারি।

   বিধাতা যদি আমাকে ব্যর্থ করিয়াই সৃষ্টি করিয়া থাকেন তবে আমি ধন্য; কিন্তু যদি উপদেষ্টার তাড়নায় আমি মনে করি আমাকে উপকার করিতেই হইবে, কাজে লাগিতেই হইবে, তবে যে উৎকট ব্যর্থতার সৃষ্টি করি, তাহা আমার স্বকৃত। তাহার জবাবদিহি আমাকে করিতে হইবে। পরের উপকার করিতে সকলেই জন্মাই নাই, অতএব উপকার না করিলে লজ্জা নাই। মিশনারী হইয়া চীন উদ্ধার করিতে না-ই গেলাম; দেশে থাকিয়া শেয়াল শিকার করিয়া ও ঘোড়দৌড়ে জুয়া খেলিয়া দিন-কাটানোকে যদি ব্যর্থতা বল, তবে তাহা চীন-উদ্ধার-চেষ্টার মতো এমন লোমহর্ষক নির্দারুণ ব্যর্থতা নহে।

   সকল ঘাস ধান হয় না। পৃথিবীতে ঘাসই প্রায় সমস্ত, ধান অল্পই। কিন্তু ঘাস যেন আপনার স্বাভাবিক নিষ্ফলতা লইয়া বিলাপ না করে--সে যেন স্মরণ করে যে, পৃথিবীর শুষ্ক ধূলিকে সে শ্যামলতার দ্বারা আচ্ছন্ন করিতেছে, রৌদ্রতাপকে সে চির-প্রসন্ন স্নিগ্ধতার দ্বারা কোমল করিয়া লইতেছে। বোধকরি ঘাসজাতির মধ্যে কুশতৃণ গায়ের জোরে ধান্য হইবার চেষ্টা করিয়াছিল; বোধ করি সামান্য ঘাস হইয়া না থাকিবার জন্য, পরের প্রতি একান্ত মনোনিবেশ করিয়া জীবনকে সার্থক করিবার জন্য, তাহার মধ্যে অনেক উত্তেজনা জন্মিয়াছিল; তবু সে ধান্য হইল না। কিন্তু সর্বদা পরের প্রতি তাহার তীক্ষ্ণ লক্ষ্য নিবিষ্ট করিবার একাগ্র চেষ্টা কিরূপ তাহা পরই বুঝিতেছে। মোটের উপর এ কথা বলা যাইতে পারে যে, এরূপ উগ্র পর-পরায়ণতা  বিধাতার অভিপ্রেত নহে। ইহা অপেক্ষা সাধারণ তৃণের খ্যাতিহীন স্নিগ্ধ-সুন্দর বিনম্র-কোমল নিষ্ফলতা ভালো।

   সংক্ষেপে বলিতে গেলে মানুষ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত--পনেরো-আনা এবং বাকী এক-আনা। পনেরো-আনা শান্ত এবং এক-আনা অশান্ত। পনেরো-আনা অনাবশ্যক এবং এক-আনা আবশ্যক। বাতাসে চলনশীল জ্বলনধর্মী অক্সিজেনের পরিমাণ অল্প, স্থির শান্ত নাইট্রোজেনই অনেক। যদি তাহার উল্‌টা হয় তবে পৃথিবী জ্বলিয়া ছাই হয়। তেমনি সংসারে, যখন কোনো এক-দল পনেরো-আনা এক-আনার মতোই অশান্ত ও আবশ্যক হইয়া উঠিবার উপক্রম করে তখন জগতে আর কল্যাণ নাই, তখন যাহাদের অদৃষ্টে মরণ আছে তাহাদিগকে মরিবার জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে।

মাঘ, ১৩০৯

Tuesday, August 28, 2012

লাইফ উইথ লিমিটেড ইন্টারনেট

একটা সময় ছিল যতক্ষণ অফিসে থাকতাম ততক্ষণ ইন্টারনেটে যুক্ত থাকতাম। মানে আমার পিসিটা সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট সংযোগ প্রাপ্ত ছিল। এক যুগেরও বেশী সময় এই সুবিধা নিয়ে কাজ করেছি। অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে ইন্টারনেট ঘুরে বেড়াতাম। গুগল, ফোরাম, ফেসবুক, ব্লগ ইত্যাদি ছিল প্রিয় বিষয়। কিন্তু একটা সময় এসে দেখা গেল কাজের ফাঁকে ফাঁকে আর ইন্টারনেটে ঘুরছি না। ইন্টারনেটের ফাঁকে ফাঁকে কাজ করছি। কখনো কখনো কাজই ভুলে যাচ্ছি। ফলে উপর মহল সিদ্ধান্ত নিল আমাকে ইন্টারনেটের ভয়াবহ নেশা থেকে রক্ষা করবে। সেই জন্য আমার ইন্টারনেট জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল কেজো ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত করে দিল। কাজের প্রতি আমার প্রবল অনীহা। কাজ না করতে করতে আমি ভুলেই গেছি কি আমার কাজ। প্রতিদিন কেন অফিসে আসি আমি জানি না। বাসার সামনে অফিসের গাড়িটা এসে দাঁড়ায় সকাল পৌনে সাতটায়, আমি প্রতিদিন তাতে চড়ে অফিসে আসি। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় আবার অফিসের নীচে নামি, গাড়িটা আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যায়। মাঝখানের সময়টুকু আমি কেন অফিসে থাকি এটা বুঝতে পারছি না। ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পর আমার মস্তিষ্ক আর ঠিকভাবে কাজ করছে না। আমি পিসি খুলে মনিটরের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকি, মেইল চেক করি, কেজো মেইল, কেজো মেইলের মতো বিরক্তিকর জিনিস দুনিয়াতে আছে কিনা জানি না। এরা পারে কেবল কলিজায় একটু পর পর খামচি দিতে। এই খাইছি তোরে, পাইছি তোরে.......পালাবি কোথায়? ইত্যাদি নানারকমের বিদঘুটে ইঙ্গিতময় খবর আসে। আর আমি দিন দিন দুর্বল হয়ে যাই। জিমেইলে ঢুকতে পারি না, বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারি না, ব্লগে ঢুকতে পারি না, লেখালেখি করতে পারি না, ফেসবুকে ঢুকতে পারি না, স্ট্যাটাস দিতে পারি না। জীবনে আর বাকী রইল কি। আমার পুরো বিশ্বটা সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে হঠাৎ করে। এই সীমাবদ্ধ জীবনে বাঁচার ইচ্ছেটাও উবে যায় মাঝে মাঝে।

প্রথমঃ মানুষ বাঁচে বাতাস মানে অক্সিজেন দিয়ে
দ্বিতীয়ঃ মানুষ বাঁচে পানি দিয়ে
তৃতীয়তঃ মানুষ বাঁচে ভাত খেয়ে
চতুর্থত মানুষ বাঁচে জীবিকা দিয়ে
পঞ্চমতঃ মানুষ বাঁচে স্বচ্ছলতা দিয়ে
ষষ্ঠতঃ মানুষ বাঁচে স্বাচ্ছন্দ্য দিয়ে


এখানে ছয়টি বাঁচার মধ্যে একটা ধারাবাহিক সম্পর্ক আছে। যার বাতাস আছে সে চায় পানি। যার পানি আছে সে চায় ভাত। যার ভাত আছে সে চায় নিয়মিত আয়/জীবিকা। যার জীবিকা ঠিক আছে সে চায় স্বচ্ছলতা। যার স্বচ্ছলতা আছে সে চায় স্বাচ্ছন্দ্য জীবন।

পৃথিবীতে জীবিত সব মানুষ প্রথম তিনটির অন্তর্ভুক্ত। অনাহারে মারা যাবে কিংবা যাচ্ছে সেরকম কিছু মানুষ বাদ দিলে ৭০০ কোটি মানুষই প্রথম তিনটি দলের অন্তর্ভুক্ত। তার এক ধাপ উপরে আছে জীবিকা। মানে আয়ের একটা উৎস আছে এদের। এরকম মানুষের সংখ্যা ৮৫ শতাংশ ধরলে ১৫ শতাংশকে কর্মহীন ধরা যায়। পনের শতাংশ কর্মহীন মানুষও ভাত খেয়ে বেচে আছে কোনমতে। ৮৫ শতাংশের মধ্যে স্বচ্ছলতা আছে হয়তো ৩০ শতাংশের। ৫৫ শতাংশ কোনমতে জীবিকা নির্বাহ করে বেঁচে থাকে। ৩০ শতাংশের মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে বেঁচে আছে কতো শতাংশ? যারা ঘরের খেয়ে ইন্টারনেট গুঁতানোর সময় পায় তাদেরকে নিশ্চয়ই স্বাচ্ছন্দ্য গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। সেই স্বাচ্ছন্দ্য গ্রুপের একাংশ বাঁচে ইন্টারনেট দিয়ে!

আমার এত ভণিতার উদ্দেশ্য এই দলকে নিয়ে যারা অক্সিজেনের দুটি মৌলিক উপাদানের মধ্যে ইন্টারনেটও যুক্ত করে দিয়েছে এটাকে H2ONET(এইচটুওনেট) বলা যায়।
এই দলটার বায়ু পানি ইন্টারনেট ছাড়া বাঁচে না। কিংবা বাঁচাটা দুর্ভোগ হিসেবে দেখে।  আমি দিনে যতটা সময় বসে থাকি ততক্ষণ ইন্টারনেট থাকা চাই। এমন না যে ইন্টারনেট থাকলেই আমি কাজ করে উড়িয়ে ফেলছি। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য যেমন অক্সিজেন চাই, তেমনি বসে থাকার জন্য ইন্টারনেট চাই। শুয়ে গেলে, কিংবা ঘুমোতে গেলে, কিংবা রাস্তায় থাকলে ইন্টারনেট না থাকুক সমস্যা নাই। কিন্ত আমি ডেস্কে আছি, কিন্তু ইন্টারনেট নেই, এটা দুঃসহ। ইন্টারনেট ছাড়া দিনের আটঘন্টা অফিসে কাজ করেছি, তেমন নজীর গত একযুগে নেই। এতদিন পর খেয়াল করলাম, মানুষ আটঘন্টা ডেস্কে বসে কাজ করে কিভাবে? আমাকে তো ডেস্কে বসিয়ে রাখে ইন্টারনেট সংযোগ। বাকীদের?




সার্কিট হাউস রোড

"হারামীর বাচ্চা হারামী!!"

মেজাজটা বিলা হয়ে গেছে। সেই কখন ভাত খাইছি এখনো বিকালের নাস্তা করি নাই। বিকালের নাস্তাটা কি হবে তা অবশ্য ঠিক করা হয়নি। বিকালের নাস্তাটা সবসময়ই অনিশ্চিত থাকে। কখনো কলামুড়ি, কখনো বনরুটি- চা,কখনো কাবাব পরোটাও টুপ করে জুটে যায়।

এই রাস্তায় কেবল আমার রাজত্ব। এখানে আর কেউ আসবে না। বলা আছে, অন্য কেউ আসলে ঠ্যাং ভেঙ্গে হাতে ঝুলিয়ে দেয়া হবে। সেই কাজটা আমাকে করতে হবে না। করার লোক আছে। আমাকে শুধু আওয়াজ দিতে হবে গলা উঁচিয়ে। সাথে সাথে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। লাইসেন্স ছাড়া কেউ এখানে আসতে পারবে না।

স্টেডিয়াম থেকে কাজীর দেউড়ি মোড় ভিআইপি এলাকা। এদিকে যেসব গাড়ি চলে, যেসব গাড়ি থামে তার প্রায় সবাই শহরের কর্তামানুষের। এই রাস্তায় গাড়ি দাড় করায় বড়লোকের উড়ন্ত ছেলেমেয়েরা। সারিবদ্ধ কাবাবের দোকান রাস্তার পাশেই। ঘ্রাণে অর্ধভোজন হবার জন্য এটার চেয়ে উপযুক্ত স্থান এই শহরে দ্বিতীয়টি নেই। ঠিকমতো কায়দা করলে বড়লোকের ছেলেপেলের নেক নজরে না পড়ার কোন কারণ নেই। এদের দিল দুইরকম। কেউ কেউ অতি দিল দরিয়া, কেউ এক্কেবারে বেরহম। কোন কোন ছেলেপেলের কাছে শতি টাকার নোটের কম কিছু নাই। দু'তিন বার ভ্যানভ্যান করলে শাঁ করে শতিটাকার একটা নোট বের হয়ে আসে। বেশীরভাগ অবশ্য মাফ চেয়ে ভাগানি দেয়। আবার কিছু আছে মাফ চাইবার পর মাফ না দিয়ে আরো দুয়েকবার ভ্যানভ্যান করলে কিছু একটা দিয়ে দেয়, একটুকরো মাংস বা একটা আধখাওয়া পরোটা। সবচেয়ে ভালো কৌশল হলো কয়েক হাত দূর থেকে চোখটা মলিন করে ওদের প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকা। এসব করতে হয় লোক বুঝে। কিছু হারামী আছে হাড্ডিটাও ছুড়ে দিতে রাজী না। গবগবিয়ে সবটা খেয়ে উল্টা ধাবকি দেয়।

এর আগে ছিলাম ফ্রি পোর্টের মোড়ে। সব ফকিন্নির পোলার বাস ওখানে। চেহারা পোষাক সবকিছুতে নাই নাই। শালারা আমার চেয়ে ফকির। মাসে এক হাজার টাকাও উঠতো না। কমিশন দিয়ে কিছুই থাকে না। উপাসে মরতে ছিলাম প্রায়। বদলির জন্য জোর তদবির করা লাগছে। তদবিরের খরচও কম না। নগদ দশ হাজার দিয়ে পোষ্টিং নিছি এখানে। কর্জ করে টাকা যোগাড় করছি মোটা সুদে। তাও সুখ। এইখানে দশ হাজার তুলতে দুইমাসও লাগবে না।

গালি যারে দেয়া হইছে সে কাঁচের আড়ালে ছিল বলে শুনতে পায়নি। নইলে ধাবকি দিত। এতক্ষণ তার পিছনে হেঁটে টাইম লস করলাম। ব্যাটা হ্যাঁও কয় না আবার নাও কয় না। তারপর হুট করে দরোজা খুলে সামনের সীটে উঠে সাঁই করে চলে গেছে সাদা গাড়ি হাঁকিয়ে। শালা হারামী!

আরেকটা নতুন চিড়িয়া নামছে নীল গাড়িটা থেকে। এই গাড়িটা আরো বড়। তবে বড় গাড়িকে টার্গেট করে প্রায়ই ঠকতে হয়। কঞ্জুশের কঞ্জুশ এগুলো। পকেটে মানিব্যাগও থাকে না। একবার এরকম গাড়ির এক হারামী মানিব্যাগ খুলে প্লাষ্টিকের কার্ড দেখিয়ে কইছিল,"নে,যা লাগে এখান থেকে নিয়ে নে, টেকা নাই এইটা আছে খালি"। বান্দরের বাচ্চা! কেডিড কাডের গরম দেখায়!

এখন যে খোদার খাসীটা কালো কাঁচের আড়াল থেকে নামলো তার ওজন কমসে কম সাড়ে এগার মন হবে। এইটা ফজুইল্যার ঠিক করে দেয়া ওজন। সে এরকম হাতি মানুষরে সাড়ে এগারো মনের কমে দেখে না। এইটারে বায়েজিদ বোস্তামী রোডে সন্ধ্যার পরে একলা পাইলে ভুড়ি ফাঁসায়ে দেয়া যেত। নাহ, এইটার পিছেও টাইম লস হবার সম্ভাবনা। এই শালা মনয় বিড়ি খাইতে নামছে। সাদা প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ভুসভুস করে টানে। ওর ভুসভুসানি দেখে আমারও সিগারেটের নেশা পায়া গেল। কিন্তু এখন সিগারেট খায়া টাইম লস করা যাবে না। বিজি টাইম।

হাতের ক্রাচ যন্ত্রটাকে কায়দা করে ধরে গাছের আড়ালে দাঁড়ালাম। একটা দলচ্যুত সবুজ পোষাকের ঠোলাকে এদিকে আসতে দেখা যাচ্ছে। ব্যাটা মুততে নামছে মনয়। তবু বিশ্বাস নাই, কোরবানীর ঈদের মরসুম, পয়সাপাতির জন্য কুত্তাপাগল এসময়। দেখলে ঝামেলা করতে পারে। রেগুলার পয়সাপাতি নিয়েও বেইজ্জতি করে সময় সময়। কুত্তার সাথে বন্ধুত্ব করলেও ঠোলার সাথে কভি নেহি। এটাও ফজুইল্যার বাণী। ফজুইল্যা আসলেই গুরুমানুষ। বয়স তিন কুড়ি পার হয়ে গেছে এখনো কি মজবুত শরীর। শালার আগের পেশাটাই ভালো ছিল শরীরের পক্ষে। কিন্তু এখন আর সম্ভব না। দুই পা নাই তার!

তয় ফজুইল্যার বুদ্ধিতে কিছুদিন আগে একবার অন্যরকম ডিউটি করছিলাম। সন্ধ্যার পর বায়োজিদ বোস্তামী রোডে গেছি। ইফতারের পর এলাকাটা কিছুক্ষণ একদম নীরব গা ছমছম অন্ধকার। আমরা পাঁচজন। প্রথমে ফজুইল্যা, তারপর আমি, তারপর আরো দুজন,তারপর আরেকজন। মানুষ পছন্দ হইলে ফজুইল্যা হাত পাতলো। ফজুইল্যারে পার হয়ে মানুষটা আমার সামনে এলে আমি আগায় দিলাম পা। ল্যাং খেয়ে দুম করে পড়ে গেল লোকটা। পড়ার পর আমার সাথে ঝগড়াঝাটি চলার সময় আমার পরের দুজন আসলো ছুরি আর একনলা হাতে। মোবাইল মানিব্যাগ সব কেড়ে নেয়া শেষ হলে গেলে তার পরের জন এসে পাছায় লাথি মেরে তাড়িয়ে দিল লোকটারে। আরো কয়জনের কাছ থেইকা টাকাপয়সা হাতায়ে একজনের ভুড়িতে ক্ষুরের খোঁচা মেরে সিএনজিতে পগারপার। মদিনা হোটেলে বিরানী খাইছিলাম সেই রাতে।

এই হাতীটারে ল্যাং মারলে আমার শরীর আস্ত থাকবে না। এটারে কেমনে কায়দা করা সম্ভব কয়েক রকম করে ভেবেও কোন রাস্তা পাইলাম না। কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হাতিটা আমাকে না দেখার ভাণ করে সিগারেটে শেষ টান দিয়ে গাড়িতে উঠে কালো কাঁচের আড়ালে চলে গেলো। দাঁত খিচে গালি চলে এল মুখে, "খা_কির পোলা"। কেন জানি না বড়লোকের বাচ্চাগুলারে গালিগালাজ দিয়ে মনে একরকমের শান্তি হয়।

আর পারা যায় না। ক্রাচ যন্ত্রটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে আমিও একটা সিগারেট ধরাইলাম ফস করে। মেজাজ চড়ে গেছে। একটা সিগারেট খেয়ে মাথা ঠাণ্ডা করি। দুই দুইটা শিকার ফসকে গেছে। সিগারেটে দুই টান দিতেই দেখি সবুজ জামা পাশে চলে আসছে। ব্যাটার মতলব কি?

"ওই আগুন দে!"
আমি চুপচাপ ম্যাচ এগিয়ে দেই। এগুলার সাথে ঝামেলায় যাওয়া যাবে না। কইলাম, "ওস্তাদ কিরাম আছেন?"
"টিকেট আছেনি তোর?"
"আছে ওস্তাদ"
"কোন লেবেল?"
"আপনেদের দোয়ায় সুপারভাইজারির প্রমোশন পাইছি"
"তাইলে তো ভালোই কামাস"
"আ্ইজ দিনটা বেশী খারাপ ওস্তাদ। একদম খালি"

টেরনিং এর দিন পয়লা টিরিক্স কিন্তুক এইটাই। ঠোলা দেখলে সেদিন কামাই একদম খারাপ কইতে হয়। নইলে পকেট হাতায়ে দিতে পারে। যদিও পকেটে টাকা রাখা হারাম আমাদের। টাকা রাখতে হয় আণ্ডুর ভেতর। তবুও বিশ্বাস নাই, আণ্ডুও হাতায় দেয় কোন কোনদিন। কয়েকদিন আগে ফজুইল্যারে পাইছিল এক মামু। নেংটা করে আণ্ডু থেকে পয়সা ছিবড়ে নিছে। অবশ্য ফয়জুইল্যারও দোষ আছে। সে মুখে মুখে তক্ক করছিল। মামুদের সাথে তক্ক করা নিষেধ, টিকেট থাকলেও।

"ওস্তাদ ঈদে বাড়িত যাইবেন না?"
"না"
"ক্যান, বাড়িত কেউ নাই?"
"আছে .....আবার নাই।"

চুপ করে থাকলো মামু। আমার আর কথা নাই। ব্যাটা গেলেই বাঁচি। নিয়ম আছে মামুরা সামনে থাকলে কাম করা যাবে না। কিন্তু তার তো উঠার লক্ষণ নাই। উদাস মনে বিড়ি টানতেছে তো টানতেছে। তারপর নিজে নিজে কথা বলা শুরু করলো-

"গত বচ্ছর ঈদের দুইদিন আগে বাড়িত গিয়া বউ বাচ্চারে নিয়া মার্কেটে গেছিলাম। আমার পোলাডা নয়া হাঁটতে শিখছে। দেড় বছর বয়স। টুক টুক ক‌ইরা হাঁটে। তারে টুকু বইল্যা ডাকি। তার জন্য নীল জুতা, লাল জামা, হলুদ প্যান্ট, মাথায় টুপি, এ‌ইডি কিনইয়্যা বাড়িত পৌঁছায় দিয়া আসছি। পোলায় কি যে খুশী হইছিল..................। এবার বাড়িত যাবার পারুম না। ছুটি নাই.......গেলে ঈদের পরে যাইতে পারি।"

"ঈদের পরে গিয়া আর কি হইব? তবু যান ওস্তাদ। পোলায় তো এখন আরো বড় হইছে। খুশী হইবো।"
"পোলায় আর বড় হয় নাই।"
"ক্যান?"
"যেইদিন টুকুরে রাইখা আসছিলাম বাড়িতে, আমি বাড়ি না ঢু‌ইকাই চইলা আসছি ডিউটি ছিল বইলা। টুকু তার মায়ের লগে বাড়িত ঢুকতেছিল। বাড়ির লগেই পুকুর। তার মায়ে কাজের তাড়ায় আগে ঢুইকা যায় ঘরে.... খেয়াল করেনাই টুকু লগে আসেনি।"
"তারপর?"
মামু চুপ। কিছু বলে না।
"তারপর কি হইলো ওস্তাদ?"

"আদঘন্টা বাদে লাশ ভাইসা ওঠে..... বাড়িত না ঢু‌ইকা টুকু পুকুরের দিকে গেছিল , মরন তারে ডাকছিল(ডুকরে ওঠে সবুজ জামা)........আমার টুকু........টুকুরে........আমি আর বাড়িত গিয়া কি করুম রে?"

ঠোলা মামুরে এতক্ষণে মানুষ মানুষ লাগে। তবু আমি বলার মতো কোন কথা খুঁজে পাই না। লুলা ভিখারীর অভিনয় করা আমার পাষাণ চোখ দুটোও এবার ঝাপসা হয়ে আসে!


Sunday, August 26, 2012

প্রতীক্ষা পীড়িত প্রশ্ন

একটা প্রশ্ন তার উত্তরের খোঁজে বিশ বছর পথ পরিভ্রমণ করেছে। প্রশ্নটা ছিল সহজ, উত্তরও ছিল বোধগম্য। তবু দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কেটে গিয়েছে নৈঃশব্দের মধ্যে। শব্দেরা কেঁদে মরেছে উত্তরদাতার অন্তরালে। প্রশ্নটা যে উপেক্ষিত হয়নি জানা গেল দুই দশক পর। উত্তরের কক্ষে গিয়ে সে ঠায় বসেছিল অভিমান বুকে নিয়ে। একই কক্ষে প্রশ্ন আর উত্তর দুজনেই চুপ করে বসে ছিল, কেউ কারো দিকে চোখ তুলেও তাকায়নি অভিমানে। প্রশ্নটা চোখ মেললে দেখতে পেতো উত্তরটা নীরবে চোখের জল ফেলছে। উত্তরটা তাকিয়ে দেখলে বুঝতে প্রশ্ন কি চায়? চোখের জলের কোন ভাষা আছে? যদি থাকে তবে তাৎক্ষণিক উত্তর নিয়ে ফিরে আসতে পারতো প্রশ্নকর্তার কাছে। কিন্তু উত্তর নেই ভেবে প্রশ্নটা আর ফেরেনি কর্তার কাছে। দুই দশক ঝুলে ছিল ঝুলহীন বারান্দায়। কতটা দহন কেবল দুজনেই জানে। আর কেউ জানে না। আর কোন সমীকরণের সম্ভাবনা নেই তবু মঙ্গলবার্তা ছুটে যায় পূব থেকে পশ্চিমে, পশ্চিম থেকে পূবে। আকাশের ওপারে আকাশে, বাতাসের ওপারে বাতাসে।

Tuesday, August 7, 2012

আলো নিভে গেলে 'পর

ব্যাপারটা যদি ১৯৯৭ সালের বদলে ১৯৮৭ সালে ঘটতো তবে দৃশ্যটা এরকমই হতো প্রায়।

একটা জনাকীর্ণ ১৪ সীটের মাইক্রোবাস পাশ দিয়ে হুশ করে চলে যাবার দৃশ্যটা এক সেকেণ্ডের মধ্যেই ভাবনাটা এনে হাজির করলো। সেকেণ্ডের ভগ্নাংশের মধ্যেও সে দেখতে পেল মাইক্রোবাসটিতে জনাবিশেক নারীপুরুষ শিশু গাদাগাদি করে বসেছে। সবার পরনে চকমকে পোষাক আশাক, চুমকি জরির ছড়াছড়ি, গাড়িটা যে একটা বিয়ের গাড়ি তা প্রমাণ করলো মধ্যখানে টোপর মাথায় দেয়া লাল সাদা শেরোয়ানী পাগড়িতে সাজানো ঘর্মাক্ত ফর্সা মুখের একটা বর।

একটা গাড়ি ওভার টেক করতে কয় সেকেণ্ড লাগে? ওই সময়টুকুতেই দেখা হয়ে গেল বিশাল একটা জীবন মানচিত্র।

..................................................................

ওই জীবনটা আনিসের হতে পারতো। ওই গাড়িটাতে মা, রাবেয়া, ফাতেমা, নাসরীন, সুমনা ছাড়াও থাকতো রাবেয়া ফাতেমার বর, খালাতো ভাই জামাল, জামালের বউ, ফুপাতো ভাই জালাল, একরাম, মিজান, সেজ চাচা, ছোট চাচা, দুই চাচী, দুই ফুফু, ফুপাতো বোন রাজিয়া, মালেকা। পাড়ার বাকীদের জন্য একটা বাস ভাড়া করা হয়েছে। সেই বাসে আসবে আরো পঞ্চাশ ষাটজন। বরযাত্রী দেড়শো। পটিয়ার একটা ক্লাবে বিয়ে। মেয়ের বাড়ি গৈরালার টেক, মেয়ে এবার মেট্রিক পরীক্ষা দিছে। ভালো রান্নাবান্না পারে। সেলাই কাজও নাকি পারে।

আনিস আরো বারো বছর আগের একটা স্বপ্নে চট করে ঘুরে এসে লজ্জিত হয়। বিয়েতে নাদিরা আর তার বরও আসবে হয়তো। নাদিরাকে দেখেনি বিয়ের পর। পাঁচ বছর পার হয়ে গেছে। ওদের বাসায় যেতে কেমন সংকোচ লাগে। ১৯৮৭ সাল সবকিছু পাল্টে দিল। নাদিরাকেও।

এই সময়ে নাদিরাকে মনে পড়ার কোন মনে হয় না। তার চেয়ে গৈরালা টেকের বউ সেজে অপেক্ষায় থাকা অষ্টাদশী নীলুকে ভাবা উচিত। কিন্তু কিছু ভাবনা না চাইলেও এসে হাজির হয় অনাহুত সময়ে। এই গাড়িটা একটা নরকের মতো লাগছে। জ্যৈষ্ঠ মাসে কেউ বিয়ে করে! বিয়ের জবরজং পোষাক সব ঋতুতে একই। এই শেরোয়ানী এই পাগড়ি, এই নাগরা, অসহ্য সব আচার। একসময় আনিস ভাবতো এই সব সামাজিক কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আন্দোলন করবে। যৌতুক তাড়াবো, কুসংস্কার রোধ করবো। সাব্বির, নয়ন, শাকিল সহ অন্য বন্ধুদের সাথে নিয়ে স্বপ্ন দেখতো সমাজ বদলের।

কিন্তু ১৯৮৭ সব বদলে দিল। আস্ত জীবনটা। এখন বন্ধুরা কেউ আসে না। সব অচেনা হয়ে গেছে।

রাস্তায় জ্যাম লেগেছে। ওরা রওনা দিয়েছে তিনটার সময়। কথা ছিল একটায় রওনা দেবে। কিন্ত কয়েকজনের জন্য দেরী হয়ে গেল। পেছনের সীটে মা বমি করছে। এসব গাড়ি মা একদম চড়তে পারে না। কিন্তু উপায় কি। বিয়েবাড়িতে পৌঁছে কাহিল অবস্থা হবে।

আনিস পেছন ফিরে একবার দেখলো। রাবেয়া মাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। মার চোখ বন্ধ। একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কে জানি জোর করে মাকে একটা জবরজং কাতান শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে। গরমে আগুন বেরুচ্ছে সবকিছু থেকে।

আনিসের সবকিছু অসহ্য লাগছে। শহরের এক রুমের খুপরি বাসাটা যৌতুকের ফার্নিচার দিয়ে সাজানো হয়েছে। বউ নিয়ে প্রথমে গ্রামের বাড়িতে যাবে, তারপর শহরে নিয়ে উঠবে। একসময় শহরে তাদের একটা জমি ছিল। অসমাপ্ত বাড়িসহ জমিটা বিক্রি করে দিতে হয়েছিল রাবেয়া ফাতেমার বিয়ের সময়। সব টাকা উড়ে গেছে। সামান্য যা ছিল আনিসের বিয়ের স্বর্ন কিনতেই বেরিয়ে গেছে। নাসরিন আর সুমনার বিয়েতে খরচ করার মতো কোন টাকা নেই আর। ওদের পড়াশোনা বন্ধ। রাবেয়া মেট্রিক পাশ করেছিল কোনমতে, ফাতেমা ক্লাস এইট পড়েছিল শহরে। গ্রামে গিয়ে আর পড়েনি। নাসরিন গ্রামে গিয়ে সেভেন পর্যন্ত পড়েছে। মার ইচ্ছে ছিল নাসরিন আর সুমনাও মেট্রিক পাশ করুক। কিন্তু গ্রামে আসার পর পড়ালেখার পরিবেশ পাওয়া গেল না। বন্ধ হয়ে গেল নাসরীনের পড়া। সুমনাকে সরকারী প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করিয়েছিল। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ে সে আর পড়েনি। হাইস্কুল একটু দূরে। একা যেতে ভয় পায়।

আনিস তার একটা অতীত গিলে ফেলেছিল। সবকিছু ভুলে গিয়েছিল। সব স্বপ্ন হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ এই যাত্রায় কেন সব মনে পড়ে যাচ্ছে। তার কেমন একটা অপরাধবোধ হতে থাকে। সে পড়াশোনা বাদ দিয়ে সেজোচাচার দোকানে কাজে যোগ দিয়েছিল। থাকা খাওয়ার চিন্তা নাই। মাসে পাঁচশো টাকা বেতনও দেয়া হতো। সেই টাকা আনিস গ্রামে পাঠিয়ে দিত। মা কিভাবে সেই টাকায় পুরো মাস চলতো আনিস জানে না। তবে সেই দোকান কর্মচারী থেকে তার আর উত্তরণ ঘটেনি। এখন সে বড়জোর সিনিয়র সেলসম্যান।

১৯৮৭ সালে ওরা শহরের বাসায় থাকতো। জলিল ম্যানসনের তিন বেডের বাসা। দুই হাজার টাকা ভাড়া। সেই আমলে অত টাকা ভাড়া দিয়ে কেউ শহরে বাসা নিত না। এমনকি বড়লোক নাদিরার বাবাও তার চেয়ে সস্তা বাসায় থাকতো। আনিসের বাবা বিদেশ থেকে প্রচুর টাকাপয়সা নিয়ে এসেছিল। ছেলেবেলা থেকে আনিস কোনদিন অভাব চোখে দেখেনি। কলেজে পড়তো, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিত, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।  স্বচ্ছল নিরুপদ্রপ জীবন।

জলিল ম্যানসনের বাসায় থেকে নিজেদের বাড়ির কাজ শুরু হয়েছিল হালিশহরে। ছোটখাট টিনশেড বাড়ি হলেও হবে। নিজেদের বাড়ি। মাস মাস ভাড়া গুনতে হবে না। বাড়িটা ঘিরে বাবার স্বপ্নগুলো তাদেরকে জড়িয়ে রাখতো। বাড়ির দেয়ালগুলো উঠে গেছে। কেবল ছাদ দেয়া বাকী। ছাদ নিয়ে বিতর্ক চলছিল ওদের পরিবারে। একদল চায় টিনশেড বাংলো টাইপ বাড়ি হবে, আরেকদল চায় কংক্রীটের ছাদ দেয়া বাড়ি। বাবা কোন পক্ষে যাবে সেটা নিয়ে বিতর্ক চলতো ভাইবোনদের মধ্যে।

কিন্তু একদিন বাবা সাইটে কাজ দেখতে গিয়ে বুকে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে বাড়ি ফিরলো। পাড়ার নজমুল ডাক্তার এসে বললো অবস্থা খারাপ অ্যাম্বুলেন্স ডাকেন। আনিস অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ফিরতে না ফিরতে সব শেষ। সেই অ্যাম্বুলেন্সে করেই গ্রামে নিয়ে যাওয়া হলো বাবাকে। সমস্ত গ্রাম ভেঙ্গে পড়েছিল সিরাজুর রহমানের মৃত্যুর সংবাদে।

সব থেমে গেল এরপর। আনিসদের এতদিনকার জীবন থমকে গেল ওই এক দিনেই।

হালিশহরের বাড়িটা শেষ করা গেল না। জলিল ম্যানসনের বাসাটা ছেড়ে দিতে হলো। সবাই গ্রামে চলে গেল। গ্রামে দাদার আমলের জীর্ণ বাড়িটা খালি ছিল। সেখানেই উঠলো গিয়ে। আনিসের বাবার প্রায় সবটুকু সঞ্চয় হালিশহরের বাড়িতে চলে গেছে। বাকী যে টাকা ছিল তা দিয়ে কিছুদিন চললো। কিন্তু কদিন আর বসে থাকা যায়। কে খাওয়াবে। সেজ চাচা এসে আনিসকে শহরে নিয়ে গেল। ওদের দোকানে বসবে এখন থেকে। সেই এক নতুন জীবন আনিসের।

গুমরে ওঠা কষ্টের সাথে কেমন একটা অট্টহাসি উঠলো আনিসের বুকের ভেতর। তার চেহারা দেখে কেউ ঠাহর করতে পারবে না মনের মধ্যে কি ঝড় বইছে এই জ্যৈষ্ঠের গরমে বিয়ের ফুলে সাজানো মাইক্রোবাসে বসে। অট্টহাসি উঠলো নাদিরার কথা ভেবে। যে নাদিরা প্রতি মাসে একবার আনিসকে দেখার জন্য ছুটে আসতো, যে আনিস বাদে নাদিরার কোন ঈদ কাটতো না, সে আনিসকে বাদ দিয়ে তার কোন স্বপ্ন দেখা হতো না, সেই নাদিরা দীর্ঘ এক বছরেও আনিসের একটা খবর নেয়নি। মানুষ কি সহজে বদলে যেতে পারে!!

এটা নিয়ে আনিস অনেক ভেবেছে। সে ডায়েরীতে বেনামীতে অনেক লেখা লিখেছে কষ্টের সময়। লিখে লিখে কষ্টগুলো উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছে। নাদিরা কেন বদলে গেল? কলেজ ছাত্র আনিস দোকান কর্মচারী হয়ে গেছে বলে? ভাগ্য আনিসকে তুলে আছাড় দিয়েছে বলে? সেই সাথে আছাড় খেয়েছে নাদিরার স্বপ্নও? যত আপনই হোক, সে আনিসের মধ্যে আর কোন ভবিষ্যত দেখতে পায়না। যার ভেতর ভবিষ্যত নেই, মানুষ তার ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করতে চায় না। আনিসের জন্য রাখা তার অনুভুতিগুলো বোধকরি সেই তখনই বুদবুদের মতো উবে গিয়েছিল।

এক বছর পর ঈদের পরদিন গ্রামে এলে নাদিরার সাথে দেখা হয়। কিন্তু সেই দেখায় নতুন জাতের সৌজন্যতার উদয় হয় সাথে যুক্ত হয় বদান্যতা। নাদিরাদের গাড়ি আছে। সেই গাড়িতে চেপে ওরা গ্রামে আসে। আনিসদের পাড়ায় আর কারো গাড়ি নেই। তাই নাদিরার পরিবার যখন গাড়িতে করে গ্রামে আসে তখন তুমুল হৈ চৈ পড়ে যায়। ওই বছর নাদিরা গ্রামে আসার সময় এক বস্তা পুরোনো কাপড়চোপড় এনেছিল। ওর বাতিল করে দেয়া কাপড়চোপরগুলো বস্তা করে এনেছে রাবেয়া ফাতেমার জন্য। ওর চোখ মুখে বদান্যতার আলো। ওদের জন্য কতো যত্ন করে কাপড়গুলো জমাচ্ছিল এতদিন ধরে, সে বর্ননা দিল। কোন কোন জামা ইণ্ডিয়া থেকে আনা, কোনটা মিমি সুপার থেকে কেনা সব হড়বড় করে বলে যাচ্ছিল সে। ওরা হরদম ইণ্ডিয়া যায়, তাই শপিংগুলো ওখান থেকেই করে বেশীরভাগ সময়।

কিন্তু আনিস সেদিন নাদিরার চোখের সেই বদান্যতার আলো সহ্য করতে পারেনি। ওর চোখ ফেটে জল এসে গিয়েছিল। সে প্রাথমিক সৌজন্য শেষে বাড়ি থেকে পালিয়ে দক্ষিন পাড়ার দীঘির পাড়ে চলে গিয়েছিল। জীবনটা এত বড় তামাশা!! সেদিনই সে বুঝে যায় নাদিরার চোখে তাদের পরিবার কোথায় নেমে গেছে। আর কোন স্বপ্ন বেঁচে থাকার মানে নেই। নাদিরার বিয়ে হয়ে যায় তার পরের বছর এক বড়লোকের ছেলের সাথে। বিয়েতে সে যেতে পারেনি। অসুস্থ ছিল বলে। তারপর এতগুলো বছরে ওর সাথে আর দেখা হয়নি। ওদের বাসায় যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল সে।

জ্যাম ছুটেছে। গাড়ি আবারো ছুটছে। চারটা বেজে গেছে। ক্লাবের গেটে যখন গাড়িটা দাড়ালো, তখন সেখানে তেমন লোকজন নেই। বেশীরভাগ লোক খেয়ে চলে গেছে। আনিসের প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। কিন্তু তাকে খাবার টেবিলে না নিয়ে বিয়ের স্টেজে নিয়ে গেল কনে পক্ষ। আনিসের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু বিয়েবাড়িতে বর আর কনে রাগ দেখাতে পারে না। ওদের থাকতে হয় ফটোজেনিক চেহারায়। নইলে বদনাম হবে।

স্টেজে বসে আনিসের বাথরুম পেল। এখানে ব্যবস্থা আছে কিনা কে জানে। তাকে ফুলের মালা দিয়ে কয়েকজন মলিন চেহারার কিশোরী দাড়িয়ে আছে। শ্যালিকা সম্পর্কের কেউ হবে। ভয়ে আছে আনিস। মালা দিয়েই এরা টাকা খুঁজবে। তার কাছে কোন টাকা নাই। জালালকে ডেকে কানে কানে বললো, এসব যন্ত্রনা তার ভালো লাগছে না। তার খিদে পেয়েছে তার চেয়ে বড় কথা বাথরুম কোথায়। জালাল ওর কথা শুনে ঘটনা বুঝলো। একমাত্র জালালের কাছেই সে সব কথা বলতে পারে। জালাল ছাড়া সে অচল। খোঁজ নিয়ে জালাল বাথরুমে নিয়ে গেল পাশের একটা দালানে। পাগড়ি খুলে রেখে আনিস হালকা হয়ে আসলো।

খাবার টেবিলে বসে গোগ্রাসে ঝাঁপিয়ে পড়ে খেল আনিস লজ্জা শরম ভুলে। তারপর দুগ্লাস কোক খেয়ে বিরাট একটা ঢেকুর তুললো। এরা রান্নাবান্না ভালোই করেছে। কোকে বরফ দিয়ে ঠান্ডা করে রেখেছিল বলে বিশেষ কৃতজ্ঞতাবোধ করলো।

খাওয়াদাওয়া সেরে বউয়ের স্টেজের কাছে যেতে যেতে সাড়ে পাঁচটা বাজলো প্রায়। বউ যে ঘরে বসেছে সেই ঘরটা একটা বড় সড় তন্দুরী বিশেষ। অন্ধকার টাইপ ঘর। সেই ঘরে গিজগিজ করছে শখানেক মুখরা রমনী। কেউ কারো কথা শুনছে না, কিন্ত অনর্গল চিৎকার করতেই আছে। বিয়েবাড়িতে এলে কিছু মানুষের গলা এত বেড়ে যায় কেন বুঝি না।

বউটা মাথা নীচু করে বসে আছে। বেচারী ঘেমে নেয়ে একাকার। সে বরের চেয়েও খারাপ অবস্থায় আছে। আনিস চায় এই পর্বটা দ্রুত সমাপ্ত হোক। গরমের মধ্যে অন্যতম এক অত্যাচার হলো ভিডিও ক্যামেরা। এই জিনিসের আবিষ্কার তার কাছে সবচেয়ে অনাহুত। এই বিয়েতে ভিডিও করে কাজ কি। তার তো ভিডিও দেখার জিনিস নাই। খামাকা পয়সা নষ্ট। তবে যৌতুকের তালিকায় একটা ভিসিআর থাকলে তাও হতো।

এমন সময় একটা হৈ চৈ শুরু হলো। সবাই বর বধুকে ছেড়ে অন্যদিকে ছুট দিল। আবার কি আকর্ষণ? খানিকপর জানা গেল এইমাত্র বিয়ের আসরে উপস্থিত হয়েছে নাদিরা আর তার বর। বিশাল একটা পাজেরো গাড়ি থেকে ওরা যখন নামলো তখন আত্মীয় পরিজন সবার মধ্যে একটা সাড়া পড়ে গেল।

লোকজন সবাই আনিসকে ভুলে গেল নাদিরার উপস্থিতিতে। বাহ। আনিসের মাথায় চমৎকার একটা সমীকরণ এলো এই সময়ে। সৃষ্টি জগতে আনিস যদি একটা মোমবাতি হয় নাদিরা সেখানে রীতিমত সূর্য। সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে মোমবাতির আলো চোখেই পড়ে না।

আনিসের ইচ্ছে হলো নতুন বউয়ের হাতটা ধরে দেখতে। কিন্তু কেউ তার হাতে বউকে তুলে দেয়নি এখনো। কি করে হাত ধরবে? বউটা এখনো মাথা নীচু করে বসে বসে ঘামছে। আহা বেচারী, মুক্তি দেয়া যেত যদি তাকে এখনি? নাদিরার উপস্থিতি তার মুক্তি আরো বিলম্বিত করলো।

সবাই এখন নাদিরার ইন্টারভিউ নিতে ব্যস্ত। কতোদিন পর গ্রামে এসেছে, বিয়ের পর এদিকে আসেনি। রাবেয়া ফাতেমার বিয়েতে দাওয়াত দেয়া হলেও আসেনি। এবার কেন এসেছে ভেবে অবাক হলো আনিস। তার মনে আর কোন কষ্ট কোন আবেগ নেই। সব অর্থহীন হয়ে মিলিয়ে গেছে সেই কবেই। তবু কৌতুহলটা জেগে আছে? কি বলবে তাকে দেখতে এসে? ভাবীর সাথে চটুল ঠাট্টা করবে নাকি? মনে হয় না। ওরও হয়তো মনে পড়ে যাবে পুরোনো স্মৃতি। কে জানে। ভেবে একটু সুখ হলো আনিসের। নিশ্চয়ই মনে পড়বে সবকিছু। মানুষ স্মৃতিকে অস্বীকার করতে পারে, কিন্তু চাইলেও স্মৃতিকে মুছে ফেলতে পারে না।

ভীড় ঠেলে নাদিরা আর তার বর কাছে এলো। আনিস উঠে হাত মেলাতে গেল বরের সাথে। লম্বা চওড়া ফর্সা বরটা অনিচ্ছুক হাতটা বাড়িয়ে একটু ধরে ছেড়ে দিল। নাদিরা কয়েকবার বললো, বউ খুব সুন্দর হইছে, খুব সুন্দর বউ।

তারপর উজ্জ্বল আলো আর সুরভী ছড়াতে ছড়াতে যেমন এসেছিল তেমনি চলে গেল। দশ মিনিটের মামলা। নাদিরা চলে যাবার পর আসরের সবচেয়ে উজ্জ্বল বাতিটা যেন নিভে গেল। যেন কেবল একটা মোমবাতি জ্বলে রইল। আসলে মাথার উপরে ঝুলন্ত বালবটি মোমবাতির মতোই আলো ছড়াচ্ছিল। সেই মোমবাতির আলোয় বর কনে দুজন আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে।

আনিস এবার বউয়ের হাতটা ধরে একটু চাপ দিল। যেন শান্ত্বনা দিল নিজকে। "আমার সূর্য নিভে গেছে, কিন্তু এই মোমের আলো আমার বাকী জীবন স্নিগ্ধতা ছড়াবে"।


Sunday, August 5, 2012

নষ্টনীড় পাঠ

আগে অমল বেশ ছিল, যেদিন হইতে লিখিতে আরম্ভ করিয়া নাম করিয়াছে সেই দিন হইতেই যত অনর্থ দেখা যাইতেছে। চারুই তো তাহার লেখার গোড়া। কুক্ষণে সে অমলকে রচনায় উৎসাহ দিয়াছিল। এখন কি আর অমলের 'পরে তাহার পূর্বের মতো জোর খাটিবে। এখন অমল পাঁচজনের আদরের স্বাদ পাইয়াছে, অতএব একজনকে বাদ দিলে তাহার আসে যায় না।

চারু স্পষ্টই বুঝিল, তাহার হাত হইতে গিয়া পাঁচজনের হাতে পড়িয়া অমলের সমূহ বিপদ। চারুকে অমল এখন নিজের ঠিক সমকক্ষ বলিয়া জানে না; চারুকে সে ছাড়াইয়া গেছে। এখন সে লেখক, চারু পাঠক। ইহার প্রতিকার করিতেই হইবে।

................................................

................................................

সেদিন আষাঢ়ের নবীন মেঘে আকাশ আচ্ছন্ন। ঘরের মধ্যে অন্ধকার ঘনীভূত হইয়াছে বলিয়া চারু তাহার খোলা জানালার কাছে একান্ত ঝুঁকিয়া পড়িয়া কী একটা লিখিতেছে।

অমল কখন নিঃশব্দপদে পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইল তাহা সে জানিতে পারিল না। বাদলার স্নিগ্ধ আলোকে চারু লিখিয়া গেল, অমল পড়িতে লাগিল। পাশে অমলেরই দুই-একটা ছাপানো লেখা খোলা পড়িয়া আছে; চারুর কাছে সেইগুলিই রচনার একমাত্র আদর্শ।

'তবে যে বল, তুমি লিখতে পার না!' হঠাৎ অমলের কণ্ঠ শুনিয়া চারু অত্যন্ত চমকিয়া উঠিল; তাড়াতাড়ি খাতা লুকাইয়া ফেলিল; কহিল, 'তোমার ভারি অন্যায়।'

অমল।  কী অন্যায় করেছি।

চারু।  নুকিয়ে নুকিয়ে দেখছিলে কেন।

অমল। প্রকাশ্যে দেখতে পাই নে বলে।

চারু তাহার লেখা ছিঁড়িয়া ফেলিবার উপক্রম করিল। অমল ফস্‌ করিয়া তাহার হাত হইতে খাতা কাড়িয়া লইল। চারু কহিল, 'তুমি যদি পড় তোমার সঙ্গে জন্মের মতো আড়ি।'

অমল।  যদি পড়তে বারণ কর তা হলে তোমার সঙ্গে জন্মের মত আড়ি।

......................................

চারু কহিল, 'ঠাকুরপো, এসো আমরা একটা মাসিক কাগজ বের করি। কী বল।'

 অমল। অনেকগুলি রৌপ্যচক্র না হলে সে কাগজ চলবে কী করে।

 চারু। আমাদের এ কাগজে কোনো খরচ নেই। ছাপা হবে না তো-- হাতের অক্ষরে লিখব। তাতে তোমার আমার ছাড়া আর কারো লেখা বেরবে না, কাউকে পড়তে দেওয়া হবে না। কেবল দু কপি করে বের হবে; একটি তোমার জন্যে, একটি আমার জন্যে।

..........................

অবশেষে চারু একেবারে হাল ছাড়িয়া দিল-- নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করায় ক্ষান্ত হইল; হার মানিয়া নিজের অবস্থাকে অবিরোধে গ্রহণ করিল। অমলের স্বৃতিকে যত্নপূর্বক হৃদয়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিয়া লইল।

ক্রমে এমনি হইয়া উঠিল, একাগ্রচিত্তে অমলের ধ্যান তাহার গোপন গর্বের বিষয় হইল-- সেই স্মৃতিই যেন তাহার জীবনের শ্রেষ্ঠ গৌরব।

গৃহকার্যের অবকাশে একটা সময় সে নির্দিষ্ট করিয়া লইল। সেই সময় নির্জনে গৃহদ্বার রুদ্ধ করিয়া তন্ন তন্ন করিয়া অমলের সহিত তাহার নিজ জীবনের প্রত্যেক ঘটনা চিন্তা করিত। উপুড় হইয়া বালিশের উপর মুখ রাখিয়া বারবার করিয়া বলিত, 'অমল, অমল, অমল!' সমুদ্র পার হইয়া যেন শব্দ আসিত, 'বউঠান, কী বউঠান।' চারু সিক্ত চক্ষু মুদ্রিত করিয়া বলিত, 'অমল, তুমি রাগ করিয়া চলিয়া গেলে কেন। আমি তো কোনো দোষ করি নাই। তুমি যদি ভালোমুখে বিদায় লইয়া যাইতে, তাহা হইলে বোধ হয় আমি এত দুঃখ পাইতাম না।' অমল সম্মুখে থাকিলে যেমন কথা হইত চারু ঠিক তেমনি করিয়া কথাগুলি উচ্চারণ করিয়া বলিত, 'অমল, তোমাকে আমি একদিনও ভুলি নাই। একদিনও না, একদণ্ডও না। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পদার্থ সমস্ত তুমিই ফুটাইয়াছ, আমার জীবনের সারভাগ দিয়া প্রতিদিন তোমার পূজা করিব।'

================================

['নষ্টনীড়' পড়া হলো অনেকদিন পর]



Saturday, August 4, 2012

এলে বেলে কথা

১. নিজেকে গাল দিতে সাহস লাগে। কিন্তু লজ্জাহীন হতে সাহস লাগে না। আত্মসমালোচনার দুর্ভিক্ষ থাকলেও  তাই নির্লজ্জতার বাম্পার ফলন হয় সোনার বাংলাদেশে। উদাহরণ? টিভি নিউজে চোখ রাখুন।

২. সংকীর্ণতা বাঙালীর ঐতিহ্য, পরশ্রীকাতরতা সংস্কৃতির অংশ।  ড. ইউনুস এরকম দেশে ধিকৃত হবেন আর আবুল হোসেনরা দেশপ্রেমিক বলে ঘোষিত হবেন, এতে অবাক হবার কি আছে?

৩. আমার কৈশোর তারুণ্যের দুষ্টলোক এরশাদ। যৌবনের শুরুতে স্বপ্ন দেখতাম একদিন এরশাদেরও পতন হবে, দেশে গনতন্ত্রের জোয়ার আসবে। অতঃপর এরশাদ পড়লো, গণতন্ত্র আসলো, কিন্তু দুই দশক পরেও এরশাদীয় নির্লজ্জতা ও নির্বুদ্ধিতার ভুত আমাদের ঘাড়ে অটল। সেই ভুতেরা আণ্ডাবাচ্চা পয়দা করে বিস্তৃত হয়েছে দল থেকে দলে, শাসক থেকে শাসকে, রাজনীতি থেকে শিক্ষালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পর্যন্ত যাতায়াত এই ভুতের।

৪. বাংলাদেশের সমাজ বা রাজনীতিতে 'বিনয়' একটি নির্বাসিত বিষয়।  দুষ্টলোক নিজেকে দেবদুত বলে দাবী করে, ব্যর্থ নেতৃত্ব উৎকট চিৎকারে নিজেকে সফলতম ঘোষণা করে।

৫. এদেশে কখনো কোন রাজনীতিবিদ বলেনি "আমি চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি, আমার ব্যর্থতা ক্ষমা করুন"। এমনকি ভোটের সময়ও নয়।

৬. এখানে সবাই সবকিছু জানে, জানার ভান করে। পত্রিকার কলাম, টেলিভিশনের টক শো কিংবা রাজনীতিবিদের ভাষণ- সবখানেই সবজান্তাদের যাতায়াত। বালিশে মুখ গুঁজে চোখ কান মুদেও মগজে এদের জ্ঞানের অনুপ্রবেশ ঠেকানো যায় না।

৭. এদেশে অজ্ঞানের দাপটে জ্ঞান হয়ে যায় নির্বাক। মূর্খেরা হয় রাষ্ট্রের পরিচালক, জ্ঞানীরা হয় মূর্খের ভৃত্য উপদেষ্টা। অর্থ কিনে নেয় হৃদয় বিবেক এবং খুলিসহ মগজ। 

৮. আমরা সমুদ্র সেঁচে মুক্তো আহরণের কষ্ট করি না, সৈকতে বালির বাধ দিয়ে স্বর্গারোহনের দম্ভ করি।

৯. আমাদের বর্তমান ধূসর, অতীত উজ্জ্বল, ভবিষ্যত অন্ধকার।

১০. সহজ মন/ অস্বচ্ছ জলে/ দিগভ্রান্ত,..... সহজ অংক/ সরল জীবনে/ গরমিল খোঁজে,..... না দেখা আঁধার/ অচ্ছুত আলোয়/ ঠেকিয়ে রাখে ভোর,....অতঃপর তুমি জয়ী হবে বলে পথ ছেড়ে দেই। 






 




Thursday, August 2, 2012

স্মৃতি, স্মৃতি, স্মৃতি.......ধোঁয়াশা হবার আগেই

সাপুড়িয়া

আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে আমাদের একতলা টিনশেড বাড়িটার সামনে একটা লম্বা টানা বারান্দা ছিল। বারান্দার সামনে কাঠের রেলিং, বাঁশের খুটি, কাঠের বীম এই তিনের সমন্বয়ে ছায়ার আড়াল। বাশের খুঁটিগুলোর গোড়ায় অপরাজিতার চারা লাগানো হয়েছিল। অপরাজিতার লতাগুলো বাঁশের গোড়া থেকে বেয়ে উঠে টিনের নীচে ঠেস দেয়া কাঠের বীমগুলো ছুঁয়ে ফেলতো। তারপর সেই কাঠের বীম বেয়ে বারান্দার এমাথা ওমাথা সবুজের মোটা একটা রেখা তৈরী করে ফেলেছিল। কদিন পরেই দেখি, সেই সবুজের মধ্যে বেগুনী ফুলের উৎসব। আর সেই ফুলের উৎসবে অবধারিতবাবে প্রজাপতি আর মোমাছিদের নিমন্ত্রণ করলো অপরাজিতার দল। বারান্দাময় সারাক্ষণ ওড়াওড়ি খেলা। উজ্জ্বল বেগুনী ফুলগুলি সবুজ ছুঁয়ে যে আলো ছড়াতো, বারান্দায় কেউ দাঁড়ালে সেই বেগুনি আভা তার চেহারায়ও পড়তো। আমরা সেই আলোয় স্নান করতাম, সেই ওড়াউড়ির মধ্যে ভাসতাম। তখনো এলাকাটায় গ্রামের গন্ধ ছিল। চারপাশে বাড়িঘর তেমন ওঠেনি। শহরের মাঝখানে ছোট্ট একটা গ্রাম যেন। প্রায় ত্রিশ ফুট লম্বা বারান্দার সর্ব উত্তরে দুই ফুট উচু ছোট্ট একটা কাঠের ঘর। সেই ঘরে বাস করতো কয়েকটা মুরগী। মায়ের শখ ছিল মুরগী পোষার।

মুরগীগুলো নিয়মিত ডিম পাড়তো। সেই ডিম থেকে একবার বেশ কয়েকটা বাচ্চার জন্ম হয়েছিল। বাচ্চাগুলো বড় হবার কালে একদিন সেই মুরগীর ঘরের পেছন দিকের ফোকরে একটা অচেনা অতিথির দেখা মেললো। অতিথি ঘর থেকে বের হয় না, কেবল মাথাটা বের করে মুরগীর বাচ্চাগুলো পাহারা দেয়। অতিথির আগমনে আমাদের ছবি বাড়িটাতে চরম আতংক এসে উপস্থিত হলো। কারণ সেই অতিথি একটা অচেনা সাপ। আমি সাপ আর কুকুর এই দুই জিনিস থেকে একশো হাত দূরে থাকি। তবু সাহস করে দশফুট লম্বা সরু একটা বাঁশ নিয়ে দূর থেকে নতুন অতিথির মানসিক গঠন পরখ করতে গেলাম। বেরসিক অতিথি বাঁশের মাথায় একটা ঠোক্কর মেরে জানান দিল তার মেজাজ বড় সুবিধার না। এরপর আমি ওই জিনিসের সাথে ঝামেলায় যাবার দরকার দেখলাম না। মুরগীর বাচ্চা সাপের পেটে গেলেও আমার করার কিছু নেই। নিশ্চয়ই মুরগীর চেয়ে মানুষের জীবন মূল্যবান।

আমি ভয়ে ওদিকে না মাড়ালেও মা কি করে যেন মুরগীর পরিচর্যা অব্যাহত থাকে। মাকে সতর্ক করতে গেলে মা উল্টা কথা শোনায়। মায়ের মতে কিছু সাপ নাকি আছে আবাসিক। ওরা গৃহস্থের ক্ষতি করে না। তাছাড়া কদিন হয়েছে তবু একটা মুরগীর বাচ্চাও খায়নি সাপটা। সুতরাং সাপটার কোন বদ মতলব নেই। কিন্তু মায়ের এই ব্যাখ্যা আমাদের অভয় দিতে পারে না। সাপটার উদ্দেশ্য বুঝতে পারছিলাম না। প্রায়ই দেখা যেতো গর্ত থেকে মাথা বের করে তাকিয়ে থাকে। ভয় করলেও সাপটাকে আমরা ঘাটাই না। সে তার মতো থাকুক। কিন্তু পরিবারের আরো একজন মনুষ্য পল্লীতে সর্পের উপস্থিতি মেনে নিতে পারেনি। বাবা। এতদিন চুপ করে থাকলেও একদিন কাণ্ড ঘটিয়ে ফেললেন।

একবার আমরা গ্রামে গেলাম, মাও গেল সাথে। বাড়িতে বাবা একা। দুদিন পর বাড়ি ফিরে দেখি পুরো বারান্দা তছনছ, মুরগীর ঘর থেকে শুরু করে বারান্দায় রাখা একরাশ কাঠের স্তুপ সব তছনছ। পুরো বারান্দার ইট তুলে খুঁড়ে ফেলা হয়েছে। ব্যাপার কি? এখানে কি মহাযুদ্ধ হয়ে গেছে নাকি? বাবার চেহারা দেখি অনেক প্রফুল্ল। ঘটনা খুলে বললো বাবা। আমরা যাবার পর বাবার মনে খচখচ করছিল সাপটা। তারপর কোত্থেকে খুঁজে এক সাপুড়িয়া ডেকে নিয়ে আসলো। সেই সাপুড়িয়া দলবল নিয়ে মোহন বাঁশীর সুর তুলে সাপটাকে অনেক আহবান করলো। কিন্তু সাপ গানে কান না দিয়ে ঘাপটি মেরে রইল গর্তের মধ্যে। গানের সুরে কাজ না হওয়াতে সাপুড়িয়া ভিন্ন রকমের কায়দায় চেষ্টা করলো ডাকতে। তন্ত্রমন্ত্র তুকতাক অনেক কিছু করলো। কিন্তু কিছুতেই সাপ বের হয় না। শেষে সাপুড়িয়া বললো সাপের বাড়িতে সরাসরি রেইড করতে হবে। সাপের বাড়ী কই? মুরগীর বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ডে। সুতরাং, ভাঙ্গো মুরগীর বাড়ি। মুরগীদের অস্থায়ী আবাসে নিয়ে মুরগীর ঘর ভেঙ্গে খোঁজা হলো সাপটাকে।

নাই।  সারা বারান্দা খুড়ে ফেলা হলো। কোথাও নাই।  সাপটাকে কোথাও পাওয়া গেল না। 

সমস্ত বারান্দা খোড়াখুড়ি সমাপ্ত হলে সাপুড়িয়া ঘোষণা দিল এই বাড়ীতে আদতে কোন সাপই নেই। (ব্যাটা ফাজিল ঘরটাকে নষ্ট করার আগে বলতে পারিস নাই, সাপ নেই, এত খোড়াখুড়ির পর সাপ নেই বলার জন্য সাপুড়িয়া হতে হয় নাকি। যত্তসব ভণ্ডামি!! পরে শুনে মনে মনে ক্ষেপে গিয়েছিলাম আমি) সাপুড়িয়াকে দুশো টাকা দিয়ে বিদায় করা হয়েছিল। এত সুন্দর বারান্দাটা তছনছ করার জন্য সবার খুব রাগ হচ্ছিল। তবু সাপটা আর নেই, এই খবরটা খুব দরকার ছিল। সাপুড়িয়াতে আস্থা স্থাপন করে অতঃপর আমরাও ক্রমাগত ভুলে যেতে থাকলাম এই বারান্দায় একটা সাপের বাসা ছিল।


কিনতা -কুনতে
বাসায় মোটামুটি তীব্র অভাব চলছিল তখন। নানান ব্যবসায় লসটস দিয়ে বাবার কাহিল অবস্থা। আমি ভার্সটিতে পড়ছি সেকেন্ড ইয়ারে। একদিন বাসায় ফিরে দেখি বারান্দার মাঝখানে ফুলের টবগুলোর মাঝে তারের জালি দেয়া নতুন একটা খুপড়ি। সেই খুপড়িতে নিরীহ চেহারার দুটো প্রাণী। একটি সাদা, অন্যটা সাদার উপর কালো ছোপ। বাবার বাজার করতে গিয়ে দেখলো খরগোশ বিক্রি করছে একজন। দেখে নাকি মায়া লাগলো। বাজার না করে খরগোশ কিনে ফিরে এলো। মা খুব রাগ করলো। ঘরে রান্নার কিছু নেই, আর উনি খরগোশ নিয়ে আহলাদ করেন। তবে ঘরের বাকীরা খুশী। এত সুন্দর কিউট দুটো খরগোশ। ছোটবোন খরগোশ দুটোর দখল নিয়ে নিয়েছে ইতিমধ্যে। সবার ছোট হওয়ায় ওকে ওয়াক ওভার দিয়ে আমরা ওই দুজনের নামকরণে ব্যস্ত হলাম। তখন বিটিভিতে অ্যালেক্স হ্যালীর 'রুটস' চলছিল। সেই সিরিজ থেকে কিনতা আর কুনতে নাম দুটো ধার নিয়ে এদের জন্য বরাদ্দ হলো। কিনতা কুনতে আমাদের নতুন বিনোদন উৎস। প্রতিদিন বিকেলে খরগোশ বাড়ির দরোজা খুলে দেয়া হয়, ওরা ঘুরে বেড়াতে থাকে সামনের সবুজ চত্বরে। সন্ধ্যে হতে হতে আবারো ঘরে ফিরিয়ে নেয়া হয় ওদের।

নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে যাবার কিছুদিন পর একদিন একটা দুর্ঘটনা ঘটলো। সকালে উঠে দেখতে পেলাম, কিনতাকে কে যেন খুন করে রেখেছে। রক্তমাখা শরীরটা পড়ে আছে তার ঘরের সামনে। খরগোশের বাড়িতে সিঁদ কাটা। বাইরের কেউ সিঁদ কেটে ঢুকেছিল নাকি ওরা সিদ কেটে বের হয়েছিল বুঝলাম না।  কুনতা মনমরা হয়ে একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিনতার এই অকাল প্রয়ানে সবচেয়ে বেশী কাঁদলো ছোটবোন দিশা। ওর সবচেয় প্রিয় বন্ধু ছিল খরগোশ দুটো। বাকীদের চোখও অশ্রুসজল।

সেই ঘটনার পর থেকে কুনতা কেমন অস্থির হয়ে যায়। সঙ্গী হারিয়ে ওর কি অবস্থা আমরা বুঝতে পারছিলাম খানিকটা। সহ্য করতে না পেরে একদিন বাবা ওকে খাঁচায় পুরে চিড়িয়াখানায় দিয়ে এলো। আমরা আর কখনোই চিড়িয়াখানায় গিয়ে খোঁজ নেইনি কুনতা কেমন আছে নতুন পরিবেশে। বেঁচে ছিল কতদিন, তাও জানি না। এখনো মাঝে মাঝে খুব মনে পড়ে আদুরে খরগোশ দুটোকে।