Thursday, May 31, 2012

ট্রানজিট

১.
ইতিমধ্যে সৌরজগত ঘিরে পাঁচবার চক্কর খেয়েছে পৃথিবীটা। তবু পৃথিবী বা চাঁদ বা সূর্যের ওঠানামায় কোন তারতম্য হয়নি। পৃথিবীর ওজোন স্তরের ফুটোটা আরো একটু বড় হয়েছে দক্ষিণ গোলার্ধে, উষ্ণতা বেড়েছে নগর ও গ্রামের। পার্থক্য বলতে এটুকুই। আর সব ঠিকঠাক। কিন্তু নিশাতের পৃথিবী অবিচল, অপরিবর্তনীয়। সৌর আলোর আগুনে বৃষ্টিতে ঝলসে যাচ্ছে দিগন্ত বিস্তৃত রানওয়ে। শীতাতপ এয়ারপোর্টে বসে বাইরের উষ্ণতার তেজ টের পাওয়া মুশকিল। ভেতরের কাঁচঘেরা জগতটার সাথে বাইরের কোন মিল নেই। নিশাতের এই যাত্রাটা কারো জন্য বিশেষ কোন ঘটনা নয়।

দেড় দশক আগে যখন এরকম একটা বিশাল হলঘর পেরিয়ে রাস্তায় অপেক্ষমাণ ফোর হুইলের গাড়িটায় চড়ে বসেছিল, তখন ছিল একরকম শূন্যতা, দেশ ছেড়ে আসার নির্বাক শোক। আজ দেড় দশক পর আবারো একটা হলঘর পেরিয়ে বিশাল একটা উড়ুক্কু তিমির পেটে ঢুকে যাবার সময়ও একরকম শূন্যতা। কী ফেলে যাচ্ছে সে এই দেশে? কী এমন অর্জন করেছিল এখানে এসে? নিশাত আজ কোন হিসেব মেলাতে যায় না। পনের বছরের সবকিছু তার মনে থাকলেও, পাঁচ বছর আগের পর্বটা ভুলতে চেয়েছিল। কিন্তু স্মৃতি মুছে ফেলার কোন ক্ষমতা মানুষকে দেয়নি প্রকৃতি। ওটা যন্ত্রণা দেয়না এখন আর, কিন্তু ক্ষতটা রয়ে গেছে। নিশাত বরং আনন্দিত হবার চেষ্টা করে। দেশে ফিরছে সে। কতোগুলো বছর দেশের ঘ্রাণ পায়নি! আকুল করা ঘ্রাণ "ওমা অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতের হাসি"। গান দিয়ে মাথাটা ভরিয়ে রাখবে আগামী ২৮ ঘণ্টা।
২.
আবীরের কথা মনে আছে? নিশাতের পুরোনো বন্ধু। নিশাত আমেরিকায়, সে বাংলাদেশে। কখনো মুখোমুখি দেখা হয়নি। হ্যাঁ সেই আবীর ঘনিষ্ঠতার চূড়ান্তে এসে যে নিশাতকে পাবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। কিন্তু নিশাত একটা পর্যায়ে এসে আবীরকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ভীষণ একটা কারণ ছিল সেটা চেপে গিয়েছিল সে। কিন্তু আবীর পাগলের মতো দেশ ছেড়ে ওর কাছে চলে যাবে বলে ঘোষণা দেবার পর নিশাত ওর সাথে সম্পর্কটাই ছিন্ন করে। তারপর আবীর কেমন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। পাঁচ বছর পর আজ রাত বারোটায় সে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে কানাডা যাচ্ছে বিজনেস ভিসায়। তার ছয় ঘণ্টার একটা ট্রানজিট আছে সিঙ্গাপুরে। সেখানে ওই ছয়ঘন্টায় কি করবে তার একটা খসড়া করে ফেলেছে মনে মনে। সময় কাটাবার জন্য কনসার্ট লাউঞ্জটা তার খুব প্রিয় জায়গা। কিন্তু খসড়া চূড়ান্ত করার সময় ইমিগ্রেশানের লাইনে তার ডাক এসে গেল। এই প্রথম তার বিদেশ যাওয়া নয়, কিন্তু যতবার ইমিগ্রেশান পার হয় বুকের ভেতর একটা ধুকপুক করে। এই লোকগুলো কেমন করে যেন তাকায়। ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পাসপোর্ট ইত্যাদি চেক করে। একবার এক অফিসার কিছু না পেয়েও তার কাছ থেকে ভিক্ষুকের মতো ১০০ টাকা কেড়ে নিয়েছিল। টাকাটা দেয়া কঠিন ছিল না। কিন্তু মানুষ অত সস্তায় নিজেকে বিকোয় দেখে অবাক লেগেছিল। দুঃখও। সে নিজে খুব সস্তা হয়ে গিয়েছিল। ছুঁড়ে ফেলবার মতো সস্তা হয়ে গিয়েছিল একজনের কাছে। ভুলতে চায় সেই ঘটনাটা। সেই পর্বটা। পারেনি। এবার ইমিগ্রেশান পার হওয়াটা অন্যরকম। তার ভিসা এক মাসের। কিন্তু সে জিন্দেগীতে ফিরবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

৩.
আপনারা ঠিকই ধরেছেন। এখানে খুব চেনা একটা নাটকীয় ঘটনা ঘটবে। কারণ একই দিনে সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্ট দিয়ে নিশাত বাংলাদেশে আসছে। ওর ট্রানজিট চার ঘণ্টার। সেই চার ঘণ্টা কিভাবে কাটাবে সে জানে না। তবু কনসার্ট লাউঞ্জে চলে আসবে নিয়তির নির্দেশে। জায়গাটা সময় কাটাবার জন্য আদর্শ। সব ঠিকঠাক থাকলে আবীরের সাথে নিশাতের দেখা হয়ে যেতে পারে। দুজনের ট্রানজিট টাইম প্রায় কাছাকাছি সময়ে।

৪.
নিয়তির প্ল্যানমতোই এগোচ্ছিল। কিন্তু ইমিগ্রেশান অফিসারের সাথে লেগে গেল আবীরের। তার সাথে ছোটলোকের মতো ব্যবহার করেছে ওরা। অপমান করেছে যেন সে পাচারকৃত চোরাই আদম। তাকে দেখেই বললো, দেশ থেকে ভাগছেন নাকি। কথাটা সত্য বলেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতে হলো তাকে। মুখ দিয়ে কু কথা বেরিয়ে যায় রেগে গেলে। ইংরেজিতে গালি দিয়ে উঠতে তাকে ধরে ফেললো একজন। পুলিশে দেবে অবস্থা। পরে মাফ চেয়ে সমস্যার সমাধান করলো। কারণ তাকে দেশ ত্যাগ করতেই হবে। ফেরার কোন উপায় নেই। জীবনে কারো কাছে এতটা অপমানিত হয়নি সে। সেই অপমানের যন্ত্রণায় তার সমস্ত প্ল্যান ভেস্তে গেল। সিঙ্গাপুরে গিয়ে যখন পৌঁছেছে তখন সে কনসার্ট লাউঞ্জের কথা ভুলে গিয়ে বারে গিয়ে কয়েক পেগ হুইস্কি খাবে। তারপর সোফায় গিয়ে ঘুম।

৫.
নিশাত কারো জন্য অপেক্ষা করছে না। কনসার্ট শুনছে একা বসেই। সে জানেই না নিয়তির একটা নির্ধারিত খেলা থেকে সে বঞ্চিত হলো। মাত্র তিনশো গজ দূরেই অনেক লোকের ভিড়ে ঘুমাচ্ছে আবীর। নিয়তি নিশাতকে কিছু না জানালেও দেশের কথা ভাবলেই তার আবীরের কথা মনে পড়ে। পাঁচ বছরে কতো কিছু হয়ে গেছে। বিয়ে করে সংসারী হয়েছে ছেলেটা এদ্দিনে। চুলে পাক আসবে? কতো বয়স হবে ওর এখন? চল্লিশ? চল্লিশে কারো চুল পাকে? মন খারাপকে ছুটি দিয়েছিল আমেরিকাতেই। তবু এই কথাটা মনে পড়তে কেমন আনমনা হয়ে গেল। আবীরকে সে যে কারণে প্রত্যাখ্যান করেছে সেটা সফল হয়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু নিশাতের সফলতা কোথায়? বাকী জীবনও তার একাই কাটবে? চল্লিশের কোন নারীকে কেউ বিয়ে করে না। বাঙালী নারী কুড়িতেই বুড়ি নাকি। কি সব কুসংস্কার। তাকে তো এখনো কেউ বুড়ি বলেনি। বিয়ে ব্যাপারটা ভাবলেই তার হাসি পায়। লোকজন কেন এই যুগে ওরকম একটা নাছোড় বাঁধনে জড়ায়!

৬.
নিশাতের খিদে পেয়ে গেছে। দু-ঘণ্টা পার হলো মাত্র। সময় যেন কাটছেই না। একটা ফাস্ট ফুড কর্নারের খোঁজে বেরুলো সে।

৮.
মাথা ধরে গেছে আবীরের। সোফাটার মাথায় চকচকে স্টিলের রড। ওটায় মাথা চেপে ঘুমিয়েছিল এতক্ষণ। ব্যথা ব্যথা লাগছে। কাছের টয়লেটে গিয়ে মাথায় পানি দিয়ে একটু ভালো লাগতে সে ভাবলো কনসার্টের দিকে যাবে। ব্যাগটা টানতে টানতে এগিয়ে গেল।

৯.
নিয়তি আবারো ফাজলামি করলো। আবীর যখন কনসার্টে গিয়ে বসেছে, নিশাত তখন দেড়শো গজ দূরের একটা ফাস্টফুড কর্নারে একটা স্যান্ডউইচ গেলার চেষ্টা করছে এক গ্লাস কোক দিয়ে।

১০.
ঘড়ি দেখলো আবীর। এখনো বাংলাদেশের সময় দেখাচ্ছে। মনে নেই লোকাল টাইম করতে। করে লাভও নেই। খানিক বাদেই তো আবার বদলে যাবে সময়। খিদে পেয়েছে তারও। এই ব্যাগ বোঁচকা টানতে টানতে খাওয়া দাওয়া যন্ত্রণা লাগে। সে লাউঞ্জের ডানপাশের সারির একটা চেয়ারে ব্যাগগুলো রেখে খাবার উদ্দেশ্যে বেরুলো।

১১.
না, সে নিশাতের ওই ফুড কর্নারের দিকে গেল না। তার পরিচিত চমৎকার একটা সিঙ্গাপুরি ফুড শপ আছে উল্টোদিকে। ওখানে গিয়ে চাওমিন খাবে।

১২.
নিশাত খাওয়া সেরে ভাবলো আরো দেড় ঘণ্টা! এদিকে আসার পথে অর্কিডের বাগান দেখেছিল কোথায় যেন। খুঁজতে গেল সেটা। অর্কিড খুব প্রিয় তার।

১৩.
পেটপুরে চাওমিন খেয়ে আবীর ভাবলো আরো তিন ঘণ্টা বাকী। সময় কাটাবার উপায় কি। মনে পড়লো, ব্রাউজিং কর্নারের কথা। নেট ব্রাউজিং করে নেয়া যাক কিছুক্ষণ। ব্রাউজিং সেন্টারে গিয়ে ঢুকলো সে।

১৪.
অর্কিড দেখে মন ভরে গেল নিশাতের। এখানেও যদি সঙ্গীতের ব্যবস্থা থাকতো। কনসার্টের বাদ্যগুলো কি যে মিষ্টি লেগেছে। এই প্রথম উপভোগ করতে শুরু করেছে সময়টা। অর্কিড দেখা শেষে কনসার্টের দিকে গেল আবার। শেষ সময়টা এখানেই কাটুক। পকেটের ছোট্ট নোটবুক বের করে হাতের নীল পেন্সিলটা দিয়ে গুটিগুটি পায়ে সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ বিবরণ লিখতে বসলো। এটা অনেক দিনের পুরোনো অভ্যেস। কোথাও গেলে নোট লেখে সে।

১৫.
নেট সার্ফিং করতে বসে চ্যাটে ঢুকে পুরোনো বন্ধু আরিফকে পেয়ে গেল আবীর। জানা গেল গত বছর দুবাই থেকে কানাডা চলে গেছে সে। একই শহরে আবীরও আসছে জেনে অসম্ভব খুশী হলো এবং গিয়ে তার ওখানে ওঠার জন্য চাপাচাপি করতে লাগলো। এক ঘণ্টার বেশী আড্ডা শেষে ওর ঠিকানা লিখে নিতে গিয়ে খেয়াল হলো কলম নেই। ব্যাগে রয়ে গেছে। আরিফকে অপেক্ষা কতে বলে সে কলমের খোঁজে গেল।

১৬.
নিশাতের ফ্লাইট কল করছে। বোর্ডিং কার্ড সংগ্রহ করতে হবে। গেট নাম্বারটা দেখে নীল মনিটরের পর্দায়। ডানদিকের চেয়ারে একটা মালিকবিহীন ব্যাগ দেখে বহুবছর আগের ওরকম একটা ব্যাগের কথা মনে পড়লো। নিজের হাতব্যাগটা নিয়ে বামদিকের প্যাসেজ ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলো।

ঠিক একমিনিট পর ডানদিকের প্যাসেজ থেকে দ্রুতপায়ে হেঁটে এলো আবীর। এসে ব্যাগ রাখার জায়গায় গিয়ে ব্যাগের সাইড পকেট থেকে কলমটা বের করে নিল। খেয়াল করলো পাশের সারির একটা চেয়ারে কে যেন একটা নীল পেন্সিল ফেলে গেছে। কলম নিয়ে সে আবার দ্রুত চলে গেল সার্ফিং লাউঞ্জের দিকে।

বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে আজকের একমাত্র ফ্লাইটটি উড়াল দেবার এক ঘণ্টা পরে আবীরের ফ্লাইট কল এলো বোর্ডিং কার্ড সংগ্রহের জন্য। নিশাতের ফ্লাইট যখন বঙ্গোপসাগরেরর প্রান্ত ছুঁয়েছে, আবীরের ফ্লাইট তখন মালয়েশিয়ার আকাশ পেরিয়ে আরো পূর্বদিকের গন্তব্যে। এই প্রথম প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেবে আবীর।

৩১শে মে ২০১২

Monday, May 28, 2012

ছাড়

আমি এই দ্বীপে আসার সুযোগ খুঁজছিলাম অনেক বছর ধরে। অবশেষে দ্বীপটিতে আমার একটা অভাবিত আশ্রয় মিললো। তুমি আসতে চাইতে না। আধুনিক সুযোগ সুবিধা রহিত কোন দ্বীপে তুমি থাকতে চাও না। এ যেন স্বেচ্ছা নির্বাসন। পৃথিবীর একমাত্র গাড়িবিহীন দ্বীপ। তুমি তোমার শখের ফিয়াট গাড়িটা রেখে আসতে হচ্ছিল বলে তিনদিন তিন রাত কেঁদেছিলে। আর আমি গাড়ি যন্ত্রনা থেকে মুক্তিলাভের জন্য হন্যে হয়ে উঠেছিলাম। মনে আছে তুমি কতোবার দূর্ঘটনায় পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছো? সেই কুফা গাড়িটাকে তুমি এত ভালোবাসতে আমি ভাবতে পারি না। গাড়িটা তোমার জন্মদিনের উপহার হলেও ওটার কাছ থেকে মুক্তি লাভের জন্য আমি হন্যে হয়ে সুযোগ খুঁজছিলাম যেদিন গাড়িটা প্রথম নিয়ন্ত্রন হারিয়ে পাহাড় থেকে গড়িয়ে সমুদ্রের দিকে যেতে যেতে জলপাই গাছটার সাথে আটকে দাড়িয়ে গেল। আমি ওখানেই ফেলে আসতাম। কিন্তু তুমি তা হতে দিলে না। ক্রেন এনে গাড়িটাকে উদ্ধার করলে। তারপর আবার মেরামত করে রাস্তায়। রঙ চটে গেছে গাড়িটার অনেক জায়গায়। তবু তুমি নতুন রঙের প্রলেপ দিতে চাও না। গাড়িটাকে তুমি এত ভালোবাসতে মাঝে মাঝে আমার ঈর্ষা হতো। আমার দেয়া গাড়ি অথচ তুমি আমার চেয়েও গাড়িটাকে বেশী ইজ্জত করতে শুরু করেছো। গাড়িটা ফেলে দেবার আমার সকল যুক্তি তর্ককে তুমি স্তব্ধ করে দিতে সেই একটা বাক্য দিয়ে, গাড়িটা আমার প্রেমের প্রথম উপহার। তাই জীবনের শেষদিন পর্যন্ত প্রেমের উপহারকে আদিরূপে রাখতে চাও। অথচ ওরকম একরোখা কোন সেন্টিমেন্টে আমি গাড়িটা তোমাকে দেই নি। ভালোবাসার জন্য বছর বছর নতুন উপহার দেয় মানুষ। তুমি একটা উপহারকে আজীবনের মওকা ধরে নিয়ে বসে থাকলে জীবনের বাকী থাকলো কি। তবু তোমার প্রেমের অটল সিদ্ধান্তে তুমি অনড় থাকতে চেয়েছিলে।

--------------------

আমাদের বিয়ের তিন বছর পেরিয়েছে তখন। আমাদের প্রেমের কোথাও চিড় ধরেনি। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। তবু একদিন বাসায় একটা টেলিফোন এলো রং নাম্বারে। দুঃখ প্রকাশ করে লাইন কেটে দিল ওপার থেকে। পরের সপ্তাহে সেই নাম্বার থেকে আবারো টেলিফোন। এবার ভুল নয়। সচেতন ভাবে। বললো, কথা বলতে চায় আপত্তি আছে কিনা। তুমি জানো আমি টেলিফোনে পারদর্শী নই। যেসব মানুষ রাতের পর রাত প্রেয়সীর সাথে কথা বলতে পারে আমি তাদের দলে নই। আমি দশ মিনিটের বেশী গেলে হাপিয়ে উঠি। তুমি বারবার অভিযোগ করতে। আমি জানাতাম এ আমার সীমাবদ্ধতা।

সেই অচেনা কন্ঠটি যখন জানতে চাইল আপত্তি আছে কিনা, আমি 'না' উচ্চারণ করেছিলাম। তুমি বিশ্বাস করো, আমি 'না' বলেছিলাম, কথা বলবো না বলার জন্যই। কিন্তু ওই 'না' এর অর্থ যে হ্যাঁ সেটা বুঝতে কয়েক মিনিট লেগেছিল আমার। ততক্ষণে অপর পক্ষ কথা বলতে শুরু করেছে। এবং দেখা গেল শুনতে আমার খারাপ লাগছে না। কারণ ওই পক্ষ শোনার চেয়ে বলতে পছন্দ করছে। আর শোনার ব্যাপারে আমার জুড়ি নেই তা তো জানোই। আমি চোখ বন্ধ করে শুনতে লাগলাম। অবাক হচ্ছো চোখ বন্ধ করেছি কেন? কারণ কন্ঠটি এমন একটা সুরে কথা বলছিল যা আমার কৈশোরের প্রথম প্রেমে পড়া মেয়েটির কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল। আমি কথা শুনতে শুনতে ফিরে গেলাম কৈশোরে। যে মুখটা আমি কখনোই ভুলি না সেই মুখটা ভেসে উঠলো টেলিফোন কন্ঠে। সেদিন থেকে আমাদের অনর্গল কথা বলার সুত্রপাত হয়। আমি নিজেও কখন যে কথা বলতে শিখে গেলাম জানি না। দিনের পর দিন মাসের পর মাস আমাদের কথা চলেছে। অদ্ভুত ব্যাপার কি জানো? আমি মেয়েটার নাম জানি না। মেয়েটাও আমার নাম জানে না। আমরা কেউ কারো সম্পর্কে কিছুই জানতে চাইনি। আমরা কেবল সময় নির্দিষ্ট করে নিয়েছিলাম কথা বলার। আমি চাইতাম এমন একটা সময় যখন আমি বাসায় থাকি না। কিংবা তুমি যখন বাসায় থাকো না। সেও বোধহয় তেমন একটা সময় বেছে নিতো যখন সে একা থাকে। আমাদের ফোনালাপের সময়গুলো ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সময়। ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলার পরও আমাদের একবিন্দু ক্লান্তি আসতো না।

তুমি টের পাওনি বলে অবাক হচ্ছো? আমিও অবাক হতাম। তোমাকে ঠকাচ্ছি ভেবে প্রথম কদিন আক্ষেপে ভুগেছি। পরে ভেবে দেখলাম তোমাকে যতটুকু দেবার ততটুকু দেবার পরেই আমি ওকে সময় দিচ্ছি। তোমার কাছ থেকে কোন সময় চুরি করিনি। তোমার কাছ থেকে ভালোবাসার কোন ভাগ ওকে দিতে হয়নি। সে তার নিজের অংশটাই নিয়েছে। হ্যাঁ সে তার নিজের একটা অংশ সৃষ্টি করে নিয়েছিল আমার হৃদয়ে। মানুষের হৃদয়টা একটা অদ্ভুত জায়গা। এটা অসীম স্থিতিস্থাপক রাবারের মতো। যতগুলো মানুষকে তুমি ভালোবাসতে চাও ততগুলোকে বাসতে পারবে। যখন তুমি একজনকে ভালোবাসছো তখন মনে হবে তুমি একজনের জন্যই সৃষ্ট। যখন দুজনকে বাসতে শুরু করবে তখন দুজনের জন্য জায়গা তৈরী হয়ে যাবে। মানুষ, পোষা প্রাণী, গাছপালা, সবকিছুর জন্য ভালোবাসার আলাদা আলাদা খুপড়ি আছে হৃদয়ে। সেরকম একটা খুপড়ি বানিয়ে বসবাস করতে শুরু করেছিল সে। তোমার সাম্রাজ্যের কোন ক্ষতি হয়নি তাই।

তোমাকে না ঠকিয়েও ওই নারীর সাথে আমার বন্ধুতা নিরুপদ্রপ ছিল কয়েকটা বছর। একদিন যাদুকর লোকটা স্বপ্নে হানা দিল আমার। মনে আছে লোকটার কথা? তোমার দ্বিতীয় গাড়ি দুর্ঘটনার পর একদিন রাস্তায় হাত দেখিয়ে গাড়িতে উঠে বসেছিল। তারপর গল্প করছিল জেবেল পাহাড়ের চুড়ার পাথরের মাথাটি ভুমধ্যসাগরে খসে পড়ার। দাবী করছিল সংবাদে যদিও আসেনি কিন্তু ওই ঘটনার জন্য দায়ী তার যাদুদণ্ডটি। সে বলছিল তোমাকে দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করার পেছনেও আছে সেই যাদুদণ্ড। আমি লোকটাকে অবিশ্বাস করেছিলাম বলে সে কেমন একটা অদ্ভুত হাসি দিয়েছিল। সেদিন সেই যাদুকর স্বপ্নে হানা দিয়ে বললো, সে তোমাকে সবকিছু বলে দেবে এবং শুধু তাই নয় তোমাকে নাকি আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবে। আমি চমকে গেলাম। জেগে উঠলাম ধড়ফড় করে। পাশে শুয়ে তুমি কিছুই জানো না।

কয়েকদিন পর আবারো একই স্বপ্ন। যাদুকরটি এই শহরেই থাকে। শহরের নাড়ি নক্ষত্র সব জানা তার। আমার পিছু নিয়েছে, বলা যায় তোমার। অথবা তোমার আমার দুজনেরই। এতদিন পর তোমাকে হারাবার ভয় পেয়ে বসলো আমাকে। অথবা ধরা পড়ার। আমি তোমাকে হারাতে চাই না আবার ধরাও পড়তে চাই না। কৌশলে তাই আমি শহর ছেড়ে পালাবার জন্য রাস্তা খুঁজতে শুরু করি। এমন একটা শহর যেখানে আধুনিকতা নেই, গাড়ি নেই, দালানকোটা নেই। আছে কেবল বিরল এক নৈঃশব্দ, যেখানে দিনের বেলায়ও ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ পাওয়া যায়। এই পরিচিত গণ্ডী ছেড়ে বহুদূরের দেশে।

----------------------------

অবশেষে আমি এই দ্বীপে পৌঁছালাম তোমাকে নিয়ে। এখানে একদম আনকোড়া নতুন জীবন। এই দ্বীপে তৈরি কিছুই নেই। থাকার একটি ঘর বাদে সবকিছু তৈরী করে নিতে হবে। প্রশান্ত মহাসাগরে পথ হারা জাহাজের নাবিকেরা এখানে নির্মান করেছিল সাময়িক আবাস তার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এই ফরাসী দ্বীপের নাগরিক সমাজ। মাত্র দেড়শো ঘর মানব বসতি নিয়ে কখনো একটা শহর হয়? এটি হয়েছে। সভ্য সমাজ থেকে বহুদূরে এই দ্বীপের সাথে একমাত্র যোগাযোগ বাহন একটা যান্ত্রিক নৌযান যেটা সপ্তাহে একবার নিকটস্থ বৃহৎ দ্বীপটা থেকে রসদপত্র যোগাড় করে আনে। প্রতি শনিবার এই দ্বীপটা খালি হয়ে যায়। তখন সমস্ত দ্বীপে আমরা দুজন বাদে আর কেউ থাকে না। কী অদ্ভুত ব্যাপার বলতো, প্রতি সপ্তাহে কয়েক ঘন্টার জন্য আমরা একটা দ্বীপের মালিকানা পেয়ে যাবো। এখানে তোমাকে আমাকে কেউ বিরক্ত করবে না স্বপ্নে হানা দিয়েও। এই দ্বীপে পা রাখার পরদিন থেকে আমার সেই দুঃস্বপ্নটা নির্বাসনে গেছে।

আমি সত্য গোপন না করে সব খুলে বললাম। তুমি কি আমাকে ঘৃনা করবে এখন?

==============================================================
- ভয় পেয়ো না। এটা একটা গল্প।
- গল্প?
- হ্যাঁ। একটা বিদেশী ম্যাগাজিনে পড়া গল্প।
- এই গল্প আমাকে শোনালে কেন? এই দ্বীপে আসার সিদ্ধান্ত নেবার পেছনে একটা রহস্য আছে বলেছিলে। এটাই কি সেই রহস্য?
- না। তবে আমাদের প্রত্যেকের কিছু না কিছু 'না বলা গল্প' থাকে। সেই গল্পগুলো বলা হলে জীবনের ছক একরকম থাকে, না বলা হলে জীবন অন্যরকম। তুমি কি চাও 'না বলা গল্পগুলো' সব বলা হয়ে যাক?
-না!
-আমার সেই টেলিফোন নিয়ে কোন কৌতুহল আছে?
-না, নেই।
-গুড। তোমার বন্ধুর চিঠির ব্যাপারটা নিয়েও আমি কিছু বলবো না।
-থ্যাংকু।
-জীবনে এরকম ছোট ছোট ছাড় দিয়েই টিকে থাকতে হয়।
-নিঃসন্দেহে
-তাহলে চলো বিকেলের কফি পর্বটা সেরে ফেলি। একটু পরেই আঁধার নামবে দ্বীপে।

Sunday, May 20, 2012

মুক্তিযুদ্ধের উপর একটি কালজয়ী চলচ্চিত্রের অপেক্ষায়

দেখছিলাম Battle of Algiers। ১৯৬৬ সালের এই ছবিটা কেউ কেউ দেখেছেন হয়তো। ছবিটার সাথে আমাদের উপনিবেশ আমলের বেশ কিছু মিল আছে। কিন্তু ছবিটা দেখে আমার মাথায় একটা বাক্য খেলছিল - 'ব্যাট্ল্ অব বাংলাদেশ'। না, এই নামে কোন ছবি বাংলাদেশে নেই। কিন্তু এরকম একটা ছবি দেখার স্বপ্ন দেখছি আমি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত এন্তার ছবি দেখেও আমার তৃপ্তি মেটেনি। আলজেরিয়ার ছবিটা সেই অতৃপ্তিটা আবারো জানান দিতে শুরু করেছে। হুমায়ূন আহমেদের দেয়ালের কয়েক পাতা পড়ে সেই ইচ্ছেটা ঘোরতর যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

মাত্র নয় মাসে স্বাধীনতা এসেছে বলে কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধকে সস্তা জ্ঞান করে। তাদের কাছে রক্তের ঘনত্বের কোন আপেক্ষিক গুরুত্ব নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সমস্ত পৃথিবীর সবগুলো পরাশক্তির সম্মিলিত অস্ত্রপাতেও এত রক্তের বান ডাকেনি। এমনকি মহাযুদ্ধের মারণাস্ত্রের লক্ষ্যের তালিকায় সরাসরি নিরীহ মানুষ ছিল না। কিন্তু পাকিস্তানী অস্ত্রের একমাত্র লক্ষ্যবস্তু ছিল নিরীহ মানুষ, ২৫ মার্চের অপারেশান সার্চলাইটের টার্গেট মধ্যরাতের ঘুমন্ত মানুষ। বস্তুতঃ পাকিস্তানীদের আগে একা একটা জাতির এত রক্ত ঝরানোর রেকর্ড আর কারো নেই। পাকিস্তান আগামী একশো বছর প্রায়শ্চিত্ত করলেও সেই রক্তের দেনা শোধ হবে না। ক্ষমা চাওয়া তো সেই তুলনায় নস্যি।

সেই আমাদের রক্তে ধোয়া স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে পূর্নাঙ্গ কোন চলচ্চিত্র নেই!! ভাবা যায়? Battle of Algiers দেখতে বসে এ কথাটাই মনে পড়ছিল। ইতালির পরিচালক Gillo Pontecorvo ছবিটায় আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের কৃতিত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে ছবিটা বানিয়েছিলেন। ছবিটা দেখে সংক্ষেপে ওদের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটা টাইম লাইন খুঁজে পাবেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের মুখ্য চরিত্র গুলো খুঁজে পাবেন। দ্য গলের ফরাসী সরকারকে আলজেরিয়ার মাটি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য FLN (জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট) নামে দলটির মুষ্টিমেয় সদস্যের সশস্ত্র আন্দোলন/আত্মত্যাগ কিভাবে গনআন্দোলনে পরিণত করে সেটা বুঝতে পারবেন। ঘটনার বিস্তার ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২। ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে ১৯৬২ সালে। আরো দুই যুগ আগে আমাদের সূর্যসেন-প্রীতিলতারা ঠিক এরকম কাজই করতে চেয়েছিল। স্বাধীনতা আসতে আরো দুটো ধাপ পেরোতে হলেও, প্রেরণার অনেকটা ভিত সূর্যসেনরাই গড়ে দিয়েছিল।

স্বাধীনতার জন্য আলজেরিয়া বা অন্য যে কোন দেশের তুলনায় আমাদের অনেক বেশী রক্ত ঢালতে হলেও সেটা নিয়ে এখনো একটি পূর্নাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারিনি কেন? এই ভাবনাটা খুব পোড়ায়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেসব চলচ্চিত্র এ যাবৎ নির্মিত হয়েছে তার মধ্যে এমন কোন সিনেমা আছে যেটায় মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতা আছে? এমন কোন ছবি আছে যাতে সবগুলো প্রধান ঘটনার বিবরণ আছে, মুক্তিযুদ্ধে সব নায়ক খলনায়কদের কথা আছে? নেই!! মুক্তিযুদ্ধের সকল প্রধান উপাদান উপস্থিত আছে সেরকম একটি কালজয়ী চলচ্চিত্রও আমাদের নেই!

অথচ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিভ্রান্তিকর ইতিহাস পাঠ থেকে রক্ষা করার জন্য ইতিহাসের ধারাবাহিক বিবরণী নিয়ে একটা চলচ্চিত্র থাকা জরুরী। চলচ্চিত্রটি নিয়মিত দৈর্ঘ্যের বদলে যদি তিনগুণ বেশীও হয় তবু এমন একটা চলচ্চিত্র আমাদের বানাতে হবে। যারা যুদ্ধ করেছেন, কিংবা যারা যুদ্ধের সময়ের স্মৃতি ধারণ করার মতো বয়ঃপ্রাপ্ত ছিলেন, তেমন মানুষেরা এখনো বেঁচে আছেন। আর দশ বছর পর অনেকেই থাকবেন না। তাই জরুরী ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা পূর্নাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণ করার উদ্যোগ নিতে হবে। এখনই সময়।

আশার কথা দেশে শিক্ষার হার বাড়ছে, আবার আশংকার কথা- বাড়ছে জ্ঞানপাপীদের সংখ্যাও। নানা বর্নের খল ইতিহাসবিদ এদেশে সুক্ষ্ণভাবে সক্রিয়। তারা খুব সুশীলতার সাথে আমাদের ইতিহাসের মূল আবেগ অথবা পাকি নৃশংসতার চিত্রগুলো মুছে সেখানে প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করছে অর্ধসত্য রকমের বানোয়াট ইতিহাস। লেখনীর কৌশলে কিংবা শিল্পের সৌকর্যে ইতিহাস কোথাও কোথাও পরিণত হচ্ছে পরিহাসে।

মেহেরজান ও দেয়াল - এই দুটো জিনিসই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দ্বারা চালিত অপ ইতিহাস বর্ণনার প্রয়াস।

গেল সপ্তাহে লেখাটি মগজে থাকা অবস্থায় ভাবা হয়েছিল সেই ছবিটি নির্মাণ উপাদানের মধ্যে ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৭১ এই বছরগুলোই থাকবে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের দেয়ালের আগমন বার্তা দেখে মনে হচ্ছে একাত্তরের পর ১৯৭৫কেও আনতে হবে তথ্যচিত্র ভিত্তিক এই চলচ্চিত্র নির্মাণে। ইতিহাসের মহানায়কের মর্মান্তিক প্রস্থানকে সঠিক ইতিহাসের আলোতে ধারণ করা এবং স্বাধীনতা পরবর্তী খলনায়কদের চিহ্নিত করা খুব প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে নায়ক মহানায়কের চেয়ে খলনায়কেরাই বেশী সক্রিয়। নিরপেক্ষতার ভণ্ডামিতে না গিয়ে সেই সব খলনায়ককেও স্পষ্ট আলোয় চিহ্নিত করতে হবে। তা না হলে সুশীল ইতিহাস খাদকেরা খুবলে খুবলে খেয়ে ফেলবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস। আগাছায় ভরে যাবে ইতিহাসের পাতা। আমরা তা হতে দিতে পারি না!

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি পূর্নাঙ্গ চলচ্চিত্র চাই! ইতিহাস নষ্টকীটের খাদ্য হবার আগেই!!

==============================

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা পূর্নাঙ্গ চলচ্চিত্রের সম্ভাব্য উপাদান-

১. বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে উনসত্তরের গন অভ্যুত্থান পর্যন্ত ঘটনাবলীর সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
২. শেখ মুজিবের ছয় দফা আন্দোলন থেকে সত্তরের নির্বাচন।
৩. একাত্তরের মার্চ মাস বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক মাস। শুধু মার্চের ঘটনাবহুল দিনগুলির বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে একটা পর্ব থাকতে পারে। স্বাধীনতার ঘোষনা বিষয়ক ইতিহাসটা স্পষ্ট করে প্রমাণ সহকারে উপস্থাপন করা হবে।
৪. পঁচিশে মার্চের পর থেকে শুরু হওয়া গনহত্যা, শেখ মুজিবকে গ্রেফতার, প্রবাসী সরকার গঠন ইত্যাদি।
৫. ভারতে শরনার্থী জীবনের চিত্র
৬. মুক্তিবাহিনীর গঠন, সেক্টরসমূহের জন্ম ও কর্মকান্ড।
৭. মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সুবিধাবাদী নেতাকর্মী ও ষড়যন্ত্রকারীদের কার্যক্রম
৮. মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের ভূমিকা
৯. জাতিসংঘ ভারত সহ পরাশক্তিসমূহের ভূমিকা
১০. ভারতের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এবং পাকিস্তানের আত্মসমর্পন।
১১. গেরিলাযুদ্ধের বিশেষ কয়েকটা অপারেশন

যেসব ঘটনা বা ব্যক্তিদের ভূমিকা স্পষ্ট করে দেখাতে হবে
১. শেখ মুজিবুর রহমান
২. তাজউদ্দিন ও প্রবাসী সরকার
৩. সেক্টর কমান্ডারগনের ভূমিকা
৪. বিশেষ বীরত্ব বা ভূমিকা পালনকারী রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব
৫. রাজাকার আলবদরের পাশাপাশি খন্দকার মুশতাক সহ অপরাপর দলীয় বিশ্বাসঘাতকগন
৬. পাকি বাহিনী আর তা সহযোগীতের নৃশংসতা
৭. বুদ্ধিজীবি হত্যা
৮. বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকা


Saturday, May 12, 2012

হাউ টু ম্যানেজ ইয়োর পাপ


ধার্মিকদের জন্য ব্যাপারটা মানে এই লেখার বিষয়বস্তু অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু পাপীরা মনে মনে মুচকি হেসে জানবেন এতো আমার রোজকার কারবার, নতুন করে কি শেখার আছে? আসলে শেখানোর কোন চেষ্টা করা হচ্ছে না। শেখাবার থাকলে শিরোনাম দিতাম- 'এসো নিজে শিখি'।

যাই হোক বিষয়ের শুরুতে রোজার দিনে শৃংখলাবদ্ধ শয়তানের কাণ্ডকীর্তি দিয়ে কিছু বলি।

ভাবছেন রোজার দিনে তো শয়তানকে গরাদে পুরে রাখা হয়। তার কাণ্ড কীর্তি নিয়ে কিসের চাপাবাজি? সেটা আমারও বিস্ময় ছিল। কিন্তু বেশীক্ষন বিস্ময় থাকবে না, যখন আপনি ইরাদ হোসেনকে দেখবেন। আসুন পরিচয় করিয়ে দেই ইরাদ হোসেনের সাথে।

ইরাদ হোসেন অতিশয় ভদ্রলোক মানুষ। নিয়মিত ধর্ম কর্ম করেন। অন্য অনেকের মতো তিনি ধর্মের সাথে কর্মকে মেলান না। ধর্মের কাজ ধর্মের সিস্টেমে করে, কর্মের কাজ কর্মের সিস্টেমে চালান। দুই সিস্টেমের মধ্যে কখনো বিরোধ বাধে না তাঁর। এখানেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব। ইহকাল আর পরকালকে যারা একটা সুতোয় বাঁধতে পারে জগতে তাদের উন্নতি ঠেকাবে তেমন শক্তি কারো নেই।

ধর্মে যাদের অতি মতি আছে তাদের প্রধান কয়েকটি আচার হলো নিয়মিত মসজিদে গমন করে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করা, রোজার দিনে ইফতার করে ঘুম দেবার বদলে খতম তারাবীর জন্য প্রস্তুত হওয়া, জুম্মাবারে এগারোটার সময় মসজিদে গিয়ে প্রথম কাতার দখল করে ইমাম সাহেবের বয়ান শোনা ইত্যাদি। ইরাদ হোসেন এর কোনটিতেই ব্যর্থ হয়নি কোনকালে।

ফিরে আসি রোজার দিনে। এই মাসটিতে ইরাদ হোসেন বছরের অন্যন্য সময়ের তুলনায় অধিক পূণ্য কামাই করার চেষ্টা করে। সুযোগ পেলেই শয়তানকে শাপ শাপান্ত করে। ফলে তার পূণ্যের ঘরে বাম্পার ফলন সারা বছর। পাপের ঘরটা খা খা শূণ্য। রোজার দিনে শয়তানের প্রতি বিশেষ ঘৃনা নিক্ষেপ করার মানসে তারাবীর নামাজ শেষ করে আসার পথে শয়তানের দরোজায় গিয়ে কষে অভিশাপ দিয়ে আসে। সেদিন শয়তানের গরাদের কাছে দাড়িয়ে শাপান্ত করার সময় তার পাঞ্জাবির পকেটে কখন যে ইবলিশের বামহাত আলগোছে কিছু একটা ঢুকিয়ে দেয় সে টের পায় না। যখন সে টের পায় তখন সে ঘরের কাছাকাছি। পাপের বীজটা হাতে নিয়ে সে বুঝতে বাকী থাকে না এটা কার কাজ এবং এটা কিসের বীজ। একই সাথে কিসের বীজ বুঝতে পেরেছে বলেই ওটা স্পর্শ করে ইরাদ হোসেন কেমন দুর্বল বোধ করতে থাকে। তাই  ফেলে দেবার বদলে বীজটা ড্রয়ারে রেখে দিল। ছোট্ট করে ভেবেছে 'থাক, কালকে ফেলবো, আজকে রাখি'। সেই শুরু। প্রতিদিন ইরাদ হোসেন তারাবী থেকে ফেরার পথে শয়তানের গরাদে যায় অভিশাপ দিতে, ফেরার পথে একটা করে বীজ পকেটে করে নিয়ে আসে, সে বলে অনিচ্ছায়, লোকে বলে স্বেচ্ছায়।

বীজগুলো ফেলতে গেলে দুর্বল লাগে, তাই জমিয়ে রাখতে রাখতে বিশাল স্তুপ হয়ে যায়। তখন সে খেয়াল করে তার পাপের শূণ্য ঘরটা এখন আর খাঁ খাঁ করে না। পাপপূণ্য সমানতালে মিলে মিশে বাস করতে থাকে দুই পাশের দুটো ঘর জুড়ে।

ইরাদ হোসেন মাঝে মাঝে অনুতপ্ত হয়। তখন সে ধর্মের ব্যাখ্যাসংক্রান্ত বইপত্র খুলে পাপবীজ সংক্রান্ত জ্ঞানার্জন করে। দেখতে পায় সকল পাপেরই সহজ সমাধান আছে মুষ্টিমেয় গুরুতর কয়েকটি বাদে। ইরাদ হোসেন বোকা নয়, তেমন গুরুতর পাপ সে করে না। ছোটখাট নিয়ন্ত্রনযোগ্য পাপ সে করে যা প্রতিদিনের প্রার্থনায় কেটে যায়। বরং ধর্মমতে যখন বিশেষ কিছু দিবসে পূণ্যের বাম্পার বোনাস দেয়া হয়, তখন বর্তমান ছাড়িয়েও আগামী কয়েক বছরের জন্য পূণ্য সঞ্চিত হয়ে যায়। এতটা  পূণ্য একজন মানুষের জন্য বাহুল্যই বটে। বিলাসিতাও বলা যায়।

সে কখনো বিলাসীতা পছন্দ করে না। ইহকালে তো নয়ই পরকালেও না। এক জায়গায় পড়েছে কেয়ামতের দাড়িপাল্লায় তিল সমান একটা পূণ্য পাহাড় সমান একটা পাপের চেয়েও ওজনদার। কেয়ামতের ময়দানের অভিকর্ষ বিজ্ঞান সে বোঝে না। কিন্তু বোঝে যে ধর্মগ্রন্থ যা বলে তার সবই সত্য।

তাই মাঝে মাঝে আজকাল সে বাড়তি পাপ সঞ্চয় করতে থাকে। সেই পাপগুলো রাখার সমস্যা দেখা গেলে সে কিছু পূণ্যকে ডিলিট করে ট্র্যাশ বক্সে পাঠিয়ে দেয়। তার পূণ্যের ঘর এমনিতেই বড়, তাছাড়া বিশেষ দিবসের বাড়তি পূণ্যের চাপ তো আছেই। সামান্য কিছু পূণ্য মুছে গেলেও তেমন ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না।

পাপপূণ্যের এই যাত্রায় ইরাদ হোসেন নতুন যাত্রী হলেও সে পেছনে ফেলে দেয় অনেক সিনিয়র পাপীকে।
এখানেই সে একটু ভুল করে, সে বোঝেনি পাপের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার নিয়ম নেই। এটি পূণ্য প্রতিযোগিতার মতো নয়। পূণ্য যদি হয় ইউজার নেম, পাপ হবে পাসওয়ার্ড। তার পূণ্য সবাই দেখবে জানবে, কিন্তু তার পাপ কেবল সে একাই জানবে।

ইরাদ খেয়াল করে দেখলো পাপের বীজগুলো সংখ্যায় এখন পূণ্যের চেয়ে বেড়ে গেছে। তবু সে পাপকে ডিলিট করতে পারছে না সময়ের এক অমোঘ নির্দেশে। তাই সে বুদ্ধি করে পাপগুলোকি জিপ করে ফেলতে শুরু করে। জিপ করে পুরো পাপের ফোল্ডার আপ করে দিল ইন্টারনেটে। ফলে তার ঘরের মধ্যে এখন খা খা শূণ্যতা, পূণ্য দিয়ে সেই শূণ্যতা পুরণ করা যাচ্ছে না। তখন সে নতুন কিছু পুণ্য ডাউনলোড করে নিয়ে কপিপেষ্ট করতে শুরু করে। এমনকি পাপের শূণ্যঘরটাও পূণ্যে ভরপুর হয়ে যায়। কপিপেষ্ট পদ্ধতি তাকে পূণ্যশীর্ষে তুলতে সাহায্য করেছে। 

বিষয়টা খুবই তুচ্ছ। ভালো করে খেয়াল না করলে বাইরের কেউ বুঝবে না। একদিন সে খেয়াল করলো আজকাল সে গরাদের কাছে গেলে ইবলিশ সালাম দেয়া দূরে থাক ফিরেও তাকায় না। গোমড়া মুখে বিপরীত দিকে বসে থাকে। সে পাঞ্জাবীর পকেট উন্মুক্ত করে দিলেও তাতে একটা পাপবীজও আমদানী হয় না।

এটা নিয়ে শয়তানের সাক্ষাত সহকারীকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করা হলে সেও ফিসফিস করে জানায়,

"বসের মন খারাপ, কারণ নরকে বসের চেয়ারে আরো যোগ্য নতুন লোক অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়ার জন্য মনোনয়নপত্র আহবান করা হয়েছে, তার মধ্যে এমন একজনের নাম এসেছে স্বর্গ নরক উভয় স্থানে অবাধে গমনের পাসপোর্ট আছে যার। সুতরাং অদূর ভবিষ্যতে হি ইজ দ্য বস। ইবলিশের জন্য এটা এক রকমের পদাবনতি, এবং অপমান। এই অপমানের শোধ নিতে বস আত্মহত্যা বৈধ করার জন্য বিধাতার কাছে আবেদন করেছে।"

"সেই মনোনয়ন প্রাপ্ত লোকটা কে তুমি জানো?"

"তার নাম ইরাদ হোসেন।"

গুগল

কৈশোরে গুগলপ্লেক্স নামের একটা বই হাতে পেয়েছিলাম। বইটি তিন টাকায় কিনেছিলাম সম্ভবতঃ। প্রকাশক ছিল মুক্তধারা। সেই বইটির একটি কাহিনী গুগলপ্লেক্স, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংখ্যাটি কিভাবে আবিষ্কৃত হলো। সেই থেকে গুগল শব্দটি মাথায় গেঁথে থাকে। তার বহুবছর পর একদিন পত্রিকায় পড়লাম গুগল নামের একটা ওয়েবসাইটের কথা যেখানে পৃথিবীর তাবৎ তথ্যের খোঁজ মেলে।

১৯৯৮ সালে ইন্টারনেট ঘরে ঘরে ছিল না। একটা অফিসে সাধারণত একটা ডায়াল আপ কানেকশান থাকলেই ধরে নেয়া হতো অফিসটা আইটি সচেতন। আমাদেরও একটা পিসিতেই ইন্টারনেট কানেকশান ছিল। টেলিফোন ফ্যাক্স বাদ দিলে ওই পিসিটাই বৈশ্বিক যোগাযোগের একমাত্র ব্যবস্থা। ওটার কোন মালিক ছিল না, বলা চলে সরকারী। কিন্তু সরকারী হলেও ওটার উপর খবরদারি করার ক্ষমতা ছিল আমারই। যে বনে বাঘ নেই সেখানে শেয়ালই রাজা, আমিও ইন্টারনেট গুতানোর অভিজ্ঞতাবলে কোম্পানীর আইটি কর্তাও হয়ে বসি। নিজের পিসি ছাড়াও ওই পিসিতে বসে গুতোগুতি করার স্বাধীনতা পেয়ে যাই পদাধিকার বলে। তখন ইয়াহু ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন। আমি হটমেইল এবং ইয়াহুতে একাউন্ট করি, তবে খোজখবরের জন্য ইয়াহুকে প্রাধান্য দেই। তখন সম্ভবতঃ হটমেইল দিত ২ মেগা, ইয়াহু দিচ্ছিল ৪ মেগা স্পেস। তাতেই যথেষ্ট মনে হতো।

যেদিন গুগলের খোঁজ পেলাম, সাদাসিধে পাতাটা খুলে প্রথম দর্শনেই ভালো লাগায় জড়িয়ে গেলাম। তারপর থেকে ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ পেলে গুগলে ঢুঁ মারি। ইয়াহু গুগল দুটোতে খোজাখুজি চলে। প্রথম প্রথম সার্চ দিতাম বাংলাদেশ। বাংলাদেশ নিয়ে কিছু দেখতে কেমন একটা অনুভুতি হতো। কোন সুদুর বিদেশে বাংলাদেশ নিয়ে এত কিছু লেখা হচ্ছে, ভেবে অবাক হতাম। কিছুদিন পর দেখা গেল আমি আর ইয়াহুতে কিছু সার্চ করছি না। সবকিছু খোঁজার জন্য গুগলে যেতে শুরু করেছি। কোন জিনিস খুঁজতে গুগল বা ইয়াহু দুটোকে কাজে লাগাতাম প্রথমদিকে। কিন্তু দেখা গেল ইয়াহুর চেয়ে গুগলের রেজাল্টেই প্রাসঙ্গিক উত্তর মেলে। আমি একটা শব্দ টাইপ করে দিলে গুগল কি করে যেন বোঝে আমি কি খুঁজছি। এটা যেন মনের কথা জেনে ফেলা। সে জন্য গুগলের দিকে ঝুঁকে পড়ি। তবু তখনো হটমেইল বা ইয়াহুকে দরকার হয়, মেইলের জন্য, চ্যাটের জন্য।

আরো কয়েক বছর কেটে গেছে। আমাদের অফিস আরো বড় হয়েছে। কম্পিউটার ইউজার পঞ্চাশ ছুয়ে গেছে। সবার জন্য ইমেল আইডি, ইন্টারনেট কানেকশান, নিজস্ব ডোমেন, সব হয়ে গেছে। একদিন গুগল ঘোষণা দিল এবার ওরা আসছে জিমেইল নিয়ে। সেদিন আমার মতো খুশী বোধহয় আর কোন ইউজার হয়নি। হটমেইল ইয়াহুর বিজ্ঞাপনের যন্ত্রনায় ওখানে মেইল খুলতে বিরক্ত লাগতো। তবু মেনে নিয়েছিলাম প্রযুক্তির যন্ত্রনাই নিয়তি বলে। গুগল এসে সে যন্ত্রনা থেকে সম্পূর্ন মুক্তি দিল। পেয়ে গেলাম ছিমছাম সুবিধাজনক একটি ওয়েব মেইল যাতে গ্রাফিক্স বিজ্ঞাপনের কোন উৎপাত নেই। তার উপর এই মেইলের তাক লাগানো ১ গিগা লিমিট। ইয়াহু হটমেইলের কাহিল অবস্থা দাঁড়ায় তখন। প্রথমদিকে জিমেইল পাওয়া সহজ ছিল না। ইনভাইটেশন পেলেই একাউন্ট খুলতে দিত। আমি ইনভাইটেশান চেয়ে আনলাম একটা ফোরামে গিয়ে। অচেনা এক বিদেশী আমাকে দয়া করে ইনভাইটেশান পাঠালো। রেজিষ্ট্রেশান করার পর দেখি আমিও আরো দশজনকে ইনভাইট করতে পারি। এভাবে বাড়তে থাকে জিমেইল গ্রাহক। কদিন পরে আমার ইনভাইটেশন লিমিট বাড়ানো হলো ১০০তে। মানে আমি একশো বন্ধুকে ইনভাইট করতে পারি। জিমেলের পর পেলাম ব্লগস্পট। নিজের ইচ্ছেমতো লেখালেখি করার জন্য একটা অনলাইন ডায়েরী।

স্কুল বয়স থেকে ম্যাপের প্রতি একটা ঝোঁক ছিল। আমার টেবিলে ছোট্ট একটা গ্লোব ছিল, পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ওটাও মুখস্ত করে ফেলেছিলাম। পৃথিবীর কোথায় কোন দেশ, কোন সমুদ্রের গভীরতা কতো, কোন পর্বতের উচ্চতা কতো, এরকম হাবিজাবি সাধারণ জ্ঞান আয়ত্বে এসে গিয়েছিল গ্লোবটা দেখে দেখেই। বড় হবার পর আরো ভালো বিকল্প খুঁজছিলাম। বড় কোন ম্যাপ যাতে সবগুলো দেশের নগর বন্দরের রাস্তার ম্যাপ থাকে। কিন্তু অতবড় ম্যাপ পাওয়া অসাধ্য প্রায়। যেদিন প্রথম গুগল আর্থে ঢুকলাম সেদিন আমার চোখে নতুন এক বিস্ময়। এটা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল। এ শুধু ম্যাপ নয়। সমস্ত পৃথিবীটা আমার হাতের মুঠোয় পুরে দেয়া হয়েছে। নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ মনে হলো। সামান্য একটা মাউস নেড়ে সমস্ত পৃথিবীর সবগুলো নগরে ঘুরে বেড়াতে পারি আকাশ পথে।
অনায়াসে এবং বিনামূল্যে। একেক দিন একেকটা দেশে যাই, ওই দেশের অখ্যাত বিখ্যাত সবগুলো শহরের রাস্তা ধরে ঘুরে বেড়াতে থাকি। বিস্ময়ের পর বিস্ময়। বিশ্বভ্রমণের আজীবনের দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো গেল।

নতুন কোন জায়গায় গিয়েছি। চিনতে কষ্ট হচ্ছে, মোবাইল খুলে গুগল ম্যাপে ক্লিক করি। টিক টিক করে নীল বোতাম দেখিয়ে দেয় আমি কোন এলাকায় দাঁড়িয়ে। আশেপাশের রাস্তার নাম্বার দেখে ঠিকানা বের করে ফেলতে পারি খুব সহজেই। সেদিন উত্তরায় এক আত্মীয়ের বাড়ি খুজে পাচ্ছিলাম না। আমি এমনিতেই ঢাকার রাস্তাঘাট কম চিনি। উত্তরাতো আরো বহুদূরের কথা। তবু সাহস করে হাজির হলাম উত্তরায়। রাস্তার নম্বার জানা ছিল, আর জানা ছিল ওই বাড়ির কাছে একটা পার্ক আর মাঠ আছে। আমি রাস্তার নম্বর টাইপ করে ক্লিকাইলাম, স্যাটেলাইট ভিউতে দেখলাম ওই রাস্তার মাথায় একটা মাঠ আর পার্কমতো। আমি গিয়ে মাঠের কাছটায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফোন দিলাম। অমনি আমার হোস্টকে দেখা গেল সামনের বাড়ির বারান্দায় এসে আমাকে ইশারায় ডাকছে। কি চমৎকার ব্যাপার না?

দরকারী ফাইলপত্র লেখালেখি জমা রাখি হার্ডডিস্কে, কিছুদিন পরপর হার্ডডিস্ক বদলালে কিংবা ক্রাশ করলে ফাইলপত্র নিয়ে বিপদে পড়ি। গুগল এসে জানালো সমস্যা নাই, গুগল ডকস আছে। ওখানে জরুরী ফাইলগুলি ব্যাকাপ রাখতে শুরু করি। কদিন আগে দেখি গুগল ডকস এখন গুগল ড্রাইভ হয়ে গেছে। খুব চমৎকার করে ফাইলপত্র গুছিয়ে ফোল্ডারে রেখে দিতে পারছি এবং ডেক্সটপ থেকে ফাইল আপডেট করা যাচ্ছে খুব সহজেই।

আর কিসের কথা বলি, গান খোজার জন্য, মুভি খোজার জন্য, বিশেষ কোন ডকুমেন্টারীর খোজ করার জন্য ইউটিউবের বিকল্প নেই। তাও সেই গুগল।

সব মিলিয়ে হিসেব করলে দেখা যাবে আমার নেট জীবনটা গুগল নির্ভর হয়ে গেছে। গুগল আছে আমি আছি, গুগল নাই আমি নাই।

আরো অর্ধযুগ আগে একবার খুব শখ হলো, গুগলের দুই বন্ধুর সাথে আলাপ করবো। ল্যারি পেজ আর সের্গেই ব্রাউন। খোঁজ করতে করতে সের্গেই'র যে ওস্তাদ মানে ওর ভার্সিটির যে শিক্ষক তাকে এসব বিষয়ে প্রাথমিক হাতে খড়ি দিয়েছিল তার সাথে যোগাযোগ হয়ে যায়। সের্গেই সম্পর্কে সে বলে। তারপর....

.....নাহ, বাকীটুকু আরেকদিন বলি।



অপালাপ-১

-মৃত্যু কয় প্রকার?
-দুই প্রকার
-কি কি
-স্বাভাবিক মৃত্যু অস্বাভাবিক মৃত্যু
-ভুল...মৃত্যু চার প্রকার। দুর্ঘটনায় মৃত্যু, অসুস্থতার মৃত্যু, অপাঘাতে মৃত্যু, আত্মহত্যা মৃত্যু
-কথা তো আমার লাইনেই। দুর্ঘটনা আর অসুস্থতা হলো স্বাভাবিক মৃত্যু, অপাঘাত আর আত্মহত্যা হলো অস্বাভাবিক
-আরো একটা মৃত্যুর কথা বাদ গেছে
-কোনটা
-শর্ট সার্কিট
-এটা কেমন?
-এটাকে ডাক্তারেরা বলে স্ট্রোক। অসুখ নাই বিসুখ নাই, দুর্ঘটনা নাই, দুম করে শর্ট সার্কিট হয়ে গেল মাথায়।
-ফাজলামি করো?
-ফাজলামি না, ইতরামি বলতে পারো
-মানুষকে নিয়ে ইতরামি?
-না নিজেকে নিয়ে, আমার ধারণা আমি শর্ট সার্কিটে মরবো
-তুমি কি মানুষ না?
-না আমি অমানুষ
-সেজন্যই মৃত্যু নিয়ে গবেষণা করছো?
-না, গবেষণা করছি না, কিন্তু বিশাল একটা ভাবনায় পড়ছি
-কিসের ভাবনা
-মৃত্যুর পর মানুষ কোথায় যায়
-তুমি সেদিন বললা মানুষ মাটির সাথে মিশে যায়
-সে তো আমি নাস্তিক বলেই, তুমিও কি মাটির সাথে মিশে যাবে?
-মাথা খারাপ? আমি নাস্তিক না। আমি ধার্মিক মানুষ, মাটির সাথে মিশবে আমার দেহ, আত্মা আমার ঘুরতে থাকবে জগতময়
-এই তো, দেখো তুমিও দার্শনিক বাতাসে নড়তে শুরু করেছো
-দার্শনিকেরা কি অধার্মিক?
-দার্শনিকেরাও ধার্মিক হতে পারে তোমার মতো। যারা গাছেরও খাবে তলারও কুড়োবে
-আমি মানছি না। ধর্ম নিয়ে আমার যে জ্ঞান তোমারও সেই জ্ঞান। কিন্তু আমার জ্ঞান নিয়ে আমি আস্তিক, তোমার জ্ঞান নিয়ে তুমি নাস্তিক
-আমি নাস্তিক, কারণ আমি মৃত্যু পরবর্তী কোন গন্তব্যে বিশ্বাস করি না
-তোমার এই অবিশ্বাসের জন্য তোমাকে কেয়ামত পর্যন্ত গজবের আগুন পোহাতে হবে
-আর তোমাকে কি বেহেশতের সুবাস দিয়ে ঢেকে রাখবে
-তা কেন, কিন্তু আমার বিশ্বাসের জোর আমাকে যন্ত্রনা থেকে রক্ষা করবে।
-বিশ্বাসের জোর কতদিন থাকবে
-সেটা নির্ভর করবে বিশ্বাসটা কতো মজবুত তার উপর
-তোমার বিশ্বাস কতোটা মজবুত
-সেটা দিয়ে তোমার কাজ কি?
-জানতে চাইছি তুমি কতো বছর ঠেকিয়ে রাখতে পারবে
-অন্ততঃ কয়েকশো বছর
-হাসতে ইচ্ছে করছে
-কেন
-তুমি আমার উপর তিন মাসের একটা বিশ্বাস রাখতে পারোনি,
-তোমার কথা আলাদা
-আলাদা কেন
-তুমি একটা অমানুষ। নাস্তিকেরাই এরকম অমানুষ হয়
-আর যারা দীর্ঘকালের বন্ধুতাকে মুহুর্তের ভুলে উচ্ছেদ করতে বলে তারা
-তুমি কথা ঘুরিয়ে অন্য দিকে নেয়ার চেষ্টা কোরো না
-আচ্ছা ধরো তিনশো বছর তুমি বিশ্বাস দিয়ে ঠেকিয়ে রাখবে কবর যন্ত্রনা, এই তিনশো বছর পরে যদি কেয়ামত না হয়?
-তা তো হবেই না। কিন্তু তিনশো বছরে আমি পারিপার্শ্বিক অবস্থাগুলো সম্পর্কে ধারণা নিয়ে ফেলতে পারবো, মুর্দাপ্রহরীদের সাথে খাতির করে নিতে পারবো
-তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে কবর হলো থানা বা জেলখানার মতো যেখানে প্রহরীদের সাথে খাতির করলেই আরামে থাকা যায়
-শোনো তোমাদের ডারউইনই তো বলেছে অভিযোজনের কথা,
-তুমি এখন ডারউইনে বিশ্বাস করতে শুরু করেছো? বাহ উন্নতি হয়েছে তোমার
-ধুরো বিশ্বাস করবো কেন, একটা উদাহরণ দিলাম মাত্র
-উদাহরণ দেবার জন্য একজন মোল্লা মওলানার নাম পাইলা না?
-তা পাবো না কেন, কিন্তু তাদের কথা তো তুমি বিশ্বাস করবা না,
-আমি যাকে বিশ্বাস করবো তাকে দিয়ে আমাকে উদাহরণ দিলে আমি কি ধার্মিকতার দিকে অগ্রসর হবো
-তোমার মাথায় নিরেট পাথর, তোমাকে বোঝানো আমার কম্ম নয়।
-এই তো তুমি চট করে এক্সট্রিম হয়ে যাচ্ছো। আস্তিকতার এইটা একটা বড় সমস্যা। যাদের বিশ্বাস যত কঠিন, তারা তত বেশী এক্সট্রিম।
-আর অবিশ্বাসীরা বুঝি একেবারে জলের মতো তরল
-আমাকে দেখেও কি তা বোঝা যায় না?
-তুমি একটা থিউরিষ্ট এভিল
-যে স্বর্গের যাত্রীদের নরকের টিকেট কেটে দেয়
-আমাকে নিয়ে তাই করোনি?
-তোমার উপর জোর খাটিয়েছি
-জোর খাটাওনি কিন্তু দিনের পর দিন তোমার এভিল থিউরিগুলো আমার মগজে ঢুকিয়ে একটা যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছো
-সেই যুদ্ধে কে জিতলো
-জিতলো আমার বিশ্বাস
-যুক্তি জিতলো না কেন
-বিশ্বাসের শক্তি বেশী ছিল বলে
-সংখ্যায় যুক্তিরা বেশী থেকেও শক্তিশালী বিশ্বাসের কাছে হেরে গেল। এটাকে রাজনীতির ভাষায় কি বলে জানো?
-কি বলে
-তার আগে একটা প্রশ্নের জবাব দাও
-বলো
-মধ্যপ্রাচ্যে এক ইজরায়েলের বিরুদ্ধে দশটা আরব দেশ যুদ্ধ করে পারেনি, কেন জানো?
-জানি
-কেন
-ইজরায়েলের অস্ত্রের জোর বেশী, পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক ওরা
-তাই সংখ্যায় বেশী হয়েও আরব দেশগুলো হেরে গেছে,
-ঠিক তাই
-বিশাল আরবের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র ইজরায়েলের এই বিজয়কে তুমি সমর্থন করো?
-প্রশ্নই ওঠে না
-তাহলে তোমার বিশ্বাসের সাথে আমার যুক্তিরা হেরেছে ওটা কেন সমর্থন করছো
-তুমি এটার সাথে ওটা মেলাবে? একটা হলো ধর্ম, আরেকটা রাজনীতি
-বন্ধু, এখানেই গোলমাল। ধর্মে বিশ্বাসের রাজত্ব আর রাজনীতিতে অবিশ্বাসের। তবু ধর্ম আর রাজনীতি মিলে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে।
-আমি তোমার সাথে এই বিষয়ে এখন আর তর্ক করতে চাই না
-কিন্তু আমার আরো কথা বলার ছিল
-তোমার বলার থাকলেও আমার শোনার সময় নাই। আমাকে এখন ঘুমাতে হবে কাল সকাল সকাল উঠতে হবে।
-ঠিক আছে আজকের মতো রাখছি।


=================================


Monday, May 7, 2012

সময়াক্রান্ত

সেই দিনটা সম্পর্কে এখনো কেউ জানে না। দিনটা কেমন থাকবে মেঘলা না রোদেলা না কুয়াশায় ঢাকা। যদি রাত হয় পূর্নিমা হোক আর অমাবস্যা হোক, বৃষ্টি যেন না হয়। অঝোর বর্ষায় এতটা নষ্টালজিকতা ভর করে মেঘ মেদুর বর্ষাকে রেখে চলে যাওয়াটা দুঃসহ হবে। সেই দিনটা বা রাতটা কেমন হবে আমরা কেউ জানি না। কেবল জানি সেই দিনটা অনিবার্য, কিন্তু সময়টা জানি না। সময়। সময় খুব অদ্ভুত একটা মাত্রার নাম।