Sunday, June 4, 2017

ন কবিতা

তোমাকে দেখি আর নিজেকে দারুন উচ্ছৃংখল লাগে
তোমাকে দেখি আর নিজেকে বড় অপাংক্তেয় লাগে

আমাকে উচ্ছৃংখল রেখে তুমি
দু'পায়ে আলতা মেখে হাঁটছো ওই সংসারে

ভরাডুবি চাঁদটাকে আজ বিষ জ্যোৎস্নায় চুবিয়ে
খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে

(২৪.৪.২০১০)


গাঙ্গেয় ভূগোলের বিবর্তন

পদ্মা মেঘনা যমুনার সমস্ত জল যে পথ দিয়ে বঙ্গোপসাগরে নামতো সে পথটি আমূল বদলে গেছে। যেখানে ছিল দুটি পথ সেখানে আছে আছে একটি পথ। কিভাবে এই পরিবর্তন হলো, কোন পথে যাত্রা করলো সেটা বোঝার জন্য কিছু মানচিত্র দেখা দরকার। একটা নদী আগাগোড়া মুছে গিয়ে সেখানে নতুন ভূখণ্ড জেগে উঠেছে ভাবতেই অবাক লাগে। কিন্তু সেটাই ঘটেছে। মুছে যাওয়া সেই নদীটি মেঘনা মোহনায় এসে যেখানে বঙ্গোপসাগরে মিশতো সেখানে এখন নোয়াখালীর বিস্তৃর্ণ চরাঞ্চল।

প্রথমে এই গুগল মানচিত্রটি দেখা যাক। এই অঞ্চলের  ইতিহাস বোঝার জন্য এই মানচিত্রটি বোঝা দরকার। এই অঞ্চলের ৪০০ বছর আগের ইতিহাস পড়তে গিয়ে বর্তমান মানচিত্রের দিকে চোখ রাখতে গেলে বিভ্রান্ত হতে হয়। কেননা এই ৪০০ বছরে নদীর অনেক জল সমুদ্রে গড়াতে গিয়ে আমাদের ভূগোলে বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আমরা অনেকেই খেয়াল করি না সেই পরিবর্তনটা কত ব্যাপক বিস্তৃত। গাঙ্গেয় মোহনায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের অধিকারী মেঘনা। এই নদীটার গতিপথ আমূল বদলে গেছে। দুইশো বছর আগেও নদীটা চট্টগ্রাম সন্দ্বীপের মাঝখান দিয়ে বঙ্গোপসাগর স্পর্শ করতো। কিন্তু এখন সেটা পশ্চিমে সরে গিয়ে হাতিয়া বরাবর বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। বর্তমান নোয়াখালী জেলার মাঝখান দিয়ে যে মেঘনা বয়ে যেতো, সেটা অবিশ্বাস্যই ঠেকে। অথচ সেটাই সত্যি। ফেনী নদীর সাথে মেঘনার দেখা সাক্ষাতের কথা ভাবাই যায় না এখন। অথচ একসময় ফেনী নদীর মুখেই মেঘনা বঙ্গোপসাগরে মিলিত হতো। এই মানচিত্রে তার কিছুটা ছাপ আছে সে কারণে মানচিত্রটি দেখতে বলা।




স্যাটেলাইট মানচিত্রের উপর হলুদ রেখায় কিছু সীমানা রেখা আঁকা আছে। একসময় মনে হতো হলুদ রেখাগুলো ভুল সীমানা নির্দেশ করছে। হ্যাঁ বর্তমানের জন্য সীমানাগুলো ভুলই। কিন্তু অতীতের জন্য সেই সীমানা চিহ্নই সঠিক ছিল। এই মানচিত্রের হলুদ সীমানাগুলো  এই ভূখণ্ডের আদি অবস্থানের চেহারার। মানচিত্রের এই সীমানা রেখা নেয়া হয়েছে পুরোনো কোন এক মানচিত্র থেকে। বলা বাহুল্য, এই হলুদ রেখার মানচিত্রের বয়স ১০০ বছরেরও কম। এর মধ্যেই মেঘনা নদী তার গতিপথকে যেভাবে বদলে ফেলেছে, আগামী একশো বছর এই অঞ্চলের জন্য নতুন মানচিত্র আঁকতে হবে। কেননা সন্দ্বীপের উত্তরদিকে যেসব চর জাগছে তাতে সন্দ্বীপ পঞ্চাশ বছরের মধ্যে নোয়াখালীর সাথে অবিচ্ছিন্ন ভূখন্ড হয়ে মিশে গেলে আশ্চর্যের কিছু না।

গুগল মানচিত্রের হলুদ সীমান্তের সমর্থন পাওয়া যায় নীচের এই মানচিত্রটিতেও। এই মানচিত্রে বাংলাদেশের সমস্ত নদীগুলোকে গতিপথ সহকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই মানচিত্রটি খুব বেশী পুরোনো না। এই মানচিত্রেও দেখা যাচ্ছে মেঘনার মোহনা সন্দ্বীপের পূর্বদিকে বহমান ছিল। আমাদের দেশে খুঁজলে এখনো পাওয়া যাবে পুরোনো পাঠ্যপুস্তকে। যেখানে বাংলাদেশের মানচিত্র আছে সবগুলোতে মেঘনার মোহনাকে সন্দ্বীপের পূর্বদিকে দেখানো হয়েছে। এর কারণটা পরিষ্কার। বৃটিশরা যখন এই অঞ্চলের মানচিত্র তৈরী করতে শুরু করে তখন তার ভৌগলিক চেহারা এমনটিই ছিল। এই মানচিত্র ৬০ বছরের কম বয়সী। কেননা এখানে কাপ্তাই লেকের অস্তিত্ব আছে।



এবার দেখি উপনিবেশ আমলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিস্তারিত তথ্য সম্বলিত রেনেলের মানচিত্র। এই মানচিত্রটি আরো দুশো বছর আগের (১৭৮৬ সালের)। সেই মানচিত্রের ভৌগলিক চেহারা আরো অনেক বেশী ভিন্ন।


যে দ্বীপগুলো এখন সত্যের মতো বিদ্যমান একসময় সেগুলো সমুদ্রের অংশ ছিল। যে অংশ একসময় সমুদ্র ছিল, তা এখন ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। ভৌগলিক এই বিবর্তনগুলো বোঝা দরকার ইতিহাসকে পরিষ্কার করে বোঝার জন্য।




ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের 'বাংলাদেশ' আপত্তি

ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের সুলিখিত গ্রন্থ  'বাংলা দেশের ইতিহাস'  এই বইটি বাংলার অন্যতর ইতিহাস গ্রন্থের মধ্যে একটু ব্যতিক্রম। এখানে তিনি রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি ধর্ম, সংস্কৃতি, সাহিত্যের ঐতিহাসিক উপাদানগুলো নিয়েও আলোচনা করেছেন। সেই কারণে বইটি অতুলনীয় এবং অতীত খু‌ঁড়তে ইচ্ছুক পাঠকদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।

কিন্তু  তিনি বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় নামকরণ বিষয়ে যে মন্তব্য করেছেন সেটা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থেকে যায়। এই বিষয়ে ইতিপূর্বে কোথাও আলোচনা হয়েছে কিনা জানা নেই। কিন্তু দুই বাংলার সাধারণ মানুষের এই অংশ নিয়ে কিছু বলার থাকতে পারে। তাই সেই অংশটুকু এখানে তুলে ধরা হলো আলোচনার স্বার্থে।  এই দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার কয়েক বছর পরে।




এই অংশে আমার আপত্তি হলো ইতিহাসের দিক থেকে পূরবঙ্গের 'বাংলাদেশ' নাম গ্রহনের কোন সমর্থন নেই। এই মন্তব্যটির সপক্ষে তিনি যে যুক্তি দিয়েছেন তা হলো




Bengal শব্দটির প্রতিশব্দ হলো 'বাংলা'। এটা কখনোই 'বাংলাদেশ' বোঝায়নি। এটার অনুবাদেও কেউ কখনো 'বাংলাদেশ' লেখেননি। অতীতে শত শত বছর ধরে বাংলা বলতে অবিভক্ত বঙ্গকেই বোঝাতো। রাজ্য হিসেবে অবিভক্ত একটি দেশ ছিল বাংলা। কিন্তু বাংলাদেশ নামের কোন রাজ্য কোথাও ছিল না। কবি সাহিত্যিকগণ বাংলাদেশ শব্দটি বহুদিন ধরে ব্যবহার করে আসলেও রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ শব্দটির ব্যবহার হয়নি ১৯৭১ সালের আগে।

পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা বাঙালী পরিচয় দিতে পারবে না এ দাবী কেউ করেছে বলে জানা নেই। আবার স্বাধীন পূর্ববঙ্গকে বাংলাদেশ বললে কেন হাস্যকর শোনাবে সেটাও বোধগম্য নয়।

তবে সবচেয়ে গুরুতর মনে হয়েছে নীচের অংশটুকু-


'বাংলাদেশ' নামটি গ্রহন করার ব্যাপারে কারো আপত্তি থাকতে পারে, কারো অনুমতি নিতে হতে পারে এমন বিষয় এই প্রথম চোখে পড়েছে। মনে হচ্ছে রমেশচন্দ্র মজুমদার দেশভাগ মেনে নিতে পারলেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নিয়ে বিব্রত ছিলেন।

সাধারণ লোকে বাংলাদেশ নামের অর্থ পরিবর্তনকে গ্রহন করতে পারেনি- এই ব্যাপারটা কিভাবে নিশ্চিত হলেন তিনি?