Thursday, June 30, 2011

সম্পর্কের আপেক্ষিকতা

১. বিপরীত লিঙ্গের দুজন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালো সম্পর্ক কতোদিন পর্যন্ত টিকতে পারে? প্রেম-বন্ধুত্বে দীর্ঘকাল টিকে। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে ভালো সম্পর্ক মানে কি দুজনের মধ্যে ভালোবাসা সমহারে বিদ্যমান থাকা নাকি দুজন দুজনকে স্রেফ সহ্য করে নিয়ে থাকা? একটা আপাতঃ সুখী সংসার দেখে কেউ কি বুঝবে দুজন কতটা সুখী মানুষ আর কতোটা সফল অভিনয় শিল্পী?

২. ধরা যাক মানব মানবী খুব ঘনিষ্ট দুজন মানুষ। হয় বন্ধুত্বে, নয় প্রেমে, নয় দাম্পত্যে যুক্ত আছে দীর্ঘসময়। এর মধ্যে কতোটা খাটি মমত্ব বিদ্যমান? উন্নত দেশে পাঁচ বছর লিভ টুগেদার করে পাঁচ মাস পর ভেঙ্গে যাবার নজির ভুরি ভুরি। এই দৃশ্য এখন বাংলাদেশেও বিরল নয়। হয়তো ডিভোর্স হচ্ছে না, কিন্তু একই ছাদের নীচে দুজন মানুষ আলাদা সংসার পেতে কাটিয়ে দিচ্ছে বছরের পর বছর। কিন্তু এই বিচ্যুতির প্রধান কারন কি? আশাভঙ্গ নাকি বিস্ময়ভঙ্গ?

৩. সম্পর্কের শুরুতে যে মুগ্ধতা নিয়ে যাত্রা করা হয় সেটা প্রত্যাশার ডালপালা বিস্তার করতে থাকে সময়ের সাথে। কিছু কিছু প্রত্যাশা প্রকাশও পায় না। বিয়ের পর সেই প্রত্যাশায় যদি গুড়ে বালি পড়ে একটা প্রাথমিক ধাক্কা লাগে। ক্রমে ধাক্কার পরিমান বাড়তে থাকে হতাশার সাথে। বিয়ের আগে-পরের ভিন্নতায় দুজন মানুষের মুগ্ধতার স্মৃতি হারিয়ে যায় বর্তমানের তিক্ততার আড়ালে।

৪. সম্পর্কে জটিলতা আসার বহুবিধ কারণ থাকতে পারে। খুব কম গুরুত্বপূর্ন ইস্যুও একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে স্থায়ী চিড় ধরিয়ে দিতে পারে। স্বামীস্ত্রী সম্পর্কের মতো প্রেমে বা বন্ধুত্বের মধ্যেও সেরকম জটিলতা আসতে পারে। আশাভঙ্গ বা বিশ্বাসভঙ্গের যাতনা আমাদের অহরহ পোড়ায়। দশ বছরের পুরোনো বন্ধুত্ব বিশ মিনিটের ভিন্ন একটা ঘটনায় চরম হোঁচট খেতে পারে। পাল্টে দিতে পারে সকল সমীকরণ।

৫. যারা প্রেম করে বিয়ের বিপক্ষে, তারা বলেন প্রেমের বিয়ে টেকে না। আবার যারা প্রেম করে বিয়ের পক্ষে তারা বলেন, প্রেমের বিয়েতেই সুখ, আরোপিত বিয়েতে প্রেম নেই, সুখ নেই। আসলে কোনটাই স্থির সত্যি নয়। দুই দিকেই বিপরীত চিত্রের নজির আছে। সাত বছর প্রেম করে সাত মাসে যেমন বিয়ে ভেঙ্গে যেতে পারে, তেমনি সাতদিন প্রেম না করেও সাত বছরের সুখী সংসার আছে তেমন নজীর আছে।

৬. সম্পর্ক জিনিসটা যত্নের উপর ভীষণ নির্ভরশীল। সম্পর্ক যতটা যাপন করতে হয় ততটা লালনও করতে হয়। হাজার মাইল দূর থেকে প্রেম করার সময় যে আবেগ তা বাসর ঘরে ঢোকার পর থেকে যদি তার মৃত্যুঘন্টা বেজে যায়, সেই প্রেম অর্থহীন, সেই সম্পর্ক যত্নহীন। হাজার দিন প্রেম করেও যারা সম্পর্ক লালন করতে অক্ষম, তাদের বিয়ে সংসার ইত্যাদিতে প্রবেশ করা অনুচিত।

৭. প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে দুইটা কথা। প্রেম-ভালোবাসা মূলতঃ দুইরকম।
ক) আমি কাউকে দেখে কেবল মুগ্ধ হয়েই ভালোবেসে ফেললাম। সে আমাকে ভালো নাও বাসতে পারে। এই প্রকার ভালোবাসা প্রায়শঃ হতাশায় পর্যবসিত হয়। এটি খুব রিস্কি ভালোবাসা। এতে কষ্ট প্রচুর। তবে এই জাতীয় ভালোবাসা নিঃস্বার্থ। অপরপক্ষ ভালো না বাসলেও তাকে ভালোবাসা যায়। তবে সিডাকসিন, ফেনসিডিল, গাজা , মদ এই প্রেমের নিত্য সঙ্গী হতে পারে।

খ) কেউ আমাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে ভালোবাসলো, আমি তার ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকে ভালোবাসলাম। এই ভালোবাসায় দ্বিতীয় পক্ষের কোন রিস্ক নেই। দায় নেই। এই ভালোবাসা একটু স্বার্থপর। আমি তাকে ততক্ষণই ভালোবাসি, যতক্ষণ তার ভালোবাসার ফল্গুধারা অব্যাহত। এই প্রকার ভালোবাসার নাম, নির্ভরশীল ভালোবাসা। এই জাতীয় প্রেমিক প্রেমিকাগন সুশীলতায় পারদর্শী হয়ে থাকে।

এই দুই দলের বাইরে তৃতীয় একটা দল আছে। এরা প্রেমহীন, অভাগা। তবে এই অভাগারা সবসময় সংখ্যাগরিষ্ট। সমাজে প্রেমহীন লোকেরা সংখ্যাগরিষ্ট। এদেরও একটা সুলভ ভালোবাসা আছে। অপ্রকাশিত ভালোবাসা। দুনিয়ার ৯৫% ভাগ মানুষ এই ভালোবাসার আওতাভুক্ত। এটি ব্যক্তিবিশেষের বাইরে সিনেমার নায়ক নায়িকা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এই ভালোবাসায় কোন দায় নেই, কষ্ট নেই, ঝামেলা নেই, নির্ঘুম রাত নেই, কবিতা নেই, গান নেই, হাহাকার নেই, ভাত মাছ তরকারীর ফাকে ফাকেও এই ভালোবাসা দিব্যি চলে যায়। এটাকে সর্বোত্তম নিরাপদ ভালোবাসা বলা যায়।
.........................................................................

রুমানা সাঈদের সম্পর্ক ১৮ বছরের। ৭ বছরের প্রেম আর ১১ বছরের সংসার। ৭ বছর নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু ১১ বছরের কতোটা 'সুখ' আর কতোটা 'সহ্য করে নেয়া' ওই দুজন বাদে কেউ জানবে না।

মুহুর্তের ছাপ



এই ছবিটার কোন গল্প নেই। ছবিটা নির্দিষ্ট একটা মুহুর্র্তকে ধারণ করে রেখেছ। একটা স্মারক।

Sunday, June 26, 2011

আনফেয়ার ওয়ার্ল্ড!

আশ্চর্য। দশ হাজার ডলার স্প্যামবক্সে খেয়ে ফেললো?? তিনদিন আগেই এসেছিল মেসেজটা। ছোট একটা পুরষ্কার, কোন অপরাধের জন্য পুরষ্কার দেয়া হলো বুঝলাম না। কিন্তু আস্ত দশ হাজার ডলারের একটা চেক মিস হলো। ওরা লিখেছে ২৩ তারিখ পর্যন্ত ডেডলাইন ছিল। এরপর হাপিস হয়ে যাবে অফারটা। আহ, এই একটা আলগা ইনকাম মিস হয়ে গেল। দুনিয়াটা বড্ড আনফেয়ার। টাকপয়সার লোভ করিনা বলে আপোষে যা আসবে তাও হাত গলে পড়ে যাবে? মিস মিস মিস।

Saturday, June 25, 2011

৮৫ সেকেন্ড

তুমি সমুদ্র দেখতে না পেরে হাহাকার করো কেন? তুমি হিমালয়ে যেতে না পেরে আক্ষেপে মরে যাও কেন
তুমি নগরে মুখ লুকিয়ে জনারণ্যে মিশে যাও, অথচ তুমি মানুষের সঙ্গ চাও না।

তুমি আমার কাছেই থাকো, অথচ আমি জানি না তুমি আমাকে ছুঁতে চাও কিনা।

Thursday, June 23, 2011

আচ্ছন্ন সময়

অনাগত সময়ের ভয়, বিগত সময়ের আক্ষেপ, ছিল আছে থাকবে, অথচ আজ যে সবচেয়ে সুন্দর দিন সেটাই ভুলে থাকি।

সুত্র অনিশ্চিত, সমীকরণ অজ্ঞাত, তবু ঘটমান বর্তমান।

কিছু সত্য ভয়াবহ সুন্দর। কিছু মিথ্যে সুন্দর মুখোশে, কোনটা ধর্তব্য আর কোনটা বর্জনীয়, ভুলে থাকি।

সঙ্গীত সময়কে ধারণ করে, স্মৃতিকে লালন করে, মুহুর্তে অতীত হাজির করে।

আচ্ছন্নতা কাটেনি, আচ্ছন্নকাল চলছে, আচ্ছন্নতা হারালে মহাকালে হারিয়ে যাবে।

Tuesday, June 21, 2011

অভিমানী বৃক্ষ

দেওয়ানহাট ওভারব্রীজ থেকে নামতে নামতেই সবুজের ব্যাপক সমারোহ চোখে পড়ে। পতেঙ্গা থেকে এ পর্যন্ত দেখা শহরের চেহারার সাথে কোন মিল নেই। যান্ত্রিকতার কংক্রিট ছাড়িয়ে খানিকটা সবুজের ঘ্রান এখানটায়। ডানদিকের পাহাড়ের গোড়ায় একটা কৃষ্ণচুড়া গাছ অপূর্ব শোভা নিয়ে দাড়িয়ে থাকে পেছনের সবুজের মায়ায়। কতোদিন ভেবেছি এখানে দাড়িয়ে একটা ছবি তুলবো গাছটির। কিন্তু দাড়ানো গাছটি কিংবা আইল্যান্ডে দুহাত মেলে ধরা ট্রাফিক পুলিশটি কিছু ভাববে বলে ছবিটা তোলা হয়নি। এবছর গাছটিতে আর ফুল ধরেনি। অভিমানী বৃক্ষ?

একটি সবুজ বিকেল

অনেকদিন কোথাও ছিলাম না। যেন অনেকদিন পর জ্বরতপ্ত শরীর ঝেড়ে উঠে দাড়ালাম। বুকের বামদিকে অনবরত নড়তে থাকা অজানা বস্তুর অস্তিত্বটা রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল অনেককাল। কোথাও শেষ চিহ্ন রাখার কথা ভাবিনি, তবু শেষ পড়া বইটার কোন পাতা কিংবা শেষবার শোনা গানের কোন লাইন মাথায় আনতে চাইছিলাম। না পড়া বইগুলোর কথা ভাবছিলাম। না দেখা ছবিগুলোর কথা, না যাওয়া দেশগুলোর কথা, না বলা কথাগুলো.......এরকম সময়ে অবসাদ লাগে। অনেকদিন পর বারান্দায় বসলাম। বিকেলের রোদ দেখলাম। আষাঢ় মাসের বৃষ্টি থেমে যাওয়া বিকেলে যখন খুব হাওয়া দেয় সেই হাওয়া বঙ্গোপসাগর থেকে নোনা সুখ বয়ে আনে। অর্ধেক অবসাদ কেটে যায় আমার। হাতের ডানদিকে যে সবুজ জঙ্গল দেখা যাচ্ছে, ওগুলো কিছু গুচ্ছ পাহাড়। শহরের মাঝে এখনো কিছু পাহাড়ের অস্তিত্ব এখন জীবনকে সতেজ রেখেছে। আমার প্রিয় শহরের অতীতে ডুব দেই এই সৌন্দর্যের অতলান্তিকে সাঁতার কাটার জন্য। আরেকটু উচুতে নিদেনপক্ষে ১২ তলার ছাদে ওঠা গেলে সোজা দক্ষিনের কর্ণফুলীর নীল রেখা দেখা যেতো। নদীর ওপারের সবুজ গ্রাম। সবুজের পর সবুজ। বড় প্রশান্তিদায়ক এই সবুজ। অনেকদিন পর একটি বিকেলকে ভালোবাসলাম খুব।

Tuesday, June 14, 2011

কলম

কলম দিয়ে লিখিনা বহুদিন। না লিখতে লিখতে আঙুলের গিঁটে গিঁটে মরিচা ধরে গেছে। বাংলা ইংরেজী দুই প্রকার হাতের লেখাই জঘন্য হয়ে গেছে। একটা পৃষ্টা লিখতেও ঘাম ধরে যায়। আমার লাইন হয়া যায় আঁকাবাকা আর চাপে থাকে আঙুল। স্বাক্ষর করা ছাড়া কলমের কোন কাজ নাই আজকাল। আঙুলগুলো কীবোর্ডে এত বেশী সপ্রতিভ হয়ে গেছে যে, দুই আঙুল দিয়ে একটা কলম ধরে লেখার ধৈর্য একেবারে নেই।

জমে গেছে অনেক কলম। অনেকগুলো শখের কলমের কালি শুকিয়ে রাবার হয়ে গেছে। ছোটবেলা থেকেই কলমের খুব শখ ছিল। বইয়ের শখ শুরুর অনেক আগে থেকেই কলম জমাতে শুরু করি। কেউ দামী কলম উপহার দিলে রেখে দিতাম বড় হয়ে লিখবো বলে। স্কুল পেরিয়ে কলেজে গেলাম, কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে কর্মজীবনের মধ্যাহ্ন, তবু কলমের উপহার থামেনি এখনো। কিন্তু স্কুলের কলমগুলির মতো করে আর সংগ্রহ বাড়েনি। সাম্প্রতিক পাওয়া কলমগুলির অনেকাংশই এদিক সেদিক হারিয়ে গেছে। বড় হয়ে লিখবো বলে যে কলমগুলো রেখে দিয়েছিলাম সেগুলোর মধ্যে নিবের কলমগুলো যাদুঘরেই যাচ্ছে কারণ দোয়াত কালির যুগ পেরিয়ে গেছে বহু আগে। আর কখনো লেখা হবেনা ওগুলো দিয়ে।

আগাগোড়া সোনায় মোড়ানো একটা সোনালী কলম এখনো রয়ে গেছে। win chung নামের চীনা কলমটি একসময় খুব জনপ্রিয় ছিল। ওই কলম অনেকগুলো ছিল আমার। বাবা এনেছিল বিদেশ থেকে। যা দিয়ে পুরো স্কুল জীবনের বার্ষিক পরীক্ষাগুলো পার করেছি। নিয়মিত লেখার কাজে ব্যবহৃত সেই কলমের একটি রেখে দিয়েছিলাম। সেদিন পুরোনো বাক্স খুলে দেখি এখনো অবিকল আছে ২৭ বছর আগের কলমটি। তারো আগের আরেকটি কলম ফ্রান্সের তৈরী waterman। ক্লাস এইটে পড়ার সময় বাবা দিয়েছিল। একদম রূপার তৈরী কলম যেন, আগাগোড়া রূপোলী বর্ণের বলপয়েন্ট কলম। এত নরোম স্পীং এর কলম আগে পরে কখনোই পাইনি। ওই কলমের রিফিলটাও ছিল রুপালী, স্টীলের তৈরী। ওই রিফিল দেশে কোথাও পাওয়া যাবে না বলে অর্ধেক লিখে রেখে দিয়েছিলাম। অনিবার্যভাবে কালি শুকিয়ে যায়। আজো আছে সংগ্রহের সবচেয়ে পুরোনো ৩০ বছর বয়সী সেই কলমটা। এছাড়াও কাছাকাছি সময়ের দামী কলমের মধ্যে কয়েক প্রকার পার্কার, কয়েক প্রকার শেফার সহ খ্যাত অখ্যাত কোম্পানীর প্রায় দুডজন কলম একটা ছোট বাক্সের মধ্যে রেখে দিয়েছিলাম। ওই কলমগুলোতে আর কখনো লেখা হবে না বুঝতে পারলাম কলম যুগ শেষ হবার অনেক বছর পর। সেদিন পুরোনো জিনিসপত্র ঘাটতে গিয়ে বাক্সটা হাতে নিলাম এবং আপ্লুত হলাম।

তিন টাকার ইকোনো কলম বাজারে আসার পর থেকে কালির কলমের যুগে ভাটা পড়ে। বাজারে তখন জেম ইউথ দুরকম কালির খুব চল ছিল। আমার পছন্দ ছিল ইউথ। কালচে নীল রঙের কালি। জেম কালি ছিল নীলের নীল। আরেকটা কালি তখন দেখা যেত স্ট্যান্ডার্ড কালি। ওই কালি কুচকুচে কালো। কিন্তু কিছুদিন পর সেই কালোটা রং বদলে হয়ে যেতো খয়েরী। খাতার উল্টো পৃষ্ঠায়ও লেখা উঠে যেত বলে ওটা আমার অপছন্দ ছিল।

এত কলম থাকলেও একটা কলমের জন্য আমার এখনো মন পোড়ে। এক মামা এসএসসি পরীক্ষার আগে বিদেশ থেকে আমার জন্য একটা কলম পাঠায় তার বন্ধুকে দিয়ে। চিঠিতে জানিয়েছিল, "তোর জন্য খুব সুন্দর ঝকঝকে একটা দামী কলাম পাঠালাম, যত্ন করে রাখিস, ভালোমতোন পরীক্ষা দিস, প্রথম বিভাগ পাওয়ার আগাম পুরষ্কার" পরীক্ষা শুরু হয়ে গেলেও কলমটা এসে পৌঁছাতে পারে না। একে একে পরীক্ষাগুলো সব শেষ হলো, রেজাল্টও হলো, প্রথম বিভাগও জুটলো, কিন্তু কলমটা আর কখনোই আসেনি আমার কাছে। মামার বন্ধু পথে কোথাও হারিয়ে ফেলেছিল। সেই অদেখা হারিয়ে যাওয়া কলমটির জন্য অনেকদিন মন কেমন করতো। এখন ভাবি, না এসেই তার উপকার হয়েছে, আমার কাছে এলে সংগ্রহের আরেকটা সংখ্যা বাড়তো বৈ কোন লাভ হতো না। এখন যার হাতে পড়েছে তার হাতেই যত্নে থাকুক।

সেদিন কলমগুলো বের করে একটা একটা করে দেখছিলাম, আর স্মৃতির রেকর্ড বাজছিল মাথায়। সবুজ কালির একটা জার্মান কলম হাতে পড়তেই মনটা উদাস হলো। এই কলম আমার তারুণ্যের প্রথমদিকের। একজনের জন্য মন খারাপ হলে এই কলম দিয়ে ডায়েরী লিখতাম। ডায়েরীর সেই পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি একটা সময়, কিন্তু কলমটা রয়ে গেছে সময়ের অজান্তেই।

হারানো দিন

১.
রংটা ছিল সবুজ। বাংলাদেশের পতাকার মতো গাঢ়। বুকের উপর দারুণ একটা ডিজাইন। বাবা বিদেশ থেকে আসার সময় এনেছিল সুয়েটারটা। এত চমৎকার সুয়েটার আমি জন্মেও দেখিনি। তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করতো। প্রথমবার ওটা পড়ে বেড়াতে গেলাম টেক্সীতে করে। বাবার সাথে কোথাও গেলে পথে পথে সাইনবোর্ড পড়ে পড়ে যেতাম। অভ্যেসটা বাবাই করেছিল। বাংলা ইংরেজী বানানগুলো কায়দা করে শেখানো। তখণ বিশ্বব্যাপি একটা জনপ্রিয় ব্যান্ড ছিল abba. ওটার নামে একটা দোকান ছিল। ওটার একটা বি ছিল উল্টা। বাবা বলতো ওটা কিন্তু আব্বা না, অ্যাবা। শুনে আমি হাসি। বাবার সাথে সাইনবোর্ড দেখে দেখে গেলাম। আসার পথেও। তখন বড়লুকী বাহন ছিল টেক্সী। বাবা বিদেশে যাবার পর থেকে ছুটিতে এলে রিকশা চড়তেন না একদম। যেখানেই হোক টেক্সিতে যেতেন, বড়লুকি দেখানো বোধহয়। বাবা বলতো টাইম কম। সেদিন রাতে ফেরার পথে টেক্সি থেকে নেমে ভোঁ দৌড় বাসার দরজায়। ভাড়া মিটিয়ে বাবা ঘরে ঢুকে বললেন, কিরে গরম লাগে নাকি, সুয়েটার কই? আরে? ছ্যাত করে উঠলো বুকটা। দৌড় দিলাম বাইরে, দূরে টেক্সিটার পেছনের লালবাতি দুটো মিশে যাচ্ছে। আমি ঠায় দাড়িয়ে আছি পাথর হয়ে। ওই টেক্সীতে চলে গেছে আমার প্রিয় সবুজ সুয়েটারটা, যেটাকে আমি আজীবন আগলে রাখবো ভেবেছিলাম, মাত্র একবার পরেই শেষ। বাবা পাশে এসে দাড়ালেন। বললো, থাক মন খারাপ করিস না, আরেকটা কিনে দেবো। পরে আরো অনেক সুয়েটার কিনে দিয়েছিল, নানান রঙের কিন্তু কোনটাই আমার সেই সবুজ সুয়েটারের সমকক্ষ ছিল না। কতোদিন খুজেছি মার্কেটে গেলে, যদি ওরকম একটা পেয়ে যাই। কখনো পাইনি।

২.
আজকাল কেউ কি মার্বেল খেলে? ছেলেবেলায় মার্বেল কেনার কি যে নেশা ছিল। বৈয়াম ভর্তি করে মার্বেল রাখার স্বপ্ন দেখতাম। আগে একটা মার্বেল ছিল পাঁচ পয়সা। টাকায় ২০টা। পরে আস্তে আস্তে দাম বেড়ে টাকায় দশটা হয়ে যায়। কিন্তু বেশীরভাগ পাওয়া যেত এক রঙা মার্বেল। কেমন সস্তা কাচের টুকরার মতো। ওই মার্বেলগুলো থেকে সবচেয়ে ভালো মার্বেলটাকে বানানো হতো ডাগ্গি। ওটাই নেতা মার্বেল। আমার ডাগ্গি মার্বেলগুলো খুব সুন্দর হতো না, কারণ আমি রঙিন মার্বেল কিনতে পারিনি। অন্য ছেলেরা কোত্থেকে যোগাড় করতো জানি না, কিন্তু আমি জুলজুল করে তাকিয়ে থাকতাম ওদের দিকে। একবার কোথায় যেন পাংকি মার্বেল পেয়ে গেলাম কয়েকটা। দুই রঙা। ওগুলো কখনো বাজিতে নিতাম না। নিজে নিজে খেলতাম। মার্বেলগুলো যখন পাকা মেঝেতে পড়তো। টাশ টাশ করে যে শব্দ হতো, সেই শব্দ মাথায় নেশা ধরিয়ে দিত বাইরে যাবার জন্য। কিন্তু রাতের বেলা যাওয়া হতো না। আমাদের উপরতলায় বেশ স্বাধীনতা। কারণ রাতের বেলাও শুনতে পেতাম ওই ঠাশ ঠাশ মার্বেল শব্দ। আমি বুঝতাম ওরা খেলছে, কিন্তু আমি পারি না। পড়া রেখে মার্বেল নিলে চটকানা খাবো মায়ের। কিন্তু যতক্ষন ওই ঠাশ ঠাশ শব্দ চলতো, আমার চোখটা আলগোছে উপরে চলে যেতো, আর মনটা চলে যেতো মার্বেল বৈয়ামে। একদিন মার্বেল দিন ফুরিয়ে গেল বিনা নোটিশেই। একদিন আমি আবিষ্কার করলাম আমি আর মার্বেল খেলি না।

৩.
শহুরে হিসেবে তখন মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত। প্রাইমারী পেরিয়ে হাইস্কুলে। বড়সড় হয়ে গেছি যেন ভাবে সাবে। শহরে আমার গুরু ছিল মামাতো ভাই বাদল। আমার এক বছর সিনিয়র হলেও গ্রামে গেলে আমরা বন্ধু। ও হলো বিখ্যাত পড়ুয়া। আমরা যখন গ্রামে গিয়ে গাছের ডালে ঝুলতাম, পুকুরে দাপাদাপি করতাম কিংবা কাদায় গড়াগড়ি খেতাম অথবা ডাংগুলি খেলতে খেলতে দূপুর পার করে দিতাম, তখন সে নানার খাটের পাশের টেবিলে মগ্ন হয়ে আছে গল্পের বইতে। ফলে তার সুনাম ছিল গ্রাম জুড়ে। শহর থেকে বেড়াতে গেলে রীতিমত সেলেব্রিটি মর্যাদা পেত। (কতগুলো ব্যাপার ছেলেবেলায়ই বোঝা যায়, বড় হয়ে সে ঠিক অনেক উচুতে চলে গেছে, আমার কাছাকাছি বয়সের বাদল এখন সরকারের উচ্চপদের কর্তা)। তার এত ভালত্ব আমাদের খুব হিংসা হতো। একবার আমরা আমাদের দস্যিপনাতে ওকেও কিভাবে যেন সামিল করে ফেললাম। বই ফেলে সেও হৈ হৈ করে যোগ দিল আমাদের সাথে।

ওর বই পড়ার অভিজ্ঞতায় দেখেছে এই বয়সে ডানপিটে ছেলেরা গাছ থেকে ফলমূল চুরি করে। সুতরাং জীবনে একবার ওরকম অভিযানে নামলে দোষ নেই। আমরা ওর নেতৃত্বে বেরিয়ে গেলাম সব কাজিন মিলে। পেছনে পুকুরপাড়টা ছিল গা ছমছম নির্জন জায়গা। ওদিকে কেউ যেতনা খুব দরকার না হলে। পুকুরটায় কোন গোসল করতো না। কেবল মাছের চাষ। ওই জায়গাটা তাই চুরি করার জন্য আদর্শ। কিন্তু সব কটা আনাড়ি চোর। কোন গাছ থেকে কি চুরি করতে হবে না বুঝতে পারছে না। যুতসই কোন গাছ মিলছে না। কোন গাছেই ফল নেই। কেবল গাবগাছে কটা গাব দেখা যাচ্ছে কিন্তু ওটায় চড়া দুঃসাধ্য। পড়লে হাড়গোড় একটাও আস্ত থাকবে না। সহজ কোন শিকারে খোঁজে আমরা। অভিযানে বেরুবার আগে আমি আরেকটা সাফাই করেছি, নানার খাটের নীচে গুপ্তধনের মতো একটা ছোট্ট ছুরি পেয়েছি যেটা ভাজ করা যায়। অভিযানে অস্ত্রশস্ত্র থাকলে সাহস লাগে। পুরো বনজঙ্গল ঘেটে কোন গাছ পাওয়া যাচ্ছে না বলে সবাই যখন হতাশ, তখন একজন বললো, ওই তো একটা লেবুগাছ, থোকা থোকা লেবু ধরে আছে। লেবুও তো একটা ফল, আয় লেবুই সাফা করি। যেই বলা সেই কাজ, দামাল কিশোরের দল হৈ হৈ করতে করতে লেবুগাছে হামলে পড়লো। মোটামুটি সবার পকেট/কোচড় যখন ভর্তি তখন বাদল বললো, হয়েছে এবার ফেরা যাক।

আমরা ফিরে চললাম। ঘরে ঢুকলে তো মাইর চলবে, ডরে আমরা পাশের একটা দেউড়ী ঘরে ঢুকে গিয়ে খিল আটকে দিলাম। একটা চৌকিতে সব লেবু ঢেলে দিলাম। বাপরে লেবুর পাহাড় পড়ে গেছে। এত লেবু নিয়ে কি করবে, এতক্ষণে মাথায় আসলো। লেবুতো পেয়ারা বা আম না, যে কচকচ করে খেয়ে ফেলবো। মহা মুশকিল। কিন্তু কিছু একটা চুরি না করলে অভিযান ব্যর্থ হচ্ছিল বলেই চুরিটা করা। এসব ভাবনা আলোচনা যখন চলছিল, তখন সেই পুকুর পাড় থেকে চিৎকার শোনা গেল, "কোন গোলামের বাচ্চা আমার লেবুগাছ ন্যাড়া করে দিয়েছে, ওরে বদমাশের দল, আমার হাড় জ্বালাইলি, আমি একবার পাই হাড্ডি গুড়া করবো তোদের....." অনির্দিষ্ট কাউকে উদ্দেশ্য করে বলা হলেও প্রতিটা বাক্য আমাকের হাড়ে এসে লাগলো। কারন যার গলা, তিনি হলেন পাড়ার সবচেয়ে দজ্জাল বুড়ি। তার ডরে চিল শকুনও তার কোন ফলের গাছে বসে না। আমরা সব পুচকের মুখ শুকনো। এমন সময় দরজায় দমাদম শব্দ।

ওরে বাপ। কে এল আবার? লুকা লুকা। সব লেবু লুকা, আইজ রক্ষা নাই। কিন্তু বাদল মাথা ঠান্ডা বললো, তোরা অত চিন্তা করিস কেন। বলবো, আমরা লেবু শহর থেকে কিনে এনেছি। লেবুর মধ্যে কি নাম লেখা আছে? তার বুদ্ধিতে দরজা খুলে দিলাম। সর্বনাশ। এটা তো তৈয়ব। যে বুড়ি গালি দিচ্ছে তার নাতি। যদিও সে আমাদের ডাংগুলি বন্ধু, কিন্তু চুরি ধরতে পারলে বন্ধুত্বের বারোটা বাজবে। একদম বমাল হাতে নাতে ধরা। তৈয়ব চৌকির উপর ছড়ানো লেবু আর দাদীর গালি দুটো মিলিয়ে যা বোঝার বুঝে নিল।

বাদল আসলেই প্রতিভাবান। সে তখন ছুরি দিয়ে লেবু কাটছিল, তৈয়বকে দেখে বললো, আরে তৈয়ব কেমন আছো। তুমি আসছো ভালো হয়েছে, আমরা লেবু খেতে খুব পছন্দ করি। তাই শহর থেকে আসার সময় এত্তগুলা লেবু কিনলাম, এখন খেয়ে শেষ করতে পারছি না। আসো তুমিও খাও একটা।

তৈয়ব বেজার মুখে লেবুটা নিল। চোরকে হাতে নাতে পেয়েও কিছু করতে পারছে না কারণ যার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হবে সে এই গ্রামের সবচেয়ে উজ্জ্বল ছেলে এবং তার বন্ধুও। সুতরাং দাদীর চিৎকারে গা না করে সে লেবু খেতে বসে গেল আমাদের সাথে। সেই বিব্রতকর মজার পরিস্থিতি এখনো ভুলতে পারি না। ঘটনাটা তৈয়ব বেমালুম চেপে গেলেও রাতের বেলা আরেক চোরের খোজ লাগালো মেজমামা বাড়ীতে ফেরার পর। তার দামী ছুরিটা চুরি গেছে, যে চুরি করছে তাকে পাওয়া গেলে কানের পটকা ফাটিয়ে দেয়া হবে বলে ঘোষনা করা হলো। এখন ছুরিটা চুরি করেছি আমি, আমার কাছ থেকে নিল বাদল, তার কাছ থেকে হাতিয়েছে খালাতো ভাই আজাদ। চোর হিসেবে কাকে ধরা হবে সেটা নিয়ে আলোচনা হলো আমাদের। আমরা কেউ চোর হতে রাজী হলাম না বলে, আজাদ রাতের বেলা চুপি চুপি ছুরিটা জায়গা মতো রেখে এল। পরদিন মামাতো ভাই বেলাল ওটা খুজে পেয়ে বললো, বাবা ছুরিটা পাওয়া গেছে। মামা টেরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললো, আমি তখনই বুঝেছি এটা কার কাজ।

ধোঁয়া

রাতে ঘুমোবার আগে একবার ঘরের বাইরে যেতে হয়। ধূমপান প্রাণঘাতী জেনেও শ্বেত ফিল্টারের একটা তামাক শলাকা দুই ঠোঁটে চেপে রেখে একটা দিয়াশলাই কাঠির মাথা দিয়ে তার ঘরের পার্শ্বদেয়ালে আঘাত করতে হয়। সেই ছোট্ট বিষ্ফোরণের শিখা থেকেই বিশুষ্ক তামাক শলাকা যোগাড় করে নেয় প্রয়োজনীয় আগুন।

সিগারেটের কমলা আগুন থেকে আহরিত ধোঁয়া বুকের খাঁচা হয়ে অন্ধকার আকাশে উড়ে যাবার আগে নিকোটিনের দাগ বসিয়ে দেয় ফুসফুসের কোথাও। সেই দাগ কখনো মুছবে না।

তবু সেই ধোঁয়া রেখাকে আকাশমুখী দেখার জন্য আমাকে প্রত্যেক সন্ধ্যায় একবার আগুন দিতে হয় তামাক শলাকায়। কারণ সেই আকাশমুখী ধোঁয়ার ভেতর আমি কারো নিমগ্ন ছায়া খুঁজে পাই। সেই ছায়াতে নিমজ্জিত হয়ে থাকি কিছুক্ষণ। বিদ্যমান সকল রহস্যের মায়াজাল সরিয়ে, অনধিকারের সীমানা পেরিয়ে ওই সময়ে সে কেবল আমার হয়ে যায়। আমি তাহাতে আশ্রয় নেই, সে আমাতে আশ্রয় পায়।

সিগারেটে আমার নেশা নেই, আমার নেশা তাহাতে। আমি তাহাকে অনুভব করার জন্যই আগুন জ্বালাই, ধোঁয়া ওড়াই।

মানুষ জানে আমার ফুসফুস পুড়ে যাচ্ছে।
আমি জানি পুড়ছে আমার হৃদয়।

কেবল..... সে কিছুই জানে না।

বাসা বদল

১.
লোকটা হাত ধরতেই এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিলাম।

নাছোড়বান্দা লোকটা এ বাড়ির মালিক। পিছু নিয়েছে বাড়ী বদলের দিন থেকেই। এই এলাকায় আমি নতুন। পথঘাট চেনা হয়নি। সুযোগ পেয়েছে লোকটা।

কদিন আগে হলেও দু'গালে দুটো চড় বসিয়ে দেয়া যেতো। কিন্তু আইন বদলে গেছে কদিন আগে। আমার সময় আইনের প্রতিকূলে। মন বলছে ধৈর্য ধরতে। কটা দিন গেলে ঠিক হয়ে যাবে।

সাবধানে লোকটার গতিবিধির দিকে নজর রাখি। লোকটা শিকারী বিড়ালের মতো। পা টিপে টিপে হাঁটে খানিক দূর দিয়ে। আশে পাশে লোকজন থাকলে ভাজা মাছটিও ভেঙ্গে খেতে জানে না। কিন্তু নির্জন হলেই বিপদ। তখন সাবধানে থাকতে হয় আমার। নইলে ঝাঁপিয়ে পড়বে যে কোন মুহুর্তে। চেহারা বদলে যায় তখন তার। দেখেই বোঝা যায় শাণিত অস্ত্র লুকোনো আছে। এরকম বিপদ আগের বাসায় কখনো হয়নি।

২.
বাসা বদলে সম্মতি ছিল না আমার। তবু বাবার দিকে চেয়ে বাসাটা বদলাতেই হলো। বাবা পারছিল না আর। আমার চেয়েও বাবার প্রয়োজনটা ছিল বেশী।

বাসা বদলাবার সময় মা কাঁদছিল খুব। টুকুনও। এতগুলো বছর আগের বাসায় থেকেছি। স্কুলে ভর্তি হবার আগ থেকেই। এত বছর পর এরকম হুট করে পরিচিত বাসাটা ছেড়ে যেতে হবে। নতুন বাড়ীটা অনেক সাজানো। দামী ফিটিংসে মোড়ানো অভিজাত এলাকার বাড়ি। কিন্তু বাড়িওয়ালা কেমন হবে জানার উপায় নেই। আলাপে পোষাকে আধুনিক হলেও মননে কতটুকু রুচিশীল, ঝামেলা পাকাতে কতটা ওস্তাদ আগে থেকে জানার উপায় নেই। এখানে আসার পর বাড়ীওয়ালার মতলব ভালো লাগছে না। মা বলছিল এই বাড়িওয়ালারা একটু ওরকমই হয়।

ওই বাসাটা কতো ভালো ছিল! যখন খুশী বই নিয়ে জানালার পাশে বসে যেতে পারতাম। যেকোন বিকেলে বা দুপুরে ক্যাসেট প্লেয়ারে হেমন্তের গান ছেড়ে দিয়ে বাইরে মেঘের সাথে রোদের মাখামাখি দেখতে দেখতে বইতে ডুবে যেতে পারতাম। রাতে যত দেরীতেই খাই, দেরীতেই ঘুমোই কারো কোন আপত্তি ছিল না।

মাঝরাতে বই পড়তে ভালো লাগে আমার। বুদ্ধদেব বসুর 'তিথিডোর' বইটা মাঝরাত থেকে পড়তে শুরু করে ভোরের আগে আগে শেষ করেছি। গোগ্রাসে গিলেছিলাম। কেউ বাধা দেয়নি। রবীন্দ্রনাথের 'নৌকাডুবি' পড়ে চোখের জলে বালিশ ভিজিয়েছিলাম একা। কেউ জানে না। এখন কি ওসব হবার যো আছে? সবকিছুতে নজরদারি, নিয়মের কড়াকড়ি। রাত দশটার পরপর বাতি নেভাতে হবে, ঘুমাবার আগে গান বাজানো চলবে না, বই পড়া চলবে না। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে একা একা চাঁদ দেখা যাবে না। সব কিছুতে ঘাড়ের উপর এসে দাঁড়াবে কেউ।

অথচ লোকটাকে ভদ্র সভ্য দয়ালু বলেই মনে হয়েছিল আগে। নইলে বাসা বদল করতাম না। এখানে আসার পর লোকটা স্বরূপে প্রকাশ পেয়েছে। আমার আগের বাসায় খানিক দারিদ্র্য থাকলেও ছিল অবাধ স্বাধীনতা, অসীম সুখ, যা কেড়ে নিয়েছে এই নতুন বাসা। এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা, একা থাকতে না পারা।

খানাপিনা বিলাস ব্যাসনের সুব্যবস্থা থাকলেও সবকিছু শৃংখলাবদ্ধ। ভাল্লাগে না এত শৃংখল। এসব নতুন বাসায় নাকি অবাধ স্বাধীনতা থাকে না। তবু কেন যে মেয়েরা পুরোনো বাসা ছেড়ে নতুন বাসায় ওঠে?

আর ....বিয়ের পর কেবল মেয়েদেরই বাসা বদল করতে হয় কেন, এ কেমন নিয়ম?

একটি অলৌকিক সন্ধ্যা

দিনটা কেমন থম মেরে আছে। মে মাসের শেষ দিন আজ। আবহাওয়া দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে বঙ্গোপসাগরে উর্ধাকাশে অবস্থিত মেঘেদের মধ্যে ব্যাপক চিত্তচাঞ্চল্য ঘটাতে চট্টগ্রাম বন্দরে ৫ নম্বর সতর্ক সংকেত দেয়া হয়েছে। পাগলা হাওয়ায় সমুদ্র উত্তাল। জেলেদের তীরের কাছাকাছি থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অথচ শহরের বাতাস কুলুপ এঁটেছে মুখে।

সন্ধ্যের মুখে মুখে টিপটিপ বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। সাথে দপ্তরের ভাষায় 'হালকা থেকে মাঝারি' দমকা হাওয়ার শুরু। অফিস থেকে বেরিয়ে ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই সল্টগোলা, আগ্রাবাদ আর টাইগারপাসের জ্যাম পেরিয়ে জিইসির মোড়ের কাছে পৌঁছাতে সাতটা বেজে গেল। পথে ছোট্ট একটা কাজ সারলাম। ওয়াসার মোড়ের কাছে 'ফ্লাওয়ার ল্যান্ডে' গাড়ি থামিয়ে জাপানী কায়দায় সাজানো একটা গোলাপের টব কিনে নিলাম সাথে খুচরা কিছু বেলী। বেলীগুলো টবের গোড়ায় ছিটিয়ে দিলাম।

যোজন যোজন দূরে থেকেও এই শহরটা খুব প্রিয় তার। অথচ এই শহরে কখনো আসেনি সে। ভয় ছিল পথ চিনবে তো। বলেছে চিনতে কষ্ট হবে না। শুনে শুনে এই শহরের সমস্ত বর্ণনা তার মুখস্ত। প্রতিটা রেঁস্তোরা মহাসড়ক পাহাড় নদী জিলিপি ডালপুরী অলিগলি সব।

বাস থেকে নামার কথা ঠিক এখানেই। দুপুর বারোটায় রওনা দিলে এতক্ষণে পৌঁছে যাবার কথা। বলেছি বাস থেকে নেমে উল্টোদিকের পাহাড়ের দিকে তাকাতে। সে জানে আমাকে কোথায় খুঁজতে হয়। ঠিক খুঁজে নেবে।

'ব্লুসম গার্ডেন' রেস্টুরেন্টের সিড়িতে নেমে গাড়িটা ছেড়ে দিলাম।

এই রেস্টুরেন্টের অবস্থানের মধ্যে একটা স্বপ্নভাব আছে। পেছনে খাড়া পাহাড় উঠে গেছে। সেই পাহাড়ের খাঁজে ফুলের বাগানের মধ্যে রেস্টুরেন্টটা বসিয়ে দেয়া হয়েছে সাজানো স্বপ্নের চেহারায়। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একটা মিনি জল প্রপাত থেকে কলকল শব্দে জল গড়াচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টির শব্দে ঢাকা পড়ে গেছে সেই কলকল শব্দ। ভিন্ন ধাঁচের এই রেষ্টুরেন্টে কংক্রীটের ছাদ নেই। আগাগোড়া বাঁশ, বেতের তৈরী। মাথার উপর ছনের ছাউনি। চারপাশে আদিম চেহারা দেবার আপ্রান চেষ্টা করা হয়েছে।

অনেক বছর হয়েছে এই জায়গায় রেষ্টুরেন্টটা চালু আছে। এ এক রহস্যঘন এলাকা। শহরের মাঝখানে একটা হঠাৎ নির্জন পাহাড় রাস্তার ধার ঘেঁষে উঠে গেছে। দিনে দুবার এদিক দিয়ে যাতায়াত হলেও কখনো নামিনি এখানে। ভার্সিটি জীবনে খুব প্রিয় একজনকে নিয়ে এখানে আসার সাধ জেগেছিল একবার। কিন্তু সাহস আর সামর্থ্য দুটোরই ব্যাপক ঘাটতি থাকায় আর হয়ে ওঠা হয়নি। আজ এত বছর পর ভিন্ন এক সিদ্ধান্তে এখানে আসা।

টিমটিমে আলো জ্বলছে ভেতরে। এখানে কখনোই উজ্জ্বল আলো জ্বালানো হয় না আদিম রূপকে অবিকৃত রাখতে। বিদ্যুত বাতি আছে, কিন্তু কোনটার আলো হারিকেনের চেয়ে বেশী না। কয়েকটা ঝোলানো হারিকেনও আছে কিছু টেবিলের উপর। দুজনের একটা টেবিলে দখল নিয়ে বসে পড়লাম। বড় চুপচাপ আজ রেষ্টুরেন্টটা। এসময়ে খদ্দের আরো বেশী থাকার কথা। কিন্তু ওই উত্তর পূর্ব কোনে একজোড়া তরুন তরুনী বাদে আর কেউ নেই। ঝড়বাদলের কারণেই হয়তো।

আমি যে টেবিলে বসেছি তার উপরেও একটা হারিকেন জ্বলছে। হারিকেন থেকে চারপাশে টিমটিমে হলুদ আলো ছড়িয়ে পড়লেও টেবিলে ছুঁড়ে দিয়েছে এক চিলতে গোল অন্ধকার। সেই অন্ধকারে আমি ছোট্ট ফুলের টবটা রাখলাম। ওতে নয়টা অর্ধস্ফুট মেটে কমলা রঙের গোলাপকুঁড়ি সাজানো। অন্ধকারে গোলাপের রংটা বোঝা না গেলেও টবের গোড়ায় ছড়ানো বেলীফুলগুলি অন্ধকারেও হাসছে আর নিঃশব্দে সুগন্ধ ছড়াচ্ছে।

আগেই ঠিক করা ছিল কি অর্ডার করবো। চটপট দুজনের খাবার অর্ডার দিতে ওয়েটার প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো। আমি ইঙ্গিতে ফুলের টবকে দেখালাম। ওয়েটার বুঝলো আরেকজন আসবে, পথে আছে। সে অর্ডার নিয়ে চলে গেল। আমি চুপ করে বৃষ্টির গান শুনতে থাকি। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টির গান ছাপিয়ে আরেকটা [url=http://www.youtube.com/embed/XWKXpC2JTVU] পুরোনো গান[/url] বেজে উঠলো মাথার ভেতর।

খাবার এলো। দুজনেরই। ওয়েটার দুই পাশে প্লেট সাজাতে সাজাতে আবারো জিজ্ঞেস করলো, আসেনি? আমি ইশারায় বললাম, বেড়ে দাও, আসছে। দুই প্লেটেই খাবার বেড়ে দিয়ে ওয়েটার বিস্মিত চেহারা নিয়ে চলে গেল। আমার কানে বাজছে তখন, "এক অচিন দেশে চলে এসেছি তোমার হাত ধরে, যেখানে আমি আর আগে কখনো আসিনি....."

বাইরে তুমুল বাতাস শুরু হয়েছে। বৃষ্টির তোড়ে পেছনের পাহাড় থেকে জলের ধারা নেমে রাস্তায় চলে যাচ্ছে হলুদ কাদামাটি বুকে নিয়ে। হারিকেনের আলোটা কেঁপে কেঁপে উঠছে মাঝে মাঝে। আমি ছুরি কাঁটা দিয়ে খাওয়া শুরু করেছি। বলেছিল আমাকে সময় মেপে খাওয়া শুরু করতে। অপেক্ষা বারণ। অপেক্ষায় কষ্ট বেশী বলে অপেক্ষার বদলে আমরা প্রতীক্ষা করি। খেতে খেতেও প্রতীক্ষা করা যায়।

ওপাশের প্লেটে খাবারগুলো অক্ষুন্ন। ঠান্ডা হয়ে যাবে। পাশেই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে ফুলের টবটা। টেবিলের উল্টোপাশে অন্ধকারে ওই একলা চেয়ারে কেমন একটা অবয়ব যেন বসে আছে। কে ওখানে? হাসছে কবুতরের মতো করে? নাহ, এসব নেহায়েত অতিকল্পনা। কেউ নেই ওখানে। আসেনি সে এখনো। দুশ্চিন্তা করবো? নাহ। আমি জানি সে আসবেই। দুর্যোগ তাকে আটকে রাখতে পারবে না।

হঠাৎ জোর বাতাসে হারিকেনগুলো সব নিভে গেল। সাথে সাথে কড়কড় শব্দে বাজ পড়লো কাছে কোথাও। গর্জনের সাথে সাথে বৈদ্যুতিক আলোগুলো সব নিবে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিজের হাতও দেখা যাচ্ছে না এমন। সময় যাচ্ছে। জেনারেটর নেই এদের? বিরক্ত হলাম এবার। কারো কোন সাড়া নেই। নীরব মৃত্যুপুরী যেন।

তখনি টেবিলে রাখা আমার হাতের উপর কার যেন একটা উষ্ণ স্পর্শ। আমার ডানহাতের উপর নরোম একটা হাত এসে বসে গেছে। শিউরে উঠলাম ভয়ে। কে ওখানে? জিজ্ঞেস করার আগেই ফিসফিস করে একটা কবুতর হাসি ভেসে আসলো অন্ধকারে। হাসিটা এত হালকা যে আমার কান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে কোন মতে।

দুমিনিট বা আরো কম। তারপরই জেনারেটার চালু, আলো জ্বলে উঠলো। তাকিয়ে দেখলাম, সামনে কেউ নেই। উষ্ণ হাতের স্পর্শও উধাও। সামনে পেছনে আশে পাশে কেউ নেই। অদূরে বসা জুটিটা তেমনই ফিসফিস করে কথা বলে যাচ্ছে। কেউ কি আসলেই হাত রেখেছিল? নাকি বিভ্রম। ওপাশে প্লেটে খাবারগুলো সেরকমই আছে। ছুরি কাটা ন্যাপকিন সব ঠিক আছে। কিন্তু ফুলের টবটা? ওটা কোথায় গেল? সব আছে, ওটা নেই! এসেছিল সে? এভাবেই কি?

আমি কাউকে জিজ্ঞেস করবো বলে খুঁজলাম। কিন্তু কোন ওয়েটার নেই তখন। তীব্র বেলী ফুলের সুগন্ধীতে পুরো রেষ্টুরেন্ট ম ম করছে। এটা কি সত্যি নাকি স্বপ্ন? স্বপ্নে কি সুগন্ধ টের পাওয়া যায়?

না স্বপ্ন নয়। সত্যিই। দুর্যোগ মাথায় নিয়ে বাসায় ফিরলাম রিকশায় করে। ভিজে জুবুথুবু। কারেন্ট চলে গেছে পুরো শহরে। অন্ধকারে তিন তলার সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে আবারো সেই সুগন্ধ। এবার আরো স্পষ্ট। আরো কাছে। আশ্চর্য! সে তো চলে গেছে ওখান থেকেই। এখনো তার সুগন্ধ আসে কি করে?

বাসায় ঢুকে শার্ট বদলাতে গিয়ে দেখি পকেটে তিনটা বেলী ফুল। টব নিয়ে যাবার সময় তিনটা বেলী দিয়ে গেছে ৩৩৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এক রহস্যময় নীহারিকা বালিকা রঞ্জনা!! দূর থেকে যার কথাই শোনা যায় কেবল, যাকে কখনো ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, পাওয়া যায় না।