Thursday, August 27, 2026

কেন চট্টগ্রাম বঙ্গোপসাগরের প্রধান বন্দর হতে পারেনি?

২৪ আগষ্ট ২০২৬ তারিখে ডেইলি স্টারে রিলা মুখার্জির লেখা Why Chittagong never became a maritime city? আলোচনাটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। খুব চমৎকার কিছু বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। কিন্তু সেই বিশ্লেষণের তাত্ত্বিক আলাপের ভেতরে গুরুতর কিছু বাস্তবতা আসেনি। তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয়টা বলেননি। অজ্ঞতা কিংবা এড়িয়ে যাওয়া, ঠিক জানি না। এটা সবাই জানে কলকাতার জন্ম হবার বহুকাল আগে চট্টগ্রাম বন্দর হিসেবে খ্যাত ছিল। কিন্তু তবু ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রাম কেন প্রধান বন্দর হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সেই প্রশ্নের উত্তর কলোনিয়াল শাসকদের কাছে আছে। উপনিবেশ যুগে শুধুমাত্র সেইসব অঞ্চল উন্নতি করেছে যেগুলো শাসকদের সুবিধাজনক ছিল।

চট্টগ্রামের বড় শহর বা পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক শহর হতে না পারার আসল কারণ ভূ-রাজনৈতিক। শত শত বছর ধরে চট্টগ্রাম ছিল এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক সীমান্ত। আরাকান, মুঘল, ত্রিপুরা রাজ্য আর পর্তুগিজ জলদস্যু, সবার নজর ছিল এই ভূখণ্ডের ওপর। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সংঘাতের কারণে কেউই দীর্ঘদিন একে একচ্ছত্র দখলে রাখতে পারেনি। এই দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অস্থিতিশীলতার কারণেই সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থায়ী পরিবেশ বা দেশীয় অভিজাত শ্রেণি গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়নি।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রবন্ধটিতে একটি ঐতিহাসিক সত্য এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে (বা লেখকের নজর এড়িয়ে গেছে)। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কিন্তু শুরুতেই কলকাতার কথা ভাবেনি; তাদের প্রথম পছন্দ ছিল চট্টগ্রাম। ১৬৮৬ সালে জব চার্নক ও ব্রিটিশ নৌবহর চট্টগ্রাম দখলের জন্য হামলা চালায়। এই বিষয়ে সকল তথ্য প্রমাণ এখনো নানান আর্কাইভে আছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করেই বাংলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক ও সামরিক ভিত্তি গড়ে তোলা। কিন্তু সেই অভিযানে ব্রিটিশরা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। এমনকি ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা লাটে ওঠার দশা হয়েছিল।
এই ব্যর্থতার পরেই বাধ্য হয়ে তারা অখ্যাত এবং নিরাপদ স্থান হিসেবে কলকাতার দিকে নজর দেয়। অর্থাৎ, ১৬৮৬ সালে চট্টগ্রামে ব্রিটিশদের হারই ছিল কলকাতার জন্ম ও উত্থানের মূল কারণ। ‘ফোর্ট উইলিয়াম’ দুর্গটি কলকাতার বদলে চট্টগ্রামে গড়ে উঠত, তবে আজকের ভৌগলিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলতো।
তাঁর সাথে আমার পরিচয় নেই। যদি আলাপ হতো আমি তাঁকে বলতাম Chittagong’s failure to evolve into a full-fledged maritime city was, above all, a result of persistent geopolitical turmoil. For centuries, the region was a highly contested frontier claimed by the Arakanese, the Mughals, the Tripura Kingdom, and Portuguese buccaneers. Because control over the territory changed hands so frequently, no single power could establish long-term political stability. It was this constant conflict, not a inherent lack of commercial appetite, that prevented a permanent merchant elite from forming and investing locally.
More importantly, the essay omits a critical historical turning point that reshaped the region's destiny. The British East India Company did not originally set its sights on Calcutta; Chittagong was their first choice. In 1686, Job Charnock and the British naval forces launched an aggressive military campaign to capture Chittagong, intending to turn it into the main commercial and strategic stronghold for the British Empire in Bengal. However, due to strong Mughal resistance, the British failed catastrophically. It was precisely this failure in Chittagong that forced the Company to fall back to the Hooghly River and establish a base at Calcutta in 1690. In short, Calcutta’s birth and rise were the direct consequence of Britain's military defeat at Chittagong.
Had history taken a different turn in 1686, and had Fort William been erected in Chittagong instead of Calcutta, the maritime history of Bengal and Chittagong’s future would have been entirely different. Chittagong possessed superior natural advantages: a deep-water natural harbor with direct access to the Bay of Bengal, features that the silt-prone, narrow Hooghly River near Calcutta could never match. Calcutta grew into a world-class maritime city largely because it received colonial patronage and imperial defense infrastructure, leaving Chittagong’s vast potential untapped. Ultimately, Chittagong’s destiny cannot be adequately explained through urban planning theories or missing merchant networks. It did not fail to become a maritime city due to structural economic flaws, but because of centuries of geopolitical friction and a decisive moment in British colonial policy. Had the political wheel turned just a bit differently, the legacy that became Calcutta would likely have belonged to Chittagong.

অথচ কয়েক মাস আগে রিলা মুখার্জী নিজেই আরেকটা লেখায় যেটা উল্লেখ করেছিলেন, সেটা গত পরশুর প্রবন্ধের বিপরীত। ১৫০২ সালে বঙ্গোপসাগরের একমাত্র বন্দর হিসেবে চট্টগ্রামের নামই পাওয়া গেছে প্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র ক্যানটিনো প্লেনিস্ফেয়ারে। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন:
How, then, did this marginal land transform into the Cantino Planisphere's major portal in 1502? The Portuguese diarist Tomé Pires (1515) observed a westward commercial networking from Chittagong, with Persian, Rumi, Turk, and Arab merchants present there, as well as traders from Chaul, Dabhol, and Goa, while the Portuguese epic poet Camões (1572) emphasised eastern networks:
'The City CATHIGAN would not be wav'd,
The fairest of BENGALA: who can tell
The plenty of this Province? but its post
(Thou seest) is Eastern turning the South-Coast.'
হ্যাঁ, এই অরণ্য বেষ্টিত প্রাচীন জনপদটাই ছিল বঙ্গোপসাগরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। ১৬৮৬ সালে চট্টগ্রাম দখল করতে ব্যর্থ না হলে এখন হয়তো চট্টগ্রাম হতো বঙ্গোপসাগরের সিঙ্গাপুর।

রিলা মুখার্জির লেখার লিংক:
https://www.thedailystar.net/slow-reads/focus/news/why-chittagong-never-became-maritime-city-4254986

Friday, August 7, 2026

সত্যি বন্ধু

"সত্যিকারের বন্ধু আমরা খুব কমই পাই। যাদের অধিকাংশকে আমরা বন্ধু বলে মনে করি, তারা প্রকৃতপক্ষে কেবল পরিচিত মানুষ মাত্র। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কারণ সিসেরোর সেই উক্তি একেবারেই সত্য। সত্যিকারের বন্ধুত্ব কেবল সৎ মানুষের মধ্যেই সম্ভব। যৌবনে, যখন রক্তে এখনও উষ্ণতা থাকে এবং নিজের নিষ্পাপ হৃদয় থেকে জন্ম নেওয়া বিশ্বাস এখনও অটুট থাকে, তখন মানুষ সহজেই অন্যকে বন্ধু ভাবে। কিন্তু অন্য মানুষের অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে সেই বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। আমিও একসময় আমার পরিচিতদেরই বন্ধু ভেবেছিলাম। মনে করতাম, আমার অসংখ্য বন্ধু আছে। কিন্তু বিপদের আগুন আমার পরিচিতদের ভিড়কে ছেঁকে দিয়েছে। এখন দেখি, একদিকে রয়েছে হাতে গোনা কয়েকজন প্রকৃত বন্ধু, আর অন্যদিকে রয়েছে শত্রুর মতো বা সম্পূর্ণ অপরিচিত এক বিরাট জনসমষ্টি। তবে এই কঠিন পরীক্ষার একটি উপকারও হয়েছে- আমি অন্য মানুষের ওপর যতটা ভরসা করতাম, তার চেয়ে কম ভরসা করতে শিখেছি; আর নিজের মধ্যে যতটা শক্তি আছে, তা আমার ধারণার চেয়েও বেশি আবিষ্কার করেছি।"

জোনাথন সুইফট বহুবছর আগে এই কথাটা বলে গিয়েছিলেন। এত বছর পরেও কথাটা শতভাগ খাঁটি। বরং আরো বেশি সত্যি এখন।

Thursday, July 16, 2026

কাগজ, কলম, প্রযুক্তি, লেখালেখি

১. লেখকদের হাতে কাগজ আর কলম থাকাই সবচেয়ে ভালো। এখন কম্পিউটার যুগ। প্রায় সবাই ল্যাপটপ কম্পিউটারে লেখালেখি করে। কেউ কেউ মোবাইলেও প্রচুর লেখালেখি করে। মোবাইলে লেখার কায়দাটা খুব বেশি রপ্ত হয়নি। বাংলা ফন্টে মোবাইলে লেখা কষ্টকর। ভয়েস কমান্ডে প্রচুর বানান ভুল। তবু কম্পিউটারবিহীন জীবনে সামান্য লেখালেখির জন্য মোবাইল মাঝে মাঝে কার্যকর হতে পারে।

২. আরো কিছু প্রযুক্তি আসার দরকার। টাইপ না করে লেখা যায় সেরকম প্রযুক্তি। মাথার ভেতর কোনো ভাবনা এলে সেটা হাতের চারকোনা স্ক্রিনে ভেসে উঠলো। বলা যায় না, ভবিষ্যতে সেরকম কোনো অতিবুদ্ধিমাত্রিক প্রযুক্তি এসে হাজির হতে পারে।


৩. সুস্থ শরীরে অলস সময় কাটানোর সবচেয়ে আনন্দময় উপায় হলো ইউটিউবে খুঁজে খুঁজে পুরোনো দিনের বিটিভি যুগের নাটক দেখা। আশি নব্বই দশকের ঝাপসা নাটকগুলো এখনো আনন্দময়। হুমায়ূন আহমেদ কিংবা আফজাল-সুবর্ণার চমৎকার সব নাটক এখনো আছে।


৪. শরীর মন দুটো দিন ভালো থাকলে মনে হয় অনেক কিছু পাওয়া হলো। গত দুই দিন খুব ভালো কেটেছে দু সপ্তাহের অস্বস্তিকর সময়ের পর। এগুলো বেশিদিন থাকে না। নতুন ঝামেলা এসে হাজির হবেই। 


Tuesday, June 2, 2026

বইপোকা অথবা পোকার খাদ্য

অনেকদিন পর আক্কাস ভাই আসলেন বেড়াতে। এই বাসায় তিনি আগে আসেননি। ঘুরে ফিরে দেখে এক পর্যায়ে বলে উঠলেন, ভাই আপনার তো অনেক বই, সারা ঘরে লাইব্রেরি।

আমি লজ্জিত হেসে বললাম, ভাই এটা লাইব্রেরি না, বইয়ের শরণার্থী ক্যাম্প বলতে পারেন।


তিনি অবাক হয়ে বললেন, এটা কেমন কথা?


আমি বললাম, পুরোটা শুনলে বুঝবেন। 


দেখুন, মানুষের অনেক বড় বড় স্বপ্ন থাকে। ক্যারিয়ার নিয়ে উন্নত চিন্তাভাবনা থাকে। আর্থিক বৈষয়িক ব্যাপারে অনেক সচেতনতা থাকে। আমার সেসব কিছুই ছিল না। না থাকার কারণ- ক্লাস সেভেনে উঠে আমি একটা নতুন বিস্ময়ের মুখোমুখি হই। আমাদের স্কুলের ছোট্ট লাইব্রেরি ঘর ছিল। সেই লাইব্রেরি কার্ড করার পর আমার মনে একটা নতুন স্বপ্ন দানা বাঁধে। আমার মনে হতে থাকে ওরকম একটা ঘর থাকলে জীবনে আর কিছু চাইবার থাকবে না। যেখান থেকে প্রতিদিন একটা করে বই পেড়ে নেয়া যাবে। যে ঘরে ঢুকলে বুকশেলফে হাত বুলাতে বুলাতে এই প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যাওয়া যাবে। এই অভিজ্ঞতা অন্য কারো আছে কিনা জানি না। বইয়ের ভাঁজে আঙুল বোলাতে বোলাতে হাতের তালুতে একটা পরম আনন্দদায়ক অনুভূতি হয়। আমি বই পড়ার পাশাপাশি সেই অনুভূতিটাও খুব উপভোগ করি। প্রতিটা বইয়ের আলাদা স্পর্শ, আলাদা অনুভূতি, আলাদা স্মৃতি। যত পুরোনো হয় বই, তত বেশি গভীর হয় সেই অনুভূতি।


ক্লাস সেভেন থেকে সেই অনুভূতির যাত্রা চার যুগ পার হবার পরও থামেনি। ফলে আমার অন্য সকল উচ্চাশা হার মেনে গেছে বইয়ের কাছে। কিন্তু স্বপ্নের বাইরের জগতটা অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন। সেটা টের পেতে শুরু করলাম ভার্সিটিতে ওঠার পর। বাবা তখন একটা ছোটখাট বাড়ি তৈরি করেছেন শহরে। ওই বাড়ির আংশিক ইঞ্জিনিয়ার ছিলাম আমি। মানে আমি একটা লেআউট করে দিয়েছিলাম কয়টা রুম হবে, কোন রুম কোন দিকে থাকবে। বাবা ওটা ইঞ্জিনিয়ারকে দিলেন। তিনি ওটা তাঁর মতো করে ড্রইং করে সিডিএ থেকে পাশ করিয়ে নিলেন। 

সেই যে মূল নকশা করেছিলাম, সেখানে আমার একটা গোপন অভিপ্রায় ছিল। আমি একটা ঘরকে লাইব্রেরি করতে চেয়েছিলাম। আমাদের জন্য তিন বেডরুমের বাড়ি হলেই চলতো। কিন্তু আমি চারটা বানিয়ে দিয়েছিলাম ইন্টার পাশ বুদ্ধি নিয়ে। ওই একটা বাড়তি ঘর হবে লাইব্রেরি। যেখানে সবগুলো দেয়াল জোড়া আলমারীতে শুধু বই থাকবে। সিনেমায় দেখা স্টাডি রুমের মতো। 


বাড়িটা যথাসময়ে হয়ে গেল। আমরা উঠলাম স্বপ্নের বাড়িতে। কিন্তু তারপর থেকে অভাবিত সব ঘটনা ঘটতে শুরু করলো। প্রথম ধাক্কা আসলো ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল। প্রবল ঘুর্ণিঝড়ে আমাদের একতলা টিনশেড বাড়ির ছাদ উড়ে যায়। বাসা পুরো তলিয়ে গিয়েছিল জলোচ্ছ্বাসে। সারা জীবনের অনেক সঞ্চয় এক রাতে নষ্ট হয়ে যায়। কিছু বই রক্ষা পেয়েছিল প্রায় অলৌকিকভাবে। বাকীগুলো আবর্জনায় পরিণত হয়েছিল। 


সেই ধাক্কার পর আরো নানান ধাক্কা আমাদের পরবর্তী কয়েক বছরকে কঠিন করে তুলেছিল। আরো অনেক বছর পর ওই বাড়িটা আমাদের ছেড়ে দিতে হয়। আমরা একটা নতুন ফ্ল্যাটে এসে উঠলাম। এখানে জায়গা অনেক কম। ফার্নিচার রাখার পর বইয়ের জন্য আলাদা জায়গা থাকে না। তবু কায়দা করে বুকশেলফগুলো বসিয়ে দিলাম। কিন্তু সবগুলো বইয়ের জায়গা হচ্ছিল না। চার দশকের সঞ্চয়ে শত শত বই, পত্রিকা জমে ছিল। বন্যা, ঝড়, বাদলে প্রচুর নষ্ট হবার পরও যেগুলো রয়ে গেছে সেগুলোর ঠাঁই হচ্ছে না। জায়গার সংকুলান না হওয়ার ফলে শত শত বই পত্রিকা বিসর্জন দিতে হলো। তারপরও খাটের নীচে এখানে ওখানে নানান জায়গায় স্তুপ। অন্যদের মতো ঘর সাজানোর শৌখিনতা আমার তেমন নেই। শুধু জিনিসপত্রগুলো ঠিক জায়গায় থাকতে পারলেই হয়। বাসার অন্য আসবাবপত্রের চিন্তা করার মানুষ আছে। বইগুলোর ব্যবস্থা করাই আমার দুশ্চিন্তা। 


বাসার কারো সমস্যা না করে কাজটা করার জন্য আমাকে একটু কৌশলের আশ্রয় নিতে হলো। ছোট ফ্ল্যাট। ছোট ছোট বেডরুম। তবু আমি খুঁজে খুঁজে যেখানে এক ফুট দেড় ফুট খালি জায়গা পেলাম, সেই মাপে বুকশেলফ বানাতে লাগলাম। অজুহাত দিলাম, অন্যকিছু রাখার। কিন্তু বুকশেলফ আনার পর ওখানে বই ঢুকে গেল। ড্রইংরুম শেষ করে, ডাইনিং রুমের কোনায়, বেডরুমের আলমারীর ফাঁকে, শোকেসের ভেতরের দিকে, যেখানে একটু জায়গা পেয়েছি, বইগুলোকে আশ্রয় দিয়েছি। অনেকটা শরণার্থী শিবিরে থাকার মতো করে সবগুলো বই কোনো না কোনো শেলফে আশ্রয় পেয়ে গেল। 

তো, এটাকে আমি লাইব্রেরি বলি না। এটাকে বইয়ের শরণার্থী শিবির বলা যায়।


আক্কাস ভাই হাসতে লাগলেন আমার কথা শুনে। আমি আবারো বললাম, হাসবেন না। এর পরে দুঃখের ব্যাপারও আছে।


কেমন?


এই যে বইগুলা। এগুলা এখন আছে। কিন্তু একসময় এগুলাকে আপনি শহরের নানা ফুটপাতে খুঁজে পেতে পারেন।


তা কি করে হয়?


পরের প্রজন্ম যদি বই না পড়ে তাহলে ওটাই হবার কথা। এখন যে যন্ত্রযুগ এসেছে, বইপত্রের দিকে এই প্রজন্মের তেমন আগ্রহ নেই। আগামীতে কাগজের বই হয়তো কেউ পড়বে না। তখন ফুটপাতই সর্বশেষ গন্তব্য হতে পারে।


আক্কাস ভাই যে হাসি নিয়ে ঘরে ঢুকেছিল, তার উল্টো চেহারা নিয়ে বিদায় নিলেন। কারণ তাঁর বাড়িতে আমার চেয়ে কয়েকগুন বেশি বই আছে। তাঁর পুত্রকন্যারা কেউ একটা বইও কোনোদিন উল্টে দেখে না। এটা নিয়ে তিনি প্রায়ই আক্ষেপ করতেন। বলতেন বইগুলো একদিন পোকার খাদ্য হবে। আজকে আবারো হয়তো সে কথা মনে পড়ে গেছে।


Friday, May 29, 2026

একটা মেকি হাসির গল্প: : পাভেল রহমান

 


স্বৈরাচার পতনে বঙ্গভবনে দুই নেত্রীর ছবি।

' মা, তোর বদনখানি মলিন হলে ...!

বঙ্গভবনে দুই নেত্রীর ‘বদনখানি মলিন’ ছিল ! ছবিতে দুই নেত্রীর মুখে যে হাসি দেখা যাচ্ছে সেই হাসিটি ছবি তোলার জন্য হেসেছিলেন তাঁরা। তার আগে বঙ্গভবনের দরবার হলে সোফায় পাশাপাশি 'মলিন বদনে' বসেছিলেন দুই নেত্রী।
এর আগে
৬ ডিসেম্বর বিকেলে শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়া উপস্থিত হয়েছিলেন বঙ্গভবনে বিজয়ীর বেসে। দরবার হলে দুইনেত্রির বসার জন্য একটি ডবল শোফার ব্যবস্থা ঠিক করে রাখা হয়েছিল। তবে সোফায় বসবার মুহূর্তে একে অন্যের প্রতি সৌজন্য বিনিময়ও করেননি তাঁরা। বসার পরে বেগম জিয়া এক নিবিষ্টে সামনের স্টেজের দিকে তাকিয়ে থাকলেও শেখ হাসিনা ডানের সোফায় বসা আওয়ামী লীগ নেত্রী বেগম সাজেদা চৌধুরীর সাথেই টুকটাক কথা বলছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া নিজে যেহেতু গম্ভীর থাকতে পছন্দ করেন সে কারনে প্রয়োজন ছাড়া তিনি আগবাড়িয়ে তাঁর বায়ে বসা মহাসচিব ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের সাথে কোন কথা বলেননি।
তবে কাকতালীয় ছিল তাঁদের শাড়ির রঙ্গের মিল। তাঁরা দুইজনাই 'গর্জিয়াস ঘিয়ে রঙ্গের শাড়িতে’ উপস্থিত হয়েছিলেন বঙ্গভবনে। সেই সাথে ছিলেন পরিপাটি সাজে। দরবার হলের উপস্থিত বিশিষ্ট গণ্যমান্য অতিথিরা দুইনেত্রির সান্নিধ্যে লাভ কিংবা দুজনাকে একটিবার 'চোখে' দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন।
কিন্তু এমন একটি ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে তাঁরা যেভাবে বসেছিলেন তাতে মনে হচ্ছিল তাঁদের মাঝে কোন পূর্ব পরিচয়ই ছিল না কখনোই। উৎফুল্ল উচ্ছ্বাস তো দূরের কথা, দুজনার মাঝে মুখ চাওয়াচায়ি পর্যন্ত ছিল না সেই অনুষ্ঠানে যোগদিয়ে !
খবরের মানুষ হিসেবে তাঁদের দুজনার সঙ্গে দীর্ঘ ৯ বছরে রাজপথে গড়ে উঠা সম্পর্কের খাতিরে প্রত্যাশা আজকের দিনে তাঁদের একটা প্রাণবন্ত ছবি তোলার। সেই আশাতেই সেই কখন পৌঁছে গেছি বঙ্গভবনের দরবার হলে। আর ঐতিহাসিক মুহূর্তের ছবি তুলতে ক্যামেরা নিয়ে ওৎ পেতে বসে আছি ‘মহেন্দ্র‘ ক্ষণে’র জন্য। শুধু কি আমি, আছেন দুই নেত্রীর সামনে উপচেপরা ফটো সাংবাদিকরাও।
যদিও এমন ভাবে দুইনেত্রিকে ছবি তোলার জন্য ঘিরে রাখার সময়টা খুব বেশী পাওয়া যাবে না। যে কোন মুহূর্তে দরবার হলে প্রবেশ করবেন অনুষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। আর সেই মুহূর্তে আমাদের এই স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে যেতে হবে।
বঙ্গভবনের আজকের এই অনুষ্ঠানে যদিও প্রধান ব্যক্তি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ কিন্তু ক্যামেরায় প্রধান আকর্ষণ ‘দুই নেত্রী’ শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া। শুধু আমাদের চোখ না অনুষ্ঠানের হাজারো চোখ তাঁদের দিকেই। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ ছবির দ্বিতীয় ম্যারিটে। তবে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ একা হবেন নন দুই নেত্রীর মাঝে তৃতীয় হয়ে।
তবে দুজনার মাঝে কথা কিংবা হাসি বিনিময়টা ছবির জন্য প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বেগম জিয়ার চেয়ে প্রাণবন্ত আর উচ্ছল স্বভাবের নেত্রী শেখ হাসিনার সাহায্যে কাজটা করা চেষ্টা করি আমি।
হাসিনা আপাকে বললাম, আপা এমন দিনে চুপ করে আছেন কেন ? ম্যাডমের সাথে কথা বলেন। আপা বললেন, ‘ কি বলবো ‘? আমি বললাম, যা খুশী বলেন। আপা মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত কবিতা ‘ উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই’-আওড়াতে লাগলে আমি থামিয়ে দিলাম। পাশে থাকা ম্যাডাকে দেখিয়ে বললাম, না না ওনাকে কিছু বলেন। আপা আবার আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘ কেমন আছেন ’ ? আবার থামিয়ে দিলাম বললাম, আপা আমার দিকে না, ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করেন। আপা তখন ম্যাডামের দিকে তাকালেন আর হাসতে হাসতে অনুযোগের সূরে বললেন, ‘দেখেন তো, পাভেল কেন যে এমন ঝামেলা করে ‘ ? হাসিনা আপার কথা শুনে মুখে হাসি ফুটিয়ে ম্যাডামও আপার দিকে ঘুরে তাকালেন আর হাসতে হাসতে বললেন, ‘ পাভেল তো এমনই করে ‘। আর সেই মুহূর্তে দুজনাই দুজনার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলেন একসাথে !
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মহামূল্যবান সেই হাসিটি আমাদের সবার ক্যামেরার মুহু মুহু ফ্ল্যাশে ফ্ল্যাশে আলোয় ঝলসে উঠলো দরবার হল, ছড়িয়ে গেলো সেই ছবি সারা দেশে সারা বিশ্বে।
মুহূর্তে পাওয়া কাঙ্কখিত দুই নেত্রীর হাসির ছবিটি সেই রাতেই এপির ওয়্যারে ছড়িয়ে গেলো সারা বিশ্বে। পরদিন বাংলাদেশের কাগজে এবং ফ্লাইটে নেগেটিভ চলে গেলো আনন্দবাজার, স্টেট্‌সম্যান এবং প্যারিসের গামা প্রেস এবং সিপা ফটোতে।
সে সময় ছবি পাঠানোর প্রযুক্তি উন্নত না থাকায় মিডিয়ার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গুলিতে নেগেটিভও পাঠানো হতো।

পাভেল রহমান
বেবিলন, নিউ ইয়র্ক
৬ ডিসেম্বর ২০২৫

Monday, May 25, 2026

ইচক দুয়েন্দে সম্পর্কে আমার অজ্ঞতা

আমি ইচক দুয়েন্দের নাম যখন প্রথম শুনি তখন ভেবেছি তিনি বিদেশী লেখক। কখনো তাঁর কোনো বই পড়িনি। অনেক পরে জানলাম তিনি বাংলাদেশের সাহিত্য জগতের সবকিছু থেকে আড়ালে থাকা একজন মানুষ ছিলেন। কয়েকদিন আগে তিনি চিরতরে চলে গেলেন। তখন তাঁকে নিয়ে অনেক হৈ চৈ। অথচ বেঁচে থাকতে তাঁকে নিয়ে কোথাও আলোচনা হয়নি। তিনি বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলেন জীবদ্দশাতেই।

প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত তাঁর সম্পর্কে লেখা এই নিবন্ধটি রেখে দিলাম। মানুষ এমন অদ্ভুতও হতে পারে?

-------------------------------------------------------------------------------

ইচক দুয়েন্দে: আমাদের না-পড়া একাকিত্ব
সৈকত আরেফিন

ইচক দুয়েন্দে শামসুল কবীর কচি চলে গেলেন।

এই বাক্যটি লিখতে গিয়ে মনে হলো, মৃত্যুর সংবাদ সবসময় কেবলই মৃত্যুর সংবাদ নয়। কখনও কখনও তা আমাদের দীর্ঘ বিস্মৃতির হঠাৎ প্রকাশ। মানুষটি হয়তো অনেক আগেই সরে গিয়েছিলেন আড্ডা থেকে, আলোচনার টেবিল থেকে, সাহিত্যসমাজের চেনা আলোকবৃত্ত থেকে, আমাদের নিয়মিত স্মৃতি থেকে। আর আমরা ভেবেছি, তিনি আছেন। কোথাও আছেন। নিজের মতো আছেন। তার মতো মানুষ তো থাকেনই অদ্ভুত, দুর্বোধ্য, কিংবদন্তির মতো দূরে। কিন্তু এই ‘দূরে থাকা’র ভেতরে যে কতখানি একা হয়ে যাওয়া থাকে, তা আমরা ভাবিনি।

শামসুল কবীর কচিকে আমরা ইচক দুয়েন্দে নামে চিনেছি। এই নাম তিনিই নিয়েছিলেন, কচিকে উল্টে ক+চ+ই= ইচক করে। তাকে আমরা মহামতি, মহাত্মা বলেছি, কেউ বলেছি দুর্বোধ্য, রহস্যময়, অস্বাভাবিক। কিন্তু এসব নামের আড়ালে যে একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন শামসুল কবীর কচি, তাকে আমরা কতটা দেখেছি? তারও শরীর ছিল, ক্ষুধা ছিল, ক্লান্তি ছিল, অপেক্ষা ছিল, অভিমান ছিল। তারও হয়তো সামান্য আলাপের দরকার হতো। হয়তো চুপ করে পাশে বসে থাকার মতো একজন মানুষের দরকার হতো। অথচ আমরা তাকে মিথ বানিয়ে আরামে দূরে বসে থেকেছি। মিথের শরীর নেই, ক্ষুধা নেই, বিছানা নেই, ঘর নেই, একাকিত্ব নেই। কিন্তু ইচক দুয়েন্দের ছিল।

তার মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে বারবার রাজশাহীর সেই বাড়িটার কথা মনে পড়ছে। সূর্যকণা স্কুল গলির শেষ মাথায় বিশাল, প্রায়-পরিত্যক্ত এক বাড়ি। অন্ধকার করিডোর। বন্ধ দরজা। স্যাঁতসেঁতে দেয়াল। এমন এক নীরবতা, যেখানে মানুষের বসবাসের চেয়ে সময়ের ক্ষয় বেশি স্পষ্ট। বিকালের আলোও সেখানে ঢুকে পূর্ণ আলোয় উদ্ভাসিত থাকতে পারত না। জানালা পেরিয়ে ঘরে এসে আলোই যেন আবছায়া হয়ে যেত। মনে হতো, বাড়িটির ভেতরে প্রবেশ করলেই সবকিছু ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে আলো, শব্দ, উপস্থিতি, মানুষের স্বাভাবিকতা সব। সেই বাড়িতে একা থাকতেন ইচক দুয়েন্দে। এই বাড়িতে যেমন তিনি থাকতেন, হয়তো বাড়িটিও তার মধ্যে থাকত। তার ভেতরেও হয়তো ছিল অন্ধকার করিডোর, অর্ধেক খোলা দরজা, মৃত আলো, হঠাৎ সরীসৃপের মতো নড়ে ওঠা বাক্য, আর এমন সব ঘর যেখানে আমরা প্রবেশ করতে ভয় পেতাম।

তিনি বলেছিলেন, ঘরে প্রায়ই সাপ আসে। কথাটি বলেছিলেন অবিশ্বাস্য স্বাভাবিকতায়। যেন সাপ কোনো আতঙ্ক নয়, কোনো বিপর্যয় নয় বরং সহবাসী। যেন মানুষেরা না থাকলে নিঃসঙ্গতারও নিজস্ব প্রাণিকুল জন্মায় সাপ, পোকা, দেয়ালের নোনা ধরা গন্ধ, বাতাস, ছায়া, পুরনো কাগজ, অসমাপ্ত বাক্য।

তখন কথাটি শুনে বিস্মিত হয়েছিলাম। আজ বুঝি, সেটি ছিল তার জীবনের এক অমোঘ রূপক। সভ্যতার আলো থেকে সরে গেলে মানুষের ঘরে অন্ধকারের প্রাণীরা ফিরে আসে। সাপ তখন শুধু সাপ থাকে না। সে হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গতার প্রতীক। সে বলে দেয়, মানুষটি আর মানুষের সাধারণ জগৎ-ধারণার মধ্যে নেই; তিনি বাস করছেন অন্য এক অঞ্চলে যেখানে অর্ধেক বাস্তব, অর্ধেক ভাষা, অর্ধেক অরণ্য, অর্ধেক পরিত্যক্ত সময়।

আমি আর কথাশিল্পী কবীর রানা যেদিন তার কাছে গিয়েছিলাম, তিনি আমাদের কবিতা শুনিয়েছিলেন। কবিতা ঠিকই, কিন্তু সেটা আমাদের পরিচিত কবিতার মতো নয়। সেখানে সহজ আবেগ হয়তো ছিল, শ্রুতিমধুরতার পথ ছিল হয়তো কিন্তু পাঠকের প্রবেশের জন্য কোনো দরজা খোলা ছিল না। কারণ সে ভাষা ছিল অচেনা। ফলে আমরা কিছুই বুঝিনি। সত্যি বলতে, বুঝবার মতো প্রস্তুতি আমাদের ছিল না। কবিতা শেষ হওয়ার পর আমরা কেউ কথা বলতে পারিনি।

এই নীরবতাই হয়তো ইচক দুয়েন্দেকে বোঝার প্রথম পাঠ। তাকে সহজ ব্যাখ্যায় ধরা যায় না। তাকে সারাংশে নামানো যায় না। তাকে দুর্বোধ্য বলে সরিয়ে দিলে নিজের অক্ষমতাটাই শুধু প্রকাশ পায়। কিছু সাহিত্য মাথায় ঢোকে, কিছু সাহিত্য হৃদয়ে লাগে, আর কিছু সাহিত্য শরীরের গভীরে গিয়ে অস্বস্তি তৈরি করে। ইচক দুয়েন্দের লেখা সেই তৃতীয় ধরনের। তার অর্থ হয়তো প্রথমে মেলে না; কিন্তু অভিঘাত মেলে। মনে হয়, কোনো অচেনা প্রাণী আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। আমরা তার নাম জানি না, কিন্তু তার পায়ের শব্দ শুনেছি। আমরা তার ভাষা বুঝি না, কিন্তু তার উপস্থিতি এড়াতে পারি না।

আমরা যারা লিখি, আমরা বেশিরভাগই আপোসের মানুষ। আমাদের চাকরি আছে, সংসার আছে, সন্তান আছে, বাজার আছে, চিকিৎসা আছে, সামাজিক সম্পর্ক আছে, নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে। আমরা সাহিত্যকে ভালোবাসি, কিন্তু সাহিত্যকে আমাদের জীবন গ্রাস করতে দিই না। আমরা জীবন বাঁচিয়ে রেখে লিখি। অথচ ইচক দুয়েন্দে যেন লেখার কাছে জীবনটাই রেখে দিয়েছিলেন।

তার বইয়ের নাম লালঘর, টিয়াদুর। এই নামগুলো উচ্চারণ করলেই মনে হয় বাংলা সাহিত্যের পরিচিত মানচিত্রে কেউ লাল কালি দিয়ে অচেনা চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। লালঘর ঘর আছে, কিন্তু আশ্রয় নেই; রঙ আছে, কিন্তু উৎসব নেই; আছে রক্ত, গোপনতা, অন্তরীণতা, নিষিদ্ধ আলোর ঝিলিক। টিয়াদুর-এও তিনি জটিল রাজনীতির আপাত সরল বঙ্গানুবাদ করেন প্রতীকী ভাষায়।

আমরা তাকে কিংবদন্তি বানিয়েছি। কারণ কিংবদন্তি বানানো সহজ। দূর থেকে বলা যায় তিনি আলাদা, তিনি দুর্বোধ্য, তিনি অসাধারণ। কিন্তু একজন একা মানুষের পাশে বসা কঠিন। তার অন্ধকার ঘরে গিয়ে বসা কঠিন। তার ভাঙা, জটিল, অস্থির ভাষা শুনেও ধৈর্য ধরে থাকা কঠিন। তার প্রয়োজন বুঝতে চেষ্টা করা কঠিন। জীবিত শিল্পীর পাশে থাকা কঠিন। মৃত শিল্পীকে শ্রদ্ধা করা সহজ। এখানেই আমাদের অপরাধবোধ।

ইচক দুয়েন্দের মৃত্যু তাই কেবল আমাদের ব্যক্তিগত শোক নয়, এটি আমাদের সাহিত্যসমাজের আয়না। আমরা তাদের কথাই বলি, আমাদের প্রচলিত রুচির সঙ্গে যারা মিলে যায়। যারা প্রতিষ্ঠানের ভাষায় অনুবাদযোগ্য। যারা আলোচনায় সুবিধাজনক। যারা আমাদের আরাম নষ্ট করে না। আর যারা ভাষাকে বিপজ্জনক করে তোলে, যারা অর্থকে অনিশ্চিত করে, যারা পাঠকের অলসতা ভেঙে দেয়, যারা নিজের জীবনকেও সামাজিকভাবে অস্বস্তিকর করে ফেলে তাদের আমরা দূরে সরিয়ে রাখি। মৃত্যুর পরে বলি, তারা অনন্য ছিল। কিন্তু অনন্য মানুষের জীবন অনেক সময় খুব কষ্টের হয়। এই কথাটা আমরা ভুলে যাই।

ইচক দুয়েন্দে ছিলেন বাংলা ভাষার ভেতরের এক গোপন অসুখ। এই অসুখ আমাদের স্বাভাবিকতার মিথ ভেঙে দিয়েছিল, আমাদের জাগিয়ে রেখেছিল। রাজশাহীর সেই বাড়িটি আমাদের মনে করিয়ে দেবে, এখানে একজন মানুষ থাকতেন, যিনি প্রচল ভাষার ভেতরে অন্য এক পৃথিবী বানাতে চেয়েছিলেন। যিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমাদের ভাষায় নয়; নিজের তৈরি করা, অচেনা, অদ্ভুত ভাষায়। আমরা হয়তো তা বুঝিনি। কিন্তু আগামী পৃথিবীর মানুষ নিশ্চয়ই সেই ভাষা বুঝবে।

তার মৃত্যু শোকের, কিন্তু তার জীবন দাবি রেখে যায় বাংলা সাহিত্যকে আরও সাহসী করো। ভাষাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে দাও। অস্বস্তিকর লেখকদের পাশে দাঁড়াও। জীবিত শিল্পীকে মৃত্যুর আগেই পড়ো।

মৃত্যুর পর ফুল দেওয়া সহজ। জীবিত অবস্থায় অন্ধকার ঘরে গিয়ে বসা কঠিন।

ইচক দুয়েন্দের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি শ্রদ্ধা হলো তাকে ফিরিয়ে আনা পাঠে, আলোচনায়, পুনর্মুদ্রণে, স্মরণে, বিতর্কে। তাকে কিংবদন্তির নিরাপদ কুয়াশায় হারিয়ে ফেললে চলবে না। তার বই হাতে নিতে হবে। তার প্রতীকী ভাষার সামনে বসতে হবে। তার অস্বস্তিকে গ্রহণ করতে হবে। তাকে বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে যদি ব্যর্থও হই, সেই ব্যর্থতাকে সম্মান করতে হবে। কারণ বড় শিল্প সবসময় আমাদের জয়ী করে না, কখনও আমাদের বিনম্র করে।

শামসুল কবীর কচি, ইচক দুয়েন্দেকে আমরা হয়তো যথেষ্ট ভালোবাসতে পারিনি। যথেষ্ট পড়িনি। যথেষ্ট পাশে থাকিনি। তাকে কিংবদন্তি বলেছি, কিন্তু মানুষ হিসেবে ছুঁতে পারিনি। এই দেরিতে বলা স্বীকারোক্তি তার কাছে পৌঁছাবে কি না জানি না। তবু বলতে হয়, তিনি বাংলা ভাষার সেই দুর্লভ মানুষদের একজন, যারা ভাষার জন্য নিজের জীবনকে সহজ হতে দেননি।

ইচক দুয়েন্দে চলে গেছেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া অন্ধকার নিভে যায়নি। সে অন্ধকার এখন আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আর আমরা, এতদিন পরে, প্রথমবারের মতো তার চোখের দিকে তাকাতে শিখছি।

Thursday, May 21, 2026

উপনিবেশ চট্টগ্রাম নিয়ে দূরবর্তী দুই টেলি প্রতিক্রিয়া

‘উপনিবেশ চট্টগ্রাম’ নিয়ে পাঠকের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আজকাল কিছু লিখি না। কারণ গত পাঁচ বছরে পাঠকের কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে এত বেশি বার্তা পেয়েছি যে সেগুলো প্রকাশ করতে গেলে আস্ত একটা বই হয়ে যাবে। তবু সাম্প্রতিক দুটো অভিজ্ঞতার কথা না বলে পারছি না। বলার আগে একটু ভূমিকা নিচ্ছি। কারণ আমি এইসব প্রশংসা একা ভোগ করতে চাই না। আরো কয়েকজনকে ভাগীদার করতে চাই, যারা এই বইটা প্রকাশের সাথে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন। এটার সাথে যারা জড়িত ছিল তাদের সাথে আমার সম্পর্কটা এত আন্তরিক যে লেখক-প্রকাশক সম্পর্ক জাতীয় কিছু ছিল না তাতে। প্রকাশক মইনুল ভাই ছাড়া বাকী সবাই বয়সে আমার ছোট এবং সম্পর্কটা ছোট ভাই-বোনের মতো। সবাই এত আন্তরিক ভূমিকা রেখেছিল যে আমার মনেই হয়নি আমি জীবনের প্রথম বইটা প্রকাশ করতে যাচ্ছি। প্রথম বই প্রকাশের সময় নতুন লেখকদের যেসব হ্যাপা পোহাতে হয়, আমাকে তার বিন্দুমাত্রও হয়নি। বলা ভালো, মেইলে পাণ্ডুলিপি পাঠানো বাদে আমি কিছুই করিনি। ওরাই যা করার করেছে, যেখানে যতটা দরকার তার চেয়েও বেশি করেছে।

পেছনের কারিগরেরা সবাই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। তবু এবার আমি একটু স্বজনপ্রীতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই কয়েকজনের নাম প্রকাশ করছি। চারজনের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। কবি-অনুবাদক-সাহিত্যিক মাহমুদ আলম সৈকত, মুয়ীন পার্ভেজ, আসমা বীথি এবং দেবাশীষ মজুমদার। এরা প্রত্যেকে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং সাহিত্য সংস্কৃতির জগতে জাতীয়ভাবে পরিচিত-সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। আমি বরং তাদের প্রত্যেকের চেয়ে অনেক কম পরিচিত। তবু আমার প্রথম কাজ ‘উপনিবেশ চট্টগ্রাম’ নিয়ে এরা এমন আবেগ নিয়ে কাজ করেছে যেটা নজিরবিহীন। ফলে এই বইটা নিয়ে যত প্রশংসা আসে তার অর্ধেক আমি এদেরকে দিতে চাই। এদের কারণেই বইটা মানুষের কাছে পছন্দনীয়ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। সৈকত-বীথি দম্পতি ছিল সবার আগে। যেহেতু আমরা পারিবারিকভাবে পরিচিত ছিলাম, সে কারণে সৈকতই আমাকে কাজটা দেবার জন্য প্রথম অনুরোধ করে। পরবর্তীতে পুরো কাজটা সে-ই সমন্বয় করেছে। তাদের সাথে ছিলেন দেবাশীষ মজুমদার। মূল্যবান সব পরামর্শ তিনিই দিয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন কাজটা করেছেন মুয়ীন পার্ভেজ। পৃথিবীর যে কোনো প্রকাশনীর সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং শক্তি হলো সম্পাদনা। মুয়ীন এই কাজটা এত ভালভাবে করেছে যে আমি নিশ্চিত বইটা মুয়ীনের কাজের কারণেই পাঠক বইটা পছন্দ করেছে। তো… এইসব কৃতিত্বের কোনো প্রতিদান হয় না। কৃতজ্ঞতাতেই সীমাবদ্ধ থাকলাম।

ভূমিকা শেষ। এবার আসল ঘটনায় যাই। যে দুটো অভিজ্ঞতা লিখতে বসেছি। কোনো নাম না বলে শুধু গল্প দুটো বলি।

১.
এক সকালে আমার মোবাইলে একটা মেসেজ আসলো। পাঠিয়েছেন আমার শুভাকাঙ্ক্ষি দেশের প্রথম সারির একজন সাহিত্যিক। তিনি আমাকে মেইল চেক করতে বললেন। তাঁর এক সাহিত্যিক বন্ধু কানাডা থেকে আমাকে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন দুদিন আগে। কিন্তু কোনো জবাব পাননি। তাই তিনি আমার ফোন নাম্বার চেয়ে নিয়েছেন। আমি যেন ফোনটা ধরি।
 
অবাক হলাম খুব। মেইলের জবাব দিতে আমার কখনো ১২ ঘন্টাও দেরি হয় না। আমার সব কাজকর্ম মেইলে। তবু কিছু একটা সন্দেহ হওয়ায়, আবার মেইল খুলে স্প্যামবক্সে গেলাম। ঠিক যা ভেবেছিলাম। ওখানে পড়ে আছে মেইলটা। তখুনি সেই ভদ্রলোকের মেইলের জবাব দিলাম। মেইলের জবাব দিতে না দিতেই হোয়াটসঅ্যাপে একটা কল আসলো। সেই ভদ্রলোক ফোন করেছেন কানাডা থেকে। নিজের পরিচয় দিলেন। তারপর যে কারণে ফোন করেছেন সেটা বললেন। মেইলেও সেটা লিখেছিলেন। শুনে আমি প্রায় বাকহারা।

ব্যাপার হলো, গত বছর অক্টোবর মাসে তিনি ইউটিউবে আমার একটা সাক্ষাৎকার দেখেছেন। ডেইলি স্টারে দেয়া ভূমিকম্প বিষয়ক একটা ভিডিও। ওটার সূত্রে তিনি আমার একটা বইয়েরও সন্ধান পান। বইটার নাম উপনিবেশ চট্টগ্রাম। কয়েক মাস পর তিনি এক আত্মীয়ের মাধ্যমে দেশ থেকে বইটা সংগ্রহ করেছেন। বইটা হাতে পেয়ে পড়ে ফেললেন। পড়ার পর তাঁর এত ভালো লেগেছে তিনি আমার সাথে যোগাযোগ করার উপায় খুঁজতে থাকেন। অবশেষে তিনি তাঁর চট্টগ্রাম নিবাসী সাহিত্যিক বন্ধুর কাছ থেকে আমার ইমেইল নিয়ে চিঠি লিখেছেন। চিঠির জবাব না পেয়ে ফোন করেছেন। ইতিহাস নিয়ে তাঁর প্রচুর পড়াশোনা। ভারতবর্ষের এবং পৃথিবীর বিখ্যাত অনেক বইপত্র পড়েছেন। সেগুলো নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আলাপ হলো। সেই আলাপের মধ্যে তিনি আমার সদ্যপঠিত বইটাকে উপমহাদেশের এমনসব বিখ্যাত বইয়ের সাথে তুলনা করেছেন, সেগুলোর নাম প্রকাশ করারও সাহস করি না। আপ্লুত হয়ে শুনে গেলাম শুধু। আর শুকনো ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করলাম। পরদিন দেখলাম, কুরিয়ারে একটা প্যাকেট এসেছে। তিনি আমার জন্য তাঁর সম্পাদিত একটা আন্তর্জাতিক পত্রিকা পাঠিয়েছেন ঢাকার কাউকে বলে। তিনি আমাকে অনুরোধ করেছিলেন সেই পত্রিকায় লিখতে। লেখক তালিকায় যাদের নাম দেখলাম, তাদের পাশে বসার যোগ্যতাও আমার নেই।

তার কিছুদিন পর দ্বিতীয় আরেকটি ঘটনা।

২.
ইউরোপের একটা দেশ থেকে অচেনা নাম্বারে আমার হোয়াটসাপে একটা ফোন এলো। পরপর দুবার এবং দুটোই ভিডিওকল। আমি এমনিতেই অচেনা ফোন রিসিভ করি না, তার ওপর ভিডিও কল ধরার প্রশ্নই ওঠে না। ফোন না ধরার কারণে অচেনা লোকটা একটা টেক্সট মেসেজ দিয়ে অনুরোধ করলেন আমি যেন সময় পেলে তাঁকে একটা কলব্যাক করি। ওটা দেখে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। কারণ আমি কিছুদিন ধরে হ্যাকারের যন্ত্রণায় আছি, এই লোকটা নিশ্চয়ই সেই দলের কেউ। আমার অধিকাংশ হ্যাকারের ঠিকানা থাকে ইউরোপে। তাই প্রথম কাজ হিসেবে আমি বিনা দ্বিধায় নাম্বারটা ব্লক করে দিলাম।
 
তারপর মেসেজটা মুছতে গেলাম। কিন্তু মোছার আগে কৌতূহলী হয়ে প্রোফাইল ছবিটা দেখলাম। একজন বয়স্ক মানুষ। রবিশঙ্করের মতো চেহারা। সেতার বাজাচ্ছেন মনে হলো। ছবিটা আসল কিংবা নকল জানি না। যুগটাই তো ভেজালের। তবু কি মনে করে মেসেজ মোছার কাজটা ঘন্টা দুয়েকের জন্য মূলতবী রাখলাম। কারণ ভদ্রলোকের নামের শেষে যে টাইটেল সেটা আমাকে একটু সংশয়ে ফেলেছে। আমি সেই নাম্বার আর নামটা কপি করে আমার বিশ্বস্ত কয়েকটা সোর্সে খবর লাগালাম। কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে খবর পেলাম, উনি নকল লোক নন। সত্যি সত্যি আছেন।
এবার আমি তাঁকে আনব্লক করে মেসেজ দিলাম, ‘আপনাকে আমি চিনতে পারছি না। কিন্তু কী বিষয়ে কথা বলবেন জানালে পরদিন সময় করে ফোন করবো’। তিনি সাথে সাথে জবাব দিলেন, আমার একটা বই নিয়ে কথা বলবেন। আমি পরদিন একটা নির্দিষ্ট সময় দিলাম।
 
পরদিন ঠিক সেই সময়ে তিনি ফোন করলেন। ফোন করেই এমনভাবে কথা বলতে শুরু করলেন, যেন আমি তার বহুদিনের চেনা। তাঁর ফোন করার কারণও ‘উপনিবেশ চট্টগ্রাম’। বললেন বইটা তিনি কারো মাধ্যমে দেশ থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন। দুদিন আগে পড়তে শুরু করেছেন। মাত্র ৫৬ পৃষ্ঠা পড়েছেন, তাতেই নাকি এত আপ্লুত হয়েছেন যে আমার সাথে কথা বলার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন।
 
এই ভদ্রলোকও নানা প্রশংসায় ভাসিয়ে দিলেন। আমি সাধারণত কারো প্রশংসার জবাব দিতে পারি না। চুপ করে থাকি। অভদ্রতা হয়ে যায়, তবুও। কি বলবো ভেবে পাই না। শুধু আস্তে করে জানতে চাইলাম, এই বইয়ের খবর তাকে কে দিয়েছেন। তিনি অন্য মহাদেশে থাকা তাঁর এক আত্মীয়ের কথা বললেন। যিনি কিছুদিন আগে বইটা পড়েছেন। বুঝলাম, সেই কানাডা প্রবাসী সাহিত্যিক। আমি এই বইটা নিয়ে অনেক প্রশংসা শুনেছি। কিন্তু তাঁর উচ্ছ্বাস আমার অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। দেশে তাঁর প্রতিষ্ঠিত একটা সংগঠন আছে, তিনি ওদের মাধ্যমে বইটা প্রচার করার জন্য যা করা দরকার সব করবেন।(তিনি অতি উচ্ছ্বাসে আমার জন্য যেসব পুরস্কার পাবার কথা বললেন যেখানে নোবেল ছাড়া বাকী সব পুরস্কার আছে)।
 
যাই হোক, আমি সংগঠন এবং প্রচার এই দুটো বিষয় থেকে একশো হাত দূরে থাকি। তাই বিনীতভাবে অপারগতা জানালাম। তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে আলাপ শেষ করলাম। পরে তাঁর নামটা গুগলে সার্চ দিয়ে আরেকটু বিস্তারিত জানলাম। তিনিও চট্টগ্রামের বিখ্যাত এক সাহিত্যিক পরিবারের সন্তান। তাদের বাড়িতে সত্তর দশকে জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যান্ডদল। তিনি সেই দলের প্রতিষ্ঠাতা চার সদস্যের একজন। মজার ব্যাপার হলো সেই বাড়িটার মাত্র দুশো গজ দূরেই আমার বাসস্থান। ফোন রেখে অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম, ৭৫+ একজন মানুষ এখনো বইপত্র নিয়ে ২৫ বছর বয়সী তরুণের মতো উচ্ছ্বাস দেখান কিভাবে?
অভিজ্ঞতা দুটো লিখে না রাখলে অকৃতজ্ঞতা হয়ে যায় বলে একটু আত্মপ্রচার করলাম।
..............
ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে অচেনা পাঠকের এই উচ্ছ্বাসগুলোর মতো বড় উপহার আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু তাঁদের দুজনের পরিচয় উহ্য রেখে বইয়ের পেছনের সবটা কৃতিত্ব দিলাম আমার সেই সুহৃদদের। যাদের কারণে আমি 'লেখক' নামটা সংগ্রহ করেছি।