Sunday, September 20, 2026

এলিনোর র‍্যাথবোনের প্রতি রবীন্দ্রনাথ

রাজনীতি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের তেমন বেশি লেখালেখি নেই। তিনি সযত্নে এড়িয়ে চলতেন বলা চলে। কিন্তু জীবনের কিছু কিছু অধ্যায়ে তিনি গর্জে উঠেছিলেন। তাঁর শেষ গর্জন ছিল ১৯৪১ সালের মে মাসে। অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তখনও তিনি তাঁর বক্তব্য প্রকাশে দ্বিধা করেননি।

১৯৪১ সালের মে মাসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য এবং পরিচিত সমাজসংস্কারক মিস এলিনোর র‍্যাথবোন ভারতীয় নেতৃবৃন্দ ও জনগণের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতীয়রা কেন ব্রিটিশ সরকারকে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা দিচ্ছে না—এই নিয়ে তিনি ভারতীয়দের কঠোর সমালোচনা করেন।

র‍্যাথবোন তাঁর চিঠিতে সাম্রাজ্যবাদী সুলভ মানসিকতা থেকে দাবি করেন যে, ব্রিটিশ শাসন ভারতকে শান্তি, নিরাপত্তা, আধুনিক শিক্ষা ও আইনসম্মত সমাজ উপহার দিয়েছে। সুতরাং, এই সংকটকালে ব্রিটিশদের সহায়তা না করা ভারতীয়দের 'অকৃতজ্ঞতা' এবং অদূরদর্শিতার নামান্তর। একজন তথাকথিত প্রগতিশীল ব্রিটিশ নারীর মুখে ব্রিটিশদের এই 'পাদপ্রদীপপ্রদানকারী প্রভূ' ভাবমূর্তি এবং ভারতীয়দের করুণার পাত্র মনে করার ঔদ্ধত্য রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে মর্মাহত ও ক্রুদ্ধ করে। চিকিৎসকদের কঠোর বারণ এবং শারীরিক প্রচণ্ড যন্ত্রণা সত্ত্বেও শয্যাশায়ী রবীন্দ্রনাথ এই অপপ্রচারের জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মুখে বলে প্রতিবাদলিপিটি লিখেছিলেন। সেটা প্রকাশিত হয়েছিল পত্রপত্রিকায়:

"I have read with surprise and pain the open letter which Miss Eleanor Rathbone has addressed to Indians. She is shocked at our 'ingratitude' and has listed the achievements of British rule in India...

What have the British done for India? They have maintained law and order, but at what cost? Look at the condition of our people—steeped in ignorance, poverty and disease, completely defenseless... In Soviet Russia, I saw what a government could do in twenty years to educate and uplift its people. But in India, after two centuries of British rule, elementary education is still denied to the masses.

To demand gratitude from a people who have been kept in subjection and exploited for generations is a cruel mockery. The communal division that plagues our country today is itself the direct outcome of the policy of 'divide and rule'.

It is not possible for any self-respecting Indian to accept this attitude of patronising superiority. The British imperialism has left us a heritage of poverty, illiteracy, and helplessness..."

["মিস র‍্যাথবোন ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে যে খোলা চিঠি লিখেছেন, তা পড়ে আমি গভীরভাবে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছি। তিনি ভারতীয়দের তথাকথিত 'অকৃতজ্ঞতা' নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং আমাদের মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে ব্রিটিশ শাসন ভারতবর্ষকে কতটা রক্ষা করেছে, কীভাবে এখানে শান্তি ও সভ্যতা বজায় রেখেছে। কিন্তু তিনি অত্যন্ত সুচতুরভাবে এড়িয়ে গেছেন যে, এই দুই শতকের ব্রিটিশ শাসন ভারতবর্ষকে আজ কোন চরম সর্বনাশের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

যিনি ব্রিটিশ শাসনের এই 'দান'-এর কথা বড় গলায় প্রচার করছেন, তিনি কি একবারও ভেবে দেখেছেন যে, আজ ভারত অশিক্ষা, চরম দারিদ্র্য, অনাহার এবং একের পর এক মহামারীর এক প্রকাণ্ড আঁধার হয়ে দাঁড়িয়েছে? এই করুণ পরিস্থিতির দায় কার? আমি নিজে রাশিয়া গিয়ে দেখেছি, মাত্র ২০ বছরের মধ্যে তারা কীভাবে কোটি কোটি নিরক্ষর মানুষকে শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করে তুলেছে। অথচ প্রায় দুই শতকের ব্রিটিশ রাজত্বে আমাদের দেশের জনগণের সামান্যতম প্রাথমিক শিক্ষার সুবিধাও দেওয়া হয়নি।

আজ যুদ্ধের দোহাই দিয়ে আমাদের কাছ থেকে আনুগত্য এবং সহায়তার যে দাবি তোলা হচ্ছে, তার নৈতিক ভিত্তি কোথায়? যে জাতিকে নিজের দেশেই পরাধীন ও অধিকারবঞ্চিত করে রাখা হয়েছে, যাদের জাতীয় সম্পদ অন্য একটি দেশকে পুষ্ট করতে শোষিত হচ্ছে—তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা দাবি করা এক পরম নির্মম কৌতুক বৈ আর কিছু নয়। ভারতে আজ যে সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে, তা-ও ব্রিটিশদের সুদীর্ঘ 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতিরই প্রত্যক্ষ ফল।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের এই অহংকার ও অনুগ্রহ প্রদর্শনের ভঙ্গি কোনো স্বাভিমানী মানুষ মেনে নিতে পারে না। তাঁরা আমাদের 'সভ্য' করার দাবি করেন, কিন্তু আমাদের জন্য রেখে যাচ্ছেন কেবল এক নিঃস্ব, সহায়সম্বলহীন ও ক্ষয়িষ্ণু ভারতবর্ষ। সাম্রাজ্যবাদী ঔদ্ধত্য দিয়ে সভ্যতার এই ব্যর্থতা ও সত্যকে ঢাকা দেওয়া যাবে না।"]

তাঁর সেই প্রতিবাদের কথা স্মরণ করেছিল দৈনিক যুগান্তর ৮ আগষ্ট ১৯৪১ তারিখে। তাঁর প্রয়ানের সংবাদের সাথে প্রকাশিত হয়েছিল প্রতিবাদের ভাষাও।



পুরো বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল লন্ডনের পত্রিকায়  The Tribune, August 15, 1941 সংখ্যায়:

I have been deeply pained at Miss Rathbone’s Open Letter to Indians. I do not know who Miss Rathbone is, but I take it that she represents the mentality of the average “well-intentioned” Britisher. Her letter is mainly addressed to Jawaharlal Nehru and I have no doubt that if that noble fighter of freedom’s battle had not been gagged behind prison-bars by Miss Rathbone’s countrymen, he would have made a fitting and spirited reply to her gratuitous sermon. His enforced silence makes it necessary for me to voice a protest even from my sick-bed.

* * *

The lady has ill-served the cause of her people by addressing so indiscreet, indeed impertinent, a challenge to our conscience. She is scandalised at our ingratitude – that having “drunk deeply at the wells of English thought,” we should still have some thought left for our poor country’s interests. English thought, insofar as it is representative of the best traditions of Western enlightenment, has indeed taught us much, but let me add that those of our countrymen who have profited by it have done so despite the official British attempts to ill-educate us.

We might have achieved introduction to Western learning through any other European language. Have all the other peoples in the world waited for the British to bring them enlightenment? It is sheer insolent self-complacence on the part of our so-called English friends to assume that had they not “taught” us, we would still have remained in the Dark Ages. Through the official British channels of education in India have flowed to our children in schools not the best of English thought but its refuse, which has only deprived them of a wholesome repast at the table of their own culture.

* * *

Assuming, however, that the English language is the only channel left to us for “enlightenment,” all that “drinking deeply at its wells” has come to is that in 1931, even after a couple of centuries of British administration, only about one per cent of the population was found to be literate in English – while in the USSR in 1932, after only fifteen years of Soviet administration, 98 per cent of the children were educated. (These figures are taken from The Statesman’s Year-Book, an English publication, not likely to err on the Russian side).

But even more necessary than the so-called culture are the bare elementary needs of existence, on which alone can any superstructure of enlightenment rest. And what have the British, who have held tight the purse-strings of our nation for more than two centuries and exploited its resources, done for our poor people ?

I look round and see famished bodies crying for bread. I have seen women in villages dig up mud for a few drops of drinking water, for wells are even more scarce in Indian villages than schools. I know that the population of England itself is today in danger of starvation and I sympathize with them, but when I see how the whole might of the British Navy is engaged in convoying food vessels to the English shores and when I recollect that I have seen our people perish of hunger and not even a cart-load of rice brought to their door from the neighboring district, I cannot help contrasting the British at home with the British in India.

* * *

Shall we then be grateful to the British, if not for keeping us fed, at least for preserving law and order? I look around and see riots raging all over the country. When scores of Indian lives are lost, our property looted, our women dishonoured, the mighty British arms stir in no action, only the British voice is raised from overseas to chide us for our unfitness to put our house in order.

Examples are not wanting in history when even fully armed warriors have shrunk before superior might and contingencies have arisen in the present war when even the bravest among the British, French and Greek soldiers have had to evacuate the battlefield in Europe because they were overwhelmed by superior armaments – but when our poor, unarmed and helpless peasants, encumbered with crying babes, flee from homes, unable to protect them from armed goondas, the British officials perhaps smile in contempt at our cowardice. Every British civilian in England is armed today for protecting his hearth and home against the enemy, but in India even lathi- training is forbidden by decree.

Our people have been deliberately disarmed and emasculated in order to keep them perpetually cowed and at the mercy of their armed masters. The British hate the Nazis for merely challenging their world-mastery and Miss Rathbone expects us to kiss the hand of her people in servility for having riveted chains on ours. A government must be judged not by the pretensions of its spokesmen but by its actual and effective contribution to the well being of the people.

* * *

It is not so much because the British are foreigners that they are unwelcome to us and have found no place in our hearts as because, while pretending to be trustees for our welfare, they have betrayed the great trust and have sacrificed the happiness of millions in India to bloat the pockets of a few capitalists at home. I should have thought that the decent Britisher would at least keep silent at these wrongs and be grateful to us for our inaction, but that he should add insult to injury, and pour salt over our wounds, passes all bounds of decency.

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ কবিতাটি মৃত্যুশয্যায় লেখা। নিজের হাতে লেখার মতো অবস্থা ছিল না। তিনি মুখে মুখে বলেছেন, তার পাশে বসা সহকারী রানী চন্দ সেটা নোট করেছেন। ১৯৪১ সালের ৩০ জুলাই  সকাল সাড়ে নয়টার দিকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে কবিতাটি রচিত হয়। রবীন্দ্রনাথ তখন মারাত্মক অসুস্থ এবং ওই দিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর একটি বড় অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ও দুর্বলতার কারণে কবি নিজে হাতে লিখতে পারছিলেন না। তিনি শয্যাশায়ী অবস্থায় মুখে মুখে কবিতার চরণগুলো বলতে থাকেন এবং তাঁর পাশে বসে থাকা রানী চন্দ তা কাগজে লিখে নেন। কবিতাটি বলা শেষ হলে রানী চন্দ তা কবিকে পড়ে শোনান এবং কবি শুনে সংশোধন ও অনুমোদন দেন। এর মাত্র দুই ঘণ্টা পর কবির অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর তিনি আর সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি এবং সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। এর ঠিক সাত দিন পর ৭ আগস্ট (২২ শ্রাবণ) তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কবিতাটির অন্তর্নিহিত দর্শনটা কি বোঝা যায়? এই ছলনাময়ী কে?

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে,
হে ছলনাময়ী।
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে
সরল জীবনে।
এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বকে চিহ্নিত করেছ,
তার তরে রাখো নি গোপন রাত্রি।
তোমার জ্যোতিষ্ক
যে পথ দেখায়
সে যে তার অন্তরের পথ,
সে যে সহজ সরল,
অনায়াসে তারে সত্য করে
কুটিলতার অগোচরে।
বাহিরে সে কুটিল বটে,
অন্তরে সে সরল—
এই নিয়ে তার গৌরব।
লোকে তারে বলে প্রবঞ্চিত।
সত্যেরে সে পায়
আপন আলোতে ধৌত অন্তরে অন্তরে।
কিছুতে পারে না তারে প্রবঞ্চিতে,
শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে
আপনার ভাণ্ডারে।
অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
সে পায় তোমার হাতে
শান্তির অক্ষয় অধিকার।

Friday, September 18, 2026

টাইগারপাস- নিরপেক্ষ মতের পাঠক

'টাইগারপাস' নিয়ে আমার একটা সংশয় ছিল। জীবনের প্রথম উপন্যাস। কথা ছিল একটিমাত্র উপন্যাসই লিখবো। কিন্তু পরে আরো একটি হয়ে গেছে। সেকথা থাক। এই প্রথম উপন্যাসটা লিখতে আমার দীর্ঘ সময় লেগে গিয়েছে। শখ করে লিখেছি মনের মাধুরী মিশিয়ে। অনেকটা আড্ডার ছলে। গল্পের মধ্যে ইতিহাসের পুর দিয়ে। কোথায় কিভাবে শেষ হবে কিছুই জানা ছিল না। চরিত্রগুলোকে মুক্ত করে দিয়েছি যেদিকে খুশি চলে যাক। প্রায় এক যুগ পর যখন কাজটা শেষ হলো তখন আমি উপন্যাসটার প্রতি গভীর অনুরাগ অনুভব করলাম। অনেকটা প্রথম প্রেমের অনুভূতি। এমন একটা ভালোলাগা আগে কখনো কাজ করেনি। আমি সাহিত্যিক নই। ইতিহাসের মতো রসকসহীন বিষয় নিয়ে কাজ করি। উপন্যাস লিখতে যতটা মুন্সিয়ানা দরকার, আমার সেসব কিছু নেই। এই উপন্যাস কারো ভালো লাগবে কিনা সন্দেহ আছে। পাঠকের কাছ থেকে কিরকম সাড়া মিলবে বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু ঈদসংখ্যায় প্রকাশের পর অনেক পাঠক জানালো ভালো লেগেছে। সম্পাদকও একই কথা বললেন। তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম গ্রন্থাকারে প্রকাশ করবো। আগ্রহী প্রকাশকও আছে। প্রকাশের পর প্রথম দুমাসে অর্ধেক বই বিক্রি হয়ে গেল শুনে দুশ্চিন্তার ভার নেমে গেল। আশা করা যায় সবগুলো শেষ হয়ে যাবে আগামী এক বছরের মধ্যে। এখন গত ছমাসের মূল্যায়ন দেখি। দেখা যাচ্ছে যারা বোদ্ধা পাঠক, খুব উঁচু মানের বইপত্র পড়েন, তাদের কাছে বইটা তেমন আশা জাগায়নি। হালকা চালে পড়ে শেষ করেছেন। তাদের ক্ষেত্রে এমন লাগাটাই স্বাভাবিক। তাই অবাক হইনি। কিন্তু আরেকটা বড় অংশ যাদেরকে সাধারণ পাঠক বলা যায়, তারা বইটা নিয়ে খুব উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। এত বেশি যে অনেকে আমাকে ফোন করে তাদের ভালো লাগার কথা জানিয়েছেন। ইনবক্সের মেসেজে ভরিয়ে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে দেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিকও আছেন। আমি খুব অবাক হয়ে গেছি। এতটা আমার প্রত্যাশা ছিল না কোনোদিন। আমার এক পরিচিত সাহিত্যিকের কাছে বইয়ের রিভিউগুলো দিয়ে মতামত জানতে চেয়েছিলাম। তিনি বলেছেন, তিনি খুব মনোযোগ সহকারে বইটা পড়েছেন। তার কাছে বইটা খুব ভালো লেগেছে। তার ধারণা বইটা যারা তাড়াহুড়া না করে আস্তে ধীরে পড়বেন তাদের সবাইকে স্পর্শ করবে। এটা আবেগ সর্বস্ব বই। যে গল্পটা লেখা হয়েছে সেটার ভেতরে গভীর একটা আবেগজনিত ব্যাপার আছে। যাদের ভেতরে সেই আবেগের উপস্থিতি আছে, তাদের সবাই বইটার আবেগে একাত্মতা অনুভব করবেন। যারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে তারা সেই দলের মানুষ। আবার যারা ক্রিটিক্যাল উপন্যাস পড়ে অভ্যস্ত, যারা সাহিত্যের মধ্যে নতুন কিছু আশা করেন তাদের কাছে এই বই তেমন ভালো লাগবে না। কারণ এই সাদামাটা গল্প তাদের খোরাক নয়। তবে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন বইটা উচ্চমানের কোনো সাহিত্যকর্ম হয়নি ঠিক, তবু এটা তাকে খুব গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। চরিত্রগুলোর পরিণতি তাঁকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে। তিনি আবেগে ভেসেছেন। যারা আনন্দ বেদনার স্পর্শ নেবার জন্য সাহিত্যপাঠ করেন, তিন তাদের জন্য বইটা সুপারিশ করবেন। সাথে তিনি আরো যোগ করেছেন হয়তো তিনি চট্টগ্রামে বেড়ে উঠেছেন বলে এই পক্ষপাতিত্ব।

টাইগারপাস প্রকাশের এক বছরও পূর্ণ হয়নি এখনো। আমাকে আরো পাঠকের মতামত পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আরো দূরের কোনো পাঠক। আমাকে যিনি চেনেন না। কিছু না জেনেই বইটা কিনেছেন। তার মতামত নিশ্চয়ই আরো পক্ষপাতহীন হবে।

Tuesday, September 8, 2026

আমার প্রথম বই- জর্জ আর. সিমসের স্মৃতি থেকে

 "আমার প্রথম বইটি যখন প্রকাশিত হয়, তখনও আমি শহরের সেই চাকুরিজীবন ছাড়িনি। তখন নিয়ম করে সকাল নয়টায় অফিসে গিয়ে সন্ধ্যা ছয়টায় বের হতাম। তবে মাঝখানে এক ঘণ্টার একটা দুপুরের খাবারের বিরতি থাকত। সেই এক ঘণ্টার বিরতিতেই ছোটগল্প কিংবা মাথায় আসা মজার সব ছোটখাটো লেখা লিখে ফেলতাম; আর সেগুলো বড় খামে ভরে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে পাঠাতাম। ওভাবে প্রায় বিশটির মতো লেখা পাঠিয়েছিলাম, তার মধ্যে একটাও গ্রহণ করা হয়নি, তবে বেশ কয়েকটি সসম্মানে ফেরত এসেছিল!

অফিসের সেই এক ঘণ্টার দুপুরের খাবারের বিরতিতেই আমি আমার প্রথম বইটি লিখেছিলাম। এইমাত্র সেটা খুঁজে পেলাম.......এই যে তার প্রচ্ছদ! আপনারা লক্ষ করবেন যে এতে আমার একটা প্রতিকৃতিও আছে। ছবিতে আমাকে বেশ অসুস্থ, কৃশ আর কঙ্কালসার দেখাচ্ছে। সাহিত্যচর্চায় নিজেকে সঁপে দেওয়ার চক্করে দুপুরের খাবার না খাওয়ার ফলই হয়তো এটি!

আপনি যদি সেই বইটার ভেতরের পাতায় একবার নজর বোলাতে পারতেন, আর যে বাজে কাগজে বইটি ছাপা হয়েছিল তা স্বচক্ষে দেখতে পেতেন....তবে আমার হাতে ওটা তুলে দিয়ে যখন বলা হয়েছিল, ‘এই নিন আপনার প্রথম সন্তান,’ তখন আমার বুকে যে কী তীব্র আঘাত লেগেছিল তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারতেন!

আমার ভেতরের সমস্ত অহংকার (আর লোকমুখে শুনি, আমার নাকি তা বেশ ভালোই আছে!) এক লহমায় ধুলোয় মিশে গেল, যখন প্রচ্ছদে আঁকা সেই দুমড়েমুচড়ে যাওয়া কঙ্কালসার লোকটার দিকে তাকালাম.......যে লোকটার চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, তাঁর এখনই কোনো সৎকার সমিতির সদস্যপদ নিয়ে নেওয়া উচিত!

তা-ও হয়তো গায়ে মাখতাম না, কিন্তু বাঁধ সাধল বই কেনা পাঠকেরা......তারা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে চিঠি লিখে অভিযোগ জানাতে শুরু করল! এক ভদ্রলোক তো পোস্টকার্ড পাঠিয়ে লিখলেন, বইটি কিনে বাড়ি ফেরার পথেই নাকি তা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে গেছে! আরেকজন নিশ্চিত করলেন যে, বইটির পাতা থেকে তিনি নাকি এত পরিমাণ খড় কুড়িয়ে পেয়েছেন যা দিয়ে অনায়াসে তাঁর ঘোড়ার জন্য একটা তোশক বানিয়ে ফেলা যায়! আর তৃতীয় একজন তো ডাক-মাশুল না দিয়েই বইটি আমাকে ফেরত পাঠালেন এবং বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করলেন....আমি যেন ওটা দয়া করে আমার ডাস্টবিনে ফেলে দিই; কারণ তাঁর বাড়ির পেছনের বাগানে যে ডাস্টবিনটা আছে, তা নিয়ে তাঁর রাঁধুনির নাকি বেশ অহংকার রয়েছে!"

[জর্জ আর. সিমস]


Thursday, August 27, 2026

কেন চট্টগ্রাম বঙ্গোপসাগরের প্রধান বন্দর হতে পারেনি?

২৪ আগষ্ট ২০২৬ তারিখে ডেইলি স্টারে রিলা মুখার্জির লেখা Why Chittagong never became a maritime city? আলোচনাটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। খুব চমৎকার কিছু বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। কিন্তু সেই বিশ্লেষণের তাত্ত্বিক আলাপের ভেতরে গুরুতর কিছু বাস্তবতা আসেনি। তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয়টা বলেননি। অজ্ঞতা কিংবা এড়িয়ে যাওয়া, ঠিক জানি না। এটা সবাই জানে কলকাতার জন্ম হবার বহুকাল আগে চট্টগ্রাম বন্দর হিসেবে খ্যাত ছিল। কিন্তু তবু ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রাম কেন প্রধান বন্দর হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সেই প্রশ্নের উত্তর কলোনিয়াল শাসকদের কাছে আছে। উপনিবেশ যুগে শুধুমাত্র সেইসব অঞ্চল উন্নতি করেছে যেগুলো শাসকদের সুবিধাজনক ছিল।

চট্টগ্রামের বড় শহর বা পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক শহর হতে না পারার আসল কারণ ভূ-রাজনৈতিক। শত শত বছর ধরে চট্টগ্রাম ছিল এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক সীমান্ত। আরাকান, মুঘল, ত্রিপুরা রাজ্য আর পর্তুগিজ জলদস্যু, সবার নজর ছিল এই ভূখণ্ডের ওপর। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সংঘাতের কারণে কেউই দীর্ঘদিন একে একচ্ছত্র দখলে রাখতে পারেনি। এই দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অস্থিতিশীলতার কারণেই সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থায়ী পরিবেশ বা দেশীয় অভিজাত শ্রেণি গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়নি।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রবন্ধটিতে একটি ঐতিহাসিক সত্য এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে (বা লেখকের নজর এড়িয়ে গেছে)। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কিন্তু শুরুতেই কলকাতার কথা ভাবেনি; তাদের প্রথম পছন্দ ছিল চট্টগ্রাম। ১৬৮৬ সালে জব চার্নক ও ব্রিটিশ নৌবহর চট্টগ্রাম দখলের জন্য হামলা চালায়। এই বিষয়ে সকল তথ্য প্রমাণ এখনো নানান আর্কাইভে আছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করেই বাংলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক ও সামরিক ভিত্তি গড়ে তোলা। কিন্তু সেই অভিযানে ব্রিটিশরা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। এমনকি ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা লাটে ওঠার দশা হয়েছিল।
এই ব্যর্থতার পরেই বাধ্য হয়ে তারা অখ্যাত এবং নিরাপদ স্থান হিসেবে কলকাতার দিকে নজর দেয়। অর্থাৎ, ১৬৮৬ সালে চট্টগ্রামে ব্রিটিশদের হারই ছিল কলকাতার জন্ম ও উত্থানের মূল কারণ। ‘ফোর্ট উইলিয়াম’ দুর্গটি কলকাতার বদলে চট্টগ্রামে গড়ে উঠত, তবে আজকের ভৌগলিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলতো।
তাঁর সাথে আমার পরিচয় নেই। যদি আলাপ হতো আমি তাঁকে বলতাম Chittagong’s failure to evolve into a full-fledged maritime city was, above all, a result of persistent geopolitical turmoil. For centuries, the region was a highly contested frontier claimed by the Arakanese, the Mughals, the Tripura Kingdom, and Portuguese buccaneers. Because control over the territory changed hands so frequently, no single power could establish long-term political stability. It was this constant conflict, not a inherent lack of commercial appetite, that prevented a permanent merchant elite from forming and investing locally.
More importantly, the essay omits a critical historical turning point that reshaped the region's destiny. The British East India Company did not originally set its sights on Calcutta; Chittagong was their first choice. In 1686, Job Charnock and the British naval forces launched an aggressive military campaign to capture Chittagong, intending to turn it into the main commercial and strategic stronghold for the British Empire in Bengal. However, due to strong Mughal resistance, the British failed catastrophically. It was precisely this failure in Chittagong that forced the Company to fall back to the Hooghly River and establish a base at Calcutta in 1690. In short, Calcutta’s birth and rise were the direct consequence of Britain's military defeat at Chittagong.
Had history taken a different turn in 1686, and had Fort William been erected in Chittagong instead of Calcutta, the maritime history of Bengal and Chittagong’s future would have been entirely different. Chittagong possessed superior natural advantages: a deep-water natural harbor with direct access to the Bay of Bengal, features that the silt-prone, narrow Hooghly River near Calcutta could never match. Calcutta grew into a world-class maritime city largely because it received colonial patronage and imperial defense infrastructure, leaving Chittagong’s vast potential untapped. Ultimately, Chittagong’s destiny cannot be adequately explained through urban planning theories or missing merchant networks. It did not fail to become a maritime city due to structural economic flaws, but because of centuries of geopolitical friction and a decisive moment in British colonial policy. Had the political wheel turned just a bit differently, the legacy that became Calcutta would likely have belonged to Chittagong.

অথচ কয়েক মাস আগে রিলা মুখার্জী নিজেই আরেকটা লেখায় যেটা উল্লেখ করেছিলেন, সেটা গত পরশুর প্রবন্ধের বিপরীত। ১৫০২ সালে বঙ্গোপসাগরের একমাত্র বন্দর হিসেবে চট্টগ্রামের নামই পাওয়া গেছে প্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র ক্যানটিনো প্লেনিস্ফেয়ারে। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন:
How, then, did this marginal land transform into the Cantino Planisphere's major portal in 1502? The Portuguese diarist Tomé Pires (1515) observed a westward commercial networking from Chittagong, with Persian, Rumi, Turk, and Arab merchants present there, as well as traders from Chaul, Dabhol, and Goa, while the Portuguese epic poet Camões (1572) emphasised eastern networks:
'The City CATHIGAN would not be wav'd,
The fairest of BENGALA: who can tell
The plenty of this Province? but its post
(Thou seest) is Eastern turning the South-Coast.'
হ্যাঁ, এই অরণ্য বেষ্টিত প্রাচীন জনপদটাই ছিল বঙ্গোপসাগরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। ১৬৮৬ সালে চট্টগ্রাম দখল করতে ব্যর্থ না হলে এখন হয়তো চট্টগ্রাম হতো বঙ্গোপসাগরের সিঙ্গাপুর।

রিলা মুখার্জির লেখার লিংক:
https://www.thedailystar.net/slow-reads/focus/news/why-chittagong-never-became-maritime-city-4254986

Friday, August 7, 2026

সত্যি বন্ধু

"সত্যিকারের বন্ধু আমরা খুব কমই পাই। যাদের অধিকাংশকে আমরা বন্ধু বলে মনে করি, তারা প্রকৃতপক্ষে কেবল পরিচিত মানুষ মাত্র। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কারণ সিসেরোর সেই উক্তি একেবারেই সত্য। সত্যিকারের বন্ধুত্ব কেবল সৎ মানুষের মধ্যেই সম্ভব। যৌবনে, যখন রক্তে এখনও উষ্ণতা থাকে এবং নিজের নিষ্পাপ হৃদয় থেকে জন্ম নেওয়া বিশ্বাস এখনও অটুট থাকে, তখন মানুষ সহজেই অন্যকে বন্ধু ভাবে। কিন্তু অন্য মানুষের অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে সেই বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। আমিও একসময় আমার পরিচিতদেরই বন্ধু ভেবেছিলাম। মনে করতাম, আমার অসংখ্য বন্ধু আছে। কিন্তু বিপদের আগুন আমার পরিচিতদের ভিড়কে ছেঁকে দিয়েছে। এখন দেখি, একদিকে রয়েছে হাতে গোনা কয়েকজন প্রকৃত বন্ধু, আর অন্যদিকে রয়েছে শত্রুর মতো বা সম্পূর্ণ অপরিচিত এক বিরাট জনসমষ্টি। তবে এই কঠিন পরীক্ষার একটি উপকারও হয়েছে- আমি অন্য মানুষের ওপর যতটা ভরসা করতাম, তার চেয়ে কম ভরসা করতে শিখেছি; আর নিজের মধ্যে যতটা শক্তি আছে, তা আমার ধারণার চেয়েও বেশি আবিষ্কার করেছি।"

জোনাথন সুইফট বহুবছর আগে এই কথাটা বলে গিয়েছিলেন। এত বছর পরেও কথাটা শতভাগ খাঁটি। বরং আরো বেশি সত্যি এখন।

Thursday, July 16, 2026

কাগজ, কলম, প্রযুক্তি, লেখালেখি

১. লেখকদের হাতে কাগজ আর কলম থাকাই সবচেয়ে ভালো। এখন কম্পিউটার যুগ। প্রায় সবাই ল্যাপটপ কম্পিউটারে লেখালেখি করে। কেউ কেউ মোবাইলেও প্রচুর লেখালেখি করে। মোবাইলে লেখার কায়দাটা খুব বেশি রপ্ত হয়নি। বাংলা ফন্টে মোবাইলে লেখা কষ্টকর। ভয়েস কমান্ডে প্রচুর বানান ভুল। তবু কম্পিউটারবিহীন জীবনে সামান্য লেখালেখির জন্য মোবাইল মাঝে মাঝে কার্যকর হতে পারে।

২. আরো কিছু প্রযুক্তি আসার দরকার। টাইপ না করে লেখা যায় সেরকম প্রযুক্তি। মাথার ভেতর কোনো ভাবনা এলে সেটা হাতের চারকোনা স্ক্রিনে ভেসে উঠলো। বলা যায় না, ভবিষ্যতে সেরকম কোনো অতিবুদ্ধিমাত্রিক প্রযুক্তি এসে হাজির হতে পারে।


৩. সুস্থ শরীরে অলস সময় কাটানোর সবচেয়ে আনন্দময় উপায় হলো ইউটিউবে খুঁজে খুঁজে পুরোনো দিনের বিটিভি যুগের নাটক দেখা। আশি নব্বই দশকের ঝাপসা নাটকগুলো এখনো আনন্দময়। হুমায়ূন আহমেদ কিংবা আফজাল-সুবর্ণার চমৎকার সব নাটক এখনো আছে।


৪. শরীর মন দুটো দিন ভালো থাকলে মনে হয় অনেক কিছু পাওয়া হলো। গত দুই দিন খুব ভালো কেটেছে দু সপ্তাহের অস্বস্তিকর সময়ের পর। এগুলো বেশিদিন থাকে না। নতুন ঝামেলা এসে হাজির হবেই।