Thursday, May 21, 2026

উপনিবেশ চট্টগ্রাম নিয়ে দূরবর্তী দুই টেলি প্রতিক্রিয়া

‘উপনিবেশ চট্টগ্রাম’ নিয়ে পাঠকের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আজকাল কিছু লিখি না। কারণ গত পাঁচ বছরে পাঠকের কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে এত বেশি বার্তা পেয়েছি যে সেগুলো প্রকাশ করতে গেলে আস্ত একটা বই হয়ে যাবে। তবু সাম্প্রতিক দুটো অভিজ্ঞতার কথা না বলে পারছি না। বলার আগে একটু ভূমিকা নিচ্ছি। কারণ আমি এইসব প্রশংসা একা ভোগ করতে চাই না। আরো কয়েকজনকে ভাগীদার করতে চাই, যারা এই বইটা প্রকাশের সাথে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন। এটার সাথে যারা জড়িত ছিল তাদের সাথে আমার সম্পর্কটা এত আন্তরিক যে লেখক-প্রকাশক সম্পর্ক জাতীয় কিছু ছিল না তাতে। প্রকাশক মইনুল ভাই ছাড়া বাকী সবাই বয়সে আমার ছোট এবং সম্পর্কটা ছোট ভাই-বোনের মতো। সবাই এত আন্তরিক ভূমিকা রেখেছিল যে আমার মনেই হয়নি আমি জীবনের প্রথম বইটা প্রকাশ করতে যাচ্ছি। প্রথম বই প্রকাশের সময় নতুন লেখকদের যেসব হ্যাপা পোহাতে হয়, আমাকে তার বিন্দুমাত্রও হয়নি। বলা ভালো, মেইলে পাণ্ডুলিপি পাঠানো বাদে আমি কিছুই করিনি। ওরাই যা করার করেছে, যেখানে যতটা দরকার তার চেয়েও বেশি করেছে।

পেছনের কারিগরেরা সবাই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। তবু এবার আমি একটু স্বজনপ্রীতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই কয়েকজনের নাম প্রকাশ করছি। চারজনের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। কবি-অনুবাদক-সাহিত্যিক মাহমুদ আলম সৈকত, মুয়ীন পার্ভেজ, আসমা বীথি এবং দেবাশীষ মজুমদার। এরা প্রত্যেকে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং সাহিত্য সংস্কৃতির জগতে জাতীয়ভাবে পরিচিত-সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। আমি বরং তাদের প্রত্যেকের চেয়ে অনেক কম পরিচিত। তবু আমার প্রথম কাজ ‘উপনিবেশ চট্টগ্রাম’ নিয়ে এরা এমন আবেগ নিয়ে কাজ করেছে যেটা নজিরবিহীন। ফলে এই বইটা নিয়ে যত প্রশংসা আসে তার অর্ধেক আমি এদেরকে দিতে চাই। এদের কারণেই বইটা মানুষের কাছে পছন্দনীয়ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। সৈকত-বীথি দম্পতি ছিল সবার আগে। যেহেতু আমরা পারিবারিকভাবে পরিচিত ছিলাম, সে কারণে সৈকতই আমাকে কাজটা দেবার জন্য প্রথম অনুরোধ করে। পরবর্তীতে পুরো কাজটা সে-ই সমন্বয় করেছে। তাদের সাথে ছিলেন দেবাশীষ মজুমদার। মূল্যবান সব পরামর্শ তিনিই দিয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন কাজটা করেছেন মুয়ীন পার্ভেজ। পৃথিবীর যে কোনো প্রকাশনীর সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং শক্তি হলো সম্পাদনা। মুয়ীন এই কাজটা এত ভালভাবে করেছে যে আমি নিশ্চিত বইটা মুয়ীনের কাজের কারণেই পাঠক বইটা পছন্দ করেছে। তো… এইসব কৃতিত্বের কোনো প্রতিদান হয় না। কৃতজ্ঞতাতেই সীমাবদ্ধ থাকলাম।

ভূমিকা শেষ। এবার আসল ঘটনায় যাই। যে দুটো অভিজ্ঞতা লিখতে বসেছি। কোনো নাম না বলে শুধু গল্প দুটো বলি।

১.
এক সকালে আমার মোবাইলে একটা মেসেজ আসলো। পাঠিয়েছেন আমার শুভাকাঙ্ক্ষি দেশের প্রথম সারির একজন সাহিত্যিক। তিনি আমাকে মেইল চেক করতে বললেন। তাঁর এক সাহিত্যিক বন্ধু কানাডা থেকে আমাকে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন দুদিন আগে। কিন্তু কোনো জবাব পাননি। তাই তিনি আমার ফোন নাম্বার চেয়ে নিয়েছেন। আমি যেন ফোনটা ধরি।
 
অবাক হলাম খুব। মেইলের জবাব দিতে আমার কখনো ১২ ঘন্টাও দেরি হয় না। আমার সব কাজকর্ম মেইলে। তবু কিছু একটা সন্দেহ হওয়ায়, আবার মেইল খুলে স্প্যামবক্সে গেলাম। ঠিক যা ভেবেছিলাম। ওখানে পড়ে আছে মেইলটা। তখুনি সেই ভদ্রলোকের মেইলের জবাব দিলাম। মেইলের জবাব দিতে না দিতেই হোয়াটসঅ্যাপে একটা কল আসলো। সেই ভদ্রলোক ফোন করেছেন কানাডা থেকে। নিজের পরিচয় দিলেন। তারপর যে কারণে ফোন করেছেন সেটা বললেন। মেইলেও সেটা লিখেছিলেন। শুনে আমি প্রায় বাকহারা।

ব্যাপার হলো, গত বছর অক্টোবর মাসে তিনি ইউটিউবে আমার একটা সাক্ষাৎকার দেখেছেন। ডেইলি স্টারে দেয়া ভূমিকম্প বিষয়ক একটা ভিডিও। ওটার সূত্রে তিনি আমার একটা বইয়েরও সন্ধান পান। বইটার নাম উপনিবেশ চট্টগ্রাম। কয়েক মাস পর তিনি এক আত্মীয়ের মাধ্যমে দেশ থেকে বইটা সংগ্রহ করেছেন। বইটা হাতে পেয়ে পড়ে ফেললেন। পড়ার পর তাঁর এত ভালো লেগেছে তিনি আমার সাথে যোগাযোগ করার উপায় খুঁজতে থাকেন। অবশেষে তিনি তাঁর চট্টগ্রাম নিবাসী সাহিত্যিক বন্ধুর কাছ থেকে আমার ইমেইল নিয়ে চিঠি লিখেছেন। চিঠির জবাব না পেয়ে ফোন করেছেন। ইতিহাস নিয়ে তাঁর প্রচুর পড়াশোনা। ভারতবর্ষের এবং পৃথিবীর বিখ্যাত অনেক বইপত্র পড়েছেন। সেগুলো নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আলাপ হলো। সেই আলাপের মধ্যে তিনি আমার সদ্যপঠিত বইটাকে উপমহাদেশের এমনসব বিখ্যাত বইয়ের সাথে তুলনা করেছেন, সেগুলোর নাম প্রকাশ করারও সাহস করি না। আপ্লুত হয়ে শুনে গেলাম শুধু। আর শুকনো ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করলাম। পরদিন দেখলাম, কুরিয়ারে একটা প্যাকেট এসেছে। তিনি আমার জন্য তাঁর সম্পাদিত একটা আন্তর্জাতিক পত্রিকা পাঠিয়েছেন ঢাকার কাউকে বলে। তিনি আমাকে অনুরোধ করেছিলেন সেই পত্রিকায় লিখতে। লেখক তালিকায় যাদের নাম দেখলাম, তাদের পাশে বসার যোগ্যতাও আমার নেই।

তার কিছুদিন পর দ্বিতীয় আরেকটি ঘটনা।

২.
ইউরোপের একটা দেশ থেকে অচেনা নাম্বারে আমার হোয়াটসাপে একটা ফোন এলো। পরপর দুবার এবং দুটোই ভিডিওকল। আমি এমনিতেই অচেনা ফোন রিসিভ করি না, তার ওপর ভিডিও কল ধরার প্রশ্নই ওঠে না। ফোন না ধরার কারণে অচেনা লোকটা একটা টেক্সট মেসেজ দিয়ে অনুরোধ করলেন আমি যেন সময় পেলে তাঁকে একটা কলব্যাক করি। ওটা দেখে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। কারণ আমি কিছুদিন ধরে হ্যাকারের যন্ত্রণায় আছি, এই লোকটা নিশ্চয়ই সেই দলের কেউ। আমার অধিকাংশ হ্যাকারের ঠিকানা থাকে ইউরোপে। তাই প্রথম কাজ হিসেবে আমি বিনা দ্বিধায় নাম্বারটা ব্লক করে দিলাম।
 
তারপর মেসেজটা মুছতে গেলাম। কিন্তু মোছার আগে কৌতূহলী হয়ে প্রোফাইল ছবিটা দেখলাম। একজন বয়স্ক মানুষ। রবিশঙ্করের মতো চেহারা। সেতার বাজাচ্ছেন মনে হলো। ছবিটা আসল কিংবা নকল জানি না। যুগটাই তো ভেজালের। তবু কি মনে করে মেসেজ মোছার কাজটা ঘন্টা দুয়েকের জন্য মূলতবী রাখলাম। কারণ ভদ্রলোকের নামের শেষে যে টাইটেল সেটা আমাকে একটু সংশয়ে ফেলেছে। আমি সেই নাম্বার আর নামটা কপি করে আমার বিশ্বস্ত কয়েকটা সোর্সে খবর লাগালাম। কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে খবর পেলাম, উনি নকল লোক নন। সত্যি সত্যি আছেন।
এবার আমি তাঁকে আনব্লক করে মেসেজ দিলাম, ‘আপনাকে আমি চিনতে পারছি না। কিন্তু কী বিষয়ে কথা বলবেন জানালে পরদিন সময় করে ফোন করবো’। তিনি সাথে সাথে জবাব দিলেন, আমার একটা বই নিয়ে কথা বলবেন। আমি পরদিন একটা নির্দিষ্ট সময় দিলাম।
 
পরদিন ঠিক সেই সময়ে তিনি ফোন করলেন। ফোন করেই এমনভাবে কথা বলতে শুরু করলেন, যেন আমি তার বহুদিনের চেনা। তাঁর ফোন করার কারণও ‘উপনিবেশ চট্টগ্রাম’। বললেন বইটা তিনি কারো মাধ্যমে দেশ থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন। দুদিন আগে পড়তে শুরু করেছেন। মাত্র ৫৬ পৃষ্ঠা পড়েছেন, তাতেই নাকি এত আপ্লুত হয়েছেন যে আমার সাথে কথা বলার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন।
 
এই ভদ্রলোকও নানা প্রশংসায় ভাসিয়ে দিলেন। আমি সাধারণত কারো প্রশংসার জবাব দিতে পারি না। চুপ করে থাকি। অভদ্রতা হয়ে যায়, তবুও। কি বলবো ভেবে পাই না। শুধু আস্তে করে জানতে চাইলাম, এই বইয়ের খবর তাকে কে দিয়েছেন। তিনি অন্য মহাদেশে থাকা তাঁর এক আত্মীয়ের কথা বললেন। যিনি কিছুদিন আগে বইটা পড়েছেন। বুঝলাম, সেই কানাডা প্রবাসী সাহিত্যিক। আমি এই বইটা নিয়ে অনেক প্রশংসা শুনেছি। কিন্তু তাঁর উচ্ছ্বাস আমার অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। দেশে তাঁর প্রতিষ্ঠিত একটা সংগঠন আছে, তিনি ওদের মাধ্যমে বইটা প্রচার করার জন্য যা করা দরকার সব করবেন।(তিনি অতি উচ্ছ্বাসে আমার জন্য যেসব পুরস্কার পাবার কথা বললেন যেখানে নোবেল ছাড়া বাকী সব পুরস্কার আছে)।
 
যাই হোক, আমি সংগঠন এবং প্রচার এই দুটো বিষয় থেকে একশো হাত দূরে থাকি। তাই বিনীতভাবে অপারগতা জানালাম। তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে আলাপ শেষ করলাম। পরে তাঁর নামটা গুগলে সার্চ দিয়ে আরেকটু বিস্তারিত জানলাম। তিনিও চট্টগ্রামের বিখ্যাত এক সাহিত্যিক পরিবারের সন্তান। তাদের বাড়িতে সত্তর দশকে জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যান্ডদল। তিনি সেই দলের প্রতিষ্ঠাতা চার সদস্যের একজন। মজার ব্যাপার হলো সেই বাড়িটার মাত্র দুশো গজ দূরেই আমার বাসস্থান। ফোন রেখে অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম, ৭৫+ একজন মানুষ এখনো বইপত্র নিয়ে ২৫ বছর বয়সী তরুণের মতো উচ্ছ্বাস দেখান কিভাবে?
অভিজ্ঞতা দুটো লিখে না রাখলে অকৃতজ্ঞতা হয়ে যায় বলে একটু আত্মপ্রচার করলাম।
..............
ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে অচেনা পাঠকের এই উচ্ছ্বাসগুলোর মতো বড় উপহার আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু তাঁদের দুজনের পরিচয় উহ্য রেখে বইয়ের পেছনের সবটা কৃতিত্ব দিলাম আমার সেই সুহৃদদের। যাদের কারণে আমি 'লেখক' নামটা সংগ্রহ করেছি।





Monday, May 4, 2026

১৬ আগষ্ট ১৯৪৬ এবং অতঃপর

 ভারতবর্ষের ইতিহাসের কালো একটা দিন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো তার আগের দিনের সংবাদপত্র পড়ে বোঝার উপায় ছিল না পরদিনই এমন একটা ভয়ানক ব্যাপার ঘটতে চলেছে। ১৬ আগষ্ট পুরো পাতা জুড়ে দৈনিক যুগান্তরের বিশাল শিরোনাম ‘প্রাক-সংস্কার যুগের দীর্ঘমেয়াদী বাংলার রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির আদেশ’। 





এটা বিরাট একটা খবর। কেননা এই আদেশে মুক্তি পেয়েছিল চট্টগ্রাম বিদ্রোহের প্রধান আসামীরা। দ্বিতীয় শিরোনামে ছিল ‘মি. জিন্নার সাথে পণ্ডিত নেহেরুর সাক্ষাৎ’। দুটো সংবাদই গুরুত্বপূর্ণ। আগে চট্টগ্রাম বিদ্রোহের ঘটনাটা নিয়ে যুগান্তর কি লিখেছে দেখা যাক।


“বাঙ্গলার প্রাক-সংস্কার যুগের গনেশ ঘোষ, অনন্ত সিং, অম্বিকা চক্রবর্তী ইত্যাদি ৩০ জন রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তির আদেশ দেওয়া হইয়াছে। গতকল্য বৃহস্পতিবার বঙ্গীয় ব্যবস্থা পরিষদে প্রধানমন্ত্রী মি: সুরাবর্দী তাঁহার পূর্ব্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উপরোক্ত ঘোষণা করেন। অপর একটি প্রশ্নোত্তরে তিনি জানান যে, আগষ্ট বন্দীদের সম্পর্কেও তিনি বিবেচনা করিতেছেন।”


এই সংবাদের পাশে অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলার বিবরণ ছাপানো হয়েছে। 

"...আজ হইতে ১৬ বছর পূর্বে ১৯৩০  এর ১৮ এপ্রিলে ইষ্টার ছুটিতে রাত্রি দশটার সময় একদল যুবক যুগপৎ চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার, টেলিগ্রাফ অফিস এবং পুলিশ ব্যারাকে আক্রমণ করে এবং তাহাদের আক্রমণের ফলে সমগ্র সরকারী শাসন ব্যবস্থা স্তব্ধ হইয়া যায়। এই কাহিনী প্রকাশিত হইলে দেশবাসী এমন কি সরকারী কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত প্রথমে বিশ্বাস করিতে পারেন নাই যে এইরূপ ব্যাপার সম্ভব। এমন কি তদানীন্তন লাটসাহেব স্যার স্ট্যানলি জ্যাকসন একজন খ্যাতনামা নেতার নিকট বলিয়াছিলেন যে অসন্তুষ্ট পুলিশ বাহিনী এই কাণ্ড করিয়াছে।  ১৮ এপ্রিলের পরদিন আক্রমণ কারীদের অন্যতম সহকর্ম্মী হাসপাতালে মৃত্যুর সময় যে জবানবন্দী দেন তাহাতে কর্তৃপক্ষ প্রকৃত ব্যাপার জানিতে পারেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বৃটিশ শক্তি চঞ্চল হইয়া উঠে।…….”


 ‘মি. জিন্নার সাথে পণ্ডিত নেহেরুর সাক্ষাৎ’ শিরোনামে ২য় সংবাদটিও গুরুত্বপূর্ণ। সেই সংবাদেও ছিল আশার বাণী। সমঝোতার কথা।


কিন্তু ৩য় পৃষ্ঠায় আরেকটা শিরোনাম। যেটাকে তখনো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। তাতে লেখা ছিল-

১. ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস সংঘর্ষ দিবস নয়’। উপশিরোনাম: ‘জিন্না মুসলমানদের শান্ত ও শৃংখলা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন’। 


মুসলমানদের শান্ত থাকার আহবান জানালেন কেন জিন্না? সেই সংবাদের নীচে ছোট্ট দুটো সংবাদ। 

২. ‘১৬ আগষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি’ 

৩. ‘১৬ আগষ্ট ট্রাম ধর্মঘট’। 


এখন আমরা জানি ১৬ আগষ্ট কলকাতায় ভয়ানক একটা দাঙ্গা হয়েছিল। এই সংবাদগুলোর মধ্যে এমন কোনো প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত আছে যে পরদিন কিছু ঘটবে?


পরের কয়েক দিনের সংবাদপত্র জুড়ে ছিল সেই দাঙ্গার নানা ভয়ানক ঘটনা। স্বাভাবিকভাবেই চট্টগ্রাম বিদ্রোহের মুক্তি পাওয়া বন্দীরা হারিয়ে গেল সংবাদপত্রের পাতা থেকে।










Sunday, April 26, 2026

বিপরীত সংবাদ

কখনো কখনো একেকটা সুসংবাদের বিপরীতে পাঁচটা দুঃসংবাদ লুকিয়ে থাকতে পারে।
আজ একসাথে পেলাম খুব কাছের মানুষের তিনটা দুঃসংবাদ। বাকীগুলো হয়তো কোথাও অপেক্ষা করছে।

যতই বলি এইসব কুসংস্কারের বিশ্বাস আমার নেই, কিন্তু সংবাদগুলো পিছু ছাড়ছে না।

তবু, যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ......

Tuesday, April 21, 2026

সম্মাননা পদক: পেছনের কথা

আমার মতো একজন অপরিচিত মানুষকে কিভাবে পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করা হলো সেটা আগে জানা ছিল না। নির্বাচক কমিটির একজন আমার বইপত্র পড়ে মুগ্ধ হয়েছেন। তিনি সিটি কর্পোরেশনের এডিসি,  ম্যাজিস্ট্রেট রক্তিম চৌধুরী। আমার সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে। তিনি তাঁর ফেসবুক পোস্টে পরদিন বিষয়টা খোলাসা করেছেন। আমাকে এবং আরো তিনজনকে কিভাবে তিনি সুপারিশ করেছেন। লেখাটা তুলে রাখলাম এখানে।

****************************

আজকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন স্বাধীনতা পদক ও সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। এই কাজে নির্বাচক কমিটির মেম্বার হিসেবে দারুণ অভিজ্ঞতা হলো!
স্বাধীনতা সম্মাননায় ১১ জন/প্রতিষ্ঠানকে এবং সাহিত্য পুরস্কারে ৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়। এবার দারুণ সব মানুষ পুরস্কার পেয়েছেন। অনেক ক্যাটাগরি নির্বাচনে আমি দর্শকের ভূমিকায় থাকলেও আমার পরিচিত এবং ইন্টেরেস্টের ক্যাটাগরিতে আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, যাতে যোগ্য লোক সম্মাননা পান। ভাল লাগার বিষয়, বেশ কয়েকটা ক্যাটাগরিতে আমার পছন্দের মানুষই নির্বাচিত হন!🤗🤗
আমার ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির জায়গা থেকে ৪ জনকে নিয়ে আলাদা করে বলতে চাই..
প্রথমত, চিকিৎসাক্ষেত্রে: ডা. এম এ ফয়েজ স্যার। বাংলাদেশে শুধু না, এই দক্ষিণ এশিয়াতেই এক কিংবদন্তী ডা. এম এ ফয়েজ স্যার। অত্র অঞ্চলের সাপ ও এন্টিভেনম নিয়ে গবেষণার পাইওনিয়ার ফয়েজ স্যার! সম্ভাব্য অনেক নামের মধ্যে আমি স্যারকে নিয়ে বেশি মাতামাতি করায় আজকের অনুষ্ঠানে স্যারের সাথে যোগাযোগ, রিসিভ-সবকিছুর দায়িত্ব আমার ঘাড়েই এসে পড়ে! গ্রীষ্মের নিদারুণ দাবদাহের মধ্যেও এই দায়িত্ব আমার কাছে ছিল সুশীতল বাতাসের মত! দারুণ ছিল সেই অভিজ্ঞতা!!❤️🌿
দ্বিতীয়ত, প্রবন্ধ ও গবেষণায়- হারুন রশীদ ভাই। ইদানীং আমরা বুঁদ হয়ে আছি উনার লেখনীতে। এবং চট্টগ্রামকে নিয়ে একটা ফাটাফাটি লাগিয়ে দিবো এই স্বপ্নে বিভোর, যার মূলেই আছে 'চিত-তৌত-গং', 'উপনিবেশ চট্টগ্রাম' এইসব অসাধারণ সৃষ্টি। এই ক্যাটাগরির আলোচনায় উনার নাম সাজেস্ট করার পরে যখন দেখি ভাগ্য কিছুটা সুপ্রসন্ন, তখন আমি তুরন্ত মনিরুল মনির ভাইয়ের মাধ্যমে হারুন ভাইয়ের বায়োডাটা এনে পেশ করি। এরপর যখন ফাইন্যালি উনি সিলেক্টেড হলেন, এতো ভাল লেগেছে কি বলবো! উনার সাথে আলাপের ছুতো খুঁজছিলাম, আজ অনুষ্ঠানের ফাঁকে সেই কাজটি মন ভরে করে নিয়েছি! তবে অনেক কাজ করা বাকি হারুন ভাই!!🤗🌿🙏
তৃতীয়ত, কথাসাহিত্যে- জাহেদ মোতালেব ভাই। যখন এই ক্যাটাগরি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, তখন চোখ বন্ধ করে ভাবছিলাম, চট্টগ্রামের কার কার লেখা আসলে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নামের মধ্যে এই নামটিই কেন জানি মনে ধরে! বায়োপিক-টিক জোগাড়ের পর উনি সিলেক্টেড হলেন; কিন্তু খেল শুরু এরপর। গত দুইদিন কি যে প্যারার ভেতর দিয়ে যে গেছে! এ ফোন করে তো, ও রাগারাগি করে! কি বিষয়? উনি কোন সময় বঙ্গবন্ধু-কে নিয়ে একটা বই লিখেছিলেন! উনি কিভাবে এই পুরস্কার পান? এ নিয়ে ফেসবুক, মেয়র মহোদয়ের নাম্বারে প্রচুর আপত্তি-বিবাদ-সমালোচনা! আমি বার বার বলতে চেষ্টা করেছি, এবং চট্টগ্রামের প্রথিতযশা বেশ কয়েকজন লেখক-প্রকাশকের সুপারিশেই যে, উনার যোগ্যতার বিচারেই এই নির্বাচন! শেষ পর্যন্ত মেয়র মহোদয় নিরপেক্ষ অবস্থান বজায়ে দৃঢ়চিত্ত থাকেন। এবং আজকের অনুষ্ঠানে মেয়র মহোদয় নিজেই সেই ঘটনা সবার সামনে তুলে ধরে বলেন, সত্য-নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে আমাদের এই পুরস্কার নির্বাচনের চেষ্টা! এই অভিজ্ঞতা অনেকদিন মনে থাকবে!
পরিশেষে, এবারের সম্মাননায় যে নির্বাচনটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিয়েছে, সেই নামটি বলি! বুলবুল আকতার (চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অবদান)।
কী? চিনতে পারছেন না তো! বুলবুল আকতার চট্টগ্রামের এক বিশেষ ধারার গান 'অঁলা' গানের কিংবদন্তী বিস্মৃতপ্রায় শিল্পী। উনার স্বামী বিখ্যাত রশিদ কাওয়ালের লেখনীতে উনারই গাওয়া বিখ্যাত গান,
অ কালাচান গলার মালা..
পেট ফুরেদ্দে তুয়ার লাই!!
ইদানীং অঁলা গান নিয়ে খুব মেতেছিলাম। ফলে আমি বুলবুল আকতারকে চিনি, কিন্তু উনার খোঁজ কিভাবে পাই? তানিম বদ্দা>আরকান>রাফসান গালিব>জিহান>রাফসান গালিব এই ক্রমে উনাকে খুঁজে বের করে আমরা শেষ পর্যন্ত উনাকে নিয়ে আসতে সক্ষম হই আজকের অনুষ্ঠানে। দারুণ মজার মানুষ ইনি!
জিহান তো উনাকে এক সেকেন্ডও চোখের আড়াল করে নাই! কাজীর দেউড়ি মোড় থেকে স্টেজে এনে, অনুষ্ঠান শেষে নিজের হাতে চা খাইয়ে (উনি বাচ্চার মত খুশি হয়ে উঠেন চা পেয়ে), আবার ফেরার গাড়ির জন্যে কোতোয়ালি-তে পৌঁছে দিয়ে আসে!
উনাকে কেউ চিনতেন না, কিন্তু অনুষ্ঠানে আসার পরে কিছু নিভৃতচারী মানুষ, যাদের আমি চিনি-ই না, আমাকে মন থেকে ধন্যবাদ জানিয়ে যান, উনাকে নিয়ে আসায়!
তখনি বুঝি, মানুষকে যিনি আনন্দ দিতে পারেন, তার একটা চেনাপরিচয়ের চোরা স্রোত সবসময়-ই চলতে থাকে! বুলবুল আকতারও তেমন একজন মানুষ!
খুব শীঘ্রি উনার গান সামনাসামনি শুনবো, এই প্রত্যাশায় আজ শেষ করি!
বি.দ্র. লম্বা লেখা ধৈর্য ধরে পড়ায় অসংখ্য ধন্যবাদ!
আর এই মানুষগুলো নিজের গুণেই গুণান্বিত! আমাদের নির্বাচন-অনির্বাচনে উনাদের মত মানুষের কিছুই যায় আসে না! উনাদের সম্মাননা প্রদানের সুযোগে আমরা নিজেরাই আসলে সম্মানিত ফিল করছি! আর এই লেখা সম্পূর্ণরূপে আমার ব্যক্তিগত তৃপ্তির জায়গা থেকে লেখা! দোষত্রুটি মার্জনীয়!🙏🌿

[১৯ এপ্রিল ২০২৬]

***

গত দুই বছরের সাহিত্যের পদক তালিকা:

কথাসাহিত্যে
২০২৫: প্রফেসর আসহাব উদ্দীন (মরণোত্তর),
২০২৬: জাহেদ মোতালেব

প্রবন্ধ ও গবেষণায়
২০২৫: প্রফেসর ড. সলিমুল্লাহ খান,
২০২৬: হারুন রশীদ

শিশুসাহিত্যে:
২০২৫: মিজানুর রহমান শামীম,
২০২৬: সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার

কবিতায়:
২০২৫: জিললুর রহমান
২০২৬: শাহিদ হাসান

অনুবাদে
২০২৫: ফারজানা রহমান শিমু।
২০২৬: নাই

গীতিকবিতায়:
২০২৫: নাই
২০২৬: ড. আবদুল্লাহ আল মামুন

Sunday, April 19, 2026

একটি পুরস্কার প্রাপ্তির অভিজ্ঞতা

স্থানীয় পর্যায়ে সরকারী পুরস্কারগুলোর প্রতি আমার একটু অভক্তি আছে। কারণ এগুলো দেয়ার প্রক্রিয়াটা সুন্দর হয় না। একটা বিশৃংখল হযবরল পরিস্থিতির মধ্যে যেনতেনভাবে অনুষ্ঠান করা হয়। ফলে পুরস্কার পাওয়ার কথাটা ফেসবুকে ফলাও করে প্রচার করতে যতটা আরাম, অনুষ্ঠানে গিয়ে পুরস্কারটা হস্তগত করা ততটা আরাম হয় না। জানতাম, তবু গেলাম বইমেলার মাঠে। পরিবারের কয়েকজন সহকারে। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পুরস্কার নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পুরস্কারের নাম স্বাধীনতা সম্মাননা পদক। বলা যায় এটা চট্টগ্রামের স্থানীয় স্বাধীনতা পদক(তবে ভুলেও তাকে জাতীয় পদকের সাথে তুলনা করা ঠিক হবে না)। আমাকে নির্বাচিত করা হয়েছে গবেষণা প্রবন্ধে অবদান রাখার জন্য।

আমি খুব অবাক হয়েছি পুরস্কারের খবর শুনে। যতটা অবাক হয়েছে তার চেয়ে আশঙ্কিত হয়েছি। কারণ লেখালেখির মাঠে আমি একেবারেই নতুন খেলোয়াড়। পুরোনো খেলোয়াড়েরা আমার এই পুরস্কারপ্রাপ্তি ভালোভাবে নেবে না। এটাই স্বাভাবিক। আমি নিজেকে এই পুরস্কারের জন্য উপযুক্ত মনে করি না। সবচেয়ে বড় কথা আমি লেখালেখি করি নিজের আনন্দের জন্য। পাশাপাশি এটাকে পেশাদার পর্যায়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা। কিছু বাড়তি আয় উপার্জন হলে ক্ষতি কি। আমাকে কেন নির্বাচিত করা হয়েছে, কারা এটা করেছেন বুঝতে পারছিলাম না। আমার শুভাকাঙ্ক্ষী লেখক সাহিত্যিক প্রকাশক যারা চট্টগ্রামে আছেন তাঁদের কারো কাজ এটাই অনুমান করলাম। কিন্তু কেউ সেটা স্বীকার করছে না। 

পুরস্কার নেবার খানিক আগে জানলাম কারা এই কাজটা করেছে। আমার লেখালেখি আন্তরিকভাবে পছন্দ করে তেমন একজন আছেন সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচক কমিটিতে। তিনিই আমার নামটা প্রস্তাব করেছেন। আমাকে দেখে তিনি এসে পরিচয় দিলেন। আগে কখনো আলাপ হয়নি তাঁর সাথে। তিনি শুধু ফেসবুকে যুক্ত আছেন, এটুকুই। এরকম অচেনা মানুষ যখন শুধু বই দিয়ে আমাকে এমন সম্মান জানায় তখন সত্যিই আপ্লুত হতে হয়। আমি সরকারী পদকের চেয়ে পাঠকের এই ভালোবাসাকে অনেক বেশি মূল্যবান মনে করি। 

কিন্তু অল্পদিনের লেখালেখির জীবনে এমন প্রাপ্তি সত্যি বাড়াবাড়ি। মাত্র পাঁচ বছর আগে আমার প্রথম বই প্রকাশ হয়েছে। গত তিন বছরে মুড়ি-মুড়কির মতো আমার ৮টা বই প্রকাশ হয়ে গেছে। যদিও এগুলো অনেক আগের কাজ। আস্তে ধীরে করে যাচ্ছিলাম। কিভাবে যেন লোকের চোখে পড়ে গেলাম। পাঠক পছন্দ করলো। পুরস্কারও এসে গেল। টাকাপয়সা রয়েলটিও কম আসেনি। একদম প্রথম বই থেকে সবগুলো বই চুক্তি করে রয়েলটি এডভান্স নিয়ে পেশাদারিত্বের সাথে প্রকাশ করেছি। পাঠকের ভালোবাসা, প্রকাশকের সম্মানী এবং সরকারী স্বীকৃতি- এই তিনটা বিষয় এত অল্প সময়ে পাওয়া যে কোনো লেখকের জন্য ভাগ্যের ব্যাপার। আমার কাছে মনে হয় এটা একটা অলৌকিক ব্যাপার। অথবা অনেক লম্বা সময় ধরে চলতে থাকা স্বপ্নদৃশ্য, ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখবো, আসলে কোথাও কিছু নেই।

গতকাল আমার একটা শোকের দিন ছিল। আমার জীবনের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুটা মারা গেছে আগের দিন রাতে। গতকাল ঢাকায় ওর জানাজা-দাফন হয়েছে। আমার যাওয়ার উপায় ছিল না। তার মধ্যেই আমাকে পুরস্কার নিতে যেতে হয়েছে। হাসিমুখে স্টেজে ফটোসেশান করতে হয়েছে। মানুষের জীবনটা মাঝে মাঝে এত স্ববিরোধী!

পুরস্কার নিতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে সেগুলো লিখে রাখা যাক।

***
যেখানে বসেছিলাম সেখানে একটু গরম। তবু বসে আছি। কারণ এই সারির সোফাগুলো পদকপ্রাপ্ত অতিথিদের জন্য বরাদ্দ। দুজনের জন্য বরাদ্দ সোফায় আমার পাশে সৌম্যদর্শন বয়স্ক ভদ্রলোকও আছেন। দুজনের মাঝে একটু খালি জায়গা আছে। বড় জোর ছ ইঞ্চি। মোটামুটি স্বস্তিতেই বসেছি। গরম হলেও বেশি খারাপ লাগছিল না। একটু পরেই অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে, তাড়াতাড়ি মুক্তি পাবো। পাশের ভদ্রলোকও আশান্বিত। মঞ্চের দিকে তাকিয়ে আছি।
হঠাৎ করে কেউ একজন কোনো কথাবার্তা ছাড়া আমাদের দুজনের মাঝে দুম করে বসে পড়লেন। এমনভাবে বসেছেন যেন আমাদের দুজনের কোনো অস্তিত্বই তিনি জানেন না এবং সোফায় দুজনের মাঝে যে ছ’ইঞ্চি ফাঁক ছিল সেটা কিভাবে যেন বারো ইঞ্চিতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আমাদের প্রায় কোলে বসে গিয়ে নিজের জায়গাটুকু করে নিলেন। এমন দৃশ্য লোকাল বাস বা নাজিরহাট-দোহাজারী ট্রেনে নিয়মিত। কিন্তু আইফোন হাতে স্যুটকোট পড়া অভিজাত চেহারার ভদ্রলোক কেন সেরকম আচরণ করবেন বুঝলাম না। দুম করে বসার আগে অন্তত মুখ ফুটে একটু বলতে পারতেন। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, এটা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।
অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল। কিন্তু প্রথম বক্তা মাইক হাতে নিয়েই এমন চিৎকার দিয়ে ভাষণ দিতে লাগলেন, সাউণ্ডবক্স ফেটে যেতে পারে, আমাদের কানের পর্দাও ফুটো হয়ে যেতে পারে। আমি তাঁকে চিনি না, কিন্তু পরিচয়ে লেখা তিনি একজন প্রকাশক। তাঁর উৎকট বক্তব্যের সারমর্ম হলো স্মরণকালের সেরা বইমেলাটা আয়োজন করতে পেরে তিনি চট্টগ্রামবাসীকে ধন্য করে দিয়েছেন। আমি জানি বানোয়াট কথাবার্তাই সবচেয়ে বেশি জোরে বলতে হয়। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, এমন অসত্য বয়ানও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।
পরের দুই বক্তা সরকারী কর্মকর্তা। তাঁরা পরিমিতির ভেতর অল্প সময়ে শেষ করলেন। কিন্তু পরের বক্তা এসে হঠাৎ এমন চিৎকার শুরু করলেন, আমি হতবাক। চিৎকারের জন্য না, ভদ্রলোকের পরিচয় দেখে। তিনি একটা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। তিনি এমন বিষয়ে চিৎকার করছেন, যেটা আস্তে বললেও গুরুত্ব কমে না। কিন্তু মাইকের সামনে চিৎকার করে কথা বলাও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। সেটা বিশ্ববিদ্যালের ভিসি হোক কিংবা ফুটপাতের মলম বিক্রেতা হোক।
তালিকায় গুনে দেখলাম আরো নাম রয়ে গেছে। চিৎকার আর তেল বিতরণ দুটোই সমানে চলবে আরো বেশ কিছুক্ষণ। সাথে পাশের ভদ্রলোকের চাপ, আবহাওয়ার গরম, সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম এই জায়গা ছাড়তে হবে। বিশেষ অতিথির আসন ছেড়ে পেছনে কোথাও আশ্রয় খুঁজলাম। মঞ্চ থেকে যতটা দূরে যাওয়া যায়। উঠে গিয়ে পেছন দিকে একটা খালি চেয়ার পেয়ে গেলাম। বাকী সময় ওখানেই পার করলাম।
গতকাল পদক নেবার অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা বললাম। এবার সর্বশেষ পর্যবেক্ষণটা বলি।
ভাইসব, বইমেলা রাজনৈতিক ময়দান নয়। গলার রগ ফুলিয়ে এখানে বক্তৃতা দিতে হয় না। উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে বিদঘুটে সব গান বাজনা করতে হয় না। বইমেলার সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে হয় কেন? বইমেলায় যারা যায় তারা পরস্পরের সাথে বইপত্র নিয়ে গল্পগুজব করে, আড্ডা দেয়। একটু শান্তির পরিবেশ ছাড়া এসব আলাপ জমে না। বইমেলার সাথে এই সাংস্কৃতিক উৎসব নামের উৎকট আয়োজন আমার কাছে স্রেফ শব্দদুষণ মনে হয়। মাইকের আওয়াজে কোনো স্টলে দাঁড়িয়ে বই পছন্দ করার রুচিও থাকে না। কারা এসব পরিকল্পনা করে আমি জানি না। আমার চেনা-জানা যে কজন প্রকাশক বা সিটি কর্পোরেশন কর্মকর্তা আছেন তাদের সবাই রুচিশীল মানুষ। কিন্তু তাদেরকে সম্ভবত এসব পরিকল্পনায় রাখা হয় না।


চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর শহর হিসেবে গৌরব করি। কিন্তু সেই গৌরব ম্লান করে দেয় এসব গ্রাম্যতা। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের শুধু অধঃপতনই হতে থাকবে।




***

আমি আর বেশিদিন লিখবো না ঠিক করেছিলাম। পাঠকের বিরক্তি আসার আগেই সরে যাওয়া উচিত। এখন হাতে যে দুয়েকটা প্রকল্প আছে সেগুলো লিখে শেষ করতে পারলেই হয়। এখন প্রতিটা দিনই অনিশ্চিত। কোনো না কোনো দুঃসংবাদ, ঝামেলা এসে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলে। তবু মনে মনে বলি, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ।

Friday, April 17, 2026

সুসংবাদ বনাম দুঃসংবাদ

একই সাথে দুটো সংবাদ এসে হাজির। একটা সুসংবাদ, আরেকটা দুঃসংবাদ। সুসংবাদটা এসেছে কাছ থেকে। দুঃসংবাদ একটু দূর থেকে। কখনো কখনো জীবন মানুষকে এমন অবস্থায় দাঁড় করায়। তখন সে বুঝে উঠতে পারে না তার কী করা উচিত। এই দেশের বাস্তবতায় আমাদের প্রতিনিয়ত এমনসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, আমরা আজকে যা করছি আগামীকাল তার বিপরীত অবস্থায় চলে যেতে পারি। সুসংবাদ উদযাপনেও আমাদের আশঙ্কা থাকে। নির্বিকার দার্শনিক কাঠিন্য নিয়ে সারা পৃথিবীকে উপেক্ষা করার শক্তি সবার থাকে না। যদি থাকতো তাহলে জীবনটা আরো সহনীয় হতো। সুসংবাদটা অনেককে আনন্দিত করেছে, কিন্তু দুঃসংবাদটা কাউকে প্রভাবিত করেনি। ওটা একান্ত আমার নিজস্ব। যদিও বেশ কিছুদিন ধরে জানি দুঃসংবাদটা আসছে। ওটা অনিবার্যই ছিল। তবু সুসংবাদটা ম্লান হয়ে গেছে দুঃসংবাদের ছায়ায়।

And I knew this would happen, and it has finally happened. Who knows what fate is waiting for us? We all reach the final destination. Goodbye, my friend. We had 42 years together...

Wednesday, April 15, 2026

ইংরেজদের নারী প্রহার আইন ১৮০০



"And as, by the laws of England, a man may beat his wife with a stick which will not endanger the breaking of a limb, or may confine her in a room, the women dare not even give their tongues too much liberty."



(ইংল্যান্ডের আইন অনুযায়ী একজন মানুষ তার স্ত্রীকে এমন লাঠি দিয়ে মারতে পারে যা তার অঙ্গহানির কারণ হবে না, বা তাকে ঘরে বন্দী করে রাখতে পারে। তাই নারীরা এমনকি মুখ খোলার ব্যাপারেও খুব একটা স্বাধীনতা পায় না।)

[মাসির-ই-তালিবী, মির্জা আবু তালেব খান, ১৮০১]

একজন ভারতীয়ের চোখে লন্ডনের বর্ননার এই অংশটা চমকে ওঠার মতো। মাত্র দুশো বছর আগেও ইংল্যান্ডে এরকম আইন ছিল?

ব্যাপারটা নিয়ে খোঁজখবর করতেই জানলাম সত্যি এরকম আইন ছিল।

ইংল্যান্ডের সাধারণ আইন বা অনুযায়ী, সে সময় স্বামীর হাতে স্ত্রীর শারীরিক লাঞ্ছনা বা "Moderate Correction" (পরিমিত শাসন) একপ্রকার স্বীকৃত ছিল। স্যার উইলিয়াম ব্ল্যাকস্টোন তার বিখ্যাত গ্রন্থ Commentaries on the Laws of England (১৭৬৫)-এ লিখেছিলেন যে, পুরনো আইন অনুযায়ী স্বামী তার স্ত্রীকে "পরিমিতভাবে শাসন" করার অধিকার রাখতেন।

তবে ১৮৫৩ সালের আইন: 'Act for the Better Prevention and Punishment of Aggravated Assaults upon Women and Children' পাসের মাধ্যমে নারীদের ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়। ১৮৯১ সালের বিখ্যাত 'Jackson Case': এই মামলার রায়ে আদালত ঘোষণা করে যে, স্বামী তার স্ত্রীকে জোর করে আটকে রাখতে পারবেন না। এর মাধ্যমেই মূলত স্ত্রীকে ঘরে বন্দি করে রাখার আইনি বৈধতা চিরতরে শেষ হয়।