Sunday, April 19, 2026

একটি পুরস্কার প্রাপ্তির অভিজ্ঞতা

স্থানীয় পর্যায়ে সরকারী পুরস্কারগুলোর প্রতি আমার একটু অভক্তি আছে। কারণ এগুলো দেয়ার প্রক্রিয়াটা সুন্দর হয় না। একটা বিশৃংখল হযবরল পরিস্থিতির মধ্যে যেনতেনভাবে অনুষ্ঠান করা হয়। ফলে পুরস্কার পাওয়ার কথাটা ফেসবুকে ফলাও করে প্রচার করতে যতটা আরাম, অনুষ্ঠানে গিয়ে পুরস্কারটা হস্তগত করা ততটা আরাম হয় না। জানতাম, তবু গেলাম বইমেলার মাঠে। পরিবারের কয়েকজন সহকারে। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পুরস্কার নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পুরস্কারের নাম স্বাধীনতা সম্মাননা পদক। বলা যায় এটা চট্টগ্রামের স্থানীয় স্বাধীনতা পদক(তবে ভুলেও তাকে জাতীয় পদকের সাথে তুলনা করা ঠিক হবে না)। আমাকে নির্বাচিত করা হয়েছে গবেষণা প্রবন্ধে অবদান রাখার জন্য।

আমি খুব অবাক হয়েছি পুরস্কারের খবর শুনে। যতটা অবাক হয়েছে তার চেয়ে আশঙ্কিত হয়েছি। কারণ লেখালেখির মাঠে আমি একেবারেই নতুন খেলোয়াড়। পুরোনো খেলোয়াড়েরা আমার এই পুরস্কারপ্রাপ্তি ভালোভাবে নেবে না। এটাই স্বাভাবিক। আমি নিজেকে এই পুরস্কারের জন্য উপযুক্ত মনে করি না। সবচেয়ে বড় কথা আমি লেখালেখি করি নিজের আনন্দের জন্য। পাশাপাশি এটাকে পেশাদার পর্যায়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা। কিছু বাড়তি আয় উপার্জন হলে ক্ষতি কি। আমাকে কেন নির্বাচিত করা হয়েছে, কারা এটা করেছেন বুঝতে পারছিলাম না। আমার শুভাকাঙ্ক্ষী লেখক সাহিত্যিক প্রকাশক যারা চট্টগ্রামে আছেন তাঁদের কারো কাজ এটাই অনুমান করলাম। কিন্তু কেউ সেটা স্বীকার করছে না। 

পুরস্কার নেবার খানিক আগে জানলাম কারা এই কাজটা করেছে। আমার লেখালেখি আন্তরিকভাবে পছন্দ করে তেমন একজন আছেন সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচক কমিটিতে। তিনিই আমার নামটা প্রস্তাব করেছেন। আমাকে দেখে তিনি এসে পরিচয় দিলেন। আগে কখনো আলাপ হয়নি তাঁর সাথে। তিনি শুধু ফেসবুকে যুক্ত আছেন, এটুকুই। এরকম অচেনা মানুষ যখন শুধু বই দিয়ে আমাকে এমন সম্মান জানায় তখন সত্যিই আপ্লুত হতে হয়। আমি সরকারী পদকের চেয়ে পাঠকের এই ভালোবাসাকে অনেক বেশি মূল্যবান মনে করি। 

কিন্তু অল্পদিনের লেখালেখির জীবনে এমন প্রাপ্তি সত্যি বাড়াবাড়ি। মাত্র পাঁচ বছর আগে আমার প্রথম বই প্রকাশ হয়েছে। গত তিন বছরে মুড়ি-মুড়কির মতো আমার ৮টা বই প্রকাশ হয়ে গেছে। যদিও এগুলো অনেক আগের কাজ। আস্তে ধীরে করে যাচ্ছিলাম। কিভাবে যেন লোকের চোখে পড়ে গেলাম। পাঠক পছন্দ করলো। পুরস্কারও এসে গেল। টাকাপয়সা রয়েলটিও কম আসেনি। একদম প্রথম বই থেকে সবগুলো বই চুক্তি করে রয়েলটি এডভান্স নিয়ে পেশাদারিত্বের সাথে প্রকাশ করেছি। পাঠকের ভালোবাসা, প্রকাশকের সম্মানী এবং সরকারী স্বীকৃতি- এই তিনটা বিষয় এত অল্প সময়ে পাওয়া যে কোনো লেখকের জন্য ভাগ্যের ব্যাপার। আমার কাছে মনে হয় এটা একটা অলৌকিক ব্যাপার। অথবা অনেক লম্বা সময় ধরে চলতে থাকা স্বপ্নদৃশ্য, ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখবো, আসলে কোথাও কিছু নেই।

গতকাল আমার একটা শোকের দিন ছিল। আমার জীবনের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুটা মারা গেছে আগের দিন রাতে। গতকাল ঢাকায় ওর জানাজা-দাফন হয়েছে। আমার যাওয়ার উপায় ছিল না। তার মধ্যেই আমাকে পুরস্কার নিতে যেতে হয়েছে। হাসিমুখে স্টেজে ফটোসেশান করতে হয়েছে। মানুষের জীবনটা মাঝে মাঝে এত স্ববিরোধী!

পুরস্কার নিতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে সেগুলো লিখে রাখা যাক।

***
যেখানে বসেছিলাম সেখানে একটু গরম। তবু বসে আছি। কারণ এই সারির সোফাগুলো পদকপ্রাপ্ত অতিথিদের জন্য বরাদ্দ। দুজনের জন্য বরাদ্দ সোফায় আমার পাশে সৌম্যদর্শন বয়স্ক ভদ্রলোকও আছেন। দুজনের মাঝে একটু খালি জায়গা আছে। বড় জোর ছ ইঞ্চি। মোটামুটি স্বস্তিতেই বসেছি। গরম হলেও বেশি খারাপ লাগছিল না। একটু পরেই অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে, তাড়াতাড়ি মুক্তি পাবো। পাশের ভদ্রলোকও আশান্বিত। মঞ্চের দিকে তাকিয়ে আছি।
হঠাৎ করে কেউ একজন কোনো কথাবার্তা ছাড়া আমাদের দুজনের মাঝে দুম করে বসে পড়লেন। এমনভাবে বসেছেন যেন আমাদের দুজনের কোনো অস্তিত্বই তিনি জানেন না এবং সোফায় দুজনের মাঝে যে ছ’ইঞ্চি ফাঁক ছিল সেটা কিভাবে যেন বারো ইঞ্চিতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আমাদের প্রায় কোলে বসে গিয়ে নিজের জায়গাটুকু করে নিলেন। এমন দৃশ্য লোকাল বাস বা নাজিরহাট-দোহাজারী ট্রেনে নিয়মিত। কিন্তু আইফোন হাতে স্যুটকোট পড়া অভিজাত চেহারার ভদ্রলোক কেন সেরকম আচরণ করবেন বুঝলাম না। দুম করে বসার আগে অন্তত মুখ ফুটে একটু বলতে পারতেন। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, এটা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।
অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল। কিন্তু প্রথম বক্তা মাইক হাতে নিয়েই এমন চিৎকার দিয়ে ভাষণ দিতে লাগলেন, সাউণ্ডবক্স ফেটে যেতে পারে, আমাদের কানের পর্দাও ফুটো হয়ে যেতে পারে। আমি তাঁকে চিনি না, কিন্তু পরিচয়ে লেখা তিনি একজন প্রকাশক। তাঁর উৎকট বক্তব্যের সারমর্ম হলো স্মরণকালের সেরা বইমেলাটা আয়োজন করতে পেরে তিনি চট্টগ্রামবাসীকে ধন্য করে দিয়েছেন। আমি জানি বানোয়াট কথাবার্তাই সবচেয়ে বেশি জোরে বলতে হয়। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, এমন অসত্য বয়ানও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।
পরের দুই বক্তা সরকারী কর্মকর্তা। তাঁরা পরিমিতির ভেতর অল্প সময়ে শেষ করলেন। কিন্তু পরের বক্তা এসে হঠাৎ এমন চিৎকার শুরু করলেন, আমি হতবাক। চিৎকারের জন্য না, ভদ্রলোকের পরিচয় দেখে। তিনি একটা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। তিনি এমন বিষয়ে চিৎকার করছেন, যেটা আস্তে বললেও গুরুত্ব কমে না। কিন্তু মাইকের সামনে চিৎকার করে কথা বলাও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। সেটা বিশ্ববিদ্যালের ভিসি হোক কিংবা ফুটপাতের মলম বিক্রেতা হোক।
তালিকায় গুনে দেখলাম আরো নাম রয়ে গেছে। চিৎকার আর তেল বিতরণ দুটোই সমানে চলবে আরো বেশ কিছুক্ষণ। সাথে পাশের ভদ্রলোকের চাপ, আবহাওয়ার গরম, সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম এই জায়গা ছাড়তে হবে। বিশেষ অতিথির আসন ছেড়ে পেছনে কোথাও আশ্রয় খুঁজলাম। মঞ্চ থেকে যতটা দূরে যাওয়া যায়। উঠে গিয়ে পেছন দিকে একটা খালি চেয়ার পেয়ে গেলাম। বাকী সময় ওখানেই পার করলাম।
গতকাল পদক নেবার অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা বললাম। এবার সর্বশেষ পর্যবেক্ষণটা বলি।
ভাইসব, বইমেলা রাজনৈতিক ময়দান নয়। গলার রগ ফুলিয়ে এখানে বক্তৃতা দিতে হয় না। উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে বিদঘুটে সব গান বাজনা করতে হয় না। বইমেলার সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে হয় কেন? বইমেলায় যারা যায় তারা পরস্পরের সাথে বইপত্র নিয়ে গল্পগুজব করে, আড্ডা দেয়। একটু শান্তির পরিবেশ ছাড়া এসব আলাপ জমে না। বইমেলার সাথে এই সাংস্কৃতিক উৎসব নামের উৎকট আয়োজন আমার কাছে স্রেফ শব্দদুষণ মনে হয়। মাইকের আওয়াজে কোনো স্টলে দাঁড়িয়ে বই পছন্দ করার রুচিও থাকে না। কারা এসব পরিকল্পনা করে আমি জানি না। আমার চেনা-জানা যে কজন প্রকাশক বা সিটি কর্পোরেশন কর্মকর্তা আছেন তাদের সবাই রুচিশীল মানুষ। কিন্তু তাদেরকে সম্ভবত এসব পরিকল্পনায় রাখা হয় না।


চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর শহর হিসেবে গৌরব করি। কিন্তু সেই গৌরব ম্লান করে দেয় এসব গ্রাম্যতা। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের শুধু অধঃপতনই হতে থাকবে।




***

আমি আর বেশিদিন লিখবো না ঠিক করেছিলাম। পাঠকের বিরক্তি আসার আগেই সরে যাওয়া উচিত। এখন হাতে যে দুয়েকটা প্রকল্প আছে সেগুলো লিখে শেষ করতে পারলেই হয়। এখন প্রতিটা দিনই অনিশ্চিত। কোনো না কোনো দুঃসংবাদ, ঝামেলা এসে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলে। তবু মনে মনে বলি, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ।

Friday, April 17, 2026

সুসংবাদ বনাম দুঃসংবাদ

একই সাথে দুটো সংবাদ এসে হাজির। একটা সুসংবাদ, আরেকটা দুঃসংবাদ। সুসংবাদটা এসেছে কাছ থেকে। দুঃসংবাদ একটু দূর থেকে। কখনো কখনো জীবন মানুষকে এমন অবস্থায় দাঁড় করায়। তখন সে বুঝে উঠতে পারে না তার কী করা উচিত। এই দেশের বাস্তবতায় আমাদের প্রতিনিয়ত এমনসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, আমরা আজকে যা করছি আগামীকাল তার বিপরীত অবস্থায় চলে যেতে পারি। সুসংবাদ উদযাপনেও আমাদের আশঙ্কা থাকে। নির্বিকার দার্শনিক কাঠিন্য নিয়ে সারা পৃথিবীকে উপেক্ষা করার শক্তি সবার থাকে না। যদি থাকতো তাহলে জীবনটা আরো সহনীয় হতো। সুসংবাদটা অনেককে আনন্দিত করেছে, কিন্তু দুঃসংবাদটা কাউকে প্রভাবিত করেনি। ওটা একান্ত আমার নিজস্ব। যদিও বেশ কিছুদিন ধরে জানি দুঃসংবাদটা আসছে। ওটা অনিবার্যই ছিল। তবু সুসংবাদটা ম্লান হয়ে গেছে দুঃসংবাদের ছায়ায়।

And I knew this would happen, and it has finally happened. Who knows what fate is waiting for us? We all reach the final destination. Goodbye, my friend. We had 42 years together...

Wednesday, April 15, 2026

ইংরেজদের নারী প্রহার আইন ১৮০০

"And as, by the laws of England, a man may beat his wife with a stick which will not endanger the breaking of a limb, or may confine her in a room, the women dare not even give their tongues too much liberty."

(ইংল্যান্ডের আইন অনুযায়ী একজন মানুষ তার স্ত্রীকে এমন লাঠি দিয়ে মারতে পারে যা তার অঙ্গহানির কারণ হবে না, বা তাকে ঘরে বন্দী করে রাখতে পারে। তাই নারীরা এমনকি মুখ খোলার ব্যাপারেও খুব একটা স্বাধীনতা পায় না।)

[মাসির-ই-তালিবী, মির্জা আবু তালেব খান, ১৮০১]

একজন ভারতীয়ের চোখে লন্ডনের বর্ননার এই অংশটা চমকে ওঠার মতো। মাত্র দুশো বছর আগেও ইংল্যান্ডে এরকম আইন ছিল?

ব্যাপারটা নিয়ে খোঁজখবর করতেই জানলাম সত্যি এরকম আইন ছিল।

ইংল্যান্ডের সাধারণ আইন বা অনুযায়ী, সে সময় স্বামীর হাতে স্ত্রীর শারীরিক লাঞ্ছনা বা "Moderate Correction" (পরিমিত শাসন) একপ্রকার স্বীকৃত ছিল। স্যার উইলিয়াম ব্ল্যাকস্টোন তার বিখ্যাত গ্রন্থ Commentaries on the Laws of England (১৭৬৫)-এ লিখেছিলেন যে, পুরনো আইন অনুযায়ী স্বামী তার স্ত্রীকে "পরিমিতভাবে শাসন" করার অধিকার রাখতেন।

তবে ১৮৫৩ সালের আইন: 'Act for the Better Prevention and Punishment of Aggravated Assaults upon Women and Children' পাসের মাধ্যমে নারীদের ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়। ১৮৯১ সালের বিখ্যাত 'Jackson Case': এই মামলার রায়ে আদালত ঘোষণা করে যে, স্বামী তার স্ত্রীকে জোর করে আটকে রাখতে পারবেন না। এর মাধ্যমেই মূলত স্ত্রীকে ঘরে বন্দি করে রাখার আইনি বৈধতা চিরতরে শেষ হয়।


Saturday, April 11, 2026

স্বগত স্বীকারোক্তি অথবা আত্মপক্ষ সমর্থন

আমার প্রায় প্রতিটি বইয়ের সূচনায় একটা স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য থাকে। যেখানে আমি বইটা কোন প্রেক্ষিতে লিখেছি তার একটা দায়মুক্তি দেবার চেষ্টা করেছি। পাঠক যেন বইটা কেনার আগে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এটা তার জন্য উপযুক্ত কিনা। সব বই সবার ভালো লাগবে না। একই বইতে কেউ A+ দিতে পারে, আবার আরেকজন D-ও দিতে পারে। বিষয়বস্তু, পাঠরুচি, উপস্থাপনভঙ্গি, এমনকি পড়ার সময় পাঠকের মানসিক অবস্থা কিংবা পরিবেশ অনেক কিছুই এই পার্থক্যের কারণ হয়। আমি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম একটা ক্লাসিক বইয়ের ক্ষেত্রেও দেখেছি আমার দেখা শতকরা ৯৯ জন বইটা অসম্ভব পছন্দ করেছে, কিন্তু ১ জন পড়ে বলেছে ওটা নিতান্তই ফালতু একটা বই। কিছুই বোঝেনি সে। আমি সেই একজনকে চিনি, তার পাঠরুচি জানি, তাই খুব অবাক হয়েছি এমন একটা মন্তব্য পেয়ে।


আমার নিজের বইয়ের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা আছে। আমার সবচেয়ে জনপ্রিয় বলে কথিত ‘থাংলিয়ানা’ সম্পর্কে একজন মন্তব্য করেছেন- মূল বইটা তিনি পড়েছেন, অনুবাদে আমি পুরো বইটার সবটুকু তুলে ধরিনি। ফলে পরিপূর্ণ ইতিহাস উঠে আসেনি ওখানে। যিনি এটা বলেছেন তিনি আমার অচেনা, ফলে আমি বলতে পারছি না কোন প্রেক্ষিতে তিনি কথাটা বলেছেন। সম্পূর্ণ বলতে তিনি কী বুঝিয়েছেন, সেটাও স্পষ্ট নয়। কিন্তু বইটার ভূমিকাতে আমি স্পষ্ট করে বলেছি ওটা সম্পূর্ণ অনুবাদ নয়। ওটা মূল বই থেকে বেছে নেয়া নির্বাচিত কিছু অংশের অনুবাদ। অনুবাদগুলো আমি এমনভাবে সাজিয়েছি যাতে পাঠকের মনে হয় তিনি খণ্ডিত কোনো বই পড়ছেন না। গল্পের ঢং-এ লেখার চেষ্টা করেছি। আমার সব অনুবাদে আমি একটা নিয়ম মেনে চলি। আমার কাছে অনুবাদ মানে শব্দার্থ নয়। অনুবাদ হলো একটা গল্পকে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় এমনভাবে বহন করে নিয়ে যাওয়া যেন মূল গল্পটা আহত না হয়। এটা করার জন্য তিনটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রথম পর্বে শব্দার্থ অনুবাদ, যেখানে আক্ষরিক অর্থে মূল ভাষায় যা বলা হয়েছে সেভাবে লেখা। দ্বিতীয় পর্বে, বাংলা ভাষায় সেই বাক্যগুলোকে পুনর্লিখন যাতে ভাষাটা প্রাণবন্ত হয়। তৃতীয় পর্বে, নিজস্ব স্টাইল বা শব্দচয়ন দিয়ে বাক্যগুলো সাজানো। এই শেষ পর্বটা আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটা দিয়ে একটা অনুবাদও মৌলিক গল্পের মতো উপভোগ্য হতে পারে। আমি সেবা প্রকাশনীর আশির দশকের অনুবাদগুলোতে এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে দেখেছি। সেখান থেকে নিজেও গ্রহন করেছি। পুরোপুরি সফল হয়েছি বলবো না, কিন্তু চেষ্টা করে যাচ্ছি। আরো কয়েকজনকে সেই পদ্ধতি নিতে দেখেছি, যার মধ্যে আলভি আহমেদ অন্যতম। তাঁর অনুবাদ পড়তে আমার একবিন্দু ক্লান্তি লাগে না। 


এই যে এতগুলো পন্থা অনুসরন করে অনুবাদ করা, এটা খুব খুব ক্লান্তিকর একটা কাজ। এই ধৈর্যটা না থাকলে অনুবাদ কাজ না করাই ভালো। কারণ অনেক ক্ষেত্রে দেখেছি- যে গল্প আমি ইংরেজিতে গড়গড় করে পড়তে পারছি, বাংলা ভাষায় সেটা পড়তে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়ে পড়ছি। তাতে অনুমান করি, অনুবাদক প্রথম পর্ব করেই লেখাটা ছাপাতে দিয়েছেন। আমি অনেক বড় অনুবাদকের গল্পেও এই ব্যাপারটা দেখেছি। আমি যখন একটা অনুবাদ পড়ি, তখন অনুদিত ভাষাতেই লেখাটা অনুভব করতে চাই। মূল ভাষার ব্যাকরণ আমার কাছে মূখ্য না। অনুদিত ভাষার ব্যাকরণেই বাক্যটা উপস্থাপন করতে হবে। অথচ দেখা যায় অনেকে মূল ভাষার ব্যাকরণকে জোর করে অনুদিত ভাষার বাক্য গঠনের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করছেন। বাংলা ভাষার বাক্যটা যদি শুদ্ধ না হয়, সেই অনুবাদের অর্থ কী? সেই গল্প আমি অনুভব করবো কি করে?

পাঠক হিসেবে আমি সেই গল্পই পড়তে চাই যেটা আমার ভাষার চরিত্র অনুযায়ী অনুবাদ করা হয়েছে। আমার কাছে গল্পটাই আসল। অন্য ভাষার ব্যাকরণ নয়।


Wednesday, April 8, 2026

মানুষের পৃথিবীতে দানবের রাজত্ব

এক রাতের মধ্যে একটা সভ্যতা নিকেশ করে দেবার ঘোষণা দিতে পারে তেমন বিশ্ব উন্মাদ পৃথিবীতে আগে কখনো জন্মায়নি। শক্তিমানেরা যখন ধ্বংসের হুমকি দেয় সেটা তাদের পরাজিত হবারই বার্তা। আমেরিকা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তাদের ইতিহাসে কোনো বিজয়ের উদাহরণ নেই। বারবার ধ্বংস করাই তাদের নিয়তি। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাক, কোথাও জিততে পারেনি ওরা। শুধু ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে পুরো জনপদকে। আমেরিকা কখনো বুঝলো না ধ্বংস দিয়ে বিজয় উদযাপন হয় না। ধ্বংস কখনো বিজয়ের নিদর্শন নয়। এবারও প্রচলিত যুদ্ধ কৌশলে আমেরিকা পুরোপুরি পরাজিত বলেই এই ধ্বংসের হুংকার।

যদি এই হুমকি বাস্তবায়িত হয় আগামীকাল বাকী পৃথিবী অপেক্ষা করবে নজিরবিহীন একটা প্রলয়ের জন্য। কারণ এই দানবের হাতে সীমাহীন ক্ষমতা। এই দানবকে থামাতে পারে তেমন কেউ নেই এই নীল গ্রহে। হাজার ক্ষমতা থাকলেও সভ্য জগতে প্রকাশ্যে কোনো সুস্থ মানুষ এমন কথা উচ্চারণ করতে পারে আমি ভাবতেই পারি না। লোকটা নিঃসন্দেহে নিকৃষ্ট স্যাডিস্ট কিংবা বিকৃত মস্তিষ্ক!
আমি এখনো বিশ্বাস করতে চাই, পৃথিবীতে মানুষেরাই রাজত্ব করবে। বিকৃত মস্তিষ্কের দানবেরা নয়।
Threatening a civilization's heritage isn't a show of strength; it is a confession of cultural illiteracy and a war crime against history itself. Do not reveal your impotence again and again Mr Giant Clown!


সূত্র: আমেরিকার উন্মাদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়াতে ঘোষণা দিয়েছে আগামীকালের মধ্যে ইরানের সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে(পারমানবিক বোমা হামলা?)।

বোধশক্তিহীন এক অসভ্য, ইতর, অপরিমাণদর্শী অর্বাচীনের হাতে ক্ষমতা গেলে এমন কথাই শুনতে হয়। যে কথা হিটলারও বলতে সাহস করেনি। অথচ আমেরিকানরা এই উন্মাদকে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত করেছে। তাদের ভুলের কারণে পুরো পৃথিবীকে মূল্য দিতে হবে।

Tuesday, March 31, 2026

জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে

জাতীয়তাবাদ জিনিসটা সবসময় ভালো না। যদি একই সীমান্তের মধ্যে অন্য জাতির বসবাস থাকে তখন শক্তিশালী জাতীয়তাবাদ দুর্বল জাতিদের কাছে ফ্যাসিবাদ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। আমি যখন শক্তিশালী জাতির প্রতিনিধি হিসেবে দেশপ্রেমে গর্বিত হয়ে আমার জাতীয়তাবাদের শ্লোগান দেই, তখন হয়তো  আমার চোখের আড়ালে অন্য ক্ষুদ্র জাতিগুলো ভয়ে কুঁকড়ে যায়। নিঃসন্দেহে  যে কোনো মতবাদের চেয়ে মানবতাবাদ অনেক বেশি জরুরী। শিক্ষাদীক্ষায়  মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার জন্য যে কয়েকটি মন্ত্র আছে এটি তার মধ্যে অন্যতম। ব্যাপারটা শুধু জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রে নয়, জাতি, ধর্ম, বর্ন, গোত্র নির্বিশেষে সব শক্তিমানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যাকে আমরা ফ্যাসিবাদ বলছি, সেটা অনেকের ভেতরেই সুপ্ত অবস্থায় থাকে, অনুকূল পরিবেশ পেলেই প্রকাশ পায়। ভারত, বাংলাদেশ, বার্মা, ইসরায়েল কিংবা উগান্ডা বুরুণ্ডি সব দেশেই কমবেশি একই ঘটনা।


Monday, March 30, 2026

একুশ শতকের হিরোশিমা-নাগাসাকি

 ইরানের সাথে প্রচলিত যুদ্ধে পেরে উঠছে না আমেরিকা-ইসরায়েল একত্রিত হয়েও। এক মাস পার হয়ে গেছে। শুরু থেকে আমার আশঙ্কা ছিল আমেরিকা ইরানে আরেকটা হিরোশিমা-নাগাসাকি সৃষ্টি করবে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন সময়ের ব্যাপার। পৃথিবীতে নরক সৃষ্টির জন্য অমর হয়ে থাকবে ট্রাম্প নেতানিয়াহু। সম্ভবত হামলাটা ইসরায়েলের মাধ্যমে ঘটানো হবে। তাতে বৃহত্তর ইসরায়েল পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হবে আশপাশের দেশগুলো দখল করার মাধ্যমে।

আমার আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হোক।