Monday, February 23, 2026

প্রাণী জীবন

 আমরা যতক্ষণ বেঁচে থাকি স্বার্থপরের মতো জীবন কাটাই। এটা অনিবার্য এক স্বার্থপরতা। টিকে থাকার জন্য প্রাণীসুলভ স্বার্থপরতা। জগতের সব প্রাণী এই স্বার্থপরতা নিয়ে টিকে থাকে। মানুষ একটু ব্যতিক্রম। বন্ধু স্বজন ভালো না থাকলে সেও ভালো থাকে না। বিষন্নতা গ্রাস করে তাকে। সেও একটু একটু ক্ষয়ে যেতে থাকে। কিন্তু যার দায়িত্বে একটা পরিবার আছে তাকে  এসব গ্রাস করলে চলবে না। টিকে থাকার জন্য তাকে স্বার্থপর হয়ে, অনেক কিছু ভুলে প্রতিদিন বাঁচতে হয়। গ্লাণি, অপরাধবোধ এসব তখন কাজ করবে না। প্রতিটি প্রাণী আসলে নিজেকেই ভালো রাখতে চেষ্টা করে। নিজের জন্যই বাঁচে। সে যতক্ষণ বাঁচুক। 

প্রবোধ দেবার চেষ্টা করছি না। কিন্তু এই সান্ত্বনাবাক্য কেবল নিজের জন্যই খাটে। কারণ যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। কঠিন অবস্থায় পড়ে গেছে আমার প্রিয় কয়েকজন মানুষ। পরিবার এবং পরিবারের বাইরে। একসময় নাম ধরে বলতাম, অমুক ভালো নেই, তমুকের এই সমস্যা। এখন সংখ্যাটা এত বেশি হয়ে গেছে, আর নাম বলা যাচ্ছে না। তখন নিজের সমস্যাকে খুব তুচ্ছ মনে হয়। মনে হয় এখনো তো পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়িনি। এখনো যুদ্ধ করতে পারছি। প্রতিদিনের যুদ্ধে যে মানসিক ও শারিরীক শক্তি দরকার, সেটা এখনো তো আছে। এখনো তো বলতে পারছি, লিখতে পারছি।


যেদিন ‘ভালো নেই’ কথাটা আর লিখতে পারবো না, সেদিনই শেষ। লেখক জীবন এবং বাস্তব জীবন, দুটোই।


Sunday, February 22, 2026

নির্বাচন এবং অতঃপর

১২ ফেব্রুয়ারী তারিখে নির্বাচনটা হয়ে গেল। কমিশন সূত্রমতে ৬০ ভাগ মানুষ ভোট দিয়েছে। আমি দুটো ভোটকেন্দ্রে গিয়েছি। লোকজনের ভিড় দেখিনি তেমন। ভোট সুষ্ঠু হয়েছে বলেই মনে হয়েছে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে। একদল মানুষ জামাতকে ক্ষমতায় বসাতে মরিয়া ছিল। আরেকদল জামাতকে ঠেকাতে মরিয়া ছিল। দুই পক্ষের চেষ্টা শান্তিপূর্ণ ছিল। তেমন দাঙ্গাহাঙ্গামা হয়নি। দুয়েকটা বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া ভালোই হয়েছে নির্বাচন। অবশেষে ২১২ আসন নিয়ে বিএনপি জোট সরকার গঠন করেছে। ৭৭ আসন নিয়ে জামাত বিরোধী দলে বসেছে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ বলে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। না হলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারতো। যাই হোক, এখন আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে যাবে?


বিএনপি ক্ষমতা নেবার পর প্রগতিশীল ফ্রন্টে আনন্দের বন্যা। কেননা গত দেড় বছর তাদের জন্য একটা অস্বস্তিকর সময় ছিল। দেশে কারো কোনো নিয়ন্ত্রন ছিল না। মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ জঙ্গীবাদী দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। প্রতিদিন নানান হুংকার শোনা যেতো। পারলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে এমন হৈ হল্লা। একদল উন্মাদের হাতে পড়ে গিয়েছিল দেশটা। এখন পাগলের দল গর্তে ঢুকে পড়েছে আপাতত। আবারো সুযোগ পেলে মাথাচাড়া দেবে। দেশ সবসময় মধ্যপন্থীদের হাতে নিরাপদ, এটাই প্রমাণিত। আমরা কখনোই উগ্রতার পক্ষে ছিলাম না। উগ্রতা একটা দেশকে কি বানিয়ে ফেলে সেটা সিরিয়া বা আফগানিস্তানের দিকে তাকালে বোঝা যায়।


কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিন্ত থাকার উপায় নেই। আমাদের চারপাশে জটিল ভূ-রাজনীতির খেলা। আমেরিকা-রাশিয়া-চীন-ভারত প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ আছে। সেই স্বার্থে আঘাত লাগলে নির্বাচিত সরকারও নিরাপদ থাকে না। আপাতত রাজনৈতিক অঙ্গন শান্ত হয়েছে। এটাও সাময়িক। ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে যাবে কদিন পরেই। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে সেটা বোঝা যাচ্ছে।


সবচেয়ে স্বস্তির কথা হলো একটা ব্যর্থ অথর্ব সরকারের বিদায়। আঠারো মাসে কাজের কাজ কিছু করতে না পারলেও অপকর্মের পরিমাণ নেহায়েত কম নয়। অনেক দেশ বিরোধী চুক্তিটুক্তি করেছে। এমন কিছু ঝামেলা রেখে গেছে যেগুলা এই সরকারকে ভোগাবে। দেশের কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে তাদের এগিয়ে আসতে দেখিনি। অদ্ভুত একটা নীরবতা ছিল যে কোনো অরাজকতার সময়। ড. ইউনুসকে নিয়ে আমি সবচেয়ে হতাশ হয়েছি। আমি রীতিমত প্রতারিত বোধ করেছি তাঁর কাজকর্ম দেখে। দেশের কোনো সংকটে তাঁর হস্তক্ষেপ দেখিনি।


Monday, February 9, 2026

নির্বাচন ২০২৬

 আমার জীবনে আমি মাত্র তিনবার ভোট দিয়েছি। তিনবারের অভিজ্ঞতায় আমি উপলব্ধি করেছি বাংলাদেশে নির্বাচন বা গণতন্ত্র নামের যেটাকে গেলানো হয় সেটা একটা প্রহসন। নির্বাচনের আগে আমাকে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার একটাও পালিত হয়নি। ফলে আমি প্রতারিত বোধ করেছিলাম। অতঃপর আমি ব্যক্তিগতভাবে বাকী জীবনের জন্য একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমি আর কখনো বাংলাদেশের কোনো নির্বাচনে অংশ নেবো না। গত দেড় যুগ আমি সেই সিদ্ধান্তে অটল আছি। ভবিষ্যতেও থাকবো। আমি বিশ্বাস করি ভোট দেয়া যেমন একটা অধিকার, তেমনি না দেয়াও একটি নাগরিক অধিকার। আমাদের দেশে যারা নির্বাচনে দাঁড়ায় তারা যত ভালো মানুষই হোক না কেন, ভোটের সময় তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এমনসব প্রতিশ্রুতি কিংবা বাণী দিতে থাকে, সেটা ভোটার তো বটেই তাদের নিজের কাছেও আত্মপ্রতারণার সামিল। এবারের নির্বাচন তো আরো জটিল। এখানে মিথ্যার ছড়াছড়ি আরো অনেক বেশি। যখন যেদিকে সুবিধা হচ্ছে সেরকম প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জটিল বিষয় হলো গণভোট। এটা থেকে মানুষ কি পাবে সেটা নিজেরাও জানে না। যারা ভোট দিতে বলছে তারাও বোঝে কিনা সন্দেহ আছে। কিন্তু এদেশে গণভোটের ইতিহাস বলে সবসময় হ্যাঁ ভোট জেতে। এবারও তাই হতে পারে। সাধারণভাবে গণভোটের অন্তর্নিহিত বার্তা হলো আয়োজককে হ্যাঁ বলুন। এবার আর অন্তর্নিহিত বার্তা নেই। সরাসরি হ্যাঁ ভোট দিতে বলা হচ্ছে আয়োজনকদের পক্ষ থেকে। সেই সুযোগ তাদের আছে। সুতরাং এখানে হ্যাঁ জিতুক, কিংবা না জিতুক, আমাদের মতো নির্দলীয় মানুষদের কোনো লাভ নেই। যারা ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ি করবে এটা তাদের ইস্যু। কিন্তু এই নির্বাচন নিয়ে আমার মতো সাধারণ মানুষদের একটাই আশাবাদ। যে দলই জিতুক, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, পুরো প্রক্রিয়াটা যেন শান্তিপূর্ণ হয়। মানুষের জীবন যেন নিরাপদ থাকে। দেশের অর্থনীতির চাকা যেন সচল থাকে। দেশটা সিঙ্গাপুর হবার দরকার নাই, মানুষ কাজকর্ম করে দুটো খেতে পাবে, ওই সুযোগটা যেন অব্যাহত থাকে।


Saturday, February 7, 2026

পেশাদারিত্ব কী

পেশাদারিত্ব।

এই শব্দটা অনেকে বোঝেন না। মনে করেন এটা কেবল পেশা সংক্রান্ত কোনো বিষয়। মানে যিনি যে পেশায় আছেন সেই পেশার দক্ষতা। ধারণাটা আংশিক সত্যি, কিন্তু পুরো ব্যাপারটা একটু আলাদা। পেশাদারিত্ব মানে হলো আপনার যে কাজটা যখন করা দরকার আপনি সেটা ঠিকমত করতে পারছেন কিনা। পাড়ার মুদি দোকানদার থেকে কোম্পানির সিইও পর্যন্ত এটা বিস্তৃত হতে পারে। পেশাদারিত্ব না থাকলে লোকে আপনার সাথে কাজ করে আনন্দ পাবে না। এটা না থাকলে মুদি দোকানী কাস্টমার পাবে না, কোম্পানির সিইও কর্পোরেট দক্ষতা দেখাতে পারবেন না। পেশাদারিত্বের প্রধান উপাদান হলো অডিয়েন্সের প্রতি আপনার আচরণ এবং মনোভাব। অডিয়েন্সটা কী? সেটা আপনার কাস্টমার হতে পারে, আপনার সহকর্মীও হতে পারে কিংবা আপনার ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ হতে পারে।

সহজে বোঝানোর জন্য আমাদের পাড়ার দুটো মুদি দোকানের উদাহরণ দিচ্ছি। দুটো দোকানই একইরকম জিনিসপত্র পাওয়া যায়। দুটো দোকান পাশাপাশি অবস্থিত। ধরা যাক একটা দোকান চালায় হাবিল, অন্যটা চালায় কাবিল। আমি একসময় হাবিলের দোকান থেকে কেনাকাটা করতাম। বছরখানেক আগে কাবিলের দোকানটা খোলার পর আমি কাবিলের দোকানে বেশি কেনাকাটা করি। কারণ হাবিল পুরোনো হলেও কাবিলের দোকানে গিয়ে আমি আরামবোধ করি।
কিন্তু সেই আরামের উৎস কী? খুব বেশি কিছু না। কাবিলের হাসিমুখ। আন্তরিকতা। আমি তার দোকানে ঢুকলেই সে কিভাবে আমার সন্তুষ্টি অর্জন করবে সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সবচেয়ে ভালো জিনিসটা দেবার জন্য নিজ থেকে এগিয়ে আসে। ওর দোকানে যেটা থাকে না সেটা পাশের দোকান থেকে এনে দেয়। অর্থাৎ আমি কাবিলের দোকানে গেলে নিশ্চিন্ত হয়ে যাই এখানে সব পাওয়া যাবে।
অথচ হাবিলের দোকানে জিনিসপত্র সব থাকলেও এই ব্যবহারটা নাই। সেও অধিকাংশ সময়ে হাসিমুখে কথা বলে, আদাব সালাম দেয়। কিন্তু মাঝে মাঝে সে অচেনা আচরণ করে। এই 'মাঝে মাঝে' অন্যরকম আচরণ আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে। যেমন, আমার চেয়ে বড়লোক কোনো ক্রেতা তার দোকানে ঢুকলে সে আমার দিকে তাকানোর প্রয়োজনও বোধ করে না। আমি গিয়ে গোবেচারার মতো দাঁড়িয়ে আছি, সে বড়লোক কাস্টমার নিয়ে ব্যস্ত।
ওই কাস্টমার বিদায় হলে সে আমার কাছে জানতে চায়, কি লাগবে? আমি ততক্ষণে খুব বিরক্ত হয়ে গেছি। মুখ ফুটে কিছু না বলে চুপচাপ জিনিস নিয়ে চলে এসেছি। এরকম কয়েকবার ঘটার পর ওর দোকানে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছি।
কাবিল এদিক থেকে ব্যতিক্রম। তার দোকানে যে লেভেলের কাস্টমারই ঢুকুক, সে সবার কাছে একবার একবার জিজ্ঞেস করে ফেলবে কি লাগবে, কেন এসেছেন? ওখানে গিয়ে বোকার মতো কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না।
এটাকেই বলে পেশাদারিত্ব। এই পেশাদারিত্বের কারণে পাশাপাশি একই জিনিস বিক্রি করেও হাবিল বসে বসে মাছি মারে, আর কাবিলের দোকানে মৌমাছির মতো ভিড় থাকে দিনরাত। মজার ব্যাপার হলো, মাত্র দুবছর আগেও কাবিল ছিল হাবিলের দোকানের সামান্য কর্মচারী। এখন সে কাবিলের চেয়ে অনেক ব্যস্ত ব্যবসায়ী। হাবিলের অবস্থান সমাজের উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ অংশে, কাবিলের অবস্থান সমাজের নিন্মশ্রেনীতে। কিন্তু পেশাদারিত্বের অভাবে উচ্চ মর্যাদা নিয়েও হাবিল পরাজিত হয়েছে কাবিলের কাছে।
হাবিলের ব্যবসাটা গড়ে তুলেছিলেন তার অর্ধশিক্ষিত বাবা, তিনি সমাজের নীচ থেকে উঠে এসেছিলেন। তিনি যখন দায়িত্বে ছিলেন তখন ওটা পাড়ার সবচেয়ে জমজমাট দোকান ছিল, তিনি ওপরে ওঠার জন্য পেশাদারিত্বের চূড়ান্ত করেছেন। কাস্টমারদের মন জয় করার সব কায়দা করেছেন। তাঁর শিক্ষিত পুত্র দায়িত্ব নেবার পর ব্যবসায় ধ্বস নেমেছে। ছেলেটা বুঝতে পারেনি তার বাবা কোন পেশাদারিত্ব দিয়ে ব্যবসাটা দাঁড় করিয়েছিল। বাবা যেখানে পাড়ার সেরা দোকানটা চালিয়েছিল, পুত্র আসার পর টিকে থাকতেই হিমশিম খাচ্ছে।
আমি দোকানীর উদাহরণ দিয়ে পেশাদারিত্ব ব্যাখ্যা করলাম। কিন্তু এই উদাহরণ আমাদের সমাজের সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কর্পোরেট অফিস, পত্রিকা, প্রকাশনা, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, থানা, পুলিশ, আদালত, সচিবালয় সর্বত্র।
আরেকটা উদাহরণ দেই। লেখালেখির সূত্রে আমি বিভিন্ন পত্রিকা, প্রকাশনা, লেখক সম্পাদকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হয় দেশে কিংবা বিদেশে। এখানেও আমি পেশাদারিত্বের এই পার্থক্যটা টের পাই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের অভাব এত প্রকট যে তাদের সাথে আমি কাজ করতেই আগ্রহী নই। আমি খুব বেছে বেছে প্রকাশক বা পত্রিকা নির্বাচিত করি। পেশাদার নয় এমন কাউকে আমি কাজ দেই না। এসব ক্ষেত্রে আমি যে বিষয়টাকে গুরুত্ব দেই সেটা হলো মেইল/মেসেজের রেসপন্স। আমি যখন কাউকে মেসেজ দেই, সেটার জবাব আশা করি। আমার অধিকাংশ কাজ বা যোগাযোগ মেইলেই হয়। খুব জরুরী না হলে আমি মেসেঞ্জারে কাউকে নক করি না। মেইল বা মেসেঞ্জারের জবাবের ধরণ দেখে আমি বুঝতে পারি ইনি পেশাদার কিংবা অপেশাদার। যদি যৌক্তিক সময়ে জবাব না পাই, তখন আমি ধরে নেই তিনি পেশাদার নন। তার সাথে আমার কাজ হবে না। আমি অনেক প্রতিষ্ঠানকে বাতিল করেছি শুধুমাত্র এই একটা কারণে। পাওনা টাকা ফেরত না দেবার চেয়েও এটা আমার কাছে গুরুতর ব্যাপার।
বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা ঘটে বলে আলাদা করে বলতে হচ্ছে। এদেশে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অপেশাদার বিষয় হলো মেইলের জবাব না দেয়া কিংবা প্রাপ্তি স্বীকার না করা। এটা আমি আরো অনেকবার বলেছি। অনেককে মেইল পাঠানোর পরে মেসেঞ্জারে গিয়ে কিংবা ফোন করে বলতে হয় আপনাকে মেইল দিয়েছি। এটা কি ইচ্ছাকৃত কিনা জানি না। অন্যপক্ষের অবস্থা তো জানার উপায় নেই। অনেকে হয়তো নিয়মিত মেইল চেক করেন না। কিন্তু ব্যস্ততা কোনো অজুহাত হতে পারে না। আমার আগের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় দৈনিক শতাধিক মেইলের জবাব দিতে হতো আমার। কোনো মেইল ২৪ ঘন্টা জবাব না দেয়া ছিল অপরাধের সামিল। দুর্ভাগ্যজনক হলো মেইলের জবাব না দেবার এই বিষয়টা বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেই দেখেছি। অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে এটা খুব কম ঘটেছে। একদম অচেনা কেউ হলেও জবাব পেয়েছি। বাংলাদেশিদের মতো কখনো লা-জওয়াব অবস্থা দেখিনি।
এই দুটো ব্যক্তিগত উদাহরণ দিয়ে আমি আসলে একটা জাতীয় সমস্যার কথা বলতে চাই। আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক গুরুতর সমস্যা আছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা নিরাপত্তা ইত্যাদি। কিন্তু তার সাথে আরেকটা যুক্ত হওয়া উচিত। পেশাদারীত্বের অভাব।
আমাদের সবগুলো সেক্টরে পেশাদারিত্বের অভাব এত বেশি সেটার বিস্তৃতি নিয়ে বলাই মুশকিল। আইন- আদালত থেকে সচিবালয়ের অফিসপাড়া, ডাক্তার- হাসপাতাল থেকে বাজারঘাট, নাজিরহাট থেকে দোহাজারি, টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, পতেঙ্গা থেকে কালুরঘাট সবখানে একই অবস্থা। পেশাদারিত্ব আমাদের নৈতিকার একটা অংশ। নৈতিকতা নিজের জীবন থেকে শিখতে হয়। স্কুল কলেজে এটা পড়ানো হয় না। আপনি যতই শিক্ষিত হোন, যতই অভিজ্ঞ হোন না কেন, আপনার মধ্যে যদি পেশাদারিত্ববোধ না থাকে তাহলে কোনো কিছুতে আপনি উন্নতি করতে পারবেন না।
কথার মাঝখানে একজন বলে উঠলেন- পেশাদারিত্ব জিনিসটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে দেন।
বললাম, নিজের দায়িত্বটা আন্তরিকতার সাথে পালন করার নামই পেশাদারিত্ব।
আমাদের সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশের মধ্যে পেশাদারিত্ব নেই। কেন নেই? কারণ আমরা যারা সাধারণ মানুষ বলে পরিচিত, আমরাই তো সরকারের সেইসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। আ্মাদের মধ্যেই পেশাদারিত্ব নেই। ওইসব প্রতিষ্ঠানে কিভাবে থাকবে? ওখানে তো আমাদের মতো মানুষেরাই কাজ করে। কিছু ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। কিন্তু সেই ব্যতিকর্মী মানুষগুলো টিকতে পারে না কুৎসিত সিস্টেমের কারণে। সেই সিস্টেম কি কখনো বদলাবে? আশাবাদী হবার মতো কোনো লক্ষণ এখনো দেখিনি।
তাই বলে আপনি কি হাল ছেড়ে দেবেন? আমি হাল ছাড়িনি। আমি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। নিজেকে জয় করেছি। তারপর আপনাদের বলছি। হ্যাঁ, রাস্তায় নেমে ভাঙ্গচুর বিপ্লব করার চেয়ে এটা অনেক বেশি কঠিন। তবু অসম্ভব নয়। চেষ্টা করে দেখুন। লেগে থাকুন। ব্যর্থ হতে হতে আপনি সফল হবেন একদিন। আমার বিশ্বাস আপনি পারবেন। নেহায়েত আপনি যদি না পারেন আপনার সন্তানকে শিক্ষাটা তুলে দিন। তাহলে এখন না হলেও পঞ্চাশ বছর পরের বাংলাদেশটা বদলাবে।

আমি কেন উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলাম?

আমি নন-ফিকশন লেখক। আমার লেখালেখির মূল ফোকাস ইতিহাস। কিন্তু মাঝে মাঝে আমি কিছু গল্প লেখার চেষ্টা করেছি। সেগুলো নিছক অবসর কাটাবার উদ্দেশ্যে। তার মধ্যে কিছু গল্প লিখেছি গল্পের ছলে ইতিহাসকে পাঠকের কাছে তুলে ধরার জন্য। আরো বহুবছর আগে, আমি একটা উপন্যাস লিখতে বসেছিলাম। সেটা কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ ছিল না। আমি নিতান্তই অপরিচিত লেখক, আমার লেখা উপন্যাস পড়ার পাঠক পাওয়া যাবে না বলে আমি শতভাগ নিশ্চিত। তবু আমি সেই উপন্যাসটি লিখতে চেষ্টা করছিলাম বহুবছর ধরে। অর্ধেক লেখার পর থেমেও গিয়েছিলাম। প্রায় অর্ধযুগ ফেলে রাখার পর আবার যখন শুরু করলাম তখন আর আগের মতো এগোতে পারছিলাম না। না পারার কারণ ছিল আমি এখানেও গল্পের ছলে ইতিহাস গেলানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু যে সময়কাল নিয়ে আমি কাজটা করতে যাচ্ছিলাম সেই সময়কালের ঘটনাগুলোকে সমন্বয় করতে গিয়ে একটা ঝামেলার মধ্যে পড়ে গেলাম। আমার গল্পের চরিত্রগুলো কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে জড়িত ছিল। সেই ঘটনাগুলো সত্যি ঘটেছিল। আমার উপন্যাসের চরিত্রগুলো সেখানে উপস্থিত ছিল। সমস্যা হলো তাদের উপস্থিতিকে বাস্তবসম্মত করার জন্য সময়কালকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন তার ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে। সেখানে গিয়ে আমি মুশকিলে পড়ে গেলাম। উপন্যাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে আমি যে বয়সে উপস্থাপন করেছিলাম, সেই ঘটনার মধ্যে তাকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে হাজির করা যাচ্ছিল না। তাই গল্পটা বারবার হোঁচট খেতে খেতে থেমে গিয়েছিল। আমার দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও আটকে গেল সেখানে। আরো চার বছর পর আমি একদিন এক নির্ঘুম রাতে কীবোর্ড নাড়াতাড়া করতে করতে নতুন একটা গল্প লিখতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ লেখার পর অনুভব করলাম আমি আসলে নতুন গল্প লিখছি না। পুরোনো গল্পটাকে আমি নতুন একটা স্রোতের সাথে মিলিয়ে দিয়েছি। আমার উপন্যাসের নদী এবার এমন একটা গতি পেল এক যুগ আটকে থাকা গল্পটা কথা বলতে শুরু করলো। একটানা কয়েক মাস লেখার পর আমি আমার পছন্দের গন্তব্য খুঁজে পেলাম। উপন্যাসটির সমাপ্তিরেখায় পৌঁছে আমাকে চমকে দিল। কারণ আমি নিজেও এই সমাপ্তির কথা ভাবিনি। এটা উপন্যাসের নিজস্ব গতিতে, নতুন স্রোতের সাথে মিলেমিশে তৈরি হয়েছে। আমার করার কিছু ছিল না। শেষ করার পর ওটা একটা ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হলো। আমার আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত করে পাঠক সাদরে বরণ করলো গল্পটাকে। জীবনের প্রথম ফিকশন নিয়ে আমি আনন্দিত। সেটাই শেষ নয়। পত্রিকায় প্রকাশের পরপর কয়েকজন প্রকাশক যোগাযোগ করলেন গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার জন্য। আমি তখনো স্থির করিনি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা উচিত হবে কিনা। কাকে দেয়া উচিত। গ্রন্থাকারে প্রকাশের জন্য উপন্যাসের পরিধি আরেকটু বাড়ানো দরকার। হাতে যথেষ্ট সময় ছিল। প্রকাশক ঠিক হবার পর সময় নিয়ে উপন্যাসটাকে চূড়ান্ত করলাম। খুব বেশি কাজ করার ছিল না। মাঝখানে বাদ দেয়া কিছু পর্বকে যোগ করা ছাড়া মূল গল্প অক্ষুন্ন আছে। ২০২৬ সালের বইমেলায় প্রকাশ হতে পারে। এখনো ঘোষণা করা হয়নি। প্রকাশকের কাজ শেষ হলে ঘোষণা আসবে। কিন্তু জীবনের প্রথম উপন্যাস প্রকাশের প্রাক্কালে নিজেকে প্রশ্ন করছি, উপন্যাসের কাজটা পাঠক কিভাবে গ্রহন করবে? আমার ৮টা বই প্রকাশিত হয়েছে গত কয়েক বছরে। সবগুলোই নন-ফিকশন। আমাকে ফিকশন লেখক হিসেবে পাঠক মেনে নেবে? এই জায়গাটা সত্যি খুব অনিশ্চিত। ইতিহাস লিখে যেটুকু সুনাম অর্জিত হয়েছে সেটা হুমকির মধ্যে পড়বে কিনা তাও ভাবতে হচ্ছে। আমার লেখক জীবনে এখনো পাঠকের কাছ থেকে কঠিন কোনো সমালোচনার মুখোমুখি হইনি। কমবেশি ভালো ভালো কথাই শোনা গেছে। আমার যোগ্যতার তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু ফিকশন লিখে সমালোচনার ধাক্কা সামলাতে হলে আমার আসল কাজগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আমার হাতে আরো দু-তিনটি কাজ রয়ে গেছে, যেগুলো শেষ করার পর লেখক জীবনের ইতি টানার কথা। সেই কাজগুলো ঠিক সময়ে করা যাবে কিনা এখন বলা যাচ্ছে না। এই বছরটা আরো অনিশ্চিত। অনেক কিছুই ঘটতে পারে। পত্রিকায় প্রকাশের সময় পাঠক যেভাবে সাদরে গ্রহন করেছে, গ্রন্থাকারে প্রকাশের পর যদি সেই সমাদর না করে তাহলে হতাশ হওয়া উচিত হবে? অনেক বড় লেখকেরাও নিজের উপন্যাস নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেন না। পাঠকের কাছ থেকে সবসময় সমাদর পান না। তাই বলে তারা লেখা থামিয়ে দেন?


আমার আশঙ্কা অন্য কারণে। আমি প্রথম উপন্যাসটি প্রকাশের আগেই আরেকটি উপন্যাসের কাজে হাত দিয়ে ফেলেছি। সেটিও এবার একটা  পত্রিকার ঈদসংখ্যায় প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। ওই উপন্যাসের কথা তেমন কেউ জানে না। প্রকাশের আগে কাউকে বলতে চাই না। প্রথম উপন্যাস প্রকাশের পর সাড়া পাওয়া না গেলে লেখক নিশ্চিতভাবে চুপসে যাবেন। ঈদসংখ্যার উপন্যাসটা নিয়ে আশাবাদী হবার কোনো সুযোগ থাকবে না। কারণ সেই উপন্যাসটি ভিন্ন চরিত্রের হলেও ইতিহাস জড়িয়ে আছে প্রথমটার মতো। আকারে বড় না হলেও ইতিহাসের পরিমাণ প্রথমটার চেয়েও বেশি। পাঠক পরপর দুবছরে দুটো উপন্যাস কিভাবে হজম করবে? 


অসন্তুষ্ট পাঠক যদি জিজ্ঞেস করে, আপনাকে দ্বিতীয় উপন্যাস লেখার আশকারা কে দিয়েছে?


আমি বলবো, ইতিহাস। এই ইতিহাসটা আমি নীরস তাত্ত্বিক উপায়ে উপস্থাপন করার বদলে গল্পের আশ্রয় নিয়েছি। গল্পটা বেড়ে গেলে উপন্যাসে রূপান্তরিত হয়েছে। সেই রূপান্তর কতটা সার্থক হলো সেটা বোঝার জন্য আরো দু’মাস অপেক্ষা করতে হবে। তার আগে নিজের জন্য একটা সান্ত্বনাবাক্য রেখে যাই।


"Ever tried. Ever failed. No matter. Try again. Fail again. Fail better."

Samuel Beckett, Worstward Ho (1983)


Friday, February 6, 2026

দেশ, মানুষ, রাজনীতি বিবিধ ভাবনা

১.
রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানো ছেড়ে দিয়েছি বহু বছর আগে। এই দলকানাদের দেশে রাজনীতির মাঠে বিচরণ করে ভণ্ড আর বুদ্ধি প্রতিবন্ধীরা। কিন্তু দেশ নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবতে বাধ্য হই। কারণ দেশের সাথে আমার অস্তিত্বের প্রশ্ন আছে। আমাদের জীবন একরকম কেটে গেছে। এখন আমার সন্তানদের পালা। ওদের জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে এইসব ভণ্ড আর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী রাজনৈতিক কর্মীদের কারণে। আমি নিশ্চিত সংখ্যায় তারা বেশি নয়, কিন্তু তাদের দাপটে সারা দেশ কাঁপে। কারণ তারা শক্তি প্রয়োগে নিজ নিজ মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মতবাদেরও কোনো ঠিক নেই। নিজেই নিজের মতবাদের বিপরীত আচরণ করে। যে আচরণ অন্য দলের কাছ থেকে অন্যায় বলে মনে করা হয়, নিজেরাই আবার সেই আচরণ করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। সুবিচার বা ন্যায়বিচার এই কথাগুলো সত্য হয় তখনই, যখন সেটা নিজের পক্ষে যায়। টিভি, পত্রিকা কিংবা সোশাল মিডিয়াতে যতটুকু দেখা যায় তাতে মনে হয় আমাদের জীবনটা আর কখনো শান্তির দেখা পাবে না। প্রতিটি দলই পরস্পর মারমুখী। কেউ কাউকে সহ্য করছে না।

আগামী সপ্তাহে একটা নির্বাচন আছে। সেই নির্বাচন নিয়ে আমি দেশে আবারো নতুন করে একটা অস্থিরতার আশঙ্কা করছি।

গত পনের বছর নির্বাচনে শুধু আওয়ামী লীগ থাকতো। যেনতেন করে একটা নির্বাচন প্রহসন করে নিজেদের ক্ষমতা রিনিউ করতো। এবার তার শাস্তিস্বরূপ আওয়ামী লীগ নিজেই খেলা থেকে আউট। বাকী আছে বিএনপি, জামাত এবং অল্প কিছু ছোট দল। মূল খেলা বিএনপি এবং জামাতের মধ্যে। কে জিতবে?

অনুমান করা হচ্ছে বিএনপি জিতবে। কারণ দেশে ওদের সমর্থনই বেশি। দীর্ঘদিন ক্ষমতা বঞ্চিত দলটা। কিন্তু বিএনপির অনেক দুর্নাম আছে। দলটির সমর্থক থাকলেও সাংগঠনিক দুর্বলতা অনেক বেশি। সেই তুলনায় জামাত অনেক শক্তিশালী। তাই এবার জামাত জিতে যাবার সম্ভাবনা আছে। তার চেয়েও বড় কথা হলো জামাতের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ক একটা গুজব শোনা যাচ্ছে। যদি ওটা সত্যি হয় তাহলে বিএনপি হেরে যাবে। জামাত সরকার গঠন করবে, বিএনপি বিরোধী দলের চেয়ারে বসবে। ব্যাপারটা কেমন শোনাচ্ছে? খুব অবাস্তব মনে হচ্ছে? মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এরকম কিছু মেনে নেবার জন্য আমাদের তৈরি থাকতে হবে।

জামাত ক্ষমতায় আসলে দেশে কী কী পরিবর্তন আসতে পারে? ওরা কথায় কথায় ইসলামী বিপ্লবের শ্লোগান দেয়। নির্বাচনে জিতলেও কী সেই শ্লোগান দেবে? আমার মনে হয় না। নির্বাচনে জেতার পর ওরা নানান ভুল ভ্রান্তি করতে শুরু করবে। এমনসব সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করবে যেগুলো সাধারণ মানুষের বিপক্ষে যাবে। মানুষ বিরক্ত হতে থাকবে। যারা এতকাল সরল বিশ্বাসে জামাতকে সমর্থন করেছিল তাদের সমর্থন হারাবে। সেই সুযোগে বিরোধী দলগুলো আবারো নতুন আন্দোলন শুরু করবে। আবারো অস্থির হবে দেশ।

এবার তৃতীয় একটা সম্ভাবনার কথা ভাবা যাক। আগামী সপ্তাহে যদি নির্বাচনটা না হয়? যদি এমন কিছু ঘটে নির্বাচন ভণ্ডুল হয়ে গেল, তাহলে?

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেবে। নতুন একটা সরকার গঠিত হতে পারে। সেই সরকারটা কাদের নিয়ে গঠিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর একেবারেই অনিশ্চিত।

কিন্তু সাধারণ মানুষের চাওয়া দেশটা যাদের হাতেই থাকুক, দেশের অর্থনীতির চাকা যেন সচল থাকে। দেশে যেন কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি না হয়। হোক সেটা গৃহযুদ্ধ কিংবা প্রতিবেশিদের সাথে যুদ্ধ। আমাদের মতো পেটে-ভাতে খাওয়ার দেশে যুদ্ধের মতো ব্যাপার হলো অভিশাপ। যে অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর অনেক দেশ। স্পষ্ট করে বলতে গেলে মুসলিম দেশ। নিজেদের ভালো নিজেদের বুঝতে হয়। নইলে অন্য দেশের মোড়ল এসে আমার ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। যে আমি নানান টানাপোড়েনের মধ্যেও এখনো একটা শান্তির পরিবেশে মাথার ওপর ছাদওয়ালা বাড়িতে ঘুমাচ্ছি, সেটা থাকবে না। শরনার্থী জীবন বেছে নিতে হবে আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মতো। সেই অভিশাপ থেকে বাংলাদেশ মুক্ত থাকুক।

২.
দেশ নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে মধ্যবিত্ত, স্বচ্ছল, শিক্ষিত, সম্পন্ন মানুষদের দুশ্চিন্তা সবসময় বেশি থাকে। এবার সেই দুশ্চিন্তার মধ্যে বাড়তি যোগ হলো নির্বাচন করছে এমন কিছু দল যাদের কোনো গণভিত্তি নেই। বড়জোর গোত্রভিত্তি আছে। এদের নীতি নৈতিকতার বালাই নেই। এদের মধ্যে গিরিগিটি, শকুন, ছারপোকা, তেলাপোকা চরিত্রের মানুষ প্রচুর। এদের কেউ কেউ হয়তো ধর্মীয় আবেগের জোয়ারে জিতে যাবে। আমাদেরকে সহ্য ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ এদেরই কেউ কেউ দেশের মন্ত্রণালয়ে বসবে। আগেও আমরা অনেক ইতর, অসভ্য লোককে দেখেছি সরকারে। এবার তাদের চেয়েও বেশি ঘৃণিত চরিত্র থাকতে পারে। মানুষ কী লোক চিনতে এত বড় ভুল করবে?













Tuesday, February 3, 2026

ইতিহাসের বর্জ্য

অনেকে ভুলে যায় ইতিহাস বদ্ধ ডোবা কিংবা পাঁকে আটকে থাকা জলাভূমি নয়। ইতিহাস হলো স্রোতস্বিনী নদীর মতো। সে তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে। নদীর অংশ না হয়েও স্রোতের সাথে অনেক খড়কুটো আগাছা কচুরিপানাও ভেসে চলে। সেইসব আগাছা শেষমেষ কোথায় হারিয়ে যায় কেউ জানে না। আগাছাদের কেউ মনে রাখে না। তবু একটা নদীতে নানা রকম আগাছা, কচুরিপানা কিংবা বর্জ্য পদার্থের উপস্থিতি কেউ অস্বীকার করতে পারে না। আবার সেটাকে কেউ নদীর অংশ বলে মনে করে না। আমরা আমাদের ভবিষ্যত বদলাতে পারি, নতুন করে নির্মান করতে পারি। কিন্তু অতীত একেবারেই অপরিবর্তনীয়। ফলে ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে আমার কখনো তেমন মাথাব্যথা হয় না। যেমন মাথাব্যথা হয় না কারো চিন্তার বিকৃতি কিংবা মস্তিষ্কের ভারসাম্যহীনতা নিয়েও।