Wednesday, October 14, 2026

তিসিডোর - বঙ্গভাষায় নিন্দাসাহিত্যের অনন্য নজির

 আট বছর আগে একটি বই পড়ে আমি টানা তিন রাত ঘুমাতে পারিনি। জীবনে এমন অভিজ্ঞতা আগে হয়নি। অভিজ্ঞতাটা সুখকর নয়, কুৎসিত। পরে অনুভূতিটা লিখে নিজেকে হালকা করেছিলাম। 

যে কোনো সাহিত্যকর্মকে তখনই সফল বলে ধরে নেওয়া হয় যখন সেটা পাঠকের মগজে দীর্ঘ সময় ধরে ঠাঁই করে নিতে পারে, ভাবনার জগতকে আলোড়িত করতে পারে। তেমন সাহিত্যপাঠের অভিজ্ঞতা পাঠকের জন্য যেমন সুখকর, লেখকের জন্যও তেমনি সৌভাগ্যের ব্যাপার। প্রতিটি নতুন গ্রন্থ পাঠকের জন্য নতুন একটি অভিজ্ঞতার জানালা খুলে দেয়। কেতকী কুশারী ডাইসন লিখিত ‘তিসিডোর’ পড়তে শুরু করার আগে তেমন একটি অভিজ্ঞতা লাভের আকাঙ্ক্ষা দানা বেঁধেছিল। বইটি পড়ার জন্য প্রাথমিক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল যখন শুনেছিলাম এই গ্রন্থটিতে বুদ্ধদেব বসু এবং জীবনানন্দ দাশের তুলনামূলক কিছু আলোচনা আছে। বুদ্ধদেব বসু এবং জীবনানন্দ দাশ দুজনই আমার প্রিয় সাহিত্যিক। দুজনের সাহিত্য এবং জীবন সম্পর্কে আমি বিশেষ আগ্রহ নিয়ে পড়াশোনা করেছি। তাই আরেকটি চমৎকার গ্রন্থ পাঠের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হওয়ার আশয়ায় তিসিডোর পড়তে শুরু করেছিলাম।

৯৪ পাতায় এসে জীবনানন্দ দাশের নামটা প্রথমবারের মতো উপস্থিত হয়। আশা করা গিয়েছিল এবার জীবনানন্দের কাব্য সাহিত্য নিয়ে আলোচনা আসবে। কিন্তু সেসব কিছুর নজির দেখা গেল না। আরও কিছুদূর পড়ার পর বোঝা গেল এই গ্রন্থের প্রধান উপজীব্য বিষয় জীবনানন্দের একটি অপ্রচারিত উপন্যাস—‘সফলতা নিষ্ফলতা’।

আমরা জানি জীবদ্দশায় জীবনানন্দ দাশ তাঁর কোনো উপন্যাস প্রকাশ করেননি। তিনি হয়তো সেগুলোকে ঠিক প্রকাশযোগ্য ভাবেননি। তাঁর মৃত্যুর কয়েক দশক পর ট্রাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ সাহিত্যকর্ম আবিষ্কার করেন তাঁর স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা। সেগুলো একে একে প্রকাশ পেতে থাকলে জীবনানন্দ দাশের সৃষ্টি সমগ্র বাংলা সাহিত্যে নতুন করে আলো ছড়াতে শুরু করে।

‘সফলতা নিষ্ফলতা’ উপন্যাসটি লোকচক্ষুর অন্তরালে ট্রাংকের ভেতর পাণ্ডুলিপি অবস্থায় ৭২ বছর ঘুমিয়ে ছিল। প্রকাশিত হওয়ার বিশ বছর পরও উপন্যাসটি ভূভারতে সুলভ নয়। বইটির নামই শোনেনি অধিকাংশ বাঙালি। ২০০৪ সালে প্রকাশিত হওয়ার পরও পড়েছেন হাতে গোনা অল্প কিছু মানুষ।

তিসিডোরের মাধ্যমে জানা গেল বিলম্বে প্রকাশিত উপন্যাসটি কেতকী কুশারী ডাইসনের হাতে পৌঁছানোর পর তিনি পড়ে ভীষণ মর্মাহত হন। এতই মর্মাহত হন যে তিনি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বৃহৎ সমালোচনা পুস্তক ‘তিসিডোর’ রচনা করেন। বিচিত্র কারণে তিনি পুস্তকটিকে উপন্যাস হিসেবে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু যে কোনো বিচারেই তিসিডোরকে উপন্যাস হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা কঠিন।

উপন্যাসটি শুরু হয়েছে লেখিকার নিজের পরিবার ও প্রতিবেশীদের কিছু স্মৃতিচারণ দিয়ে। ৯৪ পৃষ্ঠায় এসে জীবনানন্দের ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’ নিয়ে আলোচনা (নিন্দা বলাই শ্রেয়) শুরু হয়। দীর্ঘ সাড়ে তিনশো পৃষ্ঠার নিন্দালোচনা চলার পরে আবার লেখিকার ব্যক্তিগত পারিবারিক স্মৃতিচারণ চলে দুশো পৃষ্ঠার মতো। কিছু অংশে আবার ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু এবং বিশ্বরাজনীতির আলোচনা যুক্ত হয় যার সাথে জীবনানন্দের কোনো সম্পর্ক নেই। পাঁচশো পৃষ্ঠার পর আবার জীবনানন্দ আলোচনা (নিন্দা বলাই শ্রেয়) পুনর্বহাল হয় এবং উপন্যাসটির সমাপ্তি ঘটে ৮৫৫ পৃষ্ঠায় গিয়ে।

বইটির এই পর্বগুলোর মধ্যে মূল অংশ হলো তিসি ও তিল নামের দুই বোনের মধ্যে জীবনানন্দ দাশের ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’ নিয়ে আলোচনা এবং এই উপন্যাসের মধ্যেরকার সংলাপ ও ঘটনাবলী থেকে জীবনানন্দের কুৎসিত মানসিকতা, ব্যর্থতা, হীনমন্যতা আবিষ্কার (!)। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটি হলো বুদ্ধদেব বসুর প্রতি জীবনানন্দ দাশের তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষ। সেটিই তিসিডোরের মূল উপজীব্য। লেখিকা নিজেই তিসিডোর লেখার পেছনে প্রধান এই কারণটি উল্লেখ করেছেন।

‘সফলতা-নিষ্ফলতা’র রচনাকাল ১৯৩২ সাল। যখন কবি জীবনানন্দ দাশ জীবনের কঠিনতম একটি অধ্যায় অতিক্রম করছিলেন। যে সময়টায় তিনি প্রায় কয়েক বছর কবিতাশূন্য সময় কাটিয়েছেন। সেই অকেজো সময়ে পাতার পর পাতা গদ্য রচনা করে বস্তাবন্দী করে ফেলে রেখেছিলেন, যার কিছু উপন্যাস, কিছু গল্প। সেসব কোথাও প্রকাশ করার চেষ্টা করেননি, যতটা জানা যায় কারো সাথে আলোচনাও করেননি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর অর্ধশত বছর পর ভূমেন্দ্র গুহের সম্পাদনায় মাত্র ১২৩ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি প্রকাশ পায়। উপন্যাসটির সম্পাদকীয় বিবরণের অংশটি বিপুলায়তন এবং সেই অংশে সম্পাদক ভূমেন্দ্র গুহ অনুমান করছেন যে উপন্যাসের দুটি প্রধান চরিত্রের একজন হলেন বুদ্ধদেব বসু (বানেশ্বর) এবং অন্যটি জীবনানন্দ দাশ (নিখিল)।

ভূমেন্দ্র গুহের নানান বিষয়ে কেতকীর ব্যাপক আপত্তি আছে। তাঁর অনেক কথাই তিনি মানতে রাজি নন। কিন্তু এই উপন্যাসটির দুই চরিত্রকে নিয়ে ভূমেন্দ্রর অনুমানকে ভিত্তি করে তার ওপর তিনি নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা চড়িয়ে মূল ঘটনার তিলটিকে তাল বানিয়ে ‘তিসিডোর’ নামের ৮৫৫ পৃষ্ঠার বিপুলায়তনের গ্রন্থ লিখে ফেলেছেন।

তিসিডোরের বিরাট অংশ জুড়েই নানা ধরনের বিচিত্র বিশ্লেষণ দিয়ে যা বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে তার সারমর্ম হলো—জীবনানন্দ দাশ বুদ্ধদেব বসুর প্রতি তীব্রভাবে ঈর্ষা, ঘেন্না, বিদ্বেষ পোষণ করতেন। সেইসব ঘেন্নার প্রমাণ ‘সফলতা নিষ্ফলতা’র লাইনে লাইনে লুকোনো। অথচ জীবদ্দশায় সে মানসিকতা লুকিয়ে রেখেছিলেন। কারো কাছে প্রকাশ করেননি। বুদ্ধদেব বসু নিজেও কখনো জানতেন না জীবনবাবু তাঁকে কতখানি ঘেন্না করেন। এই অজ্ঞতার ফলে বুদ্ধদেব বসু সবসময় জীবনানন্দ দাশের প্রশংসায় ডুবে ছিলেন, সাহিত্য আসরের নানান কুটিল জায়গায় তিনি জীবনানন্দ দাশকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। বুদ্ধদেব বসু জীবদ্দশায় যেহেতু জানতে পারেননি তাঁকে মনে মনে অসম্মান করতেন জীবনবাবু, তাই বুদ্ধদেব বসুর মরনোত্তর সম্মান রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন কেতকী কুশারী ডাইসন। কথিত উপন্যাসের খসড়া বাক্যগুলোতে বুদ্ধদেব বসুকে স্নান করিয়ে নিজস্ব বিদ্বেষকে সাহিত্যায়ন করেছেন ‘তিসিডোর’ নামের কথিত উপন্যাসে। কাঠগড়ায় তুলেছেন বাংলা সাহিত্যের নিরীহতম কবি জীবনানন্দ দাশকে।

তিসিডোরের কুৎসাকর্মের ছোট্ট একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। জীবনানন্দের গল্প উপন্যাসে ডিমের অমলেটের কথা আসছে বেশ কয়েকবার। এটা নিয়ে তিসিডোরে ৬ পাতা ব্যাপী ব্যঙ্গ রচনা করা হয়েছে। কবির কাছে ডিম কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেইকালে ডিম দুর্লভ ছিল কিনা, ডিম নিয়ে আহ्लाদ করার কী আছে, বড়লোকেরা ব্রেকফাস্টে ডিম খায়, ডিম খাওয়া বড়লোকী, জীবনানন্দ জানতো না ডিমে কোলেস্টেরল আছে, শরীরে ক্ষতি করে, জানলে উপন্যাসে ডিম আনতো না এত, ইত্যাদি বিষয়ে হাসাহাসি করেছেন।

জীবনানন্দ দাশ দরিদ্র মানুষ ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি সাহিত্য খ্যাতি যেমন পাননি, তেমনি আর্থিক স্বচ্ছলতার মুখও দেখেননি। ডিম তাঁর কাছে গুরুত্ব পেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যে মানুষটা জীবনভর কষ্ট করে পার করেছেন তাঁকে নিয়ে এমন ব্যঙ্গ, এমন অপ্রয়োজনীয় ব্যবচ্ছেদ সহ্য করা কষ্টকর। জীবনানন্দ দাশের তুলনায় বুদ্ধদেব বসু হাজার গুণ বেশি সুখী, স্বচ্ছল, সমৃদ্ধ, সফল জীবন কাটিয়েছেন। তবু সেই বুদ্ধদেব বসুকে তথাকথিত অপমান থেকে বাঁচাবার জন্য লেখিকা জীবনানন্দ দাশকে নিষ্ঠুরতার সাথে আক্রমণ করে গেছেন। মজার ব্যাপার হলো যে অপমান বুদ্ধদেব বসু কখনো অনুভব করেননি। যে বই সম্পর্কে তিনি কখনো জানেননি, সেই বইটি নিয়ে এমন সপ্তকাণ্ড রচনা!

বস্তুতপক্ষে ভূ-ভারতে আর কেউ বোধহয় মনে করেননি জীবনানন্দ দাশ ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’ দিয়ে বুদ্ধদেব বসুকে অপমান করার চেষ্টা করেছেন। যে উপন্যাস তিনি কখনো প্রকাশ করেননি, সেই উপন্যাস কী করে অপমানের হাতিয়ার হতে পারে সেটাও একটা ভাবনার বিষয়। বরং তিসিডোরই সেই অপ্রকাশিত অঘটিত ঘটনাটিতে ঘষে ঘষে তাদের দুজনের মরনোত্তর সম্পর্কটিতে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে। জীবনানন্দ মুখে না বললেও মনে মনে বুদ্ধদেব বসুকে ঈর্ষা করতেন, ঘৃণা করতেন, তাচ্ছিল্য করতেন, খুঁড়ে খুঁড়ে কেবল এই তথ্যগুলো আবিষ্কার করার চেষ্টা করা হয়েছে তিসিডোরে। চেষ্টাটি খুব হাস্যকর। এতে জীবনানন্দ দাশ বা বুদ্ধদেব বসুর কোনো লাভ-ক্ষতি না হলেও তিসিডোর লেখকের ছিদ্রান্বেষী মানসিকতার রূপটাই পাঠকের চোখে বারবার প্রকাশ পেয়েছে। এটাই সবচেয়ে দুঃখজনক।

এই দুজনকে কেউ কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে কিনা জানা নেই। সাহিত্যরসিকগণ দুজনের কাছ থেকেই রস আস্বাদন করেন। দুজনের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। কেতকী চেষ্টা করে গেছেন সেই রসের ভেতর বিষ দিয়ে জীবনানন্দের প্রতি পাঠকের মনকে তিক্ত করে তুলতে। সেই চেষ্টা বোধকরি শতভাগ বিফলে গেছে। কেননা তিসিডোর প্রকাশের পর জীবনানন্দের বইয়ের বিক্রি কমেছে বলে শোনা যায় না। জীবনানন্দের বাজার তৈরির জন্য বিজ্ঞাপন লাগেনি। সময়ই তাঁকে তুলে এনেছে। রবীন্দ্রোত্তর যুগে জীবনানন্দের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হয়নি এখনো পর্যন্ত। আধুনিক বাংলা কাব্যের বিরাট একটা অংশ গড়ে উঠেছে তাঁকে ভিত্তি করে। জীবনানন্দের সুনাম ধ্বংসে তিসিডোরের সেই প্রাণপণ চেষ্টাকে করুণাই করতে হয়।

‘তিসিডোর’কে কেন উপন্যাস বলা হয়েছে আমার জানা নেই। তিসিডোরের গঠন-প্রকৃতি-চরিত্র কিছুর মধ্যেই উপন্যাসের কোনো উপাদান নেই। সাধারণত একটি উপন্যাসের মধ্যে চারটি মৌলিক উপাদান থাকে—কাহিনী, চরিত্র, পরিণতি, বক্তব্য। উপন্যাসের এই চারটি মূল উপাদানের মধ্যে তিসিডোরে শুধু একটি উপস্থিত। তা হলো বক্তব্য। একজন লেখকের চরিত্রহনন বিষয়ক বক্তব্য। যে বক্তব্যকে নিন্দাসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, কিন্তু কিছুতেই উপন্যাস হতে পারে না এই গ্রন্থ।

তবু কেন এটাকে উপন্যাস বলা হয়েছে? একটি কারণ হতে পারে জীবনানন্দ দাশের সম্মানহানি করার মামলা এড়ানো। অপ্রকাশিত একটি উপন্যাসের চরিত্রের মধ্যে যদি তিনি বুদ্ধদেব বসুর চরম অপমান এবং অবমাননা আবিষ্কার করতে পারেন তাহলে তিনি সরাসরি জীবনানন্দের নাম উল্লেখ করে যেসব কুৎসিত অমূলক অভিযোগ করেছেন তা নিয়ে যে কেউ মামলা করতে পারে তাঁর বিরুদ্ধে। কেননা তিনি কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র উপন্যাসের চরিত্র বিশ্লেষণ করে অনুমানের ভিত্তিতে একজন লেখকের সুনামহানির চেষ্টা করেছেন। ‘তিসিডোর’ গ্রন্থটি যদি উপন্যাস হয়ে থাকে তাহলে সাহিত্যের অভিধান থেকে উপন্যাসের সংজ্ঞাটিই তুলে দিতে হবে।

বস্তুতপক্ষে তিসিডোর হলো ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’ উপন্যাসটিকে ব্যবচ্ছেদ করে জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে আবর্জনা লেপনের প্রচেষ্টা। যে দুর্গন্ধ কখনো বাংলা সাহিত্যের আলো-বাতাসে ছিল না, সেই দুর্গন্ধকে আবিষ্কার করার কৃতিত্বের দাবিদার তিসিডোর। এই ভয়ংকর কাজটি তিনি কোনো তথ্য প্রমাণের মাধ্যমে করেননি। উপন্যাসের চরিত্রের মুখনিঃসৃত বাক্যগুলোকে অনুমানের ভিত্তিতে বাস্তবের ব্যক্তিদের মুখে পছন্দমতো বসিয়ে সাহিত্যিক দক্ষতায় প্রমাণ করার চেষ্টা করে গেছেন জীবনানন্দের হৃদয় বুদ্ধদেব বসুর প্রতি প্রবল ঘৃণা, বিদ্বেষ, ঈর্ষায় ভরপুর ছিল, যা তিনি গোপন রেখেছিলেন আজীবন। শুধুমাত্র ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’ উপন্যাসে তা তিনি প্রকাশ ঘটিয়েছেন পুতুল চরিত্রগুলোর মাধ্যমে। সেটার উদ্ঘাটন করার জন্য জীবনানন্দের কথিত ১২৩ পৃষ্ঠার চটি উপন্যাসটির নিন্দা করার জন্য ৮৫৫ পৃষ্ঠার বিপুলায়তনের পুস্তকের জন্ম দিয়েছেন বঙ্গসাহিত্যে। পৃথিবীর ইতিহাসে এত বড় নিন্দাপুস্তক আর একটিও আছে কিনা সন্দেহ।

কোনো যুক্তি না থাকলেও তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া গেল—জীবনানন্দ দাশ সত্যি সত্যি বুদ্ধদেব বসুকে মনে মনে হিংসা করতেন। সেই ঈর্ষা তিনি গোপনে একটি খাতায় লিখে রাখতেন উপন্যাসের আকারে। মুখে কখনো বলতেন না। কেউ জানে না তাঁর হিংসা-বিদ্বেষমূলক মনোভাব। সাথে এটাও ধরলাম যে জীবনানন্দ দাশ নামক ব্যক্তিটি কখনোই লোকের দৃষ্টি আকর্ষণে সফল হননি। কয়েকটি কবিতা ছাপিয়ে জীবনভর ব্যর্থ হয়ে সাধারণ এক বরিশাইল্যা সাহিত্যিক হিসেবে ইহলোক ত্যাগ করলেন ১৯৫৪ সালে। তাঁর প্রয়াণের অর্ধশত বছর পর তাঁর কোনো বংশধর খাটের নিচে একটা খাতা পেয়ে গেল। তারপর সে ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’ নাম দিয়ে একটা বই ছাপাল। সেই বইটি কেতকী কুশারী ডাইসনের হাতে গিয়ে পড়ল। তখন তিনি কী করতেন? কোনো এক অখ্যাত বরিশাইল্যা জীবনানন্দ দাশের উপন্যাস পড়তেন? মনে হয় না। যদি পড়তেন তবুও কি তিনি ‘তিসিডোর’ নামের ঢাউশ একটি বই লিখে জগতকে জানাবার চেষ্টা করতেন যে জীবনানন্দ নামের এক বরিশাইল্যা সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুকে মনে মনে অপমান করেছিল বাহাত্তর বছর আগে? কষ্টকল্পনা ছাড়াই বলে দেওয়া যায়, তিনি তা করতেন না।

কিন্তু এখন জীবনানন্দের সেই তুচ্ছ পুস্তকটি নিয়ে তিনি অতিমাত্রায় প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন কেন? কারণ জীবনানন্দ দাশ জীবদ্দশায় তেমন খ্যাতির নাগাল না পেলেও মৃত্যুর পর মহীরূহ হয়ে উঠেছিলেন। এতই বিশাল সেখানে বুদ্ধদেব বসুর মতো অনেক বড় বড় কবিকেও ছাড়িয়ে গেছেন। বস্তুতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের পর সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী কবি হিসেবে তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তাঁকে বড় করে তোলার এই কাজটা করেছে সময়। জীবনানন্দ নিজেও পারেননি নিজেকে এতখানি তুলে ধরতে। কেতকী নিজেও জানতেন তাঁর এই বইটি বিক্রি হবে ‘কেতকী কুশারী ডাইসন’ নামের কারণে নয়, এই বইয়ের সাথে ‘জীবনানন্দ দাশ’ নামটি জড়িত বলে। তিনি জীবনানন্দ দাশকে অখ্যাত এক উপন্যাসের জন্য নিন্দাঝড়ে ধুয়ে দিলেও তাঁর নামের কাছে নিজেকে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু একজন অখ্যাত বরিশাইল্যা জীবনানন্দ হলে পুরো বাংলা সাহিত্যের সব দিকপালকে প্রকাশ্যে বই ছাপিয়ে গালি দিলেও তিনি কিছু বলতেন না। জীবনানন্দ দাশের মরনোত্তর খ্যাতি প্রাবল্য কারো কারো গায়ে এত জ্বালা ধরিয়েছিল।

বাংলার নিন্দাসাহিত্যের মধ্যে তিসিডোরকে অতিক্রম করতে পারবে তেমন পুস্তক রচিত হবার সম্ভাবনা দেখি না। এটা আপাদমস্তক একটি নিন্দাপুস্তক। তিলকে তাল করার যে অসাধারণ ক্ষমতা এই লেখিকার আছে তা এই পুস্তকের পরতে পরতে ভেসে উঠেছে অতি নগ্নভাবে। ঘটনা খুব সামান্য। সেই ঘটনাটিও ঘুমন্ত থাকত যদি জীবনানন্দের প্রকাশ-অনিচ্ছুক পুস্তকটি বাজারে না আসত এবং সেটি নিয়ে কেতকী বুদ্ধদেব বসুর সম্মান বাঁচানোর নামে দুর্গন্ধ না ছড়াতেন। জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব বসু সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে যে চিত্রটি আছে তা খুব চমৎকার। বিশেষ করে বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধসমূহ এবং অন্যান্য আলোচনায় আমরা দুজনকে খুব সুসম্পর্কের মানুষ বলে জানি। প্রতিভা বসুর ‘জীবনের জলছবি’তেও তার নজির আছে অনেক। কেতকী কুশারী সেই সৌন্দর্যের ওপর কালিমা লাগানোর জন্য বিপুল আয়তনের যে বইটি ফেঁদে বসেছেন, তার মধ্যে মানবজাতির উপকৃত হওয়ার বিষয় খুব কম, যে পরিশ্রমটুকু তিনি করেছেন তার সবটুকুই দিয়েছেন জীবনানন্দকে নোংরা জলে স্নান করিয়ে বুদ্ধদেব বসুকে দুগ্ধস্নান করাতে। কিন্তু সেটি করতে গিয়ে তিনি যে বুদ্ধদেব বসুর গায়েও নোংরা জলের ছিটে দিলেন, তাতে তিনি বুদ্ধদেবকেও কলুষিত করে দিলেন। ঘটনাটি এরকম—আমাকে একজন হিতাকাঙ্ক্ষী এসে জানাল আমার এক বন্ধু নাকি দেড় যুগ আগে একদিন আমাকে বাগে পেলে কষে চড় মারবে বলেছিল। বলার সাথে সাথেই হিতাকাঙ্ক্ষী আমার গালে কষে একটার পর একটা চড় মেরে মাটিতে ফেলে বোঝাতে চেষ্টা করল যে আমার বন্ধুটি আসলে তলে তলে আমাকে এমন চড় দেবার জন্যই প্রস্তুত ছিল সেই সময়ে। আমি চড় খেয়ে বুঝতে চেষ্টা করলাম আমার আসল সমস্যা কী—দেড় যুগ আগের বন্ধুর চড় মারার বাসনা, নাকি বর্তমানে হিতাকাঙ্ক্ষীর হাতের এই চড়?

অতএব, প্রিয় কেতকী কুশারী ডাইসন, আপনি বুদ্ধদেব বসুকে ভালোবেসে স্বতঃপ্রণোদিত এই কাজটি করেছেন বলে জানিয়েছেন। যাকে ভালোবাসি আমরা তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করি। আপনিও তাঁকে রক্ষা করার চেষ্টাতেই এই গ্রন্থটি লিখেছেন। তাই আমরা জেনেছি আপনার বাণী থেকে। কিন্তু আপনার মূল উদ্দেশ্য কী? আপনি এই পুস্তক রচনার আগে কেউ বলেনি বুদ্ধদেব বসু কখনো অপমানিত হয়েছেন জীবনানন্দের কাছে। বরং অন্যদের চেয়ে জীবনানন্দের সাথে তাঁর সম্পর্কটা ভালো ছিল একটা পর্যায় পর্যন্ত। একটা সময়ে দূরত্ব এসেছিল ঠিক, কিন্তু তাতে কোনো বিদ্বেষ বা বৈরিতা আছে বলে জানা যায় না। দুজনকে নিয়ে তুলনা করার মতো কোনো বিষয়ও ছিল না। সাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠক মাত্রেই জানে যে বুদ্ধদেব এক জাতের সাহিত্যিক, জীবনানন্দ আরেক ঘরানার সাহিত্যিক। একজন আম গাছ হলে আরেকজন হতে পারে কাঁঠাল গাছ। কেউ কারো প্রতিদ্বন্দ্বীও নয়। আপনি জোর করে টেনে দুজনকে মুখোমুখি দাঁড় করাবার কাজটি করলেন—যখন দুজনেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে বহুবছর আগে। আপনার এই কাজটা যেমন বুদ্ধদেব বসুকে উপকৃত করেনি, কিন্তু জীবনানন্দের সম্মানহানি করেছে। মাঝখানে আপনি তিসিডোর লিখে, অনাকাঙ্ক্ষিত একটা বিতর্ক উসকে দিয়ে নিজেকে আরেকটু খ্যাতিমান করার চেষ্টা করে গেছেন। আপনার তিসিডোর বাংলা সাহিত্যের কোনো উপকার করেছে বলে মনে হয় না। যা উপকার হয়েছে তার ভাগ আপনি আর আনন্দবাজার দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আপনাদের দু’পক্ষের আর্থিক লাভ হয়েছে বইপত্র বিক্রি এবং রয়্যালটি দিয়ে।

আমাদের মতো সাধারণ পাঠকের কাছে জীবনানন্দ দাশ এবং বুদ্ধদেব বসু দুজনেরই সৃষ্টিকর্ম নিজ নিজ মহিমা নিয়ে পাঠকের কাছে বেঁচে থাকবেন। জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব বসুকে নিয়ে আপনার এই অপ্রয়োজনীয় ব্যবচ্ছেদ শুধুমাত্র সাহিত্যিক কুৎসাসাহিত্যের উদাহরণ হয়ে বেঁচে থাকবে।

জীবনানন্দ দাশের ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’ পড়ে আপনি যেমন অনেক রাত ঘুমোতে পারেননি, আপনার ‘তিসিডোর’ পড়েও আমার কয়েক রাত নির্ঘুম কেটেছে। নিরীহ এক কবিকে নির্দয় আক্রমণের আঘাত আমার বুকেও গভীরভাবে আঘাত হেনেছিল। তারই সামান্য প্রতিক্রিয়া এই আলোচনা।


[২০ জুন ২০১৯]


Sunday, October 11, 2026

ভালো বই, মন্দ বই

কোন বিষয়ে লিখলে জনপ্রিয়তা অর্জন করা যায়, কোন বিষয়ে পাঠক আগ্রহ খুঁজে পাবে এটা খুব সহজে বোঝা যায় না। লেখার মতো উপযুক্ত বিষয়বস্তু পাওয়া লেখকের জন্য ভাগ্যের ব্যাপার। আমি কিভাবে পেয়েছিলাম? আমি কি আগ থেকে জানতাম যেসব বিষয়ে লিখতে যাচ্ছি সেগুলো পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করবে? কিছুতেই না। আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না আমার বইয়ের গন্তব্য কী হবে? আমি শুধু মনের আনন্দে লিখে গিয়েছি। পাঠক যে সেগুলো পছন্দ করে ফেলেছে সেটা নিতান্তই ভাগ্য। ৯টা বই প্রকাশের পর এখন আমি ভাবতে বসেছি আসলে ঠিক পথে আছি কিনা। এখন আমি সতর্ক হবার চেষ্টা করছি। কারণ পাঠক এতদিন আমাকে ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে গেছে, এখন আর দেবে না। পুরস্কারগুলো আমাকে বিপদে ফেলবে। সমালোচকের জন্ম হবে। অদৃশ্য শত্রুও হয়তো তৈরি হয়েছে। কে জানে? 

থামতে হবে। থামা অনিবার্য। চলমান প্রকল্পগুলো শেষ হলে আর নতুন কিছু নয়। ক্লান্তি এসে ভর করেছে। পাঠক থামতে বলার আগে নিজেরই থেমে যাওয়া উচিত। লেখার আনন্দ যখন ফুরিয়ে যায়, তখন থেমে না গেলে আবর্জনার সৃষ্টি হতে শুরু করে। লিখতে হয় আনন্দের সাথে। সৃজনশীলতার মধ্যে যে আনন্দ আছে সেটার প্রকাশের সাথে পাঠকের আগ্রহের মিল থাকতে হবে। পাঠক যদি আগ্রহ হারায় তাহলে লেখকের উচিত তখনই থেমে যাওয়া। জোর করে পাঠকের মুগ্ধতা আদায় করা যায় না। পূর্ব সুনামের ভিত্তিতে পাঠককে মুগ্ধ করার চেষ্টা করা উচিত না। পাঠক প্রতারিত বোধ করলে পূর্বে আহরিত সম্মানও হুমকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে। লেখকেরা কি এসব ভাবে? নাকি নতুন বই প্রকাশের আনন্দে একের পর এক ছাপাখানার সন্তান প্রসব করতেই থাকে।


প্রকাশক কি এসব ভাবে? প্রকাশক দেখে বিক্রির সংখ্যা। পাণ্ডুলিপির গুনগত মানের চেয়ে বিক্রির পরিধি নিয়েই প্রকাশক বেশি ব্যস্ত। একটা অখাদ্য বই নিয়ে এক প্রকাশক খুব আহলাদিত হয়ে বিজ্ঞাপন করেছেন। পোস্টে যতজন লাইক দিয়েছে তার অর্ধেকও বইটা পড়েনি, কেনেনি। প্রকাশকও বইটা পড়েনি। পড়লেও বোঝার মতো ক্ষমতা নেই তার। এরকম অশিক্ষিত অন্ধ প্রকাশকের সংখ্যাই বেশি।


আরেকটি নতুন বই প্রকাশের আগে লেখককে ভাবতে হবে। বারবার ভাবতে হবে? কেন পাঠক বইটা কিনবে? এই বইটা থেকে পাঠক নতুন কী অর্জন করবে? পাঠক দুটো কারণে বই কেনে। আনন্দ কিংবা জ্ঞানার্জন। অথবা দুটোই। এ ছাড়া বই কেনার অন্য কোনো কারণ নেই। আমি কিনি না। আমাকে হয় আনন্দ পেতে হবে। বইটা সুখপাঠ্য হতে হবে। অথবা এমন কিছু থাকবে যেখান থেকে নতুন কিছু শিখবো। কিন্তু আনন্দ এবং জ্ঞানের সম্মিলন বাংলা ভাষার প্রকাশনা জগতে বিরল ঘটনা।


পাঠকের মান কেমন? খুব খারাপ। ক্রমাগত নিন্মগামী। পাঠকের রুচির নিন্মগামীতা ভালো লেখকদের জন্য বিরাট সমস্যা। বিশ বছর আগে কেউ কল্পনা করতে পারতো না পদ্মজা নামের একটা চটি মানসম্পন্ন বই বাংলাদেশে সর্বাধিক বিক্রিত বই। এটা বই জগতের দুর্ভাগ্য। একসময় বুদ্ধিজীবিরা হুমায়ূন আহমেদকে সস্তা লেখক বলতো। এখন তারা কোথায়? হুমায়ূনের ধারার লেখকদের যদি সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটতো তাহলে এদেশে এসব চটি সাহিত্যের প্রসার ঘটতে পারতো না। শিক্ষার মান পাঠকের মানকে প্রভাবিত করেছে। আশি নব্বই দশকের শিক্ষিত মানুষগুলো একুশ শতকে এসে কুপমণ্ডুকে পরিণত হয়েছে। তাদের সন্তানেরাই সেই মূর্খ পাঠকের দল ভারী করেছে।


একদল অতি আঁতেল কাজী আনোয়ার হোসেন কিংবা হুমায়ূন আহমেদকে স্বীকার করতে রাজী নয়। তারা এমনসব লেখকদের মাথায় তুলে রাখতে চায় যাদের অধিকাংশ সাধারণ পাঠকের কাছে হজমযোগ্য নয়। এতে মাঝারি পাঠকেরা বিভ্রান্ত হয়েছে। মাঝখানে জন্ম নিয়েছে বিপুল সংখ্যক অসাধু লেখক, অসাধু প্রকাশক এবং লক্ষ লক্ষ গণ্ডমূর্খ পাঠক। রকমারির শীর্ষস্থানে থাকা নামগুলোই পরিস্থিতি বোঝার জন্য যথেষ্ট। পাঁচ বছর আগেও এই তালিকা কল্পনাও করা যেতো না।


ভালো বই পড়তে হবে। ভালো বই লিখতে হবে। বাংলাদেশের বই জগতকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য আর কোনো বিকল্প নেই।


যদি সেটা সম্ভব না হয়, তাহলে কলম থামিয়ে দাও। খারাপ কিছু করার চেয়ে থেমে যাওয়া মঙ্গল।

Sunday, September 20, 2026

এলিনোর র‍্যাথবোনের প্রতি রবীন্দ্রনাথ

রাজনীতি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের তেমন বেশি লেখালেখি নেই। তিনি সযত্নে এড়িয়ে চলতেন বলা চলে। কিন্তু জীবনের কিছু কিছু অধ্যায়ে তিনি গর্জে উঠেছিলেন। তাঁর শেষ গর্জন ছিল ১৯৪১ সালের মে মাসে। অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তখনও তিনি তাঁর বক্তব্য প্রকাশে দ্বিধা করেননি।

১৯৪১ সালের মে মাসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য এবং পরিচিত সমাজসংস্কারক মিস এলিনোর র‍্যাথবোন ভারতীয় নেতৃবৃন্দ ও জনগণের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতীয়রা কেন ব্রিটিশ সরকারকে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা দিচ্ছে না—এই নিয়ে তিনি ভারতীয়দের কঠোর সমালোচনা করেন।

র‍্যাথবোন তাঁর চিঠিতে সাম্রাজ্যবাদী সুলভ মানসিকতা থেকে দাবি করেন যে, ব্রিটিশ শাসন ভারতকে শান্তি, নিরাপত্তা, আধুনিক শিক্ষা ও আইনসম্মত সমাজ উপহার দিয়েছে। সুতরাং, এই সংকটকালে ব্রিটিশদের সহায়তা না করা ভারতীয়দের 'অকৃতজ্ঞতা' এবং অদূরদর্শিতার নামান্তর। একজন তথাকথিত প্রগতিশীল ব্রিটিশ নারীর মুখে ব্রিটিশদের এই 'পাদপ্রদীপপ্রদানকারী প্রভূ' ভাবমূর্তি এবং ভারতীয়দের করুণার পাত্র মনে করার ঔদ্ধত্য রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে মর্মাহত ও ক্রুদ্ধ করে। চিকিৎসকদের কঠোর বারণ এবং শারীরিক প্রচণ্ড যন্ত্রণা সত্ত্বেও শয্যাশায়ী রবীন্দ্রনাথ এই অপপ্রচারের জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মুখে বলে প্রতিবাদলিপিটি লিখেছিলেন। সেটা প্রকাশিত হয়েছিল পত্রপত্রিকায়:

"I have read with surprise and pain the open letter which Miss Eleanor Rathbone has addressed to Indians. She is shocked at our 'ingratitude' and has listed the achievements of British rule in India...

What have the British done for India? They have maintained law and order, but at what cost? Look at the condition of our people—steeped in ignorance, poverty and disease, completely defenseless... In Soviet Russia, I saw what a government could do in twenty years to educate and uplift its people. But in India, after two centuries of British rule, elementary education is still denied to the masses.

To demand gratitude from a people who have been kept in subjection and exploited for generations is a cruel mockery. The communal division that plagues our country today is itself the direct outcome of the policy of 'divide and rule'.

It is not possible for any self-respecting Indian to accept this attitude of patronising superiority. The British imperialism has left us a heritage of poverty, illiteracy, and helplessness..."

["মিস র‍্যাথবোন ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে যে খোলা চিঠি লিখেছেন, তা পড়ে আমি গভীরভাবে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছি। তিনি ভারতীয়দের তথাকথিত 'অকৃতজ্ঞতা' নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং আমাদের মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে ব্রিটিশ শাসন ভারতবর্ষকে কতটা রক্ষা করেছে, কীভাবে এখানে শান্তি ও সভ্যতা বজায় রেখেছে। কিন্তু তিনি অত্যন্ত সুচতুরভাবে এড়িয়ে গেছেন যে, এই দুই শতকের ব্রিটিশ শাসন ভারতবর্ষকে আজ কোন চরম সর্বনাশের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

যিনি ব্রিটিশ শাসনের এই 'দান'-এর কথা বড় গলায় প্রচার করছেন, তিনি কি একবারও ভেবে দেখেছেন যে, আজ ভারত অশিক্ষা, চরম দারিদ্র্য, অনাহার এবং একের পর এক মহামারীর এক প্রকাণ্ড আঁধার হয়ে দাঁড়িয়েছে? এই করুণ পরিস্থিতির দায় কার? আমি নিজে রাশিয়া গিয়ে দেখেছি, মাত্র ২০ বছরের মধ্যে তারা কীভাবে কোটি কোটি নিরক্ষর মানুষকে শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করে তুলেছে। অথচ প্রায় দুই শতকের ব্রিটিশ রাজত্বে আমাদের দেশের জনগণের সামান্যতম প্রাথমিক শিক্ষার সুবিধাও দেওয়া হয়নি।

আজ যুদ্ধের দোহাই দিয়ে আমাদের কাছ থেকে আনুগত্য এবং সহায়তার যে দাবি তোলা হচ্ছে, তার নৈতিক ভিত্তি কোথায়? যে জাতিকে নিজের দেশেই পরাধীন ও অধিকারবঞ্চিত করে রাখা হয়েছে, যাদের জাতীয় সম্পদ অন্য একটি দেশকে পুষ্ট করতে শোষিত হচ্ছে—তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা দাবি করা এক পরম নির্মম কৌতুক বৈ আর কিছু নয়। ভারতে আজ যে সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে, তা-ও ব্রিটিশদের সুদীর্ঘ 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতিরই প্রত্যক্ষ ফল।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের এই অহংকার ও অনুগ্রহ প্রদর্শনের ভঙ্গি কোনো স্বাভিমানী মানুষ মেনে নিতে পারে না। তাঁরা আমাদের 'সভ্য' করার দাবি করেন, কিন্তু আমাদের জন্য রেখে যাচ্ছেন কেবল এক নিঃস্ব, সহায়সম্বলহীন ও ক্ষয়িষ্ণু ভারতবর্ষ। সাম্রাজ্যবাদী ঔদ্ধত্য দিয়ে সভ্যতার এই ব্যর্থতা ও সত্যকে ঢাকা দেওয়া যাবে না।"]

তাঁর সেই প্রতিবাদের কথা স্মরণ করেছিল দৈনিক যুগান্তর ৮ আগষ্ট ১৯৪১ তারিখে। তাঁর প্রয়ানের সংবাদের সাথে প্রকাশিত হয়েছিল প্রতিবাদের ভাষাও।



পুরো বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল লন্ডনের পত্রিকায়  The Tribune, August 15, 1941 সংখ্যায়:

I have been deeply pained at Miss Rathbone’s Open Letter to Indians. I do not know who Miss Rathbone is, but I take it that she represents the mentality of the average “well-intentioned” Britisher. Her letter is mainly addressed to Jawaharlal Nehru and I have no doubt that if that noble fighter of freedom’s battle had not been gagged behind prison-bars by Miss Rathbone’s countrymen, he would have made a fitting and spirited reply to her gratuitous sermon. His enforced silence makes it necessary for me to voice a protest even from my sick-bed.

* * *

The lady has ill-served the cause of her people by addressing so indiscreet, indeed impertinent, a challenge to our conscience. She is scandalised at our ingratitude – that having “drunk deeply at the wells of English thought,” we should still have some thought left for our poor country’s interests. English thought, insofar as it is representative of the best traditions of Western enlightenment, has indeed taught us much, but let me add that those of our countrymen who have profited by it have done so despite the official British attempts to ill-educate us.

We might have achieved introduction to Western learning through any other European language. Have all the other peoples in the world waited for the British to bring them enlightenment? It is sheer insolent self-complacence on the part of our so-called English friends to assume that had they not “taught” us, we would still have remained in the Dark Ages. Through the official British channels of education in India have flowed to our children in schools not the best of English thought but its refuse, which has only deprived them of a wholesome repast at the table of their own culture.

* * *

Assuming, however, that the English language is the only channel left to us for “enlightenment,” all that “drinking deeply at its wells” has come to is that in 1931, even after a couple of centuries of British administration, only about one per cent of the population was found to be literate in English – while in the USSR in 1932, after only fifteen years of Soviet administration, 98 per cent of the children were educated. (These figures are taken from The Statesman’s Year-Book, an English publication, not likely to err on the Russian side).

But even more necessary than the so-called culture are the bare elementary needs of existence, on which alone can any superstructure of enlightenment rest. And what have the British, who have held tight the purse-strings of our nation for more than two centuries and exploited its resources, done for our poor people ?

I look round and see famished bodies crying for bread. I have seen women in villages dig up mud for a few drops of drinking water, for wells are even more scarce in Indian villages than schools. I know that the population of England itself is today in danger of starvation and I sympathize with them, but when I see how the whole might of the British Navy is engaged in convoying food vessels to the English shores and when I recollect that I have seen our people perish of hunger and not even a cart-load of rice brought to their door from the neighboring district, I cannot help contrasting the British at home with the British in India.

* * *

Shall we then be grateful to the British, if not for keeping us fed, at least for preserving law and order? I look around and see riots raging all over the country. When scores of Indian lives are lost, our property looted, our women dishonoured, the mighty British arms stir in no action, only the British voice is raised from overseas to chide us for our unfitness to put our house in order.

Examples are not wanting in history when even fully armed warriors have shrunk before superior might and contingencies have arisen in the present war when even the bravest among the British, French and Greek soldiers have had to evacuate the battlefield in Europe because they were overwhelmed by superior armaments – but when our poor, unarmed and helpless peasants, encumbered with crying babes, flee from homes, unable to protect them from armed goondas, the British officials perhaps smile in contempt at our cowardice. Every British civilian in England is armed today for protecting his hearth and home against the enemy, but in India even lathi- training is forbidden by decree.

Our people have been deliberately disarmed and emasculated in order to keep them perpetually cowed and at the mercy of their armed masters. The British hate the Nazis for merely challenging their world-mastery and Miss Rathbone expects us to kiss the hand of her people in servility for having riveted chains on ours. A government must be judged not by the pretensions of its spokesmen but by its actual and effective contribution to the well being of the people.

* * *

It is not so much because the British are foreigners that they are unwelcome to us and have found no place in our hearts as because, while pretending to be trustees for our welfare, they have betrayed the great trust and have sacrificed the happiness of millions in India to bloat the pockets of a few capitalists at home. I should have thought that the decent Britisher would at least keep silent at these wrongs and be grateful to us for our inaction, but that he should add insult to injury, and pour salt over our wounds, passes all bounds of decency.

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ কবিতাটি মৃত্যুশয্যায় লেখা। নিজের হাতে লেখার মতো অবস্থা ছিল না। তিনি মুখে মুখে বলেছেন, তার পাশে বসা সহকারী রানী চন্দ সেটা নোট করেছেন। ১৯৪১ সালের ৩০ জুলাই  সকাল সাড়ে নয়টার দিকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে কবিতাটি রচিত হয়। রবীন্দ্রনাথ তখন মারাত্মক অসুস্থ এবং ওই দিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর একটি বড় অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ও দুর্বলতার কারণে কবি নিজে হাতে লিখতে পারছিলেন না। তিনি শয্যাশায়ী অবস্থায় মুখে মুখে কবিতার চরণগুলো বলতে থাকেন এবং তাঁর পাশে বসে থাকা রানী চন্দ তা কাগজে লিখে নেন। কবিতাটি বলা শেষ হলে রানী চন্দ তা কবিকে পড়ে শোনান এবং কবি শুনে সংশোধন ও অনুমোদন দেন। এর মাত্র দুই ঘণ্টা পর কবির অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর তিনি আর সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি এবং সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। এর ঠিক সাত দিন পর ৭ আগস্ট (২২ শ্রাবণ) তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কবিতাটির অন্তর্নিহিত দর্শনটা কি বোঝা যায়? এই ছলনাময়ী কে?

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে,
হে ছলনাময়ী।
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে
সরল জীবনে।
এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বকে চিহ্নিত করেছ,
তার তরে রাখো নি গোপন রাত্রি।
তোমার জ্যোতিষ্ক
যে পথ দেখায়
সে যে তার অন্তরের পথ,
সে যে সহজ সরল,
অনায়াসে তারে সত্য করে
কুটিলতার অগোচরে।
বাহিরে সে কুটিল বটে,
অন্তরে সে সরল—
এই নিয়ে তার গৌরব।
লোকে তারে বলে প্রবঞ্চিত।
সত্যেরে সে পায়
আপন আলোতে ধৌত অন্তরে অন্তরে।
কিছুতে পারে না তারে প্রবঞ্চিতে,
শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে
আপনার ভাণ্ডারে।
অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
সে পায় তোমার হাতে
শান্তির অক্ষয় অধিকার।

Friday, September 18, 2026

টাইগারপাস- নিরপেক্ষ মতের পাঠক

'টাইগারপাস' নিয়ে আমার একটা সংশয় ছিল। জীবনের প্রথম উপন্যাস। কথা ছিল একটিমাত্র উপন্যাসই লিখবো। কিন্তু পরে আরো একটি হয়ে গেছে। সেকথা থাক। এই প্রথম উপন্যাসটা লিখতে আমার দীর্ঘ সময় লেগে গিয়েছে। শখ করে লিখেছি মনের মাধুরী মিশিয়ে। অনেকটা আড্ডার ছলে। গল্পের মধ্যে ইতিহাসের পুর দিয়ে। কোথায় কিভাবে শেষ হবে কিছুই জানা ছিল না। চরিত্রগুলোকে মুক্ত করে দিয়েছি যেদিকে খুশি চলে যাক। প্রায় এক যুগ পর যখন কাজটা শেষ হলো তখন আমি উপন্যাসটার প্রতি গভীর অনুরাগ অনুভব করলাম। অনেকটা প্রথম প্রেমের অনুভূতি। এমন একটা ভালোলাগা আগে কখনো কাজ করেনি। আমি সাহিত্যিক নই। ইতিহাসের মতো রসকসহীন বিষয় নিয়ে কাজ করি। উপন্যাস লিখতে যতটা মুন্সিয়ানা দরকার, আমার সেসব কিছু নেই। এই উপন্যাস কারো ভালো লাগবে কিনা সন্দেহ আছে। পাঠকের কাছ থেকে কিরকম সাড়া মিলবে বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু ঈদসংখ্যায় প্রকাশের পর অনেক পাঠক জানালো ভালো লেগেছে। সম্পাদকও একই কথা বললেন। তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম গ্রন্থাকারে প্রকাশ করবো। আগ্রহী প্রকাশকও আছে। প্রকাশের পর প্রথম দুমাসে অর্ধেক বই বিক্রি হয়ে গেল শুনে দুশ্চিন্তার ভার নেমে গেল। আশা করা যায় সবগুলো শেষ হয়ে যাবে আগামী এক বছরের মধ্যে। এখন গত ছমাসের মূল্যায়ন দেখি। দেখা যাচ্ছে যারা বোদ্ধা পাঠক, খুব উঁচু মানের বইপত্র পড়েন, তাদের কাছে বইটা তেমন আশা জাগায়নি। হালকা চালে পড়ে শেষ করেছেন। তাদের ক্ষেত্রে এমন লাগাটাই স্বাভাবিক। তাই অবাক হইনি। কিন্তু আরেকটা বড় অংশ যাদেরকে সাধারণ পাঠক বলা যায়, তারা বইটা নিয়ে খুব উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। এত বেশি যে অনেকে আমাকে ফোন করে তাদের ভালো লাগার কথা জানিয়েছেন। ইনবক্সের মেসেজে ভরিয়ে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে দেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিকও আছেন। আমি খুব অবাক হয়ে গেছি। এতটা আমার প্রত্যাশা ছিল না কোনোদিন। আমার এক পরিচিত সাহিত্যিকের কাছে বইয়ের রিভিউগুলো দিয়ে মতামত জানতে চেয়েছিলাম। তিনি বলেছেন, তিনি খুব মনোযোগ সহকারে বইটা পড়েছেন। তার কাছে বইটা খুব ভালো লেগেছে। তার ধারণা বইটা যারা তাড়াহুড়া না করে আস্তে ধীরে পড়বেন তাদের সবাইকে স্পর্শ করবে। এটা আবেগ সর্বস্ব বই। যে গল্পটা লেখা হয়েছে সেটার ভেতরে গভীর একটা আবেগজনিত ব্যাপার আছে। যাদের ভেতরে সেই আবেগের উপস্থিতি আছে, তাদের সবাই বইটার আবেগে একাত্মতা অনুভব করবেন। যারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে তারা সেই দলের মানুষ। আবার যারা ক্রিটিক্যাল উপন্যাস পড়ে অভ্যস্ত, যারা সাহিত্যের মধ্যে নতুন কিছু আশা করেন তাদের কাছে এই বই তেমন ভালো লাগবে না। কারণ এই সাদামাটা গল্প তাদের খোরাক নয়। তবে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন বইটা উচ্চমানের কোনো সাহিত্যকর্ম হয়নি ঠিক, তবু এটা তাকে খুব গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। চরিত্রগুলোর পরিণতি তাঁকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে। তিনি আবেগে ভেসেছেন। যারা আনন্দ বেদনার স্পর্শ নেবার জন্য সাহিত্যপাঠ করেন, তিন তাদের জন্য বইটা সুপারিশ করবেন। সাথে তিনি আরো যোগ করেছেন হয়তো তিনি চট্টগ্রামে বেড়ে উঠেছেন বলে এই পক্ষপাতিত্ব।

টাইগারপাস প্রকাশের এক বছরও পূর্ণ হয়নি এখনো। আমাকে আরো পাঠকের মতামত পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আরো দূরের কোনো পাঠক। আমাকে যিনি চেনেন না। কিছু না জেনেই বইটা কিনেছেন। তার মতামত নিশ্চয়ই আরো পক্ষপাতহীন হবে।

Tuesday, September 8, 2026

আমার প্রথম বই- জর্জ আর. সিমসের স্মৃতি থেকে

 "আমার প্রথম বইটি যখন প্রকাশিত হয়, তখনও আমি শহরের সেই চাকুরিজীবন ছাড়িনি। তখন নিয়ম করে সকাল নয়টায় অফিসে গিয়ে সন্ধ্যা ছয়টায় বের হতাম। তবে মাঝখানে এক ঘণ্টার একটা দুপুরের খাবারের বিরতি থাকত। সেই এক ঘণ্টার বিরতিতেই ছোটগল্প কিংবা মাথায় আসা মজার সব ছোটখাটো লেখা লিখে ফেলতাম; আর সেগুলো বড় খামে ভরে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে পাঠাতাম। ওভাবে প্রায় বিশটির মতো লেখা পাঠিয়েছিলাম, তার মধ্যে একটাও গ্রহণ করা হয়নি, তবে বেশ কয়েকটি সসম্মানে ফেরত এসেছিল!

অফিসের সেই এক ঘণ্টার দুপুরের খাবারের বিরতিতেই আমি আমার প্রথম বইটি লিখেছিলাম। এইমাত্র সেটা খুঁজে পেলাম.......এই যে তার প্রচ্ছদ! আপনারা লক্ষ করবেন যে এতে আমার একটা প্রতিকৃতিও আছে। ছবিতে আমাকে বেশ অসুস্থ, কৃশ আর কঙ্কালসার দেখাচ্ছে। সাহিত্যচর্চায় নিজেকে সঁপে দেওয়ার চক্করে দুপুরের খাবার না খাওয়ার ফলই হয়তো এটি!

আপনি যদি সেই বইটার ভেতরের পাতায় একবার নজর বোলাতে পারতেন, আর যে বাজে কাগজে বইটি ছাপা হয়েছিল তা স্বচক্ষে দেখতে পেতেন....তবে আমার হাতে ওটা তুলে দিয়ে যখন বলা হয়েছিল, ‘এই নিন আপনার প্রথম সন্তান,’ তখন আমার বুকে যে কী তীব্র আঘাত লেগেছিল তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারতেন!

আমার ভেতরের সমস্ত অহংকার (আর লোকমুখে শুনি, আমার নাকি তা বেশ ভালোই আছে!) এক লহমায় ধুলোয় মিশে গেল, যখন প্রচ্ছদে আঁকা সেই দুমড়েমুচড়ে যাওয়া কঙ্কালসার লোকটার দিকে তাকালাম.......যে লোকটার চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, তাঁর এখনই কোনো সৎকার সমিতির সদস্যপদ নিয়ে নেওয়া উচিত!

তা-ও হয়তো গায়ে মাখতাম না, কিন্তু বাঁধ সাধল বই কেনা পাঠকেরা......তারা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে চিঠি লিখে অভিযোগ জানাতে শুরু করল! এক ভদ্রলোক তো পোস্টকার্ড পাঠিয়ে লিখলেন, বইটি কিনে বাড়ি ফেরার পথেই নাকি তা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে গেছে! আরেকজন নিশ্চিত করলেন যে, বইটির পাতা থেকে তিনি নাকি এত পরিমাণ খড় কুড়িয়ে পেয়েছেন যা দিয়ে অনায়াসে তাঁর ঘোড়ার জন্য একটা তোশক বানিয়ে ফেলা যায়! আর তৃতীয় একজন তো ডাক-মাশুল না দিয়েই বইটি আমাকে ফেরত পাঠালেন এবং বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করলেন....আমি যেন ওটা দয়া করে আমার ডাস্টবিনে ফেলে দিই; কারণ তাঁর বাড়ির পেছনের বাগানে যে ডাস্টবিনটা আছে, তা নিয়ে তাঁর রাঁধুনির নাকি বেশ অহংকার রয়েছে!"

[জর্জ আর. সিমস]


Thursday, August 27, 2026

কেন চট্টগ্রাম বঙ্গোপসাগরের প্রধান বন্দর হতে পারেনি?

২৪ আগষ্ট ২০২৬ তারিখে ডেইলি স্টারে রিলা মুখার্জির লেখা Why Chittagong never became a maritime city? আলোচনাটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। খুব চমৎকার কিছু বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। কিন্তু সেই বিশ্লেষণের তাত্ত্বিক আলাপের ভেতরে গুরুতর কিছু বাস্তবতা আসেনি। তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয়টা বলেননি। অজ্ঞতা কিংবা এড়িয়ে যাওয়া, ঠিক জানি না। এটা সবাই জানে কলকাতার জন্ম হবার বহুকাল আগে চট্টগ্রাম বন্দর হিসেবে খ্যাত ছিল। কিন্তু তবু ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রাম কেন প্রধান বন্দর হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সেই প্রশ্নের উত্তর কলোনিয়াল শাসকদের কাছে আছে। উপনিবেশ যুগে শুধুমাত্র সেইসব অঞ্চল উন্নতি করেছে যেগুলো শাসকদের সুবিধাজনক ছিল।

চট্টগ্রামের বড় শহর বা পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক শহর হতে না পারার আসল কারণ ভূ-রাজনৈতিক। শত শত বছর ধরে চট্টগ্রাম ছিল এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক সীমান্ত। আরাকান, মুঘল, ত্রিপুরা রাজ্য আর পর্তুগিজ জলদস্যু, সবার নজর ছিল এই ভূখণ্ডের ওপর। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সংঘাতের কারণে কেউই দীর্ঘদিন একে একচ্ছত্র দখলে রাখতে পারেনি। এই দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অস্থিতিশীলতার কারণেই সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থায়ী পরিবেশ বা দেশীয় অভিজাত শ্রেণি গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়নি।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রবন্ধটিতে একটি ঐতিহাসিক সত্য এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে (বা লেখকের নজর এড়িয়ে গেছে)। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কিন্তু শুরুতেই কলকাতার কথা ভাবেনি; তাদের প্রথম পছন্দ ছিল চট্টগ্রাম। ১৬৮৬ সালে জব চার্নক ও ব্রিটিশ নৌবহর চট্টগ্রাম দখলের জন্য হামলা চালায়। এই বিষয়ে সকল তথ্য প্রমাণ এখনো নানান আর্কাইভে আছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করেই বাংলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক ও সামরিক ভিত্তি গড়ে তোলা। কিন্তু সেই অভিযানে ব্রিটিশরা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। এমনকি ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা লাটে ওঠার দশা হয়েছিল।
এই ব্যর্থতার পরেই বাধ্য হয়ে তারা অখ্যাত এবং নিরাপদ স্থান হিসেবে কলকাতার দিকে নজর দেয়। অর্থাৎ, ১৬৮৬ সালে চট্টগ্রামে ব্রিটিশদের হারই ছিল কলকাতার জন্ম ও উত্থানের মূল কারণ। ‘ফোর্ট উইলিয়াম’ দুর্গটি কলকাতার বদলে চট্টগ্রামে গড়ে উঠত, তবে আজকের ভৌগলিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলতো।
তাঁর সাথে আমার পরিচয় নেই। যদি আলাপ হতো আমি তাঁকে বলতাম Chittagong’s failure to evolve into a full-fledged maritime city was, above all, a result of persistent geopolitical turmoil. For centuries, the region was a highly contested frontier claimed by the Arakanese, the Mughals, the Tripura Kingdom, and Portuguese buccaneers. Because control over the territory changed hands so frequently, no single power could establish long-term political stability. It was this constant conflict, not a inherent lack of commercial appetite, that prevented a permanent merchant elite from forming and investing locally.
More importantly, the essay omits a critical historical turning point that reshaped the region's destiny. The British East India Company did not originally set its sights on Calcutta; Chittagong was their first choice. In 1686, Job Charnock and the British naval forces launched an aggressive military campaign to capture Chittagong, intending to turn it into the main commercial and strategic stronghold for the British Empire in Bengal. However, due to strong Mughal resistance, the British failed catastrophically. It was precisely this failure in Chittagong that forced the Company to fall back to the Hooghly River and establish a base at Calcutta in 1690. In short, Calcutta’s birth and rise were the direct consequence of Britain's military defeat at Chittagong.
Had history taken a different turn in 1686, and had Fort William been erected in Chittagong instead of Calcutta, the maritime history of Bengal and Chittagong’s future would have been entirely different. Chittagong possessed superior natural advantages: a deep-water natural harbor with direct access to the Bay of Bengal, features that the silt-prone, narrow Hooghly River near Calcutta could never match. Calcutta grew into a world-class maritime city largely because it received colonial patronage and imperial defense infrastructure, leaving Chittagong’s vast potential untapped. Ultimately, Chittagong’s destiny cannot be adequately explained through urban planning theories or missing merchant networks. It did not fail to become a maritime city due to structural economic flaws, but because of centuries of geopolitical friction and a decisive moment in British colonial policy. Had the political wheel turned just a bit differently, the legacy that became Calcutta would likely have belonged to Chittagong.

অথচ কয়েক মাস আগে রিলা মুখার্জী নিজেই আরেকটা লেখায় যেটা উল্লেখ করেছিলেন, সেটা গত পরশুর প্রবন্ধের বিপরীত। ১৫০২ সালে বঙ্গোপসাগরের একমাত্র বন্দর হিসেবে চট্টগ্রামের নামই পাওয়া গেছে প্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র ক্যানটিনো প্লেনিস্ফেয়ারে। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন:
How, then, did this marginal land transform into the Cantino Planisphere's major portal in 1502? The Portuguese diarist Tomé Pires (1515) observed a westward commercial networking from Chittagong, with Persian, Rumi, Turk, and Arab merchants present there, as well as traders from Chaul, Dabhol, and Goa, while the Portuguese epic poet Camões (1572) emphasised eastern networks:
'The City CATHIGAN would not be wav'd,
The fairest of BENGALA: who can tell
The plenty of this Province? but its post
(Thou seest) is Eastern turning the South-Coast.'
হ্যাঁ, এই অরণ্য বেষ্টিত প্রাচীন জনপদটাই ছিল বঙ্গোপসাগরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। ১৬৮৬ সালে চট্টগ্রাম দখল করতে ব্যর্থ না হলে এখন হয়তো চট্টগ্রাম হতো বঙ্গোপসাগরের সিঙ্গাপুর।

রিলা মুখার্জির লেখার লিংক:
https://www.thedailystar.net/slow-reads/focus/news/why-chittagong-never-became-maritime-city-4254986