দীন মোহাম্মদের আগে কোনো ভারতীয় ইংরেজিতে বই লেখেননি এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোনো ভারতীয় কর্মচারী ভারতে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা লেখেননি। ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কার্যক্রম সম্পর্কে বেশিরভাগ বইপত্র ইউরোপীয় দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগ সৈন্য স্থানীয় অধিবাসী হলেও তাঁদের মধ্যে কেউই তাঁদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লেখেননি। সেই সময়ে ভারতে এ ধরনের বইপত্র লেখার চল শুরু হয়নি। ফলে দীন মোহাম্মদের বই প্রকাশের ঘটনাটি একটি অসাধারণ এবং ঐতিহাসিক ঘটনা। তিনিই প্রথম এবং সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সেই অভিজ্ঞতা এবং ব্রিটিশদের প্রতি সাধারণ সৈন্যদের মনোভাবের সরাসরি বিবরণ দিয়েছেন। যদিও দীন মোহাম্মদ একজন ব্রিটিশ-ভক্ত সৈনিক ছিলেন, তবুও তাঁর বইয়ের মাধ্যমে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম দিককার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যেসব তথ্য আমাদের জানান, তা যে কোনো ভারতীয়ের জন্য একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। অতএব, দীন মোহাম্মদের বইটিকে ভারতীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচনা করা অপরিহার্য।
১৭৯৩ সালের মার্চ মাসে তিনি সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে বইটি প্রকাশের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন, যা সেই সময়ের একটি প্রচলিত প্রথা ছিল। দীন মোহাম্মদ তাঁর বইটার প্রচারের জন্য কেবল জনসাধারণের বিজ্ঞাপনই ব্যবহার করেননি, বরং গ্রাহক সংগ্রহ করার জন্য ব্যক্তিগতভাবে দক্ষিণ আয়ারল্যান্ডের বিশিষ্ট পরিবারগুলোর সাথে দেখা করেছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল, কারণ বইটা প্রকাশের আগে ৩২০ জন ব্যক্তি ২ শিলিং ৬ পেন্স করে জমা দিয়েছিলেন। এদের সবাই অভিজাত পরিবারের লোক ছিলেন।
দীন মোহাম্মদের জন্মের পরের সময়কাল থেকে ইংরেজ কোম্পানি তাঁর পরিবার এবং সেরকম আরও অনেক পরিবারের জীবিকার ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাঁদের মতো অনেক মুসলিম পরিবার কোম্পানির সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনে ভারতীয়দের মধ্যে ওপরের দিকে স্থান পেতে শুরু করে—তবে অবশ্যই ইউরোপীয়দের নিচে। বেঙ্গল আর্মিতে দীন মোহাম্মদের সময়কালে প্রায় অর্ধেকের মতো উচ্চপদস্থ ভারতীয় অফিসার, ৪০% নিম্নপদস্থ অফিসার এবং এক তৃতীয়াংশ সিপাহি মুসলিম পরিবার থেকে আগত ছিলেন, যা তাদের জনসংখ্যা অনুপাতের চেয়ে অনেক বেশি। সেই সময় মুসলিম জনসংখ্যা ছিল এক চতুর্থাংশ।
যেহেতু সেই সময় থেকেই বাংলার নবাবের ক্ষমতা খর্ব হতে শুরু করেছিল, তখন থেকেই অনেক অভিজাত মুসলিম কর্মকর্তা দ্রুত বর্ধনশীল কোম্পানির সৈন্যবাহিনীতে ঠাঁই করে নিতে শুরু করেন। অন্যদিকে রবার্ট ক্লাইভও হিন্দু-মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছিলেন। এই সময়টাতে কোম্পানি বাঙালিদেরকে সৈন্যবাহিনীতে তেমন মূল্যায়ন করেনি; তারা সেই সময় শুধু মাত্র যোদ্ধা হিন্দু জাতিগোষ্ঠী আর মুসলমানদের নিয়োগ দিতে চাইতো।
কোম্পানির সৈন্যবাহিনীর বেলায়ও মুঘলদের মতো কঠিন শ্রেণিবিভেদ ছিল। উচ্চপর্যায়ের অফিসার এবং নিম্নপর্যায়ের সিপাইদের মধ্যে অনেক দূরত্ব ছিল। দীন মোহাম্মদের পিতার অফিসার পদবীর কারণে দীন মোহাম্মদও সরাসরি অফিসারদের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিল। তাঁর বাবা সুবেদার পদে ছিলেন, যা ভারতীয়দের জন্য প্রযোজ্য পদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছিল।
দীন মোহাম্মদ যখন বেড়ে উঠছিল, তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্রমাগত তাদের ক্ষমতার পরিধি সম্প্রসারিত করছিল এবং ভারতবর্ষের শাসন প্রণালীর মধ্যে সরাসরি প্রভাব বিস্তার শুরু করেছিল। বাংলায় পুতুল নবাব বসিয়ে তাদের কাঁধে বন্দুক রেখে স্বার্থ হাসিল করে যাচ্ছিল। ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৫ সময়কালে বাংলার নবাবের মাধ্যমে বিহার থেকেও রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা করছিল, কিন্তু সেটা অংশত ব্যর্থ হয়েছিল। যে পরিমাণ রাজস্ব দরকার, সে পরিমাণ আদায় হচ্ছিল না, যা নিয়ে কোম্পানি অসন্তুষ্ট ছিল। ফলে বিহারের রাজস্ব আদায়ের জন্য কোম্পানি সরাসরি নিজেরাই মাঠে নেমে যায়। বিহারের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় থমাস রামবোল্ডকে। ১৭৬৬ সালে তাঁকে পাটনা রেভিনিউ বোর্ডের প্রধান করা হয় আর রাজা সিতাব রায়কে বাংলার নবাবের ডেপুটি হিসেবে সেটা দেখভাল করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বিহারের ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সিতাব রায় রামবোল্ড এবং ব্রিটিশ অফিসারদের সন্তুষ্ট করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালান। কোম্পানির বাহিনীকে ব্যবহার করে জোর করে জমিদারদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের চেষ্টা করেন। সেরকম একটা বাহিনীতে কাজ করত দীন মোহাম্মদের পিতা। জমিদারেরা অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল সিতাব রায়ের এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে। সেরকম একটা খাজনা আদায়ের অভিযানে দীন মোহাম্মদের পিতাকে পাঠানো হয়েছিল, যেখানে তিনি প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন। যদিও হত্যাকারীরা পরবর্তীতে ব্রিটিশদের সাথে বড় অংকের খাজনা দেওয়ার মাধ্যমে আপস করেছিল। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বা রাজা সিতাব রায়ের কাছে দীন মোহাম্মদের পিতার মৃত্যুর ঘটনাটা তেমন বড় কিছু না হলেও, দীন মোহাম্মদের পরিবারের জন্য সেটা ছিল একটি মর্মান্তিক ঘটনা। তাদের পরিবারে তখন অন্ধকার নেমে এসেছিল।
১৭৬৯ সালে দীন মোহাম্মদ যখন চাকরিতে যোগ দেয়, তখন বেঙ্গল আর্মির মোট ভারতীয় সৈন্য ছিল ২৭,২৭৭ জন, ইউরোপীয় অফিসার ৫২২ জন এবং ইউরোপীয় সৈন্য ২,৭২২ জন। ১৭৮২ সালে দীন মোহাম্মদ যখন চাকরি ছেড়ে দেয়, তখন ভারতীয় সৈন্য ছিল ৫২,৫০০ জন এবং কোম্পানির তিনটা প্রেসিডেন্সি মিলে মোট সৈন্য ছিল ১১৫,০০০ জন।
দীন মোহাম্মদ চাকরি ছেড়ে দিয়ে তখন মুক্ত। সে সময় চাকরি ছেড়ে দেওয়ার জন্য এক বছরের নোটিশ দিতে হতো, কিন্তু বিশেষ অবস্থার কারণে সে ব্যবস্থা মওকুফ করা হয়েছিল। তবে যে কোনো দরখাস্তের চূড়ান্ত মঞ্জুরের জন্য ছয় সপ্তাহের একটা বিরতি থাকত, এমনকি সেটা যদি ক্যাম্প ট্রান্সফারও হয়। অফিসারদের ক্ষেত্রে এই আইনটা প্রযোজ্য ছিল। ধরে নেওয়া যায়, সেই অবকাশে দীন মোহাম্মদ ক্যাপ্টেন বেকারের সাথে এদিক-সেদিক ঘুরে ফিরে কাটিয়েছেন বেশ কিছুদিন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল ঢাকা ভ্রমণ। ঢাকা থেকে কলকাতা ফেরার পথে সুন্দরবন এলাকাও ঘুরে দেখেছিলেন। এ ছাড়া ১৭৮৩ সালের পুরো সময়টা কলকাতাতেই কেটেছে। বেকারের সাথে আয়ারল্যান্ড যাওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় তখন।
সে সময় অধিকাংশ ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজে করে ইউরোপে যাতায়াত করত। জাহাজগুলো অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এবং শক্তিশালী ছিল। কিন্তু কোম্পানির জাহাজে যেতে হলে কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হতো। দীন মোহাম্মদকে নিয়ে ক্যাপ্টেন বেকারের পক্ষে কোম্পানির জাহাজে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই বিকল্প হিসেবে একটা ডেনিশ জাহাজে চড়ে রওনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এটা খুব গোপনে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, ফলে কলকাতার বাইরে থেকে জাহাজে উঠতে হবে।
৭০০ টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ডেনিশ জাহাজটির নাম ছিল ‘ক্রিস্টিয়ানবর্গ’। সেই জাহাজে ডেনিশ কোম্পানির কিছু গোপন মালামাল ছিল। তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার জন্য জাহাজটি কলকাতার বাইরে থেকে ছাড়ে। সেখানে এক লাখ পাউন্ডের সমতুল্য মালামাল ছিল, যেটি ভারত থেকে ডেনমার্কগামী যেকোনো ডেনিশ জাহাজের মধ্যে সর্বোচ্চ। সেই জাহাজে দীন মোহাম্মদ ইউরোপে পৌঁছে গিয়েছিল। আয়ারল্যান্ডের কর্ক (Cork) শহরে তাঁর জীবনের নতুন একটা অধ্যায়ের সূত্রপাত ঘটে।
১. কর্ক শহরে বসেই তিনি তাঁর বিখ্যাত বই ‘দ্য ট্রাভেলস অব ডিন মাহোমেদ’ (The Travels of Dean Mahomet) রচনা করেন, যা ১৭৯৪ সালে প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল কোনো ভারতীয় কর্তৃক ইংরেজিতে প্রকাশিত প্রথম কোনো বই। এই বইটিতে তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনি, মুঘল ভারত এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম দিকের কর্মকাণ্ডের দুর্লভ বিবরণ তুলে ধরেন।
২. আয়ারল্যান্ড থেকে তিনি পরবর্তীতে ইংল্যান্ডে চলে যান। ১৮১০ সালে লন্ডনের পোর্টম্যান স্কোয়ারে তিনি খুলেন ‘মোহামেদস বাথ অ্যান্ড শ্যাম্পুয়িং মেশিনস’ নামক একটি এক্সক্লুসিভ বাথ বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সেখানে তিনি ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী ভেষজ তেল ব্যবহার করে মালিশ এবং বাষ্পীয় স্নানের প্রচলন করেন, যা তৎকালীন ব্রিটিশ সমাজে প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা লাভ করে। ইংরেজি ভাষায় ‘শ্যাম্পু’ (Shampoo) শব্দটির আধুনিক ব্যবহারে তাঁর এই উদ্যোগের ভূমিকা ঐতিহাসিক।
৩. তাঁর এই ব্যতিক্রমী ও স্বাস্থ্যসম্মত থেরাপি এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, ব্রিটিশ রাজা চতুর্থ জর্জ এবং চতুর্থ উইলিয়াম তাঁকে তাঁদের ব্যক্তিগত ‘শ্যাম্পুয়িং সার্জন’ বা রাজকীয় ম্যাসাজ ও স্নান বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। একজন সাধারণ ভারতীয় অভিবাসী হিসেবে ব্রিটিশ রাজদরবারে এমন বিরল সম্মান ও উচ্চ পদমর্যাদা লাভ করা ছিল এক অভাবনীয় কীর্তি।
শেখ দীন মোহাম্মদের জীবন এবং তাঁর লেখা গ্রন্থটি নিয়ে এই কাজটি করতে টানা দুবছর সময় লেগেছে। কাজটা খুব লাভজনক ছিল না। কিন্তু এই কাজের সুবাদে মার্কিন ইতিহাসবিদ প্রফেসর মাইকেল এইচ ফিশারের মতো একজনের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি হওয়া খুব মূল্যবান অর্জন ছিল।

