Saturday, February 7, 2026

আমি কেন উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলাম?

আমি নন-ফিকশন লেখক। আমার মূল ফোকাস ইতিহাস। কিন্তু মাঝে মাঝে আমি কিছু গল্প লেখার চেষ্টা করেছি। সেগুলো নিছক অবসর কাটাবার উদ্দেশ্যে। তার মধ্যে কিছু গল্প লিখেছি গল্পের ছলে ইতিহাসকে পাঠকের কাছে তুলে ধরার জন্য। আরো বহুবছর আগে, আমি একটা উপন্যাস লিখতে বসেছিলাম। সেটা কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ ছিল না। আমি নিতান্তই অপরিচিত লেখক, আমার লেখা উপন্যাস পড়ার পাঠক পাওয়া যাবে না বলে আমি শতভাগ নিশ্চিত। তবু আমি সেই উপন্যাসটি লিখতে চেষ্টা করছিলাম বহুবছর ধরে। অর্ধেক লেখার পর থেমেও গিয়েছিলাম। প্রায় অর্ধযুগ ফেলে রাখার পর আবার যখন শুরু করলাম তখন আর আগের মতো এগোতে পারছিলাম না। না পারার কারণ ছিল আমি এখানেও গল্পের ছলে ইতিহাস গেলানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু যে সময়কাল নিয়ে আমি কাজটা করতে যাচ্ছিলাম সেই সময়কালের ঘটনাগুলোকে সমন্বয় করতে গিয়ে একটা ঝামেলার মধ্যে পড়ে গেলাম। আমার গল্পের চরিত্রগুলো কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে জড়িত ছিল। সেই ঘটনাগুলো সত্যি ঘটেছিল। আমার উপন্যাসের চরিত্রগুলো সেখানে উপস্থিত ছিল। সমস্যা হলো তাদের উপস্থিতিকে বাস্তবসম্মত করার জন্য সময়কালকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন তার ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে। সেখানে গিয়ে আমি মুশকিলে পড়ে গেলাম। উপন্যাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে আমি যে বয়সে উপস্থাপন করেছিলাম, সেই ঘটনার মধ্যে তাকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে হাজির করা যাচ্ছিল না। তাই গল্পটা বারবার হোঁচট খেতে খেতে থেমে গিয়েছিল। আমার দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও আটকে গেল সেখানে। আরো চার বছর পর আমি একদিন এক নির্ঘুম রাতে কীবোর্ড নাড়াতাড়া করতে করতে নতুন একটা গল্প লিখতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ লেখার পর অনুভব করলাম আমি আসলে নতুন গল্প লিখছি না। পুরোনো গল্পটাকে আমি নতুন একটা স্রোতের সাথে মিলিয়ে দিয়েছি। আমার উপন্যাসের নদী এবার এমন একটা গতি পেল এক যুগ আটকে থাকা গল্পটা কথা বলতে শুরু করলো। একটানা কয়েক মাস লেখার পর আমি আমার পছন্দের গন্তব্য খুঁজে পেলাম। উপন্যাসটির সমাপ্তিরেখায় পৌঁছে আমাকে চমকে দিল। কারণ আমি নিজেও এই সমাপ্তির কথা ভাবিনি। এটা উপন্যাসের নিজস্ব গতিতে, নতুন স্রোতের সাথে মিলেমিশে তৈরি হয়েছে। আমার করার কিছু ছিল না। শেষ করার পর ওটা একটা ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হলো। আমার আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত করে পাঠক সাদরে বরণ করলো গল্পটাকে। জীবনের প্রথম ফিকশন নিয়ে আমি আনন্দিত। সেটাই শেষ নয়। পত্রিকায় প্রকাশের পরপর কয়েকজন প্রকাশক যোগাযোগ করলেন গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার জন্য। আমি তখনো স্থির করিনি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা উচিত হবে কিনা। কাকে দেয়া উচিত। গ্রন্থাকারে প্রকাশের জন্য উপন্যাসের পরিধি আরেকটু বাড়ানো দরকার। হাতে যথেষ্ট সময় ছিল। প্রকাশক ঠিক হবার পর সময় নিয়ে উপন্যাসটাকে চূড়ান্ত করলাম। খুব বেশি কাজ করার ছিল না। মাঝখানে বাদ দেয়া কিছু পর্বকে যোগ করা ছাড়া মূল গল্প অক্ষুন্ন আছে। ২০২৬ সালের বইমেলায় প্রকাশ হতে পারে। এখনো ঘোষণা করা হয়নি। প্রকাশকের কাজ শেষ হলে ঘোষণা আসবে। কিন্তু জীবনের প্রথম উপন্যাস প্রকাশের প্রাক্কালে নিজেকে প্রশ্ন করছি, উপন্যাসের কাজটা পাঠক কিভাবে গ্রহন করবে? আমার ৮টা বই প্রকাশিত হয়েছে গত কয়েক বছরে। সবগুলোই নন-ফিকশন। আমাকে ফিকশন লেখক হিসেবে পাঠক মেনে নেবে? এই জায়গাটা সত্যি খুব অনিশ্চিত। ইতিহাস লিখে যেটুকু সুনাম অর্জিত হয়েছে সেটা হুমকির মধ্যে পড়বে কিনা তাও ভাবতে হচ্ছে। আমার লেখক জীবনে এখনো পাঠকের কাছ থেকে কঠিন কোনো সমালোচনার মুখোমুখি হইনি। কমবেশি ভালো ভালো কথাই শোনা গেছে। আমার যোগ্যতার তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু ফিকশন লিখে সমালোচনার ধাক্কা সামলাতে হলে আমার আসল কাজগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আমার হাতে আরো দু-তিনটি কাজ রয়ে গেছে, যেগুলো শেষ করার পর লেখক জীবনের ইতি টানার কথা। সেই কাজগুলো ঠিক সময়ে করা যাবে কিনা এখন বলা যাচ্ছে না। এই বছরটা আরো অনিশ্চিত। অনেক কিছুই ঘটতে পারে। পত্রিকায় প্রকাশের সময় পাঠক যেভাবে সাদরে গ্রহন করেছে, গ্রন্থাকারে প্রকাশের পর যদি সেই সমাদর না করে তাহলে হতাশ হওয়া উচিত হবে? অনেক বড় লেখকেরাও নিজের উপন্যাস নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেন না। পাঠকের কাছ থেকে সবসময় সমাদর পান না। তাই বলে তারা লেখা থামিয়ে দেন?


আমার আশঙ্কা অন্য কারণে। আমি প্রথম উপন্যাসটি প্রকাশের আগেই আরেকটি উপন্যাসের কাজে হাত দিয়ে ফেলেছি। সেটিও এবার একটা  পত্রিকার ঈদসংখ্যায় প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। ওই উপন্যাসের কথা তেমন কেউ জানে না। প্রকাশের আগে কাউকে বলতে চাই না। প্রথম উপন্যাস প্রকাশের পর সাড়া পাওয়া না গেলে লেখক নিশ্চিতভাবে চুপসে যাবেন। ঈদসংখ্যার উপন্যাসটা নিয়ে আশাবাদী হবার কোনো সুযোগ থাকবে না। কারণ সেই উপন্যাসটি ভিন্ন চরিত্রের হলেও ইতিহাস জড়িয়ে আছে প্রথমটার মতো। আকারে বড় না হলেও ইতিহাসের পরিমাণ প্রথমটার চেয়েও বেশি। পাঠক পরপর দুবছরে দুটো উপন্যাস কিভাবে হজম করবে? 


অসন্তুষ্ট পাঠক যদি জিজ্ঞেস করে, আপনাকে দ্বিতীয় উপন্যাস লেখার আশকারা কে দিয়েছে?


আমি বলবো, ইতিহাস। এই ইতিহাসটা আমি নীরস তাত্ত্বিক উপায়ে উপস্থাপন করার বদলে গল্পের আশ্রয় নিয়েছি। গল্পটা বেড়ে গেলে উপন্যাসে রূপান্তরিত হয়েছে। সেই রূপান্তর কতটা সার্থক হলো সেটা বোঝার জন্য আরো দু’মাস অপেক্ষা করতে হবে। তার আগে নিজের জন্য একটা সান্ত্বনাবাক্য রেখে যাই।


"Ever tried. Ever failed. No matter. Try again. Fail again. Fail better."

Samuel Beckett, Worstward Ho (1983)


Friday, February 6, 2026

দেশ, মানুষ, রাজনীতি বিবিধ ভাবনা

 রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানো ছেড়ে দিয়েছি বহু বছর আগে। এই দলকানাদের দেশে রাজনীতির মাঠে বিচরণ করে ভণ্ড আর বুদ্ধি প্রতিবন্ধীরা। কিন্তু দেশ নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবতে বাধ্য হই। কারণ দেশের সাথে আমার অস্তিত্বের প্রশ্ন আছে। আমাদের জীবন একরকম কেটে গেছে। এখন আমার সন্তানদের পালা। ওদের জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে এইসব ভণ্ড আর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী রাজনৈতিক কর্মীদের কারণে। আমি নিশ্চিত সংখ্যায় তারা বেশি নয়, কিন্তু তাদের দাপটে সারা দেশ কাঁপে। কারণ তারা শক্তি প্রয়োগে নিজ নিজ মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মতবাদেরও কোনো ঠিক নেই। নিজেই নিজের মতবাদের বিপরীত আচরণ করে। যে আচরণ অন্য দলের কাছ থেকে অন্যায় বলে মনে করা হয়, নিজেরাই আবার সেই আচরণ করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। সুবিচার বা ন্যায়বিচার এই কথাগুলো সত্য হয় তখনই, যখন সেটা নিজের পক্ষে যায়। টিভি, পত্রিকা কিংবা সোশাল মিডিয়াতে যতটুকু দেখা যায় তাতে মনে হয় আমাদের জীবনটা আর কখনো শান্তির দেখা পাবে না। প্রতিটি দলই পরস্পর মারমুখী। কেউ কাউকে সহ্য করছে না। 

আগামী সপ্তাহে একটা নির্বাচন আছে। সেই নির্বাচন নিয়ে আমি দেশে আবারো নতুন করে একটা অস্থিরতার আশঙ্কা করছি।

গত পনের বছর নির্বাচনে শুধু আওয়ামী লীগ থাকতো। যেনতেন করে একটা নির্বাচন প্রহসন করে নিজেদের ক্ষমতা রিনিউ করতো। এবার তার শাস্তিস্বরূপ আওয়ামী লীগ নিজেই খেলা থেকে আউট। বাকী আছে বিএনপি, জামাত এবং অল্প কিছু ছোট দল। মূল খেলা বিএনপি এবং জামাতের মধ্যে। কে জিতবে?

অনুমান করা হচ্ছে বিএনপি জিতবে। কারণ দেশে ওদের সমর্থনই বেশি। দীর্ঘদিন ক্ষমতা বঞ্চিত দলটা। কিন্তু বিএনপির অনেক দুর্নাম আছে। দলটির সমর্থক থাকলেও সাংগঠনিক দুর্বলতা অনেক বেশি। সেই তুলনায় জামাত অনেক শক্তিশালী। তাই এবার জামাত জিতে যাবার সম্ভাবনা আছে। তার চেয়েও বড় কথা হলো জামাতের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ক একটা গুজব শোনা যাচ্ছে। যদি ওটা সত্যি হয় তাহলে বিএনপি হেরে যাবে। জামাত সরকার গঠন করবে, বিএনপি বিরোধী দলের চেয়ারে বসবে। ব্যাপারটা কেমন শোনাচ্ছে? খুব অবাস্তব মনে হচ্ছে? মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এরকম কিছু মেনে নেবার জন্য আমাদের তৈরি থাকতে হবে।

জামাত ক্ষমতায় আসলে দেশে কী কী পরিবর্তন আসতে পারে? ওরা কথায় কথায় ইসলামী বিপ্লবের শ্লোগান দেয়। নির্বাচনে জিতলেও কী সেই শ্লোগান দেবে? আমার মনে হয় না। নির্বাচনে জেতার পর ওরা নানান ভুল ভ্রান্তি করতে শুরু করবে। এমনসব সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করবে যেগুলো সাধারণ মানুষের বিপক্ষে যাবে।  মানুষ বিরক্ত হতে থাকবে। যারা এতকাল সরল বিশ্বাসে জামাতকে সমর্থন করেছিল তাদের সমর্থন হারাবে। সেই সুযোগে বিরোধী দলগুলো আবারো নতুন আন্দোলন শুরু করবে। আবারো অস্থির হবে দেশ।

এবার তৃতীয় একটা সম্ভাবনার কথা ভাবা যাক। আগামী সপ্তাহে যদি নির্বাচনটা না হয়? যদি এমন কিছু ঘটে নির্বাচন ভণ্ডুল হয়ে গেল, তাহলে?

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেবে। নতুন একটা সরকার গঠিত হতে পারে। সেই সরকারটা কাদের নিয়ে গঠিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর একেবারেই অনিশ্চিত।

কিন্তু সাধারণ মানুষের চাওয়া দেশটা যাদের হাতেই থাকুক, দেশের অর্থনীতির চাকা যেন সচল থাকে। দেশে যেন কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি না হয়। হোক সেটা গৃহযুদ্ধ কিংবা প্রতিবেশিদের সাথে যুদ্ধ। আমাদের মতো পেটে-ভাতে খাওয়ার দেশে যুদ্ধের মতো ব্যাপার হলো অভিশাপ। যে অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর অনেক দেশ। স্পষ্ট করে বলতে গেলে মুসলিম দেশ। নিজেদের ভালো নিজেদের বুঝতে হয়। নইলে অন্য দেশের মোড়ল এসে আমার ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। যে আমি নানান টানাপোড়েনের মধ্যেও এখনো একটা শান্তির পরিবেশে মাথার ওপর ছাদওয়ালা বাড়িতে ঘুমাচ্ছি, সেটা থাকবে না। শরনার্থী জীবন বেছে নিতে হবে আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মতো। সেই অভিশাপ থেকে বাংলাদেশ মুক্ত থাকুক।


 





Tuesday, February 3, 2026

ইতিহাসের বর্জ্য

অনেকে ভুলে যায় ইতিহাস বদ্ধ ডোবা কিংবা পাঁকে আটকে থাকা জলাভূমি নয়। ইতিহাস হলো স্রোতস্বিনী নদীর মতো। সে তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে। নদীর অংশ না হয়েও স্রোতের সাথে অনেক খড়কুটো আগাছা কচুরিপানাও ভেসে চলে। সেইসব আগাছা শেষমেষ কোথায় হারিয়ে যায় কেউ জানে না। আগাছাদের কেউ মনে রাখে না। তবু একটা নদীতে নানা রকম আগাছা, কচুরিপানা কিংবা বর্জ্য পদার্থের উপস্থিতি কেউ অস্বীকার করতে পারে না। আবার সেটাকে কেউ নদীর অংশ বলে মনে করে না। আমরা আমাদের ভবিষ্যত বদলাতে পারি, নতুন করে নির্মান করতে পারি। কিন্তু অতীত একেবারেই অপরিবর্তনীয়। ফলে ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে আমার কখনো তেমন মাথাব্যথা হয় না। যেমন মাথাব্যথা হয় না কারো চিন্তার বিকৃতি কিংবা মস্তিষ্কের ভারসাম্যহীনতা নিয়েও।

Saturday, January 24, 2026

সমাপ্তির আগে

মাত্র একটা বই লিখে যার লেখক জীবনের সমাপ্তি টানার কথা ছিল তার যখন ৭টা বই প্রকাশিত হয়ে যায়, তখন একটা ছোট ভাবনা এসে উঁকি দেয়। এখনই থামার উপযুক্ত সময় কিনা। প্রত্যেক লেখকের একটা সোনালী অধ্যায় থাকে। সেই অধ্যায়টা শেষ হয়ে যাবার পর এমন কিছু পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে যেটা সুখকর হয় না। সময়মতো থামতে পারাও একটা কাজ। এখন আমার সেই যুগটা চলছে। এটার মেয়াদ বেশিদিন থাকবে না। সময় থাকতেই আমি থেমে যেতে চাই। প্রতিকূল সময় এসে থামিয়ে দেবার আগে। আমার লেখক সত্তা যেমন ছোট, যেমনি লেখালেখির বয়সও খুব সামান্য। মাত্র দুবছরে বাড়াবাড়ি কিছু বই প্রকাশ হয়ে গেছে। যদিও এই কাজগুলো গত এক দশক ধরে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। আরো কয়েকটা বাকী আছে। সেগুলো শেষ হবে কিনা এখনো বলা যাচ্ছে না। তার আগেই ভাবনাটা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। বয়সটা আরো দশ বছর কম হলে হয়তো এমন ভাবতাম না। পেশাদার লেখক হবার ইচ্ছে থাকলেও সেটা বর্তমান বাস্তবতায় সম্ভব না। অতএব মানসম্মান নিয়ে কেটে পড়াই মঙ্গল মনে হচ্ছে। তার আগে একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক।


লেখালেখির জীবনে ভাগ্য আমাকে কিছু আনুকূল্য দিয়েছিল শুরু থেকেই। ওটা না পেলে আমার লেখক হওয়া সম্ভব হতো না। এতগুলো বই(আমার জন্য ৭টা বই অনেক বেশি) প্রকাশ করা হতো না। বাজারে নতুন লেখক হলেও আমি কতগুলো ব্যাপারে পেশাদার লেখকের মতো আচরণ করেছি। তাতে আমার প্রকাশক পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারতো।


তখনো আমার জানা ছিল না বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখক, যাদের বিশ-ত্রিশটা বই প্রকাশিত হয়েছে তারা কেউ রয়েলটি পায় না। এমনও আছে সৌজন্য কপিও পায় না। টাকা দিয়ে অধিকাংশ লেখক বই প্রকাশ করে। এই বিষয়গুলো সম্পূর্ণ অজানা ছিল। ওই জগতটাই সম্পূর্ণ অন্ধকার ছিল আমার কাছে। সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো অন্ধকারই থাকে। আমি তাদেরই একজন। তবু প্রথম গ্রন্থ উপনিবেশ চট্টগ্রামের পাণ্ডুলিপি প্রকাশকের হাতে দেবার আগে যে কথাগুলো বলেছিলাম, তার সারমর্ম হলো- আমি যদিও অপরিচিত লেখক, তবু আমি বই প্রকাশের জন্য কোনো টাকাপয়সা খরচ করবো না। প্রকাশক যদি নিজ দায়িত্বে সব খরচ বহন করতে পারে তাহলে কাজটা দেবো। মনে রাখতে হবে এই প্রজেক্ট পুরোপুরি লস প্রজেক্ট হবে। কারণ আমি বইয়ের প্রচার-প্রচারণা তেমন করতে পারবো না। আমার চেনাজানা যারা আছে তাদের মধ্যে বড়জোর দশ বারোটা বই বিক্রি হতে পারে। ভালো করে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।


পূর্বস্বরের মইনুল ভাই অদ্ভুত দুঃসাহসী একজন মানুষ। তিনি হাসিমুখে আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন- এই বইটা বিক্রি হতে দশ বছর লাগলেও আমার আপত্তি নেই। আমি একটা ভালো কাজ করতে চাই।

তিনি ভালো কাজের আশ্বাস দিলেও আমি ধারণা করিনি কতটা ভালো করতে পারবেন। বিশেষ করে বইয়ের শেষে যোগ করা ১৮১৮ সালের রঙিন মানচিত্রটা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। ওটা ব্রিটিশ লাইব্রেরি থেকে কেনা হয়েছিল, বইয়ের সাথে ফ্রি দেবো এই শর্তে। ওটা যদি অরিজিনাল প্রিন্ট না হয় তাহলে বিপদ। ২০১৯ সালে পাণ্ডুলিপি নেবার পরবর্তী দেড় বছর কাজ করে ২০২১ সালে বইটা যখন প্রকাশিত হলো তখন আমি সত্যি খুব অবাক হয়েছিলাম প্রকাশনার মান দেখে। সম্পাদনা, ছাপা, বাঁধাই, ছবি ইত্যাদি মিলিয়ে বাংলাদেশে এই মানের প্রকাশনা খুব কমই আছে। কথা ছিল একটা প্রকাশনা উৎসব হবে, কিন্তু করোনার ধাক্কায় সেটা বাতিল করতে হলো। তার বদলে তিনি লেখক কপির সাথে কেক আর ফুল নিয়ে বাসায় চলে এলেন। আমরা পারিবারিকভাবেই উদযাপন করলাম প্রকাশনা উৎসব।


তখনো জানা ছিল না পাঠক বইটা কিভাবে নেবে? লেখকের খুশিতে কিছু এসে যায় না। করোনার কারণে সব দোকানপাট বুকস্টোর বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু ফেসবুক পোস্ট দিয়ে অনলাইনে ডেলিভারির ব্যবস্থা আছে। আমি বলেছিলাম, ক্রেতা পাওয়া যাবে না, ২০০ কপি ছাপালেই যথেষ্ট। কিন্তু প্রকাশক প্রথম দফাতেই ৪০০ কপি ছাপিয়ে ফেললেন। তাই একটু দুর্ভাবনা আমার। প্রচ্ছদ দেখে এক অচেনা লেখকের বই কে কিনবে? আশ্চর্য ব্যাপারটা তার পরেই ঘটলো। সেই রুদ্ধশ্বাস করোনার সময়েও বইটার প্রচুর অর্ডার আসতে লাগলো প্রকাশকের কাছে। চার মাস পর শুনলাম প্রথম সংস্করণ শেষ। বিস্ময়ে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সেই সাথে আরো একটা ঘটনা ঘটলো। বই প্রকাশের মাস তিনেক পর একদিন সাহিত্য পত্রিকা শব্দঘর থেকে টেলিফোন আসলো। ওই পত্রিকায় আমি কখনো লিখিনি, ওরা আমাকে চেনেও না। কিন্তু কারো কাছ থেকে খোঁজ পেয়ে ওরা আমার বইটা সংগ্রহ করে ফেলেছে। তারপর ২০২১ সালে সেরা বই(ইতিহাস) হিসেবে নির্বাচিত করেছে।


এইসব অবিশ্বাস্য কাণ্ডের মধ্যে আমি পরের কয়েকটা কাজ শুরু করেছিলাম। উপনিবেশ চট্টগ্রামের কাজ করতে করতে আমি আরো চারটা প্রকল্পের পরিকল্পনা করেছিলাম ভবিষ্যতের জন্য। সেগুলো আদৌ শেষ করতে পারবো কিনা নিশ্চিত ছিলাম না। কিন্তু লেখালেখি বা পড়াশোনার কাজের মধ্যে আমার সবসময় একটা আনন্দ কাজ করে। সেই আনন্দে পরের তিন বছরে সেই কাজগুলো শেষ করতে পেরেছিলাম। তারপর আরো নতুন প্রকল্পে হাত দিতে শুরু করি। 


পরবর্তী বিস্ময় ছিল থাংলিয়ানা। কথাপ্রকাশ থেকে। বইটা প্রকাশিত হলো ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারীর শেষ সপ্তাহে। বইমেলা শেষ হতে মাত্র ৭ দিন বাকী তখন। যেদিন প্রকাশ হলো সেদিন সন্ধ্যায় প্রকাশক সূত্র থেকে জানলাম ঢাকার বইমেলায় পাঠানো ২০ কপি দুঘন্টার মধ্যে শেষ। পরদিন আরো ৩০ কপি পাঠানো হবে। পরদিন শুনলাম ওটাও শেষ। চট্টগ্রামে পাঠানো হলো কিছু কপি। সেগুলোর অবস্থাও একই। চারদিন পর শুনলাম প্রথম মুদ্রণ শেষ হচ্ছে। আরেকটা মুদ্রণ আসছে। মেলার শেষদিন ২য় মুদ্রণ চলে এলো। আমার মত অখ্যাত একজনের নন-ফিকশন অনুবাদ বই পাঠক এত পছন্দ করবে কল্পনাও করিনি।  থাংলিয়ানা প্রথম প্রকাশের পর থেকে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ৭ মুদ্রণ হয়েছে। এটা খুব আনন্দদায়ক ব্যাপার ছিল লেখক প্রকাশক দুই পক্ষেই। 


প্রথম দুটো বইয়ের সফলতার গল্প পরের বইগুলোকেও স্পর্শ করেছে একে একে। প্রকাশিত ৭টি বইয়ের মধ্যে ৪টি বই এক বছরের অনধিক সময়ে ২ বা তিন মুদ্রণ হয়েছে। পাঠকের এই ভালোবাসা আমার জন্য অপরিশোধ্য ঋণ।


কিন্তু পাঠকের ভালোবাসায় আপ্লুত হবার পাশাপাশি এটাও ভাবতে হয় কেন পাঠক বইগুলো পছন্দ করেছে? শুধু বাংলাদেশ না। পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছ থেকেও অভাবিত সাড়া পাওয়া গেছে। আমার কাছে যে বিষয়টা সবচেয়ে বিস্ময়কর লেগেছে কিছু কিছু আজব পাঠকের আচরণ। আমাকে একাধিক পাঠক নানা মাধ্যমে জানিয়েছেন তারা আমার সবগুলো বই কিনে ফেলেছেন। তাদের মধ্যে সাধারন পড়ুয়া ছাত্র যেমন আছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীন অধ্যাপক শ্রেণীও আছেন। আমার মতো অখ্যাত লেখকের জীবনে এটার চেয়ে বড় পুরস্কার আর কিছু হতে পারে না। যে কোনো লেখকই এমন ঘটনায় আপ্লুত হবেন নিশ্চিত। কিন্তু কেন এমন ঘটেছে? আমি কি এমন কোনো নতুন বিষয় লিখতে পেরেছি? এরকম যে কোনো আত্মতুষ্টি বিব্রতকর। আমি পরিকল্পনা করে কিছুই লিখিনি। কী করেছি আসলে?


প্রথমত আমি চট্টগ্রামের ইতিহাস লিখতে চেয়েছি। একটা ধারাবাহিক ইতিহাস। সহজ ভাষায় লেখা হবে যেন পাঠক পড়তে গিয়ে হোঁচট না খায়। উপনিবেশ চট্টগ্রাম শেষ করতে গিয়ে অনেক হিমশিম খেয়েছি। মোটামুটি বড় বই। এক লাখ শব্দ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পরে কিছু কমিয়েছি। তারপর থাংলিয়ানা। পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিযান নিয়ে রোমাঞ্চকর একটা স্মৃতিকথা। অনুবাদ করে সম্পাদনা করে নিজের মতো যেভাবে সাজিয়েছি সেটাই পাঠক পছন্দ করে ফেলেছে। পরের বই বাতিঘর থেকে শরচ্চন্দ্র দাসকে নিয়ে। ইনি চট্টগ্রামের লোক হলেও তাঁর তিব্বত অভিযানটা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। ওটাও পাঠক গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। তারপর আবারো আরেকটা চট্টগ্রাম। চিৎ-তৌৎ-গং। আমার চট্টগ্রাম বিষয়ক কিছু লেখার সংকলন করেছে কথাপ্রকাশ। পাশাপাশি বাতিঘর থেকে প্রকাশ হয়েছে শেখ দীন মোহাম্মদ- বিলেতে প্রথম বাঙালি বণিক। ২০২৫ সালেই আরেকটি বই প্রকাশিত হয় মার্কেজের সাংবাদিক জীবন নিয়ে। স্ক্যান্ডাল অব সেঞ্চুরি। ২০২৪ এবং ২০২৫ এক বছরের মধ্যে এই ৫টা বই। তখন কাজ চলছিল ২০২৬ সালের জন্য প্রকাশিত্য রাজকীয় জলদস্যু বণিক সমিতি। বইমেলা নিয়ে সরকারের তাল-বেতাল দেখে প্রকাশক বইটা ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসেই প্রকাশ করে। আশাতীত জনপ্রিয় পেল এই বইটাও। এভাবে ৭টা বই হয়ে গেল। পাইপলাইনে আছে আরো দুটো বই। আমার হাতে লেখার বিষয়বস্তুও যথেষ্ট আছে। নতুন কিছু না লিখে পুরোনো লেখা দিয়ে প্রকাশ করা যাবে সেরকম তিনটি পাণ্ডুলিপি তৈরি আছে। তবু, তবু থেমে যাবার ভাবনাটা কেন আসছে?


কারণ মানুষ নিজের যোগ্যতার চেয়ে যখন বেশি কিছু পেয়ে যায়, তখন দিক হারায়, ভারসাম্য হারায়, নিজেকে নিজের ভেতর খুঁজে পায় না। আমি নিজের ভেতর অবশিষ্ট থাকতে থাকতেই সমাপ্তি টানতে চাই।


Thursday, January 15, 2026

আসন

ভদ্রলোককে দেখে আমি একটু চমকে উঠেছিলাম। আমাদের পরিচয় নেই। কিন্তু আমি তাঁকে চিনি। যে কারণে চিনি সেটা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল আমার। সুপারশপের কাউন্টারে তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি একা ছিলেন। বিল দিচ্ছিলেন একটা প্যাকেটের। আমার হাতে ছয়টা প্যাকেট ছিল। একই জিনিস। নিশ্চয়ই তিনি এখন নিঃসঙ্গ আছেন। নইলে হাতে চারটা প্যাকেট থাকতো। তাঁর পকেটে আমার চেয়ে বেশি টাকা। কিন্তু তাঁকে একটা প্যাকেট কিনেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। আমার পকেটে টাকার টানাটানি। তাই ছয়টা কিনতে অনেক হিসেব করতে হচ্ছিল। তিনি অনায়াসে চার-ছয়-দশটা কিনতে পারেন। কিন্তু তাঁকে একটাই কিনতে হলো। ওই একটা প্যাকেটের নিঃসঙ্গতা আমাকে খুব গভীরভাবে স্পর্শ করছিল। আমি শুনেছি তিনি ভালো লোক নন। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে শোনা। তাঁর বক্তব্য শোনা হয়নি কখনো। এটা খুব অদ্ভুত ব্যাপার যে আজ এই কাউন্টারে তাঁর সাথে আমার দেখা হয়ে গেল। এবং তিনি জানেন না তাঁর পেছনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে তার জীবনের কিছু গল্প জানে। তিনি আমাকে চেনেন না। চিনলে বিব্রত হতেন। আমি তাঁর সাথে পরিচিত হতে চাইনি। তাহলে তিনি লজ্জায় পড়ে যেতেন। আমি ওরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইনি। আমি যে সূত্রে তাঁর সম্পর্কে আবছা জানি, সেই সূত্র তাঁর জন্য খুব সংবেদনশীল। আমি পুরোটা জানি না। আংশিক জানি তিনি কেন একা। পুরোটা জানলে হয়তো তাঁকে আমার ভালো লাগতো না। অথবা উল্টোটাও ঘটতে পারতো। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে আমাকে কেউ বলেনি। আমি কিভাবে জেনেছি সেটা একটু বিচিত্র ব্যাপার। অনুমানের সাথে প্রমাণ যুক্ত হবার পর আমি তাঁর পরিচয় উদঘাটন করেছি। বাইরে দেখে সব মানুষকে চেনা যায় না। যে আলো আমরা দেখি, তার পেছনে গভীর অন্ধকারও লুকোনো থাকে। আমার সাথে তাঁর কিছু সংখ্যাগত মিল আছে। যে কারণে একদিন আমি তাঁর জায়গায় গিয়ে বসে পড়েছিলাম। অনিচ্ছায় নয়, স্বেচ্ছায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে। ওই চেয়ারে তাঁরই বসার কথা ছিল। কিন্তু বসতে হলো আমাকে। তিনি সেটা জানেন না। যারা আমাকে বসিয়েছিল তারা নিশ্চিতভাবে ওটা বলবে না। আমি ওই আসনে দুই ঘন্টা সময় উপভোগ করেছি। গল্প করেছি। যাদের সাথে গল্প করেছি, আহার করেছি, তাদের সাথে তাঁরই বসার কথা। কিন্তু তিনি ওখানে ছিলেন না। তাঁকে ডাকা হয়নি। হয়তো তিনি তখন অবাঞ্ছিত ছিলেন। মানুষের জীবনে এমন অদ্ভুত কিছু মুহূর্ত আসে যখন সে অন্যের চেয়ারে বসে যায় অনায়াসে। অথচ যার বসার কথা সে জানতেও পারে না।

[অনুগল্প]

বাণী

১. একটা সময় তেলের সাথে ঘিয়ের তুলনা হতো, তারপর সরিষার তেল আর সোয়াবিন তেলের তুলনা, তারও পরে সোয়াবিন আর পাম অয়েলের তুলনা। আর আজকাল তুলনা নামতে নামতে দেশের এত উন্নতি হইছে ঘিয়ের সাথে গুয়ের তুলনাও করা হয়।

Tuesday, January 13, 2026

নির্বোধ ক্ষমতায় অন্ধ

ক্ষমতার সাথে নির্বুদ্ধিতার যোগফল মানবজাতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে এনেছে যুগ যুগ ধরে। এমনকি বিশ্বযুদ্ধও। গত এক শতকে আমরা বহুবার তার নজির দেখেছি। আবারো দেখার জন্য প্রস্তুত হয়েছি। বর্তমান পৃথিবীর শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে যুদ্ধবাজ কিছু নির্বোধ দানব। আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে অনিশ্চিত অন্ধকার। বর্তমান পৃথিবীর প্রধান নির্বোধটির নাম ডোনাল ড্রাম্প। এই লোকটা একুশ শতকের হিটলার হিসেবে জন্ম নিয়েছে। পৃথিবীর সকল অশুভ শক্তির সাথে তার সম্পর্ক। বর্তমান সভ্যতার ধ্বংসের সূচনা তার হাত ধরেই ঘটতে পারে।