আট বছর আগে একটি বই পড়ে আমি টানা তিন রাত ঘুমাতে পারিনি। জীবনে এমন অভিজ্ঞতা আগে হয়নি। অভিজ্ঞতাটা সুখকর নয়, কুৎসিত। পরে অনুভূতিটা লিখে নিজেকে হালকা করেছিলাম।
যে কোনো সাহিত্যকর্মকে তখনই সফল বলে ধরে নেওয়া হয় যখন সেটা পাঠকের মগজে দীর্ঘ সময় ধরে ঠাঁই করে নিতে পারে, ভাবনার জগতকে আলোড়িত করতে পারে। তেমন সাহিত্যপাঠের অভিজ্ঞতা পাঠকের জন্য যেমন সুখকর, লেখকের জন্যও তেমনি সৌভাগ্যের ব্যাপার। প্রতিটি নতুন গ্রন্থ পাঠকের জন্য নতুন একটি অভিজ্ঞতার জানালা খুলে দেয়। কেতকী কুশারী ডাইসন লিখিত ‘তিসিডোর’ পড়তে শুরু করার আগে তেমন একটি অভিজ্ঞতা লাভের আকাঙ্ক্ষা দানা বেঁধেছিল। বইটি পড়ার জন্য প্রাথমিক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল যখন শুনেছিলাম এই গ্রন্থটিতে বুদ্ধদেব বসু এবং জীবনানন্দ দাশের তুলনামূলক কিছু আলোচনা আছে। বুদ্ধদেব বসু এবং জীবনানন্দ দাশ দুজনই আমার প্রিয় সাহিত্যিক। দুজনের সাহিত্য এবং জীবন সম্পর্কে আমি বিশেষ আগ্রহ নিয়ে পড়াশোনা করেছি। তাই আরেকটি চমৎকার গ্রন্থ পাঠের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হওয়ার আশয়ায় তিসিডোর পড়তে শুরু করেছিলাম।
৯৪ পাতায় এসে জীবনানন্দ দাশের নামটা প্রথমবারের মতো উপস্থিত হয়। আশা করা গিয়েছিল এবার জীবনানন্দের কাব্য সাহিত্য নিয়ে আলোচনা আসবে। কিন্তু সেসব কিছুর নজির দেখা গেল না। আরও কিছুদূর পড়ার পর বোঝা গেল এই গ্রন্থের প্রধান উপজীব্য বিষয় জীবনানন্দের একটি অপ্রচারিত উপন্যাস—‘সফলতা নিষ্ফলতা’।
আমরা জানি জীবদ্দশায় জীবনানন্দ দাশ তাঁর কোনো উপন্যাস প্রকাশ করেননি। তিনি হয়তো সেগুলোকে ঠিক প্রকাশযোগ্য ভাবেননি। তাঁর মৃত্যুর কয়েক দশক পর ট্রাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ সাহিত্যকর্ম আবিষ্কার করেন তাঁর স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা। সেগুলো একে একে প্রকাশ পেতে থাকলে জীবনানন্দ দাশের সৃষ্টি সমগ্র বাংলা সাহিত্যে নতুন করে আলো ছড়াতে শুরু করে।
‘সফলতা নিষ্ফলতা’ উপন্যাসটি লোকচক্ষুর অন্তরালে ট্রাংকের ভেতর পাণ্ডুলিপি অবস্থায় ৭২ বছর ঘুমিয়ে ছিল। প্রকাশিত হওয়ার বিশ বছর পরও উপন্যাসটি ভূভারতে সুলভ নয়। বইটির নামই শোনেনি অধিকাংশ বাঙালি। ২০০৪ সালে প্রকাশিত হওয়ার পরও পড়েছেন হাতে গোনা অল্প কিছু মানুষ।
তিসিডোরের মাধ্যমে জানা গেল বিলম্বে প্রকাশিত উপন্যাসটি কেতকী কুশারী ডাইসনের হাতে পৌঁছানোর পর তিনি পড়ে ভীষণ মর্মাহত হন। এতই মর্মাহত হন যে তিনি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বৃহৎ সমালোচনা পুস্তক ‘তিসিডোর’ রচনা করেন। বিচিত্র কারণে তিনি পুস্তকটিকে উপন্যাস হিসেবে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু যে কোনো বিচারেই তিসিডোরকে উপন্যাস হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা কঠিন।
উপন্যাসটি শুরু হয়েছে লেখিকার নিজের পরিবার ও প্রতিবেশীদের কিছু স্মৃতিচারণ দিয়ে। ৯৪ পৃষ্ঠায় এসে জীবনানন্দের ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’ নিয়ে আলোচনা (নিন্দা বলাই শ্রেয়) শুরু হয়। দীর্ঘ সাড়ে তিনশো পৃষ্ঠার নিন্দালোচনা চলার পরে আবার লেখিকার ব্যক্তিগত পারিবারিক স্মৃতিচারণ চলে দুশো পৃষ্ঠার মতো। কিছু অংশে আবার ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু এবং বিশ্বরাজনীতির আলোচনা যুক্ত হয় যার সাথে জীবনানন্দের কোনো সম্পর্ক নেই। পাঁচশো পৃষ্ঠার পর আবার জীবনানন্দ আলোচনা (নিন্দা বলাই শ্রেয়) পুনর্বহাল হয় এবং উপন্যাসটির সমাপ্তি ঘটে ৮৫৫ পৃষ্ঠায় গিয়ে।
বইটির এই পর্বগুলোর মধ্যে মূল অংশ হলো তিসি ও তিল নামের দুই বোনের মধ্যে জীবনানন্দ দাশের ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’ নিয়ে আলোচনা এবং এই উপন্যাসের মধ্যেরকার সংলাপ ও ঘটনাবলী থেকে জীবনানন্দের কুৎসিত মানসিকতা, ব্যর্থতা, হীনমন্যতা আবিষ্কার (!)। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটি হলো বুদ্ধদেব বসুর প্রতি জীবনানন্দ দাশের তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষ। সেটিই তিসিডোরের মূল উপজীব্য। লেখিকা নিজেই তিসিডোর লেখার পেছনে প্রধান এই কারণটি উল্লেখ করেছেন।
‘সফলতা-নিষ্ফলতা’র রচনাকাল ১৯৩২ সাল। যখন কবি জীবনানন্দ দাশ জীবনের কঠিনতম একটি অধ্যায় অতিক্রম করছিলেন। যে সময়টায় তিনি প্রায় কয়েক বছর কবিতাশূন্য সময় কাটিয়েছেন। সেই অকেজো সময়ে পাতার পর পাতা গদ্য রচনা করে বস্তাবন্দী করে ফেলে রেখেছিলেন, যার কিছু উপন্যাস, কিছু গল্প। সেসব কোথাও প্রকাশ করার চেষ্টা করেননি, যতটা জানা যায় কারো সাথে আলোচনাও করেননি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর অর্ধশত বছর পর ভূমেন্দ্র গুহের সম্পাদনায় মাত্র ১২৩ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি প্রকাশ পায়। উপন্যাসটির সম্পাদকীয় বিবরণের অংশটি বিপুলায়তন এবং সেই অংশে সম্পাদক ভূমেন্দ্র গুহ অনুমান করছেন যে উপন্যাসের দুটি প্রধান চরিত্রের একজন হলেন বুদ্ধদেব বসু (বানেশ্বর) এবং অন্যটি জীবনানন্দ দাশ (নিখিল)।
ভূমেন্দ্র গুহের নানান বিষয়ে কেতকীর ব্যাপক আপত্তি আছে। তাঁর অনেক কথাই তিনি মানতে রাজি নন। কিন্তু এই উপন্যাসটির দুই চরিত্রকে নিয়ে ভূমেন্দ্রর অনুমানকে ভিত্তি করে তার ওপর তিনি নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা চড়িয়ে মূল ঘটনার তিলটিকে তাল বানিয়ে ‘তিসিডোর’ নামের ৮৫৫ পৃষ্ঠার বিপুলায়তনের গ্রন্থ লিখে ফেলেছেন।
তিসিডোরের বিরাট অংশ জুড়েই নানা ধরনের বিচিত্র বিশ্লেষণ দিয়ে যা বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে তার সারমর্ম হলো—জীবনানন্দ দাশ বুদ্ধদেব বসুর প্রতি তীব্রভাবে ঈর্ষা, ঘেন্না, বিদ্বেষ পোষণ করতেন। সেইসব ঘেন্নার প্রমাণ ‘সফলতা নিষ্ফলতা’র লাইনে লাইনে লুকোনো। অথচ জীবদ্দশায় সে মানসিকতা লুকিয়ে রেখেছিলেন। কারো কাছে প্রকাশ করেননি। বুদ্ধদেব বসু নিজেও কখনো জানতেন না জীবনবাবু তাঁকে কতখানি ঘেন্না করেন। এই অজ্ঞতার ফলে বুদ্ধদেব বসু সবসময় জীবনানন্দ দাশের প্রশংসায় ডুবে ছিলেন, সাহিত্য আসরের নানান কুটিল জায়গায় তিনি জীবনানন্দ দাশকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। বুদ্ধদেব বসু জীবদ্দশায় যেহেতু জানতে পারেননি তাঁকে মনে মনে অসম্মান করতেন জীবনবাবু, তাই বুদ্ধদেব বসুর মরনোত্তর সম্মান রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন কেতকী কুশারী ডাইসন। কথিত উপন্যাসের খসড়া বাক্যগুলোতে বুদ্ধদেব বসুকে স্নান করিয়ে নিজস্ব বিদ্বেষকে সাহিত্যায়ন করেছেন ‘তিসিডোর’ নামের কথিত উপন্যাসে। কাঠগড়ায় তুলেছেন বাংলা সাহিত্যের নিরীহতম কবি জীবনানন্দ দাশকে।
তিসিডোরের কুৎসাকর্মের ছোট্ট একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। জীবনানন্দের গল্প উপন্যাসে ডিমের অমলেটের কথা আসছে বেশ কয়েকবার। এটা নিয়ে তিসিডোরে ৬ পাতা ব্যাপী ব্যঙ্গ রচনা করা হয়েছে। কবির কাছে ডিম কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেইকালে ডিম দুর্লভ ছিল কিনা, ডিম নিয়ে আহ्लाদ করার কী আছে, বড়লোকেরা ব্রেকফাস্টে ডিম খায়, ডিম খাওয়া বড়লোকী, জীবনানন্দ জানতো না ডিমে কোলেস্টেরল আছে, শরীরে ক্ষতি করে, জানলে উপন্যাসে ডিম আনতো না এত, ইত্যাদি বিষয়ে হাসাহাসি করেছেন।
জীবনানন্দ দাশ দরিদ্র মানুষ ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি সাহিত্য খ্যাতি যেমন পাননি, তেমনি আর্থিক স্বচ্ছলতার মুখও দেখেননি। ডিম তাঁর কাছে গুরুত্ব পেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যে মানুষটা জীবনভর কষ্ট করে পার করেছেন তাঁকে নিয়ে এমন ব্যঙ্গ, এমন অপ্রয়োজনীয় ব্যবচ্ছেদ সহ্য করা কষ্টকর। জীবনানন্দ দাশের তুলনায় বুদ্ধদেব বসু হাজার গুণ বেশি সুখী, স্বচ্ছল, সমৃদ্ধ, সফল জীবন কাটিয়েছেন। তবু সেই বুদ্ধদেব বসুকে তথাকথিত অপমান থেকে বাঁচাবার জন্য লেখিকা জীবনানন্দ দাশকে নিষ্ঠুরতার সাথে আক্রমণ করে গেছেন। মজার ব্যাপার হলো যে অপমান বুদ্ধদেব বসু কখনো অনুভব করেননি। যে বই সম্পর্কে তিনি কখনো জানেননি, সেই বইটি নিয়ে এমন সপ্তকাণ্ড রচনা!
বস্তুতপক্ষে ভূ-ভারতে আর কেউ বোধহয় মনে করেননি জীবনানন্দ দাশ ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’ দিয়ে বুদ্ধদেব বসুকে অপমান করার চেষ্টা করেছেন। যে উপন্যাস তিনি কখনো প্রকাশ করেননি, সেই উপন্যাস কী করে অপমানের হাতিয়ার হতে পারে সেটাও একটা ভাবনার বিষয়। বরং তিসিডোরই সেই অপ্রকাশিত অঘটিত ঘটনাটিতে ঘষে ঘষে তাদের দুজনের মরনোত্তর সম্পর্কটিতে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে। জীবনানন্দ মুখে না বললেও মনে মনে বুদ্ধদেব বসুকে ঈর্ষা করতেন, ঘৃণা করতেন, তাচ্ছিল্য করতেন, খুঁড়ে খুঁড়ে কেবল এই তথ্যগুলো আবিষ্কার করার চেষ্টা করা হয়েছে তিসিডোরে। চেষ্টাটি খুব হাস্যকর। এতে জীবনানন্দ দাশ বা বুদ্ধদেব বসুর কোনো লাভ-ক্ষতি না হলেও তিসিডোর লেখকের ছিদ্রান্বেষী মানসিকতার রূপটাই পাঠকের চোখে বারবার প্রকাশ পেয়েছে। এটাই সবচেয়ে দুঃখজনক।
এই দুজনকে কেউ কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে কিনা জানা নেই। সাহিত্যরসিকগণ দুজনের কাছ থেকেই রস আস্বাদন করেন। দুজনের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। কেতকী চেষ্টা করে গেছেন সেই রসের ভেতর বিষ দিয়ে জীবনানন্দের প্রতি পাঠকের মনকে তিক্ত করে তুলতে। সেই চেষ্টা বোধকরি শতভাগ বিফলে গেছে। কেননা তিসিডোর প্রকাশের পর জীবনানন্দের বইয়ের বিক্রি কমেছে বলে শোনা যায় না। জীবনানন্দের বাজার তৈরির জন্য বিজ্ঞাপন লাগেনি। সময়ই তাঁকে তুলে এনেছে। রবীন্দ্রোত্তর যুগে জীবনানন্দের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হয়নি এখনো পর্যন্ত। আধুনিক বাংলা কাব্যের বিরাট একটা অংশ গড়ে উঠেছে তাঁকে ভিত্তি করে। জীবনানন্দের সুনাম ধ্বংসে তিসিডোরের সেই প্রাণপণ চেষ্টাকে করুণাই করতে হয়।
‘তিসিডোর’কে কেন উপন্যাস বলা হয়েছে আমার জানা নেই। তিসিডোরের গঠন-প্রকৃতি-চরিত্র কিছুর মধ্যেই উপন্যাসের কোনো উপাদান নেই। সাধারণত একটি উপন্যাসের মধ্যে চারটি মৌলিক উপাদান থাকে—কাহিনী, চরিত্র, পরিণতি, বক্তব্য। উপন্যাসের এই চারটি মূল উপাদানের মধ্যে তিসিডোরে শুধু একটি উপস্থিত। তা হলো বক্তব্য। একজন লেখকের চরিত্রহনন বিষয়ক বক্তব্য। যে বক্তব্যকে নিন্দাসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, কিন্তু কিছুতেই উপন্যাস হতে পারে না এই গ্রন্থ।
তবু কেন এটাকে উপন্যাস বলা হয়েছে? একটি কারণ হতে পারে জীবনানন্দ দাশের সম্মানহানি করার মামলা এড়ানো। অপ্রকাশিত একটি উপন্যাসের চরিত্রের মধ্যে যদি তিনি বুদ্ধদেব বসুর চরম অপমান এবং অবমাননা আবিষ্কার করতে পারেন তাহলে তিনি সরাসরি জীবনানন্দের নাম উল্লেখ করে যেসব কুৎসিত অমূলক অভিযোগ করেছেন তা নিয়ে যে কেউ মামলা করতে পারে তাঁর বিরুদ্ধে। কেননা তিনি কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র উপন্যাসের চরিত্র বিশ্লেষণ করে অনুমানের ভিত্তিতে একজন লেখকের সুনামহানির চেষ্টা করেছেন। ‘তিসিডোর’ গ্রন্থটি যদি উপন্যাস হয়ে থাকে তাহলে সাহিত্যের অভিধান থেকে উপন্যাসের সংজ্ঞাটিই তুলে দিতে হবে।
বস্তুতপক্ষে তিসিডোর হলো ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’ উপন্যাসটিকে ব্যবচ্ছেদ করে জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে আবর্জনা লেপনের প্রচেষ্টা। যে দুর্গন্ধ কখনো বাংলা সাহিত্যের আলো-বাতাসে ছিল না, সেই দুর্গন্ধকে আবিষ্কার করার কৃতিত্বের দাবিদার তিসিডোর। এই ভয়ংকর কাজটি তিনি কোনো তথ্য প্রমাণের মাধ্যমে করেননি। উপন্যাসের চরিত্রের মুখনিঃসৃত বাক্যগুলোকে অনুমানের ভিত্তিতে বাস্তবের ব্যক্তিদের মুখে পছন্দমতো বসিয়ে সাহিত্যিক দক্ষতায় প্রমাণ করার চেষ্টা করে গেছেন জীবনানন্দের হৃদয় বুদ্ধদেব বসুর প্রতি প্রবল ঘৃণা, বিদ্বেষ, ঈর্ষায় ভরপুর ছিল, যা তিনি গোপন রেখেছিলেন আজীবন। শুধুমাত্র ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’ উপন্যাসে তা তিনি প্রকাশ ঘটিয়েছেন পুতুল চরিত্রগুলোর মাধ্যমে। সেটার উদ্ঘাটন করার জন্য জীবনানন্দের কথিত ১২৩ পৃষ্ঠার চটি উপন্যাসটির নিন্দা করার জন্য ৮৫৫ পৃষ্ঠার বিপুলায়তনের পুস্তকের জন্ম দিয়েছেন বঙ্গসাহিত্যে। পৃথিবীর ইতিহাসে এত বড় নিন্দাপুস্তক আর একটিও আছে কিনা সন্দেহ।
কোনো যুক্তি না থাকলেও তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া গেল—জীবনানন্দ দাশ সত্যি সত্যি বুদ্ধদেব বসুকে মনে মনে হিংসা করতেন। সেই ঈর্ষা তিনি গোপনে একটি খাতায় লিখে রাখতেন উপন্যাসের আকারে। মুখে কখনো বলতেন না। কেউ জানে না তাঁর হিংসা-বিদ্বেষমূলক মনোভাব। সাথে এটাও ধরলাম যে জীবনানন্দ দাশ নামক ব্যক্তিটি কখনোই লোকের দৃষ্টি আকর্ষণে সফল হননি। কয়েকটি কবিতা ছাপিয়ে জীবনভর ব্যর্থ হয়ে সাধারণ এক বরিশাইল্যা সাহিত্যিক হিসেবে ইহলোক ত্যাগ করলেন ১৯৫৪ সালে। তাঁর প্রয়াণের অর্ধশত বছর পর তাঁর কোনো বংশধর খাটের নিচে একটা খাতা পেয়ে গেল। তারপর সে ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’ নাম দিয়ে একটা বই ছাপাল। সেই বইটি কেতকী কুশারী ডাইসনের হাতে গিয়ে পড়ল। তখন তিনি কী করতেন? কোনো এক অখ্যাত বরিশাইল্যা জীবনানন্দ দাশের উপন্যাস পড়তেন? মনে হয় না। যদি পড়তেন তবুও কি তিনি ‘তিসিডোর’ নামের ঢাউশ একটি বই লিখে জগতকে জানাবার চেষ্টা করতেন যে জীবনানন্দ নামের এক বরিশাইল্যা সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুকে মনে মনে অপমান করেছিল বাহাত্তর বছর আগে? কষ্টকল্পনা ছাড়াই বলে দেওয়া যায়, তিনি তা করতেন না।
কিন্তু এখন জীবনানন্দের সেই তুচ্ছ পুস্তকটি নিয়ে তিনি অতিমাত্রায় প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন কেন? কারণ জীবনানন্দ দাশ জীবদ্দশায় তেমন খ্যাতির নাগাল না পেলেও মৃত্যুর পর মহীরূহ হয়ে উঠেছিলেন। এতই বিশাল সেখানে বুদ্ধদেব বসুর মতো অনেক বড় বড় কবিকেও ছাড়িয়ে গেছেন। বস্তুতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের পর সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী কবি হিসেবে তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তাঁকে বড় করে তোলার এই কাজটা করেছে সময়। জীবনানন্দ নিজেও পারেননি নিজেকে এতখানি তুলে ধরতে। কেতকী নিজেও জানতেন তাঁর এই বইটি বিক্রি হবে ‘কেতকী কুশারী ডাইসন’ নামের কারণে নয়, এই বইয়ের সাথে ‘জীবনানন্দ দাশ’ নামটি জড়িত বলে। তিনি জীবনানন্দ দাশকে অখ্যাত এক উপন্যাসের জন্য নিন্দাঝড়ে ধুয়ে দিলেও তাঁর নামের কাছে নিজেকে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু একজন অখ্যাত বরিশাইল্যা জীবনানন্দ হলে পুরো বাংলা সাহিত্যের সব দিকপালকে প্রকাশ্যে বই ছাপিয়ে গালি দিলেও তিনি কিছু বলতেন না। জীবনানন্দ দাশের মরনোত্তর খ্যাতি প্রাবল্য কারো কারো গায়ে এত জ্বালা ধরিয়েছিল।
বাংলার নিন্দাসাহিত্যের মধ্যে তিসিডোরকে অতিক্রম করতে পারবে তেমন পুস্তক রচিত হবার সম্ভাবনা দেখি না। এটা আপাদমস্তক একটি নিন্দাপুস্তক। তিলকে তাল করার যে অসাধারণ ক্ষমতা এই লেখিকার আছে তা এই পুস্তকের পরতে পরতে ভেসে উঠেছে অতি নগ্নভাবে। ঘটনা খুব সামান্য। সেই ঘটনাটিও ঘুমন্ত থাকত যদি জীবনানন্দের প্রকাশ-অনিচ্ছুক পুস্তকটি বাজারে না আসত এবং সেটি নিয়ে কেতকী বুদ্ধদেব বসুর সম্মান বাঁচানোর নামে দুর্গন্ধ না ছড়াতেন। জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব বসু সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে যে চিত্রটি আছে তা খুব চমৎকার। বিশেষ করে বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধসমূহ এবং অন্যান্য আলোচনায় আমরা দুজনকে খুব সুসম্পর্কের মানুষ বলে জানি। প্রতিভা বসুর ‘জীবনের জলছবি’তেও তার নজির আছে অনেক। কেতকী কুশারী সেই সৌন্দর্যের ওপর কালিমা লাগানোর জন্য বিপুল আয়তনের যে বইটি ফেঁদে বসেছেন, তার মধ্যে মানবজাতির উপকৃত হওয়ার বিষয় খুব কম, যে পরিশ্রমটুকু তিনি করেছেন তার সবটুকুই দিয়েছেন জীবনানন্দকে নোংরা জলে স্নান করিয়ে বুদ্ধদেব বসুকে দুগ্ধস্নান করাতে। কিন্তু সেটি করতে গিয়ে তিনি যে বুদ্ধদেব বসুর গায়েও নোংরা জলের ছিটে দিলেন, তাতে তিনি বুদ্ধদেবকেও কলুষিত করে দিলেন। ঘটনাটি এরকম—আমাকে একজন হিতাকাঙ্ক্ষী এসে জানাল আমার এক বন্ধু নাকি দেড় যুগ আগে একদিন আমাকে বাগে পেলে কষে চড় মারবে বলেছিল। বলার সাথে সাথেই হিতাকাঙ্ক্ষী আমার গালে কষে একটার পর একটা চড় মেরে মাটিতে ফেলে বোঝাতে চেষ্টা করল যে আমার বন্ধুটি আসলে তলে তলে আমাকে এমন চড় দেবার জন্যই প্রস্তুত ছিল সেই সময়ে। আমি চড় খেয়ে বুঝতে চেষ্টা করলাম আমার আসল সমস্যা কী—দেড় যুগ আগের বন্ধুর চড় মারার বাসনা, নাকি বর্তমানে হিতাকাঙ্ক্ষীর হাতের এই চড়?
অতএব, প্রিয় কেতকী কুশারী ডাইসন, আপনি বুদ্ধদেব বসুকে ভালোবেসে স্বতঃপ্রণোদিত এই কাজটি করেছেন বলে জানিয়েছেন। যাকে ভালোবাসি আমরা তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করি। আপনিও তাঁকে রক্ষা করার চেষ্টাতেই এই গ্রন্থটি লিখেছেন। তাই আমরা জেনেছি আপনার বাণী থেকে। কিন্তু আপনার মূল উদ্দেশ্য কী? আপনি এই পুস্তক রচনার আগে কেউ বলেনি বুদ্ধদেব বসু কখনো অপমানিত হয়েছেন জীবনানন্দের কাছে। বরং অন্যদের চেয়ে জীবনানন্দের সাথে তাঁর সম্পর্কটা ভালো ছিল একটা পর্যায় পর্যন্ত। একটা সময়ে দূরত্ব এসেছিল ঠিক, কিন্তু তাতে কোনো বিদ্বেষ বা বৈরিতা আছে বলে জানা যায় না। দুজনকে নিয়ে তুলনা করার মতো কোনো বিষয়ও ছিল না। সাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠক মাত্রেই জানে যে বুদ্ধদেব এক জাতের সাহিত্যিক, জীবনানন্দ আরেক ঘরানার সাহিত্যিক। একজন আম গাছ হলে আরেকজন হতে পারে কাঁঠাল গাছ। কেউ কারো প্রতিদ্বন্দ্বীও নয়। আপনি জোর করে টেনে দুজনকে মুখোমুখি দাঁড় করাবার কাজটি করলেন—যখন দুজনেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে বহুবছর আগে। আপনার এই কাজটা যেমন বুদ্ধদেব বসুকে উপকৃত করেনি, কিন্তু জীবনানন্দের সম্মানহানি করেছে। মাঝখানে আপনি তিসিডোর লিখে, অনাকাঙ্ক্ষিত একটা বিতর্ক উসকে দিয়ে নিজেকে আরেকটু খ্যাতিমান করার চেষ্টা করে গেছেন। আপনার তিসিডোর বাংলা সাহিত্যের কোনো উপকার করেছে বলে মনে হয় না। যা উপকার হয়েছে তার ভাগ আপনি আর আনন্দবাজার দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আপনাদের দু’পক্ষের আর্থিক লাভ হয়েছে বইপত্র বিক্রি এবং রয়্যালটি দিয়ে।
আমাদের মতো সাধারণ পাঠকের কাছে জীবনানন্দ দাশ এবং বুদ্ধদেব বসু দুজনেরই সৃষ্টিকর্ম নিজ নিজ মহিমা নিয়ে পাঠকের কাছে বেঁচে থাকবেন। জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব বসুকে নিয়ে আপনার এই অপ্রয়োজনীয় ব্যবচ্ছেদ শুধুমাত্র সাহিত্যিক কুৎসাসাহিত্যের উদাহরণ হয়ে বেঁচে থাকবে।
জীবনানন্দ দাশের ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’ পড়ে আপনি যেমন অনেক রাত ঘুমোতে পারেননি, আপনার ‘তিসিডোর’ পড়েও আমার কয়েক রাত নির্ঘুম কেটেছে। নিরীহ এক কবিকে নির্দয় আক্রমণের আঘাত আমার বুকেও গভীরভাবে আঘাত হেনেছিল। তারই সামান্য প্রতিক্রিয়া এই আলোচনা।
[২০ জুন ২০১৯]