আমি নন-ফিকশন লেখক। আমার মূল ফোকাস ইতিহাস। কিন্তু মাঝে মাঝে আমি কিছু গল্প লেখার চেষ্টা করেছি। সেগুলো নিছক অবসর কাটাবার উদ্দেশ্যে। তার মধ্যে কিছু গল্প লিখেছি গল্পের ছলে ইতিহাসকে পাঠকের কাছে তুলে ধরার জন্য। আরো বহুবছর আগে, আমি একটা উপন্যাস লিখতে বসেছিলাম। সেটা কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ ছিল না। আমি নিতান্তই অপরিচিত লেখক, আমার লেখা উপন্যাস পড়ার পাঠক পাওয়া যাবে না বলে আমি শতভাগ নিশ্চিত। তবু আমি সেই উপন্যাসটি লিখতে চেষ্টা করছিলাম বহুবছর ধরে। অর্ধেক লেখার পর থেমেও গিয়েছিলাম। প্রায় অর্ধযুগ ফেলে রাখার পর আবার যখন শুরু করলাম তখন আর আগের মতো এগোতে পারছিলাম না। না পারার কারণ ছিল আমি এখানেও গল্পের ছলে ইতিহাস গেলানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু যে সময়কাল নিয়ে আমি কাজটা করতে যাচ্ছিলাম সেই সময়কালের ঘটনাগুলোকে সমন্বয় করতে গিয়ে একটা ঝামেলার মধ্যে পড়ে গেলাম। আমার গল্পের চরিত্রগুলো কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে জড়িত ছিল। সেই ঘটনাগুলো সত্যি ঘটেছিল। আমার উপন্যাসের চরিত্রগুলো সেখানে উপস্থিত ছিল। সমস্যা হলো তাদের উপস্থিতিকে বাস্তবসম্মত করার জন্য সময়কালকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন তার ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে। সেখানে গিয়ে আমি মুশকিলে পড়ে গেলাম। উপন্যাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে আমি যে বয়সে উপস্থাপন করেছিলাম, সেই ঘটনার মধ্যে তাকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে হাজির করা যাচ্ছিল না। তাই গল্পটা বারবার হোঁচট খেতে খেতে থেমে গিয়েছিল। আমার দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও আটকে গেল সেখানে। আরো চার বছর পর আমি একদিন এক নির্ঘুম রাতে কীবোর্ড নাড়াতাড়া করতে করতে নতুন একটা গল্প লিখতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ লেখার পর অনুভব করলাম আমি আসলে নতুন গল্প লিখছি না। পুরোনো গল্পটাকে আমি নতুন একটা স্রোতের সাথে মিলিয়ে দিয়েছি। আমার উপন্যাসের নদী এবার এমন একটা গতি পেল এক যুগ আটকে থাকা গল্পটা কথা বলতে শুরু করলো। একটানা কয়েক মাস লেখার পর আমি আমার পছন্দের গন্তব্য খুঁজে পেলাম। উপন্যাসটির সমাপ্তিরেখায় পৌঁছে আমাকে চমকে দিল। কারণ আমি নিজেও এই সমাপ্তির কথা ভাবিনি। এটা উপন্যাসের নিজস্ব গতিতে, নতুন স্রোতের সাথে মিলেমিশে তৈরি হয়েছে। আমার করার কিছু ছিল না। শেষ করার পর ওটা একটা ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হলো। আমার আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত করে পাঠক সাদরে বরণ করলো গল্পটাকে। জীবনের প্রথম ফিকশন নিয়ে আমি আনন্দিত। সেটাই শেষ নয়। পত্রিকায় প্রকাশের পরপর কয়েকজন প্রকাশক যোগাযোগ করলেন গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার জন্য। আমি তখনো স্থির করিনি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা উচিত হবে কিনা। কাকে দেয়া উচিত। গ্রন্থাকারে প্রকাশের জন্য উপন্যাসের পরিধি আরেকটু বাড়ানো দরকার। হাতে যথেষ্ট সময় ছিল। প্রকাশক ঠিক হবার পর সময় নিয়ে উপন্যাসটাকে চূড়ান্ত করলাম। খুব বেশি কাজ করার ছিল না। মাঝখানে বাদ দেয়া কিছু পর্বকে যোগ করা ছাড়া মূল গল্প অক্ষুন্ন আছে। ২০২৬ সালের বইমেলায় প্রকাশ হতে পারে। এখনো ঘোষণা করা হয়নি। প্রকাশকের কাজ শেষ হলে ঘোষণা আসবে। কিন্তু জীবনের প্রথম উপন্যাস প্রকাশের প্রাক্কালে নিজেকে প্রশ্ন করছি, উপন্যাসের কাজটা পাঠক কিভাবে গ্রহন করবে? আমার ৮টা বই প্রকাশিত হয়েছে গত কয়েক বছরে। সবগুলোই নন-ফিকশন। আমাকে ফিকশন লেখক হিসেবে পাঠক মেনে নেবে? এই জায়গাটা সত্যি খুব অনিশ্চিত। ইতিহাস লিখে যেটুকু সুনাম অর্জিত হয়েছে সেটা হুমকির মধ্যে পড়বে কিনা তাও ভাবতে হচ্ছে। আমার লেখক জীবনে এখনো পাঠকের কাছ থেকে কঠিন কোনো সমালোচনার মুখোমুখি হইনি। কমবেশি ভালো ভালো কথাই শোনা গেছে। আমার যোগ্যতার তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু ফিকশন লিখে সমালোচনার ধাক্কা সামলাতে হলে আমার আসল কাজগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আমার হাতে আরো দু-তিনটি কাজ রয়ে গেছে, যেগুলো শেষ করার পর লেখক জীবনের ইতি টানার কথা। সেই কাজগুলো ঠিক সময়ে করা যাবে কিনা এখন বলা যাচ্ছে না। এই বছরটা আরো অনিশ্চিত। অনেক কিছুই ঘটতে পারে। পত্রিকায় প্রকাশের সময় পাঠক যেভাবে সাদরে গ্রহন করেছে, গ্রন্থাকারে প্রকাশের পর যদি সেই সমাদর না করে তাহলে হতাশ হওয়া উচিত হবে? অনেক বড় লেখকেরাও নিজের উপন্যাস নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেন না। পাঠকের কাছ থেকে সবসময় সমাদর পান না। তাই বলে তারা লেখা থামিয়ে দেন?
আমার আশঙ্কা অন্য কারণে। আমি প্রথম উপন্যাসটি প্রকাশের আগেই আরেকটি উপন্যাসের কাজে হাত দিয়ে ফেলেছি। সেটিও এবার একটা পত্রিকার ঈদসংখ্যায় প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। ওই উপন্যাসের কথা তেমন কেউ জানে না। প্রকাশের আগে কাউকে বলতে চাই না। প্রথম উপন্যাস প্রকাশের পর সাড়া পাওয়া না গেলে লেখক নিশ্চিতভাবে চুপসে যাবেন। ঈদসংখ্যার উপন্যাসটা নিয়ে আশাবাদী হবার কোনো সুযোগ থাকবে না। কারণ সেই উপন্যাসটি ভিন্ন চরিত্রের হলেও ইতিহাস জড়িয়ে আছে প্রথমটার মতো। আকারে বড় না হলেও ইতিহাসের পরিমাণ প্রথমটার চেয়েও বেশি। পাঠক পরপর দুবছরে দুটো উপন্যাস কিভাবে হজম করবে?
অসন্তুষ্ট পাঠক যদি জিজ্ঞেস করে, আপনাকে দ্বিতীয় উপন্যাস লেখার আশকারা কে দিয়েছে?
আমি বলবো, ইতিহাস। এই ইতিহাসটা আমি নীরস তাত্ত্বিক উপায়ে উপস্থাপন করার বদলে গল্পের আশ্রয় নিয়েছি। গল্পটা বেড়ে গেলে উপন্যাসে রূপান্তরিত হয়েছে। সেই রূপান্তর কতটা সার্থক হলো সেটা বোঝার জন্য আরো দু’মাস অপেক্ষা করতে হবে। তার আগে নিজের জন্য একটা সান্ত্বনাবাক্য রেখে যাই।
"Ever tried. Ever failed. No matter. Try again. Fail again. Fail better."
— Samuel Beckett, Worstward Ho (1983)