Tuesday, February 3, 2026

ইতিহাসের বর্জ্য

অনেকে ভুলে যায় ইতিহাস বদ্ধ ডোবা কিংবা পাঁকে আটকে থাকা জলাভূমি নয়। ইতিহাস হলো স্রোতস্বিনী নদীর মতো। সে তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে। নদীর অংশ না হয়েও স্রোতের সাথে অনেক খড়কুটো আগাছা কচুরিপানাও ভেসে চলে। সেইসব আগাছা শেষমেষ কোথায় হারিয়ে যায় কেউ জানে না। আগাছাদের কেউ মনে রাখে না। তবু একটা নদীতে নানা রকম আগাছা, কচুরিপানা কিংবা বর্জ্য পদার্থের উপস্থিতি কেউ অস্বীকার করতে পারে না। আবার সেটাকে কেউ নদীর অংশ বলে মনে করে না। আমরা আমাদের ভবিষ্যত বদলাতে পারি, নতুন করে নির্মান করতে পারি। কিন্তু অতীত একেবারেই অপরিবর্তনীয়। ফলে ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে আমার কখনো তেমন মাথাব্যথা হয় না। যেমন মাথাব্যথা হয় না কারো চিন্তার বিকৃতি কিংবা মস্তিষ্কের ভারসাম্যহীনতা নিয়েও।

Saturday, January 24, 2026

সমাপ্তির আগে

মাত্র একটা বই লিখে যার লেখক জীবনের সমাপ্তি টানার কথা ছিল তার যখন ৭টা বই প্রকাশিত হয়ে যায়, তখন একটা ছোট ভাবনা এসে উঁকি দেয়। এখনই থামার উপযুক্ত সময় কিনা। প্রত্যেক লেখকের একটা সোনালী অধ্যায় থাকে। সেই অধ্যায়টা শেষ হয়ে যাবার পর এমন কিছু পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে যেটা সুখকর হয় না। সময়মতো থামতে পারাও একটা কাজ। এখন আমার সেই যুগটা চলছে। এটার মেয়াদ বেশিদিন থাকবে না। সময় থাকতেই আমি থেমে যেতে চাই। প্রতিকূল সময় এসে থামিয়ে দেবার আগে। আমার লেখক সত্তা যেমন ছোট, যেমনি লেখালেখির বয়সও খুব সামান্য। মাত্র দুবছরে বাড়াবাড়ি কিছু বই প্রকাশ হয়ে গেছে। যদিও এই কাজগুলো গত এক দশক ধরে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। আরো কয়েকটা বাকী আছে। সেগুলো শেষ হবে কিনা এখনো বলা যাচ্ছে না। তার আগেই ভাবনাটা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। বয়সটা আরো দশ বছর কম হলে হয়তো এমন ভাবতাম না। পেশাদার লেখক হবার ইচ্ছে থাকলেও সেটা বর্তমান বাস্তবতায় সম্ভব না। অতএব মানসম্মান নিয়ে কেটে পড়াই মঙ্গল মনে হচ্ছে। তার আগে একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক।


লেখালেখির জীবনে ভাগ্য আমাকে কিছু আনুকূল্য দিয়েছিল শুরু থেকেই। ওটা না পেলে আমার লেখক হওয়া সম্ভব হতো না। এতগুলো বই(আমার জন্য ৭টা বই অনেক বেশি) প্রকাশ করা হতো না। বাজারে নতুন লেখক হলেও আমি কতগুলো ব্যাপারে পেশাদার লেখকের মতো আচরণ করেছি। তাতে আমার প্রকাশক পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারতো।


তখনো আমার জানা ছিল না বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখক, যাদের বিশ-ত্রিশটা বই প্রকাশিত হয়েছে তারা কেউ রয়েলটি পায় না। এমনও আছে সৌজন্য কপিও পায় না। টাকা দিয়ে অধিকাংশ লেখক বই প্রকাশ করে। এই বিষয়গুলো সম্পূর্ণ অজানা ছিল। ওই জগতটাই সম্পূর্ণ অন্ধকার ছিল আমার কাছে। সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো অন্ধকারই থাকে। আমি তাদেরই একজন। তবু প্রথম গ্রন্থ উপনিবেশ চট্টগ্রামের পাণ্ডুলিপি প্রকাশকের হাতে দেবার আগে যে কথাগুলো বলেছিলাম, তার সারমর্ম হলো- আমি যদিও অপরিচিত লেখক, তবু আমি বই প্রকাশের জন্য কোনো টাকাপয়সা খরচ করবো না। প্রকাশক যদি নিজ দায়িত্বে সব খরচ বহন করতে পারে তাহলে কাজটা দেবো। মনে রাখতে হবে এই প্রজেক্ট পুরোপুরি লস প্রজেক্ট হবে। কারণ আমি বইয়ের প্রচার-প্রচারণা তেমন করতে পারবো না। আমার চেনাজানা যারা আছে তাদের মধ্যে বড়জোর দশ বারোটা বই বিক্রি হতে পারে। ভালো করে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।


পূর্বস্বরের মইনুল ভাই অদ্ভুত দুঃসাহসী একজন মানুষ। তিনি হাসিমুখে আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন- এই বইটা বিক্রি হতে দশ বছর লাগলেও আমার আপত্তি নেই। আমি একটা ভালো কাজ করতে চাই।

তিনি ভালো কাজের আশ্বাস দিলেও আমি ধারণা করিনি কতটা ভালো করতে পারবেন। বিশেষ করে বইয়ের শেষে যোগ করা ১৮১৮ সালের রঙিন মানচিত্রটা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। ওটা ব্রিটিশ লাইব্রেরি থেকে কেনা হয়েছিল, বইয়ের সাথে ফ্রি দেবো এই শর্তে। ওটা যদি অরিজিনাল প্রিন্ট না হয় তাহলে বিপদ। ২০১৯ সালে পাণ্ডুলিপি নেবার পরবর্তী দেড় বছর কাজ করে ২০২১ সালে বইটা যখন প্রকাশিত হলো তখন আমি সত্যি খুব অবাক হয়েছিলাম প্রকাশনার মান দেখে। সম্পাদনা, ছাপা, বাঁধাই, ছবি ইত্যাদি মিলিয়ে বাংলাদেশে এই মানের প্রকাশনা খুব কমই আছে। কথা ছিল একটা প্রকাশনা উৎসব হবে, কিন্তু করোনার ধাক্কায় সেটা বাতিল করতে হলো। তার বদলে তিনি লেখক কপির সাথে কেক আর ফুল নিয়ে বাসায় চলে এলেন। আমরা পারিবারিকভাবেই উদযাপন করলাম প্রকাশনা উৎসব।


তখনো জানা ছিল না পাঠক বইটা কিভাবে নেবে? লেখকের খুশিতে কিছু এসে যায় না। করোনার কারণে সব দোকানপাট বুকস্টোর বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু ফেসবুক পোস্ট দিয়ে অনলাইনে ডেলিভারির ব্যবস্থা আছে। আমি বলেছিলাম, ক্রেতা পাওয়া যাবে না, ২০০ কপি ছাপালেই যথেষ্ট। কিন্তু প্রকাশক প্রথম দফাতেই ৪০০ কপি ছাপিয়ে ফেললেন। তাই একটু দুর্ভাবনা আমার। প্রচ্ছদ দেখে এক অচেনা লেখকের বই কে কিনবে? আশ্চর্য ব্যাপারটা তার পরেই ঘটলো। সেই রুদ্ধশ্বাস করোনার সময়েও বইটার প্রচুর অর্ডার আসতে লাগলো প্রকাশকের কাছে। চার মাস পর শুনলাম প্রথম সংস্করণ শেষ। বিস্ময়ে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সেই সাথে আরো একটা ঘটনা ঘটলো। বই প্রকাশের মাস তিনেক পর একদিন সাহিত্য পত্রিকা শব্দঘর থেকে টেলিফোন আসলো। ওই পত্রিকায় আমি কখনো লিখিনি, ওরা আমাকে চেনেও না। কিন্তু কারো কাছ থেকে খোঁজ পেয়ে ওরা আমার বইটা সংগ্রহ করে ফেলেছে। তারপর ২০২১ সালে সেরা বই(ইতিহাস) হিসেবে নির্বাচিত করেছে।


এইসব অবিশ্বাস্য কাণ্ডের মধ্যে আমি পরের কয়েকটা কাজ শুরু করেছিলাম। উপনিবেশ চট্টগ্রামের কাজ করতে করতে আমি আরো চারটা প্রকল্পের পরিকল্পনা করেছিলাম ভবিষ্যতের জন্য। সেগুলো আদৌ শেষ করতে পারবো কিনা নিশ্চিত ছিলাম না। কিন্তু লেখালেখি বা পড়াশোনার কাজের মধ্যে আমার সবসময় একটা আনন্দ কাজ করে। সেই আনন্দে পরের তিন বছরে সেই কাজগুলো শেষ করতে পেরেছিলাম। তারপর আরো নতুন প্রকল্পে হাত দিতে শুরু করি। 


পরবর্তী বিস্ময় ছিল থাংলিয়ানা। কথাপ্রকাশ থেকে। বইটা প্রকাশিত হলো ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারীর শেষ সপ্তাহে। বইমেলা শেষ হতে মাত্র ৭ দিন বাকী তখন। যেদিন প্রকাশ হলো সেদিন সন্ধ্যায় প্রকাশক সূত্র থেকে জানলাম ঢাকার বইমেলায় পাঠানো ২০ কপি দুঘন্টার মধ্যে শেষ। পরদিন আরো ৩০ কপি পাঠানো হবে। পরদিন শুনলাম ওটাও শেষ। চট্টগ্রামে পাঠানো হলো কিছু কপি। সেগুলোর অবস্থাও একই। চারদিন পর শুনলাম প্রথম মুদ্রণ শেষ হচ্ছে। আরেকটা মুদ্রণ আসছে। মেলার শেষদিন ২য় মুদ্রণ চলে এলো। আমার মত অখ্যাত একজনের নন-ফিকশন অনুবাদ বই পাঠক এত পছন্দ করবে কল্পনাও করিনি।  থাংলিয়ানা প্রথম প্রকাশের পর থেকে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ৭ মুদ্রণ হয়েছে। এটা খুব আনন্দদায়ক ব্যাপার ছিল লেখক প্রকাশক দুই পক্ষেই। 


প্রথম দুটো বইয়ের সফলতার গল্প পরের বইগুলোকেও স্পর্শ করেছে একে একে। প্রকাশিত ৭টি বইয়ের মধ্যে ৪টি বই এক বছরের অনধিক সময়ে ২ বা তিন মুদ্রণ হয়েছে। পাঠকের এই ভালোবাসা আমার জন্য অপরিশোধ্য ঋণ।


কিন্তু পাঠকের ভালোবাসায় আপ্লুত হবার পাশাপাশি এটাও ভাবতে হয় কেন পাঠক বইগুলো পছন্দ করেছে? শুধু বাংলাদেশ না। পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছ থেকেও অভাবিত সাড়া পাওয়া গেছে। আমার কাছে যে বিষয়টা সবচেয়ে বিস্ময়কর লেগেছে কিছু কিছু আজব পাঠকের আচরণ। আমাকে একাধিক পাঠক নানা মাধ্যমে জানিয়েছেন তারা আমার সবগুলো বই কিনে ফেলেছেন। তাদের মধ্যে সাধারন পড়ুয়া ছাত্র যেমন আছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীন অধ্যাপক শ্রেণীও আছেন। আমার মতো অখ্যাত লেখকের জীবনে এটার চেয়ে বড় পুরস্কার আর কিছু হতে পারে না। যে কোনো লেখকই এমন ঘটনায় আপ্লুত হবেন নিশ্চিত। কিন্তু কেন এমন ঘটেছে? আমি কি এমন কোনো নতুন বিষয় লিখতে পেরেছি? এরকম যে কোনো আত্মতুষ্টি বিব্রতকর। আমি পরিকল্পনা করে কিছুই লিখিনি। কী করেছি আসলে?


প্রথমত আমি চট্টগ্রামের ইতিহাস লিখতে চেয়েছি। একটা ধারাবাহিক ইতিহাস। সহজ ভাষায় লেখা হবে যেন পাঠক পড়তে গিয়ে হোঁচট না খায়। উপনিবেশ চট্টগ্রাম শেষ করতে গিয়ে অনেক হিমশিম খেয়েছি। মোটামুটি বড় বই। এক লাখ শব্দ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পরে কিছু কমিয়েছি। তারপর থাংলিয়ানা। পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিযান নিয়ে রোমাঞ্চকর একটা স্মৃতিকথা। অনুবাদ করে সম্পাদনা করে নিজের মতো যেভাবে সাজিয়েছি সেটাই পাঠক পছন্দ করে ফেলেছে। পরের বই বাতিঘর থেকে শরচ্চন্দ্র দাসকে নিয়ে। ইনি চট্টগ্রামের লোক হলেও তাঁর তিব্বত অভিযানটা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। ওটাও পাঠক গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। তারপর আবারো আরেকটা চট্টগ্রাম। চিৎ-তৌৎ-গং। আমার চট্টগ্রাম বিষয়ক কিছু লেখার সংকলন করেছে কথাপ্রকাশ। পাশাপাশি বাতিঘর থেকে প্রকাশ হয়েছে শেখ দীন মোহাম্মদ- বিলেতে প্রথম বাঙালি বণিক। ২০২৫ সালেই আরেকটি বই প্রকাশিত হয় মার্কেজের সাংবাদিক জীবন নিয়ে। স্ক্যান্ডাল অব সেঞ্চুরি। ২০২৪ এবং ২০২৫ এক বছরের মধ্যে এই ৫টা বই। তখন কাজ চলছিল ২০২৬ সালের জন্য প্রকাশিত্য রাজকীয় জলদস্যু বণিক সমিতি। বইমেলা নিয়ে সরকারের তাল-বেতাল দেখে প্রকাশক বইটা ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসেই প্রকাশ করে। আশাতীত জনপ্রিয় পেল এই বইটাও। এভাবে ৭টা বই হয়ে গেল। পাইপলাইনে আছে আরো দুটো বই। আমার হাতে লেখার বিষয়বস্তুও যথেষ্ট আছে। নতুন কিছু না লিখে পুরোনো লেখা দিয়ে প্রকাশ করা যাবে সেরকম তিনটি পাণ্ডুলিপি তৈরি আছে। তবু, তবু থেমে যাবার ভাবনাটা কেন আসছে?


কারণ মানুষ নিজের যোগ্যতার চেয়ে যখন বেশি কিছু পেয়ে যায়, তখন দিক হারায়, ভারসাম্য হারায়, নিজেকে নিজের ভেতর খুঁজে পায় না। আমি নিজের ভেতর অবশিষ্ট থাকতে থাকতেই সমাপ্তি টানতে চাই।


Thursday, January 15, 2026

আসন

ভদ্রলোককে দেখে আমি একটু চমকে উঠেছিলাম। আমাদের পরিচয় নেই। কিন্তু আমি তাঁকে চিনি। যে কারণে চিনি সেটা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল আমার। সুপারশপের কাউন্টারে তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি একা ছিলেন। বিল দিচ্ছিলেন একটা প্যাকেটের। আমার হাতে ছয়টা প্যাকেট ছিল। একই জিনিস। নিশ্চয়ই তিনি এখন নিঃসঙ্গ আছেন। নইলে হাতে চারটা প্যাকেট থাকতো। তাঁর পকেটে আমার চেয়ে বেশি টাকা। কিন্তু তাঁকে একটা প্যাকেট কিনেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। আমার পকেটে টাকার টানাটানি। তাই ছয়টা কিনতে অনেক হিসেব করতে হচ্ছিল। তিনি অনায়াসে চার-ছয়-দশটা কিনতে পারেন। কিন্তু তাঁকে একটাই কিনতে হলো। ওই একটা প্যাকেটের নিঃসঙ্গতা আমাকে খুব গভীরভাবে স্পর্শ করছিল। আমি শুনেছি তিনি ভালো লোক নন। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে শোনা। তাঁর বক্তব্য শোনা হয়নি কখনো। এটা খুব অদ্ভুত ব্যাপার যে আজ এই কাউন্টারে তাঁর সাথে আমার দেখা হয়ে গেল। এবং তিনি জানেন না তাঁর পেছনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে তার জীবনের কিছু গল্প জানে। তিনি আমাকে চেনেন না। চিনলে বিব্রত হতেন। আমি তাঁর সাথে পরিচিত হতে চাইনি। তাহলে তিনি লজ্জায় পড়ে যেতেন। আমি ওরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইনি। আমি যে সূত্রে তাঁর সম্পর্কে আবছা জানি, সেই সূত্র তাঁর জন্য খুব সংবেদনশীল। আমি পুরোটা জানি না। আংশিক জানি তিনি কেন একা। পুরোটা জানলে হয়তো তাঁকে আমার ভালো লাগতো না। অথবা উল্টোটাও ঘটতে পারতো। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে আমাকে কেউ বলেনি। আমি কিভাবে জেনেছি সেটা একটু বিচিত্র ব্যাপার। অনুমানের সাথে প্রমাণ যুক্ত হবার পর আমি তাঁর পরিচয় উদঘাটন করেছি। বাইরে দেখে সব মানুষকে চেনা যায় না। যে আলো আমরা দেখি, তার পেছনে গভীর অন্ধকারও লুকোনো থাকে। আমার সাথে তাঁর কিছু সংখ্যাগত মিল আছে। যে কারণে একদিন আমি তাঁর জায়গায় গিয়ে বসে পড়েছিলাম। অনিচ্ছায় নয়, স্বেচ্ছায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে। ওই চেয়ারে তাঁরই বসার কথা ছিল। কিন্তু বসতে হলো আমাকে। তিনি সেটা জানেন না। যারা আমাকে বসিয়েছিল তারা নিশ্চিতভাবে ওটা বলবে না। আমি ওই আসনে দুই ঘন্টা সময় উপভোগ করেছি। গল্প করেছি। যাদের সাথে গল্প করেছি, আহার করেছি, তাদের সাথে তাঁরই বসার কথা। কিন্তু তিনি ওখানে ছিলেন না। তাঁকে ডাকা হয়নি। হয়তো তিনি তখন অবাঞ্ছিত ছিলেন। মানুষের জীবনে এমন অদ্ভুত কিছু মুহূর্ত আসে যখন সে অন্যের চেয়ারে বসে যায় অনায়াসে। অথচ যার বসার কথা সে জানতেও পারে না।

[অনুগল্প]

বাণী

১. একটা সময় তেলের সাথে ঘিয়ের তুলনা হতো, তারপর সরিষার তেল আর সোয়াবিন তেলের তুলনা, তারও পরে সোয়াবিন আর পাম অয়েলের তুলনা। আর আজকাল তুলনা নামতে নামতে দেশের এত উন্নতি হইছে ঘিয়ের সাথে গুয়ের তুলনাও করা হয়।

Tuesday, January 13, 2026

নির্বোধ ক্ষমতায় অন্ধ

ক্ষমতার সাথে নির্বুদ্ধিতার যোগফল মানবজাতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে এনেছে যুগ যুগ ধরে। এমনকি বিশ্বযুদ্ধও। গত এক শতকে আমরা বহুবার তার নজির দেখেছি। আবারো দেখার জন্য প্রস্তুত হয়েছি। বর্তমান পৃথিবীর শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে যুদ্ধবাজ কিছু নির্বোধ দানব। আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে অনিশ্চিত অন্ধকার। বর্তমান পৃথিবীর প্রধান নির্বোধটির নাম ডোনাল ড্রাম্প। এই লোকটা একুশ শতকের হিটলার হিসেবে জন্ম নিয়েছে। পৃথিবীর সকল অশুভ শক্তির সাথে তার সম্পর্ক। বর্তমান সভ্যতার ধ্বংসের সূচনা তার হাত ধরেই ঘটতে পারে।

Thursday, January 8, 2026

হলো না, দেখা

চল্লিশ বছর আগে আমরা দুজন এত ঘনিষ্ঠ ছিলাম যে দিনে দুই বেলা আড্ডা না দিলে আমাদের ভাত হজম হতো না। আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনীর নয় নম্বর মাঠে প্রতিদিনের সান্ধ্য আড্ডা ছিল আমাদের প্রিয় স্মৃতিময় সময়। আশির দশক পেরিয়ে নব্বই দশকে সে ঢাকা চলে গেল পরিবারের সাথে। ঢাকা যাওয়ার পরও আমাদের আড্ডা পুরোপুরি কমেনি। সুযোগ পেলেই আমি ঢাকায় চলে যেতাম। ঢাকায় যাবার পর সে চাকরিতে ঢুকে পড়ে, আমি তখনো ভার্সিটি শেষ করিনি। নব্বই দশকের শুরুতে সে ফকিরাপুলে আলাদা বাসায় নেয় কয়েক বন্ধুর সাথে। সেই বাসাটা আমাদের ঢাকার ঠিকানা হয়ে ওঠে। বছরে কয়েকবার ঘুরে আসতাম গিয়ে। দু চারদিন আড্ডা দিয়ে স্বাদ মিটিয়ে আসতাম। আমি আরো কয়েকজন নিয়মিত। অনেক সময় ঢাকা যাওয়ার বাসভাড়া থাকতো না। কিন্তু ঢাকা পৌঁছাতে পারলেই হতো। সে আমার সব খরচ মিটিয়ে দিতো। আসার সময় ফিরতি ভাড়াও পকেটে ভরে দিতো। ভালো চাকরি করতো। দেদারসে খরচ করতো। ফকিরাপুলের বাসায় ওঠার আগে ঢাকা মেডিক্যাল হোস্টেলে রুম শেয়ার করতো। ফজলে রাব্বী হলের জেড-সিক্স নামের বিখ্যাত একটা কক্ষ ছিল। সেখানেই ওর ঠাঁই। আমাদের কয়েক ডাক্তার বন্ধুর তখন  ছাত্রজীবন। সেখানেই কেটেছে আমাদের কিছু দিনরাত। বইমেলা শুরু হলে আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যেতো। স্টলে বসে আড্ডা দেয়া, মাঝরাতে বাসায় ফেরা। আমার তীব্র অভাবের সময় তখন। সে আমাকে ভরসা দিতো। একবার উত্তরবঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমার পকেটে পঞ্চাশ টাকাও ছিল না। ওর খরচেই গিয়েছিলাম। সেই যাত্রায় আমার পকেটে একটা পাঁচশো টাকার নোট দিয়ে বলেছিল, এটা রাখ, যদি লাগে। আমার চোখ ভিজে গিয়েছিল। সে কিভাবে বুঝলো আমার কাছে টাকা নেই। ফেরিতে মাঝরাতে যমুনা নদী পার হচ্ছিলাম। কানে হেডফোনে সুমনের গান বাজছিল। হেডফোনটা রুপুর। সে আমাদের আরেক প্রিয় বন্ধু। দারুণ ছবি আঁকতো। ফকিরাপুলের সেই বাসাতেই থাকতো। নদীর জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর মাথার ওপরে একটা গোল চাঁদ এখনো চোখে ভাসছে। তিনবিঘা করিডোর ঘুরে চেঙ্গড়াবান্দা সীমান্তে রঙিন পানি খেয়ে ঢাকা ফিরেছিলাম দুদিন পর। কী অসাধারণ সময় ছিল সব। তারপর আমিও পাশ করলাম। চাকরিতে ঢুকলাম। এত ব্যস্ত চাকরি। তবু ঢাকা যাবার সুযোগ পেলেই দুজনে দেখা করতাম। আড্ডা দিতাম একটা বেলা। সে একটা বিদেশী কোম্পানির ঢাকার বড় কর্তা। সোনারগাঁও হোটেলের উল্টো দিকে একুশে টাওয়ারে অফিস। চট্টগ্রামে আসতো অফিসের কাজে। আসলে স্টেশন রোডের হোটেল মিসকার বিশাল কক্ষ নিতো আমাদের আড্ডার জন্য। সব বন্ধু গিয়ে জুটতাম। দেদারসে উপহার বিলাতো সব বন্ধুদের। কার্টুন ভর্তি শার্ট, টিশার্ট আরো কত কিছু। মৌমাছির মতো ভিড় করতো বন্ধুরা। বছরের পর বছর সেই আনন্দময় সময় কেটেছে। বিয়ে করলো, সংসার হলো। সেখানেও মিসকার আড্ডা জড়িত। আরো অনেক বছর পার হবে। তারপর একদিন কঠিন একটা রোগ ধরা পড়বে। আমরা দুজনই দীর্ঘ সময় পর জীবিকাচ্যুত হয়ে পড়েছি। বয়স বেড়েছে, শরীরে ক্ষয় ধরেছে। পকেটে টান পড়েছে। সংসারে চাপ বেড়েছে। জীবনের সম্পন্ন অধ্যায় পার হবার পর ‘নাই নাই’ হাহাকার অধ্যায় শুরু হয়েছে। তখনই সেই দুঃসংবাদ। তিন বছর কোনোমতে ধুঁকতে ধুঁকতে কেটে যাবার পর এসে গেল মাহেন্দ্রক্ষণ। গত দুমাস হাসপাতালের বিছানা আঁকড়ে আছে সেই সজীব প্রাণবন্ত হাসিখুশি বন্ধু। ওই হাসি আর কখনো দেখা হবে না আমাদের। 


তোর অসুস্থতা আমাকে অপরাধী করে দেয় বারবার। কথা ছিল আমরা দুজন পরস্পরের বিপদে কাছে থাকবো। কিন্তু হলো না। আমি এক বিপদে চাটগাঁ আটকে আছি। তুই ঢাকার হাসপাতালে। আমাদের শেষ দেখা হবে না। ২০২০ সালের পর আমরা আর কখনো একসাথে বসার সুযোগ পাইনি। জীবন এমন। জীবন তেমন। দুমাস আগে তোর কথা বন্ধ হয়ে গেছে। শেষবার ফোনে কথা বলেছিলাম দুমাস আগে। সর্বশেষ পতনের আগে। বলেছিলি, আমরা বিশ-বাইশ বছরে জীবনকে কতভাবে উপভোগ করেছি। আর আমার ছেলেমেয়ে দুটো বাবার চিকিৎসার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে হচ্ছে। ওদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। জীবন এমন কেন? 

আমাকে ক্ষমা করিস। আমি পারলাম না। আমি নিজেও একটা অক্ষমতার জালে আটকে আছি। যতটা দরকার ছিল ততটা পারিনি। তোর সাথে শেষ দেখাটাও বোধহয় হবে না। তোর ছেলে-মেয়ে আমাকে বলেছে আমার নাম শুনলে তুই এখনো চিনতে পারিস। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারিস না। শুধু নীরব অশ্রু ঝরে চোখ থেকে। ওখানে কী ভাষা থাকে আমি কখনো জানতে পারবো না। মিসকার দিনগুলো মনে আছে? ফকিরাপুলের রাত জাগা কিংবা শহীদ মিনারের উল্টো দিকে পামগাছ দুটোর নীচে চায়ের স্টলের আড্ডা? বইমেলা? জেড-সিক্স? সিটি কলেজ? মসজিদ মার্কেট, নয় নম্বর মাঠ, হাসপাতালের সিঁড়ি, পাওয়ার হাউসের আড্ডা। সব তো নেই হয়ে গেছে। আমাদের মধ্যে কে আগে যাবে জানার উপায় নেই। আরো কয়েকজন চলে গেছে করোনার সময়। যারা টিকে গেছে তারা এখন যাবে, একের পর এক পালা আসবে। 


আমি অনেক দিন ঢাকা যাই না। ২০২০ সালের পর একবারও যাইনি। তুই অচল হয়ে পড়ার পর আমার ঢাকা যাওয়ার ইচ্ছে উবে গেছে। ঢাকায় আমি একা চলতে পারি না। পথ হারিয়ে ফেলি। তুই আমার একমাত্র পথপ্রদর্শক ছিলি। তুই না থাকলে আমি কোথায় হারিয়ে যাবো, সেই ভয়ে আমি ঢাকা যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। আমি জানি তুই শুনলে হাসবি। কিন্তু তুই ছাড়া ঢাকা আমার কাছে অর্থহীন। আমি একটা অর্থহীন শহরে কেন যাবো? আমাকে প্রকাশক সম্পদক লেখক সবাই অনুরোধ করে। একবার গিয়ে যেন তাদের সাথে বসি। কিন্তু আমার এক ফোঁটা ইচ্ছা করে না। আমি এখানে বসেই সব কাজ করি। এখান থেকেই যতটুকু পারা যায়। ঢাকা না গেলে নাকি বড় লেখক হওয়া যায় না। আমার হবার দরকার নেই। তুই ভালো থাকলে আমার বড় লেখক হবার সুযোগ ছিল। তুই এখন এইসবের উর্ধ্বে উঠে গিয়েছিস। আমি একটা দুঃসংবাদের আশঙ্কায় বসে আছি। কিন্তু তোর নাম্বারে আর কখনো ফোন করবো না এটা জেনে গেছি। আমরা বিদায় বলবো না। পরের ট্রেনেই হয়তো উঠে পড়বো। কে জানে?


Sunday, December 28, 2025

৫০ বছর পর

আজ থেকে ৫০ বছর পর যারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করবেন তাদের জন্য আমার আগাম সমবেদনা থাকলো। কারণ ২০২৪-২৫ সময়কালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে যে চরিত্রগুলোর উদয় ঘটেছে, তাদের অনেকে তখন প্রয়াত হবেন, কেউ প্রবীন রাজনৈতিক গুরু হিসেবে টিকে থাকবেন। সমাজকে সদুপদেশের মাধ্যমে সমৃদ্ধ পরিশুদ্ধ করার ভাণ করবেন। তখনকার তরুণ যুবারা এদেরকে ফেরেশতার মতো ভক্তিশ্রদ্ধা করে আকাশে তুলে ফেলবেন। তাদের অনেকেই জানবে না এরা এই সময়ে একেকজন কত বড় বড় বাটপার ছিল।