আমার মতো একজন অপরিচিত মানুষকে কিভাবে পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করা হলো সেটা আগে জানা ছিল না। নির্বাচক কমিটির একজন আমার বইপত্র পড়ে মুগ্ধ হয়েছেন। তিনি সিটি কর্পোরেশনের এডিসি, ম্যাজিস্ট্রেট রক্তিম চৌধুরী। আমার সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে। তিনি তাঁর ফেসবুক পোস্টে পরদিন বিষয়টা খোলাসা করেছেন। আমাকে এবং আরো তিনজনকে কিভাবে তিনি সুপারিশ করেছেন। লেখাটা তুলে রাখলাম এখানে।
****************************
আজকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন স্বাধীনতা পদক ও সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। এই কাজে নির্বাচক কমিটির মেম্বার হিসেবে দারুণ অভিজ্ঞতা হলো!
স্বাধীনতা সম্মাননায় ১১ জন/প্রতিষ্ঠানকে এবং সাহিত্য পুরস্কারে ৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়। এবার দারুণ সব মানুষ পুরস্কার পেয়েছেন। অনেক ক্যাটাগরি নির্বাচনে আমি দর্শকের ভূমিকায় থাকলেও আমার পরিচিত এবং ইন্টেরেস্টের ক্যাটাগরিতে আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, যাতে যোগ্য লোক সম্মাননা পান। ভাল লাগার বিষয়, বেশ কয়েকটা ক্যাটাগরিতে আমার পছন্দের মানুষই নির্বাচিত হন!

আমার ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির জায়গা থেকে ৪ জনকে নিয়ে আলাদা করে বলতে চাই..
প্রথমত, চিকিৎসাক্ষেত্রে: ডা. এম এ ফয়েজ স্যার। বাংলাদেশে শুধু না, এই দক্ষিণ এশিয়াতেই এক কিংবদন্তী ডা. এম এ ফয়েজ স্যার। অত্র অঞ্চলের সাপ ও এন্টিভেনম নিয়ে গবেষণার পাইওনিয়ার ফয়েজ স্যার! সম্ভাব্য অনেক নামের মধ্যে আমি স্যারকে নিয়ে বেশি মাতামাতি করায় আজকের অনুষ্ঠানে স্যারের সাথে যোগাযোগ, রিসিভ-সবকিছুর দায়িত্ব আমার ঘাড়েই এসে পড়ে! গ্রীষ্মের নিদারুণ দাবদাহের মধ্যেও এই দায়িত্ব আমার কাছে ছিল সুশীতল বাতাসের মত! দারুণ ছিল সেই অভিজ্ঞতা!!

দ্বিতীয়ত, প্রবন্ধ ও গবেষণায়- হারুন রশীদ ভাই। ইদানীং আমরা বুঁদ হয়ে আছি উনার লেখনীতে। এবং চট্টগ্রামকে নিয়ে একটা ফাটাফাটি লাগিয়ে দিবো এই স্বপ্নে বিভোর, যার মূলেই আছে 'চিত-তৌত-গং', 'উপনিবেশ চট্টগ্রাম' এইসব অসাধারণ সৃষ্টি। এই ক্যাটাগরির আলোচনায় উনার নাম সাজেস্ট করার পরে যখন দেখি ভাগ্য কিছুটা সুপ্রসন্ন, তখন আমি তুরন্ত মনিরুল মনির ভাইয়ের মাধ্যমে হারুন ভাইয়ের বায়োডাটা এনে পেশ করি। এরপর যখন ফাইন্যালি উনি সিলেক্টেড হলেন, এতো ভাল লেগেছে কি বলবো! উনার সাথে আলাপের ছুতো খুঁজছিলাম, আজ অনুষ্ঠানের ফাঁকে সেই কাজটি মন ভরে করে নিয়েছি! তবে অনেক কাজ করা বাকি হারুন ভাই!!


তৃতীয়ত, কথাসাহিত্যে- জাহেদ মোতালেব ভাই। যখন এই ক্যাটাগরি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, তখন চোখ বন্ধ করে ভাবছিলাম, চট্টগ্রামের কার কার লেখা আসলে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নামের মধ্যে এই নামটিই কেন জানি মনে ধরে! বায়োপিক-টিক জোগাড়ের পর উনি সিলেক্টেড হলেন; কিন্তু খেল শুরু এরপর। গত দুইদিন কি যে প্যারার ভেতর দিয়ে যে গেছে! এ ফোন করে তো, ও রাগারাগি করে! কি বিষয়? উনি কোন সময় বঙ্গবন্ধু-কে নিয়ে একটা বই লিখেছিলেন! উনি কিভাবে এই পুরস্কার পান? এ নিয়ে ফেসবুক, মেয়র মহোদয়ের নাম্বারে প্রচুর আপত্তি-বিবাদ-সমালোচনা! আমি বার বার বলতে চেষ্টা করেছি, এবং চট্টগ্রামের প্রথিতযশা বেশ কয়েকজন লেখক-প্রকাশকের সুপারিশেই যে, উনার যোগ্যতার বিচারেই এই নির্বাচন! শেষ পর্যন্ত মেয়র মহোদয় নিরপেক্ষ অবস্থান বজায়ে দৃঢ়চিত্ত থাকেন। এবং আজকের অনুষ্ঠানে মেয়র মহোদয় নিজেই সেই ঘটনা সবার সামনে তুলে ধরে বলেন, সত্য-নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে আমাদের এই পুরস্কার নির্বাচনের চেষ্টা! এই অভিজ্ঞতা অনেকদিন মনে থাকবে!
পরিশেষে, এবারের সম্মাননায় যে নির্বাচনটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিয়েছে, সেই নামটি বলি! বুলবুল আকতার (চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অবদান)।
কী? চিনতে পারছেন না তো! বুলবুল আকতার চট্টগ্রামের এক বিশেষ ধারার গান 'অঁলা' গানের কিংবদন্তী বিস্মৃতপ্রায় শিল্পী। উনার স্বামী বিখ্যাত রশিদ কাওয়ালের লেখনীতে উনারই গাওয়া বিখ্যাত গান,
অ কালাচান গলার মালা..
পেট ফুরেদ্দে তুয়ার লাই!!
ইদানীং অঁলা গান নিয়ে খুব মেতেছিলাম। ফলে আমি বুলবুল আকতারকে চিনি, কিন্তু উনার খোঁজ কিভাবে পাই? তানিম বদ্দা>আরকান>রাফসান গালিব>জিহান>রাফসান গালিব এই ক্রমে উনাকে খুঁজে বের করে আমরা শেষ পর্যন্ত উনাকে নিয়ে আসতে সক্ষম হই আজকের অনুষ্ঠানে। দারুণ মজার মানুষ ইনি!
জিহান তো উনাকে এক সেকেন্ডও চোখের আড়াল করে নাই! কাজীর দেউড়ি মোড় থেকে স্টেজে এনে, অনুষ্ঠান শেষে নিজের হাতে চা খাইয়ে (উনি বাচ্চার মত খুশি হয়ে উঠেন চা পেয়ে), আবার ফেরার গাড়ির জন্যে কোতোয়ালি-তে পৌঁছে দিয়ে আসে!
উনাকে কেউ চিনতেন না, কিন্তু অনুষ্ঠানে আসার পরে কিছু নিভৃতচারী মানুষ, যাদের আমি চিনি-ই না, আমাকে মন থেকে ধন্যবাদ জানিয়ে যান, উনাকে নিয়ে আসায়!
তখনি বুঝি, মানুষকে যিনি আনন্দ দিতে পারেন, তার একটা চেনাপরিচয়ের চোরা স্রোত সবসময়-ই চলতে থাকে! বুলবুল আকতারও তেমন একজন মানুষ!
খুব শীঘ্রি উনার গান সামনাসামনি শুনবো, এই প্রত্যাশায় আজ শেষ করি!
বি.দ্র. লম্বা লেখা ধৈর্য ধরে পড়ায় অসংখ্য ধন্যবাদ!
আর এই মানুষগুলো নিজের গুণেই গুণান্বিত! আমাদের নির্বাচন-অনির্বাচনে উনাদের মত মানুষের কিছুই যায় আসে না! উনাদের সম্মাননা প্রদানের সুযোগে আমরা নিজেরাই আসলে সম্মানিত ফিল করছি! আর এই লেখা সম্পূর্ণরূপে আমার ব্যক্তিগত তৃপ্তির জায়গা থেকে লেখা! দোষত্রুটি মার্জনীয়!

[১৯ এপ্রিল ২০২৬]
***
গত দুই বছরের সাহিত্যের পদক তালিকা:
কথাসাহিত্যে
২০২৫: প্রফেসর আসহাব উদ্দীন (মরণোত্তর),
২০২৬: জাহেদ মোতালেব
প্রবন্ধ ও গবেষণায়
২০২৫: প্রফেসর ড. সলিমুল্লাহ খান,
২০২৬: হারুন রশীদ
শিশুসাহিত্যে:
২০২৫: মিজানুর রহমান শামীম,
২০২৬: সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার
কবিতায়:
২০২৫: জিললুর রহমান
২০২৬: শাহিদ হাসান
অনুবাদে
২০২৫: ফারজানা রহমান শিমু।
২০২৬: নাই
গীতিকবিতায়:
২০২৫: নাই
২০২৬: ড. আবদুল্লাহ আল মামুন