Sunday, September 20, 2026

এলিনোর র‍্যাথবোনের প্রতি রবীন্দ্রনাথ

রাজনীতি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের তেমন বেশি লেখালেখি নেই। তিনি সযত্নে এড়িয়ে চলতেন বলা চলে। কিন্তু জীবনের কিছু কিছু অধ্যায়ে তিনি গর্জে উঠেছিলেন। তাঁর শেষ গর্জন ছিল ১৯৪১ সালের মে মাসে। অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তখনও তিনি তাঁর বক্তব্য প্রকাশে দ্বিধা করেননি।

১৯৪১ সালের মে মাসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য এবং পরিচিত সমাজসংস্কারক মিস এলিনোর র‍্যাথবোন ভারতীয় নেতৃবৃন্দ ও জনগণের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতীয়রা কেন ব্রিটিশ সরকারকে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা দিচ্ছে না—এই নিয়ে তিনি ভারতীয়দের কঠোর সমালোচনা করেন।

র‍্যাথবোন তাঁর চিঠিতে সাম্রাজ্যবাদী সুলভ মানসিকতা থেকে দাবি করেন যে, ব্রিটিশ শাসন ভারতকে শান্তি, নিরাপত্তা, আধুনিক শিক্ষা ও আইনসম্মত সমাজ উপহার দিয়েছে। সুতরাং, এই সংকটকালে ব্রিটিশদের সহায়তা না করা ভারতীয়দের 'অকৃতজ্ঞতা' এবং অদূরদর্শিতার নামান্তর। একজন তথাকথিত প্রগতিশীল ব্রিটিশ নারীর মুখে ব্রিটিশদের এই 'পাদপ্রদীপপ্রদানকারী প্রভূ' ভাবমূর্তি এবং ভারতীয়দের করুণার পাত্র মনে করার ঔদ্ধত্য রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে মর্মাহত ও ক্রুদ্ধ করে। চিকিৎসকদের কঠোর বারণ এবং শারীরিক প্রচণ্ড যন্ত্রণা সত্ত্বেও শয্যাশায়ী রবীন্দ্রনাথ এই অপপ্রচারের জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মুখে বলে প্রতিবাদলিপিটি লিখেছিলেন। সেটা প্রকাশিত হয়েছিল পত্রপত্রিকায়:

"I have read with surprise and pain the open letter which Miss Eleanor Rathbone has addressed to Indians. She is shocked at our 'ingratitude' and has listed the achievements of British rule in India...

What have the British done for India? They have maintained law and order, but at what cost? Look at the condition of our people—steeped in ignorance, poverty and disease, completely defenseless... In Soviet Russia, I saw what a government could do in twenty years to educate and uplift its people. But in India, after two centuries of British rule, elementary education is still denied to the masses.

To demand gratitude from a people who have been kept in subjection and exploited for generations is a cruel mockery. The communal division that plagues our country today is itself the direct outcome of the policy of 'divide and rule'.

It is not possible for any self-respecting Indian to accept this attitude of patronising superiority. The British imperialism has left us a heritage of poverty, illiteracy, and helplessness..."

["মিস র‍্যাথবোন ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে যে খোলা চিঠি লিখেছেন, তা পড়ে আমি গভীরভাবে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছি। তিনি ভারতীয়দের তথাকথিত 'অকৃতজ্ঞতা' নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং আমাদের মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে ব্রিটিশ শাসন ভারতবর্ষকে কতটা রক্ষা করেছে, কীভাবে এখানে শান্তি ও সভ্যতা বজায় রেখেছে। কিন্তু তিনি অত্যন্ত সুচতুরভাবে এড়িয়ে গেছেন যে, এই দুই শতকের ব্রিটিশ শাসন ভারতবর্ষকে আজ কোন চরম সর্বনাশের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

যিনি ব্রিটিশ শাসনের এই 'দান'-এর কথা বড় গলায় প্রচার করছেন, তিনি কি একবারও ভেবে দেখেছেন যে, আজ ভারত অশিক্ষা, চরম দারিদ্র্য, অনাহার এবং একের পর এক মহামারীর এক প্রকাণ্ড আঁধার হয়ে দাঁড়িয়েছে? এই করুণ পরিস্থিতির দায় কার? আমি নিজে রাশিয়া গিয়ে দেখেছি, মাত্র ২০ বছরের মধ্যে তারা কীভাবে কোটি কোটি নিরক্ষর মানুষকে শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করে তুলেছে। অথচ প্রায় দুই শতকের ব্রিটিশ রাজত্বে আমাদের দেশের জনগণের সামান্যতম প্রাথমিক শিক্ষার সুবিধাও দেওয়া হয়নি।

আজ যুদ্ধের দোহাই দিয়ে আমাদের কাছ থেকে আনুগত্য এবং সহায়তার যে দাবি তোলা হচ্ছে, তার নৈতিক ভিত্তি কোথায়? যে জাতিকে নিজের দেশেই পরাধীন ও অধিকারবঞ্চিত করে রাখা হয়েছে, যাদের জাতীয় সম্পদ অন্য একটি দেশকে পুষ্ট করতে শোষিত হচ্ছে—তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা দাবি করা এক পরম নির্মম কৌতুক বৈ আর কিছু নয়। ভারতে আজ যে সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে, তা-ও ব্রিটিশদের সুদীর্ঘ 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতিরই প্রত্যক্ষ ফল।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের এই অহংকার ও অনুগ্রহ প্রদর্শনের ভঙ্গি কোনো স্বাভিমানী মানুষ মেনে নিতে পারে না। তাঁরা আমাদের 'সভ্য' করার দাবি করেন, কিন্তু আমাদের জন্য রেখে যাচ্ছেন কেবল এক নিঃস্ব, সহায়সম্বলহীন ও ক্ষয়িষ্ণু ভারতবর্ষ। সাম্রাজ্যবাদী ঔদ্ধত্য দিয়ে সভ্যতার এই ব্যর্থতা ও সত্যকে ঢাকা দেওয়া যাবে না।"]

তাঁর সেই প্রতিবাদের কথা স্মরণ করেছিল দৈনিক যুগান্তর ৮ আগষ্ট ১৯৪১ তারিখে। তাঁর প্রয়ানের সংবাদের সাথে প্রকাশিত হয়েছিল প্রতিবাদের ভাষাও।



পুরো বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল লন্ডনের পত্রিকায়  The Tribune, August 15, 1941 সংখ্যায়:

I have been deeply pained at Miss Rathbone’s Open Letter to Indians. I do not know who Miss Rathbone is, but I take it that she represents the mentality of the average “well-intentioned” Britisher. Her letter is mainly addressed to Jawaharlal Nehru and I have no doubt that if that noble fighter of freedom’s battle had not been gagged behind prison-bars by Miss Rathbone’s countrymen, he would have made a fitting and spirited reply to her gratuitous sermon. His enforced silence makes it necessary for me to voice a protest even from my sick-bed.

* * *

The lady has ill-served the cause of her people by addressing so indiscreet, indeed impertinent, a challenge to our conscience. She is scandalised at our ingratitude – that having “drunk deeply at the wells of English thought,” we should still have some thought left for our poor country’s interests. English thought, insofar as it is representative of the best traditions of Western enlightenment, has indeed taught us much, but let me add that those of our countrymen who have profited by it have done so despite the official British attempts to ill-educate us.

We might have achieved introduction to Western learning through any other European language. Have all the other peoples in the world waited for the British to bring them enlightenment? It is sheer insolent self-complacence on the part of our so-called English friends to assume that had they not “taught” us, we would still have remained in the Dark Ages. Through the official British channels of education in India have flowed to our children in schools not the best of English thought but its refuse, which has only deprived them of a wholesome repast at the table of their own culture.

* * *

Assuming, however, that the English language is the only channel left to us for “enlightenment,” all that “drinking deeply at its wells” has come to is that in 1931, even after a couple of centuries of British administration, only about one per cent of the population was found to be literate in English – while in the USSR in 1932, after only fifteen years of Soviet administration, 98 per cent of the children were educated. (These figures are taken from The Statesman’s Year-Book, an English publication, not likely to err on the Russian side).

But even more necessary than the so-called culture are the bare elementary needs of existence, on which alone can any superstructure of enlightenment rest. And what have the British, who have held tight the purse-strings of our nation for more than two centuries and exploited its resources, done for our poor people ?

I look round and see famished bodies crying for bread. I have seen women in villages dig up mud for a few drops of drinking water, for wells are even more scarce in Indian villages than schools. I know that the population of England itself is today in danger of starvation and I sympathize with them, but when I see how the whole might of the British Navy is engaged in convoying food vessels to the English shores and when I recollect that I have seen our people perish of hunger and not even a cart-load of rice brought to their door from the neighboring district, I cannot help contrasting the British at home with the British in India.

* * *

Shall we then be grateful to the British, if not for keeping us fed, at least for preserving law and order? I look around and see riots raging all over the country. When scores of Indian lives are lost, our property looted, our women dishonoured, the mighty British arms stir in no action, only the British voice is raised from overseas to chide us for our unfitness to put our house in order.

Examples are not wanting in history when even fully armed warriors have shrunk before superior might and contingencies have arisen in the present war when even the bravest among the British, French and Greek soldiers have had to evacuate the battlefield in Europe because they were overwhelmed by superior armaments – but when our poor, unarmed and helpless peasants, encumbered with crying babes, flee from homes, unable to protect them from armed goondas, the British officials perhaps smile in contempt at our cowardice. Every British civilian in England is armed today for protecting his hearth and home against the enemy, but in India even lathi- training is forbidden by decree.

Our people have been deliberately disarmed and emasculated in order to keep them perpetually cowed and at the mercy of their armed masters. The British hate the Nazis for merely challenging their world-mastery and Miss Rathbone expects us to kiss the hand of her people in servility for having riveted chains on ours. A government must be judged not by the pretensions of its spokesmen but by its actual and effective contribution to the well being of the people.

* * *

It is not so much because the British are foreigners that they are unwelcome to us and have found no place in our hearts as because, while pretending to be trustees for our welfare, they have betrayed the great trust and have sacrificed the happiness of millions in India to bloat the pockets of a few capitalists at home. I should have thought that the decent Britisher would at least keep silent at these wrongs and be grateful to us for our inaction, but that he should add insult to injury, and pour salt over our wounds, passes all bounds of decency.

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ কবিতাটি মৃত্যুশয্যায় লেখা। নিজের হাতে লেখার মতো অবস্থা ছিল না। তিনি মুখে মুখে বলেছেন, তার পাশে বসা সহকারী রানী চন্দ সেটা নোট করেছেন। ১৯৪১ সালের ৩০ জুলাই  সকাল সাড়ে নয়টার দিকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে কবিতাটি রচিত হয়। রবীন্দ্রনাথ তখন মারাত্মক অসুস্থ এবং ওই দিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর একটি বড় অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ও দুর্বলতার কারণে কবি নিজে হাতে লিখতে পারছিলেন না। তিনি শয্যাশায়ী অবস্থায় মুখে মুখে কবিতার চরণগুলো বলতে থাকেন এবং তাঁর পাশে বসে থাকা রানী চন্দ তা কাগজে লিখে নেন। কবিতাটি বলা শেষ হলে রানী চন্দ তা কবিকে পড়ে শোনান এবং কবি শুনে সংশোধন ও অনুমোদন দেন। এর মাত্র দুই ঘণ্টা পর কবির অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর তিনি আর সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি এবং সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। এর ঠিক সাত দিন পর ৭ আগস্ট (২২ শ্রাবণ) তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কবিতাটির অন্তর্নিহিত দর্শনটা কি বোঝা যায়? এই ছলনাময়ী কে?

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে,
হে ছলনাময়ী।
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে
সরল জীবনে।
এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বকে চিহ্নিত করেছ,
তার তরে রাখো নি গোপন রাত্রি।
তোমার জ্যোতিষ্ক
যে পথ দেখায়
সে যে তার অন্তরের পথ,
সে যে সহজ সরল,
অনায়াসে তারে সত্য করে
কুটিলতার অগোচরে।
বাহিরে সে কুটিল বটে,
অন্তরে সে সরল—
এই নিয়ে তার গৌরব।
লোকে তারে বলে প্রবঞ্চিত।
সত্যেরে সে পায়
আপন আলোতে ধৌত অন্তরে অন্তরে।
কিছুতে পারে না তারে প্রবঞ্চিতে,
শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে
আপনার ভাণ্ডারে।
অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
সে পায় তোমার হাতে
শান্তির অক্ষয় অধিকার।

Friday, September 18, 2026

টাইগারপাস- নিরপেক্ষ মতের পাঠক

'টাইগারপাস' নিয়ে আমার একটা সংশয় ছিল। জীবনের প্রথম উপন্যাস। কথা ছিল একটিমাত্র উপন্যাসই লিখবো। কিন্তু পরে আরো একটি হয়ে গেছে। সেকথা থাক। এই প্রথম উপন্যাসটা লিখতে আমার দীর্ঘ সময় লেগে গিয়েছে। শখ করে লিখেছি মনের মাধুরী মিশিয়ে। অনেকটা আড্ডার ছলে। গল্পের মধ্যে ইতিহাসের পুর দিয়ে। কোথায় কিভাবে শেষ হবে কিছুই জানা ছিল না। চরিত্রগুলোকে মুক্ত করে দিয়েছি যেদিকে খুশি চলে যাক। প্রায় এক যুগ পর যখন কাজটা শেষ হলো তখন আমি উপন্যাসটার প্রতি গভীর অনুরাগ অনুভব করলাম। অনেকটা প্রথম প্রেমের অনুভূতি। এমন একটা ভালোলাগা আগে কখনো কাজ করেনি। আমি সাহিত্যিক নই। ইতিহাসের মতো রসকসহীন বিষয় নিয়ে কাজ করি। উপন্যাস লিখতে যতটা মুন্সিয়ানা দরকার, আমার সেসব কিছু নেই। এই উপন্যাস কারো ভালো লাগবে কিনা সন্দেহ আছে। পাঠকের কাছ থেকে কিরকম সাড়া মিলবে বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু ঈদসংখ্যায় প্রকাশের পর অনেক পাঠক জানালো ভালো লেগেছে। সম্পাদকও একই কথা বললেন। তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম গ্রন্থাকারে প্রকাশ করবো। আগ্রহী প্রকাশকও আছে। প্রকাশের পর প্রথম দুমাসে অর্ধেক বই বিক্রি হয়ে গেল শুনে দুশ্চিন্তার ভার নেমে গেল। আশা করা যায় সবগুলো শেষ হয়ে যাবে আগামী এক বছরের মধ্যে। এখন গত ছমাসের মূল্যায়ন দেখি। দেখা যাচ্ছে যারা বোদ্ধা পাঠক, খুব উঁচু মানের বইপত্র পড়েন, তাদের কাছে বইটা তেমন আশা জাগায়নি। হালকা চালে পড়ে শেষ করেছেন। তাদের ক্ষেত্রে এমন লাগাটাই স্বাভাবিক। তাই অবাক হইনি। কিন্তু আরেকটা বড় অংশ যাদেরকে সাধারণ পাঠক বলা যায়, তারা বইটা নিয়ে খুব উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। এত বেশি যে অনেকে আমাকে ফোন করে তাদের ভালো লাগার কথা জানিয়েছেন। ইনবক্সের মেসেজে ভরিয়ে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে দেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিকও আছেন। আমি খুব অবাক হয়ে গেছি। এতটা আমার প্রত্যাশা ছিল না কোনোদিন। আমার এক পরিচিত সাহিত্যিকের কাছে বইয়ের রিভিউগুলো দিয়ে মতামত জানতে চেয়েছিলাম। তিনি বলেছেন, তিনি খুব মনোযোগ সহকারে বইটা পড়েছেন। তার কাছে বইটা খুব ভালো লেগেছে। তার ধারণা বইটা যারা তাড়াহুড়া না করে আস্তে ধীরে পড়বেন তাদের সবাইকে স্পর্শ করবে। এটা আবেগ সর্বস্ব বই। যে গল্পটা লেখা হয়েছে সেটার ভেতরে গভীর একটা আবেগজনিত ব্যাপার আছে। যাদের ভেতরে সেই আবেগের উপস্থিতি আছে, তাদের সবাই বইটার আবেগে একাত্মতা অনুভব করবেন। যারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে তারা সেই দলের মানুষ। আবার যারা ক্রিটিক্যাল উপন্যাস পড়ে অভ্যস্ত, যারা সাহিত্যের মধ্যে নতুন কিছু আশা করেন তাদের কাছে এই বই তেমন ভালো লাগবে না। কারণ এই সাদামাটা গল্প তাদের খোরাক নয়। তবে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন বইটা উচ্চমানের কোনো সাহিত্যকর্ম হয়নি ঠিক, তবু এটা তাকে খুব গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। চরিত্রগুলোর পরিণতি তাঁকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে। তিনি আবেগে ভেসেছেন। যারা আনন্দ বেদনার স্পর্শ নেবার জন্য সাহিত্যপাঠ করেন, তিন তাদের জন্য বইটা সুপারিশ করবেন। সাথে তিনি আরো যোগ করেছেন হয়তো তিনি চট্টগ্রামে বেড়ে উঠেছেন বলে এই পক্ষপাতিত্ব।

টাইগারপাস প্রকাশের এক বছরও পূর্ণ হয়নি এখনো। আমাকে আরো পাঠকের মতামত পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আরো দূরের কোনো পাঠক। আমাকে যিনি চেনেন না। কিছু না জেনেই বইটা কিনেছেন। তার মতামত নিশ্চয়ই আরো পক্ষপাতহীন হবে।

Tuesday, September 8, 2026

আমার প্রথম বই- জর্জ আর. সিমসের স্মৃতি থেকে

 "আমার প্রথম বইটি যখন প্রকাশিত হয়, তখনও আমি শহরের সেই চাকুরিজীবন ছাড়িনি। তখন নিয়ম করে সকাল নয়টায় অফিসে গিয়ে সন্ধ্যা ছয়টায় বের হতাম। তবে মাঝখানে এক ঘণ্টার একটা দুপুরের খাবারের বিরতি থাকত। সেই এক ঘণ্টার বিরতিতেই ছোটগল্প কিংবা মাথায় আসা মজার সব ছোটখাটো লেখা লিখে ফেলতাম; আর সেগুলো বড় খামে ভরে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে পাঠাতাম। ওভাবে প্রায় বিশটির মতো লেখা পাঠিয়েছিলাম, তার মধ্যে একটাও গ্রহণ করা হয়নি, তবে বেশ কয়েকটি সসম্মানে ফেরত এসেছিল!

অফিসের সেই এক ঘণ্টার দুপুরের খাবারের বিরতিতেই আমি আমার প্রথম বইটি লিখেছিলাম। এইমাত্র সেটা খুঁজে পেলাম.......এই যে তার প্রচ্ছদ! আপনারা লক্ষ করবেন যে এতে আমার একটা প্রতিকৃতিও আছে। ছবিতে আমাকে বেশ অসুস্থ, কৃশ আর কঙ্কালসার দেখাচ্ছে। সাহিত্যচর্চায় নিজেকে সঁপে দেওয়ার চক্করে দুপুরের খাবার না খাওয়ার ফলই হয়তো এটি!

আপনি যদি সেই বইটার ভেতরের পাতায় একবার নজর বোলাতে পারতেন, আর যে বাজে কাগজে বইটি ছাপা হয়েছিল তা স্বচক্ষে দেখতে পেতেন....তবে আমার হাতে ওটা তুলে দিয়ে যখন বলা হয়েছিল, ‘এই নিন আপনার প্রথম সন্তান,’ তখন আমার বুকে যে কী তীব্র আঘাত লেগেছিল তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারতেন!

আমার ভেতরের সমস্ত অহংকার (আর লোকমুখে শুনি, আমার নাকি তা বেশ ভালোই আছে!) এক লহমায় ধুলোয় মিশে গেল, যখন প্রচ্ছদে আঁকা সেই দুমড়েমুচড়ে যাওয়া কঙ্কালসার লোকটার দিকে তাকালাম.......যে লোকটার চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, তাঁর এখনই কোনো সৎকার সমিতির সদস্যপদ নিয়ে নেওয়া উচিত!

তা-ও হয়তো গায়ে মাখতাম না, কিন্তু বাঁধ সাধল বই কেনা পাঠকেরা......তারা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে চিঠি লিখে অভিযোগ জানাতে শুরু করল! এক ভদ্রলোক তো পোস্টকার্ড পাঠিয়ে লিখলেন, বইটি কিনে বাড়ি ফেরার পথেই নাকি তা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে গেছে! আরেকজন নিশ্চিত করলেন যে, বইটির পাতা থেকে তিনি নাকি এত পরিমাণ খড় কুড়িয়ে পেয়েছেন যা দিয়ে অনায়াসে তাঁর ঘোড়ার জন্য একটা তোশক বানিয়ে ফেলা যায়! আর তৃতীয় একজন তো ডাক-মাশুল না দিয়েই বইটি আমাকে ফেরত পাঠালেন এবং বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করলেন....আমি যেন ওটা দয়া করে আমার ডাস্টবিনে ফেলে দিই; কারণ তাঁর বাড়ির পেছনের বাগানে যে ডাস্টবিনটা আছে, তা নিয়ে তাঁর রাঁধুনির নাকি বেশ অহংকার রয়েছে!"

[জর্জ আর. সিমস]


Thursday, August 27, 2026

কেন চট্টগ্রাম বঙ্গোপসাগরের প্রধান বন্দর হতে পারেনি?

২৪ আগষ্ট ২০২৬ তারিখে ডেইলি স্টারে রিলা মুখার্জির লেখা Why Chittagong never became a maritime city? আলোচনাটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। খুব চমৎকার কিছু বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। কিন্তু সেই বিশ্লেষণের তাত্ত্বিক আলাপের ভেতরে গুরুতর কিছু বাস্তবতা আসেনি। তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয়টা বলেননি। অজ্ঞতা কিংবা এড়িয়ে যাওয়া, ঠিক জানি না। এটা সবাই জানে কলকাতার জন্ম হবার বহুকাল আগে চট্টগ্রাম বন্দর হিসেবে খ্যাত ছিল। কিন্তু তবু ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রাম কেন প্রধান বন্দর হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সেই প্রশ্নের উত্তর কলোনিয়াল শাসকদের কাছে আছে। উপনিবেশ যুগে শুধুমাত্র সেইসব অঞ্চল উন্নতি করেছে যেগুলো শাসকদের সুবিধাজনক ছিল।

চট্টগ্রামের বড় শহর বা পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক শহর হতে না পারার আসল কারণ ভূ-রাজনৈতিক। শত শত বছর ধরে চট্টগ্রাম ছিল এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক সীমান্ত। আরাকান, মুঘল, ত্রিপুরা রাজ্য আর পর্তুগিজ জলদস্যু, সবার নজর ছিল এই ভূখণ্ডের ওপর। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সংঘাতের কারণে কেউই দীর্ঘদিন একে একচ্ছত্র দখলে রাখতে পারেনি। এই দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অস্থিতিশীলতার কারণেই সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থায়ী পরিবেশ বা দেশীয় অভিজাত শ্রেণি গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়নি।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রবন্ধটিতে একটি ঐতিহাসিক সত্য এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে (বা লেখকের নজর এড়িয়ে গেছে)। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কিন্তু শুরুতেই কলকাতার কথা ভাবেনি; তাদের প্রথম পছন্দ ছিল চট্টগ্রাম। ১৬৮৬ সালে জব চার্নক ও ব্রিটিশ নৌবহর চট্টগ্রাম দখলের জন্য হামলা চালায়। এই বিষয়ে সকল তথ্য প্রমাণ এখনো নানান আর্কাইভে আছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করেই বাংলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক ও সামরিক ভিত্তি গড়ে তোলা। কিন্তু সেই অভিযানে ব্রিটিশরা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। এমনকি ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা লাটে ওঠার দশা হয়েছিল।
এই ব্যর্থতার পরেই বাধ্য হয়ে তারা অখ্যাত এবং নিরাপদ স্থান হিসেবে কলকাতার দিকে নজর দেয়। অর্থাৎ, ১৬৮৬ সালে চট্টগ্রামে ব্রিটিশদের হারই ছিল কলকাতার জন্ম ও উত্থানের মূল কারণ। ‘ফোর্ট উইলিয়াম’ দুর্গটি কলকাতার বদলে চট্টগ্রামে গড়ে উঠত, তবে আজকের ভৌগলিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলতো।
তাঁর সাথে আমার পরিচয় নেই। যদি আলাপ হতো আমি তাঁকে বলতাম Chittagong’s failure to evolve into a full-fledged maritime city was, above all, a result of persistent geopolitical turmoil. For centuries, the region was a highly contested frontier claimed by the Arakanese, the Mughals, the Tripura Kingdom, and Portuguese buccaneers. Because control over the territory changed hands so frequently, no single power could establish long-term political stability. It was this constant conflict, not a inherent lack of commercial appetite, that prevented a permanent merchant elite from forming and investing locally.
More importantly, the essay omits a critical historical turning point that reshaped the region's destiny. The British East India Company did not originally set its sights on Calcutta; Chittagong was their first choice. In 1686, Job Charnock and the British naval forces launched an aggressive military campaign to capture Chittagong, intending to turn it into the main commercial and strategic stronghold for the British Empire in Bengal. However, due to strong Mughal resistance, the British failed catastrophically. It was precisely this failure in Chittagong that forced the Company to fall back to the Hooghly River and establish a base at Calcutta in 1690. In short, Calcutta’s birth and rise were the direct consequence of Britain's military defeat at Chittagong.
Had history taken a different turn in 1686, and had Fort William been erected in Chittagong instead of Calcutta, the maritime history of Bengal and Chittagong’s future would have been entirely different. Chittagong possessed superior natural advantages: a deep-water natural harbor with direct access to the Bay of Bengal, features that the silt-prone, narrow Hooghly River near Calcutta could never match. Calcutta grew into a world-class maritime city largely because it received colonial patronage and imperial defense infrastructure, leaving Chittagong’s vast potential untapped. Ultimately, Chittagong’s destiny cannot be adequately explained through urban planning theories or missing merchant networks. It did not fail to become a maritime city due to structural economic flaws, but because of centuries of geopolitical friction and a decisive moment in British colonial policy. Had the political wheel turned just a bit differently, the legacy that became Calcutta would likely have belonged to Chittagong.

অথচ কয়েক মাস আগে রিলা মুখার্জী নিজেই আরেকটা লেখায় যেটা উল্লেখ করেছিলেন, সেটা গত পরশুর প্রবন্ধের বিপরীত। ১৫০২ সালে বঙ্গোপসাগরের একমাত্র বন্দর হিসেবে চট্টগ্রামের নামই পাওয়া গেছে প্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র ক্যানটিনো প্লেনিস্ফেয়ারে। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন:
How, then, did this marginal land transform into the Cantino Planisphere's major portal in 1502? The Portuguese diarist Tomé Pires (1515) observed a westward commercial networking from Chittagong, with Persian, Rumi, Turk, and Arab merchants present there, as well as traders from Chaul, Dabhol, and Goa, while the Portuguese epic poet Camões (1572) emphasised eastern networks:
'The City CATHIGAN would not be wav'd,
The fairest of BENGALA: who can tell
The plenty of this Province? but its post
(Thou seest) is Eastern turning the South-Coast.'
হ্যাঁ, এই অরণ্য বেষ্টিত প্রাচীন জনপদটাই ছিল বঙ্গোপসাগরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। ১৬৮৬ সালে চট্টগ্রাম দখল করতে ব্যর্থ না হলে এখন হয়তো চট্টগ্রাম হতো বঙ্গোপসাগরের সিঙ্গাপুর।

রিলা মুখার্জির লেখার লিংক:
https://www.thedailystar.net/slow-reads/focus/news/why-chittagong-never-became-maritime-city-4254986

Friday, August 7, 2026

সত্যি বন্ধু

"সত্যিকারের বন্ধু আমরা খুব কমই পাই। যাদের অধিকাংশকে আমরা বন্ধু বলে মনে করি, তারা প্রকৃতপক্ষে কেবল পরিচিত মানুষ মাত্র। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কারণ সিসেরোর সেই উক্তি একেবারেই সত্য। সত্যিকারের বন্ধুত্ব কেবল সৎ মানুষের মধ্যেই সম্ভব। যৌবনে, যখন রক্তে এখনও উষ্ণতা থাকে এবং নিজের নিষ্পাপ হৃদয় থেকে জন্ম নেওয়া বিশ্বাস এখনও অটুট থাকে, তখন মানুষ সহজেই অন্যকে বন্ধু ভাবে। কিন্তু অন্য মানুষের অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে সেই বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। আমিও একসময় আমার পরিচিতদেরই বন্ধু ভেবেছিলাম। মনে করতাম, আমার অসংখ্য বন্ধু আছে। কিন্তু বিপদের আগুন আমার পরিচিতদের ভিড়কে ছেঁকে দিয়েছে। এখন দেখি, একদিকে রয়েছে হাতে গোনা কয়েকজন প্রকৃত বন্ধু, আর অন্যদিকে রয়েছে শত্রুর মতো বা সম্পূর্ণ অপরিচিত এক বিরাট জনসমষ্টি। তবে এই কঠিন পরীক্ষার একটি উপকারও হয়েছে- আমি অন্য মানুষের ওপর যতটা ভরসা করতাম, তার চেয়ে কম ভরসা করতে শিখেছি; আর নিজের মধ্যে যতটা শক্তি আছে, তা আমার ধারণার চেয়েও বেশি আবিষ্কার করেছি।"

জোনাথন সুইফট বহুবছর আগে এই কথাটা বলে গিয়েছিলেন। এত বছর পরেও কথাটা শতভাগ খাঁটি। বরং আরো বেশি সত্যি এখন।

Thursday, July 16, 2026

কাগজ, কলম, প্রযুক্তি, লেখালেখি

১. লেখকদের হাতে কাগজ আর কলম থাকাই সবচেয়ে ভালো। এখন কম্পিউটার যুগ। প্রায় সবাই ল্যাপটপ কম্পিউটারে লেখালেখি করে। কেউ কেউ মোবাইলেও প্রচুর লেখালেখি করে। মোবাইলে লেখার কায়দাটা খুব বেশি রপ্ত হয়নি। বাংলা ফন্টে মোবাইলে লেখা কষ্টকর। ভয়েস কমান্ডে প্রচুর বানান ভুল। তবু কম্পিউটারবিহীন জীবনে সামান্য লেখালেখির জন্য মোবাইল মাঝে মাঝে কার্যকর হতে পারে।

২. আরো কিছু প্রযুক্তি আসার দরকার। টাইপ না করে লেখা যায় সেরকম প্রযুক্তি। মাথার ভেতর কোনো ভাবনা এলে সেটা হাতের চারকোনা স্ক্রিনে ভেসে উঠলো। বলা যায় না, ভবিষ্যতে সেরকম কোনো অতিবুদ্ধিমাত্রিক প্রযুক্তি এসে হাজির হতে পারে।


৩. সুস্থ শরীরে অলস সময় কাটানোর সবচেয়ে আনন্দময় উপায় হলো ইউটিউবে খুঁজে খুঁজে পুরোনো দিনের বিটিভি যুগের নাটক দেখা। আশি নব্বই দশকের ঝাপসা নাটকগুলো এখনো আনন্দময়। হুমায়ূন আহমেদ কিংবা আফজাল-সুবর্ণার চমৎকার সব নাটক এখনো আছে।


৪. শরীর মন দুটো দিন ভালো থাকলে মনে হয় অনেক কিছু পাওয়া হলো। গত দুই দিন খুব ভালো কেটেছে দু সপ্তাহের অস্বস্তিকর সময়ের পর। এগুলো বেশিদিন থাকে না। নতুন ঝামেলা এসে হাজির হবেই। 


Tuesday, June 2, 2026

বইপোকা অথবা পোকার খাদ্য

অনেকদিন পর আক্কাস ভাই আসলেন বেড়াতে। এই বাসায় তিনি আগে আসেননি। ঘুরে ফিরে দেখে এক পর্যায়ে বলে উঠলেন, ভাই আপনার তো অনেক বই, সারা ঘরে লাইব্রেরি।

আমি লজ্জিত হেসে বললাম, ভাই এটা লাইব্রেরি না, বইয়ের শরণার্থী ক্যাম্প বলতে পারেন।


তিনি অবাক হয়ে বললেন, এটা কেমন কথা?


আমি বললাম, পুরোটা শুনলে বুঝবেন। 


দেখুন, মানুষের অনেক বড় বড় স্বপ্ন থাকে। ক্যারিয়ার নিয়ে উন্নত চিন্তাভাবনা থাকে। আর্থিক বৈষয়িক ব্যাপারে অনেক সচেতনতা থাকে। আমার সেসব কিছুই ছিল না। না থাকার কারণ- ক্লাস সেভেনে উঠে আমি একটা নতুন বিস্ময়ের মুখোমুখি হই। আমাদের স্কুলের ছোট্ট লাইব্রেরি ঘর ছিল। সেই লাইব্রেরি কার্ড করার পর আমার মনে একটা নতুন স্বপ্ন দানা বাঁধে। আমার মনে হতে থাকে ওরকম একটা ঘর থাকলে জীবনে আর কিছু চাইবার থাকবে না। যেখান থেকে প্রতিদিন একটা করে বই পেড়ে নেয়া যাবে। যে ঘরে ঢুকলে বুকশেলফে হাত বুলাতে বুলাতে এই প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যাওয়া যাবে। এই অভিজ্ঞতা অন্য কারো আছে কিনা জানি না। বইয়ের ভাঁজে আঙুল বোলাতে বোলাতে হাতের তালুতে একটা পরম আনন্দদায়ক অনুভূতি হয়। আমি বই পড়ার পাশাপাশি সেই অনুভূতিটাও খুব উপভোগ করি। প্রতিটা বইয়ের আলাদা স্পর্শ, আলাদা অনুভূতি, আলাদা স্মৃতি। যত পুরোনো হয় বই, তত বেশি গভীর হয় সেই অনুভূতি।


ক্লাস সেভেন থেকে সেই অনুভূতির যাত্রা চার যুগ পার হবার পরও থামেনি। ফলে আমার অন্য সকল উচ্চাশা হার মেনে গেছে বইয়ের কাছে। কিন্তু স্বপ্নের বাইরের জগতটা অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন। সেটা টের পেতে শুরু করলাম ভার্সিটিতে ওঠার পর। বাবা তখন একটা ছোটখাট বাড়ি তৈরি করেছেন শহরে। ওই বাড়ির আংশিক ইঞ্জিনিয়ার ছিলাম আমি। মানে আমি একটা লেআউট করে দিয়েছিলাম কয়টা রুম হবে, কোন রুম কোন দিকে থাকবে। বাবা ওটা ইঞ্জিনিয়ারকে দিলেন। তিনি ওটা তাঁর মতো করে ড্রইং করে সিডিএ থেকে পাশ করিয়ে নিলেন। 

সেই যে মূল নকশা করেছিলাম, সেখানে আমার একটা গোপন অভিপ্রায় ছিল। আমি একটা ঘরকে লাইব্রেরি করতে চেয়েছিলাম। আমাদের জন্য তিন বেডরুমের বাড়ি হলেই চলতো। কিন্তু আমি চারটা বানিয়ে দিয়েছিলাম ইন্টার পাশ বুদ্ধি নিয়ে। ওই একটা বাড়তি ঘর হবে লাইব্রেরি। যেখানে সবগুলো দেয়াল জোড়া আলমারীতে শুধু বই থাকবে। সিনেমায় দেখা স্টাডি রুমের মতো। 


বাড়িটা যথাসময়ে হয়ে গেল। আমরা উঠলাম স্বপ্নের বাড়িতে। কিন্তু তারপর থেকে অভাবিত সব ঘটনা ঘটতে শুরু করলো। প্রথম ধাক্কা আসলো ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল। প্রবল ঘুর্ণিঝড়ে আমাদের একতলা টিনশেড বাড়ির ছাদ উড়ে যায়। বাসা পুরো তলিয়ে গিয়েছিল জলোচ্ছ্বাসে। সারা জীবনের অনেক সঞ্চয় এক রাতে নষ্ট হয়ে যায়। কিছু বই রক্ষা পেয়েছিল প্রায় অলৌকিকভাবে। বাকীগুলো আবর্জনায় পরিণত হয়েছিল। 


সেই ধাক্কার পর আরো নানান ধাক্কা আমাদের পরবর্তী কয়েক বছরকে কঠিন করে তুলেছিল। আরো অনেক বছর পর ওই বাড়িটা আমাদের ছেড়ে দিতে হয়। আমরা একটা নতুন ফ্ল্যাটে এসে উঠলাম। এখানে জায়গা অনেক কম। ফার্নিচার রাখার পর বইয়ের জন্য আলাদা জায়গা থাকে না। তবু কায়দা করে বুকশেলফগুলো বসিয়ে দিলাম। কিন্তু সবগুলো বইয়ের জায়গা হচ্ছিল না। চার দশকের সঞ্চয়ে শত শত বই, পত্রিকা জমে ছিল। বন্যা, ঝড়, বাদলে প্রচুর নষ্ট হবার পরও যেগুলো রয়ে গেছে সেগুলোর ঠাঁই হচ্ছে না। জায়গার সংকুলান না হওয়ার ফলে শত শত বই পত্রিকা বিসর্জন দিতে হলো। তারপরও খাটের নীচে এখানে ওখানে নানান জায়গায় স্তুপ। অন্যদের মতো ঘর সাজানোর শৌখিনতা আমার তেমন নেই। শুধু জিনিসপত্রগুলো ঠিক জায়গায় থাকতে পারলেই হয়। বাসার অন্য আসবাবপত্রের চিন্তা করার মানুষ আছে। বইগুলোর ব্যবস্থা করাই আমার দুশ্চিন্তা। 


বাসার কারো সমস্যা না করে কাজটা করার জন্য আমাকে একটু কৌশলের আশ্রয় নিতে হলো। ছোট ফ্ল্যাট। ছোট ছোট বেডরুম। তবু আমি খুঁজে খুঁজে যেখানে এক ফুট দেড় ফুট খালি জায়গা পেলাম, সেই মাপে বুকশেলফ বানাতে লাগলাম। অজুহাত দিলাম, অন্যকিছু রাখার। কিন্তু বুকশেলফ আনার পর ওখানে বই ঢুকে গেল। ড্রইংরুম শেষ করে, ডাইনিং রুমের কোনায়, বেডরুমের আলমারীর ফাঁকে, শোকেসের ভেতরের দিকে, যেখানে একটু জায়গা পেয়েছি, বইগুলোকে আশ্রয় দিয়েছি। অনেকটা শরণার্থী শিবিরে থাকার মতো করে সবগুলো বই কোনো না কোনো শেলফে আশ্রয় পেয়ে গেল। 

তো, এটাকে আমি লাইব্রেরি বলি না। এটাকে বইয়ের শরণার্থী শিবির বলা যায়।


আক্কাস ভাই হাসতে লাগলেন আমার কথা শুনে। আমি আবারো বললাম, হাসবেন না। এর পরে দুঃখের ব্যাপারও আছে।


কেমন?


এই যে বইগুলা। এগুলা এখন আছে। কিন্তু একসময় এগুলাকে আপনি শহরের নানা ফুটপাতে খুঁজে পেতে পারেন।


তা কি করে হয়?


পরের প্রজন্ম যদি বই না পড়ে তাহলে ওটাই হবার কথা। এখন যে যন্ত্রযুগ এসেছে, বইপত্রের দিকে এই প্রজন্মের তেমন আগ্রহ নেই। আগামীতে কাগজের বই হয়তো কেউ পড়বে না। তখন ফুটপাতই সর্বশেষ গন্তব্য হতে পারে।


আক্কাস ভাই যে হাসি নিয়ে ঘরে ঢুকেছিল, তার উল্টো চেহারা নিয়ে বিদায় নিলেন। কারণ তাঁর বাড়িতে আমার চেয়ে কয়েকগুন বেশি বই আছে। তাঁর পুত্রকন্যারা কেউ একটা বইও কোনোদিন উল্টে দেখে না। এটা নিয়ে তিনি প্রায়ই আক্ষেপ করতেন। বলতেন বইগুলো একদিন পোকার খাদ্য হবে। আজকে আবারো হয়তো সে কথা মনে পড়ে গেছে।


Friday, May 29, 2026

একটা মেকি হাসির গল্প: : পাভেল রহমান

 


স্বৈরাচার পতনে বঙ্গভবনে দুই নেত্রীর ছবি।

' মা, তোর বদনখানি মলিন হলে ...!

বঙ্গভবনে দুই নেত্রীর ‘বদনখানি মলিন’ ছিল ! ছবিতে দুই নেত্রীর মুখে যে হাসি দেখা যাচ্ছে সেই হাসিটি ছবি তোলার জন্য হেসেছিলেন তাঁরা। তার আগে বঙ্গভবনের দরবার হলে সোফায় পাশাপাশি 'মলিন বদনে' বসেছিলেন দুই নেত্রী।
এর আগে
৬ ডিসেম্বর বিকেলে শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়া উপস্থিত হয়েছিলেন বঙ্গভবনে বিজয়ীর বেসে। দরবার হলে দুইনেত্রির বসার জন্য একটি ডবল শোফার ব্যবস্থা ঠিক করে রাখা হয়েছিল। তবে সোফায় বসবার মুহূর্তে একে অন্যের প্রতি সৌজন্য বিনিময়ও করেননি তাঁরা। বসার পরে বেগম জিয়া এক নিবিষ্টে সামনের স্টেজের দিকে তাকিয়ে থাকলেও শেখ হাসিনা ডানের সোফায় বসা আওয়ামী লীগ নেত্রী বেগম সাজেদা চৌধুরীর সাথেই টুকটাক কথা বলছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া নিজে যেহেতু গম্ভীর থাকতে পছন্দ করেন সে কারনে প্রয়োজন ছাড়া তিনি আগবাড়িয়ে তাঁর বায়ে বসা মহাসচিব ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের সাথে কোন কথা বলেননি।
তবে কাকতালীয় ছিল তাঁদের শাড়ির রঙ্গের মিল। তাঁরা দুইজনাই 'গর্জিয়াস ঘিয়ে রঙ্গের শাড়িতে’ উপস্থিত হয়েছিলেন বঙ্গভবনে। সেই সাথে ছিলেন পরিপাটি সাজে। দরবার হলের উপস্থিত বিশিষ্ট গণ্যমান্য অতিথিরা দুইনেত্রির সান্নিধ্যে লাভ কিংবা দুজনাকে একটিবার 'চোখে' দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন।
কিন্তু এমন একটি ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে তাঁরা যেভাবে বসেছিলেন তাতে মনে হচ্ছিল তাঁদের মাঝে কোন পূর্ব পরিচয়ই ছিল না কখনোই। উৎফুল্ল উচ্ছ্বাস তো দূরের কথা, দুজনার মাঝে মুখ চাওয়াচায়ি পর্যন্ত ছিল না সেই অনুষ্ঠানে যোগদিয়ে !
খবরের মানুষ হিসেবে তাঁদের দুজনার সঙ্গে দীর্ঘ ৯ বছরে রাজপথে গড়ে উঠা সম্পর্কের খাতিরে প্রত্যাশা আজকের দিনে তাঁদের একটা প্রাণবন্ত ছবি তোলার। সেই আশাতেই সেই কখন পৌঁছে গেছি বঙ্গভবনের দরবার হলে। আর ঐতিহাসিক মুহূর্তের ছবি তুলতে ক্যামেরা নিয়ে ওৎ পেতে বসে আছি ‘মহেন্দ্র‘ ক্ষণে’র জন্য। শুধু কি আমি, আছেন দুই নেত্রীর সামনে উপচেপরা ফটো সাংবাদিকরাও।
যদিও এমন ভাবে দুইনেত্রিকে ছবি তোলার জন্য ঘিরে রাখার সময়টা খুব বেশী পাওয়া যাবে না। যে কোন মুহূর্তে দরবার হলে প্রবেশ করবেন অনুষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। আর সেই মুহূর্তে আমাদের এই স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে যেতে হবে।
বঙ্গভবনের আজকের এই অনুষ্ঠানে যদিও প্রধান ব্যক্তি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ কিন্তু ক্যামেরায় প্রধান আকর্ষণ ‘দুই নেত্রী’ শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া। শুধু আমাদের চোখ না অনুষ্ঠানের হাজারো চোখ তাঁদের দিকেই। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ ছবির দ্বিতীয় ম্যারিটে। তবে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ একা হবেন নন দুই নেত্রীর মাঝে তৃতীয় হয়ে।
তবে দুজনার মাঝে কথা কিংবা হাসি বিনিময়টা ছবির জন্য প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বেগম জিয়ার চেয়ে প্রাণবন্ত আর উচ্ছল স্বভাবের নেত্রী শেখ হাসিনার সাহায্যে কাজটা করা চেষ্টা করি আমি।
হাসিনা আপাকে বললাম, আপা এমন দিনে চুপ করে আছেন কেন ? ম্যাডমের সাথে কথা বলেন। আপা বললেন, ‘ কি বলবো ‘? আমি বললাম, যা খুশী বলেন। আপা মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত কবিতা ‘ উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই’-আওড়াতে লাগলে আমি থামিয়ে দিলাম। পাশে থাকা ম্যাডাকে দেখিয়ে বললাম, না না ওনাকে কিছু বলেন। আপা আবার আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘ কেমন আছেন ’ ? আবার থামিয়ে দিলাম বললাম, আপা আমার দিকে না, ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করেন। আপা তখন ম্যাডামের দিকে তাকালেন আর হাসতে হাসতে অনুযোগের সূরে বললেন, ‘দেখেন তো, পাভেল কেন যে এমন ঝামেলা করে ‘ ? হাসিনা আপার কথা শুনে মুখে হাসি ফুটিয়ে ম্যাডামও আপার দিকে ঘুরে তাকালেন আর হাসতে হাসতে বললেন, ‘ পাভেল তো এমনই করে ‘। আর সেই মুহূর্তে দুজনাই দুজনার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলেন একসাথে !
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মহামূল্যবান সেই হাসিটি আমাদের সবার ক্যামেরার মুহু মুহু ফ্ল্যাশে ফ্ল্যাশে আলোয় ঝলসে উঠলো দরবার হল, ছড়িয়ে গেলো সেই ছবি সারা দেশে সারা বিশ্বে।
মুহূর্তে পাওয়া কাঙ্কখিত দুই নেত্রীর হাসির ছবিটি সেই রাতেই এপির ওয়্যারে ছড়িয়ে গেলো সারা বিশ্বে। পরদিন বাংলাদেশের কাগজে এবং ফ্লাইটে নেগেটিভ চলে গেলো আনন্দবাজার, স্টেট্‌সম্যান এবং প্যারিসের গামা প্রেস এবং সিপা ফটোতে।
সে সময় ছবি পাঠানোর প্রযুক্তি উন্নত না থাকায় মিডিয়ার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গুলিতে নেগেটিভও পাঠানো হতো।

পাভেল রহমান
বেবিলন, নিউ ইয়র্ক
৬ ডিসেম্বর ২০২৫

Monday, May 25, 2026

ইচক দুয়েন্দে সম্পর্কে আমার অজ্ঞতা

আমি ইচক দুয়েন্দের নাম যখন প্রথম শুনি তখন ভেবেছি তিনি বিদেশী লেখক। কখনো তাঁর কোনো বই পড়িনি। অনেক পরে জানলাম তিনি বাংলাদেশের সাহিত্য জগতের সবকিছু থেকে আড়ালে থাকা একজন মানুষ ছিলেন। কয়েকদিন আগে তিনি চিরতরে চলে গেলেন। তখন তাঁকে নিয়ে অনেক হৈ চৈ। অথচ বেঁচে থাকতে তাঁকে নিয়ে কোথাও আলোচনা হয়নি। তিনি বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলেন জীবদ্দশাতেই।

প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত তাঁর সম্পর্কে লেখা এই নিবন্ধটি রেখে দিলাম। মানুষ এমন অদ্ভুতও হতে পারে?

-------------------------------------------------------------------------------

ইচক দুয়েন্দে: আমাদের না-পড়া একাকিত্ব
সৈকত আরেফিন

ইচক দুয়েন্দে শামসুল কবীর কচি চলে গেলেন।

এই বাক্যটি লিখতে গিয়ে মনে হলো, মৃত্যুর সংবাদ সবসময় কেবলই মৃত্যুর সংবাদ নয়। কখনও কখনও তা আমাদের দীর্ঘ বিস্মৃতির হঠাৎ প্রকাশ। মানুষটি হয়তো অনেক আগেই সরে গিয়েছিলেন আড্ডা থেকে, আলোচনার টেবিল থেকে, সাহিত্যসমাজের চেনা আলোকবৃত্ত থেকে, আমাদের নিয়মিত স্মৃতি থেকে। আর আমরা ভেবেছি, তিনি আছেন। কোথাও আছেন। নিজের মতো আছেন। তার মতো মানুষ তো থাকেনই অদ্ভুত, দুর্বোধ্য, কিংবদন্তির মতো দূরে। কিন্তু এই ‘দূরে থাকা’র ভেতরে যে কতখানি একা হয়ে যাওয়া থাকে, তা আমরা ভাবিনি।

শামসুল কবীর কচিকে আমরা ইচক দুয়েন্দে নামে চিনেছি। এই নাম তিনিই নিয়েছিলেন, কচিকে উল্টে ক+চ+ই= ইচক করে। তাকে আমরা মহামতি, মহাত্মা বলেছি, কেউ বলেছি দুর্বোধ্য, রহস্যময়, অস্বাভাবিক। কিন্তু এসব নামের আড়ালে যে একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন শামসুল কবীর কচি, তাকে আমরা কতটা দেখেছি? তারও শরীর ছিল, ক্ষুধা ছিল, ক্লান্তি ছিল, অপেক্ষা ছিল, অভিমান ছিল। তারও হয়তো সামান্য আলাপের দরকার হতো। হয়তো চুপ করে পাশে বসে থাকার মতো একজন মানুষের দরকার হতো। অথচ আমরা তাকে মিথ বানিয়ে আরামে দূরে বসে থেকেছি। মিথের শরীর নেই, ক্ষুধা নেই, বিছানা নেই, ঘর নেই, একাকিত্ব নেই। কিন্তু ইচক দুয়েন্দের ছিল।

তার মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে বারবার রাজশাহীর সেই বাড়িটার কথা মনে পড়ছে। সূর্যকণা স্কুল গলির শেষ মাথায় বিশাল, প্রায়-পরিত্যক্ত এক বাড়ি। অন্ধকার করিডোর। বন্ধ দরজা। স্যাঁতসেঁতে দেয়াল। এমন এক নীরবতা, যেখানে মানুষের বসবাসের চেয়ে সময়ের ক্ষয় বেশি স্পষ্ট। বিকালের আলোও সেখানে ঢুকে পূর্ণ আলোয় উদ্ভাসিত থাকতে পারত না। জানালা পেরিয়ে ঘরে এসে আলোই যেন আবছায়া হয়ে যেত। মনে হতো, বাড়িটির ভেতরে প্রবেশ করলেই সবকিছু ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে আলো, শব্দ, উপস্থিতি, মানুষের স্বাভাবিকতা সব। সেই বাড়িতে একা থাকতেন ইচক দুয়েন্দে। এই বাড়িতে যেমন তিনি থাকতেন, হয়তো বাড়িটিও তার মধ্যে থাকত। তার ভেতরেও হয়তো ছিল অন্ধকার করিডোর, অর্ধেক খোলা দরজা, মৃত আলো, হঠাৎ সরীসৃপের মতো নড়ে ওঠা বাক্য, আর এমন সব ঘর যেখানে আমরা প্রবেশ করতে ভয় পেতাম।

তিনি বলেছিলেন, ঘরে প্রায়ই সাপ আসে। কথাটি বলেছিলেন অবিশ্বাস্য স্বাভাবিকতায়। যেন সাপ কোনো আতঙ্ক নয়, কোনো বিপর্যয় নয় বরং সহবাসী। যেন মানুষেরা না থাকলে নিঃসঙ্গতারও নিজস্ব প্রাণিকুল জন্মায় সাপ, পোকা, দেয়ালের নোনা ধরা গন্ধ, বাতাস, ছায়া, পুরনো কাগজ, অসমাপ্ত বাক্য।

তখন কথাটি শুনে বিস্মিত হয়েছিলাম। আজ বুঝি, সেটি ছিল তার জীবনের এক অমোঘ রূপক। সভ্যতার আলো থেকে সরে গেলে মানুষের ঘরে অন্ধকারের প্রাণীরা ফিরে আসে। সাপ তখন শুধু সাপ থাকে না। সে হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গতার প্রতীক। সে বলে দেয়, মানুষটি আর মানুষের সাধারণ জগৎ-ধারণার মধ্যে নেই; তিনি বাস করছেন অন্য এক অঞ্চলে যেখানে অর্ধেক বাস্তব, অর্ধেক ভাষা, অর্ধেক অরণ্য, অর্ধেক পরিত্যক্ত সময়।

আমি আর কথাশিল্পী কবীর রানা যেদিন তার কাছে গিয়েছিলাম, তিনি আমাদের কবিতা শুনিয়েছিলেন। কবিতা ঠিকই, কিন্তু সেটা আমাদের পরিচিত কবিতার মতো নয়। সেখানে সহজ আবেগ হয়তো ছিল, শ্রুতিমধুরতার পথ ছিল হয়তো কিন্তু পাঠকের প্রবেশের জন্য কোনো দরজা খোলা ছিল না। কারণ সে ভাষা ছিল অচেনা। ফলে আমরা কিছুই বুঝিনি। সত্যি বলতে, বুঝবার মতো প্রস্তুতি আমাদের ছিল না। কবিতা শেষ হওয়ার পর আমরা কেউ কথা বলতে পারিনি।

এই নীরবতাই হয়তো ইচক দুয়েন্দেকে বোঝার প্রথম পাঠ। তাকে সহজ ব্যাখ্যায় ধরা যায় না। তাকে সারাংশে নামানো যায় না। তাকে দুর্বোধ্য বলে সরিয়ে দিলে নিজের অক্ষমতাটাই শুধু প্রকাশ পায়। কিছু সাহিত্য মাথায় ঢোকে, কিছু সাহিত্য হৃদয়ে লাগে, আর কিছু সাহিত্য শরীরের গভীরে গিয়ে অস্বস্তি তৈরি করে। ইচক দুয়েন্দের লেখা সেই তৃতীয় ধরনের। তার অর্থ হয়তো প্রথমে মেলে না; কিন্তু অভিঘাত মেলে। মনে হয়, কোনো অচেনা প্রাণী আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। আমরা তার নাম জানি না, কিন্তু তার পায়ের শব্দ শুনেছি। আমরা তার ভাষা বুঝি না, কিন্তু তার উপস্থিতি এড়াতে পারি না।

আমরা যারা লিখি, আমরা বেশিরভাগই আপোসের মানুষ। আমাদের চাকরি আছে, সংসার আছে, সন্তান আছে, বাজার আছে, চিকিৎসা আছে, সামাজিক সম্পর্ক আছে, নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে। আমরা সাহিত্যকে ভালোবাসি, কিন্তু সাহিত্যকে আমাদের জীবন গ্রাস করতে দিই না। আমরা জীবন বাঁচিয়ে রেখে লিখি। অথচ ইচক দুয়েন্দে যেন লেখার কাছে জীবনটাই রেখে দিয়েছিলেন।

তার বইয়ের নাম লালঘর, টিয়াদুর। এই নামগুলো উচ্চারণ করলেই মনে হয় বাংলা সাহিত্যের পরিচিত মানচিত্রে কেউ লাল কালি দিয়ে অচেনা চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। লালঘর ঘর আছে, কিন্তু আশ্রয় নেই; রঙ আছে, কিন্তু উৎসব নেই; আছে রক্ত, গোপনতা, অন্তরীণতা, নিষিদ্ধ আলোর ঝিলিক। টিয়াদুর-এও তিনি জটিল রাজনীতির আপাত সরল বঙ্গানুবাদ করেন প্রতীকী ভাষায়।

আমরা তাকে কিংবদন্তি বানিয়েছি। কারণ কিংবদন্তি বানানো সহজ। দূর থেকে বলা যায় তিনি আলাদা, তিনি দুর্বোধ্য, তিনি অসাধারণ। কিন্তু একজন একা মানুষের পাশে বসা কঠিন। তার অন্ধকার ঘরে গিয়ে বসা কঠিন। তার ভাঙা, জটিল, অস্থির ভাষা শুনেও ধৈর্য ধরে থাকা কঠিন। তার প্রয়োজন বুঝতে চেষ্টা করা কঠিন। জীবিত শিল্পীর পাশে থাকা কঠিন। মৃত শিল্পীকে শ্রদ্ধা করা সহজ। এখানেই আমাদের অপরাধবোধ।

ইচক দুয়েন্দের মৃত্যু তাই কেবল আমাদের ব্যক্তিগত শোক নয়, এটি আমাদের সাহিত্যসমাজের আয়না। আমরা তাদের কথাই বলি, আমাদের প্রচলিত রুচির সঙ্গে যারা মিলে যায়। যারা প্রতিষ্ঠানের ভাষায় অনুবাদযোগ্য। যারা আলোচনায় সুবিধাজনক। যারা আমাদের আরাম নষ্ট করে না। আর যারা ভাষাকে বিপজ্জনক করে তোলে, যারা অর্থকে অনিশ্চিত করে, যারা পাঠকের অলসতা ভেঙে দেয়, যারা নিজের জীবনকেও সামাজিকভাবে অস্বস্তিকর করে ফেলে তাদের আমরা দূরে সরিয়ে রাখি। মৃত্যুর পরে বলি, তারা অনন্য ছিল। কিন্তু অনন্য মানুষের জীবন অনেক সময় খুব কষ্টের হয়। এই কথাটা আমরা ভুলে যাই।

ইচক দুয়েন্দে ছিলেন বাংলা ভাষার ভেতরের এক গোপন অসুখ। এই অসুখ আমাদের স্বাভাবিকতার মিথ ভেঙে দিয়েছিল, আমাদের জাগিয়ে রেখেছিল। রাজশাহীর সেই বাড়িটি আমাদের মনে করিয়ে দেবে, এখানে একজন মানুষ থাকতেন, যিনি প্রচল ভাষার ভেতরে অন্য এক পৃথিবী বানাতে চেয়েছিলেন। যিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমাদের ভাষায় নয়; নিজের তৈরি করা, অচেনা, অদ্ভুত ভাষায়। আমরা হয়তো তা বুঝিনি। কিন্তু আগামী পৃথিবীর মানুষ নিশ্চয়ই সেই ভাষা বুঝবে।

তার মৃত্যু শোকের, কিন্তু তার জীবন দাবি রেখে যায় বাংলা সাহিত্যকে আরও সাহসী করো। ভাষাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে দাও। অস্বস্তিকর লেখকদের পাশে দাঁড়াও। জীবিত শিল্পীকে মৃত্যুর আগেই পড়ো।

মৃত্যুর পর ফুল দেওয়া সহজ। জীবিত অবস্থায় অন্ধকার ঘরে গিয়ে বসা কঠিন।

ইচক দুয়েন্দের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি শ্রদ্ধা হলো তাকে ফিরিয়ে আনা পাঠে, আলোচনায়, পুনর্মুদ্রণে, স্মরণে, বিতর্কে। তাকে কিংবদন্তির নিরাপদ কুয়াশায় হারিয়ে ফেললে চলবে না। তার বই হাতে নিতে হবে। তার প্রতীকী ভাষার সামনে বসতে হবে। তার অস্বস্তিকে গ্রহণ করতে হবে। তাকে বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে যদি ব্যর্থও হই, সেই ব্যর্থতাকে সম্মান করতে হবে। কারণ বড় শিল্প সবসময় আমাদের জয়ী করে না, কখনও আমাদের বিনম্র করে।

শামসুল কবীর কচি, ইচক দুয়েন্দেকে আমরা হয়তো যথেষ্ট ভালোবাসতে পারিনি। যথেষ্ট পড়িনি। যথেষ্ট পাশে থাকিনি। তাকে কিংবদন্তি বলেছি, কিন্তু মানুষ হিসেবে ছুঁতে পারিনি। এই দেরিতে বলা স্বীকারোক্তি তার কাছে পৌঁছাবে কি না জানি না। তবু বলতে হয়, তিনি বাংলা ভাষার সেই দুর্লভ মানুষদের একজন, যারা ভাষার জন্য নিজের জীবনকে সহজ হতে দেননি।

ইচক দুয়েন্দে চলে গেছেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া অন্ধকার নিভে যায়নি। সে অন্ধকার এখন আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আর আমরা, এতদিন পরে, প্রথমবারের মতো তার চোখের দিকে তাকাতে শিখছি।

Thursday, May 21, 2026

উপনিবেশ চট্টগ্রাম নিয়ে দূরবর্তী দুই টেলি প্রতিক্রিয়া

‘উপনিবেশ চট্টগ্রাম’ নিয়ে পাঠকের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আজকাল কিছু লিখি না। কারণ গত পাঁচ বছরে পাঠকের কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে এত বেশি বার্তা পেয়েছি যে সেগুলো প্রকাশ করতে গেলে আস্ত একটা বই হয়ে যাবে। তবু সাম্প্রতিক দুটো অভিজ্ঞতার কথা না বলে পারছি না। বলার আগে একটু ভূমিকা নিচ্ছি। কারণ আমি এইসব প্রশংসা একা ভোগ করতে চাই না। আরো কয়েকজনকে ভাগীদার করতে চাই, যারা এই বইটা প্রকাশের সাথে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন। এটার সাথে যারা জড়িত ছিল তাদের সাথে আমার সম্পর্কটা এত আন্তরিক যে লেখক-প্রকাশক সম্পর্ক জাতীয় কিছু ছিল না তাতে। প্রকাশক মইনুল ভাই ছাড়া বাকী সবাই বয়সে আমার ছোট এবং সম্পর্কটা ছোট ভাই-বোনের মতো। সবাই এত আন্তরিক ভূমিকা রেখেছিল যে আমার মনেই হয়নি আমি জীবনের প্রথম বইটা প্রকাশ করতে যাচ্ছি। প্রথম বই প্রকাশের সময় নতুন লেখকদের যেসব হ্যাপা পোহাতে হয়, আমাকে তার বিন্দুমাত্রও হয়নি। বলা ভালো, মেইলে পাণ্ডুলিপি পাঠানো বাদে আমি কিছুই করিনি। ওরাই যা করার করেছে, যেখানে যতটা দরকার তার চেয়েও বেশি করেছে।

পেছনের কারিগরেরা সবাই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। তবু এবার আমি একটু স্বজনপ্রীতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই কয়েকজনের নাম প্রকাশ করছি। চারজনের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। কবি-অনুবাদক-সাহিত্যিক মাহমুদ আলম সৈকত, মুয়ীন পার্ভেজ, আসমা বীথি এবং দেবাশীষ মজুমদার। এরা প্রত্যেকে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং সাহিত্য সংস্কৃতির জগতে জাতীয়ভাবে পরিচিত-সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। আমি বরং তাদের প্রত্যেকের চেয়ে অনেক কম পরিচিত। তবু আমার প্রথম কাজ ‘উপনিবেশ চট্টগ্রাম’ নিয়ে এরা এমন আবেগ নিয়ে কাজ করেছে যেটা নজিরবিহীন। ফলে এই বইটা নিয়ে যত প্রশংসা আসে তার অর্ধেক আমি এদেরকে দিতে চাই। এদের কারণেই বইটা মানুষের কাছে পছন্দনীয়ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। সৈকত-বীথি দম্পতি ছিল সবার আগে। যেহেতু আমরা পারিবারিকভাবে পরিচিত ছিলাম, সে কারণে সৈকতই আমাকে কাজটা দেবার জন্য প্রথম অনুরোধ করে। পরবর্তীতে পুরো কাজটা সে-ই সমন্বয় করেছে। তাদের সাথে ছিলেন দেবাশীষ মজুমদার। মূল্যবান সব পরামর্শ তিনিই দিয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন কাজটা করেছেন মুয়ীন পার্ভেজ। পৃথিবীর যে কোনো প্রকাশনীর সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং শক্তি হলো সম্পাদনা। মুয়ীন এই কাজটা এত ভালভাবে করেছে যে আমি নিশ্চিত বইটা মুয়ীনের কাজের কারণেই পাঠক বইটা পছন্দ করেছে। তো… এইসব কৃতিত্বের কোনো প্রতিদান হয় না। কৃতজ্ঞতাতেই সীমাবদ্ধ থাকলাম।

ভূমিকা শেষ। এবার আসল ঘটনায় যাই। যে দুটো অভিজ্ঞতা লিখতে বসেছি। কোনো নাম না বলে শুধু গল্প দুটো বলি।

১.
এক সকালে আমার মোবাইলে একটা মেসেজ আসলো। পাঠিয়েছেন আমার শুভাকাঙ্ক্ষি দেশের প্রথম সারির একজন সাহিত্যিক। তিনি আমাকে মেইল চেক করতে বললেন। তাঁর এক সাহিত্যিক বন্ধু কানাডা থেকে আমাকে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন দুদিন আগে। কিন্তু কোনো জবাব পাননি। তাই তিনি আমার ফোন নাম্বার চেয়ে নিয়েছেন। আমি যেন ফোনটা ধরি।
 
অবাক হলাম খুব। মেইলের জবাব দিতে আমার কখনো ১২ ঘন্টাও দেরি হয় না। আমার সব কাজকর্ম মেইলে। তবু কিছু একটা সন্দেহ হওয়ায়, আবার মেইল খুলে স্প্যামবক্সে গেলাম। ঠিক যা ভেবেছিলাম। ওখানে পড়ে আছে মেইলটা। তখুনি সেই ভদ্রলোকের মেইলের জবাব দিলাম। মেইলের জবাব দিতে না দিতেই হোয়াটসঅ্যাপে একটা কল আসলো। সেই ভদ্রলোক ফোন করেছেন কানাডা থেকে। নিজের পরিচয় দিলেন। তারপর যে কারণে ফোন করেছেন সেটা বললেন। মেইলেও সেটা লিখেছিলেন। শুনে আমি প্রায় বাকহারা।

ব্যাপার হলো, গত বছর অক্টোবর মাসে তিনি ইউটিউবে আমার একটা সাক্ষাৎকার দেখেছেন। ডেইলি স্টারে দেয়া ভূমিকম্প বিষয়ক একটা ভিডিও। ওটার সূত্রে তিনি আমার একটা বইয়েরও সন্ধান পান। বইটার নাম উপনিবেশ চট্টগ্রাম। কয়েক মাস পর তিনি এক আত্মীয়ের মাধ্যমে দেশ থেকে বইটা সংগ্রহ করেছেন। বইটা হাতে পেয়ে পড়ে ফেললেন। পড়ার পর তাঁর এত ভালো লেগেছে তিনি আমার সাথে যোগাযোগ করার উপায় খুঁজতে থাকেন। অবশেষে তিনি তাঁর চট্টগ্রাম নিবাসী সাহিত্যিক বন্ধুর কাছ থেকে আমার ইমেইল নিয়ে চিঠি লিখেছেন। চিঠির জবাব না পেয়ে ফোন করেছেন। ইতিহাস নিয়ে তাঁর প্রচুর পড়াশোনা। ভারতবর্ষের এবং পৃথিবীর বিখ্যাত অনেক বইপত্র পড়েছেন। সেগুলো নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আলাপ হলো। সেই আলাপের মধ্যে তিনি আমার সদ্যপঠিত বইটাকে উপমহাদেশের এমনসব বিখ্যাত বইয়ের সাথে তুলনা করেছেন, সেগুলোর নাম প্রকাশ করারও সাহস করি না। আপ্লুত হয়ে শুনে গেলাম শুধু। আর শুকনো ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করলাম। পরদিন দেখলাম, কুরিয়ারে একটা প্যাকেট এসেছে। তিনি আমার জন্য তাঁর সম্পাদিত একটা আন্তর্জাতিক পত্রিকা পাঠিয়েছেন ঢাকার কাউকে বলে। তিনি আমাকে অনুরোধ করেছিলেন সেই পত্রিকায় লিখতে। লেখক তালিকায় যাদের নাম দেখলাম, তাদের পাশে বসার যোগ্যতাও আমার নেই।

তার কিছুদিন পর দ্বিতীয় আরেকটি ঘটনা।

২.
ইউরোপের একটা দেশ থেকে অচেনা নাম্বারে আমার হোয়াটসাপে একটা ফোন এলো। পরপর দুবার এবং দুটোই ভিডিওকল। আমি এমনিতেই অচেনা ফোন রিসিভ করি না, তার ওপর ভিডিও কল ধরার প্রশ্নই ওঠে না। ফোন না ধরার কারণে অচেনা লোকটা একটা টেক্সট মেসেজ দিয়ে অনুরোধ করলেন আমি যেন সময় পেলে তাঁকে একটা কলব্যাক করি। ওটা দেখে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। কারণ আমি কিছুদিন ধরে হ্যাকারের যন্ত্রণায় আছি, এই লোকটা নিশ্চয়ই সেই দলের কেউ। আমার অধিকাংশ হ্যাকারের ঠিকানা থাকে ইউরোপে। তাই প্রথম কাজ হিসেবে আমি বিনা দ্বিধায় নাম্বারটা ব্লক করে দিলাম।
 
তারপর মেসেজটা মুছতে গেলাম। কিন্তু মোছার আগে কৌতূহলী হয়ে প্রোফাইল ছবিটা দেখলাম। একজন বয়স্ক মানুষ। রবিশঙ্করের মতো চেহারা। সেতার বাজাচ্ছেন মনে হলো। ছবিটা আসল কিংবা নকল জানি না। যুগটাই তো ভেজালের। তবু কি মনে করে মেসেজ মোছার কাজটা ঘন্টা দুয়েকের জন্য মূলতবী রাখলাম। কারণ ভদ্রলোকের নামের শেষে যে টাইটেল সেটা আমাকে একটু সংশয়ে ফেলেছে। আমি সেই নাম্বার আর নামটা কপি করে আমার বিশ্বস্ত কয়েকটা সোর্সে খবর লাগালাম। কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে খবর পেলাম, উনি নকল লোক নন। সত্যি সত্যি আছেন।
এবার আমি তাঁকে আনব্লক করে মেসেজ দিলাম, ‘আপনাকে আমি চিনতে পারছি না। কিন্তু কী বিষয়ে কথা বলবেন জানালে পরদিন সময় করে ফোন করবো’। তিনি সাথে সাথে জবাব দিলেন, আমার একটা বই নিয়ে কথা বলবেন। আমি পরদিন একটা নির্দিষ্ট সময় দিলাম।
 
পরদিন ঠিক সেই সময়ে তিনি ফোন করলেন। ফোন করেই এমনভাবে কথা বলতে শুরু করলেন, যেন আমি তার বহুদিনের চেনা। তাঁর ফোন করার কারণও ‘উপনিবেশ চট্টগ্রাম’। বললেন বইটা তিনি কারো মাধ্যমে দেশ থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন। দুদিন আগে পড়তে শুরু করেছেন। মাত্র ৫৬ পৃষ্ঠা পড়েছেন, তাতেই নাকি এত আপ্লুত হয়েছেন যে আমার সাথে কথা বলার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন।
 
এই ভদ্রলোকও নানা প্রশংসায় ভাসিয়ে দিলেন। আমি সাধারণত কারো প্রশংসার জবাব দিতে পারি না। চুপ করে থাকি। অভদ্রতা হয়ে যায়, তবুও। কি বলবো ভেবে পাই না। শুধু আস্তে করে জানতে চাইলাম, এই বইয়ের খবর তাকে কে দিয়েছেন। তিনি অন্য মহাদেশে থাকা তাঁর এক আত্মীয়ের কথা বললেন। যিনি কিছুদিন আগে বইটা পড়েছেন। বুঝলাম, সেই কানাডা প্রবাসী সাহিত্যিক। আমি এই বইটা নিয়ে অনেক প্রশংসা শুনেছি। কিন্তু তাঁর উচ্ছ্বাস আমার অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। দেশে তাঁর প্রতিষ্ঠিত একটা সংগঠন আছে, তিনি ওদের মাধ্যমে বইটা প্রচার করার জন্য যা করা দরকার সব করবেন।(তিনি অতি উচ্ছ্বাসে আমার জন্য যেসব পুরস্কার পাবার কথা বললেন যেখানে নোবেল ছাড়া বাকী সব পুরস্কার আছে)।
 
যাই হোক, আমি সংগঠন এবং প্রচার এই দুটো বিষয় থেকে একশো হাত দূরে থাকি। তাই বিনীতভাবে অপারগতা জানালাম। তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে আলাপ শেষ করলাম। পরে তাঁর নামটা গুগলে সার্চ দিয়ে আরেকটু বিস্তারিত জানলাম। তিনিও চট্টগ্রামের বিখ্যাত এক সাহিত্যিক পরিবারের সন্তান। তাদের বাড়িতে সত্তর দশকে জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যান্ডদল। তিনি সেই দলের প্রতিষ্ঠাতা চার সদস্যের একজন। মজার ব্যাপার হলো সেই বাড়িটার মাত্র দুশো গজ দূরেই আমার বাসস্থান। ফোন রেখে অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম, ৭৫+ একজন মানুষ এখনো বইপত্র নিয়ে ২৫ বছর বয়সী তরুণের মতো উচ্ছ্বাস দেখান কিভাবে?
অভিজ্ঞতা দুটো লিখে না রাখলে অকৃতজ্ঞতা হয়ে যায় বলে একটু আত্মপ্রচার করলাম।
..............
ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে অচেনা পাঠকের এই উচ্ছ্বাসগুলোর মতো বড় উপহার আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু তাঁদের দুজনের পরিচয় উহ্য রেখে বইয়ের পেছনের সবটা কৃতিত্ব দিলাম আমার সেই সুহৃদদের। যাদের কারণে আমি 'লেখক' নামটা সংগ্রহ করেছি।





Monday, May 4, 2026

১৬ আগষ্ট ১৯৪৬ এবং অতঃপর

 ভারতবর্ষের ইতিহাসের কালো একটা দিন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো তার আগের দিনের সংবাদপত্র পড়ে বোঝার উপায় ছিল না পরদিনই এমন একটা ভয়ানক ব্যাপার ঘটতে চলেছে। ১৬ আগষ্ট পুরো পাতা জুড়ে দৈনিক যুগান্তরের বিশাল শিরোনাম ‘প্রাক-সংস্কার যুগের দীর্ঘমেয়াদী বাংলার রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির আদেশ’। 





এটা বিরাট একটা খবর। কেননা এই আদেশে মুক্তি পেয়েছিল চট্টগ্রাম বিদ্রোহের প্রধান আসামীরা। দ্বিতীয় শিরোনামে ছিল ‘মি. জিন্নার সাথে পণ্ডিত নেহেরুর সাক্ষাৎ’। দুটো সংবাদই গুরুত্বপূর্ণ। আগে চট্টগ্রাম বিদ্রোহের ঘটনাটা নিয়ে যুগান্তর কি লিখেছে দেখা যাক।


“বাঙ্গলার প্রাক-সংস্কার যুগের গনেশ ঘোষ, অনন্ত সিং, অম্বিকা চক্রবর্তী ইত্যাদি ৩০ জন রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তির আদেশ দেওয়া হইয়াছে। গতকল্য বৃহস্পতিবার বঙ্গীয় ব্যবস্থা পরিষদে প্রধানমন্ত্রী মি: সুরাবর্দী তাঁহার পূর্ব্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উপরোক্ত ঘোষণা করেন। অপর একটি প্রশ্নোত্তরে তিনি জানান যে, আগষ্ট বন্দীদের সম্পর্কেও তিনি বিবেচনা করিতেছেন।”


এই সংবাদের পাশে অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলার বিবরণ ছাপানো হয়েছে। 

"...আজ হইতে ১৬ বছর পূর্বে ১৯৩০  এর ১৮ এপ্রিলে ইষ্টার ছুটিতে রাত্রি দশটার সময় একদল যুবক যুগপৎ চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার, টেলিগ্রাফ অফিস এবং পুলিশ ব্যারাকে আক্রমণ করে এবং তাহাদের আক্রমণের ফলে সমগ্র সরকারী শাসন ব্যবস্থা স্তব্ধ হইয়া যায়। এই কাহিনী প্রকাশিত হইলে দেশবাসী এমন কি সরকারী কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত প্রথমে বিশ্বাস করিতে পারেন নাই যে এইরূপ ব্যাপার সম্ভব। এমন কি তদানীন্তন লাটসাহেব স্যার স্ট্যানলি জ্যাকসন একজন খ্যাতনামা নেতার নিকট বলিয়াছিলেন যে অসন্তুষ্ট পুলিশ বাহিনী এই কাণ্ড করিয়াছে।  ১৮ এপ্রিলের পরদিন আক্রমণ কারীদের অন্যতম সহকর্ম্মী হাসপাতালে মৃত্যুর সময় যে জবানবন্দী দেন তাহাতে কর্তৃপক্ষ প্রকৃত ব্যাপার জানিতে পারেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বৃটিশ শক্তি চঞ্চল হইয়া উঠে।…….”


 ‘মি. জিন্নার সাথে পণ্ডিত নেহেরুর সাক্ষাৎ’ শিরোনামে ২য় সংবাদটিও গুরুত্বপূর্ণ। সেই সংবাদেও ছিল আশার বাণী। সমঝোতার কথা।


কিন্তু ৩য় পৃষ্ঠায় আরেকটা শিরোনাম। যেটাকে তখনো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। তাতে লেখা ছিল-

১. ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস সংঘর্ষ দিবস নয়’। উপশিরোনাম: ‘জিন্না মুসলমানদের শান্ত ও শৃংখলা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন’। 


মুসলমানদের শান্ত থাকার আহবান জানালেন কেন জিন্না? সেই সংবাদের নীচে ছোট্ট দুটো সংবাদ। 

২. ‘১৬ আগষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি’ 

৩. ‘১৬ আগষ্ট ট্রাম ধর্মঘট’। 


এখন আমরা জানি ১৬ আগষ্ট কলকাতায় ভয়ানক একটা দাঙ্গা হয়েছিল। এই সংবাদগুলোর মধ্যে এমন কোনো প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত আছে যে পরদিন কিছু ঘটবে?


পরের কয়েক দিনের সংবাদপত্র জুড়ে ছিল সেই দাঙ্গার নানা ভয়ানক ঘটনা। স্বাভাবিকভাবেই চট্টগ্রাম বিদ্রোহের মুক্তি পাওয়া বন্দীরা হারিয়ে গেল সংবাদপত্রের পাতা থেকে।










Sunday, April 26, 2026

বিপরীত সংবাদ

কখনো কখনো একেকটা সুসংবাদের বিপরীতে পাঁচটা দুঃসংবাদ লুকিয়ে থাকতে পারে।
আজ একসাথে পেলাম খুব কাছের মানুষের তিনটা দুঃসংবাদ। বাকীগুলো হয়তো কোথাও অপেক্ষা করছে।

যতই বলি এইসব কুসংস্কারের বিশ্বাস আমার নেই, কিন্তু সংবাদগুলো পিছু ছাড়ছে না।

তবু, যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ......

Tuesday, April 21, 2026

সম্মাননা পদক: পেছনের কথা

আমার মতো একজন অপরিচিত মানুষকে কিভাবে পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করা হলো সেটা আগে জানা ছিল না। নির্বাচক কমিটির একজন আমার বইপত্র পড়ে মুগ্ধ হয়েছেন। তিনি সিটি কর্পোরেশনের এডিসি,  ম্যাজিস্ট্রেট রক্তিম চৌধুরী। আমার সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে। তিনি তাঁর ফেসবুক পোস্টে পরদিন বিষয়টা খোলাসা করেছেন। আমাকে এবং আরো তিনজনকে কিভাবে তিনি সুপারিশ করেছেন। লেখাটা তুলে রাখলাম এখানে।

****************************

আজকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন স্বাধীনতা পদক ও সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। এই কাজে নির্বাচক কমিটির মেম্বার হিসেবে দারুণ অভিজ্ঞতা হলো!
স্বাধীনতা সম্মাননায় ১১ জন/প্রতিষ্ঠানকে এবং সাহিত্য পুরস্কারে ৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়। এবার দারুণ সব মানুষ পুরস্কার পেয়েছেন। অনেক ক্যাটাগরি নির্বাচনে আমি দর্শকের ভূমিকায় থাকলেও আমার পরিচিত এবং ইন্টেরেস্টের ক্যাটাগরিতে আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, যাতে যোগ্য লোক সম্মাননা পান। ভাল লাগার বিষয়, বেশ কয়েকটা ক্যাটাগরিতে আমার পছন্দের মানুষই নির্বাচিত হন!🤗🤗
আমার ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির জায়গা থেকে ৪ জনকে নিয়ে আলাদা করে বলতে চাই..
প্রথমত, চিকিৎসাক্ষেত্রে: ডা. এম এ ফয়েজ স্যার। বাংলাদেশে শুধু না, এই দক্ষিণ এশিয়াতেই এক কিংবদন্তী ডা. এম এ ফয়েজ স্যার। অত্র অঞ্চলের সাপ ও এন্টিভেনম নিয়ে গবেষণার পাইওনিয়ার ফয়েজ স্যার! সম্ভাব্য অনেক নামের মধ্যে আমি স্যারকে নিয়ে বেশি মাতামাতি করায় আজকের অনুষ্ঠানে স্যারের সাথে যোগাযোগ, রিসিভ-সবকিছুর দায়িত্ব আমার ঘাড়েই এসে পড়ে! গ্রীষ্মের নিদারুণ দাবদাহের মধ্যেও এই দায়িত্ব আমার কাছে ছিল সুশীতল বাতাসের মত! দারুণ ছিল সেই অভিজ্ঞতা!!❤️🌿
দ্বিতীয়ত, প্রবন্ধ ও গবেষণায়- হারুন রশীদ ভাই। ইদানীং আমরা বুঁদ হয়ে আছি উনার লেখনীতে। এবং চট্টগ্রামকে নিয়ে একটা ফাটাফাটি লাগিয়ে দিবো এই স্বপ্নে বিভোর, যার মূলেই আছে 'চিত-তৌত-গং', 'উপনিবেশ চট্টগ্রাম' এইসব অসাধারণ সৃষ্টি। এই ক্যাটাগরির আলোচনায় উনার নাম সাজেস্ট করার পরে যখন দেখি ভাগ্য কিছুটা সুপ্রসন্ন, তখন আমি তুরন্ত মনিরুল মনির ভাইয়ের মাধ্যমে হারুন ভাইয়ের বায়োডাটা এনে পেশ করি। এরপর যখন ফাইন্যালি উনি সিলেক্টেড হলেন, এতো ভাল লেগেছে কি বলবো! উনার সাথে আলাপের ছুতো খুঁজছিলাম, আজ অনুষ্ঠানের ফাঁকে সেই কাজটি মন ভরে করে নিয়েছি! তবে অনেক কাজ করা বাকি হারুন ভাই!!🤗🌿🙏
তৃতীয়ত, কথাসাহিত্যে- জাহেদ মোতালেব ভাই। যখন এই ক্যাটাগরি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, তখন চোখ বন্ধ করে ভাবছিলাম, চট্টগ্রামের কার কার লেখা আসলে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নামের মধ্যে এই নামটিই কেন জানি মনে ধরে! বায়োপিক-টিক জোগাড়ের পর উনি সিলেক্টেড হলেন; কিন্তু খেল শুরু এরপর। গত দুইদিন কি যে প্যারার ভেতর দিয়ে যে গেছে! এ ফোন করে তো, ও রাগারাগি করে! কি বিষয়? উনি কোন সময় বঙ্গবন্ধু-কে নিয়ে একটা বই লিখেছিলেন! উনি কিভাবে এই পুরস্কার পান? এ নিয়ে ফেসবুক, মেয়র মহোদয়ের নাম্বারে প্রচুর আপত্তি-বিবাদ-সমালোচনা! আমি বার বার বলতে চেষ্টা করেছি, এবং চট্টগ্রামের প্রথিতযশা বেশ কয়েকজন লেখক-প্রকাশকের সুপারিশেই যে, উনার যোগ্যতার বিচারেই এই নির্বাচন! শেষ পর্যন্ত মেয়র মহোদয় নিরপেক্ষ অবস্থান বজায়ে দৃঢ়চিত্ত থাকেন। এবং আজকের অনুষ্ঠানে মেয়র মহোদয় নিজেই সেই ঘটনা সবার সামনে তুলে ধরে বলেন, সত্য-নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে আমাদের এই পুরস্কার নির্বাচনের চেষ্টা! এই অভিজ্ঞতা অনেকদিন মনে থাকবে!
পরিশেষে, এবারের সম্মাননায় যে নির্বাচনটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিয়েছে, সেই নামটি বলি! বুলবুল আকতার (চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অবদান)।
কী? চিনতে পারছেন না তো! বুলবুল আকতার চট্টগ্রামের এক বিশেষ ধারার গান 'অঁলা' গানের কিংবদন্তী বিস্মৃতপ্রায় শিল্পী। উনার স্বামী বিখ্যাত রশিদ কাওয়ালের লেখনীতে উনারই গাওয়া বিখ্যাত গান,
অ কালাচান গলার মালা..
পেট ফুরেদ্দে তুয়ার লাই!!
ইদানীং অঁলা গান নিয়ে খুব মেতেছিলাম। ফলে আমি বুলবুল আকতারকে চিনি, কিন্তু উনার খোঁজ কিভাবে পাই? তানিম বদ্দা>আরকান>রাফসান গালিব>জিহান>রাফসান গালিব এই ক্রমে উনাকে খুঁজে বের করে আমরা শেষ পর্যন্ত উনাকে নিয়ে আসতে সক্ষম হই আজকের অনুষ্ঠানে। দারুণ মজার মানুষ ইনি!
জিহান তো উনাকে এক সেকেন্ডও চোখের আড়াল করে নাই! কাজীর দেউড়ি মোড় থেকে স্টেজে এনে, অনুষ্ঠান শেষে নিজের হাতে চা খাইয়ে (উনি বাচ্চার মত খুশি হয়ে উঠেন চা পেয়ে), আবার ফেরার গাড়ির জন্যে কোতোয়ালি-তে পৌঁছে দিয়ে আসে!
উনাকে কেউ চিনতেন না, কিন্তু অনুষ্ঠানে আসার পরে কিছু নিভৃতচারী মানুষ, যাদের আমি চিনি-ই না, আমাকে মন থেকে ধন্যবাদ জানিয়ে যান, উনাকে নিয়ে আসায়!
তখনি বুঝি, মানুষকে যিনি আনন্দ দিতে পারেন, তার একটা চেনাপরিচয়ের চোরা স্রোত সবসময়-ই চলতে থাকে! বুলবুল আকতারও তেমন একজন মানুষ!
খুব শীঘ্রি উনার গান সামনাসামনি শুনবো, এই প্রত্যাশায় আজ শেষ করি!
বি.দ্র. লম্বা লেখা ধৈর্য ধরে পড়ায় অসংখ্য ধন্যবাদ!
আর এই মানুষগুলো নিজের গুণেই গুণান্বিত! আমাদের নির্বাচন-অনির্বাচনে উনাদের মত মানুষের কিছুই যায় আসে না! উনাদের সম্মাননা প্রদানের সুযোগে আমরা নিজেরাই আসলে সম্মানিত ফিল করছি! আর এই লেখা সম্পূর্ণরূপে আমার ব্যক্তিগত তৃপ্তির জায়গা থেকে লেখা! দোষত্রুটি মার্জনীয়!🙏🌿

[১৯ এপ্রিল ২০২৬]

***

গত দুই বছরের সাহিত্যের পদক তালিকা:

কথাসাহিত্যে
২০২৫: প্রফেসর আসহাব উদ্দীন (মরণোত্তর),
২০২৬: জাহেদ মোতালেব

প্রবন্ধ ও গবেষণায়
২০২৫: প্রফেসর ড. সলিমুল্লাহ খান,
২০২৬: হারুন রশীদ

শিশুসাহিত্যে:
২০২৫: মিজানুর রহমান শামীম,
২০২৬: সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার

কবিতায়:
২০২৫: জিললুর রহমান
২০২৬: শাহিদ হাসান

অনুবাদে
২০২৫: ফারজানা রহমান শিমু।
২০২৬: নাই

গীতিকবিতায়:
২০২৫: নাই
২০২৬: ড. আবদুল্লাহ আল মামুন

Sunday, April 19, 2026

একটি পুরস্কার প্রাপ্তির অভিজ্ঞতা

স্থানীয় পর্যায়ে সরকারী পুরস্কারগুলোর প্রতি আমার একটু অভক্তি আছে। কারণ এগুলো দেয়ার প্রক্রিয়াটা সুন্দর হয় না। একটা বিশৃংখল হযবরল পরিস্থিতির মধ্যে যেনতেনভাবে অনুষ্ঠান করা হয়। ফলে পুরস্কার পাওয়ার কথাটা ফেসবুকে ফলাও করে প্রচার করতে যতটা আরাম, অনুষ্ঠানে গিয়ে পুরস্কারটা হস্তগত করা ততটা আরাম হয় না। জানতাম, তবু গেলাম বইমেলার মাঠে। পরিবারের কয়েকজন সহকারে। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পুরস্কার নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পুরস্কারের নাম স্বাধীনতা সম্মাননা পদক। বলা যায় এটা চট্টগ্রামের স্থানীয় স্বাধীনতা পদক(তবে ভুলেও তাকে জাতীয় পদকের সাথে তুলনা করা ঠিক হবে না)। আমাকে নির্বাচিত করা হয়েছে গবেষণা প্রবন্ধে অবদান রাখার জন্য।

আমি খুব অবাক হয়েছি পুরস্কারের খবর শুনে। যতটা অবাক হয়েছে তার চেয়ে আশঙ্কিত হয়েছি। কারণ লেখালেখির মাঠে আমি একেবারেই নতুন খেলোয়াড়। পুরোনো খেলোয়াড়েরা আমার এই পুরস্কারপ্রাপ্তি ভালোভাবে নেবে না। এটাই স্বাভাবিক। আমি নিজেকে এই পুরস্কারের জন্য উপযুক্ত মনে করি না। সবচেয়ে বড় কথা আমি লেখালেখি করি নিজের আনন্দের জন্য। পাশাপাশি এটাকে পেশাদার পর্যায়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা। কিছু বাড়তি আয় উপার্জন হলে ক্ষতি কি। আমাকে কেন নির্বাচিত করা হয়েছে, কারা এটা করেছেন বুঝতে পারছিলাম না। আমার শুভাকাঙ্ক্ষী লেখক সাহিত্যিক প্রকাশক যারা চট্টগ্রামে আছেন তাঁদের কারো কাজ এটাই অনুমান করলাম। কিন্তু কেউ সেটা স্বীকার করছে না। 

পুরস্কার নেবার খানিক আগে জানলাম কারা এই কাজটা করেছে। আমার লেখালেখি আন্তরিকভাবে পছন্দ করে তেমন একজন আছেন সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচক কমিটিতে। তিনিই আমার নামটা প্রস্তাব করেছেন। আমাকে দেখে তিনি এসে পরিচয় দিলেন। আগে কখনো আলাপ হয়নি তাঁর সাথে। তিনি শুধু ফেসবুকে যুক্ত আছেন, এটুকুই। এরকম অচেনা মানুষ যখন শুধু বই দিয়ে আমাকে এমন সম্মান জানায় তখন সত্যিই আপ্লুত হতে হয়। আমি সরকারী পদকের চেয়ে পাঠকের এই ভালোবাসাকে অনেক বেশি মূল্যবান মনে করি। 

কিন্তু অল্পদিনের লেখালেখির জীবনে এমন প্রাপ্তি সত্যি বাড়াবাড়ি। মাত্র পাঁচ বছর আগে আমার প্রথম বই প্রকাশ হয়েছে। গত তিন বছরে মুড়ি-মুড়কির মতো আমার ৮টা বই প্রকাশ হয়ে গেছে। যদিও এগুলো অনেক আগের কাজ। আস্তে ধীরে করে যাচ্ছিলাম। কিভাবে যেন লোকের চোখে পড়ে গেলাম। পাঠক পছন্দ করলো। পুরস্কারও এসে গেল। টাকাপয়সা রয়েলটিও কম আসেনি। একদম প্রথম বই থেকে সবগুলো বই চুক্তি করে রয়েলটি এডভান্স নিয়ে পেশাদারিত্বের সাথে প্রকাশ করেছি। পাঠকের ভালোবাসা, প্রকাশকের সম্মানী এবং সরকারী স্বীকৃতি- এই তিনটা বিষয় এত অল্প সময়ে পাওয়া যে কোনো লেখকের জন্য ভাগ্যের ব্যাপার। আমার কাছে মনে হয় এটা একটা অলৌকিক ব্যাপার। অথবা অনেক লম্বা সময় ধরে চলতে থাকা স্বপ্নদৃশ্য, ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখবো, আসলে কোথাও কিছু নেই।

গতকাল আমার একটা শোকের দিন ছিল। আমার জীবনের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুটা মারা গেছে আগের দিন রাতে। গতকাল ঢাকায় ওর জানাজা-দাফন হয়েছে। আমার যাওয়ার উপায় ছিল না। তার মধ্যেই আমাকে পুরস্কার নিতে যেতে হয়েছে। হাসিমুখে স্টেজে ফটোসেশান করতে হয়েছে। মানুষের জীবনটা মাঝে মাঝে এত স্ববিরোধী!

পুরস্কার নিতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে সেগুলো লিখে রাখা যাক।

***
যেখানে বসেছিলাম সেখানে একটু গরম। তবু বসে আছি। কারণ এই সারির সোফাগুলো পদকপ্রাপ্ত অতিথিদের জন্য বরাদ্দ। দুজনের জন্য বরাদ্দ সোফায় আমার পাশে সৌম্যদর্শন বয়স্ক ভদ্রলোকও আছেন। দুজনের মাঝে একটু খালি জায়গা আছে। বড় জোর ছ ইঞ্চি। মোটামুটি স্বস্তিতেই বসেছি। গরম হলেও বেশি খারাপ লাগছিল না। একটু পরেই অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে, তাড়াতাড়ি মুক্তি পাবো। পাশের ভদ্রলোকও আশান্বিত। মঞ্চের দিকে তাকিয়ে আছি।
হঠাৎ করে কেউ একজন কোনো কথাবার্তা ছাড়া আমাদের দুজনের মাঝে দুম করে বসে পড়লেন। এমনভাবে বসেছেন যেন আমাদের দুজনের কোনো অস্তিত্বই তিনি জানেন না এবং সোফায় দুজনের মাঝে যে ছ’ইঞ্চি ফাঁক ছিল সেটা কিভাবে যেন বারো ইঞ্চিতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আমাদের প্রায় কোলে বসে গিয়ে নিজের জায়গাটুকু করে নিলেন। এমন দৃশ্য লোকাল বাস বা নাজিরহাট-দোহাজারী ট্রেনে নিয়মিত। কিন্তু আইফোন হাতে স্যুটকোট পড়া অভিজাত চেহারার ভদ্রলোক কেন সেরকম আচরণ করবেন বুঝলাম না। দুম করে বসার আগে অন্তত মুখ ফুটে একটু বলতে পারতেন। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, এটা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।
অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল। কিন্তু প্রথম বক্তা মাইক হাতে নিয়েই এমন চিৎকার দিয়ে ভাষণ দিতে লাগলেন, সাউণ্ডবক্স ফেটে যেতে পারে, আমাদের কানের পর্দাও ফুটো হয়ে যেতে পারে। আমি তাঁকে চিনি না, কিন্তু পরিচয়ে লেখা তিনি একজন প্রকাশক। তাঁর উৎকট বক্তব্যের সারমর্ম হলো স্মরণকালের সেরা বইমেলাটা আয়োজন করতে পেরে তিনি চট্টগ্রামবাসীকে ধন্য করে দিয়েছেন। আমি জানি বানোয়াট কথাবার্তাই সবচেয়ে বেশি জোরে বলতে হয়। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, এমন অসত্য বয়ানও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।
পরের দুই বক্তা সরকারী কর্মকর্তা। তাঁরা পরিমিতির ভেতর অল্প সময়ে শেষ করলেন। কিন্তু পরের বক্তা এসে হঠাৎ এমন চিৎকার শুরু করলেন, আমি হতবাক। চিৎকারের জন্য না, ভদ্রলোকের পরিচয় দেখে। তিনি একটা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। তিনি এমন বিষয়ে চিৎকার করছেন, যেটা আস্তে বললেও গুরুত্ব কমে না। কিন্তু মাইকের সামনে চিৎকার করে কথা বলাও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। সেটা বিশ্ববিদ্যালের ভিসি হোক কিংবা ফুটপাতের মলম বিক্রেতা হোক।
তালিকায় গুনে দেখলাম আরো নাম রয়ে গেছে। চিৎকার আর তেল বিতরণ দুটোই সমানে চলবে আরো বেশ কিছুক্ষণ। সাথে পাশের ভদ্রলোকের চাপ, আবহাওয়ার গরম, সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম এই জায়গা ছাড়তে হবে। বিশেষ অতিথির আসন ছেড়ে পেছনে কোথাও আশ্রয় খুঁজলাম। মঞ্চ থেকে যতটা দূরে যাওয়া যায়। উঠে গিয়ে পেছন দিকে একটা খালি চেয়ার পেয়ে গেলাম। বাকী সময় ওখানেই পার করলাম।
গতকাল পদক নেবার অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা বললাম। এবার সর্বশেষ পর্যবেক্ষণটা বলি।
ভাইসব, বইমেলা রাজনৈতিক ময়দান নয়। গলার রগ ফুলিয়ে এখানে বক্তৃতা দিতে হয় না। উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে বিদঘুটে সব গান বাজনা করতে হয় না। বইমেলার সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে হয় কেন? বইমেলায় যারা যায় তারা পরস্পরের সাথে বইপত্র নিয়ে গল্পগুজব করে, আড্ডা দেয়। একটু শান্তির পরিবেশ ছাড়া এসব আলাপ জমে না। বইমেলার সাথে এই সাংস্কৃতিক উৎসব নামের উৎকট আয়োজন আমার কাছে স্রেফ শব্দদুষণ মনে হয়। মাইকের আওয়াজে কোনো স্টলে দাঁড়িয়ে বই পছন্দ করার রুচিও থাকে না। কারা এসব পরিকল্পনা করে আমি জানি না। আমার চেনা-জানা যে কজন প্রকাশক বা সিটি কর্পোরেশন কর্মকর্তা আছেন তাদের সবাই রুচিশীল মানুষ। কিন্তু তাদেরকে সম্ভবত এসব পরিকল্পনায় রাখা হয় না।


চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর শহর হিসেবে গৌরব করি। কিন্তু সেই গৌরব ম্লান করে দেয় এসব গ্রাম্যতা। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের শুধু অধঃপতনই হতে থাকবে।




***

আমি আর বেশিদিন লিখবো না ঠিক করেছিলাম। পাঠকের বিরক্তি আসার আগেই সরে যাওয়া উচিত। এখন হাতে যে দুয়েকটা প্রকল্প আছে সেগুলো লিখে শেষ করতে পারলেই হয়। এখন প্রতিটা দিনই অনিশ্চিত। কোনো না কোনো দুঃসংবাদ, ঝামেলা এসে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলে। তবু মনে মনে বলি, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ।