Sunday, October 11, 2026

ভালো বই, মন্দ বই

কোন বিষয়ে লিখলে জনপ্রিয়তা অর্জন করা যায়, কোন বিষয়ে পাঠক আগ্রহ খুঁজে পাবে এটা খুব সহজে বোঝা যায় না। লেখার মতো উপযুক্ত বিষয়বস্তু পাওয়া লেখকের জন্য ভাগ্যের ব্যাপার। আমি কিভাবে পেয়েছিলাম? আমি কি আগ থেকে জানতাম যেসব বিষয়ে লিখতে যাচ্ছি সেগুলো পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করবে? কিছুতেই না। আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না আমার বইয়ের গন্তব্য কী হবে? আমি শুধু মনের আনন্দে লিখে গিয়েছি। পাঠক যে সেগুলো পছন্দ করে ফেলেছে সেটা নিতান্তই ভাগ্য। ৯টা বই প্রকাশের পর এখন আমি ভাবতে বসেছি আসলে ঠিক পথে আছি কিনা। এখন আমি সতর্ক হবার চেষ্টা করছি। কারণ পাঠক এতদিন আমাকে ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে গেছে, এখন আর দেবে না। পুরস্কারগুলো আমাকে বিপদে ফেলবে। সমালোচকের জন্ম হবে। অদৃশ্য শত্রুও হয়তো তৈরি হয়েছে। কে জানে? 

থামতে হবে। থামা অনিবার্য। চলমান প্রকল্পগুলো শেষ হলে আর নতুন কিছু নয়। ক্লান্তি এসে ভর করেছে। পাঠক থামতে বলার আগে নিজেরই থেমে যাওয়া উচিত। লেখার আনন্দ যখন ফুরিয়ে যায়, তখন থেমে না গেলে আবর্জনার সৃষ্টি হতে শুরু করে। লিখতে হয় আনন্দের সাথে। সৃজনশীলতার মধ্যে যে আনন্দ আছে সেটার প্রকাশের সাথে পাঠকের আগ্রহের মিল থাকতে হবে। পাঠক যদি আগ্রহ হারায় তাহলে লেখকের উচিত তখনই থেমে যাওয়া। জোর করে পাঠকের মুগ্ধতা আদায় করা যায় না। পূর্ব সুনামের ভিত্তিতে পাঠককে মুগ্ধ করার চেষ্টা করা উচিত না। পাঠক প্রতারিত বোধ করলে পূর্বে আহরিত সম্মানও হুমকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে। লেখকেরা কি এসব ভাবে? নাকি নতুন বই প্রকাশের আনন্দে একের পর এক ছাপাখানার সন্তান প্রসব করতেই থাকে।


প্রকাশক কি এসব ভাবে? প্রকাশক দেখে বিক্রির সংখ্যা। পাণ্ডুলিপির গুনগত মানের চেয়ে বিক্রির পরিধি নিয়েই প্রকাশক বেশি ব্যস্ত। একটা অখাদ্য বই নিয়ে এক প্রকাশক খুব আহলাদিত হয়ে বিজ্ঞাপন করেছেন। পোস্টে যতজন লাইক দিয়েছে তার অর্ধেকও বইটা পড়েনি, কেনেনি। প্রকাশকও বইটা পড়েনি। পড়লেও বোঝার মতো ক্ষমতা নেই তার। এরকম অশিক্ষিত অন্ধ প্রকাশকের সংখ্যাই বেশি।


আরেকটি নতুন বই প্রকাশের আগে লেখককে ভাবতে হবে। বারবার ভাবতে হবে? কেন পাঠক বইটা কিনবে? এই বইটা থেকে পাঠক নতুন কী অর্জন করবে? পাঠক দুটো কারণে বই কেনে। আনন্দ কিংবা জ্ঞানার্জন। অথবা দুটোই। এ ছাড়া বই কেনার অন্য কোনো কারণ নেই। আমি কিনি না। আমাকে হয় আনন্দ পেতে হবে। বইটা সুখপাঠ্য হতে হবে। অথবা এমন কিছু থাকবে যেখান থেকে নতুন কিছু শিখবো। কিন্তু আনন্দ এবং জ্ঞানের সম্মিলন বাংলা ভাষার প্রকাশনা জগতে বিরল ঘটনা।


পাঠকের মান কেমন? খুব খারাপ। ক্রমাগত নিন্মগামী। পাঠকের রুচির নিন্মগামীতা ভালো লেখকদের জন্য বিরাট সমস্যা। বিশ বছর আগে কেউ কল্পনা করতে পারতো না পদ্মজা নামের একটা চটি মানসম্পন্ন বই বাংলাদেশে সর্বাধিক বিক্রিত বই। এটা বই জগতের দুর্ভাগ্য। একসময় বুদ্ধিজীবিরা হুমায়ূন আহমেদকে সস্তা লেখক বলতো। এখন তারা কোথায়? হুমায়ূনের ধারার লেখকদের যদি সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটতো তাহলে এদেশে এসব চটি সাহিত্যের প্রসার ঘটতে পারতো না। শিক্ষার মান পাঠকের মানকে প্রভাবিত করেছে। আশি নব্বই দশকের শিক্ষিত মানুষগুলো একুশ শতকে এসে কুপমণ্ডুকে পরিণত হয়েছে। তাদের সন্তানেরাই সেই মূর্খ পাঠকের দল ভারী করেছে।


একদল অতি আঁতেল কাজী আনোয়ার হোসেন কিংবা হুমায়ূন আহমেদকে স্বীকার করতে রাজী নয়। তারা এমনসব লেখকদের মাথায় তুলে রাখতে চায় যাদের অধিকাংশ সাধারণ পাঠকের কাছে হজমযোগ্য নয়। এতে মাঝারি পাঠকেরা বিভ্রান্ত হয়েছে। মাঝখানে জন্ম নিয়েছে বিপুল সংখ্যক অসাধু লেখক, অসাধু প্রকাশক এবং লক্ষ লক্ষ গণ্ডমূর্খ পাঠক। রকমারির শীর্ষস্থানে থাকা নামগুলোই পরিস্থিতি বোঝার জন্য যথেষ্ট। পাঁচ বছর আগেও এই তালিকা কল্পনাও করা যেতো না।


ভালো বই পড়তে হবে। ভালো বই লিখতে হবে। বাংলাদেশের বই জগতকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য আর কোনো বিকল্প নেই।


যদি সেটা সম্ভব না হয়, তাহলে কলম থামিয়ে দাও। খারাপ কিছু করার চেয়ে থেমে যাওয়া মঙ্গল।

No comments: