আবদুল্লাহ আল মাহমুদ ( ১০.৬.২০২৬)
হুমায়ূনের ভাষার গভীরতা নেই, খুব বেশি পিচ্ছিল। টানা গদ্য, এক ঢোকে গিলে ফেলা যায়। তাঁর ‘বাদশাহ নামদার’ পড়েছিলাম একদিনে। সকালে গিয়েছিলাম বাতিঘরে, এরপর যখন মাগরিবের আজান হচ্ছিল, তখন শেষ হয়েছিল।
এটি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নাকি নিরেট ইতিহাসের একটি কিতাব, তা বুঝিনি। তবে হুমায়ূনী যখন লিখেছেন, ইতিহাসাশ্রিত একটি আখ্যান মনে হয়েছে। কারণ, গল্পকে টেনে নিয়ে যাওয়া, পরিস্থিতির নিটোল বর্ণনা এবং সাবলীলতা—এগুলোই একে একটি ঐতিহাসিক আখ্যান করে তুলেছে।
এরপর আর কত দিন গেল, কত বই পড়লাম! আর এমন বই পড়া হয়ে ওঠেনি। আবার এই জনরাটা খুব প্রিয় আমার, এমন অনেক বইয়ের লিস্ট আছে। বেছে বেছে পড়তে হয়।
এরই মধ্যে একুশে বইমেলা। অনেক বই পাবলিশ হয়। উইশলিস্টে যেগুলোকে ঠাঁই দিই, তার মধ্যে ‘টাইগার পাস’ও ছিল। কারণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি, আমি চট্টগ্রামের লোক। তাই বইটির নাম ও বইটির লেখক এবং তাঁর সম্পর্কিত কিছু দক্ষতা আমাকে আগে থেকেই বশ করে রেখেছিল। লেখক পুরোদস্তুর একজন একাডেমিশিয়ান। এবং এই সময়গুলোতেই সিল্করুট ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস ‘রাশাতন’-এর কিছু অংশ পড়ে মনে হয়েছিল, না, এই লোক ভালোই লেখেন। বিশেষ করে ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাসে তিনি আরেকটু মনোনিবেশ করলে বাংলা সাহিত্যের এই ঘাটতিটা কিছুটা ঘুচে আসবে। তবে রমজানের পরবর্তী সময়ে ভর্তির জন্য প্যারা খেতে খেতে আর সুযোগ হয়নি বইটি সংগ্রহের। কিন্তু বাতিঘর আমার জন্য সত্যিই একটি আশার প্রদীপ। নাগিব মাহফুজের ‘কায়রো ট্রিলজি’র মতো ঢাউস ঢাউস উপন্যাস ওখানে বসেই খতম করা! আরও কত কী পড়েছি!
একদিন শনিবার সকাল সকাল বাতিঘরে গিয়ে ‘টাইগার পাস’ নিয়ে বসি। পড়ছি, পড়ছি। চট্টগ্রামের সামাজিক ইতিহাস, কালচার, লোকাচার; রোড, এলাকা, এলাকার মানুষ—সবই দেখতে থাকি উনিশ শতকের লেন্স চোখে দিয়ে।
ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাসে লেখক মহাশয়েরা কালচার, ভূপ্রকৃতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক দিকগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। কিন্তু এই ‘টাইগার পাস’ উপন্যাসে সচেতন পাঠক হিসেবে আমি বলতে পারি, এমন হয়নি।
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ছিল ফরিদ, যে কি না এনট্রান্স পাস করার পর আর পড়তে পারেনি পারিবারিক রক্ষণশীলতার কারণে। তাই নবীনচন্দ্র নামক একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উসিলায় তার জন্য উন্মুক্ত করা হয় আরভিন রসের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি। দ্বিতীয় প্রধান চরিত্রে থাকে ওই ব্রিটিশ ভদ্রলোকের মেয়ে অ্যামেলিয়া, যার সাথে বই-পুস্তকের আলাপ দিয়ে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এবং শেষমেশ এটা গড়িয়ে যায় প্রেমের ঝরনার দিকে।
এই বিষয়টা আরভিন রসের দৃষ্টিগোচর হয়। এবং পরে অন্য আরেক ব্রিটিশের একটি কুকুরকে মারার কারণে, যখন ওই ব্রিটিশ তদন্ত করতে দেয়, তখন ফরিদ আত্মগোপন করে কর্ণফুলী নদী ঘেঁষে গড়ে ওঠা এক জনবসতিতে, তার এক আত্মীয়ের বাড়ি।
অনেক দিন পর যখন ফেরে, তখন অ্যামেলিয়াকে আর পায় না। জানতে পারে, বাবা তাকে বিয়ে দিয়ে ফেলেছেন। ফরিদের জন্য পাঠাগারটির দরজাতেও তালা পড়ে যায়।
এরপর ভবঘুরে জীবনযাপন। একদিন পরিবারের কাউকে না জানিয়ে এক বন্ধুর সাথে সমুদ্রপথে বিদেশ পাড়ি দেওয়ার জন্য জাহাজে ওঠে। সে নিরুদ্দেশ হবে, এই শহর আর তার ভালো লাগে না।
বিপত্তি ঘটে মাঝপথে ঝড়ের কবলে। সে ভাসতে ভাসতে মালদ্বীপে পৌঁছায়। ওখানেই এক আশ্চর্য জীবন কাটাতে শুরু করে। মন্দ ছিল না ওই জীবন। তবে তার জীবনে আরেকজনের আবির্ভাব হয়—মাহানুর তার নাম।
মেয়েটির দৃঢ়চেতা বিশেষ লক্ষণীয়। ফরিদের সাথে তার বিবাহের কথা তুললে মাহানুরের বাবা বা কেউই রাজি ছিল না; কারণ দুজনেরই জীবনে বড় ধাক্কা রয়েছে। তাই তারা বন্ধুত্বের সম্পর্কই রাখে কেবল।
ফরিদ একটা পেপারের টুকরো পায় একদিন। কিছুই লেখা নেই, ভাঙা-ভাঙা কয়েকটা অক্ষর—অ্যামেলিয়া, আরভিন রস, চিটাগং... এরকম কিছু শব্দ। সে ভাবে, তাহলে অ্যামেলিয়া ফিরে এসেছে! তবে পত্রিকায় কেন প্রকাশিত হবে? হয়তো বড় লোক। এরপর সে দেশে ফেরার কথা নবীনচন্দ্রকে চিঠিমারফত লেখে। মাহানুরও যাবে—যদি সে পুনরায় দ্বীপে ফিরে না আসে এই ভয়ে। ফেরার বন্দোবস্ত হতে হতে অনেক বেশি সময় গড়িয়ে যায়। তবুও সে ফিরবে, অ্যামেলিয়া নিশ্চয়ই তার জন্য অপেক্ষা করবে। না, অপেক্ষা করবেই!
সে পৌঁছায়। আগে কার বাড়ি যাবে—নিজের নাকি অ্যামেলিয়ার? অ্যামেলিয়ার বাড়িতেই যাবে ঠিক করে। তবে মাহানুরও যে সাথে আছে, সে কি তাকে দেখে কষ্ট পাবে? না—সে মনে মনে ভাবে—অ্যামেলিয়া নিশ্চয়ই ওকে বিশ্বাস করে, এমন হওয়ার কথা নয়।
বাড়ির পুরোনো কর্মচারীরা নেই, সবই নতুন। সে ঢুকতে পারে না। এরপর এক পুরোনো কর্মচারী, যে কি না বাগানের মালি ছিল, সে ফরিদকে চেনে। তাকে ঢুকতে দেয়, বলে, “কই ছিলেন এত দিন! অ্যামেলিয়াকে বিয়ে দিয়ে ফেলেছিল জোরজবরদস্তিমূলক। সে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল আপনি চলে যাওয়ার পর থেকে। লাইব্রেরি ঘরে বসে থাকত। বিয়ের পর সে আত্মহত্যা করেছে।”
ফরিদ চোখ তুলে তাকায়। এ কী? এ কী করলাম আমি! নিঃশব্দে শুধু চোখ থেকে পানি ঝরে।
মালি জানায়, আরভিন রস স্কটল্যান্ড ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফেরার সময় শিপে তাঁর মৃত্যু হয়।
সে থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। বাড়ির নতুন কর্তা এসে তাকে বলে, “আর ইউ ফরিদ?” সে বলে, “ইয়েস।”
তাকে লাইব্রেরি ঘরে নিয়ে যায়। দেখে, তার চৌকাঠে খোদাই করে করে তার নাম লেখা—‘ফরিদ’।
সে ফিরে যায় আবার মালদ্বীপে।
এই হলো উপন্যাসের মূল কাহিনী। এবং পারিপার্শ্বিক আরও বহু ঘটনা আছে, যেগুলো এই তরকারিতে মসলা হিসেবে কাজ করেছে।
সবচেয়ে যেটা ইন্টারেস্টিং গল্প, ওটা হলো চট্টগ্রামে পাবলিক টয়লেটের সূচনা এবং একে ঘিরে জনমানুষের ক্ষোভ। একটি পর্যায়ে শহরের চার কোণের চারটি পাবলিক টয়লেটের তিনটিই পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, একটিমাত্র রক্ষা পেয়েছিল। এবং এর নির্মাণকাজের সময় এমন হয়েছে যে, আউট ডিস্ট্রিক্ট থেকে মিস্ত্রি আমদানি করতে হয়েছে।
আরও বেশি মজার বিষয় হলো এই কাণ্ডের পেছনের কলকাঠি কে নাড়ল, তাকে ঘিরে। একজনকে পেল, যদিও সে মূল হোতা নয়। তবে কে—তা জানাও ছিল না বলে তাকেই সন্দেহ করা হয়েছে। তার জন্য মামলা দায়ের করে। আসামি যে, তার পক্ষের বাদীও সে, বিপক্ষের বাদীও সে! কারণ নবীনচন্দ্র সেকালের কলকাতার সবচেয়ে বড় যে উকিল, তাঁকে আহ্বান জানান। আসতে আসতে তাঁর দেরি হয়ে যায় বেশ কদিন। তাই মজার এই কাণ্ডটি ঘটে। পরে কলকাতার ওই উকিল এলে এটারই বিরুদ্ধে আরেক অভিযোগ তুললে তার সংবিত ফেরে।
আরও এক কাহিনী জানতে পারি—অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম কলেজ, নবীনচন্দ্র জমিদার গোলচন্দ্র রায়ের দশ হাজার টাকার অর্থায়নে ফের নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেন।
উপন্যাসের এসব গল্পের মাঝেই আমি ঘুরতে থাকি চট্টগ্রামের টাইগার পাস, তার ঝরনা, কর্ণফুলী নদী, তার পাড় ধরে গড়ে ওঠা জনবসতি আর তাদের লোকাচার। কখনো চলে যাই মালদ্বীপ, আবার ফিরেও আসি। কী যে এক মোহন-সুতো দিয়ে লেখক জাল বুনেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর!
আরও অবাক করা বিষয়, বইটি শনিবার বিকেল পর্যন্ত পড়েছি ১২৭ পৃষ্ঠা। পরে বৃহস্পতিবারে যখন আবার ধরলাম, মনেই হচ্ছিল না যে নতুন কোনো বই শুরু করছি। এত লম্বা একটা গ্যাপ উপন্যাসের সাথে যায় না, অন্য জনরার বইয়ের ক্ষেত্রে যায়। মনে হয় এক সপ্তাহ যাবৎ ‘টাইগার পাস’ আবেশ মিশিয়ে রেখেছিল, তাই-ই এমন মনে হয়েছে।
এবার এটাকে ঘিরেই আরেকটা কথা বলি—
আমি সমালোচক নই, কোনো রিভিউয়ারও নই; আমি বইয়ের গল্প বলেছি কেবল। তবে লেখার শুরুতে যে হুমায়ূনকে টানলাম, কেন—তার কারণটা বলি। এটা সমালোচনা নাকি অন্য কিছু, সেটা লেখক মহাশয় ও আপনারা পাঠকেরা বুঝে নেবেন। না নিলেও সমস্যা নেই, আমি শুধু বলি।
‘বাদশাহ নামদার’ পড়ার সময় একটা শ্লথ গতি ছিল, যার কারণে আড়াইশ পৃষ্ঠার মতো বই সকাল থেকে বিকেলের ভেতর শেষ করতে পেরেছি। কিন্তু ‘টাইগার পাস’-এর ক্ষেত্রে এমন হয়নি।
তবে আরেকটা কথাও বলে রাখা ভালো, হুমায়ূন ভালো লেখক। আমি তাঁর অন্যান্য বইয়ের ক্ষেত্রে তাঁর সাবলীলতাকে দোষারোপ না করলেও সমর্থনও করি না। তবে ‘বাদশাহ নামদার’ মাস্টারপিস মনে হয়েছে, অন্যগুলোর চেয়ে।
আমার মনে হয়েছে লেখক একজন পুরোদস্তুর ইতিহাসবিদ, তাঁর কারণেই কি না একটা কঠিন গাম্ভীর্যের ছাপ পড়েছে উপন্যাসে। আবার আমার এই ভাবনাটাকে অমূলকও মনে হয়; মনে মনে বলি, আমার পাঠ-স্বল্পতার কারণেই হয়তো এমন হয়েছে। পরিশেষে, এখানের সমস্ত আলাপ আমার। ভুলও থাকবে, ধরিয়ে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব।
***