Saturday, February 28, 2026

পৃথিবীর আসন্ন বিপদ

 পৃথিবী আরেকটা বড় যুদ্ধের মুখোমুখি।

ইসরায়েল-আমেরিকা যৌথভাবে ইরান আক্রমণ করেছে আজ। এই যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে। এমনকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেরও সূচনা করতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দানব। এই দানব দুটো যতদিন জীবিত থাকবে মানবজাতি ততদিন অনিরাপদ থাকবে। এদেরকে ধ্বংস করার মতো শক্তি এখন পৃথিবীর কারো নেই। যদি কোনো ঘটনাচক্রে একটা উল্কাপাত কিংবা গ্রহাণুর আঘাতে যদি এই দানব দুটো ধ্বংস হতো।

বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যুদ্ধে না জড়ালেও ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। কয়েকদিনের মধ্যেই দেশে তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের সংকট শুরু হবে। দ্রব্যমূল্য আকাশে উঠে যাবে। আমদানী রপ্তানী সবকিছু বিপদের মধ্যে পড়ে যাবে। এই যুদ্ধ যদি সহসা না থাকে পুরো পৃথিবী দীর্ঘ সময়ের জন্য অন্ধকার দেখতে যাচ্ছে।

মসলিন স্মৃতি, এ.এল, ক্লে

"আমরা তখন কাপাসিয়া পুলিশ থানার আওতাধীন এলাকায় ছিলাম। "কার্পাস" হলো তুলার দেশীয় শব্দ; বর্তমানে জঙ্গলময় এই অঞ্চলটি একসময় নিঃসন্দেহে সেই ফসলের জন্যই পরিচিত ছিল যেখান থেকে এর নামের উৎপত্তি। আগে ঢাকা জেলায় ব্যাপকভাবে তুলার চাষ হতো, কিন্তু ম্যানচেস্টার ও অন্যান্য শিল্পকেন্দ্রের সস্তা পণ্যের কারণে সূক্ষ্ম ঢাকা মসলিন বাজার থেকে প্রায় বিতাড়িত হওয়ার পর এর চাষ অনেক কমে গেছে। ইংরেজ মিল-মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতীয় তাঁতের তৈরি সূক্ষ্ম কাপড়ের ওপর যন্ত্রচালিত পণ্যের এই জয়ে আফসোসের কিছু না থাকতে পারে; কিন্তু শিল্পপ্রেমীরা ঢাকা মসলিন, যা একসময় তার সৌন্দর্য এবং বিস্ময়কর সূক্ষ্মতার জন্য বিখ্যাত ছিল, সেই ব্যবসার এই বাস্তব বিলুপ্তিতে দুঃখ প্রকাশ করলে তাদের ক্ষমা করা যেতেই পারে।

সবচেয়ে সূক্ষ্ম বুননের মসলিনগুলো 'আব-রওয়ান' বা "প্রবাহিত জল" এবং 'শব-নম' বা "ভোরের শিশির" নামে পরিচিত ছিল, কারণ ভেজা অবস্থায় এগুলোকে জল বা শিশির থেকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব ছিল। বলা হয় যে, জাহাঙ্গীরের আমলে ১০ হাত বাই ২ হাত মাপের এক টুকরো 'আব-রওয়ান' মসলিন তৈরি করা যেত যার ওজন ছিল মাত্র পাঁচ সিক্কা বা ৯০০ গ্রেইন এবং এর দাম ছিল ৪০০ টাকা। বর্তমানে একই মাপের সবচেয়ে সূক্ষ্ম যে মসলিন তৈরি করা সম্ভব, তার ওজন প্রায় নয় সিক্কা বা ১,৬০০ গ্রেইন এবং তা ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। এই অতি সূক্ষ্ম মসলিনগুলো এখন আর অর্ডার ছাড়া তৈরি করা হয় না।" [ঢাকা, ১৮৬৬]


 "We were now in the jurisdiction of Police Thanah Kapasia. "Kapás" is the native word for cotton; and this tract, now very jungly, at one time was doubtless noted for the crop from which it derives its name. In former days cotton was extensively grown in the Dacca District, but its cultivation has been much reduced since the fine Dacca muslins have been almost driven out of the market by the cheaper goods of Manchester and other manufacturing centres. From the English mill-owners' point of view there may be little to regret in the victory of the machine-made article over the airy fabrics of the Indian hand-loom; but lovers of art may be pardoned for deploring the practical annihilation of the trade in Dacca muslins, once so famed for their beauty and wondrous fineness. Those of the most delicate texture were known by the names of áb-rawán or "running water," shab-nám or "evening dew," from the fact of their being, when wet, almost undistinguishable from either. It is said that in the time of Jehangir a piece of áb-rawán muslin could be manufactured 10 cubits by 2, weighing only five siccas or 900 grains, the price of which was 400 rupees. The finest that can be made in the present day, of the above dimensions, weighs about nine siccas or 1,600 grains, and is sold at 100 rupees. These finer kinds are not now made, except to order."

A.L. Clay (Diary from Lower Bengal) p.144


Monday, February 23, 2026

প্রাণী জীবন

 আমরা যতক্ষণ বেঁচে থাকি স্বার্থপরের মতো জীবন কাটাই। এটা অনিবার্য এক স্বার্থপরতা। টিকে থাকার জন্য প্রাণীসুলভ স্বার্থপরতা। জগতের সব প্রাণী এই স্বার্থপরতা নিয়ে টিকে থাকে। মানুষ একটু ব্যতিক্রম। বন্ধু স্বজন ভালো না থাকলে সেও ভালো থাকে না। বিষন্নতা গ্রাস করে তাকে। সেও একটু একটু ক্ষয়ে যেতে থাকে। কিন্তু যার দায়িত্বে একটা পরিবার আছে তাকে  এসব গ্রাস করলে চলবে না। টিকে থাকার জন্য তাকে স্বার্থপর হয়ে, অনেক কিছু ভুলে প্রতিদিন বাঁচতে হয়। গ্লাণি, অপরাধবোধ এসব তখন কাজ করবে না। প্রতিটি প্রাণী আসলে নিজেকেই ভালো রাখতে চেষ্টা করে। নিজের জন্যই বাঁচে। সে যতক্ষণ বাঁচুক। 

প্রবোধ দেবার চেষ্টা করছি না। কিন্তু এই সান্ত্বনাবাক্য কেবল নিজের জন্যই খাটে। কারণ যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। কঠিন অবস্থায় পড়ে গেছে আমার প্রিয় কয়েকজন মানুষ। পরিবার এবং পরিবারের বাইরে। একসময় নাম ধরে বলতাম, অমুক ভালো নেই, তমুকের এই সমস্যা। এখন সংখ্যাটা এত বেশি হয়ে গেছে, আর নাম বলা যাচ্ছে না। তখন নিজের সমস্যাকে খুব তুচ্ছ মনে হয়। মনে হয় এখনো তো পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়িনি। এখনো যুদ্ধ করতে পারছি। প্রতিদিনের যুদ্ধে যে মানসিক ও শারিরীক শক্তি দরকার, সেটা এখনো তো আছে। এখনো তো বলতে পারছি, লিখতে পারছি।


যেদিন ‘ভালো নেই’ কথাটা আর লিখতে পারবো না, সেদিনই শেষ। লেখক জীবন এবং বাস্তব জীবন, দুটোই।


Sunday, February 22, 2026

নির্বাচন এবং অতঃপর

১২ ফেব্রুয়ারী তারিখে নির্বাচনটা হয়ে গেল। কমিশন সূত্রমতে ৬০ ভাগ মানুষ ভোট দিয়েছে। আমি দুটো ভোটকেন্দ্রে গিয়েছি। লোকজনের ভিড় দেখিনি তেমন। ভোট সুষ্ঠু হয়েছে বলেই মনে হয়েছে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে। একদল মানুষ জামাতকে ক্ষমতায় বসাতে মরিয়া ছিল। আরেকদল জামাতকে ঠেকাতে মরিয়া ছিল। দুই পক্ষের চেষ্টা শান্তিপূর্ণ ছিল। তেমন দাঙ্গাহাঙ্গামা হয়নি। দুয়েকটা বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া ভালোই হয়েছে নির্বাচন। অবশেষে ২১২ আসন নিয়ে বিএনপি জোট সরকার গঠন করেছে। ৭৭ আসন নিয়ে জামাত বিরোধী দলে বসেছে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ বলে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। না হলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারতো। যাই হোক, এখন আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে যাবে?


বিএনপি ক্ষমতা নেবার পর প্রগতিশীল ফ্রন্টে আনন্দের বন্যা। কেননা গত দেড় বছর তাদের জন্য একটা অস্বস্তিকর সময় ছিল। দেশে কারো কোনো নিয়ন্ত্রন ছিল না। মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ জঙ্গীবাদী দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। প্রতিদিন নানান হুংকার শোনা যেতো। পারলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে এমন হৈ হল্লা। একদল উন্মাদের হাতে পড়ে গিয়েছিল দেশটা। এখন পাগলের দল গর্তে ঢুকে পড়েছে আপাতত। আবারো সুযোগ পেলে মাথাচাড়া দেবে। দেশ সবসময় মধ্যপন্থীদের হাতে নিরাপদ, এটাই প্রমাণিত। আমরা কখনোই উগ্রতার পক্ষে ছিলাম না। উগ্রতা একটা দেশকে কি বানিয়ে ফেলে সেটা সিরিয়া বা আফগানিস্তানের দিকে তাকালে বোঝা যায়।


কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিন্ত থাকার উপায় নেই। আমাদের চারপাশে জটিল ভূ-রাজনীতির খেলা। আমেরিকা-রাশিয়া-চীন-ভারত প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ আছে। সেই স্বার্থে আঘাত লাগলে নির্বাচিত সরকারও নিরাপদ থাকে না। আপাতত রাজনৈতিক অঙ্গন শান্ত হয়েছে। এটাও সাময়িক। ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে যাবে কদিন পরেই। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে সেটা বোঝা যাচ্ছে।


সবচেয়ে স্বস্তির কথা হলো একটা ব্যর্থ অথর্ব সরকারের বিদায়। আঠারো মাসে কাজের কাজ কিছু করতে না পারলেও অপকর্মের পরিমাণ নেহায়েত কম নয়। অনেক দেশ বিরোধী চুক্তিটুক্তি করেছে। এমন কিছু ঝামেলা রেখে গেছে যেগুলা এই সরকারকে ভোগাবে। দেশের কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে তাদের এগিয়ে আসতে দেখিনি। অদ্ভুত একটা নীরবতা ছিল যে কোনো অরাজকতার সময়। ড. ইউনুসকে নিয়ে আমি সবচেয়ে হতাশ হয়েছি। আমি রীতিমত প্রতারিত বোধ করেছি তাঁর কাজকর্ম দেখে। দেশের কোনো সংকটে তাঁর হস্তক্ষেপ দেখিনি।


Monday, February 9, 2026

টাইগারপাস: পাঠকের মতামত

একজন নন-ফিকশন লেখক যখন হঠাৎ করে ফিকশন লিখে বসে, তখন সবচেয়ে বড় শঙ্কা থাকে পাঠকদের নিয়ে। টাইগারপাস প্রকাশের আগ থেকেই সেই শঙ্কাটা ছিল। ঈদসংখ্যায় পাঠক পছন্দ করলেও বই প্রকাশের পর কী প্রতিক্রিয়া হয়, সেটা দেখার অপেক্ষা ছিল। ব্যক্তিগতভাবে যারা জানিয়েছেন তাদের সবাই ভালো লেগেছে বলেছেন। কেউ কেউ অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। যেটা আশাতীত। তবে যেহেতু তাঁদের প্রায় সবাই ব্যক্তিগতভাবে লেখককে চেনেন, সেক্ষেত্রে মতামত নিরপেক্ষ বলা উচিত হবে না।

গুডরিডসে একটা ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়। যেটাকে মোটামুটি নিরপেক্ষ বলা চলে। এখানকার পাঠক আমার অচেনা। পক্ষপাতিত্বের কোনো কারণ নেই। সে কারণে গুডরিডসের পাঠক মতামত আমি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি।

টাইগারপাসকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যায় কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। কিন্তু ঐতিহাসিক উপন্যাসের কিছু ধর্ম মেনে চলার চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন যেসব ঐতিহাসিক চরিত্র বাস্তবেই ছিল তাদের ব্যাপারে কোনো তথ্যগত অসঙ্গতি যেন না থাকে। যে প্রেক্ষাপটে গল্পটা লেখা হয়েছে সেই প্রেক্ষাপট যেন বিশ্বাসযোগ্য হয়। একটা বিষয় পরিষ্কার করা ভালো। এই উপন্যাস সিরিয়াস পাঠকদের জন্য লেখা হয়নি। আধুনিক উপন্যাসের নতুন কিছুর সন্ধান করেন। এটা শতভাগ পুরোনো ধাঁচের গল্প, আগাগোড়া সরলরেখায় বর্ণিত। যারা সিরিয়াস কিছু আশা করবেন, তাঁদের হতাশ হতে হবে। রেটিং দেখে দুয়েকজন সিরিয়াস পাঠক খুঁজে পেলাম। সবচেয়ে স্বস্তির কথা হলো মাত্র এক মাসের মধ্যে ৭টি রিভিউ, যার মধ্যে সবগুলোই পাশ মার্ক (৩-৫ তারকা) দিয়েছেন। একজন অচেনা লেখকের জন্য এটা আনন্দের ব্যাপার।

......................................................................

পাঠক রিভিউ:

রোনেল বড়ুয়া (১৪.৩.২০২৬)

“সময়ের নদীতে ভেসে আসে

বীরত্ব, হারানো স্বপ্ন আর শিক্ষা।”

সাহিত্যের উৎকর্ষ বা অপকর্ষ বিচার করে যে সম্যক আলোচনা করা হয়, তাকেই সাধারণত সমালোচনা বলা হয়। আমি সেই দায়িত্ব নিতে আসিনি। এতটুকু বোধশক্তিও আমার অদ্যাবধি জন্মায়নি। আমি শুধু একজন পাঠক, পাঠের যে রসটুকু পেয়েছি, সেটুকু ভাগ করে নেওয়ার ছোট্ট চেষ্টা মাত্র।

ঐতিহাসিক প্লটনির্ভর গল্প-উপন্যাস আমার সবচেয়ে প্রিয় পাঠধারাগুলোর একটি। তাই ‘টাইগারপাস’ পড়া যেন একপ্রকার অনিবার্যই ছিল।

চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে লেখকের গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিচয় তাঁর আগের বইগুলো পড়েই পেয়েছি। তাই চোখ বন্ধ করেই একই ভরসায় এই বইটি হাতে নিয়েছিলাম। পড়তে পড়তে মনে হলো, বইটি যেন গিলে ফেলিনি, বরং জীর্ণ করছি। যে দুই দিন বইটি পড়েছি এক ধরনের ঘোরের মধ্যে কেটেছে। এখানেই লেখকের মূল শক্তি— তিনি পাঠককে অমনোযোগী হওয়ার সুযোগ দেন না। গল্পের ভেতর এমনভাবে টেনে নেন পাঠক অজান্তেই তার ভেতর ডুবে যায়। ঐতিহাসিক মিশ্র এই উপন্যাসের শেষভাগে এসে বুকের ভেতরের ব্যথাটা যেন আরও তীব্র হয়ে ওঠে, চাপা কষ্ট নিঃশব্দে জেগে ওঠে।

গল্পের কথায় আসি— ইতিহাস থেকে ধার করা কাহিনি হলেও রাঁধুনি হিসেবে হারুন রশিদ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। চট্টগ্রামের গরম মসলায় তিনি গল্পটিকে এক বিশেষ স্বাদে রেঁধেছেন। এমনভাবে পরিবেশন করেছেন যা শেষ না করে উঠা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে বসার আসন (ভাষা) আর একটু মজবুত হলে পাঠের স্বাচ্ছন্দ্য আরও বাড়ত।

চরিত্রগুলোর বুননও ছিল বেশ চমৎকার। নবীনচন্দ্র, স্বর্ণকুমারী দেবী, উইলিয়াম জোন্স, চট্টগ্রামের অলি-গলি, সমুদ্র— সব মিলিয়ে এক জীবন্ত সমীর তৈরি হয়েছে। অচেনা নায়ক ফরিদ, নায়িকা এমেলিয়া, আর গল্পে আমার ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র মাহানুর। তার দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। চরিত্রগুলো যেন ঊর্ণনাভের মতো নিজেদের জাল বুনে ঘটনাপ্রবাহ তৈরি করেছে। কখনো তারা চট্টগ্রাম থেকে সমুদ্রপথে মালদ্বীপে নিয়ে যায়, আবার মালদ্বীপ থেকে বিভিন্ন শহর ঘুরে পুনরায় ফিরিয়ে আনে চট্টগ্রামে।

উপন্যাস লেখা নিজেই কঠিন কাজ, আর ঐতিহাসিক ফিকশন লেখা তার চেয়েও বেশি জটিল। কারণ এখানে লেখককে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। অতীতের ইতিহাস, রীতি-নীতি, প্রচলিত গান, সংস্কার-ব্যবহার, পোশাক-পরিচ্ছদ, সামাজিক ও গার্হস্থ্য জীবনের অবস্থা এসব বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না হলে সহজেই কালবিরোধী-দোষ দেখা দিতে পারে। লেখক এই বিষয়ে সচেতন থাকার যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। ভালো লাগার বিষয় হলো, কোথাও অযথা দীর্ঘ বর্ণনা নেই।

স্থানীয় আচার-ব্যবহার ও জীবনযাত্রার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতেও লেখক সচেতন ছিলেন। জীবনজিজ্ঞাসার ভেতরেও ছিল এক ধরনের গভীরতা। সব মিলিয়ে এটিকে একটি মহৎ শিল্পকর্মের আন্তরিক প্রয়াস বলেই মনে হয়েছে।

এখন আমি ‘ক্যাসান্দ্রা’ ফুলের সন্ধানে আছি। কোনো একদিন যদি সেই ফুলের দেখা পাই, তবে বাড়ির উঠোনে সেটি রোপণ করে ‘এমেলিয়া’কে উৎসর্গ করব।

জিহাদ আল ফারুক (১৫.৩.২০২৬)


ব্রিটিশ শাসনাধীন চট্টগ্রাম, ভারতবর্ষ, মালদ্বীপ ও সুদূর বিলেতের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে ইতিহাসাশ্রয়ী বইটির আখ্যান। হারুন রশীদের নন ফিকশন পড়ে যতটা ভালো লেগেছিল, সেকারণেই উনার প্রথম (জানামতে) ফিকশনটা সম্পর্কে জানতে পেরে পড়ার সিদ্ধান্ত নিতে দু'বার ভাবতে হয়নি।

রবি ঠাকুর, স্বর্ণকুমারী দেবী ও এসেছেন গল্পের চরিত্র হিসেবে। শুরু থেকেই ইতিহাস, প্রেম, পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের গল্প রোমাঞ্চকর একটি সূচনা প্রাপ্তির পর হঠাৎ করে শেষাংশে করুণ রূপ নেয়। সমুদ্র ও পাহাড়ে ঘেরা পুরো চট্টগ্রাম শহরটিকে যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম। অধ্যায়ের শুরুতে কবিতাগুলি প্রাসঙ্গিক ছিল। বাঙালি যুবক ফরিদের সাথে এমিলিয়ার অসম প্রেম ও এর পরিণতি মন খারাপ করিয়ে দেয়। পোকায় খাওয়া যে পত্রিকার টুকরো খবর পড়ে ফরিদ চট্টগ্রামে ফিরে এসেছিল, সেটির সঠিক ঘটনাও তার জানা হলো না..

ফাহাদ আমিন (২৩.৩.২০২৬)

নন ফিকশন জনরার লেখক হিসেবে হারুন রশীদ ইতিমধ্যেই খ্যাতনামা। তাই বইটা কেনার আগে ভেবেছিলাম এটাও হয়তো নন ফিকশন জনরার বই হবে। পরে পড়তে গিয়ে ভুল ভাঙলো।

একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নিয়ে বইটা লেখা। লেখক নিজে চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে দারুণভাবে অবগত হওয়ায় চরিত্রগুলোকে যেন আরও বেশি বাস্তব বলে মনে হয়েছে।

নবীনচন্দ্র সেন চরিত্রটা বাস্তবতা আছে বলে জানি। কিন্তু ফরিদ, এমিলিয়া চরিত্রগুলো কি আসলেই ছিল?

এক বসায় পড়ে শেষ করলাম বইটা। পড়া শেষ করে ভীষণ মন খারাপ হলো। মালদ্বীপ থেকে ছুটে এসেও না পাওয়ার বেদনা মনটাকে বিষন্ন করে তোলে।

মাহমুদ রাজ(২৫.৩.২০২৬)

লেখকের রাজকীয় জলদস্যু বণিক সমিতি, আর সমুদ্রপথে গ্রিস থেকে বাংলায় বই দুটো শেষ করার পর তৃতীয় বই হিসেবে টাইগারপাস পড়লাম। ইতিহাসের বাইরে এসে ফিকশন বই পড়লে হয়ত এমনেই ভালো লাগে বেশী, এই বইটাও ভালো লাগলো।

বইটার গল্পের সময় ব্রিটিশ আমলের চট্টগ্রাম শহরকে ঘিরে। বইয়ে শহরের জন্মের ঘটনাও, অর্থাৎ বদর পীর কিভাবে চাটগাঁকে মানুষের বসতিতে রুপান্তর করলেন সেই ঘটনাও রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনকালের আবার এক সময় নয়, বেশ কয়েকটা যুগের গল্প রয়েছে। এখানে চট্টগ্রাম শহরের জন্ম, বেড়ে উঠার কথা যেমন রয়েছে। তেমনি আছে এই চাটগাঁর ভূ প্রকৃতি, সাগর নদীর কোলঘেষা জনপদের মানুষদের গল্প। শাসকগোষ্ঠীর কথা ছাড়াও স্থানীয় মানুষদেরদেও কাছ থেকে দেখতে পারলাম বই থেকে। তবে এই বইয়ে উঠে এসেছে নতুন এক ভূখণ্ডের কথা। ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে মালদ্বীপ কেমন ছিল, তা এতকাল জানা ছিল না, লেখকের মাধ্যমে বেশ খানিকটা ধারণা পাওয়া গেল।

আধুনিক মালদ্বীপ কিংবা ব্রিটিশ আমলের বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশ সম্পর্কে কমবেশী জানি কিন্তু ব্রিটিশ আমলের মালদ্বীপ সম্পর্কে একদম জানাশোনা ছিল না আমার।

ইতিহাসের পথে ঘুরতে বরাবরই ভালো লাগে। সেই ভ্রমণ যদি হয় খুব প্রাণোচ্ছল তবে ত কথাই নেই। এতক্ষণ যা বললাম এগুলো বাড়তি পাওনা, বইয়ের মূল গল্প কিন্তু নয়। গল্পের মূল নায়ক ফরিদ, মূল নায়িকা এমিলিয়া। দারুণ এক ভালবাসার গল্প, দুই বই পড়ুয়ার এক হবার গল্প, কল্পনায় ভেসে বেড়ানোর গল্প, মন ভাংগার গল্প।

লেখকের মোট ৪ টা বই পড়েছি। আমার কাছে এটাই সবচেয়ে বেশী ভালো লেগেছে। ২৩,২৪,২৫ বিগত তিনটা বছর চট্টগ্রামে কাটিয়েছি, ঘুরে বেড়িয়েছি এই অঞ্চলের এমাথা থেকে ওমাথা। হয়ত এজন্যই বইটা পড়ার সময় কল্পনায় ঘুরে বেড়াতে সুবিধা হয়েছে আমার, চেনা জানা বলে কথা।

শতাব্দী ভট্টাচার্য (১৫.৩.২০২৬)

ইতিহাস বিষয়ক নন ফিকশনে হারুন রশীদ একটা উজ্জ্বল নাম সমকালীন বাংলা সাহিত্যে। তাঁর প্রকাশিত সিংহভাগ বইই আমার পড়া। টাইগারপাস ও প্রায় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই কেনা। তবে আমি আসলে জানতাম না যে এটা উপন্যাস। অবধারিতভাবে ঐতিহাসিক উপন্যাসই লিখবেন হারুন রশীদ, এতো অনুমেয়ই ছিল। তবে শুধু ঐতিহাসিক জনরায় একে ফেললে ভুল হবে, এটি অবশ্যই একটি রোমান্টিক উপন্যাসও। উপন্যাসের মূল চরিত্র ফরিদ। আগাগোড়া তাকে ঘিরেই সমস্ত ঘটনা আবর্তিত হয়েছে। ফরিদের পড়ার নেশা, আরভিন রসের মেয়ে এমেলিয়ার প্রেমে পড়া, এমেলিয়াকে হারিয়ে ফেলা, ফরিদের দেশান্তরী হয়ে মালদ্বীপে পৌঁছানো, মাহানূরের সঙ্গে আলাপ, আবার ফিরে আসা চট্টগ্রামে- মোটামুটি এই হচ্ছে মোটাদাগে গল্প। এরই ভাঁজে ভাঁজে ঐতিহাসিক ঘটনা, চরিত্র এসেছে। নবীনচন্দ্র সেন যেমন এসেছেন, তেমনি এসেছেন স্বর্ণকুমারী দেবী। মালদ্বীপ আর চট্টগ্রামের প্রাচীন সম্পর্কের ইতিহাসও এসেছে। উপন্যাসটি এক বসায় পড়ার মতো। তবে সত্যি বলতে কী, আমি একটু হতাশই৷ হারুন রশীদের কাছে কি জটায়ুমার্কা ভুল আশা করা যায়? এমেলিয়া স্বর্ণকুমারী দেবীকে চিঠিতে লিখছেন রবিঠাকুরের কথা। সাত বছর বয়সে নাকি তাঁর প্রথম লেখা ছড়া, 'জল পড়ে, পাতা নড়ে!' অথচ জীবনস্মৃতির শিক্ষারম্ভ ভাগে রবীন্দ্রনাথ নিজে লিখেছেন এই লাইনটা দ্বারা তিনি প্রথম আদিকবির সঙ্গে পরিচিত হন। এটা বর্ণপরিচয় এর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর। রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায়, 'এমনি করিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া সেদিন আমার সমস্ত চৈতন্যের মধ্যে জল পড়িতে ও পাতা নড়িতে লাগিল।' এই মারাত্মক ভুলটা পড়ে বড্ড মন খারাপ হয়ে গেছে।

[** লেখকের ব্যাখ্যা: এই ভুলটা আসলে উপন্যাসেরই একটা অংশ ছিল]

মোহতাসিম সিফাত (২৭.৩.২০২৬)

ইতিহাস কেন্দ্রিক নন ফিকশন লেখক হারুন রশিদকে ঔপন্যাসিক হিসেবে পেলাম এই বইতে। উনার কমফোর্ট জোনেই আছেন, ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা চলে একে। সকল সূত্র মেনে কিছু ঐতিহাসিক সত্য চরিত্রের সাথে কিছু কাল্পনিক চরিত্র মিলিয়ে সুন্দর এগিয়ে নিয়েছেন গল্প। ওজি ঐতিহাসিক উপন্যাস সুনীলের "সেই সময়" এর কথা মনে করে নস্টালজিক হয়ে গেছিলাম।

আধুনিক চট্টগ্রাম শহর ওই সময়ে কেমন ছিল, গল্পের ছলে এর একটা ভালো ধারণা পেয়েছি। দেশি ছোকরার সাথে বিদেশি মেমের প্রেমপর্বটা শুরুতে ইন্টারেস্টিং ছিল, তবে মাঝে উনারা যে প্রবল পিনিকে ডেলুলু হয়ে গেছিলেন, ওই পার্টটা ফাস্ট স্কিপ করে গেছি।

মূল চরিত্র ফরিদের জীবনের একটা অপ্রত্যাশিত বাঁক গল্পের ক্ষণকালীন একঘেয়েমি কাটিয়ে নতুন করে মনোযোগ দিতে বাধ্য করায়। শেষের পরিণতিটা কষ্টদায়ক হলেও ভালো মনে হয়েছে।

ওভারঅল ভালো একটা ফিল-গুড মুভির মতো উপন্যাস। প্রথম উপন্যাস হিসেবে লেখককে অভিনন্দন জানাই। পরবর্তী উপন্যাসগুলো নিয়ে উচ্চাশা রাখতেই পারি আমরা।

পাঠকের জন্যে ইম্পর্ট্যান্ট নোটিশ: বইটা পড়ার সময় ভুলেও যেন শেষ পাতাটা আগে চোখে না পড়ে। তাইলেই শ্যাষ। কঠিন স্পয়লার।

হারুন আহমেদ (১.৪.২০২৬)

হারুন রশীদের লেখা উপন্যাস, তাই সাগ্রহে পড়লাম। সূচনা - উপসংহার উভয়ই মনে রাখার মতো। কিন্তু আধুনিক উপন্যাসসুলভ বৈশিষ্ট্য লেখায় কমই পেলাম। চরিত্রগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্ব, দ্বিধা, সমস্যা সবই আমরা উপরিতল থেকে দেখি, তাদের ভেতরটার দেখা পাওয়া যায় খুব কম। এজন্য তাদের দুঃখে ঠিক দুঃখিত হতে পারি না পাঠক হিসেবে। লেখকের স্বাদু গদ্যশৈলীর গুণে অবশ্য পড়ার সময়টুকু ভালো কেটেছে। দেড়শো বছর আগের চট্টগ্রাম আর তখনকার মানুষের জীবনযাত্রার বর্ণনাও চমৎকার।

তা-রা (২১.৫.২০২৬)

বাস্তব এবং অবাস্তব বেশ কিছু চরিত্রের সমারহ এই উপন্যাসে। লেখক বলেছিলেন নন ফিকশন থেকে বেশি কঠিন ফিকশনকে দাঁড় করানো। কারণ একটি মিথ্যা জগতকে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া সহজ নয়। তবে লেখক তা করে দেখিয়েছেন দক্ষ হাতে। যদিও তা দাঁড় করাতে লেগে গেছে এক যুগ!

প্রাচীন চাটগাঁই শহরের বেড়ে উঠা রক্ষণশীল পরিবারের ছেলে ফরিদের পড়াশোনা যেন প্রায় থেমে যাচ্ছিল। বন্ধুরা কলেজের মাটি পেরোলেও ফরিদের বাবার কড়া শাসনে তাকে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হবার মতো পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছিল। তবে সেসময়ের একজন গুণী ব্যক্তি নবীনচন্দ্রের সহায়তায় ফরিদের পড়ার জগতে এক টুকরো লাইব্রেরী নামক বিলাসিতা যোগ হয়েছিল। আরভিন রসের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বই পড়ার সুযোগ। এর মাঝেই তার সাথে পরিচয় হয় স্কটল্যান্ডের এমেলিয়ার সাথে। এ যেন মেঘ না চাইতেই জল! পড়া আর প্রেমের দ্বন্দ্বে ফরিদ ফেঁসেছিল খুব বাজেভাবে। পরিবার এই প্রেম মানবে তা যেন অসম্ভব কল্পনা।

তবে এর মাঝে ফরিদের ভাগ্যে শনি হয়ে দেখা দেয় একটি কুকুর। কুকুরের মালিকের আড়চোখ হতে বাঁচতে তাকে পাড়ি দিতে হয় অন্যত্র। আর ফিরে এসে দেখে এমেলিয়া বিলেত ফিরে গেছে। তার বাবা তাকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। আর এমেলিয়ার দুঃখ ভুলতে ফরিদ পাড়ি জমায় বিলেতের পথে দেশ ছেড়ে। তবে পথিমধ্যে ডুবে যায় জাহাজ। ফরিদ ভাগ্যক্রমে পৌঁছে যায় মালদ্বীপ; কুনাহান্দু দ্বীপের অধিবাসীরা তাকে নিয়ে একপ্রকার আনন্দে মেতে উঠে কারণ সে তখনো বেঁচে ছিল। আর ভাষাগত সমস্যার জন্য ইংরেজি ভাষার ব্যবহার দেখে তারা ধারণা করে ফরিদ জাহাজের কোনো উচ্চতর কর্মকর্তা ছিল। জীবনে আবার আনন্দের দেখা মিলে। ফরিদ সেই নারকেলের দ্বীপেই নতুনভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। এবং এইবার তার দেখা মিলে মাহানুরের সাথে। সুন্দরী, গুণবতী এবং তাকে জেল থেকে বাঁচানো এই কন্যার হাত সে এক পলকে ছেড়ে দেয় যখন সে খোঁজ পায় এমেলিয়ার। মাহানুরের জন্য বড্ড আফসোস হয়। তবে শেষমেষ ফরিদ সেই ভিনদেশে থাকেনি। যে ভিনদেশে দাঁড়িয়ে সে বলেছিল কখনোই দেশে ফিরবে না সেই ফরিদ ফিরে এসেছিল এমেলিয়ার খোঁজে। চাটগাঁই শহরে আবারো ফিরে এসেছিল সে। তবে শেষটা খুব বিষণ্ণ হতো যদি লেখক পুনশ্চ না লিখতেন। মাহানুরের জন্য শেষমেষ কষ্টটা একটু হলেও কমেছিল।

পুরো উপন্যাসে ফরিদের অংশটুকু বাদ দিলেও আরো অনেককিছু ছিল যা মূলত ইতিহাস। এবং আমার মনে হয়েছে চাটগাঁইয়ের লোকদের নিজস্বতা, সংস্কৃতি, এবং কঠোরভাবে দমনের ব্যাপারগুলো চলে আসছে সেই সুদূর অতীত থেকেই। প্রথম পাবলিক ল্যাট্রিন নির্মাণ নিয়ে একটি মজার তথ্য ছিল এখানে। এবং তখনকার সেই ব্রিটিশ লোকটি চাটগাঁইয়ের লোকদের যে একতাবদ্ধের সম্মুখীন হয়েছিলেন তা অবশ্য মনে রাখার মতো। লোকজন তাকে মনে রেখেছিল ঠিকই। তবে তার বদলে যাওয়া নাম পড়ে হেসেছিলাম প্রাণখুলে।

বলা বাহুল্য, হারুন রশীদের লেখা এই প্রথম পড়লাম। আর 'টাইগারপাস' এর সাথে একটা ভালো সময় কেটেছে। বাতিঘরের ওপর ভরসাটা আরেকটু হলেও বেড়ে গেল।

মাজহারুল আলম তিতুমীর (৩০.৫.২০২৬)

টাইগার পাস। প্রিয় নগরীর পছন্দের জায়গা। নামটি উচ্চারণে চোখে ভেসে ওঠে সবুজ সুউচ্চ পথ ধরে হেঁটে চলা। কৈশোরে প্রাকৃতিক ভাবে নির্মিত দু তলা সড়ক দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তারুণ্যে যখনই কদমতলী বাস স্ট্যান্ড, চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম, সিআরবি যেতে হয়েছে, প্রত্যেকবার টাইগার পাস মোড়ে নেমে যেতাম। পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী শিরিষ গাছের ছায়ায় সুশীতল বাতাস গায়ে মেখে ইচ্ছে করেই হেঁটে গেছি। টাইগার পাস এখনো হেঁটে যেতে প্রলুব্ধ করে।
হারুন রশীদ রচিত সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস এর নাম ' টাইগার পাস ' দেখে, বইয়ের ফ্ল্যাপে প্রকাশিত লেখক পরিচিতি না পড়েই কিনে ফেললাম। সব্যসাচী মিস্ত্রীর চমৎকার প্রচ্ছদে বাতিঘর এর প্রকাশনাটি এড়িয়ে যেতে পারিনি।
হারুন রশীদ রচিত উপন্যাসটি শুধুই টাইগার পাসকে ঘিরে আবর্তিত হয়নি। চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গায় প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ও শ্রমিক নেতা এডভোকেট জানে আলমের বাড়িতে বসে কলকাতা, দ্বীপের রাজ্য মালদ্বীপ, এমনকি সুদূর বিলেত থেকে ঘুরে এলাম।
 
ঐতিহাসিক চরিত্রের সাথে সাধারণ অনেক চরিত্রের হাত ধরে ফরিদের মাধ্যমে দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্তি জাগেনি। সাধারণ অসাধারণ সব মানুষের জীবনে একাধিক ঘটনা, দূর্ঘটনা থাকে। নদীর জোয়ার ভাটার মতো কখনো ঝিমিয়ে পড়া একজন পুণরায় প্রবল জোয়ারে নব উদ্যমে জেগে ওঠে। বার বার মনোবাসনা'র অপমৃত্যু এমনকি জীবন নিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা ফরিদ সেই ঝোপের দিকে এগিয়ে গেলো।
 
" বিকেলের রোদে অদ্ভুত সুন্দর কিছু বেগুনি সাদা ফুল চারপাশ আলো করে রেখেছে। চোখ সরানো যায় না। চার বছর আগে ঠিক এই জায়গায় এসেছিল এমেলিয়াকে নিয়ে। ফরিদ নিশ্চিত ওই বেগুনি ফুলের ভেতর থেকে এমেলিয়ার নীল দুটো চোখ অপলক তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই দৃষ্টির সামনে ফরিদের বাস্তব বুদ্ধি লোপ পেয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ঘুরে তাকান পাশে দাঁড়ানো মাহানূরের দিকে। নির্জীব এক বোধ শূন্যতা নিয়ে সে ভাবছে এই মেয়েটা কে ? ওর চোখ থেকে জলের ধারা নামছে কেন ? "
 
যেখানে উপন্যাসের সমাপ্তি হলো সেখানে শিবাজির একটি গানের কথা মনে পড়ে গেলো।
" ঝড়ো হাওয়ায় দীপ জ্বালানোইতো জীবন
শুকনো নদীতে নৌকা চালানোইতো জীবন "

ছোট ছোট পর্বে রচিত ' টাইগার পাস ' উপন্যাসে উনিশ শতকের ঐতিহাসিক ঘটনা ও চরিত্রগুলো মূর্ত হয়েছে।
সভ্যতা কতখানি সভ্য ও মানবিক হলো সেই প্রশ্ন বিব্রত করে। তথাপি এই সভ্যতা বিনির্মাণে কত মানুষের মেধা শ্রম ও কঠিন আত্ম প্রত্যয় জড়িয়ে রয়েছে। নারী শিক্ষা তখন কল্পনাতীত বিষয় ছিল। মুসলমান পরিবারে পুরুষ সন্তানদের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা ছিল।
 
১৮৭১ সালে চট্টগ্রাম জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রাস পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে পাস করার গৌরব অর্জনে বাড়ি বাড়ি মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছিল।
" কিন্তু ফরিদের বাবা ছেলেকে কলেজে পড়াতে রাজি নন। তিনি বলে দিয়েছেন কাজী বাড়ির ছেলে হয়ে সে এন্ট্রাস পর্যন্ত পড়েছে সেটাই ঢের বেশি। ইংরেজ এর পড়াশোনা গোলামির প্রশিক্ষণ। খাঁটি মুসলমান কখনো ইংরেজ এর গোলাম হতে পারে না। "

সমাজ পতি রক্ষণশীল মওলানা পিতার সন্তান ফরিদ বাবার অবাধ্য হতে পারেনি। কলেজে ভর্তি হতে না পারলেও জ্ঞানার্জনের নেশা তাকে তাড়া করে বেড়ায়। চাটগাঁ শহরের তরুণ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রট নবীন চন্দ্র সেন স্কটিশ শিক্ষক আরভিন রসের ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে গিয়ে ইচ্ছে মতো বই পড়ার দুর্লভ সুযোগ করে দিলেন। শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তারে উৎসাহী নবীন চন্দ্র সেন অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম কলেজ পুণরায় চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নিজেকে পাড়ি দিতে হয়েছে কঠিন পথ পরিক্রমা।
 
আরভিন রসের লাইব্রেরিতে নিয়মিত পড়তে গিয়ে পরিচয় ঘটেছিলো বই পড়ুয়া এমেলিয়ার সাথে। বই বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ আলাপ আলোচনা তাদের কেবল নির্জন পাঠকক্ষে ঘুরপাক খায়নি, স্বাভাবিক ভাবেই সেই সম্পর্ক গভীর প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। সুশিক্ষিত দুই তরুণ তরুণীর প্রেমালাপ আর দশ জনের চেয়েও অনেক ভিন্ন। মুগ্ধ করে। জীবনের নাটকীয়তা সেই সুন্দর পরিচ্ছন্ন সম্পর্ককে পূর্ণতার দিকে যেতে দেয়নি ! জীবনের বাস্তবতা যেমন গল্পকে ছাড়িয়ে যায়, তেমনি গল্পও কখনো জীবনকে ছাড়িয়ে যায়। এমেলিয়া আত্মহত্যা করেন।







Saturday, February 7, 2026

পেশাদারিত্ব কী

পেশাদারিত্ব।

এই শব্দটা অনেকে বোঝেন না। মনে করেন এটা কেবল পেশা সংক্রান্ত কোনো বিষয়। মানে যিনি যে পেশায় আছেন সেই পেশার দক্ষতা। ধারণাটা আংশিক সত্যি, কিন্তু পুরো ব্যাপারটা একটু আলাদা। পেশাদারিত্ব মানে হলো আপনার যে কাজটা যখন করা দরকার আপনি সেটা ঠিকমত করতে পারছেন কিনা। পাড়ার মুদি দোকানদার থেকে কোম্পানির সিইও পর্যন্ত এটা বিস্তৃত হতে পারে। পেশাদারিত্ব না থাকলে লোকে আপনার সাথে কাজ করে আনন্দ পাবে না। এটা না থাকলে মুদি দোকানী কাস্টমার পাবে না, কোম্পানির সিইও কর্পোরেট দক্ষতা দেখাতে পারবেন না। পেশাদারিত্বের প্রধান উপাদান হলো অডিয়েন্সের প্রতি আপনার আচরণ এবং মনোভাব। অডিয়েন্সটা কী? সেটা আপনার কাস্টমার হতে পারে, আপনার সহকর্মীও হতে পারে কিংবা আপনার ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ হতে পারে।

সহজে বোঝানোর জন্য আমাদের পাড়ার দুটো মুদি দোকানের উদাহরণ দিচ্ছি। দুটো দোকানই একইরকম জিনিসপত্র পাওয়া যায়। দুটো দোকান পাশাপাশি অবস্থিত। ধরা যাক একটা দোকান চালায় হাবিল, অন্যটা চালায় কাবিল। আমি একসময় হাবিলের দোকান থেকে কেনাকাটা করতাম। বছরখানেক আগে কাবিলের দোকানটা খোলার পর আমি কাবিলের দোকানে বেশি কেনাকাটা করি। কারণ হাবিল পুরোনো হলেও কাবিলের দোকানে গিয়ে আমি আরামবোধ করি।
কিন্তু সেই আরামের উৎস কী? খুব বেশি কিছু না। কাবিলের হাসিমুখ। আন্তরিকতা। আমি তার দোকানে ঢুকলেই সে কিভাবে আমার সন্তুষ্টি অর্জন করবে সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সবচেয়ে ভালো জিনিসটা দেবার জন্য নিজ থেকে এগিয়ে আসে। ওর দোকানে যেটা থাকে না সেটা পাশের দোকান থেকে এনে দেয়। অর্থাৎ আমি কাবিলের দোকানে গেলে নিশ্চিন্ত হয়ে যাই এখানে সব পাওয়া যাবে।
অথচ হাবিলের দোকানে জিনিসপত্র সব থাকলেও এই ব্যবহারটা নাই। সেও অধিকাংশ সময়ে হাসিমুখে কথা বলে, আদাব সালাম দেয়। কিন্তু মাঝে মাঝে সে অচেনা আচরণ করে। এই 'মাঝে মাঝে' অন্যরকম আচরণ আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে। যেমন, আমার চেয়ে বড়লোক কোনো ক্রেতা তার দোকানে ঢুকলে সে আমার দিকে তাকানোর প্রয়োজনও বোধ করে না। আমি গিয়ে গোবেচারার মতো দাঁড়িয়ে আছি, সে বড়লোক কাস্টমার নিয়ে ব্যস্ত।
ওই কাস্টমার বিদায় হলে সে আমার কাছে জানতে চায়, কি লাগবে? আমি ততক্ষণে খুব বিরক্ত হয়ে গেছি। মুখ ফুটে কিছু না বলে চুপচাপ জিনিস নিয়ে চলে এসেছি। এরকম কয়েকবার ঘটার পর ওর দোকানে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছি।
কাবিল এদিক থেকে ব্যতিক্রম। তার দোকানে যে লেভেলের কাস্টমারই ঢুকুক, সে সবার কাছে একবার একবার জিজ্ঞেস করে ফেলবে কি লাগবে, কেন এসেছেন? ওখানে গিয়ে বোকার মতো কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না।
এটাকেই বলে পেশাদারিত্ব। এই পেশাদারিত্বের কারণে পাশাপাশি একই জিনিস বিক্রি করেও হাবিল বসে বসে মাছি মারে, আর কাবিলের দোকানে মৌমাছির মতো ভিড় থাকে দিনরাত। মজার ব্যাপার হলো, মাত্র দুবছর আগেও কাবিল ছিল হাবিলের দোকানের সামান্য কর্মচারী। এখন সে কাবিলের চেয়ে অনেক ব্যস্ত ব্যবসায়ী। হাবিলের অবস্থান সমাজের উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ অংশে, কাবিলের অবস্থান সমাজের নিন্মশ্রেনীতে। কিন্তু পেশাদারিত্বের অভাবে উচ্চ মর্যাদা নিয়েও হাবিল পরাজিত হয়েছে কাবিলের কাছে।
হাবিলের ব্যবসাটা গড়ে তুলেছিলেন তার অর্ধশিক্ষিত বাবা, তিনি সমাজের নীচ থেকে উঠে এসেছিলেন। তিনি যখন দায়িত্বে ছিলেন তখন ওটা পাড়ার সবচেয়ে জমজমাট দোকান ছিল, তিনি ওপরে ওঠার জন্য পেশাদারিত্বের চূড়ান্ত করেছেন। কাস্টমারদের মন জয় করার সব কায়দা করেছেন। তাঁর শিক্ষিত পুত্র দায়িত্ব নেবার পর ব্যবসায় ধ্বস নেমেছে। ছেলেটা বুঝতে পারেনি তার বাবা কোন পেশাদারিত্ব দিয়ে ব্যবসাটা দাঁড় করিয়েছিল। বাবা যেখানে পাড়ার সেরা দোকানটা চালিয়েছিল, পুত্র আসার পর টিকে থাকতেই হিমশিম খাচ্ছে।
আমি দোকানীর উদাহরণ দিয়ে পেশাদারিত্ব ব্যাখ্যা করলাম। কিন্তু এই উদাহরণ আমাদের সমাজের সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কর্পোরেট অফিস, পত্রিকা, প্রকাশনা, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, থানা, পুলিশ, আদালত, সচিবালয় সর্বত্র।
আরেকটা উদাহরণ দেই। লেখালেখির সূত্রে আমি বিভিন্ন পত্রিকা, প্রকাশনা, লেখক সম্পাদকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হয় দেশে কিংবা বিদেশে। এখানেও আমি পেশাদারিত্বের এই পার্থক্যটা টের পাই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের অভাব এত প্রকট যে তাদের সাথে আমি কাজ করতেই আগ্রহী নই। আমি খুব বেছে বেছে প্রকাশক বা পত্রিকা নির্বাচিত করি। পেশাদার নয় এমন কাউকে আমি কাজ দেই না। এসব ক্ষেত্রে আমি যে বিষয়টাকে গুরুত্ব দেই সেটা হলো মেইল/মেসেজের রেসপন্স। আমি যখন কাউকে মেসেজ দেই, সেটার জবাব আশা করি। আমার অধিকাংশ কাজ বা যোগাযোগ মেইলেই হয়। খুব জরুরী না হলে আমি মেসেঞ্জারে কাউকে নক করি না। মেইল বা মেসেঞ্জারের জবাবের ধরণ দেখে আমি বুঝতে পারি ইনি পেশাদার কিংবা অপেশাদার। যদি যৌক্তিক সময়ে জবাব না পাই, তখন আমি ধরে নেই তিনি পেশাদার নন। তার সাথে আমার কাজ হবে না। আমি অনেক প্রতিষ্ঠানকে বাতিল করেছি শুধুমাত্র এই একটা কারণে। পাওনা টাকা ফেরত না দেবার চেয়েও এটা আমার কাছে গুরুতর ব্যাপার।
বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা ঘটে বলে আলাদা করে বলতে হচ্ছে। এদেশে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অপেশাদার বিষয় হলো মেইলের জবাব না দেয়া কিংবা প্রাপ্তি স্বীকার না করা। এটা আমি আরো অনেকবার বলেছি। অনেককে মেইল পাঠানোর পরে মেসেঞ্জারে গিয়ে কিংবা ফোন করে বলতে হয় আপনাকে মেইল দিয়েছি। এটা কি ইচ্ছাকৃত কিনা জানি না। অন্যপক্ষের অবস্থা তো জানার উপায় নেই। অনেকে হয়তো নিয়মিত মেইল চেক করেন না। কিন্তু ব্যস্ততা কোনো অজুহাত হতে পারে না। আমার আগের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় দৈনিক শতাধিক মেইলের জবাব দিতে হতো আমার। কোনো মেইল ২৪ ঘন্টা জবাব না দেয়া ছিল অপরাধের সামিল। দুর্ভাগ্যজনক হলো মেইলের জবাব না দেবার এই বিষয়টা বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেই দেখেছি। অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে এটা খুব কম ঘটেছে। একদম অচেনা কেউ হলেও জবাব পেয়েছি। বাংলাদেশিদের মতো কখনো লা-জওয়াব অবস্থা দেখিনি।
এই দুটো ব্যক্তিগত উদাহরণ দিয়ে আমি আসলে একটা জাতীয় সমস্যার কথা বলতে চাই। আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক গুরুতর সমস্যা আছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা নিরাপত্তা ইত্যাদি। কিন্তু তার সাথে আরেকটা যুক্ত হওয়া উচিত। পেশাদারীত্বের অভাব।
আমাদের সবগুলো সেক্টরে পেশাদারিত্বের অভাব এত বেশি সেটার বিস্তৃতি নিয়ে বলাই মুশকিল। আইন- আদালত থেকে সচিবালয়ের অফিসপাড়া, ডাক্তার- হাসপাতাল থেকে বাজারঘাট, নাজিরহাট থেকে দোহাজারি, টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, পতেঙ্গা থেকে কালুরঘাট সবখানে একই অবস্থা। পেশাদারিত্ব আমাদের নৈতিকার একটা অংশ। নৈতিকতা নিজের জীবন থেকে শিখতে হয়। স্কুল কলেজে এটা পড়ানো হয় না। আপনি যতই শিক্ষিত হোন, যতই অভিজ্ঞ হোন না কেন, আপনার মধ্যে যদি পেশাদারিত্ববোধ না থাকে তাহলে কোনো কিছুতে আপনি উন্নতি করতে পারবেন না।
কথার মাঝখানে একজন বলে উঠলেন- পেশাদারিত্ব জিনিসটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে দেন।
বললাম, নিজের দায়িত্বটা আন্তরিকতার সাথে পালন করার নামই পেশাদারিত্ব।
আমাদের সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশের মধ্যে পেশাদারিত্ব নেই। কেন নেই? কারণ আমরা যারা সাধারণ মানুষ বলে পরিচিত, আমরাই তো সরকারের সেইসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। আ্মাদের মধ্যেই পেশাদারিত্ব নেই। ওইসব প্রতিষ্ঠানে কিভাবে থাকবে? ওখানে তো আমাদের মতো মানুষেরাই কাজ করে। কিছু ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। কিন্তু সেই ব্যতিকর্মী মানুষগুলো টিকতে পারে না কুৎসিত সিস্টেমের কারণে। সেই সিস্টেম কি কখনো বদলাবে? আশাবাদী হবার মতো কোনো লক্ষণ এখনো দেখিনি।
তাই বলে আপনি কি হাল ছেড়ে দেবেন? আমি হাল ছাড়িনি। আমি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। নিজেকে জয় করেছি। তারপর আপনাদের বলছি। হ্যাঁ, রাস্তায় নেমে ভাঙ্গচুর বিপ্লব করার চেয়ে এটা অনেক বেশি কঠিন। তবু অসম্ভব নয়। চেষ্টা করে দেখুন। লেগে থাকুন। ব্যর্থ হতে হতে আপনি সফল হবেন একদিন। আমার বিশ্বাস আপনি পারবেন। নেহায়েত আপনি যদি না পারেন আপনার সন্তানকে শিক্ষাটা তুলে দিন। তাহলে এখন না হলেও পঞ্চাশ বছর পরের বাংলাদেশটা বদলাবে।

আমি কেন উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলাম?

আমি নন-ফিকশন লেখক। আমার লেখালেখির মূল ফোকাস ইতিহাস। কিন্তু মাঝে মাঝে আমি কিছু গল্প লেখার চেষ্টা করেছি। সেগুলো নিছক অবসর কাটাবার উদ্দেশ্যে। তার মধ্যে কিছু গল্প লিখেছি গল্পের ছলে ইতিহাসকে পাঠকের কাছে তুলে ধরার জন্য। আরো বহুবছর আগে, আমি একটা উপন্যাস লিখতে বসেছিলাম। সেটা কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ ছিল না। আমি নিতান্তই অপরিচিত লেখক, আমার লেখা উপন্যাস পড়ার পাঠক পাওয়া যাবে না বলে আমি শতভাগ নিশ্চিত। তবু আমি সেই উপন্যাসটি লিখতে চেষ্টা করছিলাম বহুবছর ধরে। অর্ধেক লেখার পর থেমেও গিয়েছিলাম। প্রায় অর্ধযুগ ফেলে রাখার পর আবার যখন শুরু করলাম তখন আর আগের মতো এগোতে পারছিলাম না। না পারার কারণ ছিল আমি এখানেও গল্পের ছলে ইতিহাস গেলানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু যে সময়কাল নিয়ে আমি কাজটা করতে যাচ্ছিলাম সেই সময়কালের ঘটনাগুলোকে সমন্বয় করতে গিয়ে একটা ঝামেলার মধ্যে পড়ে গেলাম। আমার গল্পের চরিত্রগুলো কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে জড়িত ছিল। সেই ঘটনাগুলো সত্যি ঘটেছিল। আমার উপন্যাসের চরিত্রগুলো সেখানে উপস্থিত ছিল। সমস্যা হলো তাদের উপস্থিতিকে বাস্তবসম্মত করার জন্য সময়কালকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন তার ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে। সেখানে গিয়ে আমি মুশকিলে পড়ে গেলাম। উপন্যাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে আমি যে বয়সে উপস্থাপন করেছিলাম, সেই ঘটনার মধ্যে তাকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে হাজির করা যাচ্ছিল না। তাই গল্পটা বারবার হোঁচট খেতে খেতে থেমে গিয়েছিল। আমার দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও আটকে গেল সেখানে। আরো চার বছর পর আমি একদিন এক নির্ঘুম রাতে কীবোর্ড নাড়াতাড়া করতে করতে নতুন একটা গল্প লিখতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ লেখার পর অনুভব করলাম আমি আসলে নতুন গল্প লিখছি না। পুরোনো গল্পটাকে আমি নতুন একটা স্রোতের সাথে মিলিয়ে দিয়েছি। আমার উপন্যাসের নদী এবার এমন একটা গতি পেল এক যুগ আটকে থাকা গল্পটা কথা বলতে শুরু করলো। একটানা কয়েক মাস লেখার পর আমি আমার পছন্দের গন্তব্য খুঁজে পেলাম। উপন্যাসটির সমাপ্তিরেখায় পৌঁছে আমাকে চমকে দিল। কারণ আমি নিজেও এই সমাপ্তির কথা ভাবিনি। এটা উপন্যাসের নিজস্ব গতিতে, নতুন স্রোতের সাথে মিলেমিশে তৈরি হয়েছে। আমার করার কিছু ছিল না। শেষ করার পর ওটা একটা ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হলো। আমার আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত করে পাঠক সাদরে বরণ করলো গল্পটাকে। জীবনের প্রথম ফিকশন নিয়ে আমি আনন্দিত। সেটাই শেষ নয়। পত্রিকায় প্রকাশের পরপর কয়েকজন প্রকাশক যোগাযোগ করলেন গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার জন্য। আমি তখনো স্থির করিনি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা উচিত হবে কিনা। কাকে দেয়া উচিত। গ্রন্থাকারে প্রকাশের জন্য উপন্যাসের পরিধি আরেকটু বাড়ানো দরকার। হাতে যথেষ্ট সময় ছিল। প্রকাশক ঠিক হবার পর সময় নিয়ে উপন্যাসটাকে চূড়ান্ত করলাম। খুব বেশি কাজ করার ছিল না। মাঝখানে বাদ দেয়া কিছু পর্বকে যোগ করা ছাড়া মূল গল্প অক্ষুন্ন আছে। ২০২৬ সালের বইমেলায় প্রকাশ হতে পারে। এখনো ঘোষণা করা হয়নি। প্রকাশকের কাজ শেষ হলে ঘোষণা আসবে। কিন্তু জীবনের প্রথম উপন্যাস প্রকাশের প্রাক্কালে নিজেকে প্রশ্ন করছি, উপন্যাসের কাজটা পাঠক কিভাবে গ্রহন করবে? আমার ৮টা বই প্রকাশিত হয়েছে গত কয়েক বছরে। সবগুলোই নন-ফিকশন। আমাকে ফিকশন লেখক হিসেবে পাঠক মেনে নেবে? এই জায়গাটা সত্যি খুব অনিশ্চিত। ইতিহাস লিখে যেটুকু সুনাম অর্জিত হয়েছে সেটা হুমকির মধ্যে পড়বে কিনা তাও ভাবতে হচ্ছে। আমার লেখক জীবনে এখনো পাঠকের কাছ থেকে কঠিন কোনো সমালোচনার মুখোমুখি হইনি। কমবেশি ভালো ভালো কথাই শোনা গেছে। আমার যোগ্যতার তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু ফিকশন লিখে সমালোচনার ধাক্কা সামলাতে হলে আমার আসল কাজগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আমার হাতে আরো দু-তিনটি কাজ রয়ে গেছে, যেগুলো শেষ করার পর লেখক জীবনের ইতি টানার কথা। সেই কাজগুলো ঠিক সময়ে করা যাবে কিনা এখন বলা যাচ্ছে না। এই বছরটা আরো অনিশ্চিত। অনেক কিছুই ঘটতে পারে। পত্রিকায় প্রকাশের সময় পাঠক যেভাবে সাদরে গ্রহন করেছে, গ্রন্থাকারে প্রকাশের পর যদি সেই সমাদর না করে তাহলে হতাশ হওয়া উচিত হবে? অনেক বড় লেখকেরাও নিজের উপন্যাস নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেন না। পাঠকের কাছ থেকে সবসময় সমাদর পান না। তাই বলে তারা লেখা থামিয়ে দেন?


আমার আশঙ্কা অন্য কারণে। আমি প্রথম উপন্যাসটি প্রকাশের আগেই আরেকটি উপন্যাসের কাজে হাত দিয়ে ফেলেছি। সেটিও এবার একটা  পত্রিকার ঈদসংখ্যায় প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। ওই উপন্যাসের কথা তেমন কেউ জানে না। প্রকাশের আগে কাউকে বলতে চাই না। প্রথম উপন্যাস প্রকাশের পর সাড়া পাওয়া না গেলে লেখক নিশ্চিতভাবে চুপসে যাবেন। ঈদসংখ্যার উপন্যাসটা নিয়ে আশাবাদী হবার কোনো সুযোগ থাকবে না। কারণ সেই উপন্যাসটি ভিন্ন চরিত্রের হলেও ইতিহাস জড়িয়ে আছে প্রথমটার মতো। আকারে বড় না হলেও ইতিহাসের পরিমাণ প্রথমটার চেয়েও বেশি। পাঠক পরপর দুবছরে দুটো উপন্যাস কিভাবে হজম করবে? 


অসন্তুষ্ট পাঠক যদি জিজ্ঞেস করে, আপনাকে দ্বিতীয় উপন্যাস লেখার আশকারা কে দিয়েছে?


আমি বলবো, ইতিহাস। এই ইতিহাসটা আমি নীরস তাত্ত্বিক উপায়ে উপস্থাপন করার বদলে গল্পের আশ্রয় নিয়েছি। গল্পটা বেড়ে গেলে উপন্যাসে রূপান্তরিত হয়েছে। সেই রূপান্তর কতটা সার্থক হলো সেটা বোঝার জন্য আরো দু’মাস অপেক্ষা করতে হবে। তার আগে নিজের জন্য একটা সান্ত্বনাবাক্য রেখে যাই।


"Ever tried. Ever failed. No matter. Try again. Fail again. Fail better."

Samuel Beckett, Worstward Ho (1983)


Friday, February 6, 2026

দেশ, মানুষ, রাজনীতি বিবিধ ভাবনা

১.
রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানো ছেড়ে দিয়েছি বহু বছর আগে। এই দলকানাদের দেশে রাজনীতির মাঠে বিচরণ করে ভণ্ড আর বুদ্ধি প্রতিবন্ধীরা। কিন্তু দেশ নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবতে বাধ্য হই। কারণ দেশের সাথে আমার অস্তিত্বের প্রশ্ন আছে। আমাদের জীবন একরকম কেটে গেছে। এখন আমার সন্তানদের পালা। ওদের জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে এইসব ভণ্ড আর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী রাজনৈতিক কর্মীদের কারণে। আমি নিশ্চিত সংখ্যায় তারা বেশি নয়, কিন্তু তাদের দাপটে সারা দেশ কাঁপে। কারণ তারা শক্তি প্রয়োগে নিজ নিজ মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মতবাদেরও কোনো ঠিক নেই। নিজেই নিজের মতবাদের বিপরীত আচরণ করে। যে আচরণ অন্য দলের কাছ থেকে অন্যায় বলে মনে করা হয়, নিজেরাই আবার সেই আচরণ করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। সুবিচার বা ন্যায়বিচার এই কথাগুলো সত্য হয় তখনই, যখন সেটা নিজের পক্ষে যায়। টিভি, পত্রিকা কিংবা সোশাল মিডিয়াতে যতটুকু দেখা যায় তাতে মনে হয় আমাদের জীবনটা আর কখনো শান্তির দেখা পাবে না। প্রতিটি দলই পরস্পর মারমুখী। কেউ কাউকে সহ্য করছে না।

আগামী সপ্তাহে একটা নির্বাচন আছে। সেই নির্বাচন নিয়ে আমি দেশে আবারো নতুন করে একটা অস্থিরতার আশঙ্কা করছি।

গত পনের বছর নির্বাচনে শুধু আওয়ামী লীগ থাকতো। যেনতেন করে একটা নির্বাচন প্রহসন করে নিজেদের ক্ষমতা রিনিউ করতো। এবার তার শাস্তিস্বরূপ আওয়ামী লীগ নিজেই খেলা থেকে আউট। বাকী আছে বিএনপি, জামাত এবং অল্প কিছু ছোট দল। মূল খেলা বিএনপি এবং জামাতের মধ্যে। কে জিতবে?

অনুমান করা হচ্ছে বিএনপি জিতবে। কারণ দেশে ওদের সমর্থনই বেশি। দীর্ঘদিন ক্ষমতা বঞ্চিত দলটা। কিন্তু বিএনপির অনেক দুর্নাম আছে। দলটির সমর্থক থাকলেও সাংগঠনিক দুর্বলতা অনেক বেশি। সেই তুলনায় জামাত অনেক শক্তিশালী। তাই এবার জামাত জিতে যাবার সম্ভাবনা আছে। তার চেয়েও বড় কথা হলো জামাতের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ক একটা গুজব শোনা যাচ্ছে। যদি ওটা সত্যি হয় তাহলে বিএনপি হেরে যাবে। জামাত সরকার গঠন করবে, বিএনপি বিরোধী দলের চেয়ারে বসবে। ব্যাপারটা কেমন শোনাচ্ছে? খুব অবাস্তব মনে হচ্ছে? মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এরকম কিছু মেনে নেবার জন্য আমাদের তৈরি থাকতে হবে।

জামাত ক্ষমতায় আসলে দেশে কী কী পরিবর্তন আসতে পারে? ওরা কথায় কথায় ইসলামী বিপ্লবের শ্লোগান দেয়। নির্বাচনে জিতলেও কী সেই শ্লোগান দেবে? আমার মনে হয় না। নির্বাচনে জেতার পর ওরা নানান ভুল ভ্রান্তি করতে শুরু করবে। এমনসব সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করবে যেগুলো সাধারণ মানুষের বিপক্ষে যাবে। মানুষ বিরক্ত হতে থাকবে। যারা এতকাল সরল বিশ্বাসে জামাতকে সমর্থন করেছিল তাদের সমর্থন হারাবে। সেই সুযোগে বিরোধী দলগুলো আবারো নতুন আন্দোলন শুরু করবে। আবারো অস্থির হবে দেশ।

এবার তৃতীয় একটা সম্ভাবনার কথা ভাবা যাক। আগামী সপ্তাহে যদি নির্বাচনটা না হয়? যদি এমন কিছু ঘটে নির্বাচন ভণ্ডুল হয়ে গেল, তাহলে?

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেবে। নতুন একটা সরকার গঠিত হতে পারে। সেই সরকারটা কাদের নিয়ে গঠিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর একেবারেই অনিশ্চিত।

কিন্তু সাধারণ মানুষের চাওয়া দেশটা যাদের হাতেই থাকুক, দেশের অর্থনীতির চাকা যেন সচল থাকে। দেশে যেন কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি না হয়। হোক সেটা গৃহযুদ্ধ কিংবা প্রতিবেশিদের সাথে যুদ্ধ। আমাদের মতো পেটে-ভাতে খাওয়ার দেশে যুদ্ধের মতো ব্যাপার হলো অভিশাপ। যে অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর অনেক দেশ। স্পষ্ট করে বলতে গেলে মুসলিম দেশ। নিজেদের ভালো নিজেদের বুঝতে হয়। নইলে অন্য দেশের মোড়ল এসে আমার ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। যে আমি নানান টানাপোড়েনের মধ্যেও এখনো একটা শান্তির পরিবেশে মাথার ওপর ছাদওয়ালা বাড়িতে ঘুমাচ্ছি, সেটা থাকবে না। শরনার্থী জীবন বেছে নিতে হবে আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মতো। সেই অভিশাপ থেকে বাংলাদেশ মুক্ত থাকুক।

২.
দেশ নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে মধ্যবিত্ত, স্বচ্ছল, শিক্ষিত, সম্পন্ন মানুষদের দুশ্চিন্তা সবসময় বেশি থাকে। এবার সেই দুশ্চিন্তার মধ্যে বাড়তি যোগ হলো নির্বাচন করছে এমন কিছু দল যাদের কোনো গণভিত্তি নেই। বড়জোর গোত্রভিত্তি আছে। এদের নীতি নৈতিকতার বালাই নেই। এদের মধ্যে গিরিগিটি, শকুন, ছারপোকা, তেলাপোকা চরিত্রের মানুষ প্রচুর। এদের কেউ কেউ হয়তো ধর্মীয় আবেগের জোয়ারে জিতে যাবে। আমাদেরকে সহ্য ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ এদেরই কেউ কেউ দেশের মন্ত্রণালয়ে বসবে। আগেও আমরা অনেক ইতর, অসভ্য লোককে দেখেছি সরকারে। এবার তাদের চেয়েও বেশি ঘৃণিত চরিত্র থাকতে পারে। মানুষ কী লোক চিনতে এত বড় ভুল করবে?













Tuesday, February 3, 2026

ইতিহাসের বর্জ্য

অনেকে ভুলে যায় ইতিহাস বদ্ধ ডোবা কিংবা পাঁকে আটকে থাকা জলাভূমি নয়। ইতিহাস হলো স্রোতস্বিনী নদীর মতো। সে তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে। নদীর অংশ না হয়েও স্রোতের সাথে অনেক খড়কুটো আগাছা কচুরিপানাও ভেসে চলে। সেইসব আগাছা শেষমেষ কোথায় হারিয়ে যায় কেউ জানে না। আগাছাদের কেউ মনে রাখে না। তবু একটা নদীতে নানা রকম আগাছা, কচুরিপানা কিংবা বর্জ্য পদার্থের উপস্থিতি কেউ অস্বীকার করতে পারে না। আবার সেটাকে কেউ নদীর অংশ বলে মনে করে না। আমরা আমাদের ভবিষ্যত বদলাতে পারি, নতুন করে নির্মান করতে পারি। কিন্তু অতীত একেবারেই অপরিবর্তনীয়। ফলে ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে আমার কখনো তেমন মাথাব্যথা হয় না। যেমন মাথাব্যথা হয় না কারো চিন্তার বিকৃতি কিংবা মস্তিষ্কের ভারসাম্যহীনতা নিয়েও।