পেশাদারিত্ব।
এই শব্দটা অনেকে বোঝেন না। মনে করেন এটা কেবল পেশা সংক্রান্ত কোনো বিষয়। মানে যিনি যে পেশায় আছেন সেই পেশার দক্ষতা। ধারণাটা আংশিক সত্যি, কিন্তু পুরো ব্যাপারটা একটু আলাদা। পেশাদারিত্ব মানে হলো আপনার যে কাজটা যখন করা দরকার আপনি সেটা ঠিকমত করতে পারছেন কিনা। পাড়ার মুদি দোকানদার থেকে কোম্পানির সিইও পর্যন্ত এটা বিস্তৃত হতে পারে। পেশাদারিত্ব না থাকলে লোকে আপনার সাথে কাজ করে আনন্দ পাবে না। এটা না থাকলে মুদি দোকানী কাস্টমার পাবে না, কোম্পানির সিইও কর্পোরেট দক্ষতা দেখাতে পারবেন না। পেশাদারিত্বের প্রধান উপাদান হলো অডিয়েন্সের প্রতি আপনার আচরণ এবং মনোভাব। অডিয়েন্সটা কী? সেটা আপনার কাস্টমার হতে পারে, আপনার সহকর্মীও হতে পারে কিংবা আপনার ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ হতে পারে।
সহজে বোঝানোর জন্য আমাদের পাড়ার দুটো মুদি দোকানের উদাহরণ দিচ্ছি। দুটো দোকানই একইরকম জিনিসপত্র পাওয়া যায়। দুটো দোকান পাশাপাশি অবস্থিত। ধরা যাক একটা দোকান চালায় হাবিল, অন্যটা চালায় কাবিল। আমি একসময় হাবিলের দোকান থেকে কেনাকাটা করতাম। বছরখানেক আগে কাবিলের দোকানটা খোলার পর আমি কাবিলের দোকানে বেশি কেনাকাটা করি। কারণ হাবিল পুরোনো হলেও কাবিলের দোকানে গিয়ে আমি আরামবোধ করি।
কিন্তু সেই আরামের উৎস কী? খুব বেশি কিছু না। কাবিলের হাসিমুখ। আন্তরিকতা। আমি তার দোকানে ঢুকলেই সে কিভাবে আমার সন্তুষ্টি অর্জন করবে সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সবচেয়ে ভালো জিনিসটা দেবার জন্য নিজ থেকে এগিয়ে আসে। ওর দোকানে যেটা থাকে না সেটা পাশের দোকান থেকে এনে দেয়। অর্থাৎ আমি কাবিলের দোকানে গেলে নিশ্চিন্ত হয়ে যাই এখানে সব পাওয়া যাবে।
অথচ হাবিলের দোকানে জিনিসপত্র সব থাকলেও এই ব্যবহারটা নাই। সেও অধিকাংশ সময়ে হাসিমুখে কথা বলে, আদাব সালাম দেয়। কিন্তু মাঝে মাঝে সে অচেনা আচরণ করে। এই 'মাঝে মাঝে' অন্যরকম আচরণ আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে। যেমন, আমার চেয়ে বড়লোক কোনো ক্রেতা তার দোকানে ঢুকলে সে আমার দিকে তাকানোর প্রয়োজনও বোধ করে না। আমি গিয়ে গোবেচারার মতো দাঁড়িয়ে আছি, সে বড়লোক কাস্টমার নিয়ে ব্যস্ত।
ওই কাস্টমার বিদায় হলে সে আমার কাছে জানতে চায়, কি লাগবে? আমি ততক্ষণে খুব বিরক্ত হয়ে গেছি। মুখ ফুটে কিছু না বলে চুপচাপ জিনিস নিয়ে চলে এসেছি। এরকম কয়েকবার ঘটার পর ওর দোকানে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছি।
কাবিল এদিক থেকে ব্যতিক্রম। তার দোকানে যে লেভেলের কাস্টমারই ঢুকুক, সে সবার কাছে একবার একবার জিজ্ঞেস করে ফেলবে কি লাগবে, কেন এসেছেন? ওখানে গিয়ে বোকার মতো কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না।
এটাকেই বলে পেশাদারিত্ব। এই পেশাদারিত্বের কারণে পাশাপাশি একই জিনিস বিক্রি করেও হাবিল বসে বসে মাছি মারে, আর কাবিলের দোকানে মৌমাছির মতো ভিড় থাকে দিনরাত। মজার ব্যাপার হলো, মাত্র দুবছর আগেও কাবিল ছিল হাবিলের দোকানের সামান্য কর্মচারী। এখন সে কাবিলের চেয়ে অনেক ব্যস্ত ব্যবসায়ী। হাবিলের অবস্থান সমাজের উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ অংশে, কাবিলের অবস্থান সমাজের নিন্মশ্রেনীতে। কিন্তু পেশাদারিত্বের অভাবে উচ্চ মর্যাদা নিয়েও হাবিল পরাজিত হয়েছে কাবিলের কাছে।
হাবিলের ব্যবসাটা গড়ে তুলেছিলেন তার অর্ধশিক্ষিত বাবা, তিনি সমাজের নীচ থেকে উঠে এসেছিলেন। তিনি যখন দায়িত্বে ছিলেন তখন ওটা পাড়ার সবচেয়ে জমজমাট দোকান ছিল, তিনি ওপরে ওঠার জন্য পেশাদারিত্বের চূড়ান্ত করেছেন। কাস্টমারদের মন জয় করার সব কায়দা করেছেন। তাঁর শিক্ষিত পুত্র দায়িত্ব নেবার পর ব্যবসায় ধ্বস নেমেছে। ছেলেটা বুঝতে পারেনি তার বাবা কোন পেশাদারিত্ব দিয়ে ব্যবসাটা দাঁড় করিয়েছিল। বাবা যেখানে পাড়ার সেরা দোকানটা চালিয়েছিল, পুত্র আসার পর টিকে থাকতেই হিমশিম খাচ্ছে।
আমি দোকানীর উদাহরণ দিয়ে পেশাদারিত্ব ব্যাখ্যা করলাম। কিন্তু এই উদাহরণ আমাদের সমাজের সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কর্পোরেট অফিস, পত্রিকা, প্রকাশনা, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, থানা, পুলিশ, আদালত, সচিবালয় সর্বত্র।
আরেকটা উদাহরণ দেই। লেখালেখির সূত্রে আমি বিভিন্ন পত্রিকা, প্রকাশনা, লেখক সম্পাদকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হয় দেশে কিংবা বিদেশে। এখানেও আমি পেশাদারিত্বের এই পার্থক্যটা টের পাই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের অভাব এত প্রকট যে তাদের সাথে আমি কাজ করতেই আগ্রহী নই। আমি খুব বেছে বেছে প্রকাশক বা পত্রিকা নির্বাচিত করি। পেশাদার নয় এমন কাউকে আমি কাজ দেই না। এসব ক্ষেত্রে আমি যে বিষয়টাকে গুরুত্ব দেই সেটা হলো মেইল/মেসেজের রেসপন্স। আমি যখন কাউকে মেসেজ দেই, সেটার জবাব আশা করি। আমার অধিকাংশ কাজ বা যোগাযোগ মেইলেই হয়। খুব জরুরী না হলে আমি মেসেঞ্জারে কাউকে নক করি না। মেইল বা মেসেঞ্জারের জবাবের ধরণ দেখে আমি বুঝতে পারি ইনি পেশাদার কিংবা অপেশাদার। যদি যৌক্তিক সময়ে জবাব না পাই, তখন আমি ধরে নেই তিনি পেশাদার নন। তার সাথে আমার কাজ হবে না। আমি অনেক প্রতিষ্ঠানকে বাতিল করেছি শুধুমাত্র এই একটা কারণে। পাওনা টাকা ফেরত না দেবার চেয়েও এটা আমার কাছে গুরুতর ব্যাপার।
বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা ঘটে বলে আলাদা করে বলতে হচ্ছে। এদেশে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অপেশাদার বিষয় হলো মেইলের জবাব না দেয়া কিংবা প্রাপ্তি স্বীকার না করা। এটা আমি আরো অনেকবার বলেছি। অনেককে মেইল পাঠানোর পরে মেসেঞ্জারে গিয়ে কিংবা ফোন করে বলতে হয় আপনাকে মেইল দিয়েছি। এটা কি ইচ্ছাকৃত কিনা জানি না। অন্যপক্ষের অবস্থা তো জানার উপায় নেই। অনেকে হয়তো নিয়মিত মেইল চেক করেন না। কিন্তু ব্যস্ততা কোনো অজুহাত হতে পারে না। আমার আগের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় দৈনিক শতাধিক মেইলের জবাব দিতে হতো আমার। কোনো মেইল ২৪ ঘন্টা জবাব না দেয়া ছিল অপরাধের সামিল। দুর্ভাগ্যজনক হলো মেইলের জবাব না দেবার এই বিষয়টা বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেই দেখেছি। অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে এটা খুব কম ঘটেছে। একদম অচেনা কেউ হলেও জবাব পেয়েছি। বাংলাদেশিদের মতো কখনো লা-জওয়াব অবস্থা দেখিনি।
এই দুটো ব্যক্তিগত উদাহরণ দিয়ে আমি আসলে একটা জাতীয় সমস্যার কথা বলতে চাই। আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক গুরুতর সমস্যা আছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা নিরাপত্তা ইত্যাদি। কিন্তু তার সাথে আরেকটা যুক্ত হওয়া উচিত। পেশাদারীত্বের অভাব।
আমাদের সবগুলো সেক্টরে পেশাদারিত্বের অভাব এত বেশি সেটার বিস্তৃতি নিয়ে বলাই মুশকিল। আইন- আদালত থেকে সচিবালয়ের অফিসপাড়া, ডাক্তার- হাসপাতাল থেকে বাজারঘাট, নাজিরহাট থেকে দোহাজারি, টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, পতেঙ্গা থেকে কালুরঘাট সবখানে একই অবস্থা। পেশাদারিত্ব আমাদের নৈতিকার একটা অংশ। নৈতিকতা নিজের জীবন থেকে শিখতে হয়। স্কুল কলেজে এটা পড়ানো হয় না। আপনি যতই শিক্ষিত হোন, যতই অভিজ্ঞ হোন না কেন, আপনার মধ্যে যদি পেশাদারিত্ববোধ না থাকে তাহলে কোনো কিছুতে আপনি উন্নতি করতে পারবেন না।
কথার মাঝখানে একজন বলে উঠলেন- পেশাদারিত্ব জিনিসটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে দেন।
বললাম, নিজের দায়িত্বটা আন্তরিকতার সাথে পালন করার নামই পেশাদারিত্ব।
আমাদের সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশের মধ্যে পেশাদারিত্ব নেই। কেন নেই? কারণ আমরা যারা সাধারণ মানুষ বলে পরিচিত, আমরাই তো সরকারের সেইসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। আ্মাদের মধ্যেই পেশাদারিত্ব নেই। ওইসব প্রতিষ্ঠানে কিভাবে থাকবে? ওখানে তো আমাদের মতো মানুষেরাই কাজ করে। কিছু ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। কিন্তু সেই ব্যতিকর্মী মানুষগুলো টিকতে পারে না কুৎসিত সিস্টেমের কারণে। সেই সিস্টেম কি কখনো বদলাবে? আশাবাদী হবার মতো কোনো লক্ষণ এখনো দেখিনি।
তাই বলে আপনি কি হাল ছেড়ে দেবেন? আমি হাল ছাড়িনি। আমি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। নিজেকে জয় করেছি। তারপর আপনাদের বলছি। হ্যাঁ, রাস্তায় নেমে ভাঙ্গচুর বিপ্লব করার চেয়ে এটা অনেক বেশি কঠিন। তবু অসম্ভব নয়। চেষ্টা করে দেখুন। লেগে থাকুন। ব্যর্থ হতে হতে আপনি সফল হবেন একদিন। আমার বিশ্বাস আপনি পারবেন। নেহায়েত আপনি যদি না পারেন আপনার সন্তানকে শিক্ষাটা তুলে দিন। তাহলে এখন না হলেও পঞ্চাশ বছর পরের বাংলাদেশটা বদলাবে।
No comments:
Post a Comment