গুডরিডসে একটা ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়। যেটাকে মোটামুটি নিরপেক্ষ বলা চলে। এখানকার পাঠক আমার অচেনা। পক্ষপাতিত্বের কোনো কারণ নেই। সে কারণে গুডরিডসের পাঠক মতামত আমি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি।
টাইগারপাসকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যায় কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। কিন্তু ঐতিহাসিক উপন্যাসের কিছু ধর্ম মেনে চলার চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন যেসব ঐতিহাসিক চরিত্র বাস্তবেই ছিল তাদের ব্যাপারে কোনো তথ্যগত অসঙ্গতি যেন না থাকে। যে প্রেক্ষাপটে গল্পটা লেখা হয়েছে সেই প্রেক্ষাপট যেন বিশ্বাসযোগ্য হয়। একটা বিষয় পরিষ্কার করা ভালো। এই উপন্যাস সিরিয়াস পাঠকদের জন্য লেখা হয়নি। আধুনিক উপন্যাসের নতুন কিছুর সন্ধান করেন। এটা শতভাগ পুরোনো ধাঁচের গল্প, আগাগোড়া সরলরেখায় বর্ণিত। যারা সিরিয়াস কিছু আশা করবেন, তাঁদের হতাশ হতে হবে। রেটিং দেখে দুয়েকজন সিরিয়াস পাঠক খুঁজে পেলাম। সবচেয়ে স্বস্তির কথা হলো মাত্র এক মাসের মধ্যে ৭টি রিভিউ, যার মধ্যে সবগুলোই পাশ মার্ক (৩-৫ তারকা) দিয়েছেন। একজন অচেনা লেখকের জন্য এটা আনন্দের ব্যাপার।
......................................................................
পাঠক রিভিউ:
রোনেল বড়ুয়া (১৪.৩.২০২৬)
“সময়ের নদীতে ভেসে আসে
বীরত্ব, হারানো স্বপ্ন আর শিক্ষা।”
সাহিত্যের উৎকর্ষ বা অপকর্ষ বিচার করে যে সম্যক আলোচনা করা হয়, তাকেই সাধারণত সমালোচনা বলা হয়। আমি সেই দায়িত্ব নিতে আসিনি। এতটুকু বোধশক্তিও আমার অদ্যাবধি জন্মায়নি। আমি শুধু একজন পাঠক, পাঠের যে রসটুকু পেয়েছি, সেটুকু ভাগ করে নেওয়ার ছোট্ট চেষ্টা মাত্র।
ঐতিহাসিক প্লটনির্ভর গল্প-উপন্যাস আমার সবচেয়ে প্রিয় পাঠধারাগুলোর একটি। তাই ‘টাইগারপাস’ পড়া যেন একপ্রকার অনিবার্যই ছিল।
চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে লেখকের গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিচয় তাঁর আগের বইগুলো পড়েই পেয়েছি। তাই চোখ বন্ধ করেই একই ভরসায় এই বইটি হাতে নিয়েছিলাম। পড়তে পড়তে মনে হলো, বইটি যেন গিলে ফেলিনি, বরং জীর্ণ করছি। যে দুই দিন বইটি পড়েছি এক ধরনের ঘোরের মধ্যে কেটেছে। এখানেই লেখকের মূল শক্তি— তিনি পাঠককে অমনোযোগী হওয়ার সুযোগ দেন না। গল্পের ভেতর এমনভাবে টেনে নেন পাঠক অজান্তেই তার ভেতর ডুবে যায়। ঐতিহাসিক মিশ্র এই উপন্যাসের শেষভাগে এসে বুকের ভেতরের ব্যথাটা যেন আরও তীব্র হয়ে ওঠে, চাপা কষ্ট নিঃশব্দে জেগে ওঠে।
গল্পের কথায় আসি— ইতিহাস থেকে ধার করা কাহিনি হলেও রাঁধুনি হিসেবে হারুন রশিদ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। চট্টগ্রামের গরম মসলায় তিনি গল্পটিকে এক বিশেষ স্বাদে রেঁধেছেন। এমনভাবে পরিবেশন করেছেন যা শেষ না করে উঠা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে বসার আসন (ভাষা) আর একটু মজবুত হলে পাঠের স্বাচ্ছন্দ্য আরও বাড়ত।
চরিত্রগুলোর বুননও ছিল বেশ চমৎকার। নবীনচন্দ্র, স্বর্ণকুমারী দেবী, উইলিয়াম জোন্স, চট্টগ্রামের অলি-গলি, সমুদ্র— সব মিলিয়ে এক জীবন্ত সমীর তৈরি হয়েছে। অচেনা নায়ক ফরিদ, নায়িকা এমেলিয়া, আর গল্পে আমার ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র মাহানুর। তার দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। চরিত্রগুলো যেন ঊর্ণনাভের মতো নিজেদের জাল বুনে ঘটনাপ্রবাহ তৈরি করেছে। কখনো তারা চট্টগ্রাম থেকে সমুদ্রপথে মালদ্বীপে নিয়ে যায়, আবার মালদ্বীপ থেকে বিভিন্ন শহর ঘুরে পুনরায় ফিরিয়ে আনে চট্টগ্রামে।
উপন্যাস লেখা নিজেই কঠিন কাজ, আর ঐতিহাসিক ফিকশন লেখা তার চেয়েও বেশি জটিল। কারণ এখানে লেখককে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। অতীতের ইতিহাস, রীতি-নীতি, প্রচলিত গান, সংস্কার-ব্যবহার, পোশাক-পরিচ্ছদ, সামাজিক ও গার্হস্থ্য জীবনের অবস্থা এসব বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না হলে সহজেই কালবিরোধী-দোষ দেখা দিতে পারে। লেখক এই বিষয়ে সচেতন থাকার যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। ভালো লাগার বিষয় হলো, কোথাও অযথা দীর্ঘ বর্ণনা নেই।
স্থানীয় আচার-ব্যবহার ও জীবনযাত্রার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতেও লেখক সচেতন ছিলেন। জীবনজিজ্ঞাসার ভেতরেও ছিল এক ধরনের গভীরতা। সব মিলিয়ে এটিকে একটি মহৎ শিল্পকর্মের আন্তরিক প্রয়াস বলেই মনে হয়েছে।
এখন আমি ‘ক্যাসান্দ্রা’ ফুলের সন্ধানে আছি। কোনো একদিন যদি সেই ফুলের দেখা পাই, তবে বাড়ির উঠোনে সেটি রোপণ করে ‘এমেলিয়া’কে উৎসর্গ করব।
জিহাদ আল ফারুক (১৫.৩.২০২৬)
ব্রিটিশ শাসনাধীন চট্টগ্রাম, ভারতবর্ষ, মালদ্বীপ ও সুদূর বিলেতের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে ইতিহাসাশ্রয়ী বইটির আখ্যান। হারুন রশীদের নন ফিকশন পড়ে যতটা ভালো লেগেছিল, সেকারণেই উনার প্রথম (জানামতে) ফিকশনটা সম্পর্কে জানতে পেরে পড়ার সিদ্ধান্ত নিতে দু'বার ভাবতে হয়নি।
রবি ঠাকুর, স্বর্ণকুমারী দেবী ও এসেছেন গল্পের চরিত্র হিসেবে। শুরু থেকেই ইতিহাস, প্রেম, পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের গল্প রোমাঞ্চকর একটি সূচনা প্রাপ্তির পর হঠাৎ করে শেষাংশে করুণ রূপ নেয়। সমুদ্র ও পাহাড়ে ঘেরা পুরো চট্টগ্রাম শহরটিকে যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম। অধ্যায়ের শুরুতে কবিতাগুলি প্রাসঙ্গিক ছিল। বাঙালি যুবক ফরিদের সাথে এমিলিয়ার অসম প্রেম ও এর পরিণতি মন খারাপ করিয়ে দেয়। পোকায় খাওয়া যে পত্রিকার টুকরো খবর পড়ে ফরিদ চট্টগ্রামে ফিরে এসেছিল, সেটির সঠিক ঘটনাও তার জানা হলো না..
ফাহাদ আমিন (২৩.৩.২০২৬)
নন ফিকশন জনরার লেখক হিসেবে হারুন রশীদ ইতিমধ্যেই খ্যাতনামা। তাই বইটা কেনার আগে ভেবেছিলাম এটাও হয়তো নন ফিকশন জনরার বই হবে। পরে পড়তে গিয়ে ভুল ভাঙলো।
একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নিয়ে বইটা লেখা। লেখক নিজে চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে দারুণভাবে অবগত হওয়ায় চরিত্রগুলোকে যেন আরও বেশি বাস্তব বলে মনে হয়েছে।
নবীনচন্দ্র সেন চরিত্রটা বাস্তবতা আছে বলে জানি। কিন্তু ফরিদ, এমিলিয়া চরিত্রগুলো কি আসলেই ছিল?
এক বসায় পড়ে শেষ করলাম বইটা। পড়া শেষ করে ভীষণ মন খারাপ হলো। মালদ্বীপ থেকে ছুটে এসেও না পাওয়ার বেদনা মনটাকে বিষন্ন করে তোলে।
মাহমুদ রাজ(২৫.৩.২০২৬)
লেখকের রাজকীয় জলদস্যু বণিক সমিতি, আর সমুদ্রপথে গ্রিস থেকে বাংলায় বই দুটো শেষ করার পর তৃতীয় বই হিসেবে টাইগারপাস পড়লাম। ইতিহাসের বাইরে এসে ফিকশন বই পড়লে হয়ত এমনেই ভালো লাগে বেশী, এই বইটাও ভালো লাগলো।
বইটার গল্পের সময় ব্রিটিশ আমলের চট্টগ্রাম শহরকে ঘিরে। বইয়ে শহরের জন্মের ঘটনাও, অর্থাৎ বদর পীর কিভাবে চাটগাঁকে মানুষের বসতিতে রুপান্তর করলেন সেই ঘটনাও রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনকালের আবার এক সময় নয়, বেশ কয়েকটা যুগের গল্প রয়েছে। এখানে চট্টগ্রাম শহরের জন্ম, বেড়ে উঠার কথা যেমন রয়েছে। তেমনি আছে এই চাটগাঁর ভূ প্রকৃতি, সাগর নদীর কোলঘেষা জনপদের মানুষদের গল্প। শাসকগোষ্ঠীর কথা ছাড়াও স্থানীয় মানুষদেরদেও কাছ থেকে দেখতে পারলাম বই থেকে। তবে এই বইয়ে উঠে এসেছে নতুন এক ভূখণ্ডের কথা। ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে মালদ্বীপ কেমন ছিল, তা এতকাল জানা ছিল না, লেখকের মাধ্যমে বেশ খানিকটা ধারণা পাওয়া গেল।
আধুনিক মালদ্বীপ কিংবা ব্রিটিশ আমলের বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশ সম্পর্কে কমবেশী জানি কিন্তু ব্রিটিশ আমলের মালদ্বীপ সম্পর্কে একদম জানাশোনা ছিল না আমার।
ইতিহাসের পথে ঘুরতে বরাবরই ভালো লাগে। সেই ভ্রমণ যদি হয় খুব প্রাণোচ্ছল তবে ত কথাই নেই। এতক্ষণ যা বললাম এগুলো বাড়তি পাওনা, বইয়ের মূল গল্প কিন্তু নয়। গল্পের মূল নায়ক ফরিদ, মূল নায়িকা এমিলিয়া। দারুণ এক ভালবাসার গল্প, দুই বই পড়ুয়ার এক হবার গল্প, কল্পনায় ভেসে বেড়ানোর গল্প, মন ভাংগার গল্প।
লেখকের মোট ৪ টা বই পড়েছি। আমার কাছে এটাই সবচেয়ে বেশী ভালো লেগেছে। ২৩,২৪,২৫ বিগত তিনটা বছর চট্টগ্রামে কাটিয়েছি, ঘুরে বেড়িয়েছি এই অঞ্চলের এমাথা থেকে ওমাথা। হয়ত এজন্যই বইটা পড়ার সময় কল্পনায় ঘুরে বেড়াতে সুবিধা হয়েছে আমার, চেনা জানা বলে কথা।
শতাব্দী ভট্টাচার্য (১৫.৩.২০২৬)
ইতিহাস বিষয়ক নন ফিকশনে হারুন রশীদ একটা উজ্জ্বল নাম সমকালীন বাংলা সাহিত্যে। তাঁর প্রকাশিত সিংহভাগ বইই আমার পড়া। টাইগারপাস ও প্রায় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই কেনা। তবে আমি আসলে জানতাম না যে এটা উপন্যাস। অবধারিতভাবে ঐতিহাসিক উপন্যাসই লিখবেন হারুন রশীদ, এতো অনুমেয়ই ছিল। তবে শুধু ঐতিহাসিক জনরায় একে ফেললে ভুল হবে, এটি অবশ্যই একটি রোমান্টিক উপন্যাসও। উপন্যাসের মূল চরিত্র ফরিদ। আগাগোড়া তাকে ঘিরেই সমস্ত ঘটনা আবর্তিত হয়েছে। ফরিদের পড়ার নেশা, আরভিন রসের মেয়ে এমেলিয়ার প্রেমে পড়া, এমেলিয়াকে হারিয়ে ফেলা, ফরিদের দেশান্তরী হয়ে মালদ্বীপে পৌঁছানো, মাহানূরের সঙ্গে আলাপ, আবার ফিরে আসা চট্টগ্রামে- মোটামুটি এই হচ্ছে মোটাদাগে গল্প। এরই ভাঁজে ভাঁজে ঐতিহাসিক ঘটনা, চরিত্র এসেছে। নবীনচন্দ্র সেন যেমন এসেছেন, তেমনি এসেছেন স্বর্ণকুমারী দেবী। মালদ্বীপ আর চট্টগ্রামের প্রাচীন সম্পর্কের ইতিহাসও এসেছে। উপন্যাসটি এক বসায় পড়ার মতো। তবে সত্যি বলতে কী, আমি একটু হতাশই৷ হারুন রশীদের কাছে কি জটায়ুমার্কা ভুল আশা করা যায়? এমেলিয়া স্বর্ণকুমারী দেবীকে চিঠিতে লিখছেন রবিঠাকুরের কথা। সাত বছর বয়সে নাকি তাঁর প্রথম লেখা ছড়া, 'জল পড়ে, পাতা নড়ে!' অথচ জীবনস্মৃতির শিক্ষারম্ভ ভাগে রবীন্দ্রনাথ নিজে লিখেছেন এই লাইনটা দ্বারা তিনি প্রথম আদিকবির সঙ্গে পরিচিত হন। এটা বর্ণপরিচয় এর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর। রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায়, 'এমনি করিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া সেদিন আমার সমস্ত চৈতন্যের মধ্যে জল পড়িতে ও পাতা নড়িতে লাগিল।' এই মারাত্মক ভুলটা পড়ে বড্ড মন খারাপ হয়ে গেছে।
[** লেখকের ব্যাখ্যা: এই ভুলটা আসলে উপন্যাসেরই একটা অংশ ছিল]
মোহতাসিম সিফাত (২৭.৩.২০২৬)
ইতিহাস কেন্দ্রিক নন ফিকশন লেখক হারুন রশিদকে ঔপন্যাসিক হিসেবে পেলাম এই বইতে। উনার কমফোর্ট জোনেই আছেন, ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা চলে একে। সকল সূত্র মেনে কিছু ঐতিহাসিক সত্য চরিত্রের সাথে কিছু কাল্পনিক চরিত্র মিলিয়ে সুন্দর এগিয়ে নিয়েছেন গল্প। ওজি ঐতিহাসিক উপন্যাস সুনীলের "সেই সময়" এর কথা মনে করে নস্টালজিক হয়ে গেছিলাম।
আধুনিক চট্টগ্রাম শহর ওই সময়ে কেমন ছিল, গল্পের ছলে এর একটা ভালো ধারণা পেয়েছি। দেশি ছোকরার সাথে বিদেশি মেমের প্রেমপর্বটা শুরুতে ইন্টারেস্টিং ছিল, তবে মাঝে উনারা যে প্রবল পিনিকে ডেলুলু হয়ে গেছিলেন, ওই পার্টটা ফাস্ট স্কিপ করে গেছি।
মূল চরিত্র ফরিদের জীবনের একটা অপ্রত্যাশিত বাঁক গল্পের ক্ষণকালীন একঘেয়েমি কাটিয়ে নতুন করে মনোযোগ দিতে বাধ্য করায়। শেষের পরিণতিটা কষ্টদায়ক হলেও ভালো মনে হয়েছে।
ওভারঅল ভালো একটা ফিল-গুড মুভির মতো উপন্যাস। প্রথম উপন্যাস হিসেবে লেখককে অভিনন্দন জানাই। পরবর্তী উপন্যাসগুলো নিয়ে উচ্চাশা রাখতেই পারি আমরা।
পাঠকের জন্যে ইম্পর্ট্যান্ট নোটিশ: বইটা পড়ার সময় ভুলেও যেন শেষ পাতাটা আগে চোখে না পড়ে। তাইলেই শ্যাষ। কঠিন স্পয়লার।
হারুন আহমেদ (১.৪.২০২৬)
হারুন রশীদের লেখা উপন্যাস, তাই সাগ্রহে পড়লাম। সূচনা - উপসংহার উভয়ই মনে রাখার মতো। কিন্তু আধুনিক উপন্যাসসুলভ বৈশিষ্ট্য লেখায় কমই পেলাম। চরিত্রগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্ব, দ্বিধা, সমস্যা সবই আমরা উপরিতল থেকে দেখি, তাদের ভেতরটার দেখা পাওয়া যায় খুব কম। এজন্য তাদের দুঃখে ঠিক দুঃখিত হতে পারি না পাঠক হিসেবে। লেখকের স্বাদু গদ্যশৈলীর গুণে অবশ্য পড়ার সময়টুকু ভালো কেটেছে। দেড়শো বছর আগের চট্টগ্রাম আর তখনকার মানুষের জীবনযাত্রার বর্ণনাও চমৎকার।
তা-রা (২১.৫.২০২৬)
বাস্তব এবং অবাস্তব বেশ কিছু চরিত্রের সমারহ এই উপন্যাসে। লেখক বলেছিলেন নন ফিকশন থেকে বেশি কঠিন ফিকশনকে দাঁড় করানো। কারণ একটি মিথ্যা জগতকে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া সহজ নয়। তবে লেখক তা করে দেখিয়েছেন দক্ষ হাতে। যদিও তা দাঁড় করাতে লেগে গেছে এক যুগ!
প্রাচীন চাটগাঁই শহরের বেড়ে উঠা রক্ষণশীল পরিবারের ছেলে ফরিদের পড়াশোনা যেন প্রায় থেমে যাচ্ছিল। বন্ধুরা কলেজের মাটি পেরোলেও ফরিদের বাবার কড়া শাসনে তাকে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হবার মতো পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছিল। তবে সেসময়ের একজন গুণী ব্যক্তি নবীনচন্দ্রের সহায়তায় ফরিদের পড়ার জগতে এক টুকরো লাইব্রেরী নামক বিলাসিতা যোগ হয়েছিল। আরভিন রসের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বই পড়ার সুযোগ। এর মাঝেই তার সাথে পরিচয় হয় স্কটল্যান্ডের এমেলিয়ার সাথে। এ যেন মেঘ না চাইতেই জল! পড়া আর প্রেমের দ্বন্দ্বে ফরিদ ফেঁসেছিল খুব বাজেভাবে। পরিবার এই প্রেম মানবে তা যেন অসম্ভব কল্পনা।
তবে এর মাঝে ফরিদের ভাগ্যে শনি হয়ে দেখা দেয় একটি কুকুর। কুকুরের মালিকের আড়চোখ হতে বাঁচতে তাকে পাড়ি দিতে হয় অন্যত্র। আর ফিরে এসে দেখে এমেলিয়া বিলেত ফিরে গেছে। তার বাবা তাকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। আর এমেলিয়ার দুঃখ ভুলতে ফরিদ পাড়ি জমায় বিলেতের পথে দেশ ছেড়ে। তবে পথিমধ্যে ডুবে যায় জাহাজ। ফরিদ ভাগ্যক্রমে পৌঁছে যায় মালদ্বীপ; কুনাহান্দু দ্বীপের অধিবাসীরা তাকে নিয়ে একপ্রকার আনন্দে মেতে উঠে কারণ সে তখনো বেঁচে ছিল। আর ভাষাগত সমস্যার জন্য ইংরেজি ভাষার ব্যবহার দেখে তারা ধারণা করে ফরিদ জাহাজের কোনো উচ্চতর কর্মকর্তা ছিল। জীবনে আবার আনন্দের দেখা মিলে। ফরিদ সেই নারকেলের দ্বীপেই নতুনভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। এবং এইবার তার দেখা মিলে মাহানুরের সাথে। সুন্দরী, গুণবতী এবং তাকে জেল থেকে বাঁচানো এই কন্যার হাত সে এক পলকে ছেড়ে দেয় যখন সে খোঁজ পায় এমেলিয়ার। মাহানুরের জন্য বড্ড আফসোস হয়। তবে শেষমেষ ফরিদ সেই ভিনদেশে থাকেনি। যে ভিনদেশে দাঁড়িয়ে সে বলেছিল কখনোই দেশে ফিরবে না সেই ফরিদ ফিরে এসেছিল এমেলিয়ার খোঁজে। চাটগাঁই শহরে আবারো ফিরে এসেছিল সে। তবে শেষটা খুব বিষণ্ণ হতো যদি লেখক পুনশ্চ না লিখতেন। মাহানুরের জন্য শেষমেষ কষ্টটা একটু হলেও কমেছিল।
পুরো উপন্যাসে ফরিদের অংশটুকু বাদ দিলেও আরো অনেককিছু ছিল যা মূলত ইতিহাস। এবং আমার মনে হয়েছে চাটগাঁইয়ের লোকদের নিজস্বতা, সংস্কৃতি, এবং কঠোরভাবে দমনের ব্যাপারগুলো চলে আসছে সেই সুদূর অতীত থেকেই। প্রথম পাবলিক ল্যাট্রিন নির্মাণ নিয়ে একটি মজার তথ্য ছিল এখানে। এবং তখনকার সেই ব্রিটিশ লোকটি চাটগাঁইয়ের লোকদের যে একতাবদ্ধের সম্মুখীন হয়েছিলেন তা অবশ্য মনে রাখার মতো। লোকজন তাকে মনে রেখেছিল ঠিকই। তবে তার বদলে যাওয়া নাম পড়ে হেসেছিলাম প্রাণখুলে।
বলা বাহুল্য, হারুন রশীদের লেখা এই প্রথম পড়লাম। আর 'টাইগারপাস' এর সাথে একটা ভালো সময় কেটেছে। বাতিঘরের ওপর ভরসাটা আরেকটু হলেও বেড়ে গেল।
মাজহারুল আলম তিতুমীর (৩০.৫.২০২৬)
টাইগার পাস। প্রিয় নগরীর পছন্দের জায়গা। নামটি উচ্চারণে চোখে ভেসে ওঠে সবুজ সুউচ্চ পথ ধরে হেঁটে চলা। কৈশোরে প্রাকৃতিক ভাবে নির্মিত দু তলা সড়ক দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তারুণ্যে যখনই কদমতলী বাস স্ট্যান্ড, চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম, সিআরবি যেতে হয়েছে, প্রত্যেকবার টাইগার পাস মোড়ে নেমে যেতাম। পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী শিরিষ গাছের ছায়ায় সুশীতল বাতাস গায়ে মেখে ইচ্ছে করেই হেঁটে গেছি। টাইগার পাস এখনো হেঁটে যেতে প্রলুব্ধ করে।
হারুন রশীদ রচিত সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস এর নাম ' টাইগার পাস ' দেখে, বইয়ের ফ্ল্যাপে প্রকাশিত লেখক পরিচিতি না পড়েই কিনে ফেললাম। সব্যসাচী মিস্ত্রীর চমৎকার প্রচ্ছদে বাতিঘর এর প্রকাশনাটি এড়িয়ে যেতে পারিনি।
হারুন রশীদ রচিত উপন্যাসটি শুধুই টাইগার পাসকে ঘিরে আবর্তিত হয়নি। চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গায় প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ও শ্রমিক নেতা এডভোকেট জানে আলমের বাড়িতে বসে কলকাতা, দ্বীপের রাজ্য মালদ্বীপ, এমনকি সুদূর বিলেত থেকে ঘুরে এলাম।
হারুন রশীদ রচিত সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস এর নাম ' টাইগার পাস ' দেখে, বইয়ের ফ্ল্যাপে প্রকাশিত লেখক পরিচিতি না পড়েই কিনে ফেললাম। সব্যসাচী মিস্ত্রীর চমৎকার প্রচ্ছদে বাতিঘর এর প্রকাশনাটি এড়িয়ে যেতে পারিনি।
হারুন রশীদ রচিত উপন্যাসটি শুধুই টাইগার পাসকে ঘিরে আবর্তিত হয়নি। চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গায় প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ও শ্রমিক নেতা এডভোকেট জানে আলমের বাড়িতে বসে কলকাতা, দ্বীপের রাজ্য মালদ্বীপ, এমনকি সুদূর বিলেত থেকে ঘুরে এলাম।
ঐতিহাসিক চরিত্রের সাথে সাধারণ অনেক চরিত্রের হাত ধরে ফরিদের মাধ্যমে দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্তি জাগেনি। সাধারণ অসাধারণ সব মানুষের জীবনে একাধিক ঘটনা, দূর্ঘটনা থাকে। নদীর জোয়ার ভাটার মতো কখনো ঝিমিয়ে পড়া একজন পুণরায় প্রবল জোয়ারে নব উদ্যমে জেগে ওঠে। বার বার মনোবাসনা'র অপমৃত্যু এমনকি জীবন নিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা ফরিদ সেই ঝোপের দিকে এগিয়ে গেলো।
" বিকেলের রোদে অদ্ভুত সুন্দর কিছু বেগুনি সাদা ফুল চারপাশ আলো করে রেখেছে। চোখ সরানো যায় না। চার বছর আগে ঠিক এই জায়গায় এসেছিল এমেলিয়াকে নিয়ে। ফরিদ নিশ্চিত ওই বেগুনি ফুলের ভেতর থেকে এমেলিয়ার নীল দুটো চোখ অপলক তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই দৃষ্টির সামনে ফরিদের বাস্তব বুদ্ধি লোপ পেয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ঘুরে তাকান পাশে দাঁড়ানো মাহানূরের দিকে। নির্জীব এক বোধ শূন্যতা নিয়ে সে ভাবছে এই মেয়েটা কে ? ওর চোখ থেকে জলের ধারা নামছে কেন ? "
যেখানে উপন্যাসের সমাপ্তি হলো সেখানে শিবাজির একটি গানের কথা মনে পড়ে গেলো।
" ঝড়ো হাওয়ায় দীপ জ্বালানোইতো জীবন
শুকনো নদীতে নৌকা চালানোইতো জীবন "
ছোট ছোট পর্বে রচিত ' টাইগার পাস ' উপন্যাসে উনিশ শতকের ঐতিহাসিক ঘটনা ও চরিত্রগুলো মূর্ত হয়েছে।
সভ্যতা কতখানি সভ্য ও মানবিক হলো সেই প্রশ্ন বিব্রত করে। তথাপি এই সভ্যতা বিনির্মাণে কত মানুষের মেধা শ্রম ও কঠিন আত্ম প্রত্যয় জড়িয়ে রয়েছে। নারী শিক্ষা তখন কল্পনাতীত বিষয় ছিল। মুসলমান পরিবারে পুরুষ সন্তানদের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা ছিল।
১৮৭১ সালে চট্টগ্রাম জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রাস পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে পাস করার গৌরব অর্জনে বাড়ি বাড়ি মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছিল।
" কিন্তু ফরিদের বাবা ছেলেকে কলেজে পড়াতে রাজি নন। তিনি বলে দিয়েছেন কাজী বাড়ির ছেলে হয়ে সে এন্ট্রাস পর্যন্ত পড়েছে সেটাই ঢের বেশি। ইংরেজ এর পড়াশোনা গোলামির প্রশিক্ষণ। খাঁটি মুসলমান কখনো ইংরেজ এর গোলাম হতে পারে না। "
সমাজ পতি রক্ষণশীল মওলানা পিতার সন্তান ফরিদ বাবার অবাধ্য হতে পারেনি। কলেজে ভর্তি হতে না পারলেও জ্ঞানার্জনের নেশা তাকে তাড়া করে বেড়ায়। চাটগাঁ শহরের তরুণ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রট নবীন চন্দ্র সেন স্কটিশ শিক্ষক আরভিন রসের ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে গিয়ে ইচ্ছে মতো বই পড়ার দুর্লভ সুযোগ করে দিলেন। শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তারে উৎসাহী নবীন চন্দ্র সেন অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম কলেজ পুণরায় চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নিজেকে পাড়ি দিতে হয়েছে কঠিন পথ পরিক্রমা।
আরভিন রসের লাইব্রেরিতে নিয়মিত পড়তে গিয়ে পরিচয় ঘটেছিলো বই পড়ুয়া এমেলিয়ার সাথে। বই বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ আলাপ আলোচনা তাদের কেবল নির্জন পাঠকক্ষে ঘুরপাক খায়নি, স্বাভাবিক ভাবেই সেই সম্পর্ক গভীর প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। সুশিক্ষিত দুই তরুণ তরুণীর প্রেমালাপ আর দশ জনের চেয়েও অনেক ভিন্ন। মুগ্ধ করে। জীবনের নাটকীয়তা সেই সুন্দর পরিচ্ছন্ন সম্পর্ককে পূর্ণতার দিকে যেতে দেয়নি ! জীবনের বাস্তবতা যেমন গল্পকে ছাড়িয়ে যায়, তেমনি গল্পও কখনো জীবনকে ছাড়িয়ে যায়। এমেলিয়া আত্মহত্যা করেন।
No comments:
Post a Comment