Sunday, April 30, 2023

গোলাম গোলামী করেছে, রাজা রাজাগিরি

১.

একসময় এই এরাই এসে বলবে, আমরা তখন থেকে জানতাম এমন হবে। উনি যে দিনের পর দিন ভুল করে যাচ্ছেন। ওনাকে নিয়ে যে বাড়াবাড়ি চলছিল, আমরা তখন থেকেই দেখছিলাম। আমরা সব জানতাম আমরা সব দেখছিলাম কিন্তু আমরা কিছু বলিনি। আমরা বরং ওনাকে উস্কে দিয়েছি। মিথ্যার পসরা সাজিয়ে ওনাকে মুগ্ধ করার জন্য আমরা দিনের পর দিন কাটিয়েছি। আমরা ওনার পতনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম মনে মনে। আমাদের সাহস ছিল না প্রকাশ্যে কিছু বলার। বললে আমাদের ঘাড়ে মাথা থাকতো না। আমরা হবুচন্দ্রকে দেখছিলাম, আমরা গবুচন্দ্রকেও দেখছিলাম।

২.

যারা সরকারী চাকরী করেন, তাদের অনেক ক্ষমতা। কিন্তু অধিকাংশ চাকুরে মূলত একেকজন চাকর ছাড়া আর কিছু নয়। মননে মগজে নিরেট নির্বোধ একেকটা মানুষ। সৃজনশীলতার ধারে কাছেও নেই অধিকাংশ কর্মকর্তা কর্মচারী। আমি খুব কম কর্মকর্তাকে দেখেছি মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে। যত বড় অফিসারই হোক না কেন, তার উপরে আরেকজন থাকে। সেই উপরের জনকে ক্রমাগত স্যালুট স্যার ডাকতে ডাকতে প্রত্যেকের গলা শুকিয়ে যায়। আমার মাঝে মাঝে করুণা হয় এদের জন্য। যতটুকু স্যার বলতে হয় এরা তার চেয়ে কয়েকগুন বেশি বলে। দিনের পর দিন এই স্যার স্যার করতে করতে এরা একটা সময় আত্মসম্মানবোধহীন একটা প্রাণীতে পরিণত হয়।


৩.

এতগুলো নিরেট নির্বোধ লোক দেশ চালাবার দায়িত্বে থাকলে দেশের অবস্থা এর চেয়ে ভালো হবার কথা না। দেশ চালাবার কথা রাজনীতিবিদদের। কিন্তু এদেশের রাজনীতি থেকে মগজ নেই হয়ে গেছে অনেক আগেই। মগজ ছাড়া রাজনীতিবিদরা দেশের কর্তা। সেই মগজহীন নেতাদের তোয়াজ করার জন্য তৈরি আছে আরেকদল মগজহীন আমলা। মাঝখানে দুজনের মগজ দখলে নিয়ে বসে আছে ব্যবসায়ীরা। দ্বিগুন মগজের অধিকারী হয়ে ব্যবসায়ীরাই দেশটা চালিয়ে যাচ্ছে রাজনীতিবিদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে।


যেমন রাজা, তেমন প্রজা

 আদিকাল থেকেই উপমহাদেশের সকল রাজা বাদশাহের চরিত্র আর হাড্ডিলোভী কুকুরের চরিত্রের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। কুকুর একটু এগিয়ে থাকবে নৈতিকতায়। সে একটা হাড্ডি পেলে সন্তুষ্ট থাকে কিংবা একটা হাড্ডি চিবানোর সময় আরেকটা হাড্ডির দিকে হাত বাড়ায় না। কিন্তু এই উপমহাদেশের সব রাজা বাদশাহ রাজপুত্র একের পর এক খুনোখুনি করে গেছে সিংহাসন দখল নিয়ে। কে কখন কাকে মেরে সিংহাসন দখল করবে সেটাই ছিল একমাত্র আদর্শ। তাদের জীবনে আর কোন লক্ষ্য নেই। তাদের দুর্ভাগ্য যে এত ক্ষমতা থেকেও তাদের কারো আয়ু একশো বছরও ছিল না। কেউ কেউ চল্লিশ পঞ্চাশেই ঠেসে গেছে। সেই হতভাগা লোভী স্বার্থপর ঘৃণিত চরিত্রের রাজাবাদশাগুলোর কাইজ্জা বিবাদ নিয়ে পৃথিবীতে হাজার হাজার বই লেখা হয়েছে, হচ্ছে হবে। কোটি কোটি ছাত্রছাত্রী সেগুলো মুখস্ত করে পরীক্ষার খাতা ভরিয়েছে। এইসব কুৎসিত কর্মযজ্ঞের ভদ্র একটা নাম আছে, সেটা হলো ইতিহাস। অবশ্য পৃথিবী জুড়ে সব রাজরাজড়াদের ইতিহাস হলো রক্তারক্তির ইতিহাস। আধুনিক পৃথিবীতে ইউরোপেই সবার আগে বুঝতে পেরেছে অতীতের সেই নোংরামিগুলো নিতান্তই অসভ্যতা ছিল। তারা কয়েক দশক ধরে সভ্যতার পথে ফিরে এসেছে। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া কানাডাসহ আরো কিছু দেশও বুঝতে পেরেছে অতীতের কাইজ্জাগুলো লজ্জাজনক ছিল। কিন্তু আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়া এখনো সেই্ উপলব্ধিতে আসেনি। আফ্রিকার মধ্যে এখনো আদিম বর্বরতা বিদ্যমান। দক্ষিণ এশিয়া সভ্যতার পথে্ এগিয়ে থাকার সুযোগ থাকলেও তাদের আদিপুরুষের ঐতিহ্য ধারণ করে এখনো কাইজ্জাপর্ব চালিয়ে যাচ্ছে। অসভ্য দেশগুলোর মধ্যে আমরা নিজেরাও অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন নৈতিকতা নেই, তেমন দেশ পরিচালকদের মধ্যেও নেই। দুই পক্ষই এই কুৎসিত কদাচারকে ঐতিহ্য বলে পালন করে যাচ্ছে। অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রায় প্রতিটি মানুষই অসৎ, ভণ্ড, মিথ্যুক, বিশৃংখল, অনিষ্টকারী। মুখোশ পরা কিছু ভালোমানুষ আছে, ভাল ভাল কথা বলে , কিন্তু ভেতরে চরম ইতরামি লুকিয়ে আছে। একই মানুষের তিনরকম চেহারা হতে পারে। দশ রকমও হতে পারে। যার যতগুলো চেহারা সমাজে সে ততটা গণ্যমান্য উপযুক্ত বিবেচিত। এদেশের রাজা যেমন হাড্ডিলোভী কুকুর, জনতাও হাড্ডিলোভী। কেউ কারো চেয়ে কম না। এই দেশ কেন উন্নতি হয় না, সেজন্য কাউকে দায়ী করে লাভ নেই। বিদেশীরা আমাদের শোষণ করে শূন্য করে দিয়ে গেছে বলে বহুকাল গান গেয়েছে। সেই গান এখনো চলছে। নিজেদের অযোগ্যতা অক্ষমতা ভণ্ডামি আড়াল করার জন্য এইসব গান গাইতে হয়। এটাই দেশপ্রেম বলে বিবেচিত।

প্রকৃতির দাসত্ব বনাম প্রকৃতির শত্রু

কাজ যখন আনন্দদায়ক হয়, তখন কেউ কাজ থেকে ছুটি চায় না। বরং ছুটি শেষ করে কাজে ফিরতে আনন্দ পায়। আমরা অধিকাংশ সময় ব্যয় করি নিরানন্দ কাজে। তাই সপ্তাহের প্রথমদিন থেকেই ভাবতে শুরু করি উইকেণ্ড কবে আসবে। আমাদের প্রাণ আনচান করে ছুটির খোঁজে।  

শৈশবের শিক্ষাজীবন থেকে শুরু হয় আমাদের নিরানন্দকাল। যে বিষয় কিংবা বই পছন্দ নয়, সে বই আমাদের জোর করে হজম করতে হয়। বদহজম করতে করতে শিক্ষাজীবন শেষ হয়। শিক্ষাজীবন শেষ করে যে পেশা আমার পছন্দ নয় সে পেশায় আমাদের ঢুকে যেতে হয়। দিনরাত অপছন্দের কাজ করে মাস শেষে বেতনটা পকেটে পুরে সুখী মানুষের ভান করতে হয়। নিজের পছন্দমত কাজ করে আয় উপার্জন করে সুখে জীবন কাটিয়েছে তেমন লোক আমি অন্তত দেখিনি।


আদিমযুগে মানুষ এতটা নিরানন্দ সময় কাটায়নি। যাযাবার শিকারীরা তাদের কাজের মধ্যেই আনন্দ উত্তেজনা বিনোদন সবকিছু পেতো। শিকারের খোঁজ করতে করতে, খাবারের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে আদিম মানুষ সারা পৃথিবীতে বংশবিস্তার করেছিল। সেই শিকারের যুগ শেষে মানুষ যখন প্রথম চাষাবাদ করতে শেখে তখন থেকে মানুষের মধ্যে দাসত্বের সূচনা হয়। মানুষকে প্রথম দাস বানিয়েছিল জমির ফসল। ফসলের দাসত্ব করার জন্য মানুষ প্রথম ঘর বাঁধতে বাধ্য হয়। পৃথিবীতে স্থায়ী গ্রামের সূত্রপাত হয় ফসলের দাসত্ব করতে গিয়ে। ফসলকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে মানুষ ছুটে বেড়ানোর স্বাধীনতা হারিয়েছিল। ইউভাল নোয়াহ হারারির এই তত্ত্বটা যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য। 



কিন্তু সেই ফসলের দাসত্ব খারাপ কোন ব্যাপার ছিল না। ওটা ছিল আধুনিক সভ্যতার প্রথম উন্মোচন। কিন্তু ফসল দাসত্বের বিবর্তনে মানুষ যে বাণিজ্যের দাসে পরিণত হতে শুরু করেছিল, সেখান থেকেই সভ্যতার সংকট শুরু। ফসল বিক্রি করার অধিকার পেতে, কিংবা অন্যের ফসল দখল করার তাগিদে গিয়ে পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধের জন্ম হয়। অস্ত্র এবং প্রযুক্তির উদ্ভাবনের অধিকাংশই ছিল দূরের জিনিসে হাত বাড়ানোর তাগিদে। নতুন নতুন জমির খোঁজ নিয়ে সেটা অধিকার করাই ছিল আবিষ্কারের যুগের আসল কথা। জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, বিশ্বায়ন সবকিছুই একই লক্ষ্যে ছুটছে। সেই লক্ষ্যটা হলো বাণিজ্য। আধুনিক সভ্য উচ্চশিক্ষিত মানুষদের মধ্যে শিল্প- সাহিত্য-দর্শন-বিজ্ঞান এবং পেশাজীবি কিছু মানুষকে বাদ দিলে বাকী সবাই আসলে বাণিজ্যের দাসত্ব করে। তিনি রাজা-উজির যাই হন না কেন, যত বড় চাকরিই করুক না কেন আখেরে তিনি আসলে বাণিজ্যের দাসত্বই করে যাচ্ছেন। সারা পৃথিবীর সবগুলো যুদ্ধ বিগ্রহ গোলমালের পেছনে কোন না কোনভাবে বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে। কেউ পণ্য বিক্রি করার মতলবে আছে, কেউ মতবাদ বিক্রি করার তালে আছে। অধিকাংশ মানুষ নিজের অজ্ঞাতেই বাণিজ্যের দাসত্ব করে যাচ্ছে। মানুষের বাণিজ্যিক দাসত্বের বয়স অন্তত দশ হাজার বছর। এখনো সেই দাসত্ব সদর্পে বিদ্যমান। 


একুশ শতকে এসে সেই দাসত্বে নতুন সংযোজন হতে যাচ্ছে। মানুষ এবার প্রযুক্তির দাসত্বের সূচনা করেছে। বিশ শতক পর্যন্ত মানুষ প্রযুক্তিকে দাস বানিয়ে একের পর এক উদ্ভাবন করে গেছে। একুশ শতক থেকে মানুষ প্রযুক্তির দাসে পরিণত হতে শুরু করেছে স্বেচ্ছায় এবং স্বজ্ঞানে। প্রযুক্তির উপর যেটা এতদিন নির্ভরশীলতা ছিল, এখন সেটা দাসত্বে পরিণত হয়েছে। প্রচুর মানুষ ঘুম থেকে উঠে প্রথম যে কাজটি করেন মোবাইল স্ক্রিনে চোখ বুলানো। ওই স্ক্রিন হাতে না থাকলে মানুষের দম আটকে আসে।  হাটে মাঠে ঘাটে অফিস আদালতে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় রান্নাঘর বাথরুম সবখানে এই সাড়ে  ইঞ্চির রঙিন পর্দা মানুষকে দখল করে রেখেছে। এখন তার সাথে যুক্ত হবে এআই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। নতুন প্রযুক্তির মহাযুগ। আগামী কয়েক যুগ মানুষ হয়তো এই নতুন প্রভুর দাসত্ব করবে।


বিশ্বব্যাপি সর্বগ্রাসী এই দাসত্ব চক্রের বাইরে অল্প কিছু মানুষ আছে যারা কিছুটা স্বাধীন। যাদের বড় অংশ হলো আদিবাসী। এখনো পৃথিবীর যেখানে আদিবাসী আছে তাদের জীবন আধুনিক মানুষের মতো নিরানন্দ নয়। এমনও জাতি আছে যারা যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু চাষ করে। বাকীটা সময় স্বাধীন আনন্দে কাটায়। দেড়শো বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন জঙ্গলে এক অভিযানে গিয়ে এক বৃটিশ কর্মকর্তা বলেছিলেন এই পার্বত্যবাসীরা যে কোন উন্নত ইউরোপীয়ানের চেয়ে স্বাধীন জীবনযাপন করে। কথাটা এই যুগেও সমান সত্য। অথচ সভ্য মানুষেরা এইসব আদিবাসীদের কোণঠাসা করতে করতে প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছে। নিজের মতো করে বিচ্ছিন্ন থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে বারবার। কোন না কোন রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব উদ্ভাবিত অদ্ভুত ভৌগলিক রাজনৈতিক অধিকারবোধে  তাদেরকে রাষ্ট্রীয় সীমানাভুক্ত করে। 


অথচ কারো দাসত্ব না করে পৃথিবীতে একমাত্র স্বাধীন জীবন কাটাতে পারতো সেই আদিবাসী মানুষেরাই। প্রকৃতির সন্তান, প্রকৃতির দাসত্ব করে জীবন কাটাতে পারতো।  প্রকৃতির দাসত্বই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম দাসত্ব। যেখানে আধুনিক মানুষ নেই সেখানকার প্রকৃতিই সবচেয়ে সুন্দর। প্রকৃতির স্বঘোষিত শ্রেষ্ঠ সন্তান আধুনিক মানুষ প্রতিনিয়ত প্রকৃতি ধ্বংস ডেকে আনছে। মানুষ ছাড়া জগতের সব প্রাণী প্রকৃতির দাসত্বই করে।


যুদ্ধ, শান্তি, সাহিত্য, নোবেল এবং রবীন্দ্রনাথের রসবোধ

একদম গোড়া থেকে না হলেও নোবেল পুরস্কার নিয়ে মাঝে মাঝে কিছু কৌতুককর ব্যাপার ঘটেছে। যার কিছু কিছু মর্মান্তিক কৌতুক। নোবেল পুরস্কারের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজনীতি চলে শান্তি পুরস্কার ঘোষণায়। তামাশার ব্যাপার হলো শান্তি পুরস্কারের একটা অংশ পেয়েছেন অশান্তির জনকেরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উইনস্টন চার্চিলও শান্তিতে নোবেল পেয়ে যেতেন, নেহাত লোকলজ্জার খাতিরে বাধ্য হয়ে তাঁকে সাহিত্যে নোবেল দেয়া হয়েছিল।

১৯৩৮ সালে হিটলার ক্ষমতায় এসে ঘোষণা করলেন এই পুরস্কার দেয় ইহুদীরা, সুতরাং জার্মান কোন নাগরিক এই পুরস্কার নিতে পারবে না। সে বছর একজন জার্মান বিজ্ঞানী রিচার্ড কুন নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। তিনি পুরস্কারটা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হলেন। পরের সাত বছর অবশ্য জার্মান দূরে থাকুক, গোটা পৃথিবীতে কেউ নোবেল পুরস্কার পায়নি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামায়।

রাশিয়ানদের কাছে নোবেল পুরস্কার ব্যাপারটার সাথে প্রেম আর বিদ্বেষ দুটোই ছিল। ১৯৫৮ সালে যখন বরিস প্যাস্টারনাককে নোবেল দেয়া হলো তখন রাশিয়ান সরকার ক্ষেপে ছিল বলে তিনি ভয়ে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আবার ১৯৬৫ সালে মিখাইল শোলোকভকে যখন দেয়া হলো তখন রাশিয়ানরা উৎসব করেছিল। কিন্তু ১৯৭০ সালে সোলজেনেৎসিন পুরস্কার পাওয়ার পর রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ সেটাকে সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেছিল। তবে পাবলো নেরুদাকে যখন নোবেল পুরস্কার দেয়া হলো তখন রাশিয়ান সরকারের শীর্ষ কর্তারা তাঁকে অভিনন্দিত করেছিলেন। বলেছিলেন,তিনি আমাদেরই লোক। রাশিয়ানদের এই নোবেল রসিকতা অবশ্য রাজনীতির মেরুকরণের খেলা।

অন্যদিকে ল্যাটিন আমেরিকার হোর্হে লুই বোর্হেস নিজের কপাল নিজেই পুড়িয়েছিলেন। রসিকতা করতে গিয়ে তিনি নোবেল পুরস্কার হারিয়েছিলেন। সত্তর দশকের গোড়া থেকেই তিনি প্রতিবছর মনোনয়ন তালিকায় ছিলেন এবং যে বছর তিনি পুরস্কারের জন্য চুড়ান্তভাবে নির্বাচিত হতে যাচ্ছিলেন সে বছরই তিনি ভুলটা করেছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর- পুরস্কারের চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের এক মাস আগে বুয়েনাস আয়ার্সের এক সরকারী অনুষ্ঠানে চিলির কুখ্যাত স্বৈরশাসক অগাস্টো পিনোচেটের সাথে দেখা হয়েছিল তাঁর। সেখানে তিনি পিনোচেটের উপস্থিতিতে একটা বক্তৃতায় বলেছিলেন- “হে মহামান্য প্রেসিডেন্ট, এটা আমার জন্য বিরাট সৌভাগ্য যে আমি আপনার কাছে আসার সুযোগ পেয়েছি….আর্জেন্টিনা, চিলি এবং উরুগুয়েতে আজ স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে….. কমিউনিজমের মাধ্যমে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে পতিত হওয়া একটা মহাদেশে এটা সম্ভব হয়েছে আপনার জন্য….”

এরকম আরো অনেক স্তুতির মধ্যে পিনোচেট ভেসে গিয়েছিলেন। বোর্হেসকে তিনি মেডেল দিয়ে অভিনন্দিত করেছিলেন। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মতে এই স্তুতি মূলত বোর্হেসের একটা রসিকতা ছিল মাত্র। কিন্তু সুইডিশ একাডেমির সদস্যরা সেই রসিকতা ধরতে পারেননি। সেই ঘটনার পর থেকে বোর্হেসের নামটা পুরস্কারের সম্ভাব্য তালিকা থেকে বাদ পড়ে গিয়েছিল। সে বছর বোর্হেসের বদলে তড়িঘড়ি করে মার্কিন সাহিত্যিক সল বেলোকে নোবেল পুরস্কার দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বোর্হেস অবশ্য একবার দুঃখ করে বলেছিলেন প্রতি বছর এই পুরস্কারের জন্য তিন মাস ধরে টেনশানে থাকা আর ভালো লাগে না। তিনি কৌতুক করতে গিয়ে পুরস্কারের সুযোগ হারিয়ে টেনশান মুক্ত হয়েছিলেন সেটাই লাভ।

কিন্তু আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পুরস্কারের প্রতিক্রিয়ায় ১৮ নভেম্বর ১৯১৩ তারিখে তার বন্ধু রোদেনস্টাইনকে যা বলেছিলেন সেটা মনে হয় সবচেয়ে সেরা:

“আমাকে যে নোবেল পুরস্কারের মতো একটা বিশাল সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে, এই সংবাদ পাওয়ামাত্র আপনার আপনার কথা মনে পড়ল- ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা সহ। আমি নিশ্চিত যে আমার বন্ধুদের মধ্যে আপনিই এই সংবাদে সবার চেয়ে বেশি আনন্দিত হবেন। তবে তা হলেও এটা আমার পক্ষে শাস্তিস্বরূপ হয়ে দাঁড়ালো। এর ফলে জনতার উত্তেজনা এমন ঘূর্ণবার্ত্যার মতো আবিল হয়ে উঠছে যে সেটা আমার পক্ষে অত্যন্ত ভীতিকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কুকুরের লেজে একটা টিনের কৌটো বেঁধে দিলে সে যেমন শব্দ ছাড়া নড়তে পারে না। যেখানে যায় শব্দটা তাকে তাড়া করে বেড়ায়, আর চারধারে দর্শকদের ভিড় জোটায়, আমার অবস্থাটা তার চেয়ে খুব একটা ভালো নয়। গত কদিন ধরে চিঠি আর টেলিগ্রামের ভিড়ে আমি দমবন্ধ হয়ে মারা যেতে বসেছি। যারা সারা জীবনে আমার একটা লাইনও পড়েনি তারাই হৈ চৈ আরম্ভ করেছে বেশি। আসলে তারা সম্মান জানাচ্ছে আমার সম্মানটাকে, আমাকে নয়। একমাত্র যা আমাকে তৃপ্তি দিচ্ছে তা হল, এই উপলক্ষে আমার স্কুলের ছেলেদের অবিমিশ্রিত আনন্দ।”

রবীন্দ্রনাথের রসবোধ তাঁর সাহিত্যবোধের চেয়ে মোটেও কম কিছু না।



সূত্র:

-Imperfect Encounter: Letters of William Rothenstein and Rabindranath Tagore, Harvard University Press,1972

-The Specter of the Nobel Prize- El País, Madrid, October 8, 1980

-The Nobel Prize: A History of Genius, Controversy and Prestige- Burton Feldman Arcade; 1st edition (October 9, 2012)


Saturday, April 8, 2023

গরীব হইবার সামর্থ্য

"অনেকের গরীব-মানুষি করিবার সামর্থ্য নাই। এত তাহাদের টাকা নাই যে, গরীব-মানুষি করিয়া উঠিতে পারে। আমার মনের এক সাধ আছে যে, এত বড় মানুষ হইতে পারি যে, অসঙ্কোচে গরীব-মানুষি করিয়া লইতে পারি! এখনো এত গরীব মানুষ আছি যে গিল্টি করা বোতাম পরিতে হয়, কবে এত টাকা হইবে যে সত্যকার পিতলের বোতাম পরিতে সাহস হইবে!

এখনো আমার রূপার এত অভাব যে অন্যের সমুখে রূপার থালায় ভাত না খাইলে লজ্জায় মরিয়া যাইতে হয়। এখনো আমার স্ত্রী কোথাও নিমন্ত্রণ খাইতে গেলে তাহার গায়ে আমার জমিদারীর অর্দ্ধেক আয় বাঁধিয়া দিতে হয়! আমার বিশ্বাস ছিল রাজশ্রী ক বাহাদুর খুব বড়মানুষ লোক। সে দিন তাঁহার বাড়িতে গিয়াছিলাম, দেখিলাম তিনি নিজে গদীর উপরে বসেন ও অভ্যাগতদিগকে নীচে বসান, তখন জানিতে পারিলাম যে তাঁহার গরীব-মানুষি করিবার মত সম্পত্তি নাই।

এখন আমাকে যেই বলে যে, ক রায়বাহাদুর মস্ত বড়মানুষ লোক, আমি তাহাকেই বলি,"সে কেমন করিয়া হইবে? তাহা হইলে তিনি গদীর উপর বসেন কেন?" উপার্জ্জন করিতে করিতে বুড়া হইয়া গেলাম, অনেক টাকা করিয়াছি, কিন্তু এখনো এত বড়মানুষ হইতে পারিলাম না যে আমি বড়মানুষ এ কথা একেবারে ভুলিয়া যাইতে পারিলাম। সর্ব্বদাই মনে হয় আমি বড়মানুষ। কাজেই আংটি পরিতে হয়, কেহ যদি আমাকে রাজাবাহাদুর না বলিয়া বাবু বলে, তবেই চোক রাঙাইয়া উঠিতে হয়।

যে ব্যক্তি অতি সহজে খাবার হজম করিয়া ফেলিতে পারে, যাহার জীর্ণ খাদ্য অতি নিঃশব্দে নিরুপদ্রবে শরীরের রক্ত নির্ম্মাণ করে, সে ব্যক্তির চব্বিশ ঘণ্টা "আহার করিয়াছি' বলিয়া একটা চেতনা থাকে না। কিন্তু যে হজম করিতে পারে না, যাহার পেট ভার হইয়া থাকে, পেট কামড়াইতে থাকে, সে প্রতি মুহূর্ত্তে জানিতে পারে যে, হাঁ, আহার করিয়াছি বটে।

অনেকের টাকা আছে বটে, কিন্তু নিঃশব্দে টাকা হজম করিতে পারে না, পরিপাকশক্তি নাই-- ইহাদের কি আর বড়মানুষ বলে! ইহাদের বড়মানুষি করিবার প্রতিভা নাই। ইহারা ঘরে ছবি টাঙ্গায় পরকে দেখাইবার জন্য; শিল্পসৌন্দর্য্য উপভোগ করিবার ক্ষমতা নাই, এই জন্য ঘরটাকে একেবারে ছবির দোকান করিয়া তুলে। ইহারা  গণ্ডা গণ্ডা গাহিয়ে বাজিয়ে নিযুক্ত রাখে, পাড়াপ্রতিবেশীদের কানে তালা লাগাইয়া দেয়, অথচ যথার্থ গান বাজনা উপভোগ করিবার ক্ষমতা নাই। এই সকল চিনির বলদদিগকে প্রকৃতি গরীব মনুষ্য করিয়া গড়িয়াছেন। কেবল কতকগুলা জমিদারী ও টাকার থলিতে বেচারাদিগকে বড়মানুষ করিবে কি করিয়া?"

[গরীব হইবার সামর্থ্য- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]