Saturday, December 20, 2008

ঢাকা নিয়ে কচকচানি

ঢাকার বাইরের লোক হয়েও ঢাকা আমার খুব প্রিয় শহর ছিল একসময়। আকাশ ছোঁয়া দালানের দিকে তাকিয়ে মতিঝিলের ফুটপাত ধরে হাটতে হাঁটতে নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ন কেউকেটা মনে হতো। সেই কৈশোরে আমার ধারনা ছিল ঢাকায় যাদের যেতে হয় তারা সাধারন কেউ না। ঢাকা যাওয়ার আগের আর পরের ক'টা দিন মুখিয়ে থাকতাম এরকম কয়েকটা রেডী উত্তর নিয়ে -"এই একটু ঢাকা যেতে হবে কাল", "আর বলিস না, ঢাকা যেতে হয়েছিল গত সপ্তাহে"। সবসময় কোন না কোন ছুতায় ঢাকা যাবার উপায় খুঁজতাম। কোন কাজ না থাকলেও শ্রেফ বইমেলায় যাবার অজুহাতে ঢাকা চলে যেতাম। বেমক্কা ঘুরতাম রাস্তায় রাস্তায়। মানুষ, গাড়ী, দালান সবকিছু কেমন স্বপ্নময় মনে হতো। যা দেখি তাই ভালো লাগে, যা খাই তাই তৃপ্তিময়। ঢাকার সবকিছুই সুন্দর মনে হতো। এমনকি সদরঘাট-রামপুরা রোডের লক্কর-ঝক্কর বাসগুলো পর্যন্ত। সদ্য কৈশোরোত্তীর্ন তরুনের রোমান্টিকতার জগতে ঢাকা শহরের ব্যাপক ভুমিকা ছিল।

বিশ-বাইশ বছর আগে ঢাকা শহর এত যানজটপূর্ন ছিল না। শহরের যে কোন জায়গায় স্বচ্ছন্দেই যাওয়া যেতো। মালিবাগে খালার বাসায় থাকা-খাওয়া চলতো, বাকী সময় ঘুরতাম ফিরতাম এদিক সেদিক। বাসে বা রিক্সায় করে যেখানে খুশী যাওয়া যায়। রমনা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টিএসসি এলাকায় বেহুদা ঘুরাঘুরির নেশা ছিল। পাবলিক লাইব্রেরী, আজিজ মার্কেটে বইয়ের দোকানেও গুজগুজ করতাম। নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকে দাম দেখে অর্ধভোজনের অতৃপ্তি নিয়ে ফিরে যেতাম গুলিস্তান, নয়াপল্টন, কাকরাইল কিংবা বায়তুল মোকাররমের সামনের ফুটপাতে পুরোনো বইয়ের টালে। হকারের সাথে খাপ-খুপ খাতির জমানোর চেষ্টা করতাম সস্তায় বই পত্তর মেলানোর আশায়। সুকান্ত, জীবননান্দ থেকে পিয়ার্স এনসাইক্লোপেডিয়া পর্যন্ত বিশ পঞ্চাশ টাকায় মিলে যেত কখনো কখনো। চাটগাঁ ফিরে যাবার গাড়ী ভাড়া বাদে সব টাকা ফুটপাতে বিলিয়ে ফিরে আসতাম মালিবাগের বাসায়।

যদিও ঢাকার নির্দিষ্ট গন্ডির বাইরে কিছু চিনতাম না, তবু রাস্তায় হারিয়ে যাবার কোন ভয় ছিলনা। এমনকি মীরপুর পাইকপাড়ার ভেতর গলির খালাতো বোন জলি আপার বাসাটা খুঁজে বের করতেও মোটে বেগ পেতে হতো না। যদিও প্রতিবার রাস্তা হারিয়ে ফেলতাম নতুন নতুন দালানের ভীড়ে, তবু কোন অনিশ্চয়তায় ভুগতাম না।

সেই ঢাকা শহর আমার কাছে অচেনা লাগে। ভীষন অচেনা। যেন কখনো আসিনি এই শহরে। সবকিছুই নতুন লাগে। এত ভীড়, এত যানজট, কেবল রাস্তা হারিয়ে ফেলার ভয় কাজ করে। যে আমি একসময় যাত্রাবাড়ী থেকে মিরপুর পর্যন্ত অবাধে ঘুরে বেড়াতাম, সেই আমি এখন আরামবাগ থেকে রাজারবাগ একা যেতে ভরসা পাইনা সন্ধ্যা সাতটায়। গুলশানে যেতে হলে অবশ্যই সাথে নিই ঢাকা অফিসের আলীকে। নাহলে কোথায় কোন বিপাকে পড়ি। এমনকি ব্যক্তিগত কাজে গেলেও ঢাকা পৌছার আগেই ফোন করি আলীকে, আলী ফোন পেলেই বোঝে কী করতে হবে, "কোথায় আসতে হবে স্যার, আরামবাগ না কলাবাগান?" হাসিখুশী লোকটা এসে আমাকে বনানীর রেষ্টহাউজে কিংবা হোটেলে নিয়ে যাবে। রেষ্টহাউজে সে একা থাকে। নিজেই রান্নাবান্না করে খায়। আমাকে পেলে বন্ধুর মতো গল্প করবে। হোটেলে বুকিং না থাকলে বলি, "আজ রাতে তোমার হাতের টেংরা মাছের ঝোল খাবো।"

আরেকবার বাস থেকে আরামবাগে নেমে ওর জন্য অপেক্ষা করছি, কিন্তু সে গাড়ী নিয়ে মালিবাগ রেলগেটের জ্যামে আটকে আছে ঘন্টাখানেক। রাত নটা বাজে প্রায়, আমি যাবো রাজারবাগের হোটেল আশরাফীতে, ঢাকায় গেলে মাঝে মাঝে ওখানেই থাকি। কাছাকাছি জায়গা। কিন্তু গত কয় বছরে আমি এমনই পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছি যে এই সামান্য পথটাও একা যেতে ভরসা পাচ্ছিলাম না। এমকি রাস্তাটা কোথা দিয়ে রাজারবাগ পৌছেছে তাও মনে পড়ছিল না অন্ধকারে। তবু এদিক ওদিক তাকিয়ে নিরাপদ চেহারার একটা বুড়া রিকশাওয়ালা দেখে উঠে পড়লাম। দুরুদুরু বুকে কোন অঘটন ছাড়াই কিছুক্ষনের মধ্যেই হোটেলে পৌছালাম। এই যে 'দুরুদুরু বুকে' ঢাকা শহরে চলাচল, এটা আমার বয়সের পরিবর্তন নাকি ঢাকা শহরের পরিবর্তন, বুঝি না।

ঢাকা এখন আর ভালো লাগে না। একদমই না। যখনই ঢাকা যেতে হয় কখন কাজ শেষ করে পালিয়ে আসবো সে চিন্তায় থাকি। এত মানুষের ভীড়, এত গাড়ী, এত ধুলা, এত ধোঁয়া, দমবন্ধ হয়ে আসে। যে রাস্তা, যে ফুটপাত দিয়ে বিশ-বাইশ বছর আগে স্বচ্ছন্দে হেঁটে বেড়িয়েছি সেখানে এখন পা রাখারও জো নেই। কোটি মানুষের শহর ঢাকা। ব্যস্ততম শহর ঢাকা। স্বার্থপর শহর ঢাকা। ঢাকার মানুষের স্বার্থপরতা নিয়ে খুব গল্প শুনতাম। আসলেই কী স্বার্থপরতা, নাকি নিরুপায়তা। জীবন যাপনের জন্য যখন এই স্বার্থপরতা অপরিহার্য, তখন তাকে আমি দোষ দেই না। আরেকটু কম স্বার্থপর হতে হলে যেটুকু সামর্থ্য থাকা দরকার সেটা সবার নেই, কিংবা বেশীরভাগের নেই। আমার বেশ কিছু কাছের বন্ধু ঢাকায় আস্তানা গেড়েছে অনেক বছর ধরে। এই স্বার্থপরতা কিংবা ব্যস্ততার পাতা জালে সবাই এমন আষ্টেপৃষ্টে আটকে গেছে কেউ কারো নিয়মিত খোজ খবর নেয়ার সুযোগ পায় না। অথচ একটা সময় ছিল দিনে অন্ততঃ একবার দুই বন্ধু মিলে ঘন্টাখানেক গেজাতো কোথাও বসে। ফকিরাপুলে রুপুদের বাসায় আমাদের সেই আড্ডাটার কথা মনে পড়লো। দিনরাত কেউ না কেউ আড্ডা দিচ্ছে ওখানে। পুরো ঘরে কার্পেট পাতা, বিরাট দুটো রুম। কেউ ঘুমোচ্ছে, কেউ সিগারেট টানছে, কেউ ডাইলের বোতল নিয়ে এসেছে সন্ধ্যা হতে না হতেই, কেউবা তাশ পেটাচ্ছে। বাজার রান্না সব করে দিচ্ছে অসাধারন রাধুনী রাশিদার মা। রাশিদার মা এখন কোথায় আছে কে জানে। এত ভালো বুয়া এমন ভালো রান্নার হাত আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। ঢাকার বন্ধুতো বটেই, চট্টগ্রাম থেকে আমরা সবকটা ওখানেই উঠতাম আড্ডার লোভে। প্রত্যেকেই এমন হুজুগে ছিল যে পরিকল্পনা ছাড়াই একবার সবাই মিলে হুট করে লালমনিরহাটের বাসে উঠে চলে গিয়েছিলাম বুড়িমারী সীমান্তে। থাকার জায়গা নাই বলে বাস কোম্পানীর এক স্টাফকে ধরে তার পেছনের একটা রুমে গাদাগাদি রাত্রিযাপন। কে একজন নিয়ে এল রূহ আফজা কালারের ভুটানী মদ। ভরপেট টাল মাতাল তরুনের দল পাশের ভারতীয় সীমানার কাছে গিয়ে পেশাব করে দিয়ে বিএসএফ এর হুংকারে হৈ হৈ ছুটে আসা। সেই জোৎস্না রাতে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত রোডে নো ম্যানস ল্যান্ডের কাছে সেই মাতালীয় ছোটাছুটির স্মৃতি, আহ্ কী সুধাময়।

ঢাকার রাস্তার ব্যস্ততা সম্পর্কের মধ্যেও কেমন দুরত্ব সৃষ্টি করে একটা উদাহরন দেই। বছর তিনেক আগে আমি কারওয়ান বাজারের অ্যাংকর টাওয়ারে গেলাম একটা কাজে। ওই কাজ সেরে আগারগাঁও যেতে হবে, যাবার পথে জাহাঙ্গীর টাওয়ারে বন্ধু মামুনের সাথে দেখা করবো। অনেকদিন দেখা হয়না ওর সাথে। অ্যাংকর টাওয়ার থেকে বেরিয়েই জ্যামে পড়লাম। জাহাঙ্গীর টাওয়ার যেতে হলে গাড়ীকে বাঁয়ে অনেকদুর ঘুরে আসতে হবে বিপরীত রাস্তায়। সরাসরি যাবার উপায় নেই। কিন্তু মোড়ের কাছাকাছিই আটকে থাকলাম অনেকক্ষন। মামুন ফোন করছে বারবার। আমি তাকিয়ে দেখছি ওর অফিস বিল্ডিংটা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমি ওখানে পৌছাতে পারছি না সহজে। অনেক সময় লাগবে ঘুরে আসতে। হেটে গেলে পাচ মিনিট লাগবে বড়জোর। কিন্তু গাড়ীকে জ্যামে রেখে কীভাবে হেটে যাবো। মুশকিলে পড়লাম। ওদিকে সময়ও কম। আগারগাঁওএর কাজ সেরে বাস ধরতে ছুটতে হবে আরামবাগে। হিসেব মেলাতে পারলাম না। অবশেষে এত টাইট শিডিউলের চাপে পড়ে মাত্র ২০০ গজ দুরে থাকা প্রিয় বন্ধুকে দেখার সাধ বিসর্জন দিতে হলো। ওকে ফোন দিয়ে বললাম, "দোস্ত মাফ করে দে, তোর অফিসের সামনেই আছি, কিন্তু উল্টাদিকে। রাস্তার যা অবস্থা তোর সাথে দশ মিনিট আড্ডা দেবার লোভ করতে গেলে আজকে যাওয়াটাই বাতিল করতে হবে, পরেরবার নিশ্চয়ই সময় করতে পারবো।"

তুই এখন কেমন আছিস জাহাঙ্গীর টাওয়ারের পাঁচতলায়? বন্ধু কী খবর বল, কতদিন দেখা হয় না!

একজন 'বাঘা মমিন'

পকেটে ঘাটতি বাজেটের মানিব্যাগ নিয়ে কোরবানীর গরু কেনার জন্য সাগরিকার রোডের সিডিএ মার্কেটের কাছাকাছি যেতেই একটা হৈ চৈ কানে এলো বাজারের গেটের দিক থেকে। লোকজন দিশেহারা হয়ে কিছু একটা থেকে বাঁচার জন্য বাজারের ভেতর থেকে পরি কি মরি করে ছুটে বেরিয়ে এসে রাস্তার চলন্ত-থামন্ত বাস-ট্রাকের সামনে গিয়ে পড়ছে। আরেকটু পেছনে চোখ পড়তেই যা দেখলাম তাতে আমিও তিন লাফে চলে গেলাম পাশ্ববর্তী দোকানের পেছনে। কারন ধাবমান জনতার পিছু পিছু ছুটে আসছে দড়ি ছেঁড়া কালো রঙের বিশাল এক পাগলা ষাঁড়। পরিস্থিতি ঠান্ডা হয়ে এলেও বাজারে ঢুকতে ভরসা পেলাম না। এমনিতে কোরবানীর হাটে যাওয়া আমার পছন্দ না, কুরবানি করতে গিয়ে খামাকা পাগলা গরুর হাতে শহীদ হওয়ার কোন ইচ্ছে নেই আমার। তবু পরিবারের একমাত্র পুরুষ হওয়াতে নিতান্ত বাধ্য হয়েই যেতে হয়। যাই ঠিকই কিন্তু বাজারে ঢুকিনা। এবারও যথারীতি সাথে আসা গরু ধরতে অতি উৎসাহী কাজের ছেলেটাকে বলি, যা ভেতর থেকে তোর পছন্দমতো কোন একটা গরু নিয়ে আয়, কিন্তু ত্রিশ হাজারের বেশী যাবি না।

আমি বাজারের বাইরে একটা বন্ধ দোকানের সামনের ভাঙ্গা দেয়ালের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আয়েশ করে একটা সিগারেট ধরালাম। রাস্তায় গাড়ী-মানুষের হাড্ডাহাড্ডি ভীড়, গ্রামমুখী মানুষের অসহনীয় দুর্ভোগ দেখতে দেখতে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হলো গ্রামে যেতে হয়নি বলে। পাশে একটা গরু পেটানো বেত হাতে চুপচাপ বসে থাকা দীন-হীন মলিন পোষাকের বুড়ো লোকটাকে দেখে কথা বলতে ইচ্ছে হলো। মানুষকে জানা আমার একটা শখ। প্রথম পর্বের কথোপকথন এরকম।

-আপনার গরু আছে?
-না
-ওহ্........গরু ছিল?
-ছিল
-এখন নাই?
-নাই
-সব শেষ?
-শেষ

কথা জমলো না। নিরাসক্ত বুড়ো মুখ ফিরিয়ে রাস্তার মানুষ গননায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো। একটু পরে ফস করে বিড়ি ধরালো একটা। খেয়াল করলাম তার দুপায়ের মাঝখানে একটা মশার কয়েল জ্বলছে। আবার চেষ্টা করলাম।
-খুব মশা, তাই না?
-খুব
-গরু কোথা থেকে আনছেন?
-দুর থেইকা
-কোন দুর
-ফরিদপুর
-অনেকদুর...কয়টা আনছেন?
-৩০/৩২টা
-লাভ কেমুন?
-হইছে...
-কয়দিন আগে আসছেন
-৭দিন
-কখন শেষ হইছে?
-আইজ
-এখানে আছিলেন কই?
-বোডিং-এ
আবার চুপ। আমার ছেলেটাও গরু নিয়ে ফিরছে না। কতক্ষন আর বসে থাকা যায়। আবার খাজুরে আলাপ জুড়াবার চেষ্টা। বুড়া আমাকে ছিনতাইকারী ভাবছে কিনা কে জানে। ফুসলিয়ে গরু বিক্রির টাকাগুলো হাতিয়ে নেবো ভাবছে হয়তো। তাই সাবধানে কথা বলছে। কিছুক্ষন নীরবতার পর বুড়ো আপনমনে কথা বলে উঠলো-
-আমার শেষ গরু দুইটা পাশের এক বেপারী কিনে নিছে। কদিনে খাতির হয়ে গেছিল তার সাথে। সকালে সে এসে বললোঃ
=কাহা, আমি এই গরু দুইটা নিবাম
=নেও, অসুবিধা কি
=দাম চাইবার পারবেন না কিন্তুক
=আইচ্ছা
=আমি যা দিমু নিতে হইবো
=ঠিক আছে নিমু
=কোন দরাদরি করতে পারবেন না
=কইলামতো, তুমি যা খুশী দাও
=এই লন, গুনতে পারবেন না।
=আইচ্ছা
-টাকার বান্ডিল পকেটে দিয়া চলে গেল। গুনে দেখি সত্তর হাজার আছে। অথচ আমি ভাবছিলাম পঞ্চাশ হবে। তারে আবার ডাক দিলাম।
=ওই মিয়া শোনো
=কাহা, আমি কিন্তুক আগেই কইছি আপনি কিছু কইবার পারবেন না। লেনদেন কিন্তুক শেষ।
=ঠিকাছে, কিন্তু গরুতো নিলা। কত বেচবা? মানে কত লাভ করবা এই দুইটা বেইচ্যা?
=দশ-পনের হাজার তো করবোই
=একটাতে না দুইটা মিল্লা?
=দুইটা মিল্লা
=তারপর কী করবা?
=বৌ-পোলাপান নিয়া মৌজে ঈদ করবাম।
=তুমি এই পাঁচ হাজার রাখো, আমারে বেশী লাভ দিছিলা। আমার লাভের কিছু অংশ তোমারে দিলাম।
=কী বলেন কাহা, আপনি আজব মানুষ!!
-তারপর সে খুশী হয়ে চলে গেল। আমার খুব ভালো লাগলো দেখে।
-আপনি তো মহান মানুষ চাচা
-আমি সামান্য মানুষ বাবা। একসময় ছোট চাকরী করতাম। রিটায়ার করার পর থেইক্যা গত ১৮ বছর গরুর কারবার করি। এইখান থেকে গিয়ে দশ বারোদিন আরাম করবো। তারপর গরুর হাটে গিয়ে ৪০টার মতো গরুবাছুর কিন্যা খামারে ঢুকায়া দিব। আগামী কোরবান পর্যন্ত ওগুলা বাইরে আসবে না। খইল-ভুষি আর যত রকম ভালো খাবার আছে সব খাওয়ামু। তারপর কোরবানীর একসপ্তাহ আগে বাইর কইরা সোজা হাটে। আমি কোন গরু ৫ হাজার টাকার উপরে কিনি না। ২ থেকে ৫ হাজারের মধ্যে সবগুলা।
-আপনি তো অনেক বড়লোক চাচা।
-নারে বাবা, ৬৫টাকা বেতনে সার্ভিসে যোগ দিছিলাম ৫০০০ টাকায় রিটায়ার করছি। রিটায়ার করার সময় ৬ লাখ টাকা নগদে পাইছি। সেই টাকায় এই গরুর কারবার করতাছি।
-কোন সার্ভিসে আছিলেন?
-এই আছিলাম ছোটখাট একটাতে। এহন কইতে চাইনা।
-গরু ব্যবসায় আপনার তো অনেক লাভ তাইলে?
-লাভ আছে, হিসাব করি না, সংসার ভালোই চলে আল্লার রহমতে
-ছেলে মেয়ে আছে?
-আছে
-কয়জন
-১১জন, ৭ ছেলে ৩ মেয়ে
-খাওয়ার লোক তো অনেক।
-তা আছে। নাতিপুতি মিলে ৫৪ জন
-বলেন কি? এতো বিরাট মিছিল।
-তা ঠিক, প্রতিদিন আমার ঘরে চাল লাগে ২৫-৩০ কেজি, তার উপর মেহমানতো আছেই।
-দিনে ২৫-৩০ কেজি? (আমি ভিড়মি খাই মনে মনে, আমার সারা মাসের বাজেট)
-অবাক হইলেন? আমার একার কত চাল লাগে আন্দাজ করেন তো?
-পারলাম না
-আমি দেড় কেজি চালের ভাত খাই এক বেলায়, রাতের বেলা রুটি খাই এক কেজি আটার
-বলেন কী? (আমি মনে মনে হিসেব করতে গিয়ে হোচট খাই)
-আমরা যা খাইছি আজকালকার পোলাপানরে তার কিছুই তো দিতে পারি না। সবকিছুতে ভেজাল।
-আপনার ছেলেমেয়েরা কী করে
-কেউ বিদেশে থাকে, কেউ দেশে কাজ কারবার করে
-গরুর কারবার আপনি একা করেন?
-একাই করি, আমার বাড়ীর সাথেই গরুর ঘর। দেড় বিঘার উপর বাড়ীটা।
-বিরাট ব্যাপার, দুধের গরু নাই?
-আছে দুইটা, বিশ কেজির মতো দুধ পাই, ঘরের খাওয়া চলে, আর একটা রামছাগল আছে, শখের পালা। ওইটাও দেড় কেজি দুধ দেয়। তবে রামছাগলের খরচ অনেক তিনবেলাই ভাত খায়, ছাগলের পিছনে ডেইলী খরচ লাগে ১০০ টাকার মতো। তবু শখের কারবার।
-আপনার শখ দেখে আমার লোভ লাগতেছে, আমিও আপনার সাথে গরুর কারবার করবো
-হে হে হে
-আপনার নাম কী? আপনার সাথে যোগাযোগ রাখবো
-আমার নাম আবদুল মমিন খান, তবে বাঘা মমিন বললে লোকে চিনে বেশী, ফরিদপুর সদরে বাস।
-বাঘা মমিন মানে?
-আমার দাদায় আমারে আদর কইরা ডাকতো, আমার নাকি সাহস বেশী
-৭১ সালে আপনি কোথায় ছিলেন? যুদ্ধ করছেন?
-যুদ্ধের সময় জান বাচায়া লুকায় আছিলাম
-পুলিশের অনেকে তো যুদ্ধ করেছে। আপনি পুলিশে ছিলেন, তাই না?
-জী। কিন্তু যুদ্ধের ঝামেলায় না গিয়ে পরিবারকে রক্ষা করছি
-আপনারে কোথায় পাবো ফরিদপুরে
-ফরিদপুর সদরে বাঘা মমিন বললে লোকে দেখিয়ে দেবে
-আপনি তো বিখ্যাত লোক
-আমার একটা কুকুর আছে, নাম ভুলু, সে আমার চেয়ে বিখ্যাত
-বলেন কী?
-ভুলু আমার সব কাজ করে দেয়, এমনকি বাজারটা পর্যন্ত।
-আরে, মজার ব্যাপার তো?
- আমি যদি ভুলুকে বলি, ভুলু যা বাজারটা নিয়ে আয়। ভুলু ঘেউ ঘেউ করে ছুট লাগাবে বাজারের নির্দিষ্ট দোকানে। ভুলুর গলার বেল্টে ছোট একটা ব্যাগে কাগজের স্লিপে বাজারের লিষ্টি দেয়া থাকে। ভুলু দোকানের সামনে গিয়ে দাড়ালে চেনা দোকানদার ভুলুর গলার ব্যাগ থেকে কাগজটা নিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো ব্যাগে ভরে ভুলুর গলায় ঝুলিয়ে দেবে। কিন্তু ভুলু নড়বে না। দুবার ঘেউ ঘেউ করবে। তখন দোকানদার ছোট একটা আধপাউন্ডের পাউরুটি সামনে দিলে ভুলু গপগপ করে খেয়ে দুবার ঘেউ ঘেউ করে ধন্যবাদ দেবে। তারপর বাজারের থলেটা কামড়ে ধরে ছুট লাগাবে। রাত দশটার সময় বাড়ীর চারপাশে ছেড়ে দেই ওকে। সারারাত পাহারা দেয়।
-বাহ, আপনার কুকুরতো বড় আশ্চর্য? সরাইলের নাকি?
-জী, সরাইল থেকে আনছি

এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠলো আমার, গরু কেনার সংবাদ এলো। আমি বিদায় নিলাম বাঘা মমিনের কাছ থেকে। মানুষের জীবনের বিচিত্র কাহিনীর কথা ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে এলাম বাজারের ভিড় থেকে।

Thursday, December 4, 2008

সাতকানিয়ায় এক স্বাধীনতা দিবসে

সময়টা ২০০২ সাল। জোট সরকার সদ্য ক্ষমতায় আসীন। সাতকানিয়া উপজেলার ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসের সরকারী অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেলাম। পরিবারের একজন সদস্য উপজেলার সরকারী কর্মকর্তা হবার সুবাদে এই দাওয়াত। উপজেলার একটা স্কুল মিলনায়তনে বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠান শুরু হবে। একে একে অতিথিবৃন্দ আসছেন। আমাকে দর্শকদের প্রথম সারিতে নিয়ে বসানো হলো। এই প্রথম মফস্বলের এধরনের একটা অনুষ্ঠানে এসেছি। এই এলাকাটা জামাতের শক্ত ঘাটি, সেকারনে আমার আগ্রহটা একটু বেশী। অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষন এলাকার সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহনে আলোচনা সভা এবং আমন্ত্রিত সব মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সনদ ও পুরস্কার বিতরন।

অনুষ্ঠান শুরু হলো। অতিথিদের নাম ঘোষিত হচ্ছে। সভাপতি স্বয়ং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। তাছাড়া অন্যান্য অতিথিদের মধ্যে গন্যমান্য ব্যক্তিদের নাম ঘোষনা হচ্ছে। সবশেষে ঘোষিত হলো প্রধান অতিথির নাম। প্রধান অতিথি হিসেবে যার নাম ঘোষিত হলো, তিনি সাতকানিয়ার জামায়াতে ইসলামীর আমীর। প্রধান অতিথির নামটা শুনে আমি একটু চমকে গেলাম। এই লোক একাত্তরের চিহ্নিত রাজাকার এবং পাকিস্তানীদের প্রিয় দোসরদের একজন। এই রাজাকার আজ স্বাধীন দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের কে স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদানের জন্য সনদ ও পুরস্কার দেবেন!! হায় স্বাধীনতা, হায় বাংলাদেশ, হায় লক্ষ শহীদের আত্মা!!! পরে জেনেছি ওটা ছিল জোট সরকারের অবিস্মরনীয় বিজয়ের ফসল। এলাকায় আর কারো প্রধান অতিথি হবার জো নেই। ওই আমীরের আঙ্গুলি হেলন ছাড়া কারো সাধ্য নেই এখানে কিছু করার। আমার তক্ষুনি ছুটে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল অনুষ্ঠান থেকে। তবু থাকলাম কৌতুহলবশতঃ।

রাজাকার বেষ্টিত অনুষ্ঠানে স্বাভাবিকভাবেই একাত্তর নিয়ে স্মৃতিচারনে রাজাকারদের ভুমিকা নিয়ে কেউ কোন কথা বললো না। প্রধান অতিথি জামাত আমীর তার ভাষনে বললেন, "একাত্তরের যুদ্ধ খুব দুঃখজনক ঘটনা। আমরা যুদ্ধের সময় একেকজন একেকভাবে দেশের জন্য কাজ করেছি। প্রত্যেকের অবদান স্মরনীয়। আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে যুদ্ধের শুরুতে আমরা কীভাবে পাকিস্তানী হামলা থেকে আমাদের এলাকাকে রক্ষা করেছি, শান্তি কমিটি করেছি, বাহিনী করেছি। পাকিস্তানীদেরকে দেখাতে হয়েছে এলাকায় কোন মুক্তিযোদ্ধা নেই। এখানে সবাই পাকিস্তানের সমর্থক। ওদের সাথে হাত মিলিয়ে এলাকার জনগনের জানমাল রক্ষা করেছি। ব্যাপক ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছি সাতকানিয়াকে। আমি জানি কিছু মানুষ আমাদের ভুমিকা নিয়ে বিভ্রান্ত হয়েছে, আমাদর কার্যক্রমকে ভুলভাবে নিয়েছে। কিন্তু আসলে তো আমরা দেশের স্বাধীনতার জন্যই কাজ করেছিলাম। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশ স্বাধীন হয়েছে। আজকে তাই আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করবো তাদের আত্মত্যাগের জন্য।" ইত্যাদি ইত্যাদি।

এরপর মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ধরে ধরে মঞ্চে ডাকা হলো পুরস্কার ও সনদের জন্য। খুব কষ্ট হলো হতভাগ্য মুক্তিযোদ্ধাদের করুন অসহায় নির্বাক চেহারা দেখে। যে দেশের জন্য এরা নিজের জীবনটাকে আজরাইলের হাতে তুলে দিয়েছিল বিনা দ্বিধায়, সেই দেশ কী দিয়েছে এদের? স্বাধীন দেশের ফসল খাচ্ছে আজ পাকিস্তানী দালালেরা। মুক্তিযোদ্ধাদের একজনকেও দেখলাম না সোজা হয়ে দাড়ানোর শক্তি আছে, এত অভাবী মানুষ এরা। প্রত্যেককে শাড়ি লুঙ্গি আর ভাতের থালা প্রদান করা হলো। একজন করুন স্বরে আবেদন করলেন লুঙ্গির বদলে একটা শাড়ী দিতে, কারন নিজের লুঙ্গির চেয়ে বউয়ের শাড়ীটা বেশী দরকার। আয়োজকদের কটুদৃষ্টির সম্মুখীন হয়েও অধিকার আদায়ে নাছোড়বান্দা তিনি। পরে প্রধান অতিথি রাজাকারের বদান্যতায় লুঙ্গির বদলে শাড়ী পেলেন তিনি!

পুরস্কার প্রদান পর্ব শেষ হলে প্রধান অতিথি মঞ্চ থেকে নেমে আসলেন। বসলেন আমার পাশে। বসে জামাতী কায়দায় হাত মেলালেন। আমার শরীর ঘিনঘিন করে উঠলো। ভাবলাম, এই হাতে কত মানুষ প্রান হারিয়েছে, কত মুক্তিযোদ্ধা পঙ্গু হয়েছে। হয়তো তাদের স্বজনেরা এই হলরূমেই আছে। আমি যেন একটা সিনেমা দেখছিলাম। এসব দৃশ্য আগে সিনেমার পর্দায়ই দেখতাম কেবল। আমার সাথে খুচরা আলাপ জমানোর চেষ্টা করলেন জামাত আমীর, বললেন আমাকে বোধহয় তিনি চেনেন, কোথাও দেখেছে ইত্যাদি। আমি তেমন জবাব দিলাম না। পাত্তা দিচ্ছি না বুঝতে পেরে তফাত রইলেন।

অনুষ্ঠানের শেষদিকে একজন হাড় জিরজিরে মুক্তিযোদ্ধা দর্শক গ্যালারী থেকে উঠে দাঁড়ালেন। চরম দারিদ্র আর বয়সের ভারে ন্যুজ, কিন্তু চোখটা এখনো ঈগলের মতো তীক্ষ্ণ। দেখে বোঝা যায় এ বান্দা মাথা নোয়াবার নয়। জানালেন মঞ্চে গিয়ে কিছু বলতে চান। সভাপতি অনুমতি দিলেন।

মঞ্চে উঠে জ্বালাময়ী কন্ঠ গমগম করে উঠলো হলরুমে, "আমাদের কী সৌভাগ্য!! আপনারা লুঙ্গি-থালা-বাসন দিয়ে আমাদের পুরস্কৃত করলেন। প্রতি বছরই করেন। কিন্তু আমরা কী বছরে একবার শাড়ি-লুঙ্গি-বাসন-কোসন পাবার জন্য যুদ্ধ করেছি, এইদেশ স্বাধীন করেছি? আমাদের জীবনটা কী এতই তুচ্ছ? কারা এদেশকে স্বাধীন করেছিল, আর কারা স্বাধীনতা চায় নি, আমরা কী তাদের চিনি না? যারা এদেশের স্বাধীনতা চায়নি তাদের কাছ থেকে পুরস্কার নিয়ে আমরা কী আজ লক্ষ শহীদকে সম্মান দিলাম? এটা সরকারের কাছে আমার প্রশ্ন। আমাদের আর কত অপমান করবেন এভাবে? চাইনা আপনাদের লুঙ্গি শাড়ী, চাইনা আপনাদের সার্টিফিকেট। আমরা শুধু মিনতি করছি, জীবনের তো বেশী বাকী নেই আমাদের, যেটুকু আছে তা অন্ততঃ আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে দিন।" চোখে পানি নিয়ে বক্তৃতা শেষ করলেন প্রৌড় মুক্তিযোদ্ধা।

পুরো হলরুমে পিনপতন নিস্তব্ধতা। রাজাকার এলাকায় এতটা সাহস কেউ আশা করেনি। শরীরে রোগা হলেও চেতনায় উজ্জীবিত এই মুক্তিযোদ্ধা। এই চেতনাই তো আমাদের শক্তি। এই শক্তির জোরেই আমরা বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলাম একাত্তরে। সবাই উঠে দাড়িয়ে সম্মান জানালাম সেই সাহসী মুক্তিযোদ্ধাকে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের আঁধার নেমেছে তখন সাতকানিয়ায়। আমি অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করলাম অন্যরকম এক আবিষ্ট মন নিয়ে। আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি এখনো। এই চেতনা মরতে পারে না

Monday, December 1, 2008

VIVACE বাংলাদেশে বিপ্লব ঘটাতে পারে

এটি একটি স্বপ্নও হতে পারে, আবার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সুত্রপাতও হতে পারে। ভাইবেক (VIVACE- Vortex Induced Vibrations Aquatic Clean Energy) নামের সদ্য আবিষ্কৃত এক প্রযুক্তি পুরো বিশ্বে বিদ্যুত আর জ্বালানী শক্তির হিসেব নিকেশ পাল্টে দিতে পারে। বন্যাপ্রবন নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য এ হতে পারে বিশাল আশীর্বাদ। সাধামাটা বহমান নদী যোগাবে বিদ্যুত। জোয়ার ভাটার গতিকে বিদ্যুত শক্তিতে রূপান্তরিত করে গ্রাম গন্জের ঘরে ঘরে পৌছে দেয়া সম্ভব হবে। এছাড়াও বিদ্যুত ঘাটতিতে জর্জরিত বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে বিদ্যুত উদ্ধৃত্ত দেশ এমনকি পরিনত হতে পারে বিদ্যুত রপ্তানীকারক দেশে। খুব বেশী দুরের স্বপ্ন কী?


পরিবেশবান্ধব এই যুগান্তকারী প্রযুক্তির উদ্ভাবক যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাভাল আর্কিটেকচার ও ম্যারিন ইন্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর Dr. Michael M. Bernitsas। নদী বা সমুদ্রের বহমান স্বল্পগতির জলরাশির গতিকে কাজে লাগিয়ে ঘুর্নায়মান টারবাইনের সাহায্যে বিদ্যুত উৎপাদন সম্ভব। মিশিগান ইউনিভার্সিটির ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সফল হবার পর বর্তমানে ডেট্রয়েট নদীতে একটা প্রোটোটাইপ পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে


নীচে এই প্রযুক্তির সরল চিত্র দেয়া হয়েছে। চিত্রে স্রোতের সাথে টারবাইনের ঘুর্নন গতির সম্পর্ক দেখানো হয়েছে



বিস্তারিত সংজ্ঞা পড়ুন এখানে

A novel approach to extract energy from flowing water currents. It is unlike any other ocean energy or low-head hydropower concept. VIVACE is based on the extensively studied phenomenon of Vortex Induced Vibrations (VIV), which was first observed 500 years ago by Leonardo DaVinci in the form of “Aeolian Tones.” For decades, engineers have been trying to prevent VIV from damaging offshore equipment and structures. By maximizing and exploiting VIV rather than spoiling and preventing it, VIVACE takes this ‘problem’ and transforms it into a valuable resource for mankind.

Vortex Induced Vibrations (VIV) result from vortices forming and shedding on the downstream side of a bluff body in a current. Vortex shedding alternates from one side to the other, thereby creating a vibration or oscillation. The VIV phenomenon is non-linear, which means it can produce useful energy at high efficiency over a wide range of current speeds.

VIVACE devices have many potential advantages, which improve installation survivability in the hostile underwater environment and enable low-cost power production by decreasing capital cost and minimizing maintenance.

High energy density - permits low cost energy to be produced from relatively small installations - requiring up to 50 times less ocean acreage than wave power concepts.
Simple and rugged moving parts - allows for robust designs that can operate for long periods in the underwater environment with minimal maintenance.
Low dependence on ocean/river conditions - application of non-linear resonance permits useful energy to be extracted over a wide range of current speeds.
VIVACE and other renewable energy technologies also face regulatory hurdles. Again, VIVACE is advantaged by salient benefits over other technologies.

Non-obtrusiveness - installations can be positioned beneath the surface, thereby avoiding interference with other uses, such as fishing, shipping and tourism.
Compatibility with marine life - VIVACE utilizes vortex formation and shedding, which is the same mechanism fish use to propel themselves through the water.
Prototype, funded by the U.S. Department of Energy and the Office Naval Research, is currently operating in the Marine Hydrodynamics Laboratory at the University of Michigan. This device has met and often exceeded expectations; thereby, providing strong evidence to proceed to the next scale, a multi-kilowatt field demonstration.



প্রযুক্তির মূল ধারনা পাবেন উপরের চিত্র থেকে



প্রচলিত জালানীর সাথে তুলনামূলক চিত্র দেয়া হয়েছে এই চিত্রে


বাংলাদেশের ভাগ্য বদলের সম্ভাব্য এই প্রযুক্তি আমার নজর কেড়েছিল বলে ব্যক্তিগত আগ্রহে যোগাযোগ করেছিলাম প্রযুক্তির আবিষ্কারক Dr. Michael M. Bernitsas সাথে। বাংলাদেশে প্রয়োগের প্রাসঙ্গিকতা উল্লেখ করে আমার কিছু প্রশ্ন নিয়ে আমি ওনাকে একটা মেইল পাঠিয়েছিলাম গত ২৫শে নবেম্বর। উনি আমাকে নিন্মোক্ত জবাব দিয়েছেন-


Dear Mr Rashid:

The VIVACE generator is scalable and can work in rivers. The amount
of electricity depends on the available space and speed. We have
several models and we are building a prototype with the US Navy which
we expect to be tested by the end of 2009.

MMB

Michael M. Bernitsas, PhD
Professor of Naval Architecture and Marine Engineering
Professor of Mechanical Engineering
Director, Marine Renewable Energy Laboratory
University of Michigan
Fellow ASME, Fellow SNAME
http://www.engin.umich.edu/dept/name/faculty_staff/bernitsas/

CTO Vortex Hydro Energy
http://www.vortexhydroenergy.com/

W: (734) 764-9317
C: (734) 223-4223

======================================


আমি ২০০৯ সালের মধ্যে প্রোটোটাইপ পরীক্ষা শেষ হবার জন্য অপেক্ষায় আছি। তারপর বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করবো বিদ্যুত শক্তির বিকল্প সুত্র এই 'ভাইবেক' প্রযুক্তিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় আনার জন্য।


[সকল চিত্র এবং তথ্যসুত্রের কপিরাইট http://www.vortexhydroenergy.com]

জ্যোতির্ময় নন্দীর একটা আংশিক কবিতা

অই যে চশমাধারী, মারাত্মক সিরিয়াস
চেহারাসুরত, যেন সারা দীন-দুনিয়ার যাবতীয়
দায়ভার তারই বৃষ স্কন্ধে কেউ চাপিয়ে দিয়েছে;
যেন সে পটল তুললে দুনিয়া এতিম হয়ে যাবে।

কিন্তু অই চশমাধারী, মারাত্মক সিরিয়াস
চেহারাসুরত, জানে না যে ওর মতো কত শত
বালস্য বাল/ “হরিদাস পাল” পৃথিবীর-প্রকৃতির
প্রগাঢ় প্রস্রাবের ফেনায় ভেসে গেছে……..।”

[আংশিক]
.....................
জ্যোতির্ময় নন্দীর একটা কবিতা

Sunday, November 23, 2008

বন্ধু আমার, ঘুনপোকায় খাচ্ছে তোমার জীবন

মাহমুদের বাবা যখন হঠাৎ মারা যায় মাহমুদ তখন মাত্র বিএ পাশ করেছে। ৪ভাই ৩বোন আর মাকে নিয়ে জীবনের সর্ববিষয়ে অনভিজ্ঞ মাহমুদ সংসার সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে খেতে অবশেষে একটা চাকরীর সন্ধান পেল। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীর চাকরীটা না পেলে গ্রামে গিয়ে হালচাষ করা ছাড়া উপায় ছিল না। এমনিতে গ্রামে বহুবছর যায়নি, পৈত্রিক সম্পত্তিগুলো চাচারাই দেখাশোনা ভোগদখল করে। চাকরীটা পাবার পর স্বস্তিকর জীবন শুরু হলো। কিন্তু নতুন জীবন শুরু হতে না হতেই একটা ভাই হঠাৎ মারা গেল দুঃখজনক এক ঘটনায়। বাবার পর ভাইকে হারিয়ে পাথর হয়ে গেল মাহমুদ। ওর চেহারার দিকে তাকানো যেতো না তখন। বোকা বোকা হয়ে গিয়েছিল। কিছুদিন পর আবার নতুন উদ্যমে শুরু। এই দ্বিতীয় যাত্রার প্রাক্কালে আমার সাথে মাহমুদের ঘনিষ্টতা জন্মায়। পড়াশোনার সুত্রে। মাহমুদ রাজনীতির পোকা ছিল। বাম রাজনীতির সক্রিয় কর্মী। ওর পুরো ঘর জুড়ে রাজনৈতিক বই। কালমার্কস, তাজউদ্দিন, মোনাজাতউদ্দিন থেকে শুরু করে রাজনীতি নিয়ে খ্যাত অখ্যাত যত বই দেখে সব কিনে। তবে সব পুরোনো বই। রেয়াজুদ্দিন বাজারে একটা পুরোনো বইয়ের দোকান আছে। অফিস শেষে প্রতিদিন বিকেলে ঘন্টাখানেক ওখানে কাটিয়ে বাসায় ফিরতো। আমারো বইয়ের নেশা ছিল বলে আমরা প্রতি সন্ধ্যায় বসতাম। বন্ধুদের মধ্যে আমরা দুজনই বাবাকে হারিয়েছিলাম সবার আগে। ফলে দুজনের মধ্যে সহমর্মিতা আর বোঝাপড়া ছিল বেশ।

সবকিছু যখন মোটামুটি স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছিল মাহমুদ একটা বোনের বিয়ে দিল ধুমধাম করে আমেরিকা প্রবাসী ছেলের সাথে। নিজের ভাল চাকরীর অফার পেতে লাগলো। ভাল পোষ্টে অফার পেয়ে নতুন একটা কোম্পানীতে যোগ দিল। তার কদিন পর শোনা গেল মাহমুদ বিয়ে করছে। আমরা অবাক। এমনকি ঘনিষ্ট বন্ধুরাও জানতো না। চাইনিজ হোটেলে বিয়ের চমৎকার অনুষ্ঠান হলো। মেয়েটা বয়স অল্প। ১৮/১৯ হবে। সুন্দরী তরুনী চটপটে বৌ পেয়ে মাহমুদ আমাদের প্রায় ভুলেই যায় আর কি। বিয়ের পরদিন থেকে বেশ কয়েকমাস দেখা নেই ওর সাথে। বেশীরভাগ ছেলে বিয়ের প্রথম দিকে বৌ নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকে, রোমাঞ্চ, দাওয়াত, সামাজিক আচার। তাই আমিও সন্ধ্যাবেলার বইয়ের আড্ডাটা বন্ধ করে দিয়েছি।

একবার বন্ধুরা সবাই মিলে কক্সবাজার বেড়াতে গেলাম। যে কজন বিয়ে করেছে সবাই বৌ নিয়ে গেছে একমাত্র মাহমুদ বাদে। কক্সবাজার পৌছে দুপুরে হোটেলে খাওয়া গোসল সেরে ব্যাচেলর আমি ঘোষনা করলাম, মহেশখালী ঘুরে আসতে যাচ্ছি আমি। ব্যাচেলর যে কেউ চাইলে সঙ্গী হতে পারে। আমার ঘোষনা শুনে ব্যাচেলর তো বটেই, বিবাহিত দুতিনজনও বৌকে লুকিয়ে আমার সাথে যোগ দিল। রাতে অবশ্য তাদের এজন্য যথেষ্ট খেসারত দিতে হয়েছিল বৌয়ের কাছে। সে গল্প আরেকদিন। মহেশখালি পৌছে আদিনাথ পাহাড়ে ছবি তোলার সময় হঠাৎ খেয়াল করলাম মাহমুদ কেমন যেন একলা একলা থাকতে চাইছে। চেহারায় কেমন যেন মলিনতা। কারো সাথে গল্পগুজব করছে না। আড্ডার তোড়ে ব্যাপারটা ভুলে গেলাম শীঘ্রই। ফিরে আসার কয়েকদিন মাহমুদের সমস্যার কথা জানতে পারলাম জাহেদের কাছ থেকে।

মাহমুদের বিয়ে খুব সংকটে। প্রায় ভঙ্গুর আর কি। মাহমুদের বৌয়ের আগে একবার বিয়ে হয়েছিল। মেয়েটা ঘর থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছিল একটা ছেলেকে। পরে বাবা মা ধরে এনে ডিভোর্স করিয়ে নিয়েছে। এখন আবার বিয়ে দিয়েছে মাহমুদের কাছে। মাহমুদ ব্যাপারটা জেনেছে বিয়ের ঠিক আগে আগে। বিয়ের কথাবার্তা চুড়ান্ত হবার আগে মেয়ের পরিবার মাহমুদকে মেয়েটার সাথে ঘনিষ্টতার সুযোগ করে দেয়। ঘনিষ্টতা চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছানোর পর (পয়েন্ট অব নো রিটার্ন) মাহমুদ জানতে পারে মেয়েটার পুরোনো সম্পর্কের কথা। কিন্তু ততদিনে দেরী হয়ে গেছে, মাহমুদ মেয়েটার সাথে দারুন প্রণয়ে আবদ্ধ, একদম গভীরে ডুবে গেছে। তাছাড়া সে প্রগতিশীল ছেলে। এসব কোন ব্যাপারই না ওর কাছে। মানুষের একাধিক বিয়ে, প্রেম এসব হতেই পারে। আর মেয়েটা যখন পালিয়ে বিয়ে করেছে তখন ওর বয়স মাত্র ১৫ বছর। ওই বয়সে মেয়েরা ভুল করতেই পারে। তাই বর্তমানটাকেই গুরুত্ব দেবার সিদ্ধান্ত নেয় মাহমুদ। আর কারো সাথে পরামর্শের তোয়াক্কা না করে উদারতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে হুট করে বিয়ে করে ফেলে মেয়েটাকে। বিয়ের দিনের ছোট্ট একটা ঘটনা মাহমুদ পরে বলেছে আমাকে।

বিয়ের গাড়ী যখন মাহমুদের বাসার সামনে এল, মাহমুদের মা আগেই বাড়ীর দরজায় দাড়ানো, বৌমাকে সাদরে বরন করার জন্য। গাড়ীর দরজা খুলে নামতেই মা ছুটে গিয়ে বৌমার হাতটা ধরলো ঘরে নেবার জন্য। বৌ এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে বললো, "ছাড়েন, এসব ঢং আমার ভালো লাগে না।" কথাটা শুনে মা স্তব্ধ। মাহমুদ চুপ। সে ভাবলো বয়স কম, আর বিয়েবাড়ীর গরমে-ভিড়ে অতিষ্ট হয়ে মুখ ফসকে বলে ফেলেছে।

ছুটির কয়েকটা দিন টোনাটুনির মতো রুমের মধ্যেই কাটায় দুজনে। কিন্তু আরো কয়েকদিন যাবার পরও দেখা গেল, মেয়েটা রুম থেকে বোরোয় না। মাহমুদ ছাড়া কারো সাথে ভালো করে কথা বলে না। ঘরের কোন কাজকর্মের তো প্রশ্নই ওঠেনা। মাসখানেক পর একদিন বৌ বাপের বাড়ী বেড়াতে গেল। কয়েকদিন পর মাহমুদকে জানালো ওই বাসা তার ভালো লাগে না, আলাদা বাসা না নিলে সে আর ফিরে আসবে না। আরও বললো মা ভাইবোনদেরকে গ্রামে পাঠিয়ে দিতে। মাহমুদ যেন তার সিদ্ধান্ত জানায়। মাহমুদের মাথায় যেন বাজ পড়লো। যেখানে পুরো পরিবার তার আয়ের উপর নির্ভর, সব আশাভরসা তার উপর, সে ছাড়া পরিবারের আর কোন অবলম্বন নেই। মেয়েটা কীভাবে বলতে পারলো এমন কথা? মাহমুদ বৌয়ের কথায় রাজী হলো না। বৌ আসলো না।

ওদিকে নতুন যে কোম্পানীতে চাকুরী নিয়েছিল, তাদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছিল না। চাকরীটা প্রায় চলে যাচ্ছিল তবু কোন মতে ঠেকালো বস ভালো ছিল বলে, তবে বেতন অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ। কোম্পানীর অবস্থা ভালো হলে বেতন দেয়া হবে। সে আশায় মাহমুদ চাকরীটা চালিয়ে যাচ্ছে। কয়েকমাস পর ডিভোর্সের নোটিশ পেল মাহমুদ বৌয়ের কাছ থেকে। সাথে ৩ লাখ টাকা কাবিনের দাবী। মড়ার ওপর খাড়ার ঘা। অনেক দেন দরবার হলো। কোন লাভ হলো না। টাকা না দিতে পারলে জেল খাটতে হবে। এমনিতে বেতন নেই, সঞ্চয়তো অনেক আগেই শেষ। ধার-কর্জ করে চলছে সংসার। এ অবস্থায় ভাগ্যের এই কষা থাপ্পড় কেমন লাগে? আমরা সবাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম সেই পুঁচকে মেয়ের ক্ষমতা দেখে। এক বছর সময় নিয়ে কিস্তিতে কিস্তিতে, আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবের সহায়তায় কোন মতে কাবিনের দাবী মেটানো গেল।

এই সময়ে মাহমুদ নিজেকে ভুলিয়ে রাখার জন্য বেশী বেশী করে রাজনীতির দিকে ঝুঁকলো। চাকরীতে বেতন পাওয়া শুরু হয়েছে, যদিও অর্ধেক। তবু কম কি, বেঁচে থাকতে পারলেই হলো। পায়ের নীচে খানিকটা মাটি পেয়ে দাঁড়াতে চাইল মাহমুদ। একদিন রমজানের সময় গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন, ঈদ বোনাস ইত্যাদির অধিকার নিয়ে আন্দোলনে মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিল মাহমুদ। পুলিশের বেপরোয়া আক্রমন তেড়ে এল তাদের ওপর। গ্রেফতার হয়ে জেলে চলে গেল সে। এ ঘটনার পর পরিবারের উপর বিপর্যয়ের খাড়া নেমে আসলো। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি পড়ে গেলে যা হয় আর কি। মাহমুদের পরিবারের আর কোন আশ্রয়ই রইল না শহরে। ছোট ভাইবোনদের নিয়ে গ্রামের বাড়ীতে চলে গেল ওর মা। বিনা বিচারে প্রায় ছয়মাস জেল খেটে, জামিনে ছাড়া পেল।

দেখতে গেলাম আমি। কিন্তু এ কাকে দেখছি ? সে আর আমাদের পুরোনো হাসিখুশী মাহমুদ না। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখ দুটো বসা, মুখের দুই পাশে হাড্ডি বেরিয়ে গেছে, মাথায় চুল পড়ে অর্ধেক। বোঝা যায় জেলখানায় কী দুর্দশা গেছে। আশ্চর্য লাগে যে মানুষটার নিজের অধিকারেরই ঠিক নেই সে অন্য মানুষের জন্য আন্দোলন করে জেলে যায়! চা খাওয়ার পর সিগারেট অফার করলে মৃদু হেসে হাত নেড়ে বললো, সিগারেটে পোষায় না। বিড়ি ধরেছি। জেলে তো বিড়ি ছাড়া উপায় নাই। বিড়ির অভ্যেসটা হয়ে গেছে। আর বিড়ি তো জেলখানার অঘোষিত মুদ্রা। তোষকের নীচ থেকে আকিজ বিড়ির বান্ডিল বের করে ধরালো।

জেল থেকে ছাড়া পেল ঠিকই কিন্তু মামলাটা রয়ে গেল। নিয়মিত হাজিরা দিতে হয়। খরচ অবশ্য পার্টি থেকে দিচ্ছে। অফিসের বসটা ভালো ছিল বলে, চাকরিটাও ফিরে পেল আবার। বেতন যদিও অর্ধেক এখনও। তবু আবারো উঠে দাড়ানোর চেষ্টা। কিছুদিন পর গ্রামে গেল মাকে নিয়ে আসতে। গিয়ে আরেকটা নতুন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলো, ওদের সব জমি জমা চাচারা বেদখল করে ফেলেছে দীর্ঘ অনুপস্থিতির সুযোগে। ভাগ্যের চতুর্থ কামড়। মাহমুদ নিজেই গ্রামে চলে গেল দীর্ঘ ছুটি নিয়ে। এবারের ছুটি মানে চাকরী শেষ। কোন কোম্পানী এতবার এতদিন ছুটি দেয় না। গ্রামে গিয়ে মামলা মোকদ্দমা হয়রানি অপমান গ্লানি। শেষ হয় না কিছুতেই। ক্লান্ত ক্লান্ত মাহমুদ। তবু পরাজিত হয় না। আজীবন সংগ্রামী মাহমুদ ঘরে বাইরে যুদ্ধ চালিয়েই যায়। এখনও চলছে।

মাহমুদের জীবনটা নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবি। এক সময় সব ছিল ওর, সুখের সব উপাদান। তারপর আস্তে আস্তে ঝরে পড়তে লাগলো একেকটা সুখ। ভাগ্য কিছু কিছু মানুষের প্রতি এমন নির্দয় হয় কেন? আরেকটু কম নির্দয় হলে কী এমন ক্ষতি হয়ে যেতো বিশ্বজগতের? যতই সে উঠে দাঁড়াতে চায়, ভাগ্য তাকে আবার আছড়ে ফেলে শক্ত মাটিতে। যেন তাকে উঠতে না দেয়ার প্রতিজ্ঞা করেছে ভাগ্যবিধাতা!!

দাওয়াতী কর্মের বিটকেলে সমাপ্তি

বয়েস তখন বিশের কোটায়। আমার এক বন্ধু পারভেজ। কথাবার্তায় খুব দুষ্টু। ওর প্রতিটি বাক্য একেকটা কৌতুক, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়তে হয়। ওকে কেউ কিছু বলে সারতে পারে না, তাৎক্ষনিক জবাব রেডী, একটা কথাও মাটিতে পড়তে দেয় না। ফলে সবার প্রিয় ছিল আর বন্ধুবান্ধবও ছিল অগনিত।

ওর বাসাটা ছিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে প্রিয় আড্ডাখানা। ওর বাবা মা ভাই বোন এত আন্তরিক ছিল যে আমরা ওটাকে নিজের ঘরের মতো ব্যবহার করতে পারতাম। ওর রান্নাঘরে ঢুকে ডেকচি উল্টিয়ে মাছ তরকারী নিয়ে খাচ্ছি এটা খুব স্বাভাবিক একটা দৃশ্য ছিল। খাওয়া ঘুম আডডা সব চলতো, কেউ কেউ রাতেও থেকে যেতো বেশী দেরী হয়ে গেলে। পাড়ায় আমাদের ১৬ জনের একটা ম্যারাথন আড্ডা গ্রুপ ছিল। তাছাড়া অতিথি আড্ডাবাজরাও প্রতিদিন আসতো শহরের কোন না কোন অংশ থেকে।

এত বেশী বন্ধুবান্ধব ওর বিয়ের দাওয়াতের সময় একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দাওয়াতের লিষ্টে বন্ধুর সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে যাওয়াতে ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক দুরের বন্ধুকে বাদ দিতে হয়। মজার ব্যাপার হলো বিয়ের দিন বিনা দাওয়াতেই প্রায় অর্ধশত বন্ধু এসে হাজির। এবং দাওয়াত না দেয়াতে কেউ কোন মাইন্ড করে নাই। বরং বলছিল, তুই দাওয়াত দিতে ভুলে গেছিস সেটা আমরা বুঝি, কিন্তু আমাদের তো একটা দায়িত্ব আছে !

পাড়াতে বেশ কয়েকজন কট্টর শিবির কর্মী ছিল। শিবিরের অতি তৎপর একটা দায়িত্ব হলো মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া। একবার দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে এলাকার শীর্ষ শিবির নেতা কামাল ভাই আড্ডায় আসলেন। মোলায়েম ভাষায় ‘আসসালামুআলাইকুম’ বলে বসে গেলেন একপাশে। উনি মাবুর পরিচিতি সুত্রে এসেছেন দাওয়াতী কাজে। কিন্তু এখানে ঢুকেই পড়ে গেলেন পারভেজের পাল্লায়। আম্বো তাম্বো গল্পের ঠেলায় দুদিনের মাথায় দ্বীনের দাওয়াত ভুলিয়ে দিল পারভেজ। এক সপ্তাহ পর দেখা গেল কামাল ভাইও মেয়েদের ‘ঠেকা’ দেয়ার পদ্ধতি নিয়ে জমিয়ে আলাপ করছে। দ্বীনের দাওয়াতের কোন খবর নেই আর।

আমাদের আড্ডার একটা বৈশিষ্ট্য ছিল মাঝে মাঝে একেকজনের উপর ভর করে পাড়ার হোটেলে পরোটা, চপ, হালিম ইত্যাদির শ্রাদ্ধ করা। একবার কামাল ভাইয়ের পালা এলো। সহজে রাজী হয় না। শুনেছিলাম হাড় কন্জুস। তবু প্রথমে লজ্জায় ‘হ্যাঁ’ বলে রাজী হলেও রওনা দেয়ার পর যতই হোটেলের কাছাকাছি হচ্ছিলেন ওনার পা যেন ভারী হয়ে উঠছিল। হোটেলের ১০০ গজের মধ্যে পৌছে পুরো শক্ত হয়ে গেল কদমযুগল, আর নড়ে না। ব্যাপার কী? কামাল ভাইকে জিজ্ঞেস করা হলো। কামাল ভাই মিন মিন করে বললেন “একটু বাসায় যেতে হবে যে। মানিব্যাগটা ফেলে এসেছি বোধহয়।”

চেহারা দেখে সন্দেহ করলাম পালানোর ফন্দী করছে। এভাবে ছাড়া যাবে না। আমরা দ্রুত বললাম সাথে যা আছে তাতেই চলবে, ৫০ টাকা এমনকি ২০ টাকা হলেও চলবে, বাকীটা আমরা দেবো, দরকার হলে লোন দেব। কিন্তু তিনি অনড়। আমরা লক্ষন বুঝে দুজন দুহাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে চাইলাম। কিন্তু নড়ানো গেলনা। ছাগলের মতো পা দুটি মাটি কামড়ে আটকে রইল। যতই সামনে টানি ছাগলের মতো উনি উল্টা দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। (ওনার পরে আরো দুজন শিবির নেতা আমাদের আড্ডায় যোগ দিয়েছিল, প্রত্যেকটা হাড় কন্জুস এবং প্রত্যেকের সাথে খাওয়ার পর্বে এসে প্রায় একই অভিজ্ঞতা। হোটেলের কাছাকাছি এলেই নড়ানো যেত না, পায়ে খুটা লেগে যেত। যারা জীবনে একবারও ছাগলের দড়ি হাতে নিয়েছে তারা জানে ছাগলের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দড়ি যেদিকে টানবেন তার উল্টা দিকে হাঁটবে সে।)

কামাল ভাইকে ছাগলের মতো খুটা পায়ে আটকে থাকা দেখে তখুনি পারভেজ এগিয়ে এসে বললো, “দুর ব্যাটা, তোরা তো ছাগল ধরাও শিখলি না। কিভাবে নিতে হয় জানিস না। বাবু আয়তো, তুই বাম পাটা ধর আমি ডান পা ধরি। ত্যাড়া ছাগলকে চ্যাংদোলা করে নিতে হয় ” তিন সেকেন্ডের মধ্যেই চার জোড়া হাতের উপর কামাল ভাই ভাসতে লাগলেন।

সেই আট হাতের দোলনায় কামাল ভাই যখন হোটেলের সামনে পৌছালো, লোকজন বুঝে গেছে আজকের হোষ্ট কে। খাওয়া শেষে কামাল ভাই বেজার মুখে অন্তর্বাসের ভেতর থেকে লুকানো ছোট্ট মানিব্যাগ বের করলো। সেদিনের পর থেকে আড্ডায় যাওয়া কমিয়ে দিলেন তিনি। বুঝলেন দুনিয়াতে ফ্রী বলতে কিচ্ছু নাই। এমনকি আড্ডাও না। সেদিন থেকে প্রকাশ্যে দাওয়াতী কাজের সমাপ্তি ঘটলো পাড়ায়।

Wednesday, November 19, 2008

চোরের কবলে একটা প্রেম

বন্ধু মাবু বিশ্বপ্রেমিক ধরনের ছেলে। যেখানেই বাসা নিত তার আশেপাশে কারো না কারো সাথে মন দেয়া নেয়া হয়ে যেতো। নতুন এলাকায় বাড়ী করে সবেমাত্র উঠেছে। পাড়া-প্রতিবেশী অত বেশী নেই। কাছাকাছি একটা মাত্র দোতলা বাড়ী আছে। বাড়ীর মালিক দোতলায় থাকেন সপরিবারে। তাঁর এক পুত্র বাপ্পী এক কন্যা লুনা। মাবুর নজর কাড়লো লুনা। যথারীতি চুপি চুপি মন দেয়া নেয়ার চেষ্টা শুরু হলো। কিন্তু মেয়ের বাবার অতীব কড়াকড়িতে প্রেমটা ঠিকমতো গড়ে উঠতে পারছিল না। ফলে রাতের বেলা সবাই যখন ঘুমিয়ে যায় তখন দুজনে ছাদে উঠে চিঠি চালাচালি করে। গোপনীয়তা রক্ষার জন্য চিঠি বিনিময়টা হতো অভিনব পদ্ধতিতে । দুজনের বাড়ীর ছাদ কাছাকাছি ছিল। ওরা চিঠি লিখে একটা ছোট ইট পাথরের মধ্যে পেঁচিয়ে ছুঁড়ে মারতো একে অন্যের ছাদে। এ কাজগুলো করা হতো রাত বারোটার পর। নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় দুজনের প্রেম মোটামুটি ভিত্তিস্থাপনের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল।

একদিন ঝামেলা হয়ে গেল। মাবুর চিঠিটা অল্পের জন্য ফসকে গিয়ে ছাদের কার্নিশে বাড়ি খেয়ে নীচে পড়ে গেলো। ওদিকে নীচে তখন এক চোর লুনাদের একতলায় চুরির ফন্দী করছিল জানালার পাশে দাড়িয়ে। পাথরসহ চিঠিটা পড়বি তো পড় চোরের মাথায়। চোরটা ছিল পাড়ার মুখচেনা ছিঁচকে চোরদের একজন। যারা দিনের বেলায় ভালোমানুষের মতো পাড়ার টুকটাক কাজ করতো, নতুন বাড়ী করলে তাদের মালামাল পাহারা দিত আর সুযোগ পেলে মেরে দিত।

মাবু ছাদের কিনারে গিয়ে চিঠি কোথায় পড়েছে খুঁজতে গিয়ে সেই চেনা চোরের সাথে চোখাচোখি। রাস্তার বাতির হালকা আলোয় দুজন দুজনকে দেখে চিনলো এবং চমকে গেল। চোর দুই ছাদের কিনারে মাবু আর লুনা দুজনকে দাড়ানো দেখে বুঝে ফেলল ঘটনা। চোরের হাতে তখন পাথর সহ চিঠিটা।

ঘটনায় চোর আর মাবু পরস্পরের উপর ক্ষিপ্ত। দুজন দুজনের কাজে বাগড়া দিয়েছে। কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলতে পারছে না। চোর ব্যাথা পেয়েও চুপ। কয়েক সেকেন্ড পর চোর কেটে পড়লো নিঃশব্দে। তবে চিঠিটা মিস হলেও লুনা খুব খুশী হলো মাবু বীরত্বের সাথে চোর তাড়িয়েছে বলে।

পরদিন সকালে চোর ভালমানুষ হয়ে লুনাদের বাসায় গেল। মাবুর চিঠিটা নিয়ে সোজা লুনার বাবার হাতে তুলে দিয়ে বললো, “চাচা বাড়ীর সামনে কাজ করতে গিয়ে পেলাম। দরকারী কাগজ হতে পারে।” লুনার বাপ তো চিঠি পড়ে তেলে বেগুনে জ্বলে আগুন। সোজা মাবুর বাপের কাছে গেল চিঠিটা নিয়ে। মাবুর বাবা চিঠি পড়ে রেগে মেগে মাবুকে ডেকে জানতে চাইল, “হারামজাদা, এটা তোর চিঠি?”

মাবু পুরোপুরি নিশ্চুপ। কি বলবে সে? মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইল। একটা শব্দও বেরুলো না তার মুখ দিয়ে। একফাঁকে জানালা দিয়ে বাইরে দাড়ানো রাতের চোর, দিনের ভালোমানুষটাকে দেখলো। বুঝলো ওই বদমাশটা চুরি করতে না পারার প্রতিশোধটা নিল। কিন্তু লুনার বাবাকে একবারও মুখফুটে বলতে পারলো না, “আংকেল, কাল রাতে ওই ব্যাটা আপনাদের বাসায় চুরি করতে এসেছিল, কিন্তু আমি ঢিল মেরে তাকে তাড়িয়েছি।”

বলতে পারেনি কারন সেই ঢিলকে জড়িয়ে ধরা ছিল কড়কড়ে প্রেমের পত্রটি।

স্মৃতি থেকে একটা প্রেমপত্র

২৫ বছর আগের আমাদের স্কুলে একটা আলোচিত ছোট্ট একটা প্রেমপত্র। ক্লাস এইটের একটা ছেলে ক্লাস সিক্সের একটা মেয়েকে দুই লাইনের একটা প্রেমপত্র লিখেছেঃ

প্রিয় নীলা,
আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচিব না।
কিন্তু তুমি আমাকে ভালো না বাসিলে আমি ইটা মেরে তোমাদের জানালার সব গ্লাস ভাঙ্গিয়া ফেলিব।

ইতি,
তোমার প্রেমিক মাসুদ

রহিম গুন্ডার চোখ মারা

রহিম গুন্ডার কথা মনে পড়লো আজ। সত্তর দশকের মাঝামাঝিতে রহিম আমাদের এলাকায় দাপুটে গুন্ডা। সবাই ভয় করে। শহরে তখন রংবাজ সিনেমার জোশ। রহিমের প্রানপন চেষ্টা রংবাজের রাজ্জাক হবার। রহিমের এক ছোট ভাই ছিল আমার ডাংগুলি বন্ধু। সে কারনে রহিমকে আমি তেমন ভয় পেতাম না। রহিমের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল চোখ মারা। যে কোন সুন্দরী মেয়ে দেখলেই তার বাম চোখটা দুবার ক্লিক করতো। মেয়ে দেখলে চোখ মারার ব্যাপারটা কেন করতে হয় আমি ঠিক বুঝতাম না। খালি ভাবতাম ওটা বড়দের কাজ এবং নিষিদ্ধ জিনিষ। নিষিদ্ধ হবার কারনে মাঝে মাঝে আমরা বন্ধুরা নিজেরা নিজেরা চোখ মারা প্র্যাকটিস করতাম।

রহিম সবচেয়ে বেশী চোখ মারতো রুমা আপাকে। রুমা আপার বাসা ছিল আমাদের ঠিক দোতলায়, উনি খুব সুন্দরী ছিলেন। রুমা আপারা আমাদের বিল্ডিংএর সবচেয়ে বড়লোক। আশেপাশের বিল্ডিংএর মধ্যে একমাত্র ওনাদের বাসায়ই টিভি ছিল যা দেখার জন্য আমরা পিচ্চিরা সব ভিড় করতাম। কলোনীতে তখন যে বাসায় টিভি আছে, বাইরের যে কারোর অলিখিত অধিকার ছিল সে বাসায় গিয়ে টিভি দেখার।

রুমা আপা আর রহিমের মধ্যে প্রেম-ট্রেম জাতীয় কিছু কিনা জানি না। কিন্তু উনি যতক্ষন বারান্দায় বসে থাকতেন রহিম নীচের ইলেকট্রিকের পোলে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো। বামচোখ মেরে যাচ্ছে একটু পর পর। এটা আমাদের নিত্যদিনের দৃশ্য। মাঝে মাঝে চোখ মেরে বাঁ চোখটা বন্ধই করে রাখতো অনেকক্ষন। এরকম ম্যারাথন চোখ মারতে মারতে রহিমের বামচোখটা ছোট এবং কালশিটে হয়ে গিয়েছিল।

একদিন আমার কাজিন রানু আপা বেড়াতে এসেছে বাসায়। রুমা আপাদের কাছাকাছি বয়সী হবেন, এসএসসি দেবেন। সেদিন রানু আপা বারান্দায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিল আমার সাথে। রহিমের চোখের ফোকাস দোতলা থেকে নীচে নেমে আসলো। রানু আপার সাথে চোখাচোখি হবার সাথে সাথে ক্লিক করলো দুবার। রানু আপা প্রথমে ব্যাপারটা বুঝলো না। কিন্তু আবার তাকাতেই একই ঘটনা ঘটলো। রানু আপা ছুটে ভেতরে গিয়ে মাকে বললো ঘটনাটা।

বিকেলে বাবা অফিস থেকে ফেরার সাথে সাথে মা জানালো রহিমের কান্ডের কথা। বাবা রাগী মানুষ। কাপড়চোপড় না বদলেই দৌড়ে বেরুলেন। আমি পিছু পিছু। রহিম তখন সামনের বিল্ডিংয়ের কোনায় দাঁড়িয়ে কী যেন করছিল। বাবা সোজা গিয়ে ঠাশ ঠাশ করে দুগালে দুটো রাম থাপ্পড় বসিয়ে বললো- “হারামজাদা!! তোর এত সাহস আমার বাসার দিকে নজর দেস?? আর যদি কোনদিন তোকে আমার বাসার সামনে দেখি তোর চোখ আমি তুলে ফেলবো।”

রহিম পুরা হতভম্ব। এর আগে তাকে কেউ এভাবে মারে নাই। ভড়কে গেছে তাই। তাছাড়া আমরা চাটগাঁইয়া, লোকাল একটা ব্যাপারও ছিল বোধহয়। রহিম মাফ চেয়ে বললো, “ভুল হয়ে গেছে চাচা, মাফ কইরা দেন। আমি বুঝি নাই” ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর থেকে বাবা বাসায় থাকলে রহিমগুন্ডা আশেপাশেও ভিড়তো না। রুমা আপার সাথে টাংকিটা ছিল আরো অনেকদিন, কিন্তু সতর্কভাবে।

প্রেম যখন ফাঁস

আমার প্রিয় বন্ধু সাব্বির। যৌবনের শুরুতে সিটি কলেজে ইন্টারে পড়ার সময় সোমা নামের এক মেয়েকে তার খুব ভালো লেগে গেল। মেয়েটা আমাদের ব্যাচে কিন্তু অন্য সেকশানে। তাই কথা বলার অজুহাত পাওয়া যায়না। কিন্তু না পেলে তো চলবে না। এই মেয়ের প্রেম না পেলে জীবন বৃথা, এরকম ধারনা গজিয়ে গেছে ওর মধ্যে।

বলে রাখা ভাল তখন আমাদের মাত্র গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছে মুখে। কিন্তু সিটি কলেজ তখন চট্টগ্রামের শেঠ কলেজ। দু্র্ধর্ষ সব ছাত্রনেতা এই কলেজে। এক ডাকে পুরো শহর কাঁপে। রাস্তায় বাস ড্রাইভার-কন্ডাকটর কোন ছাত্রের সাথে বেয়াদবী করলে পুরো লাইনের বাস সহ ধরে কলেজে নিয়ে আসতো। শহরে তখন যত বাস ছিল সবাইকে নিউমার্কেট দিয়ে ঘুরে যেতেই হতো। সুতরাং যে কোন একটা বেয়াদবীতে ধরা পড়লে রক্ষা নাই। তাই সিটি কলেজ বললে সবাই ভয় পায়। স্বাভাবিকভাবে সেই গরবে গর্বিত সদ্য গোঁফ ওঠা আমরাও।

সাব্বির ভাবলো এটাতো সামান্য একটা মেয়ে, প্রেম না দিয়ে কোথায় যাবে? সোমা বেশ সুন্দরী হলেও সাইজে বেশ বড়সড়, সাব্বিরের চেয়েও বড় ছিল। তাছাড়া মেয়েটা হিন্দু, সে মুসলমান। কিন্তু প্রেমের জন্য সাইজ কোন ব্যাপার না আর আধুনিক মানুষের জন্য ধর্ম কোন সমস্যা না। আমরা মানব ধর্মে বিশ্বাসী, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে প্রেম। সব সমস্যা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে সাব্বির সুযোগের অপেক্ষায় আছে কখন প্রেম নিবেদন করবে। কিন্তু চোখাচোখি ছাড়া আর কোন সুযোগ পাওয়া যাচ্ছিল না। ওর ধারনা সোমাও ওর জন্য খুব আগ্রহী, সেটা তার দৃষ্টি দেখেই বোঝা গেছে। কিন্তু মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। সুতরাং ছেলে হিসেবে তাকেই এগিয়ে যেতে হবে।

একদিন দুপুরবেলা ক্লাস শেষে বেরিয়ে দেখি আর্টস বিল্ডিংয়ের নীচে সোমা একা দাড়িয়ে আছে। ব্যাপার কী, এই ভর দুপুরে বাসায় না গিয়ে মেয়েটা একা একা দাড়িয়ে আছে কার জন্য। সাব্বির বললো, দোস্ত সে নিশ্চয়ই আমাকে কথা বলার সুযোগ দেয়ার জন্য দাড়িয়ে আছে। আজকেই সুযোগ। তুই একটু হেল্প করবি। গিয়ে বলবি আমি ওর সাথে কথা বলতে চাই।

আমি আরো বেশী লাজুক। রাজী হলাম না প্রথমে। কিন্তু সাব্বির আমার পায়ে ধরার অবস্থা। ওকে বাঁচাতে আমাকে এগিয়ে যেতেই হলো। আমি গিয়ে সোমাকে কথাটা বলতেই সোমা হেসে বললো, ঠিক আছে ওকে আসতে বলেন।

সাব্বির এগিয়ে গেলে আমি দুরে সরে এলাম। ওরা নিজেরা নিজেরা ফয়সালা করুক এবার। কিছুক্ষন পর দুর থেকে তাকিয়ে দেখি দুজনে খুব কথা বলছে হেসে হেসে। কি কথা শুনতে পেলাম না। তবে বুঝলাম সাব্বিরের ধারনাই ঠিক। মেয়েটা ওর জন্যই অপেক্ষা করছিল। শালাকে আজকে ধরতে হবে ডায়মন্ডে কাবাব খাওয়াতে।

একটু পর সাব্বির ফিরে এলো উত্তেজিতভাবে। “দোস্ত, মেয়ে তো অনেক ফাস্ট। যা ভেবেছি তারচেয়েও এডভান্স। আমি বলার সাথে সাথে রাজী। কিন্তু সমস্যা হলো সে দেরী করতে চাচ্ছে না। বললো আজকেই সেরে ফেলতে। সে আমাকে এখুনি কোর্টবিল্ডিং-এ নিয়ে যেতে চায় রেজিষ্ট্রি করে বিয়ে করতে। কী করি বলতো এখন?” যুগপৎ খুশী আর দুশ্চিন্তা তার চোখে মুখে।

কোর্ট বিল্ডিং-এর কথায় আমি ঘাবড়ে গেলাম। বললাম “তুই গেলে যা, আমাকে বাসায় যেতে হবে এখন, আমি কোর্টবিল্ডিং-এ যেতে পারবো না।” কেটে পড়তে চাইলাম তখুনি। ওদিকে সোমা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। অপেক্ষা করছে সিদ্ধান্তের। ততক্ষনে সাব্বির বুঝে ফেলেছে ব্যাপারটার গুরুত্ব। পালাতে হবে। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। কিন্তু এভাবে পালালে ইজ্জত থাকবে না। ওকে বললাম, তুই গিয়ে বল- আজকে অনেক দেরী হয়ে গেছে, টাকা পয়সা, সাক্ষী-টাক্ষী যোগাড় করে আগামীকাল সকালে যাবি। সাব্বির কোনমতে কথাটা বলে আসতেই তাড়াতাড়ি রিকশা ডেকে পালালাম ওখান থেকে।

পাদটিকাঃ
ইন্টার পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাব্বিরকে আর্টস বিল্ডিং-এর ধারে কাছেও দেখা যায় নি কখনো।

Thursday, November 13, 2008

একটি মজার সুপারিশ পত্র

চিঠিপত্রের যুগ উঠে গেছে বললেই হয়। দুই আড়াই বছর আগে আমাদের অফিসে একটা চিঠি আসে। একজন অচেনা ভদ্রলোক ব্যবসার সুযোগ এবং আত্মীয় স্বজনের চাকরীর সুযোগ চেয়ে দীর্ঘ একটা পত্র লেখেন। এরকম পত্র আমি আগে কখনো দেখিনি। পত্রটির ভাষা এবং প্রকাশভঙ্গীর ভিন্নতা বেশ মজার, সেকারনে চিঠিটা সংগ্রহে রেখে দেই আমি। আপনাদের সাথে শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারলাম না। ঠিকানা পরিচয় মুছে দিয়েছি সঙ্গত কারনেই।


২২ডিসেম্বর১৯৯০ ছাত্রশিবিরের সেই তান্ডব

২২শে ডিসেম্বর ১৯৯০। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকেন্ড ইয়ার অনার্সে পড়ি তখন। ভার্সিটিতে কী একটা পরীক্ষা ছিল সেদিন। কিন্তু হবে না বোধহয়। কারন ইসলামী ছাত্র শিবির অবরোধ ডেকেছে। দাবি ভিসির পদত্যাগ। অথচ যৌক্তিক কোন কারন নেই। ব্যাপার হলো এই ভিসি শিবিরের পছন্দ না। কিন্তু যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের নিয়ন্ত্রনে, মসজিদের ইমাম থেকে রেজিস্ট্রি অফিসের পিয়নটা পর্যন্ত সবকিছু শিবিরের পছন্দের হতে হবে। সবাই বাধ্য শিবিরের কথা শুনতে। সেখানে ভিসি যদি মোটামুটি নিরপেক্ষও হয়, তাকে নিয়ন্ত্রন করাও মহা ঝামেলা। ঝামেলা কে চায়, শক্তি যখন আছে, ঝামেলা কেটে ফেলার চেষ্টা। ডঃ আলমগীর সিরাজের পদত্যাগ চেয়ে তাই অবরোধ।

সঙ্গত কারনেই সাধারন ছাত্রছাত্রীর কোন সমর্থন নেই এ ধরনের আন্দোলনে। তাই সিদ্ধান্ত সবাই নিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবো, পরীক্ষা দেবো, শিবিরের মুখোমুখি দাঁড়াবো।

যদিও পরীক্ষা অনিশ্চিত, তবু ঘুরে আসি এরকম মন নিয়ে আমিও সকাল সোয়া আটটায় ট্রেনে উঠলাম। সাথে বন্ধু হোসেন শহীদ আর নওশাদ পারভেজ। হোসেন শহীদ ভালো কবিতা লেখে, চট্টগ্রামের মোটামুটি নামকরা কবি। আড্ডাবাজ, আমার প্রিয় বন্ধুদের একজন। ওকে জোর করে নিয়ে যাচ্ছি আড্ডা দেয়ার জন্য। কারন আরেক আড্ডাবাজ বন্ধু পারভেজও যাচ্ছে। সে সমাজতত্ত্বে প্রিলিমিনারিতে ভর্তি হয়েছে। আমাদের তিনজনের ভালো আড্ডা জমে। আজকে পরীক্ষা নাও হতে পারে, তাই ঘুরে ফিরে আড্ডা দিয়ে চলে আসবো দুপুরের ট্রেনে।

ট্রেন যখন বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশানে পৌঁছালো তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেট বন্ধ। কাউকে যেতে দিচ্ছে না ভেতরে। ছেলেমেয়েদের সাথে বাকবিতন্ডা হচ্ছে শিবির নেতাদের। শিবিরের নেতাদের সাথে জামাতী শিক্ষকরাও পাশে দাঁড়িয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। বুঝলাম যৌথ প্রযোজনার অবরোধ। শিক্ষকদের এমন ভুমিকায় দেখে ঘেন্না লাগলেও অবাক হই না। জামাতী শিক্ষকদের চরিত্র বুঝতে বাকী নেই গত তিন বছরে। সদ্যনির্বাচিত চাকসুর কিছু ছাত্রনেতাও ছিল ওখানে। ছাত্রছাত্রীরা তাদের ধরলো কিছু একটা করার জন্য। একজন নেতা(ভিপি নাজিম বোধহয়) পাশের একটা উচু জায়গায় দাঁড়িয়ে সংক্ষিপ্ত গরম বক্তৃতা দিল কয়েক মিনিট। ছাত্রছাত্রীরা ক্রমাগত চিৎকার করে যাচ্ছে - অবরোধ ভাংবো, ভাংতেই হবে। উত্তেজনা বেড়ে গেলে নেতা বক্তৃতা শেষ করে নেমে পড়েন। এরপর মিছিল শুরু হয়। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছেন তারা জানেন, ছাত্রছাত্রীরা ট্রেনে শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ষ্টেশনে আসে। তারপর এখান থেকে বাসে করে দুই কিলোমিটার দুরের ক্যাম্পাসে যায়।

আজকে অবরোধের কারনে বাস চলছে না। হেঁটেই যেতে হবে। শহীদ আর পারভেজের কাছে গিয়ে বলতেই ওরা বললো, "চল ফিরে যাই। শিবিরের সাথে গ্যান্জাম করে লাভ নেই।" আমার হঠাৎ কেন যেন জিদ চেপে বসলো তখন। পরীক্ষা দেয়ার জোশে না। জিদ চাপলো শিবিরের অনৈতিক অবরোধের বিরুদ্ধে। আমরা কী ওদের খেয়ালের চাকর? চাইলেই কি ওরা আমাদের এভাবে আটকে রাখতে পারে? আমি শহীদ আর পারভেজকে বললাম, "শিবিরকে ভয় পেলে তোরা ফিরে যা, আমার কাজ আছে, ভেতরে যেতেই হবে।"

এমন সময় গেটের কাছে হৈ হৈ ধ্বনি শোনা গেল। একদল ছাত্র কীভাবে যেন গেটের তালা ভেঙ্গে ফেলেছে। পঙ্গপালের মতো সবাই হুড়মুড় করে ঢুকছে গেটের ভেতরে। কাটা পাহাড় দিয়ে না গিয়ে মিছিলের মুখ শাহজালাল হলের সামনের রাস্তার দিকে ঘুরে গেল। শহীদ আর পারভেজ আমাকে একা ছাড়তে চাইল না, ওরাও যোগ দিল মিছিলে। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম বিশাল ব্যাপার। এত বেশী ছাত্রছাত্রী কোন মিছিলে দেখা যায়নি আগে। এমনকি চাকসু নির্বাচনের বিজয় মিছিলও ছিল এর চেয়ে ঢের ছোট। এই বিশাল মিছিল পাহাড়ী রাস্তা ঘুরে ঘুরে যখন ক্যাম্পাসে পৌছালো তখন বেলা সাড়ে দশটা পেরিয়ে গেছে। কলাভবনের সবগুলো কলাপসিবল গেটের তালা বন্ধ। সামনের বাধানো চত্বরে শিবিরের ক্যাডার বাহিনী দাঁড়ানো। আপাতঃ নিরস্ত্র। তবে অনেকগুলো ইটের আধলা স্তুপ করে রাখা। মিছিলের মুখ মাঝখানের গেটের দিকে এগোচ্ছে। দেখে ভরসা লাগলো যে এত বড় মিছিলের সামনে শিবিরের সামান্য কটা কুত্তা কী করবে। মিছিলের সামনের ভাগে মেয়েরা। হঠাৎ কথাবার্তা ছাড়া ঠাশ ঠুশ শব্দ শুরু হলো হলো। শিবিরের ছেলেরা ইট মারছে। প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি হলো। কিন্তু আমাদের এদিকে ইট বলতে কিছু নেই, সব ওরা নিয়ে নিয়েছে। ভেবেছি ছাত্র নেতারা নিশ্চয়ই খালি হাতে আমাদের উজ্জীবিত করেন নাই। লোহা-বিচি, মাল-মুল নিয়ে এসেছে নিশ্চয়ই। পাল্টা জবাব দিবে হোতাইয়া। এদিক ওদিক তাকালাম। কিন্তু না, কোন পাল্টা জবাব দেখা গেল না। এ পক্ষে কারো অস্ত্রশস্ত্র নেই। সাধারন ছেলেপেলেরা বিড়বিড় করে গালি গালাজ করতে শুরু করেছে নেতাদের। শালারা খালি বিচি দুইটা নিয়া যুদ্ধ করতে আসছে, নাজিম্যা কই, ইত্যাদি। হঠাৎ আমরা খেয়াল করলাম নির্মানাধীন নতুন কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর সামনে অনেকগুলো লম্বা বাঁশ স্তুপ করে রাখা। ওগুলো নিতে পারলে শিবিরের গোয়া ফাটিয়ে দেয়া যাবে এবার। চল নিয়ে আসি। মিছিল ছেড়ে আমরা কজন ছুটলাম বাঁশ নিতে। এটাই বোধহয় বড় ভুল হয়ে গেল। বাঁশের কাছে পৌছাতে না পৌঁছাতেই পেছন থেকে গুলির শব্দ। শিবিরের ক্যাডাররা ইট ছেড়ে বন্দুক ধরেছে। আমাদের পিছু হটার দৃশ্য দেখে ওরা বুঝতে পেরেছে আমাদের বন্দুক টন্দুক নেই। সাথে সাথে মিছিলের বাকী অংশের উপর গুলী করা শুরু করেছে। গুলির শব্দে পুরো ক্যাম্পাসে ছুটোছুটি, মেয়েদের চীৎকার, কান্নার শব্দ, মিছিল ছত্রভঙ্গ। আমরা যারা বাঁশের জন্য এসেছিলাম, তারা ফিরতে গিয়ে পলায়নপর উল্টোস্রোতের মুখোমুখি হলাম। দেখলাম তিনদিক থেকে আক্রমন শুরু হয়েছে। পুরোটা পূর্ব-পরিকল্পিত বোঝা যায়।

বাঁশ হাতে বন্দুকের মুখোমুখি হওয়ার কোন মানে নেই। বাঁশ রেখে পিছু হটলাম। পালানো ছাড়া গতি নেই। ভাবলাম লাইব্রেরীর পেছনের ফোকড় দিয়ে সায়েন্স ফ্যাকাল্টির দিকে চলে যাবো। লাইব্রেরীর পেছনে যেতেই দেখলাম উল্টো দিক থেকে গুলি করতে করতে ছুটে আসছে হামিদ বাহিনীর কয়েকজন। প্রায় ট্র্যাপড হয়ে গেলাম, ঘেরাও তিন দিক থেকে। লাইব্রেরীটা কলাভবনের মুখোমুখি রাস্তার ওপারে। লাইব্রেরীর পেছনে ঝোপজঙ্গলভর্তি খাড়া পাহাড় উঠে গেছে। এমনিতে লাখ টাকা দিলেও ওই জঙ্গলে উঠার কথা ভাবতাম না। একটা পা রাখারও জায়গা নেই, এত ঘন আদিম জঙ্গল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি খারাপ। প্রান বাঁচানো ফরজ। মুহুর্তেই লাফ দিলাম জঙ্গলের ভেতরে। হাঁচড়ে পাঁচড়ে উঠে গেলাম বেশ কিছুদুর। আড়াল পেতেই একটু দাঁড়ালাম। দেখি আরো অনেক ছেলে মেয়ে উঠে আসছে জঙ্গল মাড়িয়ে। কারো মাথা দিয়ে রক্ত পড়ছে, কারো হাত দিয়ে। একজন আরেকজনকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে পাহাড়ের খাড়াইতে। কে একজন পানি চাইল। একটা মেয়ে কাঁদছে, তার সহপাঠির মাথা ফেটে দরদর করে রক্ত পড়ছে। ওকে ধরে উপরের দিকে এগিয়ে দিলাম আমরা। উপরে কোথায় যাচ্ছি জানি না। শুধু গোলাগুলি থেকে যত দুরে যাওয়া যায় সেই চেষ্টা।

কিছুদুর গিয়ে একজনকে দেখলাম, জঙ্গলের মধ্যেই একজন রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে জনে জনে। বলছে, "ভায়েরা আমরা যদি এভাবে পালিয়ে যাই ৭১ এর পরাজিত শক্তির ভয়ে, ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। চলুন আমরা ঘুরে দাঁড়াই। ঝাঁপিয়ে পড়ি একাত্তরের চেতনায় ......." কয়েকজন দাঁড়িয়েও পড়েছিলো। কিন্তু পেছনে আবার বুম বুম শব্দ হতেই সবাই হুড়মুড় ছুট। জঙ্গলের লতাপাতা ধরে ধরে টিলার চুড়ায় পৌছালাম কোনমতে, তারপর ওপাশে নামতে শুরু করলাম, নামতে তেমন সময় লাগলো না। ছোট্ট একটা লোকালয়, অচেনা গ্রাম। গ্রামের লোকজন অবাক হয়ে গেছে আমাদের দেখে। হঠাৎ খেয়াল হলো আমার, আরে - ওরা কোথায়? শহীদ আর পারভেজ? ধরা পড়েনি তো? তিক্ততায় মনটা ভরে গেল নিজের স্বার্থপরতায়। আমার গোয়ার্তুমির জন্যই ওরা আজ এই বিপদে পড়েছে। নিজে পালাতে ব্যস্ত ছিলাম বলে ওরা কোথায় গেছে দেখার সুযোগ পাইনি। যাই হোক গ্রামের ভেতর দিয়ে এগিয়ে দেখলাম, সামনে আরেকটা পাহাড়। এটা অনেক পরিস্কার, গ্রামবাসীর কল্যানেই বোধহয়। পলাতক সবাই উঠতে শুরু করলো। অর্ধেক উঠে উপরে কাদেরকে যেন দেখা গেল। সন্দেহ হলো। শিবিরের কেউ না তো? ওরাও সন্দেহজনকভাবে তাকাচ্ছে আমাদের দিকে। তবে হাতে অস্ত্র দেখলাম না বলে এগিয়ে গেলাম সাহস করে। না, শিবির না, এরাও পলাতক জনতার অংশ। হেসে সন্দেহের কথাটা বললাম তারপর হাত মিলিয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগলাম। তখনো জানতাম না কোথায় উঠছি। টিলার ওপর উঠে দেখি সুন্দর একটা বাড়ী। সামনে বড় লোহার গেট বন্ধ। ওটা আসলে ভিসি সাহেবের বাড়ী। পাহাড়টা হলো ভিসির পাহাড়। স্বাভাবিক পথে কেউ কখনো আসিনি। আজকে প্রানভয়ে এলোমেলো ছুটতে ছুটতে ঘুরে ভিসির পাহাড়ে উঠে গেছি। অথচ ভেবেছিলাম ক্যাম্পাস ছেড়ে অনেক দুরে চলে গেছি। যাহোক এটা মোটামুটি নিরাপদ জায়গা আপাততঃ। পুলিশও দেখা যাচ্ছে গেটে।

ভিসির বাড়ী ছাড়িয়ে ডানে তাকাতে দেখি ওদিকের পাহাড়ের নীচ থেকে দুটি মাথা উপরে উঠছে। দেখে আমার হাসি দুকান ছাড়িয়ে গেল। শহীদ আর পারভেজ। তিনজনই আলাদা আলাদা পালানোর পরও ছুটতে ছুটতে একই আশ্রয়ে পৌছেছি। 'শালা, বেঁচে আছিস তাহলে' - দুঃসময়েও খুশী লাগলো। পরবর্তী গন্তব্য কোথায় জানি না। ঘন্টাখানেক পর ভিসির পাহাড় থেকে নেমে এলাম শহীদ মিনারের মোড়ে। খিদে পেয়েছে খুব। কিন্তু সব দোকানপাট কলাভবনের পাশে। ওখানে যাওয়া মানে আত্মহত্যা করা। তাছাড়া ক্যাম্পাসের মারামারিতে দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে বোধহয়। দুর থেকে দেখা যাচ্ছে কাকপক্ষীর আওয়াজও নেই ওখানে। কিন্তু খিদেটা আরো চিড়বিড় করে উঠতেই তিনজনে বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, চল যাই। ভালোমানুষের মতো হাঁটা দিলাম কলাভবনের দিকে । পুরো ক্যাম্পাসে কবরের নিস্তব্ধতা। কে বলবে দুই ঘন্টা আগেও কয়েক হাজার ছেলেমেয়ের পদচারনা ছিল এখানে। শিরশির করছে গায়ে। একটা ঝুপড়ি দোকানের আংশিক খোলা দেখলাম। দোকানী যে মারাত্মক সাহসী বলার অপেক্ষা রাখে না। এর বাপ নিশ্চয় একাত্তরের ২৫ মার্চের রাতেও দোকান করেছে। দোকানের ছেলেটা জানালো, শিবিরের পোলাপান ক্যাম্পাস থেকে চলে গেছে। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। খাবার তেমন কিছু নেই। শুধু চা মুড়ি খেয়ে ফিরে আসার সময় কলাভবনের কোনায় শিক্ষকদের বিশ্রামাগারের দিকে চোখ গেল। লোকজন দেখা যাচ্ছে ওখানে। এগিয়ে গিয়ে দেখি প্রতিবাদ সভা চলছে শিক্ষক সমিতির। হামিদা বানুকে দেখলাম। তিনিসহ আরো অনেক প্রগতিশীল শিক্ষক আক্রান্ত হয়েছেন। প্রতিবাদ সভা শেষে ফিরে এলাম শহীদ মিনারের দিকে। দেখি সব ছাত্রছাত্রী শামসুন্নাহার হলের দিকে যাচ্ছে। আমরাও গেলাম। আগে কখনো যাইনি মেয়েদের হলে। ছেলেরা ভেতরে যেতে পারেনা, সবাই সামনের মাঠে বসে আছে। গিয়ে নতুন খবর পেলাম একটা। শিবিরকর্মীরা ভার্সিটি থেকে বেরুনোর সব রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়েছে। শতশত ছেলেমেয়ে আটকে আছে এখানে। শিবিরের ক্যাডাররা তখন হলগুলোতে নির্যাতন চালাচ্ছিল বিপক্ষ দলের উপর। (পরে জেনেছি ছাত্র ফেডারেশানের নির্বিবাদী কর্মী ফারুককে কীভাবে মেরেছে। আমার আরেক নির্দলীয় বন্ধুকে তার শিবিরের রুমমেট দ্বীনের দাওয়াত কবুল না করার প্রতিশোধ নিয়েছিল সে রাতে। শাহ আমানত হলে সারারাত হকিষ্টিক দিয়ে রুমের এ মাথা থেকে মারতে মারতে ও মাথায় পাঠিয়ে খেলেছে শিবির ক্যাডার দিয়ে। নেহায়েত রুমমেট ছিল বলে খাতির করে প্রানে মারেনি, হাতপায়ের হাড়গুলো গুড়ো করে ছেড়ে দিয়েছে।)

শামসুন্নাহার হলের সামনে তখন অভুতপুর্ব এক দৃশ্য। হলের মেয়েরা একেকজন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল হয়ে গেছে। কেউ আহতদের ব্যান্ডেজ করছে, কেউ খাবার দিচ্ছে, কেউ পানির জগ হাতে পানি খাওয়াচ্ছে। দুপুর গড়িয়ে গেছে তখন। অনেকের খাওয়া হয়নি। আমাদের চা-মুড়ি হেঁটে আসতে আসতেই হজম। এগিয়ে গিয়ে দেখি কিছু মেলে কি না। কিন্তু খবর ভালো না। হলের খাবারতো অনেক আগেই শেষ। এরপর মেয়েদের নিজ নিজ রুমের যত চাল, ডাল, ডিম, কলা, মুড়ি, চিড়া, গুড়, তাও শেষ। একটা ছেলেকে দেখলাম মিনতি করছে, আপা শুধু সাদা ভাত থাকলেও দেন। সেই আপার কাছে অল্প ডাল ছিল, তাই দিল এগিয়ে। আমি ভেবে পেলাম না কার কাছে চাইব। লজ্জাটজ্জা আজ কোথায় যেন চলে গেছে। অন্যরকম এক অনুভুতি। একাত্তরকে একটু হলেও বাস্তব উপলব্ধি করেছিলাম সেদিন।

দয়াবতী চেহারার কাউকে খুঁজলাম। শেষে একজনকে বলেই ফেললাম,"আপা আপনার কাছে কী কিছু আছে?" সেই আপাটা এমন দুঃখিত চোখে তাকালো আমি এখনো দেখতে পাই সেই চোখের মায়া। বললো "ভাই, আরেকটু আগে যদি আসতেন! আমারতো ডাল ডিম সব শেষ"। আমি তাড়াতাড়ি বললাম, "না- ঠিক আছে, আমরা অবশ্য চা-মুড়ি খেয়েছি কিছুক্ষন আগে"। সেই অচেনা আপা তখন বললো, "একটু দাড়ান, রুম থেকে আসি।" পাঁচ মিনিটের মধ্যে হাতে করে নিয়ে এলো আনন্দ বিস্কিটের একটা প্যাকেট। বললো, "নিন, এটা তিনজনে ভাগ করে খান আপাততঃ।"

কোথায় যেন পড়েছিলাম, মানুষের প্রতি কখনোই বিশ্বাস হারাবে না। যে দেশের মানুষে মানুষে এতটা মায়া সে দেশের মাটি সোনার চেয়ে খাটি হবে না তো কোন দেশের হবে?

বিকেল হয়ে এসেছিল তখন। আমরা শহরে ফেরার কোন উপায় দেখছি না। আজ ফেরা যাবে কি না কে জানে। রাতে কোথায় থাকবে, কী খাবে এসব ভেবে সবাই অস্থির। একজন বললো, সামনের রাস্তা ধরে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে গেলে গ্রামের রাস্তা পাওয়া যাবে। রাতটা হয়ত সে গ্রামে কাটানো নিরাপদ হবে। এখানে হলের সামনে রাতে শিবিরের হামলা হবে শোনা যাচ্ছে। শহীদ বললো, চল পাহাড়ের ভেতরের রাস্তা দিয়েই হাঁটা শুরু করি। কোথাও না কোথাও বেরুনোর রাস্তা নিশ্চয়ই আছে। আরো কয়েকজন মিলে আমরা রওনা দিলাম।

শীতের বিকেল স্বল্পায়ু। আমরা পা চালিয়ে ভার্সিটি এলাকা পেরুতে পেরুতেই সন্ধ্যা নেমে আসলো। এলোপাথাড়ি হাঁটছি। বেশ কিছুদুর হাঁটার পর একট গ্রামের ভেতর প্রবেশ করলাম। গ্রামের একজনকে জিজ্ঞেস করে জানলাম চট্টগ্রাম শহরে যাবার রাস্তা। বড় রাস্তায় উঠে শহরে যাবার বাস পেয়ে গেলাম। আধঘন্টা পরে মধ্যে শহরের আলোতে প্রবেশ করলাম বিধ্বস্ত পরাজিত সৈনিকের মতো।

বাসায় ঢোকার পথে রক্তমাখা সাদা শার্ট দেখে মা চিৎকার করে ওঠে। মাকে আশ্বস্ত করি, ভয় নেই মা, এ আমার রক্ত না, এ রক্ত আরেক সহযোদ্ধার। তোমার ছেলের কিছু হয়নি।

গতকাল শুনলাম সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ তাঁদের একটি স্মরনিকা থেকে ১৯৯০-এর সেই কুখ্যাত ঘটনা থেকে শিবিরের নাম বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে প্রবল হুমকির মুখে। অবাক হইনি। সম্ভব হলে জামাত-শিবির চক্র ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ১৯৭১ সালটাকেই মুছে দিত।

Monday, November 10, 2008

আমি গনতন্ত্র দেখিনি

আমি কোন তন্ত্র বুঝি না। তন্ত্রের কোন কাজ আমি বাংলাদেশে দেখিনি আমার ৪০ বছর বয়সে। বাংলাদেশের জন্য ঠিক কোন তন্ত্র প্রযোজ্য আমি শিওর না। বাংলাদেশে গত ৩৮ বছরে শাসক বদল হয়েছে ৬ বারের মতো। কিন্তু চরিত্র কি বদলেছে? সামরিক বেসামরিক সব আমলেই কমবেশী অবিচার হয়েছে। প্রকৃত গনতন্ত্র বাংলাদেশে কোনদিনই ছিল না।

স্বাধীনতার পর পর দেশের অবস্থা খুব নাজুক হয়ে পড়ে বিভিন্ন আর্থ সামাজিক সমস্যার কারনে। একে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ তার উপর সুযোগ সন্ধানীরা যে যেদিকে পারছে লুটপাট করছিল। শেখ মুজিব সেই পরিস্থিতির সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। তার উপর রাজনৈতিক কোন্দলে ঘর ভাঙ্গলো। জাসদের জন্ম হলো। জাতীয় ঐক্যের বদলে অনৈক্য আর নৈরাজ্যই প্রাধান্য পেতে লাগলো। বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট বাংলাদেশেও এসে লাগলো। সাধারন মানুষ যখন না খেয়ে মরছে, তখন আওয়ামীলীগের অনেক নেতা মৌজ করছে আর টাকার পাহাড় বানাচ্ছে। তার উপর রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার মানুষের মধ্যে তীব্র ঘৃনার সুত্রপাত করে এবং নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তার সুচক দ্রুত নেমে যায়। তারপর দেশী-বিদেশী যৌথ ষড়যন্ত্রে সফল হলো ১৫ আগষ্টের শেখ মুজিবের নির্মম হত্যাকান্ড। জাতি নিপতিত হলো এক অন্ধকার যুগে।

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব হত্যার পর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর নানান ক্রিয়া বিক্রিয়ার ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা লাভ করে। দুই বছরের মধ্যে সেনাবাহিনীতে শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে সাধারন মানুষের মধ্যেও জনপ্রিয় নেতা হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে। তবে শৃংখলা আনতে গিয়ে সেনাবাহিনীকে প্রায় বধ্যভুমি বানিয়ে ফেলতে হয়। শত শত মুক্তিযোদ্ধা অফিসার নিধন করা হয়। বিদ্রোহ আর ষড়যন্ত্রের খোয়াড় হয়ে উঠে সেনানিবাসগুলো। কিন্তু জনগনের কাছে এসব খবর পৌছায় না। সবাই দেখে জিয়া খাল কাটে ছেড়া গেন্জী গায়ে। মুগ্ধ হয় তারা। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে জিয়ার ক্যারিশমা। তবে জিয়ার দেশ গড়ার একটা স্বপ্ন ছিল। নিজের মতো করে কিছু করতে চেয়েছিল। ক্ষমতার মোহটাও একটা কারন হতে পারে। ক্ষমতাকে নিরংকুশ রাখার জন্য অনেক সেনা অফিসারের প্রান নেয়া হয় আর এরশাদের মতো মেরুদন্ডহীন লম্পটকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। যার প্রতিদান অবশ্য এরশাদ দিয়েছিল ১৯৮১ সালের ৩০শে মে। মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা অফিসারের দ্বন্দ্ব কাজে লাগিয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করে এরশাদ।

১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির কালোযুগ। এরশাদ নামক নরকের কীট লম্পট দুরাচারের শাসনকাল।রাজনীতি থেকে 'নীতি' নামক বস্তুটা বিসর্জনের কাল। মহামান্য চামচা আর মহামান্য ভাঁড়েরা হয়ে ওঠে দেশ ও জাতি ভাগ্য নির্ধারক। সেই যুগের অবসান ঘটে যখন শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা আর জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়ার যৌথভাবে আন্দোলনে সামিল হয়।

১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশের গনতান্ত্রিক যুগের শুরু। কিন্তু কী গনতন্ত্র দেখলাম আমরা ১৫ বছরে? নির্বাচন হয়, একদল জিতে, অন্যদল হারে। যে জিতে সে বলে খুব ভালো নির্বাচন, যে হারে সে বলে কারচুপি হয়েছে। জিতা পার্টি সংসদে যায় নিজেরা নিজেরা আমোদ করে, বিরোধী দল গেলে মাইক কেড়ে নেয়। তারপর বিরোধী দল বলে সংসদে যামু না। ওয়াক আউট দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। তারপর হরতাল, ভাংচুর, আন্দোলন। মানি না মানবো না, একদফা একদাবী সরকার তুই কবে যাবি। ক্ষমতার কাড়াকাড়ি। বোদ্ধারা বলে এটাই গনতন্ত্র। শিশু গনতন্ত্র তো, মারামারি করছে তাই।

১৯৯৬ সালে আবার সরকার বদল হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। কিছুদিন পর একই দৃশ্য। পরের চার বছর সংসদ বর্জন, হরতাল, ভাংচুর, আন্দোলন। মানিনা মানবো না। একদফা একদাবি। ক্ষমতার কাড়াকাড়ি। বোদ্ধারা বলে গনতন্ত্র এরকমই। বাড়ন্ত বয়স, মারামারি লাগাই স্বাভাবিক।

২০০১ আবার নির্বাচন হয়। সরকার বদল হয়। আবারও একই দৃশ্য। মানিনা মানবো না। সংসদ বর্জন, হরতাল, ভাংচুর, আন্দোলন। ক্ষমতার কাড়াকাড়ি। বোদ্ধারা বলে এইতো বেড়ে উঠছে গনতন্ত্র। কৈশোর পেরোচ্ছে তো, হাতাহাতি একটু হবেই।

সন্ত্রাস, দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য এসবের কথা সচেতনভাবেই এড়িয়ে গেছি। এগুলো সব সরকারের আমলেই জনগনের প্রধান সমস্যা ছিল । কিন্তু একবারও এসবের জন্য একবারও আন্দোলন হয়নি। আন্দোলন, হরতাল সবকিছু হয়েছে ক্ষমতার কাড়াকাড়ি নিয়ে। তথাকথিত গনতন্ত্র নিয়ে।

অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষও ক্ষমতার এই অসভ্য কাড়াকাড়িকে বলে গনতন্ত্র। এর জন্য মায়াকান্না করে, প্রবন্ধ রচনা করে, ভাবগম্ভীর আলোচনায় অংশ নেয় টিভিতে।

এইসব কারনেই বাংলাদেশের গনতন্ত্র নামক প্রচলিত অরাজকতার প্রতি আমার বিশ্বাস নেই। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামাত, জাতীয়পার্টি গনতন্ত্রের পরীক্ষিত শত্রু ।


দুই শুয়োরের যুদ্ধকে যদি গনতন্ত্র বলা হয়, তাহলে আমি সেই গনতন্ত্র চাই না।
দুই শুয়োরের যুদ্ধকে যদি গনতন্ত্র বলা না হয়, তাহলে আমি গনতন্ত্র দেখিনি।

আমি আসলেই গনতন্ত্র দেখিনি। একদিনের জন্যও নয়।

গনতন্ত্রঃ অনাগত এক অতিথি

ভোরে অফিসে যেতে যেতে মানুষের পদচারনা দেখছিলাম। হেমন্তের মিষ্টি সোনালী ভোর, শিশির স্নাত ঘাস, পাখপাখালির কিচিরমিচির। বাঁয়ের পাহাড়ী সবুজে শীতলতার ছোঁয়া। স্কুলের বাচ্চারা মায়ের সাথে রিকশায় চলমান, ফুটপাতের পথশিশু পান্তার জন্য মায়ের আঁচল ধরে দন্ডায়মান। ডিসি হিলের বৃক্ষতলায় নানা বয়সী মানুষের বিলম্বিত ক্যালরি দমন। নিয়মিত দৃশ্য।

রাস্তায় তখনো যানজট শুরু হয়নি। রাইফেল ক্লাব ফেলে আরেকটু সামনে নিউমার্কেটের কাছে ফুটপাত বেদখল করে বসানো চৌকি দোকানগুলো এখনো শূন্য। রাস্তার মাঝখানে আইল্যান্ডে স্তুপ করে রাখা পুঁতিগন্ধময় ময়লার পাহাড়। সরকার বলে কিছু আছে? ডাষ্টবিনের জায়গায় দোকান, আইল্যান্ডের মাঝখানে ডাস্টবিন। তুলনা মিলবে না কোথাও। এটাও নিয়মিত দৃশ্য।

সময়টা গার্মেন্টস শ্রমিকদের। কর্মদিবসের শুরুতে দ্রুতপদে এগিয়ে চলা। ধাবমান পায়ের গতিতে ব্যস্ততা। বাংলাদেশ চলছে তাদের পায়ে পায়ে। ৫০ ডলারের পায়ে পায়ে বিলিয়ন ডলারের যোগফল। শিল্প এলাকার কাছাকাছি গিয়ে বাস-টেম্পুতে ঠাসাঠাসি মানুষ ট্রাফিক জ্যামে আটক। চোখ-মুখে বিলম্বিত কর্মপ্রবেশের উৎকন্ঠা। ইটের আধলা হাতে এক পাগলা রাস্তার এধার থেকে ওধারে ছুটছে আর বলছে "হে সাবধান, হে সাবধান......" এটা নিয়মিত দৃশ্য না।

তবে পাগলের সাবধান সংকেত আঘাত করে অন্য কোনখানে। অজানা উৎকন্ঠার হালকা কাঁপুনি ভেতরে। বাংলাদেশ কী ভালো আছে? স্বার্থপর আত্মমগ্নতার বাইরে এসে বোঝার চেষ্টা - বাংলাদেশের সমস্যা আমার নিজের সমস্যা আমার সমস্যা কিনা, অথবা আমার সমস্যা বাংলাদেশের সমস্যা কি না। সমীকরন মেলে না।

দরিদ্র বাংলাদেশের কতটুকু দারিদ্র দৃশ্যমান? চরম দারিদ্র কাহাকে বলে? বিশ্বব্যাংকের দারিদ্রের সংজ্ঞা আর বাংলাদেশের দারিদ্রের সংজ্ঞা কী এক? দৈনিক ১ ডলারেও অনেক খুশী বাংলাদেশের দরিদ্র। এমনকি সিকি ডলারেও বেঁচে থাকতে পারে বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষ। সেই সিকি ডলারের নীচে যাদের বসবাস, তাদের সংখ্যাও বাংলাদেশে বহু লক্ষ। বাজেটের বাইরে তাদের বসবাস, কেউ কেউ এমনকি গননারও বাইরে। সেই সব মানুষও বেঁচে আছে। তাহলে ভালো আছে বাংলাদেশ?

বাংলাদেশের খুব কাছের নিভৃতচারী দেশ ভুটান। দারিদ্রের সংজ্ঞাকে অর্থনীতির মাপকাঠির বাইরে আনতে সক্ষম হয়েছে এই একটিমাত্র দেশ। জাতীয় মোট আয়ের চেয়ে জাতীয় সামগ্রিক সুখকে প্রাধান্য দিয়েছে ভুটান। যার যা আছে তা নিয়ে সুখী হওয়া। বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের সাথে তার একটা মিল আছে। এদেশের দরিদ্র মানুষ খুব অল্পেই তুষ্ট। সে তুলনায় উচ্চবিত্তদের অতৃপ্তি লক্ষনীয়। উচ্চবিত্তদের বিত্ত টিকিয়ে রাখার কলা কৌশলের কাছে দরিদ্র মানুষ বারবার পরাজিত। বিত্তশালীদের উত্তরোত্তর সম্পদ বৃদ্ধির প্রতিযোগীতায় ধনী দরিদ্রের ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে। চরম দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার তুলনা করলে ভুটানের দরিদ্র বাংলাদেশের দরিদ্রের চেয়ে স্বচ্ছল। কিন্তু ধনবান শ্রেনীর তুলনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশের ধনীদের জীবনযাত্রা আমেরিকার ধনীদের সাথে তুল্য।

বাংলাদেশে ধনী দরিদ্রের পার্থক্যের এই বিশাল ব্যবধান আমাদের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি সবখানেই প্রভাব বিস্তার করেছে। আমাদের গনতন্ত্রের অন্যতম দুর্বলতা ধনী-দরিদ্রের এই বিশাল ব্যবধান। এই দুর্বলতার কারনে দুষ্ট লোকেরা ভোটের রাজনীতির নিয়ন্ত্রন করছে খুব সহজে। কারন তারা জানে ক্ষুধা যখন প্রবল, নীতিবোধ তখন মৃত।

তাই নির্বাচন যত সুষ্টুই হোক, যত নিরপেক্ষই হোক, বাংলাদেশের সত্যিকারের গনতন্ত্রে উত্তরনের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীন। গনতন্ত্র বাংলাদেশে এখনো অনাগত এক অতিথি।

Saturday, November 8, 2008

সংবাদে বিভ্রান্তি : মহাকাশ




Hubble Scores a Perfect Ten
The blue ring was most probably formed after the galaxy on the left passed through the galaxy on the right. Just as a pebble thrown into a pond creates an outwardly moving circular wave, a propagating density wave was generated at the point of impact and spread outward. As this density wave collided with material in the target galaxy that was moving inward due to the gravitational pull of the two galaxies, shocks and dense gas were produced, stimulating star formation.

http://www.newswise.com/articles/view/545911/


আজগুবি খবর। পড়ে সবাই বিভ্রান্ত হবে। যাদের মহাকাশ সম্পর্কে ধারনা নাই।

পরে হাবল্ থেকে যাচাই করে পড়লাম নিচেরটা।

The two galaxies happen to be oriented so that they appear to mark the number 10. The left-most galaxy, or the "one" in this image, is relatively undisturbed apart from a smooth ring of starlight. It appears nearly on edge to our line of sight. The right-most galaxy, resembling a zero, exhibits a clumpy, blue ring of intense star formation. The galaxy pair was photographed on October 27-28, 2008. Arp 147 lies in the constellation Cetus, and it is more than 400 million light-years away from Earth.

http://hubblesite.org/newscenter/archive/releases/2008/37/

আমরা পরিবর্তন চাই না

আমরা বদলাবো না। আমাদের অতীত সোনালী।
আমরা বাঁচি অতীতে। আমরা ভবিষ্যত দেখি না।
বর্তমান মানি না। আমরা আপোষহীনা।

না, এইটা কোন কবিতা না।

মনটা ভার ভার গত দুই দিন। কথা ছিল হালকা হওয়ার। জরুরী অবস্থা শিথিল হচ্ছে, নির্বাচনী দামামা বাজছে, শেখ হাসিনা দেশে এসেছে, খালেদা জিয়া লালদিঘীতে প্রথম জনসভা করেছে। গনতন্ত্রপ্রিয় মানুষেরই খুশী হওয়ার কথা। কিন্তু আমি খুশী হতে পারিনি। মুক্তির পর পর দুই নেত্রীর প্রথম জনদর্শন কেন যেন শুভ সূচনা মনে হয়নি।

পৃথিবীজুড়ে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। বারাক ওবামা বলছে ‘পরিবর্তন’, প্রথম আলো বলছে ‘বদলে যাও’। কিন্তু খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনার মধ্যে পরিবর্তনের কোন আভাস দেখা যায়নি এখনও।

দুজনের কেউ বলেনি, আমরা অতীতের ভুলভ্রান্তি ছাপিয়ে বাংলাদেশকে সোনালী ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবো। দেখে মনেই হচ্ছে না জীবনের দীর্ঘতম কারাজীবন শেষে দুজন প্রথম জনসমক্ষে এসেছেন। কী ভুলের কারনে এই কারাবাস ঘটেছিল? আদৌ কোন ভুল ছিল কি? তাঁদের প্রাথমিক আচরনে মনে হচ্ছে না কোন ভুল ছিল দুজনের অতীতে। সব কিছু যেন ‘শুদ্ধ’ই ছিল এবং সেই ‘শুদ্ধতা’র চর্চা অব্যাহত রাখার লক্ষনও মোটামুটি পরিস্কার। কিন্তু অতীতের সেই ‘শুদ্ধতা’ জাতিকে নতুন কোন সংকটের মুখোমুখি করবে না তো?

Thursday, November 6, 2008

একজন রাজাকার ও সাধারন ক্ষমা

একজন রাজাকারের গল্প বলি। তার নাম আবদুল আলীম। বয়স এখন প্রায় ৫৫/৫৬। আমার নিজের গ্রামের বাসিন্দা। বর্তমান পেশা পাহারাদার। ১৯৭১ সালে আবদুল আলীমের বয়স ১৮ বছরের কাছাকাছি। দারিদ্রপীড়িত পরিবারের সন্তান। পড়াশোনা করার সুযোগ হয়নি। নিয়মিত কোন কাজ নেই। মাঝে মাঝে দিনমজুর খেটে কোনমতে সংসার চালাত। বাবা মারা গেছে অনেক ছোট বয়সে। মা আর ছোট ভাই আমিনকে নিয়ে বাঁশের খুপড়ি ঘরে খেয়ে না খেয়ে দিন যাপন করছিল।

যুদ্ধের শুরুতে এলাকার মাতব্বর উকিল আহমেদ হোসেন পাকিস্তান রক্ষায় তৎপর হয়ে পড়েন। এলাকার লোকজনকে নিয়ে গড়ে তোলেন শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী। আবদুল আলীমকে ডেকে রাজাকার বাহিনীতে চাকরীর অফার দেন। মাসিক বেতন ১৫ টাকা। দ্বিতীয় চিন্তার চেষ্টা না করেই আবদুল আলীম রাজী। খবর পেয়ে খুশীতে ডগমগ আবদুল আলীমের পরিবার। আল্লায় মুখ তুলে চেয়েছে এতদিনে। তিন বেলা পেটপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা হল। কাজও তেমন কঠিন না, রাতের বেলা কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে গ্রামের সামনে মহাসড়কের সেতুটা পাহারা দেয়া। দিনে ঘুম, রাতে পাহারা।

ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হবার পর ভয়ে বেশ কিছুদিন পালিয়ে ছিল আবদুল আলীম। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসলে বাড়ী ফিরে আসে। এবং আবারও সেই পুরোনো কর্মহীন জীবন। অভাব, অনাহার, অর্ধাহার। না, স্বাধীনতা কোন পরিবর্তনই আনতে পারেনি তার জীবনে। বরং যুদ্ধের সময়টাই আরামের ছিল। যুদ্ধটা যদি আরো দীর্ঘায়িত হতো!

রাজাকার বাহিনীতে চাকরী করার কারনে কিনা জানি না, তাকে এলাকায় কোন কাজ কর্ম করতে দেখা যেতো না। মুখচোরা হয়ে থাকতো সবসময়। পরে কে যেন শহরে রিয়াজুদ্দিন বাজারে দারোয়ানের চাকরী যোগাড় করে দিয়েছিল, যা এখনো তার পরিবারের একমাত্র জীবিকা।

আমি গোলাম আজম-নিজামীদের ঘৃনা করি, উকিল আহমদ হোসেনকে ঘৃনা করি, কিন্তু আবদুল আলীমকে কখনো ঘৃনা করতে পারিনি। এমনকি সে যে রাজাকার ছিল সেটা আমার মনেও থাকে না। কারন তাঁর রাজাকার পরিচয়ের চেয়েও তাঁর অভাবী সংসারের পরিচয়টা অনেক বেশী প্রকট। তাছাড়া সে কখনো পাকিস্তান রক্ষার কুযুক্তির বানী শোনায়নি অথবা ইসলামের দোহাই দিয়ে তার রাজাকারী জায়েজ করারও চেষ্টা করেনি। বরং সে যে রাজাকার ছিল তার জন্য অনুতপ্ত হতে দেখেছি।

যদি কেউ বলে শেখ মুজিব রাজাকারদের সাধারন ক্ষমা করে মস্ত ভুল করেছিল, তখন আমার আবদুল আলীমের কথা মনে পড়ে যায়। বুঝতে পারি শেখ মুজিব কাদেরকে ক্ষমা করেছিল, কেন করেছিল। অসহায়, অভাবী মানুষ যারা নিজের দুর্দিন কাটাতে পাকিস্তানীদের চাকরী করতে বাধ্য হয়েছিল, তাদেরকেই ক্ষমা করেছিল শেখ মুজিব। চিহ্নিত ঘাতকদের নয়।

আবদুল আলীমদের ক্ষমার ফোকড় দিয়ে যখন নিজামী-মুজাহিদদের মতো আত্মস্বীকৃত গর্বিত রাজাকারেরা পিছলে বেরিয়ে যেতে চায়, তখন কী করা উচিত?

জাল ভোটের ভেজালে

একবার জাল ভোট দিয়েছিলাম। কিভাবে, বলছি সেকথা। ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচন ১৯৯৪। ভোটের আগের রাতে ঘনিষ্ট এক বন্ধু বললো, তোকে আমার এলাকায় ভোটার করেছি, রাতে আমার বাসায় থাকবি ভোটটা দিয়ে সকাল সকাল চলে আসবি।

আমি বললাম, জাল ভোট? না বাপু আমি এখানেই ভোটার, আমার আসল ভোটটাই দিতে চাই।

বন্ধু বললো, জাল ভোট না তো। তুই আগে ওই এলাকায় ছিলি না? তোকে তো জেনুইন ভোটার করেছি। তোর দুইটা ভোটই তো জেনুইন।

আমি দোনোমোনো। বললাম, না, তুই যা। ধরা খেলে খামাকা জেল খাটতে হবে আমার।

সে অপমান করার সুরে বললো, তুই শালা একটা *****ই, ভীতুর ডিম। তোর ইয়ে আছে কি না সন্দেহ আছে।

অপমান সহ্য হলো না, বললাম - চল।

পরদিন সকালে ভয়ে ভয়ে নকল ভোটটা সফলভাবে দিয়ে বুড়ো আঙুলে কালি মেখে বেরিয়ে এলাম ভোটকেন্দ্র থেকে। আসল ভোট দিতে যাবো এখন। রিক্সা নিলাম একটা, বুকে সাহস লাগল এতক্ষনে। কিন্তু ফ্যাকড়া লাগলো অমোছনীয় কালি নিয়ে। শালার এমন আঠালো কালি, কিছুতেই মুছে না। সবকিছুতে এত এত ভেজাল, মাগার এই কালিতে ভেজাল দিতে খেয়াল নাই কারো। মনে মনে ক্ষেপে উঠলাম ভেজালকারকের অদক্ষতার উপর। ভালো মুশকিলে পড়লাম তো!। আমার আসল ভোটটাই মারা যায় যায় আর কি। হঠাৎ খেয়াল করলাম ভোটকেন্দ্রের পাশের কচুক্ষেতে খুব ভীড়। গিয়ে দেখি কচুর ডগার রস দিয়ে কালি মোছার মহোৎসব চলছে সেখানে। বাহ্। দারুন তো? বাঙালীর এহেন আবিষ্কারে গর্বিত হলাম আমি। কে বলে বাঙালী পিছিয়ে? ঠেকা এবার আমারে! কচুবনে নেমে পড়লাম তাড়াতাড়ি।

কচু থেরাপীতে আধাঘন্টার মধ্যে কালি ছাফা। চাপকলের পানিতে ধোয়া ফকফকা হাত নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। সামনে এখনো জনা পঞ্চাশেক আছে, দেরী আছে অনেক। তবু নিজের এলাকা, জেনুইন ভোট, অতএব মেজাজ খোশ। ঘন্টা দুই পর আমার সিরিয়াল আসলো।

"ভাই, আপনি কি জেনুইন? আপনার ভোট তো দেয়া হয়ে গেছে অনেক আগেই।" দুম করে জানালো নির্বাচন কর্মী।

বাজ পড়লো আমার মাথায় - "কী??"

"হতেই পারে না। আমি এই মাত্র আসলাম। কে দিলো আমার ভোট? এটা কিছুতেই মেনে নেবো না।" উচ্চঃস্বরে বললাম আমি।

"দুঃখিত ভাই, কিন্তু কিছু করার নেই।" সহমর্মীতার সাথে বললো নির্বাচন কর্মী।

দুপুর গড়িয়ে গেছে। খিদা পেটে কয়েক ঘন্টা রোদের মধ্যে দাড়িয়ে আছি আমার জেনুইন ভোটটা দেয়ার জন্য। আর শালারা এখন বলে কিনা ভোট দেয়া হয়ে গেছে। মগের মুল্লুক? সবগুলা বদমাশ। গালাগাল করতে করতে বের হয়ে বেরিয়ে আসছি এমন সময় এক বন্ধু পোলিং এজেন্ট ডাক দিল আড়ালে।

ফিসফিস করে বললো, "তোর ভোটটা তো দিতে দেখেছি তোদের বাড়ীর বশিরকে। আমি ভেবেছিলাম ধরবো। কিন্তু পরে চিন্তা করলাম তুই হয়তো অসুস্থ, নিজে না এসে ওকে পাঠিয়েছিস। তাই সীন ক্রিয়েট না করে চুপচাপ ছিলাম।" পোলিং এজেন্ট বন্ধুর রাজনৈতিক পরিচয় জানা ছিল। পরিষ্কার হয়ে গেল কেন বশীর ধরা পড়লো না।

বশীর আমাদের বাসায় থাকে, আত্মীয় কিন্তু ভোটার না এখানকার। তার পছন্দ ছিল বিএনপি'র প্রার্থী। যখন শুনেছে আমি অন্য এলাকায় ভোট দিতে গেছি, ফাঁকতালে ভোটটা মেরে দিয়েছে নিজের পছন্দের প্রার্থীর জন্য। কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে এলাম কেন্দ্র থেকে গজগজ করতে করতে। বশীরকে ভালো একটা ধোলাই দিতে হবে আজ।

ভালো একট শিক্ষা পেলাম আজ। এক ভোটে দুই অনুভুতি। নিজে জালভোট দিলাম, আবার জালভোটের সাজাও পেলাম। জালভোট দিতে গিয়ে নিজের জালেই ধরা পড়লাম।

জামায়াতের রাজনীতি ও আমার বিবমিষা

বাঙালীমাত্রেই রাজনীতি প্রিয়। রিকশাওয়ালা থেকে শিল্পপতি পর্যন্ত সবারই নিজস্ব রাজনৈতিক পছন্দ অপছন্দ আছে। মাঝে মাঝে মনে হয় রাজনীতিতে মাথাটা আরেকটু কম ঘামালে দেশ আরো এগোতে পারতো। তবু খাওয়া-পরা-ঘুমের মতো রাজনীতি আমাদের প্রত্যেকের কিছু না কিছু সময় অধিকার করে রাখে প্রতিদিন। টিভিতে খবর দেখতে দেখতে কিংবা খাবার টেবিলে সপরিবারে রাজনৈতিক তর্ক খুব স্বাভাবিক দৃশ্য এদেশে।

জামাতে ইসলামীর নিবন্ধন নিয়ে নির্বাচন কমিশন নাটক করলো একটা। তা নিয়ে তোলপাড়। ব্যক্তিগতভাবে জামাতে ইসলামীকে অপছন্দ করি তিনটি কারনে। প্রথমতঃ ১৯৭১, দ্বিতীয়তঃ ইসলামের বিকৃতি, তৃতীয়তঃ ভন্ডামি। তবে আমার চোখে তাদের যেগুলো তাদের দোষ, সমর্থকদের চোখে সেগুলো গুন। আমি 'রাজাকার' বলি গালি অর্থে, কিন্তু জামাতের সমর্থক এটাকে ইসলামের সেবক মনে করে। জামাতের সংসদে আসন সংখ্যা বেশী না হলেও তাদের ভোট ব্যাংক তাদের যোগ্যতার তুলনায় অনেক বেশী। এর প্রধান কারন দলটির সাংগঠনিক দক্ষতা নয় বরং প্রধান কারন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির ধারা। এই দুই দলের কল্যানে জামায়াত মোটামুটি ভালো অবস্থানে থাকে সব সরকারের আমলে।

বিএনপি আদর্শভিত্তিক কোন দল নয়। বরং দলটির মুল ভিত্তি আদর্শহীনতা। তবু দলটি গড়ে উঠেছে কিছুটা আওয়ামী লীগের ব্যর্থ শাসনে বিরক্ত মানুষের বিপরীত সমর্থনে, আর কিছুটা জেনারেল জিয়ার ব্যক্তিগত সামরিক ক্যারিশমার গাল-গল্পে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সকল প্রাক্তন মুসলিম লীগ, আওয়ামী আশীর্বাদ বঞ্চিত হতাশ সামরিক-বেসামরিক আমলা, রাজনৈতিক নেতা, জিয়ার অনুগ্রহভাজন হয়ে আলাদা একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরী করেছিল। সেই প্ল্যাটফর্ম পরবর্তীতে বিএনপি নামে পরিচিত হয়েছে। আদর্শ একটাই, আওয়ামী-বাকশালী ঠেকাও। ৭০-৭১ সালে আওয়ামী লীগের পেছনে সমবেত হওয়া মানুষের সমর্থন ৭৩-৭৫ সালে এসে ব্যপক হারে ধ্বসে পড়ে নিদারুন অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারনে। আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থা হারানো সেই বিশাল জনগোষ্টীকে জেনারেল জিয়া সামরিক ক্যারিশমায় নিজ আস্থায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন শীঘ্রই। জিয়ার সময়কালে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কারনে বিএনপির সমর্থন বাড়তে থাকে সারাদেশে। ঠিক সেই সময় জিয়ার বহুদলীয় রাজনীতির ছাতা মাথায় স্বাধীনতা বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রবেশ। পরবর্তীকালে আরেক লম্পট স্বৈরাচার হু.মু.এরশাদের ধর্মীয় ভন্ডামির রাজনীতি জামাতকে হৃষ্টপুষ্ট হবার সুযোগ করে দেয়।

১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জামাতের প্রতি আশীর্বাদ প্রসারিত হয় আরো। গোলাম আজমকে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু বিএনপি আমলের শেষের দিকে ক্ষমতার রাজনীতির নীতিহীন ভাগাভাগিতে জামাত ও আওয়ামী লীগের মধ্যে অবৈধ প্রেমের ঘটনা ঘটে যায়। ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ ক্ষমতার স্বাদ পেলে জামাতের সাথে অবৈধ প্রেমের অবসান ঘটে আবার।

১৯৯৬ সালের পর থেকে জামাত নতুন পদ্ধতির রাজনীতির চাষ করা শুরু করে। হরকতুল জিহাদ, হিজবুত তাহরীর, বাংলাভাই, এরকম অগনিত আন্ডারগ্রাউন্ড দল ও পান্ডার জন্ম দেয় জামাত। শুরু হয় বোমা কালচার। লক্ষ্য সব প্রগতিশীল মঞ্চ। কিন্তু ভুলেও একটা বোমা বিষ্ফেরিত হয়না বিএনপি বা তাদের সমমনা কোন সংগঠনের অনুষ্ঠানে। ২০০১ সালে বিএনপির ওয়ার্কিং পার্টনার হিসেবে ক্ষমতার আংশিক স্বাদ পেয়ে বিএনপির কাঁধে পা ঝুলিয়ে বসে জামাত। ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করার পরিকল্পনা এগিয়ে চলে। ২০০৬ এর শেষের দিকে যার চুড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে। যে কারনে ১/১১ কে বিধাতার আশীর্বাদ মনে হয়েছিল।

১/১১ এর পর বিএনপির চেয়ে জামাতের হতাশা ছিল লক্ষনীয় পরিমান বেশী। কারনটা কী? বাড়া ভাতে ছাই? কিন্তু পাতের ভাত কেড়ে নেয়া হলেও হাল ছাড়েনি জামাত। বসে থাকেনি একদিনও। ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে ব্যর্থ হয়ে এই ত্বত্তাবধায়ক সরকারের আমলে জরুরী অবস্থার অবসরে ঘরের- বাইরের সব নেটওয়ার্ক মেরামত-সম্প্রসারনে ব্যস্ত থাকে দুই বছর। সেই নেটওয়ার্কের মজেজায় দুর্নীতিবিরোধী সাড়াঁশি অভিযানেও অক্ষত থাকে জামাতের নেতাকুল। গ্রেফতারী পরোয়ানা মাথায় নিয়েও রাস্ট্রের সর্বোচ্চ কর্নধারদের সাথে হাসিমুখে সভা করে বেরিয়ে আসে তাদের নেতারা। মানুষ টিভিতে সেই মুখ দেখে প্রতি সন্ধ্যায়, অথচ পুলিশ তাদের খুঁজে পায় না।

হাসিনা-খালেদা-মুজাহিদ এই তিন জনের মধ্যে কে বেশী শক্তিশালী? উত্তরের জন্য বেশী ভাবতে হয় না এখন।

এমন শক্তিমান একটা দলকে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন দেবে না, এধরনের চিন্তা কি বাস্তবসম্মত? জামায়াত নিবন্ধন পাবে এটা নিশ্চয়ই পুর্বনির্ধারিত ব্যাপার। না হলে নির্বাচন কমিশনের শুনানীতে হাজির না থেকেও কিভাবে নিবন্ধন সার্টিফিকেট পেয়ে যায় জামাত। মাঝখানের প্রহসনগুলো সেই জলিল-মান্নান সংলাপ নাটকের মতো সময়ক্ষেপন। সরকার কি কোথাও অসহায়? কোথায়?

আমার এক উদারপন্থী বন্ধু বলে, ওরা রাজনীতি করলে অসুবিধা কোথায়, নির্বাচন করলে সমস্যা কোথায়, ওরাও তো দেশের নাগরিক।

বন্ধুকে বলি, ওরা এদেশের নাগরিক ঠিক আছে, তাছাড়া জামাত করে তো আমাদেরই কারো কারো মামা-চাচা-খালু-ভাই-বেরাদার। তাদের তো ফেলে দিতে পারবো না।

কিন্তু যে পতাকার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালে লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তে লাল করেছিল এ দেশের মাটি, সে পতাকা ওদের গাড়ীতে উড়বে, এটা আমার সহ্য হয় না। যারা এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের দাওয়াত দিয়ে এনে লাথি মারার মতো দুঃসাহস দেখায় তাদের হাতে এ দেশের সংসদের চাবি কতটা নিরাপদ? যারা এখনো শ্লোগান দেয় 'একাত্তরের রাজাকার গর্জে ওঠো আরবার', তাকে আমি কী করে বুকে নেবো। সে আমার ভাই হোক আর খালুই হোক।

স্বাধীনতার এত বছর পরেও যাদের বিশ্বাসে এতটুকু পরিবর্তন আসেনি, যাদের আচার আচরনে একটুও অনুশোচনা দেখি না, সেই ঘাতকদের, দালালদের, রাজাকার-আলবদরদের এদেশের রাজনীতিতে, সংসদে হেসে খেলে বেড়াতে দেখলে সত্যিই বিবমিষা হয়।

Monday, November 3, 2008

Development Is A Continious Process [Jan 2002]


DEVELOPMENT IS A CONTINUOUS PROCESS


Introduction:
Geographically Bangladesh is located in a natural disaster zone. A large number of rivers split the country into many low lands and plain lands. To control all these natural obstruction Bangladesh have to spend a big amount every year. Most of the money is from foreign grants and loans. Naturally it added a burden to our economy. Past 30 years we received as many as 36 billion US dollars debt and still we have a balance of debt around 17 billion dollars. A major portion of this money suppose to use for developing the infra structure of our country. But there is an allegation that only 25% of this money was used for the original purpose. Balance 75% money was misused! A recent seminar of an economist forum revealed this information. How a large amount of foreign aid was misused? There is no clear explanation from any source. But lets have a simple look how the interruption of development affects to our total economy and how we can overcome it. For better understanding we can take it in 3(three) parts, now we will look at the 1st phase.


PART-I (Development Criteria & Obstructions)

Development is a Process:


Development is not a destination rather it is a process. All developed country reached the destination of prosperity under a constant active development process for years. There are a lot of hardships involved to continue the process. Except few, all of the European countries had to pass crucial financial crisis until 1950s. Most of the East and South-East Asian country was under poverty level 30 years ago. But they all crossed that line and some of them are become economic giant by end of 20th century.

Where was the magic? The magic is A Continuous Development Process in every sector.

Regardless the democratic or autocratic governmental system development was on its own way in all those countries. Change of political government didn’t affect the development works.

Primarily a total development needs to contemplate following elements:

1. Higher Education Rate
2. Standard Infra-structural Facilities
3. Social and Political Stability
4. Implementation of Rules of Law
5. A Government with Dynamic Bureaucratic System

In the context of Bangladesh we cant find any of above elements in a satisfactory rate. That causes us to remain a backward and poorest nation in the world. What are the reasons that interrupted our development process? Among other factors we can see one of the main reason is the political change of government. Changes in power have a negative impact on our economy always. It becomes a kind of common tradition that whenever power hand over to a new party, he just simply blame to previous ruler for the bad shape of economy and never consider other factors involved.

In past 31 years changes of political government was as follows:

a. 1972-1975 Awami League
b. 1976-1981 BNP
c. 1982-1990 Jatiya Party
d. 1991-1996 BNP
e. 1996-2001 Awami League
f. 2001-2006 BNP

All the government works under some particular agenda for development. Government allocates the money under the program named ADP (Annual Development Program). A big amount of ADP is procured from Foreign Debt and Aid. But many of the projects were remain half done due to the inefficient management and corruption in the working process. Coordination between different wings of government is another quandary that is helped by poor bureaucratic system. Even the decision making for a project takes several years. But the most imperative problem in the development work is political change of a government.

It interrupts the development work severely. Politicize everything including development works is an impractical, but a common trend in Bangladesh. For example, the project taken by BNP government cannot expect sincere follow up by next AL government and BNP will do same way with AL project. Our 31 years experiences have seen this trend for many times. No government praise any project taken by previous government if they are political rival.



Where the 36 billion dollars used


During past 31 years Bangladesh received about 36 billion dollars foreign debt. It’s not a small amount for a country of our size! But where all those money had been utilized?

Food? Education? Public health? Electricity? Roads & Highways? Tele-communication? Housing? Urbanization? Social Security? Disaster protection? Poverty alleviation?

How many of above sector have been developed to a satisfactory level? We only achieved the target of the production of rice. Not any other sector developed to the minimum satisfactory level.

All the development projects can be fallen in the following 4 types groups:

1. Successful project
2. Half-Successful project
3. Failure project &
4. Unfinished or pending project

Government should take a measure how many projects have been fallen in which group and why? Who is the responsible for the failed project and why unfinished projects were not finish in due course? Another remarkable factor must take into account that most of the government project cannot be finished with the budgeted cost. Sometimes the cost increased more than 100%. It happened to Barapukuria coalmine, Madya para shila project, Tista dam, KAFCO and many other projects. To avoid overlapping time and cost government should consider all the related factors carefully before approving any project. During implementation keeping it in mind that we are using lending money and repayment will be done from our own resources including the interest that increases our budget deficit.



PART-II (Development of Other Asian Countries)

How other Asian countries Excelled


Countries of East and South East Asian region are used to pick up as a development model for Bangladesh. But did we do what we supposed to do? How they have developed themselves to a certain level? How they have attracted huge foreign investment? How they managed to use foreign debt to develop the infrastructure that helped them to enhance the foreign investment at a large scale?

They have designed and constructed their country to attract foreign investment. As foreign investment enhanced, their economy had been boosted in a short time. Development reaches to a satisfactory. That's why many of those countries stopped borrowing external debt from IDA etc.

We may take a look at some Asian countries that stopped borrowing from IDA as per mentioned year below:
Indonesia: 1980
Philippines: 1991
Thailand: 1979
China: 1999
Korea: 1974
None of above countries enjoyed better financial stability than Bangladesh even 30 years ago. The have had worst infra structure facilities than Bangladesh. But most of the country achieved financial stability within two decades. From the experience of south East Asia it has been found that political stability is the main pre-requisite to achieve the goal.

Where Bangladesh is
What is the position of Bangladesh? Lets look at some figure for the year 2001-2002
[In million U$]
Export 6476.0
Import (9363.0)
Tread Balance (2887.0)
Current Transfer 2316.0
Foreign Investment 174.0
Foreign debt (1999-2000) 1575.0
Total FC reserve end of 2001 1305.5
[Source: Bangladesh Bank report]

Our trade balance is negative by around 3 billion US dollars. To recover this deficit we need more foreign currency to be added with inbound dollars. Our own major source of foreign currency is just two, Inward remittances & Export earnings. We must enhance these two areas to cover up the deficit.

Increase Inward Remittance

Firstly, inward remittance can be increased in large scale if all the Bangladeshi people living abroad send money to Bangladesh in legal way instead of 'hundee' etc. Government should emphasis Middle East and South East Asian region priority base. Because most of the less educated Bangladeshi workers are employed there and they send a huge amount every year by using illegal channel. One of the reasons for sending money by illegal channel is ignorance and lack of consciousness. For many of them, banking process is really a difficult matter and many of them never maintain a bank account. In that case our foreign missions and embassies can play an important role to motivate them to use legal channel for sending all their money. A co-ordination is needed between embassies and foreign branch of local bank. If this work can be done successfully that may add as much as 1 billion dollars to our economy.

Recently government took some initiative to make it easy to send remittance easy way. Electronic Transfer System quickened the receipt of money. But the best another alternative will be, if government can set a kind of booth in all the foreign embassies in different country who will receive money from the people and send it to Bangladesh. May be Sonali Bank can help in this area. To encourage using banking channel, the traditional formalities of money transfer can be avoided. People will deposit the money to the booth with the address of recipient and rest of the job can be done by embassy. Whatever, there must be a change.

Boost Up Export Sector:

Secondly, we must boost up our export sector. Now only garment sector contributing about 75% of our total export. Yet garments sector is the only better source for foreign currency. Age of garments business is around 20 years. Needless to say that most of the business like banks, insurance companies, forwarding company, Transport business, accessories suppliers etc surviving in Bangladesh depending only on garments sector. If this sector is collapsed the whole economy will be jeopardized. Destruction will be immeasurable. Already Bangladesh started facing the hardship in this garments business and we must find an alternative immediately. To boost up our export we need to attract foreign investment very badly. Government keeps trying to attract investors in different ways. But we should remember that by the Seminar, Workshop and Exhibition in not enough to attract foreign investment. We really have to understand that. An investor considers Investment Environment for investing anywhere. Bangladesh must create the environment if she really wants to have a large amount of foreign investment. Without creating a standard infra structural facilities, inviting foreign investor is just useless. It is simply like inviting a guest to your home without preparing food and accommodation.

Not only foreign investment, if the climate of investment is not good, we can't expect local investment too. If the investment is not safe, if the return from investment is uncertain no one will utilize their money for any business or industry. So, we must ensure the environment before expect mass development in investment.


PART-III (Development and Enhancing the Investment Environment)



"We have to create the right climate for bigger and bigger investments. There are three investment climates that we should keep our eyes fixed on ---- domestic, international, and regional. The domestic investment climate depends heavily on the international climate. The international climate which is going through a lull, will soon start picking up. But when it does, will it come our way? We must prepare ourselves quickly to answer this question positively. If our law and order situation continues to deteriorate, as it is doing now, we can forget about foreign investment. Corruption and violence have become the order of the day. Nothing can work in an environment of limitless corruption and deteriorating law and order. Even the poor borrower of micro credit is not sure if her investment is safe. Restoring law and order and bringing down the corruption level to a level consistent with at least the SAARC countries." Dr. Muhammad Yunus in The Daily Star.

What is the Investment Environment?

The environment of investment can be defined as the composition of various infra-structural facilities that create the environment for investment. As such, there are five very important pre-requisites:

1. Port
2. Tele-communications
3. Electricity
4. Inland road transport etc.
5. Rules of law

To arrive at a certain level of our goal, we must have an "uninterrupted development process and no political interference in the development works." Only then will we be able to reach a satisfactory level in the above five pre-requisites. Singapore ensured it. Taiwan ensured it. Malaysia ensured it. Indonesia ensured it. The Philippines ensured it. Thailand ensured it and recently Vietnam also ensured it. They all understood the importance of the environment of investment and prepared their country to adopt foreign and local investment in the industrial sector. There is no other alternative.


A Brief Comparative Study:

I would like to compare our country with a nearby country, Vietnam, whose economy, size, and many other factors are similar to Bangladesh. A large number of prominent foreign companies have invested over there within a short time. In the last decade, countries such as South Korea and Malaysia were our development models. But they are already far ahead, and we can now see only Vietnam, which is experiencing its highest growth rate in GDP in recent history, as a country that is comparable to Bangladesh, who is also going up within very short time.

Only a few years ago, Vietnam opened her doors to foreign investment and the following companies entered there for investment:

Hi-tech : IBM, Oracle, General Electric, Nokia, Siemens, Philips,
Electrolux, ABB

Automobile : BMW, Ford, Daimler-Chrysler, Toyota, Mercedes-Benz etc.

Aeronautics : Boeing

Why does Bangladesh not have any foreign investors comparable to those listed above? Why have these firms moved to Vietnam? Why not Bangladesh? What is special about Vietnam?

The answer is that Vietnam created the Environment for the Investors before they invited foreign investment. From my recent visit to Vietnam and by a brief study, I have determined the following elements were the basic factors enabling Vietnam to change their economy:

1. An education rate of 94% (about 99% of the population high school enrolled)
2. Well established infra-structural facilities
3. A strong but dynamic bureaucratic system
4. Lowest Crime rate
5. Clean and well organized cities

Bangladesh still has the chance to achieve the above goals successfully if our leaders and policy makers proceed with sincerity, and if they act less Politically and more Economically.



Conclusion: Let's Look at Our Own Resources

The above analysis states the necessity of the existence of a continuous development process in Bangladesh. No political or non-political interruption should be allowed in any development works. This process requires not only the building of infrastructure, but also improvements in education, in law and order, in the bureaucratic system, in all sectors. Bangladesh needs to identify the areas that have huge potential for an affluent future. It must eradicate all of the old complexes, such as poverty, overpopulation, corruption, hunger, and criminal activities. We have to recognize and take advantage of the fact that Bangladesh is the country of highest arable land in the world, with the highest fertility. We can produce our own food and we can use our own energy sources for industrial development.

Having energy resources is a great advantage for any country that is working to be industrialized. Bangladesh has big reserves of natural gas--enough for its own use for 20 to 50 years, depending on the growth rate of development. In addition, there is another valuable resource, largely unexplored in different places of southern Bangladesh.

Locally, it is called "black gold." Black gold is the popular term for the minerals lying in Cox's Bazaar and the surrounding area. The real names are Titanium, Zircon, Rutile etc. All of these are blended in the sand of the beaches in the area.

According to a valuation survey, in 1992-93, the estimated value of those minerals is (USD) $2,620,974,561,403.00!!!

This price is beyond our imagination. To obtain this high price, we need to PURIFY the minerals to a certain level. The purification process is difficult enough and costly, no doubt, but not impossible. Recently, a lease agreement was signed by an Australian company, International Titanium Resources. From a different source it has been found that the deal was not fair and favorable for us. We will not be able to get the price we are supposed to get. The agreement was made by bypassing the local experts who were on the development committee from an earlier stage. We therefore wish for the government to review the deal again and check to see if there is any irregularity and reach a final decision only after consulting with local experts from BUET etc.

The proper utilization of natural resources and human resources can be a powerful tool for substantial changes in Bangladesh within a short time. Bangladesh is a land of great undiscovered potential. Let's unearth the opportunities from our own golden soil.

Teen: Age of Spoil or Blooming [Feb 20, 2002]

3 OF US

……Hanif is in jail now. 7 cases against him including 3 murder case. Not married yet.

……Shahin is a Civil Engineer and working in a large multi-national company. Married
recently. No children yet.

……I (Mahmud) am a teacher of a government college. Married and one daughter.

THREE of us were “manik-jor” in our early age. We lived together, study together, play together in fact our all routine was same during our studying in school. After SSC we admitted different college. This was the turning point of our life, I can feel it now. But that time we didn’t realize that we will be changed dramatically and we will be inhabitant of a separate world. But within 15 years of our SSC exam, that become the reality. We still friend but Hanif is far distant from us.

But how things have been changed? I analyzed it from different point of view.


WE STARTED TO APART

After entering college life our routine was changed. Each of us have found new friends in new campus. We learned to smoke for the first time. We fell in love for the first time. But Hanif was in little advanced than us. He introduced to the dark world. He obtained some ‘ganja’ friend and ‘ganja stick’ became part of their everyday life. Also he started to return home late. It also have been noticed that his parents never complained about his late arrival home. In school we 3 used to meet every day, every hour except sleeping time. But that was extended to a week, a month and then a year. Eventually Hanif become a classified listed criminal of city and a distant friend from two of us. Not that we didn’t try to keep him away from dark world, but that world become so sweet for him suddenly.


HOW PARENTS SPOILED A CHILD

Late teen is very sensitive time for youth, most important turning point of life. Thousands of Hanif is growing in our society every year. Apparently because of political instability, unemployment, social unrest is responsible for that. But from a close observation to few family and Hanif gives us different signal.

A teen boy/girl can be spoiled by mishandling. “Over-care” and “no-care” both are detrimental for upbringing a child. In many cases I found that parents blindly support all activities of his son. In Hanif case what happen is:

1. His parents didn’t mind his late arrival at home regularly.
2. His parents allow him to spend countless money and he used to enjoy absolute freedom in college life.
3. His parents were very much satisfied with his SSC result and admission to a reputed college.
4. His parents didn’t check who were in his friends during his college age.

Above all elements are good enough to spoil a good boy. Placement has an important role to build one’s character. But that’s not all. Person’s wrong choice of freedom can make different result. Hanif had good chance to make his life in correct way in but he came in touch with wrong group and he didn’t face any control from his family. Need to mention one thing here, his parents never had good relation with each other and they rarely care about the kids instead of their conjugal fighting.


A FUTURE HANIF

Hanif couldn’t pass HSC and that is end of his student life, but he turned to a student leader soon and lead a student front of a damn powerful political party. He were from a solvent family, but he himself became rich within 7/8 year of his leadership in the college. We will not surprise if he nominated for MP in next election and he is expected to be out of jail before hand. We were too shocked by his development(!) that we forgot to hate him. Probably we will hail him when he will be a proud member of Sher-e-Bangla Nagar MP club.

Never noticed any survey done on the background of existing urban terrorist in Bangladesh. If there is any, surely many of them will have similar background as Hanif. Surely many will be found that due to the carelessness of family, the teen boys turned to the underworld criminal and a part of them already involved with leadership of country. Politics, social elements are going to be controlled by them. Many can expect upcoming social chaos in near future if we can’t stop this trend.


PARENTS LIABILITY IN NATION BUILDING

Each family may consider to monitor the activity of their teen boy/girl. Not to let them spare the lots of money in early age even if from rich family. Not allow out of home late at night. Talk to their friend time to time. Watch them. This is not so much painful job if you think of a spoiled future of your kids.

Unless a parents supervision and fair education system jointly work, no hope is waiting for the nation so far. Family is the best place to build a nation.