Sunday, June 8, 2014

গানের পরে গান

এলোমেলো সময়ে গান কি কোন কাজ দেয়? তিন তিরিক্ষে নয় রকমের ঝামেলায় গান শোনার মুডও উবে গিয়েছিল। ভোরবেলা কর্মস্থলে আসার পথে ব্যাগের ভেতর থেকে না পড়া একটা বই বের করে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে পনেরো মিনিটের যাত্রা পয়তাল্লিশ মিনিটে শেষ করে কর্মস্থলে পৌঁছে যাই। গান শুনে শুনে কী বই পড়া যায়? যায়, আবার যায় না। আমি ছাত্রজীবনে গান শুনে শুনে অংক করতাম। ভার্সিটির পড়ালেখার সময় ওভাবেই গেছে। আর কিছু না হোক গোল্লা গোল্লা নাম্বার যোগাড় হয়েছে। থার্ড ইয়ারে এসে তবু রক্ষা।

কিছু গান আছে যা শুনতে শুনতে পড়াশোনা করা যায়। বহুবার শোনা গানগুলো। আবার একদম নতুন গান হলে পড়ায় মন বসে না। আবার গান শুনেও যুত লাগে না। তাই বই পড়ার সময় পুরোনো গান শুনি, আর নতুন গান শোনার সময় বই পড়ি না। এভাবেই গান শোনা আর বই পড়া একটা আপোষ করে নিয়েছে। কেউ কারো ক্ষতি না করেই সহাবস্থানে থাকতে পারছে।

বেশ কিছুদিন সুমনের গান শুনছিলাম। এই পর্বে আবারো নতুন কটা গান পেলাম। শুনে দেখার জন্য সংগ্রহ করলাম।


থেমে যেতে যেতে


সাড়া দাও



বিগড়ে যাওয়া সময়গুলো যখন অমসৃন পথ ঠেলে এগিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানায় তখন কেউ আকাশ পথে হাতটি ধরে মাটি থেকে একটু করে ভাসিয়ে দিলে, ভেসে যেতাম আমি।

অসময়ে গুরুত্ব হারানো সংবাদটি

কেতাবী জ্ঞান না থাকলেও কাতেবুল ইসলামের কুতুবী বুদ্ধির কাছে মিরাজুল ইসলাম দুগ্ধপানরত বাছুর মাত্র। এক গাঁয়ের বাসিন্দা দুইজনই, দুই প্রান্তে বসবাস। শৈশব কৈশোরে একসাথে দুরন্তপনা করলেও দেশভাগের পর ভোল পাল্টে যায় কাতেবুল ইসলামের। দাঙ্গার সময় গ্রাম ছেড়ে পালানো এক হিন্দু পরিবারের সব সহায় সম্পদ দেখভালের দায়িত্ব নেবার পর পুরো গাঁয়ের দায়িত্বও যেন তার উপর এসে পড়ে। সেই পরিবার আর ফেরেনি, সম্পদের দলিলে কাতেবুলের কারসাজির হাত পড়ে মালিকের ঠিকানা বদলে যায়। শুরুতে আপনি মোড়ল হলেও একসময় গাঁয়ের লোকেও তাকে মানতে শুরু করে। এক মিরাজুল ইসলাম ছাড়া।

মিরাজুল ইসলাম তাকে মোড়ল মানতে পারে না বন্ধুই মনে করে এখনো। বাল্যবন্ধু হলেও কাতেবুল ইসলাম ধনদৌলতের মালিক হবার পর থেকে মিরাজুলের কাছ থেকে দূরে চলে যেতে থাকে। একসময় মিরাজুল বন্ধুকে হারিয়ে ফেলে চামুণ্ডাবেষ্টিত ক্ষমতার বলয়ের ভেতরে।

কাতেবুলের বৈঠকখানায় লম্বা একটা টেবিলের এক পাশে দুটো চেয়ার বসানো আছে যেখানে সে বিশিষ্ট অতিথিকে বসিয়ে গল্পগুজব করে। টেবিলের দুপাশে আর ঘরের চারপাশে আরো আট দশখানা কাঠের টুল বসানো যেখানে গ্রামের সাধারণ লোক বসে মোড়লের কথা শোনে।

মিরাজুল প্রথম ভুলটি করে এক সালিশের দিনে। সেদিন সে কাতেবুলের পাশের চেয়ারে বসে পড়ে কোন কথাবার্তা ছাড়াই। কাতেবুলের কাছে ব্যাপারটা বেয়াদবীর সামিল। ছেলেবেলায় নেংটা হয়ে এক পুকুরে গোসল করেছি বলে এখনো এক বিছানায় ঘুমাবো তা কখনো হয় না। গাঁয়ের লোক কিন্তু এতে কিছু মনে করে না, জানে দুজনেই বাল্য দোস্ত। কাতেবুল মনে মনে খুবই রুষ্ট হয় কিন্তু মুখফুটে কিছু বলতে পারে না। মনে মনে চেপে রাখে।

সেই থেকে শুরু। সুযোগ পেলেই কাতেবুল অপদস্থ করতে শুরু করে মিরাজুলকে। মিরাজুলের অর্থবিত্ত নেই, কিন্তু কিছু জোত জমি আছে তাতে ভালোই সংসার চলে। এই ভালোটা কাতেবুলের সহ্য হয় না। সে চায় বাকীদের মতো মিরাজুলও তার বাধ্য থাকবে, তার অধীন থাকবে, টাকাপয়সা লাগলে হাত পাতবে। ছেলেমেয়ের জন্য ভালো জামা লাগলে এসে বলবে। কাতেবুল জনসেবা করতে পছন্দ করে। সে সবাইকে সেবা করলেও মিরাজুলের জন্য কিছু করতে না পেরে মনে মনে অস্বস্তিতে ভোগে।

অস্বস্তিটা কয়েকগুন বেড়ে গেল যখন মেরাজুল বাড়ির পশ্চিম জমিতে বিরাট একটা পুকুর খনন করালো। পুকুরের চারপাশ ঘিরে নারকেল আম জাম কাঠাল গাছ লাগালো। খাবার জল আর মাছ চাষ দুটোর জন্যই দরকার ছিল পুকুরটার। গাঁয়ের লোকের মুখে পুকুরের প্রসংশা শুনে কাতেবুলের মেজাজটা দ্বিগুন চড়ে গেল।

মেজাজ ঠাণ্ডা করতেই বোধহয় কাতেবুল একদিন একটা মোটর সাইকেল কিনে ফেললো। নানান কাজে তাকে জেলা শহরে যাতায়াত করতে হয়। মোটরসাইকেলের দরকারটা ফেলনা নয়। জেলাশহর থেকে ফেরার সময় দুনিয়া কাঁপিয়ে ভটভট করে যখন তালতলার মেঠো পথে নামে তখন গাঁয়ের লোক কেন যেন একটু তটস্থ হয়ে পড়ে।

এরকম সময়ে মিরাজুল ইসলাম তৃতীয় বেয়াদবীটা করে বসলো। একদিন সে একটা রেডিও কিনে ফেললো। দেশ বিদেশের খবর শোনার জন্য। কাতেবুল ভাবলো এটা মিরাজুলের বাড়াবাড়ি। সে মোটর সাইকেল কিনেছে বলে পাল্টা রেডিও কিনে সে বাহাদুরি দেখালো। চাইলে কাতেবুল তিনটা রেডিও কিনে দেখাতে পারে। কিন্তু সেটা করলে মিরাজুলকে শিক্ষা দেয়া হবে না। তাই সে এক বৈঠকে ঘোষণা করলো, রেডিও হলো শয়তানের বাক্স। মানুষের ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে রেডিও শুনলে। চাটুকারেরা রব তুললো শয়তানের বাক্স, শয়তানের বাক্স, শয়তানের বাক্স।

একদিন কাতেবুলের বড় ছেলে জেলা শহর থেকে ফেরার পথে একটা রেডিও কিনে আনলো। কাতেবুল রাগে কিড়মিড় করেও জিব কামড়ে ফতোয়া বের করে ফেললো। ইহুদি নাসারার সাথে যুদ্ধ চলতেছে আরব দেশে। সেই যুদ্ধের খবর শোনা ঈমানী দায়িত্ব। সুতরাং রেডিও এখন হালাল। মোসাহেবরা বললো হালাল হালাল হালাল।

মিরাজুলের বড় ছেলে ঢাকায় পড়াশোনা করে। সে একটা মেয়েকে পছন্দ করে বিয়ে করে ফেলেছে শহরেই। মিরাজুল সমাজে মুখ যতটুকু দেখাতে পারতো তাও বন্ধ হয়ে গেল কাতেবুলের এক ফতোয়ায়। যে ছেলে বাপের অমতে বিয়ে করে তাকে ত্যাজ্য করা ছাড়া কোন উপায় নাই। মাথা নীচু করে শুনলেও মিরাজুল ত্যাজ্য করতে পারলো না ছেলেকে। তবে কঠিনভাবে বলে দিল সে যেন গ্রামে না আসে আর। মেসাহেবরা বললো ত্যাজ্য ত্যাজ্য ত্যাজ্য।

বছর না ঘুরতেই কাতেবুলের বড় ছেলেটা একদিন পাশের গ্রামের এক কৃষকের মেয়েকে তুলে এনে জোর করে বিয়ে করলো। কাতেবুলের ফিট হওয়া মাথায় বরফ দেবার পর হুশ ফিরলে সে প্রথম যে বাক্যটা বলে তা হলো, 'বয়স হলে মুসলমানের ছেলেকে বিয়ে করানো বাপের দায়িত্ব। বাপ সে দায়িত্ব ভুলে গেলেও ছেলে যে ভোলেনি, সেজন্য আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। সে নিজ দায়িত্বে বাপের অপ্রদত্ত নির্দেশ পালন করেছে বলে তাকে খোশ আমদেদ। মোসাহেবরা বললো, খোশ আমদেদ, খোশ আমদেদ, খোশ আমদেদ।

মিরাজুল সব বুঝেও মুখ বন্ধ করে থাকে। সে বুঝে ফেলে একই কাজ তার জন্য হারাম হলেও কাতেবুলের জন্য হালাল। এই নিয়মের মধ্যে সে ছোট মেয়ের বিয়েটা দিয়ে ফেলে নিজ হাতে। ব্যাপক আয়োজন না হলেও ঢাকঢোল কম বাজেনি।

মিরাজুলের মেয়েটা শ্বশুরবাড়ি পৌঁছানোর আগেই কাতেবুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তার মেয়ের বিয়েটা এমন জাঁকজমক করবে তা  সাত গ্রামের লোকে দেখেনি। জেলা শহর থেকে বাবুর্চি, শহরের নামকরা ব্যাণ্ডের বাদক দল, মহাসড়ক থেকে গ্রামে ঢোকার রাস্তার পুরোটাই সাতদিন ধরে আলোকসজ্জা চলবে।

তিন মাসের মধ্যে পাত্র ঠিকঠাক করা হলো। মোড়ল জীবনের তেইশ বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো কাতেবুল হাজির হলো সাবেক বন্ধুর বাড়ি। বিয়ের দাওয়াত নিয়ে। অনুষ্ঠানের তিনদিন আগেই যেন মিরাজুল পরিবার নিয়ে তার ঘরে চলে আসে ভাবীসাবকে সেই ওয়াদা করিয়ে তবে উঠলো কাতেবুল। মুগ্ধ হলো মিরাজুলের পরিবার।

বিবাহের আয়োজনের সাথে দুই বন্ধুর পুনর্মিলনে গ্রাম জুড়ে আনন্দ ছড়িয়ে পড়লো।

গায়ে হলুদে রাতভর জমজমাট অনুষ্ঠান হলো বলে বিয়ের দিন সবাই দেরীতে জেগে উঠলো।

ঘুম থেকে জাগার পর দুইজন মানুষকে নিখোঁজ দেখা গেল। স্বয়ং বিয়ের কন্যা এবং মিরাজুলের কনিষ্ঠ পুত্র।

দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে কাতেবুল পাঁচ সেকেণ্ডে বুঝে ফেলে তার মেয়েকে নিয়ে মিরাজুলের পোলাটা ভাগছে। তাকে ধরে কুত্তা দিয়ে খাওয়াবো আমি। মিরাইজ্যারে আমি এখন লাথি দিয়ে পুস্কুরনীতে ফেলে দেবো। খুন করে ফেলবো তোর গুষ্টিশুদ্ধা। শালা নেমক হারাম!

এরকম গালিগালাজ চলাকালীন কাতেবুলের শুভাকাংখী একজন পরামর্শ দিল খুনের কর্মসূচী আপাততঃ মুলতবী রেখে থানায় যাওয়া যাক। পুলিশকে কাজে লাগালে কাজ অনেক সহজ।

থানায় যাবার পথে পাশের জমিতে সাদা পাঞ্জাবীতে একজনকে শুয়ে থাকতে দেখা গেল। কাছে গিয়ে দেখা গেল সেটি মিরাজের কনিষ্ঠপুত্রের লাশ।

ঘটনা এখানে এসে সম্পূর্ন উল্টোপথে হাঁটতে শুরু করে।

জানাজানি হতেই শত শত লোক ছুটে এলো। কাতেবুল ইসলামে পা থানার বিপরীত দিকেই টানতে শুরু করলো এবার। থানায় গিয়ে মামলা করার বদলে তাকে এখন বলতে হবে, আমি খুন করি নাই!

খুনের দায় থেকে রেহাই পেতে কাতেবুলকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হলো। মিরাজুলকে আবারো বুকে টেনে নিতে হয়েছিল তাকে।

কিন্তু মিরাজুল কোনদিন তাকে ক্ষমা করতে পারেনি। আবার এটাও বুঝতে পারেনি কেন তার ছেলেকে খুন হতে হলো। তার সাথে কি কাতেবুলের মেয়ের কোন সম্পর্ক ছিল? সেরকম কোন ইঙ্গিত পায়নি কোনদিন।

অনেক তদন্ত করেও এই ঘটনার ব্যাপারে আর কিছুই জানা যায় না। রহস্য থেকে যায়। একসময় সবাই ভুলে যায়।

শেষ সংবাদঃ
কোন ঘটনাই চাপা থাকে না চিরকাল। বহুবছর পর জানা যায় কাতেবুলের মেয়েটা যাকে ভালোবাসতো তার সাথে যখন পালাচ্ছিল তখন কাতেবুলের কনিষ্ঠ সন্তানের চোখে পড়ে যায়। ছেলেটা তাদের পিছু পিছু কিছুদূর যাবার পর তাকে ধরে খুন করে ফেলে রেখে যায় মেয়েটার প্রেমিকের বন্ধুরা। এই সংবাদটা এমন সময় জানা যায় যখন কাতেবুল আর মিরাজুল দুই বন্ধুই পরপারের ঠিকানায় পৌঁছে গেছে। এরকম চটকদার সংবাদেও কোন সাড়া পড়ে না। কারো কোন উপকার হয় না।

Friday, June 6, 2014

এই সব দুঃখবোধ

১.
একজন অচেনা মাহবুব শাহীন খিলগাঁও রেলক্রসিং এ নিজের শরীরকে চলন্ত ট্রেনের নীচে পাঠিয়ে দেবার আগমুহূর্তে ফেসবুক মারফত পৃথিবীকে যে বার্তাটা জানিয়ে গিয়েছে তার অন্তর্নিহিত সত্য কতটা বেদনাদায়ক তা উপলব্ধি করার ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু একজন অচেনা মাহবুব শাহীনের এরকম একটা প্রস্থান আমার সমস্ত অস্তিত্বকে নাড়া দিয়েছে। পৃথিবীর কেউ তাকে useless ভেবেছিল বলেই হয়তো সে নিজেকেই উপহাস করে বলেছে Leaving useless myself forever. আড়াই লক্ষ কোটি টাকার জাতীয় বাজেটও তোমার কাছে অর্থহীন এখন!!

২.
এই ঘটনায় নিজস্ব ব্যক্তিগত দুঃখবেদনাজনিত হতাশ্বাসের জন্য খুব খুব লজ্জিত হলাম আজ।

৩.
কালকে আবারো নুতন কোন সমস্যায় ভারাক্রান্ত হয়েও ভাবতে থাকবো আমার চেয়ে ঢের বেশী সমস্যাক্রান্ত মানুষ আছে। আমাকে দুঃসময়ে হাত ধরার মানুষও আছে এখনো

৪.
পরশু হয়তো এই সব পরদুঃখ ভুলে আবারো আপনারে লয়েই বিব্রত রহিতে শুরু করিবো। জগতে এই মানবিক স্বার্থপরতা হাজার বছরের ইতিহাস।

Wednesday, June 4, 2014

হারিকেন

-একটা ঘান গাইবার কথা ছিল, ঘান
-ঘান নয় গাধা, গান
-না, ঘান
-ঘান কি করে হয়
-হয়, এরকম সময়ে ঘান হতে হয়, আমি গলা ছেড়ে ঘান গাইবো
-এতো দেখি পাড় মাতাল, শালা!
-ঐ গালি দিবি না, আমি তোর শালা কেমনে, তুই তো বিয়াই করিস নাই
-বিয়া করি নাই তো কি হইছে, করছি তো
-কি করছিস
-যা ইচ্ছে করছি,এবার ঘান গাইতে হবে
-ধুশশালা মাতোয়াল!
-ঐ আবারো গালি দেস?? আমি তোর গলাটা চেপে ধরবো, আয় হারামী.....কাছে আয়। আমি তোর গলা টিপে ধরে কাঁদি, আয় দুজনে কেঁদে কেঁদে ঘান গাই।

দোতলার বারান্দা থেকে দুই মাতালের গলাগলি আর গালাগালি শুনছিলাম মাঝরাতে। আমার ঘুম আসছে না। ঘরের ভেতর প্রচণ্ড গরম। কারেন্ট নেই। মশার ভ্যানভ্যান। সব মিলিয়ে ভীষণ অস্বস্তিকর একটা রাত। রাত দুটো বাজে এখনো ঘুমের দেখা নেই। প্রতিদিন এরকম হচ্ছে। মাঝরাতে উঠে বসি। আমার রুমমেট গ্রামের বাড়িতে গিয়ে অসুখে পড়েছে। গত কয়েকদিন একাকী রাত্রিযাপন।

সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ফিরে হারিক্যানটা জ্বালিয়ে রাখি। যখন তখন কারেন্ট চলে যায় বলে নয়। আমার নিজস্ব শখে। আমার পড়াশোনার বাতিক আছে একটু, কিন্তু টাকাপয়সার অভাবে তেমন বইপত্র কেনা হয় না। ফুটপাত থেকে পুরোনো ঈদসংখ্যা কিনে জমিয়েছি কিছু। সময় পেলে ওগুলোই পড়ি। মোটা মোটা ম্যাগাজিনগুলো অনেক সস্তা। একেকটা সংখ্যায় দশ পনেরোটা উপন্যাস থাকে। পঞ্চাশ টাকা দিয়ে অনেক পাওয়া।

আমি মেট্রিক পাশ করার পর গ্রাম থেকে চলে আসি সংসারের হাল ধরার জন্য। টাইপের কাজটা শিখেছিলাম বলে একটা কাজ পেয়ে যাই। সারাদিন খুটখাট টাইপ করে মাস শেষে যা পাই তাতে সংসারের হাল ধরা যেতো না। তাই ভাবি যা হয়েছে ভালোর জন্য হয়েছে।

দুর্ভাগাদের জন্য ধার্মিকেরা আশ্বাসবাণী ছড়ায়। আল্লায় যা করে ভালোর জন্যই করে। হ্যাঁ আমি জানি। খুব ভালো করে জানি এখন। সব ভালোর কারিগর সেই। এমনকি এক অসুখে আমার মা আর ছোটভাইটা এক সপ্তাহের মধ্যে দুনিয়া ছেড়ে চলে গিয়েও খুব ভালো কাজ করেছে। সবই তাঁর ইশারায়।

সংসারের হাল ধরার জন্য এখন আর হিমশিম খেতে হয় না। চার হাজার টাকা বেতনে আমার খুব ভালো চলে যায়।

মেসের সবগুলো ঘরে কারেন্ট আছে। শুধু আমার ঘরে নাই। আমার ঘরে লাইন আছে। কিন্তু বাতি না জ্বালালে ভাড়া ১০০ টাকা কম। পঞ্চাশ টাকার কেরোসিনে আমার সারা মাস চলে যায়।  তাই বাতি লাগাই নাই। তাছাড়া বাতি ফিউজ হলে আমার কিনে লাগাতে হবে। একটা বাল্বের টাকায় দুই সপ্তার কেরোসিন হয়ে যায়। এটা কি যথেষ্ট জোরালো কারণ নয়?

হারিক্যানটা আমার কিনতে হয়নি। চিমনিও বহু পুরোনো। কালসিটে দাগ পড়েছে, তবু বদলাই না। আমি সন্ধ্যাবেলায় হারিক্যান জ্বালিয়ে পড়াশোনা করি। যেমন করতাম গ্রামের স্কুলে পড়ার সময়। তখন মা হারিক্যানটা ঝেড়ে মুছে জ্বালিয়ে দিতেন। চিমনিতে খাতার কাগজ ছিঁড়ে চারভাঁজ করে একটুকরো কাগজও লাগিয়ে দিতেন। চোখে আলো আসলে পড়তে অসুবিধা।

আমি সেই অভ্যেসটা এখনো চালু রেখেছি। পুরোনো ঈদসংখ্যার বিজ্ঞাপনের পাতা ছিড়ে চারভাঁজ করে হ্যারিকেনের চিমনিতে আটকে দেই। চোখে আরাম লাগে। পড়তে কষ্ট হয় না আর চোখের জলও আড়াল হয়।

আসল ব্যাপারটা সসংকোচে বলেই ফেলি।

আমি প্রত্যেক সন্ধ্যায় নিয়ম করে চোখের জল ফেলি। পুরুষ মানুষের চোখের জল লজ্জার বিষয়। কিন্তু এই হ্যারিকেনের সামনে বসলে আমার চোখে জল না এসে পারে না। এই উজ্জ্বল শহরে আমি পুরোনো চিমনির মধ্যে যে আমার মায়ের মুখ দেখি। এই হ্যারিকেন আমার আমরণের সঙ্গী!

Tuesday, June 3, 2014

বছর কুড়ি আগে

ওদের দুজনের কথা আমার খুব মনে পড়ে।

আরো মনে পড়ে তখন বিটিভিতে অ্যালেক্স হ্যালীর রুটস দেখাচ্ছিল আর আমি তখন ভার্সিটির নবীন ছাত্রের গন্ধ কাটিয়ে উঠছিলাম মাত্র। সংসারে তখন তীব্র অভাব, পড়াশোনা করাটা বিলাসীতারই নামান্তর। তবু কিভাবে যে চলছিল! চলছিল কারণ বাবা নামের বটগাছটি ছিল। যে বটগাছটি কয়েক বছর আগেও সুখের পায়রাদের নিয়ে বিত্তবান সমাজে আনন্দ উল্লাসে সময় কাটাতো সেই বটগাছ এখন পত্র পল্লব হারিয়ে ঘরের কোনে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছিল। সেই ঘরটিতে বাবার নিত্য সঙ্গী ছিল ১৪ ইঞ্চি রঙিন টেলিভিশনটা যা বিকেল পাঁচটায় জাতীয় সঙ্গীতের সাথে জেগে উঠতো, ঘুমাতো রাত বারোটায় জাতীয় পতাকা দেখাবার পরে। সেই সময়ের অধিকাংশ বাবা খুব মন দিয়ে টেলিভিশনে ডুবে থাকতো। মা বিরক্ত হতো, আমরাও কখনো কখনো। বাবা টিভি রুমে থাকলে রুটস ম্যাকগাইভার বা বিশ্বকাপের খেলাটেলা দেখা হলেও মুভিটুভিগুলো দেখতে সাহস পেতাম না। টিভির জাতীয় পতাকা দেখানোর অনেক পরেও বাবা জেগে থাকতেন। ঘুম আসতো না হয়তো। কেন আসতো না আমাদের বোঝার বয়স হয়তো হয়নি, অথবা আমরা সেদিকে দেখতে চাইতাম না।

ঠিক সেরকম একটা সময়ে কুনতা কিনতে আমাদের ঘরে আসে। একদিন বাবা বাজারে  গিয়ে গোশতের বদলে দুটো ফুটফুটে খরগোশ ছানা নিয়ে ফিরেছিল। মায়ের তিরস্কারের মুখেও আমরা ভাইবোন চুপি চুপি বাবার পাশে গিয়ে খরগোশ দুটোকে দেখছিলাম এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই আদর করে ওদের নামকরণ করা হলো কুনতা কিনতে। রুটসের সেই বিখ্যাত দাস চরিত্র। ঘরে বাজার করার টাকা নেই কিন্তু খরগোশের জন্য তারের জালির সুন্দর ঘর তৈরী হয়ে যায়। ওদের জন্য আসতে থাকে খাবার দাবার সবজি।

আমরা অভাবের কথা ভুলে খরগোশ নিয়ে মেতে থাকি কদিন। আমাদের সামনের সবুজ বাগানে খরগোশ দুটো ছোটাছুটি করতো, খেলা করতো নিজেদের সাথে আর আমাদের সাথে। আমাদের সবচেয়ে কনিষ্ঠ বোনটার খুব প্রিয় হয়ে যায় কুনতা কিনতে। ওর প্রিয় সবকিছু আমারও প্রিয়, আমার প্রিয় সবকিছু ওরও প্রিয়। ফলে আমিও কুনতা কিনতের ভক্ত হয়ে যাই। আমাদের আনন্দ দেখে বাবাও কিছুসময় ভুলে থাকেন সংসার যন্ত্রণা।


আমাদের বাড়িটার চারপাশ ঘিরে অনেকগুলো নারিকেল গাছ লাগানো হয়েছিল। গাছগুলো তখনো মাটির কাছাকাছি। আম জাম লেবু আতা জলপাই পেয়ারা বরইসহ অনেক ফলের গাছ লাগানো হয়েছে। তখনো গাছগুলো ছায়া দেবার মতো খুব বড় হয়নি। কিন্তু ঘাসগুলো বেড়ে উঠতো তরতর করে। দশ কাঠা জায়গার মাঠটা জঙ্গল হয়ে যেতো ঘাস লতাপাতার ছাউনিতে। সেই ক্ষুদ্র আমাজনে হারিয়ে যেতো কুনতা কিনতে। আবার ডাক দিলে হুড়মুড় করে ছুটে বেরিয়ে আসতো জঙ্গল ছেড়ে।

মাঝে মাঝে সীমানা ছাড়িয়ে বাইরের রাস্তায় উঁকি দিত। তখনো পাকা রাস্তা হয়নি ওদিকে। চারদিকে ধানক্ষেত। পূর্ব পশ্চিমের রাস্তাটা মাটির তৈরী। বর্ষাকালে ডুবুডুবু হয়ে উঠতো বিল উপচে পড়লে। রাস্তার দিকে উঁকি দিলেও বের হবার সাহস করতো না, কুকুরের ভয়ে।

দিন যাচ্ছিল এভাবেই। ঢিমে তালে, তালে ঢিমে। আমি সকালে ভার্সিটিতে যাই, দুপুরে ফিরে খেয়ে ঘুম, ঘুম থেকে উঠে বিকেলে কলোনীতের নাটকের রিহার্সাল, রিহার্সাল শেষে কিছুক্ষণ আড্ডা, তারপর বাড়িফেরা। এই একঘেঁয়ে রুটিনে বৈচিত্র আসার মতো ঘটনা বিরল। তবু একদিন ঘুম ভেঙ্গে গেল হৈ চৈ শব্দে। ছুটে বারান্দায় গিয়ে দেখলাম জুটির সাদাকালো খরগোশটি তার ঘরের ভেতরে বসে থাকলেও ফকফকা সাদা খরগোশটি খাঁচার বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। খরগোশের ঘরটির তারের জালির নীচে একটা গর্ত।

কিভাবে কি ঘটলো কিছুই বোঝা গেল না। আপাতঃ দৃষ্টিতে বেড়াল বা কুকুরের আক্রমণে মারা গেছে বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু কোন শব্দ শুনলাম না কেন?

খরগোশের মৃত্যুটা আমাদের ঘরে প্রিয়জন হারাবার বেদনা হয়ে রইল বেশ কদিন। সবচেয়ে কনিষ্ট বোনটি এত আঘাত পেল যে কদিন ঠিকমতো খাওয়াদাওয়াও করলো না। বাকী খরগোশটি কুনতা যার নাম, সে আর তার ঘরের বাইরে আসে না। চুপচাপ বসে থাকে উদাস চাউনি দিয়ে। বেদনার্ত চোখ দুটো কেমন জ্বলজ্বল করতো। ওখানে ক'ফোটা জল জমা ছিল আমাদের কারো জানা নেই। ওই ছোট্ট বুকে সঙ্গী হারাবার বেদনা কত তীব্র হয়ে বেজেছিল তাও আমাদের বোঝা হয়নি। তবে ওর সঙ্গীহীন জীবন আমাদের মধ্যেও বিষন্নতার জন্ম দিয়েছিল। আমাদের সহ্য হচ্ছিল না এরকম একটা দৃশ্য। কুনতা আমাদেরকে অপরাধী ভেবেছিল কি?

দায়মুক্তির জন্যই বোধহয় একদিন তাই বাবা ওকে খাঁচায় পুরে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চিড়িয়াখানায় দান করার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। অশ্রুসজল চোখে কুনতাকে বিদায় জানালাম আমরা। ভরসা এটুকু যে আমাদের আদর থেকে বঞ্চিত হলেও অন্ততঃ বাকী জীবন সঙ্গীহীন থাকবে না চিড়িয়াখানায়। সঙ্গীহীন জীবন যে কোন প্রাণীর জন্যই সমান দুঃসহ।

বহুকাল কেটে গেছে, ওদের দুজনকে আমি আজো ভুলতে পারি না। পৃথিবী থেকে চলে গিয়েও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল এখনো। পৃথিবীর বয়েস ২০ বা ২৫ বছর বেড়ে গেছে ইতিমধ্যে?

আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা যদি হয়
আবার বছর কুড়ি পরে-
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে কার্তিকের মাসে-
তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে-
তখন হলুদ নদী নরম নরম  হয়
শর কাশ হোগলায়- মাঠের ভিতরে !
অথবা নাইকো ধান ক্ষেতে আর,
ব্যস্ততা নাই আর,
হাঁসের নীড়ের থেকে খড়
পাখির নীড়ের থেকে খড় ছড়াতেছে;
মনিয়ার ঘরে রাত, শীত আর শিশিরের জল !
জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি, কুড়ি, বছরের পার,-
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার !
হয়তো এসেছে চাঁদ মাঝরাতে একরাশ পাতার পিছনে
সরু- সরু- কালো কালো ডালপালা মুখে নিয়ে তার,
শিরীষের অথবা জামের ঝাউয়ের-আমের,
কুড়ি বছরের পরে তখন তোমারে নাই মনে !
জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার-
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার!
তখন হয়তো মাঠে হামাগুড়ি দিয়ে পেঁচা নামে-
বাবলার গলির অন্ধকারে
অশথের জানালার ফাঁকে কোথায় লুকায় আপনাকে !
চোখের পাতার মতো নেমে চুপি কোথায় চিলের ডানা থামে-
সোনালি সোনালি চিল- শিশির শিকার করে নিয়ে গেছে তারে-
কুড়ি বছর পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে !

[ কবিতা এবং শিরোনাম কৃতজ্ঞতাঃ জীবনানন্দ দাশ]

Sunday, June 1, 2014

একটি কবিতার সারমর্ম প্রচেষ্টা


জীবনানন্দ দাশের অন্যন্য কবিতার মতো 'দুজন' কবিতাটি পড়েও দৃষ্টিভঙ্গির ফেরে পাঠকের অর্থবাচক প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন হতে পারে। আমি বিশ বছর আগে যখন কবিতাটি পড়ি তখন একরকম অর্থ ভেবেছি, আজ ভাবছি অন্য রকম। প্রতি ছত্রের নিজস্ব একটা সারমর্ম তৈরী করে ব্র্যাকেটে জুড়ে দিলাম কবিতার সাথে। এহেন অপকর্মে বোদ্ধা লোকের তিরস্কার অতি প্রত্যাশিত পুরস্কার হতে পারে।


আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন-কতদিন আমিও তোমাকে
খুঁজি নাকো;- এক নক্ষত্রের নিচে তবু - একই আলো পৃথিবীর পারে
আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,
প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়,
হয় নাকি?- বলে সে তাকাল তার সঙ্গিনীর দিকে;
আজ এই মাঠ সূর্য সহমর্মী অঘ্রাণ কার্তিকে
প্রাণ তার ভরে গেছে।


[একই নক্ষত্রের নীচে বসবাস করেও দুজন দুজনকে ভুলে পৃথিবীর নিঃশ্বাসে বেঁচেছিল বহুকাল। নক্ষত্রের ঢের আগে মরে যায় নিবিড় প্রেমও..............]

দুজনে আজকে তারা চিরস্থায়ী পৃথিবী ও আকাশের পাশে
আবার প্রথম এল- মনে হয়-যেন কিছু চেয়ে -কিছু একান্ত বিশ্বাসে।
লালচে হলদে পাতা অনুষঙ্গে জাম বট অশ্বথের শাখার ভিতরে
অন্ধকারে নড়ে-চড়ে ঘাসের উপর ঝরে পড়ে;
তারপর সান্ত্বনায় থাকে চিরকাল।

[বিশ্ববটতলে মাত্র দুটো ঝরাপাতা................]

যেখানে আকাশে খুব নীরবতা, শান্তি খুব আছে,
হৃদয়ে প্রেমের গল্প শেষ হলে ক্রমে-ক্রমে যেখানে মানুষ
আশ্বাস খুঁজেছে এসে সময়ের দায়ভাগী নক্ষত্রের কাছেঃ
সেই ব্যপ্ত প্রান্তরে দুজন; চারিদিকে ঝাউ আম নিম নাগেশ্বরে
হেমন্ত আসিয়া গেছে;-চিলের সোনালি ডানা হয়েছে খয়েরী;
ঘুঘুর পালক যেন ঝরে গেছে-শালিকের নেই আর দেরি,
হলুদ কঠিন ঠ্যাং উচুঁ করে ঘুমাবে সে শিশিরের জলে;
ঝরিছে মরিছে সব এইখানে-বিদায় নিতেছে ব্যাপ্ত নিয়মের ফলে।


[হেমন্তদিন পার হলে সোনালী ডানার চিলও হারায় আভা, এই তো জগতের ব্যাপ্ত নিয়ম.........]

নারী তার সঙ্গীকেঃ'পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,
জানি আমি;-তারপর আমাদের দুঃস্থ হৃদয়
কী নিয়ে থাকিবে বল;-একদিন হৃদয়ে আঘাত ঢের দিয়েছে চেতনা,
তারপর ঝ'রে গেছে; আজ তবু মনে হয় যদি ঝরিত না।
হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ আমাদের-প্রেমের অপূর্ব শিশু আরক্ত বাসনা
ফুরোত না যদি, আহা, আমাদের হৃদয়ের থেকে-'


[প্রতিটি প্রেমের হৃদয়ই দুস্থ, প্রতিটি হৃদয়ে রক্ত ক্ষরণ, যদি ভুলগুলো না হতো কিছু ক্ষরণ বেঁচে যেতো আহা.........]

এই বলে ম্রিয়মাণ আঁচলের সর্বস্বতা দিয়ে মুখ ঢেকে
উদ্বেল কাশের বনে দাঁড়িয়ে রইল হাঁটুভর।
হলুদ রঙের শাড়ি, চোরকাঁটা বিঁধে আছে, এলোমেলো অঘ্রাণের খড়
চারি দিকে শূণ্য হতে ভেসে এসে ছুঁয়ে ছেনে যেতেছে শরীর;
চুলের উপর তার কুয়াশা রেখেছে হাত, ঝরিছে শিশির;-
প্রেমিকের মনে হলঃ'এই নারী-অপরূপ-খুঁজে পাবে নক্ষত্রের তীরে
যেখানে রব না আমি, রবে না মাধুরী এই, রবে না হতাশা,
কুয়াশা রবে না আর-জনিত বাসনা নিজে-বাসনার মতো ভালোবাসা
খুঁজে নেবে অমৃতের হরিণীর ভিড় থেকে ইপ্সিতেরে তার।'

[অতঃপর কবি ভাবে.... এই নারী আমাকে না পেলেও খুঁজে পাবে তার ইপ্সিত আশ্রয়, অঘ্রাণের শুষ্কতা পেরিয়ে সে পৌছে যাবে তার অবিরল ঠিকানায়.......]

Saturday, May 31, 2014

এক বৃষ্টি দিনের চড়ুইভাতি

সকালের বৃষ্টির ঝাঁঝালো শব্দ ছাপিয়ে টিঁউটিঁউ করে একটা কোলাহলময় মিষ্টি শব্দ কানে এলো। শব্দটা তেমন জোরালো না। একটু খেয়াল করে শুনলেই বোঝা যাচ্ছে। শব্দের উৎস খুঁজতে জানালার দিকে চোখ গেলে দেখলাম একজোড়া চড়ুই কার্নিশের আড়ালে বসে পালকের পানি ঝাড়ছে তিরতির করে। আমি জানালার এপাশে। ওরা নীলচে কাঁচের আড়ালে আমাকে দেখতে না পেলেও আমি ওদের স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। পাখির জগত প্রায় সবসময় জুটিময়। তবে হলিউডের অ্যাকশান মুভিতে যেমন পুরুষের পাশে জোর করে একটা নারী চরিত্রকে বসিয়ে দেয়া হয় সেরকম আরোপিত কিছু না। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ওরা পাশাপাশি থাকে।

পাশাপাশি থাকলেও ওরা কি একই জুটি কিনা সেটা নিশ্চিত হতে পারি না। মানুষের চোখে সব চড়ুই একই চেহারার। কোনটি কার জুটি তা বোঝা মুশকিল। ওরা কি নিজেদের জুটি চিনতে পারে? পারে নিশ্চয়ই। নইলে অনাচার দুরাচারে ভরে যেতো পক্ষী সমাজ। পাখি সমাজে বিয়ের প্রচলন নেই। মানুষ ছাড়া আর কারো বিয়েশাদীর ঝামেলাও নেই। যে যার মতো জুটি পছন্দ করে। তবু কোথাও অনাচার অজাচার নেই। পশুপাখি সমাজ মানব সমাজের চেয়ে অনেক বেশী গোছানো আর নিয়ন্ত্রিত। বলা হয়, মানুষকে সভ্য নিয়ন্ত্রিত যৌনজীবন যাপনে বাধ্য করার জন্য বিবাহ প্রথার প্রচলন হয়েছিল আদিযুগে। আসলেই কি তাই? মানুষকে তাহলে সৃষ্টি সেরা জীব বলা যায় কিসের যুক্তিতে। যে মানুষ বিয়ের শৃংখলে না থাকলে অসভ্য হয়ে যায়, সেই মানুষ কি করে সেরা প্রাণী হলো? কেন হলো? জ্ঞান বুদ্ধি বিবেকের পাল্লা ভারী বলে? সব জ্ঞানবুদ্ধি কি মঙ্গলময় কাজে লাগানো হয়? নাহ, মানুষকে আমি ঠিক শ্রেষ্ঠত্বের পাল্লায় ফেলতে পারি না।

কিচির মিচির শব্দের ধাক্কায় আমি ভাবুক জগত থেকে বাস্তবে এলাম। পাখি দুটোর মধ্যে কি একটা বিষয়ে যেন তর্ক চলছে। পুরুষ পাখিটা কিছু একটা বোঝাতে চাইছে, কিন্তু নারী পাখিটা মাথা নেড়ে আপত্তি জানাচ্ছে। পুরুষটা আবার একটু পেছনে ফিরে জানালার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে ভেতরে। সে মনে হয় বলতে চাইছে, ওই ফোকরে ঢুকে বসি, ওদিকে বৃষ্টি লাগবে না গায়ে। কিন্তু নারী পাখিটা অধিক সতর্ক। সে বলে-
-মানুষগুলারে একটা খুদের বিশ্বাসও নাই।
-ক্যান? বিশ্বাস নাই ক্যান? কোনদিন দেখছো কোন মানুষ চড়ুই শিকার করছে?
-ঐ তুই আমাত্তে বেশী বুঝস? দুনিয়ার হালচাল কি বুঝস তুই, অ্যাঁ, কি বুঝস? আছিস তো খালি ঘুরে ঘুরে এ-ডাল ও-ডাল টাংকি মারার তালে
-ঐ চুপ কর!! একদম ফালতু বাত করবি না। তোর বাসার জন্য সেদিন খড়ের টুকরা, ঘাসের ডগা, গাছের ডাল, একটা আম পাতা, দুইটা নিমপাতা, তিনটা ম্যাচের টুকরা এসব কে যোগাড় করলো অ্যাঁ?
-যা ব্যাটা ওগুলা কোন কাজের কাজ হইলো নিকি? ঘর বানাই আমি, ডিম পাড়ি আমি, বাচ্চা ফুটাই আমি, দুনিয়ার সব কাজ আমারে করতে হয়, দেখা তো দেখি একটা ডিম পেড়ে একদিন!!

এখানে এসে পুরুষ পাখিটা হার মেনে যায়। ভালো করেই জানে হাজার পরিশ্রম করলেও সে কোনদিন ডিম পেরে দেখাতে পারবে না। ফুড়ুৎ করে উড়ে গিয়ে সামনের গাছের মগডালে গিয়ে বসে। পেছন পেছন গরবিনী মেয়ে চড়ুইটিও উড়ে গিয়ে বসে। এবার মনে হয় একটু আপোষ হয়েছে। দুজনে কিছু শলা পরামর্শ করছে ফিসফিসিয়ে। কথা শোনা যাচ্ছে না কিন্তু ঠোঁট নড়ছে সমানে।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালা থেকে ঘরের ভেতরে চোখ ফেরালাম। টেবিলের উপর একটা খাম রাখা। খামের ভিতর একটা চিঠি। খানিক আগে চিঠিটা পড়ে মন উদাস হয়ে আছে।
আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য একটি আন্তর্জাতিক চড়ুইভাতি থেকে আমার নামটা বাদ যাবার জন্য দুঃখিত পত্র। অথচ এই ভ্রমণের জন্য আমি গত তিন মাস যাবত প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কত কি কেনাকাটাও করলাম। আমার নামটা ছিল ২১ নাম্বারে। আমি বাদে বাকী ২০ জন সুযোগ পেল। বলা হয়েছে সর্বশেষজনকে বাদ দিতে হলো বাজেট সংকোচনের কারণে।

আসল ঘটনা অন্য। এই চিঠি তেমন সমস্যা না, কিন্তু আসল সমস্যার চিঠি এখনো আসেনি। আসবে আগামী সপ্তাহে। আমার চাকরীর আয়ু বড়জোর আর এক মাস। পত্রিকায় খুব গোপনে বিজ্ঞাপন দিয়ে লোক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের সাথে অসদাচরণের অভিযোগে আমাকে অব্যাহতি দেবার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

অপ্রকাশিত অসদাচরণটি হলো পরিচালক-যোগাযোগ মহোদয় এক শিক্ষানবীশ তরুণীকে তার কক্ষে ডেকে অনৈতিক প্রস্তাব দেবার পর আমার কাছে খবর আসলে আমি তার দরোজায় গিয়ে প্রচণ্ড এক লাথিতে লকটা ভেঙ্গে ফেলেছিলাম। আমার লাথির প্রমাণ দরোজায় জ্বলজ্বল করলেও তার অনৈতিক প্রস্তাবটির কোন বাস্তব স্বাক্ষী প্রমাণ নেই। তাই শাস্তির ব্যবস্থাটি আমার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিল।
তরুণীটি আমার পরিচিত কেউ না। আমার সাথে কখনো তার কথাও হয়নি।

কয়েক মিনিট ভেবে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। সর্বশেষ পত্রটি হাতে আসার আগে আমি নিজেই একটি বিচ্ছেদ পত্র লিখে জানালার পাশে দাঁড়ালাম। চড়ুইদুটোকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টির জোর কমে গেছে। দূরে নদী মোহনা পাড়ি দিচ্ছে একটা জাহাজ। পাঁচ বছরের একটা বন্ধন এই একটি পত্র দিয়েই ছিন্ন হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর পত্রটি যথাস্থানে জমা দিয়ে জমাট একটা ব্যথা বুকে বয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলাম নীচে। অফিসের পাশে একটা টং দোকানের ঝাঁপির নীচে গিয়ে দাঁড়ালাম। সামনের রাস্তায় জল জমে গেছে আধঘন্টার বৃষ্টিতেই। কোথায় যাবো বুঝতে পারছিলাম না। বৃষ্টিটা কমে গেলে কিছুক্ষণ এলোমেলো হাঁটবো। যখন কোন গন্তব্য থাকে না, তখন এলোমেলো হাঁটাই একমাত্র উপায়।

বৃষ্টি থামতে সময় লাগবে। ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা চায়ের অর্ডার দিতে যাচ্ছিলাম, তখন পেছন থেকে একটা নারীকন্ঠ বলে উঠলো, দু'কাপ প্লীজ।

অবাক হয়ে দেখি নবনীতা। অফিসের সেই অপমানিত তরুণীটি। হাসিমুখে আমার হাতে একটা কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বললো-
-আপনি চলে যাচ্ছেন, এরপর আমার মাথায় ছাতা ধরবে কে? রিলিজ নিয়ে এলাম আমিও।

আশ্চর্য হবো কিনা ভাবতে ভাবতেই আমিও পাল্টা হেসে দিলাম। কোন কোন ঘটনায় খুব অপরিচিত মানুষও আপন হয়ে যেতে পারে। এবার নিজেকে আর একেবারে গন্তব্যহীন মনে হচ্ছে না।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আড়চোখে নবনীতার দিকে তাকালাম। আবারো হাসলো সে। এবারের হাসিটায় পরিষ্কার বন্ধুতার স্নিগ্ধতা। এত সুন্দর হাসি মেয়েটার, আগে কখনো খেয়াল করিনি। হঠাৎ মনে হলো, অন্ততঃ আজ দুপুরের জন্য দুজনের একটা চড়ুইভাতি করা যায় না? বংশালের শমসের আলীর ভূনা খিচুড়ী খাই না অনেক দিন।

চা শেষ করে নবনীতা বললো, বৃষ্টি থেমে গেছে, চলুন হাঁটতে শুরু করি।
নবনীতা কোথায় যাবে জানি না। কিন্তু আমি মনে মনে বংশালের পথে হাঁটতে থাকি। ভাবছি সামনের মোড়ে গিয়ে ওকে বলবো কথাটা।

মোড়ে পৌঁছে নবনীতা থমকে দাঁড়ালো। একটা খালি রিকশা দাঁড়ানো ওখানে। আমি কিছু বলার আগেই সে আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠলো-
-এরকম দিনে খিচুড়ি হলে মন্দ হয় না। কী বলেন?
-হ্যাঁ আমিও তাই ভাবছিলাম। রিকশা নিলে দশ মিনিটে শমসের আলীর খিচুড়ির দোকানে পৌঁছে যেতে পারি কিন্তু।
-খুবই ভালো আইডিয়া। যান খেয়ে আসুন। এরকম দিনে খিচুড়ি মিস করা ঠিক হবে না। আমিও বাড়ি গিয়ে মাকে বলবো খিচুড়ি রাঁধতে। রিকশাটা আপনি নেবেন নাকি আমি?

আমি অপ্রত্যাশিত একটা ধাক্কার বুকভাঙ্গা স্বরে বললাম, রিকশাটা আপনিই নিয়ে যান।


৩১ মে ২০১৪, শনিবার