Tuesday, January 3, 2017

আনন্দপাঠ বনাম সমালোচনাপাঠ

আনন্দপাঠ বনাম সমালোচনা পাঠ ৷ দ্বিতীয়টি কষ্টসাধ্য ৷ সুক্ষ্ণ কাজ ৷ অনায়াস লব্ধ নয় কিছুই৷ ইতিহাস বিষয়ে কাজটি আরো কঠিন ৷ লেজের পর লেজ বের হয় ৷ ছিদ্রের পর ছিদ্র বের করতে গিয়ে নিজেকে ছিদ্রান্মেষী হিসেবে আবিষ্কার করলে বিব্রতকর অবস্থাও তৈরী হতে পারে ৷ তাই হয়েছে ৷ পাঠের আনন্দ নির্বাসিত হয়ে মগজের ভেতর তিক্ততা কিলবিল করছে ৷ ফুল পাখি বিষয়ে এ বিড়ম্বনা নেই ৷ ইতিহাসের মিথ্যাচার প্রবঞ্চনা খুব পীড়াদায়ক বিষয় যদি তা নিজের দেশ বা জাতি বিষয়ক হয়৷ সাহিত্য বা চলচ্চিত্র বিষয়ে যা অনেকটা সহনীয়৷

ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভূ

Monday, December 26, 2016

স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র : প্রয়োজন আছে শুদ্ধি অভিযানের

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র ত্রিশ বছর আগে প্রকাশিত হলেও অধিকাংশ বাঙালীর তা পড়া হয়নি। যদিও 'দলিলপত্র' শব্দটি যুক্ত আছে এখানে দলিলপত্রের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের সাক্ষাতকার, বিবৃতি নেয়া হয়েছে। সেই সব বিবৃতির শতভাগ সত্যতা আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। কেউ কেউ মিথ্যে সাক্ষী দিয়েছেন নানামূখী স্বার্থে। কিছু কিছু সাক্ষাতকার পরস্পরবিরোধী। একই ঘটনা নিয়ে যখন একাধিক ব্যক্তির বিবৃতি দেখা যায় তখন সেই বক্তব্যগুলোর মধ্যে অনেক পার্থক্যও দেখা যাচ্ছে। তথ্যের ভুল এবং অসঙ্গতিগুলো যাচাই করার জন্য আরো একাধিক সুত্রের সাহায্য নিয়ে বিবেচনা করা উচিত। দলিলপত্রে বর্ণিত সব ঘটনাকে তাই শতভাগ শুদ্ধ বলা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রের সচেতন মিথ্যাগুলোকে চিহ্নিত করার জন্য আরেকটি প্রকল্প হাতে নেয়া উচিত।

বাংলাদেশ সরকার প্রকল্পটি গ্রহন করে ১৯৭৩ সালে, কিন্তু কাজ শুরু হয় ১৯৭৮ সালে। প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে পঞ্চদশ খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে । এই সময়কালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার দিনরাত আমূল বদলে যায়, সরকার পরিবর্তিত হয় একাধিকবার, প্রতিটি সরকার ভিন্ন ভিন্ন মতের অনুসারী। যার ফলে প্রকল্পের মধ্যে যোগ্যতম মানুষেরা থাকা সত্ত্বেও মিথ্যে সাক্ষ্যগুলো যুক্ত হয়ে গেছে কিছু কিছু জায়গাতে। এ যাবত যেসব মিথ্যের যোগানদারের কথা পাওয়া গেছে তাদের সবাই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সেসব মিথ্যের মধ্যে অংশগ্রহন ছিল খোদ তৎকালীন সরকার প্রধানেরও।

বাংলাপিডিয়া অনুসারে প্রকল্পটিতে তথ্যগুলো যেভাবে সাজানো হয়েছে-

দলিল এবং তথ্য প্রামাণ্যকরণের জন্য সরকার নয় সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেন। এর গঠনকাঠামো ছিল নিম্নরূপ: চেয়ারম্যান প্রফেসর মফিজুল্লাহ কবীর, সদস্য সচিব হাসান হাফিজুর রহমান, সদস্যবৃন্দ: প্রফেসর সালাহউদ্দীন আহমদ, প্রফেসর আনিসুজ্জামান, ড. সফর আলী আকন্দ, ড. এনামুল হক, ড. কে.এম করিম, ড. কে.এম মোহসীন ও ড. শামসুল হুদা হারুন। ইতিহাস রচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হলে এই কমিটি শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা যুদ্ধ সংক্রান্ত দলিল ও তথ্য প্রকাশকেই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

কিন্তু দলিলপত্র সংগ্রহের সীমা স্বাধীনতা যুদ্ধকেন্দ্রিক হওয়া সত্ত্বেও, মুক্তিযুদ্ধের পশ্চাতে বিশাল পটভূমিরও রয়েছে সমান গুরুত্ব। মুক্তিযুদ্ধকে এই পটভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। এই পটভূমির ঘটনাবলী যাকে মুক্তি সংগ্রাম বলা যায় তার অনিবার্য পরিণতি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। অর্থাৎ মুক্তিসংগ্রামের স্বরূপ জানা ছাড়া ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। এই কারণে দুখন্ডে পটভূমি সংক্রান্ত দলিলপত্র প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রধানত বিশেষ ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ এবং বিষয়ভিত্তিক (themetic) ভাবে খন্ডগুলি পৃথক করা হয়েছে। যেমন-
 
প্রথমখন্ড: পটভূমি (১৯০৫-১৯৫৮);
দ্বিতীয় খন্ড: পটভূমি (১৯৫৮-১৯৭১);
তৃতীয় খন্ড: মুজিবনগর: প্রশাসন;
চতুর্থ খন্ড: মুজিবনগর: প্রবাসী বাঙালিদের তৎপরতা;
পঞ্চম খন্ড: মুজিবনগর: বেতার মাধ্যম;
ষষ্ঠ খন্ড: মুজিবনগর: গণমাধ্যম;
সপ্তম খন্ড: পাকিস্তানি দলিলপত্র (সরকারি ও বেসরকারি);
অষ্টম খন্ড: গণহত্যা, শরণার্থী শিবির ও প্রাথমিক ঘটনা; নবম খন্ড: সশস্ত্র সংগ্রাম (১);
দশম খন্ড: সশস্ত্র সংগ্রাম (২);
একাদশ খন্ড: সশস্ত্র সংগ্রাম (৩);
দ্বাদশ খন্ড: বিদেশি প্রতিক্রিয়া, ভারত;
ত্রয়োদশ খন্ড: বিদেশি প্রতিক্রিয়া: জাতিসংঘ ও বিদেশি রাষ্ট্র;
চতুর্দশ খন্ড: বিশ্ব জনমত;
পঞ্চদশ খন্ড: সাক্ষাৎকার;

ষোড়শ খন্ড: কালপঞ্জী, গ্রন্থপঞ্জী ও নির্ঘণ্ট। (তবে পরিকল্পনায় থাকলেও ষোড়শ খন্ডটি প্রকাশিত হয় নি এবং সর্বশেষে পঞ্চদশ খন্ডটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে।)

এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ পৃষ্ঠার দলিল সংগ্রহ করা হলেও প্রকাশ করা হয়েছে মাত্র পনের হাজারের বেশি নির্বাচিত দলিল।

সুতরাং বলা চলে এই প্রকল্পটি নিয়ে আরো কাজ করার অবকাশ আছে। গবেষণা এখনো শেষ হয়নি। বিশ্লেষণের অনেক বিষয় এখনো অবিশিষ্ট আছে। প্রকাশিত খণ্ডগুলোর অসঙ্গতিগুলো নিয়ে আলোচনার অবকাশ আছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য এই কাজটা করা জরুরী।


Saturday, December 24, 2016

জুলফিকার আলী ভুট্টো : রক্তাক্ত একাত্তরের জন্য দায়ী শীর্ষ নরাধম দানব

এদেশে ইয়াহিয়া খানকে যতটা জোরালোভাবে দানব রাক্ষসের সাথে তুলনা করা হয় জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ততটা জোরালোভাবে করা হয় না কেন যেন। অথচ এই নরাধম নরকের কীট অমানুষের বাচ্চাটাই বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের হত্যা ধর্ষণ ধ্বংসযজ্ঞের জন্য দায়ী। এই ক্ষমতালিপ্সু ইতরের কারণেই বাংলাদেশে ১৯৭১ নামের একটি রক্তাক্ত বছর দেখেছে ইতিহাস। মানুষবেশী রাজনৈতিক কোট পরা এই ইতর হারামজাদা মরার আগেও কখনো একবার সামান্যতম দুঃখপ্রকাশ করেনি তার ইতরামির জন্য। এই নরাধম ইতরটা যাদের উস্কে দিয়ে বাংলাদেশের মাটি রক্তাক্ত করেছিল সেই সামরিক বাহিনীর পদাঘাতে ক্ষমতাচ্যুতি এবং ফাঁসিতে লটকে মরার পরেও তার অপরাধকে ক্ষমা করা যায়  না।




১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সভা থেকে চুড়ান্ত ঔদ্ধত্য দেখিয়ে ফেরার আগেই পাকিস্তানের মৃত্যু হয়ে পরপারে পৌঁছে গেছে। পঁচিশে মার্চেই অবিভক্ত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির মৃত্যু ঘটে গিয়েছিল। তবু এই বেজন্মা ইতরের বাচ্চাটা বৃটিশ টেলিভিশনকে দেয়া সাক্ষাতকারে নিজেকে দুই পাকিস্তানের স্বপ্নে ডুবিয়ে রেখেছিল। সাক্ষাতকারের মধ্যে জানোয়ারটার চেহারার অভিব্যক্তিটা দর্শনীয়।
হায় রে নরাধম নির্বোধ, তোর জন্য যে  মর্মান্তিক পরিণতি অপেক্ষা করছিল সেটা তোর উপযুক্ত পুরস্কারই ছিল।

[ ভুট্টো নামক ইতরটাকে প্রাপ্য গালি দেবার ক্ষেত্রে কিছুটা শব্দ সংকট হয়েছে। কুকুর শুকর জাতীয় প্রাণীবাচক গালিগুলো তাকে সম্মানিত এবং ওই প্রাণীগুলোকে অপমানিত করা হয় বলে তা ব্যবহার করা হলো না]

Saturday, December 17, 2016

বিজয় দিবস ২০১৬

১. আনন্দ ও বেদনা
সব আনন্দের পেছনে সুপ্ত বেদনা লুকোনো থাকে না। কিন্তু সব সৃষ্টির পেছনে একটি ধ্বংসের ইতিহাস থাকে, যেমন থাকে জন্মের সাথে গর্ভযন্ত্রণা। বিজয় দিবসের আনন্দ উদযাপনেও একটা নীরব গ্লানি আছে। সেই গ্লানিটা ১৪ ডিসেম্বর। একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বর যখন সমগ্র বাংলাদেশ আনন্দ প্লাবনে ভাসছে, সেদিন বাংলাদেশের অনেক বাড়িতে কান্নার ঢেউ বয়ে যাচ্ছিল। আমরা এক জাহানারা ইমামের ডায়েরী পড়ে কেঁদেছি, কেঁদেছি  রমা চৌধুরী, মুশতারী শফি, কিংবা শহীদ আজাদের মায়ের কথা পড়ে। এমন হাজারো কাহিনী সমগ্র বাংলাদেশের মানচিত্র জুড়ে। আমাদের পতাকার মাঝখানে যে লাল বৃত্ত, সেই বৃত্তটি ওই সব অমোছনীয় বেদনার রং। বিজয়ের আনন্দ প্রকাশে আমরা বুকের ভেতর সেই বেদনাকেও বহন করি।

২. বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা


বিজয় র‍্যালী ২০১৬ চট্টগ্রাম। উপর থেকে কী চমৎকার লাগে পতাকার এই দৃশ্য। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিলাম যতক্ষণ দেখা যায়। সম্মিলিতভাবে পতাকা বহন করার এই দৃশ্যটি দেখে সাধ জাগে অপশক্তির হাত থেকে অক্ষত রাখতে সমগ্র বাংলাদেশটিকেও যদি সবাই এভাবে টানটান করে ধরে রাখতো!

৩.
বাপ্পা মজুমদারের চমৎকার একটা টিউন শুনে মন ভালো হয়ে গেল। জোয়ান বায়েজের সং অব বাংলাদেশ বাজিয়েছেন।

৪.
ফেসবুকে মিশুর দেয়াল থেকে পাওয়া গেল বাংলাদেশের পতাকার প্রথম রূপকার শিবনারায়ন দাসের একটি সাক্ষাতকার।

বিজয় দিবসের এইসব আনন্দ ভাগাভাগি করে উদযাপন করতে পেরে ভীষণভাবে তৃপ্ত।

Thursday, December 15, 2016

তৌকিরের 'অজ্ঞাতনামা': ভালো সিনেমা তৈরীর একটা প্রচেষ্টা

তৌকিরের 'অজ্ঞাতনামা' দেখা হয়ে গেল ইউটিউবের সৌজন্যেই। আমার মতে একটি ভালো সিনেমা তৈরীর প্রচেষ্টার ভালো উদাহরণ। সিনেমার ইস্যুটা খুবই বাস্তব, সম্ভবতঃ কিছু কিছু বাস্তবতা এর চেয়েও নিষ্ঠুর। প্রবাসী বাঙালীদের অপাঘাতে মৃত্যুর খবর আমরা পত্রিকায় পড়ার পরে তাঁদের দেশে থাকা পরিবারের চিত্রটা আমাদের জানা হয় না। এই অংশটা যথেষ্ট  চমৎকারভাবে এসেছে। প্রথমার্ধকে বাহবা দিতে হয় সেজন্য।

তবে আর দশটি সিনেমার মতো এই সিনেমায় কিছু দুর্বলতাও রয়ে গেছে।

কিছু দুর্বলতা কারিগরী, কিছু দুর্বলতা চিত্রনাট্যের। কারিগরী দুর্বলতাগুলো অধিকাংশই দৃশ্যায়নে আলোর ব্যবহারজনিত। নাটক এবং সিনেমার  মধ্যে যে কারিগরি পার্থক্য থাকে তা এই সিনেমাতে উৎরাতে পারেনি। যাকে আমরা সিনেমাটোগ্রাফি বলি, তাতে এই সিনেমাতে উপস্থিত ছিল না। কোলকাতার বাংলা সিনেমাগুলো যারা দেখেন, তাঁদের কাছে এই পার্থক্যটা প্রকট।

চিত্রনাট্যের দুর্বলতাগুলো চাইলে এড়ানো যেতো। দ্বিতীয়ার্ধে যখন লাশের তৃতীয় পরিচয় উদঘাটিত হয় তারপর লাশ নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ে ধর্না দেবার ব্যাপারটা বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। এমনকি পুলিশ হিসেবে মোশাররফ করিমের ভূমিকাটা প্রথমার্ধে মোটামুটি ঠিক থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে অবাস্তব লেগেছে। এখানে পুলিশের চরিত্র ছেড়ে বেরিয়ে মোশাররফ একদম টাইপড করিম হয়ে গিয়েছে।

তবে এই ছবির সবচেয়ে চমৎকার চরিত্র ছিল আসিরউদ্দিনের ছেলেটি। যদিও একেবারে অপ্রাসঙ্গিক তুলনা, তবু তাকে দেখে চট করে মনে পড়ে যায় পথের পাচালীর অপুর কথা। বাবার মৃত্যু সংবাদ অনুধাবন করতে না পারা একটি শিশু পাতার নৌকা ভাসিয়ে দিচ্ছে অজানার উদ্দেশ্যে - বুকের মধ্যে ব্যথা ছলকে ওঠে এখানটায়।

অজ্ঞাতনামা নিয়ে খুব বেশী আহলাদ কিংবা একেবারে প্রত্যাখ্যান কোনটাই করা উচিত না। কিন্তু এরকম সিনেমা বানানোর প্রচেষ্টাগুলোকে উৎসাহিত করা দরকার আমাদের পচে যাওয়া সিনেমা জগতকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে। এই সিনেমাটিকে অন্ততঃ ফারুকীর টেলিভিশনের মতো ফাজলামি মনে হয়নি। ক্রিকেটের মতো বাংলা চলচ্চিত্রেও তরুণ নির্মাতারাই আমাদের ভরসা।




Tuesday, December 13, 2016

তিন কাকের স্বর্গারোহন




শহরের সমস্ত সবুজ লোপাট হয়ে যাবার পর বৃক্ষহীন উদ্বাস্তু  হাজারো কাকের ভিড়ে তিন তরুণ কাকের খুব বন্ধুত্ব হলো। তিন কাকের নাম- এক, দুই, তিন। আধুনিক কাক জানে, বৃক্ষের বদলে ইলেকট্রিকের তারেও জমতে পারে তারুণ্য সভা। কংক্রিটের পিলারে তৈরী অ্যাপার্টমেন্ট বাসা। 

ত্রিরত্নের আকাশবিহার সকাল বিকাল দুপুর। ভেসে ভেসে ভেসে বেড়ানো। উড়ে উড়ে চিল তাড়ানো। ঘুরে ঘুরে পাহারা যেন শহরে যেন আর কোন পাখি প্রবেশ করে খাবারে ভাগ না বসায়। কখনো তাই কোন কোকিল এসে ডিম পাড়েনি তাদের বাসায়। সন্ধ্যে হলেই আবার যে যার স্বাধীন বাসায়। নিরিবিলি কা কা স্বাধীন জীবনে খুঁটে খুঁজে কেটে যাচ্ছিল দিন।

একদিন নগরপিতার ঘোষণা। এবার সবুজে সাজবে নগরী। ঘাসপাতার চাষ হবে ছাদের কার্নিশে। আকাশ ভেঙ্গে বর্ষা নামলেও সেই সবুজ ধুয়ে যাবে না ঘোলা নর্দমায়। এবার নগরী হবে সত্যিকারের প্রাচ্য রানী। স্বর্গের পথ খুলে দেয়া হবে এই শহরে। বিশ্ব তাকিয়ে রবে প্রবল বিস্ময়ে।

মানুষ কাকের ভাষা বোঝে না, কিন্তু কাক মানুষের ভাষা শিখে ফেলেছে। রিকশাওয়ালা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সব ভাষাতেই কাকেদের কর্ণকূহর অভ্যস্ত। লিখতে পারে না, বলতে পারে না, কিন্তু বুঝতে কোন সমস্যা হয় না। কাকেরা দেখেছে এই নগরপিতা সবুজে সাজানোর ঘোষণা দিয়ে শহরের সকল বৃক্ষ  নিধন করে সেখানে কংক্রিটের চাষ করেছে। যেখানে ছিল সবুজ বনানী সেখানে উঠেছে দালানের পর দালান। যেখানে ছিল পাহাড়ি বুনোঝোপের সজীব ছায়ার মাঝে কুলকুল করে বয়ে যাওয়া ঝরনা সেখানে এখন ধাতব নলের কৃত্রিম ফোয়ারা। শহরজুড়ে কেবল ইট সিমেন্ট কংক্রিটের মেলা। তার ফাঁকে ফাঁকে সিরামিকের টবে বৈচিত্র্যহীন বিদেশী পাতাবাহারের সস্তা প্রদর্শনী। যেখানে পাখি নেই, প্রজাপতি নেই, অন্ধকারে দীপ জ্বালানো জোনাকী নেই। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এক নগরী থেকে প্রকৃতিকে চিরতরে নির্বাসনে পাঠিয়ে যখন সবুজে সাজার ঘোষণা এলো তখন মানুষেরা না বুঝলেও কাকেরা বুঝে নিল এই প্রহসন।  

তাই প্রাচ্যের রানী হোক বা না হোক স্বর্গের ঘোষণা শুনে তিন বন্ধু সিদ্ধান্ত নিল ওরাও স্বর্গে যাবার সুযোগ নেবে। শুনেছে স্বর্গে একবার ঢুকলে আর ফিরতে হয় না, অনন্ত সুখ সেখানে। কিন্তু কবে খুলবে স্বর্গের পথ? অপেক্ষায় দিন গুনতে শুরু করলো তিন বন্ধু কাক।

কয়েকদিন পর। 

এক দুপুরে খুব বৃষ্টি হলো। ছুটির শহর চুপচাপ ভিজলো। তিন বন্ধুতে এক কার্ণিশে বসে খুব গল্প করলো। স্বপ্নের ক্যানভাসে ইচ্ছেমতো রঙ চড়াতে চড়াতে বেলা নেমে যাচ্ছিল। হঠাৎ বৃষ্টি থেমে শেষ বিকেলের সূর্য উঁকি দিল। অমনি পুব আকাশ রাঙিয়ে দিগন্ত জুড়ে মেঘের ফাঁক থেকে অদ্ভুত একটা রঙিন আলোর রেখা ভেসে উঠলো।

এক- 'ওই তো স্বর্গের দরোজা  দেখা দিয়েছে'

দুই- 'আমি জানতাম স্বর্গের দরোজা খুলবেই'

তিন- 'উড়ে চলো স্বর্গের পথে'

অতঃপর দেরী না করে তিনজনই উড়াল দিল। উড়তে উড়তে তিনজনই উড়াল দিল। উড়তে উড়তে...... উড়তে তো উড়ছেই। কিন্তু সাত রঙে সাজানো স্বর্গের দরোজা যেন আরো দূরে সরে যায়। কিছুতে ছুঁতে পারে না তাকে। কোথায় স্বর্গ, কোথায় তার সাজানো দুয়ার? সবই মায়ার খেলা।

তিন নম্বর কাক সবার আগে ক্লান্ত হয়ে নেমে আসলো ইলেকট্রিকের আড্ডা খুঁটির তারে। বসে বসে দেখছে বাকী দুই বন্ধু তখনো উড়ে উড়ে স্বর্গের দরোজা ছুঁতে চেষ্টা করছে। ওরাও ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসবে একসময়। তারপর আবারো এই মিথ্যে প্রতিশ্রুতির পুরোনো শহরের কংক্রিটের মধ্যে প্রতিদিনের ক্লান্ত জীবন। এই শহর আর কখনো ফিরবে না সবুজে। 

তবু কাকেরা শান্ত্বনা পেল পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া একটি বাণীর কথা ভেবে- 

যে শহর যত বেশী আবর্জনাময় 
সে শহর কাকেদের স্বর্গ নিশ্চয়।

Monday, December 12, 2016

আজ সোমবার

অদ্ভুত কিছু শরীরবৃত্তীয় বিচ্যুতি ঘটছে আবারো। কিছুকাল পরপর টের পাই বিচ্যুতির ঘটনা। কম্পিউটার পর্দায় অতিরিক্ত মনঃসংযোগে মস্তিষ্কে কোন চাপ তৈরী করে যাচ্ছে হয়তো। দৃষ্টি এবং মস্তিষ্ক দুটোর মধ্যে কোনটা বেশী চাপ গ্রহন করছে সেটা বুঝতে চেষ্টা করতে গিয়ে হৃদযন্ত্রে ওলটপালট শব্দের অস্তিত্বও পাই মাঝে মাঝে। ডাক্তারের সান্নিধ্য এবং আশ্বাসে কিছুটা উপশম ঘটে। কিছু হয়নি আপনার - শুনতে ভালোই লাগে। কয়েকদিন ছুটি নিন, ভালো করে ঘুমান, চাপমুক্ত থাকুন। বয়স হচ্ছে ক্যালেণ্ডারে, তবু কাজের সময় বয়স মনে থাকে না, রাখি না। এখনো কত কাজ বাকী। হাসানের মতো অসময়ে চলে যাবার কথা ভাবলে মন খারাপ লাগে।

আবার জীবনানন্দের মতো এও ভাবি-

চিরদিন শহরেই থাকি
পড়ে থাকি পাটের আড়তে
করি কেরানির কাজ—শুভে-লাভে যদি কোনোমতে
দিন যায় চ'লে
আকাশের তলে
নক্ষত্রেরা কয় কোন্‌ কথা
জোৎস্নায় প্রাণের জড়তা
ব্যথা কেন পায়
সে সব খবর নিয়ে কাজ কিবা হায়