Wednesday, November 25, 2009
আমাদের হারানো গল্পের বাগান
তুমি যাবার পর থেকে আমার গল্পগুলো থেমে গেছে।
যদ্দিন তুমি ছিলে আমি ছিলাম এক নিটোল গল্পকার। একেকটা গল্পের একেকটা জীবন্ত চরিত্র নিয়ে তোমার আগ্রহ আমার গল্প বানাবার উৎসাহকে জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত করতো। আমার সকল গল্পের একমাত্র পাঠিকা ছিলে তুমি। আমার কোন গল্প কখনো কোথাও পাঠাইনি। তুমি জানতে আমার গল্পে কখনো বানোয়াট চরিত্র থাকে না। চারপাশের মানুষগুলো নিয়েই আমার যত গল্প। তাই আমার গল্প নিয়ে তোমার বিপুল আগ্রহ। গল্পের মাঝে কখনো কখনো সংলাপ তৈরীতে মেকাপ দিতে হলেও চরিত্র চিত্রনে কোন আলগা প্রয়াস ছিল না। গল্পগুলো লিখতে লিখতে আমি কখন তোমাকেও গল্পের একটা চরিত্র ভাবতে শুরু করেছিলাম নিজেই জানি না। তোমার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তাই তোমাকেও গল্পে সম্পৃক্ত করলাম আজ। তুমি আমার গল্প মানুষ? তোমার আমার গল্পের সুচনা হয়েছিল কিভাবে?
আমাদের গল্পের প্রথম সংলাপটি ছিল তোমার। তোমার প্রথম সংলাপটি যখন আমার প্রাঙ্গনে এসে পৌছল তখন আমি ভীষন একা। সেই একাকী সময়ে গল্প করার মতো কাউকে বড় প্রয়োজন ছিল। তোমারও হয়তো। তবে আমার দ্বিতীয় সংলাপ নিক্ষেপে খানিক বিলম্ব হওয়াকে তুমি হতাশার সাথে প্রকাশ না করলে আমাদের দুজনের গল্পকার হওয়া হতো না। তোমার সেই হতাশার মধ্যে একটা সুপ্ত আকুলতা ছিল যাতে আমি সবুজের প্রতিশ্রুতি দেখেছিলাম। তৃতীয় সংলাপের পর সেই সবুজের কুড়িটি পাতা মেলতে শুরু করলো। তারপর একদিন পত্রপল্লব বেড়ে গিয়ে আমাদের বিশাল গল্পের বাগান গড়ে উঠলো। নিয়মিত পরিচর্যায় আমাদের গল্প বাগানে হরেক রকমের ফুল ফুটলো, পাখপাখালীর আগমন ঘটলো, গান হলো, কবিতা হলো। ধীরে ধীরে গল্প যেন উপন্যাসে রূপ নিল।
বিস্ময়ের ঘোর কেটে উপন্যাসের যাত্রাপথে একদিন তোমার ডাক এসে গেল আচমকা। নিরুপায় তুমি আমাকে ছেড়ে উড়াল দিলে নতুন গন্তব্যে........ চিরতরে। তোমাকে গল্প বলার, তোমার গল্প শোনার আর কোন সুযোগ রইল না আমার।
আজ তোমার আকাশে নতুন ভোর, নতুন সূর্যোদয়, নিত্য নতুন প্রতিশ্রুতি। আমাদের সেই গল্প বাগান এখনো সেই খানেই আছে, তবে নিঝুম নিস্তব্ধতায় নিথর পড়ে আছে। বহুদিন কোন নতুন ফুল ফোটেনি, পাখপাখালি আসে না। সাপখোপ আর ইঁদুরের বসতি আগাছায় ভরা সেই বাগানে আমি আর হাঁটাহাঁটি করি না আজকাল।
আমাদের গল্পগুলো কি আর কখনো প্রান ফিরে পাবে না? স্মৃতি কি প্রানহীন নিস্তরঙ্গ জলের আধার? তবু স্মৃতিতে নিমজ্জিত হয়ে এত সুখ পাই কেন!
বিলম্ব পোষ্টঃ চট্টগ্রামে ইফতারাড্ডা (উৎসর্গ: পদ্মলোচন ও স্বপ্নবাজ)
সেদিন দুপুরে অফিসের ক্যান্টিনে লাঞ্চটা শেষ করে সিগারেটে আগুন দিতেই যে ফোনটা এলো সেটা এক প্রত্যাশিত সুখবর। আমাদের প্রিয় ব্লগার ও হবু ব্যারিষ্টার জাবীর জানালো ভিসাটা হয়ে গেছে। সুখবরটা সেলিব্রেট করার কোন উপায় নেই চাটগা থেকে। তবু জেনে ভালো লাগছে ঢাকার ব্লগারগন শুক্রবারে একটা অনুষ্ঠান করছেন। খুব ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও থাকতে পারছি না বলে জাবীরের কাছে আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
গত কিছুদিন ধরে আক্ষরিক অর্থেই দৌড়ের উপরে ছিলাম, এখনো কিছুটা। তাই ব্লগেও আসা হয় না ঠিকমতো। লেখার সময় নেই, পড়ার সময় নেই, আড্ডা দেবার সময় তো নেই নেই হয়ে গেছেই। আসলে ঈদের বন্ধের পর থেকে আগের সব রুটিন বদলে গেছে যেন। খেই হারিয়ে ঘুরে মরছি এলোপাথাড়ি যেন। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের পর পর্যন্ত কখনো কখনো অফিসে কাটাই।
জাবীরের সাথে মাত্র একবারই আড্ডা দেবার সুযোগ পেয়েছিলাম। গতমাসে জাবীর চট্টগ্রাম এলো কাজে, ফোনে ঠিক করা হলো আমি অফিস শেষে ওকে নিয়ে ইফতার আড্ডায় বসবো। পাওয়া গেল আরেক চাটগাইয়া ব্লগার স্বপ্নবাজকে। আমার সাথে সেই প্রথম দেখা স্বপ্নবাজের সাথেও। যে ঠিকানায় জাবীরকে থাকতে বললাম সেটি ইস্পাহানী মোড়ে পিটস্টপ রেষ্টুরেন্ট। আমার অফিস থেকে ওখানে যেতে বড়জোর আধঘন্টা লাগে। কিন্তু ইফতারপূর্ব জ্যামের কারনে লেগে গেল দুইঘন্টা। যখন রেষ্টুরেন্টে পৌছালাম তখন মসজিদে ফু দেয়া শুরু হয়ে গেছে। আজান দেয় দেয় অবস্থা। আমি পুরো রেষ্টুরেন্টে হেটে বেরিয়ে কোথাও জাবীরকে পেলাম না। আজব।
পাঁচ মিনিট আগেও কথা হলো ওর সাথে গেল কই। বলেছিলাম ইফতারীর টেবিলের দখল নিয়ে বসে যেতে, নইলে পরে জায়গা পাওয়া যাবে না। সবগুলা মানুষের চেহারা দিয়ে ঘুরে এলাম, না জাবীর নয় একটাও। আমি ভুল করছি না তো দেখতে? আগে তো দেখিনি? ছবির সাথে আসল মানুষের মিল থাকে না। কি করি দিলাম ফোন আবার। তারপর নজর রাখলাম কার ফোন বাজে আর কার ঠোট নড়ে, গোয়েন্দা নজরে অনেকের ঠোট নড়তে দেখছি, কানে চোঙা লাগিয়ে অনেকেই কথা বলছে। জাবীরের সাথে আমিও বলছি। জিগাইলাম, কই তুমি। সে কয়, দাদা আমি তো এইখানে। আমি কই, আমিও তো এইখানে। কি মুশকিল। এত মানুষ মোবাইলে কথা বলে, কে কার কথা শোনে। ব্যাটারা ইফতারের আগে ইকটু চুপটি কর, আমি খুজে বের করি পদ্মলোচন জাবীরকে, ইফতারীর সময় যে পেরিয়ে যায়!!!
হঠাৎ নজরে পড়লো এক হুজুরের দিকে। জোব্বাজাব্বা পাগড়ী পড়া এক হুজুর মনে হলো আমার ফোনের তালে মাথা নেড়ে কথা বলছে, কি জানি সন্দেহ করে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। কাছাকাছি গিয়ে শুনি আমার ফোনে সেই শব্দ, এই হুজুরও সেই কথা বলে। খাইছে, এই হুজুরই তো জাবীর........ব্যাটা করছে কি? এই বেশভুষা লাগাইছে ক্যান? আমি দুইবার ওর পাশ দিয়ে হেঁটে গেছি, ভেবেছি কোন মওলানা ইফতার খেতে এসেছে এখানে। জাবীর ততক্ষনে চিনে ফেলেছে আমাকে। উঠে এলে জড়িয়ে ধরলাম হেসে। ওর সাথে এক বন্ধুও আছে। যাক ইফতার করা যাবে তাহলে। হাপ ছাড়লাম। কিন্তু তখনো স্বপ্নবাজ আসেনি। রাস্তার জ্যাম পেরিয়ে আজানের সাথে সাথে স্বপ্নবাজও হাজির। এরপর ইফতার, গপসপ, আড্ডা, চায়ের তেষ্টা। চায়ের অনুরোধ করতে দেরী হয়ে গেছে বলে সিরিয়ালে পেছনে পড়ে গেলাম। আমাদের ভাগ্যে চা জুটলো না, বলা হলো আরো বসতে হবে চা খেতে হলে। দুচ্ছাই অতক্ষন চা খেতে কে বসে থাকে, তারচে আমার বাসায় গিয়েই খাই চা। বাসায় গিয়ে চা খাওয়া হলো, আরেক দফা আড্ডা হলো।
তারপর ফেরার পালা এলো। জাবীর শরীর ঠিক রাখতে রাতে খায় না, এটা নিয়ে স্বপ্নবাজের সুন্দর কিছু মন্তব্য ছিল, দিলাম না এখানে। যাইহোক ডিনার বাদে ষ্টেশানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল ওরা। জাবীর কথা দিল লন্ডন যাবার আগে আরেকবার হবে আসা। আরো একটা আড্ডা সময়। কিন্তু হলো না আর। জাবীর তার আগেই চলে যাচ্ছে। এরপর আড্ডাটা হবে পরিপূর্ন ব্যারিষ্টারের সাথে। সেই দিনের প্রতি চোখ মেলে থাকলাম। জাবীরের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।
গত কিছুদিন ধরে আক্ষরিক অর্থেই দৌড়ের উপরে ছিলাম, এখনো কিছুটা। তাই ব্লগেও আসা হয় না ঠিকমতো। লেখার সময় নেই, পড়ার সময় নেই, আড্ডা দেবার সময় তো নেই নেই হয়ে গেছেই। আসলে ঈদের বন্ধের পর থেকে আগের সব রুটিন বদলে গেছে যেন। খেই হারিয়ে ঘুরে মরছি এলোপাথাড়ি যেন। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের পর পর্যন্ত কখনো কখনো অফিসে কাটাই।
জাবীরের সাথে মাত্র একবারই আড্ডা দেবার সুযোগ পেয়েছিলাম। গতমাসে জাবীর চট্টগ্রাম এলো কাজে, ফোনে ঠিক করা হলো আমি অফিস শেষে ওকে নিয়ে ইফতার আড্ডায় বসবো। পাওয়া গেল আরেক চাটগাইয়া ব্লগার স্বপ্নবাজকে। আমার সাথে সেই প্রথম দেখা স্বপ্নবাজের সাথেও। যে ঠিকানায় জাবীরকে থাকতে বললাম সেটি ইস্পাহানী মোড়ে পিটস্টপ রেষ্টুরেন্ট। আমার অফিস থেকে ওখানে যেতে বড়জোর আধঘন্টা লাগে। কিন্তু ইফতারপূর্ব জ্যামের কারনে লেগে গেল দুইঘন্টা। যখন রেষ্টুরেন্টে পৌছালাম তখন মসজিদে ফু দেয়া শুরু হয়ে গেছে। আজান দেয় দেয় অবস্থা। আমি পুরো রেষ্টুরেন্টে হেটে বেরিয়ে কোথাও জাবীরকে পেলাম না। আজব।
পাঁচ মিনিট আগেও কথা হলো ওর সাথে গেল কই। বলেছিলাম ইফতারীর টেবিলের দখল নিয়ে বসে যেতে, নইলে পরে জায়গা পাওয়া যাবে না। সবগুলা মানুষের চেহারা দিয়ে ঘুরে এলাম, না জাবীর নয় একটাও। আমি ভুল করছি না তো দেখতে? আগে তো দেখিনি? ছবির সাথে আসল মানুষের মিল থাকে না। কি করি দিলাম ফোন আবার। তারপর নজর রাখলাম কার ফোন বাজে আর কার ঠোট নড়ে, গোয়েন্দা নজরে অনেকের ঠোট নড়তে দেখছি, কানে চোঙা লাগিয়ে অনেকেই কথা বলছে। জাবীরের সাথে আমিও বলছি। জিগাইলাম, কই তুমি। সে কয়, দাদা আমি তো এইখানে। আমি কই, আমিও তো এইখানে। কি মুশকিল। এত মানুষ মোবাইলে কথা বলে, কে কার কথা শোনে। ব্যাটারা ইফতারের আগে ইকটু চুপটি কর, আমি খুজে বের করি পদ্মলোচন জাবীরকে, ইফতারীর সময় যে পেরিয়ে যায়!!!
হঠাৎ নজরে পড়লো এক হুজুরের দিকে। জোব্বাজাব্বা পাগড়ী পড়া এক হুজুর মনে হলো আমার ফোনের তালে মাথা নেড়ে কথা বলছে, কি জানি সন্দেহ করে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। কাছাকাছি গিয়ে শুনি আমার ফোনে সেই শব্দ, এই হুজুরও সেই কথা বলে। খাইছে, এই হুজুরই তো জাবীর........ব্যাটা করছে কি? এই বেশভুষা লাগাইছে ক্যান? আমি দুইবার ওর পাশ দিয়ে হেঁটে গেছি, ভেবেছি কোন মওলানা ইফতার খেতে এসেছে এখানে। জাবীর ততক্ষনে চিনে ফেলেছে আমাকে। উঠে এলে জড়িয়ে ধরলাম হেসে। ওর সাথে এক বন্ধুও আছে। যাক ইফতার করা যাবে তাহলে। হাপ ছাড়লাম। কিন্তু তখনো স্বপ্নবাজ আসেনি। রাস্তার জ্যাম পেরিয়ে আজানের সাথে সাথে স্বপ্নবাজও হাজির। এরপর ইফতার, গপসপ, আড্ডা, চায়ের তেষ্টা। চায়ের অনুরোধ করতে দেরী হয়ে গেছে বলে সিরিয়ালে পেছনে পড়ে গেলাম। আমাদের ভাগ্যে চা জুটলো না, বলা হলো আরো বসতে হবে চা খেতে হলে। দুচ্ছাই অতক্ষন চা খেতে কে বসে থাকে, তারচে আমার বাসায় গিয়েই খাই চা। বাসায় গিয়ে চা খাওয়া হলো, আরেক দফা আড্ডা হলো।
তারপর ফেরার পালা এলো। জাবীর শরীর ঠিক রাখতে রাতে খায় না, এটা নিয়ে স্বপ্নবাজের সুন্দর কিছু মন্তব্য ছিল, দিলাম না এখানে। যাইহোক ডিনার বাদে ষ্টেশানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল ওরা। জাবীর কথা দিল লন্ডন যাবার আগে আরেকবার হবে আসা। আরো একটা আড্ডা সময়। কিন্তু হলো না আর। জাবীর তার আগেই চলে যাচ্ছে। এরপর আড্ডাটা হবে পরিপূর্ন ব্যারিষ্টারের সাথে। সেই দিনের প্রতি চোখ মেলে থাকলাম। জাবীরের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।
ট্রান্সলেশান করো : ফাকি সব খরে রব রাতি ফোহাইল
ইন্টারে পড়ার সময় আমাদের দুই বন্ধু এক রাতে বাড়ী ফেরার পথে পাড়ার এক পরিচিত পাড় মাতালের মুখোমুখি হলো। পঞ্চাশোর্ধ মাতাল যে ইন্টারভিউ নিয়েছিল সেটা বহুবছর বন্ধুমহলে আনন্দ যুগিয়েছিল।
-এ্যাই খোথায় যাইচ্চ তুম্বরা?
-বাসায় যাইতেছি চাচা
-খোত্তেখে আসতেচ?
-পড়াশুনা করে আসতেছি (ডাহা মিছা কথা, দুজনেই গঞ্জিকার ভক্ত, সেই কাজ সেরে বাড়ী ফিরছিল)
-কিসে ফড়ো?
-কলেজে ফড়ি
-বহুত ফড়াশুনা কইরচ, দেকি দুটা ট্রান্সলেশন করো তো, তাইলে বুইজব তোমরা ফড়াশুনা করি আসতেছ,
-জী বলেন
-ফাকি সব খরে রব রাতি ফোহাইল, খাননে খুসুম খলি সবি ফুরাইল..বল ইংরেজীতে বল এইটা তইলে বুইজব তোমার শিক্কিত পোয়া
বন্ধু দুজন ঘাবড়ে গেল। তাছাড়া ওরাও তখন ঝিমানিতে আছে। বললো চাচা আমরা একটু পেশাব সেরে আসি। পেশাবের নাম করে একটু আঁধারে গিয়ে, সামনের দেয়ালটা টপকে ভোঁ দৌড়। পেছনে শুনতে পাচ্ছিল মাতাল তখনো ট্রান্সলেশানের অপেক্ষায় চেঁচাচ্ছে.....
"...ফাকি সব খরে রব রাতি ফোহাইল, খাননে খুসুম খলি সবি ফুরাইল। না ফারলে তোমাদের বাফেরে লাগাই দিবো। এই খোথায় তোমরা........"
-এ্যাই খোথায় যাইচ্চ তুম্বরা?
-বাসায় যাইতেছি চাচা
-খোত্তেখে আসতেচ?
-পড়াশুনা করে আসতেছি (ডাহা মিছা কথা, দুজনেই গঞ্জিকার ভক্ত, সেই কাজ সেরে বাড়ী ফিরছিল)
-কিসে ফড়ো?
-কলেজে ফড়ি
-বহুত ফড়াশুনা কইরচ, দেকি দুটা ট্রান্সলেশন করো তো, তাইলে বুইজব তোমরা ফড়াশুনা করি আসতেছ,
-জী বলেন
-ফাকি সব খরে রব রাতি ফোহাইল, খাননে খুসুম খলি সবি ফুরাইল..বল ইংরেজীতে বল এইটা তইলে বুইজব তোমার শিক্কিত পোয়া
বন্ধু দুজন ঘাবড়ে গেল। তাছাড়া ওরাও তখন ঝিমানিতে আছে। বললো চাচা আমরা একটু পেশাব সেরে আসি। পেশাবের নাম করে একটু আঁধারে গিয়ে, সামনের দেয়ালটা টপকে ভোঁ দৌড়। পেছনে শুনতে পাচ্ছিল মাতাল তখনো ট্রান্সলেশানের অপেক্ষায় চেঁচাচ্ছে.....
"...ফাকি সব খরে রব রাতি ফোহাইল, খাননে খুসুম খলি সবি ফুরাইল। না ফারলে তোমাদের বাফেরে লাগাই দিবো। এই খোথায় তোমরা........"
অপ্রত্যাশিত বিদ্যুতের চমক
গল্পটির সুত্রপাত হয়েছিল এইখানে। লেখক চা খেতে গিয়ে ডিনারও সেরে ফেলেছিল। ফিরে এসে গল্পটি সমাপ্ত করতে পাঠকের ব্যাপক অনাগ্রহ লক্ষ্য করে নিজের হাতেই আবার কোদাল চালাতে শুরু করলো। ফলাফল নীচে দেয়া হলো।
*********************************************************
ট্রেনটা ভুজপুর জংশনে এসে থামলো। বগিতে মৃদু আলো। বেশীরভাগ যাত্রী নেমে গেছে। বগির এই অংশে মাত্র দুজন মানুষ। দুজনেই নীরব। মেয়েটি তখনো বিষন্নমুখে বাইরে তাকিয়ে আছে। মেয়েটি যেদিকে বসেছে সেদিকে লোকালয় নেই, দেখার কিছু নেই, ষ্টেশানের বিপরীত দিক ওটা। তবু মেয়েটি বাইরের দিকে চেয়ে আছে অনির্দিষ্ট দৃষ্টিতে। তরুনটি বই থেকে মুখ তুলে বাইরের দিকে তাকালো। প্ল্যাটফরমে কতগুলো ফেরীওয়ালা বসা, ভবঘুরে লোকজনও দেখা যাচ্ছে কিছু।
দুজনের মধ্যে দুরত্ব বড়জোর পাঁচফুট। এই দুরত্বে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সাথে কিভাবে কথোপকথন শুরু করে তরুনের কোন ধারনা নেই। সে যে দেশে পড়াশোনা করে সেই দেশে অবশ্য অপরিচিত মানুষকেও হাই হ্যালো করা যায়। এদেশে সেখানে কেমন সংকোচ কাজ করে। নারী হলে তো কথাই নেই। তরুনটি মুগ্ধ হয়ে তরুনীর বিষন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো কয়েকসেকেন্ড। তারপর চোখ ফিরিয়ে নিল। সরাসরি তাকানো অভদ্রতা হয়ে যায়। আবার আড়চোখে তাকানোও ভব্যতার মধ্যে পড়ে না। তবে মেয়েটির মধ্যে এমন কিছু আছে না তাকিয়ে বেশীক্ষন থাকা যাচ্ছে না। ভদ্রতা করে হাই বলাও যাচ্ছে না। কিন্তু মেয়েটার সাথে পরিচিত হবার সুপ্ত একটা বাসনা ধীরে ধীরে দানা বাধছে সেটা রূপম ভালোই টের পাচ্ছে।
ট্রেনটা কতক্ষন এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। খিদে পেয়ে গেছে রূপমের। কিন্তু খাবার নেই সাথে। খাবার দোকান খুঁজতে ষ্টেশানে নামতে সাহস পাচ্ছে না। গ্রামের ষ্টেশানগুলোর আশেপাশে বিস্কুট চায়ের দোকান থাকে, কিন্তু অচেনা জায়গায় নামার ব্যাপারে বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছিল রূপমের বহুবছর আগে একবার। সেকথা মনে পড়তেই সে চিন্তাটা বাদ দিল। কিচ্ছু করার নেই। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ফস করে ধরিয়ে ফেললো রূপম। খিদে পেটে সিগারেট যুত লাগে না, তবু নিঃসঙ্গতা কাটাতে সিগারেটের জুড়ি নেই। সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে ভাবনাগুলো কেমন খেলে যায়।
সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ নাকে যেতেই ভ্রু কুচকে জয়া জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে রূপমের দিকে তাকালো। এই প্রথম তার খেয়াল হলো বগির এই অংশে ওই তরুনটি ছাড়া আর কেউ নেই। সিগারেটের গন্ধ তার খুব বিশ্রী লাগে। গাড়ীতে যারা সিগারেট খায় তাদের প্রচন্ড ঘেন্নার চোখে দেখে সে। তরুনটি বাইরে তাকিয়ে আপনমনে সিগারেট টানছে। সিগারেটটা তরুনের ঠোঁটে কেমন বেমানান লাগলো। এত সুন্দর মানুষ সিগারেটের মত বিশ্রী জিনিস খায় কি করে। ঠোট কালো হয়ে যায় না? আশ্চর্য ব্যাপার যে সিগারেটের গন্ধে নাকে ওড়না দেবার বদলে জয়া ভাবতে বসে গেল অদ্ভুত একটা বিষয়ে- বেমানান ঠোঁটে সিগারেট। যেন এটি একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। ওটা নিয়ে কয়েক মিনিট এপার ওপার ভাবতে ভাবতে কাটালো।
সিগারেট টানার পুরোটা সময় রূপম বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল সচেতনভাবেই। সে নারী ও শিশুদের সামনে সিগারেট ধরায় না কখনো। আজ ব্যতিক্রম ঘটলো। অপরিচিত জায়গা বলেই কি? সিগারেট ধরালেও সংকোচে মেয়েটার দিকে তাকানো থেকে বিরত রাখলো নিজেকে। যেন ওই মেয়ের কোন অস্তিত্বই জানা নেই তার। ফলে তার জানা হলো না মেয়েটা তার দিকে কত মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে ছিল পাক্কা দুমিনিট। সিগারেটের শেষাংশ বাইরে ছুড়ে দিয়ে বইটা খুলে বসলো আবার। এবার আর বইয়ে মন বসলো না। মেয়েটার দিকে ফিরে তাকাবার অবদমিত বাসনাটা জেগে উঠলো আবার। কিন্তু কিছুক্ষন আগের সিগারেট ধরানোর অপরাধবোধ তাকে সংকুচিত করে রাখলো। সংকোচ ধামাচাপা দিয়ে যখন সে চোখ তুললো, মেয়েটা তখন বাইরের অন্ধকারে ডুবে গেছে।
ট্রেনটা চলতে শুরু করলো আবারো। ট্রেন ও লাইনের ঝমঝম শব্দের ছন্দটা উপভোগ করছে রূপম। আরো এক ঘন্টার রাস্তা বাকী আছে হিসেবমতে। মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতে পকেট থেকে বের করে দেখলো আশিকের ফোন। কতক্ষন লাগবে জিজ্ঞেস করলো বন্ধু আশিক। পথের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে সাবধান করলো। বলো সে ষ্টেশানে থাকবে গাড়ী নিয়ে।
জয়া না তাকিয়েও কথাগুলো শুনছে মন দিয়ে। বুঝতে পারছে ছেলেটা একটু আনাড়ী আছে। এত বড় মরদকে কত জ্ঞান দিতে হয়, যেন বাংলাদেশে নতুন এসেছে। যত্তসব। এসব জিনিস মাম্মী ড্যাডির ছেলে হয়, এটা নিশ্চিত। আবার সিগ্রেটও খায়। বাপরে বাপ.... ফ্যাশান কত। কাঁধের ব্যাগ দেখলে মনে হয় বিদেশী টুরিষ্ট। মনে মনে ছেলেটার সাথে ঝগড়া শুরু করে কেন যেন। যখন কিছু করার থাকে না এরকম মনে মনে খেলা জয়ার ভীষন প্রিয়। এমনকি মনে মনে প্রেমও করে কখনো কখনো। নির্দিষ্ট কারো সাথে নয়। কল্পনার সৃষ্টি সব। তবে এই ছেলেকে তার কল্পনার মানুষের সাথে মেলানো যাচ্ছে না। বেখাপ্পা টাইপ। তবু সামনে আছে এর সাথে প্রেম না হোক ঝগড়া করা যাক। সময় কাটবে তার।
সময় যাচ্ছে। রাত বাড়ছে। আরো দুটো ষ্টেশান পেরোবার পর ট্রেনটা গতি ধীর করতে শুরু করলো হঠাৎ। একসময় ঝমঝম শব্দটা থেমেই গেলো। কি হলো? রূপম বই থেকে মুখ তুলে বাইরে তাকালো। জয়া জানালা থেকে একটু সরে আসলো। ট্রেন যখন অচেনা কোথাও থামে তখন বাইরে তাকানো নিরাপদ নয়। সে জানে, কিন্তু হাঁদারাম ছেলেটা জানে না বোধহয়। তাকে ওসব বিষয়ে ট্রেনিং দেয়নি মাম্মীডেডী? রূপম এবার পুরো মাথাটা বের করে দেখছে বাইরের অন্ধকারে।
জয়ার ভীষন রাগ হচ্ছে এবার ছেলেটার উপর। আরে বোকা করছো কি। বাইরে অত দেখার কি আছে। মাথা ঢোকাও ভেতরে। ধুর.......কিচ্ছু শুনছে না ছেলেটা। শুনবে কি করে, জয়াতো মনে মনেই চিৎকার করছে। যদি কেউ দায়ের কোপ মারে? জয়ার গাটা শিরশির করে উঠলো এবার। কিন্তু অপরিচিত মানুষ, তাকে কি করে বলবে। রাজ্যের সংকোচ এসে জড়ো হয় ।
ট্রেনটা চলতে শুরু করে আবার। রূপম মাথাটা ভেতরে ঢুকিয়ে বইয়ে মন দেয়। জয়ার বুক থেকে একটা ভার নেমে যায়।
আরো প্রায় আধঘন্টার পথ। তারপর গন্তব্য। রূপমের একটু মন খারাপ হয়। আরো কিছুক্ষন যাওয়া যেতো যদি। মেয়েটার সাথে কথা বলার কোন ছুতো বের করা গেল না। গন্তব্যে পৌছে যাওয়া মানেই তো একটা আকাংখার অপমৃত্যু। সামনে আর কোন ষ্টেশান নেই। রূপম ছটফট করতে থাকে মনে মনে। কিন্তু মেয়েটার দিকে তাকাতে পারে না সরাসরি। একবারও চোখাচোখি হয়নি ওদের।
জয়া কোথায় যাবে জানে না। মামার বাড়ী আর ফিরবে না বলে এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়েছে। তার বাবা মা নেই। ঘনিষ্ট আত্মীয় বলতে এক খালা আছে, বিদেশে থাকে। দেশে এই মামা ছাড়া আর কেউ নেই। মামাই লালনপালন করেছে পনের বছর আগে দুর্ঘটনায় বাবা মা দুজনে মারা যাবার পর থেকে। ট্রেনটা তাকে যদি আজীবন বহন করে নিত। এই যাত্রা যদি কখনো শেষ না হতো, ট্রেনটাকে ঘরবাড়ী বানিয়ে যদি বিশ্বময় ঘোরা যেত। কত আবজাব ভাবে জয়া। মেয়েদের জন্য দেশটা মোটেও নিরাপদ নয়। তবু জয়া মরে গেলেও ফিরবে না ওই ঘরে। এত বড় অপমান সে সহ্য করবে না। সে এই ট্রেনেই আজকের রাতটা কাটাবে ঠিক করলো।
শেষ ষ্টেশান আসতেই রূপম তাড়াহুড়ো করে নেমে গেল। একবারো তাকালো না জয়ার দিকে। যেন তাকে খেয়ালই করেনি। মেয়েদের সাথে এরকম ভাব ধরা তার পুরোনো অভ্যেস। এতে করে দুর্বলতা এড়ানো যায়। রূপমের নেমে যাওয়া দেখে জয়ার একাকীত্বটা ভীষন চেপে বসলো। এতক্ষন সময়টা ভালোই কাটছিল, এখন কি করবে সে? একা এই বগিতে শুয়ে ঘুমোবে, শেয়াল কুকুরের খাবার হতে হবে না তার? রাতের বেলা একা একটা মেয়েকে পেলে মানুষগুলো কি পশু হয়ে যেতে পারে তা পত্রিকার পাতায় প্রায়ই পড়ে সে। আজ কি তার সেই দিন? হোক, আত্মহত্যাই হোক এভাবে।
কতক্ষন কেটেছে তার জানা নেই। ট্রেনের বাতিগুলো নিবে গেছে। সীটে হেলান দিয়ে তার ঘুমের মতো এসেছে। হটাৎ মোবাইল ফোনের শব্দে ঘোর কাটলো। আরে এ যে সেই ছেলেটার ফোনের রিংটোন। সেকি ফিরে এসেছে? কি করে সম্ভব। নাকি স্বপ্ন দেখছে। ফোন বাজছেই। খুব কাছে। অন্ধকারে দেখলো ছেলেটা যেখানে বসেছিল সেইখানে ফোনটা বাজছে অন্ধকারে নীলাভ আলো ছড়িয়ে। ছেলেটা ফোনটা ফেলে গেছে ভুলে।
ফোন তুলবে কি তুলবে না ভাবতে ভাবতে কেটে গেল লাইনটা। আবারো বাজলো ফোনটা। আবারো। তিনবার বাজার পর সংকোচে ফোনটা তুললো সে। রিসিভ করতেই ভেসে এলো সেই কন্ঠ। বহুল কাংখিত ছিল যেন এই ‘হ্যালো’ শব্দটা। কয়েকবার হ্যালো শোনা গেল ওপার থেকে। জয়া কয়েক সেকেন্ড পরে বললো হ্যালো। এই প্রথম কথা হলো ওদের।
-হ্যালো.....কথা বলছেন না কেন? (ওপাশ থেকে পুরুষ কন্ঠ বললো)
-হ্যালো...
-কে বলছেন?
-আমি..........
-আপনার হাতে ওটা আমার মোবাইল......
-জী আমি....মানে.....ফোনটা বাজছিল, ধরলাম
-ওটা আমার ফোন.... হারিয়ে গিয়েছিল, আপনি কোথায় পেয়েছেন
-আমি জানি না, আমি ঠিক..... (আমতা আমতা করে নারী কন্ঠ)
-দেখুন ফোনটা আমার দরকার, অনেকগুলো দরকারী নাম্বার ওখানে, আপনি কোথায় আছেন বলুন
-আসলে..... আমি জানি না আমি ঠিক কোন জায়গায়
-কি বলছেন? আপনি জানেন না আপনি কোথায়?
-আসলেই জানি না
-আপনি কি জোক করছেন? দেখুন ফোনটা দিতে না চাইলে না দিন, কিন্তু সিমটা আমার খুব দরকার, ওটা ফেরত চাই আমার।
-না না আপনি বুঝতে পারছেন না, আমি বোঝাতে পারছি না.....ফোনটা আপনি নিয়ে যেতে পারেন
-তাহলে আপনি কোথায় বলছেন না কেন এখনো? কোথায় আছেন বলুন.. টাকা পয়সা চাইলে দিতে পারি, কত লাগবে জানান
-ছি ছি আপনি কিসব বলছেন, আপনার ফোন আপনি নিয়ে যান, আমি আপনার ফোন নেব কেন?
-তাহলে ঠিক ঠিক বলেন আপনি এখন কোথায়
-আমি এখন ট্রেনে
-ট্রেনে মানে? কোন ট্রেনে?
-সেই ট্রেনে, যেই ট্রেনে আমি এসেছি,
-মানে?
-সেই ট্রেন....সেই শেষ ষ্টেশানে, যেখানে ট্রেন থেমেছিল, ষ্টেশানের নাম জানি না
-আশ্চর্য!! কি বলছেন? আপনি কে? আপনি কি ......
-আমি এই ট্রেনে এসেছিলাম
-আপনি সেই.......ট্রেন থেকে নামেননি আপনি এখনো??
-না
-কেন?
-কোথায় নামবো, আমার কোথাও যাবার নেই
-আশ্চর্য......আপনি....তবে কি বলি......ইয়ে আমি আসলে খুব সরি, অনেক আজেবাজে কথা বলেছি না চিনে......আমি ভেবেছি অন্য কেউ
-না ঠিক আছে, আমি তো চেনা কেউ না আপনার
-না না, ঠিক করিনি আমি.......আমি দুঃখিত
-আপনি এসে নিয়ে যান আপনার ফোন
-আসছি আমি এখুনি, আধঘন্টার মধ্যে, আপনি থাকুন
-আচ্ছা
ফোনটা আস্তে নামিয়ে রাখলো জয়া। ওটার নীলচে আলোটা নিভে গেল কয়েকসেকেন্ড পর। চারপাশে এখন নিকষ কালো অন্ধকার। অচেনা জায়গার অচেনা রাতের শব্দ। অন্ধকারে ওটার দিকে তাকিয়ে জয়া ভাবলো যে আলোটা এতক্ষন জ্বলেছিল একটু পর সেরকম একটা আলো আবারো জ্বলবে কয়েক মিনিটের জন্য। ফোনটা নিয়ে ছেলেটা চলে যাবার পর আবারো ফের সেই অন্ধকার। সেই একাকীত্ব। রাত ভোর হতে এখনো অনেক বাকী। সেই অজানা ভোরের প্রতীক্ষায় বসে থাকবে জয়া এই অচেনা ষ্টেশানে। ভোরটা কি দেখা হবে তার?
[পাদটীকাঃ গল্পটি আপাততঃ এখানে শেষ। তবে একটা গল্পের শেষ কখনো কখনো একটা উপন্যাসের সুত্রপাত করতে পারে। সেই সম্ভাবনা এখানে লুকিয়ে আছে কিনা এখনই বলা যাচ্ছে না। কিছুটা নির্ভর করছে রূপমের উপর, কিছুটা জয়ার উপর। জয়ার জীবনটা কোন খাতে প্রবাহিত হবে সেটা কি রূপমের কোন হটকারী সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে? মানুষের জীবনের গতিপথগুলো অদ্ভুত, কখনো কখনো এক সেকেন্ডের একটা সিদ্ধান্ত আমূল পাল্টে দিতে পারে একেকটা জীবনের গতিপথ। কোন মানুষই এর বাইরে নয়। প্রতিটি মানুষের জীবনতো একেকটা ত্রিমাত্রিক উপন্যাস]
*********************************************************
ট্রেনটা ভুজপুর জংশনে এসে থামলো। বগিতে মৃদু আলো। বেশীরভাগ যাত্রী নেমে গেছে। বগির এই অংশে মাত্র দুজন মানুষ। দুজনেই নীরব। মেয়েটি তখনো বিষন্নমুখে বাইরে তাকিয়ে আছে। মেয়েটি যেদিকে বসেছে সেদিকে লোকালয় নেই, দেখার কিছু নেই, ষ্টেশানের বিপরীত দিক ওটা। তবু মেয়েটি বাইরের দিকে চেয়ে আছে অনির্দিষ্ট দৃষ্টিতে। তরুনটি বই থেকে মুখ তুলে বাইরের দিকে তাকালো। প্ল্যাটফরমে কতগুলো ফেরীওয়ালা বসা, ভবঘুরে লোকজনও দেখা যাচ্ছে কিছু।
দুজনের মধ্যে দুরত্ব বড়জোর পাঁচফুট। এই দুরত্বে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সাথে কিভাবে কথোপকথন শুরু করে তরুনের কোন ধারনা নেই। সে যে দেশে পড়াশোনা করে সেই দেশে অবশ্য অপরিচিত মানুষকেও হাই হ্যালো করা যায়। এদেশে সেখানে কেমন সংকোচ কাজ করে। নারী হলে তো কথাই নেই। তরুনটি মুগ্ধ হয়ে তরুনীর বিষন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো কয়েকসেকেন্ড। তারপর চোখ ফিরিয়ে নিল। সরাসরি তাকানো অভদ্রতা হয়ে যায়। আবার আড়চোখে তাকানোও ভব্যতার মধ্যে পড়ে না। তবে মেয়েটির মধ্যে এমন কিছু আছে না তাকিয়ে বেশীক্ষন থাকা যাচ্ছে না। ভদ্রতা করে হাই বলাও যাচ্ছে না। কিন্তু মেয়েটার সাথে পরিচিত হবার সুপ্ত একটা বাসনা ধীরে ধীরে দানা বাধছে সেটা রূপম ভালোই টের পাচ্ছে।
ট্রেনটা কতক্ষন এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। খিদে পেয়ে গেছে রূপমের। কিন্তু খাবার নেই সাথে। খাবার দোকান খুঁজতে ষ্টেশানে নামতে সাহস পাচ্ছে না। গ্রামের ষ্টেশানগুলোর আশেপাশে বিস্কুট চায়ের দোকান থাকে, কিন্তু অচেনা জায়গায় নামার ব্যাপারে বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছিল রূপমের বহুবছর আগে একবার। সেকথা মনে পড়তেই সে চিন্তাটা বাদ দিল। কিচ্ছু করার নেই। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ফস করে ধরিয়ে ফেললো রূপম। খিদে পেটে সিগারেট যুত লাগে না, তবু নিঃসঙ্গতা কাটাতে সিগারেটের জুড়ি নেই। সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে ভাবনাগুলো কেমন খেলে যায়।
সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ নাকে যেতেই ভ্রু কুচকে জয়া জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে রূপমের দিকে তাকালো। এই প্রথম তার খেয়াল হলো বগির এই অংশে ওই তরুনটি ছাড়া আর কেউ নেই। সিগারেটের গন্ধ তার খুব বিশ্রী লাগে। গাড়ীতে যারা সিগারেট খায় তাদের প্রচন্ড ঘেন্নার চোখে দেখে সে। তরুনটি বাইরে তাকিয়ে আপনমনে সিগারেট টানছে। সিগারেটটা তরুনের ঠোঁটে কেমন বেমানান লাগলো। এত সুন্দর মানুষ সিগারেটের মত বিশ্রী জিনিস খায় কি করে। ঠোট কালো হয়ে যায় না? আশ্চর্য ব্যাপার যে সিগারেটের গন্ধে নাকে ওড়না দেবার বদলে জয়া ভাবতে বসে গেল অদ্ভুত একটা বিষয়ে- বেমানান ঠোঁটে সিগারেট। যেন এটি একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। ওটা নিয়ে কয়েক মিনিট এপার ওপার ভাবতে ভাবতে কাটালো।
সিগারেট টানার পুরোটা সময় রূপম বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল সচেতনভাবেই। সে নারী ও শিশুদের সামনে সিগারেট ধরায় না কখনো। আজ ব্যতিক্রম ঘটলো। অপরিচিত জায়গা বলেই কি? সিগারেট ধরালেও সংকোচে মেয়েটার দিকে তাকানো থেকে বিরত রাখলো নিজেকে। যেন ওই মেয়ের কোন অস্তিত্বই জানা নেই তার। ফলে তার জানা হলো না মেয়েটা তার দিকে কত মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে ছিল পাক্কা দুমিনিট। সিগারেটের শেষাংশ বাইরে ছুড়ে দিয়ে বইটা খুলে বসলো আবার। এবার আর বইয়ে মন বসলো না। মেয়েটার দিকে ফিরে তাকাবার অবদমিত বাসনাটা জেগে উঠলো আবার। কিন্তু কিছুক্ষন আগের সিগারেট ধরানোর অপরাধবোধ তাকে সংকুচিত করে রাখলো। সংকোচ ধামাচাপা দিয়ে যখন সে চোখ তুললো, মেয়েটা তখন বাইরের অন্ধকারে ডুবে গেছে।
ট্রেনটা চলতে শুরু করলো আবারো। ট্রেন ও লাইনের ঝমঝম শব্দের ছন্দটা উপভোগ করছে রূপম। আরো এক ঘন্টার রাস্তা বাকী আছে হিসেবমতে। মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতে পকেট থেকে বের করে দেখলো আশিকের ফোন। কতক্ষন লাগবে জিজ্ঞেস করলো বন্ধু আশিক। পথের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে সাবধান করলো। বলো সে ষ্টেশানে থাকবে গাড়ী নিয়ে।
জয়া না তাকিয়েও কথাগুলো শুনছে মন দিয়ে। বুঝতে পারছে ছেলেটা একটু আনাড়ী আছে। এত বড় মরদকে কত জ্ঞান দিতে হয়, যেন বাংলাদেশে নতুন এসেছে। যত্তসব। এসব জিনিস মাম্মী ড্যাডির ছেলে হয়, এটা নিশ্চিত। আবার সিগ্রেটও খায়। বাপরে বাপ.... ফ্যাশান কত। কাঁধের ব্যাগ দেখলে মনে হয় বিদেশী টুরিষ্ট। মনে মনে ছেলেটার সাথে ঝগড়া শুরু করে কেন যেন। যখন কিছু করার থাকে না এরকম মনে মনে খেলা জয়ার ভীষন প্রিয়। এমনকি মনে মনে প্রেমও করে কখনো কখনো। নির্দিষ্ট কারো সাথে নয়। কল্পনার সৃষ্টি সব। তবে এই ছেলেকে তার কল্পনার মানুষের সাথে মেলানো যাচ্ছে না। বেখাপ্পা টাইপ। তবু সামনে আছে এর সাথে প্রেম না হোক ঝগড়া করা যাক। সময় কাটবে তার।
সময় যাচ্ছে। রাত বাড়ছে। আরো দুটো ষ্টেশান পেরোবার পর ট্রেনটা গতি ধীর করতে শুরু করলো হঠাৎ। একসময় ঝমঝম শব্দটা থেমেই গেলো। কি হলো? রূপম বই থেকে মুখ তুলে বাইরে তাকালো। জয়া জানালা থেকে একটু সরে আসলো। ট্রেন যখন অচেনা কোথাও থামে তখন বাইরে তাকানো নিরাপদ নয়। সে জানে, কিন্তু হাঁদারাম ছেলেটা জানে না বোধহয়। তাকে ওসব বিষয়ে ট্রেনিং দেয়নি মাম্মীডেডী? রূপম এবার পুরো মাথাটা বের করে দেখছে বাইরের অন্ধকারে।
জয়ার ভীষন রাগ হচ্ছে এবার ছেলেটার উপর। আরে বোকা করছো কি। বাইরে অত দেখার কি আছে। মাথা ঢোকাও ভেতরে। ধুর.......কিচ্ছু শুনছে না ছেলেটা। শুনবে কি করে, জয়াতো মনে মনেই চিৎকার করছে। যদি কেউ দায়ের কোপ মারে? জয়ার গাটা শিরশির করে উঠলো এবার। কিন্তু অপরিচিত মানুষ, তাকে কি করে বলবে। রাজ্যের সংকোচ এসে জড়ো হয় ।
ট্রেনটা চলতে শুরু করে আবার। রূপম মাথাটা ভেতরে ঢুকিয়ে বইয়ে মন দেয়। জয়ার বুক থেকে একটা ভার নেমে যায়।
আরো প্রায় আধঘন্টার পথ। তারপর গন্তব্য। রূপমের একটু মন খারাপ হয়। আরো কিছুক্ষন যাওয়া যেতো যদি। মেয়েটার সাথে কথা বলার কোন ছুতো বের করা গেল না। গন্তব্যে পৌছে যাওয়া মানেই তো একটা আকাংখার অপমৃত্যু। সামনে আর কোন ষ্টেশান নেই। রূপম ছটফট করতে থাকে মনে মনে। কিন্তু মেয়েটার দিকে তাকাতে পারে না সরাসরি। একবারও চোখাচোখি হয়নি ওদের।
জয়া কোথায় যাবে জানে না। মামার বাড়ী আর ফিরবে না বলে এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়েছে। তার বাবা মা নেই। ঘনিষ্ট আত্মীয় বলতে এক খালা আছে, বিদেশে থাকে। দেশে এই মামা ছাড়া আর কেউ নেই। মামাই লালনপালন করেছে পনের বছর আগে দুর্ঘটনায় বাবা মা দুজনে মারা যাবার পর থেকে। ট্রেনটা তাকে যদি আজীবন বহন করে নিত। এই যাত্রা যদি কখনো শেষ না হতো, ট্রেনটাকে ঘরবাড়ী বানিয়ে যদি বিশ্বময় ঘোরা যেত। কত আবজাব ভাবে জয়া। মেয়েদের জন্য দেশটা মোটেও নিরাপদ নয়। তবু জয়া মরে গেলেও ফিরবে না ওই ঘরে। এত বড় অপমান সে সহ্য করবে না। সে এই ট্রেনেই আজকের রাতটা কাটাবে ঠিক করলো।
শেষ ষ্টেশান আসতেই রূপম তাড়াহুড়ো করে নেমে গেল। একবারো তাকালো না জয়ার দিকে। যেন তাকে খেয়ালই করেনি। মেয়েদের সাথে এরকম ভাব ধরা তার পুরোনো অভ্যেস। এতে করে দুর্বলতা এড়ানো যায়। রূপমের নেমে যাওয়া দেখে জয়ার একাকীত্বটা ভীষন চেপে বসলো। এতক্ষন সময়টা ভালোই কাটছিল, এখন কি করবে সে? একা এই বগিতে শুয়ে ঘুমোবে, শেয়াল কুকুরের খাবার হতে হবে না তার? রাতের বেলা একা একটা মেয়েকে পেলে মানুষগুলো কি পশু হয়ে যেতে পারে তা পত্রিকার পাতায় প্রায়ই পড়ে সে। আজ কি তার সেই দিন? হোক, আত্মহত্যাই হোক এভাবে।
কতক্ষন কেটেছে তার জানা নেই। ট্রেনের বাতিগুলো নিবে গেছে। সীটে হেলান দিয়ে তার ঘুমের মতো এসেছে। হটাৎ মোবাইল ফোনের শব্দে ঘোর কাটলো। আরে এ যে সেই ছেলেটার ফোনের রিংটোন। সেকি ফিরে এসেছে? কি করে সম্ভব। নাকি স্বপ্ন দেখছে। ফোন বাজছেই। খুব কাছে। অন্ধকারে দেখলো ছেলেটা যেখানে বসেছিল সেইখানে ফোনটা বাজছে অন্ধকারে নীলাভ আলো ছড়িয়ে। ছেলেটা ফোনটা ফেলে গেছে ভুলে।
ফোন তুলবে কি তুলবে না ভাবতে ভাবতে কেটে গেল লাইনটা। আবারো বাজলো ফোনটা। আবারো। তিনবার বাজার পর সংকোচে ফোনটা তুললো সে। রিসিভ করতেই ভেসে এলো সেই কন্ঠ। বহুল কাংখিত ছিল যেন এই ‘হ্যালো’ শব্দটা। কয়েকবার হ্যালো শোনা গেল ওপার থেকে। জয়া কয়েক সেকেন্ড পরে বললো হ্যালো। এই প্রথম কথা হলো ওদের।
-হ্যালো.....কথা বলছেন না কেন? (ওপাশ থেকে পুরুষ কন্ঠ বললো)
-হ্যালো...
-কে বলছেন?
-আমি..........
-আপনার হাতে ওটা আমার মোবাইল......
-জী আমি....মানে.....ফোনটা বাজছিল, ধরলাম
-ওটা আমার ফোন.... হারিয়ে গিয়েছিল, আপনি কোথায় পেয়েছেন
-আমি জানি না, আমি ঠিক..... (আমতা আমতা করে নারী কন্ঠ)
-দেখুন ফোনটা আমার দরকার, অনেকগুলো দরকারী নাম্বার ওখানে, আপনি কোথায় আছেন বলুন
-আসলে..... আমি জানি না আমি ঠিক কোন জায়গায়
-কি বলছেন? আপনি জানেন না আপনি কোথায়?
-আসলেই জানি না
-আপনি কি জোক করছেন? দেখুন ফোনটা দিতে না চাইলে না দিন, কিন্তু সিমটা আমার খুব দরকার, ওটা ফেরত চাই আমার।
-না না আপনি বুঝতে পারছেন না, আমি বোঝাতে পারছি না.....ফোনটা আপনি নিয়ে যেতে পারেন
-তাহলে আপনি কোথায় বলছেন না কেন এখনো? কোথায় আছেন বলুন.. টাকা পয়সা চাইলে দিতে পারি, কত লাগবে জানান
-ছি ছি আপনি কিসব বলছেন, আপনার ফোন আপনি নিয়ে যান, আমি আপনার ফোন নেব কেন?
-তাহলে ঠিক ঠিক বলেন আপনি এখন কোথায়
-আমি এখন ট্রেনে
-ট্রেনে মানে? কোন ট্রেনে?
-সেই ট্রেনে, যেই ট্রেনে আমি এসেছি,
-মানে?
-সেই ট্রেন....সেই শেষ ষ্টেশানে, যেখানে ট্রেন থেমেছিল, ষ্টেশানের নাম জানি না
-আশ্চর্য!! কি বলছেন? আপনি কে? আপনি কি ......
-আমি এই ট্রেনে এসেছিলাম
-আপনি সেই.......ট্রেন থেকে নামেননি আপনি এখনো??
-না
-কেন?
-কোথায় নামবো, আমার কোথাও যাবার নেই
-আশ্চর্য......আপনি....তবে কি বলি......ইয়ে আমি আসলে খুব সরি, অনেক আজেবাজে কথা বলেছি না চিনে......আমি ভেবেছি অন্য কেউ
-না ঠিক আছে, আমি তো চেনা কেউ না আপনার
-না না, ঠিক করিনি আমি.......আমি দুঃখিত
-আপনি এসে নিয়ে যান আপনার ফোন
-আসছি আমি এখুনি, আধঘন্টার মধ্যে, আপনি থাকুন
-আচ্ছা
ফোনটা আস্তে নামিয়ে রাখলো জয়া। ওটার নীলচে আলোটা নিভে গেল কয়েকসেকেন্ড পর। চারপাশে এখন নিকষ কালো অন্ধকার। অচেনা জায়গার অচেনা রাতের শব্দ। অন্ধকারে ওটার দিকে তাকিয়ে জয়া ভাবলো যে আলোটা এতক্ষন জ্বলেছিল একটু পর সেরকম একটা আলো আবারো জ্বলবে কয়েক মিনিটের জন্য। ফোনটা নিয়ে ছেলেটা চলে যাবার পর আবারো ফের সেই অন্ধকার। সেই একাকীত্ব। রাত ভোর হতে এখনো অনেক বাকী। সেই অজানা ভোরের প্রতীক্ষায় বসে থাকবে জয়া এই অচেনা ষ্টেশানে। ভোরটা কি দেখা হবে তার?
[পাদটীকাঃ গল্পটি আপাততঃ এখানে শেষ। তবে একটা গল্পের শেষ কখনো কখনো একটা উপন্যাসের সুত্রপাত করতে পারে। সেই সম্ভাবনা এখানে লুকিয়ে আছে কিনা এখনই বলা যাচ্ছে না। কিছুটা নির্ভর করছে রূপমের উপর, কিছুটা জয়ার উপর। জয়ার জীবনটা কোন খাতে প্রবাহিত হবে সেটা কি রূপমের কোন হটকারী সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে? মানুষের জীবনের গতিপথগুলো অদ্ভুত, কখনো কখনো এক সেকেন্ডের একটা সিদ্ধান্ত আমূল পাল্টে দিতে পারে একেকটা জীবনের গতিপথ। কোন মানুষই এর বাইরে নয়। প্রতিটি মানুষের জীবনতো একেকটা ত্রিমাত্রিক উপন্যাস]
একটি গল্পের সুত্রপাত-
একটা গল্প লিখতে ইচ্ছে করছে। কি গল্প হবে এখনো জানি না। তবে গল্পের চটকদার একটা নাম ঠিক করা হয়েছে- "অপ্রত্যাশিত বিদ্যুতের চমক"। গল্পটা হতে হবে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু প্রানবন্ত। গল্পের মধ্যে সর্বোচ্চ দুজন চরিত্র থাকবে যার একজন পুরুষ আরেকজন নারী। অথবা দুজন পুরুষ কিংবা দুজন নারী। না, দুজন নারীকে নিয়ে ছোট গল্প লেখা যাবে না। কারন দুজন নারী একত্রিত হলে গল্প অনেক বড় হয়ে যাবে, সাধারনতঃ নারীগন স্বল্পভাষী হয় না। সুতরাং গল্পের আকার সংক্ষিপ্ত রাখতে দুজন পুরুষ কিংবা এক নারী এক পুরুষকে নিয়ে লেখাই শ্রেয়।
দুজন পুরুষকে নিয়ে গল্প দাঁড় করানো অবশ্য কঠিন। কারন পুরুষেরা পরস্পরের সাথে কথা বলে কম। অপরিচিত হলে তো মুখে রা টি নেই। তারচে বরং অচেনা নারী ও অচেনা পুরুষকে নিয়ে গল্প তৈরী করা যায়। দুই লিঙ্গের মধ্যে বিপরীত ও সহজাত আকর্ষনের কারনে গল্প হয়ে উঠতে পারে রোমান্টিক। কিন্তু না, রোমান্টিক গল্প লিখবো না। নারী ও পুরুষের দেখা হলেই কি রোমান্টিক গল্প হতে হবে? নারী পুরুষের মধ্যে অন্য সম্পর্ক হতে পারে না? আরো বেশী অর্থপূর্ন কোন সম্পর্ক? কি সেটা? প্রেম ছাড়া আর কি আছে? প্রেম কি পদ্যের মতো ছন্দময়? প্রেম ছাড়া অনুরাগের আর কোন প্রকাশ নেই? হয়তো আছে। সেটা পাঠকের মনে মনেও থাকতে পারে।
একটা কাজ করা যাক। গল্পটা না লিখে বরং পাঠককে গল্পের প্লট নিয়ে একটা ধারনা দেয়া যাক। পাঠকই ঠিক করুক প্রেমহীন একটা মধুর অর্থপূর্ন সম্পর্ক।
..........................................................................................................................
ধরা যাক একটি লোকাল ট্রেনের বগি। ধলঘাট ষ্টেশান থেকে ট্রেনে উঠেছে রূপম। কাঁধে একটা চামড়ার ব্যাগ। ব্যাগের ভেতর একগাদা বই। জানালার পাশে বসে রূপম নিবিষ্ট মনে বইয়ের ভেতরে ডুবে আছে। জানালা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে সবুজের অপূর্ব সমারোহ। সূর্য তখন হেলে পড়েছে পশ্চিম দিগন্তের পানে। বিকেলের সোনালী রোদে গ্রামগুলো যেন ধুয়ে যাচ্ছে। হেমন্তকাল তখন। হালকা কুয়াশার আস্তরন ভেসে আছে ধানক্ষেতের উপর।
মিনিট পনের পর কদলপুর ষ্টেশান থেকে একই বগিতে ট্রেনে উঠলো এক তরুনী। নাম জয়া। রূপম যেখানে বসেছে তার চেয়ে একটু দুরের একটা সীটে বসে পড়লো সে। যদিও লক্করঝক্কর লোকাল ট্রেন, তবে ট্রেনে ভীড় একেবারেই নেই। কারন এই সময়ে শহরমুখী যাত্রী থাকে না বললেই চলে। শহর এখনো অনেক দুর। এভাবে চললে ঘন্টা দুয়েক লাগার কথা। পথে আরো আটটা ষ্টেশান ধরার কথা। আরেকটা বড় জংশনে আধা ঘন্টার মতো থামার কথা একটা এক্সপ্রেস ট্রেনকে পার করে দিতে। ততক্ষনে সন্ধ্যে পেরিয়ে যাবে।
তবে এই তথ্যগুলো তরুন তরুনী দুজনেরই অজানা। কারন তরুন বিদেশ থেকে এসে বন্ধুর বাড়ীতে বেড়াতে গিয়েছিল। কোন কিছুই চেনে না সে। সে জানে কেবল এই ট্রেন যেখানে থামবে সেখানে তাকে নেমে যেতে হবে। ওখানে তার জন্য দাড়ানো থাকবে একটা গাড়ী। আর তরুনী এই পথে কখনো ট্রেনে চড়েনি। সে মামার বাড়ীতে থেকে পড়াশোনা করে। মামীর সাথে রাগ করে বেরিয়ে পড়েছে যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাবে। ট্রেনটা ছুটে যাচ্ছে ঝমঝম করে, দিগন্ত চিরে।
.............................................................................................................................
পাঠকের মনে ভাবনার সুত্র ধরিয়ে দিয়ে লেখক চা খেতে চলে যান। গল্পটির সাইজ মোটামুটি ১০০০ শব্দের ভেতর রাখার ইচ্ছে লেখকের। তার মধ্যে ২০০টি শব্দ লেখা হয়েছে। লেখকের ধারনা চা খেয়ে আসতে আসতে পাঠক গল্পটি শেষ করে ফেলতে পারে মনে মনে। পাঠকের দেয়া সমাপ্তি দিয়ে গল্পটি শেষ করলে কেমন হয়? কি আছে পাঠকের মনে....? বাকী ৮০০ শব্দে কি ঘটতে পারে?
দুজন পুরুষকে নিয়ে গল্প দাঁড় করানো অবশ্য কঠিন। কারন পুরুষেরা পরস্পরের সাথে কথা বলে কম। অপরিচিত হলে তো মুখে রা টি নেই। তারচে বরং অচেনা নারী ও অচেনা পুরুষকে নিয়ে গল্প তৈরী করা যায়। দুই লিঙ্গের মধ্যে বিপরীত ও সহজাত আকর্ষনের কারনে গল্প হয়ে উঠতে পারে রোমান্টিক। কিন্তু না, রোমান্টিক গল্প লিখবো না। নারী ও পুরুষের দেখা হলেই কি রোমান্টিক গল্প হতে হবে? নারী পুরুষের মধ্যে অন্য সম্পর্ক হতে পারে না? আরো বেশী অর্থপূর্ন কোন সম্পর্ক? কি সেটা? প্রেম ছাড়া আর কি আছে? প্রেম কি পদ্যের মতো ছন্দময়? প্রেম ছাড়া অনুরাগের আর কোন প্রকাশ নেই? হয়তো আছে। সেটা পাঠকের মনে মনেও থাকতে পারে।
একটা কাজ করা যাক। গল্পটা না লিখে বরং পাঠককে গল্পের প্লট নিয়ে একটা ধারনা দেয়া যাক। পাঠকই ঠিক করুক প্রেমহীন একটা মধুর অর্থপূর্ন সম্পর্ক।
..........................................................................................................................
ধরা যাক একটি লোকাল ট্রেনের বগি। ধলঘাট ষ্টেশান থেকে ট্রেনে উঠেছে রূপম। কাঁধে একটা চামড়ার ব্যাগ। ব্যাগের ভেতর একগাদা বই। জানালার পাশে বসে রূপম নিবিষ্ট মনে বইয়ের ভেতরে ডুবে আছে। জানালা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে সবুজের অপূর্ব সমারোহ। সূর্য তখন হেলে পড়েছে পশ্চিম দিগন্তের পানে। বিকেলের সোনালী রোদে গ্রামগুলো যেন ধুয়ে যাচ্ছে। হেমন্তকাল তখন। হালকা কুয়াশার আস্তরন ভেসে আছে ধানক্ষেতের উপর।
মিনিট পনের পর কদলপুর ষ্টেশান থেকে একই বগিতে ট্রেনে উঠলো এক তরুনী। নাম জয়া। রূপম যেখানে বসেছে তার চেয়ে একটু দুরের একটা সীটে বসে পড়লো সে। যদিও লক্করঝক্কর লোকাল ট্রেন, তবে ট্রেনে ভীড় একেবারেই নেই। কারন এই সময়ে শহরমুখী যাত্রী থাকে না বললেই চলে। শহর এখনো অনেক দুর। এভাবে চললে ঘন্টা দুয়েক লাগার কথা। পথে আরো আটটা ষ্টেশান ধরার কথা। আরেকটা বড় জংশনে আধা ঘন্টার মতো থামার কথা একটা এক্সপ্রেস ট্রেনকে পার করে দিতে। ততক্ষনে সন্ধ্যে পেরিয়ে যাবে।
তবে এই তথ্যগুলো তরুন তরুনী দুজনেরই অজানা। কারন তরুন বিদেশ থেকে এসে বন্ধুর বাড়ীতে বেড়াতে গিয়েছিল। কোন কিছুই চেনে না সে। সে জানে কেবল এই ট্রেন যেখানে থামবে সেখানে তাকে নেমে যেতে হবে। ওখানে তার জন্য দাড়ানো থাকবে একটা গাড়ী। আর তরুনী এই পথে কখনো ট্রেনে চড়েনি। সে মামার বাড়ীতে থেকে পড়াশোনা করে। মামীর সাথে রাগ করে বেরিয়ে পড়েছে যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাবে। ট্রেনটা ছুটে যাচ্ছে ঝমঝম করে, দিগন্ত চিরে।
.............................................................................................................................
পাঠকের মনে ভাবনার সুত্র ধরিয়ে দিয়ে লেখক চা খেতে চলে যান। গল্পটির সাইজ মোটামুটি ১০০০ শব্দের ভেতর রাখার ইচ্ছে লেখকের। তার মধ্যে ২০০টি শব্দ লেখা হয়েছে। লেখকের ধারনা চা খেয়ে আসতে আসতে পাঠক গল্পটি শেষ করে ফেলতে পারে মনে মনে। পাঠকের দেয়া সমাপ্তি দিয়ে গল্পটি শেষ করলে কেমন হয়? কি আছে পাঠকের মনে....? বাকী ৮০০ শব্দে কি ঘটতে পারে?
সুশীল বেয়াদবী
সবাই সুশীল হতে পারে না। একবার না পারিলে শতবার চেষ্টা করেও কেউ কেউ পুরোপুরি সুশীল হয় না। সুশীল হতে হলে জীনের সাহায্য লাগে। মানে জেনেটিক্যালি হয়ে আসতে হয়। ট্রেনিং, শিক্ষাদীক্ষা ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি নিয়ে কেউ সুশীল হতে পারে না। আমি ভদ্রসমাজে সুশীল ভান করে থাকি ঠিকই। কিন্তু রাস্তায় মেজাজ খারাপ হলে মুখ দিয়ে যা বের হয় তার সাথে সুশীলতা মেলানো যায় না। বিপরীত দিকে বখে যাবার জন্যও যোগ্যতা লাগে। আমি বাল্যকালে অতীব বখা ছেলেদের সাথে বেশ কিছুকাল কাটিয়েছি। ভেবেছিলাম বখেই যাবো। কিন্তু সম্ভাবনায় গুড়ে বালি। বখাও হলো না আমার।
ওদিকে সুশীলদের সাথে বসবাস করেও ঠিক খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না। মাঝে মাঝেই দড়ি ছেঁড়া হয়ে যেতাম। তারুন্যের শুরুতে আমার কয়েকজন সুশীল বন্ধুবান্ধবকে দেখে সুশীলতার দীক্ষা নিতে চেষ্টা করেছিলাম কিছুকাল। সাহিত্য সংস্কৃতির জগতে মেলামেশা হতো নিয়মিত। পাড়ায় কবি বন্ধু ছিল একজন। তার সাথে ঘুরে ঘুরে কবি সমাজে সমঝদারের খাতির পেতে লাগলাম। কবিতার ক-ও বুঝি না, কিন্তু না বুঝেও কা কা করলেও দেখি কবি সমাজ মারহাবা মারহাবা করে খুশী হয়। কোন কোন আড্ডায় কেউ কেউ আনকোড়া কবিতা পড়তে দিয়ে মতামতও চায়। আমি চোখ আধবোঝা করে উচ্চমার্গীয়তার ভান করি। কবি খুশী হয়। ভাগ্যিস 'কি বুঝিয়াছো বৎস' বলেনি, বললে রাম ধরা। আসলে সেই সময়টাতে প্রচুর বই পড়তাম ঠিকই কিন্তু উত্তরাধুনিক বা পরাবাস্তব কবিতা জিনিসটা আমার মাথার উপর দিয়েই যেতো। কিন্তু যাদের সাথে মিশতাম তারা সবাই উত্তরাধুনিক পরাবাস্তব কবিতাই লিখতো। তাই কষ্টের দিন যেতো যেদিন কয়েকজন কবি একসাথে নতুন কবিতা লিখে আনতো।
একদিন আমার এই সুশীল হবার খবর সংবাদ পৌছে গেল পাড়ার এক নবীন দার্শনিক কবির কানে। আমার ধারনাই ছিল না ছোকরা কবিতা লেখে। এক দুপুরে তার মোটা কবিতার খাতাটা আমার হাতে দিয়ে বললো, ভাইয়া আপনি একটু দেখে দেবেন পত্রিকায় পাঠানোর জন্য কোন কোন কবিতা দেয়া যায়। বুঝলাম উৎপাত শুরু হলো মাত্র। কারন ছেলেটা লাসা প্রকৃতির, বাজারে মাছঅলার সাথে কিংবা পথে রিকশাওয়ালার সাথে কি হয়েছে তা নিয়ে আধাঘন্টা বকবক করতে পারে। কী উৎপাতের কথা। এমনিতেই উত্তরাধুনিক কবিদের যন্ত্রনায় সুশীল আড্ডা ছাড়ি ছাড়ি অবস্থা। এদিকে ঘরেই কবিতা দিয়ে যাচ্ছে আরেকজন। সুশীল হবার যন্ত্রনা তো কম না?
তবু আমি কবিতার খাতাটা নিয়ে রেখে দিলাম গম্ভীর হয়ে। কবির নাম তৈয়ব। ভাগিয়ে দেবার কোন উপায় পাচ্ছিলাম না। কারন তৈয়ব আমার খুব ভক্ত। ভক্তকে নিরাশ করবো তেমন নিষ্ঠুর কি করে হই। তবু উৎপাত থেকে বাঁচার জন্য কদিনের জন্য তাকে দুরে রাখতে হবে। আমার অন্য কাজে ব্যাঘাত হচ্ছিল। কয়েকজন কট্টর লেখকের দাঁতভাঙা কয়েকটা বই ছিল আমার কাছে। ফরহাদ মজহার, আবুল কাশেম ফজলুল হক ইত্যাদি লেখকের তাত্ত্বিক বই। ওই বইগুলো আমার বদহজম হচ্ছিল তখন। বইগুলো গছানোর একটা উপায় পেয়ে আলোকিত হয়ে উঠলো চেহারা।
একদিন বিকেলে তৈয়ব কবিতার মতামত নিতে আসলে তার হাতে বইগুলো তুলে দিয়ে বললাম- "পড়েছো এ বইগুলো? অসাধারন বই। এগুলো না পড়লে ভালো কবিতা আসবে না। তুমি ওগুলো পড়ে শহীদের কাছে গিয়ে মতামত দিও। আর তোমার কবিতার খাতা ওর কাছে দেয়া আছে, তার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না কবিতা নিয়ে।"
শহীদ আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কবি মহলের অন্যতম কবিবর। একদিন কথায় কথায় বলছিল পাড়ায় একটাও শিক্ষিত লোক নেই যে তার কবিতা বোঝে। ভাবলাম নবীন কবি তৈয়বকে আবিষ্কার করে নিশ্চয়ই আনন্দিত হবে সে। পরের সপ্তাহ থেকে কবি তৈয়বের গন্তব্য বদলে গেল শহীদের বাসার দিকে। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম সে যাত্রা।
কয়েকদিন পর শহীদ আমাকে রাস্তায় পাকড়াও করলো। "শালা কী একটা পাগল জুটিয়ে দিয়েছিস, দিনরাত ঘুমাতে পারি না, তার কবিতা নাকি ছাপাতে হবে আমার পত্রিকায়। কিন্তু খাতা খুলে দেখি নামধাম বদলে আস্ত কাজী নজরুল ইসলাম কাট করে মেরে দিয়েছে।"
আমি শিউরে উঠলাম ভেতরে ভেতরে। ভাগ্যিস পড়ি নাই। নইলে বলেই ফেলতাম, কবি আপনি তো মহান। কারন নজরুলের অনেক কবিতা তখনো পড়া হয়নি আমার।
মুখে বললাম, "দোস্ত আমারে মাফ কর। আমি কবিতা পড়া ছেড়ে দিয়েছি, তাই তোর কাছে পাঠিয়েছি। ঝামেলা মনে করলে বিদায় করে দে"
শহীদ ক্ষেপে গিয়ে বলে, "বিদায় করব কি করে, ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিদিন, বেয়াদপের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুকে। আগে আমাকে লুকিয়ে সিগারেট খেতো আর এখন আমাকেই কিনে দিতে চায়। আমি নাকি হারামজাদার কবি বন্ধু এখন। কিসব যন্ত্রনা লেলিয়ে দিয়েছিস তুই!!"
সর্বনাশ! তাই নাকি? আমার তখন মনে পড়লো একদিন নিউমার্কেটের সামনে দেখা হলে তৈয়ব আমাকে বারবার জোর করছিল, ভাইয়া আপনাকে সিগারেট কিনে দেই, একটা খান।
বলেছিলাম, "আমি ভর দুপুরে সিগারেট খাই না।" শুনে খুব বেজার হয়েছিল তৈয়ব।
তাহলে এই মতলব? ভাগ্যিস খাইনি। শালা বেয়াদবীর আর্ট জানে। কোনদিন আমাকে গলায় জড়িয়ে ধরে বলতো, আয় দোস গাঁজা টানি এক সাথে। এ যে সুশীল বেয়াদপ! এর পর থেকে আমি তৈয়বের ছায়াও মাড়াই না। বাসায় বলা আছে তৈয়বকে দেখামাত্র যেন বলা হয় - "বাড়ীতে নেই আমি, চলে গেছি মার্কেটে।"
ওদিকে সুশীলদের সাথে বসবাস করেও ঠিক খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না। মাঝে মাঝেই দড়ি ছেঁড়া হয়ে যেতাম। তারুন্যের শুরুতে আমার কয়েকজন সুশীল বন্ধুবান্ধবকে দেখে সুশীলতার দীক্ষা নিতে চেষ্টা করেছিলাম কিছুকাল। সাহিত্য সংস্কৃতির জগতে মেলামেশা হতো নিয়মিত। পাড়ায় কবি বন্ধু ছিল একজন। তার সাথে ঘুরে ঘুরে কবি সমাজে সমঝদারের খাতির পেতে লাগলাম। কবিতার ক-ও বুঝি না, কিন্তু না বুঝেও কা কা করলেও দেখি কবি সমাজ মারহাবা মারহাবা করে খুশী হয়। কোন কোন আড্ডায় কেউ কেউ আনকোড়া কবিতা পড়তে দিয়ে মতামতও চায়। আমি চোখ আধবোঝা করে উচ্চমার্গীয়তার ভান করি। কবি খুশী হয়। ভাগ্যিস 'কি বুঝিয়াছো বৎস' বলেনি, বললে রাম ধরা। আসলে সেই সময়টাতে প্রচুর বই পড়তাম ঠিকই কিন্তু উত্তরাধুনিক বা পরাবাস্তব কবিতা জিনিসটা আমার মাথার উপর দিয়েই যেতো। কিন্তু যাদের সাথে মিশতাম তারা সবাই উত্তরাধুনিক পরাবাস্তব কবিতাই লিখতো। তাই কষ্টের দিন যেতো যেদিন কয়েকজন কবি একসাথে নতুন কবিতা লিখে আনতো।
একদিন আমার এই সুশীল হবার খবর সংবাদ পৌছে গেল পাড়ার এক নবীন দার্শনিক কবির কানে। আমার ধারনাই ছিল না ছোকরা কবিতা লেখে। এক দুপুরে তার মোটা কবিতার খাতাটা আমার হাতে দিয়ে বললো, ভাইয়া আপনি একটু দেখে দেবেন পত্রিকায় পাঠানোর জন্য কোন কোন কবিতা দেয়া যায়। বুঝলাম উৎপাত শুরু হলো মাত্র। কারন ছেলেটা লাসা প্রকৃতির, বাজারে মাছঅলার সাথে কিংবা পথে রিকশাওয়ালার সাথে কি হয়েছে তা নিয়ে আধাঘন্টা বকবক করতে পারে। কী উৎপাতের কথা। এমনিতেই উত্তরাধুনিক কবিদের যন্ত্রনায় সুশীল আড্ডা ছাড়ি ছাড়ি অবস্থা। এদিকে ঘরেই কবিতা দিয়ে যাচ্ছে আরেকজন। সুশীল হবার যন্ত্রনা তো কম না?
তবু আমি কবিতার খাতাটা নিয়ে রেখে দিলাম গম্ভীর হয়ে। কবির নাম তৈয়ব। ভাগিয়ে দেবার কোন উপায় পাচ্ছিলাম না। কারন তৈয়ব আমার খুব ভক্ত। ভক্তকে নিরাশ করবো তেমন নিষ্ঠুর কি করে হই। তবু উৎপাত থেকে বাঁচার জন্য কদিনের জন্য তাকে দুরে রাখতে হবে। আমার অন্য কাজে ব্যাঘাত হচ্ছিল। কয়েকজন কট্টর লেখকের দাঁতভাঙা কয়েকটা বই ছিল আমার কাছে। ফরহাদ মজহার, আবুল কাশেম ফজলুল হক ইত্যাদি লেখকের তাত্ত্বিক বই। ওই বইগুলো আমার বদহজম হচ্ছিল তখন। বইগুলো গছানোর একটা উপায় পেয়ে আলোকিত হয়ে উঠলো চেহারা।
একদিন বিকেলে তৈয়ব কবিতার মতামত নিতে আসলে তার হাতে বইগুলো তুলে দিয়ে বললাম- "পড়েছো এ বইগুলো? অসাধারন বই। এগুলো না পড়লে ভালো কবিতা আসবে না। তুমি ওগুলো পড়ে শহীদের কাছে গিয়ে মতামত দিও। আর তোমার কবিতার খাতা ওর কাছে দেয়া আছে, তার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না কবিতা নিয়ে।"
শহীদ আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কবি মহলের অন্যতম কবিবর। একদিন কথায় কথায় বলছিল পাড়ায় একটাও শিক্ষিত লোক নেই যে তার কবিতা বোঝে। ভাবলাম নবীন কবি তৈয়বকে আবিষ্কার করে নিশ্চয়ই আনন্দিত হবে সে। পরের সপ্তাহ থেকে কবি তৈয়বের গন্তব্য বদলে গেল শহীদের বাসার দিকে। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম সে যাত্রা।
কয়েকদিন পর শহীদ আমাকে রাস্তায় পাকড়াও করলো। "শালা কী একটা পাগল জুটিয়ে দিয়েছিস, দিনরাত ঘুমাতে পারি না, তার কবিতা নাকি ছাপাতে হবে আমার পত্রিকায়। কিন্তু খাতা খুলে দেখি নামধাম বদলে আস্ত কাজী নজরুল ইসলাম কাট করে মেরে দিয়েছে।"
আমি শিউরে উঠলাম ভেতরে ভেতরে। ভাগ্যিস পড়ি নাই। নইলে বলেই ফেলতাম, কবি আপনি তো মহান। কারন নজরুলের অনেক কবিতা তখনো পড়া হয়নি আমার।
মুখে বললাম, "দোস্ত আমারে মাফ কর। আমি কবিতা পড়া ছেড়ে দিয়েছি, তাই তোর কাছে পাঠিয়েছি। ঝামেলা মনে করলে বিদায় করে দে"
শহীদ ক্ষেপে গিয়ে বলে, "বিদায় করব কি করে, ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিদিন, বেয়াদপের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুকে। আগে আমাকে লুকিয়ে সিগারেট খেতো আর এখন আমাকেই কিনে দিতে চায়। আমি নাকি হারামজাদার কবি বন্ধু এখন। কিসব যন্ত্রনা লেলিয়ে দিয়েছিস তুই!!"
সর্বনাশ! তাই নাকি? আমার তখন মনে পড়লো একদিন নিউমার্কেটের সামনে দেখা হলে তৈয়ব আমাকে বারবার জোর করছিল, ভাইয়া আপনাকে সিগারেট কিনে দেই, একটা খান।
বলেছিলাম, "আমি ভর দুপুরে সিগারেট খাই না।" শুনে খুব বেজার হয়েছিল তৈয়ব।
তাহলে এই মতলব? ভাগ্যিস খাইনি। শালা বেয়াদবীর আর্ট জানে। কোনদিন আমাকে গলায় জড়িয়ে ধরে বলতো, আয় দোস গাঁজা টানি এক সাথে। এ যে সুশীল বেয়াদপ! এর পর থেকে আমি তৈয়বের ছায়াও মাড়াই না। বাসায় বলা আছে তৈয়বকে দেখামাত্র যেন বলা হয় - "বাড়ীতে নেই আমি, চলে গেছি মার্কেটে।"
ইসলামী ব্যাংকের হালাল হারাম ( যদি সুদ না বলে ভুষি বলি!!)
সুদ হারাম... সুদ হারাম.... সুদ হারাম।
লাভ হালাল.... লাভ হালাল... লাভ হালাল।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশী মুসলমানদের বিরাট অংশকে কাবু করে দিয়েছে এই বানীতে। ইসলাম বিষয়ে তরলপ্রান মানুষ তা বিশ্বাসও করেছে। বিশ্বাস করছে, ভালো করছে। ইসলামী ব্যাংকের ব্যাবসা রমরমা হইছে!! দেশে ইসলামী ব্যাংকের বিরাট জোয়ার বইতেছে। বিদেশী ব্যাংকগুলিও ইসলামী ট্যাগ লাগিয়ে ব্যাংকিং করতে আগ্রহী হচ্ছে। কারন বাজার বলে কথা। সুতরাং ইসলামের উপকার হোক বা না হোক। ব্যাংকিং ব্যবসায় প্রতিযোগীতা বাড়ছে।
আমার কিছু আলগা কথা আছে এই প্রসঙ্গে। যৎসামান্য ব্যাংকিং জ্ঞানের প্রভাবে এগুলো বেরিয়ে যায় মাঝে মাঝে।
আচ্ছা সুদ কি? সুদের সংজ্ঞা কি? সুদ শব্দটা কেন আসলো। interest শব্দটার বাংলা সুদ। তো.....এই অনুবাদ কি কোন হুজুর করে দিয়েছে? কোন সে মওলানা?
ইসলাম যখন কায়েম হয়, তখন কি ব্যাংক ছিল? ব্যাংক প্রথা চালু হয়েছে কোথা থেকে, কখন থেকে?
ইসলামী ব্যাংক সুদ আর লাভের মধ্যে হালাল হারামের মাজেজা দেখিয়ে ব্যাবসা চাঙ্গা করেছে বছরে পর বছর, আম জনতা বেহেশতের লোভে আকাম কুকামে টাকা কামিয়েও ইসলামী ব্যাংকে জমিয়েছে। ইসলামী ব্যাংক হারাম বলে সুদ দেয় না লাভ দেয়, তো যারা ওই ব্যাংকে টাকা জমা রাখে তাদের কামাইগুলা কি হারাম না হালাল তা কি কখনো যাচাই করে রাখা হয়? নাকি হারাম টাকা ইসলামী ব্যাংকে রাখলে ইসলামী ফিল্টারে হালাল হয়ে বেরিয়ে আসে?
ইসলামী ব্যাংক বৈদেশিক বানিজ্যে আছে কি না। বিদেশে যখন কোন লেনদেন করে, তখন সুদ বাদে লেনদেন করে, নাকি ইসলামী ফিল্টার করে? সারা বিশ্বে ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংকিং সুদের হার নির্ধারন করে LIBOR কিংবা SIBOR নামে দুটো পথে। ইসলামী ব্যাংকের কী নিজস্ব কোন চ্যানেল আছে বৈদেশিক লেনদেনে? যদি না থাকে তাহলে দেশী টাকা জমা রাখার বেলায় হালাল শ্লোগান, আর বিদেশী লেনদেনে হারাম কারবার। একই ব্যাংকের এই দুইরকম লেনদেন কি মোনাফেকীর লক্ষন নয়?
যদি তথাকথিত সুদ আর লভ্যাংশ হাদিস মেনে ব্যাংকিং করতে হয়, ইসলামী ব্যাংকের কোন অধিকারই নেই ব্যবসা চালানোর। বান্দারে সাত-পাচ চৌদ্দ বুঝিয়ে পার পাওয়া যাবে, কিন্তু আল্লাহর কাছে কি জবাব দেবে। তাইলে কি ইসলামী ব্যাংকওয়ালারা আল্লাহ খোদায় বিশ্বাস করে না? নইলে এখনো গলা ফুলিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে কি করে?
এখন একটু গিয়ানী কতা কই। ইসলাম যখন কায়েম হচ্ছিল তখন দুনিয়াতে ব্যাংকিং প্রথা ছিল না। প্রথম ব্যাংকিং ব্যবস্থার উদ্ভব হয় ইউরোপে। নাসারাদের দেশে। নাসারাদের অন্যতম ভাষা ইংরেজী। ভারতবর্ষে ওদের শাসন নাজিল হয় দুশো বছরের জন্য। সেই সুবাদে এই দেশেও আমদানী হয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় লেনদেনের হার নির্ধারিত হয় ইন্টারেষ্ট নামক উপাদন দিয়ে। ইংরেজী 'ইন্টারেষ্ট' শব্দটাকে কোন এক বঙ্গসন্তান অনুবাদ করেন 'সুদ' বলে। সেই থেকে চলে আসছে ব্যাংক ও সুদ। সেই আদম সন্তান যদি অনুবাদ করার সময় সুদ না বলে 'ভুষি' করতো তাহলে সেটা হারাম হতো না বলে মনে হয় না।
আপনার বলেন, ভুষি হারাম এই কথা কোন মুসলমান মওলানা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে?? সুতরাং সুদ ব্যাপারটা যতটা হালাল হারাম সমস্যা তার চেয়ে বেশী শব্দানুবাদের সমস্যা।
লাভ হালাল.... লাভ হালাল... লাভ হালাল।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশী মুসলমানদের বিরাট অংশকে কাবু করে দিয়েছে এই বানীতে। ইসলাম বিষয়ে তরলপ্রান মানুষ তা বিশ্বাসও করেছে। বিশ্বাস করছে, ভালো করছে। ইসলামী ব্যাংকের ব্যাবসা রমরমা হইছে!! দেশে ইসলামী ব্যাংকের বিরাট জোয়ার বইতেছে। বিদেশী ব্যাংকগুলিও ইসলামী ট্যাগ লাগিয়ে ব্যাংকিং করতে আগ্রহী হচ্ছে। কারন বাজার বলে কথা। সুতরাং ইসলামের উপকার হোক বা না হোক। ব্যাংকিং ব্যবসায় প্রতিযোগীতা বাড়ছে।
আমার কিছু আলগা কথা আছে এই প্রসঙ্গে। যৎসামান্য ব্যাংকিং জ্ঞানের প্রভাবে এগুলো বেরিয়ে যায় মাঝে মাঝে।
আচ্ছা সুদ কি? সুদের সংজ্ঞা কি? সুদ শব্দটা কেন আসলো। interest শব্দটার বাংলা সুদ। তো.....এই অনুবাদ কি কোন হুজুর করে দিয়েছে? কোন সে মওলানা?
ইসলাম যখন কায়েম হয়, তখন কি ব্যাংক ছিল? ব্যাংক প্রথা চালু হয়েছে কোথা থেকে, কখন থেকে?
ইসলামী ব্যাংক সুদ আর লাভের মধ্যে হালাল হারামের মাজেজা দেখিয়ে ব্যাবসা চাঙ্গা করেছে বছরে পর বছর, আম জনতা বেহেশতের লোভে আকাম কুকামে টাকা কামিয়েও ইসলামী ব্যাংকে জমিয়েছে। ইসলামী ব্যাংক হারাম বলে সুদ দেয় না লাভ দেয়, তো যারা ওই ব্যাংকে টাকা জমা রাখে তাদের কামাইগুলা কি হারাম না হালাল তা কি কখনো যাচাই করে রাখা হয়? নাকি হারাম টাকা ইসলামী ব্যাংকে রাখলে ইসলামী ফিল্টারে হালাল হয়ে বেরিয়ে আসে?
ইসলামী ব্যাংক বৈদেশিক বানিজ্যে আছে কি না। বিদেশে যখন কোন লেনদেন করে, তখন সুদ বাদে লেনদেন করে, নাকি ইসলামী ফিল্টার করে? সারা বিশ্বে ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংকিং সুদের হার নির্ধারন করে LIBOR কিংবা SIBOR নামে দুটো পথে। ইসলামী ব্যাংকের কী নিজস্ব কোন চ্যানেল আছে বৈদেশিক লেনদেনে? যদি না থাকে তাহলে দেশী টাকা জমা রাখার বেলায় হালাল শ্লোগান, আর বিদেশী লেনদেনে হারাম কারবার। একই ব্যাংকের এই দুইরকম লেনদেন কি মোনাফেকীর লক্ষন নয়?
যদি তথাকথিত সুদ আর লভ্যাংশ হাদিস মেনে ব্যাংকিং করতে হয়, ইসলামী ব্যাংকের কোন অধিকারই নেই ব্যবসা চালানোর। বান্দারে সাত-পাচ চৌদ্দ বুঝিয়ে পার পাওয়া যাবে, কিন্তু আল্লাহর কাছে কি জবাব দেবে। তাইলে কি ইসলামী ব্যাংকওয়ালারা আল্লাহ খোদায় বিশ্বাস করে না? নইলে এখনো গলা ফুলিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে কি করে?
এখন একটু গিয়ানী কতা কই। ইসলাম যখন কায়েম হচ্ছিল তখন দুনিয়াতে ব্যাংকিং প্রথা ছিল না। প্রথম ব্যাংকিং ব্যবস্থার উদ্ভব হয় ইউরোপে। নাসারাদের দেশে। নাসারাদের অন্যতম ভাষা ইংরেজী। ভারতবর্ষে ওদের শাসন নাজিল হয় দুশো বছরের জন্য। সেই সুবাদে এই দেশেও আমদানী হয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় লেনদেনের হার নির্ধারিত হয় ইন্টারেষ্ট নামক উপাদন দিয়ে। ইংরেজী 'ইন্টারেষ্ট' শব্দটাকে কোন এক বঙ্গসন্তান অনুবাদ করেন 'সুদ' বলে। সেই থেকে চলে আসছে ব্যাংক ও সুদ। সেই আদম সন্তান যদি অনুবাদ করার সময় সুদ না বলে 'ভুষি' করতো তাহলে সেটা হারাম হতো না বলে মনে হয় না।
আপনার বলেন, ভুষি হারাম এই কথা কোন মুসলমান মওলানা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে?? সুতরাং সুদ ব্যাপারটা যতটা হালাল হারাম সমস্যা তার চেয়ে বেশী শব্দানুবাদের সমস্যা।
Subscribe to:
Posts (Atom)