গ্রহ নক্ষত্রের ফেরে আমার বিজ্ঞানী হওয়াটা ঠেকে গেল। নইলে হাফপ্যান্ট থেকে ফুলপ্যান্টে প্রমোশন পাবার আগ পর্যন্ত কেবলমাত্র বিজ্ঞানী হবারই স্বপ্ন দেখতাম।
যদিও পড়াশোনায় একবিন্দু মন ছিল না কখনোই। সেটার জন্যও আংশিক দায়ী বিজ্ঞানী হবার বাসনা। কারণ পরিচিত যে তিনজন বিজ্ঞানী ছিলেন তাদের কাউকে স্কুলে যেতে দেখিনি বা শুনিনি। একজন আপেল বাগানে গিয়ে গালে হাত দিয়ে বসে থাকতো, আরেকজন চৌবাচ্চায় গোসল করতে গিয়ে পানি উপচে পড়াতে ইউরেকা বলে চেঁচাতে চেঁচাতে রাস্তায় ছুটে যেতো, শেষের জন দুরবীন হাতে দুর আকাশের অগুনতি নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে থাকতো আর কে কার পিছে ঘুরে সেটা আবিষ্কার করতো।
প্রথম দুজনের কাজ আমার পক্ষে সম্ভব না। আমাদের আপেল বাগান নেই, আদতে কোন বাগানই ছিল না আমাদের। বাসার সামনে একফালি ঘাসের লন বাদে কিচ্ছু ছিল না। দ্বিতীয়জনের মতো চৌবাচ্চায় গোসল করিনি কখনো। চৌবাচ্চা কি জিনিস তাও বুঝতাম না ঠিক। তবে আক্কেলের দৌড়ে বুঝতাম পুকুরের মতো কোন বস্তু হবে। আমাদের বাসায় পুকুর ছিল না, সুতরাং ইনিও বাদ।
বাকী থাকলো দুরবীন বিজ্ঞানী। তার সাথে খানিক মিল ছিল, সন্ধ্যের পর বাসার সামনে দাড়িয়ে আমিও খোলা আকাশে লক্ষ কোটি তারকার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। কিন্তু অত দুরের তারা দুরবীন ছাড়া কিছুই বোঝা যায় না। দুরবীন কোথায় পাই? বড়দের জিজ্ঞেস করলে হেসে উড়িয়ে দেয়। ক্লাস থ্রী পড়ুয়া পুঁচকে ছোড়া দুরবীন দিয়ে কি করবে? হতাশ হয়ে বিকল্প উপায় খুঁজতে লাগলাম। দুরবীনে শক্তিশালী কাঁচের ব্যবহার লাগে ওটা জানতাম। সেরকম কাঁচ বাবার চশমায়ও দেখি। কিন্তু ওটা দিয়ে একদিন আকাশ দেখার চেষ্টা করে ঝাপসা ধোঁয়াশা বাদে কিছুই দেখিনি।
একদিন দেখি পাশের বাসার মারুফও সন্ধ্যার পর আকাশের দিকে উঁকি ঝুঁকি মারছে। ব্যাপার কি? জিজ্ঞেস করতেই জানলাম সেও আমার পথের যাত্রী। তবে বিজ্ঞানের পথে সে আমার চেয়ে একধাপ এগিয়ে। জানালো -'বোকারাম, এটা তো একটা কাঁচের কাজ নয়। দুটো কাঁচের যোগফল একটা দুরবীন।'
মর জ্বালা কত কি অজানা! তবে সে নাকি দুটো কাঁচ যোগাড়ও করে ফেলেছে। এখন কাগজের নল যোগাড় হলে, তার দুই প্রান্তে দুটো কাঁচ বসিয়ে দিলেই কেল্লা ফতে। মারুফকে সাথে পেয়ে যেন আমি গ্যালিলিওকে পাশে পেলাম। এবার আমাদের ঠেকায় কে। উত্তেজনায় রাতে ঘুম হলো না।
পরের দিন কলোনীর পাশের একটা গোডাউনের কাছ থেকে মোটা একটা কাগজের চোঙ্গা যোগাড় করা হলো(তখন ওরকম চোঙ্গা আসতো কোন বিদেশী জিনিসের মোড়ক হিসেবে নিয়ে। কাঠের মতো শক্ত ওটি)। দুজনে বসে দুপুরের মধ্যে তৈরী করে ফেললাম জীবনের প্রথম দুরবীন।
কিন্তু যন্ত্র চোখে লাগিয়ে দুরে তাকিয়ে কিছু দেখা যায় না। সব ঝাপসা! গন্ডগোলটা কোথায়। কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। কারণ এটি আমাদের দুজনের গোপন প্রজেক্ট। সবকিছু ফাইনাল হলেই ঘোষনা দেয়া হবে চুড়ান্ত আবিষ্কারের। কি আবিষ্কার হবে তা অবশ্য জানতাম না। কিন্তু আশা ছিল দুরবীনের শক্তিশালী লেন্সে চোখ লাগালে সমগ্র নক্ষত্রমন্ডলীই তো হাতের মুঠোয় চলে আসবে। ওখান থেকে বেছে বেছে গ্রহ নক্ষত্র আবিষ্কার করে বিশ্বব্যাপী জানিয়ে দেবো আর সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে আমাদের সুনাম। আপাততঃ আমাদের বিশ্ব ছিল আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনীর মেইন গেট পর্যন্ত।
কিন্তু চোখে ঝাপসা দেখা যেতেই আমাদের বিজ্ঞানী হবার আশা মাঠে মারা যাবার উপক্রম হলো। দুদিন ধরে গালে হাত দিয়ে নিউটন হয়ে বসে রইলাম দুজনে। তৃতীয় দিন মারুফ আর্কিমিডিস হয়ে ডাক দিল, ইউরেকা। পেয়েছি!! আমি ছুটে গেলাম। কি পাইছস?
সে বলে, চল সিনেমা বানাই। আমি তাজ্জব। হওয়ার কথা বিজ্ঞানী, সিনেমা বানাবো কেন? মারুফ বললো সে তার কাকার কাছে শুনেছে সিনেমা চলে প্রজেক্টরে। সেই প্রজেক্টরে এরকম মোটা কাঁচের ব্যবহার হয়। প্রজেক্টরের পেছন থেকে আলো ফেলে সামনে সিনেমার ফিল্মগুলো চালালে পর্দায় ভেসে উঠবে চলমান সিনেমা। সে কিছু রিল যোগাড় করেছে কাকার মাধ্যমে। আমি ওর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে ভুলে গেলাম গ্যালিলিওর কথা।
এখানে আরো কিছু বাড়তি সরঞ্জাম লাগবে। একটা ছোট বাল্ব আর দুটো ব্যাটারী। যোগাড় করা কোন সমস্যাই না। বাসার টর্চলাইট থেকে এই দুই জিনিস যোগাড় হয়ে গেল। এরপর লাগবে একটা অন্ধকার ঘর। সন্ধ্যের পর মারুফের পড়ার ঘরে বাতি নিভিয়ে ওটাও ব্যবস্থা করা যাবে।
রাতে শুরু হলো আমাদের পরীক্ষা নিরীক্ষা। কিন্তু অন্ধকার ঘরে দেয়ালে ঝাপসা যে বস্তুটি প্রতিফলিত তৈরী হলো তাতে কিসসু বোঝা যাচ্ছে। না ফটু না সিনেমা। মারুফের যোগাড়কৃত সিনেমার রীলগুলি খালি চোখে লাইটের বিপরীতে ধরে যতটুকু দেখা যাচ্ছে, আমাদের বানানো প্রজেক্টারে তার কনাও বোঝা যাচ্ছে না।
এবার আর কোন সুযোগ নেই। নাহ আমাদের সমস্ত বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে মারুফ লাফিয়ে উঠে বললো, আরে এটা তো দেখতে একটা টর্চের মতো লাগছে। আমরা কি তাহলে টর্চলাইট আবিষ্কার করে ফেললাম?
আমিও পুলকিত। যাক একটা কিছু তো আবিষ্কার হয়েছে। কাগজের চোঙ্গা দিয়ে টর্চলাইট আগে কেউ আবিষ্কার করেছে বলে জানা নেই। কিন্তু সেই আবিষ্কারের কাহিনী বাসায় বলা গেল না, বললে টর্চলাইটের খোয়া যাওয়া ব্যাটারী আর বাল্বের মূল্য পরিশোধ করতে হতো পিঠের চামড়ার ছাল দিয়ে।
বহু বছর চেপে রাখা সেই আবিষ্কারের ঘটনাটা আজকে সুযোগ পেয়ে কেবল আপনাকেই বললাম। আর কাউকে বলবেন না কিন্তু!
Monday, October 4, 2010
হারানো লাটিম, হারানো লেত্তি, হারানো সময়ের কাতর গল্প
লাটিমের পেটে লেত্তিটা পেঁচিয়ে তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের মাঝে সবুজ-লালে মসৃন আঁকা লাটিমটা চেপে ধরে যখন 'হুপপপস' বলে সামনের মাটিতে দাগানো গোল চক্করে ছুড়ে মারলো আবেদ, তখনো বোঝেনি শুক্কুরের চালটা।
গত দুদিন পরপর চারটি লাটিম হারিয়েছে শুক্কুরের কাছে। আজকে নতুন লাটিম কিনে গোড়া থেকে গেজটা খুলে নিয়ে চকচকে নতুন পেরেকের হুল ঢুকিয়ে তৈরী করেছে লাল-সবুজ এই লাটিম ঘোড়া। সারাদিন ঘরে লাটিম চালিয়ে আবেদ হাতের নজর পাকা করেছে, নিয়ন্ত্রনে এনেছে লাটিম লেত্তির গতি। লাঠিম খেলায় তাকে হারাতে পারবে না কেউ এখন। বাবার পকেট কেটে নতুন লাটিমের টাকা যোগাড় করেছে। বাবার পকেট হাতিয়ে সুখ আছে। বলতে পারে না কত খোয়া গেছে। পকেটে সবসময় উপরি গিজগিজ করে সরকারী চাকুরে বাবার।
*************************************************
লাটিম খেলা সবাই বোঝে না। বুঝতে হলে তাকে ছেলেবেলায় ফিরে যেতে হবে, নইলে কোন লাটিম বালককে ধরে ছোট্ট একটা কোর্স করে নিতে হবে।
আমি বলি। ব্যাপারটা সহজ। পাড়ার ছুটকো মুদী দোকানেই লাটিম পাওয়া যায়। বিশেষতঃ যে দোকানগুলি কাঠের চারপায়ের উপর টিনের বাক্সের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তিনপাশে ড্রামশিটের দেয়ালে ঘেরা, উপরে মরচেধরা ঢেউটিন সামনে ভাজকরা টিনের কব্জার ফটক। দোকানের ঘোলা কাঁচের শোকেসের ভেতর সাজানো থাকে নানাব্রান্ডের দামী সিগারেটের প্যাকেট। সবগুলাই নিশ্চিত খালি। খালি সিগারেটের বাক্সের পেছনে সাজানো থাকে স্টার, সিজার, ক্যাপস্টান কিংবা গোল্ডফ্লেকের আধখোলা প্যাকেট। পাশে আবুল কারিগর কিংবা আকিজ বিড়ির বান্ডিল। শোকেসের উপর দাঁড়িয়ে থাকবে কয়েকটা কাঁচের বৈয়াম। বৈয়ামে সাজানো থাকবে চকোলেট, আচার, আর চিনির তৈরী মিষ্টি দানা যাকে সন্দেশ বলে বিক্রি করে পঁচিশ পয়সায়। উপরের দিকে জং ধরা দুটো খাঁচা ঝুলবে, যার একটিতে মুরগী অন্যটিতে হাসের ডিম।
পরিপাটি এই দোকানের পেছনের দেয়ালে পলিথিনের একটা ঝোলার পাশে দুটো সুতলীতে ঝোলানো থাকবে দুই সারি লাটিম। একটা পনের পয়সা আরেকটা পঞ্চাশ পয়সা। ১৫ পয়সার লাটিমের কোন বাহার নেই, দায়সারা গোলাপী রঙে চুবিয়ে তার গোড়ায় কোনমতে একটা গেজ ঢুকিয়ে লাটিম নামে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। এই লাটিমগুলো মূলত টোপ লাটিম। বাজি ধরতে এদের ব্যবহার করা হয়। পাশের সারিতে ঝোলানো দুই বা তিন রঙের পাংকি লাটিমগুলোই আসল খেলোয়াড়। ওগুলোর শরীর মসৃন মজবুত কাঠ থেকে তৈরী। লাল-নীল, লাল-সবুজ, লাল-বেগুনী এরকম বাহারী রঙের লাটিম। দেখতে যেমন দামেও তেমন!
লাঠিম খেলার বাজি দুই প্রকার। একটা হলো হেরে গেলে দোষী লাঠিমের উপর 'গেজ' মারা। গেজ মারার শুদ্ধ কোন প্রতিশব্দ জানা নেই। তবে গেজ মারা হলো, বিজয়ী লাঠিমের চোখা মাথা দিয়ে পরাজিত লাটিমের ভুড়ি বা মুন্ডু দুই ফাঁক করে দেয়া। আরেকটা বাজি হলো হলো পরাজিত লাটিমটি বিজয়ী দখলে নিয়ে নেবে।
লাটিমের বাজি খেলতে হলে রঙিন লাটিমের পাশাপাশি ভুসভুসে সস্তা দশ পয়সার গোলাপী লাটিমও থাকতে হয়। নইলে বাজিতে আসল লাটিম হারিয়ে পথে বসে কাঁদতে হবে। নেহায়েত বড়লোকের পোলা না হলে একসাথে দুটো পাংকি লাটিম কেউ পোষাতে পারে না। লাটিমের বাজি ছাড়াও নানান কেরামতী আছে লাটিম খেলার। যা সবাই পারে না। আবেদ সকল খেলায় পারদর্শী। যে কোন স্থানে লাটিম ঘুরানোর কায়দা রপ্ত করা আসল। সমতল অসমতল নরম শক্ত মাটি, সব জায়গায় চলে এরকম।
বাসায় বাবার বকার ভয়ে পাকা মেঝেতে লাটিম চালাতে পারেনা সে। তাই কায়দা করে হাতের তালুতে লাটিম ঘুরায় আবেদ। ব্যাপারটা অদ্ভুত শৈল্পিক। লাটিমটাকে লেত্তির মধ্যে পেচিয়ে গেজটা উপরের দিকে রাখা অবস্থায় ডান হাত দিয়ে সোজা সামনে ছুড়ে দিয়ে আবার পিছুটান দিলে লাটিমটা চিত থেকে সপাত করে সোজা পায়ে এসে পড়ে হাতের তালুতে, এবং ঘুরতে থাকে মনের আনন্দে। হাতের তালুতে নিরাপদ লাটিম ঘোরাবার কায়দা রপ্ত করার পর থেকে বাবার বকুনি কমেছে তার। পকেটে করে স্কুলেও নিয়ে যাওয়া শুরু করেছে সে। পেছনের বেঞ্চে জায়গা করে নিয়ে আস্ত লাটিম ঘোরানোর খেলা চলে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে।
আবেদ স্কুলে যায়। শুক্কুর যায় না। শুক্কুর স্কুলে পড়বে না, এটাই যেন স্বাভাবিক। ওর বড় ভাই রহিম গুন্ডা। ওদের স্কুলে না গেলেও চলে। কিন্তু আবেদের না গেলে চলে না। পিঠের উপর চিক্কন নিম ডালের অত্যাচার নেমে আসে একদিন পড়াশোনা না করলে। তার ইচ্ছে করে শুক্কুরদের সাথে থাকতে। সোলেমানও স্কুলে যায় না। সে আবার লাটিম খেলায় আগ্রহী না। চাক্কু ছোড়ায় ওস্তাদ সে। লাটিমের বদলে চাকু ছুড়ে মারে মাটিতে। দুরে গিয়ে অদ্ভুত সুন্দর গেঁথে যায় চাকুটা মাটিতে। এত প্রতিভা যাদের, তাদের স্কুলে না গেলেও চলে।
শর্ত ছিল শুক্কুর নতুন লাটিম বসাবে গোল চক্করে, ভুসভুসে গোলাপী লাটিম না। বসিয়েছেও ঠিক ঠাক। একদম নতুন লাল-সবুজ-বেগুনী টাট্টু ঘোড়া। আবেদের চোখজোড়া স্বপ্নে ভরে যায় ওই লাল-সবুজ-বেগুনী ঘোড়াটার জন্য। তেরঙা লাটিম দুর্লভ একটা জিনিস। পাড়ায় এই একটি লাটিমই আছে। তার সাথে খেলার জন্য আবেদ নতুন কেনা লাল-সবুজকে তৈরী করেছে।
*******************************************************
লাটিমটা ছুড়ে মেরেই চোখ ছানাবড়া করে আবেদ দেখতে পেল, তার লালসবুজ বন বন করে ঘোরার বদলে ওই গোলাকার দাগের ভেতর পা গুটিয়ে বসে গেল। ব্যাপার কি? কাছে গিয়ে দেখতে পেল যেখানে গোল্লাটা আঁকা হয়েছে, সেটায় নরম মাটির আস্তরন। আর নরম মাটিতে লাটিমের পক্ষে বনবন ঘোরা অসম্ভব। তাই সে পরাজিত গরুর মতো পা গুটিয়ে বসে গেছে শুক্কুরের লাল-সবুজ-বেগুনী লাটিমের পাশে। শুক্কুরের মুখে বিটলামী হাসি, আবেদ নিরুপায় তাকিয়ে দেখে তার চোখের সামনে নতুন কেনা লাটিমটি ওর পকেটে চলে গেল।
শুক্কুর খেলা শুরুর আগেই কায়দা করে খেলার জায়গা নির্ধারণ করেছিল নরোম মাটিতে যা ছিল একটা ফাঁদ। কিন্তু বুঝতে বড্ড দেরী হয়ে গেছে। আবেদের করার কিচ্ছু নেই। কদিন আর লাটিম কেনা হবে না তার। বাবাকে বললে তেড়ে উঠবে এখন। শুক্কুর টিটকারীর সুরে বললো, আরেক দান খেলবি নাকি আবিদ্যা?
আবেদ জবাব না দিয়ে চোখের জল সামলে মাথা নীচু করে বসে রইল। বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না।
শুক্কুরের এই প্রতারণার অভিযোগ জানাবার কোন আদালত নেই।
গত দুদিন পরপর চারটি লাটিম হারিয়েছে শুক্কুরের কাছে। আজকে নতুন লাটিম কিনে গোড়া থেকে গেজটা খুলে নিয়ে চকচকে নতুন পেরেকের হুল ঢুকিয়ে তৈরী করেছে লাল-সবুজ এই লাটিম ঘোড়া। সারাদিন ঘরে লাটিম চালিয়ে আবেদ হাতের নজর পাকা করেছে, নিয়ন্ত্রনে এনেছে লাটিম লেত্তির গতি। লাঠিম খেলায় তাকে হারাতে পারবে না কেউ এখন। বাবার পকেট কেটে নতুন লাটিমের টাকা যোগাড় করেছে। বাবার পকেট হাতিয়ে সুখ আছে। বলতে পারে না কত খোয়া গেছে। পকেটে সবসময় উপরি গিজগিজ করে সরকারী চাকুরে বাবার।
*************************************************
লাটিম খেলা সবাই বোঝে না। বুঝতে হলে তাকে ছেলেবেলায় ফিরে যেতে হবে, নইলে কোন লাটিম বালককে ধরে ছোট্ট একটা কোর্স করে নিতে হবে।
আমি বলি। ব্যাপারটা সহজ। পাড়ার ছুটকো মুদী দোকানেই লাটিম পাওয়া যায়। বিশেষতঃ যে দোকানগুলি কাঠের চারপায়ের উপর টিনের বাক্সের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তিনপাশে ড্রামশিটের দেয়ালে ঘেরা, উপরে মরচেধরা ঢেউটিন সামনে ভাজকরা টিনের কব্জার ফটক। দোকানের ঘোলা কাঁচের শোকেসের ভেতর সাজানো থাকে নানাব্রান্ডের দামী সিগারেটের প্যাকেট। সবগুলাই নিশ্চিত খালি। খালি সিগারেটের বাক্সের পেছনে সাজানো থাকে স্টার, সিজার, ক্যাপস্টান কিংবা গোল্ডফ্লেকের আধখোলা প্যাকেট। পাশে আবুল কারিগর কিংবা আকিজ বিড়ির বান্ডিল। শোকেসের উপর দাঁড়িয়ে থাকবে কয়েকটা কাঁচের বৈয়াম। বৈয়ামে সাজানো থাকবে চকোলেট, আচার, আর চিনির তৈরী মিষ্টি দানা যাকে সন্দেশ বলে বিক্রি করে পঁচিশ পয়সায়। উপরের দিকে জং ধরা দুটো খাঁচা ঝুলবে, যার একটিতে মুরগী অন্যটিতে হাসের ডিম।
পরিপাটি এই দোকানের পেছনের দেয়ালে পলিথিনের একটা ঝোলার পাশে দুটো সুতলীতে ঝোলানো থাকবে দুই সারি লাটিম। একটা পনের পয়সা আরেকটা পঞ্চাশ পয়সা। ১৫ পয়সার লাটিমের কোন বাহার নেই, দায়সারা গোলাপী রঙে চুবিয়ে তার গোড়ায় কোনমতে একটা গেজ ঢুকিয়ে লাটিম নামে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। এই লাটিমগুলো মূলত টোপ লাটিম। বাজি ধরতে এদের ব্যবহার করা হয়। পাশের সারিতে ঝোলানো দুই বা তিন রঙের পাংকি লাটিমগুলোই আসল খেলোয়াড়। ওগুলোর শরীর মসৃন মজবুত কাঠ থেকে তৈরী। লাল-নীল, লাল-সবুজ, লাল-বেগুনী এরকম বাহারী রঙের লাটিম। দেখতে যেমন দামেও তেমন!
লাঠিম খেলার বাজি দুই প্রকার। একটা হলো হেরে গেলে দোষী লাঠিমের উপর 'গেজ' মারা। গেজ মারার শুদ্ধ কোন প্রতিশব্দ জানা নেই। তবে গেজ মারা হলো, বিজয়ী লাঠিমের চোখা মাথা দিয়ে পরাজিত লাটিমের ভুড়ি বা মুন্ডু দুই ফাঁক করে দেয়া। আরেকটা বাজি হলো হলো পরাজিত লাটিমটি বিজয়ী দখলে নিয়ে নেবে।
লাটিমের বাজি খেলতে হলে রঙিন লাটিমের পাশাপাশি ভুসভুসে সস্তা দশ পয়সার গোলাপী লাটিমও থাকতে হয়। নইলে বাজিতে আসল লাটিম হারিয়ে পথে বসে কাঁদতে হবে। নেহায়েত বড়লোকের পোলা না হলে একসাথে দুটো পাংকি লাটিম কেউ পোষাতে পারে না। লাটিমের বাজি ছাড়াও নানান কেরামতী আছে লাটিম খেলার। যা সবাই পারে না। আবেদ সকল খেলায় পারদর্শী। যে কোন স্থানে লাটিম ঘুরানোর কায়দা রপ্ত করা আসল। সমতল অসমতল নরম শক্ত মাটি, সব জায়গায় চলে এরকম।
বাসায় বাবার বকার ভয়ে পাকা মেঝেতে লাটিম চালাতে পারেনা সে। তাই কায়দা করে হাতের তালুতে লাটিম ঘুরায় আবেদ। ব্যাপারটা অদ্ভুত শৈল্পিক। লাটিমটাকে লেত্তির মধ্যে পেচিয়ে গেজটা উপরের দিকে রাখা অবস্থায় ডান হাত দিয়ে সোজা সামনে ছুড়ে দিয়ে আবার পিছুটান দিলে লাটিমটা চিত থেকে সপাত করে সোজা পায়ে এসে পড়ে হাতের তালুতে, এবং ঘুরতে থাকে মনের আনন্দে। হাতের তালুতে নিরাপদ লাটিম ঘোরাবার কায়দা রপ্ত করার পর থেকে বাবার বকুনি কমেছে তার। পকেটে করে স্কুলেও নিয়ে যাওয়া শুরু করেছে সে। পেছনের বেঞ্চে জায়গা করে নিয়ে আস্ত লাটিম ঘোরানোর খেলা চলে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে।
আবেদ স্কুলে যায়। শুক্কুর যায় না। শুক্কুর স্কুলে পড়বে না, এটাই যেন স্বাভাবিক। ওর বড় ভাই রহিম গুন্ডা। ওদের স্কুলে না গেলেও চলে। কিন্তু আবেদের না গেলে চলে না। পিঠের উপর চিক্কন নিম ডালের অত্যাচার নেমে আসে একদিন পড়াশোনা না করলে। তার ইচ্ছে করে শুক্কুরদের সাথে থাকতে। সোলেমানও স্কুলে যায় না। সে আবার লাটিম খেলায় আগ্রহী না। চাক্কু ছোড়ায় ওস্তাদ সে। লাটিমের বদলে চাকু ছুড়ে মারে মাটিতে। দুরে গিয়ে অদ্ভুত সুন্দর গেঁথে যায় চাকুটা মাটিতে। এত প্রতিভা যাদের, তাদের স্কুলে না গেলেও চলে।
শর্ত ছিল শুক্কুর নতুন লাটিম বসাবে গোল চক্করে, ভুসভুসে গোলাপী লাটিম না। বসিয়েছেও ঠিক ঠাক। একদম নতুন লাল-সবুজ-বেগুনী টাট্টু ঘোড়া। আবেদের চোখজোড়া স্বপ্নে ভরে যায় ওই লাল-সবুজ-বেগুনী ঘোড়াটার জন্য। তেরঙা লাটিম দুর্লভ একটা জিনিস। পাড়ায় এই একটি লাটিমই আছে। তার সাথে খেলার জন্য আবেদ নতুন কেনা লাল-সবুজকে তৈরী করেছে।
*******************************************************
লাটিমটা ছুড়ে মেরেই চোখ ছানাবড়া করে আবেদ দেখতে পেল, তার লালসবুজ বন বন করে ঘোরার বদলে ওই গোলাকার দাগের ভেতর পা গুটিয়ে বসে গেল। ব্যাপার কি? কাছে গিয়ে দেখতে পেল যেখানে গোল্লাটা আঁকা হয়েছে, সেটায় নরম মাটির আস্তরন। আর নরম মাটিতে লাটিমের পক্ষে বনবন ঘোরা অসম্ভব। তাই সে পরাজিত গরুর মতো পা গুটিয়ে বসে গেছে শুক্কুরের লাল-সবুজ-বেগুনী লাটিমের পাশে। শুক্কুরের মুখে বিটলামী হাসি, আবেদ নিরুপায় তাকিয়ে দেখে তার চোখের সামনে নতুন কেনা লাটিমটি ওর পকেটে চলে গেল।
শুক্কুর খেলা শুরুর আগেই কায়দা করে খেলার জায়গা নির্ধারণ করেছিল নরোম মাটিতে যা ছিল একটা ফাঁদ। কিন্তু বুঝতে বড্ড দেরী হয়ে গেছে। আবেদের করার কিচ্ছু নেই। কদিন আর লাটিম কেনা হবে না তার। বাবাকে বললে তেড়ে উঠবে এখন। শুক্কুর টিটকারীর সুরে বললো, আরেক দান খেলবি নাকি আবিদ্যা?
আবেদ জবাব না দিয়ে চোখের জল সামলে মাথা নীচু করে বসে রইল। বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না।
শুক্কুরের এই প্রতারণার অভিযোগ জানাবার কোন আদালত নেই।
পাআআআআআআআআআআ
বাসায় পৌঁছে কলিংবেল বাজাতেই সবচেয়ে কাংখিত যে শব্দটা ভেতর থেকে ভেসে আসে সেটা হলো “বাবা এসেছেএএএএএএ………..”।
.
বলাই বাহুল্য ওটা কার গলা। সদ্য চতুবর্ষ পেরুনো ওশিন। ছুটে এসে ছোট ছোট দুহাতে জড়িয়ে ধরবে কিংবা এক লাফে গলায় ঝুলে পড়বে। ইদানীং তার পেছন পেছন আরেকজনও আসার চেষ্টা করে। ইনি এখনো হাঁটতে পারেন না, কিন্তু ওয়াকারে করে সারা ঘর দাপিয়ে বেড়ান সাই সাই করে। তিনিও কলিং বেল শোনামাত্র হৈ হৈ শব্দ করা শুরু করবে, দুহাত বাড়িয়ে যদ্দুর সম্ভব ছুটে আসবে। তারপর আলতো করে বলবে, ‘পা…’। কয়েক সেকেন্ড বিরতি দিয়ে আরেকটু জোর দিয়ে “পাআআ…..”। কেউ শেখায়নি, এই শব্দ নিজে নিজে তৈরী করেছে। তার নিজস্ব তিন চারটে শব্দের ভান্ডার তৈরী করেছে ১৩ মাস পেরুনো ড.শিহান রিশাদ।
.
আমাকে ‘পা’ কিংবা 'পাপা' ডাকে শিহান। ইংরেজের বাচ্চা হলে বুঝতাম যে পাপার সংক্ষিপ্ত রূপ পা, কিন্তু বাঙালের পোলা হয়ে কোত্থেকে পা আবিষ্কার করলো ভেবে পাই না। আগে হালকা ধমকে দিয়ে বলতাম, কিরে ব্যাটা আমি ‘পা’ মানে ট্যাং হলাম কেমনে? কিন্তু আজকাল অজান্তে আমিও এই ‘পা’ ডাকের ভক্ত হয়ে গেছি এবং চিন্তায় আছি কখন 'পা' ডাকের মেয়াদ শেষ হয়ে 'বাবা' কিংবা 'আব্বা'র যুগ চলে আসে।
.
কেবল ‘পা’ নয়। আমি বাসায় ঢোকামাত্র বিশেষ চিত্তচাঞ্চল্য দেখা যাবে তার মধ্যে। বোধহয় সারাদিনের না বলা কথাগুলো হড়বড় করে বলতে থাকে এবং শব্দের বাজেট দুটো। ‘পা’ আর ‘কা’ এই দুই শব্দ দিয়ে সব বকবকানি। ফোন কিংবা কলিংবেল বাজলে বলবে, ‘কে’? আর শিক্ষাদীক্ষা বিষয়ক তাবৎ বস্তুকে 'ক-খ' দিয়েই সামলাবে। এমনকি আমার ল্যাপিকে দেখলেও বলবে ‘ক-খ’।
.
গতকাল থেকে নতুন এক রসিকতা যুক্ত হয়েছে। আমার হাতটা টেনে নিয়ে উপরে আর নীচের মিলিয়ে পাঁচটা দাতের কামড় দেবার মতলবে থাকে। ব্যাথা পাচ্ছি বলে মৃদু ধমকে দিলে চোখ পিট পিট করে হাসে। যেন বলতে চায় “হালকাই তো দিলাম, এতেই ব্যাথা পাও?”
.
আসলে যে কথা বলার জন্য 'ক-খ' করলাম এতক্ষণ তা হলো, আমি বুড়ো হইতেছি আর পোলা ফাজিল হইতেছে দিন দিন।
.
বলাই বাহুল্য ওটা কার গলা। সদ্য চতুবর্ষ পেরুনো ওশিন। ছুটে এসে ছোট ছোট দুহাতে জড়িয়ে ধরবে কিংবা এক লাফে গলায় ঝুলে পড়বে। ইদানীং তার পেছন পেছন আরেকজনও আসার চেষ্টা করে। ইনি এখনো হাঁটতে পারেন না, কিন্তু ওয়াকারে করে সারা ঘর দাপিয়ে বেড়ান সাই সাই করে। তিনিও কলিং বেল শোনামাত্র হৈ হৈ শব্দ করা শুরু করবে, দুহাত বাড়িয়ে যদ্দুর সম্ভব ছুটে আসবে। তারপর আলতো করে বলবে, ‘পা…’। কয়েক সেকেন্ড বিরতি দিয়ে আরেকটু জোর দিয়ে “পাআআ…..”। কেউ শেখায়নি, এই শব্দ নিজে নিজে তৈরী করেছে। তার নিজস্ব তিন চারটে শব্দের ভান্ডার তৈরী করেছে ১৩ মাস পেরুনো ড.শিহান রিশাদ।
.
আমাকে ‘পা’ কিংবা 'পাপা' ডাকে শিহান। ইংরেজের বাচ্চা হলে বুঝতাম যে পাপার সংক্ষিপ্ত রূপ পা, কিন্তু বাঙালের পোলা হয়ে কোত্থেকে পা আবিষ্কার করলো ভেবে পাই না। আগে হালকা ধমকে দিয়ে বলতাম, কিরে ব্যাটা আমি ‘পা’ মানে ট্যাং হলাম কেমনে? কিন্তু আজকাল অজান্তে আমিও এই ‘পা’ ডাকের ভক্ত হয়ে গেছি এবং চিন্তায় আছি কখন 'পা' ডাকের মেয়াদ শেষ হয়ে 'বাবা' কিংবা 'আব্বা'র যুগ চলে আসে।
.
কেবল ‘পা’ নয়। আমি বাসায় ঢোকামাত্র বিশেষ চিত্তচাঞ্চল্য দেখা যাবে তার মধ্যে। বোধহয় সারাদিনের না বলা কথাগুলো হড়বড় করে বলতে থাকে এবং শব্দের বাজেট দুটো। ‘পা’ আর ‘কা’ এই দুই শব্দ দিয়ে সব বকবকানি। ফোন কিংবা কলিংবেল বাজলে বলবে, ‘কে’? আর শিক্ষাদীক্ষা বিষয়ক তাবৎ বস্তুকে 'ক-খ' দিয়েই সামলাবে। এমনকি আমার ল্যাপিকে দেখলেও বলবে ‘ক-খ’।
.
গতকাল থেকে নতুন এক রসিকতা যুক্ত হয়েছে। আমার হাতটা টেনে নিয়ে উপরে আর নীচের মিলিয়ে পাঁচটা দাতের কামড় দেবার মতলবে থাকে। ব্যাথা পাচ্ছি বলে মৃদু ধমকে দিলে চোখ পিট পিট করে হাসে। যেন বলতে চায় “হালকাই তো দিলাম, এতেই ব্যাথা পাও?”
.
আসলে যে কথা বলার জন্য 'ক-খ' করলাম এতক্ষণ তা হলো, আমি বুড়ো হইতেছি আর পোলা ফাজিল হইতেছে দিন দিন।
Thursday, July 29, 2010
অপূর্ব এক তিতকুনে রাঙানো আকাশ
গরম পানির মগে ধূসর সাদা ছোট্ট টি ব্যাগটা চুবিয়ে দিলাম। মগের তলানিতে গিয়ে বসে গেল টি-ব্যাগটা চুপচাপ। কয়েক মুহূর্ত পরেই টিব্যাগের তলা থেকে সোনালি রঙের ঢেউ খেলানো লিকার মগের তলদেশ আলোকিত করতে শুরু করে। অপূর্ব এক দৃশ্য। আমি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকি। জলের ভেতর ভেজা ধোঁয়া যেন, কুন্ডলী পাকিয়ে ওঠা রঙিন লিকারগুলো ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারা মগে।
খানিক বাদেই স্বচ্ছ গরম জলের মগটি হয়ে ওঠে একরাশ তরল সোনার আধার। তারপর সেই সোনালু রং আস্তে আস্তে গাঢ় হয়। সেই গাঢ়তা একসময় খয়েরী মেঘের ঘনত্ব নিয়ে তলা ছাড়িয়ে উর্ধ্বমুখী হতে থাকে। আমি আনমনে চেয়ে থাকতে থাকতে দু’আঙুলের মাঝে টিব্যাগের সুতোটা ধরে আলগোছে নাড়তে থাকি। রঙের খেলা সমাপ্ত হলে সিক্ত টি ব্যাগটি তুলে নিয়ে বাইরে ফেলে দেই। তারপর সেই রাঙানো মগটা মুখের কাছে এনে প্রথম চুমুক দিলাম উষ্ণ তরলে। নিমেষেই কষ-তিক্ত একটা স্বাদ জিবে আশ্রয় নিল।
ঠোঁটের বামপাশটা কুঁচকে উঠতে গিয়েও থেমে গেল। মনে পড়লো, এই তেতো অপ্রত্যাশিত নয়। স্বেচ্ছায় জেনে শুনেই চিনি খাওয়া বাদ দিয়েছি। হরদম তেতো চায়ের স্বাদ নিচ্ছি। একসময় তেতো চা অসহ্য লাগতো, তেতো কিছুই নিতে পারতাম না। কাউকে তেতো স্বাদ নিতে দেখলে বিস্মিত হতাম। অথচ আজকাল প্রতিদিন অবলীলায় দুকাপ তেতো হজম করি। বহুকাল মিষ্টতায় ডুবে ছিলাম বলেই বোধহয় আজ আমি তেতো ভালোবাসি।
বেলা বাড়তে বাড়তে তেতোটাই সত্য হলো আজ? নাকি রঙের মুগ্ধতায় তেতো হজম করে নিচ্ছি। এত যুগ চা খাবার পরে এই অপূর্ব রঙ চোখে পড়লো আজকেই প্রথম!
খানিক বাদেই স্বচ্ছ গরম জলের মগটি হয়ে ওঠে একরাশ তরল সোনার আধার। তারপর সেই সোনালু রং আস্তে আস্তে গাঢ় হয়। সেই গাঢ়তা একসময় খয়েরী মেঘের ঘনত্ব নিয়ে তলা ছাড়িয়ে উর্ধ্বমুখী হতে থাকে। আমি আনমনে চেয়ে থাকতে থাকতে দু’আঙুলের মাঝে টিব্যাগের সুতোটা ধরে আলগোছে নাড়তে থাকি। রঙের খেলা সমাপ্ত হলে সিক্ত টি ব্যাগটি তুলে নিয়ে বাইরে ফেলে দেই। তারপর সেই রাঙানো মগটা মুখের কাছে এনে প্রথম চুমুক দিলাম উষ্ণ তরলে। নিমেষেই কষ-তিক্ত একটা স্বাদ জিবে আশ্রয় নিল।
ঠোঁটের বামপাশটা কুঁচকে উঠতে গিয়েও থেমে গেল। মনে পড়লো, এই তেতো অপ্রত্যাশিত নয়। স্বেচ্ছায় জেনে শুনেই চিনি খাওয়া বাদ দিয়েছি। হরদম তেতো চায়ের স্বাদ নিচ্ছি। একসময় তেতো চা অসহ্য লাগতো, তেতো কিছুই নিতে পারতাম না। কাউকে তেতো স্বাদ নিতে দেখলে বিস্মিত হতাম। অথচ আজকাল প্রতিদিন অবলীলায় দুকাপ তেতো হজম করি। বহুকাল মিষ্টতায় ডুবে ছিলাম বলেই বোধহয় আজ আমি তেতো ভালোবাসি।
বেলা বাড়তে বাড়তে তেতোটাই সত্য হলো আজ? নাকি রঙের মুগ্ধতায় তেতো হজম করে নিচ্ছি। এত যুগ চা খাবার পরে এই অপূর্ব রঙ চোখে পড়লো আজকেই প্রথম!
ছৈয়দ্দা
ছৈয়দ্দাকে প্রথম যখন দেখি তখন সে তীব্র কন্ঠে কারো মায়ের সাথে সম্পর্কস্থাপন সংক্রান্ত গালিবর্ষন করছিল।
একটা মানুষ এক নাগাড়ে কতক্ষন গালির ঝড় তুলতে পারে সেটা ছৈয়দ্দাকে না দেখলে কখনোই জানা হতো না। এবং তার মুখ নিসৃত শব্দগুলোকে নেহায়েত গালি না বলে গালিঝড় কিংবা গালিটর্নেডো বললেও অত্যুক্তি হবে না। প্রথমে শুনতে কানে তালা দিতে হলেও কিছুদিন পর দেখা গেল ছৈয়দ্দার গালি না শুনলে মনে হতো কোথাও কোন ভজঘট লেগেছে, মানে দিনটা ঠিক নেই।
নতুন এলাকায় নতুন বাড়ীতে উঠেছি। বিশাল প্রান্তরের মাঝে একটুকরো জমিতে ছোট্ট একটা বাড়ী। দুর থেকে বাংলো মনে হলেও ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায় একটা সাদামাঠা মধ্যবিত্ত পরিবারের বসতঘর সেটি। শহরের মধ্যে অবস্থিতি হয়েও বাড়ীর চারপাশে এখনো জলজ্যান্ত গ্রাম। পেছনের ধানক্ষেতটি পশ্চিম দিকে যেতে যেতে প্রায় দিগন্ত ছুঁয়ে গেছে। বাড়ীর পাশ দিয়ে পুবদিকে যে মাটির রাস্তা চলে গেছে সেটা বেয়ে কয়েকশো গজ হাঁটলে নিকটস্থ প্রতিবেশী নুরুল আবসার সাহেবের বাড়ীটা পড়বে।
সেই বাড়ীর সামনে একটা পুকুর। মাটির রাস্তাটা পুকুরের পাড় ঘেসে চলে গেছে। মাটির রাস্তার ডান দিকে একটা গোবরগন্ধী গোয়াল দেখা যাবে। গোয়ালের লাগোয়া বেড়ার তৈরী একটা ঝুপড়ি ঘর। ঝুপড়ির চালে লাউয়ে সবুজ লতা ছেয়ে আছে, পাশে কয়েকটা কলা গাছ।
সেই গোয়াল, কলাগাছ আর ঝুপড়ির অস্থায়ী মালিক ছৈয়দ্দা এবং স্থায়ী মালিক সরকার। এটি রাস্তার জন্য অধিগ্রহন করা জায়গা। যদ্দিন রাস্তা হচ্ছে না তদ্দিন ছৈয়দ্দা দখলসুত্রে বসবাস করবে। পেশায় ছৈয়দ্দা একজন চাষা। এলাকায় জমি বর্গা নিয়ে চাষবাস করার জন্য সুদুর বাঁশখালী থেকে এখানে এসে ঢেরা বেঁধেছে।
গালিগালাজ শুনতে যতই খারাপ লাগুক আমাদের স্বীকার করতেই হয় যে গালিবর্ষনে সে কড়া সাম্যবাদী। গালিগালাজে তার কোন শ্রেনীভেদ নাই। প্রতিবেশী নুরুল আবসার সাহেবকে যে ভাষায় গালি দেবে, তার গোয়ালের অলস বলদকেও সে ভাষায়, আবার নিজের ছেলেকেও একই ভাষায় গালি। তার এই সাম্যবাদ নীতি প্রশংসার দাবীদার হতে পারে কিনা জানি না, কিন্তু আমাদের জন্য ছিল আতংকের।
আমাদের কানে সবচেয়ে বেশী পীড়া দিতো যখন গালিটা আবসার সাহেবের উদ্দেশ্যে বর্ষিত হতো। আবসার সাহেব সমাজে আমাদের শ্রেনীর লোক হওয়াতে ভয় ছিল - না জানি আমরাও কোনদিন ছৈয়দ্দার গালির লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ি। তার গালির প্রতিবাদ করার মতো দুঃসাহস পাড়ার কারো ছিল না। পুলিশে কেস করারও কোন আইন নাই।
যেই প্রতিবাদ করবে ছৈয়দ্দা তার মায়ের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে মুহূর্তও দ্বিধা করবে না এবং সেই আওয়াজ অন্তত আধমাইল দুরে গিয়ে পৌঁছাবে। এরকম নিরুপদ্রপ গালিবর্ষনের সুযোগ থাকার ফলে ছৈয়দ্দার গালিঝড় সূর্যোদয়ের মতো প্রতিদিনের অপরিহার্য অংশ হয়ে থাকে।
কিছুদিন পর খেয়াল করলাম ভদ্রলোকদের মধ্যে আবসার সাহেবই সবচেয়ে বেশী গালি খায়। আর কেউ ততটা না। ব্যাপার কি? একদিন কৌতুহলী হয়ে ছৈয়দ্দার সাথে খাতিরা আলাপ জমালাম। আকড়া মাকড়া অনেক আলাপ হলো গরু-গাধা-চাষবাস বিষয়ে। এক সময়ে আবসার সাহেবের সম্পর্কে তার মতামত চাইলাম। ছৈয়দ্দা যা বললো তার ভদ্র ভাষার সারমর্ম হলো-
আবসার সাহেব লোক খারাপ না। ভদ্রলোক একটা নামকরা প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। নিজের গাড়ী বাড়ী সামাজিক অবস্থান সবই আছে। তবে মানুষটা "লোয়া-কিপটা"(লৌহ কঠিন কঞ্জুস)। ছৈয়দ্দার সাম্প্রতিক মেজাজ খারাপ করার কারণ ঘটেছে আবসার সাহেবের ভাড়াটে বাড়ীটা।
আবসার সাহেবের দুটো বাড়ী। একটা বাড়ীতে নিজে থাকেন, আরেকটা বাড়ী ভাড়ায় দিয়েছেন। বাড়ী ভাড়া দেন ঠিকই কিন্তু টু-লেট সাইনবোর্ড লাগাতে রাজী না তিনি। এই সাইনবোর্ড বানাতে কয়টাকা খরচ হয়। কিন্তু আবসার সাহেবের কথা হলো, খামাকা পয়সা নষ্ট করে লাভ কি। তিনি বাড়ীর বাইরের দেয়ালে একটা ভাঙা ইট দিয়ে মোটা মোটা করে টেনে টেনে লিখে দিলেন -TO-LET.
ওটা লেখার পর থেকে ছৈয়দ্দার মেজাজ গরম।
জিজ্ঞেস করলাম টু-লেট সাইনবোর্ড না দেয়াতে তোমার সমস্যা কোথায়? বাড়ী হলো আবসার সাহেবের। তার যেরকম খুশী সেরকম পদ্ধতিতে ভাড়াটিয়া যোগাড় করুক।
ছৈয়দ্দা বলে, "আরে বদ্দা, তুঁই কি বুঝিবা, আঁরা বাশখাইল্যা মানুষ, হইলজা বড় দইজ্জার লান। ইতে কনজুইসর বাইচ্চা আঁরার জাতর বেইজ্জতি গইজ্জি। মাইনসে ইডা মার্কা লেখা দেখি আঁরে হয়দে- অডা বাইনচোত, তোরা বাঁশখাইল্লা হাইচ্ছোত ইডা মারি হোচ্চত।"
(মানে তুমি বুঝবা না, আমরা বাশখালীর মানুষ বড় ইজ্জতের মানুষ, কিন্তু এই ইট দিয়ে লেখা টু-লেট দেখে রাস্তার লোক বাঁশখালীর লোকের কিপটামির বদনাম করে যাচ্ছে, যা আমাকে হরদম শুনতে হচ্ছে প্রতিবেশী হওয়ার কারণে। আবসার সাহেব বাঁশখালীর লোক)।
এইটুকু শোনার পর আলাপ আর এগোয় না। ইজ্জত নিয়েই যখন ফ্যাসাদ, তখন ছৈয়দ্দার সাথে তর্ক করে নিজের ইজ্জতকে রিস্কে ফেলে দেবার চেয়ে তাকে ফ্লোর ছেড়ে দিয়ে বাসায় চলে যাওয়াই উত্তম। তাই করলাম।
একটা মানুষ এক নাগাড়ে কতক্ষন গালির ঝড় তুলতে পারে সেটা ছৈয়দ্দাকে না দেখলে কখনোই জানা হতো না। এবং তার মুখ নিসৃত শব্দগুলোকে নেহায়েত গালি না বলে গালিঝড় কিংবা গালিটর্নেডো বললেও অত্যুক্তি হবে না। প্রথমে শুনতে কানে তালা দিতে হলেও কিছুদিন পর দেখা গেল ছৈয়দ্দার গালি না শুনলে মনে হতো কোথাও কোন ভজঘট লেগেছে, মানে দিনটা ঠিক নেই।
নতুন এলাকায় নতুন বাড়ীতে উঠেছি। বিশাল প্রান্তরের মাঝে একটুকরো জমিতে ছোট্ট একটা বাড়ী। দুর থেকে বাংলো মনে হলেও ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায় একটা সাদামাঠা মধ্যবিত্ত পরিবারের বসতঘর সেটি। শহরের মধ্যে অবস্থিতি হয়েও বাড়ীর চারপাশে এখনো জলজ্যান্ত গ্রাম। পেছনের ধানক্ষেতটি পশ্চিম দিকে যেতে যেতে প্রায় দিগন্ত ছুঁয়ে গেছে। বাড়ীর পাশ দিয়ে পুবদিকে যে মাটির রাস্তা চলে গেছে সেটা বেয়ে কয়েকশো গজ হাঁটলে নিকটস্থ প্রতিবেশী নুরুল আবসার সাহেবের বাড়ীটা পড়বে।
সেই বাড়ীর সামনে একটা পুকুর। মাটির রাস্তাটা পুকুরের পাড় ঘেসে চলে গেছে। মাটির রাস্তার ডান দিকে একটা গোবরগন্ধী গোয়াল দেখা যাবে। গোয়ালের লাগোয়া বেড়ার তৈরী একটা ঝুপড়ি ঘর। ঝুপড়ির চালে লাউয়ে সবুজ লতা ছেয়ে আছে, পাশে কয়েকটা কলা গাছ।
সেই গোয়াল, কলাগাছ আর ঝুপড়ির অস্থায়ী মালিক ছৈয়দ্দা এবং স্থায়ী মালিক সরকার। এটি রাস্তার জন্য অধিগ্রহন করা জায়গা। যদ্দিন রাস্তা হচ্ছে না তদ্দিন ছৈয়দ্দা দখলসুত্রে বসবাস করবে। পেশায় ছৈয়দ্দা একজন চাষা। এলাকায় জমি বর্গা নিয়ে চাষবাস করার জন্য সুদুর বাঁশখালী থেকে এখানে এসে ঢেরা বেঁধেছে।
গালিগালাজ শুনতে যতই খারাপ লাগুক আমাদের স্বীকার করতেই হয় যে গালিবর্ষনে সে কড়া সাম্যবাদী। গালিগালাজে তার কোন শ্রেনীভেদ নাই। প্রতিবেশী নুরুল আবসার সাহেবকে যে ভাষায় গালি দেবে, তার গোয়ালের অলস বলদকেও সে ভাষায়, আবার নিজের ছেলেকেও একই ভাষায় গালি। তার এই সাম্যবাদ নীতি প্রশংসার দাবীদার হতে পারে কিনা জানি না, কিন্তু আমাদের জন্য ছিল আতংকের।
আমাদের কানে সবচেয়ে বেশী পীড়া দিতো যখন গালিটা আবসার সাহেবের উদ্দেশ্যে বর্ষিত হতো। আবসার সাহেব সমাজে আমাদের শ্রেনীর লোক হওয়াতে ভয় ছিল - না জানি আমরাও কোনদিন ছৈয়দ্দার গালির লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ি। তার গালির প্রতিবাদ করার মতো দুঃসাহস পাড়ার কারো ছিল না। পুলিশে কেস করারও কোন আইন নাই।
যেই প্রতিবাদ করবে ছৈয়দ্দা তার মায়ের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে মুহূর্তও দ্বিধা করবে না এবং সেই আওয়াজ অন্তত আধমাইল দুরে গিয়ে পৌঁছাবে। এরকম নিরুপদ্রপ গালিবর্ষনের সুযোগ থাকার ফলে ছৈয়দ্দার গালিঝড় সূর্যোদয়ের মতো প্রতিদিনের অপরিহার্য অংশ হয়ে থাকে।
কিছুদিন পর খেয়াল করলাম ভদ্রলোকদের মধ্যে আবসার সাহেবই সবচেয়ে বেশী গালি খায়। আর কেউ ততটা না। ব্যাপার কি? একদিন কৌতুহলী হয়ে ছৈয়দ্দার সাথে খাতিরা আলাপ জমালাম। আকড়া মাকড়া অনেক আলাপ হলো গরু-গাধা-চাষবাস বিষয়ে। এক সময়ে আবসার সাহেবের সম্পর্কে তার মতামত চাইলাম। ছৈয়দ্দা যা বললো তার ভদ্র ভাষার সারমর্ম হলো-
আবসার সাহেব লোক খারাপ না। ভদ্রলোক একটা নামকরা প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। নিজের গাড়ী বাড়ী সামাজিক অবস্থান সবই আছে। তবে মানুষটা "লোয়া-কিপটা"(লৌহ কঠিন কঞ্জুস)। ছৈয়দ্দার সাম্প্রতিক মেজাজ খারাপ করার কারণ ঘটেছে আবসার সাহেবের ভাড়াটে বাড়ীটা।
আবসার সাহেবের দুটো বাড়ী। একটা বাড়ীতে নিজে থাকেন, আরেকটা বাড়ী ভাড়ায় দিয়েছেন। বাড়ী ভাড়া দেন ঠিকই কিন্তু টু-লেট সাইনবোর্ড লাগাতে রাজী না তিনি। এই সাইনবোর্ড বানাতে কয়টাকা খরচ হয়। কিন্তু আবসার সাহেবের কথা হলো, খামাকা পয়সা নষ্ট করে লাভ কি। তিনি বাড়ীর বাইরের দেয়ালে একটা ভাঙা ইট দিয়ে মোটা মোটা করে টেনে টেনে লিখে দিলেন -TO-LET.
ওটা লেখার পর থেকে ছৈয়দ্দার মেজাজ গরম।
জিজ্ঞেস করলাম টু-লেট সাইনবোর্ড না দেয়াতে তোমার সমস্যা কোথায়? বাড়ী হলো আবসার সাহেবের। তার যেরকম খুশী সেরকম পদ্ধতিতে ভাড়াটিয়া যোগাড় করুক।
ছৈয়দ্দা বলে, "আরে বদ্দা, তুঁই কি বুঝিবা, আঁরা বাশখাইল্যা মানুষ, হইলজা বড় দইজ্জার লান। ইতে কনজুইসর বাইচ্চা আঁরার জাতর বেইজ্জতি গইজ্জি। মাইনসে ইডা মার্কা লেখা দেখি আঁরে হয়দে- অডা বাইনচোত, তোরা বাঁশখাইল্লা হাইচ্ছোত ইডা মারি হোচ্চত।"
(মানে তুমি বুঝবা না, আমরা বাশখালীর মানুষ বড় ইজ্জতের মানুষ, কিন্তু এই ইট দিয়ে লেখা টু-লেট দেখে রাস্তার লোক বাঁশখালীর লোকের কিপটামির বদনাম করে যাচ্ছে, যা আমাকে হরদম শুনতে হচ্ছে প্রতিবেশী হওয়ার কারণে। আবসার সাহেব বাঁশখালীর লোক)।
এইটুকু শোনার পর আলাপ আর এগোয় না। ইজ্জত নিয়েই যখন ফ্যাসাদ, তখন ছৈয়দ্দার সাথে তর্ক করে নিজের ইজ্জতকে রিস্কে ফেলে দেবার চেয়ে তাকে ফ্লোর ছেড়ে দিয়ে বাসায় চলে যাওয়াই উত্তম। তাই করলাম।
Monday, July 12, 2010
অনাঘ্রাত দীর্ঘশ্বাস
এইসব প্রেম কি মিথ্যা ঘটনা? রটনার বাইরেও গোপনে গোপনে প্রেম চরে বেড়ায় আকাশে বাতাসে। আমাদের কতদিন কথা হয় না জানো তুমি চাঁদ?। হয়না দেখা কতোটা কাল!
আমি বাতাসের কাছে প্রান খুলে দেই....হাওয়ার শীতল পরশে ভেতরে লুকোনো ব্যাথা বুদবুদ হয়ে উড়ে চলে যায়। ঘুমঘরের চর্চিত মাটি ছুঁয়ে ফিরে আসে তার দীর্ঘশ্বাস।
হে পুত পবিত্র প্রেম হে মমতার ছায়া, হে বিরূপতার কায়া, আমাকে ক্ষমা করো। আমি তোমাদের ভুলে গেছি। আমি কখনো নতজানু হইনি পাপের কাছে তবু আমি মাটির গর্ভে হারিয়ে গিয়েছি চিরতরে। আমি কখনো এখানে ছিলাম তার কোন চিহ্ন রাখেনি কেউ, আমার পুত্র প্রপৌত্রেরাও আমাকে মনে রাখেনি। আমি হারিয়ে গিয়েছি চিরতরে।
দেবদারুর চিরল কান্ডটা যেদিন আকাশের দিকে মাথা ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল, আমি সেদিন মগ্ন ছিলাম দীঘির জলে কম্পমান পদ্মপাতার অতলে। অতি নিকটে দাড়িয়ে থেকেও আমাকে দেখেনি সে, উপেক্ষা করে চলে গেছে অনায়াসে।
আমাকে কোন কালে চিনতো বলে কোথাও লিখে রাখেনি তবু আমি জানি সে আমারে কতো বেশী জানতো, কতোটা ভীষণ বাসতো আর শ্রদ্ধায় হতো কতো অবনত।
আমি এইসব কিছু কথা মনে রাখি তবু কেউ জানে না আমি কোথায়, আমিও জানি না অকস্মাৎ আমি কোথায় চলে এলাম এই অন্ধকারে। আমি কেবল আলোকিত আকাশ দেখি আর দীর্ঘশ্বাস গুনি জীবিত মানবের।
যারা এখনো জানে না তাদের কেউ কেউ আসছে আমার কাছে। আমি অপেক্ষায় রই, অনন্তকাল, আমার কোন হতাশা নেই, আমার কোন আক্ষেপ নেই, আমার কোন প্রেম অবশিষ্ট নেই। আমি চুড়ান্ত ধ্বংসের প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে।
আমি বাতাসের কাছে প্রান খুলে দেই....হাওয়ার শীতল পরশে ভেতরে লুকোনো ব্যাথা বুদবুদ হয়ে উড়ে চলে যায়। ঘুমঘরের চর্চিত মাটি ছুঁয়ে ফিরে আসে তার দীর্ঘশ্বাস।
হে পুত পবিত্র প্রেম হে মমতার ছায়া, হে বিরূপতার কায়া, আমাকে ক্ষমা করো। আমি তোমাদের ভুলে গেছি। আমি কখনো নতজানু হইনি পাপের কাছে তবু আমি মাটির গর্ভে হারিয়ে গিয়েছি চিরতরে। আমি কখনো এখানে ছিলাম তার কোন চিহ্ন রাখেনি কেউ, আমার পুত্র প্রপৌত্রেরাও আমাকে মনে রাখেনি। আমি হারিয়ে গিয়েছি চিরতরে।
দেবদারুর চিরল কান্ডটা যেদিন আকাশের দিকে মাথা ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল, আমি সেদিন মগ্ন ছিলাম দীঘির জলে কম্পমান পদ্মপাতার অতলে। অতি নিকটে দাড়িয়ে থেকেও আমাকে দেখেনি সে, উপেক্ষা করে চলে গেছে অনায়াসে।
আমাকে কোন কালে চিনতো বলে কোথাও লিখে রাখেনি তবু আমি জানি সে আমারে কতো বেশী জানতো, কতোটা ভীষণ বাসতো আর শ্রদ্ধায় হতো কতো অবনত।
আমি এইসব কিছু কথা মনে রাখি তবু কেউ জানে না আমি কোথায়, আমিও জানি না অকস্মাৎ আমি কোথায় চলে এলাম এই অন্ধকারে। আমি কেবল আলোকিত আকাশ দেখি আর দীর্ঘশ্বাস গুনি জীবিত মানবের।
যারা এখনো জানে না তাদের কেউ কেউ আসছে আমার কাছে। আমি অপেক্ষায় রই, অনন্তকাল, আমার কোন হতাশা নেই, আমার কোন আক্ষেপ নেই, আমার কোন প্রেম অবশিষ্ট নেই। আমি চুড়ান্ত ধ্বংসের প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে।
পাগলরে তুই সাঁকো নাড়াইস নারে
চল চল চল/ ওরে তরুন দল/ তোদেরকে বোকা বানিয়ে/ যত্তসব আইবুড়োদের দল
ভয়ের কারন নাই। কবিতা লেখার অপচেষ্টা হচ্ছে না। আরেকটা টেকি গল্প। কম্পিউটারের ভুত স্মৃতি নিয়ে।
চাকরীতে ঢোকার সময় প্রথম মিথ্যাটা বলেছিলাম কম্পিউটার নিয়ে। অফিসে একখানা লেটেষ্ট কম্পিউটার কেনা হয়েছিল। ব্রান্ড Acer মডেল 486 সাথে আরো নানা ধরনের আপডেট জিনিস। নতুন ফিচার উইনডোজ ৩.১ এবং সবচেয়ে আশ্চর্য ঘটনা এটি সম্পূর্ণ রঙ্গিন। এত চোখা জিনিস দেখে আমার ২৮৬ পিসিতে করা ৭ দিনের কোর্সের জ্ঞান ভিরমি খেল।
ফলে অফিসে জয়েন করার পর বড় সাহেব যখন জিজ্ঞেস করলো কে কে কম্পিউটার জানে, আমি 'জীবনেও কম্পিউটার দেখি নাই' বলে সবার পেছনে লুকিয়ে থাকলাম। যে কয়েকজন কম্পিউটার জানে বলে হাত তুললো তাদেরকে লম্বা দিস্তা কাগজের শিট ধরিয়ে দেয়া হলো কাজ করার জন্য। আমি মনে মনে বললাম, “মরগে তোরা, আমি বাঁচলাম”।
কম্পুজ্ঞানী কলিগরা ভেবেছিল ‘কম্পু পারি’ বললে বস খাতির করবে, বেতন ভাতা বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু লম্বা কাগজের দিস্তা দেখে ‘জেনারেল’ এসির বাতাসেও ঘামতে থাকলো এবং রাত বারোটায়ও কাজ অসম্পূর্ণ রেখে বাড়ী ফিরতে লাগলো। আমি কম্পুজ্ঞান লুকিয়ে রাখছিলাম ঠিকই কিন্তু মাঝে মধ্যে উকি দিয়ে দেখি কিভাবে কি করে। খেয়াল করে দেখলাম ওই কম্পুজ্ঞানীরা টাইপ কাজে আমার চেয়ে পিছিয়ে এবং লোটাস জ্ঞান খুবই দুর্বল। দুর্বলকে সাহায্য করার নৈতিক মানসে একদিন দুপুরবেলা বললাম আমি একটু ‘ট্রাই করি’।
দেখা গেল আমার ‘ট্রাই’ ওদের চেয়ে দ্রুত হচ্ছে। বসের অগোচরে ওদের কাজে সাহায্য করার অনুরোধ পেলাম। কিন্তু একদিন কাজ শেষে পেছনে ফিরে দেখলাম বস খাড়া আমার পেছনে। ভয়ে আমার শিরদারা টনটন করতে লাগলো। কারণ বসের পরবর্তী সংলাপগুলো হুমকিমূলক।
-কি করো তুমি এখানে, কম্পিউটার জানো না, কিন্তু অন্যের কাজে বিঘ্ন ঘটাও কেন? গেম খেলতে বসেছো নাকি?
-গেম? তাওবা। কাজের জায়গায় গেম খেলবো কেন? কিসের গেম?
-ন্যাকামি করো? ভাজা মাছটিও উল্টে খেতে জানো না?
-সত্যি জানি না স্যার
-শাট আপ
-সরি স্যার
-তুমি ভালো করেই জানো লেটেষ্ট কম্পিউটারে সব ধরনের গেম লোড করা থাকে। কিন্তু খবরদার ভুলেও ওসব কখনো খেলবে না। এটা কাজের জায়গা। খেলাধুলার মাঠ নয়।
-কিন্তু কোথায় সেগুলা? আমি নিজেও খেলাধুলা পছন্দ করিনা কাজের সময়। খালি একবার দেখিয়ে দেন। জীবনেও যাবো না ওদিকে।
-আচ্ছা দেখাচ্ছি। বাট বি কেয়ারফুল। ডোন্ট এভার ওপেন দোজ গেমস!
তারপর বস একটা কমান্ড দিলে উইন্ডোজ ৩.১ খুললো। তারপর আরেকটা ক্লিক করলো। তারপর আরেকটা মেনু এলো। তারপর দেখা গেল নানা রকম তাস খেলা, মাইন সুইপার, আরো কি কি। সবাই মনযোগ দিয়ে দেখলাম। নোট করে নিলাম।
বস বললো, মনে থাকবে তো?
আমরা বললাম, ইয়েস স্যার। আলবত থাকবে।
আসলেই মনে থেকেছিল কিভাবে গেম সেকশান খুলতে হয়। সেদিন সন্ধ্যা থেকে নিয়ম করে দুই ঘন্টা কম্পিউটারে পালাক্রমে তাস খেলা চলতে লাগলো। অফিসে এতদিন পর একটা আনন্দের জায়গা পাওয়া গেল। ভার্সিটি ছাড়ার পর তাস খেলার সুযোগ হয় নাই আর।
পাগল তুই সাঁকো নাড়িস না রে।
ভয়ের কারন নাই। কবিতা লেখার অপচেষ্টা হচ্ছে না। আরেকটা টেকি গল্প। কম্পিউটারের ভুত স্মৃতি নিয়ে।
চাকরীতে ঢোকার সময় প্রথম মিথ্যাটা বলেছিলাম কম্পিউটার নিয়ে। অফিসে একখানা লেটেষ্ট কম্পিউটার কেনা হয়েছিল। ব্রান্ড Acer মডেল 486 সাথে আরো নানা ধরনের আপডেট জিনিস। নতুন ফিচার উইনডোজ ৩.১ এবং সবচেয়ে আশ্চর্য ঘটনা এটি সম্পূর্ণ রঙ্গিন। এত চোখা জিনিস দেখে আমার ২৮৬ পিসিতে করা ৭ দিনের কোর্সের জ্ঞান ভিরমি খেল।
ফলে অফিসে জয়েন করার পর বড় সাহেব যখন জিজ্ঞেস করলো কে কে কম্পিউটার জানে, আমি 'জীবনেও কম্পিউটার দেখি নাই' বলে সবার পেছনে লুকিয়ে থাকলাম। যে কয়েকজন কম্পিউটার জানে বলে হাত তুললো তাদেরকে লম্বা দিস্তা কাগজের শিট ধরিয়ে দেয়া হলো কাজ করার জন্য। আমি মনে মনে বললাম, “মরগে তোরা, আমি বাঁচলাম”।
কম্পুজ্ঞানী কলিগরা ভেবেছিল ‘কম্পু পারি’ বললে বস খাতির করবে, বেতন ভাতা বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু লম্বা কাগজের দিস্তা দেখে ‘জেনারেল’ এসির বাতাসেও ঘামতে থাকলো এবং রাত বারোটায়ও কাজ অসম্পূর্ণ রেখে বাড়ী ফিরতে লাগলো। আমি কম্পুজ্ঞান লুকিয়ে রাখছিলাম ঠিকই কিন্তু মাঝে মধ্যে উকি দিয়ে দেখি কিভাবে কি করে। খেয়াল করে দেখলাম ওই কম্পুজ্ঞানীরা টাইপ কাজে আমার চেয়ে পিছিয়ে এবং লোটাস জ্ঞান খুবই দুর্বল। দুর্বলকে সাহায্য করার নৈতিক মানসে একদিন দুপুরবেলা বললাম আমি একটু ‘ট্রাই করি’।
দেখা গেল আমার ‘ট্রাই’ ওদের চেয়ে দ্রুত হচ্ছে। বসের অগোচরে ওদের কাজে সাহায্য করার অনুরোধ পেলাম। কিন্তু একদিন কাজ শেষে পেছনে ফিরে দেখলাম বস খাড়া আমার পেছনে। ভয়ে আমার শিরদারা টনটন করতে লাগলো। কারণ বসের পরবর্তী সংলাপগুলো হুমকিমূলক।
-কি করো তুমি এখানে, কম্পিউটার জানো না, কিন্তু অন্যের কাজে বিঘ্ন ঘটাও কেন? গেম খেলতে বসেছো নাকি?
-গেম? তাওবা। কাজের জায়গায় গেম খেলবো কেন? কিসের গেম?
-ন্যাকামি করো? ভাজা মাছটিও উল্টে খেতে জানো না?
-সত্যি জানি না স্যার
-শাট আপ
-সরি স্যার
-তুমি ভালো করেই জানো লেটেষ্ট কম্পিউটারে সব ধরনের গেম লোড করা থাকে। কিন্তু খবরদার ভুলেও ওসব কখনো খেলবে না। এটা কাজের জায়গা। খেলাধুলার মাঠ নয়।
-কিন্তু কোথায় সেগুলা? আমি নিজেও খেলাধুলা পছন্দ করিনা কাজের সময়। খালি একবার দেখিয়ে দেন। জীবনেও যাবো না ওদিকে।
-আচ্ছা দেখাচ্ছি। বাট বি কেয়ারফুল। ডোন্ট এভার ওপেন দোজ গেমস!
তারপর বস একটা কমান্ড দিলে উইন্ডোজ ৩.১ খুললো। তারপর আরেকটা ক্লিক করলো। তারপর আরেকটা মেনু এলো। তারপর দেখা গেল নানা রকম তাস খেলা, মাইন সুইপার, আরো কি কি। সবাই মনযোগ দিয়ে দেখলাম। নোট করে নিলাম।
বস বললো, মনে থাকবে তো?
আমরা বললাম, ইয়েস স্যার। আলবত থাকবে।
আসলেই মনে থেকেছিল কিভাবে গেম সেকশান খুলতে হয়। সেদিন সন্ধ্যা থেকে নিয়ম করে দুই ঘন্টা কম্পিউটারে পালাক্রমে তাস খেলা চলতে লাগলো। অফিসে এতদিন পর একটা আনন্দের জায়গা পাওয়া গেল। ভার্সিটি ছাড়ার পর তাস খেলার সুযোগ হয় নাই আর।
পাগল তুই সাঁকো নাড়িস না রে।
Subscribe to:
Posts (Atom)