Friday, March 1, 2024
গ্রহাধিপতির দর্শন
Monday, February 26, 2024
শরচ্চন্দ্র দাস বনাম থাংলিয়ানা
পরের পোস্ট ছিল বাদল সৈয়দের:
Haroon Rashid নীরবে বছরের পর বছর হারিয়ে যাওয়া দুর্লভ ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছেন। এমনকি এ কাজ করার জন্য নিয়মিত অবসরে যাওয়ার প্রায় পনের বছর আগে তিনি 'হাই প্রোফাইল' চাকুরি ছেড়ে দেন। সমসাময়িক কালে তাঁর মতো এত সিরিয়াস ইতিহাসভিত্তিক লেখক আমি খুব কম দেখেছি। এবার বইমেলায় তাঁর নিচের বইগুলো বের হয়েছে। প্রকাশ করেছে 'বাতিঘর' এবং কথাপ্রকাশ। অন্তত আমার কাছে এগুলো 'মাস্ট কালেকশন'।
প্রথম আলোতে শরচ্চন্দ্র দাসের বইটি সম্পর্কে বলা হয়েছিল:
"মেলায় বরাবরের মতোই এবারও মননশীল বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ লক্ষ করা করা গেছে। মেলায় আকবর আলি খান, আলতাফ পারভেজ, আলী রীয়াজ, মহিউদ্দিন আহমেদের বই খুঁজছেন পাঠকেরা। তাঁদের বাইরে আনিসুজ্জামান, বদরুদ্দীন উমরের মতো লেখদের বইয়ের নতুন নতুন সংস্করণেরও চাহিদা বাড়ছে।
Wednesday, February 21, 2024
মানুষের অভয়ারণ্য
কাছের দেশ হিসেবে সবার আগে ভারতের উদাহরণ দেই। পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে অনেকগুলো জাতির বসবাস। তাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। সরলভাবে চিন্তা করলে ভারতের ভেতরে স্বাধীনতা পাওয়া যোগ্য রাজ্যের সংখ্যা কয়টি? মোটা দাগে বলতে গেলে ভারতের ভেতরে কমপক্ষে দশটি ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র উপযোগী রাজ্য আছে। অনেক জায়গাতেই ভারতের মূলধারার সংস্কৃতি ধারণ করে না তেমন কিছু জাতিকেও জোর করে ভারতের ভেতরে বেঁধে রাখা হয়েছে। বেঁধে রাখা হয়েছে বলতে হচ্ছে কারণ সে রাজ্যগুলো নিজ থেকে ভারতের সাথে যুক্ত হয়নি। বৃটিশ শাসনের সময় থেকে তাদের জোর করে ভারতভুক্তি করা হয়েছে। যেমনভাবে সোভিয়েত আমলে মধ্য এশিয়ার অনেক রাজ্যকে সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে বন্দী করা হয়েছিল।
হিমালয় অধ্যুষিত এলাকার একটা জাতিও ভারতীয় নয়। বৃটিশদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সুত্রে মালিকানা না পেলে সেই রাজ্যগুলো কখনোই ভারতের অংশ হতো না। নেপাল ভূটান যে কারণে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, একই কারণে ভারতের ভেতরের সেই রাজ্যগুলোর অধিকার ছিল স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে বেঁচে থাকা। কিন্তু অসভ্য রাজনীতির কুটনৈতিক চালের কারণে তা হয়নি। অসভ্য রাজনীতি পৈত্রিক উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া সম্পদের মতো রাজ্যগুলোকে ভোগ দখল করছে। রাজ্যগুলোকে যদি জনমত যাচাই করা হয় তবে নিশ্চয়ই তারা স্বাধীন দেশ হিসেবে থাকতে চাইবে। কোন কোন রাজ্যে এসব নিয়ে অস্থিরতাও আছে। অরুনাচল থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত সমগ্র উত্তরাঞ্চলে একই চিত্রে। পূর্ব দিকে মনিপুর মেগালয় মিজোরাম নাগাল্যাণ্ডের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। ভারতের সঙ্গে এই রাজ্যগুলো নিতান্ত বাধ্য হয়ে যুক্ত আছে। দুশো বছর পর হয়তো এরা আলাদা রাষ্ট্র গঠন করতে সক্ষম হবে। দুশো বছর আগে পৃথিবীর যেসব জাতি পরাধীন ছিল, তাদের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। একইভাবে তিব্বত চীনের অংশ হতে পারে না। পারে না জিনজিয়াং নামের উইঘুরদের দেশটাও। চীনের ভেতরে লুকিয়ে আছে এরকম অন্ততঃ আরো ডজনখানেক আলাদা জাতি। সোভিয়েত রাশিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া রাষ্ট্রগুলো আজ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। স্বাধীন রাষ্ট্র হবার যোগ্যতা সম্পন্ন জাতির সংখ্যা নেহাত কম নয়। দেশে দেশে তাদের অস্তিত্ব ছড়িয়ে আছে। সবগুলো জাতি যদি যদি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতো পৃথিবীতে স্বাধীন দেশের সংখ্যা পাঁচশো ছাড়িয়ে যেতো।
জগতের শক্তিমানেরা পৃথিবীর একশোভাগ ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছে। এক ইঞ্চি মুক্ত জায়গা নেই কোথাও। সব মানুষকে কোন না কোন রাষ্ট্রে অধীনস্থ করা হয়েছে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। পৃথিবীতে এমন অনেক আদিবাসী আছে তারা জানেও না কে তাদেরকে শাসন করছে। হয়তো শাসন করছে এমন কেউ যাদের সাথে তাদের কোন যোগাযোগ নেই। হয়তো সেই জাতি উপজাতিগুলোর রাষ্ট্র, স্বাধীনতা, পতাকা, মানচিত্র এসবের কোন প্রয়োজন নেই। তবু সভ্যতার দোহাই দিয়ে তাদেরকে কোন না কোন রাষ্ট্র খোপে প্রবেশ করানো হয়েছে। মানুষ আধুনিক বলে বিবেচিত হবার পর থেকে এসব রাষ্ট্র সীমানার জন্ম। অথচ এসব সীমানার প্রশ্ন যখন ছিল না তখনও তাদের অস্তিত্ব ছিল। সীমান্ত থাকা না থাকায় তাদের কিছু এসে যায় না। মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণীর সীমান্ত নেই। আদিযুগে হাজার হাজার বছর ধরে মানবজাতি এসব ছাড়াই পৃথিবীতে বেঁচে ছিল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। এখন চাইলেই রাষ্ট্রবিহীন থাকতে পারবে না কোন জাতি। তাদেরকে কোন না কোন রাষ্ট্রের অধীনে থাকতেই হবে।
কিন্তু সব মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে কোন না কোন রাষ্ট্রের অধীনে থাকতে হবে কেন? আরো আশ্চর্য হলো এই প্রশ্নটা সাধারণভাবে আমাদের মনে জাগে না। আমরা মেনেই নিয়েছি মানুষের জীবনে এমন হওয়াই স্বাভাবিক। অথচ মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণী এই আইনের আওতায় নেই। একটা পিঁপড়া কিংবা কাক কিংবা কুকুর বেড়ালকে নাগরিকত্ব নিয়ে কোন বিড়ম্বনায় পড়তে হয় না। অথচ মানুষকে নিরন্তর এই যন্ত্রনা পোহাতে হয়।
পৃথিবীতে কিছু মুক্ত দেশ মুক্ত অঞ্চল থাকা দরকার ছিল। যেখানে কোন রাজা থাকবে না, রাজনীতি থাকবে না, পাসপোর্ট থাকবে না, মানচিত্র থাকবে না, পতাকা থাকবে না। শুধু মানুষ থাকবে। স্বাধীন মানুষ। যে মানুষেরা স্বাধীনভাবে তাদের আদিম জীবনযাত্রা বজায় রাখতে পারবে। যে মানুষকে জোর করে আধুনিক সভ্যতার দীক্ষা গ্রহন করতে হবে না। যে মানুষকে অন্যের বানানো স্বর্গে সুখী হবার ভাণ করতে হবে না। যে মানুষ নিজস্ব আলয়ে একটি স্বাধীন বন্য প্রাণীর জীবন যাপন করবে। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কোন দেশ কোথাও নেই। পৃথিবীতে আর কোন জঙ্গল, পর্বতমালা কিংবা দ্বীপ নেই যেখানে সভ্যতার কদর্য পদক্ষেপ পড়েনি।
আমার চোখে আধুনিক মানুষের বানানো সভ্যতার সংজ্ঞায় মানুষদের জন্য প্রকৃতির দেয়া স্বাধীনতা নিয়ে বসবাস করার স্বাধীন কোন অঞ্চল না থাকা বড় রকমের মানবাধিকার লংঘন। এই মানবাধিকার লংঘনের কথা কেউ বলে না। অথচ প্রকৃত স্বাধীনতা হলো প্রকৃতির সন্তান হিসেবে প্রাকৃতিক পরিবেশে বেঁচে থাকার অধিকার। পৃথিবীতে অন্য প্রাণীদের জন্য ছোটখাট অভয়ারণ্য থাকলেও মানুষের জন্য কোন অভয়ারণ্য নেই।
আধুনিক মানুষের রাষ্ট্রকেন্দ্রিক এই সভ্যতার যাত্রা শুরু মাত্র কয়েক হাজার বছর আগে। এটা হয়তো আর এক হাজার বছরও টিকবে না। টিকলে কী হবে কল্পনায় আসে না। তিনশো বছর আগে মানুষ প্রযুক্তির যে পর্যায়ে ছিল তাতে করে মানবজাতি আরো দশ হাজার বছর টিকতে পারতো। কিন্তু গত একশো বছরে মানুষ যেসব প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে তাতে স্বজাতিকে ধ্বংস করার মতো যথেষ্ট অস্ত্র মজুদ হয়ে গেছে, স্বজাতিকে চরম ঘেন্না করার নানান বিভক্তিও তৈরী হয়ে গেছে। এই মানসিকতার বহুধাবিভক্ত মানব জাতি আর এক হাজার বছর দূরে থাক দুশো বছর টিকবে কিনা তাতেও সন্দেহ আছে।
মাঝে মাঝে তাই মানুষের জন্য একটা অভয়ারণ্যের খুব প্রয়োজন অনুভব করি।
Tuesday, February 20, 2024
ধারাবাহিক গল্পচেষ্টাঃ হদিশ
হাটের প্রবেশ পথেই মুড়িমুড়কিওয়ালারা সারি বেঁধে বসে থাকে। বাঁশের কঞ্চি বাঁধা ঝাঁকার ওপর রাশি রাশি গুড়ের মোয়া। জিবে জল আসার কথা থাকলেও পকেটের ১ পয়সার সীমিত বাজেটের কথা ভেবে সামলে নিল মিরাজ। এক হালি মোয়া ২ পয়সা। তার কমে বেচে না। অগত্যা ১ পয়সার মুড়ি শার্টের কোঁচড়ে নিয়ে কচমচ করে চিবোতে চিবোতে হাটের ভেতর ঢুকে গেল ভিড় ঠেলে। প্রথমে গেল বড় বটগাছটার নীচে। ওখানে বানরের খেলা চলছে। ডুগাডুগ ডুগাডুগ বাজনার তালে তালে বানর খেলা দেখাচ্ছে। চারপাশে লোকজন ভিড় করে মজা দেখছে।
প্রতি হাটবারে একটা না একটা মজার খেলা সাজিয়ে বসে এই বটগাছের তলায়। বিকেলের সোনা রোদ বট গাছের মাথায় উঠে গেছে। হেমন্তের বিকেলে সূর্যের তাপ মরে যায় আছরের পর পর। হাটে তখন বেসুমার ভিড়। মিরাজ মুড়ি চিবাতে চিবাতে বানরের নাচ দেখতে দেখতে প্রায় ভুলেই যাচ্ছিল তাকে এক সের গরু গোশত আর দুই সের আলু কিনে নিয়ে যেতে বলেছে মা।
ঘরে মা আর ৫ বছর বয়সী ছোট ভাই আফসার বাদে আর কেউ নাই। বাপ চাচা সবাই রেঙ্গুন ব্যবসা চাকরী কাজকারবার করে। সবাই স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছিল পরিবারে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর অভাবও শুরু। এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে খোদা মালুম। মিরাজদের কয়েক ঘর বাদে সমস্ত গ্রামে অভাবের হাহাকার। কিন্তু এই হাটবাজারে এলে অভাবের চেহারা বোঝা যায় না। হৈ হৈ রৈ রৈ করে সবাই কেনাকাটা করছে, গুলতানি আড্ডাবাজি করছে চা খানায়।
হঠাৎ সামনের এক দোকানে শফি চাচাকে দেখে সে একটু আড়ালে সরে দাড়ালো। লোকটার টেরা চোখে কেমন একটা বদ মতলব। 'ভাইফুত হণ্ডে যদ্দে' বলে যখন তার হাত চেপে ধরে, তখন ন বছর বয়সী বুকটা তার ভয়ে কেঁপে ওঠে। ভয় কিসের সে বোঝে না, কিন্তু অস্বস্তিটা টের পায়। কিছু মানুষের কথার মধ্যেই কিরকম বিশ্রী একটা সুর থাকে, চাহনীর মধ্যে শকুনের ছায়া। ভয়টা হয়তো অমূলক, হয়তো অন্য কিছু, হয়তো দেশে ভরসা দেবার মতো বাপ চাচা কেউ নেই বলে কিনা।
তাদের গাঁয়ে মাত্র আট ঘর। এর মধ্যে পাঁচ ঘরের পুরুষই রেঙ্গুন। অল্প কজন বৌ-ঝি ছাড়া বয়স্ক লোক বলতে আছে, ছেনুর বাপ, আধুইল্যার বাপ আর এই শফি চাচা।
একটা রূপার আধুলি। চকচকে সুন্দর আধুলি। এই বয়সে অনেকে আধুলি হাতেও ধরেনি। সেই আধুলি নেই তো মাংস আলু কিছুই নেই। আধুলি নেই তো.......মায়ের কঠিন রাগী চেহারাটা মনে পড়লো। আজকে মা তাকে মেরেই ফেলবে।
বাবা টাকা পাঠায় না অনেকদিন। বার্মায় জোরেসোরে যুদ্ধ লাগার পর থেকে বাবার কোন খোঁজ খবরই নেই। বেঁচে আছে না মরে গেছে কেউ জানে না। শফি চাচা প্রায় প্রতিদিন উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে আফসোস করবে বুক চাপড়ে 'মরি গেইয়ুগুই, অ-বাজি রেঙ্গুনত বেয়াগগুন মরি গেইয়ুগুই'।
লোকটার আহাজারিতে শোকের চেয়ে উল্লাসের ভাগ যেন বেশী। সেই উল্লাসে কেমন একটা ভয় ডাক দেয়। এমনকি ছোট্ট আফসার পর্যন্ত ভাইয়ের পেছনে লুকিয়ে যায় আতংকে। মিরাজের মা গায়ের কাপড় ঠিক করে চট করে ভেতরের ঘরে চলে যায়। শফি চাচার তখন গ্লাস পানির তেষ্টা পায়।
'অ ভউজ, এক গলস ফানি হাবাইবা না?' মিরাজের মা একটা টিনের গ্লাসে পানি ঢেলে মিরাজের হাত দিয়ে পাঠায়।
===============
আধুলি হারিয়ে মিরাজ দিশেহারা। এই অভাবের সংসারে একটা আধুলি হারানো প্রায় আত্মহত্যার শামিল। মিরাজের তা বোঝার মতো বয়স হয়েছে। বাজার না নিয়ে খালি হাতে ফিরবে কি করে। এখানে চেনাজানা অনেকে আছে, কিন্তু একটা আধুলি দেবার মতো ক্ষমতাবান কেউ নেই। শফি চাচার হয়তো আছে, কিন্তু ওই লোকটা কি যেন মতলবে ঘোরে। তার কাছে গেলে সে হাত চেপে ধরবে আবারো। অসহ্য!
কান্না পেয়ে গেল তার। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, সে কি করবে এখন? ঘরে ফেরা যাবে না। চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাবে কোথাও। কোথায় যাবে সে। হঠাৎ করে হাট থেকে বেরিয়ে ছুটতে শুরু করলো সে। ছুটতে ছুটতে মাইলখানেক ছোটার পর মহাসড়কের কাছে এল। নীরব সুনসান। একটা কিছু গাড়ি নেই সমস্ত রাস্তায়। মাঝে মাঝে মিলিটারি ট্রাকগুলো ধুলো উড়িয়ে ছুটে যায়। শুনেছে ওরা দোহাজারী যায়। বিলাতী সৈন্য বোঝাই ট্রাক। ওরকম একটা ট্রাকে চড়ে কোথাও হারিয়ে যেতে পারতো যদি? সে বসে পড়লো রাস্তার পাশের জমির আলে। ছুটতে ছুটতে গায়ে ঘাম দিয়েছে। শার্ট ভিজে গেছে বুকের কাছে।
Monday, February 19, 2024
অনুবাদ বিষয়ক একটি জরুরী প্রশ্নের উত্তর
যারা আক্ষরিক অনুবাদ করতে গিয়ে সাহিত্যের বারোটা বাজিয়ে ফেলেন এবং অন্য ভাষা থেকে সরাসরি বাংলা ভাষায় শব্দ সাজিয়ে অনুবাদ করেন তাদের জন্য নীচের প্রশ্নোত্তরটি খুব জরুরী এবং শিক্ষণীয়। আজকের পত্রিকায় ছাপানো খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের সাক্ষাতকার থেকে এই প্রশ্নোত্তরটি তুলে রাখলাম।
আজকের পত্রিকা: ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে কোন সমস্যার মুখোমুখি হন? সমস্যাটা কী রকম?
খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে যে সমস্যাগুলো হয় তা মূলত ভাষাগত। ইংরেজি সিনট্যাক্স যেহেতু বাংলার মতো নয়, সে জন্য ইংরেজির অনেক দীর্ঘ বাক্য বাংলায় আনতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। সর্বনাম বা ‘প্রোনাউন’ ব্যবহার করে ইংরেজিতে বড় বড় বাক্য রচনা করা যায়, কিন্তু বাংলায় তা অনুবাদ করতে গেলে দীর্ঘ বাক্য ভেঙে দুটো কি তিনটি বাক্যে লিখতে হয়। এ ছাড়া রয়েছে বাংলায় ইংরেজি শব্দের প্রতিশব্দের অভাব। বাংলার তুলনায় ইংরেজি সমৃদ্ধতর। ইংরেজিতে একটি শব্দে যা বোঝানো সম্ভব, বহু ক্ষেত্রে বাংলায় তা ব্যাখ্যা করে বলতে হয়।
এ ছাড়া একটি ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন জনগোষ্ঠীর আচার-আচরণ, সংস্কার, বিশ্বাস-অবিশ্বাস ইত্যাদি বাংলা পাঠকের বোধগম্যতার কথা মাথায় রেখে অনুবাদ করতে হয়। লাখো ভাষার পাঠকের বোধগম্যতা নিশ্চিত করতে উৎস ভাষার সংস্কৃতির প্রতি সব সময় একনিষ্ঠ থাকা সম্ভব হয় না। যেকোনো ভাষার অনুবাদককে এই শ্যাম রাখি না কুল রাখির দ্বন্দ্ব মোকাবিলা করেই কাজ করতে হয়।
https://www.ajkerpatrika.com/318978/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A7%87-%E0%A6%AE%E0%A7%8C%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%B0%E0%A6%9A%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%9A%E0%A7%87%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%8B-%E0%A6%85%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6-%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%BF-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF?fbclid=IwAR0gxh3aI3t0x6kpEQVTg8p0Ez_Y1dB2jySzotz2pdpY7J3uXWswWuj2P88
Wednesday, February 14, 2024
'আছে' বনাম 'অধিকার'
‘আছে’- এই অনুভূতি খুব জরুরী। যাদের আছে তাদের জন্য যেমন, যাদের নেই তাদের জন্যও। যাদের যা আছে অনেক সময় তারা তা বুঝতে পারে না। অনুভব করে না। হারিয়ে যাবার পরেই মনে পড়ে, আমারও ছিল। যাদের এখন নেই, তাদেরও একসময় ছিল। যখন ছিল তখন অনুভব করেনি। চলে যাবার পর মনে পড়েছে, আমারও ছিল। কী ‘আছে’? তালিকার কোন সীমানা নেই। বস্তুগত এবং অবস্তুগত যে কোন ধরণের বিষয় হতে পারে। পরিবার, সম্পর্ক, জীবিকা, স্বচ্ছলতা, সম্পদ, সময়, সুবিধা, সুস্থতা, সৌন্দর্য যে কোন বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আছে - এই অনুভূতির অভাবে প্রচুর মানুষ নিজেকে বঞ্চিত মনে করে। যা নেই, তা নিয়েই হাহাকার করতে থাকে। যা আছে, সেটার কাছ থেকে প্রাপ্য সুখের অংশ বুঝে নিতে পারে না। পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ ‘আছে’ বিষয়ে সমান। ইলন মাস্ক থেকে কৃষক গণিমিয়া পর্যন্ত এই অনুভূতি নিয়ে একইরকম সুখ অনুভব করতে পারে। গনিমিয়া সাড়ে চার হাজার টাকায় একটা গরু বাছুর কিনে যতটা সুখী হয়েছে, ইলন মাস্ক বিলিয়ন ৪৪ বিলিয়ন ডলারে টুইটার কিনেও সেরকম সুখী হয়েছে। দুজনের অর্জনের অর্থমূল্য যোজন যোজন দূরত্ব থাকলেও অনুভূতির বিচারে দুজনের সুখ কারো চেয়ে কোন অংশে কম নয়। আমাদের দেহে সুখের অনুভূতি বিলিয়ে দেয় যে পদার্থ, সেটা চার হাজার টাকার লেনদেনে যে পরিমাণ নির্গত হয়, চল্লিশ বিলিয়ন ডলার পেয়ে গেলে সেটা একশো গুন বেশি নির্গত হবার কোন সুযোগ নেই। সুতরাং এখানে সম্পদের পার্থক্য যতই থাকুক, অনুভূতির পার্থক্য খুব বেশি হবে না। শুধু নিজেকে সেই অনুভূতির জন্য প্রস্তুত করতে জানতে হবে। অনেক কম থেকেও কখনো কখনো দেখা যাবে গনি মিয়া ইলন মাস্কের চেয়েও বেশি সুখী।
২. 'অধিকার' প্রয়োগের অধিকার
অধিকার থাকলেই সবসময় সেটা আদায় করতে হবে তেমন কোন কথা নেই। কড়ায় গণ্ডায় নিজের সব হিসেব বুঝে নেবার মধ্যে কোন মহত্ব নেই। অন্যের ক্ষতি করে নিজের ন্যায্য অধিকার বুঝে নেয়াটাও এক ধরণের অন্যায়। খুব প্রয়োজন না হলে নিজের সব অধিকার আদায় করা উচিত নয়। পৃথিবীতে প্রতিটি প্রাণী মূলত নিজের দেহটারই মালিক। নিজের দেহ ছাড়া অন্য কোন কিছুর ওপর অধিকার হলো বাড়তি পাওনা। বাড়তি পাওনা আদায় করতে গিয়ে মানুষ সারা পৃথিবীতে অশান্তির সৃষ্টি করে।
Monday, February 5, 2024
বন্ধুতার সংকোচন
বয়স হতে হতে মানুষের বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা কমতে থাকে। একসময় যারা ঘনিষ্ট ছিল তাদের সাথে দূরত্ব বাড়তে থাকে। আমার বন্ধুবান্ধবের পরিধি বেশ বড় হলেও নিয়মিত বন্ধুর সংখ্যা খুব সংকুচিত হয়ে গেছে। এই সংকোচনের প্রধান কারণ রুচির পার্থক্য। Common Interest বা সমান আগ্রহ বলতে যে জিনিসটা আছে সেটার খুব অভাব। অধিকাংশ বন্ধুবান্ধবের সাথে আমি আলাপ জমাতে পারি না এই পার্থক্যের কারণে। তাদের আগ্রহ টাকাপয়সা, ক্যারিয়ার, বৈষয়িক সম্পদ অথবা ধর্মকর্ম। অথচ আমার এই চারটি বিষয়ের একটিতেও আগ্রহ নেই। আমার আগ্রহ বইপত্র। বইপত্রে আগ্রহ আছে তেমন বন্ধু আমার খুব কম। লেখালেখিতেও আমার কোন বন্ধুবান্ধব নেই। যখন আড্ডায় বসি তখন আমার আলাপের বিষয় থাকে না। আমি চুপচাপ বসে থাকি বোরিং শ্রোতা হিসেবে। অতি ধার্মিক কিছু বন্ধুবান্ধব তো রীতিমত উৎপাতের মতো। তাদের্ উপস্থিতিই আমি সহ্য করতে পারি না। অথচ এরা একসময় কত আধুনিক প্রগতিশীল ছিল। কিন্তু এরা কেউ কেউ এমনসব অশিক্ষিত অযৌক্তিক কথাবার্তা বলে মনে হয় এরা মাত্র গ্রামের মক্তব থেকে উঠে এসেছে। উচ্চশিক্ষিত বন্ধুবান্ধবের এই অধঃপতন দেখে খারাপ লাগে। কিন্তু যে যার রুচি নিয়ে জীবন কাটাবে তাতে আমার আপত্তি করার কিছু নেই। আমি শুধু এড়িয়ে থাকি। ফলে আমার আড্ডা দেবার মতো লোকের মধ্যে বাস্তবের বন্ধু খুব কম। তবু এর মধ্যে একটা সৌভাগ্য যে দুজন ঘনিষ্ট বন্ধু এখনো মোল্লাগিরির পথে হাঁটেনি। তাদের সাথে এখনো আগের মতো সময় কাটাতে পারি। ওই দুজনের কারণে আমি এখনো নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা পাই। তাদের একজন ভার্সিটির বন্ধু, আরেকজন স্কুল বন্ধু। এই আকালে সেই দুই বন্ধুর কাছে অনেক কৃতজ্ঞতা।

