Friday, November 11, 2016

সালোক সংশ্লেষণ



উদ্ভিদের হৃদয় নেই, শুধু শিরা উপশিরায় বহমান প্রাণ। প্রতিটি উদ্ভিদের শিরা উপশিরার বৈশিষ্ঠ্য আলাদা, আকার, চেহারা, বর্ণ সব আলাদা। এটা আমরা সবাই জানি। ভূমি থেকে ৭০ ফুট উপরে কংক্রিট বান্ধব পরিবেশেও এই দুটো লতানো উদ্ভিদ তাদের পাতাগুলো হেমন্তের রোদে মেলে দিয়েছে, যেমন দিত খোলা হাওয়ায় মেতে থাকা শ্যামল মাটির উঠোন জুড়ে। হৃদয়হীন উদ্ভিদ কখনো সৌন্দর্য বিলাতে, আনন্দ ছড়াতে কার্পন্য করে না। যে কোন পরিবেশে এরা নিজেদের চরিত্র অক্ষুন্ন রাখে। বিরূপ অবস্থাতেও এরা অক্সিজেন আর কার্বন ডাই অক্সাইডের ভারসাম্য ঠিক রাখে। এদের হাতে বৈশ্বিক সকল সৌন্দর্য নিরাপদ, নিষ্কলুষ। এরাই তথাকথিত প্রকৃতি, এদের নিয়েই আমাদের পরিবেশ। এই এক গুচ্ছ সজীব পাতাতেও খুঁজে পাওয়া যায় নির্মল আনন্দ। অদ্য প্রভাতে চক্ষু মেলিয়া দেখা হয়ে গেল টুকরো সৌন্দর্যের প্রতিফলিত আলোটি।

তবে বিষয়টি আমার পক্ষে সৌন্দর্য উপভোগের হলেও উদ্ভিদের পক্ষে বেঁচে থাকার অতি জরুরী সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া, যা দিয়ে উদ্ভিদ সূর্যের আলোর সাহায্যে বেঁচে থাকার মতো খাবার তৈরী করে।
​

Thursday, November 10, 2016

এ ভাঙা সুখের মাঝে নয়ন জলে.....

অনেক বছর আগে কোথাও পড়েছিলাম Happiness is a journey, not a destination. কথাটা আমার খুব প্রিয়। আমার স্বাচ্ছন্দ্যময় অবসরে এই সুখ ভ্রমণের স্মৃতিগুলো নাড়াচাড়া করি। যখন বর্তমান নিয়ে অতিষ্ট থাকি, তিক্ততার আগুন এসে পুড়িয়ে মারে, তখন ওইসব ভ্রমণের কথা সুশীতল দখিনা হাওয়ার কাজ করে। এই জীবনে আর কিছু পাওয়া না হলেও ওই প্রাপ্তিগুলো চিরকালীন সম্পদ হয়ে থাকবে। মানুষ বুড়ো হলেও যৌবনের সোনালী স্মৃতিগুলো মিথ্যে বা অর্থহীন হয়ে যায়  না, তেমনি থাকবে ওই অর্জনগুলো। অক্ষর-শব্দ-বাক্যবিন্যাসে তৈরী হতে পারে বায়বীয় এক সুখ স্বর্গোদ্যান।

কোর্সেরার সৌজন্যে A Life of Happiness and Fulfillment কোর্সটি শুরুর পর একটি ব্যক্তিগত মূল্যায়ন পর্বে অংশগ্রহন করতে হলো। সুখ বিষয়ে নিজের মতো করে লিখতে বলা হলো। ফলাফল পর্বে দেখা গেল সুখ সংক্রান্ত মূল্যায়ন পর্বের একটিতে আমার রেটিং আশাতীত ভালো হলো। বলা হলো এই পর্বে আমি সর্বোচ্চ ২% এর দলে ঠাঁই পেয়েছি। এই কোর্সের গবেষণাকর্মের মধ্যে অন্যতম একটি পর্যবেক্ষণ হলো পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ অন্য বৈষয়িক বা বস্তুগত লাভের জন্য নিজের সুখকে বিসর্জন দেয়। এই অবস্থানের বিপরীতে আছে নাকি মাত্র ৬% মানুষ। সুতরাং আমার ২% দলে যুক্ত হতে পারাটা নিঃসন্দেহে সুখের বিষয়। তার মানে এই নয় যে আমি সর্ববিষয়ে সুখী। সাত পর্বের মাত্র একটিতে আমার রেটিং ভালো। বাকীগুলোতে আমার আরো অনেক উন্নতি করতে হবে।

তবে যে কারণে এই একটিতে ভালো রেটিং পাওয়া হলো তার মূল কারণটি আমার সাবেক ক্যারিয়ারের সমাপনীর সাথে গভীর সম্পর্কযুক্ত। যে কারণে আমার  দীর্ঘদিনের ক্যারিয়ার জীবনের সমাপনী টানতে হয়েছে তার সাথে সুখী হবার গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান যুক্ত আছে। পুরো লেখাটি নীচে বঙ্গানুবাদ করে দেয়া হলো।

শুরু থেকে বলি। আমি যেখানে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম সেটি সহজ কোন জায়গা ছিল না। খুব কঠিন অবস্থা থেকে, কঠোর পরিশ্রম এবং শ্রম ব্যয় করে আমি একটি মোটামুটি উচ্চ ধাপে পৌঁছে গিয়েছিলাম অল্পদিনের মধ্যেই। আমার একাডেমিক রেজাল্ট খুব বেশী সন্তোষজনক ছিল না বলে আমি ক্যারিয়ার বদলের দিকে যাইনি। তবে অন্যন্য বন্ধু কলিগ অনেকবার চাকরী বদল করলেও আমি না করার কারণটি যতটা না অক্ষমতা তার চেয়ে বেশী ছিল বিদ্যমান ক্যারিয়ারের অগ্রযাত্রা।

যে চেয়ারে বসে প্রথমদিন থেকে যাত্রা শুরু করি, সেই চেয়ারটি আমাকে কখনো বিপদে ফেলে দেয়নি। বরং সামনের দিকে এগিয়ে নিয়েছিল। চাকরী শুরুর মাত্র দেড় বছরের মাথাতেই বড় ধরণের প্রমোশন পেয়ে যাই, যা বর্তমানে দশ বছর চাকরী করেও পায়নি অন্য কলিগরা। সেই প্রমোশনের পেছনে কাজ করেছিল আমার শ্রম এবং নিষ্ঠা। আমি আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলাম কর্মক্ষেত্রে।

পাঁচ বছর পর আমি নিজেকে এমন জায়গায় আবিষ্কার করি যেখানে আমি প্রতিষ্ঠানের অপরিহার্য একটি অঙ্গ হয়ে পড়ি। আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়, আমি আরো উপরের দিকে যেতে থাকি। দশ বছরের মাথায় আমি আমার জন্য বরাদ্দ অবস্থানের সর্বোচ্চ চুড়ায় পৌঁছে যাই। যেখানে আমাকে আর কাজ করতে হয় না, শুধু সিদ্ধান্ত দিলেই হয়। আমি আমার টিমকে এমনভাবে গড়ে নিয়েছিলাম যেখানে সবাই নিজ নিজ কাজ করলে লক্ষ্য অর্জিত হয়ে যায়। অন্য সব টিম যেখানে ক্রমাগত বিশৃংখল অবস্থায় চিৎকার চেঁচামেচি করে কাজ করতো সেখানে আমার টিমটা ছিল সুসংহত, সংগঠিত অথচ শান্তিপূর্ণ। আমি এই শান্তিপূর্ণ অবস্থানের সুযোগে নিজের মতো কিছু কাজ ও পড়াশোনা করতে পারতাম।

আমি ছিলাম অফিসের সবচেয়ে সুখী মানুষ। এমনকি স্বচ্ছলতর আত্মীয় বন্ধুদের মধ্যেও আমার অবস্থান ছিল সবচেয়ে নিরুপদ্রপ এবং সন্তোষজনক। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এই অবস্থানে থেকে বাকী সময় পার করার। এই পর্যন্ত ঠিকঠাক চলছিল সবকিছু।

তারপর কোন এক সকালবেলার বিশেষ সভায় সর্বোচ্চ কতৃপক্ষ থেকে আমাকে নতুন একটি কাজের দায়িত্ব নেবার জন্য অনুরোধ করা হলো। আমি জানতাম ওই দায়িত্ব নিলে আমি আর্থিকভাবে অনেক লাভবান হবো এবং আমার ভবিষ্যত আরো আরো উজ্জ্বলতর হবে। সুযোগের দরোজা আমার জন্য উন্মুক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার কোন প্রতিদ্বন্দ্বীও ছিল না- হাত বাড়ালেই আকাশ। কিন্তু সমস্যা শুধু একটি।

এই কাজটি নিলে আমার বর্তমান নিরুপদ্রপ সুখী জীবনটা থাকবে না। নতুন দায়িত্বটি এমন একটা জায়গায় যেখানে সবসময় অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করে যে অস্থিতিশীলতা ওই দায়িত্বের একটি চরিত্রবিশেষ। এখন আমি সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে পরিবারকে সময় দেই। তখন আমি রাত দশটায়ও ফিরতে পারবো না। শুধু তাই না, আমাকে দিনরাত এমনকি ছুটির দিনেও অস্থির থাকতে হবে। শুধু ক্যারিয়ার বা টাকার জন্য ওটা সহ্য করতে গেলে আমার সুখী জীবনকে বিসর্জন দিতে হবে। আমি সেটা করতে প্রস্তুত ছিলাম না। আমি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলাম নতুন দায়িত্বটি। সমস্ত ক্যারিয়ারে এই প্রথম কোন কাজকে 'না' বললাম।

খুব স্বাভাবিকভাবেই আমার এতদিনকার উন্নতির সিঁড়িটা বন্ধ হতে শুরু করলো। এতকালের সুনজরের সার্চলাইটটি আমার উপর থেকে সরে গেলেও আমি গা করিনি। কেননা আমি নিজের কাজটি সুষ্ঠুভাবে করে যাচ্ছিলাম তৃপ্তির সাথে। আমার টিম আমার কাছে বিশ্বস্ত, ওরা আমার সকল নির্দেশ জান দিয়ে পালন করে। আমার কাজের কোন খুঁত বের করতে পারে না কেউ। তা না পারলেও অন্য একটি কাজ করে বসলো একদিন।

আমার মাথার উপর অযোগ্য লোক এনে বসিয়ে দিল। যার কাজ হলো বিনা কারণে আমার কাজে হস্তক্ষেপ করা এবং আমাকে মানসিকভাবে চাপে রাখা। যদি যোগ্য লোক হতো, আমার চেয়ে বেশী কাজ জানতো, আমার চেয়ে বেশী বুঝতো, তবু হয়তো কিছুটা মানতে পারতাম। কিন্তু এটা মানা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। তবু মাস গেলে মোটামুটি ভালো আকারের বেতন জমা হয় অ্যাকাউন্টে, সে কারণে খবরদারী সহ্য করে কিছুকাল চালাতে পেরেছি। কিছুদিন এমন চলার পরও আমাকে যখন কাবু করা গেল না, তখন নতুন পথ ধরলো। আমার চেয়ে অযোগ্য লোকদের প্রমোশন ও অন্যন্য সুবিধা দেয়া শুরু করলো। একবার, দুবার, কয়েকবার ঘটলো ব্যাপারটা। যে আমার এসিসট্যান্ট হবারও যোগ্যতা রাখে না সেরকম একজনকে অন্য একটা বিভাগের প্রধান করে দেয়া হলো। এটা পরোক্ষ অপমান প্রচেষ্টা। টাকার ব্যাপারে আমার কোন রা না থাকলেও সম্মানের ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল বরাবরই। বলা চলে ওটাই আমার মূল পুঁজি। এবারসহ্য করা গেল না।

আর বিলম্ব হলো না সিদ্ধান্ত নিতে। উপযুক্ত সময়ে পদত্যাগপত্র দাখিল করে নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করলাম। সুখের জন্য আমি ক্যারিয়ারের উন্নতি ও সমৃদ্ধিকে বিসর্জন দিলাম।

এই কোর্সের একটি উদাহরণ ছিল এরকম।

একটি রেস্তোঁরার বুফেতে সালাদ ও  চিকেন রাখা আছে। সালাদ পছন্দ করে কিন্তু চিকেন অপছন্দ করে তেমন মানুষদের ওখানে পাঠানো হলে দেখা গেল অধিকাংশ মানুষের প্লেটে সালাদের চেয়ে চিকেনের পরিমাণ বেশী এবং খাওয়া শেষে দেখা গেল অধিকাংশ প্লেটে চিকেন উচ্ছিষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এর মানে হলো সালাদ-পছন্দ মানুষও টাকার হিসেবটা মাথায় রেখে প্লেট ভর্তি করেছিল, কেননা চিকেনের দাম সালাদের চেয়ে বেশী। জরিপে দেখা গেছে টাকার জন্য সুখ বিসর্জন দেয়া মানুষের অংশ প্রায় ৯৪%।

নিজেকে প্রশ্ন করি - অধিকাংশ মানুষের বিপরীত এবং অনিশ্চিত পথে হেঁটে আমি কী সুখী?

হ্যাঁ, এখনো পর্যন্ত সুখীই। ত..বু....... প্রা..ণ.... কেন কাঁদে রে?
উত্তর তেমন কঠিন নয়। দুঃখ জাগানিয়া বাঁশীর সুরও সুখী মানুষের বিনোদন!

[ঈষৎ সংক্ষেপিত]
----------------------------------------------------

**শিরোনাম কৃতজ্ঞতা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সময় বিরূপতা এবং কবিতা মলম

স্বল্পায়ু জীবনে মানবসৃষ্ট দুর্যোগে কতখানি ক্ষত বয়ে বেড়াই, কতগুলো অমূল্য দিনকে হারিয়ে ফেলি অন্ধকারে, তার হিসেব না রেখে ভুলে যেতে পারলেই সবচেয়ে মঙ্গলময় হতো। কিন্তু সমস্যাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিতে চাইলেও লাল প্ল্যাকার্ড নিয়ে যখন চোখের সামনে দাঁড়ায় বিরূপ সময়, তখন উটপাখির মতো বালিতে মুখ গোঁজার সুযোগ না পেয়ে মানসিক আশ্রয়ের সন্ধানে কবিতায় মুখ গোঁজা যায়। কবিরা কঠিন কথাকে শব্দে সহনীয় করে যে নিঃশব্দ সুর তৈরী করে, সেই শব্দসুর এসে অযাচিত ক্ষতের প্রলম্বিত বেদনাগুলো অনায়াসে হালকা করে দেয়..........



কোমল বাতাস এলে ভাবি, কাছেই সমুদ্র! তুই তোর জরার হাতে কঠিন বাঁধন দিস। অর্থ হয়, আমার যা-কিছু আছে তার অন্ধকার নিয়ে নাইতে নামলে সমুদ্র স'রে যাবে শীতল স'রে যাবে মৃত্যু স'রে যাবে। তবে হয়তো মৃত্যু প্রসব করেছিস জীবনের ভুলে। অন্ধকার আছি, অন্ধকার থাকবো, বা অন্ধকার হবো।

আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে।
[জরাসন্ধ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়]

নির্বোধের আলস্যে কেবল ম্লান হাস্যে জানিয়েছি
মনোরম অস্তরাগে শুধু আমার গোধূলি-ভাষ্য
মূল্যবোধের আর যা কিছু সত্য তাই হতাশার
পরম, বিশ্বস্ত অনুগামী, প্ররোচক বুঝি স্বেচ্ছামরণের,

এইমতো জীবনের সাথে চলে কানামাছি খেলা
এবং আমাকে নিষ্কপর্দক, নিষ্ক্রিয়, নঞর্থক
ক'রে রাখে; পৃথিবীতে নিঃশব্দে ঘনায় কালবেলা!
আর আমি শুধু আঁধারে নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাটে রক্তাক্ত জবার মতো
বিপদ-সংকেত জ্বেলে একজোড়া মূল্যহীন চোখে
পড়ে আছি মাঝরাতে কম্পমান কম্পাসের মতো
                                    অনিদ্রায়।

[উত্তরাধিকার, শহীদ কাদরী]


অধঃপতনের ধুম সবদিকে , সভ্যতার সেয়ানা গুন্ডার মতো
মতবাদ; রাজনীতি, শিল্পকলা শ্বাস ফেলছে এদিকে ওদিকে,
শহরের সবদিকে সাজানো রয়েছে শুধু শাণিত  দুর্দিন,
বন্যা অবরোধ, আহত বাতাস !

আমি আর কার কাছে যাবো? কোনদিকে যাবো?
কোন শহরের দিকে যাবো আমি ? যৌবনের জ্বলন্ত শিরায় আজ
এই যে জ্বলছে চাঁদ জ্যোৎস্না, চাঁদ জ্যোৎস্না আর জ্যোৎস্নাফুল,
হৃদয়ের ভিতরে ব্যাকুল,
জ্বলছে এই যে স্বপ্ন, স্মৃতি, শব্দ অলঙ্কার
অভাবের মরীচিকা, এ শহর কার?

[দূরযাত্রা - আবুল হাসান]


Sunday, November 6, 2016

এসো নিজে পড়ি

হঠাৎ করে হাতে অঢেল সময় চলে আসলো। রীতিমত বড়লোক। এত সময় ধুয়ে পানি খাবো? কর্মসময় কমে যাবার প্রাক্কালে অলস সময়ের কানে কানে বলে গেল, বসে থাকিস না, কাজে লাগা, হাত পা মুখ চোখ কান, মাথা মগজ সব অচল হয়ে যাবে। জ্ঞান, আনন্দ আর বন্ধুতায় বয়সটয়স কোন ব্যাপার না।

তিন বছর পর সাহস করে edX এ ঢুকলাম। বেছে টেছে MIT এর একটা কোর্স পছন্দ করলাম। Supply Chain Analytics যেটা আমার অনলাইন কাজের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এই লাইনে অামার আত্মবিশ্বাস অনেক বেশী। চাইলে পিএইডি থিসিসও করে ফেলতে পারি অথবা কেউ পিএইডি করলে তার এডভাইজারও হতে পারি। এত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও প্রথম সপ্তাহের কোর্স ম্যাটেরিয়াল দেখে আক্কেল গুড়ুম। এখানকার অধিকাংশ পড়াশোনা হলো অংকের উপর ভর দেয়া। আমার SCM এর বাস্তব অভিজ্ঞতা আর থিউরির মধ্যে পার্থক্যের প্রধান অংশ হলো অংক। এই অংক, এই ফরমূলা আমার বহুল চেনা হলেও এই বয়সে আর এসব ধরতে ইচ্ছে করে না। তবু ওষুধের তেতো গেলার মতো গিলতে শুরু করেছি। কিন্তু সারাক্ষণ তেতোর উপর থাকলে মাথা নষ্ট হবার সম্ভাবনা।

তাই আবার একটু চোখ ঘুরিয়ে হালকার উপর সমাজবিজ্ঞানের একট কোর্স পছন্দ করলাম
Wellesley College এর। Global Inequality নামের এই কোর্সটা ইন্টারেস্টিং মনে হলো প্রথম লেকচারটা শুনেই। দুনিয়াজোড়া প্রচুর অনিয়ম, অবিচার জারি আছে কোন সন্দেহ নেই, তাই এই কোর্সটা দুনিয়ার হালচালের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। বিশেষ করে এখানে গার্মেন্টস সেক্টরের অনিয়ম অবিচারগুলো নিয়ে বেশ কিছু পর্ব আছে এবং দুটো ডকুমেন্টারী মুভি নিয়ে বেশ ভালো আলোচনা আছে কোর্সে China Blue এবং Made in LA নামে। এই দুটোই চীন এবং ল্যাটিন দেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনযাপনের উপর। আমার নিজের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের। তিন দিক মিলিয়ে এই কোর্সটা ভালো লাগতে শুরু করেছে। এটাও edX কোর্স।

সময় শূন্যতা মোটামুটি পূর্ণ করার পর ইচ্ছে হলো coursera থেকে একটু ঘুরে যাই। ওখানে আজকাল প্রায় সব কোর্সে পয়সা। আগের মতো অবস্থা নাই। দেখতে গিয়ে চোখ আটকে গেল অন্যরকম একটা কোর্সের দিকে। A Life of Happiness and Fulfillment. এই কোর্সটা Indian School of Business এর। বিজনেস স্কুল কেন  এমন কোর্স রেখেছে সেই কৌতুহল থেকে এনরোল করালাম একটু দেখে সটকে পড়বো ভেবে। কিন্তু এটার শুরুটা এমন চমকপ্রদ, ঢুকেই আটকে গেলাম চৌম্বকীয় লেকচারের টানে। এই কোর্সটার পরতে পরতে আনন্দের সম্ভার। অনেক ব্যস্ত নই বলে এটাকেও রেখে দিলাম। সবচেয়ে মজার কথা হলো এটা সবচেয়ে কম প্রায়োরিটি পাবার কথা থাকলেও, আমাকে বেশী টানতে শুরু করছে এই কোর্সটাই।

অলস সময় এবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসতে বাধ্য হলো। আগামী বছরের প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরী করার জন্য এখনই সঠিক প্রস্তুতিকাল।

Saturday, November 5, 2016

যাত্রাসঙ্গী

ডিসেম্বরের তীব্র শীত কুয়াশার চাদর ভেদ করে তূর্না নিশীথা ঢাকার পথে। যেতে যেতে মধ্যরাতে সহযাত্রীর কানে টেলিফোনের নারীকন্ঠ ভেসে আসে সুদূর নীহারিকা থেকে। কৌতুহলী কানে তবু অসাবধান শব্দেরা ছলকে পড়ে রেললাইনের পাথরকুচির মতো। সসংকোচ সহযাত্রীর অনিচ্ছুক অজুহাত, চশমার আড়ালে অবিশ্বাসের কুঁচকানো ভ্রু উপেক্ষিত হয়। অনন্ত শব্দের স্রোতস্বিনী পেরিয়ে ভেসে আসে -

সংকোচে জানাই আজ: একবার মুগ্ধ হতে চাই।
তাকিয়েছি দূর থেকে। এতদিন প্রকাশ্যে বলিনি।
এতদিন সাহস ছিল না কোনো ঝর্ণাজলে লুণ্ঠিত হবার -
আজ দেখি অবগাহনের কাল পেরিয়ে চলেছি দিনে দিনে …

জানি, পুরুষের কাছে দস্যুতাই প্রত্যাশা করেছো।
তোমাকে ফুলের দেশে নিয়ে যাবে ব'লে যে-প্রেমিক
ফেলে রেখে গেছে পথে, জানি, তার মিথ্যে বাগদান
হাড়ের মালার মতো এখনো জড়িয়ে রাখো চুলে।

আজ যদি বলি, সেই মালার কঙ্কালগ্রন্থি আমি
ছিন্ন করবার জন্য অধিকার চাইতে এসেছি? যদি বলি
আমি সে-পুরুষ, দ্যাখো, যার জন্য তুমি এতকাল
অক্ষত রেখেছো ওই রোমাঞ্চিত যমুনা তোমার?

শোনো, আমি রাত্রিচর। আমি এই সভ্যতার কাছে
এখনো গোপন ক'রে রেখেছি আমার দগ্ধ ডানা;
সমস্ত যৌবন ধ'রে ব্যধিঘোর কাটেনি আমার। আমি একা
দেখেছি ফুলের জন্ম মৃতের শয্যার পাশে বসে,
জন্মান্ধ মেয়েকে আমি জ্যোস্নার ধারণা দেব ব'লে
এখনো রাত্রির এই মরুভুমি জাগিয়ে রেখেছি।

দ্যাখো, সেই মরুরাত্রি চোখ থেকে চোখে আজ পাঠালো সংকেত -
যদি বুঝে থাকো তবে একবার মুগ্ধ করো বধির কবিকে;
সে যদি সংকোচ করে, তবে লোকসমক্ষে দাঁড়িয়ে
তাকে অন্ধ করো, তার দগ্ধ চোখে ঢেলে দাও অসমাপ্ত চুম্বন তোমার…
পৃথিবী দেখুক, এই তীব্র সূর্যের সামনে তুমি
সভ্য পথচারীদের আগুনে স্তম্ভিত ক'রে রেখে
উন্মাদ কবির সঙ্গে স্নান করছো প্রকাশ্য ঝর্ণায় ।
[স্নান - জয় গোস্বামী]

কবিতা শেষ হলেও প্রিয়ংবদা সংলাপ অব্যাহত থাকে। উপেক্ষিত প্রতিবেশী দূরযাত্রীর অলস চোখে ঘুম নামে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হৃদয়ে প্রশমিত থাকা বেদনার ভার নিয়ে। রাত্রির আকাশ ঢেকে থাকে অন্তহীন কুয়াশায়। মাঘ নিশীথের স্বপ্নের ঘোরে তখন ভিন্ন একটি স্মৃতি ডাক দিয়ে বলতে থাকে-

অতল, তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে
হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে


করো আনন্দ আয়োজন ক'রে পড়ো
লিপি চিত্রিত লিপি আঁকাবাঁকা পাহাড়ের সানুতলে
যে একা ঘুরছে, তাকে খুঁজে বার করো


করেছো, অতল; করেছিলে; প'ড়ে হাত থেকে লিপিখানি
ভেসে যাচ্ছিল–ভেসে তো যেতই, মনে না করিয়ে দিলে;
–'প'ড়ে রইল যে!' প'ড়েই থাকত–সে-লেখা তুলবে বলে


কবি ডুবে মরে, কবি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে।।

[হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে - জয় গোস্বামী]

রাত ফুরোবার আগে ফুরিয়ে যায় ভ্রমণ। গন্তব্যে নেমে এক কাপ গরম কফি হাতের তালু পুড়িয়ে সুগন্ধী সুবাসে দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি তাড়াতে থাকে, জনহীন প্ল্যাটফর্ম তখন নির্জন সৈকতের বালিতে ঝিনুকের আঁচড় কাটে। সহযাত্রীরা নিজের পথে চলে যাবার পর পথিক ভাবে, আমার কী এই অচেনা স্টেশানে নেমে পড়ার কথা? শংকা দূর করে একটি বাহন এসে পরিচিত মুখের হাতছানি দেয়। বাহনের উষ্ণ আসনে বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আরেকবার জয় গোস্বামীকে স্মরণ করে যাত্রাসঙ্গী হবার আনন্দে। দুহাজার নয় পেরুলো মাত্র কদিন আগে। 

Friday, November 4, 2016

সীমান্তরেখায় অপ্রকাশিত

পুলকের সুখ নয় সবকিছু
আছে আরো গভীর জীবন বিপুল বিশাল

সমুদ্র ধার করে না ঢেউ
ধার ধারে না সীমান্তের

আমি এবার নতুন জীবন চিনেছি
পিপীলিকা শৃংখল পিষ্ট করার নষ্ট আনন্দ

নিরানন্দ বিতরণে সিদ্ধহস্ত বিকৃত মানুষ

সুখ নেই বলে অসুখের চাষবাস করে যায় উন্মাদ



Wednesday, November 2, 2016

শব্দের অরণ্যে

একেকটি শব্দ, একেকটি অনুভূতির প্রকাশ। একটি অনুভূতিময় শব্দ কতটা দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে? একটি শব্দের যতকাল আয়ু, একশো কিংবা হাজার শব্দেরও ততদিন আয়ু। যদি অক্ষরগুলো মুছে না যায় তাহলে শব্দগুলো দিয়ে একেকটা বাগান তৈরী করা যায় কিংবা বনভূমি অথবা ন্যাশনাল পার্ক।

তা না করা গেলে, একটি দীঘিই বা মন্দ কী? সেই দীঘিতে শাপলা-শালুক কিংবা কলমিলতা অথবা উভয়ই ভেসে ভেসে মাছরাঙাদের ডেকে বলবে, এখানে শুধু গভীর জলের মাছ। মানুষ নেই, মানুষের ভয় নেই। মাছরাঙা আর ফড়িং তিরতির করে পাখা নেড়ে ভেসে থাকে জলের এক ফুট উপরে। প্রতিবিম্বিত আকাশ যেখানে মেঘের ছায়া নিয়ে অনেক গভীরে ঢুকে আছে। মাছের কথা ভুলে আকাশের নকশায় ডুবে থাকে একটি মাছরাঙা ও দুটো ফড়িং।

খুঁজে খুঁজতে অবশেষে শব্দগুলো পাওয়া গেছে। এবার বাগান তৈরীর কাজ। বাগান তৈরীর কথাটা যত সহজ, কাজটি ততটা নয়। ভীষণ ক্লান্তিকর একটি কাজ। কিন্তু শব্দগুলোর সাথে একাত্মতা থাকলে কোন ক্লান্তিই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না বেশিক্ষণ। স্নায়ুচাপ, বায়ুচাপ, উচ্চচাপ, নিন্মচাপ সকল চাপের প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাগানটি দাঁড়িয়ে যায়।

বাগানও তৈরী হয়ে গেল। এবার সেই বাগানে অনন্ত সময় কাটানোর পালা। অনন্ত সময়ের বয়স কতটুকু? বলোতো অনন্ত? অনন্ত বললো, সময় অন্তহীন কিন্তু বাগানের আনন্দ ফুরোবে কী আবারো? ফুরোবে কিনা জানার আগে দেখো কী আছে বাগানে? কী আছে? তার চেয়ে বলা সহজ- কী নেই?  বাগানে সাজানো ফুলের সারিবদ্ধ কুচকাওয়াজ বাদে আর সবই আছে। যা কিছু স্বতঃস্ফূর্ত, যা কিছু প্রকৃতি থেকে উৎসরিত, যা কিছু আকাশ থেকে নেমে আসা, তার সবই এখানে ছড়ানো, ছিটোনো। এমনকি ঝেঁপে আসা বৃষ্টিটুকুও আছে।

আর যা আছে সব পাখিদের, মেঘেদের, ফড়িংএর, দোয়েলের, শালিকের,  ঘাসফুল, বাঁশফুল, বুনোফুল, লতাপাতাঝোপ। আছে আকাশছোঁয়া বৃক্ষ! আকাশছোঁয়া মানে সত্যি আকাশ ছুঁয়ে থাকা বৃক্ষ। অবিশ্বাস্য, অসম্ভব দীর্ঘতম একেকটা বৃক্ষ, আকাশ মাটি দুটোর নাগাল পেয়ে বসে আছে। অবিশ্বাস্য বৃক্ষগুলোর জন্য বাগানটি হয়ে যায় একটি বনভূমি যার শুরু একটি জলাভূমিতে আর সমাপ্তি একটি প্রবহমান নদীতে। নদীটি আপনমনে বয়ে যায় বনভূমি চিরে। নদীতে একটি নৌকা, একজন মাঝি।

এক জীবনে এমন শব্দবনভূমির অধিকারী হওয়ার অনুভূতির তুলনা করার মতো বিষয় মানব জীবনে খুব বেশী থাকে না। জীবন এত ছোট বলে, আয়ু এত নগণ্য হলেও, ওই শব্দসুখের সীমা থেমে যায় না। আকাশ থেকে আকাশে ভেসে বেড়ায় অনন্তকাল, অদৃশ্য ছায়ায়।