Wednesday, March 12, 2014

ব্যাটারি গলির বাজার



বেসরকারী অফিসের কীবোর্ড পেষা কর্মচারী শরাফ উদ্দিন। যিনি মাসে সাড়ে বারো হাজার টাকা বেতন পেয়ে স্ত্রী আর দুই কন্যাকে নিয়ে ৪ হাজার টাকা দিয়ে দুই কক্ষের একটা অন্ধকার ঘুপচি ঘরে আপাতঃ সুখের সংসারে বাস করেন। যিনি  কৈশোরে বিজ্ঞানী হবার স্বপ্ন দেখতেন, তারুণ্যে পরিব্রাজক হবার স্বপ্ন দেখতেন, বয়স হবার পর সাহিত্যিক হবারও স্বপ্ন দেখেছিলেন নির্দয় সময় তার স্বপ্নগুলো এক এক করে ছেঁটে ফেলার আগ পর্যন্ত।

এখন 
তাঁর  নতুন কোন স্বপ্ন নেই, আকাংখা নেই, অভিযোগ নেই। অবশিষ্ট স্বপ্ন শুধু পরিবার নিয়ে তিনবেলা খেয়ে নাক ডেকে সাত ঘন্টার ঘুম নিয়ে বেঁচে থাকা। বলা চলে বেঁচে থাকাই একমাত্র স্বপ্ন তাঁর। ব্যাটারি গলির সস্তা বাজার সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে সাহায্য করে।

শরাফ উদ্দিন তাই একদিন যে কবিতাটি পত্রিকায় ছাপিয়ে অফিসময় তোলপাড় করে ফেললেন সেই কবিতাটির বিষয় প্রেম নয়, যুদ্ধ নয়, রাজনীতিও নয়, নেহায়েত অনুল্লেখ্য  ঝুপড়ি ঘরের মাছ তরিতরকারির মলিনতম এক বাজার।

কবিতাটি স্থানীয় দৈনিকের সাহিত্য পাতায় ছাপা হবার পর অফিসে তাঁর সম্মানের উর্ধ্বগতি দেখা দেয়। এই ছোট অফিসের সম্মান বৃদ্ধি করে দিয়েছে শরাফ উদ্দিনের কবিতা। তাই বড় কর্তার নির্দেশে পত্রিকায় ছাপা হওয়া কাটিং বাধাই করে ঝুলিয়ে দেয়া হয় শরাফউদ্দিনের পেছনের দেয়ালে।

এখনো প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পথে শরাফউদ্দিন এখনো গুটি গুটি পায়ে ব্যাটারি গলির বাজারে ঢোকেন। চোখ দিয়ে ছেঁকে ছেঁকে সস্তা মাছ বের করেন, গুনে গুনে দরদাম করেন, দরদামে পাঁচ টাকা জিতলে তা দিয়ে একটা পান আর একটা নেভি সিগ্রেট কিনেন। মাছ কাটার ফাঁকে ফাঁকে মুখভর্তি ধোঁয়া ছেড়ে অন্ধকার আকাশে জ্বলজ্বলে নক্ষত্র দেখেন এবং ভাবতে থাকেন ওরকম একটা নক্ষত্রের অতিক্ষুদ্র একটা অংশ দিয়ে তৈরী একটা গ্রহের
 বাসিন্দা তিনি। এত ক্ষুদ্র হবার জন্য তার কোন রকম ক্ষেদ নেই তার। চাওয়াপাওয়ার কোন হিসেব তখন বিব্রত করতে পারে না শরাফউদ্দিনকে।




Tuesday, March 11, 2014

৩+১ শেকলে আটকে থাকা প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলো

আমি নিয়মিত টিভি দেখি না। তবু জানি বাংলাদেশে এখন কমপক্ষে ২০ থেকে ৩০টি চ্যানেল রয়েছে। সংখ্যার বিচারে এতগুলো চ্যানেল প্রয়োজনের অতিরিক্ত। প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও একের পর এক নতুন চ্যানেল এসেছে। মাঝে মাঝে টিভির সামনে বসলে রিমোট নিয়ে চ্যানেল ঘুরাঘুরি করি। অধিকাংশ সময়ই দেখা যায় কোন চ্যানেলেই মন বসানো যাচ্ছে না। চ্যানেলগুলো ভয়ংকর রকমের কপিপেষ্ট। জমজ হয় দুইজনে, কিন্তু আমাদের টিভি চ্যানেলগুরো যেন বিশজনের জমজ।

আমি কোন জরিপ বা গবেষণা করিনি। একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে আমার মনে হয়েছে বিদ্যমান চ্যানেলগুলো মূলত তিন ধরনের অনুষ্ঠান তৈরী করে। নাটক, সংবাদ, টকশো। বড়ি খাড়া থোড়। এর বাইরে আর কিছু নেই। অন্ততঃ আমার চ্যানেল ঘুরন্তিসে আমি আর কিছুই পাইনি। টক শো দেখলে মনে হয় এই জিনিস কালকেও দেখেছি, এই মুখ ওই চ্যানেলেও দেখছি। খবর দেখলে মনে হয় এই খবর তো প্রতিদিনই দেখছি, সব চ্যানেলে একই খবর। নাটক দেখলে মনে হয় এরা গত এক যুগ ধরে একই রকম শহুরে প্রেম ভালোবাসা ফাষ্টফুড রেষ্টুরেন্টে, ড্রইংরুমে, বেডরুমে ঘুরপাক খাচ্ছে। 

তবে এই তিন ধরনের অনুষ্ঠানের বাইরে সারাক্ষণই টিভির পর্দা জুড়ে আর যা থাকে তা হলো বিজ্ঞাপন। টিভিতে বিজ্ঞাপনের দৌরাত্ম্য এত বেড়ে গেছে যে সময়ের যোগফল হিসেব করলে সমস্ত অনুষ্ঠানের যোগফলের সমান হবে প্রচারিত বিজ্ঞাপনের সময়। 

আমি বিরামহীন চ্যানেল ঘুরানোর সময় দেখেছি প্রতিটা চ্যানেলেই বিজ্ঞাপন, একই বিজ্ঞাপন একাধিক চ্যানেলে। হয়তো দশটা চ্যানেল পার হয়ে  একটার মধ্যে কোন একটা অনুষ্ঠান পেয়ে যাই। সেই অনুষ্ঠান হয় সংবাদ, নয়তো টকশো, অথবা নাটক। অর্থাৎ আমরা আটকে আছি ৩ যোগ ১ এর আগ্রাসনে। 

বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকার বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব যেমন নেই, তেমনি দর্শকাধিকার বলেও কিছুর অস্তিত্ব নেই।

একজন আমি টিভি না দেখলেও আমার কিছু আসে যায় না, টিভি চ্যানেলেরও কিছু যায় আসে না আমি না দেখলে। টিভি ছাড়া বিনোদনের, অবসর কাটাবার প্রচুর জিনিসপত্র আছে। আমি ছাড়া টিভি চ্যানেলের কোটি দর্শক আছে। 

কিন্তু অন্তত এক কোটি মানুষের কাছে  টিভিই এ্কমাত্র বিনোদন। এরা সবাই মাসে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করে(মাসিক ৩০০ টাকা ডিশ লাইন) টিভির বিনোদন খাতে। ওই টাকার সিংহভাগই জলে যাচ্ছে। টিভি চ্যানেলগুলো পয়সার বিনিময়ে বর্জ্য গেলাচ্ছে। আমি ওই মানুষগুলোর অধিকারের কথা বলতে এসেছি। পয়সা দিয়ে প্রতারিত হবার প্রতিবাদ করতে এই লেখাটা লিখছি।

টিভি চ্যানেল আর কি কি করতে পারে?

করার অনেক কিছুই আছে। অনেক অনেক কিছু। মগজ খরচ করলেই হয়। দর্শক জরিপ করলেই হয়। কঠিন কোন কাজ নয়।

আমি শুধু প্রধান কয়টি বলি। 

টিভিতে গান হতে পারে না? মাঝে মাঝে গানের কিছু অনুষ্ঠান দেখি। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানগুলো হয় ব্যাণ্ড বা আধুনিকে সীমাবদ্ধ। টার্গেট শহুরে তরুণদের অডিয়েন্স। অতি আধুনিকা উপস্থাপক/উপস্থাপিকা একটা টুলে বসেন, মুখোমুখি বসেন ঝাকানাকা কোন ব্যাণ্ড সঙ্গীত তারকা, চারপাশে ঘিরে থাকে বিশাল সব সঙ্গীত উপকরন, কখনো কখনো হালকা ধোঁয়াও ওড়ে পরিবেশকে রহস্যময় করে তুলতে। কথার ফাঁকে ফাঁকে গান চলে দুয়েকটা। তাও টক শো। নিরবিচ্ছিন্ন গানের কোন অনুষ্ঠান নেই। বাংলা গানের কত বৈচিত্র্য এই অনুষ্ঠানগুলো দেখে  বোঝার উপায় নেই। 

অথচ পশ্চিমবঙ্গে তারা মিউজিক নামে একটা চ্যানেল আছে। মাঝে মাঝে আমি গান শোনার জন্য ওই চ্যানেল খুজে বের করি। বিদেশী চ্যানেল বর্জন করতে গিয়েও ওই চ্যানেলটা বর্জন করতে পারি না। একমাত্র ভারতীয় চ্যানেল যা আমাকে টানতে পেরেছে। কেন পেরেছে? যে গানগুলো আমি বাংলাদেশের চ্যানেলে শুনতে চাই, সেগুলো ওখানেই পাই।

আর কি হতে পারে?

কবিতা? বাংলাদেশে এত কবি, বাংলা ভাষায় এত অসম্ভব সুন্দর কবিতা লেখা হয়েছে, সেগুলো আবৃত্তি করার মানুষ নেই দেশে? কবিতা শোনার মানুষ কি নেই বাংলাদেশে? আশি নব্বই দশকে কবিতার একটা জোয়ার ছিল, আবৃত্তির ক্যাসেটের একটা বিশাল বাজার হয়েছিল। এখন মনে হয় কবিতা উধাও বাজার থেকে? টক শোর জোয়ারে ভেসে গেছে কবিতারাও?

আর কিছু? হ্যাঁ এবার সবচেয়ে বেদনাদায়ক ব্যাপারটা বলি। টেলিভিশনের সবচেয়ে বড় দর্শক শ্রেণী হলো শিশু ও কিশোর। অথচ এদের জন্য কোন নিয়মিত অনুষ্ঠানই নেই চ্যানেলগুলোর। এসব শিশু কিশোরেরা বিদেশী চ্যানেলে কার্টুন দেখে দেখে মগজের বারোটা বাজাচ্ছে। অনুষ্ঠান থাকলেই শিশুরা কার্টুন দেখা বন্ধ করে দেবে তা না। তবু কার্টুনের বাইরেও শিশুদের নিয়ে আরো কাজকারবার করা যায় বিনোদন জগতে, এটা দেখাবার লোক কি নেই? এমনকি ওই কার্টুনগুলোকে বাংলায় ডাবিং করে দেখানোর ব্যবস্থা করা যায়।

আর কি কি হতে পারে তার জন্য খুব বেশী কষ্ট করতে না চাইলে ২০০০ সালের একুশে টিভির অনুষ্ঠান তালিকা খুঁজে বের করুন। তারপর দেখুন ওই একটা চ্যানেল যা দিয়েছিল আজকের বিশটা চ্যানেল মিলেও তার সমান হতে পারছে না। 
টাকার অভাব? নাকি মগজের। টাকার অভাব নেই জানি। কিন্তু মগজের অভাব না থাকলেও মগজ ব্যবহারের উদ্যোগ নেই। সেই উদ্যোগ থাকলে বর্তমান টিভি চ্যানেলগুলো দর্শক উপযোগী হয়ে উঠতে পারে। ভারতীয় বা বিদেশী চ্যানেলের খুদকুড়ো খেতে হবে না আমাদের।

 [খসড়া সংরক্ষণ]


দেশের নাম ভিনল্যাণ্ড

লীফ এরিকসনের নাম শোনে নাই পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ। শোনার কথাও না। দুষ্ট বংশের ছানাপোনাদের নাম ইতিহাসের পাতায় বেশীদিন থাকেও না। আমিও শুনিনি কয়েকদিন আগেও।


পড়ছিলাম কলম্বাস আর ভাস্কো-দা-গামার মতো বাঘা আবিষ্কারক(!)দের নিয়ে। এই ভদ্রলোকদ্বয়ের কাছে পশ্চিমা পৃথিবী কৃতজ্ঞ। তাদের কীর্তির ফলেই চারশো বছর ধরে বাকী পৃথিবীর উপর ঔপনিবেশিক ছড়ি চালাতে পেরেছিল ইউরোপ। পশ্চিমা ইতিহাস বইতে হীরের অক্ষরে তাদের লেখা ছাপা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তামা হয়ে যাওয়া সেই হীরক অক্ষরে চোখ বুলাতে বুলাতে একটু পেছন দিকে তাকাতে পেয়ে গেলাম মরচে ধরা অক্ষরে লেখা লীফ এরিকসনের নামটা।


পশ্চিমা ইতিহাস কলম্বাসের কথা বলে, ভাস্কোর কথা বলে, ভেসপুচির কথা বলে, কিন্তু লীফ এরিকসনের কথা বলে না। ইতিহাস বইয়ের চিপায় চুপায় লুকিয়ে থাকে লীফ এরিকসন। কারণ লীফ কোন রাজ প্রতিনিধি ছিল না। তার উপর তার বংশে আছে ব্যাপক কালিমা। তার বাপ দাদা দুজনেই খুনের ফেরারী আসামী। কি করেছিল লীফ? বলছি, তার আগে একটু তার বংশের কালিমার কথা সেরে নেই।


লীফের দাদা বাড়ি ছিল নরওয়েতে। তার দাদা থরভাল্ড ( Thorvaldr Ásvaldsson) নরওয়েতে খুনখারাবি করে পরিবার নিয়ে পালিয়ে এসে ডেরা বাঁধে আইসল্যাণ্ডে। সেখানে লীফের বাবা এরিকের (Erik Thorvaldsson(950-1003) জন্ম হয়। এরিক বড় হবার পর হকাডাল নামক স্থানে একটা খামার বানায়। কিছুকাল বাদে সেও বাপের মতো ঝামেলা পাকায় এক প্রতিবেশীর সাথে। এবার এরিককেও ভাগিয়ে দেয়া হয় হকাডাল থেকে। বউ বাচ্চা নিয়ে সে নতুন বাসা বাঁধে আইসল্যাণ্ডের ওক্সনিতে।


জনপ্রিয় ইতিহাস অনুসারে  এরিকই গ্রীনল্যাণ্ডের আবিষ্কারক। নামকরণও হয় তার হাতেই। নামকরণের ব্যাপারটা মজার। এরিক ভাবলো বরফঢাকা ওরকম একটা জায়গার নাম যদি ভেটপচা হয় লোকে ওখানে মোটেও যেতে চাইবে না।  তাই সে ঠিক করে সুন্দর একটা মনোলোভা নাম দিতে হবে। বিজ্ঞাপন প্রতারণার ইতিহাসে তার নামই প্রথম আসা উচিত মনে হয়।  দ্বীপটির নাম দেয়া হয় সবুজভূমি বা গ্রীনল্যাণ্ড। কানা ছেলের যথার্থ নাম পদ্মলোচন। এরপর লোকজন নিয়ে ওখানে কলোনী স্থাপন করে ফেলে। এই এরিকের ছেলেই হলো আমাদের আলোচ্য ব্যক্তি লীফ।


এরকম লোকের ছেলে আরো বাদর হলে কারো বলার কিছু থাকে না। তবে যুগে যুগে দুষ্ট লোকেরাও পৃথিবীর অনেক বড় বড় কাজ করেছে। বিশেষ করে সমুদ্র অভিযানের মতো কাজগুলো ভদ্রলোকের ছেলেদের পক্ষে সম্ভবই না। লাম্পট্য আর লুন্ঠনের অভ্যেস যে দেশের যত বেশী সেই দেশ তত বেশী আবিষ্কার করেছে।


সুতরাং একদিন লীফ দলবল নিয়ে আরো পূর্বদিকে অভিযান চালায় এবং ১০০০ খ্রিষ্টাব্দে একটা  নতুন ভুখণ্ড আবিষ্কার করে বসে আচমকা। সেই ভুখণ্ডের নাম হয় ভিনল্যাণ্ড। নাম শোনেননি ভিনল্যাণ্ডের? শোনার কথা না। কদিন আগে আমিও জানতাম না সেই ভিনল্যাণ্ডই আজকের আমেরিকা।


কিন্তু লীফ আদপে  দুষ্টু লোকের ছেলে বলে তার এটাকে 'আবিষ্কার' বলে মর্যাদা দেয়নি কেউ। বেশীদিন মনেও রাখেনি। পৃথিবীকে আরো পাঁচশো বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল আমেরিকা আবিষ্কারের জন্য। অপেক্ষা করতে হয়েছিল কলম্বাসকে বিখ্যাত হবার সুযোগ দিতে অথবা ইউরোপকে উপনিবেশ ব্যবসার জন্য যথেষ্ট পরিমান শক্তিশালী হতে।


কলম্বাস বা ভাস্কো দাগামাকে নিয়ে লেখার আগে লিফ এরিকসনকে নিয়ে এক পাতা লিখতে হলো তাই। লীফ এরিকসন দুষ্টু বংশের ছেলে হলেও সে সাম্রাজ্যবাদ বা উপনিবেশখোরের হাতিয়ার ছিল না। সে কারণেই লীফকে পছন্দ করে ফেললাম।


কিন্তু তবু কথা থাকে। আগেরও আগে আছে। শুরুও শুরু আছে। লীফই প্রথম নয়। আরেকটু খুঁড়তে পেয়ে গেলাম লীফের আগেই হেরজল্ফসন (Bjarni Herjólfsson) নামের এক নরওয়ের বণিক ঝড়ের কবলে পড়ে দূর থেকে নতুন এক ভূখণ্ডের ছায়া দেখেছিলেন গ্রীনল্যাণ্ডের পূর্বদিকে। সেই হিসেবে হেরজল্ফসনই প্রথম খালি চোখে আমেরিকা আবিষ্কারক।


শুধু তাই না আমাদের আলোচ্য লীফও একবার ঝড়ের কবলে পড়ে গ্রীনল্যাণ্ডের পূর্বদিকে নতুন ভূখণ্ডের কাছে জাহাজডুবিতে আটকে পড়া দুজন মানব সন্তানকে উদ্ধার করেছিল। সেই হিসেবে ওই দুজনই হতে পারে সভ্য জগতের পক্ষ থেকে আমেরিকায় পা রাখা প্রথম মানব। কে জানে, হয়তো তারও আগে আরো কেউ গিয়েছিল এদিক থেকে, যাদের নাম নেই ইতিহাসের পাতায়। নইলে সেই রেড ইণ্ডিয়ান আরাওয়াক সহ কয়েক কোটি আদিবাসি ওই মহাদেশে আসলো কোথা থেকে। তাদের কেউ প্রথম হয়েছে যাদের নাম আমাদের অজানা।


অতএব হে কলম্বাস, আপনাকে আমেরিকা আবিষ্কারের কৃতিত্ব থেকে খারিজ করে দেয়া যেতে পারে স্বচ্ছন্দে। আপনি ভূখণ্ড আবিষ্কার করেননি, আপনি নতুন উপনিবেশ আবিষ্কার করেছিলেন।

[পাঠানুভুতি]

Sunday, March 2, 2014

ভাস্কো-দা-গামাঃ হার্মাদ না অভিযাত্রী - ১

ইতিহাস বিষয়ে আমার পড়াশোনা কম বলে আজকাল খুব আগ্রহ বোধ করছি ইতিহাস পাঠে। বিশেষ করে প্রাচীন ইতিহাস। পুরোনো দিনের প্রতি আমার একটা নস্টালজিয়া কাজ করে। যে সময় আমি পৃথিবীতে আসিনি, সেই সময়কাল হলেও। একশো দুশো কিংবা পাঁচশো বছর পুরোনো দিন নিয়েও আমি এক ধরনের নস্টালজিয়ায় ভুগি। ওই সময়কালের পৃথিবী মানুষ ও প্রকৃতি আমাকে ভীষণভাবে টানে। আমি যে পৃথিবী দেখছি সেই পৃথিবীর তুলনায় কতটা পার্থক্য জানতে ইচ্ছে করে।

পুরোনো বই পেলে তাই আমি গোগ্রাসে গিলি। দমবন্ধ করা আবেগ নিয়ে পড়ি। তেমন একটা বই পেয়ে গেলাম সেদিন। যে বইয়ের অস্তিত্বই জানতাম না কোনদিন। বইটার নাম A Journal of the First Voyage of Vasco da Gama 1497-1499

বইটা 1898 সালে মূল পর্তুগীজ থেকে ইংরেজিতে সংকলিত করেছেন ইঙ্গ-জার্মান ভৌগলিক E G Ravenstein। মূল পর্তুগীজ জার্নাল কে লিখেছেন সেটা নিয়ে একটু সংশয় আছে। তবে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর বিশেষজ্ঞরা Joao De Sa (জাহাজের ক্লার্ক) অথবা  Alvero Velho (ভাস্কো দা গামার প্রিয় সৈনিক) এই দুজনের মধ্যে যে কোন একজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন। আমার কাছে আলভেরোকেই যৌক্তিক মনে হয় বর্ননার ধরন দেখে। তবে এই অভিযানটা বিপদসংকুল, পদে পদে রোমাঞ্চ আর শিহরণে ভরপুর। পড়তে পড়তে আমার খুব ইচ্ছে করছিল অনুবাদ করতে। ভাস্কো দা গামার ভারত অভিযানের উপর এত বিশদ বর্ননা আর কোথাও পাইনি আগে। তাও একদম প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে, যিনি ভাস্কো দা হার্মাদের সরাসরি সহযোগী। সমগ্র ভারত বর্ষের কাছে ইতিহাসের পাতায় পাতায় পর্তুগীজরা ঘৃণার সাথে স্মরিত হওয়ায়, ভিন্ন দৃষ্টিতে লেখা জার্নালটা পড়তে অদ্ভুত লাগছিল।

কিছু ভিন্ন রকমের তথ্য পাওয়া গেল যা আমার জানা পূর্ববর্তী তথ্যের সাথে মেলে না। আমি এতদিন জানতাম ভাস্কো দা গামা ভারতবর্ষের সমুদ্র পথ খোজার জন্য কেপ অব গুড হোপ ঘুরে মরিশাস থামেন, ওখান থেকে এক ভারতীয়কে ঘুষ দিয়ে জাহাজে তুলে তার মাধ্যমে ভারত এসে পৌঁছান। কিন্তু আসল তথ্য হলো গামা কেনিয়ার মেলিন্দা নামক অঞ্চলের রাজার সাথে খাতির করে তার মাধ্যমে এক খ্রিষ্টান নাবিক সংগ্রহ করে ভারতের পথে রওনা দেন। Cana নামক সেই নাবিক পথ দেখিয়ে ভারতের মাদ্রাজ উপকূলে পৌছে দেন গামাকে।

এখানে একটা ব্যাপার উল্লেখ করা দরকার। আদিকালে ইউরোপের সাথে এশিয়ার একটা বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের উপর দিয়ে। ক্রুসেডের পর তুর্কী সম্রাজ্যের উপর দিয়ে ইউরোপের খ্রিষ্টানদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শত শত বছর ধরে ভারতে যাবার বিকল্প একটা পথ খুঁজতে শুরু করে ইউরোপীয়ানরা। মধ্যপ্রাচ্যের রুট বন্ধ হয়ে সমুদ্রপথে অভিযান চালাতে শুরু করে ইউরোপের রাজন্যবর্গ। এক ভারত রুট খুঁজতে খুঁজতে ওরা বাকী পৃথিবী চষে ফেলে, ফলে নতুন নতুন মহাদেশ আবিষ্কার হয়ে যায়। পৃথিবীর বিশাল অংশ ইউরোপীয়ানদের পদানত হয়ে যায়। প্রথম বড় সাফল্য আসে কলম্বাসের হাতে, তারপর ভাস্কো দা গামা, তারপর ফার্ডিন্যাণ্ড ম্যাগিলান। সেই থেকে বিশ্বের সম্পদের সিংহভাগের মালিকানা সাদা চামড়ার দখলে যাওয়া শুরু। ভাস্কো দা গামার অভিযানের জার্নালটা ভুগোল পরিবর্তনের ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে থেকে যাবে। বইটার অর্ধেক শেষ করে লেখাটা শুরু করলাম। বাকীটা শেষ হলে অনুবাদের কাজে হাত দেবার ইচ্ছে।

আপাততঃ পাঠানুভুতিই লিখছি।


[চলবে]

Tuesday, February 25, 2014

এক্সিট প্ল্যান

মানুষের জীবনে বারবার এক্সিট প্ল্যান দরকার হয়। কতবারই যে কত জায়গা থেকে এক্সিট করতে হয় এক জীবনে। বারবার এক্সিট প্ল্যান করলেও মানুষ চুড়ান্ত এক্সিট প্ল্যানের ব্যাপারে অসহায় থাকে। ওই প্ল্যানে মানুষের কোন হাত নেই। একেক দেশের একেক সিস্টেম। কোন কোন দেশ আছে যেখানে প্রতিবার ঘর থেকে বের হবার জন্য এক্সিট প্ল্যান দরকার হয়। কারণ সে ফিরে নাও আসতে পারে। একবার বাইরে যাওয়া হয়তো চিরতরে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া। এমনও দেশ আছে। আমাদের দেশটাও আস্তে আস্তে সেরকম দেশে পরিণত হচ্ছে। এখানেও প্রতিদিন এক্সিট প্ল্যান দরকার হয়। প্রতিদিন ঘর থেকে বের হয়ে যাবার সময় ভালো করে প্রিয়মুখগুলো দেখে বের হই। মশারির ভেতর ঘুমন্ত দুই সন্তানের কপাল ছুঁয়ে আসি চোখ দিয়ে। হাত দিয়ে ধরলে যদি ঘুম ভেঙ্গে যায়। তখন বলবে, বাবা তোমার আজ চাকরীতে যাওয়া লাগবে না। আমার তখন কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না।

সুখের অসুখ হয় কখনো কখনো? হয় বোধহয়। জয় গোস্বামী পড়তে পড়তে মাথায় কয়েকটা শব্দ ঘুরপাক খাচ্ছিল সকাল থেকে। ছিল, নেই। মাত্র দুটি শব্দ না? মাত্র একটা কমার ব্যবধান। কিন্তু বাস্তবে কি এত ছোট্ট পার্থক্য? একজন মানুষের কিংবা একটা অস্তিত্বের থাকা না থাকার ব্যাপার মাত্র দুটি শব্দে বলে দেয়া যায়। যা নেই, তা একসময় হয়তো বলতো আছি আছি থাকবো থাকবো। কিন্তু সে টেরই পায় না কখন সে নেই হয়ে যায়।

কোথায় যেন বলেছিলেন জয় গোস্বামী-

আমার গুরুত্ব ছিল মেঘে
প্রাণচিহ্নময় জনপদে
আমার গুরুত্ব ছিল…
গা ভরা নতুন শস্য নিয়ে
রাস্তার দুপশ থেকে চেয়ে থাকা আদিগন্ত ক্ষেতে আর
মাঠে
আমার গুরুত্ব ছিল…
আজ
আমার গুরুত্ব শুধু রক্তস্নানরত
হাড়িকাঠে!


না শুধু এটা না। আরো আছে। এই যে কোমল রশ্মির অশ্রুপাতের বিকেল, সেই বিকেলের কথাও-

অপূর্ব বিকেল নামছে
রোদ্দুর নরম হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা মাঠে
রোদ্দুর, আমগাছের ফাঁক দিয়ে নেমেছে দাওয়ায়
শোকাহত বাড়িটিতে
শুধু এক কাক এসে বসে
ডাকতে সাহস হয় না তারও|
অনেক কান্নার পর পুত্রহারা মা বুঝি এক্ষুনি
ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন
যদি ঘুম ভেঙ্গে যায় তাঁর!


সমুদ্র নদী রোদ বৃষ্টি মেঘ মাখা অনেক কথাই তখন ধুলিচিহ্নিত হয়ে মুছে যাবে। এই তো হবার কথা, নয়? ছিল, কিন্তু নেই। এবার কিন্তু একটা কিন্তু বসে গেছে ঠেসে। কিন্তুকে তখন মোটেও চিন্তিত মনে হয় না। কারণ সে জানে, এ অনিবার্য শমন। বানানটা ভুল করলাম না তো আবার? 


Monday, February 24, 2014

দিনযাপনের অসমতল বর্ননা

তোমার যেখানে সাধ চলে যাও, আমি রয়ে যাবো এই বাংলার পারে। কথাটা আসল না। আসল কথা আমি বাধ্য হয়ে থাকছি। তুমি বাধ্য হয়ে চলে গেছো। আমি ভালো আছি বলে ভাণ করছি যাতে আমি দুঃখ পেলে তোমারও দুঃখী হতে না হয়। আমরা সবাই ভাণ করছি। ভালো থাকার ভাণ। সবকিছু নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার ভাণ।

ভাণ করে থাকাটা একটা নীরব মানসিক কষ্ট যা কেবল ভুক্তভোগীই জানে। ভাণ করে থাকা আমার তীব্র অপছন্দ হলেও মাঝে মাঝে পরিস্থিতি বাধ্য করে ভদ্রসমাজে ভাণ করতে। যেমন কোন জ্ঞানী সমাজে মূর্খদের ভাণ করতে হয় আমিও অনেক জানি। আমি তাই জ্ঞানী সমাজ এড়িয়ে থাকি। পারতপক্ষে তাদের সাথে মেলামেশা করি না। যদি কোন জ্ঞানী সমাজে আমাকে যেতেই হয় তখন গোমড়ামুখে চুপ করে বসে থাকি এবং জ্ঞানের আলোচনা শুনে মাথা ধরাই। চুপ করে প্রমাণ করি আমিও জ্ঞানী, কারণ আমি জানি জ্ঞানীলোক মাত্রেই ভরা কলসি, আর ভরা কলসি যে কম বাজবে সে জানা কথাই।

আবার জ্ঞানী সমাজে আমি যতটা নীরব, মূর্খ সমাজে ততটাই সরব। আমি তাই মূর্খদের সাথে আড্ডা দিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। মূর্খে মূর্খে মুখাকাকর। আমি সবচেয়ে সতর্ক থাকি বইয়ের দোকানে গেলে। আশি নব্বই দশকে কারেন্ট বুক সেন্টার ছিল চট্টগ্রামে বই কেনার সবচেয়ে ভালো জায়গা। এখানে দুনিয়ার জ্ঞানী আঁতেল লোকজন ভর্তি থাকতো তখন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে দেখতাম দোকানের টুলে বসে আড্ডা দিচ্ছে। আমি ভুলেও তাদের কোন আলোচনায়  ঢুকতাম না। চুপচাপ বই দেখতে থাকতাম আলোচনা উপেক্ষা করে।
আমি ওখানে সেবা প্রকাশনীর সস্তা বই কিংবা প্রাক স্বাধীনতা আমলের সস্তা পোকায় খাওয়া বই অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকতাম। আমি কখনোই নতুন বইয়ের দিকে তাকাতাম না। ভুলেও না। নতুন কোন বই আসলে সেটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে পয়সা লাগে না। কিন্তু আমার কাছে নতুন বই হাতে নেয়াটাও কেমন অসহ্য লাগতো। সদ্য প্রকাশিত বই না কেনার অভ্যেসটা এখনো রয়ে গেছে আমার। তখন দেখতাম না আর্থিক সমস্যার কারণে, এখন দেখি না দীর্ঘ অনভ্যস্ততার কারণে।


কারেন্ট বুকের মালিকের সাথে খাতির থাকার সুবাদে নতুন বই আসলে খোঁজ খবর পেয়ে যেতাম। সদাহাস্যময় শাহীন ভাইকে খুব পছন্দ করতাম। যখনই যেতাম আড্ডা দিতাম খানিক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই। এখন ওদিকের পথ ভুলে গেছি তেমন না। কিন্তু অনেকদিন ওদিকে যাওয়া হয় না। মাঝে মাঝে নিউমার্কেটের পাশ দিয়ে যাবার সময় খুঁজি দোকানটা আছে তো? তখন চোখে পড়ে আস্তে আস্তে কারেন্ট বুক সেন্টারকে গ্রাস করছে আশেপাশের জঞ্জাল। ফুটপাতের দোকানগুলো চারপাশ থেকে অন্ধকার করে ফেলে প্রবেশ পথটাকে। দোকানে ঢোকার মতো জায়গা রাখেনি হকারের দল। ভদ্রলোকের চলাচলের অযোগ্য হয়ে আছে দোকানের সামনের জায়গাটা।

আমার কষ্ট হতে থাকে একটা মননশীল বইয়ের দোকান এভাবে নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে দেখে। আগে যারা ওখানে ভিড় করতো তারা এখন নতুন জায়গায় চলে গেছে। চট্টগ্রামের সবচেয়ে বিশৃংখল জায়গায় পরিণত হওয়া জলসা চত্বর আর বইয়ের কেন্দ্র থাকতে পারেনি। আমার কারেন্ট বুক জীবন শেষ হয়ে গেছে ২০০৫ সালের আগেই।


কারেন্ট বুক সেন্টারের যুগ পার হবার পর আসলো বিশদ বাঙলার যুগ। বিশদ বাঙলার যুগে প্রবেশ করি ২০০৬ সালের দিকে। মেহেদীবাগে বই কেনার নতুন একটা স্বস্তিদায়ক জায়গা পেয়ে আমোদিত। নিজের ঘরের লাইব্রেরীর মতো ঘুরে ফিরে বই নির্বাচন করি। ইতিমধ্যে আমরাও বাসা বদলে চলে আসি কাছাকাছি এলাকায়। বাসার কাছে হওয়াতে হেঁটে হেঁটেও চলে যাই বিশদ বাঙলায়। শুধু বই নয় আরো অনেক কিছুই আছে বিশদ বাঙলায়। চট্টগ্রামে প্রথম এই দোকানেই বসে বসে বই পড়ার সুযোগ দেয়া হয়। কোন তাড়া না থাকলে, হাতে নগদ সময় থাকলে আমি বিশদ বাঙলায় ঢুকে পড়তাম। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় বইপত্র খুঁজে আরাম ছিল।

কয়েক বছর পর বিশদ বাঙলার জৌলুশও পড়তে শুরু করে। কেন জানি না। আগের মতো বইপত্র পাই না। বই দেখার সময় শীতল পরশ নেই। গরমে ঘামতে ঘামতে বই দেখতে অস্বস্তি হয়। পাশের চা খানায় আগের মতো নাস্তাপানি থাকে না। এটাও একদিন গল্প হয়ে যাবে?  সেটা মেনে নেয়া কষ্টকর হবে আমার জন্য। এই জায়গাটা আমার প্রিয় জায়গা ছিল।

বিশদ বাঙলার পর আমার যাতায়াত শুরু হয় বাতিঘরে। বাতিঘর চট্টগ্রামে বেশ কয়েক বছর ধরেই আছে। চেরাগী পাহাড়ের মোড়ে বাতিঘরকে কেন্দ্র করেই একটা সাহিত্য সাংস্কৃতিক আড্ডা বসে। চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক আড্ডাখানা বলতে গেলে শিল্পকলা আর চেরাগী পাহাড়কে বোঝায়। কিন্তু সেই চেরাগী পাহাড়ের আড্ডায় আমার থাকা হয়নি কখনো। বয়সে একটু এগিয়ে গিয়েছি অথবা ওখানে ছোট ভাইবোনেরা আড্ডা দেয় ইত্যাদি কারণে হয়তো। তাছাড়া চেরাগীর বাতিঘর খুবই ছোট্ট সাইজের। বই দেখার স্বস্তিদায়ক পরিবেশ ছিল না। তার চেয়ে পাশের নন্দনেই আমার ভালো লাগতো।

একদিন সেই বাতিঘর উঠে এলো প্রেসক্লাবের এক তলায়। বিশাল একতলার পুরোটা জায়গা জুড়ে বাতিঘর। অসাধারণ ডিজাইন আর শিল্পকলায় বাংলাদেশের বই সুপার স্টোর হয়ে গেল বাতিঘর। এখন বাতিঘরই চট্টগ্রামের সবচেয়ে ভালো আর স্বস্তিদায়ক দোকান। এটাকে দোকান না বলে বইয়ের যাদুঘর বললে বরং সঠিক মূল্যায়ন হয়। এখানে আসার পর থেকেই বাতিঘরে যাতায়াত শুরু হয় আমার। এখন আমি বাতিঘরেই নিয়মিত যাই। বই কিনে দেউলিয়া হবার জন্য এত উৎকৃষ্ট জায়গা বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই।
 
কিন্তু এই তিনটা জায়গাতেই আমার সবচেয়ে বড় সফলতা হলো এখানে আমি জ্ঞানীলোকের সঙ্গ আমি সযত্নে এড়িয়ে থাকতে পেরেছি। আমার জ্ঞানের ঝুড়ি আসলে এতটাই ফুটো যে বাকী জীবন পড়াশোনা করেও সেই ফুটো ভর্তি করা যাবে না। আলোচক হবার জন্য যতটা পড়া দরকার আমি তার খুব সামান্য অংশই পড়া হয়েছে আমার। আলোচনা  সভা সমিতি এসবের চেয়ে বই কেনা, বই পড়া অনেক বেশী দরকারী মনে হয়। আপাততঃ আমি সেই দরকারী কাজটিই করে যাচ্ছি।
কিছু ভাণ হোক। তবু ভালো আছি। এই তো আজ ভোরে জেগেও মনে হয়েছিল ভালোই আছি। আছি না? ফাগুনের এই নিদারুন মায়াবী শীতের আড়ারে নকশী কাঁথার ওমে ভালো থাকা নয়? লাভ লেইনের মোড়ে সেদিন দেখলাম পলাশ ফুটে আছে আইল্যাণ্ডে দাড়ানো মস্ত গাছটিতে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। ইঠ পাথরের শহরেও ফোটে সেই ফুল। মনে পড়লো মাত্র কিছুদিন আগেও পলাশ ফুল চিনতাম না। ওই গাছের পাশ দিয়ে এত বছর যাতায়াত করলেও মাত্র এই বছর নজর পড়লো ফুলের দিকে। কত কিছুই অজানা অদেখা রয়ে যায় এমনকি চিরচেনা শহরটিতেও।
গতকাল একদম হুট করে অফিস থেকে বেরিয়ে চলে গিয়েছিলাম লালদীঘির পাড়ে। প্রাচীন একটা লাইব্রেরী আছে। বহুবছর আগে গিয়েছিলাম। যে লাইব্রেরীতে ঢুকলে উনিশ শতকের গন্ধ পাই, এটা সেই লাইব্রেরী। এখনো যে বেঁচে আছে সেটা দেখেই আশ্চর্য হলাম। সাড়ে বারোটায় পৌঁছে ভেতরে ঢুকে বাধা পেলাম। বলা হলো, লাইব্রেরী খুলবে দুপুর ১ টায়। বন্ধ হবে বিকেল ছটায়।

বাহ। সিনেমা হল বারো ঘন্টা চলতে পারে কিন্তু লাইব্রেরীর অতদূর চলার সুযোগ নেই? পাঁচ ঘন্টায় যা নেবে নাও। ঢুকতে বারণ করলেও অবাধ্য হয়ে  ঢুকলাম। বললাম একটু দেখে চলে যাবো। মলিন করুন অতি নোংরা কক্ষগুলোয় মৃতপ্রায় বইগুলো কোন মতে আবছা অন্ধকারে দাড়িয়ে আছে ধুলোর আস্তর বুকে নিয়ে। কত বছর আগের বই? বিশ, পঞ্চাশ, আশি, একশো বছর? হ্যাঁ আশ্চর্য হলেও এই লাইব্রেরীতে শহরের সবচেয়ে প্রাচীন বইয়ের সংগ্রহশালা। বই এবং পত্রিকা সাময়িকীও। যে পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখতেন, যে পত্রিকায় বুদ্ধদেব বসু লিখতেন, যে পত্রিকায় জীবনানন্দ দাশ লিখতেন, সেই সব পত্রিকার সংগ্রহ ছিল। এখন অনেক কিছুই নেই। নিলাম ডেকে সব বিক্রি করে দেয়া হয়েছে হয়তো। শুধু মলিন নেমপ্লেটগুলো রাখা। সেখানে হাত দিয়ে পেলাম উর্দুভাষী পাকিস্তান আমলের কিছু পত্রিকা। আশ্চর্যজনকভাবে 
বাংলা সাহিত্যের সম্পদগুলো হারিয়ে গেলেও পাকিস্তানী তেলাপোকাগুলো টিকে গেছে, । আর দেখতে রুচি হলো না। বেরিয়ে এলাম লাইব্রেরী থেকে জাতির দুর্ভাগ্যকে গালি দিতে দিতে। 
রাস্তায় বেরিয়ে যেদিকে যাবার নয় সেদিকে হাঁটতে শুরু করলাম। এবারও।

Saturday, February 22, 2014

শিশুদের সাথে আনন্দ গ্রামে(ছবিব্লগ)

শহর থেকে খুব দূরে নয়। গাড়িতে খুব বেশী হলে এক ঘন্টা। কিন্তু যানজটের ভয়ংকর চাপ খেয়ে ফেললো আস্ত তিনটা ঘন্টা। আমরা ত্রিশ নাকি পয়ত্রিশ জন? গুনিনি। এক মিনিবাস আমরা সাথে শিশু পাঁচজন শুধু এটুকু নিশ্চিত।

যাত্রাপথের বিশ্রী যন্ত্রণায় ত্যক্ত বিরক্ত শিশুকূলের দিকে তাকিয়ে খারাপ লাগছিল। কেউ বমি করছে, কেউ করবে যে কোন সময়। কতদূর আর কতদূর।

অবশেষে গন্তব্যের দেখা মিললো। শান্তি। সবুজ শান্তিময় একটা গ্রাম। ধূ ধূ প্রান্তরে ফসল কাটা হয়ে গেছে  কবেই। মাঝে মাঝে শুধু শীতকালীন সবজি অবশিষ্ট। চমৎকার গ্রামটি দেখে মুহুর্তে পথের বিরক্তি উধাও।

গ্রামে নেমেই বদলে গেল শিশুরাও। ত্যক্ত বিরক্ত ঘর্মাক্ত চেহারায় হাসতে শুরু করলো আলো। কিছু খেয়ে না খেয়েই শুরু হলো গ্রামময় ছোটাছুটি, বন্যতা, মাঠে ঘাটে দাপাদাপি। স্বাধীনতার আনন্দ উচ্ছ্বাস।

অনেক কায়দা করে ক্যামেরা বিমুখ শিশুদের কয়েকটা ফ্রেমে আবদ্ধ করা গেছে। ধুলোবালি মেখে বিকেলের শেষ রোদ গায়ে চড়িয়ে আবারো গাড়িতে চড়া, আবারো শহুরে বন্দীশালায়।



স্থানঃ আনোয়ারা, চট্টগ্রাম
তারিখঃ ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৪

সময়ঃ সারাদিন


                                     আমিই তো বাবাকে বলে তোমাদের আনলাম এখানে


আমি এখানে সব চিনি, সব চিনি, তুমি আসো আমার সাথে

                                ব্যাটা এত চিনলো আমি চিনলাম না কেন? চাপা নাকি?
                                  ঐ শোন, এরপরই কিন্তু আমরা ছুট লাগাবো

                                    ওরা গেছে যাক, আমি এদিকে ছুট লাগাই

তাড়াতাড়ি করো, ছবি তুলে সময় নষ্ট করা যাবে না

                                                 আয় তবে সহচরী হাতে হাতে ধরি ধরি                                 

                                      আমি পায়ে ব্যথা পেয়েছি ওষুধ না দিয়ে তুমি ছবি তোলো??                   
             

আই নো হাউ টু মেক এ উইশ, কিন্তু বলবো না কি উইশ

আজ আমাদের ছুটি ও ভাই আজ আমাদের ছুটি





আমি ফারিস। ঢাকার উত্তরায় থাকি। তোমাদের সব্বাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ নিমন্ত্রণ রক্ষা করে আমাদের গ্রামে বেড়াতে আসার জন্য। এরপর তোমরা শহরে চলে যাবে, আমিও দুদিন বাদে ঢাকার জেলখানায়। তবে আবার আসবো আমি। তখন তোমরাও এসো, কেমন?