Monday, September 24, 2012
ভাববাচ্যে নিমজ্জিত তরণী-১
Thursday, September 20, 2012
অবসাদের গান
আমি অনেকদিন তোমাকে দেখি না, খুঁজি না। আমি আর অতীত খুঁড়ি না। খননকাজের ব্যথায় শয্যাশায়ী। ধরাশায়ী হতে না চাইলে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকাই ভালো। দূরত্ব তোমার স্বস্তি, দুরত্ব আমার স্বস্তি। দুরত্বে সমাজ নিরাপদ থাকে। আমি আর অতীত খুঁড়বো না। মঙ্গলবার্তার জীর্ন পাতা অমসৃন সততা নিয়ে এখনো স্থির। তুমি আছো তাই তোমাকে নতুন করে পেতে হয় না।
চায়ের কাপ হাতে ঝুলবারান্দায় পাতাবাহারের ঝোঁপ, সন্ধ্যার আকাশে নিভু নিভু পশ্চিমা নক্ষত্র, সুগন্ধী মরিচ পাতা, সবজীর সজীবত্ব, হেলান দিয়ে অজুহাত সন্ধানী খালি চায়ের কাপ, একটা গান শোনো, আগে কখনো শোনোনি, নিকটস্থ প্রার্থনালয় থেকে ভেসে আসা সুর, আকাশ জেমকালি মেখে নিঃসঙ্গ প্রতিক্ষায়, কোন কথা বাকী থাকে কিনা, তখনো কেউ জানে না, ঘরে ঘরে বাতি জ্বলে উঠে, দীর্ঘশ্বাস চায়ের কাপে পতিত হলে নীরবতা আর কোন কথা বলে না। এখন সব গল্পের অবসান ঘটেনি। এখানে গল্পেরও সূচনা হয়নি। তবু চায়ের কাপ হাতে ঝুল বারান্দায় অনর্থক লিকারের স্পর্শ পাই ঠোটে।
জ্বর সেরেছে অবসাদ ছাড়েনি। স্মৃতি এখনো ঘুর্নি পাকায় শুকনো পাতায়। পনের দিনের ক্লান্তি, পনের বছরের শান্তির ঘুম। এবার ঘুমাবো আমি। এবার পাতায় পাতায় শিরায় শিরায় অবসন্নতার ছুটি।
Saturday, September 1, 2012
কতো রবি জ্বলে, কেবা আঁখি মেলে
একবার খুব প্রিয় একটা জিনিস কেনা হলো। কেনার পর দিনরাত মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা। জেগে থাকার প্রায় সম্পূর্ন মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থাকা। কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলেই হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখা। নিজের জিনিসটা অন্যের চেয়ে কতো বেশী চমৎকার সেটা ভেবে মনে মনে পুলকিত হওয়া। কয়েকদিন যাবার পর জিনিসটার প্রতি অভ্যস্ত হওয়া। ঘনঘন ব্যবহার করার ছুতো খোজা। তৃতীয় পক্ষকে লুকিয়ে একটু বেশী আদর যত্ন করা। যেন হারিয়ে না যায় খুব সতর্ক থাকা। হারিয়ে যেতে পারে এমন জায়গায় নিয়ে না যাওয়া কিংবা তেমন জায়গা পরিহার করা। ঘরের বাইরে গেলে যতটা সম্ভব প্রকাশ্যে না আনা।
অতঃপর প্রাথমিক মুগ্ধতা কাটতে থাকবে আস্তে আস্তে। জিনিসটা স্বাভাবিক হয়ে আসবে চোখের সামনে। এখন আর লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে ইচ্ছে করবে না। আদরের চেয়ে কাজের ব্যাপারেই বেশী দেখা সাক্ষাত হবে। প্রকাশ্যে টেবিলের উপর রেখে দেয়া যাবে। ছিনতাইয়ের ভয়ে লুকিয়ে রাখতে হবে না। সহজভাবে ব্যবহার করা যাবে। মাঝে মাঝে ব্যবহার না করেও চলে যাবে। থাকলে ভালো, না থাকলেও চলে। অন্যের হাতে থাকা নতুন কোন জিনিসের দিকে নজর যাবে।
অন্যের হাতে থাকা ওই জিনিসের সুবিধা সৌন্দর্য দুটোই বেশী মনে হবে। নিজের জিনিসটার জন্য আক্ষেপ বাড়বে। এটা থেকে মুক্তির সুলভ উপায় খুজতে ইচ্ছে করবে। আগের অর্ধেক দামে বিক্রির উপায় খুজবে। জিনিসটা আগের মতো কাজ করছে না মাঝে মাঝে হ্যাং হয়ে যাচ্ছে বলে বিরক্ত লাগবে। মাঝে মাঝে আছাড় দিয়ে ভেঙ্গে ফেলতে ইচ্ছে করবে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া আছাড় দেয়া উচিত হবে না বলে মূলতবী রাখা হবে। বিকল্প আরো উন্নত জিনিসের জন্য পয়সা জমাতে শুরু করবে। বিকল্প পাওয়া মাত্র এটা কাউকে এমনকি বিনামূল্যেও গছিয়ে দিতে ইচ্ছে করবে। নতুন পাওয়ামাত্র পুরোনো জিনিসের নিন্দায় মূখর হতে হবে। পুরোনো জিনিসটা কতো খারাপ ছিল নতুনটা পাওয়ার আগে বুঝিনি বলে নিজে নিজে লজ্জা পাওয়া হবে। নতুনের জয়গান গেয়ে নতুন দিনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তবে একদিন এই নতুনের দিনও ফুরোবে, একই ভাগ্য বরণ করবে এই নতুনও। চিরনতুন বলে কিছুই নেই বস্তু ও মানবজীবনে।
আমার জিনিসটার দৈর্ঘ ১০ সেমি, প্রস্থ ৫সেমি, গভীরতা ১ সেমি। ওজন ১১০ গ্রাম। দেখতে কালো তবে চকচকে। কিন্তু চকচক করলেই সোনা হয় না। এমনকি কালো সোনাও না। হলে কি হবে এটি সোনার চেয়েও দামী। সেটা একটু পরেই বুঝবেন। তবে জিনিসটা চ্যাপটা, পুরো শরীরজুড়ে আয়না। আড়াই ইঞ্চি বাই দেড় ইঞ্চি। এটারে আদর করে বলে ডিসপ্লে এরিয়া। এটা পকেটে বহন করা যায়, হাতের তালুতে ধরে রাখা যায়, ঢিল মেরে ছুড়েও ফেলে যায়। কিন্তু পড়ে ভেঙ্গে গেলে কিংবা পানিতে ডুব দিলে তাকে আর জীবিত পাবেন না। তখন আপনি একাই মাথার চুল ছিড়বেন। আদুরে ডিসপ্লে এরিয়াটা পুরোটাই একটা টাচ স্ক্রীন। আদুরে কারণ এটাকে আদর ছাড়া চালানো যায় না। টাচ স্ক্রিনে আঙুলের আদর দিয়ে তাকে পরিচালানা করতে হয়। আদুরে না হয় হলো কিন্তু তা আপনাকে কি কি সুবিধা দিতে সক্ষম তা দেখা যাক।
১. হুকুম করা মাত্র সে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের সাথে টেলিযোগাযোগ ও মেসেজ সার্ভিস স্থাপন করে দেবে
২. তার ইন্টারনেটের মাধ্যমে ইমেইল ব্রাউজিং দিয়ে জ্ঞান বিনোদন জগতে ডুবে যেতে পারবেন
৩. কারো ঠিকানা জানেন অথচ তাকে খুজে পাচ্ছেন না? গুগল ম্যাপে ঠিকানা টাইপ করে আলতো চাপ দিন। পৃথিবীর আনাচে কানাচের যে কোন ঠিকানায় চলে যেতে পারবেন মুহুর্তেই
৪. পথিক আপনি পথ হারাইয়াছেন? ভয় নেই। জিপিএস লোকেটর দিয়ে গুগল ম্যাপে নিজের অবস্থান বের করে ফেলতে পারবেন কয়েক সেকেণ্ডেই।
৫. জ্ঞানার্জন করবেন? গুগল উইকিপিডিয়া দিয়ে সারা বিশ্বের তথ্যভাণ্ডার হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারবেন
৬. মাথা নষ্ট করার ইচ্ছে আছে? এফএম রেডিওর বাংলিশ টক শো কিংবা গান অথবা খবর কিংবা বকর বকর শুনতে পারেন
৭. বিটিভি দেখায় অরুচি? কিন্তু হাতের তালুতে আস্তে একটা টেলিভিশন খারাপ লাগবে না এমনকি বিটিভি হলেও। জিনিসটাকে আলতো ছোয়ায় টেলিভিশন বানিয়ে দেয়া যায় নিমেষেই
৮. বোরিং? দারুণ সব গেম আছে গেমিং জোনে। বসে বসে ঝিমানোর বদলে মজার মজার গেম খেলুন
৯. কতোদিন গান শোনার সময় পাননি? বোতাম টিপলে এটি মিউজিক প্লেয়ার, আঙুলের পরশে গান শুনুন ইচ্ছেমতো সাজিয়ে
১০. ভিডিও, নাটক মুভি দেখবেন? ভিডিও প্লেয়ার চেপে উপভোগ করুন পছন্দের আইটেম।
১১. হুটহাট ছবি তোলার শখ? কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে ঘুরার দরকার নেই। এটাকেই ডিজিটাল ক্যামেরা বানিয়ে ফেলতে পারেন।
১২. শুধু ছবিতে পোষাচ্ছে না? ভিডিও ক্যামেরায় ক্লিক করুন। ঘন্টা পর ঘন্টা ভিডিও করুন ব্যাটারীর বারোটা না বাজা পর্যন্ত্
১৩. ছবি তুলেই সন্তুষ্ট না? ছবিতে রংচং কার্টুন যোগ করবেন? ছবি এডিট অপশন খুলে নিশ্চিন্তে বসে যান কারো চেহারায় মুখোশ কারো পাছায় লেজ জুড়ে কোলাজের মজা নিন।
১৪. এতে আরো আছে একখানা ক্যালকুলেটার
১৫. আছে কয়েক রকমের এলার্ম
১৬. আছে একখানা রঙিলা ক্যালেণ্ডার
১৭. আছে ডিজিটাল ছবির নান্দনিক অ্যালবাম
১৮. আছে বহুমূখী একখানা কনভার্টার (দৈর্ঘ প্রস্থ, ওজন, এরিয়া ইত্যাদি)
১৯. টুকে রাখতে চান অতি জরুরী কোন মেসেজ বা তথ্য? চট করে নোট খুলে লিখে রাখুন
২০. ব্লু টুথ? হ্যাঁ এতে একখানা নীলদাঁতও আছে। বিশ্বাসী বন্ধুর সাথে বিনিময় করুন ছবি কিংবা ভিডিও কিংবা যে কোন ফাইল।
২১. সুযোগের অভাবে আপনি বাথরুম সিঙ্গার? নির্ভয়ে বাথরুমে গিয়ে রেকর্ড করে নিন পছন্দের গান। এটি একটি ভালো রেকর্ডারও।
২২. দৌড়বিদ? দৌড় শুরুর আগে স্টপওয়াচ চালু করে দিন, আপনার পদক্ষেপের গতিময়তার নিখুত হিসেব দিয়ে দেবে।
২৩. আকাশ মেঘলা অথচ বুঝতে পারছেন না বৃষ্টি হবে কিনা? ক্লিক করুন আকু ওয়েদার বাটনে। আবহাওয়ার প্রতিমুহূর্তের আপডেট, আগামী কয়েকদিনের ফোরকাষ্ট
২৪. আর কি চাই? শতশত গান ছবি ভিডিও মেমোরিতে জমা করে রাখুন। দরকার মতো মুছে ফেলুন আবার যোগ করুন।
২৫. কম্পিউটারে মতো ফোল্ডার তৈরী করে সকল গান কবিতা আর তথ্য জমা রাখুন তথ্য ভাণ্ডারে পরিণত করুন হাতের ইশারায়
২৬. এটি একটি ছোটখাট অফিসও। অফিসের মেইলে এটাচমেন্ট থাকে। এই জিনিসে এমএসওয়ার্ড এক্সেল পিডিএফ টেক্সট ইত্যাদি ফাইল স্বচ্ছন্দে পড়তে পারেন
২৭. রিজার্ভ গান বাদ দিয়ে ইন্টারনেটের গান শুনতে চান? ইউটিউব ভিডিও চালু করে দিন
২৮. এছাড়াও আছে ফ্লিকার, পিকাসা, ফটোবাকেট, সব কিছু এক আঙুলের ইশারায় পাওয়া যায়।
২৯. বিশ্বের টাইমজোন তো এখন আপনার হাতের মুঠোয়। তবে জোরে চাপ দেবেন না, বিশ্বের সময় নড়বড়ে হয়ে যাবে।
৩০. বেকার লোক আপনি? তাই প্রচুর ব্যস্ততা? চিন্তার কিছু নেই। সারা বছরের শিডিউল, ডায়েরী, রিমাইণ্ডার ইত্যাদি জমা রাখা যায় একদম বিনামূল্যে
৩১. ফেসবুকে বন্ধুদের সাথে অন থাকতে চান? তর্জনীর ইশারায় ঢুকে পড়ুন বন্ধুদের আড্ডাখানায়।
৩২.....৩৩......৩৪.......ইটিসি ইত্যাদি
জিনিসটা কি আর বোধহয় বলে দেবার দরকার নাই। জিনিসটার নাম মোবাইল ফোন। কিছু সুবিধা কম বেশী হলেও এই জিনিস আজকাল সবার হাতে হাতে। এরকম একটা কার্যকরী যন্ত্র হাতে থাকলে নিজেকে পৃথিবীর অন্যতম অলস প্রাণীতে পরিণত করতে খুব বেশী কি বেগ পেতে হয়? হয় না। আমারও হয়নি। কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিন যাতায়াত সত্ত্বেও হয়ে গেছি প্রচ্ছন্ন বেকার। শুয়ে শুয়েও অফিসের মেইল চেক করে ফেলি। নাম বদলে হয়েছি গৃহিনীর আদুরে ভাষায় 'কুঁড়ের বাদশা' ওরফে অলস দ্য কিং।
তবে আমাকে অলস দ্য কিং বানাবার এই যন্ত্রটিকেও আজকাল নীরস মনে হচ্ছে। এটাই হলো মুশকিল। মুগ্ধতার দিন শেষ। সহনীয়তাও শেষের পথে। দিন যতই যাচ্ছে মনে হচ্ছে আমার আরো অলস হওয়া উচিত। অথচ এটা আমাকে আরো বেশী অলস বানাতে পারছে না। এর চেয়ে ভালো কিছু বাজারে এসেছে কিনা খোঁজ নেই প্রতিদিন। মানুষের চাহিদার শেষ নেই। আরো উন্নত প্রযুক্তি কি হতে পারে আমার ধারণা নেই। শুধু জানি সেটা বিজ্ঞানীদের কাজ, ওরা ঠিকই খুঁজে খুঁজে নয়া প্রযুক্তি আবিষ্কার করে আরো অলস বানাবার ফন্দী করে যাচ্ছে প্রতিদিন। আমরা কেবল পকেটে কাড়ি নিয়ে তৈরী থাকবো নতুনের স্বাদ নেবার জন্য।
কিন্তু আরো উন্নত প্রযুক্তির স্পর্শে ভবিষ্যতে আমার অলসতা কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে ভাবা যায়? চরম আলস্যে যদি আমাদের ভূতলে পতন ঘটে আমরা শুয়ে শুয়ে কি সেই বেদবাক্যটি আউড়ে যাবো - "কতো রবি জ্বলে, কেবা আঁখি মেলে?"
Wednesday, August 29, 2012
পনেরো আনা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবিঠাকুর আসলেই গুরু মানুষ। নইলে এরকম একটা লেখা তার কলম দিয়ে বেরুতো না। এই লেখা তাঁকে চেনার জন্য, জানার জন্য। পারলে এই লেখাটা আমি বাংলাদেশের কোন পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতাম।
------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
পনেরো আনা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যে লোক ধনী, ঘরের চেয়ে তাহার বাগান বড়ো হইয়া থাকে। ঘর অত্যাবশ্যক; বাগান অতিরিক্ত, না হইলেও চলে। সম্পদের উদারতা অনাবশ্যকেই আপনাকে সপ্রমাণ করে। ছাগলের যতটুকু শিং আছে তাহাতে তাহার কাজ চলিয়া যায়, কিন্তু হরিণের শিঙর পনেরো-আনা অনাবশ্যকতা দেখিয়া আমরা মুগ্ধ হইয়া থাকি। ময়ুরের লেজ যে কেবল রঙচঙে জিতিয়াছে তাহা নহে, তাহার বাহুল্যগৌরবে শালিক-খঞ্জন-ফিঙার পুচ্ছ লজ্জায় অহরহ অস্থির।
যে মানুষ আপনার জীবনকে নিঃশেষে অত্যাবশ্যক করিয়া তুলিয়াছে সে ব্যক্তি আদর্শপুরুষ সন্দেহ নাই, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তাহার আদর্শ অধিক লোকে অনুসরণ করে না; যদি করিত তবে মনুষ্যসমাজ এমন একটি ফলের মতো হইয়া উঠিত যাহার বিচিই সমস্তটা, শাঁস একেবারেই নাই। কেবলই যে লোক উপকার করে তাহাকে ভালো না বলিয়া থাকিবার জো নাই; কিন্তু যে লোকটা বাহুল্য, মানুষ তাহাকে ভালোবাসে।
কারণ, বাহুল্যমানুষটি সর্বতোভাবেই আপনাকে দিতে পারে। পৃথিবীর উপকারী মানুষ কেবল উপকারের সংকীর্ণ দিক দিয়াই আমাদের একটা অংশকে স্পর্শ করে। সে আপনার উপকারিতার মহৎ প্রাচীরের দ্বারা আর-সকল দিকেই ঘেরা; কেবল একটি দরজা খোলা--সেখানে আমরা হাত পাতি, সে দান করে। আর, আমাদের বাহুল্যলোকটি কোনো কাজের নহে, তাই তাহার কোনো প্রাচীর নাই। সে আমাদের সহায় নহে, সে আমাদের সঙ্গীমাত্র। উপকারী লোকটির কাছ হইতে আমরা অর্জন করিয়া আনি এবং বাহুল্যলোকটির সঙ্গ মিলিয়া আমরা খরচ করিয়া থাকি। যে আমাদের খরচ করিবার সঙ্গী সে-ই আমাদের বন্ধু।
বিধাতার প্রসাদে হরিণের শিং ও ময়ূরের পুচ্ছের মতো সংসারে আমরা অধিকাংশ লোকই বাহুল্য, আমাদের অধিকাংশেরই জীবন জীবনচরিত লিখিবার যোগ্য নহে, এবং সৌভাগ্যক্রমে আমাদের অধিকাংশেরই মৃত্যুর পরে পাথরের মূর্তি গড়িবার নিষ্ফল চেষ্টায় চাঁদার খাতা দ্বারে দ্বারে কাঁদিয়া ফিরিবে না।
মরার পরে অল্প লোকই অমর হইয়া থাকেন, সেইজন্যই পৃথিবীটা বাসযোগ্য হইয়াছে। ট্রেনের সব গাড়িই যদি রিজার্ভ গাড়ি হইত তাহা হইলে সাধারণ প্যাসেঞ্জারদের গতি কি হইত? একে তো বড়োলোকেরা একাই একশো--অর্থাৎ, যতদিন বাঁচিয়া থাকেন ততদিন অন্তত তাহাদের ভক্ত ও নিন্দুকের হৃদয়ক্ষেত্রে শতাধিক লোকের জায়গা জুড়িয়া থাকেন--তাহার পরে আবার মরিয়াও তাঁহারা স্থান ছাড়েন না। ছাড়া দূরে থাক, অনেকে মরার সুযোগ লইয়া অধিকার বিস্তার করিয়াই থাকেন। আমাদের একমাত্র রক্ষা এই যে, ইহাদের সংখ্যা অল্প। নহিলে কেবল সমাধিস্তম্ভে সামান্য ব্যক্তিদের কুটিরের স্থান থাকিত না। পৃথিবী এত সংকীর্ণ যে জীবিতের সঙ্গ জীবিতকে জায়গার জন্য লড়িতে হয়। জমির মধ্যেই হউক বা হৃদয়ের মধ্যই হউক, অন্য পাঁচজনের চেয়ে একটুখানি ফলাও অধিকার পাইবার জন্য কত লোকে জাল-জালিয়াতি করিয়া ইহকাল পরকাল খোয়াইতে উদ্যত। এই যে জীবিতে জীবিতে লড়াই ইহা সমকক্ষের লড়াই, কিন্তু মৃতের সঙ্গ জীবিতের লড়াই বড়ো কঠিন। তাহারা এখন সমস্ত দুর্বলতা, সমস্ত খন্ডতার অতীত; তাহারা কল্পলোকবিহারী--আমরা মাধ্যাকর্ষণ কৈশিকাকর্ষণ এবং বহুবিধ আকর্ষণ-বিকর্ষণের দ্বারা পীড়িত মর্তমানুষ, আমরা পারিয়া উঠিব কেন? এইজন্যই বিধাতা অধিকাংশ মৃতকেই বিস্মৃতলোকে নির্বাসন দিয়া থাকেন, সেখানে কাহারো স্থানাভাব নাই। বিধাতা যদি বড়ো বড়ো মৃতের আওতায় আমাদের মতো ছোটো ছোটো জীবিতকে নিতান্তই বিমর্ষ-মলিন, নিতান্তই কোণঘেঁষা করিয়া রাখিবেন, তবে পৃথিবীতে এমন উজ্জ্বল সুন্দর করিলেন কেন--মানুষের হৃদয়টুকু মানুষের কাছে এমন একান্তলোভনীয় হইল কী কারণে?
নীতিজ্ঞেরা আমাদিগকে নিন্দা করেন। বলেন, আমাদের জীবন বৃথা গেল। তাঁহারা আমাদিগকে তাড়না করিয়া বলিতেছেন--উঠ, জাগো, কাজ করো, সময় নষ্ট করিয়ো না।
কাজ না করিয়া অনেকে সময় নষ্ট করে সন্দেহ নাই; কিন্তু কাজ করিয়া যাহারা সময় নষ্ট করে তাহারা কাজও নষ্ট করে, সময়ও নষ্ট করে। তাহাদের পদভারে পৃথিবী কম্পান্বিত এবং তাহাদেরই সচষ্টতার হাত হইতে অসহায় সংসারকে রক্ষা করিবার জন্য ভগবান বলিয়াছেন, "সম্ভবামি যুগে যুগে।'
জীবন বৃথা গেল। বৃথা যাইতে দাও। অধিকাংশ জীবনই বৃথা যাইবার জন্য হইয়াছে। এই পনেরো-আনা অনাবশ্যক জীবনই বিধাতার ঐশ্বর্য সপ্রমাণ করিতেছে। তাঁহার জীবনভাণ্ডারে যে দৈন্য নাই, ব্যর্থপ্রাণ আমরাই তাহার অগণ্য সাক্ষী। আমাদের অফুরান অজস্রতা, আমাদের অহেতুক বাহুল্য দেখিয়া বিধাতার মহিমা স্মরণ করো। বাঁশি যেমন আপন শূন্যতার ভিতর দিয়া সংগীত প্রচার করে, আমরা সংসারের পনেরো-আনা আমাদের ব্যর্থতার দ্বারা বিধাতার গৌরব ঘোষণা করিতেছি। বুদ্ধ আমাদের জন্যই সংসার ত্যাগ করিয়াছেন, খৃস্ট আমাদের জন্য প্রাণ দিয়াছেন, ঋষিরা আমাদের জন্য তপস্যা করিয়াছেন, এবং সাধুরা আমাদের জন্য জাগ্রত রহিয়াছেন।
জীবন বৃথা গেল। যাইতে দাও। কারণ, যাওয়া চাই। যাওয়াটাই একটা সার্থকতা। নদী চলিতেছে--তাহার সকল জলই আমাদের স্নানে এবং পানে এবং আমন-ধানের ক্ষেতে ব্যবহার হইয়া যায় না। তাহার অধিকাংশ জলই কেবল প্রবাহ রাখিতেছে। আর-কোনো কাজ না করিয়া কেবল প্রবাহরক্ষা করিবার একটা বৃহৎ সার্থকতা আছে। তাহার যে জল আমরা খাল কাটিয়া পুকুরে আনি তাহাতে স্নান করা চলে, কিন্তু তাহা পান করি না; তাহার যে জল ঘটে করিয়া আনিয়া আমরা জালায় ভরিয়া রাখি তাহা পান করা চলে, কিন্তু তাহার উপরে আলোছায়ার উৎসব হয় না। উপকারকেই একমাত্র সাফল্য বলিয়া জ্ঞান করা কৃপণতার কথা, উদ্দেশ্যকেই একমাত্র পরিণাম বলিয়া গণ্য করা দীনতার পরিচয়।
আমরা সাধারণ পনেরো-আনা, আমরা নিজেদের যেন হেয় বলিয়া না জ্ঞান করি। আমরাই সংসারের গতি। পৃথিবীতে, মানুষের হৃদয়ে আমাদের জীবনস্বত্ব। আমরা কিছুতেই দখল রাখি না, আঁকড়িয়া থাকি না, আমরা চলিয়া যাই। সংসারের সমস্ত কলগান আমাদের দ্বারা ধ্বনিত, সমস্ত ছায়ালোক আমাদের উপরেই স্পন্দমান। আমরা যে হাসি, কাঁদি, ভালোবাসি--বন্ধুর সঙ্গ অকারণ খেলা করি--স্বজনের সঙ্গ অনাবশ্যক আলাপ করি--দিনের অধিকাংশ সময়ই চারি পাশের লোকের সহিত উদ্দেশ্যহীনভাবে যাপন করি, তার পরে ধুম করিয়া ছেলের বিবাহ দিয়া তাহাকে আপিসে প্রবেশ করাইয়া পৃথিবীতে কোনো খ্যাতি না রাখিয়া মরিয়া পুড়িয়া ছাই হইয়া যাই--আমরা বিপুল সংসারের বিচিত্র তরঙ্গলীলার অঙ্গ; আমাদের ছোটোখাটো হাসিকৌতুকেই সমস্ত জনপ্রবাহ ঝল্মল্ করিতেছে; আমাদের ছোটোখাটো আলাপে বিলাপে সমস্ত সমাজ মুখরিত হইয়া আছে।
আমরা যাহাকে ব্যর্থ বলি প্রকৃতির অধিকাংশই তাই। সূর্যকিরণের বেশির ভাগ শূন্যে বিকীর্ণ হয়, গাছের মুকুল অতি অল্পই ফল পর্যন্ত টিঁকে। কিন্তু সে যাঁহার ধন তিনিই বুঝিবেন। সে ব্যয় অপব্যয় কি না বিশ্বকর্মার খাতা না দেখিলে তাহার বিচার করিতে পারি না। আমরাও তেমনি অধিকাংশই পরস্পরকে সঙ্গদান ও গতিদান ছাড়া আর-কোনো কাজে লাগি না; সেজন্য নিজেকে ও অন্যকে কোনো দোষ না দিয়া ছট্ফট্ না করিয়া, প্রফুল্ল হাস্যে ও প্রসন্ন গানে সহজেই অখ্যাত অবসানের মধ্যে যদি শান্তিলাভ করি তাহা হইলেই সেই উদ্দেশ্যহীনতার মধ্যেই যথার্থভাবে জীবনের উদ্দেশ্যসাধন করিতে পারি।
বিধাতা যদি আমাকে ব্যর্থ করিয়াই সৃষ্টি করিয়া থাকেন তবে আমি ধন্য; কিন্তু যদি উপদেষ্টার তাড়নায় আমি মনে করি আমাকে উপকার করিতেই হইবে, কাজে লাগিতেই হইবে, তবে যে উৎকট ব্যর্থতার সৃষ্টি করি, তাহা আমার স্বকৃত। তাহার জবাবদিহি আমাকে করিতে হইবে। পরের উপকার করিতে সকলেই জন্মাই নাই, অতএব উপকার না করিলে লজ্জা নাই। মিশনারী হইয়া চীন উদ্ধার করিতে না-ই গেলাম; দেশে থাকিয়া শেয়াল শিকার করিয়া ও ঘোড়দৌড়ে জুয়া খেলিয়া দিন-কাটানোকে যদি ব্যর্থতা বল, তবে তাহা চীন-উদ্ধার-চেষ্টার মতো এমন লোমহর্ষক নির্দারুণ ব্যর্থতা নহে।
সকল ঘাস ধান হয় না। পৃথিবীতে ঘাসই প্রায় সমস্ত, ধান অল্পই। কিন্তু ঘাস যেন আপনার স্বাভাবিক নিষ্ফলতা লইয়া বিলাপ না করে--সে যেন স্মরণ করে যে, পৃথিবীর শুষ্ক ধূলিকে সে শ্যামলতার দ্বারা আচ্ছন্ন করিতেছে, রৌদ্রতাপকে সে চির-প্রসন্ন স্নিগ্ধতার দ্বারা কোমল করিয়া লইতেছে। বোধকরি ঘাসজাতির মধ্যে কুশতৃণ গায়ের জোরে ধান্য হইবার চেষ্টা করিয়াছিল; বোধ করি সামান্য ঘাস হইয়া না থাকিবার জন্য, পরের প্রতি একান্ত মনোনিবেশ করিয়া জীবনকে সার্থক করিবার জন্য, তাহার মধ্যে অনেক উত্তেজনা জন্মিয়াছিল; তবু সে ধান্য হইল না। কিন্তু সর্বদা পরের প্রতি তাহার তীক্ষ্ণ লক্ষ্য নিবিষ্ট করিবার একাগ্র চেষ্টা কিরূপ তাহা পরই বুঝিতেছে। মোটের উপর এ কথা বলা যাইতে পারে যে, এরূপ উগ্র পর-পরায়ণতা বিধাতার অভিপ্রেত নহে। ইহা অপেক্ষা সাধারণ তৃণের খ্যাতিহীন স্নিগ্ধ-সুন্দর বিনম্র-কোমল নিষ্ফলতা ভালো।
সংক্ষেপে বলিতে গেলে মানুষ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত--পনেরো-আনা এবং বাকী এক-আনা। পনেরো-আনা শান্ত এবং এক-আনা অশান্ত। পনেরো-আনা অনাবশ্যক এবং এক-আনা আবশ্যক। বাতাসে চলনশীল জ্বলনধর্মী অক্সিজেনের পরিমাণ অল্প, স্থির শান্ত নাইট্রোজেনই অনেক। যদি তাহার উল্টা হয় তবে পৃথিবী জ্বলিয়া ছাই হয়। তেমনি সংসারে, যখন কোনো এক-দল পনেরো-আনা এক-আনার মতোই অশান্ত ও আবশ্যক হইয়া উঠিবার উপক্রম করে তখন জগতে আর কল্যাণ নাই, তখন যাহাদের অদৃষ্টে মরণ আছে তাহাদিগকে মরিবার জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে।
মাঘ, ১৩০৯
Tuesday, August 28, 2012
লাইফ উইথ লিমিটেড ইন্টারনেট
প্রথমঃ মানুষ বাঁচে বাতাস মানে অক্সিজেন দিয়ে
দ্বিতীয়ঃ মানুষ বাঁচে পানি দিয়ে
তৃতীয়তঃ মানুষ বাঁচে ভাত খেয়ে
চতুর্থত মানুষ বাঁচে জীবিকা দিয়ে
পঞ্চমতঃ মানুষ বাঁচে স্বচ্ছলতা দিয়ে
ষষ্ঠতঃ মানুষ বাঁচে স্বাচ্ছন্দ্য দিয়ে
এখানে ছয়টি বাঁচার মধ্যে একটা ধারাবাহিক সম্পর্ক আছে। যার বাতাস আছে সে চায় পানি। যার পানি আছে সে চায় ভাত। যার ভাত আছে সে চায় নিয়মিত আয়/জীবিকা। যার জীবিকা ঠিক আছে সে চায় স্বচ্ছলতা। যার স্বচ্ছলতা আছে সে চায় স্বাচ্ছন্দ্য জীবন।
পৃথিবীতে জীবিত সব মানুষ প্রথম তিনটির অন্তর্ভুক্ত। অনাহারে মারা যাবে কিংবা যাচ্ছে সেরকম কিছু মানুষ বাদ দিলে ৭০০ কোটি মানুষই প্রথম তিনটি দলের অন্তর্ভুক্ত। তার এক ধাপ উপরে আছে জীবিকা। মানে আয়ের একটা উৎস আছে এদের। এরকম মানুষের সংখ্যা ৮৫ শতাংশ ধরলে ১৫ শতাংশকে কর্মহীন ধরা যায়। পনের শতাংশ কর্মহীন মানুষও ভাত খেয়ে বেচে আছে কোনমতে। ৮৫ শতাংশের মধ্যে স্বচ্ছলতা আছে হয়তো ৩০ শতাংশের। ৫৫ শতাংশ কোনমতে জীবিকা নির্বাহ করে বেঁচে থাকে। ৩০ শতাংশের মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে বেঁচে আছে কতো শতাংশ? যারা ঘরের খেয়ে ইন্টারনেট গুঁতানোর সময় পায় তাদেরকে নিশ্চয়ই স্বাচ্ছন্দ্য গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। সেই স্বাচ্ছন্দ্য গ্রুপের একাংশ বাঁচে ইন্টারনেট দিয়ে!
আমার এত ভণিতার উদ্দেশ্য এই দলকে নিয়ে যারা অক্সিজেনের দুটি মৌলিক উপাদানের মধ্যে ইন্টারনেটও যুক্ত করে দিয়েছে এটাকে H2ONET(এইচটুওনেট) বলা যায়।
এই দলটার বায়ু পানি ইন্টারনেট ছাড়া বাঁচে না। কিংবা বাঁচাটা দুর্ভোগ হিসেবে দেখে। আমি দিনে যতটা সময় বসে থাকি ততক্ষণ ইন্টারনেট থাকা চাই। এমন না যে ইন্টারনেট থাকলেই আমি কাজ করে উড়িয়ে ফেলছি। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য যেমন অক্সিজেন চাই, তেমনি বসে থাকার জন্য ইন্টারনেট চাই। শুয়ে গেলে, কিংবা ঘুমোতে গেলে, কিংবা রাস্তায় থাকলে ইন্টারনেট না থাকুক সমস্যা নাই। কিন্ত আমি ডেস্কে আছি, কিন্তু ইন্টারনেট নেই, এটা দুঃসহ। ইন্টারনেট ছাড়া দিনের আটঘন্টা অফিসে কাজ করেছি, তেমন নজীর গত একযুগে নেই। এতদিন পর খেয়াল করলাম, মানুষ আটঘন্টা ডেস্কে বসে কাজ করে কিভাবে? আমাকে তো ডেস্কে বসিয়ে রাখে ইন্টারনেট সংযোগ। বাকীদের?
সার্কিট হাউস রোড
"হারামীর বাচ্চা হারামী!!"
মেজাজটা বিলা হয়ে গেছে। সেই কখন ভাত খাইছি এখনো বিকালের নাস্তা করি নাই। বিকালের নাস্তাটা কি হবে তা অবশ্য ঠিক করা হয়নি। বিকালের নাস্তাটা সবসময়ই অনিশ্চিত থাকে। কখনো কলামুড়ি, কখনো বনরুটি- চা,কখনো কাবাব পরোটাও টুপ করে জুটে যায়।
এই রাস্তায় কেবল আমার রাজত্ব। এখানে আর কেউ আসবে না। বলা আছে, অন্য কেউ আসলে ঠ্যাং ভেঙ্গে হাতে ঝুলিয়ে দেয়া হবে। সেই কাজটা আমাকে করতে হবে না। করার লোক আছে। আমাকে শুধু আওয়াজ দিতে হবে গলা উঁচিয়ে। সাথে সাথে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। লাইসেন্স ছাড়া কেউ এখানে আসতে পারবে না।
স্টেডিয়াম থেকে কাজীর দেউড়ি মোড় ভিআইপি এলাকা। এদিকে যেসব গাড়ি চলে, যেসব গাড়ি থামে তার প্রায় সবাই শহরের কর্তামানুষের। এই রাস্তায় গাড়ি দাড় করায় বড়লোকের উড়ন্ত ছেলেমেয়েরা। সারিবদ্ধ কাবাবের দোকান রাস্তার পাশেই। ঘ্রাণে অর্ধভোজন হবার জন্য এটার চেয়ে উপযুক্ত স্থান এই শহরে দ্বিতীয়টি নেই। ঠিকমতো কায়দা করলে বড়লোকের ছেলেপেলের নেক নজরে না পড়ার কোন কারণ নেই। এদের দিল দুইরকম। কেউ কেউ অতি দিল দরিয়া, কেউ এক্কেবারে বেরহম। কোন কোন ছেলেপেলের কাছে শতি টাকার নোটের কম কিছু নাই। দু'তিন বার ভ্যানভ্যান করলে শাঁ করে শতিটাকার একটা নোট বের হয়ে আসে। বেশীরভাগ অবশ্য মাফ চেয়ে ভাগানি দেয়। আবার কিছু আছে মাফ চাইবার পর মাফ না দিয়ে আরো দুয়েকবার ভ্যানভ্যান করলে কিছু একটা দিয়ে দেয়, একটুকরো মাংস বা একটা আধখাওয়া পরোটা। সবচেয়ে ভালো কৌশল হলো কয়েক হাত দূর থেকে চোখটা মলিন করে ওদের প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকা। এসব করতে হয় লোক বুঝে। কিছু হারামী আছে হাড্ডিটাও ছুড়ে দিতে রাজী না। গবগবিয়ে সবটা খেয়ে উল্টা ধাবকি দেয়।
এর আগে ছিলাম ফ্রি পোর্টের মোড়ে। সব ফকিন্নির পোলার বাস ওখানে। চেহারা পোষাক সবকিছুতে নাই নাই। শালারা আমার চেয়ে ফকির। মাসে এক হাজার টাকাও উঠতো না। কমিশন দিয়ে কিছুই থাকে না। উপাসে মরতে ছিলাম প্রায়। বদলির জন্য জোর তদবির করা লাগছে। তদবিরের খরচও কম না। নগদ দশ হাজার দিয়ে পোষ্টিং নিছি এখানে। কর্জ করে টাকা যোগাড় করছি মোটা সুদে। তাও সুখ। এইখানে দশ হাজার তুলতে দুইমাসও লাগবে না।
গালি যারে দেয়া হইছে সে কাঁচের আড়ালে ছিল বলে শুনতে পায়নি। নইলে ধাবকি দিত। এতক্ষণ তার পিছনে হেঁটে টাইম লস করলাম। ব্যাটা হ্যাঁও কয় না আবার নাও কয় না। তারপর হুট করে দরোজা খুলে সামনের সীটে উঠে সাঁই করে চলে গেছে সাদা গাড়ি হাঁকিয়ে। শালা হারামী!
আরেকটা নতুন চিড়িয়া নামছে নীল গাড়িটা থেকে। এই গাড়িটা আরো বড়। তবে বড় গাড়িকে টার্গেট করে প্রায়ই ঠকতে হয়। কঞ্জুশের কঞ্জুশ এগুলো। পকেটে মানিব্যাগও থাকে না। একবার এরকম গাড়ির এক হারামী মানিব্যাগ খুলে প্লাষ্টিকের কার্ড দেখিয়ে কইছিল,"নে,যা লাগে এখান থেকে নিয়ে নে, টেকা নাই এইটা আছে খালি"। বান্দরের বাচ্চা! কেডিড কাডের গরম দেখায়!
এখন যে খোদার খাসীটা কালো কাঁচের আড়াল থেকে নামলো তার ওজন কমসে কম সাড়ে এগার মন হবে। এইটা ফজুইল্যার ঠিক করে দেয়া ওজন। সে এরকম হাতি মানুষরে সাড়ে এগারো মনের কমে দেখে না। এইটারে বায়েজিদ বোস্তামী রোডে সন্ধ্যার পরে একলা পাইলে ভুড়ি ফাঁসায়ে দেয়া যেত। নাহ, এইটার পিছেও টাইম লস হবার সম্ভাবনা। এই শালা মনয় বিড়ি খাইতে নামছে। সাদা প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ভুসভুস করে টানে। ওর ভুসভুসানি দেখে আমারও সিগারেটের নেশা পায়া গেল। কিন্তু এখন সিগারেট খায়া টাইম লস করা যাবে না। বিজি টাইম।
হাতের ক্রাচ যন্ত্রটাকে কায়দা করে ধরে গাছের আড়ালে দাঁড়ালাম। একটা দলচ্যুত সবুজ পোষাকের ঠোলাকে এদিকে আসতে দেখা যাচ্ছে। ব্যাটা মুততে নামছে মনয়। তবু বিশ্বাস নাই, কোরবানীর ঈদের মরসুম, পয়সাপাতির জন্য কুত্তাপাগল এসময়। দেখলে ঝামেলা করতে পারে। রেগুলার পয়সাপাতি নিয়েও বেইজ্জতি করে সময় সময়। কুত্তার সাথে বন্ধুত্ব করলেও ঠোলার সাথে কভি নেহি। এটাও ফজুইল্যার বাণী। ফজুইল্যা আসলেই গুরুমানুষ। বয়স তিন কুড়ি পার হয়ে গেছে এখনো কি মজবুত শরীর। শালার আগের পেশাটাই ভালো ছিল শরীরের পক্ষে। কিন্তু এখন আর সম্ভব না। দুই পা নাই তার!
তয় ফজুইল্যার বুদ্ধিতে কিছুদিন আগে একবার অন্যরকম ডিউটি করছিলাম। সন্ধ্যার পর বায়োজিদ বোস্তামী রোডে গেছি। ইফতারের পর এলাকাটা কিছুক্ষণ একদম নীরব গা ছমছম অন্ধকার। আমরা পাঁচজন। প্রথমে ফজুইল্যা, তারপর আমি, তারপর আরো দুজন,তারপর আরেকজন। মানুষ পছন্দ হইলে ফজুইল্যা হাত পাতলো। ফজুইল্যারে পার হয়ে মানুষটা আমার সামনে এলে আমি আগায় দিলাম পা। ল্যাং খেয়ে দুম করে পড়ে গেল লোকটা। পড়ার পর আমার সাথে ঝগড়াঝাটি চলার সময় আমার পরের দুজন আসলো ছুরি আর একনলা হাতে। মোবাইল মানিব্যাগ সব কেড়ে নেয়া শেষ হলে গেলে তার পরের জন এসে পাছায় লাথি মেরে তাড়িয়ে দিল লোকটারে। আরো কয়জনের কাছ থেইকা টাকাপয়সা হাতায়ে একজনের ভুড়িতে ক্ষুরের খোঁচা মেরে সিএনজিতে পগারপার। মদিনা হোটেলে বিরানী খাইছিলাম সেই রাতে।
এই হাতীটারে ল্যাং মারলে আমার শরীর আস্ত থাকবে না। এটারে কেমনে কায়দা করা সম্ভব কয়েক রকম করে ভেবেও কোন রাস্তা পাইলাম না। কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হাতিটা আমাকে না দেখার ভাণ করে সিগারেটে শেষ টান দিয়ে গাড়িতে উঠে কালো কাঁচের আড়ালে চলে গেলো। দাঁত খিচে গালি চলে এল মুখে, "খা_কির পোলা"। কেন জানি না বড়লোকের বাচ্চাগুলারে গালিগালাজ দিয়ে মনে একরকমের শান্তি হয়।
আর পারা যায় না। ক্রাচ যন্ত্রটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে আমিও একটা সিগারেট ধরাইলাম ফস করে। মেজাজ চড়ে গেছে। একটা সিগারেট খেয়ে মাথা ঠাণ্ডা করি। দুই দুইটা শিকার ফসকে গেছে। সিগারেটে দুই টান দিতেই দেখি সবুজ জামা পাশে চলে আসছে। ব্যাটার মতলব কি?
"ওই আগুন দে!"
আমি চুপচাপ ম্যাচ এগিয়ে দেই। এগুলার সাথে ঝামেলায় যাওয়া যাবে না। কইলাম, "ওস্তাদ কিরাম আছেন?"
"টিকেট আছেনি তোর?"
"আছে ওস্তাদ"
"কোন লেবেল?"
"আপনেদের দোয়ায় সুপারভাইজারির প্রমোশন পাইছি"
"তাইলে তো ভালোই কামাস"
"আ্ইজ দিনটা বেশী খারাপ ওস্তাদ। একদম খালি"
টেরনিং এর দিন পয়লা টিরিক্স কিন্তুক এইটাই। ঠোলা দেখলে সেদিন কামাই একদম খারাপ কইতে হয়। নইলে পকেট হাতায়ে দিতে পারে। যদিও পকেটে টাকা রাখা হারাম আমাদের। টাকা রাখতে হয় আণ্ডুর ভেতর। তবুও বিশ্বাস নাই, আণ্ডুও হাতায় দেয় কোন কোনদিন। কয়েকদিন আগে ফজুইল্যারে পাইছিল এক মামু। নেংটা করে আণ্ডু থেকে পয়সা ছিবড়ে নিছে। অবশ্য ফয়জুইল্যারও দোষ আছে। সে মুখে মুখে তক্ক করছিল। মামুদের সাথে তক্ক করা নিষেধ, টিকেট থাকলেও।
"ওস্তাদ ঈদে বাড়িত যাইবেন না?"
"না"
"ক্যান, বাড়িত কেউ নাই?"
"আছে .....আবার নাই।"
চুপ করে থাকলো মামু। আমার আর কথা নাই। ব্যাটা গেলেই বাঁচি। নিয়ম আছে মামুরা সামনে থাকলে কাম করা যাবে না। কিন্তু তার তো উঠার লক্ষণ নাই। উদাস মনে বিড়ি টানতেছে তো টানতেছে। তারপর নিজে নিজে কথা বলা শুরু করলো-
"গত বচ্ছর ঈদের দুইদিন আগে বাড়িত গিয়া বউ বাচ্চারে নিয়া মার্কেটে গেছিলাম। আমার পোলাডা নয়া হাঁটতে শিখছে। দেড় বছর বয়স। টুক টুক কইরা হাঁটে। তারে টুকু বইল্যা ডাকি। তার জন্য নীল জুতা, লাল জামা, হলুদ প্যান্ট, মাথায় টুপি, এইডি কিনইয়্যা বাড়িত পৌঁছায় দিয়া আসছি। পোলায় কি যে খুশী হইছিল..................। এবার বাড়িত যাবার পারুম না। ছুটি নাই.......গেলে ঈদের পরে যাইতে পারি।"
"ঈদের পরে গিয়া আর কি হইব? তবু যান ওস্তাদ। পোলায় তো এখন আরো বড় হইছে। খুশী হইবো।"
"পোলায় আর বড় হয় নাই।"
"ক্যান?"
"যেইদিন টুকুরে রাইখা আসছিলাম বাড়িতে, আমি বাড়ি না ঢুইকাই চইলা আসছি ডিউটি ছিল বইলা। টুকু তার মায়ের লগে বাড়িত ঢুকতেছিল। বাড়ির লগেই পুকুর। তার মায়ে কাজের তাড়ায় আগে ঢুইকা যায় ঘরে.... খেয়াল করেনাই টুকু লগে আসেনি।"
"তারপর?"
মামু চুপ। কিছু বলে না।
"তারপর কি হইলো ওস্তাদ?"
"আদঘন্টা বাদে লাশ ভাইসা ওঠে..... বাড়িত না ঢুইকা টুকু পুকুরের দিকে গেছিল , মরন তারে ডাকছিল(ডুকরে ওঠে সবুজ জামা)........আমার টুকু........টুকুরে........আমি আর বাড়িত গিয়া কি করুম রে?"
ঠোলা মামুরে এতক্ষণে মানুষ মানুষ লাগে। তবু আমি বলার মতো কোন কথা খুঁজে পাই না। লুলা ভিখারীর অভিনয় করা আমার পাষাণ চোখ দুটোও এবার ঝাপসা হয়ে আসে!