Sunday, November 26, 2023

শার্লট অব চিটাগং : ১৭৯২

 


[‘শার্লট অব চিটাগং’: ১৭৯২ শিল্পী: বালথাজার সলভিন]


১৭৯৬ সালের ঘটনা। কলকাতায় নির্মিত ৪০০ টনের ননসাচ (Nonsuch) নামের একটা ফ্রিগেটের কাঠে পচন ধরলে সেটার কারণ খুঁজে বের করার জন্য চট্টগ্রামের এক জাহাজ নির্মাতা মি. হোয়াইটের মতামত চাওয়া হলো। কলকাতা তখনো বড় জাহাজ নির্মানের জন্য তেমন উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি। জাহাজটি ছিল ১৭৮১ সালে কলকাতায় নির্মিত প্রথম বড় জাহাজ যা এশিয়া জুড়ে কোম্পানির বাণিজ্য পণ্য বহন করা ছাড়াও ইউরোপে  ফ্রান্সের সাথে চলমান যুদ্ধে ফ্রিগেট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। 

 

হোয়াইট সাহেব কলকাতায় গিয়ে জাহাজের আগপাশতলা পরীক্ষা করে জানালেন, “.......জাহাজটির ফ্রেম বাদে বাকী অংশ সেগুন কাঠ দিয়ে তৈরি। কিন্তু যে কীলক বা পেরেক ব্যবহার করা হয়েছিল সেই কাঠ ভালো ছিল না। সেই কাঠ পচে গিয়ে অন্য কাঠেও সমস্যা সৃষ্টি করেছে। আমার মনে হয় ৭৪ কামানের বড় জাহাজ কলকাতায় তৈরী করাটা বাস্তবতাবিবর্জিত সিদ্ধান্ত। কারণ ওখানে জাহাজ নির্মানের জন্য যথাযথ মাপের উপযুক্ত কাঠের অভাব আছে। যেটা চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে হয় না। চট্টগ্রামে জাহাজ নির্মানের জন্য যে কোন আকৃতির গাছ পাওয়া যায়। সবচেয়ে ভালো কাঠের নাম হলো লাল জারুল। লাল জারুল তিন রকমের হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে মজবুত হলো কাঁটা জারুল গাছ।…..”

 

এই বিবরণটুকু পড়ে বোঝা যায়  অষ্টাদশ শতকে জাহাজ নির্মানের সক্ষমতায় কলকাতার তুলনায় চট্টগ্রাম অনেকখানি এগিয়ে ছিল। বস্তুতপক্ষে জাহাজ নির্মানের উপযুক্ত কাঠের প্রাচুর্যের কারণেই প্রাচীনকাল থেকে চট্টগ্রামে জাহাজ নির্মান শিল্প গড়ে উঠেছিল। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সেগুল, জারুল, শাল জাতীয় গাছ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেতো। সেই কাঠ দিয়ে স্থানীয় কারিগরেরা শত শত বছর ধরে জাহাজ তৈরি করে বিদেশে রপ্তানী করে আসছিল। গ্রীক সভ্যতার সময়েও চট্টগ্রামের জাহাজ আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে রপ্তানী হয়েছে সেরকম কিংবদন্তীও আছে। যদিও সেই  প্রাচীন যুগের কোন জাহাজের উদাহরণ আমাদের কাছে নেই। এমনকি মোগল যুগে তৈরি জাহাজের রেকর্ডপত্রও নেই। বৃটিশ নির্মাতারাই চট্টগ্রামে তৈরি জাহাজের তালিকা রাখতে শুরু হয়েছিল। 

 

চট্টগ্রামে বৃটিশ শাসন শুরু হবার পর স্থানীয়দের পাশাপাশি বৃটিশ ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রামের জাহাজ নির্মান শিল্পে বিনিয়োগ করতে শুরু করে। বড় বড় জাহাজগুলো বৃটিশদের নির্মাতাদের অধীনে তৈরি হতো। আদিকাল থেকে তৈরি হওয়া সেইসব জাহাজের কোন হিসেব রাখেনি কেউ। প্রথম দিকে বৃটিশ নির্মাতারা যখন এই খাতে স্বল্প পরিসরে বিনিয়োগ শুরু করে তখনো জাহাজগুলোর কোন হিসেব রাখা হতো না। কারণ তখন কলকাতার তুলনায় চট্টগ্রাম নিতান্তই অখ্যাত শহর। চট্টগ্রাম বন্দরের সমৃদ্ধি অতীত হয়ে গেছে মোগল যুগের আগেই। আরাকান পর্তুগীজ যৌথ দুর্বৃত্তপনায় এই অঞ্চল বাণিজ্যরহিত হয়ে পড়ে। মোগল আমল থেকে এটি মূলত আরাকান সীমান্তের একটা বাফার জোন হিসেবে ছিল। কোম্পানির কাছে স্টেশন হিসেবে চট্টগ্রামের গুরুত্ব একটা মফস্বল শহরের মতো। কিন্তু জাহাজ নির্মান শিল্পটা কোনভাবে টিকে ছিল। বৃটিশরা এই শহর অধিকার করার পর থেকে সেই শিল্প আবারো চাঙ্গা হয়ে উঠতে শুরু করে। চট্টগ্রামে নির্মিত জাহাজগুলোর তালিকা পাওয়া যায় ১৭৯৪ সাল থেকে। সেই তালিকায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে এবং উনিশ শতকের প্রথম দুই দশকে  চট্টগ্রাম থেকে ছোটবড় কয়েকশো জাহাজ রপ্তানী হয়েছিল। তার মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য জাহাজ:

 

Thetis(1794) - 498 ton,

Margaret(1794)-300 ton,

Union(1794) -350 ton,

Ceres(1796)- 400 ton,

Hellen(1802) -450 ton,

Harriett(1803)- 450 ton,

Forbes(1803) -530 ton,

Hibernia(1810) -450 ton,

Orient(1812)- 579 ton,

Alexander(1812) - 660 ton,

Frances Sherburne(1814) -450 ton,

Thalia(1815) 641 ton,

Percy(1815) 650 ton,

Victory(1816) 677 ton,

Dorah(1816) 695 ton,

Alfred(1818) 681 ton,

 

এই তালিকার সবচেয়ে পুরোনো জাহাজটি হলো  থেটিস (Thetis)। ১৭৯৪ সালে নির্মিত হয়েছিল ৪৯৮ টনের এই জাহাজ। লয়েডস রেজিষ্টার থেকে জানা যায় জাহাজটি ১৮৩৯ সালের পরও চালু ছিল। তালিকায় থেটিস সবচেয়ে পুরোনো জাহাজ হলেও তার আগেও চট্টগ্রামে চমৎকার সব জাহাজ তৈরি হতো। তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি বলে সেই জাহাজগুলোর কথা হারিয়ে গেছে। চট্টগ্রামে জাহাজ নির্মানের সেই স্বর্ণযুগে বছরে গড়ে ৮-১০টি বড় জাহাজ রপ্তানী হতো। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তৈরি জাহাজগুলো হিসেব করলে সংখ্যাটা আরো বেশি হবে। সেই জাহাজগুলো এশিয়া ছাড়াও ইউরোপ আমেরিকার বন্দরগুলোতেও যাতায়াত করতো। উপরের তালিকার মধ্যে ১৮১৮ সালে নির্মিত ৬৮১ টনের Alfred জাহাজটি ছিল সবচেয়ে খ্যাতিমান। জাহাজটি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে সারা পৃথিবীর সবগুলো মহাদেশে চলাচল করেছে। জার্মান নৌবাহিনীতে যুক্ত হবার পরে নতুন নাম হয়েছিল Frigate Deutchland নামে। অচল হয়ে যাবার পরও জাহাজটি সংরক্ষণ করা হয়েছিল মেরিটাইম জাদুঘরে। ২০১৮ সালে জাহাজটির খোঁজ পেয়েছিলাম জার্মানীর ব্রেমারহেভন মেরিটাইম জাদুঘরের সূত্র থেকে।

 

ততটা বিখ্যাত না হলেও চট্টগ্রামে তৈরি আরেকটি জাহাজের খোঁজ মিলেছে সম্প্রতি। জাহাজটির নাম ‘শার্লট অব চিটাগং’। উপরের তালিকায় জাহাজটির নাম নেই, কারণ তালিকা রাখা শুরু হয়েছিল আরো দুবছর পর থেকে। রেজিষ্টারে নাম না থাকলেও জাহাজটির ছবি এখনো ঝোলানো আছে লন্ডনে পৃথিবীর সময়কেন্দ্র বলে পরিচিত গ্রীনউইচ মানমন্দিরের পাশের ন্যাশনাল মেরিটাইম জাদুঘরে। শুধু ছবি নয়, ছবির সাথে একটা বিস্তারিত বিবরণীও ঝোলানো আছে। 

  


 

গ্রীনউইচ মেরিটাইম মিউজিয়ামের বিবরণীতে জাহাজটি সম্পর্কে লেখা হয়েছে:

 

হুগলী নদীতে নোঙর করা ‘শার্লট অব চিটাগং’ এবং অন্যন্য জাহাজ

 

এই ছবিতে কলকাতার হুগলী নদীতে নোঙর করা স্নো জাতের জাহাজ ‘শার্লট অব চিটাগং’ এর দুটি দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। ছবির বাম দিকে স্টার্ণ ভিউ দেখা যাচ্ছে যেখানে জাহাজের নামটা লেখা আছে। মাঝখানে প্রশস্ত অংশে পুরো জাহাজটা দৃশ্যমান যেখানে বৃটিশ পতাকা উড়ছে। পেইন্টিংটার তারিখ দেখে বোঝা যাচ্ছে সেই সময়ে কলকাতা বৃটিশ ভারতের রাজধানী ছিল এখান থেকে যেসব জাহাজ চলাচল করে তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রনে থাকে যেটা রাজকীয় নেভাল জাহাজের মতো দেখায়। বড় বড় যাত্রীবাহী জাহাজগুলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তাদের মালামাল এবং কর্মচারীদের পরিবহন করার কাজে ব্যবহার করতো এবং ভারতের বিভিন্ন নদী পথ এবং সমুদ্র উপকূলে চলাচল করতো। এইসব বাণিজ্য নিঃসন্দেহে লাভজনক ছিল বলে শার্লটের মতো পুবে তৈরি দেশীয় মালিকানাধীন ছোট ছোট জাহাজগুলোকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এশিয়ার বিভিন্ন বন্দরে মালামাল আনা নেওয়ার কাজে ব্যবহার করতো। ইউরোপীয়ানরা ভারত মহাসাগরে পা দেবার শত শত বছর আগে এই ধরণের সমুদ্র বাণিজ্য এই অঞ্চলে চালু ছিল।

 

জাহাজটিকে নোঙর করা অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। জাহাজের উপরিভাগে ছায়া দেবার জন্য একটা সামিয়ানা টাঙানো আছে, সেখানে পাগড়ি পরা কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে। জাহাজের মধ্যভাগে এক নারীকে দেখা যাচ্ছে। আলোর স্বল্পতা এবং মেঘের পেছনে সোনালী রঙের আভা দেখে মনে হচ্ছে এটা  সূর্যোদয়ের সময়। ছবিতে খুব বেশি জনসমাগম দেখা যাচ্ছে না। যে কোন পশ্চিমা শিল্পী ভারতীয় শহরগুলোর ক্ষেত্রে এরকম জনবিরল দৃশ্য এঁকে থাকে। ছবিটার মধ্যে একটা শান্ত নীরবতা বিরাজ করছে এবং ছবির নিন্মভাগে জলের প্রতিবিম্বের মধ্যে সেটা প্রতিফলিত হয়েছে। কলকাতার দালানকোঠার মধ্যে ব্যবসাবাণিজ্যের মধ্যে পশ্চিমা প্রভাব ফুটে উঠেছে উদিত সূর্যের সোনালী আভার মতো। ডানদিকে যে ব্রিগ ধরনের ইয়ট দেখা যাচ্ছে সেটা নৌবাহিনীর নয়। দূরে ডানদিকে দেখা যাচ্ছে জেটির পাশে কয়েকটা ষাঁড় একটা গরুগাড়িকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির পেছনে পেছেনে হেঁটে যাচ্ছে দুই ভদ্রলোক।

 

ছবিটা এঁকেছিলেন বিখ্যাত শিল্পী বালথাজার সলভিন। তিনি ১৭৮৯ সালে ভারতে এসেছিলেন। তখন তিনি ভারতীয় নৌযান নিয়ে বেশ কিছু ছবি এঁকেছিলেন। যেই ছবিগুলো পরবর্তীকালে 'Pleasure Boats and Boats of Landing' নামে একটা গ্রন্থে যুক্ত করেছিলেন।

 

এ যাবত প্রাপ্ত চট্টগ্রামে তৈরি জাহাজের মধ্যে সেই প্রথম চট্টগ্রামের নাম যুক্ত করা হয়েছিল। যেহেতু ১৭৯২ সালে জাহাজটির ছবি আঁকা হয়েছে তাতে নিশ্চিত বলা চলে জাহাজটি সেই বছর কিংবা তার অল্প কিছুকাল আগে নির্মিত হয়েছিল। জাহাজের নির্মাতা হিসেবে ইংরেজ নাবিক জর্জ পালভাসের নাম পাওয়া গেছে। এই জাহাজটির ইতিহাস বেঁচে আছে বিখ্যাত শিল্পী বালথাজার সলভিনের কারণে। তিনি ১৭৯২ সালে হুগলী বন্দরে নোঙর করা অবস্থায় জাহাজটিকে দেখে একটি ছবি এঁকেছিলেন। সেই ছবিটাই সংরক্ষণ করেছে লন্ডনের ন্যাশনাল মেরিটাইম মিউজিয়াম। মিউজিয়ামের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে এটি অনেকটা প্রমোদ তরী ধরণের জাহাজ ছিলো। তবে ভিন্ন একটি সূত্রে জানা যায় এই জাহাজটি ১৭৯৪ সালে চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশকারী বার্মিজ সৈন্যদের বিরুদ্ধে কর্নেল এরস্কিনের অভিযানের সময় রসদ পরিবহনের কাজেও ব্যবহার করা হয়েছিল। এ যাবত খোঁজ পাওয়া চট্টগ্রামে নির্মিত জাহাজের মধ্যে এটাই সবচেয়ে প্রাচীন। জাহাজটির নাম ‘শার্লট অব চিটাগং’। শিল্পী একই ফ্রেমে জাহাজের দুই দিকের ছবি এঁকেছেন যাতে পেছন দিকে খোদাই করা জাহাজের নামটা পড়া যায়। ছবিতে দেখা যাচ্ছে  জাহাজের পেছন দিকে খোদাই করা আছে - CHARLOTTE of CHITTAGONG

 

কিন্তু চট্টগ্রামের সেই সমৃদ্ধ জাহাজ নির্মান শিল্পে ধীরে ধীরে ভাটা নেমে আসতে থাকে। কারণ কর্নফুলী নদীর চেয়ে হুগলী নদী অনেক বেশি ব্যস্ত বন্দর।  কোম্পানির কাছে হুগলী নদীতে জাহাজ নির্মান সুবিধাজনক ছিল। বিশেষ করে ১৮০৩ সালে কলকাতার খিদিরপুর ডক নির্মিত হবার পর কলকাতার জাহাজ নির্মানশিল্প নতুন ভাবে বেড়ে উঠতে থাকে। তবে সেখানে পুরোদমে জাহাজ নির্মান শুরু হতে আরো কয়েক দশক লেগেছিল। তার হবার আগ পর্যন্ত চট্টগ্রামেই সবচেয়ে বেশি জাহাজ তৈরি করা হতো। ১৮৩৪ সালের পর থেকে চট্টগ্রামের চেয়ে কলকাতায় নির্মিত জাহাজের সংখ্যা বেড়ে যায়। উনিশ শতকের শেষভাগে চট্টগ্রামের বৃটিশ মালিকানাধীন জাহাজ নির্মানের কারখানাগুলো কমে আসতে থাকে। একসময় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জাহাজ নির্মানশিল্প ইতিহাসের পাতায় আশ্রয় নেয়।

 

তথ্যসূত্র:

1. National Maritime Museum, Greenwich, London.

2. A Collection of Papers Relative to Ship Building in India - John Phippy (Calcutta, 1840)

3. অতীত চিত্রে চট্টগ্রাম - শেখ শওকত কামাল

৪. Accounts and Papers of East India(For House of Commons), Vol-34 (1845)


দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড লিংক :

https://www.tbsnews.net/bangla/%E0%A6%87%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%B2/news-details-179334

Friday, November 24, 2023

উন্নয়নের বিপক্ষে

উন্নতি একটা নেশা- প্রয়োজন নয়। নেশার কারণেই সব মানুষ উন্নতির পেছনে ছোটে। সেটা ইলন মাস্ক হোক কিংবা গণি মিয়া হোক। কিন্তু যথেষ্ট হয়েছে আর উন্নতি চাই না- এই কথা কেউ বলে না। আমার যতকিছুই থাকুক, আরো উন্নতি করতে হবে। উন্নতি না করা একটা অযোগ্যতা। যেন আমরণ শুধু উন্নতি করার জন্য মানুষের জন্ম হয়েছে। উন্নতিই মানুষের একমাত্র লক্ষ্য। এটা খুব হাস্যকর একটা প্রবণতা। তার চেয়ে বড় কথা উন্নতির কারণেই মানবসভ্যতা ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে।

সম্ভবত মানুষের সভ্যতা ধ্বংসের সূচনা হয়েছে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে। যন্ত্রের উন্নতির সাথে মানুষ একের পর এক যেসব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে, তার একাংশে মানুষের মঙ্গল হলেও আরেকটা অংশ মানুষের ধ্বংসের পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মূলত বিশ শতকের শুরু থেকে মানুষ একের পর এক সভ্যতা বিনাশকারী আবিষ্কার করে যাচ্ছে। অতি দ্রুত শিল্পোন্নয়নের কারণে পরিবেশ প্রকৃতি ধ্বংস হয়ে যেমন এই গ্রহের ভবিষ্যতকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে, তেমনি মানুষ সচেতনভাবেই পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য যেসব মারাণাস্ত্র তৈরি করেছে সেটাও মানুষকের ধ্বংস ত্বরান্বিত করছে। কিন্তু মহাশক্তিধর দেশগুলো সেদিকে চোখ বন্ধ করে উন্নতি চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ ভাবছে না এত উন্নতির আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা। এত যন্ত্রের উৎপাদনের দরকার আছে কিনা, বছর বছর নতুন গাড়ির দরকার আছে কিনা। বৈশ্বিক উষ্ণতা, পরিবেশ বিপর্যয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসব শব্দ কেবল কথার কথা হিসেবে বলা হয়। যাদের দায়িত্বশীল হবার কথা তাদের কেউ দায়িত্বশীল হয় নি। যাদের লাগাম টেনে ধরার কথা তাদের কেউ টেনে ধরছে না।

অথচ মানবসভ্যতাকে বাঁচাতে হলে উন্নতির চাকা থামাতে হবে। শিল্প উন্নয়নকে সীমিত করতে হবে। এত গাড়ি, এত যন্ত্র, এত অস্ত্র, এত আসবাবের প্রয়োজন নেই।

ছোট একটা উদাহরণ দেই। আমরা ১০ টাকা দামের ওয়ান টাইম যে বলপয়েন্ট কলমটা ব্যবহার করি, সেটা রিফিল করার ব্যবস্থা থাকলে আরেকটা কলম কিনতে হতো না। এখন আমরা প্রতি মাসে একটা শিশুর জন্য গড়ে ৫টা কলম কিনি। বছরে ৬০টা কলম লাগে। অথচ রিফিল করার ব্যবস্থা থাকলে হয়তো বছরে ৫টার বেশি কলম লাগতো না। পৃথিবীতে ৩০০ কোটি মানুষের যদি বছরে ৬০টি করে কলম লাগে তাহলে ১৮ হাজার কোটি কলম উৎপাদন করতে হবে। ১৮হাজার কোটি প্লাস্টিক পন্য উৎপাদিত হয় শুধু কলমের জন্য। কলম হলো আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহার করা জিনিসের মধ্যে খুব তুচ্ছ একটা জিনিস। তার চেয়ে  অন্যন্য জিনিস অনেক বেশি ব্যবহার করা হয়। এবং আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের যত জিনিসপত্র আছে তার প্রায় সবগুলোতে কোন না কোনভাবে প্লাস্টিক আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বর্জ্য উৎপাদিত হয় প্লাস্টিক পন্যে। অন্য কিছুর কথা বাদ দিলেও শুধু পলিথিন ব্যাগই যথেষ্ট আগামী একশো বছরে পৃথিবীর সবগুলো নদী নালা সমুদ্রের অর্ধেক ভরাট হয়ে যাবার জন্য।

আমরা যদি চাহিদা না কমাই, তাহলে এসব পন্যের উৎপাদন হতে থাকবে। প্রয়োজনের পাশাপাশি অপ্রয়োজনেও আমরা নতুন নতুন জিনিসপত্র কিনি। প্রতিটি পন্যের সাথে আছে পলিথিন, প্লাস্টিক। নতুন পন্য মানে নতুন প্যাকেজ। নতুন প্যাকেজ মানেই পলিথিন। একটা নতুন পন্য মানেই প্লাস্টিকের একটা বাড়তি টুকরো। একটা নতুন পন্য কেনা থেকে বিরত থাকলে পৃথিবীর একটু উপকার হয়। পৃথিবীর উপকার হলে আপনার ভবিষ্যত প্রজন্ম ভালো থাকবে। আপনি এত ধন সম্পদের সঞ্চয় করছেন ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা ভেবে। যদি পৃথিবীটা ভালো না থাকে তাহলে আপনার ধন সম্পদ ব্যবহার করেও ওরা নিরাপদ জীবন পাবে না। 

মানুষের চাহিদার কোন শেষ নাই। যার একশো কোটি টাকা আছে তিনি চেষ্টা করেন এক হাজার কোটি টাকার মালিক হতে। যার এক হাজার কোটি আছে তিনি দশ হাজার কোটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। এটা রিকশাওয়ালা থেকে বিলিয়নিয়ার সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই চাহিদার পুরোটাই হলো নেশা। এখানে প্রয়োজনের সীমানা আপেক্ষিক ব্যাপার।

আসলে এত উন্নতি কী আমাদের দরকার আছে? মানুষের গড় আয়ু ৭০-৮০ বছর। এই জীবনটুকু কাটানোর জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু হলে নিজেকে থামতে বলেন। আপনি থামলে সভ্যতার উপকার হবে। সত্যি হবে।

মানুষের এই অসীম চাহিদা আসলে কোন উপকারে আসে না। এই বিষয়ে কোথাও নীচের কথাগুলো পড়েছিলাম। কার কথা মনে নেই কিন্তু কথাগুলো বেশ পছন্দ হয়েছিল বলে নোট করে রেখেছিলাম-

We shall all be buried with our relatives and friends in 100 years, just as we were in 2123. Strangers will reside in our homes, which we have worked so hard to build, and they will own all we own now. All of our stuff, even the car we spent a fortune on, will be unknown and unborn, and will most likely be scrapped, preferably in the hands of an unknown collector. Our descendants will have little or no idea who we were, let alone remember us. How many of us are familiar with our grandfather's father? After we die, we will be remembered for a few years, then we will be simply a portrait on someone's bookshelf, and our history, photos, and deeds will vanish into history's oblivion. We won't even be remembered. If we halted one day to consider these things, we might see how foolish and weak the goal to get it all was. If we could simply think about it, our approaches and thoughts would undoubtedly alter, and we would be different individuals. Always wanting more, there is no time for what is truly significant in life. I'd change all this to live and enjoy the walks I've never taken, these hugs I didn't give, these kisses for our children and our loved ones, these jokes we didn't have time for. Those would certainly be the most beautiful moments to remember, after all they would fill our lives with joy. And we waste it day after day with greed, greed and intolerance.

এখানে যে কথাটা বোঝাতে চেয়েছে তার সারাংশ হলো -২১২৩ সালে আপনাকে মনে রাখার মতো একজন বংশধরও হয়তো থাকবে না। মনে রাখলেও সেটা আপনার কোন কাজে আসবে না। আপনাকে মনে রাখার জন্য আপনি এখন হাজার কোটি টাকা খরচ করলেও কাজ হবে না। বরং আপনার এখনকার অতি উন্নতি হয়তো তাদের ভবিষ্যতকে অন্ধকার করে দেবে বলে মনে রাখার বদলে তারা আপনাকে গালিও দিতে পারে। আপনি এখন নিজের উন্নতি করতে গিয়ে ভবিষ্যতের জন্য অন্ধকারের চাষ করছেন। আপনার উন্নতির সেবার করার জন্য তৈরি করা প্রতিটি শিল্পপন্য পৃথিবীর পরিবেশকে দুষিত করছে প্রতিনিয়ত। প্রতিদিন ৮০০ কোটি মানুষ ৮০০০ কোটি শিল্প পন্য ব্যবহার করছে কোন না কোনভাবে। তাদের সবগুলোই ভবিষ্যতের বিষ।

মোদ্দাকথা হলো- আপনার অপ্রয়োজনীয় উন্নতির নেশাটা লোভ কমাতে পারলে ভবিষ্যত পৃথিবী একটু কম বিষাক্ত হবে।

Tuesday, November 7, 2023

আগামী বসন্তে দেশ ও পৃথিবী

 ১. এই মুহূর্তে পৃথিবীতে মানবতার সবচেয়ে বড় শত্রু আমেরিকা, ইসরাইল এবং তাদের সমর্থক। ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার হলো নির্বিচার হত্যাকাণ্ড। এমন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পৃথিবীতে কেউ বেশিদিন রাজত্ব করতে পারেনি। পারবে না। হিটলার পরবর্তী যুগের মতো পৃথিবীতে নতুন একটা মেরুকরণ হতে পারে।

২. দেশে অপ্রত্যাশিত কোন ব্যাপার ঘটতে পারে। কেউ জল ঘোলা করে মাছ শিকার করতে চায়। অতীতেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হতে পারে। কিছু নির্বোধ আত্মতৃপ্তিতে আছে, তাদের স্বপ্নভঙ্গ হতে পারে। এবার কোন মাত্রার ঘটনা ঘটবে সেটা এখনো ধোঁয়াশা।

আগামী বসন্ত আসছে নতুন কোন আশঙ্কা নিয়ে। দেশ ও পৃথিবী উভয়ক্ষেত্রেই। 

তোমরা তখন কোথায় থাকবে, কী করবে? তোমাদের কথা ভাবছি আমি। তোমরা নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে এখনো সচেতন নও। যখন বুঝতে পারবে, তখন দেরি হয়ে যাবে। তোমাদের ভুলের কারণে গোটা জাতিকে মূল্য দিতে হতে পারে।


Sunday, November 5, 2023

নির্বোধ প্রলাপ

"মানুষের আয় বাড়ায় বাজারে চাপ, তাই দেশের দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি হয়েছে।"

-পরিকল্পামন্ত্রী

এই সংবাদ শিরোনামটা ভাসছে টিভির স্ক্রলে। ভাবতে অবাক লাগে এরকম স্টুপিড লোকেরা সরকার চালায়। কতটা নির্বোধ হলে মানুষের দুরাবস্থার মধ্যে এমন অবান্তর অবাস্তব হাস্যকর কথাবার্তা বলতে পারে! 

এরা কেউ বাজারে যায় না, নিজের বেতনে সংসার চালায় না। সে কারণেই এমন দায়িত্বহীন নির্বুদ্ধিতায় পরিপূর্ণ শব্দাবলী এদের মুখ থেকে নির্গত হয়। 


Thursday, November 2, 2023

ক্যারিয়ারের হ্যাঁ অথবা না

আমি ক্যারিয়ার বিমুখ মানুষ। তবু মাঝে মাঝে ক্যারিয়ার নিয়ে তরুণদের অনুরোধে কিছু পরামর্শ দিয়ে থাকি। সেটা ঠিক ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং জাতীয় বিষয় নয়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা নিয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহনের পরামর্শ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশ্ন থাকে এরকম-


আমি ‘আলফা’ কোম্পানিতে চাকরি করছি। মোটামুটি ভালো বেতন পাই। কিন্তু আমার কাছে ‘ডেলটা’ কোম্পানি থেকে আরো বেশি বেতনের অফার এসেছে। আমি কী করবো?


পরামর্শ দেবার আগে আমি নিজের অভিজ্ঞতার গল্পটা শোনাই।


আমি একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার শুরু করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্টের আগেই চাকরিটা হয়ে যায়। পরিবার তখন কঠিন অবস্থায় ছিল, তাই আমাকে কঠিনতম একটা চাকরিতেও হ্যাঁ বলতে হয়েছিল। আমার চেয়ে কঠিন চাকরি করেছে আত্মীয় বন্ধুদের মধ্যে সেরকম একজনও দেখি নাই। শুধু একটা উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। আমি প্রথম ছ মাস বোধহয় কোন সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া সকাল সাতটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত অফিস করেছি। কখনো কখনো রাত বারোটায়ও বাসায় ফিরেছি। ছ মাস পর থেকে আমরা মাসে এক শুক্রবার ছুটি পেতাম। এক বছর পর মাসে দুদিন ছুটি। এভাবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। আমার সাথে বারোজন অফিসার যোগ দিয়েছিল, তাদের মধ্যে আমি ছাড়া আর কেউ টিকে থাকতে পারেনি। আমি কিভাবে পেরেছিলাম সেটা ভাবলে এখনো অবাক হই। কিন্তু প্রথম দেড় বছরের কঠিনতম সময় অতিক্রম করার পুরস্কারও পেয়েছিলাম ডাবল প্রমোশন এবং ডাবল ইনক্রিমেন্ট পেয়ে। তিন বছরের মধ্যে বিভাগীয় প্রধান হতে পেরেছিলাম। কোন সন্দেহ নেই এই পুরস্কারগুলো আমার পরিবারকে দুঃসময় থেকে রক্ষা করেছিল এবং আমার বাকী জীবনের ভিত গড়ে দিয়েছিল। পাঁচ বছরের মধ্যে আমি স্বয়ংসম্পূর্ণ একটা অবস্থায় পৌঁছে যেতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমার কাজকর্ম পছন্দ হওয়াতে কোম্পানি আমাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিতে শুরু করে। অনেক সময় যে কাজের যোগ্য আমি নই, সেরকম কাজেও আমাকে পাঠাতেন। সম্ভবত ১৯৯৭/৯৮ সালের দিকে একবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিশিষ্ট শিল্পপতিদের মিটিং হবে। নিমন্ত্রণ করা হয়েছে আমাদের কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীকে। কিন্তু শীর্ষ নির্বাহী না গিয়ে তাঁর স্টিকার লাগানো গাড়িটা দিয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে। আমার চাকরি তখন তিন বছরও হয়নি। মজার ব্যাপার হলো আমার মতো কম বয়সী একজনকে সেখানে দেখে আমার টেবিলে বসা কয়েকজন শিল্পপতি ভেবেছিলেন আমি হয়তো নব্য ধনী কারো পুত্র কিংবা বাপের টাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। ভাগ্য ভালো সেখানে আমাকে কোন সংলাপে অংশ নিতে হয়নি। শুধু ভোজন সভার দায়িত্ব পালন করেছিলাম নিঃশব্দে।


এই গল্পটা বলার উদ্দেশ্য হলো- কোম্পানির এতখানি ভালোবাসা আর আস্থা, সেটা যেমন আনন্দের, অন্যদিকে বিপদেরও। আনন্দের কথাটা বললাম বিপদের কথাটা বলি এবার। 


ক্যারিয়ারের সেই পর্যায়ে আমি চাইলে দেশ বিদেশের আরো বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে বেশি বেতনে ঢুকে পড়তে পারতাম। আমার কাছে প্রায়ই সেরকম নিমন্ত্রণ আসতো। কিন্তু আমি আটকে গেলাম। কোম্পানি আমাকে কিছুতেই ছাড়বে না। শীর্ষ নির্বাহীর অনুরোধ অগ্রাহ্য করলে চলে যেতে পারতাম। কিন্তু  আমি ক্যারিয়ারিষ্ট ছিলাম না বলে থেকে গেলাম। প্রায় বিশ বছর। কিন্তু এটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বুঝতে পারি আরো কয়েক বছর পর। 


দশ বছর পর কোম্পানির পলিসিগত এমন কিছু পরিবর্তন আসে, যার প্রতিক্রিয়ায় শীর্ষ নির্বাহী নিজেই পদত্যাগ করেন। ব্যাপারটা আমার জন্য সুখকর ছিল না। আমিও পদত্যাগ করতে পারতাম, কিন্তু তখন আমার হাতে তখন সেই সুযোগগুলো ছিল না, যেটা পাঁচ বছর আগে ছিল।  দেখা গেছে  প্রথম দশ বছরে আমি যতটা এগিয়েছিলাম, পরের দশ বছর তার অর্ধেকও আগাইনি। অথচ সময়মত বদল করলে আমি ততদিনে অন্য কোন কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীর পদ পেতে পারতাম। শেষ দশ বছর আমার কাছে স্রেফ অপচয় মনে হয়েছিল। আমি ওই সময়টাতে আমি নতুন কিছু শিখিনি, করিনি। পুরোনো কাজেরই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। সে কারণে যে কোন ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বোঝা খুব জরুরী। এটা নিজেকেই নির্ধারণ করতে হয় পরিস্থিতি বুঝে। আমি টার্নিং পয়েন্ট বুঝতে অক্ষম ছিলাম না। কিন্তু যখন সিদ্ধান্ত নেবার দরকার ছিল তখন আমি ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে পড়েছিলাম।


তাই আপনার সামনে যখন কোন সুযোগ আসবে তখন আপনি হ্যাঁ কিংবা না বলার আগে কয়েকদিন সময় দিন নিজেকে। নিজের সাথে বোঝাপড়া করা জরুরী। আপনাকে বুঝতে হবে আপনার বর্তমান অবস্থা কী? আপনার কোম্পানির ভবিষ্যত কী? যে কোম্পানি থেকে অফার এসেছে সে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা এবং পরিবেশ কেমন? যদি কর্পোরেট পরিবেশ ভালো না হয় তাহলে বেশি বেতন দিলেও সে চাকরি নেয়া উচিত নয়। ভালো কোম্পানি হলে বেতন বেশি না হলেও হ্যাঁ বলতে পারেন। কিন্তু আপনি বর্তমান চাকরিতে যদি সন্তুষ্ট থাকেন, যদি আপনার কোম্পানি স্থিতিশীল আর্থিক অবস্থায় থাকে তাহলে চট করে লাফঝাপ না দেয়াই ভালো। কিন্তু কোম্পানির কারো প্রেমে অন্ধ হয়ে চাকরিকে আকড়ে ধরা উচিত নয়। সম্ভবত এপিজে আবুল কালাম বলেছিলেন-   Love your job but don't love your company, because you may not know when your company stops loving you!


Monday, October 30, 2023

নতুন শিক্ষাপদ্ধতির তামাশা

 নতুন শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে যারা মতামত দিচ্ছে, তাদের অধিকাংশই এই বিষয়ে অনেকাংশে অজ্ঞ। অর্থাৎ পক্ষ বা বিপক্ষে যারা লিখছে তাদের কারোরই ব্যাপারটা নিয়ে পুরো ধারণা নেই। তাই ব্যাপারটা অন্ধের হস্তিদর্শনের মতো হয়ে যাচ্ছে। এমনকি সরকারের মন্ত্রীদেরও বিষয়টা নিয়ে পুরো ধারণা নাই। থাকলে একপেশে কথাবার্তা বলতে পারতো না।

আমি বাংলাদেশের মুষ্টিমেয় সেই কয়েকজন অভিভাবকদের একজন যারা গত বছর থেকে পাইলট প্রকল্প নিয়ে সরকারের এই নতুন শিক্ষাপদ্ধতির ভুক্তভোগী। আমার পুত্র গত বছর পাইলট প্রকল্পে গিনিপিগ ছিল।

তখন থেকে তার সমস্ত পড়াশোনা বদলে গেছে। সে এখন বই পড়ার সময় পায় না। অংক করার সময় পায় না। ইংরেজি শেখার সময় পায় না। তাকে সবগুলো বিষয় পড়তে হয় কাগজ কেটে কেটে। খাতা কলমের বদলে তাকে আমার কিনে দিতে হয় কাঁচি, আর্টপেপার, চার্টপেপার, গাম, রঙপেন্সিল ইত্যাদি। সে বীজগণিতের সূত্র লেখে কাগজ কেটে। তাকে কবিতার লাইন লিখতে হয় কাগজ কেটে বোর্ডে সাঁটিয়ে, তাকে বিজ্ঞান পড়তে হয় সেও কাগজ কেটে, গাম দিয়ে রঙিন বোর্ডে লাগিয়ে। এগুলো করতে যে পরিমান খরচ হয় সেটার কথা বাদই দিলাম, কিন্তু প্রতিদিন রাত একটা দেড়টা পর্যন্ত সে ঘুমাতে যেতে পারে না এসব করতে গিয়ে। আমি অসহায় হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি সে গলদঘর্ম হয়ে এসব করছে। শুধু কী ছাত্র, ছাত্রের মা বাবা দাদা দাদী সবাইকে ব্যস্ত থাকতে হয় এসব সামলাতে গিয়ে। আমি সেদিন দেখলাম সে কান্না করে দেবার অবস্থা হয়েছে। তাকে হোমওয়ার্ক দেয়া হয়েছে একটা ফসিল তৈরি করতে। তাকে নরম কাদা যোগাড় করতে হবে, গাছের পাতা এনে সেই কাদায় চুবিয়ে রাখতে হবে কয়েকদিন, তারপর সেটা শুকিয়ে ভেতরে যে ছাপ পড়বে, সেটা একটা ফসিলের চেহারা নেবে। তারপর কাদা সহ সেই ফসিল স্কুলে নিতে হবে। আমি ব্যাপারটা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। বাড়ির কাজ এমন হতে পারে। তখন সে বই খুলে দেখালো বাড়ির কাজ। এখন একটা ফসিল কিভাবে তৈরি হয় সেটা শেখানোর জন্য ঘরে ঘরে যদি কয়েক কোটি ফসিল তৈরির কারখানা করা হয় সেটা কী একটা সুস্থ শিক্ষা ব্যবস্থা? এরকম অসংখ্য পাগলামি উদাহরণ আছে।

সে কারণে আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি যার বাচ্চা এই শিক্ষাপদ্ধতির শিকার তারা কেউ এটার পক্ষে কথা বলবে না। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টা পুরোপুরি জানলে এটা এখনই বাতিল করবেন। বাংলাদেশে এত বড় পাগলামি শিক্ষা ব্যবস্থা আর কখনো আসেনি।


বলে রাখি, আমার পুত্র যে স্কুলে পড়ে সেই স্কুলটা একটা বিশেষায়িত স্কুল। সেখানে এসব নিয়ে শিক্ষা দেবার মতো যথেষ্ট অবকাঠামো আছে। তাদের বেশ কয়েকজন শিক্ষক গত বছর থেকে পাইলট প্রকল্পটির প্রশিক্ষক ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশে সেই অবকাঠামো খুব কম স্কুলেই আছে। তাই এরকম পদ্ধতি অধিকাংশ স্কুলে জোড়াতালি দিয়ে চলবে। কিছুই দাড়াবে না শেষমেষ। আমার বাচ্চার স্কুলে অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও আমি এই পদ্ধতির ঘোরতর বিরোধী। শুরুতে আমিও বইগুলো দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলাম। এত সুন্দর বই আগে দেখিনি এদেশে। কিন্তু যখন তার প্রয়োগ শুরু হলো তখন আমার মাথায় বাজ পড়লো। আমি নিশ্চিত যে কোন অভিভাবকেরই এই অবস্থা হবে।


আসলে সময় তো এদেশে সস্তা। সে কারণেই এত নিরীক্ষা চলছে বছরের পর বছর। সারা পৃথিবীতে হাইস্কুল লেভেলে পড়াশোনার যে চাপ যেখানে গণিত বিজ্ঞানের মতো বিষয় শিখতে গিয়ে ছেলেমেয়েরা হিমশিম খায়, সেখানে আমাদের দেশে এসব খেলো নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এই ধরণের শিক্ষাগুলো কিণ্ডারগার্টেন লেভেলের বাচ্চাদের জন্য দেয়া হয় উন্নত বিশ্বে। আমাদের দেশে সেগুলো নিয়ে প্রয়োগ করা হচ্ছে হাইস্কুলে।


নতুন শিক্ষাপদ্ধতির আরেকটা উদাহরণ দেই। কাগজ কিভাবে আবিষ্কার হয়েছে সেটা বোঝাতে গিয়ে বাচ্চাদের বলা হয়েছে ঘরে বসে পুরোনো বইপত্র ছিড়ে সেই কাগজ ভিজিয়ে মণ্ড তৈরি করে কাগজ বানিয়ে নিয়ে যেতে। সেই কাগজে আবার গাছের বীজও বুনে দিতে বলা হয়েছে। যেন কাগজ নষ্ট হয়ে গেলে সেটা ফেলে দিলে সেখান থেকে গাছ ওঠে। পৃথিবীটা নাকি এভাবে সবুজ হয়ে যাবে, পরিবেশ রক্ষা পাবে। পরিবেশ বাঁচানোর সেই হোমওয়ার্ক করতে গিয়ে আমার বাসায় তিনদিন ধরে কত কী কাণ্ড হয়েছে সেটা বলতেও ক্লান্ত বোধ করছি। এরকম একটা নতুন পদ্ধতির বাচ্চা যে বাসায় আছে সে বাসার অর্ধেক সদস্য পাগল হয়ে যাবে।

Saturday, October 28, 2023

ডেটলাইন অক্টোবর ১৯৭৪

 আমাদের শহুরের জীবন তখনো শুরু হয়নি। ১ম শ্রেণীতে ভর্তি হতে আমার আরো দেড় মাস বাকী। সত্তর দশকের সংকটাপন্ন সময়ে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত জীবন। এই জীবনের আবছা স্মৃতি আছে আমার।

৫ অক্টোবর ১৯৭৪




২১ অক্টোবর ১৯৭৪