Sunday, June 1, 2014

একটি কবিতার সারমর্ম প্রচেষ্টা


জীবনানন্দ দাশের অন্যন্য কবিতার মতো 'দুজন' কবিতাটি পড়েও দৃষ্টিভঙ্গির ফেরে পাঠকের অর্থবাচক প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন হতে পারে। আমি বিশ বছর আগে যখন কবিতাটি পড়ি তখন একরকম অর্থ ভেবেছি, আজ ভাবছি অন্য রকম। প্রতি ছত্রের নিজস্ব একটা সারমর্ম তৈরী করে ব্র্যাকেটে জুড়ে দিলাম কবিতার সাথে। এহেন অপকর্মে বোদ্ধা লোকের তিরস্কার অতি প্রত্যাশিত পুরস্কার হতে পারে।


আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন-কতদিন আমিও তোমাকে
খুঁজি নাকো;- এক নক্ষত্রের নিচে তবু - একই আলো পৃথিবীর পারে
আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,
প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়,
হয় নাকি?- বলে সে তাকাল তার সঙ্গিনীর দিকে;
আজ এই মাঠ সূর্য সহমর্মী অঘ্রাণ কার্তিকে
প্রাণ তার ভরে গেছে।


[একই নক্ষত্রের নীচে বসবাস করেও দুজন দুজনকে ভুলে পৃথিবীর নিঃশ্বাসে বেঁচেছিল বহুকাল। নক্ষত্রের ঢের আগে মরে যায় নিবিড় প্রেমও..............]

দুজনে আজকে তারা চিরস্থায়ী পৃথিবী ও আকাশের পাশে
আবার প্রথম এল- মনে হয়-যেন কিছু চেয়ে -কিছু একান্ত বিশ্বাসে।
লালচে হলদে পাতা অনুষঙ্গে জাম বট অশ্বথের শাখার ভিতরে
অন্ধকারে নড়ে-চড়ে ঘাসের উপর ঝরে পড়ে;
তারপর সান্ত্বনায় থাকে চিরকাল।

[বিশ্ববটতলে মাত্র দুটো ঝরাপাতা................]

যেখানে আকাশে খুব নীরবতা, শান্তি খুব আছে,
হৃদয়ে প্রেমের গল্প শেষ হলে ক্রমে-ক্রমে যেখানে মানুষ
আশ্বাস খুঁজেছে এসে সময়ের দায়ভাগী নক্ষত্রের কাছেঃ
সেই ব্যপ্ত প্রান্তরে দুজন; চারিদিকে ঝাউ আম নিম নাগেশ্বরে
হেমন্ত আসিয়া গেছে;-চিলের সোনালি ডানা হয়েছে খয়েরী;
ঘুঘুর পালক যেন ঝরে গেছে-শালিকের নেই আর দেরি,
হলুদ কঠিন ঠ্যাং উচুঁ করে ঘুমাবে সে শিশিরের জলে;
ঝরিছে মরিছে সব এইখানে-বিদায় নিতেছে ব্যাপ্ত নিয়মের ফলে।


[হেমন্তদিন পার হলে সোনালী ডানার চিলও হারায় আভা, এই তো জগতের ব্যাপ্ত নিয়ম.........]

নারী তার সঙ্গীকেঃ'পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,
জানি আমি;-তারপর আমাদের দুঃস্থ হৃদয়
কী নিয়ে থাকিবে বল;-একদিন হৃদয়ে আঘাত ঢের দিয়েছে চেতনা,
তারপর ঝ'রে গেছে; আজ তবু মনে হয় যদি ঝরিত না।
হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ আমাদের-প্রেমের অপূর্ব শিশু আরক্ত বাসনা
ফুরোত না যদি, আহা, আমাদের হৃদয়ের থেকে-'


[প্রতিটি প্রেমের হৃদয়ই দুস্থ, প্রতিটি হৃদয়ে রক্ত ক্ষরণ, যদি ভুলগুলো না হতো কিছু ক্ষরণ বেঁচে যেতো আহা.........]

এই বলে ম্রিয়মাণ আঁচলের সর্বস্বতা দিয়ে মুখ ঢেকে
উদ্বেল কাশের বনে দাঁড়িয়ে রইল হাঁটুভর।
হলুদ রঙের শাড়ি, চোরকাঁটা বিঁধে আছে, এলোমেলো অঘ্রাণের খড়
চারি দিকে শূণ্য হতে ভেসে এসে ছুঁয়ে ছেনে যেতেছে শরীর;
চুলের উপর তার কুয়াশা রেখেছে হাত, ঝরিছে শিশির;-
প্রেমিকের মনে হলঃ'এই নারী-অপরূপ-খুঁজে পাবে নক্ষত্রের তীরে
যেখানে রব না আমি, রবে না মাধুরী এই, রবে না হতাশা,
কুয়াশা রবে না আর-জনিত বাসনা নিজে-বাসনার মতো ভালোবাসা
খুঁজে নেবে অমৃতের হরিণীর ভিড় থেকে ইপ্সিতেরে তার।'

[অতঃপর কবি ভাবে.... এই নারী আমাকে না পেলেও খুঁজে পাবে তার ইপ্সিত আশ্রয়, অঘ্রাণের শুষ্কতা পেরিয়ে সে পৌছে যাবে তার অবিরল ঠিকানায়.......]

Saturday, May 31, 2014

এক বৃষ্টি দিনের চড়ুইভাতি

সকালের বৃষ্টির ঝাঁঝালো শব্দ ছাপিয়ে টিঁউটিঁউ করে একটা কোলাহলময় মিষ্টি শব্দ কানে এলো। শব্দটা তেমন জোরালো না। একটু খেয়াল করে শুনলেই বোঝা যাচ্ছে। শব্দের উৎস খুঁজতে জানালার দিকে চোখ গেলে দেখলাম একজোড়া চড়ুই কার্নিশের আড়ালে বসে পালকের পানি ঝাড়ছে তিরতির করে। আমি জানালার এপাশে। ওরা নীলচে কাঁচের আড়ালে আমাকে দেখতে না পেলেও আমি ওদের স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। পাখির জগত প্রায় সবসময় জুটিময়। তবে হলিউডের অ্যাকশান মুভিতে যেমন পুরুষের পাশে জোর করে একটা নারী চরিত্রকে বসিয়ে দেয়া হয় সেরকম আরোপিত কিছু না। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ওরা পাশাপাশি থাকে।

পাশাপাশি থাকলেও ওরা কি একই জুটি কিনা সেটা নিশ্চিত হতে পারি না। মানুষের চোখে সব চড়ুই একই চেহারার। কোনটি কার জুটি তা বোঝা মুশকিল। ওরা কি নিজেদের জুটি চিনতে পারে? পারে নিশ্চয়ই। নইলে অনাচার দুরাচারে ভরে যেতো পক্ষী সমাজ। পাখি সমাজে বিয়ের প্রচলন নেই। মানুষ ছাড়া আর কারো বিয়েশাদীর ঝামেলাও নেই। যে যার মতো জুটি পছন্দ করে। তবু কোথাও অনাচার অজাচার নেই। পশুপাখি সমাজ মানব সমাজের চেয়ে অনেক বেশী গোছানো আর নিয়ন্ত্রিত। বলা হয়, মানুষকে সভ্য নিয়ন্ত্রিত যৌনজীবন যাপনে বাধ্য করার জন্য বিবাহ প্রথার প্রচলন হয়েছিল আদিযুগে। আসলেই কি তাই? মানুষকে তাহলে সৃষ্টি সেরা জীব বলা যায় কিসের যুক্তিতে। যে মানুষ বিয়ের শৃংখলে না থাকলে অসভ্য হয়ে যায়, সেই মানুষ কি করে সেরা প্রাণী হলো? কেন হলো? জ্ঞান বুদ্ধি বিবেকের পাল্লা ভারী বলে? সব জ্ঞানবুদ্ধি কি মঙ্গলময় কাজে লাগানো হয়? নাহ, মানুষকে আমি ঠিক শ্রেষ্ঠত্বের পাল্লায় ফেলতে পারি না।

কিচির মিচির শব্দের ধাক্কায় আমি ভাবুক জগত থেকে বাস্তবে এলাম। পাখি দুটোর মধ্যে কি একটা বিষয়ে যেন তর্ক চলছে। পুরুষ পাখিটা কিছু একটা বোঝাতে চাইছে, কিন্তু নারী পাখিটা মাথা নেড়ে আপত্তি জানাচ্ছে। পুরুষটা আবার একটু পেছনে ফিরে জানালার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে ভেতরে। সে মনে হয় বলতে চাইছে, ওই ফোকরে ঢুকে বসি, ওদিকে বৃষ্টি লাগবে না গায়ে। কিন্তু নারী পাখিটা অধিক সতর্ক। সে বলে-
-মানুষগুলারে একটা খুদের বিশ্বাসও নাই।
-ক্যান? বিশ্বাস নাই ক্যান? কোনদিন দেখছো কোন মানুষ চড়ুই শিকার করছে?
-ঐ তুই আমাত্তে বেশী বুঝস? দুনিয়ার হালচাল কি বুঝস তুই, অ্যাঁ, কি বুঝস? আছিস তো খালি ঘুরে ঘুরে এ-ডাল ও-ডাল টাংকি মারার তালে
-ঐ চুপ কর!! একদম ফালতু বাত করবি না। তোর বাসার জন্য সেদিন খড়ের টুকরা, ঘাসের ডগা, গাছের ডাল, একটা আম পাতা, দুইটা নিমপাতা, তিনটা ম্যাচের টুকরা এসব কে যোগাড় করলো অ্যাঁ?
-যা ব্যাটা ওগুলা কোন কাজের কাজ হইলো নিকি? ঘর বানাই আমি, ডিম পাড়ি আমি, বাচ্চা ফুটাই আমি, দুনিয়ার সব কাজ আমারে করতে হয়, দেখা তো দেখি একটা ডিম পেড়ে একদিন!!

এখানে এসে পুরুষ পাখিটা হার মেনে যায়। ভালো করেই জানে হাজার পরিশ্রম করলেও সে কোনদিন ডিম পেরে দেখাতে পারবে না। ফুড়ুৎ করে উড়ে গিয়ে সামনের গাছের মগডালে গিয়ে বসে। পেছন পেছন গরবিনী মেয়ে চড়ুইটিও উড়ে গিয়ে বসে। এবার মনে হয় একটু আপোষ হয়েছে। দুজনে কিছু শলা পরামর্শ করছে ফিসফিসিয়ে। কথা শোনা যাচ্ছে না কিন্তু ঠোঁট নড়ছে সমানে।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালা থেকে ঘরের ভেতরে চোখ ফেরালাম। টেবিলের উপর একটা খাম রাখা। খামের ভিতর একটা চিঠি। খানিক আগে চিঠিটা পড়ে মন উদাস হয়ে আছে।
আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য একটি আন্তর্জাতিক চড়ুইভাতি থেকে আমার নামটা বাদ যাবার জন্য দুঃখিত পত্র। অথচ এই ভ্রমণের জন্য আমি গত তিন মাস যাবত প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কত কি কেনাকাটাও করলাম। আমার নামটা ছিল ২১ নাম্বারে। আমি বাদে বাকী ২০ জন সুযোগ পেল। বলা হয়েছে সর্বশেষজনকে বাদ দিতে হলো বাজেট সংকোচনের কারণে।

আসল ঘটনা অন্য। এই চিঠি তেমন সমস্যা না, কিন্তু আসল সমস্যার চিঠি এখনো আসেনি। আসবে আগামী সপ্তাহে। আমার চাকরীর আয়ু বড়জোর আর এক মাস। পত্রিকায় খুব গোপনে বিজ্ঞাপন দিয়ে লোক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের সাথে অসদাচরণের অভিযোগে আমাকে অব্যাহতি দেবার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

অপ্রকাশিত অসদাচরণটি হলো পরিচালক-যোগাযোগ মহোদয় এক শিক্ষানবীশ তরুণীকে তার কক্ষে ডেকে অনৈতিক প্রস্তাব দেবার পর আমার কাছে খবর আসলে আমি তার দরোজায় গিয়ে প্রচণ্ড এক লাথিতে লকটা ভেঙ্গে ফেলেছিলাম। আমার লাথির প্রমাণ দরোজায় জ্বলজ্বল করলেও তার অনৈতিক প্রস্তাবটির কোন বাস্তব স্বাক্ষী প্রমাণ নেই। তাই শাস্তির ব্যবস্থাটি আমার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিল।
তরুণীটি আমার পরিচিত কেউ না। আমার সাথে কখনো তার কথাও হয়নি।

কয়েক মিনিট ভেবে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। সর্বশেষ পত্রটি হাতে আসার আগে আমি নিজেই একটি বিচ্ছেদ পত্র লিখে জানালার পাশে দাঁড়ালাম। চড়ুইদুটোকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টির জোর কমে গেছে। দূরে নদী মোহনা পাড়ি দিচ্ছে একটা জাহাজ। পাঁচ বছরের একটা বন্ধন এই একটি পত্র দিয়েই ছিন্ন হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর পত্রটি যথাস্থানে জমা দিয়ে জমাট একটা ব্যথা বুকে বয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলাম নীচে। অফিসের পাশে একটা টং দোকানের ঝাঁপির নীচে গিয়ে দাঁড়ালাম। সামনের রাস্তায় জল জমে গেছে আধঘন্টার বৃষ্টিতেই। কোথায় যাবো বুঝতে পারছিলাম না। বৃষ্টিটা কমে গেলে কিছুক্ষণ এলোমেলো হাঁটবো। যখন কোন গন্তব্য থাকে না, তখন এলোমেলো হাঁটাই একমাত্র উপায়।

বৃষ্টি থামতে সময় লাগবে। ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা চায়ের অর্ডার দিতে যাচ্ছিলাম, তখন পেছন থেকে একটা নারীকন্ঠ বলে উঠলো, দু'কাপ প্লীজ।

অবাক হয়ে দেখি নবনীতা। অফিসের সেই অপমানিত তরুণীটি। হাসিমুখে আমার হাতে একটা কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বললো-
-আপনি চলে যাচ্ছেন, এরপর আমার মাথায় ছাতা ধরবে কে? রিলিজ নিয়ে এলাম আমিও।

আশ্চর্য হবো কিনা ভাবতে ভাবতেই আমিও পাল্টা হেসে দিলাম। কোন কোন ঘটনায় খুব অপরিচিত মানুষও আপন হয়ে যেতে পারে। এবার নিজেকে আর একেবারে গন্তব্যহীন মনে হচ্ছে না।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আড়চোখে নবনীতার দিকে তাকালাম। আবারো হাসলো সে। এবারের হাসিটায় পরিষ্কার বন্ধুতার স্নিগ্ধতা। এত সুন্দর হাসি মেয়েটার, আগে কখনো খেয়াল করিনি। হঠাৎ মনে হলো, অন্ততঃ আজ দুপুরের জন্য দুজনের একটা চড়ুইভাতি করা যায় না? বংশালের শমসের আলীর ভূনা খিচুড়ী খাই না অনেক দিন।

চা শেষ করে নবনীতা বললো, বৃষ্টি থেমে গেছে, চলুন হাঁটতে শুরু করি।
নবনীতা কোথায় যাবে জানি না। কিন্তু আমি মনে মনে বংশালের পথে হাঁটতে থাকি। ভাবছি সামনের মোড়ে গিয়ে ওকে বলবো কথাটা।

মোড়ে পৌঁছে নবনীতা থমকে দাঁড়ালো। একটা খালি রিকশা দাঁড়ানো ওখানে। আমি কিছু বলার আগেই সে আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠলো-
-এরকম দিনে খিচুড়ি হলে মন্দ হয় না। কী বলেন?
-হ্যাঁ আমিও তাই ভাবছিলাম। রিকশা নিলে দশ মিনিটে শমসের আলীর খিচুড়ির দোকানে পৌঁছে যেতে পারি কিন্তু।
-খুবই ভালো আইডিয়া। যান খেয়ে আসুন। এরকম দিনে খিচুড়ি মিস করা ঠিক হবে না। আমিও বাড়ি গিয়ে মাকে বলবো খিচুড়ি রাঁধতে। রিকশাটা আপনি নেবেন নাকি আমি?

আমি অপ্রত্যাশিত একটা ধাক্কার বুকভাঙ্গা স্বরে বললাম, রিকশাটা আপনিই নিয়ে যান।


৩১ মে ২০১৪, শনিবার

Sunday, May 25, 2014

ফেরারী দিন, ফিরে দেখা

হাজীপাড়ায় সেই বাড়িটার নাম ছিল সিরাজী মহল। বাসার এক তলায় আমাদের সদাশয় বাড়িওয়ালা বাস করতেন। তিনি নিতান্তই ভদ্রলোক। একসময় সিনেমায় অভিনয়ও করেছিলেন। নবাব সিরাজদৌলার যে সিনেমায় আনোয়ার হোসেন অভিনয় করে বাংলাদেশ কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, সেই সিনেমায় তিনি গোলাম হোসেন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ভদ্রলোকের নাম ছিল শাহ গোলাম আহমেদ। গেট দিয়ে  ঢুকতেই ওনার সদর দরজা। সেই দরজার পাশে একটা সাইনবোর্ড সর্বদা টাঙ্গানো। সাইনবোর্ডে লেখা - শাহ সাহেব বাড়িতে নেই

এরকম বিচিত্র সাইনবোর্ড আমরা আগে কখনো দেখিনি। আমাদের বাড়িতে আগত অতিথিরাও কখনো দেখেনি। তাই সবাই আসা যাওয়ার পথে সাইনবোর্ড পড়ে হাসতে  থাকে, কেউ কেউ সশব্দে উচ্চারণও করতো- শাহ সাহেব বাড়িতে নেই। ভদ্রলোকের পাওনাদারের সংখ্যা বেশী ছিল কিনা জানি না, কিন্তু তাঁর পাঁচ কন্যা আর এক পুত্রের কাণ্ড কিন্তু কম ছিল না।

দোতলা বাড়ির ছাদ আমাদের মাথার উপরই। একটা সুবিধা হলো, জামাকাপড় শুকানো যাবে ইচ্ছেমতো। কিন্তু বাড়িতে ওঠার একদিন পর বাসার এক অতিথি গোসল সেরে শাড়ি শুকাতে দেবার এক ঘন্টা পর তিনি কাপড় আনতে গেলে দেখেন তাঁর শাড়িটা নীচে লুটাচ্ছে। পাশে দাড়ানো বাড়িওয়ালার কন্যাকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, এটা ওদের ছাদ, তাই এখানে অন্য কারো জামা কাপড় শুকাতে দেয়া নিষেধ। তখনো ওদের পরিবারের কারো সাথে পরিচয়ই ঘটেনি। শুধু বাড়িওয়ালাকে দেখেছি আমরা। বাকীদের সাথে পরিচয় হবার আগেই শুরু হলো ছাদ কাহিনী।

তখনো জানার অনেক কিছু বাকী ছিল। সন্ধ্যার সময় সামনের দোকানে চাল কিনতে গেলে দেখা হলো আমাদের স্কুলের হেডস্যারের সাথে। স্যার আমাকে দেখে অবাক। বললেন,তুমি এখানে কি করো? বললাম, আমি তো ওই বাসায় উঠেছি। সাথে সাথে স্যারের চোখ কপালে। তুমি? ওই বাড়িতে? কেমনে উঠলা? কখন উঠলা? কালকেও তো খালি দেখলাম।

আমি স্যারের কথার মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছিলাম না। এই বাসায় উঠলে সমস্যা কি?

স্যার তখন বললেন, পাশের একতলা টিনশেড বাড়িটায় উনি ভাড়া থাকেন। ওটাও সেই শাহ সাহেবের বাড়ি। কিন্তু ওটা তো পাগলের কারখানা। তোমরা খোঁজ খবর না নিয়েই উঠে গেছো? দোতলার বাসাটায় তো কোন ভাড়াটে তিন মাসও টেকে না।

আমি বললাম, খোঁজ নেবার সুযোগ ছিল না। বিপদে পড়ে উঠে গেছি। স্যার বললেন, উঠেছো যখন কি আর করা। দেখে শুনে চলবে।

চিন্তায় পড়ে গেলাম। দুপুরে বিনা বাক্য ব্যয়ে খালাম্মার শাড়িটা যেভাবে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে, ভবিষ্যতে আরো কি কাণ্ড দেখায় কে জানে!

ওদের ছোট মেয়েটা অবশ্য খুব ভালো। দেখতে খুব মিষ্টি, পাকা পাকা কথা বলে। বয়স চার বছরের মতো। একমাত্র ওই পিচ্চিটার সাথেই আমাদের যোগাযোগ হয়। মেয়েটাকে আমরা সবাই খুব আদর করতাম বলে মেয়েটাও আমাদের বাসায় নিশ্চিন্তে খেলতো শোকেসের জিনিসপত্র নিয়ে। ছোটবোনের জন্মদিনে সে আমাদের সাথে বসে বসে সারাদিন বেলুন ফোলালো, ঘর সাজালো। সব কাজ শেষে অনুষ্ঠান শুরুর আগে ওকে বললাম, যাও নতুন জামা পরে আসো, ছবি তুলবো।

বাড়িওয়ালার বাসার সবাইকে দাওয়াত দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যায় দেখা গেল ওরা তো আসেইনি, ছোট মেয়েটাকেও আসতে দেয়নি। বেচারী কেঁদেকেটে ঘরে আটকে আছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল আমাদের। এ কেমন মানসিকতা?

ওর বড় আরো চারবোন ছিল। ওরা আট থেকে বারো ক্লাস পর্যন্ত বিভিন্ন ক্লাসে পড়তো। কি পড়াশোনা করতো জানি না তবে দিনের বেলার অধিকাংশ সময় ওরা ছাদে কাটাতো। ওদের ছাদ বিহার ওই পাড়ার তরুণদের অন্যতম বিনোদন। ওরা যখন ছাদে থাকতো তখন আশেপাশের নানান ছাদে ভিড় করতো উঠতি বয়সের তরুণেরা।

আমি কখনো ছাদে উঠতাম না। একদিন কিছু বন্ধুবান্ধব বেড়াতে আসলে ওদের নিয়ে একটা  বিকেল ছাদে কাটালাম। বাড়িওয়ালীর কন্যাদের নিত্যদিনের কর্মসূচী সেদিন বাধার সম্মুখীন হলো। ওরা ছাদে উঠে আমাদের দেখে নেমে গেল। নেমে গিয়ে কি করেছে সেটা টের পেলাম সন্ধ্যার সময়।

বন্ধুদের বিদায় দিতে আমি বের হলাম ঘর থেকে। গলিপথে কিছুদূর যাবার পর একদল ছেলে আমাদের পথ আটকালো। বললো, আমরা কোন সাহসে ওই ছাদে উঠেছি।
আমি বললাম, ওটা আমার বাসা। আমার ছাদে উঠতে সাহস লাগবে কেন?
ওরা বললো, আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে তোমরা ওই মেয়েদের উত্যক্ত করেছো। তোমাদের সাবধান করে দিচ্ছি। আর যদি কোনদিন ছাদে উঠো, তাহলে ঠ্যাং ভেঙ্গে হাতে ঝুলায় দেবো।

মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। ওই পাড়ায় আমি নতুন হলেও আমার কিছু দশাসই বন্ধুবান্ধবও ছিল যার মধ্যে দুয়েকজনের বেপরোয়া মাস্তানির খ্যাতি ছিল। ঘটনাটা তাদের কানে গেলে সেই পাতি মাস্তানদের ডেকে উল্টো হুমকি দিল। পাল্টাপাল্টি হুমকির ঘটনায় আমাদের জিত হওয়ায় ছাদের উপর আমাদের আপাতঃ রাজত্ব কায়েম হলো।

রাজত্ব কায়েম হলেও আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ছাদে না উঠে বাসার সামনের খোলা বারান্দায় বসে আড্ডা দেবো। ওরা ওদের ছাদ নিয়ে থাকুক। ভেজালের দরকার নাই।

কিন্তু বারান্দার সামনে বসা নিয়েও ঝামেলা লাগলো আবার। এবারের ঝামেলা একটা পেয়ারা গাছ। নীচতলার ঘরের সামনে বাড়ীওয়ালার একটা পেয়ারা গাছ ছিল। পেয়ারা গাছটা হঠাৎ সেবছর বড় হয়ে গেল লকলক করে এবং সুন্দর সুন্দর পেয়ারা ধরে আমাদের বারান্দার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। গাছটা হাত বাড়িয়ে দিলেও আমরা পেয়ারা গাছে নজর দেয়া ছাড়া আর কিছু করলাম না, কেননা গাছটা আমাদের না। তাছাড়া পেয়ারাগুলো এখনো অনেক ছোট। খাবার যোগ্য হলে তখন দেখা যাবে।

আমরা ধৈর্য ধরলেও বাড়িওয়ালার মেয়েরা ধৈর্য ধরতে পারলো না। ওরা একদিন আমাদের বারান্দায় ঢুকে কাঁচা কাঁচা সব পেয়ারা পেড়ে নিয়ে কিছু দাঁতে কাটলো আর অধিকাংশ নর্দমায় ফেলে দিল। আশংকা এই যে পেয়ারা যদি কোনদিন বড় হয় তাহলে আমরা যে কোন সুযোগে তা হাপিস করে দেবো। আমাদের কোনরকম সুযোগ না দেবার জন্য অকালে সবগুলো পেয়ারাকে নর্দমায় আশ্রয় নিতে হলো।

তখনকার দিনে পাড়ায় কে কার সাথে 'লাইন' করে সেটা কিভাবে যেন সবাই জেনে যেতো। বিশেষ করে আমাদের ছাদবিলাসী কন্যাগুলো লাইনের ব্যাপার পাড়ায় রসের অন্যতম যোগানদার। বিভিন্ন ছেলের সাথে চোখাচোখি, কানাকানি, চিঠিপত্র, ফোনাফুনি সবকিছুই একসময় প্রকাশ পেয়ে যেতো। সেই সুত্রে তিন মাসের মধ্যে জেনে গেছি কোন মেয়ের সাথে কার কার 'লাইন' আছে। আমাদের হুমকিদাতারাও ছিল সেই লাইনের দলে।

বাড়িওয়ালার মেয়েদের সাথে আমার সাথে সাপে নেউলে সম্পর্ক হওয়াতে আমাদের পরিবার নিশ্চিন্ত ছিল যে ওদের কারো সাথে আমার অন্ততঃ 'লাইন-টাইন' হবে না। ওই মেয়েরা স্কুল কলেজের সময় বাদে ছাদেই থাকতো দিনের অধিকাংশ সময়।

একদিন আমার দুপুরের ভাতঘুমটা ভেঙ্গে গেল ছাদের উপর থেকে আসা একটা শব্দে। আমি প্রথমে ভাবলাম উপরে কেউ দরকারি কোন কাজ করছে। কিন্তু না। শব্দটা যেন কেউ একজন পা দিয়ে একটা ইঠ নাড়াচ্ছে। নাড়াচ্ছে তো নাড়াচ্ছে। একটু বিরতি দিয়ে আবারো। গরমে অস্থির এমনিতে, তার উপর ওই শব্দটা ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিল। আমি গায়ে শার্ট গলিয়ে ছাদে উঠে দেখলাম বাড়িওয়ালার ক্লাস নাইনে পড়ুয়া মেয়েটা পা দিয়ে  একটা ইঠ এদিক সেদিক নাড়াচ্ছে। আমাকে দেখামাত্র সে নিপাট ভদ্রলোক। আমি কিছু না বলে বিরক্ত চাউনি দিয়ে নীচে নেমে এলাম।

এসে শোবার সাথে সাথে আবারো সেই শব্দ। প্রতিদিন এই যন্ত্রণা দিতে থাকলো মেয়েটা। আন্দাজ করতে পারছিলাম এই শব্দ করে সে আমাকে ছাদে আহ্বান করছে, কিন্তু কেন আহ্বান করছে সেটা বোঝার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না অথবা মেজাজটা তার অনুকুল ছিল না। তাই সাড়া দেবার বদলে একদিন আমি একটা পাথর এনে আমার ফ্লোরে ঘষাঘষি শুরু করলাম। সেই শব্দে থামাতে নীচতলা থেকে ছুটে এলো বাড়িওয়ালার জ্যৈষ্ঠ কন্যার অভিযোগের আঙুল। আমি তখন পাল্টা আঙুল দিয়ে ছাদের দিকে ইঙ্গিত করে বললাম, ওটা বন্ধ হলে এটাও বন্ধ হবে। দুপুরের যন্ত্রণা লাঘব হলো সেদিন থেকে।

কবেকার ঘটনা ওটা? ২৮ বছর পার হয়ে গেছে? আশ্চর্য!  সময় কত দ্রুত চলে যায়।

এই সেদিন ইন্টার পরীক্ষার রেজাল্টের দিন সকালে বন্ধুরা সবাই মিলে কাপ্তাই গেলাম বেড়াতে। নদীর ওই পাড়ের জঙ্গলগুলো টানছিল খুব। সাম্পান ভাড়া করে ওই পাড়ে গেলাম। ওপারের সীতার ঘাটে সাম্পান থেকে নেমে পাহাড়ে উঠলাম। পাহাড়ে ঘুরে হৈ হল্লা করে ফেরার পথে  সাম্পানে ওঠার সময় পা পিছলে ধপাস করে পড়ে গেলাম লেকের পানিতে। আমি সাঁতার জানতাম না। সেদিন সেই অচিন মাঝি ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে উদ্ধার না করলে আজকে এই গল্প লেখার সুযোগ হতো না। আচ্ছা সেদিন যদি আমি ডুবে যেতাম, এত বছরে আমাকে কেউ মনে রাখতো? মা ছাড়া আর কেউ মনে রাখতো না আমি নিশ্চিত। আমাদের পরিবারের মোড়টাই ঘুরে যেতো না তখন? বর্তমান অবস্থায় থাকার কোন সম্ভাবনাই থাকতো না। কারণ এর দশ বছর পর আবার বাবা মারা যেতো। কন্যাদের নিয়ে অসহায় মা দুর্বিষহ জীবন কাটাতো।

ভাগ্যিস যাইনি সেদিন। আমার এক বন্ধু কিন্তু চলে গিয়েছিল। আরো আগে সেই ক্লাস সেভেনেই। তুখোড় স্মার্ট একটা ছেলে। সেই প্রথম একটা বন্ধু হারিয়ে কষ্ট পেয়েছিলাম। এটা আরো আগের কথা। তখন আমরা সরকারী কলোনীতে থাকতাম, সেই ৩৪ বছর আগে।  যত পেছনে তাকাই, আরো পেছনে চলে যাই। এ বুঝি পেছনে যাবার নেশা। মাঝে মাঝে এই পেছনের দিনগুলো এমন করে টানে,  তখন আর বর্তমানে থাকা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। নাহ এবার লাগাম টেনে ধরতে হয়। আর পেছনে গেলে ধাক্কা খাবার সম্ভাবনা আছে।

তার চেয়ে পেছনের একটা গান শোনা যাক। আমার হারিয়ে যাওয়া দিনের প্রিয় একটা গান। গুড্ডি ছবিটা টিভিতেই দেখেছিলাম বহুবছর আগে। আবার দেখতে চেয়েছিলাম। এখানে অনেক খুঁজেছি, পাইনি। অতএব গানটাই শোনা যাক।


যাদু বাস্তবতায় মধ্যরাতের শিশু এবং মার্কেজের সম্পর্ক যাপনের গল্পটি

১.
অবশেষে মার্কেজের সিনেমাটা দেখা হলো মার্কেজ চলে যাবার পরই। Love in the time of Cholera দেখার আগে আমার কয়েকটি বদ্ধমূল ভুল ধারণার উপর ঐতিহাসিক কুঠারাঘাত চলছিল। ছবিটা দেখার পর সেই ভুল ধারণাগুলোর ভিত একেবারেই নড়ে গেল। এখন আমি জানি ঐতিহাসিক মিথ্যাগুলো জীবনের কোন একটা সময়ে এসে শোধরানোর সুযোগ কিছু কিছু মানুষের হয়। মার্কেজ খুব মুষ্টিমেয় লেখকদের একজন যিনি সেই সত্যটার মর্ম উপলব্ধি করেছেন। কোন কোন বিরল জাতের সম্পর্ক আছে যা শুকিয়ে মরে কাঠ হয়ে যায়। সেই কাঠ দিয়ে আসবাব পর্যন্ত তৈরী হয়ে যায়। কিন্তু তার শিকড়ের কোন একটা গভীরতম অংশ তাকে আবারো জীবন দান করতে পারে। মার্কেজ ৫৪ বছরের উদাহরন উপস্থাপন করেও তাই করে ছেড়েছেন। এই ছবিটা  ১০০% সম্পর্কের ছবি, ১০০% সম্পূর্ণতার ছবি, অসমাপ্ত সমীকরণ জোড়া লাগাবার ছবি। ফ্লোরেন্টিনো এবং ফারমিনাকে আমার সেইসব চেনামুখের মতো মনে হয়েছে একদিন যাদের স্বপ্নে আমি বসবাস করে এসেছি। ছবিটাকে স্বচ্ছন্দে আমি দ্বিতীয়বার দেখার সুযোগ খুঁজবো।  ক্লাসিক কালেকশানে রেখে দেবার মতো আরো একটা ছবি।



২.
Midnights Children ছবিটা নামিয়েছিলাম বেশ কিছুকাল আগে। আড়াই ঘন্টার মুভি দেখার সময় বের করা কঠিন কাজ। অপেক্ষার পর অপেক্ষা করে গতরাতেই ছবিটা দেখার সময় করতে পারলাম। সালমান রুশদীর উপন্যাস অবলম্বনে দীপা মেহতার এই ছবিটার পটভূমি অর্ধশতাব্দীর মতো। ভারতের স্বাধীনতার আগ থেকে শুরু করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা ছুঁয়ে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী অবস্থার পরে এসে শেষ হয়েছে।

আমি সিনেমাখোর মানুষ হলেও বোদ্ধা শ্রেণীর না। তাই যে কোন ছবি দেখে রিভিউ লেখা হয়ে ওঠে না। তার চেয়ে ছবি দেখার অভিজ্ঞতা বলতেই ভালো লাগে। এই ছবিটার বেশ কিছু অংশে অপার্থিবতার রাজত্ব। যাকে ম্যাজিক রিয়েলিজম বলেছে কেউ কেউ। তাই একদম বাস্তবমূখীনতা খুঁজতে গেলে হতাশ হবার সম্ভাবনা। যদি ম্যাজিকে আস্থা থাকে তাহলে অবশ্যই ভালো লাগবে।

আমার একটা জায়গায় প্রত্যাশিতভাবেই ভালো লেগেছে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা পর্বটি আসে। পাকিস্তানীরা অস্ত্র সমর্পন করার জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে, রাস্তায় রাস্তায় বাংলাদেশের পতাকা হাতে, বঙ্গবন্ধুর ছবি হাতে, জয় বাংলা বলে শ্লোগান দিচ্ছে আমজনতা এই দৃশ্যগুলি ভালো লাগার।

আবার একজন স্মৃতিভ্রষ্ট পাকিসৈন্য(এই ছবির মূল চরিত্র) ওই ভিড়ের মধ্যে তার ভারতীয় দয়িতাকে নাচতে দেখে স্মৃতি ফিরে পেয়েছে, এই দৃশ্যটা অস্বাভাবিক লেগেছে। ম্যাজিক রিয়েলিজমের ভেতর এটাকে সিনেমাটিক ড্রামা মনে হয়েছে। সেই মুহুর্তের দৃশ্যটা দর্শকের মনে মেহেরজানের স্মৃতিটা একটু উস্কে দিতে পারে।

আবার সেই ভারতীয় সাপুড়েকন্যা পার্বতী যখন ম্যাজিক দিয়ে তার পাকিস্তানী দয়িতকে ঝুড়িতে লুকিয়ে ফেলে হেলিকপ্টারের দিকে এগিয়ে যায় তখন খুব সঙ্গত প্রশ্নগুলো মাথাচাড়া দেবে। একজন ভারতীয় সাপুড়ে কন্যা বাংলাদেশে কী উৎসবে যোগ দিতে এসেছিল যাকে হেলিকপ্টারে করে দেশে ফেরত নেয়া হয়। এরকম অসঙ্গতিগুলো পার পেয়ে যায় ম্যাজিক রিয়েলিজমের কারসাজিতে। প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে যখন ছবিটাতে সম্মান দেখানো হয়, তখন সেই স্বাধীনতার অন্যতম কঠোর সমর্থক ইন্দিরাগান্ধীর উপর অতটা কঠোর কেন ছবির পরিচালক এবং লেখক। আড়াই ঘন্টার ওই ছবিটায় সবচেয়ে দৃষ্টিকটু লেগেছিল সেই অংশটুকু। ওটা ম্যাজিক রিয়েলিজমের সিড়ি বেয়ে উৎরে যেতে পারেনি। ওখানে এসে জড়ো হয়েছে অনিশ্চিত কোন রাজনৈতিক অপছন্দ।

বাংলাদেশ পর্বের কয়েক মিনিটে সংলাপগুলো বাংলাতে দেয়াটা বাস্তবসম্মত লেগেছে। ভালো লেগেছে সালীমের প্রেমের পর্বে মির্জা গালিবের(জগজিত সিং এর কন্ঠে) সেই গজলটিও।

Saturday, May 24, 2014

বৈদেশিক

গত সপ্তাহে হঠাৎ করে বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে ইইউ এবং ডিএফআইডির কয়েকজন সিনিয়র স্পেশালিস্ট আমার অফিসে এসেছিলেন কিছু বিষয় নিয়ে আলাপ করতে। প্রথমে ভেবেছিলাম সৌজন্য সাক্ষাতকার। কিন্তু কনফারেন্স রুমে এই বাঘা লোকগুলোর ধারাবাহিক জেরার মুখে টের পেলাম ব্যাপারটার সাথে জাতীয় স্বার্থ কত গভীরভাবে জড়িত। অতএব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক হয়ে যেতে হলো। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সমস্যাগুলোর ব্যাপারে সঠিক তথ্য দেয়া যাবে না। অতএব, পেশাদার মিথ্যেবাদীর মতো বাংলাদেশের প্রশংসায় ভরিয়ে দিলাম কনফারেন্স রুম।

ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলাগন প্রথমে চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শন করেন, তারপর রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল পরিদর্শন করতে গিয়ে দুটো এন্টারপ্রাইজকে বেছে নিয়েছিলেন, যার প্রথমটিতে আমি। যখন আমাকে প্রশ্ন করা হলো যদি সমজাত সুযোগ সুবিধা প্রতিবেশী দেশেও থাকে, তাহলে আমরা বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করতে গিয়ে সেই দেশকে বেছে নেবো কিনা, তখনই আমি সতর্কতার প্রথম পদক্ষেপটি নিলাম। আমার উত্তর ছিল সুযোগসুবিধা সমপর্যায়ের হলেও বাংলাদেশের যে শ্রমশক্তি সেটাকে অতিক্রমের কোন শক্তি আপাততঃ কোন প্রতিবেশী দেশের নেই। এখানে আমরা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বাংলাদেশের কোন বিকল্প নেই গার্মেন্টস সেক্টরে। আমার উত্তর তাদের চোখের উজ্জলতা কমিয়ে দিয়েছিল কিনা খেয়াল করিনি, কিন্তু এটা বুঝতে পেরেছি যে বাংলাদেশের বিকল্প হিসেবে কোন একটা দেশকে খাড়া করানোর একটা ইঙ্গিত তাতে আছে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমি বাংলাদেশের বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতাগুলোকে যতই আড়াল করার চেষ্টা করি, একজন বিদেশী কখনোই সেটা করবে না। এখানে ভাগ্যকে একটা ধন্যবাদ দিতে হয় ওই লোকগুলোর মুখোমুখি হবার জন্য কোন বিদেশীর বদলে আমাকেই নির্বাচিত করা হয়েছিল। নইলে বাংলাদেশের ইমেজের উপর একটা কষে চড় পড়ার সম্ভাবনা ছিল। কারণ এই রপ্তানী প্রক্রিয়া অঞ্চলেও আমরা সদাশয় কাস্টমস কতৃপক্ষের কাছ থেকে যেরকম অসহযোগিতা এবং দুর্বিষহ মনোভাব দেখতে পাই তাতে কোন বিনিয়োগকারীই সন্তুষ্ট নয়। ক্ষেত্রবিশেষে ব্যবসা করার জন্য আমাদেরকে ব্ল্যাকমেইলের স্বীকারও হতে হয়। এই যন্ত্রণা নিয়ে এখানে সুস্থ বিনিয়োগ আশা করা যায় না। দশ বছর আগে ভিয়েতনামকে আমাদের সাথে তুলনা করা গেলেও এখন সেটা অসম্ভবের পর্যায়ে চলে গেছে। এখানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি কেবল শ্লোগানেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে যদি এসব সরকারী দুর্বৃত্তপনা বন্ধ না হয়।

আমি নিন্মোক্ত ভদ্রলোকদের সঠিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত না হলেও তারা বিদায় নেবার সময় আমার বক্তব্য এবং তাদের পর্যবেক্ষণের ফলকে যে 'ইমপ্রেসিভ' সার্টিফায়েড করে গেছে, সেটা বাংলাদেশের জন্য তৃপ্তিকর ছিল।

Dr Duncan Overfield
Senior Regional Economic Adviser
Asia Regional Team, DFID
Current office New Delhi, India

Mr Thom Adcock
Economist, DFID
Current office Rangoon, Burma

Mr Alan Whiteworth
Senior Economist
Economic Growth Group
Current office Islamabad, Pakistan

Martha Lawrence
Senior Railway Specialist
Sustainable Development Network, Transport
World Bank
Current office Washington DC, USA

Piers Devenport
Political, Trade and Press Section
European Union
Current office Dhaka, Bangladesh

Friday, May 23, 2014

ফেলে আসা সুর

বহুকাল আগে শোনা সুরটায় কথা ফুটলো মাত্র সেদিন। লিরিকস বিহীন সুরটা এত যুগেও ভুলিনি কেন সেটা বুঝতে আমার ভেতর নতুন একটা উপলব্ধি সৃষ্টি হলো। অনেক মানুষই বুকের ভেতর প্রিয় কিছু সুর লালন করে। কেউ সজ্ঞানে কেউ অবচেতনে। আমার সেই সুরটা সজ্ঞানে যতটা ছিল অবচেতনে ছিল বহুগুন বেশী। আমি সময়ের কাছে কৃতজ্ঞ সেই সুরটাকে এতকাল বুকের ভেতর ধরে রাখার জন্য। সুর এমন একটা ব্যাপার যা জীবনের অনেকগুলো না দেখা রঙের উজ্জ্বলতাকে চোখের সামনে স্পষ্ট করে তোলে। আমরা সবাই যার যার নিজস্ব ব্যস্ততায় ডুবে গেলেও সেই সুরটা কোন কোন সময় আমাদের ভেতর স্মৃতির অনুরণন জাগায়। অনেক অপ্রাপ্তির ভেতরেও সেই সুরটা আমাদের জানান দেয় সব অন্ধকারেই একটা আলোর ইশারা থাকে। সেটাই জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। আমরা অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেও বেঁচে থাকার মধ্যে সুখ খুঁজি সেই আলোর ইশারাতে। এ যেন অচ্ছ্যুত এক স্বপ্ন যে স্বপ্নটা হাতের ফাঁক গলে পড়ে গিয়েছিল কোন আকালের দিনে। আমরা আকালের দিনগুলো ভুলে গেলেও স্বপ্নের স্মৃতিটা ভুলিনি, ভুলিনি সেই সুরের প্রতিটা ছন্দ।

কাল রাতের বেলা

Wednesday, May 21, 2014

এক চাঁদ কলংক

ব্যাপারটা তুচ্ছ। আবার ফেলে দেবার মতোও নয়। একটা উঠোন, দুটো বাড়ি, এক ফালি জ্যোৎস্না এবং চাঁদের কলংক পাহাড়।

মেঝ নানার বাড়িতে গেলেই আমাকে টানতো উঠোনটা। উঠোনের চারপাশে গাছের শাখাপ্রশাখাগুলো বাতাসের ছন্দে নাচতে নাচতে জ্যোৎস্নার বান ডাকতো। আমার তেমনই মনে হতো। অথচ চাঁদ উঠলে জ্যোৎস্না খেলবে এতো নতুন কোন কথা না। তবু আমার মনে হতো এই উঠোনে জ্যোৎস্নাগুলো একটু বেশীই যেন উজ্জ্বল। বড় হবার পর অমন কোজাগরী রাত আর কখনো দেখিনি। সেই উঠোন নেই, সেই গাছ নেই, চাঁদখানা শুধু যথাস্থানে আছে, তার জ্যোৎস্নায় চোখ রাখার যত্নটা আর নেই।

উঠোনটা নিয়ে আমি মনে হয় একটু বাড়াবাড়ি রকমের আহ্লাদ করতাম। যতটা করার দরকার তারো চেয়ে বেশী। কিন্তু কি করবো। ওখানে গেলেই যে আমি অন্যরকম হয়ে যেতাম। ওই বাড়ি, ওই উঠোন, ওই গাছের নকশাকাটা ছায়া সব যেন আমার। কখনো কখনো মামী মুড়ি মাখিয়ে বাটি ভর্তি করে দিয়ে যেতেন। শুধু মুড়ি না, মুড়ির সাথে থাকতো চানাচুর, ছোলাভাজা, চিড়েভাজা, পেয়াজ মরিচ, শসার সালাদ। মধ্যখানে চার পাঁচটা মুচমুচে পিঁয়াজু। উঠোনে পিড়ি বা মাদুর পেতে আমি ছোলামুড়ির মিলিত স্বাদ নিতে নিতে জ্যোৎস্নায় স্নান করতাম আর বলতাম- বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি, পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।

কিন্তু বাংলার রূপ খোঁজার এই উৎসবে আনন্দ খুঁজে পেত না তেমন একজনও ছিল মুখোমুখি বাড়িটাতে। এই উঠোনে তাদেরও অংশ আছে, ওই গাছের শাখায় তার জন্যও বাতাস দুলতো, ধবল জ্যোৎস্নাগুলো তার জন্যও আলো বিলাতো। তবু সে কখনো উঠোনে নামতো না। বড়জোর দরোজায় দাড়িয়ে উঠোনের দিকে মাথা বাড়িয়ে আমাদের আনন্দগুলো উপলব্ধি করার চেষ্টা করতো। আমরা খুব করে ডাকতাম ওকে, কিন্তু সে কিছুতেই উঠোনে খেলতে নামতো না। আমি অবাক হতাম। এত এত সুন্দর, কিছুই কী টানে না তাকে? কেমন বিষাদময় চোখে তাকিয়ে থাকতো জ্যোৎস্নার দিকে। আমি যতবার ওই উঠোনে খেলতে যেতাম, অবধারিতভাবে আমার চোখ খুঁজে বেড়াতো সেই বিষন্ন চোখ দুটো। সেই চোখ আমাকে এতটা মুগ্ধতা নিয়ে দেখতো, তবু কাছে আসতো না, একদিন বেশী ডাকাডাকি করাতে দরজাটাই বন্ধ করে দিল।

খুব অপমান লাগলো। রাগে দুঃখে প্রতিজ্ঞা করলাম ওকে আর কোনদিন ডাকবো না। আমার কি দায়, আমার কি দায়? আমার কোন দায় নেই। ওর যা খুশী করুক। অভিমানে চোখ ফেটে জল আসে প্রায়।

আরো কিছুকাল পর, যখন পৃথিবীর বয়স আরো কয়েক বছর বেড়ে গেছে, যখন আমি জীবনকে আরো একটু গভীরভাবে জানতে শিখেছি, সেরকম এক সময়ে বিপন্ন বিস্ময় নিয়ে জানলাম কেন ওর জ্যোৎস্না ভালো লাগতো না, কেন উঠোনের আনন্দে যোগ দিত না, কেন আমাদের ডাকে সাড়া দিত না। দুই বাড়ি এক উঠোনের মালিক হলেও ওদের রান্না ভিন্ন হাড়িতে। ওদের হাড়িতে সবসময় ভাত থাকতো না, ভাত থাকলেও তরকারী থাকতো না। ওর বাবা ছিল না। মা প্রতিবেশীর বাড়িতে কাজ করে আধপেটা খেয়ে সংসার চালাতো। ওর বাইরে যাবার মতো একটাও জামা ছিল না। উৎসবে যোগ দেয়া তো অনেক পরের কথা। এসব কিছু যখন আমি জানতে পারলাম, তখন অতীতের একটা ক্ষত যেন মুহুর্তেই সেরে গেল। যেন শোধ হয়ে গেল কৈশোরের একটা কলংক দেনা।

যদিও তখনো সুকান্তের কবিতাটা পড়িনি, তবু আমি বুঝে গেলাম খালি পেটে সৌন্দর্যের বন্দনা একেবারেই অসম্ভব। চাঁদের সৌন্দর্যের চেয়ে কলংকের দিকেই নজর বেশী থাকে তখন।