Monday, April 21, 2014

ফিরে যাবার গল্প

সে একদিন চলে যাবে জানতাম। আমাদের গন্তব্য বরাবরই আলাদা ছিল। আমি যে ট্রেনের টিকেট কেটেছিলাম, সেও একই ট্রেনের টিকেট নিয়েছিল, কিন্তু ভিন্ন স্টেশানে। আমরা আলাদা বগিতে উঠেছিলাম। বসার জন্য সিট খুঁজতে খুঁজতে এই বগি সেই বগি ঘুরতে ঘুরতে একটা বগিতে হাজির হলাম দুজন প্রায় একসাথে।


পাশাপাশি দুটো সিট খালি পড়ে ছিল সেটাও কাকতাল হলেও এত মানুষের ভিড়ে দুজনের যে এত গল্প জমে উঠেছিল সেটা কিন্তু কাকতাল নয় মোটেও।


ব্যাপারটা খুব সহজ। আমার কিছু কথা ছিল। তাহার শোনার সময় ছিল। এবং কাংখিত সুত্রের গল্পে মজে যাবার পর আমরা ট্রেন থেকে নামার কথা ভুলেই গেলাম। ফলাফল, দুজনই গন্তব্য ফেলে পার হয়ে গেলাম।


অনেকদূর যাবার পর, অনেক অনেক কথা শেষ হবার পর গল্পের মধ্যে একটা বিতর্কের সুত্রপাত হলো। বিতর্ক থেকে বাকযুদ্ধ, বাকযুদ্ধের পর বাকহীনতা, অতঃপর দুজনেরই সম্বিত ফিরে পাওয়া। অনেক দেরীতে বুঝলাম, আমাদের নির্ধারিত স্টেশন পার হয়ে গেছে! এখন উপায়?


কোন উপায় নেই। হঠাৎ জাগা টর্নেডো রাগের কোন পূর্বপশ্চিম থাকে না। 'তোমার সাথে এই বগিতে থাকার চেয়ে আমি অচেনা স্টেশানে নেমে যাবো'। এই ভাবনায়, পরবর্তী স্টেশান আসতেই সে নেমে গেল। একবারো পেছনে ফিরে তাকালো না।


আমি ভ্রু কুঁচকে কয়েক মিনিট ভাবলাম এবং পরবর্তী স্টেশানে নামার জন্য প্রস্তুত হলাম। দশ মিনিট পরেই পরের স্টেশান। আমিও নেমে গেলাম অনির্ধারিত স্টেশানে।


এবার আমি পেছনে ফিরে যাবার উপায় খুঁজতে থাকলাম। ট্রেন ছাড়ার সময় তাকিয়ে দেখি সেই বগির খালি সিট দুটোতে অন্য দুজন মানুষ বসে কথা বলতে শুরু করেছে। ভাবছি -কিছুক্ষণ পর ওরাও কি গন্তব্য ভুলে যাবে?


মনে হয় না। পৃথিবীতে খুব অল্প পরিমান গল্প আছে যাতে দুজন মানুষ একই সাথে নিজের গন্তব্য ভুলে যেতে পারে। আমরা ছিলাম সেই গল্পের দুটো আলাদা খণ্ড। এখন ফিরে যাচ্ছি দুজনেই। আলাদা স্টেশান থেকে, আলাদা গন্তব্যে। আমাদের এখন কেবল একটাই মিল, দুজনের হাতে দুটো মেয়াদোত্তীর্ণ টিকেট।

Sunday, April 20, 2014

একটি বেরসিক সন্ধ্যার গল্প

শীত বিদায় নিয়েছিল পৌষের শেষে। মাঘ মাসটা শুধু ক্যালেণ্ডারের দায়িত্ব পালন করে। দুদিন আগে শীতের ক্যালেণ্ডারও শেষ হয়ে গেল। বসন্ত চলছে তিনদিন যাবত যদিও বসন্ত হাওয়ার কোন দেখা নেই। কিন্তু আজ হঠাৎ করে আবহাওয়ার মতিভ্রম ঘটে গেল। বসন্তের বাতাস বাদ দিয়ে সে মেঘদুতের কাছ থেকে আকাশ ভরা মেঘ ধার নিয়ে দিনভর সূর্যকে আড়াল করে রাখলো। বিকেলটা শেষ হতে না হতেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মন খারাপের ঝাঁপি খুলে বসলো রাখীর সামনে।

রাখী একটা বাটিতে মুড়ি তেল পিয়াজ মরিচ মাখিয়ে বসে আছে শাহ গোলাপের জন্য। শাহ গোলাপ আজ ডিউটি শেষ করে আসলে সিনেমায় যাবার কথা ছিল। একটা ড্যাশিং সিনেমা লাগাইছে আলমাসে। অগ্নিশর্মা নাম তার। নায়ক বুরুজ খান। নায়িকা হাসি ঝিলমিল। পোষ্টার দেখেই মাথা খারাপ হবার যোগাড়। আজ কোন ব্যবসা করার রুচি নাই। আজকে শুধু শাহ গোলাপ থাকবে বসে।

শাহ গোলাপের পরনে মিলিটারী পোষাক হলেও সে তাসমান টাওয়ারের সিকিউরিটি গার্ড। আজকাল কিছু কিছু সিকিউরিটি কোম্পানী মিলিটারীদের মতো ইউনিফর্ম দেয়। রাত দশটা পর্যন্ত ডিউটি হলেও আজ রাখীবানুর মোবাইল আবদার পেয়ে ছুটি নিয়ে চলে এসেছে আগেই। আলমাসের পিছনেই রাখীর বাসা। সাথে আরো কয়েকজন থাকে। থাকে মাসীমা হারামীর বেটি আর বখতিয়ার সাড়ে হারামজাদা। আজ সব গোলামের বাচ্চাকে উপেক্ষা করে শাহ গোলাপের সাথে সিনেমায় যাবে রাখী। মাসে একদিন তাদের ঐচ্ছিক ছুটি। এদিন তারা কাস্টমার নিলেও নিতে পারে, না নিলেও বাধা নাই। এখানকার মেয়েরা সবাই একদিন করে ছুটি কাটায়।

শাহ গোলাপ কোনদিনই তার কাস্টমার ছিল না। মইজ্যা গুণ্ডা একদিন রাখীকে ভাড়া করে পয়সা না দিয়ে চলে যাবার সময় রাখী বাধা দিয়ে পয়সা চাইলে তার মাথায় তক্তার বাড়ি মেরে ফুটপাতে ফেলে চলে গিয়েছিল। অজ্ঞান পড়ে থাকলেও তাকে কেউ তুলতে আসেনি। রাখীদের মতো মেয়েকে কেউ প্রকাশ্যে খুন করে চলে গেলেও বাধা দেয় না কেউ। এত লোকের সামনে মইজ্যা তাকে বেধড়ক মারছিল, কেউ একটু প্রতিবাদও করেনি। শুধু তার বোনটা এগিয়ে এসেছিল, তাকেও মেরে তাড়িয়েছে গুণ্ডাটা।

তখন অচেনা শাহ গোলাপ ওই পথ দিয়ে যাবার সময় তাকে পড়ে থাকতে দেখে রিকশা ডেকে হাসপাতালে নেয়, চিকিৎসা করায়।  সাত দিনের মতো হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল, সেই সাতদিন বন্ধ ছিল কাস্টমার নেয়া। শাহগোলাপ ডিউটি সেরে বাড়ি ফেরার পথে তাকে দেখতে আসতো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিত আপন মানুষের মতো।

সুস্থ হবার পর  শাহ গোলাপের প্রতি কৃতজ্ঞতা বশে তাকে একদিন ঘরে ডেকে শরীর দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মানুষটা অদ্ভুত। তাকে ছুঁয়েও দেখলো না। খাটের ওই পাশে বসে কথা বলে চলে গেল। যাবার সময় শুধু কাঁধে একবার হাত রেখে বলেছিল, তুমি খুব সুন্দর!

সেই থেকে রাখির মাথায় ঝিমঝিম এক সুখ বাজতে থাকে। শাহ গোলাপ তাকে কি চোখে দেখে রাখী ঠিক জানে না। কিন্তু যখনই রাখী তার মোবাইলে মিসকল দেয়, শাহ গোলাপ সাড়া দেয়। কিন্তু রাস্তায় দেখা হলে অচেনা মানুষের মতো আচরণ করে। এটা তাকে কষ্ট দেয়। তবু শাহ গোলাপকে ভুলতে পারে না। সময় পেলেই মিসকল দেয়। শাহ গোলাপ উত্তর দেয় সময় করে। রাখীর জানতে ইচ্ছে করে সে বিয়ে করেছে কিনা। কিন্তু সংকোচ এসে জড়ো হয়। সে কাস্টমারদের সাথে দুনিয়ার ফটফট করতে পারলেও শাহ গোলাপের ফোন পেলে বাকহীন হয়ে যায়। বুকের মধ্যে কিরকম ছমছম করে। এই ছমছমের নাম কি প্রেম? দেহের আবেদনহীন এই অনুভুতি রাখীর কাছে অজানা ছিল। এই প্রথম একজন পুরুষের জন্য তার এরকম হচ্ছে।

অনেক কথা বললেও কোনদিন প্রেম ভালোবাসার কথা বলে না। অথচ জাউরা কাস্টমারদের কেউ কেউ শরীর গরমের আবেগে অনেক সময় তার উপর ঝাপিয়ে পড়ার সময় লাভ ইউ বলে ফেলে রাখী জানে সেই ভালোবাসার মেয়াদ আধাঘন্টারও কম।

শাহ গোলাপকে আজ নিমন্ত্রণ করেছে রাখী। আসবে তো লোকটা? আজ সে ছুটিতে।
বৃষ্টি একটু ধরে আসতেই ঘরের দরজায় টোকা। শাহ গোলাপ এসে গেছে।

চা মুড়ি খেয়ে দুজনে বেরিয়ে যায়। আলমাসের টিকেট কাটে। অন্ধকারে পাশাপাশি গিয়ে বসে। এখনো শো শুরু হয় নাই। লোকজন ঢুকছে আস্তে আস্তে। অন্ধকারে টর্চ  জ্বালিয়ে পথ দেখাচ্ছে টিকেট চেকার। সবাই বসে পড়লে সিনেমা শুরু হলো। অ্যাকশান রোমান্টিক সিনেমা। সিনেমা দেখার সময় রাখী তার মাথাটা শাহগোলাপের কাঁধে এলিয়ে দেয়। হাতের উপর হাত রাখে।

ওদিকে সিনেমায় জটিলতা শুরু। এক পর্যায়ে বুরুজ খানের সাথে ঝিলমিলের প্রেম যখন সংকটে পড়ে দর্শককূলকে টেনশানে ঘামিয়ে ফেলেছে, তখনই দুম করে ইন্টারভেল। বাতি জ্বলে উঠলো হল জুড়ে। চানাচুর চিপস কোকের বোতল নিয়ে টুংটাং শব্দে ঘুরতে থাকে বিক্রেতারা।

রাখী আর শাহগোলাপ চোখে চোখে তাকালো। রাখীর খুব ইচ্ছে করছে শাহ গোলাপের হাতটা ধরতে।  রাখী আজ শাড়ি পরে এসেছে। বোরকা ছাড়া তাকে অন্যরকম সুন্দর লাগে। শাহগোলাপের মুগ্ধ চাহনী তাকে কেমন লজ্জাবিধূর করে, বোঝাই যাবে না সে যে ওই পাড়ার মেয়ে। 

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা নারী কন্ঠ শাহ গোলাপের নাম ধরে ডাকে।

-এ কেমন কথা গোলাপ ভাই। বিয়ে করলেন, অথচ দাওয়াত দিলেন না।

চমকে উঠে দুজনেই। শাহ গোলাপ দেখে পেছনের সিটে পাশের ঘরের রীতাভাবী ফজলু আর সীমা। রীতা ফজলুর বউ, সীমা তার শ্যালিকা। গলাটা রীতাভাবীর। সীমার মুখ গম্ভীর। পেছনে তাকিয়ে রাখীর মুখ অন্ধকার হয়ে যায়। এরা কারা। শাহ গোলাপ কি জবাব দেবে বুঝতে পারে না। ভ্যানচালক ফজলু একবার সীমার ব্যাপারে তাকে ঈঙ্গিত করেও তার সাড়া না পেয়ে চুপ হয়ে গিয়েছিল।

এরকম আচানক ধরা পড়বে সে কল্পনা করেনি।

[অসমাপ্ত]


Saturday, April 19, 2014

২০ এপ্রিল ২০১৪: এই শনিবারে

১.
ইতিহাস পাঠে একটা ঝামেলা থাকে। যিনি ইতিহাস লিখেন তিনি সচরাচর নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না। এর মধ্যেও গ্রহনযোগ্য ইতিহাস লেখা হয়ে থাকে। পাঠককে একটু সতর্ক থাকতে হবে, মাথাটা সজাগ রাখতে হবে। যিনি ইতিহাস লিখেছেন তাঁর খানিক ইতিবৃত্ত জেনে নিতে পারলে সবচেয়ে ভালো। এটা সবসময় সম্ভব হয় না, তাই মগজের যুক্তিবাদী কোষগুলোর সঠিক ব্যবহার দরকার। আশ্চর্য হলেও সত্য যে এদেশের গত কয়েকশো বছরের ইতিহাসের অধিকাংশ বই লেখা হয়েছে ভিনদেশী লেখকের হাতে। অষ্টাদশ শতকের উপনিবেশ যুগের সূচনার ইতিহাস পড়তে গিয়ে টের পেলাম বিদেশী লেখকরা যেভাবে বিস্তারিত তথ্য সহকারে ইতিহাস লিখেছেন, এই দেশের কেউ অত বিস্তারিত ইতিহাস লেখেননি। নাকি আমিই তেমন বই খুঁজে পাইনি, কে জানে। আলীবর্দী খাঁর আমল কিংবা তার আগে আরো একশো বছর আগের ইতিহাস ইংরেজ লেখকের বইতে যতটা বিস্তারিত পেয়েছি আর কোথাও পাইনি। ফলে তিনশো বছর আগের কোন ব্যাপারে বিশদ তথ্যের জন্য আমাকে নির্ভরশীল থাকতে হয়েছে ভিনদেশী লেখকের উপর। মুশকিল হলো একজন ইংরেজ স্বাভাবিকভাবেই সবকিছু তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে লিখবে। লর্ড ক্লাইভের জীবনী পড়তে গিয়েও একই কাহিনী। ক্লাইভ স্বভাবতই তাদের কাছে হিরো, সিরাজউদ্দৌলা ভিলেন। জগতশেঠ তাদের কাছে একজন মহৎ ধনকুবের। মীরজাফর, ঘসেটি বেগম আলীবর্দী খাঁর সুবিধাবঞ্চিত বিক্ষুব্ধ আত্মীয় মাত্র। তবু ওই ইংরেজ লেখককের জবানী থেকেই ছেঁকে ছেঁকে কিছু তথ্য বের করা যায়। পলাশীর ঘটনা নিয়ে একাধিক ইউরোপীয়ান লেখকের বই আছে। আছে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর ইতিহাস নিয়েও। সেখানে খুব সতর্কভাবে চোখ বুলালে আমাদের দেশীয় রাজরাজড়াতের কিছু দুর্বলতা বের হয়ে আসে। রাজরাজড়াদের অনৈক্য, লোভ, ঈর্ষাপরায়নতা এই তিনটা দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ইংরেজ খুব সহজেই জয়লাভ করেছে বাংলায়। তারপর তারা ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতবর্ষে তাদের থাবা বিস্তার করেছে। ভারতের মতো একটা বিশাল দেশকে করায়ত্ত করা, উপনিবেশে পরিণত করার কথা কোন ইউরোপীয় শক্তি কল্পনাও করেনি তার পঞ্চাশ বছর আগেও। তারা শুধু বাণিজ্য করার জন্যই প্রথমে এদেশে এসেছিল। ভাস্কো দা গামার হাত ধরে প্রথমে পূর্তগীজরা পা রাখলো ভারতে, তারপর অন্যন্য ইউরোপীয়ান জাতি এদিকে ছুটে আসতে থাকে বাণিজ্য লোভে। সর্বশেষ আসে ইংরেজ। কিন্তু তারাই সবচেয়ে বেশী সফলতা অর্জন করে। তারাই সক্ষম হয় সমগ্র ভারতের অধীশ্বর হয়ে যেতে। সামান্য কয়েক হাজার সাদা চামড়ার হাতে বন্দী হয়ে গেল কোটি মানুষের দেশ ভারতবর্ষ।

২.
ইতিহাসের মতো মানুষ পাঠেও ঝামেলা আছে। একটা মানুষের সাথে দীর্ঘসময় বাস করেও কেউ নিশ্চিত হতে পারবে না সে মানুষটিকে ঠিকভাবে বুঝে ফেলেছে। প্রাণীজগতের মধ্যে মানুষই একমাত্র যার ভেতরে বাস করে একাধিক মানুষ। আমরা যাদের সাথে খাইদাই ঘুমাই আড্ডাই তাদের মাত্র একটা চেহারার সাথে আমরা পরিচিত। তাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বাকী মানুষগুলোকে আমরা দেখি না। দেখা যায় যে মানুষটা সবার খুব হাসিখুশী আড্ডা দিচ্ছে, তার বুকের গভীরে হয়তো জমে আছে কঠিন কোন বেদনা। যা সে দক্ষতার সাথে লুকিয়ে ফেলছে। একই আড্ডায় অনেক মানুষ থাকলেও সবার সাথে সবকিছু শেয়ার করা যায় না। কেউ কেউ খুব প্রিয় কোন বন্ধুর কাছে শেয়ার করে। আবার এমনো কিছু বিষয় আছে যেটা শুধু নিজের সাথেই বলা যায়। প্রিয়তম বন্ধুটিও জানতে পারে না। তাই কেউ যদি বলে ফেলে, আমি তোমার সবটা জেনে গেছি, বুঝে গেছি, সে নিতান্তই অর্বাচীন। আমাদের সবার মনের ভেতরে অনেক জটিল সমীকরণ খেলা করতে থাকে, এমনকি যখন ঘুমাই তখনো। অবচেতন মন মাঝে মাঝে সচেতন মনকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। আমরা দুঃস্বপ্ন ভেবে জেগে উঠি। এরপর আবার যখন ঘুমিয়ে পড়ি তখন আর কিছুই মনে থাকে না। সকালে উঠে শুধু রাতের এটুকুই মনে থাকে যে কিছু একটা দেখেছিলাম। কী সেটা কিছুতেই মনে আসে না। মানুষ বাদে আর কোন প্রাণীর কি এতটা বহুরূপী চেহার আছে? নাই। মানুষ তাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। একই সাথে মানুষ সৃষ্টির সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীবও। কারণ এই মানুষের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে ধ্বংসের অমোঘ সব অস্ত্র। যা তার জিহ্বার পেছনে লুকিয়ে থাকে, সময়ে বের হয়ে আসে বিষদাঁত। তখন চেনা মানুষ হয়ে যায় অচেনা। মানুষের ইতিহাস লেখা সহজ নয়। সম্পূর্ণ ইতিহাস লেখা তো প্রায় অসম্ভবই। আমি তাই মানুষ চেনার কাজ বাদ দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসের ভেতরে ডুব দেই।

৩.
গতকাল বাতাসে একটু মমতার ছোঁয়া থাকলেও আজ সকাল থেকে নির্মম কর্কশ। বৈশাখ জ্যেষ্ঠে এরকম গরম পড়বেই। তবু আমরা অভিযোগ করি অনির্দিষ্ট কারো কাছে। যে যার রুটিনে কাজ করবে, এতে অভিযোগ করার কোন মানে হয় না। পৌষমাসে যদি এরকম গরম পড়তো তাহলে অভিযোগ যুক্তিযুক্ত। এই চিন্তা মাথায় আসার পর আমি গরম অনুভব করি কিন্তু অভিযোগ করি না।

৪.
এই শনিবারটা একটু অন্যরকম হবার কথা ছিল। হলো না। মানুষের সব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় না। ইতিহাসের খাতায় আরেকটি ব্যর্থ শনিবারের নাম যুক্ত হয়ে গেল। স্পেস স্পেস স্পেস.......


Tuesday, April 15, 2014

১৫ এপ্রিল ২০১৪ উত্তাপে বাংলাদেশ

১.
প্রচণ্ড উত্তাপে দিনগুলো তড়পাচ্ছে। চৈত্রের শেষ ভাগে বাতাস উত্তাল হয়, এবার তেমন কিছু দেখা যায়নি। বসন্ত শেষ হয়ে গেল কোনরকম হাওয়ার মাতন ছাড়াই। বৈশাখে বাঙালী খুব উৎসবে মাতে। শহুরে মধ্যবিত্ত ঘরে থাকে না। এই বিরাট জনসংখ্যার চাপ আমাদের রাস্তাগুলো সহ্য করতে পারে না। পথঘাট স্থবির হয়ে থাকে কোথাও কোথাও। ডিসি হিল আর সিআরবিতে উৎসবের আমেজ। আশপাশের কয়েক কিলোমিটারে লাল সাদা পোষাকে মাতোয়ারা নারী পুরুষ। এই অসহ্য গরমকে তুচ্ছ করে বাঙালী ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। এই উৎসাহ দশ বছর আগেও খুব বেশী ছিল না। এখন হঠাৎ করে যেন বেড়ে গেল। পহেলা বৈশাখে আমার আনন্দ নেই গত সতের বছর। এই দিনে আমরা ঘর থেকে বের হই না তেমন। বড়জোর গ্রামে যাই। বাবাকে দেখে আসি। এই টুকুই আমার কার্যক্রম। এবার অফিসে কাটিয়েছি সারাদিন। অফিস ফেরার পথে হেঁটে হেঁটে মানুষের আনন্দিত মুখ দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, যদি এই সময়টা গ্রীষ্ম না হয়ে হেমন্ত হতো। আনন্দটা আরো অনেক উপভোগ্য হতো। আমি একবার লিখেছিলাম, নববর্ষের সময়টা বদলে ফাল্গুনে বা অঘ্রানে নিয়ে যেতে। আমার ক্ষমতা থাকলে তাই করতাম। তোমার থাকলে কী তাই করতে?

২.
আমি বৃষ্টির অপেক্ষায় আছি। মৌসুমী বায়ু কখন বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে হিমালয়ের দিকে ছুটে আসবে, সেই ছোঁয়ায় বাংলাদেশে বর্ষা নামবে আমি সেই চিরচেনা দৃশ্য দেখার জন্য বসে আছি। আরো দুই মাস অপেক্ষা। হয়তো আরো কম।

৩.
পড়াশোনা বন্ধ হয়ে আছে। প্রায় একমাস। আবারো শুরু করতে হবে। Into The Wild নামালাম। এই ছবিটা ভালো হবে বলে বিশ্বাস। কিন্তু আড়াই ঘন্টা নিজস্ব সময় কি হবে? বই পড়া আর সিনেমা দেখার জন্য একান্ত সময় লাগে। আজকাল যা খুব দুর্লভ হয়ে গেছে। জমে যাচ্ছে অনেক না পড়া বই। শুধু সময়ের আকাল না। মননেরও আকাল পড়েছে। বই হাতে নিয়ে আধঘন্টা বসে থাকার পরও একটা পাতাও পড়া হয় না। কেন যেন বই পড়ার জন্য আলাদা একটা মুডের দরকার হয়। মুড বিষয়টা ছেলেবেলায় ছিল না। বুড়ো হতে হতে মানুষ অনেক কিছুর উপর নির্ভরশীল হয়। আমি কি সত্যি বুড়োত্বের পথে এগিয়ে গেলাম? কিন্তু মনের বয়সতো এখনো ২৩।

Sunday, March 30, 2014

অতঃপর

একটি নক্ষত্র আসে; তারপর একা পায়ে চ'লে
ঝাউয়ের কিনার ঘেঁষে হেমন্তের তারাভরা রাতে
সে আসবে মনে হয়; - আমার দুয়ার অন্ধকারে
কখন খুলেছে তার সপ্রতিভ হাতে!
হঠাৎ কখন সন্ধ্যা মেয়েটির হাতের আঘাতে
সকল সমুদ্র সূর্য সত্বর তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাত্রি হতে পারে
সে এসে এগিয়ে দেয়;
শিয়রে আকাশ দূর দিকে
উজ্জ্বল ও নিরুজ্জ্বল নক্ষত্র গ্রহের আলোড়নে
অঘ্রানের রাত্রি হয়;
এ-রকম হিরন্ময় রাত্রি ইতিহাস ছাড়া আর কিছু রেখেছে কি মনে।

শেষ ট্রাম মুছে গেছে, শেষ শব্দ, কলকাতা এখন
জীবনের জগতের প্রকৃতির অন্তিম নিশীথ;
চারিদিকে ঘর বাড়ি পোড়ো-সাঁকো সমাধির ভিড়;
সে অনেক ক্লান্তি ক্ষয় অবিনশ্বর পথে ফিরে
যেন ঢের মহাসাগরের থেকে এসেছে নারীর
পুরোনো হৃদয় নব নিবিড় শরীরে।

[একটি নক্ষত্র আসে: জীবনানন্দ দাশ]

Estoy seguro de que sabía que nada de esta tierra. Esta tierra no es de comparar con la de cualquier mujer. Ella sólo le compara . Anyatama tierra fue creada y ananya a excepción de dos términos. Por ejemplo, para adorarlo con mi creación. Sbargacyuta notable construcción debe ser Dios bajó a la tierra en la tarde cuando la puerta se abrió y sus apuestos manos oscuras . Dandy ha abierto las puertas para mí en el inevitable regreso de su propio conocimiento. Sbargabasini nunca entendió cuando él llevó al cielo . Él era más gloriosa luz de la tarde. Eliminar las hojas se mueven ligeramente en el viento de bidayabani melodía elegíaca él dijo: Yo soy otro lado del cielo por el jefe de las estrellas más brillantes y los planetas nirujjbala agitación . Lo he visto romper el color de mis ojos está extendiendo estrella sentado paparite . Conozco a una mujer que vino del océano de la existencia. El viejo corazón del cuerpo intensivos neonatales . Yo estaba esperando por él un montón de ellos en la tarde durante algunos siglos. Me janama janama bhalobasabo sibhena mí. Sbarthaka he nacido en este mundo , se ve un ojo. Usted es un regalo único de la vida humana es insignificante.


Wednesday, March 19, 2014

আরো আঘাত সইবে

যতটা আঘাত পাবার ছিল,
পাওয়া হলো তারো বেশী,
পাওনা ছিল বলে।
যতটা আঘাত দেবার ছিল,
দেয়া হলো তারো বেশী,
দেনা ছিল বলে।
শোধ হলো লেনদেন,
বোধ হলো উদয়।
শুদ্ধ মানসে নতুন প্রভাত,
রবিরও কিরণ মেনে।

অবোধ কবি তবু বলে-
https://www.youtube.com/watch?v=h8wQ2ofZRn8



আরো আঘাত সইবে আমার
        সইবে আমারো,
আরো কঠিন সুরে জীবনতারে ঝংকারো ।
        যে রাগ জাগাও আমার প্রাণে
        বাজে নি তা চরমতানে,
        নিঠুর মূর্ছনায় সে গানে
             মূর্তি সঞ্চারো ।

লাগে না গো কেবল যেন
        কোমল করুণা,
মৃদু সুরের খেলায় এ প্রাণ
        ব্যর্থ কোরো না ।
         জ্বলে উঠুক সকল হুতাশ,
         গর্জি উঠুক সকল বাতাস,
         জাগিয়ে দিয়ে সকল আকাশ
                 পূর্ণতা বিস্তারো ।

Tuesday, March 18, 2014

স্বাধীনতার প্রশ্নে: বাংলাদেশ, ভারতীয় উপমহাদেশ,

১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে সিরাজদৌলার বাহিনী লর্ড ক্লাইভের হাতে পরাজিত হবার পর ভারত উপমহাদেশের পরাধীনতার যাত্রা শুরু। ইতিহাসে এভাবেই লেখা আছে। এখানে আমার কিছু প্রশ্ন কাজ করে। আমাদের পরাধীনতার যাত্রা কি তখন থেকে শুরু নাকি আরো আগে বা পরে? স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বলতে আমরা কি বুঝি। সেই সময়ে রাষ্ট্র নামক ধারণাটি কেমন ছিল। আদৌ রাষ্ট্র নামের কোন সীমানার অস্তিত্ব কি ছিল? সেই রাষ্ট্রে কয়টা সরকার ছিল? বাংলার একটা মাত্র যুদ্ধে সিরাজদৌলার পতনে কেন সমগ্র ভারত বৃটিশ অধিভুক্ত হতে শুরু করলো? এটা কি ভারতের দুর্বলতা নাকি ইংরেজের পরাক্রমতা। আমরা তাদের সুযোগ করে দেইনিতো?

আমি যদ্দুর বুঝি সমগ্র ভারত তখন একক রাজ্য ছিল না। একক রাজত্বের কোন নজির দেখি না। যদি একক রাজ্য হতো তাহলে ভাস্কোদাগামা যেদিন ভারতের মাটিতে পা রাখলো, সেদিন থেকেই তাদের প্রতিরোধ করা হতো। কিন্তু ভাস্কো দা গামা কোথাকার ইউরোপ থেকে কাঠের জাহাজ নিয়ে উড়ে এসে কয়েকটা গোলা মারলো আর তাতেই কালিকট বন্দরে তাদের আধিপত্য কায়েম হয়ে গেল। সেটা ১৪৯৮ সালের ঘটনা। তার মাত্র পনের বিশ বছরের মধ্যে পর্তুগীজরা সুদূর চট্টগ্রাম পর্যন্ত এসে গেল। সারা ভারতের জলপথে তাদের আধিপত্য শুরু হলো। শুধু জলপথ নয়, তারা স্থলভাগেও অত্যাচার শুরু করলো। এই শক্তি এই সাহস ভিনদেশী পর্তুগীজ কোথা থেকে পেল? পর্তুগীজ সেই সময়ে এমন কোন সমৃদ্ধ রাজ্য না যে তারা এত বড় ভারতবর্ষের উপর আক্রমন করতে পারে।  আসলে দিল্লীর মসনদে আসীন রাজা বাদশারা দেশ রক্ষা নিয়ে কোন চিন্তা করতেন মনে হয় না। নইলে দেশকে এরকম অরক্ষিত রেখে নিজেরা ওরকম ভোগ বিলাস আর বিশাল সব প্রাসাদ নির্মানে ব্যস্ত থাকতে পারতেন না। এরা না এগিয়েছে জ্ঞানে না বিজ্ঞানে। ব্যস্ত ছিল অন্তর্কলহে, ব্যস্ত ছিল অপ্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ডে।

ইউরোপ ভারতের সন্ধান পেয়ে হাতে যেন চাঁদ পেল। পর্তুগীজের পিছনে আসতে শুরু করে ইউরোপের অন্যন্য জাতি। তারা ভিনদেশী বইঙ্গা হয়েও এত বড় ভারতবর্ষের শক্তিশালী মোগল সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। ভারত যদি একক রাষ্ট্র হতো, একভাবে ভারতীয় সবগুলো রাজ্য বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে কাজ করতো, তাহলে এই উপমহাদেশে কোন কালেই ইউরোপীয়ান উপনিবেশ তৈরী হতে পারতো না। এ মোগল সাম্রাজ্যের ব্যর্থতা, এ আমাদের দুর্বলতা, আমাদেরই অক্ষমতা। পাঁচশো বছর পার হয়ে গেলেও সেই বিদেশী ভীতি আমাদের এখনো কাটেনি। এখনো সাদা চামড়া দেখলে আমাদের কোমর বাঁকা হয়ে যায়, কথা বলতে গেলে গলা শুকিয়ে যায়। সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যে এই দুর্বলতায় বাঙালীরাই সবচেয়ে এগিয়ে। তাহলে আমরা কিভাবে বলি বাঙালী বীরের জাত। আমাদের কথিত সেই বীরত্বের গল্প কোথায়। নিজেরা নিজেদের মাথা ফাটানোকে যদি বীরত্ব বলা যায়, তাহলে তাতে বাঙালীর কোন প্রতিদ্বন্দীই নেই।

আসলে আমরা বরাবর নিজেদের প্রতি অমনযোগী নাগরিকই ছিলাম। ভারত কখনো নিজের শক্তি নিয়ে কঠিন ভাবে বিদেশী শক্তির মুখোমুখি দাড়ায়নি। যদি দাড়াতো তাহলে কখনোই এশিয়ার এই অঞ্চলে বৃটিশ শাসন বিস্তার লাভ করতে পারতো না।

ভারত কখন পরাধীনতা হারায় এই প্রশ্নের সঠিক কোন জবাব নেই। তবে নিশ্চিত যে সেটা ১৭৫৭ নয়। তারো বহু বছর আগেই পরাধীন হয়ে ছিল। ছিন্ন ভিন্ন একটা রাষ্ট্র ছিল ভারত। বাংলা তো বটেই। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা পাবার পূর্বে বাংলাদেশ কখনো স্বাধীন ছিল এটা আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না। ইতিহাসে তেমন নজির দেখি না।




[ভাস্কো দা গামার জার্নাল পড়তে পড়তে যেসব তাৎক্ষণিক চিন্তা প্রতিক্রিয়া মাথায় আসছে, সেগুলো লিপিবদ্ধ করছিলাম। এরপর ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর প্রথম গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম হেজের ১৬৮১ সালের ডায়েরী পড়া শুরু করেছি। মাথায় নতুন চিন্তা ভর করতে শুরু করেছে। লিখে রাখছি যদি পরে কোথাও কাজে লাগে]