(এটি একটি খানাপিনা বিষয়ক হালকা পোষ্ট। জ্ঞানীগুনীরা নিজ দায়িত্বে পড়বেন).......আমি পড়তে ভালোবাসি। শুধু তাই না, পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়তে আরো বেশী ভালোবাসি। তবে আজকাল সাহিত্য পড়া বাদ দিয়ে নতুন কিছু পড়ছি। পড়ছি না ঠিক, বলা যায় গবেষণা করছি। .........যেসব খাবার খেতে ডাক্তার বারন করেন, যেসব খাবার জিবে সয় কিন্তু রক্তে সয় না, যেসব খাবার ছেলেপিলেরা কচ কচ করে খায়, আর আধবুড়োরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, সেইসব খাওয়া কি উপায়ে খাওয়া যায় সেই বিষয়ে গবেষণা করা এবয নিষিদ্ধ খাবারগুলোকে নির্ভয়ে টেবিলে পরিবেশনে গৃহিনীদের উৎসাহিত করাও একটা উদ্দেশ্যে। আজকের বিষয় চিংড়ি।
চল্লিশে সবাই চালশে হয় না। তবু চল্লিশ পেরুনো মানুষদের স্বাস্থ্যচিন্তা করতেই হয়। কারণ এই বয়স থেকেই যাত্রা শুরু হয় সেইসব রোগের যা এতদিন যাবত বয়স্কদের রোগ বলেই শুনতে অভ্যস্ত ছিল। যেমন হার্টের ব্যামো, ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার ইত্যাদি। এই সময়ে লিপিড প্রোফাইল, কোলেষ্টেরল, এইচডিএল, এলডিএল, ট্রাইগ্লিসারাইড ইত্যাদি শব্দের সাথে ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটতে থাকে ধীরে ধীরে। ডাক্তারের চেম্বারে, ডায়গনসিস সেন্টারে, ওষুধের দোকানে বারবার হানা দিতে হয়।
প্রথমবার লিপিড প্রোফাইল করাই তিন বছর আগে। তখন মোট কোলেষ্টেরল LDL, HDL সবকিছু নিরাপদ মাত্রার মধ্যে ছিল, কেবল ট্রাইগ্লিসারাইড ছিল ২৮০ (সর্বোচ্চ নিরাপদ সীমা ২০০)। ডাক্তার সাহেব TG বা triglycerides নিয়ন্ত্রনের জন্য কিছু নিয়মনীতি বেধে দিলেও বাঙালীর স্বাধীন গণতান্ত্রিক চেতনায় মাসখানেক পরই নিয়মের বেড়া ভেঙ্গে বেরিয়ে আসি। আবার পুরোনো সিস্টেমে চলতে থাকি। দাওয়াতে গেলে নিজের প্লেটে বিরিয়ানী রেজালা সব নিয়ে বসি আর বাণিজ্যমন্ত্রীর মতো লোকজনকে বলতে থাকি, কম খান।
তেমন কোন সমস্যা হচ্ছিল না। তবে জাপানের সুনামীর কিছুদিন পর আমি চোখে প্রায়ই ৬-৭ মাত্রার ভূমিকম্প দেখতে থাকি বাংলাদেশে বসেও। চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিলাম কয়েকবার। আশপাশের কাউকে জিজ্ঞেস করলে বলে, ওরকম ভূমিকম্পের কোন নজির তারা দেখে না। ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি দেখেশুনে জানালো ভূমিকম্প আসলে আমার মাথায়। আবারো চেকাপ। লিপিড প্রোফাইলসহ নানা রকম পরীক্ষানিরীক্ষার প্রেসক্রিপশান।
দেখা গেল তিন বছর আগের তুলনায় শরীরের ওজন তেমন না বাড়লেও রক্ত কনিকায় সব ধরনের কোলেস্টেরলের প্রবৃদ্ধি কেওক্রাডং ছেড়ে কাঞ্চনজংঘার দিকে রওনা দিয়েছে এবং সবচেয়ে বাম্পার ফলন হয়েছে টিজি বা ট্রাইগ্লিসারাইডের। আমার ট্রাইগ্লিসারাইড ৭৪৭ ছুয়েছে! ভয়াবহ অবস্থা। টিজি'র বিপদ সীমার সর্বোচ্চ রেটিং ৫০০, আমার রেটিং তাদেরকে ছেড়ে বোয়িং ৭৪৭ এর মতো অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। অথচ আমি নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করি, সীমিত আহার করি, পানদোষ নেই, ধুমদোষ নগণ্য। দোষের মধ্যে হাঁটাহাটি কম করি আর সুযোগ পেলে কাবাব তন্দুরী খাই।
ডাক্তার সাহেব সব উর্বর খানাপিনা, সামাজিক দাওয়াত, ফাষ্টফুড, তন্দুরী ইত্যাদির উপর কারফিউ জারি করলেন। রুটি/ভাত, সবজি, সমুদ্রের মাছ, ফলমূল ইত্যাদি বাদে আর সব খাবার নিষিদ্ধ। আয়ুবৃদ্ধির স্বার্থে আমি সব মেনে নিলাম, কিন্তু চিংড়ি মাছের প্রতি আজীবন দুর্বলতা হেতু, ডাক্তারের কাছে মিনমিন করে আপীল করলাম,
-সত্যিই চিংড়ি খাওয়া যাবে না? এটা কি খুব ক্ষতিকর?
-অসম্ভব। এটা কোলেষ্টেরলে ভর্তি, এটা একদম খাওয়া নিষেধ
-কিন্তু আমি যেন শুনলাম এটায় LDL কম HDL বেশী এবং এই চিংড়িতে OMEGA-3 আছে
-ওসব হলো খাওয়ার ফন্দী। আমি যখন বলছি ওসব কিছুতেই খাবেন না।
বেজার মুখ করে চলে আসলাম। কিন্তু একদিন স্বপ্নে আওয়াজ পেলাম, আরো কিছু অজুহাত খুঁজে বের করো যাতে চিংড়িটা সুখপাঠ্য যুক্তি দিয়ে টেবিলে সাজানো যায়। নেটে বসে আবারো গুঁতোগুতি শুরু করলাম। চিংড়ি মাছের মতো মজাদার একটা আইটেম খানাপিনার লিষ্ট থেকে বাদ যাবে, এটা হতে পারে না। খুঁজি আর খুঁজি কিন্তু কোথাও সায় পাই না।
অবশেষে ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশান একটু আশার আলো দেখালো। ওরা মৃদুস্বরে বলছে, যেসব খাবারকে আমরা কোলেষ্টেরোলের জন্য দায়ী করি, আসলে তার চেয়েও ভয়ংকর ক্ষতিকর জিনিস হলো saturated fat এবং trans fat. কোলেষ্টেরোলের উৎপাত কমাতে এই দুটোর ভোজন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রন করতে হবে। এবং চিংড়িতে এই জিনিসের তেমন প্রাদুর্ভাব নেই। এটা শোনার পর নড়ে চড়ে বসলাম আবার। তবে এই লিংকের ডকুটা ডাক্তারের কাছে দেখালে ডাক্তার মানবে কিনা সন্দেহ। যদিও এখানে পরিষ্কার বলেছে-
A common cause of high blood cholesterol levels is eating too much saturated fat.
However, some people have high blood cholesterol even though they eat a healthy diet. For example, they may have inherited a condition called familial hyperlipidaemia (FH).
The cholesterol which is found in some foods such as eggs, liver, kidneys and some types of seafood eg. prawns, does not usually make a great contribution to the level of cholesterol in your blood. It's much more important that you eat foods that are low in saturated fat.
আবার বলছে-
"In the past a restriction on eggs was recommended because we thought that foods high in cholesterol (including liver, kidneys and shellfish, as well as eggs) could have an impact on cholesterol levels in the body.
ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশানের মতো প্রতিষ্ঠান যখন একথা বলে, তখন আমার ডাক্তারের উপদেশ একটু সন্দেহের মধ্যে পড়ে যায় না?
আমি আজকাল ডাক্তার বৈদ্যকে নির্ভেজাল বিশ্বাস করা ছেড়ে দিয়েছি। কারণ ওদের কথাবার্তা কদিন পরপর বদলায়। একসময় বলতো চা খাওয়া খারাপ। এখন শুনি দিনে পাঁচ কাপ চা খেলে ক্যান্সারের সম্ভাবনা কম থাকে, আরো অনেক অসুখ বিসুখের জন্য চা বিশেষ উপকারী। জয়তু চা! তবে চিনি ছাড়া।
যাইহোক চিংড়ি কথায় ফিরে আসি।
ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশানের পরে উইকিতে গিয়ে চিংড়ি বিষয়ে দারুণ একটা প্যারা খুঁজে পেয়ে আরো উৎসাহিত হলাম।
As with other seafood, shrimp is high in calcium, iodine and protein but low in food energy. A shrimp-based meal is also a significant source of cholesterol, from 122 mg to 251 mg per 100 g of shrimp, depending on the method of preparation.[7] Shrimp consumption, however, is considered healthy for the circulatory system because the lack of significant levels of saturated fat in shrimp means that the high cholesterol content in shrimp actually improves the ratio of LDL to HDL cholesterol and lowers triglycerides.[8]
এবং আরেকটু এগিয়ে গিয়ে চিংড়ি নিয়ে সবচেয়ে চমকপ্রদ লেখা পেয়ে গেলাম American Journal of Clinical Nutrition এর একটা প্রবন্ধে। এটা পাঠ করার পর আমার চিংড়ি প্রেম তুঙ্গে উঠে গেল। এখানে পরিষ্কার বলছে চিংড়ি খাওয়া মোটেও মন্দ কাজ নয়। বরং এটি স্বাস্থ্যপক্ষে খুব উপকারী।
ভূনা চিংড়ির প্লেটটা টেবিলে সাজিয়ে কি এখন দেশী ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙুল দেখানো যায়?
Monday, November 14, 2011
ঠেঙ্গামারা কথন
প্রায় আদিম যুগের কথা। ঠেঙ্গামারা গ্রামের লোকজন তখন মাত্র মোটা ধুতির উপর পিরান পরতে শিখেছে। তার আগে পুরুষকুলের সবাই উদলা গায়ে থাকতো। শীতকালে সেটা কষ্টকর হলেও গরমে আরাম ছিল। শীতকালে বয়স্কদের শিয়রে একটা করে 'আইল্লা' দেয়া হতো। 'আইল্লা' হলো জ্বলন্ত কয়লাপূর্ন পোড়ামাটির ভান্ড, যাকে মোবাইল ফায়ারপ্লেসও বলা যায়। এর সুবিধা হলো যেখানে খুশী সেখানে নিয়ে যাওয়া যায়। এমনকি সাবধানে কাঁথার ভেতরে ঢুকিয়ে নেয়া যায় শীতকালে। অবশ্য কাঁথা পুড়ে যাবার আশংকাও থাকে সেক্ষেত্রে।
বয়স্করা প্রায়ই বলে ঠেঙ্গামারা গ্রাম এক সময় জগতের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী গ্রাম ছিল। কালের বিবর্তনে সমৃদ্ধি ক্ষয়ে গেছে, লোকজন দরিদ্র হয়ে পড়েছে।
ঠেঙ্গামারা গ্রামের মাঝ দিয়ে একটা খাল বয়ে গেছে। সেই খালের উপর গ্রামবাসীর ব্যাপক নির্ভরতা। ওই খালের ব্যবহারের দক্ষতার উপর নির্ভর করে জনগণের সুখ সমৃদ্ধি।
সেই খালের পরে গ্রামবাসীর নির্ভরতা গ্রামের দুই মৌলানার উপর। ঠেঙ্গামারা গ্রামে একটা মসজিদ থাকলেও মৌলানা আছে দুইজন। মৌলানা বাদে বাকী গ্রামবাসী নিরেট মূর্খ। দুই মোল্লাকে নিয়ে গ্রামবাসী একটু বিপদে পড়েছিল প্রথমদিকে। কারণ দুই মোল্লাই চায় মসজিদের ইমাম হতে। কিন্তু এক মসজিদে দুই ইমাম কেমনে হয়? তাই গ্রামবাসী বসে ঠিক করলো একজন ইমাম আরেকজন মুয়াজ্জিন হবে। তবে যেহেতু দুজনই দাবিদার পরের বছর ইমাম চলে যাবে মুয়াজ্জিনের জায়গায় মুয়াজ্জিন এসে বসবে ইমামের জায়গায়।
ব্যবস্থাটা প্রথম প্রথম ভালোই যাচ্ছিল। কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল নামাজের ওয়াক্ত হয়ে গেছে কিন্তু মুয়াজ্জিনের দেখা নাই। বাধ্য হয়ে ইমাম রাগে গজগজ করতে করতে নিজেই আজান দেয়। আবার কোন কোন সময় মুয়াজ্জিন এত আস্তে আজান দেয় যে কেউ শুনতেই পায় না। ইমাম নামাজ পড়ানোর জন্য দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু লোকজন কেউ আসছে না। ইমামকে এরকম ত্যক্ত করতে থাকলো মুয়াজ্জিন।
পরের বছর পালাবদল হলো। মুয়াজ্জিন ইমামের জায়গায় দাঁড়ালো, ইমাম হুজুর মুয়াজ্জিনের জায়গায় আসলো। কিন্তু বদলাবদলির একদিন পরই দেখা গেল মাগরিবের সময় নতুন মুয়াজ্জিনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে নতুন ইমাম নিজেই আজান দিয়ে নামাজ পড়াতে লাগলো। দিনের পর দিন এরকম প্রতিশোধ নেয়ানেয়ির খেলায় মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে দুজনকে গ্রাম থেকে বের করে দেবার চিন্তা করতে লাগলো।
এই খবর কানে আসার পর পর ইমাম মুয়াজ্জিন সেই রাতের মধ্যেই মিলিত হলো গোপন বৈঠকে। বৈঠক শেষে দুজনে মিলে গভীর রাতে খালের উজানে গিয়ে দুটো ছাগল মেরে রক্ত ছড়িয়ে দিয়ে আসলো জলে আর খালের পাড়ে।
পরদিন সকালে গ্রামবাসী খালে হাতমুখ ধুতে গিয়ে আবিষ্কার করলো খালের পানি লালচে হয়ে আছে জায়গায় জায়গায়। ভয় পেয়ে গ্রামের লোকজন ছুটলো মসজিদে। ইমাম মুয়াজ্জিন দুজনে গম্ভীর হয়ে ঘটনা শুনলো। তারপর ফতোয়া দিল, গ্রামের অমঙ্গল ঘনিয়ে আসার লক্ষণ। মহামারী এগিয়ে আসছে। ওই বিপর্যয় ঠেকানোর জন্য জনপ্রতি একটা করে মুরগী জবাই করতে হবে এবং কোন দ্বীনি মানুষকে খাওয়াতে হবে।
গ্রামে দ্বীনি মানুষতো দুইজন। ব্যবস্থা হলো প্রতিবেলায় একটা করে মুরগী জবাই করে একবেলা মুয়াজ্জিন আরেকবেলা ইমামকে খাওয়ানো হবে।
উপস্থিত বুদ্ধিতে টিকে গেল দুজনের চাকরী। কিন্তু মুরগী খাওয়াতে গিয়ে গ্রামের মানুষ আধাআধি ভাগ হয়ে গেল। ইমামকে যারা খাইয়েছে তারা ইমামের ভক্ত হয়ে গেল। মুয়াজ্জিনকে যারা খাইয়েছে তারা মুয়াজ্জিন হুজুরকে মান্য করতে লাগলো। এই দুই দলের মধ্যে একবার হাতাহাতিও হলো খালের পানির ব্যবহার নিয়ে।
নিয়ম ছিল যখন কেউ খাবার পানি সংগ্রহ করবে কিংবা হাতমুখ ধোয়ার জন্য নামবে অন্য কেউ মাছ ধরতে নামবে না তখন। কিন্তু ইমাম মুয়াজ্জিনের দুই দলের দ্বন্দ্বে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটতে থাকলো বারবার। ইমাম সমর্থক যখন খাবার পানি আনতে যায়, মুয়াজ্জিনের লোক তখন জাল মেরে খালের পানি নোংরা করে দেয়। ফলে লাগলো বিরাট ক্যাচাল। গ্রামের মানুষ নিজেরা নিজেরা মারামারি হানাহানিতে জড়িয়ে পড়লো। পুরো গ্রামটা অনাচারে ভরে গেল।
গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক অভিজ্ঞ মানুষ তিতা মিয়া। চোখে দেখেন না। কিন্তু কানে ভালো শোনেন। গ্রামবাসী তাঁর কাছে গেল। তিনি সব শুনে পরামর্শ দিলেন এই আজাব থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় খালের দুই পাশে দুইটা মসজিদ নির্মাণ করা। এবং দুই মসজিদে দুই ইমামকে নিয়োজিত করা।
তিতা মিয়ার কথা শতে শত সঠিক। গ্রামবাসী ওই পাড়ে আরেকটা মসজিদ বানিয়ে দুই মৌলানাকে দুই মসজিদের ইমাম করে দেবার পর ঠেঙ্গামারা গ্রামে শান্তির নহর বইয়ে গেল সাতদিন।
অতঃপর.............? তাহারা জনম জনম ধরে সুখে কাটাতে লাগল?
না!
কিছুদিন বাদেই ইমাম মুয়াজ্জিন সমর্থকগন পরস্পরের খাওয়ার পানি সংগ্রহস্থলের উল্টোদিকে পায়খানার নালা খুঁড়ে দিল এবং বছরের পর বছর ধরে তাদের ডায়রিয়া মহামারী চলতে থাকবে।
.........................................................................................................................................
এবং আরো বহু যুগ পার হয়ে ঠেঙ্গামারা জনপদের উত্তরপুরুষেরা বাংলাদেশ নামে একটা স্বাধীন দেশ গঠন করবে।
বয়স্করা প্রায়ই বলে ঠেঙ্গামারা গ্রাম এক সময় জগতের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী গ্রাম ছিল। কালের বিবর্তনে সমৃদ্ধি ক্ষয়ে গেছে, লোকজন দরিদ্র হয়ে পড়েছে।
ঠেঙ্গামারা গ্রামের মাঝ দিয়ে একটা খাল বয়ে গেছে। সেই খালের উপর গ্রামবাসীর ব্যাপক নির্ভরতা। ওই খালের ব্যবহারের দক্ষতার উপর নির্ভর করে জনগণের সুখ সমৃদ্ধি।
সেই খালের পরে গ্রামবাসীর নির্ভরতা গ্রামের দুই মৌলানার উপর। ঠেঙ্গামারা গ্রামে একটা মসজিদ থাকলেও মৌলানা আছে দুইজন। মৌলানা বাদে বাকী গ্রামবাসী নিরেট মূর্খ। দুই মোল্লাকে নিয়ে গ্রামবাসী একটু বিপদে পড়েছিল প্রথমদিকে। কারণ দুই মোল্লাই চায় মসজিদের ইমাম হতে। কিন্তু এক মসজিদে দুই ইমাম কেমনে হয়? তাই গ্রামবাসী বসে ঠিক করলো একজন ইমাম আরেকজন মুয়াজ্জিন হবে। তবে যেহেতু দুজনই দাবিদার পরের বছর ইমাম চলে যাবে মুয়াজ্জিনের জায়গায় মুয়াজ্জিন এসে বসবে ইমামের জায়গায়।
ব্যবস্থাটা প্রথম প্রথম ভালোই যাচ্ছিল। কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল নামাজের ওয়াক্ত হয়ে গেছে কিন্তু মুয়াজ্জিনের দেখা নাই। বাধ্য হয়ে ইমাম রাগে গজগজ করতে করতে নিজেই আজান দেয়। আবার কোন কোন সময় মুয়াজ্জিন এত আস্তে আজান দেয় যে কেউ শুনতেই পায় না। ইমাম নামাজ পড়ানোর জন্য দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু লোকজন কেউ আসছে না। ইমামকে এরকম ত্যক্ত করতে থাকলো মুয়াজ্জিন।
পরের বছর পালাবদল হলো। মুয়াজ্জিন ইমামের জায়গায় দাঁড়ালো, ইমাম হুজুর মুয়াজ্জিনের জায়গায় আসলো। কিন্তু বদলাবদলির একদিন পরই দেখা গেল মাগরিবের সময় নতুন মুয়াজ্জিনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে নতুন ইমাম নিজেই আজান দিয়ে নামাজ পড়াতে লাগলো। দিনের পর দিন এরকম প্রতিশোধ নেয়ানেয়ির খেলায় মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে দুজনকে গ্রাম থেকে বের করে দেবার চিন্তা করতে লাগলো।
এই খবর কানে আসার পর পর ইমাম মুয়াজ্জিন সেই রাতের মধ্যেই মিলিত হলো গোপন বৈঠকে। বৈঠক শেষে দুজনে মিলে গভীর রাতে খালের উজানে গিয়ে দুটো ছাগল মেরে রক্ত ছড়িয়ে দিয়ে আসলো জলে আর খালের পাড়ে।
পরদিন সকালে গ্রামবাসী খালে হাতমুখ ধুতে গিয়ে আবিষ্কার করলো খালের পানি লালচে হয়ে আছে জায়গায় জায়গায়। ভয় পেয়ে গ্রামের লোকজন ছুটলো মসজিদে। ইমাম মুয়াজ্জিন দুজনে গম্ভীর হয়ে ঘটনা শুনলো। তারপর ফতোয়া দিল, গ্রামের অমঙ্গল ঘনিয়ে আসার লক্ষণ। মহামারী এগিয়ে আসছে। ওই বিপর্যয় ঠেকানোর জন্য জনপ্রতি একটা করে মুরগী জবাই করতে হবে এবং কোন দ্বীনি মানুষকে খাওয়াতে হবে।
গ্রামে দ্বীনি মানুষতো দুইজন। ব্যবস্থা হলো প্রতিবেলায় একটা করে মুরগী জবাই করে একবেলা মুয়াজ্জিন আরেকবেলা ইমামকে খাওয়ানো হবে।
উপস্থিত বুদ্ধিতে টিকে গেল দুজনের চাকরী। কিন্তু মুরগী খাওয়াতে গিয়ে গ্রামের মানুষ আধাআধি ভাগ হয়ে গেল। ইমামকে যারা খাইয়েছে তারা ইমামের ভক্ত হয়ে গেল। মুয়াজ্জিনকে যারা খাইয়েছে তারা মুয়াজ্জিন হুজুরকে মান্য করতে লাগলো। এই দুই দলের মধ্যে একবার হাতাহাতিও হলো খালের পানির ব্যবহার নিয়ে।
নিয়ম ছিল যখন কেউ খাবার পানি সংগ্রহ করবে কিংবা হাতমুখ ধোয়ার জন্য নামবে অন্য কেউ মাছ ধরতে নামবে না তখন। কিন্তু ইমাম মুয়াজ্জিনের দুই দলের দ্বন্দ্বে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটতে থাকলো বারবার। ইমাম সমর্থক যখন খাবার পানি আনতে যায়, মুয়াজ্জিনের লোক তখন জাল মেরে খালের পানি নোংরা করে দেয়। ফলে লাগলো বিরাট ক্যাচাল। গ্রামের মানুষ নিজেরা নিজেরা মারামারি হানাহানিতে জড়িয়ে পড়লো। পুরো গ্রামটা অনাচারে ভরে গেল।
গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক অভিজ্ঞ মানুষ তিতা মিয়া। চোখে দেখেন না। কিন্তু কানে ভালো শোনেন। গ্রামবাসী তাঁর কাছে গেল। তিনি সব শুনে পরামর্শ দিলেন এই আজাব থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় খালের দুই পাশে দুইটা মসজিদ নির্মাণ করা। এবং দুই মসজিদে দুই ইমামকে নিয়োজিত করা।
তিতা মিয়ার কথা শতে শত সঠিক। গ্রামবাসী ওই পাড়ে আরেকটা মসজিদ বানিয়ে দুই মৌলানাকে দুই মসজিদের ইমাম করে দেবার পর ঠেঙ্গামারা গ্রামে শান্তির নহর বইয়ে গেল সাতদিন।
অতঃপর.............? তাহারা জনম জনম ধরে সুখে কাটাতে লাগল?
না!
কিছুদিন বাদেই ইমাম মুয়াজ্জিন সমর্থকগন পরস্পরের খাওয়ার পানি সংগ্রহস্থলের উল্টোদিকে পায়খানার নালা খুঁড়ে দিল এবং বছরের পর বছর ধরে তাদের ডায়রিয়া মহামারী চলতে থাকবে।
.........................................................................................................................................
এবং আরো বহু যুগ পার হয়ে ঠেঙ্গামারা জনপদের উত্তরপুরুষেরা বাংলাদেশ নামে একটা স্বাধীন দেশ গঠন করবে।
অবশেষে একদিন মানুষ খেলুম
শতবর্ষ পুরোনো অব্যবহৃত দীঘি। ঘন আঁশটে গন্ধী জলজ আগাছার ফাঁকে ফাঁকে শত শত শাপলা ফুটে থাকে এখনো। পরিত্যক্ত দীঘিতে কেউ আসে না জল নিতে বা গা ধুতে। দীঘির পাড় জুড়ে কবরস্থান। হাজার হাজার মৃত মানুষের হাড় ফসফরাস সরবরাহ করছে মাটিতে। শাপলা তুলতে প্রতিদিন দীঘিতে নামে দ্বাদশবর্ষীয় মুকুল।
একেকটা ফুল তুলে সবুজ সাদা পাপড়িগুলো ফেলে এক কামড়ে ফুলের মাথিটা খেয়ে লতাটা গলায় ঝুলিয়ে নেয়। এই ফুল তার খিদে মেটায়। ফুলের নলিগুলো তার মায়ের রান্নায় তরকারির যোগান দেয়। প্রতিদিন শাপলার তরকারী খেয়ে দুবেলা কাটে মা ছেলের।
আজকে দীঘিতে নেমে গভীরে যেতে হলো একটু। যদিও গভীর অগভীর এক সমান এখানে। জলের নীচে লতার ঝাড়ে পা দিয়ে দিয়ে অনেক দূর চলে যেতে পারে সে। কিন্তু আজকে অল্পদূর গিয়েই হঠাৎ পা ফসকে শেকড় লতার গভীরে নেমে গেল মুকুল। পায়ের নীচে কিসের যেন টান। সে দুপায়ে ঝটকা মেরে উঠতে চাইলে আরো জোরে গিট্টু লেগে গেল। টানাটানিতে তার মাথাটা ডুবে গেল জলের নীচে। সে কোনমতেই ঠাঁই পাচ্ছে না অগভীর জলেও। দম আটকে আসছে তার। শাপলার শেকড় লতাগুলোকে হিংস্র মনে হলো। অল্প কিছুক্ষণ টানাটানির পর জলের নীচেই দমটা থেমে গেল তার।
এই দীঘির পাড়ে কেউ আসে না বিবশ দুপুরে। তাই কেউ দেখলো না এই ঘটনার লেশমাত্র। কেবল গত সপ্তাহে কবর হওয়া জমিরের দাদার বুড়ো শরীরটা কবরের বাঁশের বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুনতে পায় দীঘির ধোপ সাদা ফুলগুলো একটা কালো চুলের মাথা ঘিরে বেদম হাসছে ফিসফিসিয়ে। সম্মিলিত সুরে মাথা নেড়ে জাতীয় ফুলগুলো যেন বলছে, 'অবশেষে একদিন মানুষ খেলুম'।
একেকটা ফুল তুলে সবুজ সাদা পাপড়িগুলো ফেলে এক কামড়ে ফুলের মাথিটা খেয়ে লতাটা গলায় ঝুলিয়ে নেয়। এই ফুল তার খিদে মেটায়। ফুলের নলিগুলো তার মায়ের রান্নায় তরকারির যোগান দেয়। প্রতিদিন শাপলার তরকারী খেয়ে দুবেলা কাটে মা ছেলের।
আজকে দীঘিতে নেমে গভীরে যেতে হলো একটু। যদিও গভীর অগভীর এক সমান এখানে। জলের নীচে লতার ঝাড়ে পা দিয়ে দিয়ে অনেক দূর চলে যেতে পারে সে। কিন্তু আজকে অল্পদূর গিয়েই হঠাৎ পা ফসকে শেকড় লতার গভীরে নেমে গেল মুকুল। পায়ের নীচে কিসের যেন টান। সে দুপায়ে ঝটকা মেরে উঠতে চাইলে আরো জোরে গিট্টু লেগে গেল। টানাটানিতে তার মাথাটা ডুবে গেল জলের নীচে। সে কোনমতেই ঠাঁই পাচ্ছে না অগভীর জলেও। দম আটকে আসছে তার। শাপলার শেকড় লতাগুলোকে হিংস্র মনে হলো। অল্প কিছুক্ষণ টানাটানির পর জলের নীচেই দমটা থেমে গেল তার।
এই দীঘির পাড়ে কেউ আসে না বিবশ দুপুরে। তাই কেউ দেখলো না এই ঘটনার লেশমাত্র। কেবল গত সপ্তাহে কবর হওয়া জমিরের দাদার বুড়ো শরীরটা কবরের বাঁশের বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুনতে পায় দীঘির ধোপ সাদা ফুলগুলো একটা কালো চুলের মাথা ঘিরে বেদম হাসছে ফিসফিসিয়ে। সম্মিলিত সুরে মাথা নেড়ে জাতীয় ফুলগুলো যেন বলছে, 'অবশেষে একদিন মানুষ খেলুম'।
তৎবচন
রোজার শুরুতে গরমের ভয়ে অস্থির ছিলাম। কিন্তু আগস্ট মাসে শ্রাবণের যে অংশটুকু ছিল সেটা তুমুল বারিপাতে কানায় কানায় পুষিয়ে দিল জুলাইয়ের তালু-পোড়া গরমের যন্ত্রণা। চট্টগ্রামে স্বস্তির বাতাস। কিন্তু যতই দিন যেতে থাকে উপভোগ্য বৃষ্টির সাথে বাড়তে থাকে রাস্তার ফুটোর সাইজ। এক সপ্তাহ যাবার পর দেখা গেল দানবীয় কন্টেইনার ট্রেলারের বিশ চাকার ধাক্কায় বিশ্বকাপ উপলক্ষে শহরজুড়ে যেনতেন লেপটানো পিচ-মেকআপ উঠে গিয়ে নগ্ন গর্তগুলো ছোট গাড়ীর চাকার জন্য হা করে আছে। মানুষের রোজা হালকা হতে থাকে গালির তুবড়িতে। যদিও সে গালি গিয়ে পৌঁছে না যথাস্থানে।
মেজাজ মর্জি খারাপ করলে হৃদযন্ত্রে নাকি গড়বড় হয়। ডাক্তার বলে দিয়েছে এমন কিছু না করতে যাতে হৃদযন্ত্রে গণ্ডগোল লাগে। মেজাজ খারাপ করার চেয়ে চোখ বুঝে ধ্যান করতে কিংবা দার্শনিক ভাবনা ভাবতে উপদেশ দিল।
কিন্তু রাস্তার গর্ত আর বৃষ্টির নোংরা জল দেখে কতটুকু দার্শনিক হওয়া যায়। তাই চোখ বন্ধ করে হাবিজাবি যা মাথায় আসলো একটার পর একটা লিস্টি ধরে লিখে গেলাম। এর মধ্যে যদি কোনটা আগে কেউ লিখে থাকে সেটা নেহায়েতই আমার মগজের অজ্ঞতা। কপিরাইট লংঘনের দায় নিতে চাই না। দেখা যাক কয়টা টিকে-
১.
ঝড় জলের সাথে যার দৈনিক বৈরিতা, মেঘের সাথে তার প্রণয় হতে পারে না।
২.
জীবিকা অক্ষত থাকলেই রাজনীতির বিতর্ক চলতে পারে। যাদের জীবিকা অনিশ্চিত তাদের কাছে রাজনীতি বা তন্ত্রের গুরুত্ব কচুরিপানার চেয়েও কম।
৩.
দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পরই আদিম মানুষ অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছে। আর আধুনিক মানুষ অন্যের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দেয়ার জন্য অস্ত্র ব্যবহার করে। বিবর্তনের কি নিদারুণ উন্নতি।
৪.
প্রায়শ্চিত্ত থেকেই কি প্রার্থনার সূত্রপাত? সব প্রার্থনায় অপরাধবোধের চিহ্ন কেন?
৫.
ভূগোলের উপর ইতিহাসের নির্ভরতা নেই, কিন্তু ইতিহাসই ভূগোল নির্মাণ করে। মানচিত্র বদলানোর অসভ্য যুদ্ধের ইতিহাসই সভ্য মানুষের ইতিহাস বিবেচিত হয়।
৬.
বনের পাখিকে ভালোবাসার জন্যই খাঁচা-বন্দী করে মানুষ, কিন্তু সেই ভালোবাসা কেবল পরাধীনতাই প্রসব করে।
৭.
স্বাধীনতাই উড়ন্ত পাখিদের সৌন্দর্য, উচ্ছল বন্ধুরাই তার প্রাণ। পাখিদের উড়তে দেয়া মহানুভবতা নয়, ঔদার্য নয়, প্রকৃতির স্বাভাবিক আচার।
৮.
প্রেরণা ছাড়া কোন যাত্রাই সফল হয় না। কিন্তু প্রেরণারও খুঁটির জোর লাগে।
৯.
আনন্দ-ভ্রমণ দ্রুত ফুরিয়ে যায়, আনন্দহীন ভ্রমণ যেন অনন্তকাল ধরে চলতে থাকে।
১০.
ইতিহাসের ভুল-পাঠ অমার্জনীয় অপরাধ।
মেজাজ মর্জি খারাপ করলে হৃদযন্ত্রে নাকি গড়বড় হয়। ডাক্তার বলে দিয়েছে এমন কিছু না করতে যাতে হৃদযন্ত্রে গণ্ডগোল লাগে। মেজাজ খারাপ করার চেয়ে চোখ বুঝে ধ্যান করতে কিংবা দার্শনিক ভাবনা ভাবতে উপদেশ দিল।
কিন্তু রাস্তার গর্ত আর বৃষ্টির নোংরা জল দেখে কতটুকু দার্শনিক হওয়া যায়। তাই চোখ বন্ধ করে হাবিজাবি যা মাথায় আসলো একটার পর একটা লিস্টি ধরে লিখে গেলাম। এর মধ্যে যদি কোনটা আগে কেউ লিখে থাকে সেটা নেহায়েতই আমার মগজের অজ্ঞতা। কপিরাইট লংঘনের দায় নিতে চাই না। দেখা যাক কয়টা টিকে-
১.
ঝড় জলের সাথে যার দৈনিক বৈরিতা, মেঘের সাথে তার প্রণয় হতে পারে না।
২.
জীবিকা অক্ষত থাকলেই রাজনীতির বিতর্ক চলতে পারে। যাদের জীবিকা অনিশ্চিত তাদের কাছে রাজনীতি বা তন্ত্রের গুরুত্ব কচুরিপানার চেয়েও কম।
৩.
দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পরই আদিম মানুষ অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছে। আর আধুনিক মানুষ অন্যের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দেয়ার জন্য অস্ত্র ব্যবহার করে। বিবর্তনের কি নিদারুণ উন্নতি।
৪.
প্রায়শ্চিত্ত থেকেই কি প্রার্থনার সূত্রপাত? সব প্রার্থনায় অপরাধবোধের চিহ্ন কেন?
৫.
ভূগোলের উপর ইতিহাসের নির্ভরতা নেই, কিন্তু ইতিহাসই ভূগোল নির্মাণ করে। মানচিত্র বদলানোর অসভ্য যুদ্ধের ইতিহাসই সভ্য মানুষের ইতিহাস বিবেচিত হয়।
৬.
বনের পাখিকে ভালোবাসার জন্যই খাঁচা-বন্দী করে মানুষ, কিন্তু সেই ভালোবাসা কেবল পরাধীনতাই প্রসব করে।
৭.
স্বাধীনতাই উড়ন্ত পাখিদের সৌন্দর্য, উচ্ছল বন্ধুরাই তার প্রাণ। পাখিদের উড়তে দেয়া মহানুভবতা নয়, ঔদার্য নয়, প্রকৃতির স্বাভাবিক আচার।
৮.
প্রেরণা ছাড়া কোন যাত্রাই সফল হয় না। কিন্তু প্রেরণারও খুঁটির জোর লাগে।
৯.
আনন্দ-ভ্রমণ দ্রুত ফুরিয়ে যায়, আনন্দহীন ভ্রমণ যেন অনন্তকাল ধরে চলতে থাকে।
১০.
ইতিহাসের ভুল-পাঠ অমার্জনীয় অপরাধ।
আক্কেল সেলামীঃ হীরক রাজার দেশে
১.
একজন অসুস্থ রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম। চট্টগ্রামের মেডিক্যাল সেন্টার। রোগীর জ্বর বেশী, গলায় কফ জমে গেছে, গায়ে লাল র্যাশ উঠে গেছে। ক্লিনিকে নেবার পর তাকে সরাসরি HDU নামক অতি যত্নশীল একটা চেম্বারে ঢুকিয়ে দরোজা বন্ধ করে দিল। ওখানে কারো ঢোকা নিষেধ। একদিন পর রোগ আরো বেড়ে যায়। এরপর একের পর এক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আসে, বোর্ড বসে, নতুন ওষুধ দেয়, তিনদিন এই অবস্থা চলার পর রোগীর শেষ নিঃশ্বাসটা যখন বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে তখন রোগীকে একটা আইসিইউ এম্বুলেন্সে করে সোজা ঢাকার একটা বড় হাসপাতালে নেয়া হয় রাতের মধ্যে। প্রায় শেষ অবস্থায় পৌঁছে যাওয়া রোগী জীবন ফিরে পায় আবার।
এবং অতপরঃ কোন উপকারে না এসেও মেডিক্যাল সেন্টার তিন দিনে ষাট হাজার টাকা বিল করেছিল রোগীকে সফলতার সাথে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেবার মূল্যস্বরূপ।
২.
প্রতিবেশী বাড়ির নির্মাণ কাজ করছেন। ভদ্রমহিলার স্বামী মারা গেছে বছর দুয়েক আগে। এখন তার শেষ সঞ্চয়টুকু দিয়ে বাড়ীর কাজে হাত দিয়েছেন। কাজ শুরু করার কদিন পর স্থানীয় কিছু মাস্তান এসে চাঁদা দাবী করলো। এত টাকা দিতে পারবে না বলায় বাড়ীর কাজ বন্ধ করে দিল মাস্তানরা। ভদ্রমহিলা পুলিশে খরব দিলেন। থানা থেকে এস আই এসে এদিক সেদিক ঘুরে মাস্তানদের সাথে কথা বলে বিকেলে এসে জানালো তাকে দশ হাজার টাকা দিলে ব্যাপারটা রফা করে দিতে পারে। ভদ্রমহিলা রাজী হলেন না। এটাও তো চাঁদা। এই চাঁদা বরং মাস্তানদের দিলে ওরা উৎপাত করবে না ভবিষ্যতে। পুলিশকে 'না' বলার ফলস্বরূপ পরদিন পুলিশ আসলো ওনাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যেতে। কারণ তিনি মাস্তান-চক্রকে ধরার জন্য পুলিশকে সহযোগিতা করেননি, উল্টো অসৌজন্যমূলক ব্যবহার করেছেন। বহুকষ্টে তিনি পুলিশ মাস্তান দুপক্ষকে চাঁদা দিয়ে রক্ষা পেলেন হয়রানি থেকে।
এবং অতপরঃ সন্ত্রাসীরা চাঁদা চেয়েছিল ২০ হাজার। পুলিশে খবর দেয়ার বেয়াদবির মাসুলসহ দিতে হলো ৪০ হাজার, আর ব্যাপারটা সুন্দর করে মিটমাটের জন্য পুলিশকে দিতে হলো ১০ হাজার।
৩.
সরকার পরিবর্তনের পরদিন নতুন ক্ষমতাসীন দলের লোকজন সদলবলে অফিসে ঢুকে অভিবাদন জানিয়ে বললো 'সাপ্লাই নিয়ে ভাবনা, আর না আর না'। এখন থেকে সব রকম সাপ্লাই ওরাই দেবে দেবে। আগের সাপ্লায়ার বাদ। অনেকদিন খাইছে ওরা। 'কোটেশন দেন আগামী বছর নতুন টেন্ডার হবে' জানানো হলে, বলা হলো কোটেশন লাগবে না, আমাদের চেহারাই কোটেশন। প্রতিকারের জন্য স্থানীয় সরকার দলীয় সাংসদের বাসায় ধর্না দিতেই, আড়মোড়া ভেঙ্গে তিনি বললেন, 'দলের ছেলেরা গত পাঁচ বছর অনেক নির্যাতন সহ্য করেছে এবার ওদের কিছু করে খেতে দেন। নইলে কখন কি করে বসে, বুভুক্ষু লোকের জন্য আইন নাই। বোঝেনই তো।'
এবং অতপরঃ ঘাড়ে দুটো মাথা নেই বলে আগের দলকে বাদ দিয়ে নতুন দলকে কাজ দেয়া হলো। আগের দলকে বিদায় করার ফলস্বরূপ বিদায়-বাণী আসে, "বাসায় বউ বাচ্চার খবর নিছেন তো?"
৪.
ব্যবসায়ী বন্ধুর ১১ লাখ টাকা মেরে দিয়েছে প্রভাবশালী পার্টনার সাবেক কাস্টমস ডেপুটি কর্তা। বন্ধু আদালতে গেল। ক্ষতিপূরণ মামলা করলো। উকিল নিয়োগ করলো। মামলা শুরু হলো। আদালত পুলিশকে হুকুম করলো তদন্তের। বন্ধু থানায় গিয়ে দেখলো ভাগ্যের বৃহস্পতি তুঙ্গে। থানার পুলিশের কর্তা ক্লাসমেট। বললো, দোস্ত চিন্তা নাই। আমি এই সপ্তাহেই সার্চ করতে যাবো, তুই কদিন পরে খোঁজ নিয়ে যাস। পরের সপ্তাহে থানায় গিয়ে দেখে আসামী ওসির পাশের চেয়ারে বসে খোশগল্প করছে, চা খাচ্ছে। দোস্তকে দেখে বন্ধু পুলিশ এগিয়ে এসে আড়ালে নিয়ে গেল ওকে। কানে কানে ফিসফিস করে বললো, এরা অনেক প্রভাবশালী, এদের সাথে ভেজাল করে কাজ নেই। তাছাড়া তোর মামলার ভিত্তি নাই। তুই কিছু টাকা নিয়ে আপোষ করে ফেল। নইলে কখন তোকে রাস্তাঘাটে কিছু করে ফেলবে, এর এক ছেলে আবার খুনের মামলার আসামী। বন্ধু পুলিশ দোস্তের চোখে চোখ রেখে তাজ্জব বনে যায়। এই চোখ সেদিনের চোখ নয়।
এবং অতপরঃ কদিন পর জানা গেছে, থানাকে এক লাখ টাকা দিয়ে রিপোর্ট উল্টিয়ে দিয়েছে সাবেক সরকারী কর্তা।
৫.
আমার বন্ধুটা নাছোড়। প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে সে আরো উপরের দিকে গেল সূত্র ধরে ধরে, র্যাব, আর্মি যেখানে যা পরিচয় আছে সব কাজে লাগিয়ে রিপোর্টের একটা গতি করলো। কিন্তু মামলার নির্ধারিত তারিখে আদালতে হাজির হলে উকিল তাকে এক পাশে নিয়ে ফিসফিস করে বললো, ঝামেলা না করে আপোষ করে ফেলেন। এই মামলা টিকবে না। ওরা অনেক শক্তিশালী। শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে একটা বুদ্ধি দিলাম। উকিলের চোখে সেদিনকার পুলিশ দোস্তের ছায়া দেখতে পেয়ে চমকে গেল বন্ধু। পুলিশ আর উকিল একই সুরে কথা বলছে কেন?
এবং অতপরঃ বিশ হাজার টাকা দিয়ে উকিলকে কিনে নিয়েছিল বিপক্ষ দল। পরের তারিখ থেকে বাদীর উকিল আসামী পক্ষে কোর্টে দাঁড়ানো শুরু করলো।
একজন অসুস্থ রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম। চট্টগ্রামের মেডিক্যাল সেন্টার। রোগীর জ্বর বেশী, গলায় কফ জমে গেছে, গায়ে লাল র্যাশ উঠে গেছে। ক্লিনিকে নেবার পর তাকে সরাসরি HDU নামক অতি যত্নশীল একটা চেম্বারে ঢুকিয়ে দরোজা বন্ধ করে দিল। ওখানে কারো ঢোকা নিষেধ। একদিন পর রোগ আরো বেড়ে যায়। এরপর একের পর এক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আসে, বোর্ড বসে, নতুন ওষুধ দেয়, তিনদিন এই অবস্থা চলার পর রোগীর শেষ নিঃশ্বাসটা যখন বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে তখন রোগীকে একটা আইসিইউ এম্বুলেন্সে করে সোজা ঢাকার একটা বড় হাসপাতালে নেয়া হয় রাতের মধ্যে। প্রায় শেষ অবস্থায় পৌঁছে যাওয়া রোগী জীবন ফিরে পায় আবার।
এবং অতপরঃ কোন উপকারে না এসেও মেডিক্যাল সেন্টার তিন দিনে ষাট হাজার টাকা বিল করেছিল রোগীকে সফলতার সাথে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেবার মূল্যস্বরূপ।
২.
প্রতিবেশী বাড়ির নির্মাণ কাজ করছেন। ভদ্রমহিলার স্বামী মারা গেছে বছর দুয়েক আগে। এখন তার শেষ সঞ্চয়টুকু দিয়ে বাড়ীর কাজে হাত দিয়েছেন। কাজ শুরু করার কদিন পর স্থানীয় কিছু মাস্তান এসে চাঁদা দাবী করলো। এত টাকা দিতে পারবে না বলায় বাড়ীর কাজ বন্ধ করে দিল মাস্তানরা। ভদ্রমহিলা পুলিশে খরব দিলেন। থানা থেকে এস আই এসে এদিক সেদিক ঘুরে মাস্তানদের সাথে কথা বলে বিকেলে এসে জানালো তাকে দশ হাজার টাকা দিলে ব্যাপারটা রফা করে দিতে পারে। ভদ্রমহিলা রাজী হলেন না। এটাও তো চাঁদা। এই চাঁদা বরং মাস্তানদের দিলে ওরা উৎপাত করবে না ভবিষ্যতে। পুলিশকে 'না' বলার ফলস্বরূপ পরদিন পুলিশ আসলো ওনাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যেতে। কারণ তিনি মাস্তান-চক্রকে ধরার জন্য পুলিশকে সহযোগিতা করেননি, উল্টো অসৌজন্যমূলক ব্যবহার করেছেন। বহুকষ্টে তিনি পুলিশ মাস্তান দুপক্ষকে চাঁদা দিয়ে রক্ষা পেলেন হয়রানি থেকে।
এবং অতপরঃ সন্ত্রাসীরা চাঁদা চেয়েছিল ২০ হাজার। পুলিশে খবর দেয়ার বেয়াদবির মাসুলসহ দিতে হলো ৪০ হাজার, আর ব্যাপারটা সুন্দর করে মিটমাটের জন্য পুলিশকে দিতে হলো ১০ হাজার।
৩.
সরকার পরিবর্তনের পরদিন নতুন ক্ষমতাসীন দলের লোকজন সদলবলে অফিসে ঢুকে অভিবাদন জানিয়ে বললো 'সাপ্লাই নিয়ে ভাবনা, আর না আর না'। এখন থেকে সব রকম সাপ্লাই ওরাই দেবে দেবে। আগের সাপ্লায়ার বাদ। অনেকদিন খাইছে ওরা। 'কোটেশন দেন আগামী বছর নতুন টেন্ডার হবে' জানানো হলে, বলা হলো কোটেশন লাগবে না, আমাদের চেহারাই কোটেশন। প্রতিকারের জন্য স্থানীয় সরকার দলীয় সাংসদের বাসায় ধর্না দিতেই, আড়মোড়া ভেঙ্গে তিনি বললেন, 'দলের ছেলেরা গত পাঁচ বছর অনেক নির্যাতন সহ্য করেছে এবার ওদের কিছু করে খেতে দেন। নইলে কখন কি করে বসে, বুভুক্ষু লোকের জন্য আইন নাই। বোঝেনই তো।'
এবং অতপরঃ ঘাড়ে দুটো মাথা নেই বলে আগের দলকে বাদ দিয়ে নতুন দলকে কাজ দেয়া হলো। আগের দলকে বিদায় করার ফলস্বরূপ বিদায়-বাণী আসে, "বাসায় বউ বাচ্চার খবর নিছেন তো?"
৪.
ব্যবসায়ী বন্ধুর ১১ লাখ টাকা মেরে দিয়েছে প্রভাবশালী পার্টনার সাবেক কাস্টমস ডেপুটি কর্তা। বন্ধু আদালতে গেল। ক্ষতিপূরণ মামলা করলো। উকিল নিয়োগ করলো। মামলা শুরু হলো। আদালত পুলিশকে হুকুম করলো তদন্তের। বন্ধু থানায় গিয়ে দেখলো ভাগ্যের বৃহস্পতি তুঙ্গে। থানার পুলিশের কর্তা ক্লাসমেট। বললো, দোস্ত চিন্তা নাই। আমি এই সপ্তাহেই সার্চ করতে যাবো, তুই কদিন পরে খোঁজ নিয়ে যাস। পরের সপ্তাহে থানায় গিয়ে দেখে আসামী ওসির পাশের চেয়ারে বসে খোশগল্প করছে, চা খাচ্ছে। দোস্তকে দেখে বন্ধু পুলিশ এগিয়ে এসে আড়ালে নিয়ে গেল ওকে। কানে কানে ফিসফিস করে বললো, এরা অনেক প্রভাবশালী, এদের সাথে ভেজাল করে কাজ নেই। তাছাড়া তোর মামলার ভিত্তি নাই। তুই কিছু টাকা নিয়ে আপোষ করে ফেল। নইলে কখন তোকে রাস্তাঘাটে কিছু করে ফেলবে, এর এক ছেলে আবার খুনের মামলার আসামী। বন্ধু পুলিশ দোস্তের চোখে চোখ রেখে তাজ্জব বনে যায়। এই চোখ সেদিনের চোখ নয়।
এবং অতপরঃ কদিন পর জানা গেছে, থানাকে এক লাখ টাকা দিয়ে রিপোর্ট উল্টিয়ে দিয়েছে সাবেক সরকারী কর্তা।
৫.
আমার বন্ধুটা নাছোড়। প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে সে আরো উপরের দিকে গেল সূত্র ধরে ধরে, র্যাব, আর্মি যেখানে যা পরিচয় আছে সব কাজে লাগিয়ে রিপোর্টের একটা গতি করলো। কিন্তু মামলার নির্ধারিত তারিখে আদালতে হাজির হলে উকিল তাকে এক পাশে নিয়ে ফিসফিস করে বললো, ঝামেলা না করে আপোষ করে ফেলেন। এই মামলা টিকবে না। ওরা অনেক শক্তিশালী। শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে একটা বুদ্ধি দিলাম। উকিলের চোখে সেদিনকার পুলিশ দোস্তের ছায়া দেখতে পেয়ে চমকে গেল বন্ধু। পুলিশ আর উকিল একই সুরে কথা বলছে কেন?
এবং অতপরঃ বিশ হাজার টাকা দিয়ে উকিলকে কিনে নিয়েছিল বিপক্ষ দল। পরের তারিখ থেকে বাদীর উকিল আসামী পক্ষে কোর্টে দাঁড়ানো শুরু করলো।
Saturday, November 5, 2011
Thursday, November 3, 2011
হিমালয় দর্শন - ৪র্থ দিন
"ঘোড়া একটা অতিশয় ভদ্র প্রাণী, অসম্ভব কষ্টসহিষ্ণু একটা প্রাণী, জগতের সকল প্রাণীর তুলনায় দয়ালু" ইত্যাদি বিশেষণ যার উদ্দেশ্যে মনে মনে বিড়বিড় করছিলাম তার চেহারায় বিন্দুমাত্র সন্তুষ্টির চিহ্ন দেখা গেল না।
এই নিজস্ব মন্ত্র উচ্চারণের কারণ ঘোড়াটা যেন পাহাড়ে ওঠার সময় বিগড়ে না যায়।
কিন্তু তার বিমর্ষ চেহারা আমাকে খানিক চিন্তায় ফেলে দিল। বিমর্ষতার কারণ বুঝলাম যখন গাইড ছেলেটা বললো দিনে তিনবার ঘোড়াটা ওই দুরূহ পর্বতের মাথায় চড়ে টুরিষ্ট নিয়ে। ইউরোপীয়ান টুরিষ্টই বেশী। ওদের সাইজ আমার তিনগুন। হয়তো খানিক আগে আড়াইশো পাউন্ডের কোন হোৎকাকে নিয়ে পাহাড়ে চড়ে এসেছে। ইচ্ছে ছিল একটু খেয়ে দেয়ে বিশ্রাম নেমে। কিন্তু সেই সময়ই আমি ওর পিঠে চড়ে বসলাম দেড় মন+ ওজন নিয়ে। বেজার হবার এরকম নানাবিধ কল্পনা মাথায় ঘুরতে থাকলো আর দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকলো। ঘোড়াটা দপ দপ করে পাথুরে পথ পেরিয়ে যখন এগিয়ে যাচ্ছিল আমার আসনটা ধরে শক্ত করে বসে থাকা ছাড়া আর কোন কাজ ছিল না। চারপাশের প্রকৃতি অতীব মনোরম। পাইনের জঙ্গল ভেদ করে ট্রেইলটা পর্বতের উপর উঠে গেছে। আশেপাশে বেশ কটা ছোট ছোট ঝরনাধারা নেমে আসছে পর্বত থেকে কলকল শব্দ নিয়ে। এত গহীন জঙ্গল কিন্তু পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে না।
এই ঘোড়ার কোন লাগাম নেই, থাকলেও লাভ হতো না, আমি অশ্বচালনা দূরে থাক জীবনে এই প্রথম একটা ঘোড়ার পিঠে চড়েছি। ঘোড়ার মালিক/পরিচালক বলে দিয়েছিল, শক্ত করে আসনটা ধরে বসতে। সাদা রঙের ঘোড়াটি তার মালিকের মুখের বিচিত্র শিসের ইশারায় চলে।
আমি বাল্যকালে দস্যুবনহুরকে অসংখ্যবার ঘোড়ায় চড়ে দুর্গম পাহাড় বাইতে পড়েছি। আজকে যে পাহাড়টায় উঠতে যাচ্ছি সেটি অতীব দুর্গম চেহারার। দূর থেকে তার কালচে পাথুরে খাড়া চেহারা দেখেই মেরুদন্ড বেয়ে ঘাম ঝরতে শুরু করেছিল। যেন আমি ওই পাথুরে পাহাড়ে টিকটিকির মতো বেয়ে উঠবো। আমার সঙ্গীকে কোনমতেই রাজী করাতে পারলাম না ওই পর্বতে উঠতে।
পনেরো মিনিট যাবার পর জঙ্গল শেষ হয়ে গেল। এখানে পাহাড় উন্মুক্ত অনেকটা। পথও বিশেষ সরু। হাতের বায়ে ভয়ানক খাড়াই। দূরে তাকিয়ে অপূর্ব সবুজের সমারোহ দেখে মুগ্ধ হলাম। পারো উপত্যকাটা থিমফুর চেয়েও সুন্দর কোন সন্দেহ নেই। যেদিক উঠছি কলকল করে পাহাড় থেকে ঝরনা নেমে আসছে। ঝরনার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই চারপাশে। সুনসান প্রকৃতি।
রোদ বাড়ছে, গরমে মাথাটা তেতে উঠছে। চলার পথ রুক্ষ হচ্ছে। আধঘন্টা পরই ঘোড়াটা হাঁপাচ্ছে রীতিমতো। আরো দেড়ঘন্টার পথ। এখানেই হাঁপিয়ে গেলে বাকী পথ কেমনে উঠবে? খানিক পর একটা সিমেন্ট বাধানো পানির হাউস দেখা গেল পথের ধারে। ঘোড়াদের পানি খাবার সরকারী ব্যবস্থা। ঘোড়াটা ওখানে দাঁড়িয়ে পানি খাওয়া শুরু করলো। পানি খেয়েও নড়ছে না, দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে আসছিল ঘোড়ার শিস পরিচালক। শিস দিয়ে সে ঘোড়াকে চলতে হুকুম দিল। ঘোড়া মাটিতে পা ঠুকে একটু বিরক্তি প্রকাশ করলো। তারপর চলতে শুরু করলো।
কিছুদুর ওঠার পর আবারো হাঁপাচ্ছে ঘোড়াটা। এখানে আর গাছপালা নেই। ট্রেইলটা একদম সরু, রুক্ষ পাথুরে, ডানপাশে খাড়া পাহাড় উঠে গেছে, বামদিকে নেমে গেছে কমসে হাজার ফুট। দূরের পাহাড়গুলো অনেক নীচে। আমার গলা শুকিয়ে গেল এই জায়গায় এসে। সম্ভবতঃ ঘোড়াটিও ক্লান্ত হলো এই জায়গায় এসে। থম করে দাড়িয়ে পড়লো। এই ঘোড়ার একটা বদ স্বভাব হলো সে চলে একদম কিনার ঘেষে। যেখানে এক ইঞ্চি ভুল পা দিলেও পতন অনিবার্য।
আর এখন সে গ্যাট ধরে যেখানে দাড়ালো সেটা চরম বিপজ্জনক একটা জায়গা। এটা একটা ভি আকৃতির বাঁক। আমরা দাঁড়িয়ে সেই ভি এর কোনাটাতে, যেখানে সামনে পেছনে বায়ে সবদিকেই খাড়াই। পাখা থাকলে উড়াল দিতাম সেই মুহূর্তে। কিন্তু তখন নড়তেও ভয় করছে, ঘোড়ার পিঠ থেকে নামা তো অসম্ভব ওই সরু জায়গায়। মাথার উপরে কড়কড়ে সূর্য। ঘামতে ঘামতে আমি ঘোড়ার মেজাজ বোঝার চেষ্টা করছি। কি ব্যাপার নড়ে না কেন ব্যাটা?
অবলা প্রাণীটার মর্জির সুতোয় ঝুলছে আমার জীবন তখন। সে যদি চায় পিঠে হালকা ঝাকুনি দিয়ে আমাকে নীচে ফেলে দিয়ে ঝামেলা দুর করতে পারে। মতলব কি রে তোর? বাংলা ইংরেজী কোন ভাষা বোঝে না ব্যাটা। পেছনে তাকিয়ে দেখি ঘোড়া চালকও কোথায় উধাও। আমি একা। ধ্বক করে উঠলো বুকটা। এই প্রথম আক্ষেপ হলো কেন পায়ে হেঁটে পাহাড়ে চড়লাম না। নবাবী করতে গিয়ে ধরা। লাঠি নিয়ে পাঁয়ে হেটে ওঠা অনেক নিরাপদ ছিল এর চেয়ে। ঘোড়াকে ধমক দিতেও সাহস পাচ্ছি না। ব্যাটা বিগড়ে গেলে আরো মুশকিল। এখন এমন জায়গায় সে দাঁড়িয়েছে সেখান থেকে নীচে নামতে হলে প্যারাস্যুট লাগবে।
মাত্র দুই মিনিট। দুই মিনিটকে মনে হলো দুই ঘন্টা। অবশেষে পেছন থেকে শিস শোনা গেল। তখন ঘোড়া নড়তে শুরু করলো আবার। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
কিছুদূর যাবার পর দেখি তিনচারজন বুড়োবুড়ির একটা দল। ষাট সত্তরের কম হবে না একেকজনের বয়স। ওরা পায়ে হেটে লাঠিতে ভর দিয়ে পর্বত আরোহন করছে। এই বেলা চরম লজ্জা এসে গ্রাস করলো আমাকে। এরা পায়ে হেটে উঠছে আর আমি দামড়া জোয়ান ঘোড়ায় চড়ে পাহাড়ে উঠছি। মনে মনে ধিক্কার দিলাম ঘোড়ায় চড়ার আয়েশী বুদ্ধিটাকে। কাছাকাছি যেতেই বুড়োবুড়ির দল আমাকে দেখে হেসে উঠলো। মুখে বললো 'হাই, হ্যালো'। আমিও হ্যালো বললাম কাষ্ঠহাসিতে। মনে মনে নিশ্চয় বলছে "ব্যাটা রামছাগল ঘোড়ার পৃষ্টে চড়িয়া পাহাড়ে উঠতাছে।"
তাড়াতাড়ি বুড়োবুড়ির দলকে পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম। পথটা যত উপরে যাচ্ছে কঠিনতর হচ্ছে। ঘোড়ার পিঠটা খুব নড়ছে এখন। সোজা বসে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাটা ঝপাত করে বসে পড়লে তো সোজা নীচে। রাস্তা ফুরায় না। আর কতোদুর? গলায় ক্যামেরা ঝুলানো আছে ঠিকই কিন্তু ফটো তুলতে গেলে হাত ছেড়ে দিতে হবে। তাই ছবি তোলা বাদ। এই বদ ঘোড়াটার কোন বিশ্বাস নাই। ঝাঁকুনি দিতে পারে যে কোন মুহুর্তেই। আমার ভ্রমন সঙ্গী রিজওয়ান ভাই আর গাইড উগেন তো নীচে রয়ে গেছে। চারঘন্টার মধ্যে না ফিরলে ওরা আমাকে রেখে হোটেলে চলে যাবে। পরে ড্রাইভার এসে আমাকে নিয়ে যাবে। দ্রুত উঠতে চেষ্টা করছি। মানে ঘোড়াকে মনে মনে বলছি দ্রুত চলতে। কিন্তু সে তার গতিতেই যাচ্ছে।
খানিক পর একটা সমতল চত্ত্বরের মতো একটা জায়গায় এসে ঘোড়া থেমে গেল। পেছনে আসা ঘোড়াচালক জানালো ঘোড়ার দৌড় শেষ। বাকী পথ তোমাকে হেঁটে উঠতে হবে। আশপাশের প্রকৃতি খুবই সুন্দর, কিন্তু ওই ভর দুপুরের গরমে আর পথে ঘোড়ার ধকলের জন্য সৌন্দর্যটা আমাকে তেমন আকৃষ্ট করলো না। তবু ক্যামেরা তাক করে চতুর্দিকের দিগন্তের পর্বতগুলো ক্যামেরার ফ্রেমে আনতে চাইলাম। পছন্দ হচ্ছে না ছবিগুলো। অভিজ্ঞতা থেকে জানি এরকম রোদে ছবি ভালো আসে না। আর এই দিগন্তজোড়া সৌন্দর্য গতকালকের দোচুলার সৌন্দর্যের সাথে তুলনাও করা যায় না। দোচুলা অসাধারণ। উচ্চতায় থাকসানের চেয়ে দোচুলা এগিয়ে। ওটি আগে দেখে আসার ফলে থাকসান এলাকার পর্বত আমাকে তেমন মুগ্ধ করছে না।
বাকী পথ আরো দেড় ঘন্টার। এই জায়গায় একটা রেস্তোঁরা আছে। রেস্তোঁরার পাশে দাড়িয়ে সামনেই দেখা গেল কাংখিত সেই থাকসান মনেষ্ট্রি যা দেখার জন্য হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসে। রেস্তোঁরার ভেতরটা গমগম করছে নানান দেশী টুরিষ্ট। এই নির্জন পাহাড়ী পথ পাড়ি দিয়ে এসে এখানকার এই কোলাহলটা কেমন বেমানান লাগলো। আমি ঘড়ি দেখলাম বারোটা বাজে। উপরে উঠতে গেলে দেড়টা। ওখান থেকে নীচে নামতে তিন ঘন্টা। মাথার উপর চান্দিপোড়া সূর্য। পুরো পাথুরে এলাকা এটা। সারা ভুটানে এত ঠান্ডা দেখলাম, কিন্তু এখানে সূর্যটা যেন বেশী রকমের তেতে আছে। মোবাইল বেজে উঠলো। নীচ থেকে গাইড ফোন করেছে। বললো, তুমি কোথায়, কতক্ষণ লাগবে নামতে।
বললাম, আমি তো এখনো পুরোটা উঠতেই পারিনি। মাত্র অর্ধেক এলাম।
সে বললো, তোমার সঙ্গী তো ফিরে যেতে চায়। তুমি থাকো নাকি?
আমি উপরে ওঠানামার সময়টা হিসেব করে সিদ্ধান্ত নিলাম, যথেষ্ট হয়েছে, ফেরা যাক এখান থেকেই। মাথার উপরে এরকম হিটার নিয়ে বাকী পথ উঠে দিনটা এখানে কাবার করার কোন মানে হয় না।
উগেনকে তাড়াতাড়ি বললাম, 'আরে না গরমে আমার মাথা ঘুরাচ্ছে এই পর্যন্ত এসে। বাকীপথ উঠতে পারবো না বোধহয়। থাকো তোমরা। এখুনি নেমে আসছি আমি'। ওখানে হাঁটাহাটি করে বেশ কিছু ছবি তুললাম থাকসান মনেষ্ট্রির। তারপর নামতে শুরু করলাম। নামার সময় ঘোড়া নাই। আমি মরে গেলেও ঘোড়ায় চড়ছি না আর এই পথে। একটা হারামী ঘোড়া।
নামতে আর কতক্ষণ লাগবে। ভাবলাম আমি। কিন্তু এখুনি নামছি বললেও নামছি তো নামছি, নামছি তো নামছিই, পথ ফুরায় না যেন। প্রায় এক ঘন্টা নামার পর ঝরনার জায়গাতে আসলাম। ততক্ষণে পায়ের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ। অনেকদিন এরকম হাঁটাহাঁটি করিনি। পা সোজা রাখা দায় হয়ে গেল। হাটু ভেঙ্গে আসছে। বিশ্রাম নিলাম দুয়েকটা জায়গায়। প্রায় ঘন্টা দেড়েক হাঁটার পর গাড়ির কাছে পৌছাতে পারলাম প্রায় বিধ্বস্ত। নামতে নামতেই পায়ের অবস্থা কাহিল হয়ে গেছে, উঠতে হলে না জানি কী দশা হতো।
উগেনকে বললাম, এবার হোটেলে নিয়ে চলো। একটা কঠিন ঠান্ডা শাওয়ার দরকার। নইলে সামনের বরফগলা নদীতে নেমে যাবো। গলা শুকিয়ে শিরিষ কাগজ। পানি খেলাম ঢকঢক করে আধবোতল। গাড়িতে রাখা শীতল জলের পানিও দেখি গরম হয়ে গেছে।
কিন্তু গাড়ী চলতে শুরু করলো আরেক গন্তব্যে। উগেন বললো, পারো জং দেখে যাই চলো। প্রাচীন একটা দুর্গ। আমি বেজার মুখে রাজী হলাম। দু্র্গের কাছে গিয়ে দেখি গেট বন্ধ। দুর্গ দেখা যাবে না। গত ভূমিকম্পে যে ক্ষতি হয়েছে তা মেরামতের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। খুশী হলাম মনে মনে।
ফেরার সময় খিদে পেয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ দেখি হাতের ডানদিকে একটা সাদা কি যেন দেখা যায় আকাশের গায়। দুটো পর্বতের মাঝখানে আরেকটা সাদা পর্বত যেন। উগেনকে বললাম, গাড়ি রুখখো!!!!
অদ্ভুত সুন্দর আরেকটা পর্বত। এটা আমাদের প্ল্যানে ছিল না। যেন অলৌকিক ভাবে হাজির হয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর ছবিটবি তুলে হোটেলের দিকে রওনা দিলাম। ওই চুড়াটার নাম মনে নেই। তবে ওটাকে কাঞ্চনজংঘার প্রেয়সী বলা হয়। সিকিম তিব্বত আর ভুটান সীমান্তে অবস্থিত সেটি।
হোটেলে পৌছে শাওয়ার নিলাম। তারপর কাপড় বদলে নীচে ডাইনিং টেবিলে গেলাম। হোটেল জিগম্যালিনের রেষ্টুরেন্টটা বেশ গোছানো। কারুকার্যময়। খাবার মেনু বুফে। সাত আটটার মতো আইটেম। ওখান থেকেই খেতে হবে। খাওয়া শেষ করে বেরুলাম আবার। উগেন এবার নিয়ে গেল ন্যাশনাল মিউজিয়ামে। ওখানে ক্যামেরা গেটে জমা রেখে ঢুকতে হয়। টিকেট কাটতে হলো ৫০ গুলট্রাম করে। ওটাও একটা পাহাড়েরর মাথায়। পারো ভ্যালীটা খুব সুন্দর দেখা যাচ্ছে ওখান থেকে। কিছু সময় পার করে নেমে এলাম। তারপর গেলাম একটা পুরোনো সেতুর কাছে। সেতুটা সুন্দর। নির্জন পাহাড়ের পাশে। এই শহরটা একদম নিরিবিলি। রাস্তায় তেমন মানুষজন নেই। মোড়ে একটা মজার দৃশ্য দেখলাম। এই মোড়টা এত নির্জন যে এখানে কটা গরু আড্ডা জমিয়েছে রাস্তার উপর। এই প্রথম গরু দেখলাম শহরের কেন্দ্রে। আরেকটু এগিয়ে দুটো ঘোড়াকে দেখলাম রাস্তার পাশে প্রেম করছে। কালো ঘোড়াদুটি দেখে পছন্দ হয়ে গেল, ছবি তুলে ফেললাম। তারপর ব্রীজের উপর উঠে গেলাম। এই ব্রীজের সামান্য দূরে একটা বাড়ি। বিরাট দেয়াল ঘেরা। এটা ভুটানের রাজার পারো শহরের আবাসভবন। আগামী পরশুদিন রাজা এখানে আসবেন বিয়ের দ্বিতীয় অনুষ্ঠান করতে।
ব্রীজ দেখা শেষ করে বললাম, আজকের মতো আর না, পা ব্যাথা হয়ে গেছে আমার। আমার সঙ্গী বললো যাবার সময় মার্কেটে ঘুরে যাই। পারোতে প্রধান সড়ক একটাই। ওটার দুপাশে যা আছে সেগুলোই মার্কেট।
মার্কেটে ঘুরতে ইচ্ছে হলো না। একটা ছোট্ট মুদী দোকানে গিয়ে জুতোর ব্রাশ কিনলাম ৩৫ টাকা দিয়ে। কেডসের চেহারা থাকসানের ধুলোর আড়ালে হারিয়ে গেছে। এটা নিয়ে ভদ্রসমাজে মেলামেশা করা অসম্ভব। গাড়িতে পা ঝুলিয়ে বসে ধুলো ঝেড়ে ভদ্র হলাম। আমার সঙ্গী কেনাকাটা করছে ঘুরে ঘুরে। আমি একটা দোকানে ঢুকে কয়েকটা সাবান আর এয়ারফ্রেশনার কিনলাম। ভুটানের নিজস্ব প্রোডাক্ট খুব কম, এটি তার একটা। তারপর হোটেলে ফিরে গেলাম। উগেন আমাদের রেখে চলে গেল। বাকী সময় আমাদের নিজস্ব। গাইড ছাড়া আশেপাশে ঘুরবো। সন্ধ্যে হয়ে আসছিল। রুমে ঢুকে গেলাম যার যার।
হাতমুখ ধুয়ে টিভি ছাড়লাম। ডায়েরী লিখলাম। দিনের কর্মসূচি লিপিবদ্ধ করলাম। কেমন ক্লান্তি সমস্ত শরীরজুড়ে। দুটো বিছানা পাতা আছে। মানুষ আমি একজন। খানিক ঘুমিয়ে নিলে মন্দ হয় না। ডানদিকের বিছানায় ঢুকে গেলাম। উষ্ণ লেপের নীচে। টিভিতে রাজার বিয়ে নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান দেখাচ্ছে। এদের যত জিনিস দেখেছি সবচেয়ে বোরিং বিষয় হলো টিভি। ভুটানের নিজস্ব চ্যানেলগুলো স্রেফ অখাদ্য। এইচবিও খুজে বের করলাম। জেমসবন্ডের একটা মুভি দেখাচ্ছে। আগেই দেখা। দেখতে দেখতে ঘুম এসে গেল। ঘন্টাখানেক ঘুমানোর পর জেগে উঠে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। রাস্তায় কোন লোকজন নেই। মনে হচ্ছে মাঝরাত পেরিয়েছে। আশ্চর্য একটা শহর এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে? কেডস পরে পকেটে পাসপোর্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় হাটবো। একা একা বেরুলাম নির্জন রাস্তাটায়। এরকম সুনসান কোন শহর আমি দেখিনি। মাথার উপর চাদটা মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলে যাচ্ছে। শীতটা বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে এখন। দোকানপাট সব বন্ধ। কেবল বারগুলো খোলা আছে। লোকজন পান করতে ব্যস্ত। এই সময় কারো কিছু করার নেই। কিছুক্ষণ হাটাহাটি করে ফিরে এলাম।
হোটেলে ফিরে শুনলাম খাবার তৈরী। বসে গেলাম। রাতের খাবার সারলাম রুটি ভাজি মুরগী ডালভুনা ইত্যাদি দিয়ে। খেয়ে আবার বেরুলাম সঙ্গীসহ। দুজনে এবার গেলাম একেবারে নদীর ধারে। নদীটাও কাছাকাছি দুই ব্লক পরে। নদীর ধারে পুলিশফাড়ি বা থানা। রেলিং ধরে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাড়িয়ে পাহাড়ের খাজে খাজে মানুষের ঘরবাড়ি গুলো দেখতে লাগলাম। অন্যরকম একটা শহর। আস্ত একটা গ্রাম কেউ এই শহরে ঢুকিয়ে দিয়েছে যেন। এত সুন্দর গ্রাম আর যেন দেখিনি। নদীর কলকল শব্দ ছাড়া আর কোথাও কিছু নেই। ঝরনাময় নদীর এই শব্দটা এত চমৎকার করে বাজে সারারাত শুনলেও বিরক্তি আসবে না বোধহয়। কুকুরে আনাগোনা মানুষের চেয়ে বেশী মনে হলো। নদীর ধার থেকে এবার শহরের নির্জন রাস্তগুলো দিয়ে হাটা শুরু করি। কালকে রাজার বিয়ে, সবাই দোকান বন্ধ করে বাইরে সাজাচ্ছে। মজাই লাগলো দেখে। রাজা যে পথে যাবে সেই পথগুলো বিশেষ কায়দায় সজ্জিত হচ্ছে।
দশটার আগেই হোটেলে ঢুকে গেলাম। ঘুমোতে হবে আজকে বেশ করে। ভুটানে আমাদের শেষরাত।














এই নিজস্ব মন্ত্র উচ্চারণের কারণ ঘোড়াটা যেন পাহাড়ে ওঠার সময় বিগড়ে না যায়।
কিন্তু তার বিমর্ষ চেহারা আমাকে খানিক চিন্তায় ফেলে দিল। বিমর্ষতার কারণ বুঝলাম যখন গাইড ছেলেটা বললো দিনে তিনবার ঘোড়াটা ওই দুরূহ পর্বতের মাথায় চড়ে টুরিষ্ট নিয়ে। ইউরোপীয়ান টুরিষ্টই বেশী। ওদের সাইজ আমার তিনগুন। হয়তো খানিক আগে আড়াইশো পাউন্ডের কোন হোৎকাকে নিয়ে পাহাড়ে চড়ে এসেছে। ইচ্ছে ছিল একটু খেয়ে দেয়ে বিশ্রাম নেমে। কিন্তু সেই সময়ই আমি ওর পিঠে চড়ে বসলাম দেড় মন+ ওজন নিয়ে। বেজার হবার এরকম নানাবিধ কল্পনা মাথায় ঘুরতে থাকলো আর দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকলো। ঘোড়াটা দপ দপ করে পাথুরে পথ পেরিয়ে যখন এগিয়ে যাচ্ছিল আমার আসনটা ধরে শক্ত করে বসে থাকা ছাড়া আর কোন কাজ ছিল না। চারপাশের প্রকৃতি অতীব মনোরম। পাইনের জঙ্গল ভেদ করে ট্রেইলটা পর্বতের উপর উঠে গেছে। আশেপাশে বেশ কটা ছোট ছোট ঝরনাধারা নেমে আসছে পর্বত থেকে কলকল শব্দ নিয়ে। এত গহীন জঙ্গল কিন্তু পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে না।
এই ঘোড়ার কোন লাগাম নেই, থাকলেও লাভ হতো না, আমি অশ্বচালনা দূরে থাক জীবনে এই প্রথম একটা ঘোড়ার পিঠে চড়েছি। ঘোড়ার মালিক/পরিচালক বলে দিয়েছিল, শক্ত করে আসনটা ধরে বসতে। সাদা রঙের ঘোড়াটি তার মালিকের মুখের বিচিত্র শিসের ইশারায় চলে।
আমি বাল্যকালে দস্যুবনহুরকে অসংখ্যবার ঘোড়ায় চড়ে দুর্গম পাহাড় বাইতে পড়েছি। আজকে যে পাহাড়টায় উঠতে যাচ্ছি সেটি অতীব দুর্গম চেহারার। দূর থেকে তার কালচে পাথুরে খাড়া চেহারা দেখেই মেরুদন্ড বেয়ে ঘাম ঝরতে শুরু করেছিল। যেন আমি ওই পাথুরে পাহাড়ে টিকটিকির মতো বেয়ে উঠবো। আমার সঙ্গীকে কোনমতেই রাজী করাতে পারলাম না ওই পর্বতে উঠতে।
পনেরো মিনিট যাবার পর জঙ্গল শেষ হয়ে গেল। এখানে পাহাড় উন্মুক্ত অনেকটা। পথও বিশেষ সরু। হাতের বায়ে ভয়ানক খাড়াই। দূরে তাকিয়ে অপূর্ব সবুজের সমারোহ দেখে মুগ্ধ হলাম। পারো উপত্যকাটা থিমফুর চেয়েও সুন্দর কোন সন্দেহ নেই। যেদিক উঠছি কলকল করে পাহাড় থেকে ঝরনা নেমে আসছে। ঝরনার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই চারপাশে। সুনসান প্রকৃতি।
রোদ বাড়ছে, গরমে মাথাটা তেতে উঠছে। চলার পথ রুক্ষ হচ্ছে। আধঘন্টা পরই ঘোড়াটা হাঁপাচ্ছে রীতিমতো। আরো দেড়ঘন্টার পথ। এখানেই হাঁপিয়ে গেলে বাকী পথ কেমনে উঠবে? খানিক পর একটা সিমেন্ট বাধানো পানির হাউস দেখা গেল পথের ধারে। ঘোড়াদের পানি খাবার সরকারী ব্যবস্থা। ঘোড়াটা ওখানে দাঁড়িয়ে পানি খাওয়া শুরু করলো। পানি খেয়েও নড়ছে না, দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে আসছিল ঘোড়ার শিস পরিচালক। শিস দিয়ে সে ঘোড়াকে চলতে হুকুম দিল। ঘোড়া মাটিতে পা ঠুকে একটু বিরক্তি প্রকাশ করলো। তারপর চলতে শুরু করলো।
কিছুদুর ওঠার পর আবারো হাঁপাচ্ছে ঘোড়াটা। এখানে আর গাছপালা নেই। ট্রেইলটা একদম সরু, রুক্ষ পাথুরে, ডানপাশে খাড়া পাহাড় উঠে গেছে, বামদিকে নেমে গেছে কমসে হাজার ফুট। দূরের পাহাড়গুলো অনেক নীচে। আমার গলা শুকিয়ে গেল এই জায়গায় এসে। সম্ভবতঃ ঘোড়াটিও ক্লান্ত হলো এই জায়গায় এসে। থম করে দাড়িয়ে পড়লো। এই ঘোড়ার একটা বদ স্বভাব হলো সে চলে একদম কিনার ঘেষে। যেখানে এক ইঞ্চি ভুল পা দিলেও পতন অনিবার্য।
আর এখন সে গ্যাট ধরে যেখানে দাড়ালো সেটা চরম বিপজ্জনক একটা জায়গা। এটা একটা ভি আকৃতির বাঁক। আমরা দাঁড়িয়ে সেই ভি এর কোনাটাতে, যেখানে সামনে পেছনে বায়ে সবদিকেই খাড়াই। পাখা থাকলে উড়াল দিতাম সেই মুহূর্তে। কিন্তু তখন নড়তেও ভয় করছে, ঘোড়ার পিঠ থেকে নামা তো অসম্ভব ওই সরু জায়গায়। মাথার উপরে কড়কড়ে সূর্য। ঘামতে ঘামতে আমি ঘোড়ার মেজাজ বোঝার চেষ্টা করছি। কি ব্যাপার নড়ে না কেন ব্যাটা?
অবলা প্রাণীটার মর্জির সুতোয় ঝুলছে আমার জীবন তখন। সে যদি চায় পিঠে হালকা ঝাকুনি দিয়ে আমাকে নীচে ফেলে দিয়ে ঝামেলা দুর করতে পারে। মতলব কি রে তোর? বাংলা ইংরেজী কোন ভাষা বোঝে না ব্যাটা। পেছনে তাকিয়ে দেখি ঘোড়া চালকও কোথায় উধাও। আমি একা। ধ্বক করে উঠলো বুকটা। এই প্রথম আক্ষেপ হলো কেন পায়ে হেঁটে পাহাড়ে চড়লাম না। নবাবী করতে গিয়ে ধরা। লাঠি নিয়ে পাঁয়ে হেটে ওঠা অনেক নিরাপদ ছিল এর চেয়ে। ঘোড়াকে ধমক দিতেও সাহস পাচ্ছি না। ব্যাটা বিগড়ে গেলে আরো মুশকিল। এখন এমন জায়গায় সে দাঁড়িয়েছে সেখান থেকে নীচে নামতে হলে প্যারাস্যুট লাগবে।
মাত্র দুই মিনিট। দুই মিনিটকে মনে হলো দুই ঘন্টা। অবশেষে পেছন থেকে শিস শোনা গেল। তখন ঘোড়া নড়তে শুরু করলো আবার। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
কিছুদূর যাবার পর দেখি তিনচারজন বুড়োবুড়ির একটা দল। ষাট সত্তরের কম হবে না একেকজনের বয়স। ওরা পায়ে হেটে লাঠিতে ভর দিয়ে পর্বত আরোহন করছে। এই বেলা চরম লজ্জা এসে গ্রাস করলো আমাকে। এরা পায়ে হেটে উঠছে আর আমি দামড়া জোয়ান ঘোড়ায় চড়ে পাহাড়ে উঠছি। মনে মনে ধিক্কার দিলাম ঘোড়ায় চড়ার আয়েশী বুদ্ধিটাকে। কাছাকাছি যেতেই বুড়োবুড়ির দল আমাকে দেখে হেসে উঠলো। মুখে বললো 'হাই, হ্যালো'। আমিও হ্যালো বললাম কাষ্ঠহাসিতে। মনে মনে নিশ্চয় বলছে "ব্যাটা রামছাগল ঘোড়ার পৃষ্টে চড়িয়া পাহাড়ে উঠতাছে।"
তাড়াতাড়ি বুড়োবুড়ির দলকে পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম। পথটা যত উপরে যাচ্ছে কঠিনতর হচ্ছে। ঘোড়ার পিঠটা খুব নড়ছে এখন। সোজা বসে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাটা ঝপাত করে বসে পড়লে তো সোজা নীচে। রাস্তা ফুরায় না। আর কতোদুর? গলায় ক্যামেরা ঝুলানো আছে ঠিকই কিন্তু ফটো তুলতে গেলে হাত ছেড়ে দিতে হবে। তাই ছবি তোলা বাদ। এই বদ ঘোড়াটার কোন বিশ্বাস নাই। ঝাঁকুনি দিতে পারে যে কোন মুহুর্তেই। আমার ভ্রমন সঙ্গী রিজওয়ান ভাই আর গাইড উগেন তো নীচে রয়ে গেছে। চারঘন্টার মধ্যে না ফিরলে ওরা আমাকে রেখে হোটেলে চলে যাবে। পরে ড্রাইভার এসে আমাকে নিয়ে যাবে। দ্রুত উঠতে চেষ্টা করছি। মানে ঘোড়াকে মনে মনে বলছি দ্রুত চলতে। কিন্তু সে তার গতিতেই যাচ্ছে।
খানিক পর একটা সমতল চত্ত্বরের মতো একটা জায়গায় এসে ঘোড়া থেমে গেল। পেছনে আসা ঘোড়াচালক জানালো ঘোড়ার দৌড় শেষ। বাকী পথ তোমাকে হেঁটে উঠতে হবে। আশপাশের প্রকৃতি খুবই সুন্দর, কিন্তু ওই ভর দুপুরের গরমে আর পথে ঘোড়ার ধকলের জন্য সৌন্দর্যটা আমাকে তেমন আকৃষ্ট করলো না। তবু ক্যামেরা তাক করে চতুর্দিকের দিগন্তের পর্বতগুলো ক্যামেরার ফ্রেমে আনতে চাইলাম। পছন্দ হচ্ছে না ছবিগুলো। অভিজ্ঞতা থেকে জানি এরকম রোদে ছবি ভালো আসে না। আর এই দিগন্তজোড়া সৌন্দর্য গতকালকের দোচুলার সৌন্দর্যের সাথে তুলনাও করা যায় না। দোচুলা অসাধারণ। উচ্চতায় থাকসানের চেয়ে দোচুলা এগিয়ে। ওটি আগে দেখে আসার ফলে থাকসান এলাকার পর্বত আমাকে তেমন মুগ্ধ করছে না।
বাকী পথ আরো দেড় ঘন্টার। এই জায়গায় একটা রেস্তোঁরা আছে। রেস্তোঁরার পাশে দাড়িয়ে সামনেই দেখা গেল কাংখিত সেই থাকসান মনেষ্ট্রি যা দেখার জন্য হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসে। রেস্তোঁরার ভেতরটা গমগম করছে নানান দেশী টুরিষ্ট। এই নির্জন পাহাড়ী পথ পাড়ি দিয়ে এসে এখানকার এই কোলাহলটা কেমন বেমানান লাগলো। আমি ঘড়ি দেখলাম বারোটা বাজে। উপরে উঠতে গেলে দেড়টা। ওখান থেকে নীচে নামতে তিন ঘন্টা। মাথার উপর চান্দিপোড়া সূর্য। পুরো পাথুরে এলাকা এটা। সারা ভুটানে এত ঠান্ডা দেখলাম, কিন্তু এখানে সূর্যটা যেন বেশী রকমের তেতে আছে। মোবাইল বেজে উঠলো। নীচ থেকে গাইড ফোন করেছে। বললো, তুমি কোথায়, কতক্ষণ লাগবে নামতে।
বললাম, আমি তো এখনো পুরোটা উঠতেই পারিনি। মাত্র অর্ধেক এলাম।
সে বললো, তোমার সঙ্গী তো ফিরে যেতে চায়। তুমি থাকো নাকি?
আমি উপরে ওঠানামার সময়টা হিসেব করে সিদ্ধান্ত নিলাম, যথেষ্ট হয়েছে, ফেরা যাক এখান থেকেই। মাথার উপরে এরকম হিটার নিয়ে বাকী পথ উঠে দিনটা এখানে কাবার করার কোন মানে হয় না।
উগেনকে তাড়াতাড়ি বললাম, 'আরে না গরমে আমার মাথা ঘুরাচ্ছে এই পর্যন্ত এসে। বাকীপথ উঠতে পারবো না বোধহয়। থাকো তোমরা। এখুনি নেমে আসছি আমি'। ওখানে হাঁটাহাটি করে বেশ কিছু ছবি তুললাম থাকসান মনেষ্ট্রির। তারপর নামতে শুরু করলাম। নামার সময় ঘোড়া নাই। আমি মরে গেলেও ঘোড়ায় চড়ছি না আর এই পথে। একটা হারামী ঘোড়া।
নামতে আর কতক্ষণ লাগবে। ভাবলাম আমি। কিন্তু এখুনি নামছি বললেও নামছি তো নামছি, নামছি তো নামছিই, পথ ফুরায় না যেন। প্রায় এক ঘন্টা নামার পর ঝরনার জায়গাতে আসলাম। ততক্ষণে পায়ের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ। অনেকদিন এরকম হাঁটাহাঁটি করিনি। পা সোজা রাখা দায় হয়ে গেল। হাটু ভেঙ্গে আসছে। বিশ্রাম নিলাম দুয়েকটা জায়গায়। প্রায় ঘন্টা দেড়েক হাঁটার পর গাড়ির কাছে পৌছাতে পারলাম প্রায় বিধ্বস্ত। নামতে নামতেই পায়ের অবস্থা কাহিল হয়ে গেছে, উঠতে হলে না জানি কী দশা হতো।
উগেনকে বললাম, এবার হোটেলে নিয়ে চলো। একটা কঠিন ঠান্ডা শাওয়ার দরকার। নইলে সামনের বরফগলা নদীতে নেমে যাবো। গলা শুকিয়ে শিরিষ কাগজ। পানি খেলাম ঢকঢক করে আধবোতল। গাড়িতে রাখা শীতল জলের পানিও দেখি গরম হয়ে গেছে।
কিন্তু গাড়ী চলতে শুরু করলো আরেক গন্তব্যে। উগেন বললো, পারো জং দেখে যাই চলো। প্রাচীন একটা দুর্গ। আমি বেজার মুখে রাজী হলাম। দু্র্গের কাছে গিয়ে দেখি গেট বন্ধ। দুর্গ দেখা যাবে না। গত ভূমিকম্পে যে ক্ষতি হয়েছে তা মেরামতের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। খুশী হলাম মনে মনে।
ফেরার সময় খিদে পেয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ দেখি হাতের ডানদিকে একটা সাদা কি যেন দেখা যায় আকাশের গায়। দুটো পর্বতের মাঝখানে আরেকটা সাদা পর্বত যেন। উগেনকে বললাম, গাড়ি রুখখো!!!!
অদ্ভুত সুন্দর আরেকটা পর্বত। এটা আমাদের প্ল্যানে ছিল না। যেন অলৌকিক ভাবে হাজির হয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর ছবিটবি তুলে হোটেলের দিকে রওনা দিলাম। ওই চুড়াটার নাম মনে নেই। তবে ওটাকে কাঞ্চনজংঘার প্রেয়সী বলা হয়। সিকিম তিব্বত আর ভুটান সীমান্তে অবস্থিত সেটি।
হোটেলে পৌছে শাওয়ার নিলাম। তারপর কাপড় বদলে নীচে ডাইনিং টেবিলে গেলাম। হোটেল জিগম্যালিনের রেষ্টুরেন্টটা বেশ গোছানো। কারুকার্যময়। খাবার মেনু বুফে। সাত আটটার মতো আইটেম। ওখান থেকেই খেতে হবে। খাওয়া শেষ করে বেরুলাম আবার। উগেন এবার নিয়ে গেল ন্যাশনাল মিউজিয়ামে। ওখানে ক্যামেরা গেটে জমা রেখে ঢুকতে হয়। টিকেট কাটতে হলো ৫০ গুলট্রাম করে। ওটাও একটা পাহাড়েরর মাথায়। পারো ভ্যালীটা খুব সুন্দর দেখা যাচ্ছে ওখান থেকে। কিছু সময় পার করে নেমে এলাম। তারপর গেলাম একটা পুরোনো সেতুর কাছে। সেতুটা সুন্দর। নির্জন পাহাড়ের পাশে। এই শহরটা একদম নিরিবিলি। রাস্তায় তেমন মানুষজন নেই। মোড়ে একটা মজার দৃশ্য দেখলাম। এই মোড়টা এত নির্জন যে এখানে কটা গরু আড্ডা জমিয়েছে রাস্তার উপর। এই প্রথম গরু দেখলাম শহরের কেন্দ্রে। আরেকটু এগিয়ে দুটো ঘোড়াকে দেখলাম রাস্তার পাশে প্রেম করছে। কালো ঘোড়াদুটি দেখে পছন্দ হয়ে গেল, ছবি তুলে ফেললাম। তারপর ব্রীজের উপর উঠে গেলাম। এই ব্রীজের সামান্য দূরে একটা বাড়ি। বিরাট দেয়াল ঘেরা। এটা ভুটানের রাজার পারো শহরের আবাসভবন। আগামী পরশুদিন রাজা এখানে আসবেন বিয়ের দ্বিতীয় অনুষ্ঠান করতে।
ব্রীজ দেখা শেষ করে বললাম, আজকের মতো আর না, পা ব্যাথা হয়ে গেছে আমার। আমার সঙ্গী বললো যাবার সময় মার্কেটে ঘুরে যাই। পারোতে প্রধান সড়ক একটাই। ওটার দুপাশে যা আছে সেগুলোই মার্কেট।
মার্কেটে ঘুরতে ইচ্ছে হলো না। একটা ছোট্ট মুদী দোকানে গিয়ে জুতোর ব্রাশ কিনলাম ৩৫ টাকা দিয়ে। কেডসের চেহারা থাকসানের ধুলোর আড়ালে হারিয়ে গেছে। এটা নিয়ে ভদ্রসমাজে মেলামেশা করা অসম্ভব। গাড়িতে পা ঝুলিয়ে বসে ধুলো ঝেড়ে ভদ্র হলাম। আমার সঙ্গী কেনাকাটা করছে ঘুরে ঘুরে। আমি একটা দোকানে ঢুকে কয়েকটা সাবান আর এয়ারফ্রেশনার কিনলাম। ভুটানের নিজস্ব প্রোডাক্ট খুব কম, এটি তার একটা। তারপর হোটেলে ফিরে গেলাম। উগেন আমাদের রেখে চলে গেল। বাকী সময় আমাদের নিজস্ব। গাইড ছাড়া আশেপাশে ঘুরবো। সন্ধ্যে হয়ে আসছিল। রুমে ঢুকে গেলাম যার যার।
হাতমুখ ধুয়ে টিভি ছাড়লাম। ডায়েরী লিখলাম। দিনের কর্মসূচি লিপিবদ্ধ করলাম। কেমন ক্লান্তি সমস্ত শরীরজুড়ে। দুটো বিছানা পাতা আছে। মানুষ আমি একজন। খানিক ঘুমিয়ে নিলে মন্দ হয় না। ডানদিকের বিছানায় ঢুকে গেলাম। উষ্ণ লেপের নীচে। টিভিতে রাজার বিয়ে নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান দেখাচ্ছে। এদের যত জিনিস দেখেছি সবচেয়ে বোরিং বিষয় হলো টিভি। ভুটানের নিজস্ব চ্যানেলগুলো স্রেফ অখাদ্য। এইচবিও খুজে বের করলাম। জেমসবন্ডের একটা মুভি দেখাচ্ছে। আগেই দেখা। দেখতে দেখতে ঘুম এসে গেল। ঘন্টাখানেক ঘুমানোর পর জেগে উঠে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। রাস্তায় কোন লোকজন নেই। মনে হচ্ছে মাঝরাত পেরিয়েছে। আশ্চর্য একটা শহর এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে? কেডস পরে পকেটে পাসপোর্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় হাটবো। একা একা বেরুলাম নির্জন রাস্তাটায়। এরকম সুনসান কোন শহর আমি দেখিনি। মাথার উপর চাদটা মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলে যাচ্ছে। শীতটা বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে এখন। দোকানপাট সব বন্ধ। কেবল বারগুলো খোলা আছে। লোকজন পান করতে ব্যস্ত। এই সময় কারো কিছু করার নেই। কিছুক্ষণ হাটাহাটি করে ফিরে এলাম।
হোটেলে ফিরে শুনলাম খাবার তৈরী। বসে গেলাম। রাতের খাবার সারলাম রুটি ভাজি মুরগী ডালভুনা ইত্যাদি দিয়ে। খেয়ে আবার বেরুলাম সঙ্গীসহ। দুজনে এবার গেলাম একেবারে নদীর ধারে। নদীটাও কাছাকাছি দুই ব্লক পরে। নদীর ধারে পুলিশফাড়ি বা থানা। রেলিং ধরে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাড়িয়ে পাহাড়ের খাজে খাজে মানুষের ঘরবাড়ি গুলো দেখতে লাগলাম। অন্যরকম একটা শহর। আস্ত একটা গ্রাম কেউ এই শহরে ঢুকিয়ে দিয়েছে যেন। এত সুন্দর গ্রাম আর যেন দেখিনি। নদীর কলকল শব্দ ছাড়া আর কোথাও কিছু নেই। ঝরনাময় নদীর এই শব্দটা এত চমৎকার করে বাজে সারারাত শুনলেও বিরক্তি আসবে না বোধহয়। কুকুরে আনাগোনা মানুষের চেয়ে বেশী মনে হলো। নদীর ধার থেকে এবার শহরের নির্জন রাস্তগুলো দিয়ে হাটা শুরু করি। কালকে রাজার বিয়ে, সবাই দোকান বন্ধ করে বাইরে সাজাচ্ছে। মজাই লাগলো দেখে। রাজা যে পথে যাবে সেই পথগুলো বিশেষ কায়দায় সজ্জিত হচ্ছে।
দশটার আগেই হোটেলে ঢুকে গেলাম। ঘুমোতে হবে আজকে বেশ করে। ভুটানে আমাদের শেষরাত।
Subscribe to:
Posts (Atom)