Thursday, February 25, 2010

এ ভ্রমণ, কোথাও যাওয়া নয়

এ ভ্রমন, কেবলই একটা ভ্রমন-
এ ভ্রমনের কোন গন্তব্য নেই
এ ভ্রমন মানে কোথাও যাওয়া নয়।
....................................

একদিন অবেলায় চেনা রাস্তার অচেনা মোড়ে
ঠিক দেখা হয়ে যায় পথের সাথে।
বিস্ময় ভুলে আমি পথের হাত ধরি,
পথ আমাকে আকাশ চেনায়।
আকাশ চেনার আজন্ম সাধ ছিল যার।
....................................
আমি চোখ বন্ধ করে ভাবি
আলোর পথে এ এক অনন্ত ভ্রমন।
এ ভ্রমন যেন কখনোই শেষ না হয়।
আমাকে পথ দেখাও হে আলো,
অনিঃশেষ অবিনশ্বর আলো।

তুমি জানো, কেবল তুমিই
আমার সম্মুখে আদিগন্ত বিস্তৃত পথ
অথচ দিন শেষে কোথাও যাবার নেই।

এ ভ্রমন তাই, কেবলই একটা ভ্রমন-
এ ভ্রমনের কোন গন্তব্য নেই
এ ভ্রমন মানে কোথাও যাওয়া নয়।

এ ভ্রমনে তুমি ছাড়া আর কোন সঙ্গী নেই।
****************************************
২৯.১২.২০০৯

'ঘুম যা' ক্লাস

মহিউদ্দিন স্যার বাংলা পড়াতেন ক্লাস সেভেনে। খানিকটা পাগল কিসিমের মানুষ। মুখ ভেংচিয়ে ধমক দিতেন বলে কেউ কেউ আড়ালে ডাকতো 'মুখবেকু'। পুর্নিমার চাঁদের মতো গোল স্কুলের পিতলের ঘন্টাটা ঝুলানো থাকতো দোতলায় ক্লাস সেভেনের জানালার সামনে। আর ক্লাসরুমের জানালায় ঘন্টা পেটানোর হাতুড়িটা রাখা থাকতো। বেতের বদলে ওই কাঠের হাতুড়িটা মাঝে মধ্যে আছড়ে পড়তো ক্লাস সেভেনের দুষ্ট বালকদের পিঠে।

ক্লাস সেভেনে আমি সেই মুষ্টিমেয় ভাগ্যবানদের একজন যাদের ঘাড়ে তখনো হাতুড়িটা আছড়ে পড়ে নাই। ক্লাসে পড়ানোর চেয়ে আবজাব গল্পে মহিউদ্দিন স্যারের আগ্রহ বেশী দেখা যেত। আমরাও তাতে উৎসাহী। কান ধরে দাড়িয়ে থাকা বা পেটানোর চেয়ে এইটা ঢের ভালো।

মাঝে মধ্যে স্যারের পড়ানোর মুড না থাকলে বলতো, 'ওই ঘুম যা সবাই'। এই 'ঘুম যা' মানে বেঞ্চে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে চুপচাপ মটকা মেরে থাকা যতক্ষন পর্যন্ত স্যার উঠতে না বলেন। এইটা একটা মজার খেলার মতো ছিল। খুব উপভোগ্য। স্যার হেঁটে হেঁটে টহল দিতেন ঘন্টার হাতুড়ি হাতে।

একদিন 'ঘুম যা' ক্লাস চলছিল। আমাদের সবার মাথা বেঞ্চে নতমুখী। আমি ভ্যাবলা কিসিমের ছাত্র ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ কি ভুত চাপলো আমি স্যারের পায়ের শব্দ না পেয়ে ভাবলাম স্যার কোনদিকে গেছে একটু উঁকি দিয়ে দেখি। কিন্তু মাথাটা আলগা করতে না করতেই জীবনে প্রথমবারের মতো 'ধুম' করে হাতুড়িটা নেমে আসলো আমার পিঠে। কারন উনি তখন ঠিক আমার পেছনেই দাড়িয়ে। পরবর্তী সংলাপগুলো ছিল এরকম-

-কী রঙ্গ দেখতে উঠছস?
-কিছু না স্যার...
-স্কুলে আসার আগে কি খাইছস?
-ভাত খাইছি স্যার.... (আসলে কি খাইছি ভয়ে ভুলে গেছি)
-কি দিয়া খাইছস?
-কাতাল মাছ দিয়া খাইছি... (আসলে আমি তখন কাতাল ছাড়া আর কোন মাছ চিনতাম না)
-তোর বাপ কোথায়?
-কাতারে থাকে (বাবা তখন কাতারে একটা কোম্পানীতে চাকরী করতেন)
-তোর বাপে থাকে কাতার, তুই ভাত খাস কাতাল মাছ দিয়া, তোর মা কি কাতান শাড়ী পড়ে?

স্যারের কথা শুনে পুরা ক্লাস ঘুম ভেঙ্গে হো হো করে হেসে উঠে। আমি মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে থাকি। অপরাধটা গুরুতর বুঝতে পারছি। সব যে এভাবে মিলে যাবে বুঝি নাই। ভাবছিলাম হাতুড়ির বাড়ি আরো আসছে। কিন্তু পুরো ক্লাস এমন ভাবে হাসছে, স্যার বুঝলেন নিয়ন্ত্রন চলে গেছে হাতুড়ির বাইরে। পোলাপান আর ঘুমাবে না। তাই দেখে ক্লাস শেষ করে চলে যাবার যোগাড় করলেন। খাতাপত্র নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে শেষবারের মতো হুংকার দিলেন:

-ওই চুপ যা সব, যত্তসব ফাজিল। এই তু্ই বস্ (শেষ বাক্যটা আমাকে উদ্দেশ্যে বললেন)।

আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বেঞ্চে বসতে বসতে মনে মনে বললাম- থ্যাংক্যু কাতাল মাছ। 'ঘুম যা' ক্লাসের মার থেকে তোমার জন্য বাঁচলাম।

বারো ঘন্টা বাসভ্রমনের বিনিময়ে তিন ঘন্টার বইমেলা দর্শন

শনিবার সকালে ঘুম ভাঙলো অনির্ধারিত বিলম্বে। বেশী রাত করে না ঘুমানোর ফসল। ‘দেরীতে ঘুমোলে আগে ওঠা হয় আর আগে ঘুমোলে দেরীতে ওঠা হয়’, তেমন একটা বিদঘুটে ব্যাপার হয় আমার। অফিসের গাড়ীটা মিস করে আর কতটা দেরীতে গেলে চাকরী টিকে থাকবে হিসেব করতে করতে একটা ফাঁকিবাজি ভাবনা মাথায় খেললো। আজ অফিসে না গেলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়? গত তিনমাস ছুটিছাটা বাদে একনাগাড়ে চলছে। আজকে যাবোই না। তারচে অন্য কোথাও যাওয়া যাক। গতপরশু থেকে ঢাকার বইমেলায় যাবার প্ল্যানটা বারবার বাতিল হচ্ছিল সুপরিকল্পনার অভাবে। নাহ, জীবনে সুপরিকল্পিত কাজ কয়টা করা যায়। তারচে বরং একটা অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তই নেই। হলে হবে নাহলে নাই। ঢাকাগামী যে কোন একটা বাসে একটামাত্র সীটও যদি খালি থাকে এই মুহুর্তে, তাহলে আমি ঢাকা যাবো। এক্ষুনি।

গোসল সেরে রেডী হয়ে সোহাগ পরিবহনে ফোন দিলাম পৌনে দশটায়। বললাম, “ভাই এখুনি ছাড়বে ঢাকার তেমন কোন গাড়ীতে একটা আসন হবে কিনা?”

বলা হলো -“হবে, দশটায় একটা গাড়ী যাচ্ছে, পনের মিনিট পর ছাড়বে”। শোনামাত্র একছুটে বেরিয়ে রিকশায় উঠলাম। তারপর বাস। বাসা থেকে বেরুবার আগমূহুর্তে ফেসবুকে ‘বইমেলা যাচ্ছি’ জাতীয় একটা ষ্ট্যাটাস লিখে এসেছি, ঢাকার কারো চোখে পড়লে যোগাযোগ করা যাবে। বাসে বসে মেলায় গিয়ে কাকে পাবো কাকে পাবো না হঠাৎ গিয়ে, ভাবতে ভাবতে ফোন দিলাম রুবেলকে। ও ছাড়া আর কারো ফোন নম্বর নেই। রুবেলকে জানাতে বেশ কাজ হলো। ওর কাছ থেকে দাদুভাই, সুবর্না, সুমনার নাম্বার পাওয়া গেল। ঢাকা পৌঁছার আগেই ফোনে যোগাযোগ হয়ে গেল বিহঙ্গ, সুমনা আর সুবর্নার সাথে। যাক একদম একা থাকতে হবে না গিয়ে। কেউ না কেউ আসবে।

মেলায় পৌঁছে আমারব্লগের ষ্টল খুঁজে পাচ্ছিলাম না। চরকির মতো কয়েকপাক ঘুরে অনুসন্ধান কেন্দ্রের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম- ‘আমি হারিয়ে গেছি,আমাকে খুঁজে নাও’ ষ্টাইলে। তারপর রুবেল এসে উদ্ধার করলো অনুসন্ধান কেন্দ্র থেকে। গিয়ে পরিচিত হলাম ‘নিক চেনা, মুখ অচেনা’ ব্লগারদের সাথে। অমি পিয়ালরে ভাবতাম পোলাটা বয়সে আমার ছোটই হবে, কথা বলে জানলাম আমার এক বছর আগে ইন্টার পাশ দিছে। এবং দেশী লোক। আমার মামাবাড়ীর প্রতিবেশী। ডটু রাসেলকে ভাবতাম কঠিন এক পোলা, কথা বলে দেখি ভীষন অমায়িক এক ভদ্রলোক।

সুমনাকে ভাবতাম আপু আপু লাগবে, দেখি নিতান্ত বালিকা এখনো। বিহঙ্গরে ভাবতাম বড়সড় ঢ্যাঙা সাইজ কেউ হবে, ওমা এতো পিচ্চি পোলা। কেবল আমার সাথে দেখা করার জন্য সুমনা আর বিহঙ্গ মেলায় এসেছে, এই কথা শুনে কী অসাধারন অনুভুতি হলো! হালিমভাইকে যা ভেবেছি, বরাবরই পেয়েছি অবশ্য। আরো কয়েকজনের সাথে আলাপ হলো নাম ভুলে গেছি বলে ক্ষমাপ্রার্থী। তারপর পরিচিত হলাম এবারে মেলার দুজন সেলেব্রিটি সাবরিনা আর সালমা মাহবুব। সালমা মাহবুব যিনি আমাকে একবার ফোনে একটা ব্যাপারে খুব সাহায্যে করেছেন নিজে সমস্যাক্রান্ত হবার পরও। সাবরিনাকে অন্যসুত্রে পূর্ব চেনাজানা থাকলেও মুখোমুখি হলাম, এই প্রথম। কথা বলে ওনার স্নিগ্ধ আন্তরিকতায় সিক্ত হলাম আবারো। সম্পর্কে আমার ভাবী হলেও, তিনি ভাবীর চেয়ে বোন হতে আগ্রহী। আমি চট্টগ্রামে ওনার বাসায় সবপরিবারে দাওয়াত কবুল করে নিস্তার পেলাম।

এরপর মোড়ক উন্মোচন নজরুল মঞ্চে। দলবেধে উঠলাম সবাই। মোড়ক উন্মোচন হলো ছয়টা বইয়ের। পাপড়ি আপার সাথেও এই প্রথম মুখোমুখি। আমার ছোটবোন সুমীমা ইয়াসমিনের সাথে ওনার দীর্ঘদিনের সখ্যতা। যদিও আমার সাথে কালই প্রথম মুখোমুখি দেখা। কিন্তু দেখামাত্র গ্রেফতার করে নিলেন আন্তরিকতায়। হাত ধরে টেনে নিয়ে বড়বোন সুলভ চোখ রাঙানিতে বললেন, ‘এই তোমার আসল নাম বলো, আসল নামে চিনতে চাই তোমাকে’। আমি কাঁচুমাচু। তারপর চড় চাপড়ের ভয়ে বলে দিলাম আসল নাম। উনি হাফিজ ভাইকে(ওনার বর হাফিজুর রহমান) ডেকে পরিচয় করিয়ে দিলেন আমাকে। ভাইয়াকে বললেন ছবি তুলে দিতে। তারপর লুৎফর রহমান রিটনকে এমন জোরে ডেকে আমার সাথে পরিচয় করালেন দেখে যে কেউ ভুল বুঝবে আমি পাপড়ি আপার আপন মায়ের পেটের ভাই। রিটন ভাইও সেই ভয়ে মুখস্ত বলে বসলেন, আরে ব্লগার ‘নীড় সন্ধানী’ তো মারাত্মক লেখে (তবে আমি জানি আর উপরঅলা জানে রিটন ভাই জীবনেও আমার কোন লেখা পড়ে নাই)

এইসব করতে করতে আড্ডা শেষের দিকে গেল। সুমনা বিহঙ্গ বিদায় নিল। আমি ষ্টলে গিয়ে কয়েকটা বই নিলাম। ব্লগারদের বই এখনো আসেনি, ওটার জন্য অগ্রিম পেমেন্ট দিয়ে আসলাম। রাতের বাসেই ফিরতে হবে, সাথে আমার দুই বন্ধু ছিল ওদের নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকে কিছুক্ষন স্মৃতিচারন করলাম। পনের বিশ বছর আগে কোন কোন জায়গায় আমাদের আড্ডা হতো সেগুলো নিয়ে হা হুতাশ করলাম। হা হুতাশ করে লাভ নাই। পুরোনো দিন ফিরবে না, এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তাই বর্তমানকে মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার কথা বলে সোহাগের মালিবাগ অফিসের দিকে রওনা দিলাম। প্রিয় বন্ধু আমাকে যত্ন করে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল বাসের গোড়ায়।

বাস যখন মাঝ রাতে চৌদ্দগ্রামের হাইওয়ে ইনে এসে পৌঁছাতে ফোন পেলাম প্রিয় বন্ধুর। সে জানালো মেলার আড্ডার ছবি নাকি ব্লগে চলে এসেছে ইতিমধ্যে। বন্ধু বললো, আনস্মার্ট আমাকে নাকি রীতিমত হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছে নীল টিশার্টে। ওর বাকবাকুম খুশী আমাকে সেই মাঘ নিশীথের প্রচন্ড শীতকাঁপুনিতেও উষ্ণতার স্পর্শ দিল যেন।

টেরা শফি

ভিসা টিকেট কনফার্ম হবার পর আলকরনের টেরা শফি গেল এলাকার বড় জ্যোতিষী মফিজ কাওলাদারের চেম্বারে। প্রথম বিদেশ যাত্রা তার। দেশে প্রচুর আকাম করে পবিত্র দেশ সৌদি আরবে পাড়ি জমাচ্ছে ফ্রী ভিসাতে, জায়গামত থাকতে পারলে নাকি বহুত ধান্ধা ওখানে। ইহকাল পরকাল দুইটাই কাছাকাছি। তবু জ্যোতিষীর কাছ থেকে একটা ভবিষ্যতবানী নেবার ইচ্ছে।

টেরা শফিকে বস্তির লোক যেরকম চেনে, শিক্ষিত সমাজ চেনে না। মফিজ কাওলাদারও চিনলো না। গত একসপ্তাহ ঢাকা চিটাগাং দৌড়াদৌড়িতে দাড়িগোফ কামানোর সুযোগ পায়নি। সকাল নটায় পায়ে হেঁটে ঘুমের পোষাক লুঙ্গি-শার্ট পরেই জ্যোতিষীর চেম্বারে চলে এল। নিউমার্কেটের উল্টা দিকে বসে কাফিনা হোটেলে বসে মফিজ কাওলাদার।

পেশাদার ধূর্ত লোক মফিজ কাওলাদার । চেহারা দেখেই বলে দিতে পারে কাকে টিপলে কতটা বেরুবে। টেরা শফিকে না চিনলেও তার মলিন পোষাক আর খোঁচা দাড়ি বলে দিচ্ছে এটা দুশো টাকার মাল, দুহাজার টাকার উপদেশ দিয়ে লাভ নেই। বড়জোর একটা পাঁচশো টাকার অকেজো চুনি পাথর গছানো যাবে। শফির হাতটা ধরে খানিক কচলে গ্লাস দিয়ে সুক্ষ্ণচোখে দেখার ভান করে গড়গড় করে জ্যোতিষ টেম্পলেট রেকর্ডটা চালিয়ে দিল। সুখ-দুঃখ-প্রেম-শত্রু-মিত্র-টাকা-কড়ি কিছুই বাদ গেল না ওখানে। যতটুকু সুখবর দেয়া যায় দুশ টাকা ভিজিটে তার সবটুকু দিল।

কথা শেষ হবার পর কাওলাদার একটু চুপ থেকে বললো - 'তবে...'
এটুকু বলে আবারো চুপ মফিজ কাওলাদার। যেন ভাবছে।

টেরা শফি বললে, 'তবে কি?'

মফিজ কাওলাদার বললো, 'একটা সুসংবাদ আছে। আগামী বছরের শেষভাগে বিদেশ যাত্রার ঘোর লক্ষন আপনার বৃহস্পতি রেখায়। কিন্তু তার জন্য একটা চুনি পাথরের আংটি পরতে হবে যার মূল্য একহাজার টাকা কিন্তু আপনার জন্য বিশেষ ডিসকাউন্টে পাঁচশো টাকা মাত্র।'

এটুকু শোনার পর টেরা শফি ততোধিক টেরা চোখে চেয়ে থাকলো জ্যোতিষীর দিকে। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না এই সুসংবাদ!! তারপর বললো " মাত্র পাঁচশো টাকা? ঠিকাছে পাথরটা নেবো আমি, টাকাটা যোগাড় করে এখুনি আসতেছি।"

ঘন্টাখানেক পর মফিজ কাওলাদারকে সদর রাস্তায় ধাওয়া খাওয়ারত অবস্থায় পাওয়া গেল। পেছনে লাঠি হাতে একদল উস্কোখুস্কো এলোমেলো যুবক। ঘটনা থামলে জানা গেল ভাংচুর বাদেও নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা ছিনতাই হয়ে গেছে কাওলাদারের চেম্বার থেকে।

বিদেশ যাবার আগে বউয়ের হাতে কিছু নগদ দিতে পেরেও টেরা শফি ঠিক খুশী নয়।
কাওলাদার ব্যাটা শেষ আকামটা একরকম হাতে ধরে করালো।

একজন দীপা এবং ভুলে যাওয়া একটা প্রেম

১.
জাকের মাষ্টারের অর্ধপ্রকাশিত ইতিহাসটা অনেক রহস্য অমীমাংসিত রেখে চাপা পড়ে গিয়েছিল তাঁর মৃত্যুর পরেই। ঘটনাটা তার মৃত্যুর কয়েক বছর পর আমার কানে আসার পর উত্তরপুরুষ হিসেবে কৌতুহল দমিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। কারন জাকের মাষ্টার যে সময়ের মানুষ সেই সময়ে ওরকম একটা ঘটনা উপমহাদেশে বিরল। তবে জাকের মাষ্টারের চেয়েও যাঁর কারনে কৌতুহলটা চিড়বিড় জেগে উঠলো তিনি হলেন দীপালী চক্রবর্তী বা দীপা আহমেদ।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে সুপুরুষ তরুন বোয়ালখালীস্থ সৈয়দবাড়ীর মওলানা সৈয়দ জাকের আহমেদ মাদ্রাসায় উচ্চতর ডিগ্রী নেবার জন্য কোলকাতা গমন করেন। তখনকার দিনে মাদ্রাসার ডিগ্রীর সাথে পাগড়ী বাঁধার একটা সম্মানজনক ব্যাপার ছিল। উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে মাথায় মওলানা পাগড়ী বেধে জাকের আহমেদ যখন গ্রামে ফিরে আসেন তখন মাথায় টাইটেল পাগড়ী দেখে যতটা বিস্মিত হয় তার তিনগুন বেশী বিস্মিত হয় সঙ্গের ছিপছিপে তরুনীকে দেখে। এ কাকে নিয়ে এসেছে জাকের মওলানা?

প্রাথমিক আলাপ সম্ভাষন শেষে জানা যায় এর নাম দীপালী চক্রবর্তী, কোলকাতা শহরে তার বসবাস। বিবাহিতা এবং দুসন্তানের জননী। কিন্তু কোন ভরা পূর্নিমায় জাকের মাষ্টারের সাথে তার দেখা হয়ে যায় সে কথা জানা যায় না। তবে সেই দেখাতে এমন গভীর প্রেমের জন্ম হয় দুজনের মধ্যে যে স্বামী-সন্তান-বিত্ত-বৈভব-পরিবার-ধর্ম-সংস্কৃতি সবকিছু ছেড়ে জাকের মওলানার হাত ধরে কোলকাতা শহর ছেড়ে পালিয়ে চট্টগ্রামের এই অজপাড়া গাঁয়ে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যদিকে একজন মাদ্রাসা পাশ মওলানা হয়েও জাকের মাষ্টার কিভাবে হিন্দু ব্রাম্মন রমনীকে ধর্মান্তরিত করিয়ে নিজের ঘরনী করার জন্য কোলকাতা থেকে মেইল ট্রেনে চট্টগ্রাম নিয়ে আসে সেটাও বোধগম্য হয় না কারো। এমনকি এই একুশ শতকেও ওরকম ঘটনা কতটুকু সহনীয়?

ছি ছি পড়ে যায় সমস্ত গ্রামে। এ কি অনাচার! সৈয়দবাড়ীর মান ইজ্জত সব গেল। এত দুঃসাহস কি করে হয় তার? জাকের মাষ্টারকে বংশমর্যাদার কারনে একঘরে করা সম্ভব না হলেও তার নবপরিনীতা বধুকে পাড়ায় অবাঞ্চিত ঘোষনা করা হয়। জাকের মাষ্টার কোন মতে তাকে ঘরে তুলতে পারলো না। শেষে পাড়ার বাইরে একটা ঘর বেঁধে আলাদা সংসার পাতে দুজনে। প্রেমের সংসারে বাজার হয়, রান্না হয়, খুনসুটি হয়। হয় প্রতিদিনের নিত্যনতুন রোমাঞ্চ।

২.
কিন্তু শীঘ্রই রোমাঞ্চে বাগড়া দেয় দীপার প্রাক্তন স্বামী।

এক বিকেলে বৃটিশরাজের পুলিশ এসে সমস্ত পাড়া ঘিরে ফেলে। দারোগাবাবুকে নিয়ে গ্রামে প্রবেশ করে কোলকাতা থেকে আগত দীপালীর স্বামী। পুলিশ দেখে দীপালীকে পেছনের জঙ্গলে লুকিয়ে রাখে দীপালীর বড় জা হালিমা খাতুন। গোপনে একমাত্র এই একটা মানুষেরই স্নেহ পেত দীপা। পুলিশ তন্ন তন্ন করে পাড়া তল্লাশি করে। দীপালীর স্বামী চিৎকার করে ডাকতে থাকে "দীপা দীপা" বলে। না পেলে বাড়ী জ্বালিয়ে দেবে বলে হুমকি দেয় পুলিশ।

রাজকীয় পুলিশবাহিনীকে যমের চেয়ে বেশী ভয় পায় মানুষ। কিন্তু সেই ভীতির মুখে ঝামা দিয়ে একটা সাহসী নারী কন্ঠ ভেসে আসে পাশের জঙ্গল থেকে। গ্রামের সমস্ত মানুষ হতবাক হয়ে শোনে মিতবাক তরুনী দীপা উচ্চকন্ঠে ঘোষনা করছে, "আমি স্বেচ্ছায় স্বামী সন্তান পরিবার সব ত্যাগ করে এসেছি। আমি আর কখনো ফিরবো না ওই ঘরে। আমাকে কেউ জীবিত নিতে পারবে না ওই সংসারে।"

উপস্থিত গ্রামবাসী নারী পুরুষ ছেলে বুড়ো পুলিশ দারোগাবাবু সবাই ওই দুঃসাহসী ঘোষনায় স্তব্ধ হয়ে যায়। দীপালীর ওই দৃঢ়তার কাছে হার মেনে ফিরে যায় পুলিশ, পেছন পেছন দীপালীর স্বামীও।

ওই ঘটনার পর দীপাকে ঘরে তোলার অনুমতি পায় জাকের মাষ্টার। দীপা প্রথমবারের মতো মূল বাড়ীতে প্রবেশাধিকার পায়। শুরু হয় নতুন জীবন।

কিন্তু বছর পেরোতেই জাকের এবং দীপার মধ্যে দুরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে অজ্ঞাত কারনে। কেন যেন জাকের মাষ্টার দীপাকে অবহেলা শুরু করে। প্রাথমিক রোমাঞ্চ কেটে গিয়েছিল বলেই কী? দুরত্ব বাড়তে বাড়তে দৈনিক খিটিমিটি ও চুড়ান্ত বিরক্তিতে পৌঁছে যায় সেটা। তাদের প্রায় ছাড়াছাড়ি হয় হয় অবস্থা। জাকের কেন যেন সহ্য করতে পারছে না আর দীপাকে। অস্বস্তিকর পরিস্তিতি। তখনো দীপা চাইলে ফিরে যেতে পারতো কোলকাতা। বড় জা হালিমা সেরকম প্রস্তাবও করেছিল স্নেহের বশে। কিন্তু দীপা অনড়। সে ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হয়েছে। এই দেশেই থাকবে সে। যদি জাকের তাকে রাখতে না চায়, তাহলে বিদেয় করে এখান থেকে চট্টগ্রাম শহরে রেখে আসুক। একলাই থাকবে দীপা। কিন্তু কোলকাতা যাবে না কিছুতেই।

একদিন তাই হলো। জাকের মাষ্টার দীপাকে তালাক দিল এবং শহরে রেখে আসলো। রেখে আসা বলা ঠিক না। বলা ভালো শহরের রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে আসলো চরম অনিশ্চিয়তার মধ্যে। আক্ষরিক অর্থেই রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে আসা। এখানে জাকের মাষ্টারকে একটা অমানুষ বলে মনে হয়। কিন্তু সমাজে জাকের মাষ্টার খুবই ভদ্রলোক ছিলেন, আমি নিজের চোখে দেখেছি ওনার অনেক ভালোমানুষিকতা। কিন্তু ওই মানুষটা দীপার সাথে তখন কেন যে ওরকম করলো সেটা এই যুগে বসে বোঝা মুশকিল। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ননা বাদে বোঝা অসম্ভবও। সমস্যা হলো অত আগের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কেউ বেঁচে নেই। প্রায় একশো বছর আগের কথা।

দীপার কথা ভুলে যায় সবাই।

৩.
আরো পঞ্চাশ বছর পর শহরে দীপার সন্ধান পায় তার জা হালিমার এক সন্তান তালেব। খুঁজে বের করে তার হারিয়ে যাওয়া প্রাক্তন চাচী দীপাকে। খুঁজে পেয়ে মাকে আর বোনকে নিয়ে দীপার ঘরে যায়। চটগ্রামের আসকার দীঘির পাড়ে ছোট এক কক্ষের ঘরে নিঃসঙ্গ জীবন পার করছে দীপা। ঘরের একপাশে জায়নামাজ বিছানো, তসবি ঝোলানো দেয়ালে। অন্যপাশে তক্তোপশে পাটির বিছানা। মাথার উপর বেড়ার ছাউনি। তার উপরে টিন। অন্ধকার চার দেয়ালের ভেতর স্বেচ্ছাবন্দী জীবন। বয়সের ভারে কিছুটা ন্যুজ। সুতার কারখানায় কাজ করেছে বহুবছর। এখন ঘরে বসে নামাজ পড়ে আর সেলাইকর্ম করে দিনযাপন করে। হালিমাকে এত বছর পরে দেখতে পেয়ে চিনতে ভুল করে না একমুহুর্তও। ঝাঁপিয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরে দীপা। চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় বর্ষা নামে দুজনের। হালিমার মুখ দিয়ে কথা সরে না। কোন মতে বলে-

-আমি তো ভেবেছি তুমি চলে গেছ। কেন তুমি কোলকাতা গেলে না?
-কেন যাবো দিদি, আমি তো যাবার জন্য আসিনি
-জাকের তোমাকে ছেড়ে দিয়েছে, তুমি কেন রয়ে যাবে?
-জাকের ছেড়েছে আমাকে। কিন্তু আমি তো ছাড়িনি তাকে, তার দেশকে, তার ধর্মকে। আমি সবকিছু ছেড়ে এসেছি তাকে আজীবন জড়িয়ে রাখবো বলে। আমার তো আর কিছু নাই।

এটুকু শুনেই হালিমা বাকরূদ্ধ। তার চোখ ফেটে আবারো জল আসে। সে অশ্রু লুকিয়ে সাথে আনা পিঠে, মিঠাই, নারিকেল, চালভাজা ইত্যাদি দীপার হাতে দেয়। আর বিস্ময়ে চেয়ে থাকে অই মুখটার দিকে। বয়সের বলিরেখা মুখে। কিন্তু কী নিদারুন বিশ্বাস এই নারীর ভেতর। বিশ্বাসের কি শক্তি!! তুলনা করার মতো কোন বস্তু বা মানুষ এই পৃথিবীতে খুঁজে পায় না হালিমা।

৪.
মায়ের মুখে শোনা ঘটনা। হালিমা খাতুন আমার নানী। দীপাও আমার নানী ছিল। নানার ভাইয়ের স্ত্রী। সেদিন হালিমার বাসায় আমার মাও গিয়েছিল। পাকিস্তান আমলের কথা।

নিঃসঙ্গ দীপাকে দেখতে জাকের মাষ্টার কখনো গিয়েছিল কি না কেউ জানে না। তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের আসল কারনও কেউ জানে না। দীপাও কাউকে বলেনি। জীবনের অনেক অমীমাংসীত রহস্যের মতো এটিও চির অমীমাংসিত থেকে যাবে।

দীপা আহমদেরও মৃত্যু হয়েছে বেশ কবছর আগে। জাকের মাষ্টারের আগে আগে। তারা দুজনেই চলে গেছে এক মহান প্রেমের ও বিচ্ছেদের রহস্য অমীমাংসিত রেখে।

ঘটনার এটুকু জেনে মনে হয় জাকের মাষ্টার খুব স্বার্থপরতার পরিচয় দিয়েছিল। কারন সে নিজে আবার বিয়ে করে সংসার নিয়ে সুখে দিন পার করেছে। সমাজে জাকের মাষ্টার ঘৃনিত মানুষ না হলেও পাঠক তাকে নিশ্চিত ঘৃনা করবে এই ঘটনা জেনে। আমিও করেছি যখন দীপার ঘটনাটা জেনেছি।

তবু ঘেন্নাকে ছাপিয়ে বিস্ময়টাই জেগে থাকে বেশী। রহস্যটা জানার অদম্য ইচ্ছেটা জেগেই থাকে। কি এমন প্রেম ছিল তাদের? একটা মানুষ প্রেমের জন্য কতটা ত্যাগ করতে পারে? দেশকালসময়ভেদে প্রেমের প্রকৃতি কি বদলায়? ভিন্নধর্মের দুটি মানুষের সাহসী প্রেম এই শতকেও পরম বিস্ময় জাগিয়ে রাখে আমার চোখে।

পহেলা ফাল্গুনে জ্যৈষ্ঠের স্মৃতিচর্বন

ভয়ানক গরম পড়ছে আজ। জ্যৈষ্ঠের কাঠফাটা দুপুর। ক্লাস শেষে কোনমতে ষ্টেশানগামী শেষ বাসটা ধরে ঝুলে পড়লাম। ষ্টেশানে এসে দেখি ট্রেনে ঠাসাঠাসি ভীড়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুপুর দেড়টার ফিরতি ট্রেনের যাত্রাটা মোটেও সুখকর নয়, বিশেষ করে এই দাবদাহে। কোন বগিতেই সুঁচ ঢোকার জায়গা নেই। বগির পাদানি গুলো পর্যন্ত দুজন করে বসে দখল করে রেখেছে। হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে যাবার আশাও মাঠে মারা গেল।

বিকল্প পথে নাজিরহাটের বাসে যাওয়া যায়। কিন্তু পকেটে আছে সাড়ে সাতটাকার মতো। আড়াই টাকা বাসভাড়া তিনটাকা রিকশা ভাড়া চলে গেলে দুই টাকা দিয়ে বিকেলটা পার করা যাবে না। একটা গোল্ডলীফেই দুইটাকা চলে যাবে। নাহ এই মাগনা ট্রেনই ভালো। আবার ট্রাই দেই।

পেছনের দিকে একটা মালগাড়ীর বগি দেখা গেল, ঢোকা যাবে ওখানে। বাছাবাছি না করে ওখানেই উঠে গেলাম। ওটাও ভরে গেল পাঁচমিনিটে। মালগাড়ীর বগিতে কোন আসন থাকে না। পুরোটা একটা লোহার বদ্ধ খাঁচা বিশেষ। দুপাশে পাঁচফুটের মতো খোলা মালামাল ওঠানামা করার জন্য।(ওরকম মালবাহী বগি ভার্সিটির ট্রেনে যুক্ত করার কোন যুক্তি আমি আজো পাইনি)

মালগাড়ীতে ধরার মতো কিছুই নেই। দুই পায়ের ব্যালেন্সই একমাত্র ভরসা। সেই ভরসায় মাঝামাঝি জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। পুরোনো লোহার জং ধরা বগি। বয়স একশো বছরের কম না। আগাগোড়া মরচে দিয়ে ঢাকা। মাথার উপরে.... পায়ের নীচে... ডানে..... বামে... শুধুই লোহা আর লোহার মরচে। এই গরমে লোহাগুলো যেন ফুটছে, আর আমাদের ফোটাচ্ছে। শহরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে কাবাব হয়ে যাই কিনা।

ট্রেন ছাড়তেই একটু হাওয়ার পরশ মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু ওই হাওয়াটাও বাইরের উত্তাপে তেতে আছে। মালগাড়ীতেও প্রচন্ড ভীড়। একজন আরেকজনের গায়ে ঠেকা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এইছোট্ট জায়গায় ছাত্রছাত্রী পঞ্চাশজনের কম হবে না। সবাই ঘামছে আর হাঁসফাস করছে। আমার অবস্থা একটু বেশীই কাহিল সেদিন। কারন আমি এমনিতেই বাকীদের তুলনায় ছোটখাট আর দাঁড়িয়েছি মাঝখানে। ওখানে বাতাস প্রবেশ করছে না। পুরো শরীর ভিজে চুপচুপে। ঘামে মাথার চুল ভিজে পানি ঝরছে।

তখনো ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। ট্রেনের সেই গরমে পুরোপুরি অভ্যস্ত হতে পারিনি। মালগাড়ীতে আগেও দুয়েকবার উঠেছি। কিন্তু আজকের মতো জঘন্য অবস্থা আর হয়নি। জান বেরিয়ে যায় অবস্থা। ইচ্ছে হচ্ছে ভীড় ঠেলে লাফ দিয়ে নেমে জীবন জ্বালা জুড়াই এই লোহার নরক থেকে। ট্রেন কতক্ষন চলেছে জানি না। হঠাৎ ঘাড়ে একটা বাতাসের পরশ লাগলো। মোলায়েম এবং অপেক্ষাকৃত শীতল। ভাবলাম বাহ্ দারুন তো। এত মানুষের ভীড় সরিয়ে কোন ফাঁকে এই সুমতির বাতাস আমার কাছে পৌঁছে গেছে।

একটু পর পেছনে তাকাতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখলাম, ওটা মোটেও প্রকৃতির হাওয়া নয়। আমার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ানো পেছনের একটা মেয়ের হাত পাখার বাতাস। মেয়েটার অজান্তেই তার বাতাসের কিছুটা আমার ভাগে চলে আসছে তার কাঁধ পার হয়ে। আমি চুপচাপ ওই অপ্রত্যাশিত বাতাস উপভোগ করে যেতে লাগলাম। সেই দোজখে ওই অচেনা মেয়েটার হাতপাখাটা আমাকে এয়ারকন্ডিশনের মতো স্বস্তি দিল।

ধড়ে যেন প্রান ফিরে এল। ভীষন ভীষন কৃতজ্ঞ বোধ করলাম মেয়েটার প্রতি। পেছনে না তাকানোর ভান করলাম। যেন অনিচ্ছায় বাতাস খাচ্ছি। কিন্তু আরো কিছু সময় পর খেয়াল করলাম বাতাসটা আগের চেয়ে একটু যেন বেশীই লাগছে। পেছন ফিরে আমি তো তাজ্জব!! মেয়েটার হাতপাখা আরো পেছনে এসে আমার ঘাড় বরাবর বাতাস দেয়া শুরু করেছে। সচেতন ভাবে সীমানা লংঘন করেছে হাতপাখাটা। শুধু তাই নয় এবারের বাতাসের প্রায় পুরোটা আমাকেই দিয়ে দিচ্ছে। মেয়েটা বোধহয় বুঝতে পেরেছে আমি বাতাসের জন্য কিরকম কাঙ্গাল হয়ে আছি। আহ কি মায়া রে। আমি চুপচাপ ওই জায়গায় দাড়িয়ে বাতাসটা দিয়ে প্রান জুড়াচ্ছি আর ভাবছি নামার আগে মেয়েটাকে অবশ্যই একটা বিশেষ ধন্যবাদ দেবো। এরকম একজন মায়াবতীর সাথে পরিচয়ের লোভও হলো।

কিন্তু না। বিধাতার ইচ্ছা ছিল না।

ট্রেনটা ষোলশহর আসতেই মেয়েটা তাড়াহুড়ো করে নেমে গেল বগি থেকে। আমার কিছু বলা হলো না, ধন্যবাদ রয়ে গেল পকেটে। "চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে............." কি এক আক্ষেপ নিয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর চলে যাওয়ার দিকে। এই চল্লিশ মিনিটের যাত্রাপথে এমন মায়াবী হাওয়া দিয়ে যে আমার প্রানটা তাজা রাখলো, তাকে কিছুই বলা হলো না, এমনকি তার চেহারাও দেখলাম না আমি।

হে অচেনা মায়াবতী, আপনার সেই হাত পাখার বাতাসকে আমি এখনো কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরন করি আজ একুশ বছর পরেও।

একটি ভেলা, একটি ঝরনা এবং একটি ভ্রমনের সারসংক্ষেপ

লোকটা কাঠুরে। পাহাড়ী বৃক্ষ থেকে জ্বালানী সংগ্রহ করার জন্য ভেলা বানিয়ে উজানে গিয়েছিল। হিমালয়ের বরফ গলা খরস্রোতা নদী। নদীতীরে বসে ভেলাটা দড়ি দিয়ে ধরে রেখে কাঠুরে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল খানিক। দিবানিদ্রার ঝিমানিতে দড়িটা কখন ফসকে গেল হাত থেকে কাঠুরে টেরই পেল না।

সেইক্ষন থেকে ভেলাটার অনিশ্চিত ভাসন্ত জীবন শুরু। দিন যায়, মাস যায়। ভেলাটি নানান আঁক বাঁক ঘুরতে ঘুরতে কোথাও স্থির হতে পারে না নির্জন পর্বত সংকুল অরন্যে। ভাসতে ভাসতে ছোট্ট একটা উচ্ছল ঝর্নাধারার সাথে মিলিত হলো একদিন। যেখান থেকে হিমালয় প্রবাহের নদীগুলোর জন্ম হয় ঠিক সেইখানে ভেলাটি আটকে ছিল একটা ঝোপের লতায়। ঝরনার আনন্দধারা স্পর্শ করলো ভেলাটিকে। তাই প্রথম সুযোগেই ভেলাটি নিজেকে নিশ্চিন্তে ভাসিয়ে দিল পাহাড়ী ঝরনার একাকীত্বে।

ভাসতে ভাসতে ঝর্নাকে সঙ্গী করে প্রকৃতির বিপুল সাম্রাজ্যকে নতুন চোখে দেখতে পেল সে। ঝর্নাধারা তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল বুনো অর্কিডের সাথে, পাথরে লেগে থাকা প্রায় অদৃশ্য সবুজ শেওলার সাথে, অচেনা ডাকের পাখীদের সাথে, ঘাসের কার্পেট বিছানো উপত্যকার সাথে।

দক্ষিন সাগর থেকে উড়ে আসা মেঘেরা যেখানে বাধা পেয়ে বৃষ্টি ঝরায় একদিন ওরা থামলো সেই খানে। অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছিল উপত্যকা জুড়ে। ধোঁয়াশা সেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ঝর্নাধারা একটা অচেনা অথচ খুব পরিচিত সুরের গান গেয়ে শোনালো তাকে। বৃষ্টি বিষন্ন ভেলাটিকে সেই গান যেন স্পর্শ করলো কোথাও। সেই সাথে বুঝতে পারলো এই আপাতঃ উচ্ছল ঝরনাটির কোথাও লুকোনো ক্ষত আছে একটা।

বৃষ্টি থামার পর আবারো পথ চলা শুরু হলে দেখলো ঝরনার বিষন্ন সুর কেটে গিয়ে তখন উজ্জল রোদ্দুর চিকমিক করছে। দেখে বোঝার উপায় নেই একটু আগে এই ঝরনাটিই করুন সুরে কি গান গেয়েছিল। দিনের পর দিন কলকল করে ঝরনা বয়ে চলে, ঝরনার গান শুনতে শুনতে বয়ে যায় ভেলাও।

পর্বতের উদ্দাম পথ চলা যখন সমতল সন্নিকটে একটু স্থিরতায় এসেছে তখন ভেলাটি ঝরনার কাছে মুখ খুললো, নিজের বহু পুরোনো লুকোনো এক ক্ষতকে উন্মুক্ত করলো ঝরনার কাছে। বেড়ে ওঠার কালে কোন এক আঘাতে তার প্রান বিলুপ্ত হবার পূর্বে সেও ছিল একটা পত্র পল্লবিত সবুজ বৃক্ষ। সেটাই তার আসল পরিচয়। ভেলাটির বর্তমানের পরিচয়হীনতার বেদনা, স্থানচ্যুত হবার বেদনা ঝরনাকে প্রবলভাবে স্পর্শ করলো।

ঝরনা পরম আদরে আশ্রয় দিল ভেলা এবং তার সকল বেদনাকে। একদিন ঝরনারও মুখ খুললো, জানা গেল তারও আছে অজানা বেদনার ইতিহাস। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ভেলাটি আবিষ্কার করলো ঝরনার বেদনা যেন তার চেয়ে অনেক অনেক গুন বেশী। ঝরনাটি যেই ফল্গু ধারার সাথে বয়ে যাচ্ছিল, এক আকস্মিক ভুমি ধ্বস এসে রূদ্ধ করে দিয়েছিল তার অগ্রযাত্রা। প্রানবন্ত ধারাটিকে মাঝ পথে হারিয়ে ফেলে দিশেহারা মুমূর্ষু হয়ে পড়ে ছিল ঝরনাটি। ঠিক সেই সময়ে ভেলাটিও এসে আটকে গিয়েছিল ঝরনার কাছাকাছি লতাঝোপে।

নতুন মেঘের বৃষ্টিতে যখন ঝরনার বুকে স্রোতের জন্ম হলো, তখন ঝরনাটি প্রান পেল, প্রান পেয়ে প্রথম চোখ মেলে দেখলো ভেলাটিকে। নিঃসঙ্গতা কাটাতে ভেলাকেই তার সব গান শুনিয়ে যায় ঝরনা। ভেলাটিও এতদিন পর পথ চলার আনন্দ পেল। দুজনের একসাথে পথ চলা সেই থেকে শুরু। গন্তব্য অনিশ্চিত জেনেও পথ চলা থামে না। কারন এ ভ্রমন কেবলই ভ্রমন। এ ভ্রমনের কোন গন্তব্য নেই, আছে কেবল আনন্দ।