Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

Monday, November 21, 2016

শীতকাল কবে আসবে সুপর্না

রূপকথার রাজকন্যা -তুমি কোথায় থাকো, কোন সে সুদূর অন্তহীনের ওইপারে?
তোমাদের চির সবুজের রাজ্যটিতে কখনো শীতকাল আসেনা সুপর্না?

তোমাদের সবুজ দেশে কি শুধুই গান, শুধুই আনন্দ? কানাকানি, হানাহানি, রাজনীতি, কুটনীতি নেই, বিষাদ মলিনতার দুষণ নেই? কী নাম তোমার দেশের?

আমি তোমাকে চিনি না। কিন্তু মনে পড়ে যায় সুদূর দিনের একটি বিকেলের কথা।

সেই বিকেলে ‘যদি কাগজে লিখো নাম…’ গানটা বাজছিল ক্যাসেট প্লেয়ারে। মান্না দের সুরেলা কন্ঠস্বর আমাদের মুগ্ধ করছিল। আমরা সবাই তখন পারমিতাদের বাসায় জড়ো হয়েছি। পারমিতার ক্যাসেট প্লেয়ারে ওই গানটা বাজছিল। সেদিন সজল বিদেশে চলে যাচ্ছিল। বিদায় অনুষ্ঠানে বিষন্ন সঙ্গীত। কিন্তু আমরা সবাই আনন্দে ভাসছিলাম। বাসায় আত্মীয় স্বজন সবাই আছে। কিন্তু গানটা তিনজন মানুষকে লক্ষ্য করে বাজছিল। সজল, পারমিতা, আমি। সজল গানটার শুনে আমাকে ইঙ্গিত করছিল পারমিতার দিকে। আমি হাসছিলাম। কয়েকদিন আগে সে আমাকে জানিয়েছে পারমিতার প্রতি তার মুগ্ধতার কথা। সে ফিরে এসে পারমিতাকে বিয়ে করবে এমন ইঙ্গিতও দিয়েছিল। বলছিল পারমিতারও সম্মতি আছে তাতে। আমি পারমিতাকে লক্ষ্য করছিলাম। কোনোরকম পরিবর্তন দেখা যায় কিনা চেহারায়। কিন্তু পারমিতা যথারীতি আমার পাশে পাশে ঘুরছে। আমি এক ফাঁকে পারমিতাকে লক্ষ্য করে গানটার অর্থবোধক একটা ইঙ্গিত করলাম যেখানে সজলের সাথে ওর সম্পর্কের কথাটা বোঝা যায়। শুনে পারমিতা আমার দিকে কটমট করে তাকালো। সেই দৃষ্টি আমাকে বলে দিল সজলের প্রতি ওর মোটেও আগ্রহ নেই। ওর সকল মনোযোগ আমার দিকে। সজল যদি ওটা জানতে পারে তাহলে কষ্ট পাবে। তাই আমি সজলের পক্ষে সায় দিয়ে গেলাম। অভয় দিলাম, সে নিশ্চয়ই ফিরে এসে ওকে বিয়ে করবে। তাদের প্রেমের সাফল্য কামনা করলাম। পারমিতা আমাকে বারবার ইঙ্গিত করছিল ওর কাছে যাওয়ার জন্য। আমি সেটা এড়িয়ে থাকলাম। এই সময়ে সজলকে আমি কষ্ট দিতে পারি না। সজল জানে পারমিতা ওকেই ভালোবাসে। সজল গানটা আবারো বাজাতে দিল। পারমিতা সেটা নিয়ে খানিক বিরক্ত চেহারা দেখেই অনুমান করলাম। কিন্তু কিছু বললাম না। আমার তখন এমন অবস্থা আমি পারমিতার প্রেমে হাবুডুবু খেতে পারি না। আমাদের পারিবারিক সম্পর্কটা তেল আর জলের মতো। মুখে কিছু না বললেও পারমিতা সেই দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য আকুল। গত কয়েক বছর ধরে সেটা টের পাচ্ছিলাম। গ্রামে গেলেই বেশি বোঝা যেতো। বাধানিষেধ থাকতো না কাছাকাছি থাকতে। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ২য় বর্ষে। পারমিতা এসএসসি দিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে বোধহয়। ওর ১৮ আমার ২১। সে বছরই আমার সবচেয়ে কাছাকাছি এসে গিয়েছিল সে। আমরা মুখফুটে কিছু বলিনি কিন্তু দুজনই জানি সত্যিটা। সত্যিটা প্রকাশ হবার জন্য উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায়। মান্না দের গানটা সবার অলক্ষ্যে আমাদের দুজনকে আলোড়িত করছিল সেই বিকেলে। বিকেলটা আমি কখনো ভুলবো না।

কিন্তু পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে কত কিছু ঘটে গেল। আমরা কে কোথায় ছিটকে চলে গেলাম। পারমিতার বিয়ে হয়ে গেল। সজল বিদেশ থেকে বিচ্যুত হয়ে দেশে ফিরে এলো। আমি চলে গেলাম বিপরীত পথে। আমাদের কারো জীবন কারো জীবনের সাথে যুক্ত থাকলো না। জীবনটা এরকমই। কিছু কিছু মুহূর্তে স্বপ্ন হয়েই স্মৃতির সাথে লেপ্টে থাকে। মান্না দে আমাদের তিনজনের জীবনে পাথরের স্মৃতি হয়ে থাকলো। সাথে সেই বিকেল।
------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা,
আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব –
প্রতি সন্ধ্যায় কে যেন
ইয়ার্কি করে ব্যাঙের রক্ত
ঢুকিয়ে দেয় আমার শরীরে –
আমি চুপ করে বসে থাকি –
অন্ধকারে নীল ফানুস উড়িয়ে দেয় কারা,
সারারাত বাজি পোড়ায়
হৈ-হল্লা – তারপর হঠাত্
সব মোমবাতি ভোজবাজির
মতো নিবে যায় একসঙ্গে –
উত্সবের দিন হাওয়ার
মতো অন্যদিকে ছুটে যায়,
বাঁশির শব্দ আর কানে আসে না –
তখন জল দেখলেই লাফ
দিতে ইচ্ছে করে আমার
মনে হয় – জলের ভেতর – শরীর ডুবিয়ে
মুখ উঁচু করে নিশ্বাস নিই সারাক্ষণ–

ভালো লাগে না সুপর্ণা,
আমি মানুষের মতো না, আলো না, স্বপ্ন না –
পায়ের পাতা আমার
চওড়া হয়ে আসছে ক্রমশ –
ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শুনলেই
বুক কাঁপে, তড়বড়ে নিশ্বাস ফেলি,
ঘড়ির কাঁটা আঙ্গুল দিয়ে এগিয়ে দিই প্রতিদিন –
আমার ভালো লাগে না
শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা,
আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব!
একবার ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই মেঘ
ঝুঁকে থাকতে দেখেছিলাম জানলার
কাছে –
চারিদিকে অন্ধকার
নিজের হাতের নখও স্পষ্ট দেখা যচ্ছিল
না সেদিন –
সেইদিন তোমার কথা মনে পড়তেই
আমি কেঁদে ফেলেছিলাম –
চুলে দেশলাই জ্বালিয়ে চুল পোড়ার
গন্ধে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম
আবার -এখন আমি মানুষের মতো না –
রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে
হঠাত্ এখন লাফ দিতে ইচ্ছে করে আমার
– ভালোবাসার কাছে, দীর্ঘ তিনমাস
আর মাথা নিচু
করে বসে থাকতে ভালো লাগে না –
আমি মানুষের পায়ের শব্দ শুনলেই
তড়বড়ে নিশ্বাস ফেলি এখন – যে-দিক
দিয়ে আসি, সে-দিকেই দৌড় দিই
কেন এই দৌড়ে যাওয়া?
আমার ভালো লাগে না
শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা,
আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব ।।
____________________________________________________________________

কবিতা: ভাস্কর চক্রবর্তী - শীতকাল কবে আসবে সুপর্না


Wednesday, January 29, 2014

অবিশ্বাসের বীজতলা

ফরহাদ ভাইকে প্রত্যাখ্যান করা আমার জন্য বেদনাদায়ক। কিন্তু না করে উপায় ছিল না। বিপদগ্রস্থ মানুষকে সাহায্য করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। তাছাড়া ফরহাদ ভাই আমার খুব পছন্দের মানুষ ছিলেন।

আমাদের কোম্পানীতে চাকরী করতেন অনেক বছর আগে। এখান থেকে যাবার পর ভালো ভালো জায়গায় চাকরী বাকরী করে বেড়িয়েছেন, প্রচুর টাকা কামিয়েছেন। ভালো আছেন বলে শুনেছি। গত পনের বছর কোন যোগাযোগই ছিল না।


পনের বছর পর হঠাৎ মাস দুয়েক আগে তিনি উদয় হলেন অফিসে। আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরলেন। আমিও আপ্লুত হলাম। কুশলাদি জিজ্ঞেস করলাম। তিনি এখন একটা নামকরা কোম্পানীর ডিরেক্টর। কার্ড দিলেন আমাকে। বললাম যোগাযোগ রাখতে। ফোন নাম্বার দিলাম। রাতে ডিনার করতে বললাম কোথাও বসে। কিন্তু তিনি খুব ব্যস্ত তাই পারবেন না। পরে কথা বলবেন এবং যাবার সময় জানাবেন বললেন। বললেন ঠিক, কিন্তু  চলে গেছেন কিছু না বলে। অবাক হলাম। আগে কখনো এমন করতেন না। এরপর আর কোন যোগাযোগই করলেন না। ভাবলাম ব্যস্ত মানুষ হয়তো। ওনার সম্পর্কে পনের বছর আগের বিশেষ একটা কথা মনে পড়তে গিয়েও পড়লো না।

দুমাস পর আজ দুপুরে কোনরকম হঠাৎ করে এসে হাজির আবারো। এসেই আমাদের পাঁচজনকে ডাকলেন। আমরা যারা তাঁর পুরোনো সহকর্মী। তিনি খুব বিপদে পড়েছেন। একটা কাজে পাঁচ লাখ টাকা লাগছে। সাড়ে চার লাখ যোগাড় হয়েছে। বাকী মাত্র পঞ্চাশ হাজার। একজনের পক্ষে হয়তো সম্ভব না তাই তিনি আমাদের পাঁচ জনের কাছে চাইতে এসেছেন। টাকাটা আজকেই লাগবে। নইলে তার খুব অসম্মান হয়ে যাবে।


আমরা ভাবনায় পড়লাম। এত টাকা হাতে নেই। মাসের শেষদিক এখন। ওনাকে বললাম একটু সময় দেন দুয়েকদিন। কিন্তু ওনার হাতে সময় নেই। এখুনি দিতে হবে। কালকে দিলেও হবে না। কিন্তু কেউ পকেটে করে অত টাকা নিয়ে ঘোরে না। মাসের বিশ তারিখ পার হবার পর হাত এমনিতে টানাটানিতে থাকে। তবু কোথাও থেকে ধার করে দেয়া যায় কি?


ভাবছিলাম আমি। ভাবছিল অন্যরাও। আমরা সবাই ফরহাদ ভাইকে পছন্দ করি। ওনার ব্যক্তিত্বই সেরকম আকর্ষণীয়। দশ মিনিটের কথা দিয়ে তিনি দশ বছরের মতো ঘনিষ্টতা তৈরী করে ফেলতে পারেন। কিন্তু সেই ফরহাদ ভাইকে সাহায্য করতে আমাদের সবার কেমন একটু দ্বিধা যেন। পকেট সামর্থ্য না থাকলেও ধার করে কি দিতে পারি না? তিনিও তার ইঙ্গিত দিলেন। কারো কাছ থেকে ধার করে দাও। 

এবার মনে হয় সবারই মনে পড়ে গেল ফরহাদ ভাই সম্পর্কে পনের বছর আগের ধারণাটা। 


প্রথম ঘটনাটা আমাদের সাথে তার প্রথম পরিচয়ের দু'বছরের মধ্যে।  আমাদের অফিসে যোগ দেবার পরপর জানতে পারি তাঁর স্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তাঁর পাঁচ বছর বয়সী কন্যাটি ঢাকায় নানাবাড়িতে থাকে। তিনি স্ত্রীর শোকে ঢাকা শহর ছেড়ে চট্টগ্রাম চলে এসেছেন। বউয়ের স্মৃতিগুলো তাঁকে খুব বেদনার্ত করে বলে ঢাকা তাঁর সহ্য হয় না।

শুনে আমরাও খুব ব্যথিত হয়েছিলাম। সহমর্মী হয়ে তাকে নিয়মিত সঙ্গ দিতাম। তিনি মৃত স্ত্রীর স্মৃতিচারণ করতে পছন্দ করতেন। তাদের মধ্যে কতটা প্রেম ছিল, কতটা ভালোবাসা ছিল, কতটা কেয়ার নিত তাঁকে সেসব বলতেন আমাদের। ওরকম একটা কেয়ারিং সংসারের জন্য আমাদের খুব লোভ হতো। আমরা কেউ তখন বিয়ে করিনি। 


কিছুদিন পর তিনি চাকরী ছেড়ে চলে গেলেন। নতুন জায়গায় বাসা নিলেন। তবু আমাদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত ছিল ওনার আন্তরিকতার কারণে। একদিন আমরা ফরহাদ ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে গেলাম। গিয়ে দেখি ব্যাপক খানাপিনার আয়োজন। বললেন, ওনার কন্যা ঢাকা থেকে বেড়াতে এসেছে, সেই উপলক্ষে খাওয়াদাওয়া।

আমরা তাঁর ফুটফুটে কন্যা সঞ্চিতাকে দেখে মুগ্ধ। কী সুন্দর করে কথা বলে মেয়েটা!  

কিন্তু আমাদের মুগ্ধতাকে ছাড়িয়ে ভেতরের ঘর থেকে নিঃশব্দে যে মুর্তিমান বিস্ময়টি উপস্থিত হলেন, তিনি সঞ্চিতার মা, ফরহাদ ভাইয়ের স্ত্রী।  

ফরহাদ ভাই আজব মানুষ। একটুও বিব্রতবোধ না করে বললেন, এই হলো আমার স্ত্রী অপলা, সঞ্চিতার মা, যার কথা শুনেছো তোমরা। ঢাকা থেকে বেড়াতে এসেছে আজ।


আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে না পড়লেও বিস্ময়ে থ হয়ে গিয়েছিলাম কয়েক মিনিট।  যথাসম্ভব বিস্ময় চেপে রেখে পরিচিত হলাম ভাবীর সাথে। মৃত মানুষ কিভাবে জীবিত হলো সেই প্রশ্নটা মাথায় ঠোক্কর খেতে খেতেই সৌজন্য বিনিময় শেষ হলো।  ভাবী ভেতরে চলে গেলে ফরহাদ ভাই বললেন, অপলা দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ছিল দীর্ঘকাল। পঙ্গুত্বের হাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে। এখনো ধকল কাটিয়ে ওঠেনি।

আমরা কিছুতে কোন হিসেব মেলাতে পারলাম না। এসবের মানে কি? নিজের স্ত্রীকে নিয়ে কেন এই মিথ্যে। আমাদেরকে আসল কথাটা আগে বললে কি সমস্যা ছিল? কিন্তু কোন ব্যাখ্যা নেই। আমরাও ওনাকে বিব্রত করি না।


কিছুদিন পর এক সন্ধ্যায় তিনি হঠাৎ বিপদে পড়ে আমার কাছে এলেন। বললেন কিছু টাকা লাগবে। আমার কাছে বেশী টাকা ছিল না। দেড় হাজার টাকা দিলাম। কিন্তু এরকম 'হঠাৎ বিপদ' ওনার প্রায়ই হতে থাকলো। অন্যন্য কলিগের কাছ থেকেও তিনি টাকাকড়ি ধার করতে থাকলেন।  যেহেতু উনি নিজেও মানুষের আপদ বিপদে সাহায্য করেন, তাই ওনার এসব হঠাৎ বিপদে আমরা টাকা পয়সা দিতে দ্বিধা করতাম না।  কিন্তু টাকা ফেরত পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

আরেকবার বিপদের স্কেল বাড়িয়ে এক সিনিয়র কলিগের বিশ হাজার টাকা নিলেন দুদিনে ফেরত দেবেন বলে। দুদিনের কথা বলে নিলেও দুমাসেও দেবার নাম নেই। ছমাসে অনেক ঝামেলা করে অর্ধেক উদ্ধার করতে পেরেছিল সেই কলিগ। কিছুদিন পর ফরহাদ ভাই চট্টগ্রাম থেকে পাট চুকিয়ে ঢাকায় চলে যান। কেউ ঠিকানা জানতো না।


আজ এত বছর পর আবারো ওনার 'হঠাৎ বিপদ। এই বিপদ আসল কি নকল জানার কি উপায় আছে কারো? ওনার ঠিকানাও কেউ জানি না।

আগেই বলেছি ফরহাদ ভাইয়ের এমন একটা ব্যক্তিত্ব আছে, যার ফলে ওনার দোষ ত্রুটি জানা সত্ত্বেও ওনাকে খুব বেশী অপছন্দ করতে পারেনা কেউ। দেখা যায় অনেক দোষই আমরা লঘু চোখে দেখি। ফলে জিতে যায় পছন্দ। পছন্দ করি ঠিক কিন্তু বিশ্বাসটা করতেই দ্বিধা। 

সবশেষে পছন্দ আর অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বে ফরহাদ ভাইকে আমরা বিনয়ের সাথে অক্ষমতা জানিয়ে দিলাম। বিমর্ষমুখে ফরহাদ ভাই চলে গেলেন। 

ফরহাদ ভাই চলে যাবার পর আমরা পাঁচজন বসলাম।

যুক্তিগুলো আমরা এভাবেই সাজালাম। এখানে আসার আগে উনি আগে একটা ফোনও করলেন না। সরাসরি এসে টাকা চেয়ে বসলেন। এ কেমন কথা?  তাছাড়া আমাদের মতো চাকরীজীবিদের হাতে এত টাকা নগদে থাকে না এটা উনি জানেন না বলেও অবাক লাগলো। এমনকি ঢাকা থেকে ছুটে আসার আগে একটা টেলিফোনও করেননি উনি এরকম একটা বিপদে পড়েছেন। ঢাকা থেকে আমাদের কাছে ছুটে এসেছেন শুধু এই টাকার জন্য? কেমন যেন হিসেব মিলছে না।

আসলে পনের বছর আগের অবিশ্বাসের বীজটা এতদিন সুপ্ত ছিল। আজ তার এই নতুন বিপদ যেন সেই অবিশ্বাসের বীজের অংকুরোদগোম ঘটাতে শুরু করলো। 

ফিরিয়ে দেবার পর আমার একটু কষ্টবোধ হতে থাকে, ঘটনা যদি সত্যি হয়? যদি সত্যিই বিপদে পড়ে থাকেন?
আমি ফরহাদ ভাইয়ের কার্ড খুজে বের করি, মোবাইল নম্বরটা দেখে দেখে ডায়াল করি। যান্ত্রিক একটা কন্ঠ তখন ওই প্রান্ত থেকে জানান দিল - 'এই নম্বরটি বর্তমানে আর ব্যবহৃত হচ্ছে না। অনুগ্রহপূর্বক.....।'
ফোন নম্বরটিও কি ভুল দিলেন?

Wednesday, September 26, 2012

আন্তর্জালিক আচ্ছন্নতা

শাহানা পাশ ফিরে শুয়ে আছে।

বিরক্ত লাগছে তার। রাকিবকে নাকি নিজেকে নাকি.........। বুঝতে পারছে না। রাকিব আজ রাতে আর কথা বলবে না। কাল সকালে উঠে নাস্তা না করে অফিসে চলে যাবে। শৈলিকে স্কুলে দিয়ে এসে শাহানার সারাটা দিন বিষবিষ লাগবে। এই বিষ তার নিজেরই সৃষ্টি। রাকিবকে ওভাবে প্রত্যাখ্যান না করলেও চলতো। কখনো করেনি। বিয়ের পর এই প্রথম। দশ বছরের মাত্র একবার প্রত্যাখ্যান করেছে তাতেই রাকিব ওরকম রিএক্ট করলো! অথচ রাকিব ওকে কতো বার, অগুনতি সময় প্রত্যাখ্যান করেছে। যখন রাকিবের ইচ্ছে করে তখনই হয়। শাহানার কিছু বলার নাই। এটা মেনেই শাহানা এতগুলো বছর কাটিয়েছে ওর সাথে। আশ্চর্য! নারী বলে তার কোন মত নেই? নিষিদ্ধ চার পাচদিন বাদে বাকী দিনগুলোতে সে স্বামীর ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য? এমনকি জ্বর শরীরেও শাহানা সয়ে গেছে। স্বামীর চাহিদা মেটানো অতি আবশ্যক- এই শর্ত বিয়ের কোন কাগজে লেখা ছিল! এসব কি কাউকে বলা যায়?

রাকিবের নাক ডাকার শব্দ আসছে না এখনো। তার মানে সে ঘুমায়নি এখনো। রেগে ফুলে আছে। যখন রেগে ফুলে থাকে তখন সে মটকা মেরে পড়ে থাকে, ঘুমায় না। ঘুমালে নাক ডাকার শব্দ পাওয়া যায়। সেই শব্দ পাওয়ার পরই শাহানার ঘুম আসে। আজ রাতে শাহানারও ঘুম আসবে না। দুজনেই হয়তো সারারাত নিঃশব্দে জেগে থাকবে। খুব অস্বস্তি হচ্ছে শাহানার। রাকিবের জন্য এটা খুব বড় একটা শক। এই প্রথম রাকিব গায়ে হাত দেয়ামাত্র ঝটকা মেরে হাতটা সরিয়ে দিয়ে চুড়ান্ত বিরক্তি প্রকাশ করেছে শাহানা। শব্দ দুটোর জন্যও এখন শাহানা মনে মনে লজ্জিত।

কিন্তু কি করবে। সে একটা নিষিদ্ধ কাজ করে ফেলেছে আজ। শহীদ ভাইয়ের সাথে একমাস আগে নতুন করে পরিচয় হবার সময়ও কল্পনা করেনি এমন কিছু।
শাহানার বাবা রেলওয়েতে চাকরী করার সময় ওদের পাশের টিলায় শহীদ ভাইদের বাংলো ছিল। শহীদ ভাইয়ের বাবাও রেলওয়েতে চাকরী করতেন। ছেলেবেলায় শাহানা আর শহীদ পাশাপাশি বড় হলেও কেউ কারো সাথে তেমন কথাবার্তা বলতো না। শহীদ ছিল একটু মুখচোরা।  শাহানা ইন্টার পাশ করার পরপর শহীদের বাবা বদলী হয়ে ঢাকা চলে যায়। শাহানার কিছু মনেই নাই ওদের কথা। কিন্তু সেদিন ফেসবুকে একটা ফ্রেণ্ড রিকুয়েষ্ট এলো। শরীফুল ইসলাম। নামটা অচেনা। তবে তিনজন মিচুয়াল ফ্রেণ্ড দেখা যাচ্ছে। ওই তিনজন আবার ওর ঘনিষ্ট বন্ধুদের অন্যতম। তাই দ্বিধা না করে শাহানা গ্রহন করে নিল বন্ধু তালিকায়। ওমা, সাথে সাথে মেসেজ চলে আসলো এর কাছে। দীর্ঘ একটা মেসেজ। শাহানা অবাক। সে এরকম কারো কাছ থেকে মেসেজ আশা করেনি। চেনা কেউ না এমনকি আধচেনাও না। কিন্তু চিঠির শেষে নামটা দেখে চমকে উঠলো। শহীদ। তার মানে শহীদ ভাই! যার সাথে কোনদিন কথাও বলেনি। সে এত বড় একটা চিঠি লিখে বসেছে? তার বুকটা কেমন একটু কেঁপে উঠলো। আনন্দ নাকি ভয় বুঝতে পারলো না। ১৫ বছর আগের কথা!

রাকিব আছে বাসায়। সে দেখলে কি মনে করবে? শাহানার কোন প্রাইভেসী নেই রাকিবের কাছে। রাকিবই ওর প্রায় সব মেসেজের উত্তর লিখে দিত। কারণ শাহানা কম্পিউটারে কাঁচা। আজকাল কিছু কিছু  শিখে উঠেছে। তবু সে রাকিবকেই ডাক দেয় কিছু লিখতে পড়তে। ফলে ওর সব বন্ধবান্ধবের খোঁজ জানে রাকিব। কখনো কোন সংকোচ লাগেনি ওর কাছে। রাকিবই ওর জীবনের সব, ওর কাছে গোপন রাখার মতো কিছু থাকতে পারে কোনদিন ভাবেনি। কিন্তু আজকের এই মেসেজটা তাকে উলটপালট করে দিল। এটা রাকিবকে দেখানোই যাবে না। রাকিব এসে দেখে ফেলবে ভয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করে দিল ঝট করে।

রাতে ঘুম হলো না সেদিন। সারারাত চিঠির অক্ষরগুলো চোখের সামনে ভেসেছে। এটা কি লিখলো শহীদভাই এতদিন পর। তিনি নিজে বিবাহিত, একটা ছেলে আছে পাচ বছরের। শাহানাও বিবাহিতা, তারও আট বছরের মেয়ে আছে একটা। দুজনেই সুখী সংসার করছিল। এত বছর পর হঠাৎ এটা কি শোনালো শহীদ ভাই। যে মানুষ কোনদিন চোখ তুলেও তাকায়নি সে মানুষ তাকে এতকাল ধরে পাগলের মতো ভালোবাসছে, এমনকি বিয়ের পরও তার কথা একদণ্ড ভোলেনি! শাহানার বিয়ের খবর পেয়ে উনি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। এসব কিছুই জানে না শাহানা! সে এমন কোন আহামরি সুন্দরী না। কেউ তাকে কখনো প্রেমের ঈঙ্গিতও দেয়নি জীবনে। যার সাথে বিয়ে হয়েছে তার সাথেই সবকিছু। রাকিব ছাড়া কার কাউকে ভাবতে পারতো না সে। কিন্তু সেদিন শহীদ ভাইয়ের চিঠি পেয়ে তার বুকের ভেতর ভাংচুর শুরু হয়েছিল।

পরদিন রাকিব অফিসে গেলে শাহানা নেট খুলে ফেসবুকে ঢুকলো। ভেবেছিল সে যৌক্তিক একটা চিঠি লিখবে। কিন্তু লেখা শেষ করে সে নিজেই চমকে গেল। এসব কি লিখেছে সে। শহীদ ভাইয়ের চেয়ে তার অবস্থাও খুব বেশী ভালো না। সে কখন শহীদভাইয়ের প্রেমে পড়ে গেছে। এই চিঠি পেয়ে নাকি ১৫ বছর আগে? শাহানা জানে না। সে কেবল জানে এই লোকটা তাকে টানছে খুব। সেদিন থেকে নেশা হয়ে গেছে তার। প্রতিদিন শহীদ ভাইয়ের সাথে চিঠি চালাচালি। দুরুদুরু বুকে। চিঠি থেকে চ্যাট শুরু। ঘন্টার পর ঘন্টা চ্যাট। ঘরের কাজ মাথায় উঠলো। রাকিব ঘরে ফিরলে আগের মতো ছুটে যায় না দরোজা খুলতে। কাজের মেয়েটা দরোজা খুলে দেয়। রাকিব এসে দেখে শাহানা বিছানায় শুয়ে আছে বাতি নিবিয়ে। শরীর খারাপ? কপালে হাত রাখে রাকিব। সে বলে মাথাটা ধরেছে। রাকিব বলে দাড়াও আমি টিপে দিচ্ছি বাম লাগিয়ে। সে তাড়াতাড়ি উঠে বসে। আগে এই জিনিস প্রিয় ছিল তার। রাকিব ওর কপাল টিপে দিলে সে আরামে ঘুমিয়ে পড়তো। কিন্তু আজকাল তার সামান্য স্পর্শও বিরক্ত লাগে।

আজ দুপুরে শহীদভাইয়ের সাথে কথা বলতে বলতে কেমন আচ্ছন্নতা চলে আসলো। শহীদভাই হঠাৎ ওকে বলে বসলো, তোমাকে একটা চুমু খেতে ইচ্ছে করছে শানু। এই কথা শুনে ওর সমস্ত শরীরে যেন বিদ্যুত বয়ে গেল। এত বছরের বিবাহিত শরীরটা যেন নিমেষে কুমারীত্বে চলে গেল, সে যেন হয়ে উঠলো নবীন অনভিজ্ঞ ষোড়শী তরুণী। চুপ করে থাকলো। শহীদভাই মৌনতাকে সম্মতি ধরে চ্যাটের মধ্যেই ভার্চুয়াল চুমু খেল তাকে। সে তখনো চুপ। তার সমস্ত শরীরের রক্তচলাচল বন্ধ হয়ে গেছে যেন। শহীদভাই তাকে জড়িয়ে ধরে আদর খেতে শুরু করলো। এমন করে আদর করছে যেন সে তার পাশে বসে আছে। একই ঘরে। সে নিজেকে সম্পূর্ন সমর্পন করে দিল শহীদভাইয়ের কাছে। সমস্ত শরীর জুড়ে অবিরাম রিনিঝিনি সুখ। শহীদ ভাই একটু থামতে সে বলে উঠলো, থামবেননা প্লীজ! এরপর যা ঘটলো তা ভাষায় প্রকাশের যোগ্য নয়। আনন্দের তুঙ্গে উঠে গেল দুজনে চরম উত্তেজনায়। শাহানা এক পর্যায়ে বলে দিল আজ থেকে তার শরীরটা শহীদের। আর কেউ এটা স্পর্শ করতে পারবে না। এরকম একটা পাগলামি সিদ্ধান্ত শুনে শহীদও চমকে গেল। কিন্তু শাহানা অনড়। সে সমাজ সংসার সব কিছু অস্বীকার করে শহীদকে পেতে চাইল। বাস্তবে সম্ভব না, তাই ভার্চুয়ালী সে আজ থেকে শহীদের বউ হয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিল।

দুপুরের সেই আদর সেশানের পর শাহানা অন্য মানুষ হয়ে গেল। সংসারের সবকিছু তার অসহ্য লাগলো। এমনকি শৈলী কি খেল না খেল সেটাও জিজ্ঞেস করলো না। রাতে রাকিব অফিস থেকে ফিরলে সে বাতি নিভিয়ে শুয়ে থাকলো। রাতে কিছু খেতে পারলো না।

রাকিবের সাথে বিয়ে হবার পর কখনো একমাস বিরতি দেয়নি ওরা। প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত হতো ওদের। একদম নিয়ম করে। মাঝে মাঝে বেশীও। কিন্তু শহীদের সাথে পরিচয় হবার পর একবারো সে রাকিবের সাথে করেনি। রাকিব খুব বেশী আগ্রাসী না। শাহানা না এগোলে সে এগোয় না। সবসময় শাহানাকেই শুরু করতে হয়। এই একমাস শাহানা একবারও আগায়নি। তবু রাকিব মাঝে মাঝে গায়ে হাত দিয়েছে। স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে আদর দিয়েছে, কিন্তু শাহানা সাড়া দেয়নি বলে কিছু হয়নি। রাকিব হতাশ হয়ে ঘুমিয়ে গেছে প্রতিবারই। কেবল আজ রাতে রাকিব কেমন আগ্রাসী হয়ে তার উপর চড়াও হয়েছিল। জোর করে আদর করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে শাহানার প্রিয় একটা জায়গায় আদর দিলে সে জেগে ওঠে, সেখানে সে স্পর্শ করতেই শাহানা কটুবাক্যে তাকে ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিল। রাকিব আর জোর করেনি, আলগোছে বিছানার ওপাশে সরে গিয়ে শুয়ে পড়েছে।

শাহানার মনে একটা পাপবোধ জাগছে। কিন্তু লোভও ছাড়ছে না। ভালোবাসার লোভ। এমন করে ভালোবাসার কথা শোনেনি সে। রাকিব ছাড়া আর কোন পুরুষের কথা সে জানতো না। পুরুষেরা যে নাটক সিনেমার চেয়েও বাস্তবে অনেক বেশী ভালোবাসার কথা বলতে পারে এটা তার ধারণা ছিল না। সে একটা নতুন জীবন পেয়েছে গত একমাসে। শহীদভাই তার নতুন একটা জগত হয়ে দাড়িয়েছে। যে জগতে আর কেউ নেই। সে আর শহীদ। তারা নিজ নিজ সংসারে থেকেও এই নতুন জগতে স্বামীস্ত্রী হিসেবে থাকবে। শহীদভাই তাকে আজীবন আগলে রাখবে বলে কথা দিয়েছে। কোন সংসারের ক্ষতি না করে দুজন দুজনকে আজীবন ভালোবাসবে।

সকালে নাস্তা না করে অফিসে চলে গেল রাকিব। দুজনের মধ্যে কোন কথা হলো না। শাহানা ঠিক করলো ওর সাথে জীবনেও কথা বলবে না। যদি সে নিজ থেকে এসে কথা না বলে। অকেজো পুরুষ। তার সমস্ত জীবনটাকে একঘেয়ে করে দিয়েছিল। গত এক দশক কি ভয়াবহ বঞ্চনা নিয়ে সময় কাটিয়েছে! যদি শহীদভাইয়ের সাথে বিয়ে হতো তার! ভেবে শিহরিত হয়ে উঠলো আবার। আজ আসবে শহীদভাই? আজকে কিরকম আদর করবে? আজকে ওয়েবক্যাম খুলবে ওরা। কালকে সেভাবেই কথা হয়েছিল। গতকালই খুলতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রথমদিন বলে কেমন লজ্জা গ্রাস করেছিল। আজকে কাজের মেয়েটাকে ছুটি দিয়ে দিল। শৈলী স্কুলে। ফিরতে চারটা। তার আগ পর্যন্ত ওরা দুজন একা। একান্ত সময়। অসহ্য সুখের প্রতীক্ষায় শাহানা। একটা বাজতেই নেট খুলে বসলো। শহীদ এখনো আসেনি। কি করছে এতক্ষণ। আসছে না কেন? অস্থির হয়ে উঠলো সে। অবশেষে অনলাইন দেখালো শহীদকে-

-কী ব্যাপার এত দেরী কেন?
-দেরী কই, মাত্র দশমিনিট
-প্রতীক্ষার দশমিনিটও অনেক দীর্ঘ, জানো না?
-জানি সোনা! আর কখনো হবে না এমন
-এখন ক্যাম খোলো তোমার চাঁদমুখটা দেখি
-আগে তুমি খোলো
-না তুমি
-তুমি
-তুমি
-একটা দুঃসংবাদ আছে।
-কি
-তোমার ভাবী চলে এসেছে ছুটি সংক্ষিপ্ত করে গতরাতে।
-আশ্চর্য। তার না আরো তিনদিন থাকার কথা ছিল?
-তাই তো ছিল। কিন্তু গতকাল নাকি তার খুব খারাপ লাগছিল আমার জন্য। তাই চলে এলো
-এখন কোথায়। এখন গেছে ছেলেকে স্কুল থেকে আনতে,
-সর্বনাশ!
-আসতে আরো ঘন্টাখানেক আছে, ততক্ষণ আমরা কথা বলি
-শুধু কথা?
-আজ আর কিছু হবে না
-সব শেষ একদিনেই?
-তা কেন, কিন্তু বোঝোই তো, প্রতিদিন সমান যায় না
-কেন কালকে বউ এসে সব প্রেম পুষিয়ে দিল নাকি?
-আরে না, বউয়ের অত প্রেম কই। তোমার কাছেই সব
-রাতে বউয়ের সাথে প্রেম হয় নাই? এতদিন পর পেলেন
-না, এই আর কি
-এই আর কি, খুলে বলেন
-তেমন কিছু না, ও নিয়মিত রুটিন কাজের মতো
-মানে, হয়েছে
-একবার
-বুঝেছি।
-কি বুঝেছ
-পুরুষের প্রেম
-কেন পুরুষ প্রেম করতে জানে না?
-জানবে না কেন। তার প্রেমের ধরনধারন সব আলাদা। দিনে একজন, রাতে অন্যজন। প্রেমের ছড়াছড়ি পুরুষজীবনে।
-ছি তুমি এসব কি বলছো, তোমার সাথে কি ওর তুলনা হয়?
-আমার সাথে তুলনা নাই। আমি কে? একবেলার আনন্দসামগ্রী। হিহিহিহি.......
-তুমি ভুল বোঝো না। আমি সত্যি করতে চাইনি। ও এমন জোর করলো, আমি না করতে পারিনি।
-জোর তো করবেই। এখন তো নারীদের প্রাধান্য ওরা যা চায় তা দিতেই হয়।
-তুমি বোঝার চেষ্টা করো শানু.....
-চুপপপ। আর কখনো ওই নামে ডাকবেন না আমাকে। আজ থেকে সব খেলা শেষ
-মানে?
-মানে খুব সহজ। আপনি আপনার পথে থাকুন, আমি আমার পথে
-কি বলছো এসব। এতদিনের সম্পর্ক, গত একমাসের এত ভালোবাসা, এতসব একদিনে শেষ?
-জী, জনাব। জীবনের প্রথম এবং শেষ ভুল আমার। এবার আপনি বিদেয় হোন, আমিও বিদায় হই
-শোনো, এভাবে যেও না প্লীজ। তোমার পায়ে পড়ি। তুমি জানো না আমি তোমাকে কিরকম......
-আর শুনতে চাই না মিষ্টার। কালকে যথেষ্ট খেসারত দিয়েছি। ভাগ্যিস আজ আর দিতে হয়নি।
-আমি তোমার সাথে দেখা করে সব বলবো
-ব্যাস, বলেছেন ওতেই যথেষ্ট। আর কিছুর দরকার নাই। কাল থেকে আমাদের আর কোনদিন যোগাযোগ হচ্ছে না। দয়া করে আরো কোন মেসেজ দেবার চেষ্টা করবেন না। আপনাকে আমি ব্লক করে দিতে বাধ্য থাকবো তাহলে।


শহীদের সাথে সম্পর্কটা আপনি থেকে তুমিতে চলে গিয়েছিল। আজ আবার তুমি থেকে আবারো আপনিতে নামিয়ে দরোজা বন্ধ করে দিল চিরতরে। ল্যাপিটা বন্ধ করে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলো শাহানা। মানুষকে কতো সহজে বিশ্বাস করে শাহানা! রাকিব ওকে বারবার সতর্ক করতো এতটা সরল না হতে। কি বোকা ছিল সে। রাকিবকে অগ্রাহ্য করে ভালোবাসার নামে নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিল আধচেনা একজনকে । ভালোবাসায় এতটা প্রতারণা লুকিয়ে থাকতে পারে সে কখনো ভাবেনি। পৃথিবীটা তার চোখের সামনে দুলতে থাকলো। গত একমাসের স্মৃতিগুলো এখন কিরকম বিষাক্ত লাগছে ভাবা যায় না। নিজেকে তার খুব নোংরা লাগছে এখন। কি শাস্তি দেবে সে নিজেকে এখন? রাকিব যদি এখন অফিস থেকে চলে আসতো! আসতে পারে না মাঝে মাঝে চমকে দিতে? বিয়ের প্রথম দিনগুলোর মতো। রাকিব ওকে প্রেমের কথা বলে না কখনো, কিন্তু এখন সে জানে যেসব কথা মুখে বলা হয় না সেখানেই লুকিয়ে থাকে অনেক বেশী সত্য! অনেক বেশী সুন্দর সেসব কথা। অকথিত সেসব কথা দিয়ে শাহানা ভেতরে জ্বলতে থাকা আগুনটাকে চাপা দিয়ে রাখতে চায়।

Tuesday, August 16, 2011

ডায়েরী

আমার একটা ডায়েরী আছে। সুন্দর বাধাই করা ডায়েরী। নিয়মিত ডায়েরী লেখার অভ্যেসে ভাটা পড়েছিল ব্যস্ততার কারনে। ডায়েরীর অভাবে। কালো রঙের ডায়েরীটা হাতে আসার পর নিয়মিত লিখতে শুরু করি আবার। প্রতিদিন হাবিজাবি লেখায় ভর্তি করে ফেলি ডায়েরীটা। এত হাজার বাক্য লেখার পরও ডায়েরীটা শেষ হয় না। আমারও লেখায় ক্লান্তি আসে না। আমি দেখতে পাই আমি ডায়েরীর মাঝপথে আছি। বহুদিন ধরে দেখে আসছি। মাঝপথে আসার পর থেকে ভয় ধরেছিল এই চমৎকার ডায়েরীটা শেষ হয়ে গেলে আরেকটা কোথায় পাবো। তার চেয়ে লেখার পরিমান কমিয়ে দেই। দীর্ঘকাল লিখতে পারবো।

কিন্তু অল্প অল্প করে লিখতে গিয়েও টের পেলাম লেখাও শেষ হচ্ছে না ডায়েরীটাও যেন বাড়ছে। অথচ ডায়েরী বন্ধ করলে আগের সাইজে চলে আসে। ডায়েরী খুললেই পাতাগুলো যেন বেড়ে যায়। আমার লেখাগুলো বুকে নিতে আনন্দ হচ্ছে বলে ডায়েরীটা পাতার পর পাতা বৃদ্ধি করে যাচ্ছে? এরকম একটা অলৌকিক বিশ্বাস প্রোথিত হয় আমার ভেতরে। সেই বিশ্বাসের বিস্ময়ে ডায়েরীকে নিরলস বলতে থাকি আমার প্রতিদিনের কথা।

সেদিন ঘুম ভেঙে টেবিলের কাছে এসে ড্রয়ার খুলে অবাক হলাম। কাল রাতে লেখা পুরোনো ডায়েরীটা আজ সকালে এসে কেমন নীল হয়ে গেছে। যেন নতুন একটা ডায়েরী কেউ আলগোছে রেখে গেছে। অথচ ভেতরের লেখা উপরের কভারের লোগেো, সব অবিকল একই। শুধু ডায়েরীর রং বদলে গেছে, আর ডায়েরীর পাতাগুলো শেষ হয়ে গেছে। আমার আজকে লেখার মতো একটা পাতাও খালি নেই। প্রতিটা পাতায় পুরোনো লেখার ফুলঝুড়িতে পূর্ন। ডায়েরীটা হাতে নিয়ে তাকালাম। পাতা খুললাম। কিন্তু ডায়েরীটা আমাকে যেন চিনলোই না। আমার কথা শোনার ধৈর্য তার ফুরিয়ে গেছে। অথচ এখনো অনেক কথা বলার বাকী ছিল।