Sunday, November 24, 2013

মফিজ গার্মেন্টসের ১৩ সেন্ট

কথাটা পেড়েই মফিজউদ্দিনের তোপের মুখে পড়ে গিয়েছিলাম। গালিগালাজের ব্রাশফায়ার কানের শ্রবণসীমা অতিক্রম করার আগেই আমি প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে যাই। বেনিয়া লোকটা হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেলেও মুখের ভাষাটার কোন ব্যবস্থা করতে পারে নি। শালার গাড়ল! ব্যাবসা বন্ধ করে দেবে বলেও হুমকি দিল। দিলে দে, আমার কি? গজগজ করতে করতে অফিস ত্যাগ করলাম।  
নামকরা এক গ্রুপ অব কোম্পানির মালিক তিনি। না পোষালে তাঁর ব্যবসা তিনি বন্ধ করে দিতেই পারেন। আমার করার কি আছে?
বিতর্কটা গার্মেন্টস শিল্পে ন্যুনতম মজুরী নিয়ে। শ্রমিক পক্ষ থেকে দাবী উঠেছে ন্যুনতম মজুরি ৮০০০ করতে হবে। এই দাবীর সাথে তিনি একমত নন, আমিও না। এক সাথে এত টাকা বাড়ানো সম্ভব না। তবু একটা যৌক্তিক সমাধানের জন্য আমি বললাম, এতটা যখন সম্ভব না, অন্ততঃ মাঝামাঝিতে আসি চলুন। ন্যুনতম বেতন ৬০০০ টাকা করে দিন তাহলে ঝামেলা চুকে যাবে। এটা শুনেই মফিজ সাহেব তেল-বেগুন-মরিচে বিস্ফোরিত হলেন।
"বছরে ১৬ কোটি টাকা বাড়তি লাগবে, ১৬ কোটি টাকা!! এই টাকা কি আমার ইয়ে থেকে বের করবো, নাকি আপনার.......?"
বাকীটা বললাম না প্রকাশের অযোগ্য বলে। মফিজ সাহেবের টাকাপয়সার হিসাব রাখতাম আমি। শ্রমিক -মালিকের মজুরী যুদ্ধের ক্রস ফায়ারে চাকরীটা গেলেও যে হিসেবের কথা মফিজ সাহেব শুনতে চাননি সেটা আপনাদের উদ্দেশ্যে বলতে ইচ্ছে হলো-
মফিজ গ্রুপের শ্রমিক সংখ্যা ৫৫০০ জন, কিন্তু এদের অনেকেরই বেতন ৬০০০ টাকার লেভেল পার হয়ে গেছে। অতএব বেতন তাদেরই বাড়াতে হবে যাদের এখনো ৬০০০ টাকার নীচে। নীচের লেভেলে আছে ১৫০০ জন। এই ১৫০০ জনের সবার বেতন ৩৫০০ নয়, তবু হিসেবের খাতিরে  ধরে নিলাম ১৫০০ জনের মজুরি ৩৫০০টাকার লেভেলে আছে এবং এদের সবাইকে ৬০০০ টাকায় উন্নীত করার জন্য মাথাপিছু ২৫০০ টাকা বাড়তি দরকার হবে প্রতিমাসে।  
১৫০০ শ্রমিকের বেতন ২৫০০ টাকা করে বাড়াতে হলে বছরে কত টাকার দরকার হয়? 
১৫০০ x ২৫০০ x ১২ = ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অবশ্যই অনেকগুলো টাকা, কিন্তু মফিজ সাহেবের হিসেবের ১৬ কোটির অনেক কম!
তবু কথা হচ্ছে এই টাকাটাই বা কোত্থেকে আসবে? ক্রেতার কাছ থেকে নাকি মফিজ সাহেবের লাভের অংশ থেকে।
বছরে মফিজ কোম্পানী ৪৫ লাখ পিস গার্মেন্টস রপ্তানী করে। যদি এই বাড়তি টাকাটা ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করতে হয় তাহলে মফিজ সাহেবকে প্রতি পিসে ১০ টাকা বা ১৩ সেন্ট বেশী পেতে হবে। মফিজ কোম্পানীর জ্যাকেটের বাজার মূল্য প্রতি পিসে ১০০ ডলার ডলার হলেও FOB মূল্য ১০ ডলার। আমেরিকার ক্রেতা বাংলাদেশের কারখানাকে যে মূল্য পরিশোধ করে সেটাকে FOB মূল্য বলে। এই ১০ ডলারের মধ্যে ৭ ডলার কাঁচামাল আমদানীতে যায়। শ্রমিক মজুরীতে যায় ১ ডলার। অন্যন্য খরচ ১ ডলার। বাকী ১ ডলার মফিজউদ্দিনের নেট লাভ।
ওদিকে পশ্চিমা মানবাধিকারের অন্যতম সোল এজেন্ট আমেরিকার ক্রেতা 'গিলমার্ট' মফিজ কোম্পানীর ১০ ডলারের জিনিস ১০০ ডলারে বিক্রি করে তাদের সুপার মার্কেটে। ওরা চাইলে মফিজ কোম্পানীকে এই ১৩ সেন্ট বাড়িয়ে দিতে পারে। এই সামান্য বৃদ্ধি তাদের লাভের এক দানা চিনিও না। তবু মাল্টি বিলিওনিয়ার গিলমার্ট শ্রমিক অধিকার রক্ষার বাণী যত সহজে দেয়, এক দানা বাড়তি দিতে তার দশগুন কষাকষি করে। এই ১৩ সেন্টও হয়তো দেবেও না। 
গিলমার্ট যদি ১৩ সেন্ট না দেয়, মফিজউদ্দিন কি কারখানা বন্ধ করে দেবে?
মফিজ গ্রুপের কারখানা ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত। যার মধ্যে ব্যাংকের ঋন ১২৫ কোটি টাকা। বছরে ৩৫০ কোটি টাকার গার্মেন্টস রপ্তানী করে মফিজ কোং, কাঁচামাল খাতে ব্যয় করে ২০০ কোটি টাকা। মজুরী ও কারখানার বার্ষিক খরচ ৮৫ কোটি টাকা এবং ঋনের সুদ ২০ কোটি টাকা বাদ দিলে তাঁর করমুক্ত নীট লাভ ৪৫ কোটি।
আমি মফিজ হলে কি করতাম? মজুরি বৃদ্ধির বাড়তি খরচটা ক্রেতার কাছ থেকে না পেলে কি ব্যবসা বন্ধ করে দিতাম? নাকি শ্রমিক বেতন বৃদ্ধি করে বার্ষিক লাভ ৪৫ কোটির জায়গায় ৪০ কোটি টাকা মেনে নিয়ে চুপচাপ ব্যবসা করতে থাকতাম?
সুতরাং মফিজউদ্দিন আমার চাকরী খেলেও নিজে ব্যবসাচ্যুত হবেন বলে মনে হচ্ছে না।

স্মৃতিময় গান, কোজাগরী রাত

শতেক আলোর ভিড়ে, নিভে গেল......
কোজাগরী রাত জাগা... চাঁদিনীর এত আলপনা....
(অজয় চক্রবর্তী)


প্রাঙ্গন জুড়ে সবুজের মেলা। আম, কাঠাল, পেয়ারা, কামরাঙ্গা, নারিকেল, বরই, জাম্বুরা সহ নানা জাতের ফলের গাছে আকাশ প্রায় ঢাকা। মাত্র কবছর আগেও গাছগুলো একদম চারাগাছ। ফকফকা জোছনা ছিল প্রান্তরজুড়ে। কিন্তু এখন জোছনাদের অনেক কসরত করতে হয় এই প্রাঙ্গনে প্রবেশ করতে। কোন কোন মাতাল করা চাঁদনী রাতে বেতের মোড়া নিয়ে বারান্দা বসে গাছের ফাঁক গলে পড়া জোছনা দেখতে বসতাম। কত বছর ধরে সেই মায়াবী জোছনার রূপ দেখছি, তবু যেদিন প্রথম অজয়ের এই গানের সাথে জোছনা দেখলাম সেদিন আমি জোছনার এক নতুন রূপ দেখলাম। আগে কখনো দেখিনি। গাছের ফাঁক গলে পড়া জোছনার আলো প্রাঙ্গন জুড়ে সৃষ্টি করেছে অসাধারণ এক আলপনা। অপূর্ব সেই দৃশ্য, বর্ননাতীত সেই সৌন্দর্য। আমি রাতভর সেই সৌন্দর্যে ডুবে থাকতাম। এমনকি রাত পোহাবার পরও আমার চোখে ভাসতো সেই আলপনার মায়া। অজয়ের এই গানটা আমি হারিয়ে ফেলেছি অনেক বছর আগে। তারপর থেকে ক্রমাগত খুঁজে গেছি। আর কোথাও পাইনি।

সেই মায়াবী জোছনার আলপনা ঢাকা বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে সেই কবে। তবু আমার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতির একটি সেই কোজাগরি রাতের চাঁদের আলপনা।

আমি গানটি খুঁজে যাবো। যতদিন না পাই। এই গানের সাথে আমার প্রিয় স্মৃতিদের বসবাস।

আহা, কেউ যদি খুঁজে দিত? অথবা কোন একটা লিংক?

Thursday, November 21, 2013

আরো এক লক্ষ বছর পরে

শোনা যায়, আগামী এক লক্ষ বছর এই পৃথিবীটা টিকবে না। জমে বরফ হয়ে যাবে নাকি গরমে টগবগ করে ফুটবে আমি জানি না। পৃথিবীতে মানুষ আছে লক্ষ বছর ধরে অথচ এদের ইতিহাস জানা যায় মাত্র ছ হাজার বছরের। কারণ ছ হাজার বছর ধরে মানুষ সভ্য হচ্ছিল। দশ হাজার বছর আগে যা ছিল তাকে ঠিক সভ্যতা বলা যায় না। আর এক লাখ বছর আগে মানুষ নেহায়েতই আদিম পশু। এখন বলছি মানুষ সভ্যতার শীর্ষে উঠে বসে আছে। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ উৎকর্ষতা ঘটে গেছে। মানুষের হাতে সভ্যতা বিধ্বংসী অস্ত্র চলে এসেছে। পৃথিবী ধ্বংস হতে আর বেশী দেরী নাই।

হয়তো যেদিন মানুষ প্রথম আগুন আবিষ্কার করেছিল পাথর ঘষে, সেদিনও তার সেরকম অনুভুতি হয়েছিল। মানুষ সূর্যের মতো গরম জিনিস পৃথিবীতে নামিয়ে এনেছে। মানুষের ক্ষমতা বিধাতার মতো হয়ে গেছে। বিশ্বজগত হয়তো একদিন এই আগুনেই পুড়ে যাবে। আদিম মানুষ সেদিন আগুনের আবিষ্কার করে নিজকে নিশ্চয়ই বিজ্ঞানের শীর্ষগুরু ভেবেছিল।

দশ হাজার বছর পরের মানব প্রজন্মের তুলনায় আমরাও সেরকম আদিম। আমাদের আবিষ্কারের কতোকিছু বাকী রয়ে গেছে। আমরা এখনো জানি না। আমাদের কল্পনা খুবই সীমিত। পাথরঘষা আদিম মানুষ যেমন মোবাইল ফোনের কথা কল্পনা করতে পারতো না, আমরাও তেমনি জানি না দশ হাজার বছর পরের প্রযুক্তি কি? দশ হাজার নয়, এক হাজার বছরও আমাদের কল্পনায় আসে না। দুশো বছর কল্পনা করতে বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীদেরও ঘাম ছুটে যাবে।

মনে হচ্ছে আগামী এক লক্ষ বছর পর এই গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকবে না। শুক্র কিংবা বুধের মতো মৃত গ্রহ হয়ে থাকবে অনন্তকাল।  গ্রহ থাকবে কিন্তু মানুষ থাকবে না। ধার্মিকরা বলবেন ততদিনে কেয়ামত হয়ে যাবে, গোটা বিশ্বের অস্তিত্বই নড়ে যাবে। সেটা কোন একদিন ঘটবে, কিন্তু আগামী এক লাখ বছর পর সেরকম কিছু ঘটার কথা না। শোনা কথাটা তাই বিশ্বাস করলাম না। আমার বিশ্বাস চুড়ান্ত কেয়ামতের বাকী আছে আরো কয়েকশো কোটি বছর। বিলিভ ইট অর নট!!

আরো এক লক্ষ বছর পরে তোমার ফসিলের কার্বনেও কী লুকোনো থাকবে এই ভালোবাসা? তাহলে তোমার ঝলমল হাসিটা আরো একবার হাসো আমার জন্য।

Wednesday, November 20, 2013

বাড়ি ফেরা

১.
সোজা পথগুলো রূদ্ধ। বাঁকা পথেই রওনা দিল সে।

সবচেয়ে সোজা ছিল সল্টগোলা বারিকবিল্ডিং হয়ে আগ্রাবাদ পেরিয়ে টাইগার পাস লালখান বাজার। এটা হবে না, বারিকবিল্ডিং থেকে আগ্রাবাদ হয়ে দেওয়ানহাট পর্যন্ত দাউ দাউ জ্বলছে।

দ্বিতীয় বিকল্প পোর্টকানেকটিং রোড হয়ে আগ্রাবাদ এক্সেস রোড দিয়ে বাদামতলি মোড় পেরিয়ে সোজা উত্তরে। তাতেও জ্বলছে আগুন আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে।

তৃতীয় বিকল্প নয়াবাজার দিয়ে ঈদগাহ ঢাকা ট্রাংকরোড দিয়ে পাহাড়তলীর জিলিপির প্যাচ পেরিয়ে আমবাগান হয়ে টাইগারপাস।

তৃতীয় পথটা যথেষ্ট বাঁকা তবু তাতেই রওনা দিল সে। আর কোন পথ নেই। কিন্তু তৃতীয় পথে এসেও আমবাগানে থেমে যেতে হলো। আর যাবে না গাড়ি। সামনে প্রচণ্ড জ্যাম, তারও সামনে গণ্ডগোল। আশ্চর্য হলো সে, পুরো শহরটাই কি নারকীয় তাণ্ডবের আওতায় চলে আসলো?
আমবাগান নেমে, একে খান পাহাড়ের গলিতে ঢুকে পড়লো সে। এই রাস্তাটা নিরাপদ, এটা নিশ্চয়ই গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছে দেবে।

অনিশ্চয়তায় ভর দিয়ে নতুন এই পথে হাঁটতে থাকে। এই রাস্তায় পৃথিবীর সকল নির্জনতা যেন লুকিয়ে আছে। পাহাড়ের উপর উঠতে উঠতে দেড় শতক পুরোনো স্থাপনা বাড়ি ইত্যাদি দেখতে দেখতে শহরের বিদ্যমান তাণ্ডব খানিক সময়ের জন্য ভুলে থাকতে পেরে স্বস্তি পেল সে।

ঘন্টাখানেক হাঁটার পর সে যে রাস্তায় উঠলো সেটা পরিচিত। বাঘঘোনা হয়ে গলিপথ পেরিয়ে যখন ওয়াসার মোড়ে পৌঁছুলো তখন সামনে অনেক লোকের ভিড়। সব ভিড় রাস্তার পশ্চিম দিকে। পূর্বদিক সুনসান নির্জন। অথচ তাকে যেতে হবে পূর্বদিকেই।

রাস্তা জনশূন্য,যানবাহনশূন্য। এমনকি রিকশাও চলছে না। ফুটপাতেও কেউ হাঁটছে না। জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের পাশের এই রাস্তায় কখনো এত নির্জনতা দেখেনি সে। রাস্তাটা পেরুতে হলে এই নির্জনতা পেরুতে হবে। মাঝখানে একদল দাঙ্গা পুলিশ। না, দুই দল। একদল মার্চ করছে বন্দুক হাতে। অন্যদল হেলমেট পরে বিক্ষিপ্ত ধমক দিচ্ছে লোকজনকে। ওই পথটুকু তাকে পেরুতেই হবে।

ওয়াসা থেকে আলমাস। মাত্র কয়েকশো গজ। একটা দৌড় লাগালে পৌঁছে যাবে সে। কিন্তু দৌড় লাগালে পেছনে গুলি ছুটে আসবে নিশ্চিত। আবার কাপুরুষের মতো এখানে দাঁড়িয়ে থাকাও পছন্দ হলো না তার। একটু ভেবে মার্চ করতে থাকা পুলিশের পেছনে সেও মার্চ করতে শুরু করলো। সামান্য যাবার পর রাস্তার ঠিক মাঝখানে একটা গাড়ির ঝলসে যাওয়া কংকাল। ঘন্টাখানেক আগেও এটা একটা চকচকে কার ছিল, তবে টয়োটা নাকি নিশান বোঝা গেল না। পুড়ে কয়লা। আরোহী বেঁচেছে কি পুড়েছে জানে না সে। না বাঁচলে অবাক হবার কিছু নেই।

আচ্ছন্নের মতো পুলিশ দলের পেছনে পেছনে হাঁটতে লাগলো সে। সামনে কি আছে জানে না। পুলিশের সামনে দৌড় দেয়া অপরাধ হলেও পেছন পেছন অনুসরণ করা অপরাধ কিনা জানে না সে। পুলিশ ঘুরছে ডানদিকে ভিআইপি টাওয়ারের দিকে। সে কোনদিকে যাবে?

তখনি কোথা থেকে ১৩/১৪ বছরের একটা ছেলে পাশ দিয়ে ছুটে যেতে যেতে তাকে বললো, 'ওদিকে একটু আগে দুজন রিকশা আরোহী গুলিতে মারা গেছে। একটা বাচ্চা আর তার মা। মিছিল থেকে গুলি চালিয়েছে। ওদিকে যাবেন না'। ছেলেটার কথা শুনে চমকে গিয়েও সামলে নিল। কোন এক মা মেয়ে মারা গেছে। কিন্তু তাকে মরা চলবে না। জীবিত ফিরতে হবে বাসায় অপেক্ষায় থাকা আরো দুজন মা মেয়ের কাছে। ঝাপসা চোখ সামলে সে বাঁয়ে ঘুরলো। ব্যাটারি গলি দিয়ে ঢুকতে পারলে চিন্তা নাই।

ব্যাটারী গলি দিয়ে ঘুরার সময় দেখতে পেলো চট্টেশ্বরী মোড়েও ধোঁয়া, তখনো পুড়ছে। হাতে কালচে লোহার রড হাতে একদল লোক ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে। চোখ ফেরাতে না ফেরাতেই দুয়েকজন লোহার রড উঁচু করে ইশারা করতেই আকাশবাতাস কাঁপিয়ে গুড়ুম করে উঠলো। ওগুলো রড নয় রাইফেল। গুলির লক্ষ্য সে নয়, পুলিশ। তবু অবুঝ বুলেট না বুঝে ঢুকে যাবে বুকের খাঁচায়। ছুটছে সবাই, ছুটলো সেও। এক ছুটে ব্যাটারি গলিতে ঢুকে গেল। বুকের ভেতর তখনো ধড়ফড়, মাত্র বেঁচে যাওয়া হৃদপিণ্ডটা।

আরো বেশ কিছুদূর হেঁটে, নানান গলি ঘুপচি পেরিয়ে যখন সে বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালো সেখানেও সুনসান নীরবতা। এই রাস্তা কখনো জনশূন্য দেখেনি সে। কলাপসিবল গেট খুলে সিঁড়ি ভেঙ্গে বাসায় পৌঁছে হাঁপাতে হাপাতে কলিংবেল। দরোজা খুললো উদ্বিগ্ন চেহারার পারমিতা। জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে বাংলাদেশের? সে কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে চুপ করে থাকলো। ভাবছে কোনদিকে যাবে সে? গতবার যাদের ভোট দিয়ে জেতাতে পারেনি, এবার তাদের ভোট না দিয়েও কি হারাতে পারবে? এতদিন পর নিজের উপর ঘেন্না হচ্ছে তার।

২.
সোজা পথেই রওনা দিল আরেকজন। যুদ্ধের প্রথম ধাক্কা শেষ হবার পর পথঘাট পরিষ্কার। দুই পক্ষই সরে গেছে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে। সন্ধ্যার আলো জ্বলতে শুরু করেছে রাস্তার দুপাশের দোকানগুলোতে। কোন মোড়েই ট্রাফিক নেই। জ্যামও নেই। গাড়িতে চোখ বুজে আসলো আরামে। শোনা যাচ্ছিল শহরে খুব যুদ্ধ হয়েছে, দাঙ্গা লেগেছে। কোথাও তার কোন চিহ্ন নেই। আজব দুনিয়া। এত গুজব রটায় মানুষ!

চিটাগং ক্লাব পেরিয়ে এল গাড়ি। সার্কিট হাউসটা পেরোলেই পৌঁছে যাবে গন্তব্যে। গাড়িটা থেমে গেল সার্কিট হাউসের সামনেই। পুলিশের ব্যারিকেড এখানে। শত শত সবুজ পুলিশ। ড্রাইভার বললো, আর যাওয়া যাবে না।

নেমে গেল সে। পায়ে হেঁটে বাকী পথ যেতে কোন সমস্যাই না। কিন্তু সান্ধ্যকালীন প্রচণ্ড ভীড় সমৃদ্ধ কাজির দেউড়ির মোড়ে আজ একটা গাড়িও নেই, একজন মানুষও হাঁটছে না। সব দোকান বন্ধ। সব রাস্তা অন্ধকার। মাত্র সন্ধ্যা নেমেছে, কিন্তু যেন গভীর রাত।

সে কিছুই বুঝতে পারলো না। আশংকার মেঘ দানা বাঁধছে। ডানে, বামে, সামনে পেছনে সবখানে চকচকে হেলমেটের পুলিশ। একটা পোড়ানো জ্বীপ ঘিরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে। সাইরেন বাজিয়ে হঠাৎ একটা পুলিশের অ্যাম্বুলেন্স। সে দ্রুত পেরিয়ে গেল মোড়। তারপর বাজার পেরুলো। পেছনে তাকাচ্ছে না।

কোথাও মানুষ নেই এই রাস্তায়। সে একা হাঁটছে আবছা অন্ধকারে। কিছু একটা ঘটেছে অথবা ঘটবে। খেয়াল করে দেখলো, সবগুলো বন্ধ দোকানের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছে একাধিক চোখ। ফিসফিস করছে নিজেদের মধ্যে। এক বুড়ো দারোয়ান ফিসফিস করে বললো, জোরসে হাঁটেন। কোথাও ঢুকে পড়েন। ওই ওরা সোজা ওদিকে গেছে।

কারা? শিবিরের ছেলেরা। মানে তার সামনের দিকে শিবির। পেছনে পুলিশ। দুই পক্ষের হাতের অগ্নিবর্ষক নল। নিশ্চয়ই অগ্নিবর্ষক নলই ক্ষমতার উৎস। সে কোন শব্দ না শুনেই ঢুকে পড়লো বাড়ির গেটের ভেতর।

ওখানে তাকে ঢুকিয়ে যারা গেট বন্ধ করে দিল তারা জানালো - এই কিছুক্ষণ আগেই গোলাগুলিতে মারা গেছে দুজন।


একটি মন্তব্যঃ

এই একজন, অথবা দুজন অথবা এরকম কয়েকজন অথবা আরো কয়েক লক্ষ বা কোটি মানুষ এই দৃশ্যপট কিংবা এর চেয়ে অনেকগুন ভয়াবহ দৃশ্যপট অতিক্রম করছে। তবু আপনি বলছেন - গণতন্ত্রের দোহাই, জনস্বার্থে এটা তেমন বড় কোন ক্ষতি নয়। গণতন্ত্রের স্বার্থে এদের পোড়া কংকাল প্রকল্পে আত্মত্যাগ করুন। দেশকে ভালোবাসুন এবং যারা বাসে না, তাদের সহ্য করুন।

Monday, November 18, 2013

১৮ নভেম্বর ২০১৩ নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে

১.
নীলকন্ঠ পাখির খোঁজ আমিও জানতাম না। যখন শুনলাম তখন থেকে খুঁজে শুরু করলাম। খোঁজ খোঁজ খোঁজ। অবশেষে পেয়ে গেলাম নীলকন্ঠ পাখির সন্ধান। পিডিএফে পেলাম সহব্লগার নিলয় নন্দীর কাছ থেকে(অশেষ কৃতজ্ঞতা ভদ্রলোকের কাছে), আবার কাগজে ছাপাটাও পেলাম বাতিঘরে। পিডিএফে পড়া শুরু করেছি তবু কাগজে ছাপা 'নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে' কিনতে বাতিঘরে যেতে হবে। অতীন বন্দোপাধ্যায়ের ক্লাসিক উপন্যাসটি কালেকশানে রাখার ইচ্ছে।

২.
মাঝে মাঝে ঘুরে দাঁড়ানো ভালো। মাঝে মাঝে ফিরে তাকানোও। ফিরবো না বলেও তখন ফেরা যায়।

৩.
একটা দিন নিভে গেলে, একটা রাত আসে। একটা নদী চলে গেলে আরেকটা নদী আসে না।

৪.
এই দিনটা অন্যরকম হতে যাচ্ছিল। অপ্রত্যাশিত, অনাকাংখিত, অনাহুত। প্রত্যাশা বিমুখ হয়েও কখনো কখনো বিপর্যয় ঠেকানো মুশকিল হয়ে দাঁড়ায় যখন চেনা মানুষ অপ্রত্যাশিত আচরণ করে। উথাল পাতাল ঝড়েও ঠাণ্ডা মাথায় মাঝি নৌকা সামালায়। জলপদ্ম তখন হাসে।



Sunday, November 17, 2013

একটি চেনা গল্প: স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট

১.
আজ বাতাসের সঙ্গে ওঠে, সমুদ্র, তোর আমিষ গন্ধ
দীর্ঘ দাঁতের করাত ও ঢেউ নীল দিগন্ত সমান করে
বালিতে আধ-কোমর বন্ধ
এই আনন্দময় কবরে
আজ বাতাসের সঙ্গে ওঠে, সমুদ্র, তোর আমিষ গন্ধ |
হাত দুখানি জড়ায় গলা, সাঁড়াশি সেই সোনার অধিক
উজ্জ্বলতায় প্রখর কিন্তু উষ্ণ এবং রোমাঞ্চকর
আলিঙ্গনের মধেযে আমার হৃদয় কি পায় পুচ্ছে শিকড়
আঁকড়ে ধরে মাটির মতন চিবুক থেকে নখ অবধি ?
সঙ্গে আছেই
রুপোর গুঁড়ো, উড়ন্ত নুন, হল্লা হাওয়ার মধ্যে, কাছে
সঙ্গে আছে
হয়নি পাগল
এই বাতাসে পাল্লা আগল
বন্ধ ক'রে
সঙ্গে আছে …
এক অসুখে দুজন অন্ধ !এক অসুখে দুজন অন্ধ !এক অসুখে দুজন অন্ধ !এক অসুখে দুজন অন্ধ !

[এটি শক্তি চট্টোপধ্যায় লিখেছেন। কিন্তু কি অদ্ভুত মিল! আমার চেনা দুজন মানুষকে দেখেছি এরকম একই অসুখে ভুগতে।]

২.
মাঝে মাঝে আরো কিছু অদ্ভুত মিল পাই। নীচের গল্পটিতে আমার চেনা মানুষের গল্প খুঁজে পেলাম। গল্পটি পড়তে গিয়ে আবার চোখ ভিজে গিয়েছিল। কিছু কিছু মধ্যবিত্ত জীবন ভয়ংকর সংকট লুকিয়ে প্রত্যেকটা দিন ভাণ করে কাটিয়ে দেয়। মানুষের জীবনের কত শতাংশ ভাণ হতে পারে? এদের কি ভাণ ছাড়া আর কোন গতি আছে? সচলায়তনে প্রকাশিত গল্পটি সংগ্রহ করে রেখে দিলাম তাই।
http://www.sachalayatan.com/aaynamoti/49814



স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট
----------------------------

আমি এ যুগের হরিপদ কেরানী। আমার গ্রামের ঠিকানা আপনারা জানবেন না। কিন্তু আমার শহরের ঠিকানা আপনারা চেনেন। শহরে নিন্মবিত্তদের জন্য তৈরী অগুনতি খুপড়ির একটিতে আমি থাকি। আমি একা থাকি না, আমার সাথে মা থাকে, বউ থাকে, সন্তান থাকে, ছোট দুই ভাই থাকে। বাবা বেঁচে থাকলে তিনিও থাকতেন। সুমনের 'দশফুট বাই দশ ফুট' গানটি শুনেছেন? আমি ছাত্রজীবনে শুনেছিলাম। এখন আমি সেই দশ ফুট বাই দশফুট ঘরে থাকি। সবাইকে নিয়ে। বিশ্বাস হয় না? না হবারই কথা। কারণ আপনারা এরকম জীবন দেখেননি।

আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেছি ইতিহাসে। পাশ করে আমি চাকরী পেয়ে গেছি তিন মাসেই। তার আগে আমি টিউশানি করে সংসার চালাতাম। তখন বেড়ার একটা বস্তি ঘরে থাকতাম। চাকরী পেয়ে আমি উন্নত বাসায় চলে আসি। হ্যাঁ আগের চেয়ে খুব উন্নত এই বাসা। ঝড় বৃষ্টি বাদলায় না ঘুমিয়ে চৌকির উপর বসে থাকতে হবে না আর। একটা পাঁচতলা দালানের তিন তলায় দশ ফুট বাই দশফুট একটা ঘর। সাথে লাগোয়া রান্নাঘর আর বাথরুম। গ্যাসের লাইন আছে। সপ্তাহে তিন দিন পানি আসে লাইনে। আর কি চাই। ভাড়াও নেহায়েত খারাপ না। ৩৫০০ টাকা। আর একশো টাকা দিলে ডিশের লাইনও দেবে। কিন্তু আমার টিভি নেই, ডিশ কি করবো। আমি যখন চাকরীতে ঢুকি তখন ৮০০০ টাকা বেতন। দুবছরে আমার বেতন বেড়ে ১০০০০ ছুঁই ছুঁই করছে।

আমি যখন ভার্সিটিতে ঢুকি তখন স্বপ্নে দশ হাজার টাকার একটা চাকরী ঘাপটি মেরে বসে ছিল। বাস্তবে বছরে ১০% হারে মুদ্রাস্ফীতি যোগ হলেও স্বপ্নে তার কোন ছাপ পড়েনি। আমার স্বপ্ন সফল হতে তাই কোন অসুবিধা হয়নি। আমি যখন স্বপ্ন দেখছিলাম তখন বাবার দোকানটা ছিল, দোকানের আয়ে সংসার চলতো ফুরফুর করে। আমি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াতাম দশ হাজার টাকার একটা স্বপ্ন নিয়ে। সেই স্বপ্নে ছিলাম কেবল আমি আর সুনন্দা। আমাদের দুজনের একটা সংসার, ফুটফুটে একটা বাচ্চা।

কি অবাক কাণ্ড দেখুন, আমার সেই স্বপ্নটা কেমন হুবহু পূরণ হয়ে গেল! শুধু একটা পার্থক্য। তিন বছর আগে হুট করে বাবা মারা গেলে আমার স্বপ্নের সংসারে ঢুকে গেল মা আর দুইভাইও। বাবার রেখে যাওয়া সম্পদের মধ্যে ছিল ছাপ্পান্নো হাজার টাকার একটা ঋণের বোঝা। সাড়ে তিন বছরের টিউশানীর জমানো টাকা থেকে বোঝাটা হালকা করেছি। ফলে আমি যখন চাকরীতে ঢুকি তখন ঋণমুক্ত।

চাকরীর এক বছরের মাথায় সুনন্দাকে বিয়ে করতে হলো। ভাবছেন সুনন্দাকে কেন বিয়ে করতে হলো এরকম চাপাচাপি সংসারে? উপায় কি বলুন, না করলে তো সে চলে যেতো অন্য ঘরে। "চাকরীটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছো...."..বলে কাঁদলে কোন লাভ হতো না তখন।

সে যাই হোক, আমি কেবল চাকরীটা আছে বলেই সন্তুষ্ট। সুনন্দা, ছোট্ট বাবু, মা, দুই ছোট ভাই, এদেরকে নিয়ে একটা ছাদ দেয়া ঘরে বাস করতে পারছি এতেই সুখী। আমি যেখানে কাজ করি সেটা বাসা থেকে দুই মাইল দূরে। রিকশায় গেলে বিশ টাকা, বাসে গেলে পাঁচ টাকা। আমি হেঁটেই যাই। ঝড় বাদলার দিনে একটু অসুবিধে হয়। তবু ভেবে সুখী হই দুই কায়দায়। রিকশায় না গিয়ে বাঁচলো মাসে পাঁচশো টাকা। বাসে না গিয়ে বাঁচলো দেড়শো টাকা। ভাবছেন অভিনব সুখপন্থা? আসলে পাঁচশো টাকায় মায়ের ওষুধের খরচ উঠে যায়, দেড়শো টাকায় মাসে একবার রুই মাছ কিংবা মাংস খেতে পারে পরিবার।

আমরা সাধারণত নিরামিষভোজী। মাছ মাংস তেমন ছুঁই না। শাক, ভাত, ডাল - এই তিনে চলে যায়। শরীরের জন্য তেল ক্ষতিকর, তাই আমরা তেল কিনি না। চিনি খেলে মায়ের সুগার বাড়ে, তাই চিনিও বাদ। আমরা চা নাস্তা করি না। তবে মেহমান আসলে একটু বিপদে পড়ে যাই, তাই আমি কাউকে বাসায় আসতে বলি না। বাবুর জন্মের পর বিপদে পড়েছি খানিক। খরচপাতি বেড়ে গেছে। সুনন্দা ট্যা ট্যা করে বাবুর জন্য দুধ কেনা দরকার, বাইরে খাবার না খেলে শরীর বাড়বে না। আমি চুপ করে থাকি। করার কিসসু নাই। আমার বাজেটে বাড়তি সুযোগ আছে কি? হিসেবটা দেখুন- দৈনিক তিন বেলা খাবার পেছনে দেড়শো টাকা লাগে, পুরো মাসে সাড়ে চার হাজার। খাওয়া ঘর ভাড়া বাদ দিলে বাকী থাকে দুই হাজার। দুই ভাইয়ের স্কুলের খরচ আটশো টাকা। বইখাতা পেন্সিল কলম বাবদ আরো দুশো। মায়ের ওষুধপত্র, বাথরুমের সাবান, টুথপেষ্ট এসবে লাগে আরো চার পাঁচশো টাকা। দশ হাজার টাকার হিসেবটা তো প্রায় খতম, আর বাড়তি কোথায় পাই। বাবুটাকে আমাদের তিন পদে অভ্যস্ত করতে বলি।

তবে হ্যাঁ কেউ যদি অবিবেচকের মতো অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন বিপদ। তেমন বিপদ মাত্র একবার ঘটেছিল গত বছর। ধার করে এরকম বিপদ সামাল দেয়া যায়, কিন্তু তেমন ধার শোধ করতে অপেক্ষা করতে হয় বছরের ঈদ বোনাসের সময় পর্যন্ত। হ্যাঁ ঈদের সময়টা খুব আনন্দের। ওই একটা দিন আমরা নিরামিষভোজী থেকে বেরিয়ে আসি। জামা কাপড়ে ব্যয় কমিয়ে একদিন একটু ভালো খাই। অতিথি সেবা করি। ওই্ একদিনের পোলাওয়ের স্বাদ আমাদের নস্টালজিক করে দেয়। বাবার আমলে আমরা মাসে দুয়েকবার এমন খেতে পারতাম।

এই দেখেন কেবল খাওয়াদাওয়া নিয়েই আছি। বাসস্থানের দিকে নজর দেয়া হলো না এখনো। চলুন বাসস্থানের গল্প করি। আগেই বলেছি দশফুট বাই দশফুট। বাবা মারা যাবার পর আমরা যখন বস্তিতে চলে যাই তখন একটা চৌকি বাদে আর সব আসবাব বিক্রি করে দিয়েছিলাম। জায়গা নেই রাখবো কোথায়? বস্তি ছেড়ে এখানে আসার সময় চৌকিটাও বেচে দিয়েছি দুইশো টাকায়। চৌকি থাকলে বরং এখানে শোবার অসুবিধা। এখন মাদুরের উপর কাঁথা বিছিয়ে তার উপর বিছানার চাদর পেতে পাশাপাশি দুটো বিছানা তৈরী করি রাতে শোবার আগে। এক বিছানায় আমি সুনন্দা আর বাবু। অন্য বিছানায় মা আর দুই ভাই। আমরা ম্যানেজ করে নিয়েছি। করতেই হয়। অসুবিধা হয়নি।

এই দালানে মোট ৫৫টি খুপড়ি ঘর। বড়লোকেরা এরকম জিনিসকে বলে স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট। শখ করে কিনে বিদেশে এমনকি কক্সবাজারের সৈকতে। আমাদের এই স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে এসি নেই। টিভি, ফ্রীজ নেই। এমনকি খোলা জানালার আকাশও নেই তবে বৈদ্যুতিক আলো আর ফ্যানের বাতাস আছে। তবু এখানে আমি সুখী। কেননা সুনন্দা আমাকে অভিযোগ করে না। মা আমাকে অভিযোগ করে না, ভাইয়েরা অভিযোগ করে না। ওরা জানে আমি সীমাবদ্ধ। প্রবল প্রবল সীমাবদ্ধতা আমার হাত পায়ে সমস্ত শরীরে। ওরা তাই দিনের পর দিন একই রঙের শাক ভাত আর ডাল খেয়ে কাটিয়ে দেয়। বাবুটা মাত্র ছমাস, সে এখনো বোঝে না দুনিয়ার হালচাল। তার চোখে হয়তো গোটা দুনিয়াটাই আলোবাতাসহীন একটা ষ্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট।

আমি যেখানে কলম পিষি, সেখানে দুপুরে খাবার মেলে। এক সাথে কয়েকশো মানুষের খাবার রান্না হয়। ভাত আর ডাল যত খুশী খাও, সবজি মাছ মাংস ডিম যে কোন একটা এক বাটি করে। আমার সামনে যখন মাছ মাংসের বাটি আসে, আমার ইচ্ছে করে ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে মাছ বা মাংসের টুকরোটা কাগজে মুড়ে ঘরে নিয়ে যাই। কিন্তু আমার আশেপাশে যারা বসে তাদের সবাই স্বচ্ছল ঘরের সন্তান। তাদের পাশে বসে এই কাজ করা যায় না। ওরা কেউ জানে না আমি কেমন জীবন কাটাই। আমার মুখোশকেই সত্যি মনে করে ওরা। জানি ওরাও দশ হাজার টাকাই বেতন পায়, কিন্তু ওই টাকার উপর ছ জনের একটা পরিবার নির্ভর করে না।

আমি খুব টানাটানি সংসারী? কথা সত্যি। তবে আমার দশ হাজার টাকাকে কখনো কখনো যখন বেশী টানটান মনে হয় তখন আমি আরেকটু নীচের দিকে তাকাই। নীচের ফ্লোরে রঙিন জামা পরা মেয়েগুলো মাসে চার পাঁচ হাজার টাকার বেশী পায় না। তবু ওদেরকে কোন কোন সময় আমার চেয়েও বেশী হাসতে দেখি। ওই হাসির পেছনেও কি কষ্টের নহর? জানি না। ওদের কষ্টের কথা ভেবে সমবেদনার বদলে আমি বরং সুখী হয়ে উঠি আবার।

সন্ধ্যে ছটার পরে কাজ থাকলে একটা ছোট বিস্কুটের প্যাকেট আর একটা কলা দেয় আমাদের। এই দুটো জিনিস পকেটে করে বাড়ি নিয়ে আসতে কষ্ট হয় না আর। কলাটা মাকে দেই, মা অর্ধেক দেয় সুনন্দাকে, বিস্কুট সবাই একটা করে খাই। তখন আমরা সবাই খুব হাসি এক সাথে হাসি, যেন আমরা আসলেই সুখী নগরীর বাসিন্দা।

এই পাঁচ তলা দালানের ছাদের উপর দিয়ে হু হু বয়ে যাওয়া বাতাসে বিনে পয়সার সুখ। কোন কোন রাতে ছাদে উঠে আমি সেই সুখ স্পর্শ করি। সুখের আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলি অনাগত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভুলে। আমি প্রতিদিন একটা পুরোনো ঘ্রাণের নতুন জীবন নিয়ে জেগে উঠি এই স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে।

[ পাদটীকাঃ না দেখা জীবন নিয়ে গল্প লেখার অভিজ্ঞতা আমার নেই। দেখা জীবন নিয়ে গল্প লিখতেই হিমশিম খাই। তবু এই গল্পটা লিখতেই হলো একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা শুনে। লিখতে হলো সেই সব ধনবান নিয়োগকর্তাদের উদ্দেশ্যে যারা নিয়োগ পত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার চাহিদাটা যেরকম মোটা অক্ষরে লিখেন, পারিশ্রমিকের অংকটা সেই অক্ষরে লিখতে পারেন না। শ্রমিক শোষণ নিয়ে মাথা ঘামানোর জন্য দেশে বিদেশে অনেক মানবাধিকার গোষ্ঠী থাকলেও এসব শিক্ষিত অর্ধাহারী তরুণদের নিয়ে মাথা ঘামানোর কেউ নেই। অথচ প্রায় ভিক্ষুকের জীবনযাপন করে এদের কেউ কেউ। যদি কোথাও অতিরঞ্জন মনে হয় তবে সাভার আশুলিয়া বা রামপুরা রোডের যে কোন গার্মেন্টস কর্মীর আবাস স্থলে ঘুরে আসতে পারেন। ]




Saturday, November 16, 2013

১৬ নভেম্বর ২০১৩, অম্লান অঘ্রান

১.
তোমার জন্য বুকের ভেতরটা জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। তুমি জানো না তোমার জন্য আমার কতখানি পেট পুড়ে, কতখানি বুক জ্বলে, কতখানি আমি লণ্ডভণ্ড হয়ে যাই। আজ দুপুর থেকে জ্বলছে, গতকাল জ্বলেছে, হয়তো আগামীদিনও জ্বলবে। দিনের পর দিন তুমি কি এভাবেই আমার ভেতর ঢুকে আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেবে হে ক্যান্টিনের পোড়া তেলে ভাজা ডিমের মামলেট? আমি আর কতকাল তোমাকে সহ্য করবো?

২.
গতকাল এক টিভি চ্যানেলে সকালে বলছিল আজ শুক্রবার ১ অগ্রাহয়ন, শীতকাল, ১৪২০ সাল।
আমি চোখ গোল করে তাকিয়ে ভাবছিলাম শীতকাল তাহলে সত্যি সত্যি অঘ্রানে ঢুকে গেল?

৩.
কিছু কিছু অন্ধকার আলোতেও দৃশ্যমান।