মাহমুদের বাবা যখন হঠাৎ মারা যায় মাহমুদ তখন মাত্র বিএ পাশ করেছে। ৪ভাই ৩বোন আর মাকে নিয়ে জীবনের সর্ববিষয়ে অনভিজ্ঞ মাহমুদ সংসার সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে খেতে অবশেষে একটা চাকরীর সন্ধান পেল। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীর চাকরীটা না পেলে গ্রামে গিয়ে হালচাষ করা ছাড়া উপায় ছিল না। এমনিতে গ্রামে বহুবছর যায়নি, পৈত্রিক সম্পত্তিগুলো চাচারাই দেখাশোনা ভোগদখল করে। চাকরীটা পাবার পর স্বস্তিকর জীবন শুরু হলো। কিন্তু নতুন জীবন শুরু হতে না হতেই একটা ভাই হঠাৎ মারা গেল দুঃখজনক এক ঘটনায়। বাবার পর ভাইকে হারিয়ে পাথর হয়ে গেল মাহমুদ। ওর চেহারার দিকে তাকানো যেতো না তখন। বোকা বোকা হয়ে গিয়েছিল। কিছুদিন পর আবার নতুন উদ্যমে শুরু। এই দ্বিতীয় যাত্রার প্রাক্কালে আমার সাথে মাহমুদের ঘনিষ্টতা জন্মায়। পড়াশোনার সুত্রে। মাহমুদ রাজনীতির পোকা ছিল। বাম রাজনীতির সক্রিয় কর্মী। ওর পুরো ঘর জুড়ে রাজনৈতিক বই। কালমার্কস, তাজউদ্দিন, মোনাজাতউদ্দিন থেকে শুরু করে রাজনীতি নিয়ে খ্যাত অখ্যাত যত বই দেখে সব কিনে। তবে সব পুরোনো বই। রেয়াজুদ্দিন বাজারে একটা পুরোনো বইয়ের দোকান আছে। অফিস শেষে প্রতিদিন বিকেলে ঘন্টাখানেক ওখানে কাটিয়ে বাসায় ফিরতো। আমারো বইয়ের নেশা ছিল বলে আমরা প্রতি সন্ধ্যায় বসতাম। বন্ধুদের মধ্যে আমরা দুজনই বাবাকে হারিয়েছিলাম সবার আগে। ফলে দুজনের মধ্যে সহমর্মিতা আর বোঝাপড়া ছিল বেশ।
সবকিছু যখন মোটামুটি স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছিল মাহমুদ একটা বোনের বিয়ে দিল ধুমধাম করে আমেরিকা প্রবাসী ছেলের সাথে। নিজের ভাল চাকরীর অফার পেতে লাগলো। ভাল পোষ্টে অফার পেয়ে নতুন একটা কোম্পানীতে যোগ দিল। তার কদিন পর শোনা গেল মাহমুদ বিয়ে করছে। আমরা অবাক। এমনকি ঘনিষ্ট বন্ধুরাও জানতো না। চাইনিজ হোটেলে বিয়ের চমৎকার অনুষ্ঠান হলো। মেয়েটা বয়স অল্প। ১৮/১৯ হবে। সুন্দরী তরুনী চটপটে বৌ পেয়ে মাহমুদ আমাদের প্রায় ভুলেই যায় আর কি। বিয়ের পরদিন থেকে বেশ কয়েকমাস দেখা নেই ওর সাথে। বেশীরভাগ ছেলে বিয়ের প্রথম দিকে বৌ নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকে, রোমাঞ্চ, দাওয়াত, সামাজিক আচার। তাই আমিও সন্ধ্যাবেলার বইয়ের আড্ডাটা বন্ধ করে দিয়েছি।
একবার বন্ধুরা সবাই মিলে কক্সবাজার বেড়াতে গেলাম। যে কজন বিয়ে করেছে সবাই বৌ নিয়ে গেছে একমাত্র মাহমুদ বাদে। কক্সবাজার পৌছে দুপুরে হোটেলে খাওয়া গোসল সেরে ব্যাচেলর আমি ঘোষনা করলাম, মহেশখালী ঘুরে আসতে যাচ্ছি আমি। ব্যাচেলর যে কেউ চাইলে সঙ্গী হতে পারে। আমার ঘোষনা শুনে ব্যাচেলর তো বটেই, বিবাহিত দুতিনজনও বৌকে লুকিয়ে আমার সাথে যোগ দিল। রাতে অবশ্য তাদের এজন্য যথেষ্ট খেসারত দিতে হয়েছিল বৌয়ের কাছে। সে গল্প আরেকদিন। মহেশখালি পৌছে আদিনাথ পাহাড়ে ছবি তোলার সময় হঠাৎ খেয়াল করলাম মাহমুদ কেমন যেন একলা একলা থাকতে চাইছে। চেহারায় কেমন যেন মলিনতা। কারো সাথে গল্পগুজব করছে না। আড্ডার তোড়ে ব্যাপারটা ভুলে গেলাম শীঘ্রই। ফিরে আসার কয়েকদিন মাহমুদের সমস্যার কথা জানতে পারলাম জাহেদের কাছ থেকে।
মাহমুদের বিয়ে খুব সংকটে। প্রায় ভঙ্গুর আর কি। মাহমুদের বৌয়ের আগে একবার বিয়ে হয়েছিল। মেয়েটা ঘর থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছিল একটা ছেলেকে। পরে বাবা মা ধরে এনে ডিভোর্স করিয়ে নিয়েছে। এখন আবার বিয়ে দিয়েছে মাহমুদের কাছে। মাহমুদ ব্যাপারটা জেনেছে বিয়ের ঠিক আগে আগে। বিয়ের কথাবার্তা চুড়ান্ত হবার আগে মেয়ের পরিবার মাহমুদকে মেয়েটার সাথে ঘনিষ্টতার সুযোগ করে দেয়। ঘনিষ্টতা চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছানোর পর (পয়েন্ট অব নো রিটার্ন) মাহমুদ জানতে পারে মেয়েটার পুরোনো সম্পর্কের কথা। কিন্তু ততদিনে দেরী হয়ে গেছে, মাহমুদ মেয়েটার সাথে দারুন প্রণয়ে আবদ্ধ, একদম গভীরে ডুবে গেছে। তাছাড়া সে প্রগতিশীল ছেলে। এসব কোন ব্যাপারই না ওর কাছে। মানুষের একাধিক বিয়ে, প্রেম এসব হতেই পারে। আর মেয়েটা যখন পালিয়ে বিয়ে করেছে তখন ওর বয়স মাত্র ১৫ বছর। ওই বয়সে মেয়েরা ভুল করতেই পারে। তাই বর্তমানটাকেই গুরুত্ব দেবার সিদ্ধান্ত নেয় মাহমুদ। আর কারো সাথে পরামর্শের তোয়াক্কা না করে উদারতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে হুট করে বিয়ে করে ফেলে মেয়েটাকে। বিয়ের দিনের ছোট্ট একটা ঘটনা মাহমুদ পরে বলেছে আমাকে।
বিয়ের গাড়ী যখন মাহমুদের বাসার সামনে এল, মাহমুদের মা আগেই বাড়ীর দরজায় দাড়ানো, বৌমাকে সাদরে বরন করার জন্য। গাড়ীর দরজা খুলে নামতেই মা ছুটে গিয়ে বৌমার হাতটা ধরলো ঘরে নেবার জন্য। বৌ এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে বললো, "ছাড়েন, এসব ঢং আমার ভালো লাগে না।" কথাটা শুনে মা স্তব্ধ। মাহমুদ চুপ। সে ভাবলো বয়স কম, আর বিয়েবাড়ীর গরমে-ভিড়ে অতিষ্ট হয়ে মুখ ফসকে বলে ফেলেছে।
ছুটির কয়েকটা দিন টোনাটুনির মতো রুমের মধ্যেই কাটায় দুজনে। কিন্তু আরো কয়েকদিন যাবার পরও দেখা গেল, মেয়েটা রুম থেকে বোরোয় না। মাহমুদ ছাড়া কারো সাথে ভালো করে কথা বলে না। ঘরের কোন কাজকর্মের তো প্রশ্নই ওঠেনা। মাসখানেক পর একদিন বৌ বাপের বাড়ী বেড়াতে গেল। কয়েকদিন পর মাহমুদকে জানালো ওই বাসা তার ভালো লাগে না, আলাদা বাসা না নিলে সে আর ফিরে আসবে না। আরও বললো মা ভাইবোনদেরকে গ্রামে পাঠিয়ে দিতে। মাহমুদ যেন তার সিদ্ধান্ত জানায়। মাহমুদের মাথায় যেন বাজ পড়লো। যেখানে পুরো পরিবার তার আয়ের উপর নির্ভর, সব আশাভরসা তার উপর, সে ছাড়া পরিবারের আর কোন অবলম্বন নেই। মেয়েটা কীভাবে বলতে পারলো এমন কথা? মাহমুদ বৌয়ের কথায় রাজী হলো না। বৌ আসলো না।
ওদিকে নতুন যে কোম্পানীতে চাকুরী নিয়েছিল, তাদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছিল না। চাকরীটা প্রায় চলে যাচ্ছিল তবু কোন মতে ঠেকালো বস ভালো ছিল বলে, তবে বেতন অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ। কোম্পানীর অবস্থা ভালো হলে বেতন দেয়া হবে। সে আশায় মাহমুদ চাকরীটা চালিয়ে যাচ্ছে। কয়েকমাস পর ডিভোর্সের নোটিশ পেল মাহমুদ বৌয়ের কাছ থেকে। সাথে ৩ লাখ টাকা কাবিনের দাবী। মড়ার ওপর খাড়ার ঘা। অনেক দেন দরবার হলো। কোন লাভ হলো না। টাকা না দিতে পারলে জেল খাটতে হবে। এমনিতে বেতন নেই, সঞ্চয়তো অনেক আগেই শেষ। ধার-কর্জ করে চলছে সংসার। এ অবস্থায় ভাগ্যের এই কষা থাপ্পড় কেমন লাগে? আমরা সবাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম সেই পুঁচকে মেয়ের ক্ষমতা দেখে। এক বছর সময় নিয়ে কিস্তিতে কিস্তিতে, আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবের সহায়তায় কোন মতে কাবিনের দাবী মেটানো গেল।
এই সময়ে মাহমুদ নিজেকে ভুলিয়ে রাখার জন্য বেশী বেশী করে রাজনীতির দিকে ঝুঁকলো। চাকরীতে বেতন পাওয়া শুরু হয়েছে, যদিও অর্ধেক। তবু কম কি, বেঁচে থাকতে পারলেই হলো। পায়ের নীচে খানিকটা মাটি পেয়ে দাঁড়াতে চাইল মাহমুদ। একদিন রমজানের সময় গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন, ঈদ বোনাস ইত্যাদির অধিকার নিয়ে আন্দোলনে মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিল মাহমুদ। পুলিশের বেপরোয়া আক্রমন তেড়ে এল তাদের ওপর। গ্রেফতার হয়ে জেলে চলে গেল সে। এ ঘটনার পর পরিবারের উপর বিপর্যয়ের খাড়া নেমে আসলো। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি পড়ে গেলে যা হয় আর কি। মাহমুদের পরিবারের আর কোন আশ্রয়ই রইল না শহরে। ছোট ভাইবোনদের নিয়ে গ্রামের বাড়ীতে চলে গেল ওর মা। বিনা বিচারে প্রায় ছয়মাস জেল খেটে, জামিনে ছাড়া পেল।
দেখতে গেলাম আমি। কিন্তু এ কাকে দেখছি ? সে আর আমাদের পুরোনো হাসিখুশী মাহমুদ না। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখ দুটো বসা, মুখের দুই পাশে হাড্ডি বেরিয়ে গেছে, মাথায় চুল পড়ে অর্ধেক। বোঝা যায় জেলখানায় কী দুর্দশা গেছে। আশ্চর্য লাগে যে মানুষটার নিজের অধিকারেরই ঠিক নেই সে অন্য মানুষের জন্য আন্দোলন করে জেলে যায়! চা খাওয়ার পর সিগারেট অফার করলে মৃদু হেসে হাত নেড়ে বললো, সিগারেটে পোষায় না। বিড়ি ধরেছি। জেলে তো বিড়ি ছাড়া উপায় নাই। বিড়ির অভ্যেসটা হয়ে গেছে। আর বিড়ি তো জেলখানার অঘোষিত মুদ্রা। তোষকের নীচ থেকে আকিজ বিড়ির বান্ডিল বের করে ধরালো।
জেল থেকে ছাড়া পেল ঠিকই কিন্তু মামলাটা রয়ে গেল। নিয়মিত হাজিরা দিতে হয়। খরচ অবশ্য পার্টি থেকে দিচ্ছে। অফিসের বসটা ভালো ছিল বলে, চাকরিটাও ফিরে পেল আবার। বেতন যদিও অর্ধেক এখনও। তবু আবারো উঠে দাড়ানোর চেষ্টা। কিছুদিন পর গ্রামে গেল মাকে নিয়ে আসতে। গিয়ে আরেকটা নতুন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলো, ওদের সব জমি জমা চাচারা বেদখল করে ফেলেছে দীর্ঘ অনুপস্থিতির সুযোগে। ভাগ্যের চতুর্থ কামড়। মাহমুদ নিজেই গ্রামে চলে গেল দীর্ঘ ছুটি নিয়ে। এবারের ছুটি মানে চাকরী শেষ। কোন কোম্পানী এতবার এতদিন ছুটি দেয় না। গ্রামে গিয়ে মামলা মোকদ্দমা হয়রানি অপমান গ্লানি। শেষ হয় না কিছুতেই। ক্লান্ত ক্লান্ত মাহমুদ। তবু পরাজিত হয় না। আজীবন সংগ্রামী মাহমুদ ঘরে বাইরে যুদ্ধ চালিয়েই যায়। এখনও চলছে।
মাহমুদের জীবনটা নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবি। এক সময় সব ছিল ওর, সুখের সব উপাদান। তারপর আস্তে আস্তে ঝরে পড়তে লাগলো একেকটা সুখ। ভাগ্য কিছু কিছু মানুষের প্রতি এমন নির্দয় হয় কেন? আরেকটু কম নির্দয় হলে কী এমন ক্ষতি হয়ে যেতো বিশ্বজগতের? যতই সে উঠে দাঁড়াতে চায়, ভাগ্য তাকে আবার আছড়ে ফেলে শক্ত মাটিতে। যেন তাকে উঠতে না দেয়ার প্রতিজ্ঞা করেছে ভাগ্যবিধাতা!!
Sunday, November 23, 2008
দাওয়াতী কর্মের বিটকেলে সমাপ্তি
বয়েস তখন বিশের কোটায়। আমার এক বন্ধু পারভেজ। কথাবার্তায় খুব দুষ্টু। ওর প্রতিটি বাক্য একেকটা কৌতুক, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়তে হয়। ওকে কেউ কিছু বলে সারতে পারে না, তাৎক্ষনিক জবাব রেডী, একটা কথাও মাটিতে পড়তে দেয় না। ফলে সবার প্রিয় ছিল আর বন্ধুবান্ধবও ছিল অগনিত।
ওর বাসাটা ছিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে প্রিয় আড্ডাখানা। ওর বাবা মা ভাই বোন এত আন্তরিক ছিল যে আমরা ওটাকে নিজের ঘরের মতো ব্যবহার করতে পারতাম। ওর রান্নাঘরে ঢুকে ডেকচি উল্টিয়ে মাছ তরকারী নিয়ে খাচ্ছি এটা খুব স্বাভাবিক একটা দৃশ্য ছিল। খাওয়া ঘুম আডডা সব চলতো, কেউ কেউ রাতেও থেকে যেতো বেশী দেরী হয়ে গেলে। পাড়ায় আমাদের ১৬ জনের একটা ম্যারাথন আড্ডা গ্রুপ ছিল। তাছাড়া অতিথি আড্ডাবাজরাও প্রতিদিন আসতো শহরের কোন না কোন অংশ থেকে।
এত বেশী বন্ধুবান্ধব ওর বিয়ের দাওয়াতের সময় একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দাওয়াতের লিষ্টে বন্ধুর সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে যাওয়াতে ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক দুরের বন্ধুকে বাদ দিতে হয়। মজার ব্যাপার হলো বিয়ের দিন বিনা দাওয়াতেই প্রায় অর্ধশত বন্ধু এসে হাজির। এবং দাওয়াত না দেয়াতে কেউ কোন মাইন্ড করে নাই। বরং বলছিল, তুই দাওয়াত দিতে ভুলে গেছিস সেটা আমরা বুঝি, কিন্তু আমাদের তো একটা দায়িত্ব আছে !
পাড়াতে বেশ কয়েকজন কট্টর শিবির কর্মী ছিল। শিবিরের অতি তৎপর একটা দায়িত্ব হলো মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া। একবার দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে এলাকার শীর্ষ শিবির নেতা কামাল ভাই আড্ডায় আসলেন। মোলায়েম ভাষায় ‘আসসালামুআলাইকুম’ বলে বসে গেলেন একপাশে। উনি মাবুর পরিচিতি সুত্রে এসেছেন দাওয়াতী কাজে। কিন্তু এখানে ঢুকেই পড়ে গেলেন পারভেজের পাল্লায়। আম্বো তাম্বো গল্পের ঠেলায় দুদিনের মাথায় দ্বীনের দাওয়াত ভুলিয়ে দিল পারভেজ। এক সপ্তাহ পর দেখা গেল কামাল ভাইও মেয়েদের ‘ঠেকা’ দেয়ার পদ্ধতি নিয়ে জমিয়ে আলাপ করছে। দ্বীনের দাওয়াতের কোন খবর নেই আর।
আমাদের আড্ডার একটা বৈশিষ্ট্য ছিল মাঝে মাঝে একেকজনের উপর ভর করে পাড়ার হোটেলে পরোটা, চপ, হালিম ইত্যাদির শ্রাদ্ধ করা। একবার কামাল ভাইয়ের পালা এলো। সহজে রাজী হয় না। শুনেছিলাম হাড় কন্জুস। তবু প্রথমে লজ্জায় ‘হ্যাঁ’ বলে রাজী হলেও রওনা দেয়ার পর যতই হোটেলের কাছাকাছি হচ্ছিলেন ওনার পা যেন ভারী হয়ে উঠছিল। হোটেলের ১০০ গজের মধ্যে পৌছে পুরো শক্ত হয়ে গেল কদমযুগল, আর নড়ে না। ব্যাপার কী? কামাল ভাইকে জিজ্ঞেস করা হলো। কামাল ভাই মিন মিন করে বললেন “একটু বাসায় যেতে হবে যে। মানিব্যাগটা ফেলে এসেছি বোধহয়।”
চেহারা দেখে সন্দেহ করলাম পালানোর ফন্দী করছে। এভাবে ছাড়া যাবে না। আমরা দ্রুত বললাম সাথে যা আছে তাতেই চলবে, ৫০ টাকা এমনকি ২০ টাকা হলেও চলবে, বাকীটা আমরা দেবো, দরকার হলে লোন দেব। কিন্তু তিনি অনড়। আমরা লক্ষন বুঝে দুজন দুহাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে চাইলাম। কিন্তু নড়ানো গেলনা। ছাগলের মতো পা দুটি মাটি কামড়ে আটকে রইল। যতই সামনে টানি ছাগলের মতো উনি উল্টা দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। (ওনার পরে আরো দুজন শিবির নেতা আমাদের আড্ডায় যোগ দিয়েছিল, প্রত্যেকটা হাড় কন্জুস এবং প্রত্যেকের সাথে খাওয়ার পর্বে এসে প্রায় একই অভিজ্ঞতা। হোটেলের কাছাকাছি এলেই নড়ানো যেত না, পায়ে খুটা লেগে যেত। যারা জীবনে একবারও ছাগলের দড়ি হাতে নিয়েছে তারা জানে ছাগলের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দড়ি যেদিকে টানবেন তার উল্টা দিকে হাঁটবে সে।)
কামাল ভাইকে ছাগলের মতো খুটা পায়ে আটকে থাকা দেখে তখুনি পারভেজ এগিয়ে এসে বললো, “দুর ব্যাটা, তোরা তো ছাগল ধরাও শিখলি না। কিভাবে নিতে হয় জানিস না। বাবু আয়তো, তুই বাম পাটা ধর আমি ডান পা ধরি। ত্যাড়া ছাগলকে চ্যাংদোলা করে নিতে হয় ” তিন সেকেন্ডের মধ্যেই চার জোড়া হাতের উপর কামাল ভাই ভাসতে লাগলেন।
সেই আট হাতের দোলনায় কামাল ভাই যখন হোটেলের সামনে পৌছালো, লোকজন বুঝে গেছে আজকের হোষ্ট কে। খাওয়া শেষে কামাল ভাই বেজার মুখে অন্তর্বাসের ভেতর থেকে লুকানো ছোট্ট মানিব্যাগ বের করলো। সেদিনের পর থেকে আড্ডায় যাওয়া কমিয়ে দিলেন তিনি। বুঝলেন দুনিয়াতে ফ্রী বলতে কিচ্ছু নাই। এমনকি আড্ডাও না। সেদিন থেকে প্রকাশ্যে দাওয়াতী কাজের সমাপ্তি ঘটলো পাড়ায়।
ওর বাসাটা ছিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে প্রিয় আড্ডাখানা। ওর বাবা মা ভাই বোন এত আন্তরিক ছিল যে আমরা ওটাকে নিজের ঘরের মতো ব্যবহার করতে পারতাম। ওর রান্নাঘরে ঢুকে ডেকচি উল্টিয়ে মাছ তরকারী নিয়ে খাচ্ছি এটা খুব স্বাভাবিক একটা দৃশ্য ছিল। খাওয়া ঘুম আডডা সব চলতো, কেউ কেউ রাতেও থেকে যেতো বেশী দেরী হয়ে গেলে। পাড়ায় আমাদের ১৬ জনের একটা ম্যারাথন আড্ডা গ্রুপ ছিল। তাছাড়া অতিথি আড্ডাবাজরাও প্রতিদিন আসতো শহরের কোন না কোন অংশ থেকে।
এত বেশী বন্ধুবান্ধব ওর বিয়ের দাওয়াতের সময় একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দাওয়াতের লিষ্টে বন্ধুর সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে যাওয়াতে ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক দুরের বন্ধুকে বাদ দিতে হয়। মজার ব্যাপার হলো বিয়ের দিন বিনা দাওয়াতেই প্রায় অর্ধশত বন্ধু এসে হাজির। এবং দাওয়াত না দেয়াতে কেউ কোন মাইন্ড করে নাই। বরং বলছিল, তুই দাওয়াত দিতে ভুলে গেছিস সেটা আমরা বুঝি, কিন্তু আমাদের তো একটা দায়িত্ব আছে !
পাড়াতে বেশ কয়েকজন কট্টর শিবির কর্মী ছিল। শিবিরের অতি তৎপর একটা দায়িত্ব হলো মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া। একবার দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে এলাকার শীর্ষ শিবির নেতা কামাল ভাই আড্ডায় আসলেন। মোলায়েম ভাষায় ‘আসসালামুআলাইকুম’ বলে বসে গেলেন একপাশে। উনি মাবুর পরিচিতি সুত্রে এসেছেন দাওয়াতী কাজে। কিন্তু এখানে ঢুকেই পড়ে গেলেন পারভেজের পাল্লায়। আম্বো তাম্বো গল্পের ঠেলায় দুদিনের মাথায় দ্বীনের দাওয়াত ভুলিয়ে দিল পারভেজ। এক সপ্তাহ পর দেখা গেল কামাল ভাইও মেয়েদের ‘ঠেকা’ দেয়ার পদ্ধতি নিয়ে জমিয়ে আলাপ করছে। দ্বীনের দাওয়াতের কোন খবর নেই আর।
আমাদের আড্ডার একটা বৈশিষ্ট্য ছিল মাঝে মাঝে একেকজনের উপর ভর করে পাড়ার হোটেলে পরোটা, চপ, হালিম ইত্যাদির শ্রাদ্ধ করা। একবার কামাল ভাইয়ের পালা এলো। সহজে রাজী হয় না। শুনেছিলাম হাড় কন্জুস। তবু প্রথমে লজ্জায় ‘হ্যাঁ’ বলে রাজী হলেও রওনা দেয়ার পর যতই হোটেলের কাছাকাছি হচ্ছিলেন ওনার পা যেন ভারী হয়ে উঠছিল। হোটেলের ১০০ গজের মধ্যে পৌছে পুরো শক্ত হয়ে গেল কদমযুগল, আর নড়ে না। ব্যাপার কী? কামাল ভাইকে জিজ্ঞেস করা হলো। কামাল ভাই মিন মিন করে বললেন “একটু বাসায় যেতে হবে যে। মানিব্যাগটা ফেলে এসেছি বোধহয়।”
চেহারা দেখে সন্দেহ করলাম পালানোর ফন্দী করছে। এভাবে ছাড়া যাবে না। আমরা দ্রুত বললাম সাথে যা আছে তাতেই চলবে, ৫০ টাকা এমনকি ২০ টাকা হলেও চলবে, বাকীটা আমরা দেবো, দরকার হলে লোন দেব। কিন্তু তিনি অনড়। আমরা লক্ষন বুঝে দুজন দুহাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে চাইলাম। কিন্তু নড়ানো গেলনা। ছাগলের মতো পা দুটি মাটি কামড়ে আটকে রইল। যতই সামনে টানি ছাগলের মতো উনি উল্টা দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। (ওনার পরে আরো দুজন শিবির নেতা আমাদের আড্ডায় যোগ দিয়েছিল, প্রত্যেকটা হাড় কন্জুস এবং প্রত্যেকের সাথে খাওয়ার পর্বে এসে প্রায় একই অভিজ্ঞতা। হোটেলের কাছাকাছি এলেই নড়ানো যেত না, পায়ে খুটা লেগে যেত। যারা জীবনে একবারও ছাগলের দড়ি হাতে নিয়েছে তারা জানে ছাগলের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দড়ি যেদিকে টানবেন তার উল্টা দিকে হাঁটবে সে।)
কামাল ভাইকে ছাগলের মতো খুটা পায়ে আটকে থাকা দেখে তখুনি পারভেজ এগিয়ে এসে বললো, “দুর ব্যাটা, তোরা তো ছাগল ধরাও শিখলি না। কিভাবে নিতে হয় জানিস না। বাবু আয়তো, তুই বাম পাটা ধর আমি ডান পা ধরি। ত্যাড়া ছাগলকে চ্যাংদোলা করে নিতে হয় ” তিন সেকেন্ডের মধ্যেই চার জোড়া হাতের উপর কামাল ভাই ভাসতে লাগলেন।
সেই আট হাতের দোলনায় কামাল ভাই যখন হোটেলের সামনে পৌছালো, লোকজন বুঝে গেছে আজকের হোষ্ট কে। খাওয়া শেষে কামাল ভাই বেজার মুখে অন্তর্বাসের ভেতর থেকে লুকানো ছোট্ট মানিব্যাগ বের করলো। সেদিনের পর থেকে আড্ডায় যাওয়া কমিয়ে দিলেন তিনি। বুঝলেন দুনিয়াতে ফ্রী বলতে কিচ্ছু নাই। এমনকি আড্ডাও না। সেদিন থেকে প্রকাশ্যে দাওয়াতী কাজের সমাপ্তি ঘটলো পাড়ায়।
Wednesday, November 19, 2008
চোরের কবলে একটা প্রেম
বন্ধু মাবু বিশ্বপ্রেমিক ধরনের ছেলে। যেখানেই বাসা নিত তার আশেপাশে কারো না কারো সাথে মন দেয়া নেয়া হয়ে যেতো। নতুন এলাকায় বাড়ী করে সবেমাত্র উঠেছে। পাড়া-প্রতিবেশী অত বেশী নেই। কাছাকাছি একটা মাত্র দোতলা বাড়ী আছে। বাড়ীর মালিক দোতলায় থাকেন সপরিবারে। তাঁর এক পুত্র বাপ্পী এক কন্যা লুনা। মাবুর নজর কাড়লো লুনা। যথারীতি চুপি চুপি মন দেয়া নেয়ার চেষ্টা শুরু হলো। কিন্তু মেয়ের বাবার অতীব কড়াকড়িতে প্রেমটা ঠিকমতো গড়ে উঠতে পারছিল না। ফলে রাতের বেলা সবাই যখন ঘুমিয়ে যায় তখন দুজনে ছাদে উঠে চিঠি চালাচালি করে। গোপনীয়তা রক্ষার জন্য চিঠি বিনিময়টা হতো অভিনব পদ্ধতিতে । দুজনের বাড়ীর ছাদ কাছাকাছি ছিল। ওরা চিঠি লিখে একটা ছোট ইট পাথরের মধ্যে পেঁচিয়ে ছুঁড়ে মারতো একে অন্যের ছাদে। এ কাজগুলো করা হতো রাত বারোটার পর। নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় দুজনের প্রেম মোটামুটি ভিত্তিস্থাপনের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল।
একদিন ঝামেলা হয়ে গেল। মাবুর চিঠিটা অল্পের জন্য ফসকে গিয়ে ছাদের কার্নিশে বাড়ি খেয়ে নীচে পড়ে গেলো। ওদিকে নীচে তখন এক চোর লুনাদের একতলায় চুরির ফন্দী করছিল জানালার পাশে দাড়িয়ে। পাথরসহ চিঠিটা পড়বি তো পড় চোরের মাথায়। চোরটা ছিল পাড়ার মুখচেনা ছিঁচকে চোরদের একজন। যারা দিনের বেলায় ভালোমানুষের মতো পাড়ার টুকটাক কাজ করতো, নতুন বাড়ী করলে তাদের মালামাল পাহারা দিত আর সুযোগ পেলে মেরে দিত।
মাবু ছাদের কিনারে গিয়ে চিঠি কোথায় পড়েছে খুঁজতে গিয়ে সেই চেনা চোরের সাথে চোখাচোখি। রাস্তার বাতির হালকা আলোয় দুজন দুজনকে দেখে চিনলো এবং চমকে গেল। চোর দুই ছাদের কিনারে মাবু আর লুনা দুজনকে দাড়ানো দেখে বুঝে ফেলল ঘটনা। চোরের হাতে তখন পাথর সহ চিঠিটা।
ঘটনায় চোর আর মাবু পরস্পরের উপর ক্ষিপ্ত। দুজন দুজনের কাজে বাগড়া দিয়েছে। কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলতে পারছে না। চোর ব্যাথা পেয়েও চুপ। কয়েক সেকেন্ড পর চোর কেটে পড়লো নিঃশব্দে। তবে চিঠিটা মিস হলেও লুনা খুব খুশী হলো মাবু বীরত্বের সাথে চোর তাড়িয়েছে বলে।
পরদিন সকালে চোর ভালমানুষ হয়ে লুনাদের বাসায় গেল। মাবুর চিঠিটা নিয়ে সোজা লুনার বাবার হাতে তুলে দিয়ে বললো, “চাচা বাড়ীর সামনে কাজ করতে গিয়ে পেলাম। দরকারী কাগজ হতে পারে।” লুনার বাপ তো চিঠি পড়ে তেলে বেগুনে জ্বলে আগুন। সোজা মাবুর বাপের কাছে গেল চিঠিটা নিয়ে। মাবুর বাবা চিঠি পড়ে রেগে মেগে মাবুকে ডেকে জানতে চাইল, “হারামজাদা, এটা তোর চিঠি?”
মাবু পুরোপুরি নিশ্চুপ। কি বলবে সে? মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইল। একটা শব্দও বেরুলো না তার মুখ দিয়ে। একফাঁকে জানালা দিয়ে বাইরে দাড়ানো রাতের চোর, দিনের ভালোমানুষটাকে দেখলো। বুঝলো ওই বদমাশটা চুরি করতে না পারার প্রতিশোধটা নিল। কিন্তু লুনার বাবাকে একবারও মুখফুটে বলতে পারলো না, “আংকেল, কাল রাতে ওই ব্যাটা আপনাদের বাসায় চুরি করতে এসেছিল, কিন্তু আমি ঢিল মেরে তাকে তাড়িয়েছি।”
বলতে পারেনি কারন সেই ঢিলকে জড়িয়ে ধরা ছিল কড়কড়ে প্রেমের পত্রটি।
একদিন ঝামেলা হয়ে গেল। মাবুর চিঠিটা অল্পের জন্য ফসকে গিয়ে ছাদের কার্নিশে বাড়ি খেয়ে নীচে পড়ে গেলো। ওদিকে নীচে তখন এক চোর লুনাদের একতলায় চুরির ফন্দী করছিল জানালার পাশে দাড়িয়ে। পাথরসহ চিঠিটা পড়বি তো পড় চোরের মাথায়। চোরটা ছিল পাড়ার মুখচেনা ছিঁচকে চোরদের একজন। যারা দিনের বেলায় ভালোমানুষের মতো পাড়ার টুকটাক কাজ করতো, নতুন বাড়ী করলে তাদের মালামাল পাহারা দিত আর সুযোগ পেলে মেরে দিত।
মাবু ছাদের কিনারে গিয়ে চিঠি কোথায় পড়েছে খুঁজতে গিয়ে সেই চেনা চোরের সাথে চোখাচোখি। রাস্তার বাতির হালকা আলোয় দুজন দুজনকে দেখে চিনলো এবং চমকে গেল। চোর দুই ছাদের কিনারে মাবু আর লুনা দুজনকে দাড়ানো দেখে বুঝে ফেলল ঘটনা। চোরের হাতে তখন পাথর সহ চিঠিটা।
ঘটনায় চোর আর মাবু পরস্পরের উপর ক্ষিপ্ত। দুজন দুজনের কাজে বাগড়া দিয়েছে। কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলতে পারছে না। চোর ব্যাথা পেয়েও চুপ। কয়েক সেকেন্ড পর চোর কেটে পড়লো নিঃশব্দে। তবে চিঠিটা মিস হলেও লুনা খুব খুশী হলো মাবু বীরত্বের সাথে চোর তাড়িয়েছে বলে।
পরদিন সকালে চোর ভালমানুষ হয়ে লুনাদের বাসায় গেল। মাবুর চিঠিটা নিয়ে সোজা লুনার বাবার হাতে তুলে দিয়ে বললো, “চাচা বাড়ীর সামনে কাজ করতে গিয়ে পেলাম। দরকারী কাগজ হতে পারে।” লুনার বাপ তো চিঠি পড়ে তেলে বেগুনে জ্বলে আগুন। সোজা মাবুর বাপের কাছে গেল চিঠিটা নিয়ে। মাবুর বাবা চিঠি পড়ে রেগে মেগে মাবুকে ডেকে জানতে চাইল, “হারামজাদা, এটা তোর চিঠি?”
মাবু পুরোপুরি নিশ্চুপ। কি বলবে সে? মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইল। একটা শব্দও বেরুলো না তার মুখ দিয়ে। একফাঁকে জানালা দিয়ে বাইরে দাড়ানো রাতের চোর, দিনের ভালোমানুষটাকে দেখলো। বুঝলো ওই বদমাশটা চুরি করতে না পারার প্রতিশোধটা নিল। কিন্তু লুনার বাবাকে একবারও মুখফুটে বলতে পারলো না, “আংকেল, কাল রাতে ওই ব্যাটা আপনাদের বাসায় চুরি করতে এসেছিল, কিন্তু আমি ঢিল মেরে তাকে তাড়িয়েছি।”
বলতে পারেনি কারন সেই ঢিলকে জড়িয়ে ধরা ছিল কড়কড়ে প্রেমের পত্রটি।
স্মৃতি থেকে একটা প্রেমপত্র
২৫ বছর আগের আমাদের স্কুলে একটা আলোচিত ছোট্ট একটা প্রেমপত্র। ক্লাস এইটের একটা ছেলে ক্লাস সিক্সের একটা মেয়েকে দুই লাইনের একটা প্রেমপত্র লিখেছেঃ
প্রিয় নীলা,
আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচিব না।
কিন্তু তুমি আমাকে ভালো না বাসিলে আমি ইটা মেরে তোমাদের জানালার সব গ্লাস ভাঙ্গিয়া ফেলিব।
ইতি,
তোমার প্রেমিক মাসুদ
প্রিয় নীলা,
আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচিব না।
কিন্তু তুমি আমাকে ভালো না বাসিলে আমি ইটা মেরে তোমাদের জানালার সব গ্লাস ভাঙ্গিয়া ফেলিব।
ইতি,
তোমার প্রেমিক মাসুদ
রহিম গুন্ডার চোখ মারা
রহিম গুন্ডার কথা মনে পড়লো আজ। সত্তর দশকের মাঝামাঝিতে রহিম আমাদের এলাকায় দাপুটে গুন্ডা। সবাই ভয় করে। শহরে তখন রংবাজ সিনেমার জোশ। রহিমের প্রানপন চেষ্টা রংবাজের রাজ্জাক হবার। রহিমের এক ছোট ভাই ছিল আমার ডাংগুলি বন্ধু। সে কারনে রহিমকে আমি তেমন ভয় পেতাম না। রহিমের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল চোখ মারা। যে কোন সুন্দরী মেয়ে দেখলেই তার বাম চোখটা দুবার ক্লিক করতো। মেয়ে দেখলে চোখ মারার ব্যাপারটা কেন করতে হয় আমি ঠিক বুঝতাম না। খালি ভাবতাম ওটা বড়দের কাজ এবং নিষিদ্ধ জিনিষ। নিষিদ্ধ হবার কারনে মাঝে মাঝে আমরা বন্ধুরা নিজেরা নিজেরা চোখ মারা প্র্যাকটিস করতাম।
রহিম সবচেয়ে বেশী চোখ মারতো রুমা আপাকে। রুমা আপার বাসা ছিল আমাদের ঠিক দোতলায়, উনি খুব সুন্দরী ছিলেন। রুমা আপারা আমাদের বিল্ডিংএর সবচেয়ে বড়লোক। আশেপাশের বিল্ডিংএর মধ্যে একমাত্র ওনাদের বাসায়ই টিভি ছিল যা দেখার জন্য আমরা পিচ্চিরা সব ভিড় করতাম। কলোনীতে তখন যে বাসায় টিভি আছে, বাইরের যে কারোর অলিখিত অধিকার ছিল সে বাসায় গিয়ে টিভি দেখার।
রুমা আপা আর রহিমের মধ্যে প্রেম-ট্রেম জাতীয় কিছু কিনা জানি না। কিন্তু উনি যতক্ষন বারান্দায় বসে থাকতেন রহিম নীচের ইলেকট্রিকের পোলে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো। বামচোখ মেরে যাচ্ছে একটু পর পর। এটা আমাদের নিত্যদিনের দৃশ্য। মাঝে মাঝে চোখ মেরে বাঁ চোখটা বন্ধই করে রাখতো অনেকক্ষন। এরকম ম্যারাথন চোখ মারতে মারতে রহিমের বামচোখটা ছোট এবং কালশিটে হয়ে গিয়েছিল।
একদিন আমার কাজিন রানু আপা বেড়াতে এসেছে বাসায়। রুমা আপাদের কাছাকাছি বয়সী হবেন, এসএসসি দেবেন। সেদিন রানু আপা বারান্দায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিল আমার সাথে। রহিমের চোখের ফোকাস দোতলা থেকে নীচে নেমে আসলো। রানু আপার সাথে চোখাচোখি হবার সাথে সাথে ক্লিক করলো দুবার। রানু আপা প্রথমে ব্যাপারটা বুঝলো না। কিন্তু আবার তাকাতেই একই ঘটনা ঘটলো। রানু আপা ছুটে ভেতরে গিয়ে মাকে বললো ঘটনাটা।
বিকেলে বাবা অফিস থেকে ফেরার সাথে সাথে মা জানালো রহিমের কান্ডের কথা। বাবা রাগী মানুষ। কাপড়চোপড় না বদলেই দৌড়ে বেরুলেন। আমি পিছু পিছু। রহিম তখন সামনের বিল্ডিংয়ের কোনায় দাঁড়িয়ে কী যেন করছিল। বাবা সোজা গিয়ে ঠাশ ঠাশ করে দুগালে দুটো রাম থাপ্পড় বসিয়ে বললো- “হারামজাদা!! তোর এত সাহস আমার বাসার দিকে নজর দেস?? আর যদি কোনদিন তোকে আমার বাসার সামনে দেখি তোর চোখ আমি তুলে ফেলবো।”
রহিম পুরা হতভম্ব। এর আগে তাকে কেউ এভাবে মারে নাই। ভড়কে গেছে তাই। তাছাড়া আমরা চাটগাঁইয়া, লোকাল একটা ব্যাপারও ছিল বোধহয়। রহিম মাফ চেয়ে বললো, “ভুল হয়ে গেছে চাচা, মাফ কইরা দেন। আমি বুঝি নাই” ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর থেকে বাবা বাসায় থাকলে রহিমগুন্ডা আশেপাশেও ভিড়তো না। রুমা আপার সাথে টাংকিটা ছিল আরো অনেকদিন, কিন্তু সতর্কভাবে।
রহিম সবচেয়ে বেশী চোখ মারতো রুমা আপাকে। রুমা আপার বাসা ছিল আমাদের ঠিক দোতলায়, উনি খুব সুন্দরী ছিলেন। রুমা আপারা আমাদের বিল্ডিংএর সবচেয়ে বড়লোক। আশেপাশের বিল্ডিংএর মধ্যে একমাত্র ওনাদের বাসায়ই টিভি ছিল যা দেখার জন্য আমরা পিচ্চিরা সব ভিড় করতাম। কলোনীতে তখন যে বাসায় টিভি আছে, বাইরের যে কারোর অলিখিত অধিকার ছিল সে বাসায় গিয়ে টিভি দেখার।
রুমা আপা আর রহিমের মধ্যে প্রেম-ট্রেম জাতীয় কিছু কিনা জানি না। কিন্তু উনি যতক্ষন বারান্দায় বসে থাকতেন রহিম নীচের ইলেকট্রিকের পোলে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো। বামচোখ মেরে যাচ্ছে একটু পর পর। এটা আমাদের নিত্যদিনের দৃশ্য। মাঝে মাঝে চোখ মেরে বাঁ চোখটা বন্ধই করে রাখতো অনেকক্ষন। এরকম ম্যারাথন চোখ মারতে মারতে রহিমের বামচোখটা ছোট এবং কালশিটে হয়ে গিয়েছিল।
একদিন আমার কাজিন রানু আপা বেড়াতে এসেছে বাসায়। রুমা আপাদের কাছাকাছি বয়সী হবেন, এসএসসি দেবেন। সেদিন রানু আপা বারান্দায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিল আমার সাথে। রহিমের চোখের ফোকাস দোতলা থেকে নীচে নেমে আসলো। রানু আপার সাথে চোখাচোখি হবার সাথে সাথে ক্লিক করলো দুবার। রানু আপা প্রথমে ব্যাপারটা বুঝলো না। কিন্তু আবার তাকাতেই একই ঘটনা ঘটলো। রানু আপা ছুটে ভেতরে গিয়ে মাকে বললো ঘটনাটা।
বিকেলে বাবা অফিস থেকে ফেরার সাথে সাথে মা জানালো রহিমের কান্ডের কথা। বাবা রাগী মানুষ। কাপড়চোপড় না বদলেই দৌড়ে বেরুলেন। আমি পিছু পিছু। রহিম তখন সামনের বিল্ডিংয়ের কোনায় দাঁড়িয়ে কী যেন করছিল। বাবা সোজা গিয়ে ঠাশ ঠাশ করে দুগালে দুটো রাম থাপ্পড় বসিয়ে বললো- “হারামজাদা!! তোর এত সাহস আমার বাসার দিকে নজর দেস?? আর যদি কোনদিন তোকে আমার বাসার সামনে দেখি তোর চোখ আমি তুলে ফেলবো।”
রহিম পুরা হতভম্ব। এর আগে তাকে কেউ এভাবে মারে নাই। ভড়কে গেছে তাই। তাছাড়া আমরা চাটগাঁইয়া, লোকাল একটা ব্যাপারও ছিল বোধহয়। রহিম মাফ চেয়ে বললো, “ভুল হয়ে গেছে চাচা, মাফ কইরা দেন। আমি বুঝি নাই” ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর থেকে বাবা বাসায় থাকলে রহিমগুন্ডা আশেপাশেও ভিড়তো না। রুমা আপার সাথে টাংকিটা ছিল আরো অনেকদিন, কিন্তু সতর্কভাবে।
প্রেম যখন ফাঁস
আমার প্রিয় বন্ধু সাব্বির। যৌবনের শুরুতে সিটি কলেজে ইন্টারে পড়ার সময় সোমা নামের এক মেয়েকে তার খুব ভালো লেগে গেল। মেয়েটা আমাদের ব্যাচে কিন্তু অন্য সেকশানে। তাই কথা বলার অজুহাত পাওয়া যায়না। কিন্তু না পেলে তো চলবে না। এই মেয়ের প্রেম না পেলে জীবন বৃথা, এরকম ধারনা গজিয়ে গেছে ওর মধ্যে।
বলে রাখা ভাল তখন আমাদের মাত্র গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছে মুখে। কিন্তু সিটি কলেজ তখন চট্টগ্রামের শেঠ কলেজ। দু্র্ধর্ষ সব ছাত্রনেতা এই কলেজে। এক ডাকে পুরো শহর কাঁপে। রাস্তায় বাস ড্রাইভার-কন্ডাকটর কোন ছাত্রের সাথে বেয়াদবী করলে পুরো লাইনের বাস সহ ধরে কলেজে নিয়ে আসতো। শহরে তখন যত বাস ছিল সবাইকে নিউমার্কেট দিয়ে ঘুরে যেতেই হতো। সুতরাং যে কোন একটা বেয়াদবীতে ধরা পড়লে রক্ষা নাই। তাই সিটি কলেজ বললে সবাই ভয় পায়। স্বাভাবিকভাবে সেই গরবে গর্বিত সদ্য গোঁফ ওঠা আমরাও।
সাব্বির ভাবলো এটাতো সামান্য একটা মেয়ে, প্রেম না দিয়ে কোথায় যাবে? সোমা বেশ সুন্দরী হলেও সাইজে বেশ বড়সড়, সাব্বিরের চেয়েও বড় ছিল। তাছাড়া মেয়েটা হিন্দু, সে মুসলমান। কিন্তু প্রেমের জন্য সাইজ কোন ব্যাপার না আর আধুনিক মানুষের জন্য ধর্ম কোন সমস্যা না। আমরা মানব ধর্মে বিশ্বাসী, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে প্রেম। সব সমস্যা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে সাব্বির সুযোগের অপেক্ষায় আছে কখন প্রেম নিবেদন করবে। কিন্তু চোখাচোখি ছাড়া আর কোন সুযোগ পাওয়া যাচ্ছিল না। ওর ধারনা সোমাও ওর জন্য খুব আগ্রহী, সেটা তার দৃষ্টি দেখেই বোঝা গেছে। কিন্তু মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। সুতরাং ছেলে হিসেবে তাকেই এগিয়ে যেতে হবে।
একদিন দুপুরবেলা ক্লাস শেষে বেরিয়ে দেখি আর্টস বিল্ডিংয়ের নীচে সোমা একা দাড়িয়ে আছে। ব্যাপার কী, এই ভর দুপুরে বাসায় না গিয়ে মেয়েটা একা একা দাড়িয়ে আছে কার জন্য। সাব্বির বললো, দোস্ত সে নিশ্চয়ই আমাকে কথা বলার সুযোগ দেয়ার জন্য দাড়িয়ে আছে। আজকেই সুযোগ। তুই একটু হেল্প করবি। গিয়ে বলবি আমি ওর সাথে কথা বলতে চাই।
আমি আরো বেশী লাজুক। রাজী হলাম না প্রথমে। কিন্তু সাব্বির আমার পায়ে ধরার অবস্থা। ওকে বাঁচাতে আমাকে এগিয়ে যেতেই হলো। আমি গিয়ে সোমাকে কথাটা বলতেই সোমা হেসে বললো, ঠিক আছে ওকে আসতে বলেন।
সাব্বির এগিয়ে গেলে আমি দুরে সরে এলাম। ওরা নিজেরা নিজেরা ফয়সালা করুক এবার। কিছুক্ষন পর দুর থেকে তাকিয়ে দেখি দুজনে খুব কথা বলছে হেসে হেসে। কি কথা শুনতে পেলাম না। তবে বুঝলাম সাব্বিরের ধারনাই ঠিক। মেয়েটা ওর জন্যই অপেক্ষা করছিল। শালাকে আজকে ধরতে হবে ডায়মন্ডে কাবাব খাওয়াতে।
একটু পর সাব্বির ফিরে এলো উত্তেজিতভাবে। “দোস্ত, মেয়ে তো অনেক ফাস্ট। যা ভেবেছি তারচেয়েও এডভান্স। আমি বলার সাথে সাথে রাজী। কিন্তু সমস্যা হলো সে দেরী করতে চাচ্ছে না। বললো আজকেই সেরে ফেলতে। সে আমাকে এখুনি কোর্টবিল্ডিং-এ নিয়ে যেতে চায় রেজিষ্ট্রি করে বিয়ে করতে। কী করি বলতো এখন?” যুগপৎ খুশী আর দুশ্চিন্তা তার চোখে মুখে।
কোর্ট বিল্ডিং-এর কথায় আমি ঘাবড়ে গেলাম। বললাম “তুই গেলে যা, আমাকে বাসায় যেতে হবে এখন, আমি কোর্টবিল্ডিং-এ যেতে পারবো না।” কেটে পড়তে চাইলাম তখুনি। ওদিকে সোমা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। অপেক্ষা করছে সিদ্ধান্তের। ততক্ষনে সাব্বির বুঝে ফেলেছে ব্যাপারটার গুরুত্ব। পালাতে হবে। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। কিন্তু এভাবে পালালে ইজ্জত থাকবে না। ওকে বললাম, তুই গিয়ে বল- আজকে অনেক দেরী হয়ে গেছে, টাকা পয়সা, সাক্ষী-টাক্ষী যোগাড় করে আগামীকাল সকালে যাবি। সাব্বির কোনমতে কথাটা বলে আসতেই তাড়াতাড়ি রিকশা ডেকে পালালাম ওখান থেকে।
পাদটিকাঃ
ইন্টার পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাব্বিরকে আর্টস বিল্ডিং-এর ধারে কাছেও দেখা যায় নি কখনো।
বলে রাখা ভাল তখন আমাদের মাত্র গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছে মুখে। কিন্তু সিটি কলেজ তখন চট্টগ্রামের শেঠ কলেজ। দু্র্ধর্ষ সব ছাত্রনেতা এই কলেজে। এক ডাকে পুরো শহর কাঁপে। রাস্তায় বাস ড্রাইভার-কন্ডাকটর কোন ছাত্রের সাথে বেয়াদবী করলে পুরো লাইনের বাস সহ ধরে কলেজে নিয়ে আসতো। শহরে তখন যত বাস ছিল সবাইকে নিউমার্কেট দিয়ে ঘুরে যেতেই হতো। সুতরাং যে কোন একটা বেয়াদবীতে ধরা পড়লে রক্ষা নাই। তাই সিটি কলেজ বললে সবাই ভয় পায়। স্বাভাবিকভাবে সেই গরবে গর্বিত সদ্য গোঁফ ওঠা আমরাও।
সাব্বির ভাবলো এটাতো সামান্য একটা মেয়ে, প্রেম না দিয়ে কোথায় যাবে? সোমা বেশ সুন্দরী হলেও সাইজে বেশ বড়সড়, সাব্বিরের চেয়েও বড় ছিল। তাছাড়া মেয়েটা হিন্দু, সে মুসলমান। কিন্তু প্রেমের জন্য সাইজ কোন ব্যাপার না আর আধুনিক মানুষের জন্য ধর্ম কোন সমস্যা না। আমরা মানব ধর্মে বিশ্বাসী, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে প্রেম। সব সমস্যা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে সাব্বির সুযোগের অপেক্ষায় আছে কখন প্রেম নিবেদন করবে। কিন্তু চোখাচোখি ছাড়া আর কোন সুযোগ পাওয়া যাচ্ছিল না। ওর ধারনা সোমাও ওর জন্য খুব আগ্রহী, সেটা তার দৃষ্টি দেখেই বোঝা গেছে। কিন্তু মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। সুতরাং ছেলে হিসেবে তাকেই এগিয়ে যেতে হবে।
একদিন দুপুরবেলা ক্লাস শেষে বেরিয়ে দেখি আর্টস বিল্ডিংয়ের নীচে সোমা একা দাড়িয়ে আছে। ব্যাপার কী, এই ভর দুপুরে বাসায় না গিয়ে মেয়েটা একা একা দাড়িয়ে আছে কার জন্য। সাব্বির বললো, দোস্ত সে নিশ্চয়ই আমাকে কথা বলার সুযোগ দেয়ার জন্য দাড়িয়ে আছে। আজকেই সুযোগ। তুই একটু হেল্প করবি। গিয়ে বলবি আমি ওর সাথে কথা বলতে চাই।
আমি আরো বেশী লাজুক। রাজী হলাম না প্রথমে। কিন্তু সাব্বির আমার পায়ে ধরার অবস্থা। ওকে বাঁচাতে আমাকে এগিয়ে যেতেই হলো। আমি গিয়ে সোমাকে কথাটা বলতেই সোমা হেসে বললো, ঠিক আছে ওকে আসতে বলেন।
সাব্বির এগিয়ে গেলে আমি দুরে সরে এলাম। ওরা নিজেরা নিজেরা ফয়সালা করুক এবার। কিছুক্ষন পর দুর থেকে তাকিয়ে দেখি দুজনে খুব কথা বলছে হেসে হেসে। কি কথা শুনতে পেলাম না। তবে বুঝলাম সাব্বিরের ধারনাই ঠিক। মেয়েটা ওর জন্যই অপেক্ষা করছিল। শালাকে আজকে ধরতে হবে ডায়মন্ডে কাবাব খাওয়াতে।
একটু পর সাব্বির ফিরে এলো উত্তেজিতভাবে। “দোস্ত, মেয়ে তো অনেক ফাস্ট। যা ভেবেছি তারচেয়েও এডভান্স। আমি বলার সাথে সাথে রাজী। কিন্তু সমস্যা হলো সে দেরী করতে চাচ্ছে না। বললো আজকেই সেরে ফেলতে। সে আমাকে এখুনি কোর্টবিল্ডিং-এ নিয়ে যেতে চায় রেজিষ্ট্রি করে বিয়ে করতে। কী করি বলতো এখন?” যুগপৎ খুশী আর দুশ্চিন্তা তার চোখে মুখে।
কোর্ট বিল্ডিং-এর কথায় আমি ঘাবড়ে গেলাম। বললাম “তুই গেলে যা, আমাকে বাসায় যেতে হবে এখন, আমি কোর্টবিল্ডিং-এ যেতে পারবো না।” কেটে পড়তে চাইলাম তখুনি। ওদিকে সোমা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। অপেক্ষা করছে সিদ্ধান্তের। ততক্ষনে সাব্বির বুঝে ফেলেছে ব্যাপারটার গুরুত্ব। পালাতে হবে। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। কিন্তু এভাবে পালালে ইজ্জত থাকবে না। ওকে বললাম, তুই গিয়ে বল- আজকে অনেক দেরী হয়ে গেছে, টাকা পয়সা, সাক্ষী-টাক্ষী যোগাড় করে আগামীকাল সকালে যাবি। সাব্বির কোনমতে কথাটা বলে আসতেই তাড়াতাড়ি রিকশা ডেকে পালালাম ওখান থেকে।
পাদটিকাঃ
ইন্টার পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাব্বিরকে আর্টস বিল্ডিং-এর ধারে কাছেও দেখা যায় নি কখনো।
Thursday, November 13, 2008
একটি মজার সুপারিশ পত্র
চিঠিপত্রের যুগ উঠে গেছে বললেই হয়। দুই আড়াই বছর আগে আমাদের অফিসে একটা চিঠি আসে। একজন অচেনা ভদ্রলোক ব্যবসার সুযোগ এবং আত্মীয় স্বজনের চাকরীর সুযোগ চেয়ে দীর্ঘ একটা পত্র লেখেন। এরকম পত্র আমি আগে কখনো দেখিনি। পত্রটির ভাষা এবং প্রকাশভঙ্গীর ভিন্নতা বেশ মজার, সেকারনে চিঠিটা সংগ্রহে রেখে দেই আমি। আপনাদের সাথে শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারলাম না। ঠিকানা পরিচয় মুছে দিয়েছি সঙ্গত কারনেই।
Subscribe to:
Posts (Atom)