Thursday, June 1, 2023

আমার বাবার মতো....ক্রমশঃ



(ষাটের দশকে বাবা)

প্রায় প্রত্যেক সন্তানের কাছে তার বাবা একজন মহানায়ক। কিন্তু আমার বাবা আমার কাছে কী ছিলেন সেটা আমি জীবদ্দশায় বুঝিনি। বাবা যখন কাছে ছিল তখন আমি বাবার দিকে ভাল করে তাকাইনি। সেজন্য আমার মধ্যে সামান্য একটু আক্ষেপ আছে। আমি বাবার খুব নেওটা ছিলাম একটা বয়স পর্যন্ত। বিদেশ যাবার আগ পর্যন্ত সেটা ছিল। বাবা যখন বিদেশ যায় তখন আমার ৯ বছর। ক্লাস ফোরে পড়ি। বাবা বছরে একবার আসতেন বিদেশ থেকে। এক মাস ছুটি কাটিয়ে আবার ফিরে যেতেন। আট বছর পর বাবা পাকাপাকিভাবে দেশে চলে আসেন। তখন আমি কলেজে উঠে গেছি। বাবার সাথে একটা দূরত্ব চলে এসেছে। স্বাভাবিক বয়সের দূরত্ব। আট বছরে আমি অনেক বড় হয়ে গেছি। আগের মতো বাবার কাঁধে উঠে যেতে পারি না যখন তখন। আমার অনেক বন্ধুবান্ধব হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। স্কুলের বন্ধু কলেজের বন্ধু পাড়ার বন্ধু। তাদের সাথেই আমার সময় কাটে। বাবার সাথে শুধু দরকারী কথা। আবদার আহলাদ ওসব আর কখনো করা হয়নি। কলেজ পেরিয়ে, ভার্সিটি শেষ করে চাকরিতে ঢুকে পড়েছি। খুব কঠিন প্রথম চাকরি। সকাল সাতটা থেকে রাত এগারোটা। মাসে একদিনও ছুটি নেই। বাবার সাথে আর দেখাই হয় না ঠিকমত। দেখা হলেও কথা হয় না। আমি খুব ব্যস্ত। নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। বাবা কিছু বলতে এলেও ভালমতন শুনতাম না। পরে শুনবো বলে এড়িয়ে যেতাম। আসলে আমার তখন প্রচণ্ড বিরক্তিকর একটা সময়। জীবনটা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এত কঠিন চাকরি, অথচ এত কম বেতন, যে কোন সময় চাকরি ছেড়ে দেবো। প্রতি মাসেই ভাবি এই মাসেই শেষ।

ওই সময়টা আমি বাবার কাছ থেকে একদম বিচ্ছিন্ন। আত্মীয় পরিজন বন্ধুবান্ধব সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। কারো জন্যই আমার সময় ছিল না। দাঁতে দাঁত চেপে কোনমতে টিকে থাকাই একমাত্র লক্ষ্য। বাবা তখন আমাকে নিয়ে কী ভাবতেন জানি না। কিন্তু আমার সামান্য চাকরি দিয়ে সংসারের তেমন কোন উপকারে আসতে পারছি না সেটা জানতাম। তবু আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম চাকরি পেতে কারো সাহায্য নেবো না। নিজের যোগ্যতায় যা পাবো সেটাই নেবো। এটা ছিল সেই চ্যালেঞ্জ। বাবা আমার প্রতি হতাশ হয়েছিলেন কিনা আমার কখনো জানা হবে না। কিন্তু আশাবাদী যে ছিলেন না সেটা টের পেতাম। আমার আর কিছু মনে পড়ে না। আমার চাকরি পাবার দেড় বছরের মাথায় বাবা হঠাৎ একদিন আমাদের ছেড়ে গেলেন। সেই ভোরবেলার কথা আমি জীবনে কোনদিন ভুলবো না। পহেলা বৈশাখের সেই ভোরবেলার কথা ভাবলে এখনো আমার চোখ ভিজে যায়। আমার সুস্থ সুন্দর সুপুরুষ বাবা সেদিন চিরতরে চোখের আড়ালে চলে গেল।

এখন মাঝে মাঝে পুরোনো দিনের ছবির অ্যালবাম খুলে বসি। দেখতে দেখতে ভাবি, আমার বাবার মতো সুপুরুষ আমাদের পরিবারের আর একটিও ছিল না। এখনো নেই। বাবা বেঁচে থাকতে এই কথাটা আমার কোনদিন মনে আসেনি কেন সেটা ভেবে খুব অবাক হয়ে যাই।

আমি বাবার মতো এত স্মার্ট কোনদিন হতে পারবো না। কখনো চেষ্টাও করিনি। আমার বাবা শুধু আমাদের পরিবার নয়। আমাদের পুরো গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে স্মার্ট মানুষ ছিলেন। মৃত্যুর পর বাবার এক বন্ধু আমাকে বলেছিলেন- 'তোমার বাবা পটিয়া থানার প্রথম টাই পরা মানুষ'। কথাটা শুনে আমি হেসে দিয়েছিলাম। এটা কেমনতরো যোগ্যতা আবার। কিন্তু বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে মনে হয় কথাটার মধ্যে সত্যতা থাকার সম্ভাবনা আছে। এত সুন্দর করে টাই বাঁধতে পারে তেমন লোক আমি খুব কম দেখেছি। স্যুট ছাড়া বাবার খুব কম ছবিই আছে। বাবার কতগুলো স্যুট ছিল, কতগুলো টাই ছিল আমি কখনো গুনেও দেখিনি। এখন ছবিটার দিকে তাকিয়ে আমার ভাবতে ভালো লাগছে, আমি খুব সাধারণ পুত্র। কিন্তু আমার বাবা ছিলেন অসাধারণ। বাবা চলে যাবার পর সেই অসাধারণ রূপটি আমার চোখে পড়তে শুরু করেছে। বাবা কখনো জানবে না আমি এখন কতটা মুগ্ধ হয়ে তাঁকে দেখি।

আরো পুরোনো কথা:

আমার বাবা আগাগোড়া স্বাবলম্বী মানুষ ছিলেন। তিনি যা কিছু করেছেন সব নিজের যোগ্যতায়, নিজের উপার্জিত আয় থেকে করেছেন। পৈত্রিক সম্পত্তির কানাকড়িও তিনি ভোগ করেননি। গ্রামের জমিজমা সম্পদ কিছুর লোভ করেননি কখনো। পঞ্চাশ দশক থেকে তিনি চট্টগ্রাম শহরে এসে দাদার সাথে থাকতে শুরু করেন। বাসা ছিল ফকিরহাট এলাকায়। দাদার টেইলারিং ব্যবসা ছিল সেখানে। দাদা বাবাকে গোসাইলডেঙ্গা জিআরকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই যে বাবা শহর চিনেছিল, তখন থেকে আগ্রাবাদ এলাকাতেই থিতু হতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে দাদা গ্রামে ফিরে গেলে বাবা শহরে চাকরি নিয়ে একাকী জীবনযাপন করতে শুরু করেন। বন্দরকেন্দ্রিক কাজ ছিল বাবার। একটা নামকরা শিপিং এণ্ড ফরোয়ার্ডিং কোম্পানিতে চাকরি করতেন। বিয়ে করেছিলেন ১৯৬৫ সালে। আমার জন্ম হয়েছিল সিজিএস কলোনীতে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বাবা আমাদের নিয়ে গ্রামে চলে যান। বাবা তখন অন্য জায়গায় বাসা নিয়েছিলেন। সম্ভবত ফকির হাটে কিংবা মোগলটুলীতে। ঠিক মনে পড়ছে না। বাবা যখন গ্রামে ছিল আমাদের নিয়ে শহরের বাসায় বোমা পড়েছিল একবার। বাবার বাসার আসবাবপত্র পুড়ে গিয়েছিল। স্প্রিং এর একটা বিদেশী খাট ছিল, সাথে স্প্রিং এর মেট্রেস। ওটার মাঝখানে বোমা পড়ে গর্ত হয়ে গিয়েছিল। আমরা ছোটবেলায় দেখেছি ওটা। সত্তরের দশকে কলোনীতে বাসা নিয়ে আমাদের গ্রাম থেকে নিয়ে আসেন। ১৯৭৪ সাল থেকে আমরা পাকাপাকিভাবে শহরবাসী হই। তার আগের পাঁচ বছর বোয়ালখালী টু পটিয়া এভাবে ঘুরে ফিরে থাকতাম আমরা। গ্রাম থেকে চলে আসার পেছনে একটা পারিবারিক বিরোধ কাজ করেছিল। বাবা রাগ করে আমাদের নিয়ে চলে এসেছিল।

সেবার চলে আসাতে আমাদের জীবনটা নতুন মোড় নিয়েছিল। নইলে আমাদের গ্রামেই কাটাতে হতো সারাজীবন। ব্যাপারটা কেমন হতো জানি না। কিন্তু আমাদের পড়াশোনা স্কুল পার হতো না এটা নিশ্চিত। কারণ আমাদের সমতূল্য যারা গ্রামে আছে তাদের এইরকম অবস্থা সবার। বাবা শহরে ছোট একটা বাসা নিয়ে থাকতেন। সেই বাসাতেই আমাদের এনে তোলেন। তখন আমরা ভাইবোন তিনজন। এক রুমের একটা বাসা। কলোনীর সবচেয়ে ছোট বাসা ছিল। এইচ টাইপ। সেই বাসাতে আমাদের পাঁচ বছরের বেশি সময় কেটেছিল। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮০। ১৯৭৭ সালে বাবা হুট করে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। কিছুই বুঝতে পারিনি। কেন বাবাকে বিদেশ চলে যেতে হলো। আমাদেরকে গোমদণ্ডির নানাবাড়িতে রেখে চলে গিয়েছিলেন। কলোনীর বাসাটা তখনো ছিল। আমাকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হলো। বাবা বিদেশ যাওয়ার পর কিছুদিন অনিশ্চিয়তা ছিল। কানাঘুষা শুনতাম বাবা কখনো ফিরবে না আর। আত্মীয়স্বজনদের কিছু ফিসফাস চলতো। আমার খারাপ লাগতো কিন্তু কিছু করার ছিল না। বোঝারও উপায় ছিল না। কিন্তু গ্রামে আমার ভালো লাগতো না। আমি শহরের স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। গ্রামের স্কুলটা ভালো লাগেনি। সে কারণে বোধ করি বড় মামার ভরসায় আমরা কলোনীতে ফিরে আসি। আমাদের বাসায় মায়ের চাচাতো ভাই আলমগীর মামাকে থাকার জন্য বলা হয়। আমরা তাঁকে নিয়ে ওখানে থাকতাম। ওটা আমাদের খুব অনিশ্চিত একটা সময়। আমি ক্লাসফোর থেকে ফাইভে উঠলাম। বাবার চিঠি আসতো মাঝে মাঝে। টাকা পাঠাতো কিছু। বড়মামা আমাদের সেই টাকা দিয়ে যেতো। মাসে বোধহয় এক হাজার টাকা পাঠাতো। ওটাই অনেক টাকা আমাদের জন্য। বাসা ভাড়া ছিল দেড়শো টাকার মতো। দুবছর পর বাবা ছুটিতে আসেন। এক মাসের জন্য। আমাদের জন্য একটা বারো ইঞ্চি সাদাকালো টিভি এনেছিলেন। কী যে আনন্দ। এমন চমকপ্রদ জিনিস আমরা আগে কখনো দেখিনি। তবে মাসখানেক পর টিভিটা বিক্রি করে দেয়া হয়। টিভি দেখলে আমাদের পড়াশোনা নষ্ট হবে সে কারণে। তখনো ঘরে ঘরে টিভি চালু হয়নি। পুরো কলোনীতে দশটা টিভিও ছিল না। আমাদের আত্মীয় স্বজনের মধ্যে শুধু শাহীন আপার বাসায় টিভি ছিল। আর কারো টিভি নেই।

বাবা এক মাস ছুটির পর বিদেশে চলে যান আবারো। কিন্তু এবার আর অনিশ্চয়তা নেই। বাবা খুব ভালো একটা কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছেন। অনেক টাকা বেতন। সে আমলে অত টাকা বেতন পেতো না আমাদের আর কোন আত্মীয় স্বজন। মনে হয় ৫ হাজার রিয়াল। বাংলাদেশী টাকায় চল্লিশ হাজার টাকা হবে। হঠাৎ করে আমরা যেন আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাই। আসলে আমাদের জীবনযাত্রার মান তেমন বাড়েনি। শুধু বাসাটা একটু বড় নিয়েছিল সেটাই। তবে আমাদের জীবনটা ঘুরতে শুরু করেছিল তখন থেকে। পরবর্তী অর্ধযুগ আমরা দারুণ আনন্দ এবং স্বচ্ছন্দ্যে কাটিয়েছিলাম। বাবা অনেক জমিজমা সম্পদ করেছিলেন। আট বছর বিদেশ থাকার পর ফিরে এসেছিলেন মোটা অংকের টাকা নিয়ে। ১৯৮৫ সালে। তখন আমি কলেজে উঠে গেছি।


আত্মতৃপ্তি সংলাপ
আমাদের খুব সামান্য মধ্যবিত্ত পরিবার ছিল। সত্তর দশকে বাবা ছোট একটা বেসরকারি চাকরি করতেন। সংসার ভালোই চলতো। তবু আরেকটু উন্নত জীবনের লক্ষ্যে সত্তর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন বাবা। আট বছর পর বিদেশের পাট চুকিয়ে দেশে চলে আসেন। হৃদযন্ত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ফিরে আসার সময় মোটামুটি ভালো অংকের টাকাপয়সা এনেছিলেন। কিন্তু সেই টাকা দ্রুত শেষ হয়ে যায় মাত্র তিন বছরের মধ্যে। শেষ কয়েক বছর বাবা আর্থিক কষ্টে কাটিয়েছিলেন। আমার চাকরিজীবন শুরু হতে না হতেই বাবা মারা গেলেন ১৯৯৭ সালে। আমি ছাড়া বাকী সবাই তখন ছাত্রজীবনে। মা আর চার বোনকে নিয়ে আমার নতুন সংগ্রাম শুরু হলো। শহরে থাকার মতো একটা টিনশেড বাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই। আত্মীয়-স্বজন সবার মধ্যে আমাদের আর্থিক অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। তবু সেই জটিল অবস্থা কাটিয়ে উঠেছিলাম অল্পদিনের মধ্যে। যে পরিবার কিভাবে চলবে সে দুশ্চিন্তা নিয়ে বাবা খুব হতাশ হয়ে পড়েছিল, সে পরিবারের সবাই উচ্চশিক্ষা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল। বাবা কিছুই দেখে যেতে পারেনি। বাবা কখনো জানতে পারবে না বাবার পাঁচ সন্তানের সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পাঠ শেষ করতে পেরেছে, যাদের সাথে তাদের সংসার হয়েছে তারাও সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে পাশ করেছে। সবাই সম্মানজনক চাকরি বাকরি করছে। বাবার সন্তানদের মধ্যে দুজন পিএইচডি করছে। একজন দেশে, আরেকজন ইউরোপের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছে একজন। বাবা কখনো জানতে পারবে না বাবার রেখে যাওয়া অসহায় ছেলেমেয়েগুলো সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে উঠে দাঁড়িয়েছে। সফলতার মুখ দেখেছে। নিজ নিজ চেষ্টায় বাবার মুখ উজ্জ্বল করেছে সবকটি ছেলেমেয়ে। কারো কাছে হাত পাততে হয়নি, সবাই বড় হয়েছে নিজ নিজ যোগ্যতা দিয়ে। এটাই সবচেয়ে বড় আত্মতৃপ্তির বিষয়। টাইম মেশিন থাকলে বাবা এসে দেখে আনন্দিত হতো। এ সময়ে বাবাকে আমি খুব মিস করি। বাবা যে সময়ে সংকটে পড়ে গিয়েছিলেন, আমি সে বয়সে এসে পৌঁছেছি বলে আজকাল বাবার কথা বেশি মনে পড়ে। বাবার কষ্টগুলো আমি অনেক বেশি করে অনুভব করি। বাবা যে বয়সে চলে গিয়েছিলেন সে বয়স থেকে আমি মাত্র কয়েক বছর দূরে। এই বয়সে পৌঁছে আমি জীবনকে নিয়ে তৃপ্ত, কৃতজ্ঞ। জীবনের কাছে আমার আর কোন পাওনা নেই। বাবার রেখে যাওয়া শূন্য পরিবারটি এতদূর আসতে পেরেছে সেটা অনেক বড় সাফল্য।

Sunday, May 7, 2023

কাষ্ঠ অনুবাদ : নমুনা সংরক্ষণ

বিশ্বসাহিত্যের সাথে আমাকে প্রথম পরিচয় করিয়েছিল সেবা প্রকাশনী। সেই কৈশোরে ‘পঞ্চরোমাঞ্চ’ এবং ‘ছয় রোমাঞ্চ’ পড়ে যে আনন্দ পেয়েছিলাম সেটার তূল্য কিছু এখনো পাইনি। সেই থেকে যত অনুবাদ পড়েছি এখনো সেবার অনুবাদই আমার কাছে সেরা হয়ে আছে। কারণ সেবার অনুবাদের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল ঝরঝরে গদ্য দিয়ে পাঠকের কাছে গল্পটা পৌঁছে দেয়া।

একটা উদাহরণ না দিয়ে পারছি না। সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এটিএম শামসুদ্দিনের অনুবাদে জেরোম কে জেরোমের ‘ত্রিরত্নের নৌবিহার’ আমার সবচেয়ে প্রিয় অনুবাদ। এত অসামান্য অনুবাদ আমি আর একটিও পড়িনি। বড় হয়ে মূল ইংরেজিটাও পড়েছি। কোথাও বিচ্যুতি পাইনি। আমার কাছে অনুবাদের আদর্শ হয়ে আছে বইটি।
.
আজকাল অনুবাদ খুব কম পড়ি। অনুবাদ পড়তে ভয় লাগে। আমার ভাষাজ্ঞান শুধুমাত্র ইংরেজি। তাই ইংরেজিতে যতটুকু পাওয়া যায় ততটুকুই পড়ি। অনুবাদ পড়তে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে দেখেছি ইংরেজিতে যে গল্পটি সহজে বুঝতে পেরেছি বাংলায় পড়তে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছি, হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছি। যিনি অনুবাদ করেছেন তিনি ইংরেজিও জানেন না, বাংলাটাও জানেন না। কিছু অনুবাদক আছেন কিছু শব্দার্থ লিখে পাশাপাশি সাজিয়ে যান। তিনি গল্পটা বোঝাতে পেরেছেন কিনা, বাক্যটা শুদ্ধ হয়েছে কিনা, সেদিকে খেয়াল করেন না। সেদিন চিতাবাঘের গতিওয়ালা এক জাতের পাঠকের কথা শুনলাম। আমার ধারণা এরা হলেন চিতাবাঘ অনুবাদক। উদাহরণ দিচ্ছি না তাঁদের ব্যক্তিগত সুনামের কথা ভেবে।
.
অনুবাদ মানে শব্দার্থ নয়। সাহিত্যের অন্যন্য শাখার মতো অনুবাদও একটা শিল্প। অনুবাদক একজন শিল্পী। সেই শিল্পীর দায়িত্ব হচ্ছে গল্পটা মূল ভাষা থেকে নিয়ে অনুদিত ভাষায় পরিবেশন করা। যতটা সম্ভব সহজবোধ্য ভাষায় গল্পটা পাঠকের কাছে পৌঁছানো। অনুবাদকের মূল দায়িত্ব হলো গল্পটা বলা।
.
এখন দেখা যায় অনেক অনুবাদক গল্পটা বলার চেয়ে একগাদা শব্দার্থ লিখে ভরিয়ে ফেলেন। বাক্যটা শুদ্ধ হলো কিনা সেদিকে খেয়াল করেন না। ওটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না। সত্যিকারের উদাহরণ দিতে গেলে অনেকের মান সম্মান কাটা যাবে। তাই একটা কাল্পনিক উদাহরণ দেই। I eat rice অনুবাদ করলে লিখতে হবে ’আমি ভাত খাই’। ‘আমি খাই ভাত’ লিখলে চলবে না। এই সাধারণ জ্ঞানটা ছাড়াই ডজনে ডজনে গল্প অনুবাদ করে যাচ্ছেন অনেকে। নতুনদের কথা ধরছি না। বিখ্যাত অনুবাদকের মধ্যেও এই সমস্যা দেখেছি প্রচুর। শুদ্ধ বাক্য গঠন করা শুধু শব্দার্থ সাজিয়ে হয় না। বাক্যটা অর্থপূর্ণ হতে হবে।
.
আমি যে অনুবাদকের কথা বলছি তাঁর কয়েকটা নমুনা দিচ্ছি।

একটা বাক্য এরকম:
‘She has an aura of antiquity that could just as well have been Indonesian as Andean’


তিনি অনুবাদ করেছেন:
"এনডিনের মতো ইন্দোনেশীয় প্রাচীনত্বের আলোকিত আভা সেখানে ফুটে আছে।"
অর্থাৎ তিনি বোঝেননি এখানে Andean বলতে আন্দেজ অঞ্চলকে বোঝানো হয়েছে। না বুঝেই অসংলগ্ন একটা বাক্য লিখে দায় সেরেছেন।


আরো কয়েকটি অসংলগ্ন বাক্যের নমুনা:
-"ভালোবাসার লুণ্ঠন প্রক্রিয়া এত ভয়ানক হতে পারে, ভেবে সত্যিই অবাক হলাম।"
-"আমার দুটি আসন পরে সেই বৃদ্ধ মহিলা যুদ্ধক্ষেত্রে বিস্মৃত মৃতের মতো তার এগারোটি স্যুটকেস রেখে এক বিব্রতকর অবস্থায় আছে।"
-"জানি, তুমি ঘুমিয়েছ, নিরাপত্তায় নিশ্চিত, অস্বীকৃতির বিশ্বাসী পথে আছো, মুখে অকলঙ্ক রেখা; আমার হাতকড়া লাগানো বাহুর এত কাছে।"
.
এই যে বাক্যগুলো লিখেছেন সেগুলো অর্থবোধক হলো কিনা সেটা ভাবারও প্রয়োজন বোধ করেননি। এরকম উদাহরণ অনুবাদকর্মটির ছত্রে ছত্রে আছে। একই দশা আরো অনেকেরই। বাংলা একাডেমির অনুবাদ পত্রিকাতেও প্রচুর পেয়েছি এই ধরণের অসংলগ্ন অনুবাদ। সবটা বলতে গেলে ঠগ বাছতে গা উজাড় হবে। এমনও দেখেছি সাধারণভাবে যিনি ভালো বাংলা লেখেন, অনুবাদ করতে গেলে তিনি অদ্ভুত সব শব্দ ব্যবহার করেন।

বিস্বাদ সাহিত্যের নতুন একটা উপমা পড়লাম সেদিন। শুকনো কাঠ চিবিয়ে খাওয়া। এসব অনুবাদ পড়তে গিয়ে মনে হয় শুকনো কাঠ চিবিয়ে খেলাম।
.
একটা গল্প তখনই অনুবাদ করা উচিত যখন গল্পটি পড়ে ভালো লাগে। যখন গল্পটিকে ভালোবাসা যায়। তখনই একটা ভালো অনুবাদের সম্ভাবনা থাকে। যদি আপনার ব্যস্ততা থাকে, হাতে সময় না থাকে, তাহলে কাজটা না করাই ভালো। চিতাবাঘের গতিতে অনুবাদ হয় না। সাহিত্য হয় না। চিন্তাশীল কোন কিছুই হয় না।

কাষ্ঠ অনুবাদের নমুনা সংরক্ষণ:

১. ননী ভৌমিক অনুদিত আনা কারেনিনা

"নিজের ওপর এতটুকু জোর না খাটিয়ে তিনি তক্ষুণি পালন করতে লাগলেন যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন কিটিকে- সবার সম্পর্কে সর্বদা ভালো দিকটার কথা ভাবতে হবে, সর্বদা ভালোবাসতে হবে সবাইকে।"

কী কথার কী অনুবাদ! যে অদ্ভুতুড়ে অনুবাদটা করেছেন তার ইংরেজি হলো:
He began at once, and without the slightest effort, to fulfil the promise he had given her-always think well of all people and always to love everyone.

আরেকটি লাইন- "তবে লেভিন ওঁদের সঙ্গে কথা কইলেন তাঁদের মধ্যে আপোস করিয়ে দিতে মতভেদ নরম করিয়ে আনার চেষ্টা করে"।
ইংরেজি হলো - But he talked with them, trying only to reconcile them and soften their objections
(উদাহরণের সংখ্যা এত বেশি হবে যে এতগুলো সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। সংক্ষেপে বলা যায়- বিশাল এই অনুবাদ গ্রন্থটি পুরোপুরি অপচয়।)

ননী ভৌমিক অনুবাদক হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। অনেকের এত প্রিয় যে তার সমালোচনা করতে গেলে রীতিমত শোকাহত হয়ে পড়ে। তিনি অতি ভালোমানুষ ছিলেন। সে কারণে তাঁর অনুবাদের সমালোচনা করা যাবে না। এই বিষয়টা মানা যায় না। সৎ সমালোচনার জায়গা থাকে না তাহলে। আমি তাঁর লেখা উভচর মানুষ পড়ে দেখেছি আনা কারেনিনার দুর্দশা দেখার পর। সেটার অবস্থাও কম বেশি একই। ইংরেজিটা বরং অনেক সহজ। তবু উভচর মানুষ খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। মানুষ আবেগ দিয়ে ভালোবাসে সেই অনুবাদ। আমি আবেগটাকে সম্মান করে কিছু ভুলের উদাহরণ তুলে ধরতে চাই। কাজটা কি অনুচিত হবে? ভুল সংশোধন করা যাবে না। কিন্তু ভুলের কারণে তাঁকে অসম্মান করা হবে?

Sunday, April 30, 2023

গোলাম গোলামী করেছে, রাজা রাজাগিরি

১.

একসময় এই এরাই এসে বলবে, আমরা তখন থেকে জানতাম এমন হবে। উনি যে দিনের পর দিন ভুল করে যাচ্ছেন। ওনাকে নিয়ে যে বাড়াবাড়ি চলছিল, আমরা তখন থেকেই দেখছিলাম। আমরা সব জানতাম আমরা সব দেখছিলাম কিন্তু আমরা কিছু বলিনি। আমরা বরং ওনাকে উস্কে দিয়েছি। মিথ্যার পসরা সাজিয়ে ওনাকে মুগ্ধ করার জন্য আমরা দিনের পর দিন কাটিয়েছি। আমরা ওনার পতনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম মনে মনে। আমাদের সাহস ছিল না প্রকাশ্যে কিছু বলার। বললে আমাদের ঘাড়ে মাথা থাকতো না। আমরা হবুচন্দ্রকে দেখছিলাম, আমরা গবুচন্দ্রকেও দেখছিলাম।

২.

যারা সরকারী চাকরী করেন, তাদের অনেক ক্ষমতা। কিন্তু অধিকাংশ চাকুরে মূলত একেকজন চাকর ছাড়া আর কিছু নয়। মননে মগজে নিরেট নির্বোধ একেকটা মানুষ। সৃজনশীলতার ধারে কাছেও নেই অধিকাংশ কর্মকর্তা কর্মচারী। আমি খুব কম কর্মকর্তাকে দেখেছি মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে। যত বড় অফিসারই হোক না কেন, তার উপরে আরেকজন থাকে। সেই উপরের জনকে ক্রমাগত স্যালুট স্যার ডাকতে ডাকতে প্রত্যেকের গলা শুকিয়ে যায়। আমার মাঝে মাঝে করুণা হয় এদের জন্য। যতটুকু স্যার বলতে হয় এরা তার চেয়ে কয়েকগুন বেশি বলে। দিনের পর দিন এই স্যার স্যার করতে করতে এরা একটা সময় আত্মসম্মানবোধহীন একটা প্রাণীতে পরিণত হয়।


৩.

এতগুলো নিরেট নির্বোধ লোক দেশ চালাবার দায়িত্বে থাকলে দেশের অবস্থা এর চেয়ে ভালো হবার কথা না। দেশ চালাবার কথা রাজনীতিবিদদের। কিন্তু এদেশের রাজনীতি থেকে মগজ নেই হয়ে গেছে অনেক আগেই। মগজ ছাড়া রাজনীতিবিদরা দেশের কর্তা। সেই মগজহীন নেতাদের তোয়াজ করার জন্য তৈরি আছে আরেকদল মগজহীন আমলা। মাঝখানে দুজনের মগজ দখলে নিয়ে বসে আছে ব্যবসায়ীরা। দ্বিগুন মগজের অধিকারী হয়ে ব্যবসায়ীরাই দেশটা চালিয়ে যাচ্ছে রাজনীতিবিদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে।


যেমন রাজা, তেমন প্রজা

 আদিকাল থেকেই উপমহাদেশের সকল রাজা বাদশাহের চরিত্র আর হাড্ডিলোভী কুকুরের চরিত্রের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। কুকুর একটু এগিয়ে থাকবে নৈতিকতায়। সে একটা হাড্ডি পেলে সন্তুষ্ট থাকে কিংবা একটা হাড্ডি চিবানোর সময় আরেকটা হাড্ডির দিকে হাত বাড়ায় না। কিন্তু এই উপমহাদেশের সব রাজা বাদশাহ রাজপুত্র একের পর এক খুনোখুনি করে গেছে সিংহাসন দখল নিয়ে। কে কখন কাকে মেরে সিংহাসন দখল করবে সেটাই ছিল একমাত্র আদর্শ। তাদের জীবনে আর কোন লক্ষ্য নেই। তাদের দুর্ভাগ্য যে এত ক্ষমতা থেকেও তাদের কারো আয়ু একশো বছরও ছিল না। কেউ কেউ চল্লিশ পঞ্চাশেই ঠেসে গেছে। সেই হতভাগা লোভী স্বার্থপর ঘৃণিত চরিত্রের রাজাবাদশাগুলোর কাইজ্জা বিবাদ নিয়ে পৃথিবীতে হাজার হাজার বই লেখা হয়েছে, হচ্ছে হবে। কোটি কোটি ছাত্রছাত্রী সেগুলো মুখস্ত করে পরীক্ষার খাতা ভরিয়েছে। এইসব কুৎসিত কর্মযজ্ঞের ভদ্র একটা নাম আছে, সেটা হলো ইতিহাস। অবশ্য পৃথিবী জুড়ে সব রাজরাজড়াদের ইতিহাস হলো রক্তারক্তির ইতিহাস। আধুনিক পৃথিবীতে ইউরোপেই সবার আগে বুঝতে পেরেছে অতীতের সেই নোংরামিগুলো নিতান্তই অসভ্যতা ছিল। তারা কয়েক দশক ধরে সভ্যতার পথে ফিরে এসেছে। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া কানাডাসহ আরো কিছু দেশও বুঝতে পেরেছে অতীতের কাইজ্জাগুলো লজ্জাজনক ছিল। কিন্তু আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়া এখনো সেই্ উপলব্ধিতে আসেনি। আফ্রিকার মধ্যে এখনো আদিম বর্বরতা বিদ্যমান। দক্ষিণ এশিয়া সভ্যতার পথে্ এগিয়ে থাকার সুযোগ থাকলেও তাদের আদিপুরুষের ঐতিহ্য ধারণ করে এখনো কাইজ্জাপর্ব চালিয়ে যাচ্ছে। অসভ্য দেশগুলোর মধ্যে আমরা নিজেরাও অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন নৈতিকতা নেই, তেমন দেশ পরিচালকদের মধ্যেও নেই। দুই পক্ষই এই কুৎসিত কদাচারকে ঐতিহ্য বলে পালন করে যাচ্ছে। অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রায় প্রতিটি মানুষই অসৎ, ভণ্ড, মিথ্যুক, বিশৃংখল, অনিষ্টকারী। মুখোশ পরা কিছু ভালোমানুষ আছে, ভাল ভাল কথা বলে , কিন্তু ভেতরে চরম ইতরামি লুকিয়ে আছে। একই মানুষের তিনরকম চেহারা হতে পারে। দশ রকমও হতে পারে। যার যতগুলো চেহারা সমাজে সে ততটা গণ্যমান্য উপযুক্ত বিবেচিত। এদেশের রাজা যেমন হাড্ডিলোভী কুকুর, জনতাও হাড্ডিলোভী। কেউ কারো চেয়ে কম না। এই দেশ কেন উন্নতি হয় না, সেজন্য কাউকে দায়ী করে লাভ নেই। বিদেশীরা আমাদের শোষণ করে শূন্য করে দিয়ে গেছে বলে বহুকাল গান গেয়েছে। সেই গান এখনো চলছে। নিজেদের অযোগ্যতা অক্ষমতা ভণ্ডামি আড়াল করার জন্য এইসব গান গাইতে হয়। এটাই দেশপ্রেম বলে বিবেচিত।

প্রকৃতির দাসত্ব বনাম প্রকৃতির শত্রু

কাজ যখন আনন্দদায়ক হয়, তখন কেউ কাজ থেকে ছুটি চায় না। বরং ছুটি শেষ করে কাজে ফিরতে আনন্দ পায়। আমরা অধিকাংশ সময় ব্যয় করি নিরানন্দ কাজে। তাই সপ্তাহের প্রথমদিন থেকেই ভাবতে শুরু করি উইকেণ্ড কবে আসবে। আমাদের প্রাণ আনচান করে ছুটির খোঁজে।  

শৈশবের শিক্ষাজীবন থেকে শুরু হয় আমাদের নিরানন্দকাল। যে বিষয় কিংবা বই পছন্দ নয়, সে বই আমাদের জোর করে হজম করতে হয়। বদহজম করতে করতে শিক্ষাজীবন শেষ হয়। শিক্ষাজীবন শেষ করে যে পেশা আমার পছন্দ নয় সে পেশায় আমাদের ঢুকে যেতে হয়। দিনরাত অপছন্দের কাজ করে মাস শেষে বেতনটা পকেটে পুরে সুখী মানুষের ভান করতে হয়। নিজের পছন্দমত কাজ করে আয় উপার্জন করে সুখে জীবন কাটিয়েছে তেমন লোক আমি অন্তত দেখিনি।


আদিমযুগে মানুষ এতটা নিরানন্দ সময় কাটায়নি। যাযাবার শিকারীরা তাদের কাজের মধ্যেই আনন্দ উত্তেজনা বিনোদন সবকিছু পেতো। শিকারের খোঁজ করতে করতে, খাবারের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে আদিম মানুষ সারা পৃথিবীতে বংশবিস্তার করেছিল। সেই শিকারের যুগ শেষে মানুষ যখন প্রথম চাষাবাদ করতে শেখে তখন থেকে মানুষের মধ্যে দাসত্বের সূচনা হয়। মানুষকে প্রথম দাস বানিয়েছিল জমির ফসল। ফসলের দাসত্ব করার জন্য মানুষ প্রথম ঘর বাঁধতে বাধ্য হয়। পৃথিবীতে স্থায়ী গ্রামের সূত্রপাত হয় ফসলের দাসত্ব করতে গিয়ে। ফসলকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে মানুষ ছুটে বেড়ানোর স্বাধীনতা হারিয়েছিল। ইউভাল নোয়াহ হারারির এই তত্ত্বটা যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য। 



কিন্তু সেই ফসলের দাসত্ব খারাপ কোন ব্যাপার ছিল না। ওটা ছিল আধুনিক সভ্যতার প্রথম উন্মোচন। কিন্তু ফসল দাসত্বের বিবর্তনে মানুষ যে বাণিজ্যের দাসে পরিণত হতে শুরু করেছিল, সেখান থেকেই সভ্যতার সংকট শুরু। ফসল বিক্রি করার অধিকার পেতে, কিংবা অন্যের ফসল দখল করার তাগিদে গিয়ে পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধের জন্ম হয়। অস্ত্র এবং প্রযুক্তির উদ্ভাবনের অধিকাংশই ছিল দূরের জিনিসে হাত বাড়ানোর তাগিদে। নতুন নতুন জমির খোঁজ নিয়ে সেটা অধিকার করাই ছিল আবিষ্কারের যুগের আসল কথা। জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, বিশ্বায়ন সবকিছুই একই লক্ষ্যে ছুটছে। সেই লক্ষ্যটা হলো বাণিজ্য। আধুনিক সভ্য উচ্চশিক্ষিত মানুষদের মধ্যে শিল্প- সাহিত্য-দর্শন-বিজ্ঞান এবং পেশাজীবি কিছু মানুষকে বাদ দিলে বাকী সবাই আসলে বাণিজ্যের দাসত্ব করে। তিনি রাজা-উজির যাই হন না কেন, যত বড় চাকরিই করুক না কেন আখেরে তিনি আসলে বাণিজ্যের দাসত্বই করে যাচ্ছেন। সারা পৃথিবীর সবগুলো যুদ্ধ বিগ্রহ গোলমালের পেছনে কোন না কোনভাবে বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে। কেউ পণ্য বিক্রি করার মতলবে আছে, কেউ মতবাদ বিক্রি করার তালে আছে। অধিকাংশ মানুষ নিজের অজ্ঞাতেই বাণিজ্যের দাসত্ব করে যাচ্ছে। মানুষের বাণিজ্যিক দাসত্বের বয়স অন্তত দশ হাজার বছর। এখনো সেই দাসত্ব সদর্পে বিদ্যমান। 


একুশ শতকে এসে সেই দাসত্বে নতুন সংযোজন হতে যাচ্ছে। মানুষ এবার প্রযুক্তির দাসত্বের সূচনা করেছে। বিশ শতক পর্যন্ত মানুষ প্রযুক্তিকে দাস বানিয়ে একের পর এক উদ্ভাবন করে গেছে। একুশ শতক থেকে মানুষ প্রযুক্তির দাসে পরিণত হতে শুরু করেছে স্বেচ্ছায় এবং স্বজ্ঞানে। প্রযুক্তির উপর যেটা এতদিন নির্ভরশীলতা ছিল, এখন সেটা দাসত্বে পরিণত হয়েছে। প্রচুর মানুষ ঘুম থেকে উঠে প্রথম যে কাজটি করেন মোবাইল স্ক্রিনে চোখ বুলানো। ওই স্ক্রিন হাতে না থাকলে মানুষের দম আটকে আসে।  হাটে মাঠে ঘাটে অফিস আদালতে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় রান্নাঘর বাথরুম সবখানে এই সাড়ে  ইঞ্চির রঙিন পর্দা মানুষকে দখল করে রেখেছে। এখন তার সাথে যুক্ত হবে এআই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। নতুন প্রযুক্তির মহাযুগ। আগামী কয়েক যুগ মানুষ হয়তো এই নতুন প্রভুর দাসত্ব করবে।


বিশ্বব্যাপি সর্বগ্রাসী এই দাসত্ব চক্রের বাইরে অল্প কিছু মানুষ আছে যারা কিছুটা স্বাধীন। যাদের বড় অংশ হলো আদিবাসী। এখনো পৃথিবীর যেখানে আদিবাসী আছে তাদের জীবন আধুনিক মানুষের মতো নিরানন্দ নয়। এমনও জাতি আছে যারা যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু চাষ করে। বাকীটা সময় স্বাধীন আনন্দে কাটায়। দেড়শো বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন জঙ্গলে এক অভিযানে গিয়ে এক বৃটিশ কর্মকর্তা বলেছিলেন এই পার্বত্যবাসীরা যে কোন উন্নত ইউরোপীয়ানের চেয়ে স্বাধীন জীবনযাপন করে। কথাটা এই যুগেও সমান সত্য। অথচ সভ্য মানুষেরা এইসব আদিবাসীদের কোণঠাসা করতে করতে প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছে। নিজের মতো করে বিচ্ছিন্ন থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে বারবার। কোন না কোন রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব উদ্ভাবিত অদ্ভুত ভৌগলিক রাজনৈতিক অধিকারবোধে  তাদেরকে রাষ্ট্রীয় সীমানাভুক্ত করে। 


অথচ কারো দাসত্ব না করে পৃথিবীতে একমাত্র স্বাধীন জীবন কাটাতে পারতো সেই আদিবাসী মানুষেরাই। প্রকৃতির সন্তান, প্রকৃতির দাসত্ব করে জীবন কাটাতে পারতো।  প্রকৃতির দাসত্বই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম দাসত্ব। যেখানে আধুনিক মানুষ নেই সেখানকার প্রকৃতিই সবচেয়ে সুন্দর। প্রকৃতির স্বঘোষিত শ্রেষ্ঠ সন্তান আধুনিক মানুষ প্রতিনিয়ত প্রকৃতি ধ্বংস ডেকে আনছে। মানুষ ছাড়া জগতের সব প্রাণী প্রকৃতির দাসত্বই করে।


যুদ্ধ, শান্তি, সাহিত্য, নোবেল এবং রবীন্দ্রনাথের রসবোধ

একদম গোড়া থেকে না হলেও নোবেল পুরস্কার নিয়ে মাঝে মাঝে কিছু কৌতুককর ব্যাপার ঘটেছে। যার কিছু কিছু মর্মান্তিক কৌতুক। নোবেল পুরস্কারের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজনীতি চলে শান্তি পুরস্কার ঘোষণায়। তামাশার ব্যাপার হলো শান্তি পুরস্কারের একটা অংশ পেয়েছেন অশান্তির জনকেরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উইনস্টন চার্চিলও শান্তিতে নোবেল পেয়ে যেতেন, নেহাত লোকলজ্জার খাতিরে বাধ্য হয়ে তাঁকে সাহিত্যে নোবেল দেয়া হয়েছিল।

১৯৩৮ সালে হিটলার ক্ষমতায় এসে ঘোষণা করলেন এই পুরস্কার দেয় ইহুদীরা, সুতরাং জার্মান কোন নাগরিক এই পুরস্কার নিতে পারবে না। সে বছর একজন জার্মান বিজ্ঞানী রিচার্ড কুন নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। তিনি পুরস্কারটা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হলেন। পরের সাত বছর অবশ্য জার্মান দূরে থাকুক, গোটা পৃথিবীতে কেউ নোবেল পুরস্কার পায়নি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামায়।

রাশিয়ানদের কাছে নোবেল পুরস্কার ব্যাপারটার সাথে প্রেম আর বিদ্বেষ দুটোই ছিল। ১৯৫৮ সালে যখন বরিস প্যাস্টারনাককে নোবেল দেয়া হলো তখন রাশিয়ান সরকার ক্ষেপে ছিল বলে তিনি ভয়ে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আবার ১৯৬৫ সালে মিখাইল শোলোকভকে যখন দেয়া হলো তখন রাশিয়ানরা উৎসব করেছিল। কিন্তু ১৯৭০ সালে সোলজেনেৎসিন পুরস্কার পাওয়ার পর রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ সেটাকে সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেছিল। তবে পাবলো নেরুদাকে যখন নোবেল পুরস্কার দেয়া হলো তখন রাশিয়ান সরকারের শীর্ষ কর্তারা তাঁকে অভিনন্দিত করেছিলেন। বলেছিলেন,তিনি আমাদেরই লোক। রাশিয়ানদের এই নোবেল রসিকতা অবশ্য রাজনীতির মেরুকরণের খেলা।

অন্যদিকে ল্যাটিন আমেরিকার হোর্হে লুই বোর্হেস নিজের কপাল নিজেই পুড়িয়েছিলেন। রসিকতা করতে গিয়ে তিনি নোবেল পুরস্কার হারিয়েছিলেন। সত্তর দশকের গোড়া থেকেই তিনি প্রতিবছর মনোনয়ন তালিকায় ছিলেন এবং যে বছর তিনি পুরস্কারের জন্য চুড়ান্তভাবে নির্বাচিত হতে যাচ্ছিলেন সে বছরই তিনি ভুলটা করেছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর- পুরস্কারের চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের এক মাস আগে বুয়েনাস আয়ার্সের এক সরকারী অনুষ্ঠানে চিলির কুখ্যাত স্বৈরশাসক অগাস্টো পিনোচেটের সাথে দেখা হয়েছিল তাঁর। সেখানে তিনি পিনোচেটের উপস্থিতিতে একটা বক্তৃতায় বলেছিলেন- “হে মহামান্য প্রেসিডেন্ট, এটা আমার জন্য বিরাট সৌভাগ্য যে আমি আপনার কাছে আসার সুযোগ পেয়েছি….আর্জেন্টিনা, চিলি এবং উরুগুয়েতে আজ স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে….. কমিউনিজমের মাধ্যমে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে পতিত হওয়া একটা মহাদেশে এটা সম্ভব হয়েছে আপনার জন্য….”

এরকম আরো অনেক স্তুতির মধ্যে পিনোচেট ভেসে গিয়েছিলেন। বোর্হেসকে তিনি মেডেল দিয়ে অভিনন্দিত করেছিলেন। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মতে এই স্তুতি মূলত বোর্হেসের একটা রসিকতা ছিল মাত্র। কিন্তু সুইডিশ একাডেমির সদস্যরা সেই রসিকতা ধরতে পারেননি। সেই ঘটনার পর থেকে বোর্হেসের নামটা পুরস্কারের সম্ভাব্য তালিকা থেকে বাদ পড়ে গিয়েছিল। সে বছর বোর্হেসের বদলে তড়িঘড়ি করে মার্কিন সাহিত্যিক সল বেলোকে নোবেল পুরস্কার দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বোর্হেস অবশ্য একবার দুঃখ করে বলেছিলেন প্রতি বছর এই পুরস্কারের জন্য তিন মাস ধরে টেনশানে থাকা আর ভালো লাগে না। তিনি কৌতুক করতে গিয়ে পুরস্কারের সুযোগ হারিয়ে টেনশান মুক্ত হয়েছিলেন সেটাই লাভ।

কিন্তু আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পুরস্কারের প্রতিক্রিয়ায় ১৮ নভেম্বর ১৯১৩ তারিখে তার বন্ধু রোদেনস্টাইনকে যা বলেছিলেন সেটা মনে হয় সবচেয়ে সেরা:

“আমাকে যে নোবেল পুরস্কারের মতো একটা বিশাল সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে, এই সংবাদ পাওয়ামাত্র আপনার আপনার কথা মনে পড়ল- ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা সহ। আমি নিশ্চিত যে আমার বন্ধুদের মধ্যে আপনিই এই সংবাদে সবার চেয়ে বেশি আনন্দিত হবেন। তবে তা হলেও এটা আমার পক্ষে শাস্তিস্বরূপ হয়ে দাঁড়ালো। এর ফলে জনতার উত্তেজনা এমন ঘূর্ণবার্ত্যার মতো আবিল হয়ে উঠছে যে সেটা আমার পক্ষে অত্যন্ত ভীতিকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কুকুরের লেজে একটা টিনের কৌটো বেঁধে দিলে সে যেমন শব্দ ছাড়া নড়তে পারে না। যেখানে যায় শব্দটা তাকে তাড়া করে বেড়ায়, আর চারধারে দর্শকদের ভিড় জোটায়, আমার অবস্থাটা তার চেয়ে খুব একটা ভালো নয়। গত কদিন ধরে চিঠি আর টেলিগ্রামের ভিড়ে আমি দমবন্ধ হয়ে মারা যেতে বসেছি। যারা সারা জীবনে আমার একটা লাইনও পড়েনি তারাই হৈ চৈ আরম্ভ করেছে বেশি। আসলে তারা সম্মান জানাচ্ছে আমার সম্মানটাকে, আমাকে নয়। একমাত্র যা আমাকে তৃপ্তি দিচ্ছে তা হল, এই উপলক্ষে আমার স্কুলের ছেলেদের অবিমিশ্রিত আনন্দ।”

রবীন্দ্রনাথের রসবোধ তাঁর সাহিত্যবোধের চেয়ে মোটেও কম কিছু না।



সূত্র:

-Imperfect Encounter: Letters of William Rothenstein and Rabindranath Tagore, Harvard University Press,1972

-The Specter of the Nobel Prize- El País, Madrid, October 8, 1980

-The Nobel Prize: A History of Genius, Controversy and Prestige- Burton Feldman Arcade; 1st edition (October 9, 2012)


Saturday, April 8, 2023

গরীব হইবার সামর্থ্য

"অনেকের গরীব-মানুষি করিবার সামর্থ্য নাই। এত তাহাদের টাকা নাই যে, গরীব-মানুষি করিয়া উঠিতে পারে। আমার মনের এক সাধ আছে যে, এত বড় মানুষ হইতে পারি যে, অসঙ্কোচে গরীব-মানুষি করিয়া লইতে পারি! এখনো এত গরীব মানুষ আছি যে গিল্টি করা বোতাম পরিতে হয়, কবে এত টাকা হইবে যে সত্যকার পিতলের বোতাম পরিতে সাহস হইবে!

এখনো আমার রূপার এত অভাব যে অন্যের সমুখে রূপার থালায় ভাত না খাইলে লজ্জায় মরিয়া যাইতে হয়। এখনো আমার স্ত্রী কোথাও নিমন্ত্রণ খাইতে গেলে তাহার গায়ে আমার জমিদারীর অর্দ্ধেক আয় বাঁধিয়া দিতে হয়! আমার বিশ্বাস ছিল রাজশ্রী ক বাহাদুর খুব বড়মানুষ লোক। সে দিন তাঁহার বাড়িতে গিয়াছিলাম, দেখিলাম তিনি নিজে গদীর উপরে বসেন ও অভ্যাগতদিগকে নীচে বসান, তখন জানিতে পারিলাম যে তাঁহার গরীব-মানুষি করিবার মত সম্পত্তি নাই।

এখন আমাকে যেই বলে যে, ক রায়বাহাদুর মস্ত বড়মানুষ লোক, আমি তাহাকেই বলি,"সে কেমন করিয়া হইবে? তাহা হইলে তিনি গদীর উপর বসেন কেন?" উপার্জ্জন করিতে করিতে বুড়া হইয়া গেলাম, অনেক টাকা করিয়াছি, কিন্তু এখনো এত বড়মানুষ হইতে পারিলাম না যে আমি বড়মানুষ এ কথা একেবারে ভুলিয়া যাইতে পারিলাম। সর্ব্বদাই মনে হয় আমি বড়মানুষ। কাজেই আংটি পরিতে হয়, কেহ যদি আমাকে রাজাবাহাদুর না বলিয়া বাবু বলে, তবেই চোক রাঙাইয়া উঠিতে হয়।

যে ব্যক্তি অতি সহজে খাবার হজম করিয়া ফেলিতে পারে, যাহার জীর্ণ খাদ্য অতি নিঃশব্দে নিরুপদ্রবে শরীরের রক্ত নির্ম্মাণ করে, সে ব্যক্তির চব্বিশ ঘণ্টা "আহার করিয়াছি' বলিয়া একটা চেতনা থাকে না। কিন্তু যে হজম করিতে পারে না, যাহার পেট ভার হইয়া থাকে, পেট কামড়াইতে থাকে, সে প্রতি মুহূর্ত্তে জানিতে পারে যে, হাঁ, আহার করিয়াছি বটে।

অনেকের টাকা আছে বটে, কিন্তু নিঃশব্দে টাকা হজম করিতে পারে না, পরিপাকশক্তি নাই-- ইহাদের কি আর বড়মানুষ বলে! ইহাদের বড়মানুষি করিবার প্রতিভা নাই। ইহারা ঘরে ছবি টাঙ্গায় পরকে দেখাইবার জন্য; শিল্পসৌন্দর্য্য উপভোগ করিবার ক্ষমতা নাই, এই জন্য ঘরটাকে একেবারে ছবির দোকান করিয়া তুলে। ইহারা  গণ্ডা গণ্ডা গাহিয়ে বাজিয়ে নিযুক্ত রাখে, পাড়াপ্রতিবেশীদের কানে তালা লাগাইয়া দেয়, অথচ যথার্থ গান বাজনা উপভোগ করিবার ক্ষমতা নাই। এই সকল চিনির বলদদিগকে প্রকৃতি গরীব মনুষ্য করিয়া গড়িয়াছেন। কেবল কতকগুলা জমিদারী ও টাকার থলিতে বেচারাদিগকে বড়মানুষ করিবে কি করিয়া?"

[গরীব হইবার সামর্থ্য- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]