Thursday, December 12, 2013

বাংলাদেশের দানবাধিকার ত্রাতা জাতিসংঘ?


মাসুদা ভাট্টির চমৎকার একটা লেখা পড়লাম আজ বাংলানিউজ২৪ডটকমে

মানবের বিরুদ্ধে দানবের যুদ্ধ চলছে বাংলাদেশে

মাসুদা ভাট্টি, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম



বিএনপি
'র ভাইস-চেয়ারম্যান শমসের মোবিন চৌধুরী ঠিকই বলেছেন, দেশে যুদ্ধাবস্থাই চলছে। একে যদি যুদ্ধাবস্থা না বলি তাহলে আর কাকে বলা যাবে? কিন্তু এ যুদ্ধ কার বিরুদ্ধে কে করছে?

এরকম প্রশ্ন নিয়ে যদি আজকের তরুণ প্রজন্মের সামনে দাঁড়াই তাহলে তারা নিঃসন্দেহে বলবে যে, এ যুদ্ধ মানবের বিরুদ্ধে দানবের; শুভ
'র বিরুদ্ধে অশুভ'র। দুঃখজনক সত্যি হলো, এদেশের একদল অশুভাকাঙ্ক্ষীর সঙ্গে বিদেশের একদল "লোভাতুর" ব্যক্তি মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে দানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আজ আদা-জল খেয়ে লেগেছে।

আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলা উচিত নয় এবং তা দেশের প্রচলিত আইনি ব্যবস্থাকে প্রশ্নেরই সম্মুখীন করে মাত্র। কিন্তু এ প্রশ্ন তো আজ তোলা প্রয়োজন যে, যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কাদের মোল্লার ফাঁসি যেভাবে গতকাল (১০ ডিসেম্বর, ২০১৩) রাতে বন্ধ করা হলো, কোনো উন্নত গণতান্ত্রিক দেশেও এ ধরনের নজির পাওয়া যাবে না। আমরা এতোদিন শুনে আসছিলাম যে, এ দেশে আইনের শাসন নেই, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা হচ্ছে না। কিন্তু কালকে যে কাজটি আদালত প্রাঙ্গণ থেকে জেলখানা পর্যন্ত ঘটলো তাকে আমরা কোন্ মানদণ্ডে বিচার করবো? এরপরও কি আমাদের শুনতে হবে যে, বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানের হয়নি?

এতোটা দ্রুততার সঙ্গে যেদেশে একজন রাষ্ট্র-বিরোধী দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির ফাঁসির রায় স্থগিত করা যায় সেদেশে আইনের শাসন আছে, সেকথা কি পাগলেও বিশ্বাস করবে? না করা উচিত? কিন্তু এদেশ সব সম্ভবের দেশ।

এদেশে ফাঁসির আসামিকে বাঁচানোর জন্য দেশব্যাপী চরম সহিংসতার ঘটনা ঘটে। গণ-পরিবহনে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়। রেললাইন উপড়ে ফেলে হাজারে হাজারে যাত্রীর জীবননাশের চেষ্টা চলে। মিডিয়াকে ব্যবহার করা হয় যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য মিথ্যাচারের কাজে। তারপরও এদেশে মানবাধিকার লংঘিত হচ্ছে বলে বিশ্বের বড় বড় মানবাধিকারবাদীরা প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লেখেন।

আমরা জানি যে, জাতিসংঘ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে কাদের মোল্লার ফাঁসি স্থগিত করার জন্য
আমরা সত্যিকার জাতিসংঘের কথা বলছি কিন্তু! যারা সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসি কার্যকর করার সময় সেদেশের প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে চুপ করে ছিল। আমরা সেই জাতিসংঘের কথা বলছি যারা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা-দৃশ্য সুদূর মার্কিন মুলুকে বসে সরাসরি সম্প্রচার-কাণ্ডে কোনো কথা বলেনি। এ জাতিসংঘ সেই জাতিসংঘ যারা ১৯৭১ সালে এদেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছিলো, চলছিলো হলোকাস্টের চেয়েও ভয়ঙ্কর ঘটনা তখন চুপ করে না থেকে পাকিস্তানকে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা করে দিয়েছিল গণহত্যা চালিয়ে যেতে।

শুধু জাতিসংঘ নয়, ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে দেয়া ফাঁসির রায়কে মানবাধিকার লংঘন বলে অভিহিত করে এ রায় যাতে কার্যকর করা না হয় তার অনুরোধ জানিয়েছে। বাহ্ চমৎকার!! ২০১১ সালে সৌদি আরবে ৮ বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ করা হয় একজন মিশরীয়কে হত্যার জন্য। কিন্তু পরে প্রমাণিত হয় যে, তারা নির্দোষ ছিলো। কিন্তু এ নিয়ে কোনো শব্দ আমরা শুনিনি পশ্চিমাদের দিক থেকে। বাদ দিই বাংলাদেশীদের কথা, তারা তো মিসকিন গোত্রের।

২০১২ সালে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে সবচেয়ে বেশি ফাঁসি/মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় চীনে। তালিকায় ক্রমানুসারে চীনের পরেই রয়েছে ইরান, ইরাক, সৌদি আরব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইয়েমেন, সুদান, আফগানিস্তান, গাম্বিয়া এবং জাপান। সংখ্যানুসারে ফাঁসি/মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সংখ্যা চীনে ২০১২ সালে এক হাজারের ওপরে, ইরানে ৩১৪, জাপানে ৭ এবং এর মধ্যবর্তী দেশগুলির প্রত্যেকটিতেই দশটিরও অধিক; যুক্তরাষ্ট্রে ৪৩ জন। এবার বলুন মহাশয়, এতো এতো ফাঁসির ঘটনার কোথায় আপনাদের
"মহান বিবেক" কেঁদেছিল? কোথায় আপনারা চিঠি দিয়ে ফাঁসির রায় স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন? আমরা এ বিষয়ে কিছু জানি না, ব্যাপারটা খোলাসা করলে খুশি হই খুউব!!!

১৯৭১ নিয়ে আপনারা উচ্ছ্বসিত না হোন, তাতে আপনাদের দোষ দেবো না। কারণ, ১৯৭১ সালে বাঙালি যা অর্জন করেছিল তা আপনারা অনেকেই চান নি। চাইবেন কেন? পৃথিবীর কোনো দেশেই জনগণের প্রাণের দাবির প্রতি আপনাদের সমর্থন থাকার কথা নয়, নেইও। কারণ তাতে, আপনাদের নিজেদেরই অনেকেরই পশ্চাদ্দেশ উদোম হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। আমরা সে ভয়ের কারণটা বুঝি। বুঝি বলেই কিন্তু আপনারা যখন ইরাক আক্রমণ করেন, আমরা কথা বলি না।

চুপ করে থাকি, আর ভাবি যে, বড় ভাইয়ের সিদ্ধান্ত, আমরা ছোট মানুষ চুপ করে থাকাটাই নিরাপদ। আমাদের মতো ছোটরা কেউ যদিবা মুখ খোলে তার ওপর আপনাদের
"স্যাংকসনের" খড়্গ নেমে আসতে সময় নেয় না।

তাই ভয়ও পাই খুউব। কিন্তু ১৯৭১ যেহেতু বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে একমাত্র বড় অর্জন সেহেতু এ নিয়ে বাঙালির উচ্ছ্বাসকে আপনারা থামিয়ে দিতে চেয়েছেন ১৯৭৫ সালেই। আমরা সে-ও সহ্য করে এগিয়ে এসেছি। আবার আজকে যখন ১৯৭১ সালের অপরাধীদের বিচার করছি আপনাদেরই দেখানো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে (নুরেমবার্গ ট্রায়ালসহ অন্যান্য দেশে গণহত্যার বিরুদ্ধে বসানো স্বীকৃত কমিশন অনুসরণে) তখন আপনারা বলছেন, বিচার আন্তর্জাতিক মানের হয়নি।

আপনারা ধূয়া তুলছেন মানবাধিকারের। কিন্তু মশাই, ১৯৭১ সালে ওরা তো মানবের মতো কাজ করেনি, কাজ করেছে দানবের মতো। আপনারা ওদের জন্য
'মানবাধিকার' শব্দটি খরচ না করে 'দানবাধিকার' শব্দটি প্রয়োগ করলে যথার্থ হতো বলে আমরা মনে করি। মানবে আর দানবে যে বিশাল পার্থক্য রযেছে সেটি আপনাদেরকে বুঝতে হবে। আপনারা বুঝবেন না জানি, কারণ, আপনাদের কাছে পৌঁছেছে দানবের বাণী, মানবের বাণী আপনাদের কানে কখনও পৌঁছেনি, পৌঁছবেও না কোনোদিন।

আজকে বাংলাদেশের দিকে তাকান। কী দেখতে পান? দেশটা জ্বলছে। আপনাদের কি ধারণা? এ কেবল রাজনীতির কারণে? দু
'টি রাজনৈতিক দল ঐকমত্যে পৌঁছতে পারছে না, সেজন্য? একটুও না। যারা এরকমটি মনে করেন, তারা হয় অতি সরল, নয় অতি চালাকসরল বলছি এ কারণে যে, তারা শুধু ওপরে ওপরে দু'টি পক্ষের রাজনৈতিক কোন্দল দেখতে পাচ্ছেন। তারা ভুলে গিয়েছেন যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক কোন্দল অতীতেও হয়েছে কিন্তু এরকম সহিংসতা, এতো অগ্নুৎসব কখনও হয়নি। প্রাণহানিও হয়নি এমন।

তারা সরল বলে সেসব বিচারের পক্ষপাতি নয়। আরা যারা চালাক তারাতো এসবই চাইছেন, যাতে এই আগুনে তারা ক্ষমতার ছোলা পুড়িয়ে খেতে পারেন। জাতিসংঘ, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন--- আপনারা তো সকলেই বিবেকবান, সকলেই বুদ্ধিমান আর মানবতাবাদী। একটু মানবিকভাবে বিষয়টা ভেবে দেখুন তো! এই সেদিনও যারা এদেশকে আফগানিস্তান বানানোর হুমকি দিয়েছে, এদেশের সৃষ্টিশীল মানুষদের কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছে, সারাদেশে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এদেশকে একটি ধর্মভিত্তিক উগ্রবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছে আজকে তাদের জন্য আপনাদের মানবতাবাদী বিবেকের দরদ উথলে উঠেছে।

আপনারা তো গণতন্ত্রবাদী, সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়কে মেনে নেন। আপনারা নিশ্চয়ই মানবেন যে, ২০০৮ সালে এদের বিপক্ষেই একটি রাজনৈতিক দলকে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ক্ষমতায় পাঠিয়েছিল এদেশের জনগণ। আপনারা নিশ্চয়ই একথাও মানবেন যে, তারা তাদের নির্বাচনীয় ইশতাহারেও ১৯৭১ সালের মানবতা-বিরোধী অপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি জনগণকে দিয়েছিল।

এখন যখন জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি তারা রক্ষা করতে চাইছে তখন কেন আপনাদের বিবেকের দংশন (?) হচ্ছে, জানতে পারি কি? জানি, এ উত্তর অজ্ঞাত, আপনাদেরও হয়তো জানা নেই।

কোন্ সে যাদু আপনাদের মানবাধিকারবোধকে জাগ্রত করছে তা আপনারাই ভালো বলতে পারবেন, আমাদের তা না জানলেও চলবে।

তবে, একটা কথা। একটু আগেই বলেছি, এদেশে এখন চলছে যুদ্ধাবস্থা। দুই বিবদমান রাজনৈতিক দলের একপক্ষের ভাইস চেয়ারম্যানই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে সেটি স্বীকার করেছেন। তিনি আপনাদেরই উদাহরণ টেনেছেন, বলেছেন, আফগানিস্তান এবং ইরাকের কথা।

এবং এটাই বলতে চেয়েছেন যে, ওখানে যদি মানবাধিকার লংঘন না হয়ে থাকে, আপনারা দোষ না করে থাকেন তাহলে এদেশেও তারা এই হত্যা, ধ্বংস আর মিথ্যাচার চালিয়ে অন্যায় কিছু করছেন না। এবার বুঝুন তবে, আপনারা কিন্তু সবদিক দিয়েই ব্যবহৃত হচ্ছেন:

 এক. আপনাদের দিয়ে বলানো হচ্ছে যে, এদেশে মানবাধিকার লংঘিত হচ্ছে; দুই. আবার আপনাদের মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাই উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ক্ষতিটা কিন্তু আপনাদেরই হচ্ছে। পৃথিবীটা তো গোল, একা পশ্চিমও চলতে পারে না, পুবও পারবে না। তাই আপনারা পুবকে এভাবে আহত করে ছেড়ে দিলে আপনারা এক সময় বিচ্ছিন্ন হবেন, সন্দেহ নেই। আপনাদের গবেষকরাই কিন্তু বলছে,
"পুব জাগছে"
(ইস্ট ইজ রাইজিং)। এখন প্রশ্ন হলো, এই জাগন-প্রক্রিয়ায় আপনারা কোন্ পক্ষে থাকবেন? মানবের নাকি দানবের? আপনারা দয়া করে জানার চেষ্টা করুন, এদেশে সত্যিই এখন মানব আর দানবে যুদ্ধ চলছে।

দানবের হাতে আক্রান্ত মানব, মানবতা এবং সভ্যতা। এরা এই দেশকে ফিরিয়ে নিতে চাইছে মধ্যযুগে।

আফগানিস্তানে যেমন পারেননি তাদেরকে সভ্যতায় ধরে রাখতে, এদেশেও যদি ওরা জয়ী হয়, এখানেও তাদের সভ্যতায় ধরে রাখতে পারবেন না। তাই হয় আপনারা মানবের পক্ষে দাঁড়ান, না হয়, এদেশের মানুষের ন্যায় যুদ্ধ এদের নিজেদেরকেই করতে দিন। জয়-পরাজয় পরে দেখা যাবে। অন্ততঃ দানবের পক্ষে গলাবাজি করে আপনারা দুর্নামের ভাগিদার হবেন না। দোহাই আপনাদের।


--------------------------------------------------------------------------------------------------

মন্তব্য:মানবাধিকার সংস্থাগুলো আজকাল বাংলাদেশে ঢুকে দানবাধিকার রক্ষা সংস্থায় বিবর্তিত হচ্ছে।

Wednesday, December 11, 2013

১১ ডিসেম্বর ২০১৩ : এই বিজয়ের মাসে

এই ডিসেম্বরে বাংলাদেশের আকাশে শকুনের আনাগোনা। এই বিজয়ের মাসে হায়েনাদের বিষদাঁত সক্রিয়। এই ডিসেম্বরে স্বাধীনতার পতাকা খামচে ধরছে পুরোনো শকুন। বাংলাদেশ বেঁচে থাকুক নতুন পুরোনো সকল শকুনের উপদ্রপ থেকে। বিজয়ের ৪২ বছরপূর্তিতে বাংলাদেশ যেন হয়ে না ওঠো পরাজিত শত্রুদের অভয়ারণ্য। মানুষের দেশ মানুষের হাতেই নিরাপদ থাকুক।

Saturday, December 7, 2013

বই পড়া, বই কেনা

একসময় আমার প্রিয় জায়গা ছিল চট্টগ্রামের পাবলিক লাইব্রেরী। আশি নব্বই দশকের ছাত্রজীবনের অনেকগুলো দুপুর কেটেছে লাইব্রেরীতে। শুনে মনে হতে পারে খুব ভালো ছাত্র ছিলাম। আসলে একেবারেই উল্টো। আমার একাডেমিক বইয়ের একটা পাতাও কোনদিন আমি উল্টাইনি লাইব্রেরীতে। ওখানে যেতাম শুধু আনন্দ পাঠের জন্য, আউট বইয়ের খোঁজে, যে বইগুলোতে পৃথিবীর আলো হাওয়া ভেসে বেড়ায় সেই বইয়ের সমুদ্রে স্নান করার জন্য যেতাম। বেহুদা ক্লাসের বই পড়ে কে সময় নষ্ট করে।

বিনাপয়সায় অকাজের বই পড়ার জন্য আমার পছন্দের জায়গা ছিল তিনটা।
১) চট্টগ্রাম পাবলিক লাইব্রেরী(তখন এটা ছিল মুসলিম হলের ভেতরে, পরে নতুন ভবনে আসে),

২) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরী(এটা ছিল তখন আর্টসফ্যাকাল্টির সামনের এডমিন বিল্ডিং এ,
বর্তমান অবস্থায় এসেছে নব্বই সালের পরে পাহাড়ের পাদদেশে),

৩) বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরী (তখন এটা ছিল লালদিঘির দক্ষিণ পাড়ে)।

একটা সময় আবিষ্কার করি লালদীঘির পাড়ে বৃটিশ কাউন্সিলের উপর তলায় আরেকটা লাইব্রেরী আছে, যার নাম মিউনিসিপ্যাল পাবলিক লাইব্রেরী। অনেকে এটার খোঁজ জানে না। এই লাইব্রেরীতে উপনিবেশ আমলের বই পত্রিকাও দেখেছিলাম। এটা চতুর্থ নাম্বার হতে গিয়েও হয়নি, কারণ এই লাইব্রেরীতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল না।

এই লাইব্রেরীগুলোতে বই পড়া, বই খোঁজা ইত্যাদি খুব সহজ ছিল। সহজ মানে হাতের নাগালে থাকতো বইয়ের তাকগুলো। নিজে পছন্দ করে বই নিতে পারতাম। সব লাইব্রেরীতে এই সুবিধা থাকে না। ঢাকা গেলে আমি ঘুরঘুর করতাম পাবলিক লাইব্রেরীর আশেপাশে। ঢুকতে সাহস হতো না। একদিন সাহস করে ঢুকে গেলাম। কিন্তু ওখানে দেখি কঠোর নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা। আমার ভালো লাগলো না।  ওখানে দুয়েকবার গিয়ে বিরক্ত হয়ে এসেছি। কয়েক বছর পর চট্টগ্রাম পাবলিক লাইব্রেরী বাদে চট্টগ্রামের বাকীগুলোতেও ঢাকার সিস্টেমে বই পড়া চালু হয়। তখন থেকে আমি লাইব্রেরীতে যাতায়াত বন্ধ করে দেই। গত দুই দশক আমি আর লাইব্রেরীতে যাই না। চট্টগ্রাম পাবলিক লাইব্রেরী এখন কি অবস্থায় আছে জানি না। ইচ্ছে করলেও সময় মেলাতে পারি না। ওরা যখন খোলে আমি তখন অফিসে, আমি যখন বের হই অফিস থেকে ওরা তখন বন্ধ করে চলে যায়।

ছেলেবেলায় বই কেনার জন্য প্রিয় জায়গা ছিল নিউমার্কেটের দোতলার বইঘর। এটা বন্ধ হয়ে যায় আমি বড় হতে হতে। যদ্দুর মনে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে শুরু করার পরও ছিল দোকানটা। বেশ কিছু দুর্লভ বই কিনেছিলাম শেষবারে। তারপর একদিন দেখি বইঘরে তালা। তারও কিছুদিন পর দেখি এটা স্বর্নের দোকান হয়ে গেছে। আমার বুক থেকে নিঃশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গিয়েছিল। বইঘর আমার কাছে কেবল একটা দোকান ছিল না। আমার শৈশবে এই্ দোকানের মাধ্যমেই আমি বই পড়তে ভালোবেসেছিলাম। আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় বাবা আমাকে নিয়ে এই দোকানে গিয়েছিল। সেই শৈশবেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম দোকানটাকে। ওই স্মৃতিটা এখনো তরতাজা। ওই স্মৃতিকে আমি এখনো প্রবলভাবে ভালোবাসি।

বইঘর হারিয়ে ঝুঁকে পড়ি কারেণ্ট বুক সেন্টার, মনীষা, অমর বইঘর ইত্যাদির দিকে। এক তলায় লাইসিয়াম নামে একটা দোকান ছিল, সেখানেও বিস্তর বই ছিল। দামী দামী বই থাকতো লাইসিয়ামে। কেনার সাধ্য ছিল না আমার। তবু হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখতে এত ভালো লাগতো! কারেন্ট বুক সেন্টারেও সব দামী বই ছিল, কিন্তু তাদের পেছনে গুদামে বেশ কিছু পুরোনো এডিশনের বই থাকতো। সেখান থেকে সস্তায় বেশ কিছু বই কিনেছিলাম। বইঘরের পর কারেন্ট বুক সেন্টারের কাছে আমার ঋন। একসময় অমর বইঘরের খোঁজ পেয়ে যাই। সেই প্রথম পুরোনো বইয়ের সাম্রাজ্যে  ঢুকে পড়ি। অনেক বছর বুঁদ হয়ে ছিলাম সেখানে। নিউমার্কেটের মণীষা প্রিয় ছিল রাশিয়ান বইগুলোর জন্য। আমার রাশিয়ান কালেকশানের অনেকটাই ওখান থেকে নেয়া। আন্দরকিল্লার কথাকলির কথাও উল্লেখ করতে হয়। এটাও ছিল খান্দানী বইয়ের দোকান। দাম ধরাছোয়ার বাইরে। তবু বইয়ের ঘ্রাণ নিতে স্পর্শ পেতে, সস্তা এডিশনের কোন বইয়ের খোঁজে ঘুরে বেড়াতাম এই দোকানগুলোতে। বইয়ের একটা মজা ছিল গায়ের দামে কেনা যেত। আমি পাকিস্তান আমলে প্রকাশিত ৫ টাকা দামের মোটা একটা বই বিশ বছর পরেও একই দামে কিনেছি কারেন্ট বুক সেন্টার থেকে।

কারেন্ট বুক সেন্টারে আজকাল যাওয়া হয় না। যাওয়া হয় না অমর বইঘরেও। মণীষা তো নেই। বইকেনার যাতায়াত এখন বাতিঘর, বিশদ বাঙলায় সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। অবাক লাগে শহরে জনসংখ্যা যানবাহন হাটবাজার শপিং সেন্টার বেড়েছে অগণিত, কিন্তু বই কেনার জায়গা বেড়েছে মাত্র তিন চারটে। যতটা বেড়েছে তার চেয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া দোকানের সংখ্যা বেশী। কারেণ্ট বুক সেন্টারকে চারপাশের ফুটপাত হকার যেভাবে গ্রাস করে রেখেছে ওটার নিঃশ্বাস নেবার জায়গাটুকুই কেবল আছে এখন।

আমি বইকেনার দিনগুলোর কথা ভেবে বিষন্নবোধ করি। তখন যদি আরেকটু স্বচ্ছলতা থাকতো, আরো কিছু বেশী বই কিনতে পারতাম, আরো কিছু বেশী পড়তে পারতাম। এখন সামর্থ্য আছে সময় নেই। মানুষের গোটা জীবনটাই এরকম নানাবিধ বৈপরীত্যে কেটে যায়।

Thursday, December 5, 2013

সামান্য ক্ষতি - ২০১৩!

ভয়ানক দুঃসময় অতিক্রম করছে অনেক মানুষ। অনেক না কিছু মানুষ? বেশীরভাগ মানুষ কি ভালো আছে? আমি কি ভালো আছি? আমি ভালো থাকলেই 'কিছু' মানুষের দুঃখ গায়ে কাঁটা দেয় না? এখন কিসের দুঃসময়? কতটা দুঃসময়? এক বন্ধু বললো এখনো তেমন দুঃসময় ঠিকভাবে এসে উপস্থিত হয়নি। এখনো দেখার অনেক বাকী। অনেক অন্ধকার এখনো বিষদাঁত লুকিয়ে আড়ালে অপেক্ষা করছে। সেই দাঁতাল অন্ধকার এসে উপস্থিত হলে এই যে লেখাটা টাইপ করছি, সেটাও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এই যে প্রাত্যাহিক ইন্টারনেট বিচরণ সেখানেও পড়বে করাল থাবা। তখন কেবল অন্ধকারেরই প্রবল রাজত্ব থাকবে।

তবু............এটা............বিচ্ছিন্ন............ একটা..........লেখা। এটার সাথে বাস্তবের কোন সম্পর্ক না থাকলেই ভালো হতো।


                            (... ... ... . .... .... ....  ... ... ...)
                              ______শূন্যতা_____

এটা কি?

এটা একটা দায়সারা শূন্যতা। এই যে বন্ধনীর ভেতর দেড় ইঞ্চির শূন্যস্থান - সেখানে আসলে কয়েক হাজার বা লক্ষ পৃষ্ঠা। একেকটা মানুষের সর্বনাশের ইতিহাস, সর্বনাশের বেদনার কথা কয়েক হাজার পৃষ্টা হবে যা লেখার সাধ্য আমার নেই। আমি প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুলে সংবাদ পাঠ করতে সাহস পাই না। শুধু হেডলাইন আর থেতলানো ঝলসানো শরীরগুলোর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেবার পর আমার বুকের ভেতরে ক্রোধ আর বেদনা পরস্পরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তখন আমার ইচ্ছে করে একটা নিউট্রন প্রোটন বা হাইড্রোজেন বোমায় পৃথিবীটা ধ্বংস করে দেই। কিন্তু কিছু করা হয় না। অতঃপর অক্ষমতার আগ্রাসনে এক টুকরো শূন্যস্থানে আমি লুকিয়ে থাকি। এ আমার দায়সারা শূন্যতা। 

আমার কি দায়? সে তুমি বুঝবে না। কারণ তোমার প্রিয়তম সন্তান এখনো পোড়েনি। তোমার বটবৃক্ষ বাবা এখনো বোমার আঘাতে থেতলে যায়নি। তোমার আদরের ভাই/বোনটা এখনো নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসছে, এমনকি তোমার প্রিয় বন্ধুটি বলতে পারছে, চল আজ 'রোদেলা বিকেলে' বসে একটা আড্ডা দেই। তোমার কাছে এই সর্বনাশগুলো তৃতীয় কোন পক্ষের ঘটনা, কেবলই একটা খবরের হেডলাইন কিংবা নেহায়েত ২০ ফন্টের একটা ব্লগ টাইটেল।

অথচ কি জানো, কুড়িয়ে পাওয়া ককটেল বিস্ফোরিত হয়ে হাতের পাঁচটি আঙুল হারালো যে সাড়ে তিন বছরের শিশু লিমা -তার জন্য, তার অসহায় বাবা মায়ের জন্যও লেখা যাবে কয়েকশো পৃষ্ঠা।  আর গত এক মাসে দেশের সর্বনাশ হওয়া মানুষের কথার যোগফল লেখার মতো কাগজ সমগ্র বাংলাদেশেই নেই।

তাদের সবার জন্য ওই শূন্যস্থানটি। ওই শূন্যস্থানেই আমার শোকগাঁথা। বাংলাদেশে মানুষের জীবন এখন ঢাকা শহরের সীসা মিশ্রিত দুষিত বাতাসের চেয়েও সস্তা হয়ে গেছে। দাঁতাল শুয়োরের (শমসেরের) বাচ্চারা তবু বলছে এরকম পরিস্থিতিতে এটাই স্বাভাবিক। এই দেশ আফগানিস্তান হয়ে গেছে? ইরাক হয়ে গেছে? পাকিস্তান হয়ে গেছে? এই মৃত্যু, এই জীবন্ত দাহ্য শরীরগুলো সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে শমসেরের বাচ্চাদের কাছে। তাদের চোখে স্বপ্নের সর্বনাশ গদিয়ান হয়ে মসনদী জয়গান গাইছে। তবু ওই বানচোত হয়তো একদিন গোলাপী ওড়নায় চড়ে দেশ বিদেশে বাংলার পতাকা নিয়ে দেশবিদেশে পররাষ্ট্র সেবা করবে। গ্রেনেড বোমা গুলি পেট্রোল বারুদের গন্ধ এড়িয়ে বেঁচে থাকলে আমার দুর্ভাগা চোখও কি তা দাঁতে দাঁত পিষে সহ্য করে নেবে?

এখানে যাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে তাদের আর উপায় নেই। যাদের হয়নি তারা যে কোন সময় আশংকার করছে সর্বনাশের। যারা কোন রাজনীতি করে না, যাদের সাথে রাজনীতির কোন প্রেম বিদ্বেষের সম্পর্ক নেই, যারা কেবল নিজের কাজ করে, কাজ সেরে বাজারে যায়, শাক  ডাল সবজি কিনে বাড়ি ফিরে, রান্না করে গরম তুলতুলে ভাত খায়, খাওয়া শেষে শক্ত বিছানায় তৈলাক্ত বালিশে মাথা রেখে ঘুমায়, জগতের আর কোন ত্রিবিধ ব্যাপারে যারা কখনো মাথা ঘামায় না, রাজনীতির দুষ্টচক্র তাদেরকেও রেহাই দিচ্ছে না। কামড়ে ধরছে তাদের ঘাড়, কাঁধ, নাক মুখ চোখ। যে নির্বিবাদী মানুষটা কাজ করে বাড়ি ফিরছে তার সর্বনাশ করছে রাজনীতি, যে কর্মক্লান্ত মানুষ বাজারে গিয়ে পরিবারের জন্য পঞ্চাশ টাকার আলু ডাল কিনে আনছে তাদেরও সর্বনাশ করছে রাজনীতি, যারা কোথাও কোন পক্ষ নয়, কারো বাদ বিবাদ যোগ বিয়োগে নেই, রাজনীতি তাদেরকেও সুস্থ জীবন ধারণে বাধা দিচ্ছে। গুলি বোমা বারুদের ভাষায় ডেকে ডেকে বলছে, এই দেখ আমরা শুয়োরের বাচ্চারা এই দেশে আছি, এই দেশে বাস করেও এই দেশ জ্বালিয়ে দিচ্ছি। আমাদের লোহার নল দিয়ে গুলি ফুটাই, তোর বুক পেট মুণ্ডু ফুটা করি, কি করতে পারিস তুই?

এই ভূখণ্ডে বসবাস করাটাই অপরাধের পর্যায়ে পড়ে যাচ্ছে।

কেউ কেউ বলছে, এখানে আর থাকা যাবে না, এদেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এখান থেকে পালিয়ে যাও। কিন্তু নিজের দেশ ছেড়ে, নিজের জন্মভূমি ছেড়ে, নিজের আত্মীয় পরিজন ছেড়ে কোথায় পালাবে মানুষ? সবার পালিয়ে যাবার সামর্থ্য নেই। অনেকের সামর্থ্য থাকলেও পালাবে না। পালাতে পারবে না। পালিয়ে কোন সমাধান হবার নয়।

তাহলে কি মরে যাওয়াই সমাধান? এখনো যথেষ্ট মরেনি মানুষ? এখনো লাশের টার্গেট পুরণ হয়নি? এখনো কবরে জায়গা খালি রয়ে গেছে? নিঃশেষে প্রাণ এখনো করিতে পারো দান?

হায় রবীন্দ্রনাথ, তুমি শত বছর আগেই বুঝেছিলে অপরিণামদর্শী বাঙালীর মন। শতবর্ষ পেরিয়েও তাই তোমার কবিতা প্রাসঙ্গিক থেকে যায়-

বহে মাঘমাসে শীতের বাতাস,
          স্বচ্ছসলিলা বরুণা।
পুরী হতে দূরে গ্রামে নির্জনে
শিলাময় ঘাট চম্পকবনে,
স্নানে চলেছেন শতসখীসনে
          কাশীর মহিষী করুণা।

সে পথ সে ঘাট আজি এ প্রভাতে
          জনহীন রাজশাসনে।
নিকটে যে ক'টি আছিল কুটির
ছেড়ে গেছে লোক, তাই নদীতীর
স্তব্ধ গভীর, কেবল পাখির
          কূজন উঠিছে কাননে।

আজি উতরোল উত্তর বায়ে
          উতলা হয়েছে তটিনী।
সোনার আলোক পড়িয়াছে জলে,
পুলকে উছলি ঢেউ ছলছলে--
লক্ষ মানিক ঝলকি আঁচলে
          নেচে চলে যেন নটিনী।

কলকল্লোলে লাজ দিল আজ
          নারী কণ্ঠের কাকলি।
মৃণালভুজের ললিত বিলাসে
চঞ্চলা নদী মাতে উল্লাসে,
আলাপে প্রলাপে হাসি-উচ্ছ্বাসে
          আকাশ উঠিল আকুলি।

স্নান সমাপন করিয়া যখন
          কূলে উঠে নারী সকলে
মহিষী কহিলা, "উহু! শীতে মরি,
সকল শরীর উঠিছে শিহরি,
জ্বেলে দে আগুন ওলো সহচরী--
          শীত নিবারিব অনলে।'

সখীগণ সবে কুড়াইতে কুটা
চলিল কুসুমকাননে।
কৌতুকরসে পাগলপরানী
শাখা ধরি সবে করে টানাটানি,
সহসা সবারে ডাক দিয়া রানী
          কহে সহাস্য আননে--

"ওলো তোরা আয়! ওই দেখা যায়
          কুটির কাহার অদূরে,
ওই ঘরে তোরা লাগাবি অনল,
তপ্ত করিব করপদতল'--
এত বলি রানী রঙ্গে বিভল
          হাসিয়া উঠিল মধুরে।

কহিল মালতী সকরুণ অতি,
          "একি পরিহাস রানীমা!
আগুন জ্বালায়ে কেন দিবে নাশি?
এ কুটির কোন্‌ সাধু সন্ন্যাসী
কোন্‌ দীনজন কোন্‌ পরবাসী
          বাঁধিয়াছে নাহি জানি মা!'

রানী কহে রোষে, "দূর করি দাও
          এই দীনদয়াময়ীরে।'
অতি দুর্দাম কৌতুকরত
যৌবনমদে নিষ্ঠুর যত
যুবতীরা মিলি পাগলের মতো
          আগুন লাগালো কুটিরে।

ঘন ঘোর ধূম ঘুরিয়া ঘুরিয়া
          ফুলিয়া ফুলিয়া উড়িল।
দেখিতে দেখিতে হুহু হুংকারি
ঝলকে ঝলকে উল্কা উগারি
শত শত লোল জিহ্বা প্রসারি
          বহ্নি আকাশ জুড়িল।

পাতাল ফুঁড়িয়া উঠিল যেন রে
          জ্বালাময়ী যত নাগিনী।
ফণা নাচাইয়া অম্বরপানে
মাতিয়া উঠিল গর্জনগানে,
প্রলয়মত্ত রমণীর কানে
          বাজিল দীপক রাগিণী।

প্রভাতপাখির আনন্দ গান
          ভয়ের বিলাপে টুটিল--
দলে দলে কাক করে কোলাহল,
উত্তরবায়ু হইল প্রবল,
কুটির হইতে কুটিরে অনল
          উড়িয়া উড়িয়া ছুটিল।

ছোটো গ্রামখানি লেহিয়া লইল
          প্রলয়লোলুপ রসনা।
জনহীন পথে মাঘের প্রভাতে
প্রমোদক্লান্ত শত সখী-সাথে
ফিরে গেল রানী কুবলয় হাতে
          দীপ্ত-অরুণ-বসনা।



সামান্য ক্ষতি -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

২০১৩ সালের রানীমাতার কাছেও এ বড় সামান্য ক্ষতি!

Tuesday, December 3, 2013

বাঙালী+ মুসলমান =???

পৃথিবীতে নির্বোধের সংখ্যা হিসেব করলে মুসলমানদের পাল্লা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ভারী। এ কথা শুনে বলতে পারেন মুসলমান কেন, আর কোন ধর্ম নেই?

শুধু ধর্ম নয়, জাতের হিসেবে পৃথিবীতে নির্বোধের সংখ্যা হিসেব করলে বাঙালীদের পাল্লা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ভারী। এবার বলবেন বাঙালী কেন, অন্য কোন জাত নেই?

আপনি যদি বাঙালী এবং মুসলমান দুটোই হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি আমার গলা টিপে ধরার মতো ক্ষেপে গেলেও অবাক হবো না। তবে সবাই আপনার মতো নাও হতে পারে, কেউ কেউ আমার মতোও আছে। আমি নিজেও জন্মগতভাবে বাঙালী এবং মুসলমান। কিন্তু আমার কোন নির্দিষ্ট জাতপ্রেম-জাতবিদ্বেষ(পাকি বাদে), দেশপ্রেম-দেশবিদ্বেষ(পাকি বাদে), ধর্মপ্রেম-বিদ্বেষ নেই। বলতে পারেন আমি একজন নির্বিবাদী পর্যবেক্ষক। নিজের এবং ইতিহাসের চোখ মিলিয়ে যা দেখেছি সেখান থেকেই ধারণা করে এই লেখাটা লিখছি। জানেন নিশ্চয়ই, ধারণার কোন সীমাবদ্ধতা নেই, ধারণা স্থির কোন বস্তু নয়, আমার ধারণারর অবিনশ্বর সত্য হবারও কোন দায় নেই।

আপনি যদি একমত হন, আমি খুশী। যদি একমত না হন, তবে গলা টিপে ধরার বদলে যুক্তি হাজির করুন। তার আগে বাকী অংশ পড়ুন।

মুসলমান নির্বোধ কেন?
এই ধর্মের মানুষগুলো এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস, এক রাসুলের উপর বিশ্বাস, এক কোরানের উপর বিশ্বাসের কথা বললেও ধর্ম নিয়ে নিজেদের মধ্যে হাজারো বিভক্তি তৈরী করে রেখেছে, সেই বিভক্ত দলগুলো শত শত বছর ধরে নিজেদের মধ্যে কাটাকাটি খুনাখুনি করছে। এরা যতটা অন্য ধর্মের সাথে যুদ্ধ করেছে তার চেয়ে বহুগুন বেশী যুদ্ধ নিজেদের মধ্যে করেছে, এবং করছে। এই একুশ শতকে এসেও দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে অস্থিতিশীল অঞ্চলগুলো সব মুসলমান অধ্যুষিত।

যদি বলেন ওই সব অস্থিতিশীলতা খ্রিস্টান ইহুদি নাসারার ষড়যন্ত্র, তাহলে আপনি নির্বোধ। যদি বলেন নির্বোধ মুসলমানরা নিজেরা নিজেদের প্রাণ নিচ্ছে বোমা মেরে গুলি মেরে, তাহলে স্বীকার করে নিলেন ওই মুসলমানরা নির্বোধ। আমেরিকা ইরাক থেকে চলে যাবার অনেকদিন পরেও ইরাকে আত্মঘাতী বা গাড়ি বোমা হামলায় গড়ে প্রতিদিন ১০০ জনের উপর মারা যেতো। যে গর্দভটা বোমা ফাটিয়েছে সে নিশ্চয়ই বেহেশতী হুরের লোভে পিতৃপ্রদত্ত প্রানটা নষ্ট করে আরো একশো জনকে মারলো। ইসলামের নীতি অনুসারে বোমাবাজ গর্দভটা দোজখে যাবে, আর যাদের সে মেরেছে, তারা বেহেশতে।

এরকম ঘটনা পাকিস্তান থেকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে অসংখ্যবার ঘটেছে, ঘটছে, ঘটবে। সুতরাং মুসলমানদের বিরাট একটা অংশ নির্বোধের দল। এই নির্বোধেরা মধ্যপ্রাচ্যে যেমন আছে, তেমনি আছে বাংলাদেশেও। বাংলাদেশকে হাজার বছর আগে মুসলমানী করানো হলেও এরা এত বছর পর আবারো ইসলামী বিপ্লব কায়েম করে মুসলমানী করানোর জন্য বোমা সন্ত্রাস অস্ত্রবাজির মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে রাজনীতির ছদ্মবেশে।

বাঙালী নির্বোধ কেন?
এই জাতটারও প্রায় একই সমস্যা। আদিম কাল থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর জায়গা হলো এই বাংলাদেশ। হিমালয় পর্বতমালা থেকে যতগুলো নদী নেমেছে তার প্রায় সবগুলোই এই দেশের পেট চিরে বঙ্গোপসাগরে গিয়েছে। ফলে হাজার হাজার মাইল থেকে সংগৃহিত ময়লা আবর্জনাগুলো  বন্যার জলে মিলেমিশে নদী বেয়ে নেমে এসে এদেশের মাটিকে পলিমাটির উর্বরতায় সমৃদ্ধ করেছে। এখানে একই জমিতে বছরে তিন চারবার ফসল ফলে। জমিতে শস্যবীজ ছিটকে দিলেই আপনাতেই চারা গজিয়ে ওঠে। বিলের মাছে পুকুর ভর্তি হয়ে যায় অথবা পুকুরের মাছে বিল। নদী নালা খালবিল সবকিছু জুড়েই খানাপিনার চাষবাস। আবহাওয়া না গরম না ঠাণ্ডা। বসবাসের জন্য এত আরামদায়ক জায়গা দুনিয়াতে বিরল। তাই দলে দলে লোক এখানে বাস করতে থাকে আদিমকাল থেকেই।

দূরদেশ থেকে বেড়াতে এসে এখানে বিয়ে করে ঘরসংসারী হয়ে থেকে যেত বিদেশী লোকজন। নানান জাতির রক্তের মিশালে এদেশে বিশুদ্ধ জাতি ধারণাটাই নষ্ট হয়ে যায়। এখন যেমন কেউ সাঁতরে আমেরিকা বা কোন উন্নত দেশের তীর ছুঁতে পারলেই হয়, সেই দেশ ছেড়ে সহজে আসতে চায় না। একসময় এই বাংলাদেশও তেমন ছিল।

কিন্তু এই জাতের সমস্যা কখন থেকে শুরু হলো? যখন তারা রাজনীতি শিখলো। রাজনীতি শেখার পর তারা শিখলো কুটনীতি। আসলে হবে কুটনামি। রাজনীতি দিয়ে তারা ভিনদেশী আগ্রাসী শক্তিকে তাড়ানোর কায়দা শিখলো। ভিনদেশী শক্তি তাড়াবার পর তারা নিজেরা ক্ষমতার মালিক, দেশের মালিক হলো। এবার আর বিদেশী নাই। এবার নিজেদের মধ্যে খেলা। নিজেদের মধ্যে খেলতে গিয়ে তারা রাজনীতিকে ব্যবহার করে সুবিধা করতে পারলো না, ফলে তাদের দরকার হলো কুটনীতি বা কুটনামি। একসময় এই কুটনামিকে তারা রাজনীতি বলে ডাকতে লাগলো। ফলে আসল রাজনীতি হারিয়ে গেল প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল রাজনীতি নামের কুটনামি।

বাংলাদেশে এখন সবাই নিজেকে রাজনীতিবিশারদ মনে করে। সবাই সবার চেয়ে বেশী বুঝে। বেশী বুঝতে গিয়ে অন্যের ক্ষতি করার জন্য কখনো কখনো নিজের পাছায়ও আঙুল ঢুকিয়ে দেয়। শুধু আঙুল না, আঙুল, আংটা, বড়শি, এমনকি গিরাসহ বাঁশ। সবকিছু। তারপর ব্যথা অসহ্য হলে সেই তাড়িয়ে দেয়া ভিনদেশীদের কাছে নালিশ করে। তাদেরকে সালিশ করার জন্য ডাকে। তারা বাঙালীর পাছা থেকে আংটা, বড়শি খুলে ক্ষতের উপর মলম লাগায়, শান্ত্বনা দেয়, উপদেশ দেয়। তখন বাঙালী দলেরা প্রতিযোগিতামূলক গর্ব করে বলে আমার পাছায় মলম বেশী দিছে, আমার পাছার ক্ষতি বেশী হইছিল। এইবার বলুন, এই জাত নির্বোধ কিনা?

আপনি যদি বাঙালী ও মুসলমান দুটোই হয়ে থাকেন আপনি হয় নির্বোধ, নয় দুর্ভাগা।
(বলে রাখি, নির্বোধ শব্দটার কয়েক রকম অর্থ আছে। তার মধ্যে প্রচলিত অর্থ হলো, বোকা। এখানে নির্বোধ শব্দের অর্থটা বোকা নয়। একেবারে আক্ষরিক। নির্বোধ=মানুষের জন্য যার কোন বোধ নেই।)

আপনি কোনটি?

ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ি করে যারা সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ট করে তারা নির্বোধ। যারা এই কাড়াকাড়ির চিপায় পড়ে বেঘোরে প্রাণ দেয় তারা দুর্ভাগা। এদেশে নির্বোধের চেয়ে দুর্ভাগার সংখ্যা অনেকগুন বেশী হলেও নির্বোধেরাই দুর্ভাগাদের উপর চাবুক ঘোরাবে।

এই নির্বোধেরা আন্দোলনের নামে ট্রেনের লাইন উপড়ে ফেলে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে মাঝপথে আটকে রেখেছে যাদের খাবার, পানি, মোবাইলের চার্জ সব শেষ। এমনকি প্রস্রাব পায়খানা সব বন্ধ। ৪২ ঘন্টা পরেও মুক্তি পায়নি। এখানে নারী, শিশু, হার্টের রোগী সবাই আছে। এই নির্বোধেরা নির্বাচন করে একদিন ক্ষমতায় বসে বড় বড় কথা বলবে। দুর্ভাগা দেশের দুর্ভাগা মানুষ এই দুর্ভোগ ভুলে আবারো হাত তালি বাজাবে।

ভাবছেন, শাসকদের কথা বললাম না কেন? শাসকদের কথা বলাই বাহুল্য। শাসকেরা বাই ডিফল্ট নির্বোধ হয়। বাংলাদেশের ষোল কোটি দুর্ভাগা মানুষ এখন লাখ খানেক নির্বোধের অত্যাচারে জর্জরিত। এরা বাঙালী ও মুসলমান।

Sunday, December 1, 2013

১ ডিসেম্বর ২০১৩ হাবিজাবি

১. প্রতিদিন নতুন নতুন মর্মান্তিকতায় আমাদের হৃদপিণ্ড যেভাবে আলোড়িত হচ্ছে, তাতে কিছুদিন পর মানুষ হিসেবে আমাদের প্রকৃতিই বিগড়ে যেতে পারে।

২. সম্ভাবনারও এমন দুঃসাহস নেই আগামীকাল আমাকে একটা নিরাপদ দিনের প্রতিশ্রুতি দিতে পারে।

৩. প্রকৃতির ধারণাটি এই গ্রহে যেমন, অন্য নীহারিকাতেও তেমন? এখানে প্রকৃতি সবুজ হারিয়ে হলুদ হয় হেমন্তের শেষে। ওইখানে ওই সুদূর নক্ষত্রের চারপাশে ঘুর্ণায়মান কোন গ্রহেও কি তাই ঘটে? নাকি ওখানে হলুদ প্রকৃতি মরে গিয়ে সবুজ হয়। প্রতিটি নক্ষত্র নীহারিকার আশ্চর্য সব বিচিত্র নিয়ম আছে যা আমাদের জ্ঞানের বাইরে।



Friday, November 29, 2013

প্রতিপক্ষ যখন মানুষ

১.
আমি নিরপেক্ষ মানুষ না। আওয়ামী লীগ দুর্নীতি বাটপারি করেছে বলে বিএনপিকে ভোট দিয়ে জামাতকে ক্ষমতায় আনবো না। বরং ভোটদানে বিরত থাকবো। কিন্তু জব্বার সাহেব দোদুল্যমান (তাঁর ভাষায় নিরপেক্ষ মানুষ)। গতবার নৌকায় ভোট দিলেও তিনি এবার বিএনপিকে ভোট দেবার নিয়ত করেছেন। টেক্সিতে যাচ্ছিলেন দোকানে। দোকানের কাছের মোড়ে এসে অবরোধের কবলে পড়ে হঠাৎ ছুঁড়ে দেয়া বোমায় টেক্সিসহ আপাদমস্তক ঝলসে যান তিনি। ঝলসানো শরীরে জব্বার সাহেব বুঝতে পারলেন যারা গণতন্ত্রের নামে আন্দোলন করছে, যারা তাঁর কাছে ভোট ভিক্ষা করবে কয়েকদিন পর, তারা আসলে তাঁর কথা ভাবছে না। তাদের চোখে অন্য স্বপ্ন, অন্য জিঘাংসা। তিনি বাধ্য হলেন তার ভোট দেবার নিয়ত বদলে ফেলতে।

২.
বাসভর্তি কাজের মানুষ। চাকরী বাঁচাতে ছুটছে। হঠাৎ একঝাঁক ককটেল আর পেট্রোলবোমার আক্রমণে বাসচালক দ্রুত থামাতে গিয়ে প্রায় উল্টে দেয় গাড়ি। ততক্ষণে ভেতরে আগুন ধরে গেছে। ভাগ্যবান বিশ পঁচিশজন হাত পা ছড়ে বের হয়ে আসতে পারলো, আরো পনের বিশজন বেরুতে বেরুতে ঝলসে আধা কাবাব এবং একজন সম্পূর্ন কাবাব হয়ে মারা গেলেন। ওই বাসের যাত্রীদের বিরাট অংশ ধানের শীষের ভোটার হতে পারে জেনেও যারা বোমা ছুড়ে, তারা কি ভোটের জন্য আন্দোলন করছে?

৩.
ট্রেন লাইন উপড়ে হাজার হাজার মানুষকে নানা জায়গায় আটকে রাখা হয়েছে, উল্টে গেছে বগি, হতাহত হয়েছে মানুষ। তীব্র ভোগান্তিতে লাখ লাখ মানুষ, পরীক্ষার্থী। দেশে কি যুদ্ধ চলছে? কে কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে? ট্রেনে করে কি শত্রু দেশের সেনাবাহিনী চলাচল করে? ট্রেনে বাসে গাড়িতে টেক্সিতে করে যারা যাতায়াত করে তারা তোমাদের শত্রু? তোমাদের হরতাল অবরোধে কেউ কাজে যেতে পারবে না, স্কুলে যেতে পারবে না, অসুস্থ হতে পারবে না, হাসপাতালে যেতে পারবে না, বড়জোর মরতে পারবে। যারা কোথাও যেতে চায় তারাই তোমাদের শত্রু? তাদের বিরুদ্ধেই তোমাদের আন্দোলন? অবরোধ মানে দেখামাত্র আগুনে ঝলসে দেয়া? হরতালের সংজ্ঞা কি? অবরোধের সংজ্ঞা কি? পার্থক্য কি?

৪.
১৮ দলের মিছিলে যাদের কন্ঠ সবচেয়ে সোচ্চার, সবচেয়ে তীব্র, সেই জামাত শিবিরের কন্ঠে সবচেয়ে সোচ্চার হয়ে বাজে - বিপ্লব বিপ্লব, ইসলামী বিপ্লব। দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ছদ্মবেশে ইসলামী বিপ্লবের প্রস্তুতি চলছে? যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী তারা ইসলামী বিপ্লবের স্লোগান সহ্য করে কি করে? যদি বিএনপিও ইসলামী বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে থাকে, তাহলে আর নির্বাচন, গণতন্ত্র ইত্যাদির জন্য মায়াকান্না দেখিয়ে কি কাজ। আন্দোলনের ভণ্ডামি না করে সরাসরি বিপ্লবের ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামুক।

বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, এখন যারা আন্দোলনের নামে দেশব্যাপি নৈরাজ্য চালাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য নির্বাচন নয়, গণতন্ত্র নয়, এমনকি তাদের প্রতিপক্ষ সরকার মনে হলেও তাদের আসল প্রতিপক্ষ মানুষ, তাদের প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ।

মানুষকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে কেউ কখনো জিততে পেরেছে ইতিহাসে?