Tuesday, August 12, 2014
নাগরিক পরাধীন পরিবহন যন্ত্রণা এবং যানবাহনের স্বাধীনতা-গনতন্ত্র @চট্টগ্রাম
চক্রপাক
লোকটা বেশ স্বাস্থ্যবান, পেশীবহুল না হলেও টান টান শরীর। এক ধাক্কায় বসে শাহেদকে জানালার সাথে চেপে ধরলো প্রায়।
লোকটার দোষ নেই। এই বাসটার সিটগুলোই এরকম। কোনমতে দুজন শুটকো লোক বা বাচ্চা ছেলে বসতে পারলেও পরিপূর্ন বয়স্ক দুজন বসা খুব মুশকিল। হাঁটু ভাজ করে বুকের কাছে না আনলে সোজা থাকা যায় না। লোকটার আগমনের পূর্ব পর্যন্ত দুই পা চেগিয়ে আরামেই বসেছিল সে।
বাসের কণ্ডাকটর তোবড়ানো বডিতে থাবড়া মারতে মারতে চিৎকার করছে, "......ও-ই, হ-ইইইই, হাটগর, হাটগর..... ফোন্দোরো লম্বর, ফোন্দোরো লম্বর, ফোন্দোরো......."।
বারেক বিল্ডিং চলে এলে গাড়িটা ডানদিকে মোড় নেয়। এবার বৃষ্টির ছাট সরাসরি গায়ে এসে পড়ছে তার। বাতাসও আছে বেশ। সিগন্যাল দিয়েছে সাগরে? শার্টের কাঁধ ভিজে যাচ্ছে। কিন্তু সরে বসার উপায় নেই। পাশে সাক্ষাত দৈত্যটা পিষে ফেলছে তাকে। দৈত্যের শরীরের অর্ধেকটা সিটের বাইরে। সে উঠে দাঁড়িয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েও আটকে গেল। লোকটার বিশাল শরীর ডিঙ্গিয়ে ওঠাও যাবে না। লোকটাকে সরতে বলতে গিয়ে অবাক। এরই মধ্যে ঘুম? নাক ডাকছে তার। এই বেকায়দা আসনে বসে কেউ ঘুমোতে পারে শাহেদ ভাবতেই পারলো না।
সে কখনো কোন অচেনা লোককে ঘুম থেকে ডাকেনি। কিভাবে ডাকতে হয় বুঝতে পারছে না। 'এই যে ভাই' বলাটা কি ঠিক হবে? নাকি গায়ে হালকা একটু ধাক্কা। নাহ, সাহস হয় না ওর।
শাহেদ এই ফাঁকে টুপ করে নেমে পড়লো। মাথায় বৃষ্টি নিয়ে এক দৌড়ে ফকিরহাট ওভারব্রিজের কাছে একটা হোটেলে ঢুকে দোতলায় উঠে বসলো। অনেক পুরোনো এই ওরিয়েন্ট রেস্তোঁরা। তরুণ বয়সে অনেক দুপুর বিকেল কাটিয়েছে এখানে আড্ডা দিয়ে। কাছেই জাহাজের মাস্তুল দেখা যায় কর্ণফুলী নদীতে। চায়ের অর্ডার দিয়ে আবারো ভাবতে বসলো।
সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়লো শাহেদ। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছাতের দিকে ভেসে যাচ্ছে মেঘের মতো। অনেককাল আগের কথা মনে পড়লো তার। অনেক বছর আগে একজনের সাথে খুব বন্ধুতা ছিল। বন্ধু নাকি অন্য কিছু? দ্বিতীয় জন্মের মতো ছিল ব্যাপারটা। প্রথম জন্মের হাহাকার কেটে গিয়েছিল তার। শাহেদের অনেক বন্ধু ছিল যাদের প্রায় সবাই সহপাঠী। কিন্তু সার্বক্ষণিক সঙ্গসুখের বন্ধু একজনই ছিল। দিন রাতের যে কোন সময় ওর কথা ভাবতে পারতো, ভাবনায় চলে আসতো। দুজনের বন্ধুতা গভীরতার চরমে পৌঁছার পর শাহেদ বুঝেছিল বহুকাল আগেই এরকম একটা সম্পর্ক হতে পারতো। বিচ্ছিন্ন হবার পর এখন সে কোথায় শাহেদ জানে না। দীর্ঘকাল কোন যোগাযোগ নেই। দুজনেরই ঠিকানা বদলে গেছে, মন বদলে গেছে, পরিস্থিতি বদলে গেছে। তবু আজ দীর্ঘকাল পর তার কথা ভাবলো শাহেদ। এই সিগারেটের ধোঁয়াটা সেই স্মৃতিকে উসকে দিল। মনে পড়লো ধোঁয়া ওড়ানো নিয়ে ওর আপত্তির কথা। কিন্তু যেদিন বললো এই ধোঁয়ার মধ্যে ওর মায়ার সন্ধান করে প্রতি সন্ধ্যায়, সেদিন থেকে আর আপত্তি করেনি সে।
জায়গাটা একটা বাজারের মতো হলেও কেমন একটা ভুতুড়ে রহস্যময়তা পুরো বাজারজুড়ে। একসময়ের খ্যাতিমান জায়গাগুলো পরিত্যাক্ত হবার পর এরকম চেহারা নেয়। তার স্যাণ্ডেলের একটা ফিতা ছিড়ে আলগা হয়ে যাচ্ছে। এখানে কোথাও মুচির দোকান আছে? দোকানী বললো, বাজারের শেষ মাথায় একটা মুইচ্যা আছে।
শাহেদ টুলে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো। ভাবনাটা আবারো ঘুরতে লাগলো।
আরেকটা সিগারেট ধরালো শাহেদ। ছোট্ট দোকানটা। এটা ঠিক দোকান না। একটা বন্ধ দোকানের সম্মুখভাগ। মাথার ওপর একটা তেরপল দেয়া। তিনকোনা একটা দোকান। কৈশোরে এরকম একটা দোকান ছিল তাদের পাড়ায়। রমেশকাকার দোকান। দোকানটা ওর খুব প্রিয় ছিল। ওদের বাড়ির সব পুরোনো জুতো স্যাণ্ডেল মেরামত করার জন্য শাহেদ ওই দোকানে যেতো। রমেশকাকার কাজ দেখতে তার ভীষণ ভালো লাগতো। এত সুন্দর করে সেলাই করতো, যেন একটা শিল্পকর্ম। রমেশকাকার দোকানটা আসলে বাসা কাম দোকান। শাহেদ সারাজীবন যত মানুষের জীবনযাত্রা দেখেছে তার মধ্যে রমেশকাকার জীবনটাই সবচেয়ে পছন্দের ছিল। সে চাইতো ওরকম একটা জীবনের অংশ হতে। কিন্তু ভদ্রলোকের ছেলে কি মুচিগিরি করবে? কাউকে বলা হয়নি কথাটা। এতকাল পর রমেশকাকার কথা ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল ভেতর থেকে। সে নিজেই এখন রমেশকাকার বয়সে এসে পৌঁছে গেছে।
এই তো, এই তো! শাহেদ ঠিকই ধরেছিল। বুকের ভেতর কেমন একটা আনন্দস্রোত বয়ে গেল। সে জড়িয়ে ধরলো পরেশকে। পরেশবাবু অবাক। ব্যাপার কি? সে তো শাহেদকে চেনে না।
বউটা মরে গেছে আরো বছর দশেক আগে। একটা মেয়ে ছিল বিয়ে দিয়েছে। সংসারে সে এখন একা। শ্বশুরের দেয়া ঘর একটা থাকলেও সে ওখানে খুব একটা যায় না। কেউ নেই, গিয়ে কী হবে। দোকানে কাজ করে এখানেই শুয়ে রাতটা পার করে দেয়।
আলাপ করতে করতেই শাহেদ ভালো করে দোকানটা দেখতে লাগলো। এই দোকান রমেশকাকার চেয়েও ছোট। এক পাশে একটা লম্বা টুল। দৈর্ঘে সাড়ে চারফুট হবে, দোকানের দৈর্ঘের সমান, প্রস্থ দেড়ফুট। টুলের ওপর চাটাই বিছানো। ওটাই বিছানা মনে হয়। রমেশকাকার দোকানেও তেমন ছিল। সেই টুলের সামনে তক্তায় বসে কাজ করে পরেশ। পেছনে কিছু জুতো স্যাণ্ডেল ঝোলানো। সামনে জুতো সেলাই এবং পালিশের যন্ত্রপাতি মালমশলা।
তবে রমেশ কাকার দোকানটি আরো সমৃদ্ধ ছিল। টুলের উপরটা বেডরুম, টুলের নীচে কিচেন। ওখানে থাকতো একটা স্টোভ। দুটো ছোট ডেকচি। কিছু বৈয়াম বোতল ইত্যাদি। কাকা কাজ করতে করতেই চুলায় ভাত ফোটাতেন। তরকারীর ঝোল নাড়াতেন। ফেরীওলার কাছ থেকে সবজি কিনতেন। আমি অবাক হয়ে দেখতাম একটা বেগুন, পাঁচটা শিম, একটা ফাইস্যা শুটকি কিনেই কাকার বাজার শেষ। দু তিন টাকার বেশী খরচ লাগতো না এসব বাজারে। শাহেদের চোখে এখনো ভাসছে কাকা ছোট একটা ফাইস্যা শুটকি দিয়ে বেগুনের ঝোলটা রান্না করছে লাল বাটা মরিচ দিয়ে। কী দারুন ঘ্রান আসছিল! শাহেদ নেশাড়ুর মতো তাকিয়ে থাকতো মুগ্ধতা নিয়ে। কাকাকে কখনো বলা হয়নি আপনার ডেকচি থেকে এক থালা ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত নিয়ে ওই বেগুনের ঝোল মেখে খেতে ইচ্ছে করছে। কাকার সেই সামান্য জীবনের প্রতি তার একবার লোভ হয়েছিল। কিন্তু সেই চাইলেই অমন জীবন পেতে পারে না। তাকে পড়াশোনা শেষ করতে হবে, বড় চাকরী করতে হবে, দেশ বিদেশের সুনাম কুড়াতে হবে।
তখন বড় চাকরী মানে বিসিএস পাশ বোঝাতো। কিন্তু বিসিএস পাশ করে কত টাকা বেতন পাওয়া যায় সেটা জানলেও ওই টাকায় সংসার কিভাবে চলে তার কোন ধারণা ছিল না। কেননা দেখেছে যারাই বিসিএস নামের সোনার হরিণ ধরতে পেরেছে তারাই রাজা উজির মেরে বেড়াচ্ছে। ছোটচাচা বলতো, তোকেও পারতে হবে। এটা আমাদের বংশের চ্যালেঞ্জ।
এধরণের পরিস্থিতিতে অপমানে লজ্জায় সে মাথা নীচু করে থাকতো। কিছু বলতে পারতো না। কেননা ছোটচাচা প্রবল ভালোবাসা দিয়ে কথাগুলো বলতো। কে জানে হয়তো বিশ্বাসও করতো। মনে আছে ভাইবার আগে তার জন্য সুপারিশ করার জন্য মন্ত্রীকে ধরার জন্য ছোটচাচা একদিন ঢাকা যাবার জেদ ধরেছিল। পরদিন ভাইবা। সেই রাতেই ঢাকা পৌছাতে হবে। কিন্তু প্লেনে কোন সিট নেই। কিন্তু কিভাবে যেন ছোটচাচা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সেই ফ্লাইটেই ঢাকা চলে গিয়েছিল পাইলটের পাশের সিটে বসে। আশ্চর্য এক মানুষ ছিলেন। তার চাকরীটা হয়নি যথারীতি। তবু পাগলামিটায় এখনো ভালোবাসার স্মৃতি মাখানো রয়ে গেছে।
লোকজনের কাছে পথের দিশা জেনে হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তায় উঠে এলো শাহেদ। এবার কোথায় যাবে? বাঁয়ে গেলে শহর, ডানে গেলে আরো গভীর গ্রাম। কোথায় যাবে সে?
সে চুমুক দিতে দিতে মনে মনে হাসছে। ঘরে কখনো অসময়ে চা খেতে ইচ্ছে করলে যা বলে, বুড়োকে তাই বলে ভড়কে দিয়েছে।
এতক্ষণে তার মুখে একটু হাসি ফুটলো। পকেটে থাকা শেষ দশ টাকার ছয় টাকা বুড়োকে দিলে বাকী থাকে চার টাকা। তামাকের ব্যবস্থা হয়ে যাবে তাতে।
সেই সকালে একশো টাকা নিয়ে বেরিয়েছিল। এখন সেই ১০০-র ১ বাদ দিয়ে দুটো ০০ নিয়েই বাড়ি ফিরবে। ক্লাস থ্রিতে তাদের ক্লাসে একটা ছেলে অংকে ০০ পেয়েছিল বলে স্যার বলেছিলেন, খাতাটা বাড়ি নিয়ে মামলেট করে খেতে। দুটোই নাকি হাসের ডিম ছিল। অসময়ে এসব কথা কেন মনে পড়ে কে জানে।
Sunday, August 3, 2014
বন্ধুতার কোন দিবস রজনী নাই
২.
ভাগ্যিস ফেসবুক ছিল, নইলে এত দিবস কেমনে মনে রাখতাম। দিবসটিবসগুলো মনে করিয়ে দেবার জন্য ফেসবুকের দরকার আছে। আজ বন্ধুদিবস জানার পর টের পেলাম আমার অধিকাংশ মাইট্যা বন্ধুর কোন ফেসবুক নাই। যে কয়জন আছে তারাও নিয়মিত না, মাসে দুচারবার ঢোকে কিনা সন্দেহ আছে। ফেসবুকে শুভেচ্ছা দিলে তাদের কারো কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নাই। আবার তাদেরকে যে সুমধুর (!) ভাষায় শুভেচ্ছা দিতে অভ্যস্ত সেই ভাষাও ফেসবুক এথিকসের বাইরে। যাশশালা তাইলে আজ তোদের কাউরেই শুভেচ্ছা দিলাম না। বিফলে যাক বন্ধু দিবস। তয় নিজ নিজ দায়িত্বে ভালো থাকিস তোরা। হুটহাট কারো হার্ট অ্যাটাকের সংবাদ শুনতে যেন না হয়। মেজাজ খারাপ লাগে।
৩.
Tuesday, July 22, 2014
বালিশ
সারাদিন ধকল গেছে। শিকার ধরতে বেগ পেতে হয়েছে অনেক। একটা গণ্ডারের তাড়া খেয়ে গাছে উঠে বেঁচেছে। শেষে বনের এক পাশে গাছতলায় পড়ে থাকা হাবিজাবি ফলমুল খেয়ে পেট ভর্তি করে আসার পথে একটা খরগোশের বাচ্চা চোখে পড়লো। দেখামাত্র দেরী না করে নিখুঁতভাবে পাথর নিক্ষেপ করলো হাদিম। অব্যর্থ লক্ষ্য। চামড়া ছিলে এতটুকুন মাংস মিললো। কিন্তু এটুকুনে কি পেট ভরে? তবু পাথর ঘষে আগুন জ্বালানোর ঝক্কি ঝামেলায় না গিয়ে কাঁচাকাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেললো নাড়িভুড়ি সহ।
সেই থেকে অশান্তির শুরু। পেটটা ঢোল হয়ে আছে। কতক্ষণ গড়াগড়ি খেল সে মাটিতে। তবু ঢোলটা কমে না। কী মুশকিল। দুহাতে পেট চাপড়ালো, খামচি দিল বড় বড় নখে। কোথাও ফুটা করে দিতে পারতো যদি। পায়খানার বেগও আসছে না যে কিছু জায়গা খালি করবে।
হাদিমের মনে হচ্ছে খরগোশটা জীবিত হয়ে পেটের মধ্যে ঢুশ মারছে। হারামজাদা! এত ছোট্ট জিনিসের এত শক্তি কেমনে হয়? অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে হাদিম ভাবতে থাকে কি করলে ঘুম আসবে। হাই উঠছে কিন্তু ঘুম আসে না। চোখ বুজতেই পেটে ঢুশঢাশ শুরু হয়। ভুটভাট শব্দটা মাঝে মাঝে এত জোরে হয় যে কানে এসেও বাজে।
শুয়ে বসে কিছুতে শান্তি নেই। মাঝরাতে সে উঠে বাইরে যায়। কাজটা সারতে পারলে আরাম হতো। একটু দূরে গর্তের পাশে বসে যায় আবার। কিন্তু অনেক কোৎকাত করেও কাজ সারা যায় না। অসমাপ্ত রেখে উঠে পড়ে।
শুনতে পায় দূরে গর্জন করছে হিংস্র প্রাণী। কিন্তু ভয় লাগছে না আজ, পেটের অশান্তিতে ভয়ডর চলে গেছে। আবার গুহায়ও ফিরতে ইচ্ছে করছে না এই অশান্তি নিয়ে। শরীরে কেমন আলস্য ধরে গেছে। হাদিম শুয়ে পড়ে একটা জঙ্গলের পাশে। কিন্তু মাথাটায় যেন আরাম লাগছে না। ব্যথা ব্যথা অনুভব। হাদিম কিছু ঘাস পাতা জড়ো করে মাথায় দিল। তাও হয় না। আরো কিছু লতাপাতা দিয়ে এক মাথা উচু করে মাথা রাখলো। এখন বেশ আরাম লাগছে। ঘুম চলে আসছে তার। পেটের ভুটভাটগুলো গলার ঢেকুর হয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। টেরই পেল না কখনো ঘুমিয়ে পড়েছে। সেই ঘুম ভাঙলো একদম সূর্য ওঠার পর। আজ প্রথম গুহার বাইরে রাত কাটালো। বিপদ হতে পারতো। দলের সবাই তিরস্কার করলো হাদিমকে।
কিন্তু হাদিমের শরীর একদম ঝরঝরে হয়ে গেছে। সে ভাবলো রাতে ঘুমোবার সময় মাথার নীচে দেয়া ঘাস লতাপাতার বোঝাটাই পেটের ভুটভাট দূর করে শান্তির ঘুম এনে দিয়েছে। তখন থেকে সে প্রায়ই ঘুমোবার আগে জঙ্গল থেকে ঘাসলতাপাতা ছিড়ে এনে মাথার নীচে দেয়। বাকীরা দেখে দেখে হাসে। ব্যাটা পাগল নাকি। কিন্তু হাদিম পাত্তা দেয় না ওসব।
কিছুদিন পর গুহার আরো একজনের সেরকম ভুটভাট সমস্যা হলো। হাদিম তাকেও ঘুমাবার সময় ঘাসপাতা দিয়ে শুতে বললো। প্রথমে সে অবিশ্বাস করলেও যখন সে ঘাসপাতা দিয়ে শুলো, তার ঘুম এসে গেল। ভুটভাট কমে গেল। তখন বুঝলো জিনিসটা কামেল আছে। তারপর থেকে আস্তে আস্তে পদ্ধতিটা জনপ্রিয় হতে থাকে।
যখন পাড়ার সর্দারের কাছে ঘাসপাতা মাথায় দিয়ে ঘুমানোর উপকারীতার কথাটা পাড়লো একজন, তখন সর্দার একটু ভেবে হুকুম দিল ঘাস পাতা নয়, তার জন্য ভেড়ার চামড়া আর লোম দিয়ে অমন একটা বোঁচকা তৈরী করে দিতে। ওটা মাথায় দিয়ে সর্দার ঘুমাতে শুরু করলো প্রতিদিন।
সর্দারকে ভেড়ার চামড়া ব্যবহার করতে দেখে কিছুদিন পর বাকীরাও ঘাসপাতা বাদ দিয়ে চামড়া ব্যবহার শুরু করলো এই কাজে। এদ্দিন ধরে কোমরে আর মাথায় এক টুকরো চামড়া পরা হতো বিশেষ উৎসবের দিনে নাচানাচি করার জন্য। এখন চামড়ার চাহিদা অনেক বেড়ে গেল বোঁচকা বানাবার কাজে।
ভুটভাট সমস্যা প্রায় সবারই থাকে। কিন্তু সেই সমস্যার চেয়েও বোঁচকার প্রয়োজনটা বাড়লো ঘুমের আরামের জন্য। মাথার নীচে একটা বোঁচকা দিলে ঘুমটা কেমন স্বর্গীয় আনন্দের ব্যাপার হয়ে যায়। এই জিনিসটা আস্তে আস্তে মানুষের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠতে লাগলো এবং একসময় জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে গেল।
নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন কাহিনীটা কি? হ্যাঁ, সেটাই। সেই থেকে চালু হওয়া বোঁচকটা কয়েক হাজার বছর পর বালিশ নামে পরিচিত হলো। আজ বালিশের নাম সবাই জানে কিন্তু হাদিমের নামটা বেমালুম ভুলে গেছে মানুষ।
[পাদটীকাঃ আদিম মানুষদের কোন নাম ছিল না। তবু আধুনিক যুগের এক মানুষের কাছে 'হাদিম' নামে একজন ধরা দিল কল্পজালে। হাদিমের যুগ দশ হাজার বছরেরও পুরোনো। আধুনিক মানুষের মতে খ্রিষ্ট্রপূর্ব ৭০০০ সালের দিকে মেসোপটমিয়ার মানুষ প্রথম বালিশ ব্যবহার করে। কিন্তু তারো কয়েক হাজার বছর আগেই কোন এক গুহাবাসী হাদিম বালিশের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে সেটা কোন রেকর্ডে নেই। তাই আজ হাদিমকে চেনে না কেউ। হাদিম আজ কল্পলোকের বাসিন্দা হলেও মাঝে মাঝে সে আপনাদের সামনে আসবে তার আদিম আবিষ্কারের আরো বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে। ]
ফতমে ডং গসসো খেনো?
আজ সকালের মেঘলা আকাশ, ঝড়ো হাওয়া, জানালার কাঁচে আছড়ে পড়া বৃষ্টি দেখতে দেখতে উদাস হয়ে ভাবছিলাম আজ দিনটা খারাপ না। এখনো কোন দুঃসংবাদ পীড়িত করেনি। ফেসবুকে বন্ধুদের কয়েকটা টোকা দিয়ে চোখে পড়লো একটা মজার লেখা। এটা ইতিমধ্যে অনেকের পড়া হয়েছে ফেসবুকে। আমি তবু কপি করে রাখার লোভটা সংববরন করতে পারলাম না।
চাটগাইয়া প্রেমালাপ
আশিকঃ Hi, খি গত্তেসো?
তানিয়াঃ বাত কাচ্চি।
আশিকঃ ওবাইজ্জাখোদা! লুজা লাকোনি থুমি?...
তানিয়াঃ নাহ।
আশিকঃ খেনো?
তানিয়াঃ আম্মু মানা গসসে। আমার ফরীক্ষা ছলতেসে তো, ফুরাদিন লুজা তাকলে মন দিয়ে ফত্তে ফারবো না। সেজইন্ন সবগুলা লাকতে অবেনা। শুক্কুরবারে লাকতে বলসে।
আশিকঃ আচ্চা... খি দিয়ে বাত কাচ্চো?
তানিয়াঃ ডাইন আত দিয়ে।
হি হি হি...
আশিকঃ আল্লা! আমি মনে গসসি মুক দিয়ে কাচ্চো। হো হো হো...
তানিয়াঃ থুমি বেসি বান্দর অই গেসো। থুমাকে মাইর দিতে অবে।
আশিকঃ দ না! আমি খি থুমাকে দরে লাকসি?
তানিয়াঃ হুমম... বাত কানা শেষ।
আশিকঃ বালো। খালকে খি ফরীক্কা থুমাদের?
তানিয়াঃ ইংলিশ ফতম ফত্র।
আশিকঃ ঠেনসটা বালো গরে ফড়বা। ফুরো ইংলিশ সাবজেক্ট ঠেনসের উফর।ঠেনস যথ বালো ফারবা ইংলেজিত থথ বেশি লম্বর ফাবা।
তানিয়াঃ ওবুক! থুমি তো বৌত কিসু ঝানো!
আশিকঃ হুমম...আমি ইংলিশে অনাস গত্তেসি তো...
তানিয়াঃ ওমারে! থুমি বেশি ফাখাফাখি গরো।
আশিকঃ ফাখাফাখি না গরলে মাইয়া ফঠাতে ফারবো নাথো।
তানিয়াঃ হইসে আর বেড বেড গত্তে অবে না। লুজা তেকে মানুষ এথ খতা খেমনে বলে! মারেম্মা!
আশিকঃ খে বেড বেড গত্তেসে? আমি না থুমি? ফল হন্ডেয়ার!
তানিয়াঃ থুমি ফল!
আশিকঃ তাপ্পর হাবে একন!
তানিয়াঃ থুমি কাবে!
আশিকঃ আমি কাবো না। লুজা তাকসি।
তানিয়াঃ হা হা হা... বান্দর।
আশিকঃ থানিয়া...থুমাকে একটা খতা বলবো।
তানিয়াঃ বলো।
আশিকঃ থুমার সুকগুলো কুব ঠানা ঠানা । আমার মনে খয়, সারাদিন থাকাই তাকি।
তানিয়াঃ যাহ্! আমার শরম লাগতেসে! থুমি লুজা তেকে এগুলো কি সুরু গসসো?
আশিকঃ চ্যরি...আচ্চা একটা খতা বলি?
তানিয়াঃ একন বলসো না একটা!
আশিকঃ হিটা না, আলেকটা।
তানিয়াঃ ও.খে। বলো।
আশিকঃ আমি থুমাকে অনেক বালোবাশি। থুমার মথামথ কি? থুমি খি আমাখে বালোবাশো?
তানিয়াঃ আমার খাজ আসে। কুদা হাফেজ। ফরে কতা হবে। বাই।
আশিকঃ আমার ফশ্নের উত্তর দি যাও!
তানিয়াঃ খিসের ফশ্ন?আমি খিসু শুনি নাই। ফরে কতা অবে, বাই।
আশিকঃ ফরে আর কথা অবে না। আমি আজখে তেকে আমার পেসবুকের একাউন্ট ডিট্টেবেট গরে দিব।
তানিয়াঃ দাওগা। আমাখে বলতেসো খেনো?
আশিকঃ আচ্চা, বাই। বালো তেকো। কুদাফেজ।
তানিয়াঃ এই শুনো! এথ ফাট দেকাও কেন?
আশিকঃ খে দেকাসসেদে ফাট? আমি না থুমি?
তানিয়াঃ থুমি একটু বেশি মাতো। খতা খম বলবে।
আশিকঃ হুমম... আমি আর খতাই বলবো না। থুমি খি আমার ফশ্নের উত্তরটা দিবে?
তানিয়াঃ হুমম...
আশিকঃ হুমম... খি? হ্যাঁ নাখি না?
তানিয়াঃ হ্যাঁ... আমিও থুমাকে বালুবাশি।
আশিকঃ থুমিও বাজী... এত লং গত্তে জানো যে!
ফতমে ডং গসসো খেনো?
Thursday, July 10, 2014
দুটো স্মৃতি এবং একটি সম্পর্কহীন গল্প
বহুদিন ধরে যাবো ভাবছিলাম। শেষবার গিয়েছি দুই দশক আগে। এমরানই নিয়ে গিয়েছিল। প্রাচীন একটা দালান। আবছা অন্ধকার ধোঁয়াশা ঢাকা একটা ঘর। টিমটিমে আলো জ্বলছে সিলিং থেকে। লম্বা টেবিল ঘরের মাঝখানে। সারিবদ্ধ চেয়ার। সারি সারি বইয়ের তাক দেয়াল জুড়ে।
ঘরজুড়ে অতি প্রাচীন একটা গন্ধ। যেন টাইম মেশিনে চড়ে হঠাৎ করে উনিশ শতকে চলে এসেছি। ঐ তো ওদিকে বঙ্কিম, রামমোহন, বিদ্যাসাগর। তার পাশেই তরুণ রবীন্দ্রনাথ কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নজরুল হামাগুড়ি দিচ্ছে ধুলোমাখা উঠোনে। জীবনানন্দ আচড় কাটছে মেঝেতে। এরা সব আমার চেনা।
আমি একটা চেয়ার নিয়ে বসে পড়লাম। মোটা একটা জার্নালে বুঁদ হয়ে গেলাম। এই তো এদের খুঁজছিলাম আমি এতকাল। সেই শেষ। দুই দশক ওমুখো হইনি। সময় পাইনি।
সেদিন আবারো ঝোঁক চেপে গেল। অফিসে ফাঁক বের করে আবারো ছুটলাম। ভেতরে ঢুকলাম। দুপুর একটা বাজে। নীরব নিস্তব্ধ পুরো দালান। একটা দরোজা খোলা। আমি আলগোছে ঢুকলাম। কেউ নেই। দিনের আলো যথেষ্ট ঢোকেনি। ঘুপঘুপ করছে অন্ধকার। চেয়ার টেবিল সব আগের মতন, আরো পুরোনো হয়েছে ২০ বছরে। একটাও মানুষ নেই।
-কী চাই?
-ইয়ে, পুরোনো কিছু বই পত্রিকা চাই।
রাঙ্গুনিয়া পেরিয়ে আরো বেশ কিছুদূর যাবার পর আমাদের বাসটা থামালো সরকারী বাহিনী। এক বিডিআর জওয়ান গাড়িতে উঠে কিছু একটা খুঁজছে।
আমরা তিনজন। দুজন জেগে আছি, মাঝখানের জন ঝিমাচ্ছে। বিডিআর আঙুল তুললো তার দিকে।
বললো, ওনাকে নেমে যেতে হবে। ...
আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কেন, সমস্যা কি?
বিডিআর জওয়ান বললো, পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন বিদেশী নাগরিক নিষিদ্ধ।
আমরা তাকালাম আমাদের লালগোঁফের বন্ধুটার দিকে।
ঝাঁকি দিয়ে জাগিয়ে তুলে বললাম, "ঐ বেডা তোরে ত নামি যন ফড়িবু। তোর বাড়ি হন্ডে, রাশিয়া না?"
সে ধড়মড় করে জেগে উঠে বললো -"ধুর বেডা মশকারি নচুদাইস"।
বিডিআর জওয়ান ওর ভাষা শুনে চোখ কপালে তুলে সুরসুর করে নেমে গেল। গাড়ি আবারো চলতে শুরু করলো।
সেই বন্ধুটির নাম হোসেন শহীদ। সে আজো দুনিয়াতে আছে একই শহরে আছে, কিন্তু আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে অজ্ঞাত কারণে।
মহাচোর
দেশের উজির অনেক উচ্চ বংশীয় লোক। সমাজে সম্মানিত। অর্থে প্রতিষ্ঠিত। ক্ষমতায় দম্ভিত। শুধু একটি অতি গোপনীয় সমস্যা তার। উজির ভদ্রলোক সপ্তাহে একদিন চুরি করেন। চুরি করেন রাজকোষ থেকে। রাজা প্রতি রোববার শিকারে বেরোন, তখন তিনি চুরির কাজ সারেন। চুরির কথা রাজকোষ প্রহরী ছাড়া আর কেউ জানে না। প্রহরীকে বলে দিয়েছেন কাউকে জানালে চাকরী তো যাবেই, সাথে জানও। প্রহরী নিশ্চুপ।
একদিন ভদ্রলোকের নিজের ঘরে চোর ঢুকলো। চোর চুরি করে পালাবার আগেই ধরা পড়ে গেল। প্রকাশ্য রাজ দরবারের বিচারে সাজা হলো শূলে চড়ানো। শূলে চড়ার আগে চোর একবার রাজার সাথে দেখা করতে চাইল। রাজা অনুমতি দিল। চোর তার কোচড় থেকে একটি স্বর্ণমুদ্রা বের করে রাজার সামনে ধরলো।
রাজা বললো, "এ কী!!! এ তো রাজকোষের স্বর্ণ!!!!"
চোর বললো, "মহারাজ একটি স্বর্ণমুদ্রা চুরির সাজায় যদি শূলে চড়তে হয়, পুরো রাজকোষ চুরির সাজা কি?"
[বাংলাদেশেও বড় বাটপার ছোট বাটপারকে শাস্তি দিতে পারদর্শী যদি না তার রাজনৈতিক যোগাযোগ মজবুত থাকে]
Tuesday, July 8, 2014
যে চিঠি রাষ্ট্রনায়ক কখনো পড়বেন না
আপনি বলতে পারেন এই সমস্যার কথা কেন আমি স্থানীয়ভাবে সমাধান করছি না। বাংলাদেশে অনেক সমস্যা স্থানীয়ভাবে অবহেলিত হয় অথবা স্থানীয় প্রশাসনের স্বার্থবিরোধী হবার কারণে সমাধান হয় না।