Sunday, July 17, 2016

দেবেশ রায়ের 'উচ্ছিন্ন উচ্চারণ' থেকে....

'যখন সময় থমকে দাঁড়ায়......' একটা থমকে যাওয়া দুঃসময়ে গানটা প্রথম শুনেছিলাম বলেই সেই গানের সূচনা সঙ্গীত এখনো স্মৃতি কাতরতা জাগিয়ে তোলে। গান, কবিতা, সিনেমা কিংবা বই - এসব অনেক দুঃসময়ে মলমের কাজ করে। প্রায় প্রতিটি মানুষ কোন না কোন ক্ষত নিয়ে জীবন পার করে, কিছু ক্ষত প্রকাশ্য কিছু ক্ষত অপ্রকাশ্য। আমরা কী সবার সব ক্ষত দেখতে পাই? কিংবা আমার ক্ষতটা কি আর কাউকে দেখতে দেই? দেই না। মানুষ নিজের জগতে শুধু নিজেই জানে এখানে কতটা অসহায় একটা প্রাণী। কতোটা একাকীত্ব অনুভুতির ঘুপচি ঘরে লুকোনো আছে।

দেবেশ রায়ের মফস্বলি বৃত্তান্তের পর হাতে আসলো 'উচ্ছিন্ন উচ্চারণ'। পড়তে পড়তে কিছুদূর এগিয়ে ইচ্ছে করলো কিছু অনুচ্ছেদের অংশবিশেষ লিখি। নতুন এক দেবেশ রায়কে আবিষ্কার করা হলো এই বইটিতে। একটি সম্পূর্ণ অনুভুতিময় বই, চিরচেনা কিছু অনুভুতি অথচ আর কেউ লেখেনি এমন করে। আর কেউ ভাবেনি এমন করে। নতুন একটা মুগ্ধতা এসে জড়িয়ে ধরলো আজ। লালনের গান যেমন একটা ভাবের জগতে নিয়ে যায় আমাদের। এই বইটিও তেমনি ভাসায়, আর ভাবায়। ভাবতে ভাবতে...........পড়তে পড়তে.......কিছু টুকে রাখা টুকরো অংশ.......

--------------------------------------------------------------------------------------


বাঁশের ঝাড়ে ঢুকলে বাতাস পথ হারিয়ে ফেরে। তখন সে বাঁশের গুচ্ছমূল থেকে বাঁশের পাতা বেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। বাঁশপাতার ভিতর দিয়ে তখন ছোট নদীর সেই কল্লোল শোনা যায়, যা দিনের বেলায় অনেক আওয়াজের সঙ্গে মিশে থাকে। তাকে আলাদা করা যায় না। এই কথাগুলো বাঁশপাতার বহতা নদীর মতো এখন কলধ্বনিতে স্পষ্ট।


যে একক দিয়েই মাপো না কেন, তুমি তো আমাদের সম্বন্ধকে এক জন্মের বেশী টেনে নিয়ে যেতে পারবে না। তাও সে জন্মের কতটাই তো আমাদের বাধ্যত আলাদা কেটেছে। তাহলে, মাত্র এক জন্ম? একটাই মাত্র জন্ম? আর তা এতই ছোট? এরই ভিতর আমাদের জন্ম জন্মান্তর জড়ানো মিলন ঘটে গেল, ঘটে শেষ হয়ে গেল? এরই ভিতর আমাদের জন্ম-জন্মান্তর দিয়েও ঘোচানো যাবে না, এমন বিচ্ছেদ ঘটে গেল? আর, আমরা দুজন এই এক জন্মব্যাপী সময় ধরে, ধীরে-ধীরে, ধীরে-ধীরে, যেমন করে ধীরে-ধীরে মরুভূমির বায়ুহীনতায় সারা রাত বালিয়াড়ির বালি ঝুরঝুর ঝুরঝুর ঝরে যেতে থাকে, অথবা, আর এক জায়গায় পুঞ্জিত হতে থাকে, তেমনি ধীরে-ধীরে, ধীরে-ধীরে জেনে গেলাম, জেনে গেলাম, যে, আমাদের ভিতরে যে বিচ্ছেদ ঘটে গেছে, তা যুগ-যুগান্ত কেটে গেলেও আর ভরাট হবে না।......আমাদের অভিকর্ষের বদল ঘটে গেছে, আমাদের আকাশের বদল ঘটে গেছে। আকাশ একবার বদলে গেলে কি আর তার পুনরুদ্ধার ঘটানো যায়?  [তের]


তুমি কী দিয়ে মাপতে আমাদের সম্বন্ধের বয়স? সূর্যের উদয় ও অস্ত দিয়ে? তাতে তো প্রতিটি দিনকে আলাদা করে গুনতে হয়। তুমি কি তাতে সম্মত হতে পারততে-আমাদের একটা দিনকে আর একটা দিন থেকে আলাদা করতে? তোমার কাছে তো আমাদের পুরোটা জীবনের সময় ছিল এমন, যাকে খণ্ড করা যায় না, যাকে ছিন্ন করা যায় না, যাকে গণনা করা যায় না।
...............
আমাদের দুজনের দুজনের কাছে পৌঁছাতে কতগুলো বছর শৈশব খেয়েছে, কতগুলো বছর বাল্য খেয়েছে, কৈশোরেও প্রথমদিকের বছরগুলি নিজেদের দেখতে নিজেরা খেয়েছি। তারপর কতো কোটি আলোকবর্ষ পেরিয়ে নবজাতক নক্ষত্রের আলো চোখে এসে লাগলো। তখন থেকে যদি জন্মের হিসেব নাও, তাহলে দেখবে কটি বছর, মাত্র কটি বছর আমাদের সম্বন্ধের আয়ু। সেটা কি হিসেবে আসে? আর কটি মানববর্ষের হিসেব করতেই কি সূর্য চন্দ্র ও নক্ষত্রকে পরিমাপের একক হিসেবে বাছছিলে? তোমার অনন্ত, ক-বছরের অনন্ত?
[নয়]
..................................
.......................................
তুমি কি অন্যের অনুমোদিত স্ত্রী ছিলে? তুমি কি তখনো অনূঢ়া ছিলে? এসব প্রশ্নের কোন মীমাংসা নেই, কেননা এসব কোন শব্দের ভিত্তি নেই। আমাদের সব শব্দের ভিতর কোনো না কোনো সামাজিক অনুমোদন বা নিষেধ লিপ্ত আছে। কোন নারী কি এমন থাকতে পারে যে অনূঢ়াও নয়, আবার অন্যের অনুমোদিত স্ত্রীও নয়, কিংবা ধরা যাক, বিধবাবো নয়। তাহলে তুমি আমার কী ছিলে? আমরা আমাদের জীবনের সবচেয়ে উদ্বেল, গভীর ও অমেয় সময় কাটালাম যে বন্ধনে, সে বন্ধনের কোন নাম নেই? এই বন্ধনকেই কেন জোর দিতে চাইছি? আমাদের দুজনের বন্ধন তো ছিল কত অজস্র আজন্ম, বংশানুক্রমিক ও অর্জিত বন্ধন থেকে মুক্তি। এত মুক্তির পথ দিয়ে, বা, এত মুক্তি ঘটাতে-ঘটাতে, যে বন্ধন তৈরী হয়, সে কি বন্ধন? আমরা কি তাহলে সেই বন্ধনে বাঁধা পড়েছিলাম, যে বন্ধন বাধা যায় মানুষের পূর্ণ স্বাধীন ইচ্ছায়। সে বন্ধনের মুক্তিও ঘটে মানুষের পূর্ণ স্বাধীন ইচ্ছায়। কোন মানুষ নিজেকে এতটাই অধীন করে রাখে, যে, সে তার মুক্তিকেও মুক্তি বলে চিনে নিতে পারে না, এমনকি সেই মুক্তির বন্ধনের কোন নাম বা পরিচয় পর্যন্ত দিতে পারে না। অথচ সভ্যতা বলতে তুমি যদি কিছু অনুমান করে নিতে পারো, তাহলে যে সভ্যতাগুলো আমরা পেরিয়ে এসেছি, ও যে সভ্যতার আলোড়নের মধ্যে আমাদের বসবাস, জীবনযাপন করছি ও এই সভ্যতার পর যেসব সভ্যতা তৈরী হয়ে উঠবে, সমুদ্রের প্রবালদ্বীপের মত, সেই সব সভ্যতার দিকে তাকিয়ে দেখো, মানুষ শুধু এই একটি বন্ধনের, বা মুক্তির, বা সম্বন্ধের নামকরণ করতে চাইছে এমন একটি শব্দে, যার ভেতরে কোন আনুগত্য বা সামাজিকতা লুকোনো নেই। মানুষ এখনো কোনো ভাষায় তার স্বাধীনতম সেই সম্বন্ধের কোন পথ খুঁজে পায়নি, যে সম্বন্ধ একমাত্র মানব মানবীই রচনা করতে পারে, যে সম্বন্ধে মানব মানবী উত্তীর্ণ হতে পারে। আমার এমন একটি জিজ্ঞাসা-তোমার আমার সম্বন্ধ কদিনের থাকল-তৈরী করতে গিয়ে, আমি সেই সম্বন্ধের পরিচয় কী, এই প্রাক প্রাথমিক জিজ্ঞাসাতেই ঠেকে গেলাম।
[এক]

এবং বর্তমান সময় ও ঘটনাবলীর সাথে প্রচণ্ডভাবে প্রাসঙ্গিক কয়েকটি লাইনও---

মানুষের ভালোবাসার শক্তি মৃত্যুকে পরাজিত করার শক্তি হারিয়েছে। কারণ, মানুষ নিজের জ্ঞানকে হত্যা, আরো হত্যা ও আরো হত্যার কাজে ব্যবহার করেছে। মানুষ যখন জ্ঞানের শক্তি নিজেই আয়ত্ত করেছিল, তখনই সে তার নিজের উপর এক নিষেধও জারি করেছিল। এই আহরিত ও আবিষ্কৃত জ্ঞান যেন কখনোই হত্যার ভিত্তি হয়ে না উঠে। তারপর, মানুষ নিজেই নিজের সেই নিষেধাজ্ঞা অস্বীকার করেছে। যে মানুষ নিজেই মৃত্যুর এক প্রধান কারণ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে, সে মানুষ মৃত্যুকে পরাজিত করার শান্তি, শক্তি ও নিশ্চয়তা সংগ্রহ করবে কোথা থেকে? [১১০ পৃষ্ঠা]

বইটি এখনো শেষ হয়নি। হয়তো আরো সংযোজনের প্রয়োজন হবে.....আরো কিছু লাইন।

প্রথম যাত্রার ভোর - পর্ব এক

সেই সুপ্রভাত!

ভোরে ঘুম ভাঙতে খুব কষ্ট হয় তবু উঠে যেতে হয়। হাসি পায় মাঝে মাঝে, সাথে দুঃখও। কী মানুষ কী হয়ে যায় চাপে পড়ে। দু মাস আগে নেয়া একটা সিদ্ধান্ত হুট করে জীবনের রুটিনটা পাল্টে দিল।

মেঘের দিন ছিল সেটা, ছিল আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি। এমন দিনে কাঁথামুড়ি দিয়ে ঘুম না দিয়ে চাকরীর বাজারে ধর্না দেয় কে? নাকি এটাও এক অভিজ্ঞতা। একশোটা চেষ্টা করে একটাতে লাগানো যায়। প্রথম অভিজ্ঞতাটি নেবার জন্য যারা ঠেলে গুঁতিয়ে রাজী করিয়েছে তাদের মধ্যে প্রথম হলো মামুন। সে অভিজ্ঞ চাকরী অনুসন্ধানী, বিজ্ঞাপনের খবরটা প্রথমে আনলো মামুন। তারপর পত্রিকার কাটিং নিয়ে হাজির পারভেজ, এরপর ইন্টারভিউতে বসার জন্য জোর তাগাদা নওশাদের।

আমি আদিকাল থেকে মোলায়েম ধরণের একরোখা, হুট করে জেগে ওঠা বদরাগী। আমাকে বশ মানানো যায় না বলে বদনাম আছে। নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেই। এই সিদ্ধান্তটা কি হবে? ততদিনে অবশ্য বুঝে ফেলেছি পিতার মুখ করুণ হয়ে আসলেও জননীর চোখে কোন চাওয়া ছিল না। আমাকে নিয়ে পরিবার ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারে তেমন কিছু করিনি। শুধু একবার একটা স্বপ্ন জেগে উঠেছিল মাঝে, বছরখানেক জ্বলে ছিল, তারপর দপ করে নিভে গেল প্রত্যাশিত পথেই।

তবু যেহেতু শিক্ষাজীবন শেষ, বাপের হোটেলের খাবার ফুরোলো বলে, কিছু না পারলে চাকরীর চেষ্টাটা যে চলছে তা প্রমাণ করাও কম কি। মায়ের কাছে হাত পাতার দিন শেষ। শেষ সম্বল ড্রয়ারে ডায়েরীর ভাঁজে দুটো একশো টাকার নোট, যদি কোনদিন ঘর ছেড়ে পালাতে ইচ্ছে করে তার গাড়িভাড়া।

সুতরাং স্থির একটা সিদ্ধান্তে আসার প্রয়োজনীয়তাটা খুব গোপন একটা চাপে রেখেছিল। সেই অন্তর্গত চাপটির কারণে দিস্তা কাগজের দুটো পাতা ছিঁড়ে একটা যেনতেন দরখাস্ত আর একটা বায়োডাটা লিখে নিয়ে নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে উপস্থিত।

প্রতিযোগিতা বরাবরই অপছন্দ আমার। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী নেই আমি সেখানেই বিচরণ করি। আমার রাজ্যে আমি একাই অধীশ্বর। হবু কর্মস্থলের প্রার্থনীয় পরীক্ষাতে গিয়ে কয়েকশো প্রতিযোগী দেখে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলাম প্রায়। তবু ফিরে আসার আগমুহুর্তে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গৃহে ডাক পড়লে কিছু একটা ভেবে কিংবা না ভেবে ঢুকে পড়লাম এবং চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। সাদা চামড়ার এক সাহেব প্রার্থী যাচাইকর্মের প্রধান অতিথি। সাথে আরো জনা দুই দেশী। এমন অভিজাত কোন কক্ষে প্রবেশের পূর্বাভিজ্ঞতা না থেকেও গা ছেড়ে খানিকটা কৌতুকপ্রদ আলসেমি নিয়ে বসে আছি। আমি নিশ্চিত জানি যে গদিমোড়া চেয়ারটি আমাকে বসিয়ে রেখেছে তার মেয়াদ বড়জোর পাঁচমিনিট। তারপরই আমি উঠে যাবো। এটি একটি সৌজন্য সাক্ষাত মাত্র।

মন পড়ে আছে পকেটের দিকে। পকেটে তিনটা সিগারেট এখনো অবশিষ্ট আছে। আকাশে মেঘ থাকলে সিগারেট জ্বালাতে ইচ্ছে করে। সিগারেটে নেশা নেই কিন্তু ধোঁয়া ছেড়ে উদাস হবার শখেই আমার নেশা। আকাশে এখন মেঘ, যত তাড়াতাড়ি বের হওয়া যায় ততই মঙ্গল। প্রশ্নোত্তরগুলো তাই একটু বেশীমাত্রায় বেয়াড়া ছিল। প্রশ্নকর্তা কিছুটা বিস্মিত। শুধু তাই না, কর্তাদের একটা অপছন্দের বিভাগে যোগদানের প্রস্তাব আসলে জবাবটা হলো চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে। তোমার চাকরীই করবো না আমি। এরকম সময়ে এমন পাগলামি কেউ করে না। তবু দুর্বিনীত আচরণে কর্তাগণ না দমে আবার বসতে বলা হলো। আগের প্রস্তাব ফিরিয়ে নিয়ে আমার পছন্দের কাজ দেয়া হলো। বললো চুড়ান্ত নির্বাচন জানানো হবে বিকেলে।

জানানোর গুল্লি মারি - মনে মনে বলে বেরিয়ে এসে দাঁড়ালাম ফুটপাতে। আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে দিয়াশলাই জ্বালিয়ে তামাক শলাকায় সংযোগ দিলাম। বৃষ্টি আসছে শীঘ্রি। দ্রুত হেঁটে বড় রাস্তায় উঠে বাস ধরলাম। বৃষ্টি নামলো খুব চেপে। কোনমতে নওশাদের অফিসে পৌঁছালাম।

বললাম তোর অনুরোধে গিয়েছি। ইন্টারভিউ দিয়েছি কিন্তু চাকরী করবো না। অতদূরে অত খাটনি পোষাবে না। বৃষ্টির দিন, শেজানের খিচুড়ি খাওয়াবি নাকি বল, নইলে বাসায় যাইগা। নওশাদ রাজী। গোড়ালি ডোবা জল পেরিয়ে রাস্তায় উঠে একটা রিকশা নিয়ে শেজানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আধভেজা।

শেজানের খিচুড়ি খেয়ে ঢেকুর তুলতে তুলতে বললাম যা তুই অফিস করগে, আমি বাসায় গিয়ে ভাতঘুম দেই। এবার নওশাদ উল্টাসুর ধরে বললো, বাসায় যাবার আগে একবার ওদিকে দেখে যা। বিকেল হতে দেরী নেই। রেজাল্ট কী আছে দেখে অন্তত চোখে দেখে যা। কি আর করা, নেহাত খিচুড়িটা সে খাইয়েছে, চক্ষুলজ্জা বলে কথা। আবারো বাসে উঠলাম ইপিজেডের পথে। গিয়ে দেখি নামটা সত্যি সত্যি লিষ্টিতে উপরের দিকেই উঠে গেছে। একশো পঞ্চাশ জনের মধ্যে বারোজন চুড়ান্ত। এবার?

আবারো ডাক পড়লো সেই ঠাণ্ডা ঘরে। এবার নতুন এক সাদা চামড়ার বিদেশী। নতুন বউ দেখার মতো আমার আপাদমস্তক দেখে পছন্দ করা হলো শুধু একটা জায়গা বাদে। গোঁফটা ছেঁটে ফেলতে হবে।

বলে কী? এই গোঁফ দিয়েই তো চেনা যায় আমাকে। এটা ছাঁটলে আর কী থাকে বাকী। আমি পারবো না বলে চলে এলাম।

কিন্তু এক সপ্তাহ যাবার আগেই নিয়োগপত্র বাড়ি এসে হাজির। এবার বাসার সবাই জেনে গেলো। এখন কি উপায়? ধরে বেঁধে গোঁফ ছেঁটে কর্মজীবনে প্রবেশ করানোর জন্য তৈরী করলো তখনো বেকার থাকা বন্ধুরা।

উপায়ান্তর না দেখে মনে মনে অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও চাকরীটা পরীক্ষামূলকভাবে করে দেখার একটা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি। নিয়োগপত্রে দেয়া প্রাথমিক সম্মানীর অংকটা ২৫০০ দেখে খচখচানি ছিল। বিসিএস পাশ করলে ২৮৫০ স্কেল হতো। ব্যাংকের চাকরী হলে ৬০০০ টাকা। থাক এটাও মেনে নেয়া গেল। ১০০০ টাকা দিয়ে একটা মাসিক টেক্সি ঠিক করা গেল। পকেটে ফুটো পয়সা নাই, কিন্তু টেক্সি ছাড়া চলবে না। তাও নতুন টেক্সি হতে হবে। খুরশীদ ড্রাইভার প্রতিদিন সকালে ডেকে নিয়ে যাবে বাসা থেকে। ১০০০ টাকা মায়ের হাতে দিয়ে ভালো ছেলে হবার চেষ্টা করা যাবে। বাকী পাঁচশো টাকায় নিজের খরচ। চলবে? চলবে না কেন। একসাথে পাঁচশো টাকা হাতে নিয়েছি কবে মনে নেই।

পরিবারের সবচেয়ে অযোগ্য সন্তানটির নতুন পথে যাত্রা শুরু।

ভোরে ঘুম ভাঙতে তাই খুব কষ্ট হয়। পুরো ছাত্রজীবন ধরেই দশটার আগে উঠি না, রাত দুটোর আগে ঘুমাই না। এসব চাকরী মানুষে করে? প্রতি মাসেই ভাবি, আজ কদিন গেল। এ মাসটা যাক, তারপর ছেড়ে দেবো। অমানুষের খাটনি। সকাল সাতটায় দিন শুরু করে গাধার খাটুনিতে রাত এগারোটা। কোন কোন দিন রাত বারোটা পার ফিরতে ফিরতে। ছুটিছাটা এক অলীক বস্তু। সাপ্তাহিক ছুটি ব্যাপারটি ওখানে অলীক বিষয়। প্রথম তিন মাস চাকরী ছুটিবিহীন। দম ফুরিয়ে আসে মাঝে মাঝে। মাঝরাতে বাড়ি ফিরে মড়ার মতো ঘুমাই। খুব ভোরে আবার জেগে উঠি, ঘুম শেষ না হতে। এমন দিন আর কতকাল চলবে। আর পারি না। আজকেই চলে আসবো শেষবারের মতো করে। কিন্তু আসা হয় না।

এরকম ক্লান্ত শ্রান্ত বিধ্বস্ত মানসিক অবস্থায় হঠাৎ এক ঝলক বাতাস এসে বললো, গুড মর্নিং! এক এলোকেশী, শ্যামলা মায়াকাড়া চেহারার সাদামাটা তরুণী। আমিও ফিরতি জবাবে বললাম, মর্নিং। সহকর্মী, আমার চেয়ে কয়েকমাস পুরোনো। বোধকরি চেহারা দেখে করুণা হয়েছিল। সেই থেকে রোজ একবার দেখা হলেই গুডমর্নিং। শুধু ওই টুকুই, আর কোন কথা না। অথচ কী অদ্ভুত একটা সাহস চলে এলো তাতেই। যেদিন খেয়াল করেছি ওটা শুধু আমাকেই বলতো। কেন বলতো তাও কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি। তবে শুনতে ভালো লাগতো। ওই একটি বাক্য যেন আমাকে বলতো, তুমি একা নও। আমিও তোমার মতো। আমি আছি পাশে। আমার দিনটা যেন একটু সহনীয় সুন্দর হয়ে উঠলো কিছুদিন পরেই। সেই একই খাটুনি, একই দীর্ঘসময়ের কাজ। শুধু সকালবেলা কয়েক সেকেণ্ডের একটা বাক্য। তাতেই আমার সকাল যেতো ভরে, আমার দিন উঠতো হেসে, কর্মে যেতাম ভেসে।

সামান্য একটু আন্তরিকতাপূর্ণ হাসিমুখের সম্ভাষণ একটি কঠিন বিরস দিন সহজ আনন্দে কাটাবার জন্য কতটা গুরুতর ভূমিকা রাখে সেই প্রথম দেখা।

[চলবে......]

Tuesday, July 12, 2016

বৃক্ষ ছায়া

বৃক্ষপ্রেম নিয়ে কোন সন্দেহ না থাকলেও বৃক্ষরোপন ও লালন পালনে আমার অদক্ষতা এবং অযোগ্যতা সুবিদিত। আমি কখনো কোন গাছ লাগিয়ে ফুল ফোটাতে পারিনি, ফল ধরেনি আমার লাগানো কোন গাছে। শুনলে বিশ্বাস হবে না হয়তো, আমার বাগান জুড়ে এত গাছ গাছালির মেলা ছিল তার সবটুকুই আকাশ থেকে পাওয়া। আমি বৃক্ষদের ভালোবাসি, কিন্তু তারা আমার হাতে বড় হতে পছন্দ করতো না। আমার হাতের ছোঁয়া পেলে তাদের বৃদ্ধি থেমে যেতো।

একটা জলপাই গাছ দশ বছরেও তিন ফুটের বেশী বাড়েনি। একটা কাঁঠাল চাপা যেটুক লাগিয়েছি, সেই ডালেই তিনটি ফুল দিয়েছিল তিন বছরে বাড়েনি এক ইঞ্চিও। সবচেয়ে বেশী প্রতারিত হয়েছি গোলাপের কাছে। আমার হাতে গোলাপ ফোটেনা বলে তৈরী ফুটন্ত কালচে মেরুন রঙের গোলাপসহ গাছ লাগালাম। নার্সারি থেকে বলেছিল গোলাপটির নাম পাপ্পা মেলন। 

সেই ফুল ঝরে যাবার পর ওই গাছে আর কোন ফুল ফোটেইনি বরং গাছের ডাল ফুঁড়ে দীর্ঘ কন্টকময় অসংখ্য কাণ্ডের জন্ম হয়েছিল যা লতার মতো বেড়ে আমার বাগানের একাংশ গ্রাস করে ফেলেছিল। কোন ফুল নেই, শুধু সুন্দর সুন্দর কাঁটা ঝোপের পাতা। এত সুন্দর গোলাপ পত্র আর কোথাও দেখিনি। কিন্তু ফুলের দেখা নেই যেখানে দীর্ঘ এক বছরেও পাতা দিয়ে কী করবো।

একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম গাছটিকে ঝাড়ে বংশে উৎখাত করবো। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত করার আগেই গাছটি নতুন একটা চাল দিল।  হঠাৎ করে সেই বন্ধ্যা কাণ্ড থেকে এক থোকা কুঁড়ি বের হয়ে এলো। পরের সপ্তাহে আরো। একটা ফুল না। এক থোকায় দশ পনেরোটি ছোট ছোট ফুল, দেখতে গোলাপের মতো, কিন্তু রঙটা সাদাটে গোলাপী। আমি যে ফুল দেখে গাছটি কিনেছি তার সাথে কোন মিল নেই। ওই অদ্ভুত ফুল গুলি তার রূপ দেখিয়ে গাছের জীবন রক্ষা করেছিল সেবারের মতো।

ঘটনাটি আজ অবধি রহস্যময় হয়ে আছে আমার কাছে। সেই শেষ। আমি আর কোন গোলাপের সাথে লেনদেন করিনি পরবর্তী জীবনে। শুধু গোলাপ নয়, কোন বৃক্ষ লালনে আমার আর আগ্রহ নেই। আমি বুঝে গেছি আমার হাতে বৃক্ষদের বৃদ্ধি নেই। তবু আকাশ থেকে পাওয়া বৃক্ষরা আমাকে যে অগণিত ফুল ফল ছায়া মায়া উপহার দিয়েছিল, সেগুলো আমি প্রাণভরে উপভোগ করেছি, তাতেই আমার সারা জীবনের সকল তৃষ্ণা মিটে গেছে।

তবু অনেক বছর পর, যুগের পর যুগ কেটে যাবার পর, নতুন সময়ে এসে আরেকটি বৃক্ষের চারা রোপন করলাম। এই গাছের অনেক সুনাম। আমি নিশ্চিত এই গাছের ফুলে ফলে ছেয়ে যাবে একদিন নির্জন প্রান্তর। গাছটি আমি বিক্রি করবো না, ফার্নিচার বানাবো না, কেটেছেঁটে লাকড়ির চুলাও জ্বালাবো না। গাছটিকে বড় করার স্বপ্নটা তবু আমাকে দিন রাত আচ্ছন্ন করে রাখে। গাছটি জানে না আমি কেন তাকে বড় করতে চাই। আমি জানি কেন করছি। এই বৃক্ষের কাছ থেকে আমি কিছুদিনের জন্য একটা ছায়ার বাগান চাই। শুধু ছায়া আর কিছু নয়। ছায়া দিতে কোন বৃক্ষ কখনো দ্বিমত করে না। ছায়া রেখে কোন গাছ কাউকে বিমুখ করে না।

তবু কেন যেন অমূলক একটা আশংকা এসে ভর করে, কেউ যেন বলছে জেনো, এই বৃক্ষটা একদিন তোমাকে ছায়াবিমুখ হতাশ করবে।


ছোটগল্পপাঠঃ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'উর্বরাশক্তি'

শোনা যায় ছোটগল্প বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে কম আলোচিত বিষয়, কিছুটা উপেক্ষিতও হয়তো। উপন্যাস যতটা বিক্রি হয় সেই তুলনায় ছোটগল্পের বাজার অনেক ছোট। ব্যক্তিগতভাবে ছোটগল্প আমার পছন্দের বিষয় হলেও দীর্ঘদিন ছোটগল্পের জগত থেকে দূরে ছিলাম। সেই দূরত্বের কারণে বঞ্চিত হয়েছি যেসব ভালো গল্প থেকে তা পূরণ করতে গিয়ে সাম্প্রতিককালে যেসব লেখকের গল্প দ্বারা আলোড়িত হয়েছি তাঁদের কিছু গল্প নিয়ে গল্পসল্প করার ইচ্ছে থেকে একটা ছোটগল্প আলোচনা সিরিজের সূচনা করছি। যেখানে খুব বিখ্যাত লেখকের গল্প থাকবে তেমনি থাকবে লিটল ম্যাগাজিনের অখ্যাত অথচ ভীষণ সম্ভাবনাময় কোন তরুণ লেখকেরও। প্রতিটি পর্বে একটি করে গল্পের পাঠানুভূতি নিয়ে লিখিত হবে।

ছোটগল্পে আমার প্রিয় লেখক কারা? গত শতকের আশি দশকে ছাত্র বয়সে যখন প্রথম ছোটগল্প পড়তে শুরু করি, বিশ্বসাহিত্যের চারজন ছিলেন আমার বিশেষ প্রিয়। রবীন্দ্রনাথ, চেখভ, মোপাসাঁ, এডগার এলান পো। লক্ষণীয় যে ছাত্র বয়সে বিশ্বসাহিত্যের প্রতি মনোযোগটা একটু বেশী ছিল। ঘরের দিকে নজর ছিল কম। তারপর পেশাগত ব্যস্ততার কারণে বেশ লম্বা একটা সময় পাঠ থেকে দূরে থাকতে হয়। দ্বিতীয় পর্বে এসে এই শতকের প্রথম দশক পেরিয়ে আবারো ছোট গল্পের সাথে যোগাযোগ।

এবার বিশ্বসাহিত্য বাদ দিয়ে একদম ঘরের কাছের ছোটগল্পের অনুসন্ধান- যেখানে দুই বাংলার অসাধারণ কিছু গল্প বলিয়ের সাথে পরিচয় ঘটতে থাকে। বাংলা গদ্যের বৈচিত্র্যপূর্ণ সম্ভারের আবিষ্কারটিও এই সময়েই। হাসান আজিজুল হক, হুমায়ূন আহমেদ, পেরিয়ে শাহাদুজ্জামান এবং ইমতিয়ার শামীমে যখন এই গদ্য সম্ভারের আবিষ্কার চলছিল, তখন বিস্মিত পরিচয় ঘটে ওপার বাংলার কমলকুমার মজুমদার, সুবোধ ঘোষ, নবারুণ ভট্টাচার্য, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী আর প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাথে।

নতুন পরিচয়ের এই গদ্য সম্ভারে একরকম বুঁদ হয়ে পড়ি। কিন্তু না, তখনো বিস্ময়ের কিছু বাকী ছিল। নবনীতা দেবসেনের স্মৃতিকথা 'স্বজন সকাশে' পড়ে জানতে পারি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা। বস্তুতঃ তাঁর গল্পের সাথে এত দেরীতে পরিচয় ঘটার কারণে আক্ষেপের পাশাপাশি একটা আনন্দ কাজ করেছে। কিছু লেখার সাথে এমন বয়সে পরিচিত হওয়া ভালো, যে বয়সে ওই লেখাটা অধিকতর অর্থপূর্ণ। আজ থেকে বিশ বছর আগে শ্যামল পড়লে যে অনুভূতি হতো, সেটা এই সময়ে পড়ার অনুভূতির তুলনায় অনুল্লেখযোগ্য হতো, হয়তো। কিছু কিছু লেখা পরিণত বয়সে বেশী উপভোগ্য বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা।

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পের সাথে আমার পরিচয় হলো ঠিক কল্যাণের বয়সে এসে। কল্যাণকে সবাই চিনবেন না। কিন্তু যারা তাঁর 'উর্বরাশক্তি' গল্পটি পড়েছেন কল্যাণকে তাঁদের মনে থাকার কথা।

কল্যাণের পরিচয়টি তাঁর গল্পের সূচনা থেকেই দিচ্ছি -

'পৃথিবীতে আগের চেয়ে এখন নিরুপায় লোকের সংখ্যা অনেক বেশী। এরকম একটি ধারণা কিছুদিন ধরেই কল্যাণের মাথায় চাক বেঁধে তৈরি হয়ে আসছিল। কল্যাণ এ পাড়ার আট বছরের পুরোনো ভাড়াটে। পাড়াটির প্রথম পুরুষরা সবাই এখন বিগত। মানে যারা জায়গা কিনে বাড়ি করেছিলেন- তাঁরা কেউ নেই। তাঁদের সন্তান সন্ততিদেরই বয়স এখন ষাট থেকে সত্তরের ভেতর। নিশুতি রাতে পাড়ার বেওয়ারিশ কুকুরগুলো এ পাড়ার মালিক। ভোরবেলা কাকের দল লেড়ো বিস্কুটের টুকরো খেতে চায়ের দোকানের সামনে ঝাঁক বেঁধে নামে। বাড়িগুলোর একতলার আগেকার গ্যারেজঘর এখন ধোবিখানা। ফুটপাত ঘেঁষে যা দু চারটে গাছ ছিল তাদের গোড়ায় গেরস্থ বাড়ির ছাই, খোসা আরো কত কি। কল্যাণ এখন সেই বয়সটায় - যখন ঘুম কমে আসে - রিটায়ারের বাকী থাকে তের বছর - স্ত্রী আলাদা শোয় - পেচ্ছাপ কম হয়।'

আশা করি কল্যাণ সম্পর্কে একটা ধারণা মিলেছে এইটুকু দিয়ে। 'উর্বরাশক্তি' গল্পটি কল্যাণকে দিয়ে শুরু হলেও এটি মূলত: একটি বেড়াল জুটির সম্পর্ক যাপনের গল্প। কল্যাণ সেখানে দর্শকমাত্র এবং আমরা কল্যাণের সহদর্শক।

জুটির একটি বেড়াল(নারী বেড়াল) অন্যটি হুলো(পুরুষ বেড়াল)। বেড়ালটি কল্যাণের বাড়ির আবাসিক বাসিন্দা হলেও হুলোটি বহিরাগত। কল্যাণের বারান্দার বাগানেই তাদের আলাপ পরিচয়। বারান্দা দিয়ে যাবার সময় দুজনের দেখা হয় কোন এক জ্যোৎস্না রাতে।

হুলো বহিরাগত হলেও আচরণে সে উদ্ধত এবং স্বাধীনচেতা। তার হাবভাব হলো 'পৃথিবীটা হলো ওদের দুজনের মানুষজন সব আসলে বেড়াল'। কল্যাণের দৃষ্টিতে 'আহার, বিহার আর মৈথুনে পারদর্শী একজন উচ্চশ্রেণীর বিষয়ী'। সে হুলোটির নাম দেয় 'প্রিয়গোপাল বিষয়ী' আর বিড়ালটির নাম রাখে 'রাধারানী'।
 
ওদের প্রথম দুটো বাচ্চা দুটো দুর্ঘটনায় মারা যায় দুজনের দুটো কার্যকারণে। একটা বাচ্চাকে হুলো খেয়ে ফেলেছিল। অন্যটি মায়ের দাঁতের চাপে মারা যায় এঘর ওঘর করতে গিয়ে। তবু কিছুদিন পরই রাধারানীর পেট মোটা হয় আবারো। মাঝরাতে এসে প্রিয়গোপাল ডাকে 'ক্যাঁ-রব-র ক্যাঁ-রব-র' করে। 'পনেরোই জুন রাধারাণীর আবার একটি খোকাও খুকু হলো। আকাশবাণীর তৃতীয় অধিবেশন সমাপ্ত হবার পর।....সে কাউকে ছানা দেখাতে চায় না। তাই আলনার শেষর‍্যাক থেকে বুকর‍্যাকে যায়, বুকর‍্যাক থেকে জুতোর বাক্সে বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে'। যাদের বাড়িতে বেড়াল আছে এই দৃশ্যটি খুব পরিচিত। আমি নিজে পরিচিত এটার সাথে।

 কদিন পর বাচ্চারা একটু বড় হয়ে উঠলে দুটোতে মিলে খেলাধুলো করে। রাধারানী মাছের কাটা মুখে নিয়ে বাচ্চাদের ডাকাডাকি করে। 'কাছে আয়। কাটা খাবি বাবা।এ হলো গিয়ে বড় মাছের শিরদাঁড়া। সাবধানে চিবোতে হয়'। কী মমতাময়ী ডাক!

কিন্তু পুরুষ চরিত্র। প্রিয়গোপাল মশাই বাচ্চা হবার পর থেকে রাধারাণীকে কাছে পাচ্ছে না। সে কল্যাণের বারান্দার লাগোয়া পাঁচিলে এসে রাধাকে ডাক দেয় 'এই রাধা। আয়। যাবিনে?' রাধারানী কোন জবাবই দেয় না। বাইরের লোকে হুলোর যে ডাক শোনে, সে ডাক আদেশের। যখন সে ডাক একটু খাদে নামে সেটা হলো আশাভঙ্গের। সে আবারো ডাকে ' আয় হৈমি ডাক্তারের বাড়ির ছাদে যাই। ও-বাড়ি আজ চতুর্থী। মৎস্যমুখী হচ্ছে। আয় বলছি-'

কাজ হলো না তাতেও। তারপর মাঝরাতে প্রিয়গোপাল একদম ঘরের ভেতর এলো। জানালা গলে। হিসেব নেওয়ার ভঙ্গীতে। ......প্রিয়গোপাল বাঘের ভঙ্গিতে মেঝেতেই বসলো। দুহাত দুরে রাধারানী একই ভঙ্গিতে বসা। মাঝখানে খোকাখুকু খেলছে। রাধারানী মিনতি করে দীর্ঘ মেয়াও ধ্বনি দিয়ে অনুরোধ করছে এবার যেন বাচ্চাদের না খায়। অন্ধকারেও কল্যাণ দেখতে পায় চারজনের আট জোড়া চোখ। বাপ এবং খাদক হিসেবে প্রিয়গোপালের সহনশীলতা কল্যাণকে মুগ্ধ করে। কেননা প্রিয়গোপাল এদেশের ভোটার নয়। নাগরিক নয়। যদিও সে এখানকার জল হাওয়ায় বড় হয়েছে। আচরণ আচরণের জন্য সে দেশের আইনের কাছে দায়বদ্ধ নয়। সে চাইলে সবার সামনে রাধারানীর উপর উপগত হতে পারতো।

এই বর্ণনাটুকু পড়তে পড়তে মানুষ হিসেব মানব সমাজের সাথে তুলনাটা আপনাতেই চলে আসে। লেখকও চেয়েছেন সেটাই। বাড়িতে একটি অতিথি আছে। কল্যাণের মেয়ে এসেছে বেড়াতে। তারও বাচ্চা হবে। কল্যাণের স্ত্রী মেয়ের সেবা নিয়ে ব্যস্ত। বাচ্চা হবার আগে বেড়ালছানা দুটো পার করতে হবে। নইলে মানুষের বাচ্চার অনিষ্ট হবে। কল্যাণ তার নিজের জীবনকে নিয়ে ভাবে। কোথাও কোথাও সে হুলোটার চেয়েও অসহায় পরাধীন। হুলোটি যতটা স্বাধীনভাবে রাধারানীর কাছে যেতে পারে, সে পারে না তার রাধারাণীর কাছে প্রত্যাখ্যানের দাপটে। তবু তার একটি আকাংখা, একটি মনোবেদনা প্রত্যাশা পূরণের সম্ভাবনার ছাপ রেখে যায় গল্পের শেষাংশে পৌঁছে।

মানব সমাজ এবং বিড়াল সমাজের একটা তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত আচরণগত বিশ্লেষণ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় সে সরস এবং সহজ দক্ষতার সাথে এঁকেছেন তাতে গল্পটি শেষ করার পরও আরো বহুক্ষণ গল্পের আমেজ পাঠকের মাথায় ঘুরপাক খায়। এই গল্পপাঠের সেই আনন্দটুকুই যথার্থ প্রাপ্তি।




পাশবিকতা বনাম মানবিকতা

একদল হিংস্র পশু এবং একদল হিংস্র মানুষের মধ্যে সভ্য আচরণের তুলনামূলক বিচার করলে পশু সমাজ যে এগিয়ে থাকবে তা আমরা এখন আর কেউ অস্বীকার করতে পারি না। পশুর হিংস্রতা কোন একটি মৌলিক চাহিদা পূরণ ঘটিত সমস্যা থেকে উদ্ভুত হয় এবং সেই হিংস্রতা প্রয়োগের একটা মাত্রা থাকে একটা যুক্তি থাকে। কিন্তু মানুষ কোন রকম যৌক্তিক কারণ ছাড়াই স্বজাতির উপর চড়াও হয়ে চরম নির্মমতার পরিচয় দিতে পারে খুব অনায়াসে।

বাঘ সিংহ গণ্ডার কয়োট হায়েনা বেড়াল কুকুর যেই হোক, সবাই নিজ নিজ সীমানাটা মেনে চলে। সিংহ কখনো বেড়ালকে কামড়ে দিয়ে বলে না তোর কেন কেশর হয় না, কিংবা হাতি কখনো কুকুরকে লাথি দিয়ে বলে না তুই কেন শুড় দিয়ে মাংস খাস না। আন্তঃপশু সংঘর্ষের কোন সংবাদ আমরা তেমন দেখি না। পশুরা কী করে যেন একটা সুশৃংখল সভ্যতা গড়ে তুলেছে। অথচ তাদের কোন রাষ্ট্রনায়ক নেই, মহামানব নেই, অবতার নেই, দেবতা নেই, পথ নির্দেশক নেই। তাদের নেই কোন রাষ্ট্র, ধর্ম, বিজ্ঞান, দর্শন, বিদ্যালয়, উপাসনালয়। এসব কিছু না থেকেই ওরা আদি থেকে এই সভ্যতা কিভাবে ধরে রেখেছে সেটা একটা বিস্ময়।

প্রাণীজগতের মধ্যে মানুষই একমাত্র প্রাণী যাদের রাষ্ট্র, নেতা, ধর্ম, মহামানব, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সবকিছু আছে। এই সব কিছুর যোগফল নিয়ে মানবকূল পৃথিবীটা দখল করে শাসন করছে এবং নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাকী প্রাণীসমাজ অবশ্য জানে না 'মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব', জানার মতো শিক্ষাদীক্ষাও তাদের নেই। জানলে এই শ্রেষ্ঠত্ব বিনাতর্কে মেনে নিতো কিনা সন্দেহ আছে। কিন্তু মানব সমাজের বাইরে একটা তৃতীয় অবস্থান নিয়ে যদি আমি মানুষ এবং অন্য প্রাণীদের তুলনামূলক অবস্থানটা দেখি, তাহলে দেখবো, প্রযুক্তি, জ্ঞানবিজ্ঞান এবং ক্ষমতার দিক থেকে মানুষ বর্তমানে শ্রেষ্ঠ অবস্থানে আছে (৫০ হাজার বছর আগে হলে এটা বলতে পারতাম না) এটা সত্যি হলেও যাকে আমরা গড়পড়তা 'মানবতা' বলি, সেই হিসেবে মানুষ পশুদের চেয়ে সামগ্রিকভাবে পিছিয়ে।

মানুষকে বাই ডিফল্ট শ্রেষ্ঠ ধরে ভালো গুন সমৃদ্ধ অর্থে 'মানবতা' শব্দটি ব্যবহার করা হয়। মানবতা বলতে মায়া দয়া স্নেহ মমতা সমৃদ্ধ একটি উদার একটি চরিত্রের নিদর্শনকে বুঝি। অথচ মানুষের ভেতরে যে চরম স্বার্থপর হিংস্রতম নির্দয় চরিত্রের অন্ধকার বিষয় লুকিয়ে আছে তাকে প্রকাশ করতে গেলে আমরা পশুর নামানুসারে আখ্যায়িত করি 'পশুত্ব' বলে। যদিও যুক্তিহীন নির্দয় হিংস্রতার ব্যাপারে পশু সমাজ একদমই নিষ্পাপ। মানুষের মতো অযৌক্তিক হিংস্র হওয়া কোন পশুর পক্ষে সম্ভব না।  তাই মানুষের অমানবিক আচরণের প্রকাশ করতে গিয়ে 'পশুত্ব' শব্দটি বাদ দিয়ে আমাদের উচিত মানব উপযোগী নতুন একটি শব্দের উদ্ভাবন করা।  মানুষের কুৎসিত আচরণের দায় নির্দোষ পশু সমাজের উপর চাপানো নিতান্তই অপমানের সামিল।


পর্বত ও প্রতীক্ষা

Waiting is painful. You wont have to wait for me. I will bear that pain. I will wait wait wait even in vein. Waiting is my part within us. You just go on with other inevitable pain that I cant take away. You know I dont wait for anyone else. Nobody can keep me standstill anywhere. Just you. Because its only you whom I have decided to let all my waiting times to flow.
- Rio Escober

অপেক্ষা কারো কারো জন্য সংকলিত উপহার কারো জন্য সমন্বিত বেদনা৷ নির্ভর করে ফলাফল সূচকের উপর৷ অপেক্ষা যদি অধৈর্য বয়ে আনে তার ক্ষতি বহুমাত্রিক৷

তিনি যা বলেছেন তা পর্বতের জন্যই প্রযোজ্য হতে পারে৷ আমরা পর্বত হতে পারি না৷ আমরা বড়ই অস্থির৷ অধৈর্য৷ নাজুক৷ মানবীয় দুর্বলতায় পরিপূর্ন প্রাণী৷ আমরা বড়জোর পর্বত ছুঁয়ে আসতে পারি৷ আর কিছু না ৷

আরো একবার ডাকছে পর্বত ৷ আরো একবার যেতে হবে হিমালয়ে ৷ কবে কে জানে?

Monday, June 20, 2016

সমাপনী রেস

জীবনটা একটা রেস খেলা৷ সমাপনী রাউণ্ডে এসে খুব সক্ষম দৌড়বিদও অসহায় অক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পন করে৷

এই সত্যটা সবার জানা কিন্তু সময়ের আগে তা উপলব্ধি করি না৷ করলেও পালন করি না৷ তখন যা করা দরকার তা করি না৷

দীর্ঘায়ু প্রায়শ একটি অভিশাপ৷ নির্ভরশীলতা যেখানে আপন মানুষেরও পর করে দেয় সেখানে পরনির্ভরশীলতার উল্লেখ বাহুল্য মাত্র৷