উপনিবেশ চট্টগ্রাম লেখার ইতিবৃত্ত কিংবা আমার লেখক জীবনের সূত্রপাত নিয়ে যারা জানতে চেয়েছেন তাদের জন্য এই গল্প। আমার লেখক হয়ে ওঠার ব্যাপারটাকে আমি নিছক একটা দুর্ঘটনার মতো ঘটনা হিসেবে দেখতে চাই। কারণ আমি বরাবরই পাঠকের কাতারে ছিলাম, আছি। ২০০১ সালে আমি বাংলাভাষাভাষীদের একটা ইয়াহুগ্রুপের সদস্য হিসেবে লেখালেখি করতাম। তখনো বাংলা লেখার যুগ আসেনি। ইংরেজিতেই সব লেখালেখি। প্রায় সব সদস্য প্রবাসী বাঙালী। বাংলাদেশ থেকে আমরা অল্প কয়েকজন। চট্টগ্রাম থেকে আমি একাই ছিলাম। সেই গ্রুপে একবার চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে কাজ করার উদ্যোগ নেয়া হয়, কাজটা আমাকে দেয়া হয়। আমি চট্টগ্রামের লোক হলেও ইতিহাস নিয়ে তেমন কোন পড়াশোনা ছিল না। কাজটা আমার জন্য কঠিন ছিল। কিন্তু কাজটা পছন্দ হলো। শুরু করলাম বইপত্র মানচিত্র ইত্যাদি সংগ্রহ করা। সাথে অল্পবিস্তার লেখালেখি। কয়েক বছর পর গ্রুপটা বন্ধ হয়ে গেল। ইন্টারনেটে নতুন যুগের সূত্রপাত হলো। ব্লগ, ফেসবুক, স্মার্টফোন, অ্যান্ডরয়েড যুগে প্রবেশ করলো পৃথিবী। যুগের পরিবর্তনে লেখার প্ল্যাটফর্ম বদল হতে লাগলো। আমার মাথার ভেতর তখন ইতিহাসের পোকা ভালোমতন ঢুকে গেছে। চোদ্দ বছর পর গত চোদ্দ বছর ধরে শত শত বই পড়তে পড়তে যেসব টুকিটাকি নোট রেখেছি, সেগুলো দিয়ে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ হয়ে যাবে। কিন্তু আমি তো লেখক হবার সুদূরতম চিন্তাও কখনো করিনি। তবু কয়েকজন সুহৃদের সাথে মিলে একটা ফেসবুক গ্রুপ খুলে ফেলি চট্টগ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্য কিংবদন্তী নামে। টুকিটাকি ইন্টারেস্টিং কিছু তথ্য দিয়ে গ্রুপটা সচল করি। অনেকের কাছ থেকে উৎসাহ পেতে থাকি। গ্রুপের সদস্য সংখ্যা বাড়তে বাড়তে হাজার পেরিয়ে গেল বছরখানেকের মধ্যে। ইতিহাস নিয়ে এত মানুষের আগ্রহ দেখে অবাক হলাম। তখন খুব ক্ষীণ একটা ইচ্ছে জাগলো চট্টগ্রাম বিষয়ক তথ্যগুলো জড়ো করে অন্তত একটা বই প্রকাশ করা যেতে পারে। কিন্তু আমার মতো অচেনা লোকের বই প্রকাশ করবে কে? প্রকাশ করলেও কে কিনবে?
তবু স্রেফ মজা করার জন্য একটা বইয়ের প্রচ্ছদ তৈরি করে সেই গ্রুপে পোস্ট করলাম। প্রচ্ছদটাকে অনেকে সিরিয়াসলি নিল। বইটা প্রকাশ করার জন্য উৎসাহ দিল। আমি তখনো জানি না আদৌ কাজটা শেষ করা যাবে কিনা। ভাবছিলাম ঠিক কত সময়কাল নিয়ে লিখলে ভালো হবে অথবা কোন জায়গায় শেষ করলে ভালো হবে? তখনই পূর্বস্বর আগ্রহ দেখালো বইটা প্রকাশ করার ব্যাপারে। মাহমুদ আলম সৈকত আমার ছোটভাইয়ের মতো, সে ওটার সাথে জড়িত। আমি জানি না তাদের প্রকাশনার মান কেমন। শুধু বললাম, এক শর্তে পাণ্ডুলিপি দিতে পারি বই প্রকাশের জন্য আমি কোনো টাকাপয়সা খরচ করতে পারবো না। প্রকাশক যদি নিজের বিনিয়োগে কাজটা করতে পারে তাহলে দিতে পারি। কিন্তু এই বই প্রকাশ হলে বিক্রি হবার সম্ভাবনা খুব কম। ইতিহাসের বই কেউ পড়ে না। পড়লেও বিখ্যাত লেখকদের বই পড়ে। এটা হয়তো দশ কপিও বিক্রি হবে না। তবু কিভাবে যেন প্রকাশক মইনুল ভাই দুঃসাহসী হয়ে রাজী হলেন। তখন ২০১৭, আমি বললাম বাকী ফিনিশিং কাজ ছমাসে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু শেষ করতে আরো দুবছর লেগে গেল। ২০১৯ সালে পাণ্ডুলিপি হস্তান্তর করলাম। তারপর করোনাযুগ শুরু হলো। তার মধ্যেই ফাঁকে ফাঁকে কাজ করে বইটা প্রকাশিত হলো ২০২১ সালের মার্চে। তখন করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা শুরু হয়েছে। বইয়ের বিপনী সহ সব কিছু বন্ধ প্রায়। অনলাইনেই বেচাবিক্রি। অভাবিতভাবে ওই দুঃসময়ের মধ্যেই বইটা প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে গেল মাত্র ছমাসে। তারপর ২য় এবং ৩য় সংস্করণও এলো পরবর্তী তিন বছরে। অচেনা অখ্যাত এক লেখকের জন্য পাঠকের এতখানি ভালোবাসা সত্যি অভাবিত ছিল। পরের কয়েক বছরে আরো বই প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু প্রথম বইয়ের এই আনন্দ অতুলনীয়।

No comments:
Post a Comment