Sunday, April 19, 2026

একটি পুরস্কার প্রাপ্তির অভিজ্ঞতা

স্থানীয় পর্যায়ে সরকারী পুরস্কারগুলোর প্রতি আমার একটু অভক্তি আছে। কারণ এগুলো দেয়ার প্রক্রিয়াটা সুন্দর হয় না। একটা বিশৃংখল হযবরল পরিস্থিতির মধ্যে যেনতেনভাবে অনুষ্ঠান করা হয়। ফলে পুরস্কার পাওয়ার কথাটা ফেসবুকে ফলাও করে প্রচার করতে যতটা আরাম, অনুষ্ঠানে গিয়ে পুরস্কারটা হস্তগত করা ততটা আরাম হয় না। জানতাম, তবু গেলাম বইমেলার মাঠে। পরিবারের কয়েকজন সহকারে। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পুরস্কার নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পুরস্কারের নাম স্বাধীনতা সম্মাননা পদক। বলা যায় এটা চট্টগ্রামের স্থানীয় স্বাধীনতা পদক(তবে ভুলেও তাকে জাতীয় পদকের সাথে তুলনা করা ঠিক হবে না)। আমাকে নির্বাচিত করা হয়েছে গবেষণা প্রবন্ধে অবদান রাখার জন্য।

আমি খুব অবাক হয়েছি পুরস্কারের খবর শুনে। যতটা অবাক হয়েছে তার চেয়ে আশঙ্কিত হয়েছি। কারণ লেখালেখির মাঠে আমি একেবারেই নতুন খেলোয়াড়। পুরোনো খেলোয়াড়েরা আমার এই পুরস্কারপ্রাপ্তি ভালোভাবে নেবে না। এটাই স্বাভাবিক। আমি নিজেকে এই পুরস্কারের জন্য উপযুক্ত মনে করি না। সবচেয়ে বড় কথা আমি লেখালেখি করি নিজের আনন্দের জন্য। পাশাপাশি এটাকে পেশাদার পর্যায়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা। কিছু বাড়তি আয় উপার্জন হলে ক্ষতি কি। আমাকে কেন নির্বাচিত করা হয়েছে, কারা এটা করেছেন বুঝতে পারছিলাম না। আমার শুভাকাঙ্ক্ষী লেখক সাহিত্যিক প্রকাশক যারা চট্টগ্রামে আছেন তাঁদের কারো কাজ এটাই অনুমান করলাম। কিন্তু কেউ সেটা স্বীকার করছে না। 

পুরস্কার নেবার খানিক আগে জানলাম কারা এই কাজটা করেছে। আমার লেখালেখি আন্তরিকভাবে পছন্দ করে তেমন একজন আছেন সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচক কমিটিতে। তিনিই আমার নামটা প্রস্তাব করেছেন। আমাকে দেখে তিনি এসে পরিচয় দিলেন। আগে কখনো আলাপ হয়নি তাঁর সাথে। তিনি শুধু ফেসবুকে যুক্ত আছেন, এটুকুই। এরকম অচেনা মানুষ যখন শুধু বই দিয়ে আমাকে এমন সম্মান জানায় তখন সত্যিই আপ্লুত হতে হয়। আমি সরকারী পদকের চেয়ে পাঠকের এই ভালোবাসাকে অনেক বেশি মূল্যবান মনে করি। 

কিন্তু অল্পদিনের লেখালেখির জীবনে এমন প্রাপ্তি সত্যি বাড়াবাড়ি। মাত্র পাঁচ বছর আগে আমার প্রথম বই প্রকাশ হয়েছে। গত তিন বছরে মুড়ি-মুড়কির মতো আমার ৮টা বই প্রকাশ হয়ে গেছে। যদিও এগুলো অনেক আগের কাজ। আস্তে ধীরে করে যাচ্ছিলাম। কিভাবে যেন লোকের চোখে পড়ে গেলাম। পাঠক পছন্দ করলো। পুরস্কারও এসে গেল। টাকাপয়সা রয়েলটিও কম আসেনি। একদম প্রথম বই থেকে সবগুলো বই চুক্তি করে রয়েলটি এডভান্স নিয়ে পেশাদারিত্বের সাথে প্রকাশ করেছি। পাঠকের ভালোবাসা, প্রকাশকের সম্মানী এবং সরকারী স্বীকৃতি- এই তিনটা বিষয় এত অল্প সময়ে পাওয়া যে কোনো লেখকের জন্য ভাগ্যের ব্যাপার। আমার কাছে মনে হয় এটা একটা অলৌকিক ব্যাপার। অথবা অনেক লম্বা সময় ধরে চলতে থাকা স্বপ্নদৃশ্য, ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখবো, আসলে কোথাও কিছু নেই।

গতকাল আমার একটা শোকের দিন ছিল। আমার জীবনের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুটা মারা গেছে আগের দিন রাতে। গতকাল ঢাকায় ওর জানাজা-দাফন হয়েছে। আমার যাওয়ার উপায় ছিল না। তার মধ্যেই আমাকে পুরস্কার নিতে যেতে হয়েছে। হাসিমুখে স্টেজে ফটোসেশান করতে হয়েছে। মানুষের জীবনটা মাঝে মাঝে এত স্ববিরোধী!

পুরস্কার নিতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে সেগুলো লিখে রাখা যাক।

***
যেখানে বসেছিলাম সেখানে একটু গরম। তবু বসে আছি। কারণ এই সারির সোফাগুলো পদকপ্রাপ্ত অতিথিদের জন্য বরাদ্দ। দুজনের জন্য বরাদ্দ সোফায় আমার পাশে সৌম্যদর্শন বয়স্ক ভদ্রলোকও আছেন। দুজনের মাঝে একটু খালি জায়গা আছে। বড় জোর ছ ইঞ্চি। মোটামুটি স্বস্তিতেই বসেছি। গরম হলেও বেশি খারাপ লাগছিল না। একটু পরেই অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে, তাড়াতাড়ি মুক্তি পাবো। পাশের ভদ্রলোকও আশান্বিত। মঞ্চের দিকে তাকিয়ে আছি।
হঠাৎ করে কেউ একজন কোনো কথাবার্তা ছাড়া আমাদের দুজনের মাঝে দুম করে বসে পড়লেন। এমনভাবে বসেছেন যেন আমাদের দুজনের কোনো অস্তিত্বই তিনি জানেন না এবং সোফায় দুজনের মাঝে যে ছ’ইঞ্চি ফাঁক ছিল সেটা কিভাবে যেন বারো ইঞ্চিতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আমাদের প্রায় কোলে বসে গিয়ে নিজের জায়গাটুকু করে নিলেন। এমন দৃশ্য লোকাল বাস বা নাজিরহাট-দোহাজারী ট্রেনে নিয়মিত। কিন্তু আইফোন হাতে স্যুটকোট পড়া অভিজাত চেহারার ভদ্রলোক কেন সেরকম আচরণ করবেন বুঝলাম না। দুম করে বসার আগে অন্তত মুখ ফুটে একটু বলতে পারতেন। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, এটা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।
অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল। কিন্তু প্রথম বক্তা মাইক হাতে নিয়েই এমন চিৎকার দিয়ে ভাষণ দিতে লাগলেন, সাউণ্ডবক্স ফেটে যেতে পারে, আমাদের কানের পর্দাও ফুটো হয়ে যেতে পারে। আমি তাঁকে চিনি না, কিন্তু পরিচয়ে লেখা তিনি একজন প্রকাশক। তাঁর উৎকট বক্তব্যের সারমর্ম হলো স্মরণকালের সেরা বইমেলাটা আয়োজন করতে পেরে তিনি চট্টগ্রামবাসীকে ধন্য করে দিয়েছেন। আমি জানি বানোয়াট কথাবার্তাই সবচেয়ে বেশি জোরে বলতে হয়। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, এমন অসত্য বয়ানও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।
পরের দুই বক্তা সরকারী কর্মকর্তা। তাঁরা পরিমিতির ভেতর অল্প সময়ে শেষ করলেন। কিন্তু পরের বক্তা এসে হঠাৎ এমন চিৎকার শুরু করলেন, আমি হতবাক। চিৎকারের জন্য না, ভদ্রলোকের পরিচয় দেখে। তিনি একটা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। তিনি এমন বিষয়ে চিৎকার করছেন, যেটা আস্তে বললেও গুরুত্ব কমে না। কিন্তু মাইকের সামনে চিৎকার করে কথা বলাও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। সেটা বিশ্ববিদ্যালের ভিসি হোক কিংবা ফুটপাতের মলম বিক্রেতা হোক।
তালিকায় গুনে দেখলাম আরো নাম রয়ে গেছে। চিৎকার আর তেল বিতরণ দুটোই সমানে চলবে আরো বেশ কিছুক্ষণ। সাথে পাশের ভদ্রলোকের চাপ, আবহাওয়ার গরম, সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম এই জায়গা ছাড়তে হবে। বিশেষ অতিথির আসন ছেড়ে পেছনে কোথাও আশ্রয় খুঁজলাম। মঞ্চ থেকে যতটা দূরে যাওয়া যায়। উঠে গিয়ে পেছন দিকে একটা খালি চেয়ার পেয়ে গেলাম। বাকী সময় ওখানেই পার করলাম।
গতকাল পদক নেবার অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা বললাম। এবার সর্বশেষ পর্যবেক্ষণটা বলি।
ভাইসব, বইমেলা রাজনৈতিক ময়দান নয়। গলার রগ ফুলিয়ে এখানে বক্তৃতা দিতে হয় না। উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে বিদঘুটে সব গান বাজনা করতে হয় না। বইমেলার সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে হয় কেন? বইমেলায় যারা যায় তারা পরস্পরের সাথে বইপত্র নিয়ে গল্পগুজব করে, আড্ডা দেয়। একটু শান্তির পরিবেশ ছাড়া এসব আলাপ জমে না। বইমেলার সাথে এই সাংস্কৃতিক উৎসব নামের উৎকট আয়োজন আমার কাছে স্রেফ শব্দদুষণ মনে হয়। মাইকের আওয়াজে কোনো স্টলে দাঁড়িয়ে বই পছন্দ করার রুচিও থাকে না। কারা এসব পরিকল্পনা করে আমি জানি না। আমার চেনা-জানা যে কজন প্রকাশক বা সিটি কর্পোরেশন কর্মকর্তা আছেন তাদের সবাই রুচিশীল মানুষ। কিন্তু তাদেরকে সম্ভবত এসব পরিকল্পনায় রাখা হয় না।


চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর শহর হিসেবে গৌরব করি। কিন্তু সেই গৌরব ম্লান করে দেয় এসব গ্রাম্যতা। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের শুধু অধঃপতনই হতে থাকবে।




***

আমি আর বেশিদিন লিখবো না ঠিক করেছিলাম। পাঠকের বিরক্তি আসার আগেই সরে যাওয়া উচিত। এখন হাতে যে দুয়েকটা প্রকল্প আছে সেগুলো লিখে শেষ করতে পারলেই হয়। এখন প্রতিটা দিনই অনিশ্চিত। কোনো না কোনো দুঃসংবাদ, ঝামেলা এসে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলে। তবু মনে মনে বলি, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ।

No comments: