ছুটির সকালে ঘুম থেকে ওঠার এক ঘন্টার মধ্যে ইলেকট্রিসিটি কয়েকবার আসা যাওয়া করলো। এদেশে নতুন কিছু না। কিন্তু সাথে সাথে মনে পড়লো পুরো পৃথিবী জুড়েই লোডশেডিং বা জ্বালানী সংকট এগিয়ে আসছে। আমাদের জন্য আরো অনেক আশঙ্কা তৈরি করেছে ইরান যুদ্ধ। প্রতিদিন টিভি খুলে ভয়ে থাকি এখনই কোনো ভয়ানক সংবাদ ভেসে উঠবে।
ইতিহাস বারবার ঘুরে ফিরে পুরোনো গল্পই বলে। পুরোনো চশমায় যদি নতুন বাস্তবতাকে দেখি তাহলে বলবো- পৃথিবীতে এখন যা ঘটছে সেটা উপনিবেশ যুগে ভারতবর্ষে যা ঘটেছিল তার নতুন সংস্করণ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেভাবে বাণিজ্যের অধিকারের মাধ্যমে দেড়শো বছরের মধ্যে পুরো ভারতবর্ষ দখল করেছিল, আমেরিকাও ঠিক সেভাবে ধীরে ধীরে পুরো পৃথিবী গ্রাস করেছে গত ৭০ বছরে। আমরা স্বীকার করি বা না করি, আমেরিকা ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা’ বলতে পুরো পৃথিবীকেই বোঝায়। ইসরায়েল হলো মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ। সপ্তদশ শতকে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম ছিল একটা বিদেশী সাম্রাজ্যে তৈরি করা কৃত্রিম শহর। বলেছিল নিজেদের বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষার জন্য এই দূর্গ প্রয়োজন। ইসরাইয়েলও মধ্যপ্রাচ্যে সেরকম একটা আমেরিকান দূর্গ। ছদ্মবেশটা হলো বিদেশি অঞ্চলে একটা কৃত্রিম রাষ্ট্র। রাজনীতির ভাষা বদলে গেছে এখন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো মুখ ফুটে বলেনি ওটা মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের তেল বাণিজ্য দেখাশোনা করার দূর্গ। ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে বলে পুরো আরব অঞ্চলে ঘাঁটি তৈরি করে রেখেছে আমেরিকা।
সিরাজউদ্দৌলার আগে ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ নিয়ে কেউ আপত্তি করেনি। সিরাজই প্রথম ফোর্ট উইলিয়াম আক্রমণ করে, সে কারণে কোম্পানি পাল্টা হামলা চালিয়ে বাংলা দখল করে নিয়েছিল। এখনো তাই ঘটছে। ইরান ছাড়া আর কেউ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস করেনি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বিভক্তি। ডিভাইড এন্ড রুল নীতি এখনো সক্রিয়। উপনিবেশ পূর্ব ভারতবর্ষের রাজ্যগুলোর মধ্যেকার অনৈক্যের সুযোগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার বাম হাত ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিল।
আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে ঘাঁটি করার সময় আরব দেশগুলোকে বলেছিল, আমরা তোমাদের নিরাপত্তা দেবার জন্য এসেছি। ডাহা মিথ্যা। আরব দেশগুলো থেকে ট্রিলিয়ন ডলারের চাঁদাবাজি করা বাদে আর কোনো উপকার করেনি। এবারের ইরানের পাল্টা আক্রমণে মুখোশটা খুলে পড়েছে। ইরানের আক্রমণে কোনো আরব দেশকে রক্ষা করতে পারেনি আমেরিকা। মধ্যপ্রাচ্যের মূর্খ শেখগুলো এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। এই দেরির জন্য অপুরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।
একসময় হয়তো আমেরিকা তার সব ঘাঁটি তুলে নিয়ে ভেগে যাবে আরব অঞ্চল থেকে। ততদিনে মধ্যপ্রাচ্যের তেল গ্যাসের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙ্গে যাবে। হয়তো পরবর্তী একশো বছরেও আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। আর যদি তার উল্টোটা ঘটে তাহলে কি হবে? আমেরিকা যদি মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভেগে যাবার বদলে পুরোটা দখল করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নতুন সংস্করণ তৈরি করে? তাহলে আমরা একটা নতুন পৃথিবী দেখতে পাবো।
কোনটা ঘটবে সেটা সময়ই বলবে।
আপাতত আমরা দেখতে পাচ্ছি ইরান যুদ্ধ শুরু হবার তিন সপ্তাহ পর এশিয়া, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে গত পঞ্চাশ বছরের ধারণা বদলাতে শুরু করেছে। আমেরিকা তার মিত্র দেশগুলোকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি। একের পর ইরানী মিসাইলের আক্রমণে নিজেদের জানমাল নিয়ে তটস্থ আছে আরব শেখরা। ফলে আমেরিকার বন্ধু বলে কথিত আরব দেশগুলো এখন নতুন বন্ধুর খোঁজ করছে। আজকের সংবাদে দেখলাম আরবরা এখন নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে আমেরিকাকে বাদ দিয়ে ইউরোপ, চীন, জাপানের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় কিনা। তাতে মনে হয় আমেরিকান মাতব্বরীর কারণে গত অর্ধ শতাব্দী ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা চলছে, সেটা কমার জন্য এই বিকল্প চিন্তাভাবনা সামনে আসছে। যদি আরেকটা মহাযুদ্ধ না করে এই পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয়, তাহলে পুরো পৃথিবীর জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে।
কিন্তু সেই মঙ্গলময় ঘটনাটি কি ঘটবে? আমার মনে হয় না। বরং উল্টোটি ঘটার সম্ভাবনা বেশি। আমেরিকা বহুদিন নতুন তৈরি করা পরমানু বোমাগুলো পরীক্ষা করার মতো উপযুক্ত স্থান বা অজুহাত পাচ্ছে না। ইরানের বিস্তীর্ণ ভৌগলিক অঞ্চল সেই পরীক্ষার একটা সুযোগ করে দিতে পারে। পুরো পৃথিবীকে কাঁচকলা দেখিয়ে ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বাস্তবায়নের একমাত্র উপায় সেটি।
আমেরিকানরা যদি অবিলম্বে তাদের দানবটাকে কান ধরে নামিয়ে না দেয়, তাহলে পৃথিবীর মানুষের সামনে মহা দুঃসময় অপেক্ষা করে আছে।
No comments:
Post a Comment