মাত্র একটা বই লিখে যার লেখক জীবনের সমাপ্তি টানার কথা ছিল তার যখন ৭টা বই প্রকাশিত হয়ে যায়, তখন একটা ছোট ভাবনা এসে উঁকি দেয়। এখনই থামার উপযুক্ত সময় কিনা। প্রত্যেক লেখকের একটা সোনালী অধ্যায় থাকে। সেই অধ্যায়টা শেষ হয়ে যাবার পর এমন কিছু পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে যেটা সুখকর হয় না। সময়মতো থামতে পারাও একটা কাজ। এখন আমার সেই যুগটা চলছে। এটার মেয়াদ বেশিদিন থাকবে না। সময় থাকতেই আমি থেমে যেতে চাই। প্রতিকূল সময় এসে থামিয়ে দেবার আগে। আমার লেখক সত্তা যেমন ছোট, যেমনি লেখালেখির বয়সও খুব সামান্য। মাত্র দুবছরে বাড়াবাড়ি কিছু বই প্রকাশ হয়ে গেছে। যদিও এই কাজগুলো গত এক দশক ধরে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। আরো কয়েকটা বাকী আছে। সেগুলো শেষ হবে কিনা এখনো বলা যাচ্ছে না। তার আগেই ভাবনাটা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। বয়সটা আরো দশ বছর কম হলে হয়তো এমন ভাবতাম না। পেশাদার লেখক হবার ইচ্ছে থাকলেও সেটা বর্তমান বাস্তবতায় সম্ভব না। অতএব মানসম্মান নিয়ে কেটে পড়াই মঙ্গল মনে হচ্ছে। তার আগে একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক।
লেখালেখির জীবনে ভাগ্য আমাকে কিছু আনুকূল্য দিয়েছিল শুরু থেকেই। ওটা না পেলে আমার লেখক হওয়া সম্ভব হতো না। এতগুলো বই(আমার জন্য ৭টা বই অনেক বেশি) প্রকাশ করা হতো না। বাজারে নতুন লেখক হলেও আমি কতগুলো ব্যাপারে পেশাদার লেখকের মতো আচরণ করেছি। তাতে আমার প্রকাশক পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারতো।
তখনো আমার জানা ছিল না বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখক, যাদের বিশ-ত্রিশটা বই প্রকাশিত হয়েছে তারা কেউ রয়েলটি পায় না। এমনও আছে সৌজন্য কপিও পায় না। টাকা দিয়ে অধিকাংশ লেখক বই প্রকাশ করে। এই বিষয়গুলো সম্পূর্ণ অজানা ছিল। ওই জগতটাই সম্পূর্ণ অন্ধকার ছিল আমার কাছে। সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো অন্ধকারই থাকে। আমি তাদেরই একজন। তবু প্রথম গ্রন্থ উপনিবেশ চট্টগ্রামের পাণ্ডুলিপি প্রকাশকের হাতে দেবার আগে যে কথাগুলো বলেছিলাম, তার সারমর্ম হলো- আমি যদিও অপরিচিত লেখক, তবু আমি বই প্রকাশের জন্য কোনো টাকাপয়সা খরচ করবো না। প্রকাশক যদি নিজ দায়িত্বে সব খরচ বহন করতে পারে তাহলে কাজটা দেবো। মনে রাখতে হবে এই প্রজেক্ট পুরোপুরি লস প্রজেক্ট হবে। কারণ আমি বইয়ের প্রচার-প্রচারণা তেমন করতে পারবো না। আমার চেনাজানা যারা আছে তাদের মধ্যে বড়জোর দশ বারোটা বই বিক্রি হতে পারে। ভালো করে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।
পূর্বস্বরের মইনুল ভাই অদ্ভুত দুঃসাহসী একজন মানুষ। তিনি হাসিমুখে আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন- এই বইটা বিক্রি হতে দশ বছর লাগলেও আমার আপত্তি নেই। আমি একটা ভালো কাজ করতে চাই।
তিনি ভালো কাজের আশ্বাস দিলেও আমি ধারণা করিনি কতটা ভালো করতে পারবেন। বিশেষ করে বইয়ের শেষে যোগ করা ১৮১৮ সালের রঙিন মানচিত্রটা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। ওটা ব্রিটিশ লাইব্রেরি থেকে কেনা হয়েছিল, বইয়ের সাথে ফ্রি দেবো এই শর্তে। ওটা যদি অরিজিনাল প্রিন্ট না হয় তাহলে বিপদ। ২০১৯ সালে পাণ্ডুলিপি নেবার পরবর্তী দেড় বছর কাজ করে ২০২১ সালে বইটা যখন প্রকাশিত হলো তখন আমি সত্যি খুব অবাক হয়েছিলাম প্রকাশনার মান দেখে। সম্পাদনা, ছাপা, বাঁধাই, ছবি ইত্যাদি মিলিয়ে বাংলাদেশে এই মানের প্রকাশনা খুব কমই আছে। কথা ছিল একটা প্রকাশনা উৎসব হবে, কিন্তু করোনার ধাক্কায় সেটা বাতিল করতে হলো। তার বদলে তিনি লেখক কপির সাথে কেক আর ফুল নিয়ে বাসায় চলে এলেন। আমরা পারিবারিকভাবেই উদযাপন করলাম প্রকাশনা উৎসব।
তখনো জানা ছিল না পাঠক বইটা কিভাবে নেবে? লেখকের খুশিতে কিছু এসে যায় না। করোনার কারণে সব দোকানপাট বুকস্টোর বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু ফেসবুক পোস্ট দিয়ে অনলাইনে ডেলিভারির ব্যবস্থা আছে। আমি বলেছিলাম, ক্রেতা পাওয়া যাবে না, ২০০ কপি ছাপালেই যথেষ্ট। কিন্তু প্রকাশক প্রথম দফাতেই ৪০০ কপি ছাপিয়ে ফেললেন। তাই একটু দুর্ভাবনা আমার। প্রচ্ছদ দেখে এক অচেনা লেখকের বই কে কিনবে? আশ্চর্য ব্যাপারটা তার পরেই ঘটলো। সেই রুদ্ধশ্বাস করোনার সময়েও বইটার প্রচুর অর্ডার আসতে লাগলো প্রকাশকের কাছে। চার মাস পর শুনলাম প্রথম সংস্করণ শেষ। বিস্ময়ে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সেই সাথে আরো একটা ঘটনা ঘটলো। বই প্রকাশের মাস তিনেক পর একদিন সাহিত্য পত্রিকা শব্দঘর থেকে টেলিফোন আসলো। ওই পত্রিকায় আমি কখনো লিখিনি, ওরা আমাকে চেনেও না। কিন্তু কারো কাছ থেকে খোঁজ পেয়ে ওরা আমার বইটা সংগ্রহ করে ফেলেছে। তারপর ২০২১ সালে সেরা বই(ইতিহাস) হিসেবে নির্বাচিত করেছে।
এইসব অবিশ্বাস্য কাণ্ডের মধ্যে আমি পরের কয়েকটা কাজ শুরু করেছিলাম। উপনিবেশ চট্টগ্রামের কাজ করতে করতে আমি আরো চারটা প্রকল্পের পরিকল্পনা করেছিলাম ভবিষ্যতের জন্য। সেগুলো আদৌ শেষ করতে পারবো কিনা নিশ্চিত ছিলাম না। কিন্তু লেখালেখি বা পড়াশোনার কাজের মধ্যে আমার সবসময় একটা আনন্দ কাজ করে। সেই আনন্দে পরের তিন বছরে সেই কাজগুলো শেষ করতে পেরেছিলাম। তারপর আরো নতুন প্রকল্পে হাত দিতে শুরু করি।
পরবর্তী বিস্ময় ছিল থাংলিয়ানা। কথাপ্রকাশ থেকে। বইটা প্রকাশিত হলো ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারীর শেষ সপ্তাহে। বইমেলা শেষ হতে মাত্র ৭ দিন বাকী তখন। যেদিন প্রকাশ হলো সেদিন সন্ধ্যায় প্রকাশক সূত্র থেকে জানলাম ঢাকার বইমেলায় পাঠানো ২০ কপি দুঘন্টার মধ্যে শেষ। পরদিন আরো ৩০ কপি পাঠানো হবে। পরদিন শুনলাম ওটাও শেষ। চট্টগ্রামে পাঠানো হলো কিছু কপি। সেগুলোর অবস্থাও একই। চারদিন পর শুনলাম প্রথম মুদ্রণ শেষ হচ্ছে। আরেকটা মুদ্রণ আসছে। মেলার শেষদিন ২য় মুদ্রণ চলে এলো। আমার মত অখ্যাত একজনের নন-ফিকশন অনুবাদ বই পাঠক এত পছন্দ করবে কল্পনাও করিনি। থাংলিয়ানা প্রথম প্রকাশের পর থেকে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ৭ মুদ্রণ হয়েছে। এটা খুব আনন্দদায়ক ব্যাপার ছিল লেখক প্রকাশক দুই পক্ষেই।
প্রথম দুটো বইয়ের সফলতার গল্প পরের বইগুলোকেও স্পর্শ করেছে একে একে। প্রকাশিত ৭টি বইয়ের মধ্যে ৪টি বই এক বছরের অনধিক সময়ে ২ বা তিন মুদ্রণ হয়েছে। পাঠকের এই ভালোবাসা আমার জন্য অপরিশোধ্য ঋণ।
কিন্তু পাঠকের ভালোবাসায় আপ্লুত হবার পাশাপাশি এটাও ভাবতে হয় কেন পাঠক বইগুলো পছন্দ করেছে? শুধু বাংলাদেশ না। পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছ থেকেও অভাবিত সাড়া পাওয়া গেছে। আমার কাছে যে বিষয়টা সবচেয়ে বিস্ময়কর লেগেছে কিছু কিছু আজব পাঠকের আচরণ। আমাকে একাধিক পাঠক নানা মাধ্যমে জানিয়েছেন তারা আমার সবগুলো বই কিনে ফেলেছেন। তাদের মধ্যে সাধারন পড়ুয়া ছাত্র যেমন আছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীন অধ্যাপক শ্রেণীও আছেন। আমার মতো অখ্যাত লেখকের জীবনে এটার চেয়ে বড় পুরস্কার আর কিছু হতে পারে না। যে কোনো লেখকই এমন ঘটনায় আপ্লুত হবেন নিশ্চিত। কিন্তু কেন এমন ঘটেছে? আমি কি এমন কোনো নতুন বিষয় লিখতে পেরেছি? এরকম যে কোনো আত্মতুষ্টি বিব্রতকর। আমি পরিকল্পনা করে কিছুই লিখিনি। কী করেছি আসলে?
প্রথমত আমি চট্টগ্রামের ইতিহাস লিখতে চেয়েছি। একটা ধারাবাহিক ইতিহাস। সহজ ভাষায় লেখা হবে যেন পাঠক পড়তে গিয়ে হোঁচট না খায়। উপনিবেশ চট্টগ্রাম শেষ করতে গিয়ে অনেক হিমশিম খেয়েছি। মোটামুটি বড় বই। এক লাখ শব্দ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পরে কিছু কমিয়েছি। তারপর থাংলিয়ানা। পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিযান নিয়ে রোমাঞ্চকর একটা স্মৃতিকথা। অনুবাদ করে সম্পাদনা করে নিজের মতো যেভাবে সাজিয়েছি সেটাই পাঠক পছন্দ করে ফেলেছে। পরের বই বাতিঘর থেকে শরচ্চন্দ্র দাসকে নিয়ে। ইনি চট্টগ্রামের লোক হলেও তাঁর তিব্বত অভিযানটা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। ওটাও পাঠক গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। তারপর আবারো আরেকটা চট্টগ্রাম। চিৎ-তৌৎ-গং। আমার চট্টগ্রাম বিষয়ক কিছু লেখার সংকলন করেছে কথাপ্রকাশ। পাশাপাশি বাতিঘর থেকে প্রকাশ হয়েছে শেখ দীন মোহাম্মদ- বিলেতে প্রথম বাঙালি বণিক। ২০২৫ সালেই আরেকটি বই প্রকাশিত হয় মার্কেজের সাংবাদিক জীবন নিয়ে। স্ক্যান্ডাল অব সেঞ্চুরি। ২০২৪ এবং ২০২৫ এক বছরের মধ্যে এই ৫টা বই। তখন কাজ চলছিল ২০২৬ সালের জন্য প্রকাশিত্য রাজকীয় জলদস্যু বণিক সমিতি। বইমেলা নিয়ে সরকারের তাল-বেতাল দেখে প্রকাশক বইটা ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসেই প্রকাশ করে। আশাতীত জনপ্রিয় পেল এই বইটাও। এভাবে ৭টা বই হয়ে গেল। পাইপলাইনে আছে আরো দুটো বই। আমার হাতে লেখার বিষয়বস্তুও যথেষ্ট আছে। নতুন কিছু না লিখে পুরোনো লেখা দিয়ে প্রকাশ করা যাবে সেরকম তিনটি পাণ্ডুলিপি তৈরি আছে। তবু, তবু থেমে যাবার ভাবনাটা কেন আসছে?
কারণ মানুষ নিজের যোগ্যতার চেয়ে যখন বেশি কিছু পেয়ে যায়, তখন দিক হারায়, ভারসাম্য হারায়, নিজেকে নিজের ভেতর খুঁজে পায় না। আমি নিজের ভেতর অবশিষ্ট থাকতে থাকতেই সমাপ্তি টানতে চাই।