চল্লিশ বছর আগে আমরা দুজন এত ঘনিষ্ঠ ছিলাম যে দিনে দুই বেলা আড্ডা না দিলে আমাদের ভাত হজম হতো না। আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনীর নয় নম্বর মাঠে প্রতিদিনের সান্ধ্য আড্ডা ছিল আমাদের প্রিয় স্মৃতিময় সময়। আশির দশক পেরিয়ে নব্বই দশকে সে ঢাকা চলে গেল পরিবারের সাথে। ঢাকা যাওয়ার পরও আমাদের আড্ডা পুরোপুরি কমেনি। সুযোগ পেলেই আমি ঢাকায় চলে যেতাম। ঢাকায় যাবার পর সে চাকরিতে ঢুকে পড়ে, আমি তখনো ভার্সিটি শেষ করিনি। নব্বই দশকের শুরুতে সে ফকিরাপুলে আলাদা বাসায় নেয় কয়েক বন্ধুর সাথে। সেই বাসাটা আমাদের ঢাকার ঠিকানা হয়ে ওঠে। বছরে কয়েকবার ঘুরে আসতাম গিয়ে। দু চারদিন আড্ডা দিয়ে স্বাদ মিটিয়ে আসতাম। আমি আরো কয়েকজন নিয়মিত। অনেক সময় ঢাকা যাওয়ার বাসভাড়া থাকতো না। কিন্তু ঢাকা পৌঁছাতে পারলেই হতো। সে আমার সব খরচ মিটিয়ে দিতো। আসার সময় ফিরতি ভাড়াও পকেটে ভরে দিতো। ভালো চাকরি করতো। দেদারসে খরচ করতো। ফকিরাপুলের বাসায় ওঠার আগে ঢাকা মেডিক্যাল হোস্টেলে রুম শেয়ার করতো। ফজলে রাব্বী হলের জেড-সিক্স নামের বিখ্যাত একটা কক্ষ ছিল। সেখানেই ওর ঠাঁই। আমাদের কয়েক ডাক্তার বন্ধুর তখন ছাত্রজীবন। সেখানেই কেটেছে আমাদের কিছু দিনরাত। বইমেলা শুরু হলে আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যেতো। স্টলে বসে আড্ডা দেয়া, মাঝরাতে বাসায় ফেরা। আমার তীব্র অভাবের সময় তখন। সে আমাকে ভরসা দিতো। একবার উত্তরবঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমার পকেটে পঞ্চাশ টাকাও ছিল না। ওর খরচেই গিয়েছিলাম। সেই যাত্রায় আমার পকেটে একটা পাঁচশো টাকার নোট দিয়ে বলেছিল, এটা রাখ, যদি লাগে। আমার চোখ ভিজে গিয়েছিল। সে কিভাবে বুঝলো আমার কাছে টাকা নেই। ফেরিতে মাঝরাতে যমুনা নদী পার হচ্ছিলাম। কানে হেডফোনে সুমনের গান বাজছিল। হেডফোনটা রুপুর। সে আমাদের আরেক প্রিয় বন্ধু। দারুণ ছবি আঁকতো। ফকিরাপুলের সেই বাসাতেই থাকতো। নদীর জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর মাথার ওপরে একটা গোল চাঁদ এখনো চোখে ভাসছে। তিনবিঘা করিডোর ঘুরে চেঙ্গড়াবান্দা সীমান্তে রঙিন পানি খেয়ে ঢাকা ফিরেছিলাম দুদিন পর। কী অসাধারণ সময় ছিল সব। তারপর আমিও পাশ করলাম। চাকরিতে ঢুকলাম। এত ব্যস্ত চাকরি। তবু ঢাকা যাবার সুযোগ পেলেই দুজনে দেখা করতাম। আড্ডা দিতাম একটা বেলা। সে একটা বিদেশী কোম্পানির ঢাকার বড় কর্তা। সোনারগাঁও হোটেলের উল্টো দিকে একুশে টাওয়ারে অফিস। চট্টগ্রামে আসতো অফিসের কাজে। আসলে স্টেশন রোডের হোটেল মিসকার বিশাল কক্ষ নিতো আমাদের আড্ডার জন্য। সব বন্ধু গিয়ে জুটতাম। দেদারসে উপহার বিলাতো সব বন্ধুদের। কার্টুন ভর্তি শার্ট, টিশার্ট আরো কত কিছু। মৌমাছির মতো ভিড় করতো বন্ধুরা। বছরের পর বছর সেই আনন্দময় সময় কেটেছে। বিয়ে করলো, সংসার হলো। সেখানেও মিসকার আড্ডা জড়িত। আরো অনেক বছর পার হবে। তারপর একদিন কঠিন একটা রোগ ধরা পড়বে। আমরা দুজনই দীর্ঘ সময় পর জীবিকাচ্যুত হয়ে পড়েছি। বয়স বেড়েছে, শরীরে ক্ষয় ধরেছে। পকেটে টান পড়েছে। সংসারে চাপ বেড়েছে। জীবনের সম্পন্ন অধ্যায় পার হবার পর ‘নাই নাই’ হাহাকার অধ্যায় শুরু হয়েছে। তখনই সেই দুঃসংবাদ। তিন বছর কোনোমতে ধুঁকতে ধুঁকতে কেটে যাবার পর এসে গেল মাহেন্দ্রক্ষণ। গত দুমাস হাসপাতালের বিছানা আঁকড়ে আছে সেই সজীব প্রাণবন্ত হাসিখুশি বন্ধু। ওই হাসি আর কখনো দেখা হবে না আমাদের।
তোর অসুস্থতা আমাকে অপরাধী করে দেয় বারবার। কথা ছিল আমরা দুজন পরস্পরের বিপদে কাছে থাকবো। কিন্তু হলো না। আমি এক বিপদে চাটগাঁ আটকে আছি। তুই ঢাকার হাসপাতালে। আমাদের শেষ দেখা হবে না। ২০২০ সালের পর আমরা আর কখনো একসাথে বসার সুযোগ পাইনি। জীবন এমন। জীবন তেমন। দুমাস আগে তোর কথা বন্ধ হয়ে গেছে। শেষবার ফোনে কথা বলেছিলাম দুমাস আগে। সর্বশেষ পতনের আগে। বলেছিলি, আমরা বিশ-বাইশ বছরে জীবনকে কতভাবে উপভোগ করেছি। আর আমার ছেলেমেয়ে দুটো বাবার চিকিৎসার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে হচ্ছে। ওদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। জীবন এমন কেন?
আমাকে ক্ষমা করিস। আমি পারলাম না। আমি নিজেও একটা অক্ষমতার জালে আটকে আছি। যতটা দরকার ছিল ততটা পারিনি। তোর সাথে শেষ দেখাটাও বোধহয় হবে না। তোর ছেলে-মেয়ে আমাকে বলেছে আমার নাম শুনলে তুই এখনো চিনতে পারিস। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারিস না। শুধু নীরব অশ্রু ঝরে চোখ থেকে। ওখানে কী ভাষা থাকে আমি কখনো জানতে পারবো না। মিসকার দিনগুলো মনে আছে? ফকিরাপুলের রাত জাগা কিংবা শহীদ মিনারের উল্টো দিকে পামগাছ দুটোর নীচে চায়ের স্টলের আড্ডা? বইমেলা? জেড-সিক্স? সিটি কলেজ? মসজিদ মার্কেট, নয় নম্বর মাঠ, হাসপাতালের সিঁড়ি, পাওয়ার হাউসের আড্ডা। সব তো নেই হয়ে গেছে। আমাদের মধ্যে কে আগে যাবে জানার উপায় নেই। আরো কয়েকজন চলে গেছে করোনার সময়। যারা টিকে গেছে তারা এখন যাবে, একের পর এক পালা আসবে।
আমি অনেক দিন ঢাকা যাই না। ২০২০ সালের পর একবারও যাইনি। তুই অচল হয়ে পড়ার পর আমার ঢাকা যাওয়ার ইচ্ছে উবে গেছে। ঢাকায় আমি একা চলতে পারি না। পথ হারিয়ে ফেলি। তুই আমার একমাত্র পথপ্রদর্শক ছিলি। তুই না থাকলে আমি কোথায় হারিয়ে যাবো, সেই ভয়ে আমি ঢাকা যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। আমি জানি তুই শুনলে হাসবি। কিন্তু তুই ছাড়া ঢাকা আমার কাছে অর্থহীন। আমি একটা অর্থহীন শহরে কেন যাবো? আমাকে প্রকাশক সম্পদক লেখক সবাই অনুরোধ করে। একবার গিয়ে যেন তাদের সাথে বসি। কিন্তু আমার এক ফোঁটা ইচ্ছা করে না। আমি এখানে বসেই সব কাজ করি। এখান থেকেই যতটুকু পারা যায়। ঢাকা না গেলে নাকি বড় লেখক হওয়া যায় না। আমার হবার দরকার নেই। তুই ভালো থাকলে আমার বড় লেখক হবার সুযোগ ছিল। তুই এখন এইসবের উর্ধ্বে উঠে গিয়েছিস। আমি একটা দুঃসংবাদের আশঙ্কায় বসে আছি। কিন্তু তোর নাম্বারে আর কখনো ফোন করবো না এটা জেনে গেছি। আমরা বিদায় বলবো না। পরের ট্রেনেই হয়তো উঠে পড়বো। কে জানে?
No comments:
Post a Comment