Tuesday, January 28, 2025

:: ক-খ :: ৭ম প্রহর ১১ সন্ধ্যা



এক. অনুগল্প

দেখতে পাচ্ছি দুজনকেই৷ দেখছে চটপটি ফুচকাওলাও ৷ ফুটপাতে জল জমে শহুরে ব্যাঙের সর্দি ৷

একটা রিকশা দরকার ৷ হুডতোলা, পর্দা ঘেরা ৷ কোথাও যাবে বলে ওদের আজ দুপুর চুরি করা ৷ কোথায় যাবে সে বিতর্ক অমীমাংসিত রেখে আপাতত: নিকটতম আশ্রয় সন্ধানে ৷

একটি ছাতা দুটো মাথা ৷ জোর বাতাসের বৃষ্টি তিরস্কার ৷ আর পারছে না ৷ ভিজে গেলে সব গেল ৷ বাড়ি ফিরবে না তবু ৷

এমন বৃষ্টিতে আমরাও ফিরতাম না ৷ গরম জিলিপি আর ডালপুরি ডাক দিত ৷ কবি আমাদের জন্য লিখেছিলেন-

+++++++++++++++++++++++++++++
তোমার হাত ধরে আমি দাঁড়িয়েছি বৃষ্টির ভিতরে
গাছ থেকে জল পড়ছে, বৃষ্টিছাট ছুটে আসছে গা-য়,
“ভিজে যাবে’ -তুমি বলছ, “সরে এসো ছাতার তলায়’
আমাদের একটাই ছাতা। তাতে দুজনেরই চলে যায়।
আরও কালো করে এল, গাছে ডানা ঝাপটায়।
দুজনে দাঁড়িয়ে আছি। দুজনে দাঁড়িয়ে থাকব। যতদিন পাশে থাকা যায়।
(জয় গোস্বামী)

+++++++++++++++++++++

হঠাৎ জোর বাতাসে ছাতাটা উড়ে গিয়ে হুমডি খেয়ে পড়লো ডোবার জলে ৷ এবার দুজনেই নির্বিকার আনন্দে ভিজছে ৷ দুজন থাকলে ভিজতে কোন দ্বিধা নেই ৷

ওদের জন্য কবিকে আবার নতুন লাইন যোগ করতে হবে ত্রিমাত্রিক ছন্দে ৷




দুই. সংলাপ

ক- তুমি কখনো এইটা শুনেছো https://www.youtube.com/watch?v=gWl2lSNgjJc

খ- না। এই প্রথম শুনলাম। অপূর্ব! তোমাকে একটা দেবো? এটা শোনো https://www.youtube.com/watch?v=7VVFVnSTEpc

ক -অপূর্ব! তুমি কোথায় পেলে বলোতো?

খ -তুমি যেখানে পেয়েছো?

ক -মার্কেজ?

খ -হুম

ক -কী আশ্চর্য! আমরা দুজনই মার্কেজের একই গল্প পড়ছি কখনো জানতাম না

খ -আমরা অনেক কিছুই জানি না আমরা একসাথে কত কিছু করছি নিজের অজান্তে।

ক -অথচ আমাদের দেখা হলো কত দেরিতে, কত অসময়ে।

খ- অসময়ে। তবু তো হলো। না হলে কি যে হতো?

ক- কী হতো?

খ- তা জানি না। হয়তো আমি অসম্পূর্ণ থেকে যেতাম

ক -এখন কী সম্পূর্ণ হয়েছো?

খ -যতটুকু হয়েছি ততটুকুই যথেষ্ট।

ক-আমার আসলে গল্প করার একজন সঙ্গীর দরকার ছিল। তোমার মতো সঙ্গী। সবার সাথে সব গল্প হয় না। তোমার সাথে যেসব গল্প করি সেটা অন্য কারো সাথে হয় না। এমনকি খুব কাছের খুব বন্ধুর সাথেও হয় না। আমার একজন খোলা বন্ধুর দরকার ছিল। একজন মনোযোগী শ্রোতা। যে আমার গল্পগুলো আত্মস্থ করতে পারে। বোঝাতে পারছি?

খ- বলে যাও। আমি মন দিয়ে শুনছি।

ক- এই যে বললে মন দিয়ে শুনছি। এটা আমি বিশ্বাস করি। অথচ আমার দীর্ঘকালের বন্ধু এই কথা বললে আমি বিশ্বাস করতাম না। কেন জানো?

খ- কেন?

ক- কারণ আমি বুঝি সে আমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য বলছে। আসলে মন দিয়ে শুনছে না। মন দিয়ে যেটা শোনা হয় সেটার জবাব কেমন হয় তা আমি জানি।

খ- আমার ওপর তোমার বিশ্বাস দেখে আমি আনন্দিত। আমি সত্যি মন দিয়ে শুনি। তোমার সবকিছু আমি মন দিয়ে দেখি। আমার দুই চোখের বাইরে আরো একটা দৃষ্টি আছে। তোমাকে যেদিন প্রথম দেখেছি সেদিন থেকে ওটা যুক্ত হয়েছে।

ক- তোমাকে যেদিন প্রথম দেখেছি আমার বিশ্বাস হয়নি তুমি ওটা ছিলে। তুমি কিভাবে ওখানে উপস্থিত হলে আজো আমি খুঁজে পাইনি। কিন্তু তুমি আমার জন্যই উপস্থিত হয়েছিলে।

খ- আমি রবাহুত। তোমার কথা শুনেই চলে গিয়েছিলাম। অথচ তোমাকে চিনতাম না।

ক- এত বছর পর আমি সেই প্রথম দিন স্পষ্ট দেখতে পাই। সামনের সারিতে ছিলে তুমি।

খ -দেরিতে পৌঁছেও আমি সামনের সারিতে বসার সুযোগ পেয়েছিলাম। ওটাকে ভাগ্য বলে।

ক- আমি জানতাম না তুমি কবিতা লেখো

খ- আমি ভাবিনি তুমি কবিতা পড়তে ভালোবাসো

ক -তুমি শুনছো মিউজিকটা? নোট করে রাখো- Ottorino Respighi - Concerto Gregoriano for Violin and Orchestra (1921)

খ- আমি শুনছি। তুমিও নোট করে রাখো -Ralph Vaughan Williams - Piano Quintet in C Minor (1903-1905)

ক- কী আশ্চর্য তাই না?

খ- খুব আশ্চর্য! মার্কেজ আমাদের দুজনেরই প্রিয়। অথচ দুজনে আলাদা আলাদাভাবে গল্পটা পড়েছি। সেখানেই খুঁজে পেয়েছি সঙ্গীতের দুটো সুর।

ক- মার্কেজ খুব রোমান্টিক ছিলেন। তিনি এভাবে কত জনকে মিলিয়ে দিয়েছেন তিনিও জানেন না।

খ- আমরা সাহিত্য, রাজনীতি, কবিতা, দর্শন, কত কিছু নিয়ে আলাপ করি তাই না?

ক- আমাদের বিষয়ের কোনো অভাব হয় না। তোমার কাছে আমি কঠিন সব বিষয়কে সহজ করে বলতে পারি। তুমি আমার সহজ একজন বন্ধু

খ- আর তুমি যখন কঠিন বিষয়গুলো সহজ করে বলো, আমি তখন ভাবতে পারি না ওগুলো আসলেই কঠিন কিনা।

তিন. সমাপনী সাক্ষাৎ ১০০৫২৬:৭-১১

সব গল্পেরই তো শেষ আছে। এই গল্পের পরিণতি অসমাপ্ত। গল্পের কারিগরই তার জন্য দায়ী। কারণ সে বরাবর চেয়েছে গল্পটা শুধু সংলাপে সীমাবদ্ধ থাকবে। অন্য কোনো খাতে গড়াবে না।

ক -কেউ জানে না, প্রচ্ছদও তোমার শাড়ির প্রেমে পড়ে গেছে। এসে দাঁড়িয়েছে সেই একই রঙ মেখে। কে ভেবেছিল এটা কাকতাল। মহাজাগতিক যোগাযোগ। সে রঙের শাড়ি পৃথিবীতে আর নেই। সেই প্রচ্ছদও পৃথিবীতে একটিই আছে। প্রচ্ছদ আর শাড়ির এই অদৃশ্য বন্ধনে আমরা দুই নিঃসঙ্গ পথচারী। যে পথে আমার যাবার কথা, সে পথেই তুমি আসবে। আমাদের দেখা হবে বাগানমঞ্জরির ফুলেল গালিচায়। যেখানে তোমার শাড়ি আর আমার প্রচ্ছদ দুটো মিলে নতুন একটা রঙের সূচনা করবে। তখন বৈরি বাতাসেও আমরা পথ হারাবো না। প্রচ্ছদের আড়ালে তোমার কাছে যে বার্তা পাঠিয়েছি, সেটা তুমি সবুজ আঁচলে ঢেকে রাখবে। তুমি কি জানো ওই রঙের নাম? না সবুজ না নীল। নীল সবুজের এক অদ্ভুত নির্জনতা তোমার শাড়ি জুড়ে, তোমার খোলা চুলে। এমনকি তোমার উন্মুখ দৃষ্টিতে। তুমিও জানো না, আমার প্রচ্ছদ খুব গোপনে তোমার শাড়ির প্রেমে পড়েছে। আমাদের আলাদা জীবন, কিন্তু আমরা একটা নতুন সবুজের বাঁধনে বাকী জীবন একত্রে কাটাবো। সে রঙের নাম জানো তুমি?

খ-মানুষকে কখনো কখনো নিজের হাত থেকে নিজেকে আত্মরক্ষা করতে হয়। নিজের প্রবৃত্তি থেকে, আকাঙ্ক্ষা থেকে, স্বপ্ন থেকে। মানুষের জীবনে অনেক স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা থাকে যেগুলো বাস্তবায়ন অসম্ভব। 

ক -আমাদের প্রতিনিয়ত ভান করে বেঁচে থাকতে হয়। ভালো না থেকে ভালো থাকার ভান। ভালো থেকে ভালো না থাকার ভান। এটাও আত্মরক্ষার অস্ত্র।

খ-দুর্বলতা প্রকাশ করে ফেললে সব রহস্য কেটে যায়। রহস্যের মধ্যেই প্রেমের সকল সৌন্দর্য নিহিত।

ক -অজানা রহস্যের মধ্যে যে সুপ্ত আনন্দ, প্রকাশিত সত্যের মধ্যে সেটা থাকে না। তোমার-আমার মধ্যে যা আছে, সেটা অন্ধকারে থাকাই ভালো। সেই অন্ধকার রহস্যকে আমি বেশি ভালোবাসি। সেখানেই আমি সবচেয়ে বেশি আশ্রয় নিতে পারি।

খ- তুমি অন্ধকার ভালোবাসো। সেটা জেনেই আমি আজ কালোতে সেজে এসেছি। তুমি নিশ্চিন্তে আমাতে আশ্রয় নিতে পারো। আধঘন্টা বিলম্বের কারণ সেখানেই নিহিত।

শেষের কবিতা:


ক. প্রেম হলো একটি জ্ঞান। দুই পক্ষের সেটি জানা হয়ে গেলেই পাওয়া হয়ে যায়। আমাদের জানা হয়ে গেছে, আমাদের পাবার কিছু বাকী নেই তাই। আমাদের আলাদা জীবন নিয়ে আমরা সুখী। ভালোবাসা ছায়া দিয়ে যাচ্ছে দুজনকে, সবার অলক্ষ্যে। সেই অদৃশ্য জ্যোৎস্নায় ভাসছি দুজনেই।


খ. আমাকে কতবার পেয়েছো আমারই অজান্তে। এতখানি ভালোবাসা এখনো তুমি লুকিয়ে রেখেছো আমার জন্য। অবাক লাগে। আমাকে না পেয়ে তুমি এতটা কষ্ট পেয়েছো আমি কোনদিন ভাবিনি। এমনকি তুমি যে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে আমি কোনদিন জানতাম না। কেন বলোনি তুমি? এখন এসব কথা ভাবা অবান্তর। তবু এই কমাসে যে সত্যগুলো আমরা জেনেছি সেই সত্যের শক্তিতে আমি আত্মবিশ্বাসী। নিজেকে যখন কাঙাল ভাবতাম, আসলে তখন আমি ঐশ্বর্যশালী। আমার দেখার চোখ ছিল না, শোনার কান ছিল না।


এবং গান

যখন নীরবে দূরে,
দাঁড়াও এসে,
যেখানে পথ বেঁকেছে
তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা
কে জানে, কি আবেশে দিশাহারা
আমিও ছুটে যাই সে গভীরে
আমিও ধেয়ে যাই কি নিবিঢ়ে
তুমি কি মরিচিকা,
না, ধ্রুবতারা
তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা
কে জানে, কি আবেশে দিশাহারা…
যখন রোদেরই কণা,
ধানেরই শীষে,
বিছিয়ে দেয় রোদ্দুর
তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা
কে জানে, কি আবেশে দিশাহারা
আমিও ছুটে যাই সে দিগন্তে
আমিও ধেয়ে যাই কি আনন্দে
তুমি কি, ভুলে যাওয়া কবিতারা…

তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা
কে জানে, কি আবেশে দিশাহারা
তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা
কে জানে, কি আবেশে দিশাহারা
কে জানে, কি আবেশে দিশাহারা

No comments: