সারা পৃথিবীতে বই পড়ার র্যাংকিং এ ১০২টি দেশের মধ্যে ৯৭ স্থান অধিকার করেছে বাংলাদেশ। বলা হয়েছে গড়ে একজন বাংলাদেশী বছরে ২.৭৫টি বই পড়ে। আমার ধারণা এটাও বেশি বলা হয়েছে। অথবা এখানে একাডেমিক বইয়ের কথাও যোগ করা হয়েছে। বছরে একটা আউট বই পড়ে সেরকম একটা মানুষ খুঁজে পেতে আপনি হিমশিম খেয়ে যাবেন।
খ.
১. জীবন থেকে যে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়েছি তার মধ্যে সবচেয়ে প্রথম উপলব্ধিটা হলো- বই পড়লে মানুষ সহজে বুড়ো হয় না(মানসিকভাবে)। বই মানুষের তারুণ্যকে ধরে রাখে। দ্বিতীয় উপলব্ধি হলো- ঘরের মধ্যে রাশি রাশি বই কিংবা বিশাল একটা লাইব্রেরি থাকলেই বই পড়া হয় না। উদাহরণ আমার ঘরের মধ্যেই আছে।
২. বই পড়ার সাথে মগজের একটা গভীর অদৃশ্য সংযোগ আছে। সেই সংযোগটাই আমাদের বইয়ের কাছে টেনে নিয়ে যায়। আমাদের হাতের কাছে যতই বইপত্র থাকুক, এক পাতা বই পড়াও অসম্ভব যদি ওই আবেগটা না থাকে। ওটাকে প্রেমের সাথে তুলনা করা যায়। বইপ্রেম ব্যাপারটা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। প্রতিটা মানুষের চাহিদা আলাদা। জোর করে যেমন প্রেম ঘটানো যায় না, তেমনি জোর করে কাউকে বই পড়ানো যায় না।
৩. লোকে কেন বই পড়ে? এই বোধের জন্ম হয় কিভাবে? এটারও সঠিক উত্তর বলতে কিছু নেই। একেক মানুষ একেকভাবে বইয়ের প্রেমে পড়ে। কখনো পরিবার, কখনো বন্ধুবান্ধব, কখনো বা অচেনা কেউ বই পড়ার জন্য প্রভাবিত করে। এই প্রেম চিরকাল থাকবে তারও গ্যারান্টি নেই। একসময় খুব বই পড়তো, এখন বইয়ের দিকে তাকিয়েও দেখে না, সেরকম লোকের সংখ্যা প্রচুর।
৪. অবসরের অভাবে বই পড়তে পারি না, এটা একটা সাধারণ অজুহাত। অবসরে আমরা অন্য অনেক কাজ করার জন্য ঠিকই সময় পাই, কিন্তু বইয়ের জন্য সময় পাই না। আসল কারণ হলো মগজের সাথে ঠিক যে সংযোগটা থাকলে বই মানুষকে টানে, সেই সংযোগটা নষ্ট হয়ে আছে।
মানবজাতি গত কয়েক হাজার বছরে প্রযুক্তিবিদ্যার অনেক কিছু আবিষ্কার করেছে। কিন্তু জ্ঞানার্জনের জন্য বই পড়ার কোনো বিকল্প আবিষ্কার হয়নি। নানা কারণে বইপত্র পড়ে মানুষ। জ্ঞানার্জন ছাড়াও বই কারো অবসর, কারো বিনোদন, কারো একাকীত্ব দূরীকরণের হাতিয়ার। আমি যে বইয়ের কথা বলছি সেটা আউট বই, ক্লাসের বই না। দুটো আলাদা জিনিস। আলাদা জগত।
আজকাল যে সমস্যাটা প্রকট হয়ে দেখা যাচ্ছে মানুষের সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি। আগে যে জিনিস বই পড়ে জানতো, এখন সোশ্যাল মিডিয়াতে সেটা জেনে যাচ্ছে। এটার সবচেয়ে বড় বিপদটা হলো বিভ্রান্তি। সোশ্যাল মিডিয়াতে যে কেউ দায়িত্বহীন তথ্য প্রচার করতে পারে। সেই মিথ্যা তথ্যের জন্য কোনো জবাবদিহি করতে হয় না। দেশে অসংখ্য মানুষ বোধহীনভাবে সেই তথ্যগুলো গ্রহন করে যদি সেটা তার পছন্দের হয়। এখানে এসে সবচেয়ে বিপদগ্রস্থ হয় ইতিহাস। আমি ইতিহাস নিয়ে কাজ করি বলে এই বিষয়টা খুব পীড়া দেয়। ইতিহাস জানার একমাত্র উপায় হলো প্রচুর বই পড়া। এখন প্রায়ই দেখা যায় ফেসবুক স্ট্যাটাস পড়েই সেটার ভিত্তিতেই নানা তর্ক জুড়ে দেয় অনেকে। তর্ক করার খাতিরে হলেও বই পড়তে হবে। ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কে কী বললো সেটা তর্ক করার কোনো সূত্র হতে পারে না। ইন্টারনেট উন্মুক্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার। চাইলে সেটার সুষ্ঠু ব্যবহার করে অনেক কিছু জানা যায়। ইচ্ছে করলে বিনা পয়সাতেও প্রচুর বইপত্র পাওয়া সম্ভব।
স্কুল কলেজের বই পড়ে সার্টিফিকেট পাওয়া সম্ভব হলেও সত্যিকারের জ্ঞানার্জনের জন্য আরো অনেক অনেক বই পড়া দরকার। বই পড়ার অভ্যেস একেকটা জাতিকে কতদূর এগিয়ে নিয়ে যায় সেটা ইউরোপের সাথে ভারতবর্ষের তুলনা করলেই বোঝা যাবে। এই উপমহাদেশের মূর্খতা অন্ধতা সবকিছুই ঘটছে বই পড়ার অভাবে। মূর্খতা একটা অভিশাপ। এই অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য হলেও বই পড়ার জন্য কিছুটা সময় বরাদ্দ রাখা উচিত।