ভারতবর্ষের ইতিহাসের কালো একটা দিন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো তার আগের দিনের সংবাদপত্র পড়ে বোঝার উপায় ছিল না পরদিনই এমন একটা ভয়ানক ব্যাপার ঘটতে চলেছে। ১৬ আগষ্ট পুরো পাতা জুড়ে দৈনিক যুগান্তরের বিশাল শিরোনাম ‘প্রাক-সংস্কার যুগের দীর্ঘমেয়াদী বাংলার রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির আদেশ’।
এটা বিরাট একটা খবর। কেননা এই আদেশে মুক্তি পেয়েছিল চট্টগ্রাম বিদ্রোহের প্রধান আসামীরা। দ্বিতীয় শিরোনামে ছিল ‘মি. জিন্নার সাথে পণ্ডিত নেহেরুর সাক্ষাৎ’। দুটো সংবাদই গুরুত্বপূর্ণ। আগে চট্টগ্রাম বিদ্রোহের ঘটনাটা নিয়ে যুগান্তর কি লিখেছে দেখা যাক।
“বাঙ্গলার প্রাক-সংস্কার যুগের গনেশ ঘোষ, অনন্ত সিং, অম্বিকা চক্রবর্তী ইত্যাদি ৩০ জন রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তির আদেশ দেওয়া হইয়াছে। গতকল্য বৃহস্পতিবার বঙ্গীয় ব্যবস্থা পরিষদে প্রধানমন্ত্রী মি: সুরাবর্দী তাঁহার পূর্ব্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উপরোক্ত ঘোষণা করেন। অপর একটি প্রশ্নোত্তরে তিনি জানান যে, আগষ্ট বন্দীদের সম্পর্কেও তিনি বিবেচনা করিতেছেন।”
এই সংবাদের পাশে অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলার বিবরণ ছাপানো হয়েছে।
"...আজ হইতে ১৬ বছর পূর্বে ১৯৩০ এর ১৮ এপ্রিলে ইষ্টার ছুটিতে রাত্রি দশটার সময় একদল যুবক যুগপৎ চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার, টেলিগ্রাফ অফিস এবং পুলিশ ব্যারাকে আক্রমণ করে এবং তাহাদের আক্রমণের ফলে সমগ্র সরকারী শাসন ব্যবস্থা স্তব্ধ হইয়া যায়। এই কাহিনী প্রকাশিত হইলে দেশবাসী এমন কি সরকারী কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত প্রথমে বিশ্বাস করিতে পারেন নাই যে এইরূপ ব্যাপার সম্ভব। এমন কি তদানীন্তন লাটসাহেব স্যার স্ট্যানলি জ্যাকসন একজন খ্যাতনামা নেতার নিকট বলিয়াছিলেন যে অসন্তুষ্ট পুলিশ বাহিনী এই কাণ্ড করিয়াছে। ১৮ এপ্রিলের পরদিন আক্রমণ কারীদের অন্যতম সহকর্ম্মী হাসপাতালে মৃত্যুর সময় যে জবানবন্দী দেন তাহাতে কর্তৃপক্ষ প্রকৃত ব্যাপার জানিতে পারেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বৃটিশ শক্তি চঞ্চল হইয়া উঠে।…….”
‘মি. জিন্নার সাথে পণ্ডিত নেহেরুর সাক্ষাৎ’ শিরোনামে ২য় সংবাদটিও গুরুত্বপূর্ণ। সেই সংবাদেও ছিল আশার বাণী। সমঝোতার কথা।
কিন্তু ৩য় পৃষ্ঠায় আরেকটা শিরোনাম। যেটাকে তখনো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। তাতে লেখা ছিল-
১. ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস সংঘর্ষ দিবস নয়’। উপশিরোনাম: ‘জিন্না মুসলমানদের শান্ত ও শৃংখলা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন’।
মুসলমানদের শান্ত থাকার আহবান জানালেন কেন জিন্না? সেই সংবাদের নীচে ছোট্ট দুটো সংবাদ।
২. ‘১৬ আগষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি’
৩. ‘১৬ আগষ্ট ট্রাম ধর্মঘট’।
এখন আমরা জানি ১৬ আগষ্ট কলকাতায় ভয়ানক একটা দাঙ্গা হয়েছিল। এই সংবাদগুলোর মধ্যে এমন কোনো প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত আছে যে পরদিন কিছু ঘটবে?
পরের কয়েক দিনের সংবাদপত্র জুড়ে ছিল সেই দাঙ্গার নানা ভয়ানক ঘটনা। স্বাভাবিকভাবেই চট্টগ্রাম বিদ্রোহের মুক্তি পাওয়া বন্দীরা হারিয়ে গেল সংবাদপত্রের পাতা থেকে।





